📄 কোরাইশ আমলে মক্কার ধর্মীয় দিক
কুসাই বিন কিলাবের সময় থেকেই মক্কায় মূর্তিপূজা চালু হয়। খোজাআ' গোত্রের শাসক আমর বিন লুহাই সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে অবস্থিত দুটো মূর্তির পূজা করার আদেশ দেন। কুসাইর আমলে মূর্তি দুটোকে সেখান থেকে সরিয়ে আনা হয়। একটিকে কা'বা শরীফের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং অপরটিকে যমযম কূপের, কাছে রাখা হয়। জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা মূর্তি দুটোর কাছে পশু জবেহ করত এবং সেগুলোর গায়ে হাত লাগিয়ে কল্যাণ কামনা করত। পরবর্তীতে মূর্তিপূজা চরম রূপ ধারণ করে। এমনকি মক্কাবাসীরা মূর্তির চতুর্দিকে তওয়াফ শুরু করে।
বেদুঈনরা মূর্তি কিনে ঘরে নিয়ে যেত এবং তার পূজা করত। কোরাইশদের এমন কোন ঘর বাকী ছিল না, যেখানে কমপক্ষে একটি মূর্তি ছিল না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এবং ঘরে প্রবেশের সময় তারা এর গায়ে হাত মুছে বরকত হাসিলের চেষ্টা করত। তাছাড়া কাবা শরীফের ভেতরে তাদের ৩৬০টি মূর্তি ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন পর্যন্ত কা'বা শরীফে ঐ মূর্তিগুলো মওজুদ ছিল। জাহেলিয়াতের প্রসিদ্ধ মূর্তিগুলোর মধ্যে একটা ছিল হোবল। এটি কা'বা শরীফের মাঝামাঝি স্থানে ছিল। তায়েফের পথে নাখলা শামীয়া উপত্যকায় ছিল ওজ্জা নামক দেবতা। তায়েফে ছিল লাত নামক মূর্তি। সেটি ছিল মসজিদে ইবনে আব্বাসের কাছে 'মাগিবুস শামছ' নামক জায়গায়। লোহিত সাগরের তীরে, কাদীদ নামক স্থানে ছিল 'মানাত' নামক আরেকটি প্রসিদ্ধ মূর্তি। এমনকি, জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা কাবা শরীফ তওয়াফ করার সময় বলতঃ
وَاللَّاتُ وَالْعُزَّى - وَمَنَاةُ الثَّالِثَةُ الأُخْرَى - تِلْكَ الْغَرَانِيقُ الْعُلا . وَأَنَّ شَفَاعَتَهُنَّ لَتُرْتَجِى .
অর্থ : 'লাত, ওজ্জা ও ৩য় দেবতা মানাতের মত মহতী সুন্দরী দেবীর সুফারিশ কবুল হওয়ার আশা করা যায়।'
হোজাইল গোত্রের سواع 'সূয়া' নামক একটি মূর্তি ছিল। তারা এটির পূজা করত।
কা'বা শরীফে জাহেলিয়াতের লোকদের অনেকগুলো পাত্র ছিল। কোন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ হলে কিংবা কোন কাজ করার ইচ্ছা করলে, তারা সেগুলোতে 'হ্যাঁ, বা না সূচক বাণী লিখে, লটারীর মাধ্যমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। মূর্তিপ্রীতি তাদের মন মানসিকতায় পুরো বসে গিয়েছিল।
ঐতিহাসিকরা জাহেলিয়াতের যুগে আরবদের ধর্মীয় আচরণকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে ১حَلَّ ও حَمْسٌ 'হাল্লা' ও 'হাম্ম্স'। হাল্লা হচ্ছে, হারাম এলাকার বাইরের লোকদের পূজা অর্চনার পদ্ধতি সংক্রান্ত। আর হাম্স হচ্ছে, হারাম এলাকার বাসিন্দাদের পূজা-পার্বণ পদ্ধতি সংক্রান্ত। এই দলটি পূজা-পার্বনের ক্ষেত্রে চরমপন্থী বলে পরিচিত ছিল। কানানা, খোজাআ', আউস এবং খাযরাজ ইত্যাদি গোত্রসমূহ এই শেষোক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোরাইশরা এদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশী চরমপন্থী ছিল। এমনকি, তাদের কেউ হজ্ব কিংবা উমরাহ করার জন্য ইহরাম পরার পর, শত প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও পুনরায় নিজ ঘরে কিংবা বাগানে ফিরে যাওয়া পছন্দ করত না। তারা পেছনের দিকে ফিরে, নিজের পরিবারের লোকদের প্রতি তার প্রয়োজনীয় জিনিস দেয়ার আহবান জানাত। ইহরাম পরার পর তারা নিজেদের জন্য ঘি, দুধ, মাখন ও পশমী কাপড় পরিধান হারাম করে নিত।
হজ্জের সময় বহিরাগত হাজীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করত। কিন্তু মক্কার লোকেরা হারামের বাসিন্দা হিসেবে এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আরাফায় না গিয়ে নামেরায় অবস্থান করত এবং অন্যদের থেকে নিজেদেরকে পৃথক রাখত। তারা হারাম এলাকার বাইরের লোকদের জন্য তাদের আহমসী নামক কাপড় ক্রয় করা, ভাড়ায় নেয়া কিংবা ধার নেয়া ব্যতীত কা'বা শরীফের তওয়াফ করার অনুমতি দিত না। ঐ কাপড় সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে, বহিরাগত পুরুষদের জন্য দিনে এবং নারীদের জন্য রাত্রে উলঙ্গ তওয়াফ করার অনুমতি দিত। তারা মসজিদের বাইরে কাপড় খুলে আসত এবং সে কাপড় তাদের ফিরে আসার আগ পর্যন্ত কেউ স্পর্শ করত না। মক্কার কিছু সংখ্যক যুবক এই সুযোগের সদ্যবহার করত এবং তারা এ জাতীয় উলঙ্গ তওয়াফকারিণী মহিলার অপেক্ষায় থাকত। উলঙ্গ কোন তওয়াফকারিণী নারীকে দেখার পর পছন্দ হলে সেই যুবকটি নিজেও উলঙ্গ হয়ে, ঐ রমণীর সাথে তওয়াফ শুরু করে দিত। শেষ পর্যন্ত তাদের দুইজন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যেত। তাছাড়া, জাহেলিয়াতের যুগে অনেক নারী-পুরুষ কাবাশরীফে উলঙ্গ তওয়াফ করত। মহিলারা শুধু নিজের লজ্জাস্থানের উপর একটুকরো কাপড় বেঁধে রাখত। এছাড়াও, কোরাইশরা বহিরাগত লোকদের মক্কায় থাকা অবস্থায় সাথে নিয়ে আসা খাবার খাওয়ার অনুমতি দিত না। এর ফলে, বহিরাগত লোকদের মক্কার মেহমানখানা কিংবা বাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বাধ্য করা হত।
