📄 আইয়ামে জাহেলিয়াতের বর্বরতার রূপ
হযরত ইবরাহীম (আ) নিজ পুত্র, ইসমাইল (আ) সহ কাবা নির্মাণ করেন এবং উভয়েই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকেন। পরে তার বংশধরগণ কিছুদিন ইসলামের পথে চলেছে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই তারা তাদের নবীদের শিক্ষা ও প্রদর্শিত পথ ভুলে গিয়ে জাহেলিয়াতের গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা কম-বেশী দু'হাজার বৎসর পর্যন্ত বিরাজমান ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে আরবদেশে কোন নবীর আবির্ভাব হয়নি। তারপর হযরত ইবরাহীম (আ) এর দোয়া কবুল হল এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এসে জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে মানুষকে উদ্ধার করেন। ইবরাহীম (আ) দোয়া করেছিলেন:
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ .
অর্থ: 'হে আল্লাহ এই জাতির মধ্য থেকেই একজন নবী পাঠাও, যিনি তাদেরকে তোমার বাণী শোনাবে, জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা শিক্ষা দিবে এবং তাদের নৈতিক চরিত্র সংশোধন করবে।' (আল বাকারা ১২৯)। হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর নবুওত হযরত ইবরাহীম (আ) এর দোয়ারই ফসল। এখন আসুন, আমরা জাহেলিয়াতের বর্বর আচরণ সম্পর্কে কিছু আলোচনা করি।
আল্লাহর একত্ববাদ ও সার্বভৌমত্বের প্রচারের জন্য যে কাবাঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই কাবার ভেতরই শত শত মূর্তি ও দেবতা ঢুকানো হল। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) এর ভেতর থেকে ৩৬০টি মূর্তি সরান। দুর্বৃত্তরা স্বয়ং হযরত ইবরাহীম এবং ইসমাইল (আ) এর মূর্তি তৈরি করে তা কাবার ভেতর রেখে দেয়। এ ছাড়াও তাতে লাত, মানাত, ওজ্জার ২য় সংস্করণ, আসাফ, নায়েলা, হোবল, নসর, ইয়াগুসসহ অসংখ্য মূর্তি ছিল। প্রতিমা পূজা এমন পর্যায়ে পৌঁছলো যে, পাথর না পেলে, পানি ও মাটি মিশিয়ে একটি প্রতিমূর্তি তৈরি করে এর উপর ছাগলের দুধ ছিটিয়ে দিলেই তাদের মতে সেই নিষ্প্রাণ পিণ্ডটি উপাস্য হয়ে যেত এবং তারা এরই পূজা করত।
সাইয়েদ কুতুব উল্লেখ করেছেন যে, প্রত্যেক গোত্রের একটি করে মূর্তি ছিল। এমনকি প্রত্যেক শহর ও লোকালয়ের পৃথক পৃথক মূর্তি ছিল।
আলকিন্দি লিখেছেন, মক্কার প্রত্যেক ঘরে একটি করে মূর্তি ছিল। মক্কার কোন লোক সফরে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তার সর্বশেষ কাজ ছিল পারিবারিক মূর্তির সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাকে প্রণাম জানানো। সফর থেকে ফিরে আসার পরও প্রথম কাজটি ছিল ঘরের মূর্তিটিকে প্রণাম করা।
মূর্তি সংগ্রহ করা এবং এদেরকে রাখার জন্য মন্দির তৈরি করার ব্যাপারে লোকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল। যারা অনুরূপ পাথর বা মূর্তি সংগ্রহ করতে পারত না তারা কাবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তির প্রণাম করত। ঐ সকল মূর্তি বা পাথরগুলোকে 'আনসাব' বলা হত।
বুখারী শরীফে আবু রাজোয়া আল-আতারিদী থেকে বর্ণিত আছে যে, 'আমরা পাথরপূজা করতাম। যখন আমরা নতুন ভাল পাথর পেতাম তখন পুরাতন পাথরটি ফেলে দিতাম। কোন পাথর না পেলে আমরা মাটির মূর্তি তৈরি করে তার উপর ছাগলের দুধ ছিটিয়ে দিতাম।' যখন কোন পর্যটক কোন স্থানে যাত্রা বিরতি করত, তখন সে চারটি পাথর সংগ্রহ করত। সে এর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্টটির পূজা করত এবং বাকী তিনটা দিয়ে চুলা তৈরি করে এর উপর খাবার পাকাত।
যে মূর্তিপূজা ও ঠাকুরবাদের ব্যাপারে তাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ) গোটা ইরাকের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন তারা আবার তাই শুরু করে দিল। কা'বা শরীফকে মূর্তিপূজার আড্ডাখানা বানিয়ে তারা ঠাকুর সেজে বসল। তারা ভূত-প্রেত, জ্বীন, ফেরেশতা এবং মৃতপূর্বপুরুষদের আত্মার পূজাও করত।
আল-কালবী লিখেছেন যে, খোজাআ গোত্রের বনি মালিক শাখার লোকেরা জ্বীনের পূজা করত। সাঈদ উল্লেখ করেছেন যে, হিমিয়ার গোত্র সূর্য এবং কাইয়ারা গোত্র চাঁদের পূজা করত। বনু কায়েস গোত্র বুধ, শুক্র, শনি ও বৃহস্পতি গ্রহের পূজা করত।
মক্কায় হজ্জের মওসুমে তিনটি মেলা বসত। সবচাইতে বড় মেলাটি বসত ওকাজ বাজারে। সেখানে প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা যেত, তাদের কবিরা নিজ নিজ গোত্রের খ্যাতি, বীরত্ব, শক্তি, সম্মান ও দানের প্রশংসায় আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলত এবং গৌরব ও অহংকার প্রকাশের ব্যাপারে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হত। প্রত্যেক গোত্রের প্রধানরা নিজেদের সুনাম অর্জনের জন্য বড় বড় ডেগ চড়াত এবং উটের পর উট জবাই করে মেলার মানুষদেরকে খাওয়াত। এই অপচয়ের উদ্দেশ্য হল, মেলায় আগত লোকদের মাধ্যমে গোটা আরব দেশে তাদের সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। এই সকল মেলায় নাচ-গান, মদ এবং ব্যভিচারসহ সকল প্রকার নির্লজ্জ কাজ অনুষ্ঠিত হত।
তারা উলঙ্গ হয়ে কাবার তওয়াফ করত এবং বিকৃত উপায়ে এবাদত করত। তারা কাবার পার্শ্বে হাততালি দিত, বাঁশী বাজাত এবং শিঙ্গায় ফুঁ দিত। তারা সেখানে পশু কোরবানী দিত। কোরবানীর রক্ত কাবার দেয়ালে লেপে দিত এবং গোশত কাবার দরজার সামনে ফেলে রাখত। তাদের মতে, (নাউজুবিল্লাহ) আল্লাহ এগুলো কবুল করবেন।
হযরত ইবরাহীম (আ) ৪ মাসের মধ্যে রক্তপাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু যখন তারা যুদ্ধ করতে চাইত তখন তারা এক বছরের নিষিদ্ধ মাসগুলোকে হালাল গণ্য করে যুদ্ধ করত এবং পরের বছর এর কাজা আদায় করত।
তারা হজ্জের সফরে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা আয়-রোজগার করাকে নাযায়েজ মনে করত।
তারা হজ্জের সময় পানাহার পর্যন্ত বন্ধ করে দিত। এগুলোকে তারা এবাদত মনে করত। কোন কোন লোক হজ্জে যাত্রা করলে কথাবার্তা বন্ধ করে দিত। এর নাম ছিল হজ্জে 'মুছমেত' বা বোবা হজ্জ।
ইসলামের প্রথম দিকে আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরতকারী মুসলিম দলপতি বাদশাহ নাজ্জাসীর দরবারে বলেন, আমরা ছিলাম মূর্খ লোক, আমরা শুধু মূর্তিপূজা করতাম। এমন কোন অন্যায় আচরণ বাকী নেই যা আমরা করিনি। আমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং প্রতিবেশীদের অধিকার আদায় করি না। দুর্বলের উপর অত্যাচারকারীকে আমাদের মধ্যে বেশী শক্তিশালী বিবেচনা করা হয়। আমাদের মধ্যে আল্লাহর নবী আসার পূর্ব পর্যন্ত আমরা অন্ধকারে ছিলাম। তিনি আমাদেরকে এইসব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
যুদ্ধবিগ্রহ ও দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ তাদের নিত্যকার সাথী ছিল। এক গোত্র আরেক গোত্রের সাথে বছরের পর বছর যুদ্ধে লিপ্ত থাকত। ওয়ায়েল, বকর এবং তামীম গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ ৪০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়। এই যুদ্ধে দুই গোত্র প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। দাহিস এবং আল-গাবরাআর যুদ্ধও অনুরূপ আরেকটি প্রমাণ। কায়েস বিন যুহাইরের দাহিস নামক ঘোড়াটি হোজাইফা বিন বদরের ঘোড়ার সাথে প্রতিযোগিতায় অগ্রগামী থাকায় হোজাইফার পরামর্শক্রমে আসাদ গোত্রের এক বেদুইন সেই অগ্রগামী ঘোড়াটির কপালে আঘাত হানে। ফলে, অন্যান্য ঘোড়াগুলো এই যন্ত্রণাকাতর ঘোড়াটির আগে চলে যায়। তখন একটি শিশুও মারা যায়। ফলে দুই গোত্র নিহত শিশুর প্রতিশোধে মরিয়া হয়ে উঠে। সেই যুদ্ধে বহু সংখ্যক লোক মারা যায়। উটকে পানি খাওয়ানোর বিবাদে আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে ১২০ বছর পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। কত লোক ঐ যুদ্ধে মারা যায় তার কোন শেষ নেই।
এছাড়াও সর্বত্র বাণিজ্য কাফেলার উপর ডাকাত পড়ে সব লুটপাট করে নিত। সাধারণ কোন যাত্রীর জানমালের নিরাপত্তা ছিল না। কাবার উদ্দেশ্যে আগত লোকদের জানমালেরও কোনও নিরাপত্তা ছিল না। সর্বত্র এক অরাজক পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল। সর্বত্র খুনী ও লুটেরাদের দৌরাত্ম্য এবং যুদ্ধের আগুন প্রজ্জ্বলিত ছিল। দারিদ্র্য, অভাব-অনটনে মানুষ জর্জরিত ছিল। শান্তি শৃংখলা বলতে কিছুই ছিল না।
বিয়ে প্রথা ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও পৈশাচিক। বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আইয়ামে জাহেলিয়াতে নারী পুরুষের মধ্যে ৪ ধরনের যৌন সম্পর্ক ছিল। ১ম প্রকার সম্পর্ক হচ্ছে, আজকের সমাজের বিয়ের অনুরূপ এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির মেয়ে কিংবা তার জিম্মায় মওজুদ অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব করত এবং বিয়েতে প্রয়োজনীয় দেনমোহর দিত। ২য় প্রকার সম্পর্ক ছিল, এক ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে মাসিক ঋতু শেষ হওয়ার পর কোন নির্দিষ্ট লোকের নাম ধরে বলত, তার কাছে গিয়ে গর্ভধারণ করে আস। ইশারাকৃত লোকটি থেকে বাহ্যিক গর্ভ প্রকাশের আগে স্বামী নিজ স্ত্রীর সাথে যৌন মিলন থেকে দূরে থাকত। স্ত্রীর পেট বড় হলে, স্বামী ইচ্ছা করলে তার সাথে সহবাস করত। কোন উত্তম রক্তের একটি সন্তান লাভ করার জন্যই সে এই অমানবিক পদ্ধতি গ্রহণ করত। ৩য় প্রকারের সম্পর্ক ছিল, কমপক্ষে ১০ ব্যক্তি একজন মহিলাকে শেয়ারে গ্রহণ করত। এদের প্রত্যেকেই মেয়ে লোকটির সাথে সহবাস করত। সে যদি গর্ভধারণ করত, সন্তান প্রসবের কয়েকদিন পর সে ঐ সকল পুরুষদেরকে ডেকে পাঠাত। তাদের একজনও ঐ মিটিং-এ অনুপস্থিত থাকতে পারত না। মেয়েলোকটি উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে বলত আমার এবং তোমাদের মধ্যে কি সম্পর্ক ছিল তাতো কারুর অজানা নয়। সে যাকে ইচ্ছে তাকে সন্তানের বাপ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারত। চিহ্নিত ব্যক্তির তা অস্বীকার করার কোন উপায় ছিল না।
