📄 হাজারে আসওয়াদ বা কালোপাথর
কাবা শরীফের পূর্বকোণে হাজারে আসওয়াদ অবস্থিত। এই পাথর বহু মূল্যবান ও বরকতময়। এটি একটি বেহেশতী পাথর। নবী করীম (সা) ঐ পাথরটিকে চুমু দিয়েছেন। এতে চুমু দেয়ার ফজীলত অনেক বেশী। তাই হযরত উমর (রা) হাজারে আসওয়াদকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন: "আমি জানি তুমি একখানা পাথর, তোমার উপকার ও ক্ষতি করার কোন ক্ষমতা নেই। যদি আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে তোমার গায়ে চুমু দিতে না দেখতাম তাহলে আমি কখনও তোমাকে চুমু দিতাম না।"
মূলত এই পাথরকে চুমু দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা। এই চুমু খাওয়া সুন্নত। ইসলামের বড় কোন খুঁটি নয়। তাই যারা হাজারে আসওয়াদের চুমুকে মূর্তিপূজার সাথে তুলনা করে তারা বিরাট ভুল করে। কেননা, মূর্তিপূজার উদ্দেশ্য হচ্ছে দেবতার সন্তুষ্টি অর্জন করার মাধ্যমে বিশেষ কোন লক্ষ্য হাসিল করা। দেবতার পূজায় সেজদা সহ আরো বহু অযৌক্তিক আচরণ প্রদর্শন করতে হয়। হাজারে আসওয়াদ তার সম্পূর্ণ বিপরীত। মুসলমানরা এর পূজা করে না এবং এর কাছ থেকে দুনিয়ায় উপকার-অপকার পাওয়ারও আশা করে না। মূর্তিপূজার মূল লক্ষ্য তাই। মুসলমানরা পাথরটিকে উপাস্য মনে করে এর পূজা করে না। পরকালের কিছু কল্যাণ লাভের জন্য নবীর অনুসরণে, মুসলমানরা এতে চুমু খায়। হযরত উমরের উপরোক্ত মন্তব্যের মাধ্যমেই একথা পরিষ্কার হয়ে যায় এবং এ ব্যাপারে এটিই হচ্ছে প্রত্যেক মুসলমানের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। হাজারে আসওয়াদের সম্মান এক জিনিস আর এর পূজা ভিন্ন জিনিস।
কাবা শরীফ নির্মাণের সময় হযরত ইবরাহীম (আ) এই পাথরটি কাবার পূর্বকোণে লাগান। রাসূলুল্লাহ (সা) এর নবুওয়তের পূর্বে কোরাইশরা যখন কাবা পুনঃনির্মাণ করে, তখনও তিনি নিজ হাতে কাবার দেয়ালে হাজারে আসওয়াদটি লাগিয়ে কোরাইশদের সম্ভাব্য সংঘর্ষের পরিসমাপ্তি ঘটান।
আল্লামা আবু আবদিল্লাহ আল-ফাকেহী তাঁর "আখবারে মক্কা" বইতে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির সনদ দুর্বল। হাদীসটি হচ্ছেঃ
إِنَّ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : لَوْ لَا مَا طَبَعَ اللَّهُ الرُّكْنَ مِنْ أَنْجَاسِ الْجَاهِلِيَّةِ وَأَرْجَاسِهَا وَأَيْدِي الظَّلَمَةِ وَالْأَثَمَةِ - لَأَسْتُشْفِي بِهِ مِنْ كُلِّ عَاهَةٍ - وَلَأُلْفِي الْيَوْمَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَهُ اللَّهُ تَعَالَى . وَإِنَّمَا غَيَّرَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِالسَّوَادِ لِئَلَّا يَنْظُرَ أَهْلُ الدُّنْيَا إِلَى زِينَةِ الْجَنَّةِ - وَلَيَصِيْرَنَّ إِلَيْهَا . وَإِنَّهَا لَيَاقُوقَةُ بَيْضَاءُ مِنْ يَاقُوتِ الْجَنَّةِ . وَضَعَهُ اللَّهُ حِيْنَ أَنْزَلَهُ لِآدَمَ فِي مَوْضَعِ الْكَعْبَةِ - قَبْلَ أَنْ تَكُونَ الكَعْبَةُ ، وَالْأَرْضُ يَوْمَئِذٍ طَاهِرَةَ لَمْ يُعْمَلْ فِيهَا بِشَيْلٍ مِّنَ الْمَعَاصِي - وَلَيْسَ لَهَا أَهْلُ يَنْجِسُونَهَا ، فَوَضَعَ لَهُ صَفًا مِّنَ الْمَلَائِكَةِ عَلَى اطرَافِ الْحَرَمِ يَحْرِسُونَهُ مِنْ سُكَانِ الْأَرْضِ - وَسُكَانُهَا يَوْمَئِذٍ الجِنُّ - وَلَيْسَ يَنْبَغِي لَهُمْ أَنْ يَنْظُرُوا إِلَيْهِ ، لِأَنَّهُ شَنِيٌّ مِّنَ الْجَنَّةِ وَمَنْ نَظَرَ إِلَى الْجَنَّةِ دَخَلَهَا ، وَفَلَيْسَ يَنْبَغِي أَنْ يَنْظُرَ إِلَيْهَا الأَمَنْ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ ، وَالْمَلَائِكَةُ يَدُودُو نَهُمْ عَنْهُ لَا يُجِيزُ مِنْهُمْ شَيْ .