কোরাইশদের যুবতী মেয়েদেরকে বিয়ের বয়সে উপনীত হওয়ার পর ভাল করে সাজিয়ে-গুজিয়ে খোলাভাবে মাতাফে নিয়ে আসা হত এবং পরে ঘরে ফিরিয়ে নেয়া হত। বিয়ের আগ পর্যন্ত তাদের ঘরের বাইরে যেতে দেয়া হত না। এরপর যার সাথে বিয়ে হবে তার ঘর ছাড়া আর কোথাও যাওয়া তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। যুবতী মেয়েদেরকে হারাম শরীফে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হল, পাত্রদের সামনে পাত্রীকে পেশ করা। যেন তারা ভাল করে দেখতে পায় ও পরে বিয়ের পয়গাম পাঠায়। বিশেষ করে কাবা শরীফের পার্শ্বে পাত্রী দেখার মধ্যে অসদুদ্দেশ্য থাকতে পারে না। এটি একটি মহৎ ব্যবস্থা বলে তারা মনে করত।
তাদের তওয়াফের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন ধরনের। তারা তওয়াফের শুরুতে হাজারে আসওয়াদে চুমু খেত। তারপর কা'বা শরীফকে ডানে রেখে তওয়াফ শুরু করত। ৭ চক্কর তওয়াফ শেষে, হাজারে আসওয়াদকে চুমু দেয়ার পর 'নায়লা' মূর্তিতে চুমু খেত। তাদের তওয়াফ ছিল ইসলামের তওয়াফ থেকে ভিন্ন ধরনের। ইসলাম হাজারে আসওয়াদে চুমু খাওয়ার পর, কা'বা শরীফকে বামে রেখে তওয়াফের পদ্ধতি চালু করেছে।
জাহেলিয়াতের যুগে নারীদেরকে ঘৃণা ও অবমাননার চোখে দেখা হত। এজন্য তারা মেয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে অসন্তুষ্ট হত এবং তাদেরকে জীবন্ত কবর দিত। তাদের একজন মন্তব্যও করেছিল যে, دَفْنُ الْبَنَاتِ مِنَ الْمُكَرَّمَاتِ ‘মেয়েদেরকে দাফন করে দেয়া সম্মানের বিষয়।' অবশ্য তাদের মধ্যে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি এই ধারণার বিরোধী ছিলেন। এদের মধ্যে যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল আল কোরাইশী ৯৬টি মেয়েকে দাফনের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন।
কোরাইশরা জুতা পরে কা'বা শরীফে প্রবেশ করত। কিন্তু ওয়ালিদ বিন মুগীরা তাদেরকে জুতা খুলে কা'বা শরীফে প্রবেশ করার নির্দেশ দিল। ঋতুবতী মহিলারা কা'বা শরীফ ও মূর্তিগুলোকে স্পর্শ করত না। তারা এগুলো থেকে দূরে অবস্থান করত। কেউ নামায পড়তে চাইলে, কাবা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়ত এবং অবসরমত যতবার ইচ্ছা ততবার রুকু ও সেজদা করত। নামাযের রাকাত সংখ্যা ও রুকু-সেজদার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম-কানুন ছিল না।
কোরাইশদের মধ্যে মূর্তিপূজার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মমতও বিস্তার লাভ করেছিল। এর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে دَهْريّة 'দাহরিয়া' বা 'কালবাদ'। এই মতবাদ অনুযায়ী মানুষের ধ্বংসের জন্য 'যুগ' বা কালই একান্তভাবে দায়ী। এছাড়া গ্রহ-নক্ষত্র পূজাও তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই দলের মতে, মানুষের ভালমন্দের ব্যাপারে গ্রহনক্ষত্রের প্রভাবই প্রধানতঃ কার্যকর। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইহুদী ধর্ম এবং কেউ কেউ খৃস্টান ধর্মের কাছাকাছি মতবাদও পোষণ করত। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের ধর্মগুলোর প্রভাবে, কোরাইশদের মধ্যে এই সকল ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাদের যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ আসমানী কিতাবসমূহের অনুসরণ করেন তাঁরা হচ্ছেন ওয়ারাকা বিন নওফল, যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল, উমাইয়া বিন আলত, উমাইয়া বিন আওফ আল কানানী এবং হাশেম বিন আবদ মনাফ প্রমুখ। তাদের কেউ কেউ মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেন, এগুলো বর্জন করার জন্য লোকদের উপদেশ দেন এবং তারা পরকালের উত্থান ও বেহেশত-দোযখের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করতেন।
টিকাঃ
৩. তারীখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী, মক্কা।
কুসাই বিন কিলাবের সময় থেকেই মক্কায় মূর্তিপূজা চালু হয়। খোজাআ' গোত্রের শাসক আমর বিন লুহাই সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে অবস্থিত দুটো মূর্তির পূজা করার আদেশ দেন। কুসাইর আমলে মূর্তি দুটোকে সেখান থেকে সরিয়ে আনা হয়। একটিকে কা'বা শরীফের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং অপরটিকে যমযম কূপের, কাছে রাখা হয়। জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা মূর্তি দুটোর কাছে পশু জবেহ করত এবং সেগুলোর গায়ে হাত লাগিয়ে কল্যাণ কামনা করত। পরবর্তীতে মূর্তিপূজা চরম রূপ ধারণ করে। এমনকি মক্কাবাসীরা মূর্তির চতুর্দিকে তওয়াফ শুরু করে।
বেদুঈনরা মূর্তি কিনে ঘরে নিয়ে যেত এবং তার পূজা করত। কোরাইশদের এমন কোন ঘর বাকী ছিল না, যেখানে কমপক্ষে একটি মূর্তি ছিল না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এবং ঘরে প্রবেশের সময় তারা এর গায়ে হাত মুছে বরকত হাসিলের চেষ্টা করত। তাছাড়া কাবা শরীফের ভেতরে তাদের ৩৬০টি মূর্তি ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন পর্যন্ত কা'বা শরীফে ঐ মূর্তিগুলো মওজুদ ছিল। জাহেলিয়াতের প্রসিদ্ধ মূর্তিগুলোর মধ্যে একটা ছিল হোবল। এটি কা'বা শরীফের মাঝামাঝি স্থানে ছিল। তায়েফের পথে নাখলা শামীয়া উপত্যকায় ছিল ওজ্জা নামক দেবতা। তায়েফে ছিল লাত নামক মূর্তি। সেটি ছিল মসজিদে ইবনে আব্বাসের কাছে 'মাগিবুস শামছ' নামক জায়গায়। লোহিত সাগরের তীরে, কাদীদ নামক স্থানে ছিল 'মানাত' নামক আরেকটি প্রসিদ্ধ মূর্তি। এমনকি, জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা কাবা শরীফ তওয়াফ করার সময় বলতঃ
وَاللَّاتُ وَالْعُزَّى - وَمَنَاةُ الثَّالِثَةُ الأُخْرَى - تِلْكَ الْغَرَانِيقُ الْعُلا . وَأَنَّ شَفَاعَتَهُنَّ لَتُرْتَجِى .