৪র্থ প্রকার সম্পর্ক ছিল, বর্তমান যুগের বেশ্যাবৃত্তির অনুরূপ। বহু সংখ্যক ব্যক্তি একজন মেয়েলোকের কাছে আসত এবং মেয়েলোকটি আগত কোন ব্যক্তিকেই অস্বীকার করতে পারত না। বেশ্যারা নিজেদের ঘরের দরজার সামনে এক ধরনের পতাকা উড়াত। এর দ্বারা তারা কোন ব্যক্তিকে স্বাগত জানায় বলে বুঝাত। বেশ্যাটি কোন সন্তান প্রসব করলে সংশ্লিষ্ট পুরুষরা মিলে মহিলাটিকে চাঁদা দিত এবং সন্তানের পিতা নির্বাচনের জন্য একজন গণকের আশ্রয় নিত। গণকের বক্তব্য অনুযায়ী জারজ সন্তানটির পিতা নির্দিষ্ট হত। ঐ পিতা কিছুতেই সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করতে পারত না।
এই বক্তব্য দ্বারা বুঝা যায় যে, আমরা যেমন গাভী, উষ্ট্রী ও ঘোটকীকে ষাঁড় কিংবা পুরুষ উট ও ঘোড়ার কাছে পাঠাই তারাও নিজের স্ত্রীকে অন্য মানুষের কাছে পাঠিয়ে পশুর স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে বর্ণিত শেষ ও প্রকার হচ্ছে মানবতার জন্য বিরাট অবমাননা ও লাঞ্ছনা।
আবুল হাসান আলী নদভী তাঁর 'ইসলাম এণ্ড দি ওয়ার্ল্ড' বইতে লিখেছেন, জাহেলিয়াতে যুগে মহিলারা ছিল সবচাইতে বেশী নির্যাতিত। সম্পত্তিতে তাদের উত্তরাধিকার স্বীকৃত ছিল না। বিধবা এবং তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদের দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর বড় ছেলে অন্যান্য সম্পত্তির মত, পিতার বিধবা স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী হিসেবে উত্তরাধিকার পেত। নারী এবং পুরুষদের খাবারও পৃথক ধরনের ছিল। মহিলাদের অপেক্ষাকৃত খারাপ ও নিম্নমানের খাবার দেয়া হত।
আইয়ামে জাহেলিয়াতে মেয়েশিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া হত। অর্থহীন গর্ব ও অহংকার প্রকাশের কুপ্রথার কারণে মেয়ে শিশুদেরকে হত্যা করে গোত্রে গোত্রে পুরুষের সংখ্যা বাড়ানোর অপচেষ্টা চলত। হায়সাম বিন আদী বলেন, প্রতি ১০ জনের মধ্যে এক ব্যক্তি জীবন্ত মেয়ে শিশু কবর দেয়ার দায়ে অপরাধী ছিল। কোন কোন সময় দয়ালু গোত্র প্রধানরা মেয়ে-শিশুদের জীবন বাঁচাত। সা'সা' বলেন, ইসলামের কিছু পূর্বে তিনি অর্থের বিনিময়ে ৩ শত মেয়ে-শিশুর প্রাণ রক্ষা করেন। এজন্য তাঁকে বহু অর্থ খরচ করতে হয়েছে।
জাহেলিয়াতের এই করুণ চিত্র মানব ইতিহাসের এক জঘন্যতম অধ্যায়। ঠিক এই ঘোর অমানিশার সময়ই আল্লাহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) কে মানবতার জন্য রহমতস্বরূপ মক্কায় পাঠান। তিনি মানুষকে এই কঠিন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন এবং মানবতার মুক্তিসনদ আল-কুরআন অনুসরণের আহ্বান জানান।
টিকাঃ
১০. হজ্জের হাকীকত, সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী।
১১. তারীখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী।
১২. হজ্জের হাকীকত, সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী।
📄 মক্কায় হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্ম ও ইসলামের আগমন
জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশার সময় ঊষার আলো জ্বালানোর তাকিদে এবং মানুষের উপর মানুষ ও দেব দেবীর প্রভুত্বকে খতম করে সেই স্থানে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে সাবেক আসমানী কিতাবসমূহের ভবিষ্যদ্বাণী ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) কে মানবতার মুক্তিদূত ও একমাত্র নেতা হিসেবে মক্কায় পাঠান। তিনি হাতী বাহিনী তথা আবরাহা বাদশাহর কাবা ধ্বংসের অভিযানের বছর ৯ই রবিউল আউয়াল (বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী) রোজ সোমবার সকালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাপের নাম আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব এবং মায়ের নাম আমিনা বিনতে ওহাব। জন্মের আগে বাপ মারা যান। তার প্রতিপালনের ভার পড়ে দাদার উপর।
হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্মের ৬ষ্ঠ দিবসে কাবার পার্শ্বে ঘুমন্ত অবস্থায় দাদা আবদুল মুত্তালিব স্বপ্নে দেখেন, নবজাত শিশুর নাম রাখতে হবে মুহাম্মদ। মা আমেনাও একই স্বপ্ন দেখেন। ৭ম দিবসে তার নাম রাখা হয় মুহাম্মদ বা প্রশংসিত। তার জন্মের সাথে সাথে পারস্য সম্রাটের পূজার আগুন নিভে যায়। ৭ম দিবসেই তাঁকে আরবদের রীতি অনুযায়ী খতনা করানো হয়। মা আমিনার পর সর্বপ্রথম যে ধাত্রী তাকে দুধ পান করান তিনি হচ্ছেন আবু লাহাবের দাসী সাওবিয়া।
শহুরে যিন্দেগী থেকে দূরে মরুভূমির তাজা হাওয়ায় সন্তান লালন পালনের রীতি অনুযায়ী, আবদুল মুত্তালিব হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্য হালিমা বিনতে আবি জোয়াইব আল-সাদীয়া নাম্নী এক বেদুইন মহিলাকে দুধ পানের জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নির্ধারণ করেন। গরীব হালিমার বুকে দুধ কম। পেটের জ্বালায় ধাত্রীর কাজ করতে চান। হযরত মুহাম্মদ (সা) কে দুধ পান করানোর সাথে সাথে দুধে বুক ভরে আসে। হযরত মুহাম্মদ (সা) কে নিয়ে তারা ঘরে ফিরে এলে সবকিছুতে পরিবর্তন ও উন্নয়নের হাওয়া বইতে শুরু করে। তাদের ফসল বৃদ্ধি পায়, খেজুর গাছে অনেক বেশী খেজুর ধরে। তাদের উট প্রচুর দুধ দান শুরু করে। বালক মুহাম্মদ তাদের জন্য রহমত ও বরকতের বিরাট উৎস হয়ে দাঁড়ান।
বালক মুহাম্মদ অন্যান্য খেলার সাথীদের সাথে মাঠে বকরী- দুম্বা চরান। একসময় দু'জন ফেরেশতা এসে তাঁর বুক চিরে অন্তর ধুয়ে পরিষ্কার করে দিয়ে যেতে খেলার সাথীরা দেখে। এই ঘটনা শুনে হালিমা ভয়ে তাঁকে মা আমিনার কাছে পাঠান। তখন তিনি যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান ও মোটা-তাজা।
আমেনা মৃত স্বামীর কবর যিয়ারতের জন্য ইয়াসরিবের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে ১ মাস থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে পথে আবওয়া নামক স্থানে মারা যান। পথের সঙ্গিনী চাকরাণী উম্মে আইমন ৬ বছরের বালক মুহাম্মদকে সাথে করে মক্কায় এসে আবদুল মুত্তালিবের হাতে সোপর্দ করে। তাঁর বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন, তখন দাদাও মারা যান। এবার তাঁকে লালন পালন করেন আপন চাচা আবু তালিব। একবার মক্কায় দুর্ভিক্ষ ও খরা দেখা দেয়ায় কোরাইশরা আবু তালিবের কাছে দোয়ার জন্য অনুরোধ করে। আবু তালিব বালক মুহাম্মদের আঙ্গুল ধরে কাবার পার্শ্বে হাত উঠালে মেঘবিহীন আকাশে বৃষ্টির ঘনঘটা শুরু হয়।
বালক মুহাম্মদের বয়স যখন ১২ বছর তখন আবু তালিব তাঁকে সাথে করে সিরিয়ায় রওনা হন এবং পথে একজন খৃষ্টান ধর্মযাজক বুহাইরা তাঁকে দেখে চিনতে পারেন যে, তিনি আগামী দিনের শেষ নবী। তখন তিনি আবু তালিবকে বলেন, সিরিয়ার ইহুদীরা এই বালককে চিনতে পারলে মেরে ফেলবে। পরে আবু তালেব তাঁকে মক্কায় ফেরত পাঠান।
১৫ বছর বয়সে কোরাইশ ও কানানা গোত্রের সাথে কায়েস গোত্রের যে যুদ্ধ হয় তাতে হযরত মুহাম্মদ (সা)ও অংশগ্রহণ করেন। কোরাইশরা যুদ্ধে জয়লাভ করে। এই যুদ্ধ নিষিদ্ধ মাসকে লংঘন করে সংঘটিত হওয়ায় একে 'হারবুল ফুজ্জার' বা 'পাপীদের যুদ্ধ' বলা হয়।
এই যুদ্ধের পরপরই জিলকদ মাসে সকল কোরাইশ গোত্র মিলে, 'হিলফুল ফুদুল' নামক একটি সমাজকল্যাণ সংস্থা কায়েম করে। এই সংস্থার লক্ষ্য হল, যুলুম-নির্যাতন প্রতিরোধ করা এবং দুঃস্থ ও অভাবী মানুষকে সাহায্য করা। হযরত মুহাম্মদ (সা) আবদুল্লাহ বিন জাদআনের ঘরে অনুষ্ঠিত উক্ত বৈঠকে নিজেও উপস্থিত ছিলেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা) এর বিশ্বস্ততা ও আমানতদারীর জন্য তাঁকে আল আমীন বলা হত। ২৫ বছর বয়সে মক্কার ধনী মহিলা খাদীজা বিনতু খোয়াইলিদ তাঁকে ব্যবসার কাজে নিয়োজিত করেন এবং বাণিজ্য কাফেলার সাথে সিরিয়া পাঠান। ঐ ব্যবসায় বিধবা খাদীজার প্রচুর লাভ হয়। পরে ৪০ বছর বয়স্কা খাদীজার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। সিরিয়ায় কাফেলার দু'টো ঘটনা ঘটে। একটি হচ্ছে খাদীজার গোলাম মাইসারা এই সফরে হযরত মুহাম্মদের সাথী ছিল। যাওয়ার পথে বিশ্রাম নেয়ার সময় একজন ধর্মযাজক মাইসারাকে বলেন, এই লোকটি ভবিষ্যতে নবী হবে। সিরিয়া থেকে মক্কায় ফেরার পথে মাইসারা গরম রোদের সময় দু'জন ফেরেশতাকে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর মাথার উপর ছায়া দিতে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়।
হযরত মুহাম্মদ (সা) এর ৩৫ বছর বয়সে কা'বায় আগুন লেগে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোরাইশরা কা'বা পুনঃনির্মাণ করে। কিন্তু সম্মান লাভের প্রতিযোগিতায় কোন গোত্রের লোকেরা হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে রাখবে তা নিয়ে বিরাট সমস্যা দেখা দেয়। পরে হযরত মুহাম্মদ (সা) একটি চাদর বিছান এবং নিজ হাতে এর উপর হাজরে আসওয়াদ রেখে সকল গোত্রের লোকদেরকে চাদর ধরে তা উপরে উঠাতে বলেন। পরে তিনি নিজ হাতে পাথরটিকে যথাস্থানে বসান। এইভাবে একটা কঠিন সমস্যার সমাধান হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) কখনও মূর্তিপূজা করেননি, মদ পান করেননি, দেবতার নামে বলি দেয়া পশুর গোশত খাননি, অশ্লীল কোন কাজ করেননি এবং কারোর অপকার করেননি। কোরাইশদের কা'বা নির্মাণের সময় হযরত মুহাম্মদ (সা) তাঁর চাচা আব্বাস (রা) এর সাথে মিলে পাথর টানেন। হযরত আব্বাস বলেন, তোমার লুঙ্গি (ইযার) হাঁটুর উপরে উঠালে তাতে আর ময়লা লাগবে না। কাপড় উঠানোর সাথে সাথে তিনি বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যান এবং চোখ আকাশের দিকে বড় হয়ে উঠে। হুঁশ আসার পর তিনি চিৎকার করতে থাকেন, আমার লুঙ্গি, আমার লুঙ্গি। তারপর তাঁর লুঙ্গি তাঁকে ঠিক করে বেঁধে দেয়া হয়।