অর্থ: 'রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যদি আল্লাহ জাহেলিয়াতের অপবিত্রতা ও নাপাকী এবং জালেম ও পাপীষ্ঠদের হাতের কালিমায় হাজারে আসওয়াদ এর রং পরিবর্তন না করতেন তাহলে, এর মাধ্যমে সকল পঙ্গুত্বের চিকিৎসা হত এবং আল্লাহ প্রথম দিন একে যে আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন হুবহু সেই আকৃতিতেই পাওয়া যেত। আল্লাহ এর রং পরিবর্তন করে এই জন্যই কাল করে দিয়েছেন যে, দুনিয়াবাসী মানুষ যেন বেহেশতের সৌন্দর্য (দুনিয়াতে বসেই) দেখতে না পায় এবং তা যেন বেহেশতের মধ্যেই ফিরে আসে। এটি বেহেশতের সাদা ইয়াকুত পাথরের একটি। হযরত আদম (আ) কে পৃথিবীতে পাঠানোর সময় আল্লাহ তা কাবা শরীফের স্থানে রেখে দিয়েছিলেন। তখন কাবাঘর ছিল না। তখন যমীন ছিল পবিত্র, এতে কোন গুনাহ সংঘটিত হত না। এতে গুনাহ করার মত কোন অধিবাসী ছিল না। আল্লাহ হারাম সীমান্তের চারদিকে একদল ফেরেশতাকে সারি বেঁধে পাহারার কাজে নিয়োজিত করেন। তখন যমীনের অধিবাসী ছিল জিন। এই পাথরের প্রতি নজর করার কোন অধিকার তাদের ছিলনা। কেননা, এটি ছিল একটি বেহেশতী জিনিস। যে বেহেশতের দিকে নজর করবে সে তাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তির জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়েছে তারই কেবল ঐ পাথরটি দেখা উচিত। ফেরেশতারা সবাইকে বিতাড়িত করতে থাকে এবং কাউকে তা দেখার অনুমতি দিচ্ছিল না।'
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) কা'বা শরীফ নির্মাণের সময় জিবরাইল (আ) বেহেশত থেকে ঐ পাথরটি এনে দেন। তাই ঐ পাথরটি সাধারণ কোন পাথর নয়।
হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরের শাসনামলে কা'বা শরীফে অগ্নিকাণ্ডের ফলে হাজারে আসওয়াদও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তা ফেটে তিন টুকরো হয়ে যায়। এজন্য হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের পরে তাকে রূপা দিয়ে মুড়িয়ে দেন। এরপর হিজরী ৩১৭ সালের ৭ই জিলহজ্জ, হাজারে আসওয়াদ তার ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ক্রান্তিলগ্নে এসে পৌঁছে। ঐ সময় কারামতিয়া সম্প্রদায়ের জালেম শাসক আবু তাহের সোলায়মান বিন হাসান কারামতী হাজারে আসওয়াদকে খুলে নিয়ে যায় এবং কুফার জামে মসজিদের সাথে লাগিয়ে দেয়। তার উদ্দেশ্য ছিল লোকেরা যেন হজ্জের জন্য সেখানে যায়। দীর্ঘ বাইশ বছর পর আবুল কাসেম মুতিউ এবং কারো মতে, আবুল আব্বাস ফজল বিন আল মোকতাদির ৩০ হাজার দীনারের বিনিময়ে তা পুনরায় মক্কায় ফিরিয়ে আনেন ও কা'বায় লাগান।