অর্থ : 'লাত, ওজ্জা ও ৩য় দেবতা মানাতের মত মহতী সুন্দরী দেবীর সুফারিশ কবুল হওয়ার আশা করা যায়।'
হোজাইল গোত্রের سواع 'সূয়া' নামক একটি মূর্তি ছিল। তারা এটির পূজা করত।
কা'বা শরীফে জাহেলিয়াতের লোকদের অনেকগুলো পাত্র ছিল। কোন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ হলে কিংবা কোন কাজ করার ইচ্ছা করলে, তারা সেগুলোতে 'হ্যাঁ, বা না সূচক বাণী লিখে, লটারীর মাধ্যমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। মূর্তিপ্রীতি তাদের মন মানসিকতায় পুরো বসে গিয়েছিল।
ঐতিহাসিকরা জাহেলিয়াতের যুগে আরবদের ধর্মীয় আচরণকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে ১حَلَّ ও حَمْسٌ 'হাল্লা' ও 'হাম্ম্স'। হাল্লা হচ্ছে, হারাম এলাকার বাইরের লোকদের পূজা অর্চনার পদ্ধতি সংক্রান্ত। আর হাম্স হচ্ছে, হারাম এলাকার বাসিন্দাদের পূজা-পার্বণ পদ্ধতি সংক্রান্ত। এই দলটি পূজা-পার্বনের ক্ষেত্রে চরমপন্থী বলে পরিচিত ছিল। কানানা, খোজাআ', আউস এবং খাযরাজ ইত্যাদি গোত্রসমূহ এই শেষোক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোরাইশরা এদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশী চরমপন্থী ছিল। এমনকি, তাদের কেউ হজ্ব কিংবা উমরাহ করার জন্য ইহরাম পরার পর, শত প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও পুনরায় নিজ ঘরে কিংবা বাগানে ফিরে যাওয়া পছন্দ করত না। তারা পেছনের দিকে ফিরে, নিজের পরিবারের লোকদের প্রতি তার প্রয়োজনীয় জিনিস দেয়ার আহবান জানাত। ইহরাম পরার পর তারা নিজেদের জন্য ঘি, দুধ, মাখন ও পশমী কাপড় পরিধান হারাম করে নিত।
হজ্জের সময় বহিরাগত হাজীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করত। কিন্তু মক্কার লোকেরা হারামের বাসিন্দা হিসেবে এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আরাফায় না গিয়ে নামেরায় অবস্থান করত এবং অন্যদের থেকে নিজেদেরকে পৃথক রাখত। তারা হারাম এলাকার বাইরের লোকদের জন্য তাদের আহমসী নামক কাপড় ক্রয় করা, ভাড়ায় নেয়া কিংবা ধার নেয়া ব্যতীত কা'বা শরীফের তওয়াফ করার অনুমতি দিত না। ঐ কাপড় সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে, বহিরাগত পুরুষদের জন্য দিনে এবং নারীদের জন্য রাত্রে উলঙ্গ তওয়াফ করার অনুমতি দিত। তারা মসজিদের বাইরে কাপড় খুলে আসত এবং সে কাপড় তাদের ফিরে আসার আগ পর্যন্ত কেউ স্পর্শ করত না। মক্কার কিছু সংখ্যক যুবক এই সুযোগের সদ্যবহার করত এবং তারা এ জাতীয় উলঙ্গ তওয়াফকারিণী মহিলার অপেক্ষায় থাকত। উলঙ্গ কোন তওয়াফকারিণী নারীকে দেখার পর পছন্দ হলে সেই যুবকটি নিজেও উলঙ্গ হয়ে, ঐ রমণীর সাথে তওয়াফ শুরু করে দিত। শেষ পর্যন্ত তাদের দুইজন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যেত। তাছাড়া, জাহেলিয়াতের যুগে অনেক নারী-পুরুষ কাবাশরীফে উলঙ্গ তওয়াফ করত। মহিলারা শুধু নিজের লজ্জাস্থানের উপর একটুকরো কাপড় বেঁধে রাখত। এছাড়াও, কোরাইশরা বহিরাগত লোকদের মক্কায় থাকা অবস্থায় সাথে নিয়ে আসা খাবার খাওয়ার অনুমতি দিত না। এর ফলে, বহিরাগত লোকদের মক্কার মেহমানখানা কিংবা বাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বাধ্য করা হত।
কোরাইশদের যুবতী মেয়েদেরকে বিয়ের বয়সে উপনীত হওয়ার পর ভাল করে সাজিয়ে-গুজিয়ে খোলাভাবে মাতাফে নিয়ে আসা হত এবং পরে ঘরে ফিরিয়ে নেয়া হত। বিয়ের আগ পর্যন্ত তাদের ঘরের বাইরে যেতে দেয়া হত না। এরপর যার সাথে বিয়ে হবে তার ঘর ছাড়া আর কোথাও যাওয়া তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। যুবতী মেয়েদেরকে হারাম শরীফে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হল, পাত্রদের সামনে পাত্রীকে পেশ করা। যেন তারা ভাল করে দেখতে পায় ও পরে বিয়ের পয়গাম পাঠায়। বিশেষ করে কাবা শরীফের পার্শ্বে পাত্রী দেখার মধ্যে অসদুদ্দেশ্য থাকতে পারে না। এটি একটি মহৎ ব্যবস্থা বলে তারা মনে করত।
তাদের তওয়াফের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন ধরনের। তারা তওয়াফের শুরুতে হাজারে আসওয়াদে চুমু খেত। তারপর কা'বা শরীফকে ডানে রেখে তওয়াফ শুরু করত। ৭ চক্কর তওয়াফ শেষে, হাজারে আসওয়াদকে চুমু দেয়ার পর 'নায়লা' মূর্তিতে চুমু খেত। তাদের তওয়াফ ছিল ইসলামের তওয়াফ থেকে ভিন্ন ধরনের। ইসলাম হাজারে আসওয়াদে চুমু খাওয়ার পর, কা'বা শরীফকে বামে রেখে তওয়াফের পদ্ধতি চালু করেছে।
জাহেলিয়াতের যুগে নারীদেরকে ঘৃণা ও অবমাননার চোখে দেখা হত। এজন্য তারা মেয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে অসন্তুষ্ট হত এবং তাদেরকে জীবন্ত কবর দিত। তাদের একজন মন্তব্যও করেছিল যে, دَفْنُ الْبَنَاتِ مِنَ الْمُكَرَّمَاتِ ‘মেয়েদেরকে দাফন করে দেয়া সম্মানের বিষয়।' অবশ্য তাদের মধ্যে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি এই ধারণার বিরোধী ছিলেন। এদের মধ্যে যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল আল কোরাইশী ৯৬টি মেয়েকে দাফনের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন।
কোরাইশরা জুতা পরে কা'বা শরীফে প্রবেশ করত। কিন্তু ওয়ালিদ বিন মুগীরা তাদেরকে জুতা খুলে কা'বা শরীফে প্রবেশ করার নির্দেশ দিল। ঋতুবতী মহিলারা কা'বা শরীফ ও মূর্তিগুলোকে স্পর্শ করত না। তারা এগুলো থেকে দূরে অবস্থান করত। কেউ নামায পড়তে চাইলে, কাবা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়ত এবং অবসরমত যতবার ইচ্ছা ততবার রুকু ও সেজদা করত। নামাযের রাকাত সংখ্যা ও রুকু-সেজদার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম-কানুন ছিল না।