তিনি নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একবার ময়দানে বকরী চরানোর সময় সাথী অন্য রাখালকে বলেন, তুমি আমার বকরীগুলোর দেখাশুনা কর, আমি শহরে গিয়ে চাঁদের আলোতে অন্য যুবকদের সাথে রাতের বেলায় আনন্দ করবো। রাখাল সাথী রাজী হওয়ায় তিনি শহরে এসে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গানের মজলিশে হাজির হন। কিন্তু আল্লাহ তাঁর শ্রবণশক্তি বন্ধ করে দেন এবং তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। পরের দিন রোদের তাপে তিনি ঘুম থেকে জাগেন। আরেকদিনও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, নবুওতের পূর্বে আমি জীবনে দু'বার জাহেলিয়াতের কাজের ইচ্ছা করেছিলাম। কিন্তু দুইবারই আল্লাহ আমার ও সেই মন্দ কাজের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করেন। ফলে আমি তা আর করতে পারিনি।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর বয়স যখন চল্লিশের কাছাকাছি তখন তিনি একাকীত্ব ভালবাসতেন এবং গভীর চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। তারপর তিনি হেরা গুহায় বসে ধ্যান করতে থাকেন। তিনি তাঁর কওমের এবাদত উপাসনায় অসন্তুষ্ট এবং মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে হেদায়াত চান। তিনি ৪০ বছর বয়সে রমযান মাসে হেরা গুহায় অপেক্ষা করেন। তখনই হযরত জিবরীল (আ) বলেন, হে মুহাম্মদ পড়। তিনি উত্তরে বলেন, আমি পড়তে পারি না। জিবরীল তাঁকে জড়িয়ে ধরে চাপ দেন এবং বলেন, পড়। তিনি এবারও বলেন, আমি পড়তে পারি না। এবারও জিবরীল তাঁকে জোরে আঁকড়ে ধরেন এবং বলেন, পড়। তৃতীয়বারও পড়তে বলায় তিনি পড়তে না পারার কথা জানানোর কারণে জিবরীল তাঁকে পূর্বের মত আঁকড়ে ধরেন। তারপর জিবরীল সূরা আলাকের ৫টি আয়াত পড়েন এবং রাসূলুল্লাহও (সা) তাঁর সাথে সেই আয়াতগুলো পড়েন। এভাবেই রাসূলুল্লাহ (সা) এর নবুওয়াত ও রিসালতের সূচনা হয়।
জিবরীল চলে যাওয়ার সময় বলে গেলেন, আমি আল্লাহর ফেরেশতা জিবরীল, আর আপনি আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে এসে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়েন এবং হযরত খাদীজা (রা) কে সব কথা খুলে বলেন। খাদীজা তাঁকে আশ্বাস ও অভয় দেন এবং নিজ চাচাত ভাই ওয়ারাকা বিন নওফলের কাছে গিয়ে বিস্তারিত ঘটনা বলেন। ওয়ারাকা শুনা মাত্রই বলেন যে, এই তো শেষ নবী। লোকেরা তাঁর বিরোধিতা করবে। আমি বেঁচে থাকলে তাঁকে সাহায্য করতাম। খাদীজাই প্রথম রাসূলুল্লাহ (সা) এর নবুওয়াতে বিশ্বাস স্থাপন করেন।
যাই হোক, রাসূলুল্লাহ (সা) নতুন দ্বীনের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন। প্রথমে আত্মীয় স্বজনদের কাছেই দাওয়াত পেশ করেন। তিনি কালেমা লাইলাহা ইল্লাল্লাহর দাওয়াত পেশ করেন। প্রথমে দাওয়াত গোপনে চলতে থাকে। তিন বছর পর আল্লাহ তাঁকে প্রকাশ্যে দাওয়াত পেশ করার নির্দেশ দেন।
কালেমার দাওয়াত শুনে ইসলাম বিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কেননা, এই কালেমার অর্থ হচ্ছে মালিক, মনিব, রিযকদাতা, আইনদাতা এবং সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা। তাঁর আইন ছাড়া আর কারুর আইন মানা যাবে না, তাঁর এবাদত ছাড়া অন্য কারো এবাদত করা যাবেনা এবং তাঁর হুকুম ছাড়া অন্য কারো হুকুম মানা যাবে না। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, তথা ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক জীবনে ইসলামী শরীয়াহ বা আল্লাহর হুকুম ও আইন কানুন কায়েম করতে হবে। এই দাওয়াত শুনে কাফেররা তা বরদাশত করতে রাজী ছিল না। কেননা, তাদের সমাজে একদিকে মূর্তিপূজা প্রচলিত ছিল এবং অন্যদিকে ছিল মানুষের উপর মানুষের আইন ও সার্বভৌমত্ব। নিজেদের বর্তমান সামাজিক সুযোগ-সুবিধাকে ত্যাগ করে আল্লাহর পূর্ণ দাসত্বের শৃংখলে নিজেকে সোপর্দ করা- এটা তাদের জন্য অসম্ভব ব্যাপার বলে বিবেচিত হয়। তাই তারা আল্লাহ, রাসূল ও আখেরাতের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা ইসলামের শান্তিভবনে প্রবেশ করতে অস্বীকার করে।
কুরাইশ রীতি অনুসারে একদিন সাফা পাহাড়ে তিনি সবাইকে ডেকে আখেরাতমুখী কালেমার দাওয়াত দেয়ায় আবু লাহাবসহ অন্যরা রাগান্বিত হল। আপন চাচা আবু লাহাব গালি দিল যে, হে মুহাম্মদ, তোমার দুই হাত ধ্বংস হোক। এই জন্যই কি আমাদেরকে এখানে একত্রিত করেছ? কুরআন তার প্রতিবাদে বলল- না, আবু লাহাবের দুই হাতই ধ্বংস হউক।
এরপর ইসলামের বিরুদ্ধে চরম বিরোধিতা শুরু হল। কোরাইশরা আবু তালিবের কাছে একটি প্রতিনিধিদল পাঠাল যেন রাসূলুল্লাহ (সা) কে ঐ দাওয়াত থেকে বিরত রাখা হয়।
তারা হাজীদেরকে হযরত মুহাম্মদ (সা) থেকে দূরে রাখার জন্য চেষ্টা তদবীর শুরু করল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং নওমুসলিমদের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ শুরু করে দিল। কিন্তু ঠাট্টা-বিদ্রুপে কাজ না হওয়ায় নবুওয়াতের চতুর্থ বছরে, কোরাইশ সরদারদের মধ্য থেকে আবু লাহাবের নেতৃত্বে গঠিত ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি রাসূলুল্লাহ ও মুসলমানদের উপর দৈহিক নির্যাতন শুরুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রথম পর্যায়ে সাফা পাহাড়ের পার্শ্বে সাহাবী দারুল আরকামের ঘরে গোপনে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য কাজ চলে এবং তা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এদিকে মক্কার কাফেরগণ নওমুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন শুরু করে। ফলে বহু নওমুসলিম ইথিওপিয়ার নওমুসলিম নাজ্জাশীর দেশে হিজরত করে চলে যান।
ইতিমধ্যে হযরত হামযাহ এবং উমর বিন খাত্তাব মুসলমান হন। এতে নির্যাতিত মুসলমানদের কিছুটা সাহায্য হয়। কাফেররা আবু তালেবকে বার বার হুমকি দিতে থাকে। অবশেষে কাফেররা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে দর কষাকষি করতে আসে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলে দেন, আমার এক হাতে চাঁদ আর অন্য হাতে সূর্য এনে দিলেও আমি আল্লাহর দীনের দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত হতে পারবো না।
কাফেররা রাসূলুল্লাহ (সা) কে হত্যা করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তা সফল হয়নি। ইতিমধ্যে বনি হাশেম ও বনি মুত্তালিবের সকল লোক এক বৈঠকে বসে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পার্শ্বে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে কাফেররা বনি হাশেম ও বনি মুত্তালিবের সাথে সর্বাত্মক বয়কট ঘোষণা করে এবং বিয়ে-শাদী ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল প্রকার অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। ৩ বছর পর ঐ বয়কট প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু নবুওয়াতের ১০ বছরের সময় তাঁর চাচা আবু তালিব মারা যান। ফলে রাসূলুল্লাহ (সা) এর দুঃখ-কষ্ট হাজার গুণ বেড়ে যায়। এদিকে কাফেরদের অত্যাচার তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) তায়েফে গিয়ে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। কিন্তু সেখানে তিনি চরমভাবে নির্যাতিত হন। আদাস নামক একজন দাস ছাড়া আর কেউ সেখানে তাঁর দাওয়াত কবুল করেনি।
নবুওয়াতের ১১ বছরের সময় মদীনা থেকে আগত ৬ জন লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাক্ষাত হয়। তিনি তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। আকাবায় অনুষ্ঠিত উক্ত আলোচনার ফলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর নবুওয়াতের ১১ বছরের শাওয়াল মাসে হযরত আয়িশা বিনতে আবু বকরের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিয়ে হয়।
ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনের বৃহত্তর কর্মসূচী তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর দীন কায়েমের জন্য তাঁকে মিরাজে নেয়া হয়। সেখান থেকে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য করণীয় বৃহত্তর এই কাজের জন্য হাতে কলমে শিক্ষার বৃহত্তর প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন। নবুওআতের দ্বাদশ বছরের হজ্জ মওসুমে আকাবায় মদীনার ১২ জন লোক ইসলাম গ্রহণ করে। নবুওয়াতের ১৩শ বছরে মদীনার ৭০ জন লোক আকাবায় এসে ইসলাম গ্রহণ করে।
এই সকল অবস্থা দেখে কোরাইশ নেতারা রাসূলুল্লাহ (সা) কে হত্যার ঘোষণা দেয়। তখন তিনি হযরত আবু বকর (রা) কে সাথে নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। তারা সরাসরি মদীনা না গিয়ে প্রথমে সাওর গুহায় ৩ রাত কাটান। তারপর নিরাপদ অবস্থার বিবেচনা করে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং মদীনায় পৌঁছেন। মদীনায় পৌছে তিনি সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করেন।
