📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মক্কায় কোরাইশ শাসনের সূচনা

📄 মক্কায় কোরাইশ শাসনের সূচনা


খোজাআ' গোত্রের শাসক আমর বিন লুহাই, কা'বা শরীফে মূর্তিপূজা শুরু করার পর, মক্কায় একেশ্বরবাদী ধর্মকর্মের সমাপ্তি ঘটে এবং এটি একটি ব্রাহ্মণ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে কুসাই বিন কিলাবের হাতে মক্কার শাসনভার আসে। তিনিই কোরাইশ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কোরাইশদেরকে একত্রিত ও সংগঠিত করেন। আরবীতে 'কারশ' শব্দের অর্থ হচ্ছে 'একত্রিত করা'। কুসাই বিন কিলাবের মৃত্যুর পর তার বংশধর কোরাইশরা মক্কার শাসন ক্ষমতা নিয়ে ঝগড়া-সংঘর্ষ করে। ৫০০ খৃস্টাব্দে মক্কায় কোরাইশ শাসন শুরু হয় এবং ৬৩১ খৃষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাতে কোরাইশের জাহেলী শাসনের সমাপ্তি ঘটে।

পরবর্তীতে কোরাইশ নেতা আবদুল মুত্তালিবের হাতে মক্কার শাসন ক্ষমতা অর্পিত হয়। তিনি কোরাইশ শাসকদের মধ্যে সবচাইতে বেশী সম্মান ও সুখ্যাতি অর্জন করেন। আবদুল মুত্তালিব হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সা) এর দাদা।

খোজাআ' গোত্রের শাসক আমর বিন লুহাই, কা'বা শরীফে মূর্তিপূজা শুরু করার পর, মক্কায় একেশ্বরবাদী ধর্মকর্মের সমাপ্তি ঘটে এবং এটি একটি ব্রাহ্মণ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে কুসাই বিন কিলাবের হাতে মক্কার শাসনভার আসে। তিনিই কোরাইশ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কোরাইশদেরকে একত্রিত ও সংগঠিত করেন। আরবীতে 'কারশ' শব্দের অর্থ হচ্ছে 'একত্রিত করা'। কুসাই বিন কিলাবের মৃত্যুর পর তার বংশধর কোরাইশরা মক্কার শাসন ক্ষমতা নিয়ে ঝগড়া-সংঘর্ষ করে। ৫০০ খৃস্টাব্দে মক্কায় কোরাইশ শাসন শুরু হয় এবং ৬৩১ খৃষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাতে কোরাইশের জাহেলী শাসনের সমাপ্তি ঘটে।

পরবর্তীতে কোরাইশ নেতা আবদুল মুত্তালিবের হাতে মক্কার শাসন ক্ষমতা অর্পিত হয়। তিনি কোরাইশ শাসকদের মধ্যে সবচাইতে বেশী সম্মান ও সুখ্যাতি অর্জন করেন। আবদুল মুত্তালিব হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সা) এর দাদা।

খোজাআ' গোত্রের শাসক আমর বিন লুহাই, কা'বা শরীফে মূর্তিপূজা শুরু করার পর, মক্কায় একেশ্বরবাদী ধর্মকর্মের সমাপ্তি ঘটে এবং এটি একটি ব্রাহ্মণ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে কুসাই বিন কিলাবের হাতে মক্কার শাসনভার আসে। তিনিই কোরাইশ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কোরাইশদেরকে একত্রিত ও সংগঠিত করেন। আরবীতে 'কারশ' শব্দের অর্থ হচ্ছে 'একত্রিত করা'। কুসাই বিন কিলাবের মৃত্যুর পর তার বংশধর কোরাইশরা মক্কার শাসন ক্ষমতা নিয়ে ঝগড়া-সংঘর্ষ করে। ৫০০ খৃস্টাব্দে মক্কায় কোরাইশ শাসন শুরু হয় এবং ৬৩১ খৃষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাতে কোরাইশের জাহেলী শাসনের সমাপ্তি ঘটে।

পরবর্তীতে কোরাইশ নেতা আবদুল মুত্তালিবের হাতে মক্কার শাসন ক্ষমতা অর্পিত হয়। তিনি কোরাইশ শাসকদের মধ্যে সবচাইতে বেশী সম্মান ও সুখ্যাতি অর্জন করেন। আবদুল মুত্তালিব হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সা) এর দাদা।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মক্কায় কোরাইশদের প্রশাসনিক কাঠামো

📄 মক্কায় কোরাইশদের প্রশাসনিক কাঠামো


আজকের মত, পূর্বে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো এত সুবিন্যস্ত ছিল না। তাই জাহেলিয়াতের যুগে কোরাইশদের প্রশাসনিক কাঠামোও সাদা-সিধে ছিল। তাদের সমাজ ছিল গোত্র ভিত্তিক। তারা মক্কার একটি নগররাষ্ট্র বাস করত।

বনি কানানা গোত্রের কুসাই বিন কিলাব একই সাথে মক্কার শাসনভার, হাজীদের সেবা, পানি পান করানো, খাওয়ানো এবং সম্মেলন করাসহ সকল কিছুর দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি কোরাইশদেরকে মক্কায় একত্রিত করেন বলে তাকে কোরাইশ বংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। এর আগে কোরাইশরা আরব দেশের সর্বত্র বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত ছিল। তিনিই তাদেরকে মক্কায় একত্রিত করেন। তখন থেকে কোরাইশরা মক্কায় বসবাস শুরু করে। ঐ বছরই কোরাইশরা 'কোরাইশ' নাম ধারণ করে। এর আগে, কোরাইশ নামে কেউ পরিচিত ছিল না। কোন কোন আরব অঞ্চলে تَقَرَّشُ শব্দের অর্থ হচ্ছে تَجَمَّعَ বা একত্রিত হওয়া . تَقَرُّش. শব্দ থেকেই মূল কোরাইশ শব্দের উৎপত্তি।