কোরাইশদের মধ্যে মূর্তিপূজার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মমতও বিস্তার লাভ করেছিল। এর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে دَهْريّة 'দাহরিয়া' বা 'কালবাদ'। এই মতবাদ অনুযায়ী মানুষের ধ্বংসের জন্য 'যুগ' বা কালই একান্তভাবে দায়ী। এছাড়া গ্রহ-নক্ষত্র পূজাও তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই দলের মতে, মানুষের ভালমন্দের ব্যাপারে গ্রহনক্ষত্রের প্রভাবই প্রধানতঃ কার্যকর। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইহুদী ধর্ম এবং কেউ কেউ খৃস্টান ধর্মের কাছাকাছি মতবাদও পোষণ করত। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের ধর্মগুলোর প্রভাবে, কোরাইশদের মধ্যে এই সকল ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাদের যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ আসমানী কিতাবসমূহের অনুসরণ করেন তাঁরা হচ্ছেন ওয়ারাকা বিন নওফল, যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল, উমাইয়া বিন আলত, উমাইয়া বিন আওফ আল কানানী এবং হাশেম বিন আবদ মনাফ প্রমুখ। তাদের কেউ কেউ মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেন, এগুলো বর্জন করার জন্য লোকদের উপদেশ দেন এবং তারা পরকালের উত্থান ও বেহেশত-দোযখের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করতেন।
টিকাঃ
৩. তারীখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী, মক্কা।
কুসাই বিন কিলাবের সময় থেকেই মক্কায় মূর্তিপূজা চালু হয়। খোজাআ' গোত্রের শাসক আমর বিন লুহাই সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে অবস্থিত দুটো মূর্তির পূজা করার আদেশ দেন। কুসাইর আমলে মূর্তি দুটোকে সেখান থেকে সরিয়ে আনা হয়। একটিকে কা'বা শরীফের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং অপরটিকে যমযম কূপের, কাছে রাখা হয়। জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা মূর্তি দুটোর কাছে পশু জবেহ করত এবং সেগুলোর গায়ে হাত লাগিয়ে কল্যাণ কামনা করত। পরবর্তীতে মূর্তিপূজা চরম রূপ ধারণ করে। এমনকি মক্কাবাসীরা মূর্তির চতুর্দিকে তওয়াফ শুরু করে।
বেদুঈনরা মূর্তি কিনে ঘরে নিয়ে যেত এবং তার পূজা করত। কোরাইশদের এমন কোন ঘর বাকী ছিল না, যেখানে কমপক্ষে একটি মূর্তি ছিল না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এবং ঘরে প্রবেশের সময় তারা এর গায়ে হাত মুছে বরকত হাসিলের চেষ্টা করত। তাছাড়া কাবা শরীফের ভেতরে তাদের ৩৬০টি মূর্তি ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন পর্যন্ত কা'বা শরীফে ঐ মূর্তিগুলো মওজুদ ছিল। জাহেলিয়াতের প্রসিদ্ধ মূর্তিগুলোর মধ্যে একটা ছিল হোবল। এটি কা'বা শরীফের মাঝামাঝি স্থানে ছিল। তায়েফের পথে নাখলা শামীয়া উপত্যকায় ছিল ওজ্জা নামক দেবতা।
তায়েফে ছিল লাত নামক মূর্তি। সেটি ছিল মসজিদে ইবনে আব্বাসের কাছে 'মাগিবুস শামছ' নামক জায়গায়। লোহিত সাগরের তীরে, কাদীদ নামক স্থানে ছিল 'মানাত' নামক আরেকটি প্রসিদ্ধ মূর্তি। এমনকি, জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা কাবা শরীফ তওয়াফ করার সময় বলতঃ
وَاللَّاتُ وَالْعُزَّى - وَمَنَاةُ الثَّالِثَةُ الأُخْرَى - تِلْكَ الْغَرَانِيقُ الْعُلا . وَأَنَّ شَفَاعَتَهُنَّ لَتُرْتَجِى .
অর্থ : 'লাত, ওজ্জা ও ৩য় দেবতা মানাতের মত মহতী সুন্দরী দেবীর সুফারিশ কবুল হওয়ার আশা করা যায়।'
হোজাইল গোত্রের سواع 'সূয়া' নামক একটি মূর্তি ছিল। তারা এটির পূজা করত। কা'বা শরীফে জাহেলিয়াতের লোকদের অনেকগুলো পাত্র ছিল। কোন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ হলে কিংবা কোন কাজ করার ইচ্ছা করলে, তারা সেগুলোতে 'হ্যাঁ, বা না সূচক বাণী লিখে, লটারীর মাধ্যমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। মূর্তিপ্রীতি তাদের মন মানসিকতায় পুরো বসে গিয়েছিল।
ঐতিহাসিকরা জাহেলিয়াতের যুগে আরবদের ধর্মীয় আচরণকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে ১حَلَّ ও حَمْسٌ 'হাল্লা' ও 'হাম্ম্স'। হাল্লা হচ্ছে, হারাম এলাকার বাইরের লোকদের পূজা অর্চনার পদ্ধতি সংক্রান্ত। আর হাম্স হচ্ছে, হারাম এলাকার বাসিন্দাদের পূজা-পার্বণ পদ্ধতি সংক্রান্ত। এই দলটি পূজা-পার্বনের ক্ষেত্রে চরমপন্থী বলে পরিচিত ছিল। কানানা, খোজাআ', আউস এবং খাযরাজ ইত্যাদি গোত্রসমূহ এই শেষোক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোরাইশরা এদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশী চরমপন্থী ছিল। এমনকি, তাদের কেউ হজ্ব কিংবা উমরাহ করার জন্য ইহরাম পরার পর, শত প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও পুনরায় নিজ ঘরে কিংবা বাগানে ফিরে যাওয়া পছন্দ করত না। তারা পেছনের দিকে ফিরে, নিজের পরিবারের লোকদের প্রতি তার প্রয়োজনীয় জিনিস দেয়ার আহবান জানাত। ইহরাম পরার পর তারা নিজেদের জন্য ঘি, দুধ, মাখন ও পশমী কাপড় পরিধান হারাম করে নিত।