টিকাঃ
১৩. The Life of the Prophet Muhammad, Laila Azzam and Ayesha Gouverneur, London.
১৪. প্রাগুক্ত।
১৫. প্রাগুক্ত।
📄 মক্কা বিজয়
মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামী যুগের শুভ সূচনা হয়। ৮ই হিজরীর ২০শে রমযান, রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাতে মক্কার পতন হয় এবং আবু সুফিয়ান সহ অন্যান্য সবাই মুসলমান হয়। যারা দুর্ভাগ্যের কালিমা নিয়ে দুনিয়ায় এসেছে তারাই শুধু এই বিশাল নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
হুদাইবিয়ার সন্ধিই মক্কা বিজয়ের সূচনা করে। ঐ সন্ধি অনুযায়ী খোযাআ' গোত্র মুসলমানদের সাথে মিত্রশক্তি হিসাবে যোগ দেয় এবং বনি বকর গোত্র যোগ দেয় কোরাইশদের মিত্রশক্তি হিসাবে। ইসলাম আসার আগ পর্যন্ত এই দুই গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ ও সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল। সন্ধির পর বনি বকর সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এবং এক রাত্রে খোযাআ' গোত্রের উপর আক্রমণ করে তাদের সহায়-সম্পত্তি লুট-পাট করে। কোরাইশদের লোকেরা এই কাজে বনি বকরকে অস্ত্রশস্ত্র ও লোকজন দিয়ে সাহায্য করে।
খোযাআ' গোত্র এই আক্রমণের পর, তাদের মিত্রশক্তি মুসলিম নেতা রাসূলুল্লাহ (সা) কে অবহিত করে। রাসূলুল্লাহ (সা) ঘটনা শুনে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং বলেন, نَصَرَتْ خُزَاعَةُ 'খোযাআ' গোত্র বিজয়ী হয়েছে। তিনি এই বাক্য দু'বার উচ্চারণ করেন। কোরাইশরা হুদাইবিয়ার চুক্তি ভঙ্গ করায় তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন।
কোরাইশরা নিজেদের ত্রুটির কথা উপলব্ধি করতে পেরে আবু সুফিয়ানের কাছে এসে তাদের অপকর্ম সম্পর্কে তাকে অবহিত করে এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে গিয়ে সন্ধির মেয়াদ বৃদ্ধির অনুরোধ জানানোর দাবী করে। আবু সুফিয়ান উত্তরে বলেন, আল্লাহর শপথ, তোমরা সর্বনাশ করেছ। আল্লাহর শপথ, মুহাম্মদ আমাদের উপর আক্রমণ করবে। আমার স্ত্রী আজ সকালে ঘুম থেকে জেগে একটি খারাপ স্বপ্ন বর্ণনা করেছে। সে স্বপ্নে দেখেছে যে, হুজুনের দিক থেকে এক রক্তবন্যা প্রবাহিত হয়ে খন্দমায় গিয়ে শেষ হয়েছে।
তারপর আবু সুফিয়ান মদীনার উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে সন্ধির মেয়াদ বৃদ্ধির আহ্বান জানানোর পরিকল্পনা করেন। ইতিমধ্যে চুক্তির ২ বছর অতিবাহিত হয়েছে।
কোরাইশদের চুক্তিভঙ্গ মুসলমানদের পক্ষে গেছে। আর এটাই মক্কা বিজয় ও মক্কার লোকদের ইসলাম গ্রহণের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোযাআ' গোত্রের লোকদের আগে আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহর দরবারে পৌঁছার জন্য দ্রুত রওনা হয়ে গেল। এদিকে আবু সুফিয়ান মদীনায় পৌঁছার আগেই রাসূলুল্লাহ (সা) ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে, আবু সুফিয়ান সন্ধির মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য মদীনায় আসছে এবং ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাবে।
আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহর কাছে পৌঁছে বলেন, আমি হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় উপস্থিত ছিলাম না। আপনি সন্ধির নবায়ন করুন এবং মেয়াদ বৃদ্ধির করুন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, হে আবু সুফিয়ান! তুমি কি এজন্যই এসেছ? তারপর তিনি সাহাবায়ে কেরামকে বলেন, তোমরা কেউ কি তোমাদের মত প্রকাশ করবে? সাহাবীরা বললেন, আমরা কৃত চুক্তি ও সন্ধির উপর বহাল আছি। আমরা এর কোন পরিবর্তন-পরিবর্ধন কামনা করি না তারপর আবু সুফিয়ান হযরত আবু বকর, উমর এবং উসমানের কাছে গিয়ে তাঁদের সুপারিশ কামনা করেন। কিন্তু এতে সফল না হয়ে হযরত আলীর কাছে আসেন এবং বলেন, আমি দেখছি বিষয়টি কঠিন হয়ে গেছে এবং আমার মুখ বন্ধ হয়ে আসছে। আপনি আমাকে উপদেশ দিন। হযরত আলী (রা) বলেন, আমি এ ব্যাপারে তোমার উপকারে আসার মত কোন কিছু দেখি না। তুমি মক্কায় ফিরে যাও। আবু সুফিয়ান প্রশ্ন করেন, আপনি কি মনে করেন যে, এর দ্বারা আমার চলবে। হযরত আলী বলেন, আমি তা মনে করি না। তবে তোমার জন্য এর চেয়ে ভিন্ন কিছু আমি দেখি না। আবু সুফিয়ান ব্যর্থ হয়ে মক্কায় ফিরে আসলেন।
এ দিকে মক্কায় আবু সুফিয়ানের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতে, মক্কাবাসীরা তাকে গোপনে মুসলিম হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করল। মদীনা থেকে ফিরে আসার পর কোরাইশরা তাকে জিজ্ঞেস করল, কি খবর? মুহাম্মদের কাছ থেকে লিখিত কোন কাগজ বা সন্ধি বৃদ্ধি সংক্রান্ত দলিল এনেছ কি? তিনি উত্তরে বলেন, না। আমি বহু চেষ্টা করেও সফল হইনি। তবে আমি তাঁর সাহাবাকে যত বেশী অনুগত দেখলাম অন্য কোন বাদশাহরও এত বেশী আনুগত্যকারী লোক নেই।
এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা অভিযানের প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। আনসার ও মুহাজিরদের ১০ হাজার যোদ্ধা সহকারে, ১০ই রমযান (৮ম হিজরী) তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সকলেই রোযা রেখেছিলেন। কাদীদে পৌঁছার পর তাঁরা সকলে ইফতার করেন, এবং পুনরায় মক্কা অভিমুখে রওনা হন। তাঁরা মক্কার নিকটবর্তী ওয়াদী ফাতিমায় এসে অবস্থান গ্রহণ করেন।
এমতাবস্থায় মক্কায় অবস্থানকারী হযরত আব্বাস (রা) মক্কার নিরাপত্তার জন্য মক্কাবাসীদের একজনকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে পাঠানোর চিন্তা করেন এবং আবু সুফিয়ানকে সাথে করে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে রওনা হন। একাধিকবার আলোচনার পর আবু সুফিয়ান মুসলমান হওয়ার ঘোষণা দেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে নিরাপত্তা দিয়ে বলেন, যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। রাসূলুল্লাহ (সা) খালেদ বিন ওয়ালিদকে বিভিন্ন আরব গোত্রের কিছু সংখ্যক লোক নিয়ে মক্কার নিম্নভূমির দিক থেকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন এবং প্রথম বাড়ীর কাছে গিয়ে পতাকা উড়ানোর হুকুম দেন। তিনি আরো নির্দেশ দেন, কেউ যুদ্ধ না করলে যেন কারুর সাথে যুদ্ধ করা না হয় এবং কাউকে হত্যা না করা হয়। কিন্তু মক্কার সাফওয়ান বিন উমাইয়া এবং ইকরামা বিন আবু জাহল খন্দমা পাহাড়ের নিকটে কিছু সংখ্যক লোক নিয়ে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়। হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা) এর বাহিনীর সাথে তাদের লড়াই হয়। এতে কিছু মারা যায় এবং অন্যরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় যুদ্ধ-বিগ্রহ অনুষ্ঠিত না হওয়ার ব্যাপারে খুব সতর্ক ছিলেন। আনসার নেতা হযরত সাদ' বিন উবাদাহ বলেছিলেন, আজ যুদ্ধ এবং প্রতিশোধের দিন, আজ নিষিদ্ধ জিনিসকে বৈধ করার দিন এবং আল্লাহ আজ কোরাইশদেরকে অপমানিত করবেন। তিনি একথা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিজয়ের উদ্দেশ্যেই বলেছিলেন। এই মক্কাবাসীরাই তাঁকে এবং মুহাজিরদেরকে অত্যাচার নির্যাতন করে ঘর-বাড়ী থেকে বের করে দিয়েছিল। তথাপি রাসূলুল্লাহ (সা) সাদ বিন উবাদাহকে এই কথার জবাবে বলেন, الْيَوْمَ يَوْمُ الْمَلْحَمَةِ اليوم يوم المرحلة অর্থাৎ আজকের দিন দয়া ও করুণার, সম্মান ও ইজ্জত দেয়ার দিন। যুদ্ধের ভয়ে তিনি সাদ বিন আবু উবাদাহ থেকে পতাকা নিয়ে তাঁর ছেলের হাতে দান করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কোসওয়া নামক উটে চড়ে পেছনে হযরত উসামা বিন যায়েদ (রা) কে সাথে করে মক্কায় প্রবেশ করেন। সেদিন ছিল শুক্রবার সকাল বেলা। আল্লাহর প্রতি বিনয়ের ভাবে মাথা নত করে তিনি প্রবেশ করেন এবং বলেন,
اَللَّهُمَّ لَأَعَيْشَ إِلَّا عَيْسُ الْآخِرَةِ 'হে আল্লাহ, পরকালীন যিন্দেগী ছাড়া সত্যিকার কোন যিন্দেগী নেই।' রাসূলুল্লাহ (সা) উটের পিঠে করে হুজুনে আসার পর সবাই প্রশান্ত হল। রাসূলুল্লাহ (সা) এর পাশে ছিলেন হযরত আবু বকর (রা), তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে কথা বলছিলেন এবং সূরা আল ফাতহ পড়তে পড়তে এগিয়ে আসছিলেন। কা'বায় পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ (সা) সওয়ারীর উপর বসেই তওয়াফ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) হাতের লাঠির মাথা দিয়ে হাজারে আসওয়াদকে স্পর্শ করার জন্য মুহাম্মদ বিন সালামাহ (রা) উটের লাগাম ধরেন। তখন কা'বার ভেতর বিভিন্ন গোত্রের ৩৬০টি মূর্তি ছিল। সীসা গলিয়ে ঐগুলোর পা আটকিয়ে রাখা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) হাতের লাঠি দিয়ে ঐগুলোকে খোঁচা দেয়ার সাথে সাথেই প্রত্যেকটা ভেঙ্গে পড়ে গেল। হাতে ধরে ভাঙ্গার প্রয়োজন হল না। তারপর তিনি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়েন-
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا
অর্থ : 'সত্য সমাগত, অসত্য বিতাড়িত, অসত্যের পতন অবশ্যম্ভাবী। (সূরা বনি ইসরাইল: ৮১)
রাসূলুল্লাহ (সা) উসমান বিন আবি তালহার কাছ থেকে চাবি এনে কা'বায় প্রবেশ করেন এবং হযরত উমর এবং ওসমানকে (রা) কা'বার ভেতরের অংকিত ছবিগুলো মুছে ফেলার নির্দেশ দেন। কোরাইশরা কা'বার ভেতরে ফেরেশতা, হযরত ইবরাহীম এবং ইসমাঈল (আ) এর হাতে ভাগ্যের তীর দিয়ে ছবি এঁকেছে এবং হযরত এসহাকসহ অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম ও মরিয়মের ছবিও অংকন করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা) কাবায় প্রবেশ করার পর হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা) দরজায় দাঁড়িয়ে লোকদেরকে ভেতরে ঢুকতে বারণ করছিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) কাবার দরজায় এসে দাঁড়ান এবং কোরাইশরা তাঁর ফায়সালা শুনার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ وَحْدَهُ صَدَقَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَأَعَزَّ جُندَهُ وَهَزَمَ ٱلْأَحْزَابَ وَحْدَهُ .
