📄 কোরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্য
জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অনেক বেশী। মক্কায় কাপড় ও খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসা জমজমাট ছিল। মক্কার দক্ষিণ ও উত্তরে অবস্থিত দেশসমূহের বাণিজ্যিক বিনিময়ের জন্য মক্কা ছিল বিরাট স্ট্রাটেজিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ব্যবসায়ীরা উত্তরে সিরিয়া ও দক্ষিণে ইয়েমেনে যাওয়ার জন্য মক্কায় এসে ভিড় জমাত।
অপরদিকে ইয়েমেন হয়ে আফ্রিকান দ্রব্য ও মালামাল আমদানি হত বিশেষ করে মক্কায় আফ্রিকার নিগ্রো দাস, আঠা এবং হাতীর দাঁত সহ বিভিন্ন দ্রব্যাদির বিরাট চাহিদা ছিল। মক্কার ব্যবসায়ীরা ইয়েমেনের চামড়া, সুগন্ধজাত দ্রব্য ও প্রখ্যাত ইয়েমেনী কাপড় ক্রয় করত। অপরদিকে তারা ইরাক হতে ভারতীয় মশলা সংগ্রহ করত। মিসর ও সিরিয়া থেকে তেল, আটা, অস্ত্র, সিল্ক ও মদ আমদানী করত।
এভাবে মক্কা বিরাট বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং কোরাইশরাও বড় ধরনের ব্যবসায়ীতে পরিণত হল। ব্যবসা বাণিজ্যে তারা বড় অভিজ্ঞ হয়ে উঠল এবং তাদের ব্যবসার পুঁজি অনেক বেড়ে গেল। হিজরী ২য় সালে বদর যুদ্ধের সময় তাদের ব্যবসায়ী কাফেলার মূলধন ৫০ হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও এক হাজার উট পর্যন্ত পৌঁছুল। এক সময় আড়াই হাজার উট ব্যবসায়ী কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তদানীন্তন সময়ে ঐ পরিমাণ উট ও ব্যবসার মূলধন বিরাট ব্যাপার ছিল। এর ফলে, কোরাইশরা ধনী হয়ে গেল। এই জন্যই তারা বদর যুদ্ধের প্রতিটি কাফের যুদ্ধবন্দীকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছ থেকে ১ হাজার হতে ৪ হাজার দিরহামের বিনিময়ে মুক্ত করতে পেরেছে। তবে রাসূলুল্লাহ (সা) যাদেরকে মাফ করে দিয়েছিলেন, তাদের কথা ভিন্ন।
তদানীন্তন সময়ে মক্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রাবিনিময় বাজার হিসেবে গড়ে উঠে। যে কোন দেশের ব্যবসায়ীরা যত বেশী পরিমাণ সম্পদই ক্রয় করতে চাইতো মক্কার 'ব্যবসায়ীরা তাদের সাথে আধুনিক যুগের ব্যাংকের মত লেনদেনের কাজ করত। তারা অনেক বেশী সুদ দাবী করত। এর ফলে তাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আরো বৃদ্ধি পেল। কোরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্যের এই সুযোগ সুবিধার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহ সূরা কোরাইশে বলেছেন,
لِإِيْلَفِ قُرَيْشٍۙ - إِيْۦلٰفِهِمْ رِحْلَةَ الشِّتَآءِ وَالصَّيْفِۚ فَلْيَعْبُدُوْا رَبَّ هٰذَا الْبَيْتِۙ الَّذِيْٓ أَطْعَمَهُمْ مِّنْ جُوْعٍ وَّاٰمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ -
অর্থ: 'যেহেতু কোরাইশরা অভ্যস্ত হয়েছে শীতকাল ও গরম কালের বিদেশযাত্রায়, কাজেই তাদের কর্তব্য হল এই কাবাঘরের প্রতিপালকের এবাদত করা, যিনি তাদেরকে ক্ষুধা হতে রক্ষা করে খাদ্য যুগিয়েছেন এবং ভয় ভীতি হতে বাঁচিয়ে নিরাপত্তা দান করেছেন।' এই সূরায় কোরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যিক সফরের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন, তাদেরকে আমি এই যে বিরাট নেয়ামত দান করেছি, শুকরিয়া স্বরূপ তাদের উচিত হল মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আমার এবাদত করা।