হজ্জের সময় বহিরাগত হাজীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করত। কিন্তু মক্কার লোকেরা হারামের বাসিন্দা হিসেবে এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আরাফায় না গিয়ে নামেরায় অবস্থান করত এবং অন্যদের থেকে নিজেদেরকে পৃথক রাখত। তারা হারাম এলাকার বাইরের লোকদের জন্য তাদের আহমসী নামক কাপড় ক্রয় করা, ভাড়ায় নেয়া কিংবা ধার নেয়া ব্যতীত কা'বা শরীফের তওয়াফ করার অনুমতি দিত না। ঐ কাপড় সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে, বহিরাগত পুরুষদের জন্য দিনে এবং নারীদের জন্য রাত্রে উলঙ্গ তওয়াফ করার অনুমতি দিত। তারা মসজিদের বাইরে কাপড় খুলে আসত এবং সে কাপড় তাদের ফিরে আসার আগ পর্যন্ত কেউ স্পর্শ করত না। মক্কার কিছু সংখ্যক যুবক এই সুযোগের সদ্যবহার করত এবং তারা এ জাতীয় উলঙ্গ তওয়াফকারিণী মহিলার অপেক্ষায় থাকত। উলঙ্গ কোন তওয়াফকারিণী নারীকে দেখার পর পছন্দ হলে সেই যুবকটি নিজেও উলঙ্গ হয়ে, ঐ রমণীর সাথে তওয়াফ শুরু করে দিত। শেষ পর্যন্ত তাদের দুইজন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যেত। তাছাড়া, জাহেলিয়াতের যুগে অনেক নারী-পুরুষ কাবাশরীফে উলঙ্গ তওয়াফ করত। মহিলারা শুধু নিজের লজ্জাস্থানের উপর একটুকরো কাপড় বেঁধে রাখত। এছাড়াও, কোরাইশরা বহিরাগত লোকদের মক্কায় থাকা অবস্থায় সাথে নিয়ে আসা খাবার খাওয়ার অনুমতি দিত না। এর ফলে, বহিরাগত লোকদের মক্কার মেহমানখানা কিংবা বাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বাধ্য করা হত।
কোরাইশদের যুবতী মেয়েদেরকে বিয়ের বয়সে উপনীত হওয়ার পর ভাল করে সাজিয়ে-গুজিয়ে খোলাভাবে মাতাফে নিয়ে আসা হত এবং পরে ঘরে ফিরিয়ে নেয়া হত। বিয়ের আগ পর্যন্ত তাদের ঘরের বাইরে যেতে দেয়া হত না। এরপর যার সাথে বিয়ে হবে তার ঘর ছাড়া আর কোথাও যাওয়া তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। যুবতী মেয়েদেরকে হারাম শরীফে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হল, পাত্রদের সামনে পাত্রীকে পেশ করা। যেন তারা ভাল করে দেখতে পায় ও পরে বিয়ের পয়গাম পাঠায়। বিশেষ করে কাবা শরীফের পার্শ্বে পাত্রী দেখার মধ্যে অসদুদ্দেশ্য থাকতে পারে না। এটি একটি মহৎ ব্যবস্থা বলে তারা মনে করত।
তাদের তওয়াফের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন ধরনের। তারা তওয়াফের শুরুতে হাজারে আসওয়াদে চুমু খেত। তারপর কা'বা শরীফকে ডানে রেখে তওয়াফ শুরু করত। ৭ চক্কর তওয়াফ শেষে, হাজারে আসওয়াদকে চুমু দেয়ার পর 'নায়লা' মূর্তিতে চুমু খেত। তাদের তওয়াফ ছিল ইসলামের তওয়াফ থেকে ভিন্ন ধরনের। ইসলাম হাজারে আসওয়াদে চুমু খাওয়ার পর, কা'বা শরীফকে বামে রেখে তওয়াফের পদ্ধতি চালু করেছে।
জাহেলিয়াতের যুগে নারীদেরকে ঘৃণা ও অবমাননার চোখে দেখা হত। এজন্য তারা মেয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে অসন্তুষ্ট হত এবং তাদেরকে জীবন্ত কবর দিত। তাদের একজন মন্তব্যও করেছিল যে, دَفْنُ الْبَنَاتِ مِنَ الْمُكَرَّمَاتِ ‘মেয়েদেরকে দাফন করে দেয়া সম্মানের বিষয়।' অবশ্য তাদের মধ্যে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি এই ধারণার বিরোধী ছিলেন। এদের মধ্যে যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল আল কোরাইশী ৯৬টি মেয়েকে দাফনের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন।
কোরাইশরা জুতা পরে কা'বা শরীফে প্রবেশ করত। কিন্তু ওয়ালিদ বিন মুগীরা তাদেরকে জুতা খুলে কা'বা শরীফে প্রবেশ করার নির্দেশ দিল। ঋতুবতী মহিলারা কা'বা শরীফ ও মূর্তিগুলোকে স্পর্শ করত না। তারা এগুলো থেকে দূরে অবস্থান করত। কেউ নামায পড়তে চাইলে, কাবা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়ত এবং অবসরমত যতবার ইচ্ছা ততবার রুকু ও সেজদা করত। নামাযের রাকাত সংখ্যা ও রুকু-সেজদার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম-কানুন ছিল না।
কোরাইশদের মধ্যে মূর্তিপূজার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মমতও বিস্তার লাভ করেছিল। এর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে دَهْريّة 'দাহরিয়া' বা 'কালবাদ'। এই মতবাদ অনুযায়ী মানুষের ধ্বংসের জন্য 'যুগ' বা কালই একান্তভাবে দায়ী। এছাড়া গ্রহ-নক্ষত্র পূজাও তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই দলের মতে, মানুষের ভালমন্দের ব্যাপারে গ্রহনক্ষত্রের প্রভাবই প্রধানতঃ কার্যকর। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইহুদী ধর্ম এবং কেউ কেউ খৃস্টান ধর্মের কাছাকাছি মতবাদও পোষণ করত। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের ধর্মগুলোর প্রভাবে, কোরাইশদের মধ্যে এই সকল ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাদের যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ আসমানী কিতাবসমূহের অনুসরণ করেন তাঁরা হচ্ছেন ওয়ারাকা বিন নওফল, যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল, উমাইয়া বিন আলত, উমাইয়া বিন আওফ আল কানানী এবং হাশেম বিন আবদ মনাফ প্রমুখ। তাদের কেউ কেউ মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেন, এগুলো বর্জন করার জন্য লোকদের উপদেশ দেন এবং তারা পরকালের উত্থান ও বেহেশত-দোযখের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করতেন।
📄 কোরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্য
জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অনেক বেশী। মক্কায় কাপড় ও খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসা জমজমাট ছিল। মক্কার দক্ষিণ ও উত্তরে অবস্থিত দেশসমূহের বাণিজ্যিক বিনিময়ের জন্য মক্কা ছিল বিরাট স্ট্রাটেজিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ব্যবসায়ীরা উত্তরে সিরিয়া ও দক্ষিণে ইয়েমেনে যাওয়ার জন্য মক্কায় এসে ভিড় জমাত।