অর্থ: 'আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তিনি এক, তিনি তাঁর ওয়াদা সত্য প্রমাণিত করলেন, তাঁর বান্দাহকে সাহায্য করলেন, তাঁর সেনাবাহিনীকে সম্মানিত করলেন এবং একাই সকল দলকে পরাজিত করলেন।' তারপর বললেন, হে কোরাইশ! তোমাদের ব্যাপারে আমার কি সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার বলে তোমরা মনে কর? তারা উত্তরে বলে, আমরা ভাল সিদ্ধান্তই আশা করি। কেননা, ভাই ও ভাতিজা থেকে উত্তম সিদ্ধান্তই প্রত্যাশা করা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, হযরত ইউসুফ (আ) তাঁর ভাইদের উদ্দেশ্যে যা বলেছিলেন, আজ আমিও তোমাদের উদ্দেশ্যে তাই বলবো। হযরত ইউসুফ (আ) বলেছিলেন, 'আজ কোন প্রতিশোধ নেই। আল্লাহ তোমাদের গুনাহ মাফ করুন, তিনি সর্বাধিক দয়ালু।'
( لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ) (۹۲) - يوسف- 'যাও তোমরা মুক্ত।'
তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) মাকামে ইবরাহীমের কাছে আসেন এবং দু'রাকাত নামায পড়েন। এবার তিনি যমযম কূপের কাছে আসেন। হযরত আব্বাস (রা) তাঁর জন্য এক বালতি পানি উঠান। তিনি পানি পান করেন ও অজু করেন। তাঁর অজুর পানি গ্রহণের জন্য উপস্থিত লোকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং এক ফোঁটা পানিও মাটিতে পড়তে পারেনি। সব মানুষের গায়ে পড়েছে। পান করার পরিমাণ হলে, লোকেরা সেই পানি পান করেছে, নচেৎ তা গায়ে মেখেছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় কিছুদিন অবস্থান করেন। পরে, শাওয়াল মাসে তায়েফের হাওয়াযেন ও সাকীফ গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য হোনাইনে যান। যুদ্ধ শেষে, সেখান থেকে জো'রানা যান এবং সেখানে ১৫ রাত অবস্থান করেন। পরে উমরাহর উদ্দেশ্যে এহরাম বেঁধে মক্কায় আসেন ও উমরাহ করেন। মদীনা রওনা হওয়ার আগে উ'তাব বিন উসাইদকে মক্কার শাসক নিযুক্ত করে, মক্কাবাসীদের সাথে সদ্ব্যবহারের উপদেশ দেন এবং বলেন, তারা আহলুল্লাহ। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে জাহেলিয়াতের সমাপ্তি হল।
টিকাঃ
১৬. ফী রেহাবিল বাইতিল হারাম, ডঃ মোহাম্মদ আলাওয়ী মালেক।
১৭. প্রাগুক্ত।
১৮. প্রাগুক্ত।
১৯. প্রাগুক্ত।
📄 মক্কায় ইসলামী শাসনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
নবী করীম (সা) এর মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে মক্কায় ইসলামী শাসনের সূচনা হয় এবং জাহেলিয়াতের সকল রীতি-নীতি এবং আইনকানুনের পরিবর্তে ইসলামের আইন-কানুন চালু হয়। ইসলাম জাহেলিয়াতের মূর্তিপূজা, শিরক, মানুষের সার্বভৌমত্ব এবং মানব রচিত আইন ও মতবাদের সমাপ্তি ঘোষণা করে। সেই স্থানে আল্লাহর একত্ব, সার্বভৌমত্ব, আইন ও বিধি-বিধান চালু করে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত পবিত্র মক্কা নগরী তার ইসলামী চরিত্র-বৈশিষ্ট্য নিয়ে বহাল আছে এবং ইনশাআল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত এই চরিত্র অক্ষুণ্ণ থাকবে।
মক্কা বিজয়ের দু'বছর পর, ১০ম হিজরীতে, রাসূলুল্লাহ (সা) বিদায় হজ্জে আসেন। হজ্জ শেষে মদীনা প্রত্যাবর্তনের ২ মাসেরও কিছু বেশী সময় পরে, ১১ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহ।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর ইন্তিকালের পর শুরু হয় খেলাফতে রাশেদার যুগ। হযরত আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী (রা) হিজরী ৪১ সাল পর্যন্ত, নবী করীম (সা) এর অনুসৃত পদ্ধতিতে বিশাল ইসলামী রাষ্ট্রের খেলাফতের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। মক্কা ও মদীনার প্রতি তাঁদের সবিশেষ দৃষ্টি ছিল।
হযরত উমর (রা) সর্বপ্রথম মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ করেন। হযরত উসমানও (রা) মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ করেন এবং ভিড়ের কারণে সৃষ্ট সংকীর্ণতা দূর করে তওয়াফ এবং নামাযের সুবন্দোবস্ত করেন।
হযরত আলী (রা) ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদীনের সর্বশেষ খলীফা। তিনি মসজিদে হারামের সুষ্ঠু সংরক্ষণ করেন। হযরত আলী (রা) এর খেলাফতের সময় মুয়াবিয়া (রা) তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেন।
হিজরী ৪১ সালে খেলাফতে রাশেদার সমাপ্তি হয়। হিজরী ৪০ সালের ১৭ই রমযান, ইরাকবাসীরা হযরত আলী (রা) এর ইন্তিকালের দিন, তাঁর ছেলে হযরত হাসানের হাতে খেলাফতের বাইআত গ্রহণ করেন। ঐ একই সালে, সিরিয়াবাসীরা হযরত মুয়াওয়িয়া বিন আবু সুফিয়ানের হাতে খেলাফতের বাইআত নেয়। ফলে একই রাষ্ট্রে দুই খলীফার অস্তিত্বের কারণে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠে। দুই পক্ষ যুদ্ধের সম্মুখীন হওয়ায়, কিছু সংখ্যক লোক তাঁদের মধ্যে আপোসের চেষ্টা করেন। এর ফলে, সিদ্ধান্ত হয় যে হযরত হাসান খেলাফতের দাবী প্রত্যাহার করবেন এবং হযরত মুয়াবিয়ার কাছে ঐ দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। এইভাবে, হিজরী ৪১ সালের রবিউল আউয়াল মাসে, খেলাফতে রাশেদার আলো নিভে যায়। সিরিয়া থেকে ইরাক পর্যন্ত এবং হেজায ও নজদের সর্বত্র হযরত মুয়াবিয়া (রা) এর শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই হচ্ছে উমাইয়া শাসনের ভিত্তি।
হিজরী ৬০ সালে হযরত মুয়াওয়িয়া (রা) মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি নিজ ছেলে ইয়াজিদের পক্ষে বাইআত গ্রহণের নির্দেশ দেন। হেজাযে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মদীনার গভর্নর মারওয়ান ইয়াজিদের পক্ষে বাইআত গ্রহণের জন্য হযরত মুয়াবিয়ার চিঠি পড়ে শোনানোর সাথে সাথে, হযরত আবদুর রহমান বিন আবুবকর, আবদুল্লাহ বিন উমর, আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের, হোসাইন বিন আলী ও হযরত আয়িশা (রা) সহ অনেকেই এর বিরোধিতা করেন। ইসলামের মাপকাঠি অনুযায়ী খলীফা হওয়ার ব্যাপারে, অন্যান্য বড় বড় সাহাবীরা ইয়াজিদের চেয়ে অনেক বেশী যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন। এছাড়া রাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, শাসকের মৃত্যুর পূর্বে তাঁর বংশের কারুর জন্য ক্ষমতা নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ ইসলাম বিরোধী। মুসলিম জনতাই তাঁদের শাসক নির্বাচন করবেন। এই কারণে, তাঁরা ইয়াজিদের মনোনয়নের বিরোধিতা করেন। ইরাকের কুফাবাসীরা হযরত হোসাইনকে কুফায় ডেকে নিয়ে তার হাতে বাইআত করেন এবং ইয়াজিদের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। হিজরী ৬১ সালে, কারবালার যুদ্ধে হযরত হোসাইন (রা) ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে শহীদ হন। এর পর হিজরী ৬৩ সালে, মক্কায় হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরের হাতে লোকেরা বাইআত গ্রহণ করেন এবং তিনি খলীফা নিযুক্ত হন। কিন্তু উমাইয়া শাসক আবদুল মালেক বিন মারওয়ান হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে মক্কা আক্রমণের নির্দেশ দেন। হিজরী ৭৩ সালের ১৭ই জুমাদাল-উলা মাসে, তিনি হাজ্জাজের বাহিনীর হাতে শহীদ হন। এইভাবে মক্কায় পুনরায় উমাইয়া শাসনের গোড়াপত্তন হয়।
হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের (রা) হিজরী ৬৪ সালে, উমাইয়াদের অবরোধের ফলে, কা'বা শরীফের যে ক্ষতি হয় তা মেরামতের উদ্দেশ্যে কা'বা শরীফ ভেঙ্গে নতুন করে নির্মাণ করেন। তিনি হযরত ইবরাহীম (রা) এর ভিত্তির উপর কা'বা শরীফকে পুননির্মাণ করেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আয়িশা (রা) কে বলেছিলেন, তোমার কওম যদি কুফরী ত্যাগ করার ব্যাপারে নতুন না হত, তাহলে, আমি কা'বা শরীফকে ভেঙ্গে হিজরে ইসমাঈলকে এর অন্তর্ভুক্ত করে দিতাম। কেননা, তোমার কওম অর্থাভাবে, কা'বা শরীফকে হযরত ইবরাহীম (রা) এর ভিত্তি থেকে ছোট করে তৈরি করেছে। আমি কাবা শরীফের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে দুটো দরজা তৈরি করতাম, যাতে করে লোক এক দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য দরজা দিয়ে বের হতে পারে এবং আমি কা'বা শরীফের দরজাকে মাটির সম্মান করে দিতাম। কেননা, তোমার কওম, যে কোন লোককে ইচ্ছা প্রবেশ করা ও নিষেধ করার উদ্দেশ্যে কা'বা শরীফের দরজাকে উঁচু করে তৈরি করেছে। এই অর্থে বোখারী ও মুসলিম শরীফে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। এই হাদীসের ভিত্তিতেই, হযরত ইবনে যোবায়ের কোরাইশদের ভিত্তির পরিবর্তে হযরত ইবরাহীম (আ) এর ভিত্তির উপর কা'বা পুনঃনির্মাণ করেন।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মক্কা দখলের পর খলীফা আবদুল মালেকের কাছে কা'বা শরীফকে পূর্বের ভিত্তি তথা কোরাইশদের ভিত্তির উপর পুনঃনির্মাণ করার অনুমতি চান। খলীফা আবদুল মালেক অনুমতি দিলে তিনি পুনরায়, কা'বা শরীফকে আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরের পূর্বের ভিত্তি তথা কোরাইশদের ভিত্তির উপর কাবা পুনর্নির্মাণ করেন। হিজরী ১৩২ সালে উমাইয়া শাসনের পতন হয়। এই আমলেই, কা'বা শরীফের চতুষ্পার্শ্বে নামাযের জামাত অনুষ্ঠান এবং মাকামে ইবরাহীমের পেছনে ইমাম সাহেবের দাঁড়ানোর স্থান নির্ধারণ করা হয়। ওলিদ বিন আবদুল মালেক মসজিদে হারামকে আরো সম্প্রসারিত করেন।