হাদীস শরীফে হাজারে আসওয়াদকে বেহেশতী পাথর বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে মুসলমানদের কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
إِنَّ الرُّكْنَ وَالْمَقَامَ يَاقُوتَتَانِ مِنْ يَاقُوتِ الْجَنَّةِ - (رواه الترمذى واحمد والحاكم وابن حبان)
অর্থ: রোকনে আসওয়াদ অর্থাৎ হাজারে আসওয়াদ এবং মাকামে ইবরাহীম বেহেশতের দুটি ইয়াকুত পাথর।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ
الْحَجَرُ الْأَسْوَدُ مِنْ حِجَارَةِ الْجَنَّةِ - (رواه الطبراني في معجمه . الاوسط والكبير )
অর্থ: 'হাজারে আসওয়াদ হচ্ছে বেহেশতের পাথর।'
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
نَزَلَ الْحَجَرُ الْأَسْوَدُ مِنَ الْجَنَّةِ - (الترمذي)
অর্থ: 'হাজারে আসওয়াদ বেহেশত থেকে নাযিল হয়েছে।' সহীহ ইবনে খোযায়মায় অন্য এক সনদে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। নাসাঈ শরীফেও পৃথক সনদে হাদীসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে-
الْحَجَرُ الأَسْوَدُ مِنَ الْجَنَّةِ .
অর্থ: 'হাজারে আসওয়াদ বেহেশতের পাথর।' ইমাম আহমদ, সাঈদ বিন মনসুর এবং হাকিমও এই হাদীসকে বর্ণনা করে বলেছেন যে, এটি সহীহ হাদীস। বাজ্জার এবং তাবরানী তাঁর আওসাত গ্রন্থে এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে হযরত আনাসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
সহীহ ইবনে খোযায়মায় বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
الْحَجَرُ الأَسْوَدُ يَاقُوتَةً بَيْضَاءُ مِنْ يَاقُوتِ الْجَنَّةِ .
'হাজারে আসওয়াদ বেহেশতের সাদা ইয়াকুত পাথরের একটি।' তিরমিযী শরীফে হাদীসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে-
الْحَجَرُ يَاقُوتَةٌ مِّنْ يُوَاقِيْتِ الْجَنَّةِ .
অর্থ: 'হাজারে আসওয়াদ বেহেশতের ইয়াকুত পাথরের অন্যতম।'
উপরোক্ত বর্ণনায় দেখা যায় যে, একাধিক হাদীস হাজারে আসওয়াদের বেহেশতী পাথর হওয়ার প্রমাণ বহন করে। হাদীসের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহে এই সম্পর্কিত হাদীসগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন মুসনাদে আহমদ বিন হাম্বল, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, সহীহ ইবনে খোযায়মা, সহীহ ইবনে হিব্বান, মোজাম আত-তাবরানী, সুনানে সাঈদ বিন মনসুর, আল্লামা আযরাকীর আখবারে মক্কা, আল্লামা ফাকেহীর আখবারে মক্কা ইত্যাদি। বিশেষ করে, তিরমিযী, ইবনে হিব্বান, হাকেম ও ইবনে খোযায়মা বর্ণনাকারী হাফেজ হাদীসের সূত্রে, ঐগুলোকে সহীহ হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। তাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কেউ এসকল হাদীসের ব্যাপারে মতভেদ পোষণ করেন না। মতভেদ হচ্ছে এর নাযিল হওয়ার সময়কাল নিয়ে। সেটি কি হযরত আদম (আ) এর সাথে বেহেশত থেকে নাযিল হয়েছিল, নাকি হযরত ইবরাহীম (আ) এর কাবা নির্মাণের সময়, এটাই হচ্ছে মতপার্থক্যের বিষয়।
তাবরানী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। সেটির সনদ দুর্বল। হাদীসটিতে বলা হয়েছে-
إِنَّهُ أُنْزِلَ إِلَى الْأَرْضِ حِيْنَ أُنْزِلَ آدَمُ .