অপরদিকে ইয়েমেন হয়ে আফ্রিকান দ্রব্য ও মালামাল আমদানি হত বিশেষ করে মক্কায় আফ্রিকার নিগ্রো দাস, আঠা এবং হাতীর দাঁত সহ বিভিন্ন দ্রব্যাদির বিরাট চাহিদা ছিল। মক্কার ব্যবসায়ীরা ইয়েমেনের চামড়া, সুগন্ধজাত দ্রব্য ও প্রখ্যাত ইয়েমেনী কাপড় ক্রয় করত। অপরদিকে তারা ইরাক হতে ভারতীয় মশলা সংগ্রহ করত। মিসর ও সিরিয়া থেকে তেল, আটা, অস্ত্র, সিল্ক ও মদ আমদানী করত।
এভাবে মক্কা বিরাট বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং কোরাইশরাও বড় ধরনের ব্যবসায়ীতে পরিণত হল। ব্যবসা বাণিজ্যে তারা বড় অভিজ্ঞ হয়ে উঠল এবং তাদের ব্যবসার পুঁজি অনেক বেড়ে গেল। হিজরী ২য় সালে বদর যুদ্ধের সময় তাদের ব্যবসায়ী কাফেলার মূলধন ৫০ হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও এক হাজার উট পর্যন্ত পৌঁছুল। এক সময় আড়াই হাজার উট ব্যবসায়ী কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তদানীন্তন সময়ে ঐ পরিমাণ উট ও ব্যবসার মূলধন বিরাট ব্যাপার ছিল। এর ফলে, কোরাইশরা ধনী হয়ে গেল। এই জন্যই তারা বদর যুদ্ধের প্রতিটি কাফের যুদ্ধবন্দীকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছ থেকে ১ হাজার হতে ৪ হাজার দিরহামের বিনিময়ে মুক্ত করতে পেরেছে। তবে রাসূলুল্লাহ (সা) যাদেরকে মাফ করে দিয়েছিলেন, তাদের কথা ভিন্ন।
তদানীন্তন সময়ে মক্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রাবিনিময় বাজার হিসেবে গড়ে উঠে। যে কোন দেশের ব্যবসায়ীরা যত বেশী পরিমাণ সম্পদই ক্রয় করতে চাইতো মক্কার 'ব্যবসায়ীরা তাদের সাথে আধুনিক যুগের ব্যাংকের মত লেনদেনের কাজ করত। তারা অনেক বেশী সুদ দাবী করত। এর ফলে তাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আরো বৃদ্ধি পেল। কোরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্যের এই সুযোগ সুবিধার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহ সূরা কোরাইশে বলেছেন,
لِإِيْلَفِ قُرَيْشٍۙ - إِيْۦلٰفِهِمْ رِحْلَةَ الشِّتَآءِ وَالصَّيْفِۚ فَلْيَعْبُدُوْا رَبَّ هٰذَا الْبَيْتِۙ الَّذِيْٓ أَطْعَمَهُمْ مِّنْ جُوْعٍ وَّاٰمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ -
অর্থ: 'যেহেতু কোরাইশরা অভ্যস্ত হয়েছে শীতকাল ও গরম কালের বিদেশযাত্রায়, কাজেই তাদের কর্তব্য হল এই কাবাঘরের প্রতিপালকের এবাদত করা, যিনি তাদেরকে ক্ষুধা হতে রক্ষা করে খাদ্য যুগিয়েছেন এবং ভয় ভীতি হতে বাঁচিয়ে নিরাপত্তা দান করেছেন।' এই সূরায় কোরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যিক সফরের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন, তাদেরকে আমি এই যে বিরাট নেয়ামত দান করেছি, শুকরিয়া স্বরূপ তাদের উচিত হল মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আমার এবাদত করা।
টিকাঃ
৪. প্রাগুক্ত।
৫. প্রাগুক্ত।
জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অনেক বেশী। মক্কায় কাপড় ও খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসা জমজমাট ছিল। মক্কার দক্ষিণ ও উত্তরে অবস্থিত দেশসমূহের বাণিজ্যিক বিনিময়ের জন্য মক্কা ছিল বিরাট স্ট্রাটেজিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ব্যবসায়ীরা উত্তরে সিরিয়া ও দক্ষিণে ইয়েমেনে যাওয়ার জন্য মক্কায় এসে ভিড় জমাত।
অপরদিকে ইয়েমেন হয়ে আফ্রিকান দ্রব্য ও মালামাল আমদানি হত বিশেষ করে মক্কায় আফ্রিকার নিগ্রো দাস, আঠা এবং হাতীর দাঁত সহ বিভিন্ন দ্রব্যাদির বিরাট চাহিদা ছিল। মক্কার ব্যবসায়ীরা ইয়েমেনের চামড়া, সুগন্ধজাত দ্রব্য ও প্রখ্যাত ইয়েমেনী কাপড় ক্রয় করত। অপরদিকে তারা ইরাক হতে ভারতীয় মশলা সংগ্রহ করত। মিসর ও সিরিয়া থেকে তেল, আটা, অস্ত্র, সিল্ক ও মদ আমদানী করত।
এভাবে মক্কা বিরাট বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং কোরাইশরাও বড় ধরনের ব্যবসায়ীতে পরিণত হল। ব্যবসা বাণিজ্যে তারা বড় অভিজ্ঞ হয়ে উঠল এবং তাদের ব্যবসার পুঁজি অনেক বেড়ে গেল। হিজরী ২য় সালে বদর যুদ্ধের সময় তাদের ব্যবসায়ী কাফেলার মূলধন ৫০ হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও এক হাজার উট পর্যন্ত পৌঁছুল। এক সময় আড়াই হাজার উট ব্যবসায়ী কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তদানীন্তন সময়ে ঐ পরিমাণ উট ও ব্যবসার মূলধন বিরাট ব্যাপার ছিল। এর ফলে, কোরাইশরা ধনী হয়ে গেল। এই জন্যই তারা বদর যুদ্ধের প্রতিটি কাফের যুদ্ধবন্দীকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছ থেকে ১ হাজার হতে ৪ হাজার দিরহামের বিনিময়ে মুক্ত করতে পেরেছে। তবে রাসূলুল্লাহ (সা) যাদেরকে মাফ করে দিয়েছিলেন, তাদের কথা ভিন্ন।
তদানীন্তন সময়ে মক্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রাবিনিময় বাজার হিসেবে গড়ে উঠে। যে কোন দেশের ব্যবসায়ীরা যত বেশী পরিমাণ সম্পদই ক্রয় করতে চাইতো মক্কার 'ব্যবসায়ীরা তাদের সাথে আধুনিক যুগের ব্যাংকের মত লেনদেনের কাজ করত। তারা অনেক বেশী সুদ দাবী করত। এর ফলে তাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আরো বৃদ্ধি পেল। কোরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্যের এই সুযোগ সুবিধার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহ সূরা কোরাইশে বলেছেন,