হিজরী ১৩২ সালের শেষ দিকে, আবুল আব্বাস সাফ্ফাহর হাতে দামেস্কের পতন হয়। এর মাধ্যমেই উমাইয়া শাসনের সমাপ্তি ও আব্বাসীয় শাসনের শুরু হয়। মক্কা-মদীনায় তাদের বাইআত গ্রহণ করা হয়। হিজরী ২৩২ সালে আব্বাসী খলীফা ওয়াসেক্কের আমলে, আব্বাসীয় আমলের ১ম সোনালী যুগের অবসান হয়। তারপর শুরু হয় বিভেদ-বিচ্ছেদ ও ফেতনা ফাসাদের ২য় আব্বাসীয় যুগ। খলীফা আবু জাফর মনসুর এবং মাহদী বিন মনসুরের সময় ২ বার মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ হয়। তুর্কী মাওয়ালীরা তখন আব্বাসী শাসকদের মক্কাসহ গোটা সাম্রাজ্য শাসন করত। ৩১৭ হিজরীর ৭ই জিলহজ্জ, কারামতিয়া সম্প্রদায়ের হাতে মক্কার পতন হয়। আবু তাহের কারামতি মক্কার ৩০ হাজার লোককে হত্যা করে এবং তাদেরকে গোসল ও কাফন ছাড়া যমযম ও মসজিদে হারামে দাফন করে। ১৪ই জিলহজ্জ, ঐ মদখোর আবু তাহের কারামতি কা'বা শরীফ থেকে হাজারে আসওয়াদকে খুলে নিয়ে যায়। দীর্ঘ বাইশ বছর পর কারামতিরা পুনরায় ঐ পাথরটি ফেরত দেয়। দ্বিতীয় আব্বাসীয়া আমলে, দারুন নাদওয়ার সম্প্রসারণ করা হয়। ঐ আমলে, শিয়াদের আন্দোলন মাথা-চাড়া দিয়ে উঠে। শেষ পর্যন্ত মিসরে শিয়া ফাতেমীয়দের শাসন শুরু হয়। ৩৫৮ হিজরীতে, মক্কায় ফাতেমীয় খলীফা মুয়ে'জ্জের নামে খোতবা দেয়া শুরু হয়। ৫৫১ হিজরীতে তারা কা'বা শরীফের জন্য নকশা করা একটা মীযাব উপহার দেয়।
মিসরের ফাতেমীয় শাসকদের পতনের সময় খৃষ্টান ক্রুসেডারদের আক্রমণ শুরু হয়। সিরিয়ার হলবের শাসক নূরুদ্দিন জংকী মিসরের ফাতেমীয় শাসকদেরকে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেন। কিন্তু ৫৬৯ হিজরীতে, সর্বশেষ ফাতেমীয় শাসক আ'দেদের শাসন নূরুদ্দিন জংকীর মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আইউবীর হাতে সমাপ্ত হয়। এখানে এসেই ফাতেমীয় শাসনের পতন হয়।
মক্কা ও মদীনায় নূরুদ্দিন জংকীর নামে বাইআত গ্রহণ করা হয়। সালাহউদ্দীন আইউবীর প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যমে আইউবী শাসনের গোড়া পত্তন হয়। আইউবীদের আমলে মসজিদে হারামে, ৪ মাজহাবের ভিত্তিতে পৃথক পৃথক নামাযের জামাত অনুষ্ঠিত হত। মাকামে ইবরাহীমের কাছে, শাফেয়ী মাজহারের ইমামের নেতৃত্বে পরিচালিত নামায শেষে, রোকনে ইয়ামানীর কাছে মালেকী মাজহাবের ইমাম তাঁর অনুসারীদেরকে নিয়ে নামায পড়ান। মীযাবের কাছে হাতীমে কা'বায় হানাফী মাজহাবের ইমাম নামায পড়ান। অনারব বিশ্বের বেশীর ভাগ লোক হানাফী মাজহাবের অনুসরণ করায়, এই মাজহাবের নামাযের জামাত সবচাইতে বড় হত। অপরদিকে, হাজারে আসওয়াদের কাছে হাম্বলী মাজহাবের ইমাম নামায পড়ান। তখন, মাকামে ইবরাহীম আজকের মত নির্ধারিত জায়গায় ছিল না। বিভিন্ন মওসুমে, সুষ্ঠু হেফাজতের জন্য এটাকে কা'বা শরীফের ভেতর রাখা হত। ৬৫৫ হিজরীতে তুরস্কের মাওয়ালী শাসকদের হাতে আইউবী শাসনের পতন হয়।
আইউবী ও মাওয়ালী শাসনের পর শারাকেসাদের শাসন শুরু হয়। এই সময় তারা হারাম শরীফের বিভিন্ন খেদমত আঞ্জাম দেয়। শারাকেসা শাসক কায়েতবায় ৮৮৪ হিজরীতে মক্কায় হজ্জ করতে আসেন। তিনি আরবী ভাষা জানতেন না বলে মক্কার কাজী ইবরাহীম বিন যোহায়রা তাঁকে তওয়াফ করান ও দোয়া পড়ান। শারাকেসা শাসক কায়েতবায়কে তওয়াফ করানোর মধ্য দিয়ে হাজীদেরকে মোতাওয়েফ দিয়ে الطوافة তথা তওয়াফ করানোর পেশার প্রথম সূচনা হয়। এর আগে এই পেশার কোন অস্তিত্ব ছিল না। ৯২৩ হিজরীতে, কায়রো বিজয়ী তুরস্কের উসমানী শাসকদের হাতে শারাকেসা শাসনের অবসান হয়।
তুরস্কের উসমানী সুলতানদের শাসন হিজরী ১২০৪ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তুর্কী শাসক সুলতান সেলিমের আমলে মসজিদে হারামের গম্বুজ বিশিষ্ট একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। তুর্কী শাসক মাসউদ ১০৪০ হিজরী সালে, মক্কায় কফি পান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কেননা, এটাকে মাদক জাতীয় দ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত করে মক্কার কিছু সংখ্যক আলেম ফতোয়া দেন। ১০৪২ হিজরীর হজ্জ মওসুমে, আমীর যায়েদ অনারব লোকদের হজ্জ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। সম্ভবতঃ ১০৩৩ হিজরীতে, অনারব লোকেরা বাগদাদে হামলা চালিয়ে উসমানী শাসকদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার কারণেই তিনি তাদের হজ্জের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ১০৮১ হিজরীর ১৬ই রমযান হারাম শরীফের ইমাম সাহেব জুমআর খোতবা দেয়ার সময় একজন পারস্যবাসী খোলা তরবারী নিয়ে ইমাম সাহেবকে হত্যা করতে এগিয়ে আসে এবং নিজেকে ইমাম মাহদী বলে দাবী করে। উপস্থিত মুসল্লীরা তাকে কঠোর মার দেয়ায় সে বেহুঁশ হয়ে পড়ে। পরে মোয়াল্লা কবরস্তানের কাছে নিয়ে তাকে আগুনে জ্বালিয়ে হত্যা করা হয়।
১০৯১ হিজরীর ২২শে জিলহজ্জ, ইবরাহীম উপত্যকার উপর দিয়ে বিরাট বন্যা প্রবাহিত হয়। প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে এই বন্যা সৃষ্টি হয়। এর ফলে, কাবা শরীফের দেয়ালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পানি উঠে এবং এতে কা'বা শরীফের কিছু ক্ষতি হয়। বন্যার ফলে বহু ঘর-বাড়ী নষ্ট হয় এবং অনেক লোক মারা যায়। আশ্চর্যের বিষয় হল, বন্যার স্রোতে একটি উট ভেসে আসে এবং সকাল বেলায় সবাই মসজিদে হারামের মিম্বারের উপর উটটিকে পড়ে থাকতে দেখে। ১০৯৭ হিজরীর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, জেদ্দার গভর্নর ও শেখুল হারাম আহমদ পাশা খৃষ্টানদেরকে জেদ্দা থেকে বহিষ্কার করেন। তাদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তারা ছাড়া তিনি আর সবাইকে জেদ্দা থেকে বিদায় করেন।
১১১২ হিজরীতে ভারতের এক ধনী ব্যক্তি মক্কার গরীব লোকদের মধ্যে বন্টনের জন্য ৫ লাখ ভারতীয় মুদ্রা পাঠায়। এর ফলে, মক্কার দরিদ্র লোকেরা যথেষ্ট উপকৃত হয়। ১১৪৯ হিজরীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, মক্কায় তুর্কী শাসকের প্রতিনিধি শরীফ মাসউদ ধূমপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন, একই বছর তিনি মক্কা থেকে সকল প্রবাসীকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কেননা, মক্কায় বেশী সংখ্যক প্রবাসীর অস্তিত্বের কারণে স্থানীয় অধিবাসীদের বাসস্থান এবং অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দেয়।
১১৫৩ হিজরীর মক্কার স্মরণীয় ঘটনা হচ্ছে, এক বিরাট বন্যার ফলে লোকেরা মসজিদে হারামের জুমআর নামাযের জামাতে হাজির হতে পারেনি। এমনকি ইমাম সাহেবও মিম্বার পর্যন্ত যেতে পারেননি। তিনি মাত্র ৫ জন মুসল্লী নিয়ে জুমার নামায আদায় করেন। ১১৫৯ হিজরীতেও অনুরূপ আরেক ভয়াবহ বন্যা হয়।
১১৯৬ হিজরীতে তুর্কী শাসকের প্রতিনিধি সুরুর বিন মোসায়েদ মক্কার প্রতিরক্ষার জন্য জিয়াদ পাহাড়ের উপরে এক মজবুত কিল্লা নির্মাণ করেন। সে কিল্লাটি এখন পর্যন্ত মওজুদ আছে।
১২০৩ হিজরীর রজব মাসে, হারাম শরীফের ইমাম শেখ আবদুস সালাম আল-হারসী জুমআর নামাযের খোতবা দিচ্ছিলেন। তখন বাংলা থেকে আগত একজন হাজী ইমাম সাহেবকে ছুরিকাঘাত করায় তাঁর পেটের নাড়ী-ভূড়ি সব বেরিয়ে পড়ে এবং তিনি সাথে সাথে মারা যান। সম্ভবতঃ সে বাঙ্গালী হাজীটি পাগল ছিল। কিন্তু পরে সেই আসামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
সে সময়, উসমানীয়দের সহযোগিতায় মক্কার বিশিষ্ট আলেমরা বিভিন্ন বিষয়ে ফতোয়া দান করতেন। বিচার বিভাগের দায়িত্ব তুর্কীদের হাতে সীমাবদ্ধ ছিল। উসমানী শাসকরা মিসর থেকে সবসময় কা'বা শরীফের গেলাফ পাঠাত।