টিকাঃ
৪. প্রাগুক্ত।
৫. প্রাগুক্ত।
জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অনেক বেশী। মক্কায় কাপড় ও খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসা জমজমাট ছিল। মক্কার দক্ষিণ ও উত্তরে অবস্থিত দেশসমূহের বাণিজ্যিক বিনিময়ের জন্য মক্কা ছিল বিরাট স্ট্রাটেজিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ব্যবসায়ীরা উত্তরে সিরিয়া ও দক্ষিণে ইয়েমেনে যাওয়ার জন্য মক্কায় এসে ভিড় জমাত।
অপরদিকে ইয়েমেন হয়ে আফ্রিকান দ্রব্য ও মালামাল আমদানি হত বিশেষ করে মক্কায় আফ্রিকার নিগ্রো দাস, আঠা এবং হাতীর দাঁত সহ বিভিন্ন দ্রব্যাদির বিরাট চাহিদা ছিল। মক্কার ব্যবসায়ীরা ইয়েমেনের চামড়া, সুগন্ধজাত দ্রব্য ও প্রখ্যাত ইয়েমেনী কাপড় ক্রয় করত। অপরদিকে তারা ইরাক হতে ভারতীয় মশলা সংগ্রহ করত। মিসর ও সিরিয়া থেকে তেল, আটা, অস্ত্র, সিল্ক ও মদ আমদানী করত।
এভাবে মক্কা বিরাট বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং কোরাইশরাও বড় ধরনের ব্যবসায়ীতে পরিণত হল। ব্যবসা বাণিজ্যে তারা বড় অভিজ্ঞ হয়ে উঠল এবং তাদের ব্যবসার পুঁজি অনেক বেড়ে গেল। হিজরী ২য় সালে বদর যুদ্ধের সময় তাদের ব্যবসায়ী কাফেলার মূলধন ৫০ হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও এক হাজার উট পর্যন্ত পৌঁছুল। এক সময় আড়াই হাজার উট ব্যবসায়ী কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তদানীন্তন সময়ে ঐ পরিমাণ উট ও ব্যবসার মূলধন বিরাট ব্যাপার ছিল। এর ফলে, কোরাইশরা ধনী হয়ে গেল। এই জন্যই তারা বদর যুদ্ধের প্রতিটি কাফের যুদ্ধবন্দীকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছ থেকে ১ হাজার হতে ৪ হাজার দিরহামের বিনিময়ে মুক্ত করতে পেরেছে। তবে রাসূলুল্লাহ (সা) যাদেরকে মাফ করে দিয়েছিলেন, তাদের কথা ভিন্ন।
তদানীন্তন সময়ে মক্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রাবিনিময় বাজার হিসেবে গড়ে উঠে। যে কোন দেশের ব্যবসায়ীরা যত বেশী পরিমাণ সম্পদই ক্রয় করতে চাইতো মক্কার 'ব্যবসায়ীরা তাদের সাথে আধুনিক যুগের ব্যাংকের মত লেনদেনের কাজ করত। তারা অনেক বেশী সুদ দাবী করত। এর ফলে তাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আরো বৃদ্ধি পেল। কোরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্যের এই সুযোগ সুবিধার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহ সূরা কোরাইশে বলেছেন,
لِإِيْلَفِ قُرَيْشٍۙ - إِيْۦلٰفِهِمْ رِحْلَةَ الشِّتَآءِ وَالصَّيْفِۚ فَلْيَعْبُدُوْا رَبَّ هٰذَا الْبَيْتِۙ الَّذِيْٓ أَطْعَمَهُمْ مِّنْ جُوْعٍ وَّاٰمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ -
অর্থ: 'যেহেতু কোরাইশরা অভ্যস্ত হয়েছে শীতকাল ও গরম কালের বিদেশযাত্রায়, কাজেই তাদের কর্তব্য হল এই কাবাঘরের প্রতিপালকের এবাদত করা, যিনি তাদেরকে ক্ষুধা হতে রক্ষা করে খাদ্য যুগিয়েছেন এবং ভয় ভীতি হতে বাঁচিয়ে নিরাপত্তা দান করেছেন।' এই সূরায় কোরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যিক সফরের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন, তাদেরকে আমি এই যে বিরাট নেয়ামত দান করেছি, শুকরিয়া স্বরূপ তাদের উচিত হল মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আমার এবাদত করা।
টিকাঃ
৪. প্রাগুক্ত।
৫. প্রাগুক্ত।
জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অনেক বেশী। মক্কায় কাপড় ও খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসা জমজমাট ছিল। মক্কার দক্ষিণ ও উত্তরে অবস্থিত দেশসমূহের বাণিজ্যিক বিনিময়ের জন্য মক্কা ছিল বিরাট স্ট্রাটেজিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ব্যবসায়ীরা উত্তরে সিরিয়া ও দক্ষিণে ইয়েমেনে যাওয়ার জন্য মক্কায় এসে ভিড় জমাত।
অপরদিকে ইয়েমেন হয়ে আফ্রিকান দ্রব্য ও মালামাল আমদানি হত বিশেষ করে মক্কায় আফ্রিকার নিগ্রো দাস, আঠা এবং হাতীর দাঁত সহ বিভিন্ন দ্রব্যাদির বিরাট চাহিদা ছিল। মক্কার ব্যবসায়ীরা ইয়েমেনের চামড়া, সুগন্ধজাত দ্রব্য ও প্রখ্যাত ইয়েমেনী কাপড় ক্রয় করত। অপরদিকে তারা ইরাক হতে ভারতীয় মশলা সংগ্রহ করত। মিসর ও সিরিয়া থেকে তেল, আটা, অস্ত্র, সিল্ক ও মদ আমদানী করত।
এভাবে মক্কা বিরাট বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং কোরাইশরাও বড় ধরনের ব্যবসায়ীতে পরিণত হল। ব্যবসা বাণিজ্যে তারা বড় অভিজ্ঞ হয়ে উঠল এবং তাদের ব্যবসার পুঁজি অনেক বেড়ে গেল। হিজরী ২য় সালে বদর যুদ্ধের সময় তাদের ব্যবসায়ী কাফেলার মূলধন ৫০ হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও এক হাজার উট পর্যন্ত পৌঁছুল। এক সময় আড়াই হাজার উট ব্যবসায়ী কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তদানীন্তন সময়ে ঐ পরিমাণ উট ও ব্যবসার মূলধন বিরাট ব্যাপার ছিল। এর ফলে, কোরাইশরা ধনী হয়ে গেল। এই জন্যই তারা বদর যুদ্ধের প্রতিটি কাফের যুদ্ধবন্দীকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছ থেকে ১ হাজার হতে ৪ হাজার দিরহামের বিনিময়ে মুক্ত করতে পেরেছে। তবে রাসূলুল্লাহ (সা) যাদেরকে মাফ করে দিয়েছিলেন, তাদের কথা ভিন্ন।
তদানীন্তন সময়ে মক্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রাবিনিময় বাজার হিসেবে গড়ে উঠে। যে কোন দেশের ব্যবসায়ীরা যত বেশী পরিমাণ সম্পদই ক্রয় করতে চাইতো মক্কার 'ব্যবসায়ীরা তাদের সাথে আধুনিক যুগের ব্যাংকের মত লেনদেনের কাজ করত। তারা অনেক বেশী সুদ দাবী করত। এর ফলে তাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আরো বৃদ্ধি পেল। কোরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্যের এই সুযোগ সুবিধার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহ সূরা কোরাইশে বলেছেন,
لِإِيْلَفِ قُرَيْشٍۙ - إِيْۦلٰفِهِمْ رِحْلَةَ الشِّتَآءِ وَالصَّيْفِۚ فَلْيَعْبُدُوْا رَبَّ هٰذَا الْبَيْتِۙ الَّذِيْٓ أَطْعَمَهُمْ مِّنْ جُوْعٍ وَّاٰمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ -
অর্থ: 'যেহেতু কোরাইশরা অভ্যস্ত হয়েছে শীতকাল ও গরম কালের বিদেশযাত্রায়, কাজেই তাদের কর্তব্য হল এই কাবাঘরের প্রতিপালকের এবাদত করা, যিনি তাদেরকে ক্ষুধা হতে রক্ষা করে খাদ্য যুগিয়েছেন এবং ভয় ভীতি হতে বাঁচিয়ে নিরাপত্তা দান করেছেন।' এই সূরায় কোরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যিক সফরের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন, তাদেরকে আমি এই যে বিরাট নেয়ামত দান করেছি, শুকরিয়া স্বরূপ তাদের উচিত হল মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আমার এবাদত করা।
টিকাঃ
৪. প্রাগুক্ত।
📄 কোরাইশ আমলে মক্কার সাহিত্য চর্চা
আইয়ামে জাহিলিয়াতের সময় কোরাইশ ও আরব উপদ্বীপের অন্যান্য গোত্রগুলোর মধ্যে আরবী সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা হয়। সে সময় আরবী সাহিত্যের মান সবচাইতে বেশী উন্নত ছিল। জাহেলিয়াতের আরবী সাহিত্য আজকের এ যুগেও সাহিত্য পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় আরবী কাব্যের চর্চা বেশী হত। এগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা হত। তবে আরবদের স্মরণ শক্তি বেশী ছিল। কোন কিছু লিখে না রাখলেও তারা অনেক কিছু মুখস্থ বলতে পারত। তারা বিভিন্ন গোত্রের গর্ব, অহংকার ও প্রশংসার উপরে শত শত কবিতা লিখত। বিভিন্ন গোত্র এ উদ্দেশ্যে কবি তৈরি করত ও তাদেরকে যথেষ্ট সম্মান দিত। কেননা তাদের মাধ্যমেই এক গোত্র আরেক গোত্রের উপর প্রাধান্য ও সম্মান পেত। যেই বংশের কবি যত শ্রেষ্ঠ সেই বংশের মর্যাদা তত বেশী। এজন্য জাহেলিয়াতের অনেক আরবী কবির নাম ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
কবিতা চর্চা তথা কবিতা প্রতিযোগিতার প্রধান স্থান ছিল বিভিন্ন মৌসুমী বাজার ও মেলাসমূহ। এর মধ্যে ওকাজ বাজার ছিল সবচাইতে সেরা। বর্তমান যুগে সেই ওকাজ বাজারের স্থান নির্ধারণের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তবে مُعْجَمُ البلدان (নগর অভিধান) এর লেখক এ প্রসংগে যা উল্লেখ করেছেন তাই বেশী যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। তিনি বলেছেন, ওকাজ এমন এক উপত্যকায় অবস্থিত যেখান থেকে তায়েফের দূরত্ব এক রাতের এবং মক্কার দূরত্ব তিন রাতের। সেখানে বড় বড় কিছু পাথর ছিল। তারা সেগুলোর তওয়াফ করত। এই বর্ণনার প্রেক্ষিতে ذاتُ الْقَرْن 'জাতুল কান্'ই ঐ জায়গা বলে মনে হয়। এর বর্তমান নাম হচ্ছে سيل الكبير (সায়লুল কবীর)। এটি পুরাতন তায়েফ রোডে অবস্থিত।
এটি হাজীদের মীকাতও বটে। সেখান থেকে তায়েফের দূরত্ব কম এবং মক্কার দূরত্ব তায়েফের দূরত্বের তিনগুণ। সেখানে এখন পর্যন্ত কতগুলো বড় বড় পাথর রয়েছে। এটি একটি বড় উপত্যকা। আরব কাফেলাসমূহের বেশী সংকুলানের জন্য এটাই ছিল উপযোগী স্থান। দ্বিতীয় স্থানটি ছিল মাজান্না বাজার। বর্তমান মক্কা ও জেদ্দার মাঝখানে অবস্থিত বাহরাহ শহরটিই পূর্বের মাজান্না বাজার বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মত। এটি মক্কার নিকটে অবস্থিত। ৩য় স্থানটি জুল মাজায। এটি আরাফাত থেকে উত্তর দিকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মক্কা থেকে হোনায়েন হয়ে তায়েফ যাওয়ার সময় হাতের ডানে পড়ে। সেখানে এখন পর্যন্ত সেই যুগের অনেক নির্দশন বিদ্যমান রয়েছে।