لِإِيْلَفِ قُرَيْشٍۙ - إِيْۦلٰفِهِمْ رِحْلَةَ الشِّتَآءِ وَالصَّيْفِۚ فَلْيَعْبُدُوْا رَبَّ هٰذَا الْبَيْتِۙ الَّذِيْٓ أَطْعَمَهُمْ مِّنْ جُوْعٍ وَّاٰمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ -
অর্থ: 'যেহেতু কোরাইশরা অভ্যস্ত হয়েছে শীতকাল ও গরম কালের বিদেশযাত্রায়, কাজেই তাদের কর্তব্য হল এই কাবাঘরের প্রতিপালকের এবাদত করা, যিনি তাদেরকে ক্ষুধা হতে রক্ষা করে খাদ্য যুগিয়েছেন এবং ভয় ভীতি হতে বাঁচিয়ে নিরাপত্তা দান করেছেন।' এই সূরায় কোরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যিক সফরের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন, তাদেরকে আমি এই যে বিরাট নেয়ামত দান করেছি, শুকরিয়া স্বরূপ তাদের উচিত হল মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আমার এবাদত করা।
টিকাঃ
৪. প্রাগুক্ত।
৫. প্রাগুক্ত।
জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অনেক বেশী। মক্কায় কাপড় ও খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসা জমজমাট ছিল। মক্কার দক্ষিণ ও উত্তরে অবস্থিত দেশসমূহের বাণিজ্যিক বিনিময়ের জন্য মক্কা ছিল বিরাট স্ট্রাটেজিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ব্যবসায়ীরা উত্তরে সিরিয়া ও দক্ষিণে ইয়েমেনে যাওয়ার জন্য মক্কায় এসে ভিড় জমাত।
অপরদিকে ইয়েমেন হয়ে আফ্রিকান দ্রব্য ও মালামাল আমদানি হত বিশেষ করে মক্কায় আফ্রিকার নিগ্রো দাস, আঠা এবং হাতীর দাঁত সহ বিভিন্ন দ্রব্যাদির বিরাট চাহিদা ছিল। মক্কার ব্যবসায়ীরা ইয়েমেনের চামড়া, সুগন্ধজাত দ্রব্য ও প্রখ্যাত ইয়েমেনী কাপড় ক্রয় করত। অপরদিকে তারা ইরাক হতে ভারতীয় মশলা সংগ্রহ করত। মিসর ও সিরিয়া থেকে তেল, আটা, অস্ত্র, সিল্ক ও মদ আমদানী করত।
এভাবে মক্কা বিরাট বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং কোরাইশরাও বড় ধরনের ব্যবসায়ীতে পরিণত হল। ব্যবসা বাণিজ্যে তারা বড় অভিজ্ঞ হয়ে উঠল এবং তাদের ব্যবসার পুঁজি অনেক বেড়ে গেল। হিজরী ২য় সালে বদর যুদ্ধের সময় তাদের ব্যবসায়ী কাফেলার মূলধন ৫০ হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও এক হাজার উট পর্যন্ত পৌঁছুল। এক সময় আড়াই হাজার উট ব্যবসায়ী কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তদানীন্তন সময়ে ঐ পরিমাণ উট ও ব্যবসার মূলধন বিরাট ব্যাপার ছিল। এর ফলে, কোরাইশরা ধনী হয়ে গেল। এই জন্যই তারা বদর যুদ্ধের প্রতিটি কাফের যুদ্ধবন্দীকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছ থেকে ১ হাজার হতে ৪ হাজার দিরহামের বিনিময়ে মুক্ত করতে পেরেছে। তবে রাসূলুল্লাহ (সা) যাদেরকে মাফ করে দিয়েছিলেন, তাদের কথা ভিন্ন।
তদানীন্তন সময়ে মক্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রাবিনিময় বাজার হিসেবে গড়ে উঠে। যে কোন দেশের ব্যবসায়ীরা যত বেশী পরিমাণ সম্পদই ক্রয় করতে চাইতো মক্কার 'ব্যবসায়ীরা তাদের সাথে আধুনিক যুগের ব্যাংকের মত লেনদেনের কাজ করত। তারা অনেক বেশী সুদ দাবী করত। এর ফলে তাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আরো বৃদ্ধি পেল। কোরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্যের এই সুযোগ সুবিধার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহ সূরা কোরাইশে বলেছেন,
لِإِيْلَفِ قُرَيْشٍۙ - إِيْۦلٰفِهِمْ رِحْلَةَ الشِّتَآءِ وَالصَّيْفِۚ فَلْيَعْبُدُوْا رَبَّ هٰذَا الْبَيْتِۙ الَّذِيْٓ أَطْعَمَهُمْ مِّنْ جُوْعٍ وَّاٰمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ -
অর্থ: 'যেহেতু কোরাইশরা অভ্যস্ত হয়েছে শীতকাল ও গরম কালের বিদেশযাত্রায়, কাজেই তাদের কর্তব্য হল এই কাবাঘরের প্রতিপালকের এবাদত করা, যিনি তাদেরকে ক্ষুধা হতে রক্ষা করে খাদ্য যুগিয়েছেন এবং ভয় ভীতি হতে বাঁচিয়ে নিরাপত্তা দান করেছেন।' এই সূরায় কোরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যিক সফরের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন, তাদেরকে আমি এই যে বিরাট নেয়ামত দান করেছি, শুকরিয়া স্বরূপ তাদের উচিত হল মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আমার এবাদত করা।
টিকাঃ
৪. প্রাগুক্ত।
📄 কোরাইশ আমলে মক্কার সাহিত্য চর্চা
আইয়ামে জাহিলিয়াতের সময় কোরাইশ ও আরব উপদ্বীপের অন্যান্য গোত্রগুলোর মধ্যে আরবী সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা হয়। সে সময় আরবী সাহিত্যের মান সবচাইতে বেশী উন্নত ছিল। জাহেলিয়াতের আরবী সাহিত্য আজকের এ যুগেও সাহিত্য পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় আরবী কাব্যের চর্চা বেশী হত। এগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা হত। তবে আরবদের স্মরণ শক্তি বেশী ছিল। কোন কিছু লিখে না রাখলেও তারা অনেক কিছু মুখস্থ বলতে পারত। তারা বিভিন্ন গোত্রের গর্ব, অহংকার ও প্রশংসার উপরে শত শত কবিতা লিখত। বিভিন্ন গোত্র এ উদ্দেশ্যে কবি তৈরি করত ও তাদেরকে যথেষ্ট সম্মান দিত। কেননা তাদের মাধ্যমেই এক গোত্র আরেক গোত্রের উপর প্রাধান্য ও সম্মান পেত। যেই বংশের কবি যত শ্রেষ্ঠ সেই বংশের মর্যাদা তত বেশী। এজন্য জাহেলিয়াতের অনেক আরবী কবির নাম ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