তুর্কী শাসকের প্রতিনিধি শরীফ মাসউদের শাসনামলে, নজদের প্রখ্যাত সংস্কারক শেখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওহাবের সংস্কার আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। তিনি কবরপূজা সহ বিভিন্ন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জোর আওয়াজ তোলেন। তুর্কী শাসকরা শেখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওহাবের সংস্কার আন্দোলনকে ভিন্ন চোখে দেখত। সৌদী শাসন তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম সৌদী শাসনের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন ইমাম মুহাম্মদ বিন ফয়সল বিন সউদ। তিনি শেখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওহাবের মেয়ে বিয়ে করেন এবং পরস্পর শ্বশুর জামাইর সম্পর্কে আবদ্ধ হন। ইমাম মুহাম্মদ বিন সউদ শেখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওহাবের কুসংস্কার ও বেদআত বিরোধী আন্দোলনে প্রভাবিত হন এবং ১৭৪৫ খৃঃ মোতাবেক ১১৫৮ হিঃ স্বাক্ষরিত এক চুক্তি অনুসারে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর সেই সংস্কার আন্দোলনকে বাস্তবায়ন করেন।
১২০৬ হিজরীতে শেখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওহাব ইন্তেকাল করেন। নজদে তখন প্রথম সৌদী রাজত্ব বিদ্যমান আর হেজাযে ছিল তুর্কী শাসন। নজদের সৌদী শাসকরা মক্কার তুর্কী শাসকদের দৃষ্টিতে বৈরি হওয়ায়, হজ্জ পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। তারা মক্কার শাসকদের কাছে বারবার হজ্জ পালনের অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হয়। পরে হেজাযের তুর্কী গভর্নর গালেবের সাথে এক আপোস চুক্তির ভিত্তিতে ১২১৩ হিজরীতে, নজদের লোকেরা মক্কায় হজ্জ করতে আসে এবং ১২১৫ হিঃ পর্যন্ত ঐ আপোস চুক্তি কার্যকর থাকে। ফলে, নজদবাসীরা ঐ কয়েক বছর হজ্জ করার সুযোগ পায়। তারপর নজদ ও হেজাযের মধ্যে মতানৈক্য হয়। ফলে ঐ চুক্তি আর বেশী দিন টিকেনি।
১২১৮ হিজরীতে, গালেবের বাহিনীর সাথে নজদের সৌদী শাসকদের সংঘর্ষ হয়। ১২২০ হিজরীতে এক আপোস চুক্তি অনুযায়ী, গালেব সৌদী শাসনের অধীনে মক্কার শাসক হিসেবে বহাল থাকে। এইভাবে, মক্কায় তুর্কী শাসনের অবসান এবং প্রথম সৌদী শাসনের সূচনা হয়।
১২২৫ হিজরীতে, তুর্কী সুলতানের নির্দেশে মিসরে নিযুক্ত গভর্নর মুহাম্মদ আলী পাশা তাঁর ছেলে তুসুনের নেতৃত্বে মক্কায় বিরাট সেনাবাহিনী পাঠায়। সৌদী শাসকরা আবদুল্লাহ বিন সউদের নেতৃত্বে ঐ আক্রমণ প্রতিহত করে এবং মিসরীয় বাহিনীকে পরাজিত করে। হিজরী ১২২৮ সাল পর্যন্ত মক্কায় সৌদী শাসন বহাল থাকে। মক্কা ও মদীনা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তা পুনরুদ্ধারের জন্য তুর্কী সুলতানের নির্দেশে মিসরের মুহাম্মদ আলী পাশা গোপনে হেজাযের গভর্নর গালেবের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে এবং অন্যান্য নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে অর্থ সম্পদ দিয়ে রাজী করে। এর পর মিসরীয় বাহিনী প্রথমে ইয়াম্বু দখল করে এবং সবশেষে মক্কাও তাদের দখলে চলে যায়। ১২৩৪ হিজরীতে, পুরো হেজায ও নজদ মিসরীয় গভর্নরের দখলে চলে যায় এবং সৌদী শাসকরা মিসরীয় বাহিনীর হাতে পরাজয় বরণ করে।
১২৫৬ হিজরীতে মুহাম্মদ আলী পাশা এবং উসমানীদের মধ্যে, হেজাযের শাসন তুরস্কের উসমানী সুলতানের কাছে হস্তান্তরের জন্য এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফলে মক্কায় ২য় বার তুরস্কের উসমানী শাসনের সূচনা হয়। উসমানী শাসকরা মক্কা থেকে 'আল-হেজায' নামক একটি সরকারী পত্রিকা প্রকাশ করে। এই আমলে, সুলতান আবদুল হামিদ দামেস্ক থেকে মদীনা পর্যন্ত রেল লাইন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৩২৬ হিজরীতে মদীনায় রেল লাইনের কাজ সমাপ্ত হয়। একই আমলে মক্কার শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়। তাই মক্কায় মাদ্রাসা রশিদিয়া, মাদ্রাসা সোলতিয়া, মাদ্রাসা ফালাহ এবং মাদ্রাসা ফখরিয়াসহ অন্যান্য অনেক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১৩৩৪ হিজরীর ৯ই শাবান আরবরা মক্কায় হোসাইন বিন আলীর নেতৃত্বে ইংরেজদের সাথে এক সহযোগিতা চুক্তির ভিত্তিতে, অনারব উসমানী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ঐ সময় ইংরেজ বাহিনী জেদ্দায় সাহায্যের জন্য উপস্থিত হয়। হোসাইন বিন আলী মক্কা ও মদীনাসহ জর্দান পর্যন্ত তুর্কী শাসনের অবসান করেন। ঐ সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, ১৩৩৮ হিজরীতে, মেশিনের সাহায্যে প্রথম মসজিদে হারামে বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু হয়।
১৩৩৮ হিজরীতে, মক্কার শাসক হোসাইনের সাথে নজদের মতবিরোধ হয় এবং নজদবাসীদেরকে হজ্জ করার অনুমতি না দেয়ায় ঐ মতবিরোধ চরমে উঠে। ১৩৪৩ হিজরীর ৫ই রবিউল আউয়াল, মক্কা ও জেদ্দার লোকেরা হোসাইন বিন আলীর ছেলে আলী বিন হোসাইনকে নিজেদের বাদশাহ হিসেবে তার হাতে বাইআ'ত গ্রহণ করে। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরেই তার পতন হয়।
মিসরীয় বাহিনীর হাতে পরাজিত ও তুর্কী শাসনের অধীন হয়ে পড়ার পর সৌদী শাসক তুর্কী বিন আবদুল্লাহ রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হন এবং তিনি তুরস্কের ওসমানী খেলাফতের কবল থেকে রিয়াদসহ হেজাযের কয়েকটি শহর পুনরুদ্ধার করে ২য় বার সৌদী শাসনের সূচনা করেন। তার ছেলে ফয়সল বিন তুর্কীর আমলে, সৌদী রাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ফয়সল বিন তুর্কীর ছেলেদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই দেখা দিলে, হায়েলের গভর্নর মোহাম্মদ বিন রশীদ উক্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন। তিনি সৌদী শাসক আব্দুর রহমান বিন ফয়সলের কাছ থেকে রিয়াদ ও পার্শ্ববর্তী এলাকা দখল করে তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর ফলে, ২য় বারের মত সৌদী শাসনের সমাপ্তি ঘটে।
এদিকে, ক্ষমতাচ্যুত সৌদী শাসক আবদুর রহমান বিন ফয়সল রিয়াদের আর-রোবউল খালি মরুভূমিতে সপরিবারে দিন কাটাতে থাকেন। ১১ বছর বয়স্ক ছেলে আবদুল আযীয এখানে ঘোড়াদৌড় শিখেন এবং মরুভূমির প্রতিকূল অবস্থা সহ্য করার শক্তি সাহস অর্জন করেন। পরে কুয়েতের আমীর শেখ মোবারক আস-সাবাহর আমন্ত্রণক্রমে আবদুর রহমান সপরিবারে কুয়েতে বাস করতে থাকেন।
তখন কুয়েত ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ। একদিকে, জার্মানী বাগদাদ থেকে কুয়েত পর্যন্ত বৃটিশ প্রভাব মুছে ফেলে নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে চায়। অপরদিকে, বৃটেন তার ভারতীয় উপনিবেশে পৌঁছার নিরাপত্তার স্বার্থে আরব উপসাগরীয় নৌপথে অন্য কোন শক্তির প্রভাব বরদাশত করতে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে, তুরস্কের ওসমানী খলীফা বৃটিশ ষড়যন্ত্রের কারণে আরব উপদ্বীপ থেকে নিজেদের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলায় আরব উপসাগরে বৃটিশ প্রভাবের পরিবর্তে জার্মানীর অনুপ্রবেশ কামনা করে। আবদুল আযীয বিন আবদুর রহমান কুয়েতের আমীরের দরবারে বসে এ সকল জটিল বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি ১৯০২ খৃঃ মোতাবেক ১৩১৯ হিঃ কুয়েত থেকে ফিরে এসে রিয়াদের উপর আক্রমণ করে তা পুনরুদ্ধার করেন। তখন থেকে নজদে ৩য় সৌদী শাসনের সূচনা হয়।
কুয়েতের নির্বাসন থেকে ফিরে এসে, আবদুল আযীয বিন আবদুর রহমান বিন মুহম্মদ বিন ফয়সল বিন সউদ নিজেকে নজদের সুলতান ঘোষণা করেন। তিনি ১৩৪৩ হিজরীর ৮ই জুমাদাল উলা মক্কায় পৌছেন এবং মক্কার লোকেরা তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণ করে। তারপর ১৩৪৪ হিজরীতে মদীনা ও জেদ্দায় যান এবং সেখানকার লোকেরাও তাঁর হাতে বাইআত নেয়। ১৯৩২ খৃঃ মোতাবেক, ১৩৫১ হিজরীর ২১শে জুমাদাল উলা তিনি মক্কা, মদীনা, জেদ্দা, তায়েফ, রিয়াদসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্রিত করে 'সৌদী আরব রাজতন্ত্র' নামকরণ করেন এবং নিজেকে এর বাদশাহ ঘোষণা করেন।
বাদশাহ আবদুল আযীয কুরআন ও সুন্নাহকে সৌদী আরবের শাসনতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেন এবং দেশে ইসলামী শরীয়াহ বা আইন প্রবর্তন করেন। ১৩৫৭ হিঃ মোতাবেক ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দে, দাহরানে ১ম তেল খনি আবিষ্কার হয় এবং সেই বছরই বিদেশে তেল রফতানি শুরু হয়। তেল সৌদী আরবের বিরাট আয়ের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায়। তেলের পয়সার প্রাচুর্যের ফলে হারাম শরীফের উন্নয়ন শুরু হয়।