অর্থ: 'হযরত আদম (আ) এর নাযিল হওয়ার সময় হাজারে আসওয়াদও বেহেশত থেকে নাযিল হয়েছিল।'
হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে,
نَزَلَ الْحَجَرُ أَوَّلَ مَا نَزَلَ عَلَى جَبَلِ أَبِي قُبَيْس - فَمَكَثَ أَرْبَعِينَ سَنَةً . ثُمَّ وَضَعَ عَلَى قَوَاعِدِ إِبْرَاهِيمَ - (رواه الطبراني)
অর্থ: 'হাজারে আসওয়াদ প্রথম আবু কোবাইস পাহাড়ে নাযিল হয়। সেখানে তা ৪০ বছর পর্যন্ত থাকে। তারপর তা হযরত ইবরাহীম (আ) এর ভিত্তির উপর লাগানো হয়। এই হাদীসটি মাওকুফ যা শুধুমাত্র সাহাবী পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। তবে এর সনদ সবল ও রাবীরা বিশ্বস্ত।
ইবনে জোহাইরা আল মক্কী বলেছেন, 'যখন ইবরাহীম খলীল কাবা নির্মাণের সময় হাজারে আসওয়াদের জায়গায় এসে পৌছেন তখন জিবরাইল (আ) হাজারে আসওয়াদকে নিয়ে আসেন। কেউ বলেছেন, জিবরাইল (আ) বেহেশত থেকে পাথরটি নিয়ে এসেছেন। কারো কারো মতে, জিবরাইল (আ) আবু কোবাইস পাহাড় থেকে পাথরটি নিয়ে আসেন। কেননা, প্লাবনের সময় যখন সবকিছু ডুবে গিয়েছিল, তখন আল্লাহ হাজারে আসওয়াদকে আবু কোবাইস পাহাড়ে আমানত রাখেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী শরহে বুখারীতে আবু জাহমের একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। সেটি হচ্ছে-
إِنَّ الْحَجَرَ الْأَسْوَدَ نَزَلَ قَبْلَ إِبْرَاهِيمَ ، ثُمَّ رُفِعُ إِلَى السَّمَاءِ حِيْنَ غَرِقَتُ الْأَرْضُ ، ثُمَّ جَاءَ بِهِ جِبْرِيلُ حِيْنَ بَنَاهُ إِبْرَاهِيمُ .
অর্থ: 'হযরত ইবরাহীম (আ) এর আগেই হাজারে আসওয়াদ অবতীর্ণ হয়েছে। বন্যার সময় এটিকে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল। তারপর ইবরাহীম (আ) এর কাবা শরীফ নির্মাণের সময় জিবরাইল তা নিয়ে আসেন।'
উবাই বিন কাব (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, নবী করীম (সা) এরশাদ করেছেন : أَنْزَلَ الْحَجَرَ مَلَكُ مِّنَ الْجَنَّةِ অর্থ- 'বেহেশত থেকে একজন ফেরেশতা হার্জারে আসওয়াদটি অবতীর্ণ করেছেন। এই সকল হাদীসের মূলকথা হল হাজারে আসওয়াদ বেহেশতের একটি পাথর। কাজেই এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য আলোচনা দ্বারা মূল বিষয়ে কোন অসুবিধে নেই।