আরবের বিভিন্ন জায়গা থেকে জিলকদ মাসের শেষ ১০ তারিখে কাফেলাগুলো ওকাজ বাজারে এসে জড় হত। ওকাজ বাজারের মেলা শেষে তারা 'জুল মাজান্না' বাজারের মেলায় যোগ দিত। হজ্জ মওসুমের সর্বশেষ মেলা ছিল 'জুল মাজাযে'। জিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখে সেখানে মেলা বসত। পরে তারা মক্কা, মিনা ও দাওমাতুল জানদালের বাজারে যেত। কিন্তু ওকাজের মত আর কোন মেলায় এত বেশী সাহিত্য চর্চা জমে উঠতনা। এটিই ছিল সাহিত্য চর্চার সেরা মেলা।
আল্লামা তকিউদ্দীন আলফাসী তাঁর شفاء الغرام 'শেফাউল গারাম' বইতে লিখেছেন যে, হিজরী ১২৯ সাল পর্যন্ত ওকাজ মেলা চালু ছিল। ১২৯ হিঃ সনে মক্কায় মোখতারের বিপ্লবের কারণে আরবরা ভয়ে ওকাজ বাজার ত্যাগ করে, যা আজ পর্যন্ত আর কোনদিন জমে উঠেনি। ক্রমান্বয়ে তারা মাজান্না ও জুলমাজায বাজারের মেলাও ত্যাগ করে এবং পরবর্তীতে শুধু মক্কা, মিনা ও আরাফাতের বাজারে নিজেদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখে।
📄 কোরাইশ আমলে মক্কার বিজ্ঞান চর্চা
কোরাইশরা গ্রহ-নক্ষত্রের গতি-প্রকৃতির উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করত। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছে লোকেরা যেত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করত। আবহাওয়া বিজ্ঞানেও তাদের যথেষ্ট পারদর্শিতা ছিল। বিভিন্ন উপত্যকায় তারা বৃষ্টির স্থান নির্ধারণ করতে পারত এবং সাথে সাথে বাতাসের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণেও তাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল। লোহিত সাগরে নৌঅভিযানে তাদের সার্থক অভিজ্ঞতা ছিল। আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের সাহায্যে তারা নিজেদের বন্দর থেকে সামুদ্রিক পথে দূরবর্তী বন্দরসমূহে সফর করত। লোহিত সাগর থেকে তারা সুদূর ভারত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছে যেত। চিকিৎসা শাস্ত্রেও তারা পিছিয়ে ছিল না। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যাবলী সম্পর্কে তাদের ভাল ধারণা ছিল। একই সাথে তারা বিভিন্ন গাছ-গাছড়ার উপকারিতা এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও ওয়াকিফহাল ছিল। তারা শিঙ্গা লাগানোসহ বিভিন্ন সার্জারী পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসা করত। এই সমস্ত বিষয়ে বড় বড় হেকিম ছিল। তাদের মধ্যে হারেস বিন কালদাহ আসসাকাফি ছিলেন অন্যতম হেকিম। তিনি হযরত মুয়াবিয়া (রা) এর শাসনকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, ঐ সময় পর্যন্ত অন্যান্য চিকিৎসকরা তাঁকে গুরুর মর্যাদা দিত। এখন পর্যন্ত গ্রামীণ এলাকার বেদুঈনরা আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির পরিবর্তে ঐ প্রাচীন পদ্ধতির অনুসরণে বিভিন্ন গাছ গাছড়ার তৈরি ওষুধ, শিঙ্গা ও দাগ লাগানোর পদ্ধতি ব্যবহার করে।