কবিতা চর্চা তথা কবিতা প্রতিযোগিতার প্রধান স্থান ছিল বিভিন্ন মৌসুমী বাজার ও মেলাসমূহ। এর মধ্যে ওকাজ বাজার ছিল সবচাইতে সেরা। বর্তমান যুগে সেই ওকাজ বাজারের স্থান নির্ধারণের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তবে مُعْجَمُ البلدان (নগর অভিধান) এর লেখক এ প্রসংগে যা উল্লেখ করেছেন তাই বেশী যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। তিনি বলেছেন, ওকাজ এমন এক উপত্যকায় অবস্থিত যেখান থেকে তায়েফের দূরত্ব এক রাতের এবং মক্কার দূরত্ব তিন রাতের। সেখানে বড় বড় কিছু পাথর ছিল। তারা সেগুলোর তওয়াফ করত। এই বর্ণনার প্রেক্ষিতে ذاتُ الْقَرْن 'জাতুল কান্'ই ঐ জায়গা বলে মনে হয়। এর বর্তমান নাম হচ্ছে سيل الكبير (সায়লুল কবীর)। এটি পুরাতন তায়েফ রোডে অবস্থিত।
এটি হাজীদের মীকাতও বটে। সেখান থেকে তায়েফের দূরত্ব কম এবং মক্কার দূরত্ব তায়েফের দূরত্বের তিনগুণ। সেখানে এখন পর্যন্ত কতগুলো বড় বড় পাথর রয়েছে। এটি একটি বড় উপত্যকা। আরব কাফেলাসমূহের বেশী সংকুলানের জন্য এটাই ছিল উপযোগী স্থান। দ্বিতীয় স্থানটি ছিল মাজান্না বাজার। বর্তমান মক্কা ও জেদ্দার মাঝখানে অবস্থিত বাহরাহ শহরটিই পূর্বের মাজান্না বাজার বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মত। এটি মক্কার নিকটে অবস্থিত। ৩য় স্থানটি জুল মাজায। এটি আরাফাত থেকে উত্তর দিকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মক্কা থেকে হোনায়েন হয়ে তায়েফ যাওয়ার সময় হাতের ডানে পড়ে। সেখানে এখন পর্যন্ত সেই যুগের অনেক নির্দশন বিদ্যমান রয়েছে।
আরবের বিভিন্ন জায়গা থেকে জিলকদ মাসের শেষ ১০ তারিখে কাফেলাগুলো ওকাজ বাজারে এসে জড় হত। ওকাজ বাজারের মেলা শেষে তারা 'জুল মাজান্না' বাজারের মেলায় যোগ দিত। হজ্জ মওসুমের সর্বশেষ মেলা ছিল 'জুল মাজাযে'। জিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখে সেখানে মেলা বসত। পরে তারা মক্কা, মিনা ও দাওমাতুল জানদালের বাজারে যেত। কিন্তু ওকাজের মত আর কোন মেলায় এত বেশী সাহিত্য চর্চা জমে উঠতনা। এটিই ছিল সাহিত্য চর্চার সেরা মেলা।
আল্লামা তকিউদ্দীন আলফাসী তাঁর شفاء الغرام 'শেফাউল গারাম' বইতে লিখেছেন যে, হিজরী ১২৯ সাল পর্যন্ত ওকাজ মেলা চালু ছিল। ১২৯ হিঃ সনে মক্কায় মোখতারের বিপ্লবের কারণে আরবরা ভয়ে ওকাজ বাজার ত্যাগ করে, যা আজ পর্যন্ত আর কোনদিন জমে উঠেনি। ক্রমান্বয়ে তারা মাজান্না ও জুলমাজায বাজারের মেলাও ত্যাগ করে এবং পরবর্তীতে শুধু মক্কা, মিনা ও আরাফাতের বাজারে নিজেদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখে।
📄 কোরাইশ আমলে মক্কার বিজ্ঞান চর্চা
কোরাইশরা গ্রহ-নক্ষত্রের গতি-প্রকৃতির উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করত। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছে লোকেরা যেত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করত। আবহাওয়া বিজ্ঞানেও তাদের যথেষ্ট পারদর্শিতা ছিল। বিভিন্ন উপত্যকায় তারা বৃষ্টির স্থান নির্ধারণ করতে পারত এবং সাথে সাথে বাতাসের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণেও তাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল। লোহিত সাগরে নৌঅভিযানে তাদের সার্থক অভিজ্ঞতা ছিল। আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের সাহায্যে তারা নিজেদের বন্দর থেকে সামুদ্রিক পথে দূরবর্তী বন্দরসমূহে সফর করত। লোহিত সাগর থেকে তারা সুদূর ভারত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছে যেত। চিকিৎসা শাস্ত্রেও তারা পিছিয়ে ছিল না। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যাবলী সম্পর্কে তাদের ভাল ধারণা ছিল। একই সাথে তারা বিভিন্ন গাছ-গাছড়ার উপকারিতা এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও ওয়াকিফহাল ছিল। তারা শিঙ্গা লাগানোসহ বিভিন্ন সার্জারী পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসা করত। এই সমস্ত বিষয়ে বড় বড় হেকিম ছিল। তাদের মধ্যে হারেস বিন কালদাহ আসসাকাফি ছিলেন অন্যতম হেকিম। তিনি হযরত মুয়াবিয়া (রা) এর শাসনকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, ঐ সময় পর্যন্ত অন্যান্য চিকিৎসকরা তাঁকে গুরুর মর্যাদা দিত। এখন পর্যন্ত গ্রামীণ এলাকার বেদুঈনরা আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির পরিবর্তে ঐ প্রাচীন পদ্ধতির অনুসরণে বিভিন্ন গাছ গাছড়ার তৈরি ওষুধ, শিঙ্গা ও দাগ লাগানোর পদ্ধতি ব্যবহার করে।
তারা আল কিয়াফাহ বা 'পদচিহ্ন বিজ্ঞানে' অদ্বিতীয় ছিল। ভেগে যাওয়া মানুষ ও পশুর পদচিহ্ন দেখে, অন্যান্য অগণিত চিহ্নগুলোর মধ্য থেকে তারা সঠিকভাবে সেগুলোর গন্তব্যস্থান বের করতে সক্ষম হত। দুই হাজার বছর পর আজ পর্যন্তও ঐ জ্ঞান বিদ্যমান রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তা পড়ানো হচ্ছে। এই একই বিজ্ঞানের মাধ্যমে তারা মরুভূমিতে পানির অস্তিত্ব বুঝতে পারত এবং কূপ খুঁড়ে পানি আবিষ্কার করে সেখানে বাস করত। মক্কার বিভিন্ন জায়গায় তখন তারা অগণিত কূপ খনন করে পানি বের করেছিল।
তারা كَهَانَهُ কাহানা' ও عَیَافَةً 'এয়াফাহ' বিজ্ঞানেও পারদর্শী ছিল। তারা গ্রহ-নক্ষত্র ও তারকার প্রভাবের ভিত্তিতে ভবিষ্যদ্বাণী কিংবা অতীতের কোন অজানা খবর বলত। সাধারণ মানুষ ঐ সকল গণকদের দ্বারা অনেক প্রতারিত হয়েছে। ইসলাম এসে এগুলোকে হারাম ঘোষণা করেছে। কোরাইশরা বংশ জ্ঞানের ব্যাপারে বিশেষ স্মরণশক্তির দাবীদার, তারা আরবের বিভিন্ন গোত্রের পুরো বংশ তালিকা স্মরণ রাখতে পারত। এ ছাড়াও বাণিজ্য উপলক্ষে বিদেশে ভ্রমণের কাহিনী বংশ পরম্পরায় চলে আসত। পরবর্তীতে ঐ সকল বর্ণনা ইতিহাসের মর্যাদা লাভ করে। তারা ঘোড়-দৌড় এবং শরীর চর্চা বিজ্ঞানেও যথেষ্ট অগ্রসর ছিল।
টিকাঃ
৬. প্রাগুক্ত।