১৯৪৯ খৃঃ মোতাবেক ১৩৬৮ হিজরীতে বাদশাহ আবদুল আযীয মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ কর্মসূচীর কথা ঘোষণা করেন। তিনি ১৩৭৩ হিজরীতে মারা যান। কিন্তু তাঁর ছেলে বাদশাহ সউদ বিন আবদুল আযীযের সময়, ১৩৭৫ হিজরীতে মসজিদে হারামের প্রথম সৌদী সম্প্রসারণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
তুর্কী সুলতান সেলিমের নির্মিত ১ তলা ভবনকে অক্ষুণ্ণ রেখে এর পেছনে সুরম্য দোতলা মসজিদ নির্মাণ করা হয় এবং এতে মূল্যবান মার্বেল পাথর লাগানো হয়। সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মাসআ' (সাঈ করার জায়গা) কে সম্প্রসারিত করে তাকে দোতলা করা হয়। পরে মসজিদে হারামের দোতলা বরাবর, মাটির নীচে আরেকতলা নির্মাণ করা হয়। মাতাফে তাপ নিয়ন্ত্রিত মার্বেল পাথর বসানো হয়।
যমযমে ডুবুরী নামিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়। এতে করে, যমযম কূপের অজানা বহু রহস্য উদ্ঘাটিত হয়। যমযম কূপের বর্ণনায় আমরা তা উল্লেখ করেছি।
এরপর যমযমের পানিকে ঠাণ্ডা করার জন্য মসজিদে হারামের পার্শ্বে একটি কারখানা নির্মাণ করা হয়। পাইপের মাধ্যমে কূপ থেকে সরাসরি সেখানে পানি নিয়ে, পুনরায় পাইপের মাধ্যমে পানি পান করার কলসমূহে ঠাণ্ডা পানি সরবরাহ করা হয়। মাসআ'র উপর ৬টি ওভারব্রীজ বা পুল নির্মাণ করা হয় যেন ভিড়ের সময় সাঈর ক্ষতি না করে লোক পারাপার করতে পারে। ৭টি বড় মিনারা তৈরি করা হয়।
বর্তমানে সম্পূর্ণ মসজিদে হারামকে নাতিশীতোষ্ণ বা এয়ার কণ্ডিশন্ড করার জন্য চিন্তা-ভাবনা চলছে। মসজিদে হারামে বহু পাখা, বাতি ও ঘড়ি লাগানো হয়েছে। মসজিদে হারামের ছাদের উপর নামায পড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং এতে তাপ নিয়ন্ত্রিত মার্বেল পাথর বসানো হয়েছে যেন সব সময় তাতে নামায পড়া যায়। হারাম শরীফের তিন তলা ও ছাদে উঠার জন্য স্বয়ংক্রিয় ৩টি বৈদ্যুতিক সিঁড়ি চালু করা হয়েছে। মসজিদে হারামের সাথে সুষ্ঠু যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য মক্কা শহরের পাহাড়ের ভেতর দিয়ে বহু সুড়ঙ্গ পথ তৈরি করা হয়েছে। সেগুলো আলোকোজ্জ্বল ও গরম নিয়ন্ত্রিত পাখা সজ্জিত। হারাম শরীফের সংলগ্ন স্থানে হারাম শরীফের একটি বাণিজ্যিক এলাকা নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেখানকার দোকানপাটগুলো ভাড়া দেয়া হয়েছে।
যমযম কূপের পানি হারাম শরীফের বাইর থেকে সহজে সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে তিন স্থানে পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ ছাড়াও গাড়ীতে করে প্রতিদিন মদীনার মসজিদে নববীতে যমযমের পানি সরবরাহ করা হয়। হারাম শরীফের ভেতর পানির শত শত বড় বড় পাত্র বসানো হয়েছে। সেগুলোতে যমযমের পানি থেকে তৈরি বরফ সরবরাহ করে ঠাণ্ডা পানি পান করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরো হারাম শরীফ উন্নত ও মূল্যবান কার্পেট দ্বারা আচ্ছাদিত।
১৪০০ হিঃ ১লা মুহররম, মোতাবেক ১৯৭৯ খৃষ্টাব্দের ২০শে নবেম্বর, জোহায়মান বেগের নেতৃত্বে একদল সৌদী নাগরিক সৌদী শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং পবিত্র মসজিদে হারাম দখল করে নেয়। তাদের দৃষ্টিতে সৌদী আরবে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম কায়েম নেই। তাই তারা বিদ্রোহ করে এবং অগণিত অস্ত্রশস্ত্র সহকারে মসজিদে হারামে প্রবেশ করে। তারা সৌদী সরকারের পুলিশ ও অন্যান্যদের উপর গুলী ছোঁড়ে। সৌদী বাহিনীর গুলীতে বিদ্রোহীদের অনেকেই মারা যায় এবং অবশিষ্টরা সুদীর্ঘ ১৫ দিন অবরোধের পর, ৫ই ডিসেম্বর মোতাবেক, ১৫ই মুহররম সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তারা হারাম শরীফের সকল দরজা বন্ধ করে দেয় এবং ভেতরের মুসল্লীদেরকে বের হতে বাধা দেয়। পরে, তাদের বিরুদ্ধে সৌদী উচ্চ উলামা পরিষদ এক ফতোয়া জারি করে এবং তাদেরকে গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করে। দুই পক্ষের গোলাগুলীতে অনেকেই নিহত হওয়ায় বিদ্রোহীদের সবাই গ্রেফতার হয়নি। তাদের ৬০ জন বন্দীকে শরীয়াহ কোর্টের ফয়সালা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
১৪০৭ হিজরীর জিলহজ্জ মাসের ৪ তারিখে, এক সংঘর্ষে ৪ শতাধিক ইরানী হাজী মারা যায় এবং আরো কিছু সংখ্যক বিদেশী হাজী এবং সৌদী নাগরিকও মারা যায় বলে সৌদী সরকার ঘোষণা করেন। ইরানে শিয়াপন্থী নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইসলামের নামে ১৪০০ হিজরীর শুরুতে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়, ইরানী হাজীরা প্রতিবছর হজ্জে তার মহড়া প্রদর্শন করে। তারা মিছিল বের করে ও ইমাম খোমেনীর ছবি সম্বলিত প্লাকার্ড ও পোস্টার বহন করে। তারা ইসলামী বিপ্লব এবং খোমেনীর পক্ষে শ্লোগান দেয় এবং রুশ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক মর্মে গগণবিদারী আওয়াজ তোলে।
সৌদী সরকারের আইনে এ সকল রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ। প্রত্যেক বছর ইরান সরকারকে তা বুঝানোর চেষ্টা সত্ত্বেও ইরানী হাজীরা তা মানে না বরং এই বছরও উল্লেখিত তারিখে, তারা মিছিল নিয়ে হুজুন পেরিয়ে আসলে সৌদী নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে তাদের সংঘর্ষ হয় এবং এতে বেসরকারী হিসেব মোতাবেক, সহস্রাধিক লোক মারা যায়।
সৌদী শাসনামলে মিনার ব্যাপক উন্নয়ন হয়। জামরায় পাথর মারার প্রচণ্ড ভিড় কমানোর উদ্দেশ্যে সেটিকে চারতলা করা হয়। এ ছাড়াও সুষ্ঠু যোগাযোগের জন্য সেখানে বহু পুল ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয়। মিনায় হাজীদের ভিড় বেশী হওয়ায়, পাহাড়ের উপরিভাগ তথা ছাদকে সমান করা হয় এবং সেখানে হাজীদের অবস্থানের সুযোগ করে দেয়া হয়। আ'রাফাতের মসজিদে নামেরাকে প্রশস্ত করা হয়। সেখান থেকে ইমাম হজ্জের দিন খোতবা দিয়ে থাকেন।
মোযদালেফায় 'মাশআরুল হারামে' একটি বড় ও সুন্দর মসজিদ নির্মাণ করা হয়। হারাম শরীফের পার্শ্বে বিভিন্ন দেশের সরকারী মেহমানদের জন্য এক বিরাট সুরম্য অট্টালিকা তৈরি করা হয়। এছাড়াও জাবালে আবু কোবায়েসে বাদশাহ ও রাজপরিবারের সদস্যদের জন্য তিনটি সুরম্য অট্টালিকা তৈরি করা হয়।
বর্তমানে, হারামের বাবে আবদুল আযীয থেকে বাবে উমরাহ বরাবর মসজিদে হারামের নতুন সম্প্রসারিত ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ২রা সফর, ১৪০৯ হিঃ মোতাবেক, ১৩ই সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ খৃঃ বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আযীয ৩ তলা বিশিষ্ট সম্প্রসারণ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এতে দুটো স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিঁড়ি লাগানো হয়েছে।
বিভিন্ন শাসকদের আমলে, হারাম শরীফের দরজাসমূহের পরিবর্তন পরিবর্ধন হয়েছে। বর্তমানে এতে প্রধান ৩টি দরজা এবং ৩৩টি সাধারণ দরজা আছে। নতুন সম্প্রসারিত অংশে, একটি প্রধান ফটক ও ১৪টি সাধারণ দরজা নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও এতে বর্তমান ৭টি মিনারার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আরো দুটো মিনারা তৈরি করা হয়েছে। মাটির নীচতলার জন্য বর্তমানে ৪টি প্রবেশ পথ আছে। সম্প্রসারিত অংশের নীচতলার জন্য আরো ২টি প্রবেশপথ নির্মাণ করা হয়েছে। সম্প্রসারিত অংশের ছাদকেও বর্তমান ছাদের অনুরূপ নামায পড়ার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
হারাম শরীফের বিরাট লাইব্রেরী রয়েছে। এতে দুষ্প্রাপ্য বইসহ অন্যান্য অজস্র বই-পুস্তকের সমাহার। এতে পুরুষ ও মহিলাদের পৃথক পৃথক পড়াশুনার ব্যবস্থা আছে।
৯/৩/১৪০৯ হিজরীতে, বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আযীয 'মক্কা নির্মাণ ও উন্নয়ন কোম্পানী'র নতুন কিছু প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল, হারাম শরীফের চারদিক উন্নয়ন করা। এতে হাজীদের জন্য ৬৭টি নতুন ভবন, ৭৬৪ কক্ষ বিশিষ্ট ১২টি বিল্ডিং, ১ হাজার দোকানপাট, ৬৫২ কক্ষ বিশিষ্ট একটি ফাইভ স্টার হোটেল, ১২০০ গাড়ী সংকুলানের জন্য পার্কিং এবং ২২ হাজার লোকের নামায পড়ার উপযোগী মসজিদ নির্মাণ করা। অতীতের যে কোন যুগ ও সরকারের চেয়ে, সৌদী শাসনামলেই হারাম শরীফের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়।
টিকাঃ
২০. তারীখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী।
২১. প্রাগুক্ত।
২২. প্রাগুক্ত।
২৩. প্রাগুক্ত।
২৪. প্রাগুক্ত।
২৫. প্রাগুক্ত।
২৬. প্রাগুক্ত।
২৭. প্রাগুক্ত।
২৮. তারীখু মামলাকাতিল আরাবিয়া আস-সাউদিয়া, সালাউদ্দীন আল-মোখতার।
২৯. প্রাগুক্ত।
৩০. প্রাগুক্ত।
৩১. সাকার আল-জাযীরাহ, আহমদ আবদুল গফুর আত্তার।
৩২. প্রাগুক্ত।