তারা আল কিয়াফাহ বা 'পদচিহ্ন বিজ্ঞানে' অদ্বিতীয় ছিল। ভেগে যাওয়া মানুষ ও পশুর পদচিহ্ন দেখে, অন্যান্য অগণিত চিহ্নগুলোর মধ্য থেকে তারা সঠিকভাবে সেগুলোর গন্তব্যস্থান বের করতে সক্ষম হত। দুই হাজার বছর পর আজ পর্যন্তও ঐ জ্ঞান বিদ্যমান রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তা পড়ানো হচ্ছে। এই একই বিজ্ঞানের মাধ্যমে তারা মরুভূমিতে পানির অস্তিত্ব বুঝতে পারত এবং কূপ খুঁড়ে পানি আবিষ্কার করে সেখানে বাস করত। মক্কার বিভিন্ন জায়গায় তখন তারা অগণিত কূপ খনন করে পানি বের করেছিল।
তারা كَهَانَهُ কাহানা' ও عَیَافَةً 'এয়াফাহ' বিজ্ঞানেও পারদর্শী ছিল। তারা গ্রহ-নক্ষত্র ও তারকার প্রভাবের ভিত্তিতে ভবিষ্যদ্বাণী কিংবা অতীতের কোন অজানা খবর বলত। সাধারণ মানুষ ঐ সকল গণকদের দ্বারা অনেক প্রতারিত হয়েছে। ইসলাম এসে এগুলোকে হারাম ঘোষণা করেছে। কোরাইশরা বংশ জ্ঞানের ব্যাপারে বিশেষ স্মরণশক্তির দাবীদার, তারা আরবের বিভিন্ন গোত্রের পুরো বংশ তালিকা স্মরণ রাখতে পারত। এ ছাড়াও বাণিজ্য উপলক্ষে বিদেশে ভ্রমণের কাহিনী বংশ পরম্পরায় চলে আসত। পরবর্তীতে ঐ সকল বর্ণনা ইতিহাসের মর্যাদা লাভ করে। তারা ঘোড়-দৌড় এবং শরীর চর্চা বিজ্ঞানেও যথেষ্ট অগ্রসর ছিল।
টিকাঃ
৬. প্রাগুক্ত।
📄 কোরাইশ আমলে মক্কার গান বাজনা
পারস্য ও রোমের পরে, গান-বাজনার ক্ষেত্রে আরবরাই ছিল সবার আগে। এক্ষেত্রে কোরাইশরা আরবদের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ঐ সময় মক্কার ঘরে ঘরে নর্তকী ছিল। মহিলাদের কোন পর্দা ছিল না। বরং তারা জাহেলিয়াতের রং-ঢং ও সাজগোজে প্রকাশ্যে বের হত। জাহেলিয়াতের মত সেজেগুজে প্রকাশ্যে বের না হওয়ার জন্য আল্লাহ কুরআনে মুসলিম মহিলাদেরকে নির্দেশ করেছেন। যাই হোক, ঐ সকল মহিলা পুরুষদের সাথে আনন্দ অনুষ্ঠানে খোলামেলা যোগ দিত এবং ঢোল ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান গাইত। বিয়ের রাত্রে সেই গান বাজনার আর কোন শেষ ছিল না। তাদের মধ্যে দেবতার উদ্দেশ্যে রচিত نصب নামক ধর্মীয় গানের বহুল প্রচার ছিল। আবু সুফিয়ান বদর যুদ্ধে কোরাইশদের ফিরে আসার উপদেশ পাঠালে এর জবাবে আবু জাহল বলেছিল, 'আল্লাহর শপথ, আমরা বদর প্রান্তর না দেখে ফিরব না, যুদ্ধের পর আমরা সেখানে ৩ দিন অবস্থান করবো, উট জবেহ করবো, খানা-পিনা, মদ, গান বাজনা ও নর্তকীর নাচ দেখবো এতে গোটা আরবে আমাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে।' এই উক্তি দ্বারাও সেই সমাজে গান-বাজনা ও নাচের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলে।
مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيْثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ
অর্থ: 'আল্লাহর পথ থেকে ফিরানোর জন্য যে গান কিনে আনে।' (লোকমান: ৬)
এ আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছে যে, নাদর বিন হারেস নতুন মুসলমানদেরকে তার ঘরে ডাকতেন এবং ঘরের একজন গায়িকাকে হুকুম দিতেন, সে যেন নও মুসলিমকে খাদ্য-পানীয় ও গান দ্বারা আপ্যায়িত করে। তার বিশ্বাস, এর ফলে নও মুসলিম ব্যক্তি নবীর দাওয়াত ভুলে যাবে এবং ইসলাম ত্যাগ করবে। তিনি এই উদ্দেশ্যে ঘরে বেশ কিছু গায়িকা পালন করতেন।
মূলকথা, কোরাইশদের ঘর-মজলিশ, পার্ক, বিশ্রামাগার এবং ধনীদের বাড়ীতে নর্তকী ও গায়িকার ব্যাপক পদচারণা ছিল।