কুসাই তাঁর গোত্রের লোকদের ধারণা থেকে আরো বেশী বাস্তবধর্মী ছিলেন। তিনি মক্কায় ক্ষমতা লাভ করার পর কোরাইশদের শলা-পরামর্শের জন্য দারুন-নাদওয়া প্রতিষ্ঠা করেন এবং ৪০ বছরের কম বয়স্ক কোন কোরাইশীর জন্য এতে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তাও আবার যে সমস্ত লোক সমাজ সেবা ও বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী ছিলেন তিনি তাদেরকেই এই পরামর্শ সভার সদস্য করতেন। হাশেম, উমাইয়া, মাখযুম, জুমাহ, সাহাম, আদী আসাদ, নওফল এবং গোহরা প্রমুখ পরামর্শ সভার সদস্য ছিলেন। অপরদিকে, কুসাই তাঁর সন্তানদেরকে, বয়সের ভেদ-বিচার না করে যাকে ইচ্ছে তাকেই পরামর্শ সভায় আসার অনুমতি দিতেন। এই ক্ষেত্রে তিনি পুরো স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন করেন।

কুসাই হাজীদের পানি পান করানোর বিষয়টির উপর বেশ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি কা'বা শরীফের পার্শ্বে, চামড়ার বড় বড় মশক ভর্তি করে পানি রাখার ব্যবস্থা করেন এবং মক্কার চতুর্দিক থেকে উটের পিঠে বোঝাই করে বিভিন্ন কূপ থেকে মিষ্টি পানি সংগ্রহ করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি হারাম শরীফের বর্তমান 'বাবুল অদা'র কাছে একটি কূপ খনন করেন। তিনি রদমের মসজিদ আর-রায়ার কাছে আরেকটি কূপ খনন করেন। বর্তমানে আলুজ্ফালী ভবনের সামনের গলিতে, আলুজ্ফালীয়া নামক স্থানের কূপটিই সেই কূপ। পরবর্তীতে এটাকে 'জোবায়ের বিন মোতয়েম' কূপ বলা হয়। কেননা, এক সময় ঐ কূপটি মাটির নীচে চাপা পড়ে যাওয়ায় জোবায়ের সেটিকে পুনরায় খনন করেন। কুসাইর পরে, তাঁর বংশে মিষ্টি পানির সন্ধান করে সেখানে কূপ খনন করে কা'বা শরীফে মিষ্টি পানি সরবরাহ করা কুসাইর সুন্নতে পরিণত হয়। এইভাবে তারা হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। কুসাই হাজীদেরকে খানা খাওয়ানোর ব্যাপারেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেন।

এই উদ্দেশ্যে তিনি সকল কোরাইশী থেকে হজ্জ হওসুমে চাঁদা আদায় করতেন এবং গরীব ও দরিদ্র হাজীদের জন্য ঐ অর্থ দিয়ে খাবার তৈরী করে তাদেরকে খাওয়াতেন। তিনি চাঁদার অর্থ দিয়ে আটা কিনতেন এবং কোরবানীর পশুর রানের গোশত সংগ্রহ করতেন। গোশতের সাথে আটা মিশিয়ে খাবার তৈরী করে তা গরীব নিঃস্ব হাজীদেরকে খাওয়াতেন। কুসাইর মৃত্যুর পরও ঐ ব্যবস্থা অব্যাহত ছিল। কুসাইর নাতি উমরের শাসনামলে, মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ায় তিনি কোরাইশদের কাছ থেকে সংগৃহীত চাঁদা নিয়ে সিরিয়া যান এবং সেখান থেকে আটা ও কেক কিনে নিয়ে আসেন। তারপর উট জবাই করে আরবদের প্রসিদ্ধ খাবার 'সারীদ' তৈরী করে হাজীদেরকে খাওয়ান।

ইসলাম আসার পরও রাসূলুল্লাহ (সা) হাজীদেরকে খাওয়ানোর সুন্নত অব্যাহত রাখেন। ৯ হিজরী সালে, তিনি হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রা) কে আমীরে হজ্জ বানিয়ে মক্কায় পাঠানোর সময় হাজীদের উদ্দেশ্যে খাবার তৈরীর নির্দেশ দিয়েছিলেন। অবশিষ্ট খোলাফায়ে রাশেদাও (রা) ঐ পদ্ধতি চালু রাখেন। আবুল অলীদ আযরাকী বলেন যে, তাঁর সময় পর্যন্ত ঐ পদ্ধতি চালু ছিল। তিনি হিজরী ৩য় শতকের মাঝামাঝি মারা যান। পরবর্তীতে কখন এই প্রথাটি বন্ধ হয়ে যায় তা সঠিকভাবে জানা যায় না। সম্ভবতঃ যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু হওয়ার পর এই প্রথাটি বন্ধ হয়ে গেছে। ইসলাম আসার পর এই আতিথেয়তার পরিধি অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং এটি মক্কার জাতীয় প্রথায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী শাসকেরা যুদ্ধে ক্লান্ত-শ্রান্ত থাকায় তারা হাজীদের তওয়াফ করানোর খেদমত ছাড়া অন্য কোন বড় খেদমত আঞ্জাম দিতে পারেনি।

টিকাঃ
৩. তারীখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী, মক্কা।

আজকের মত, পূর্বে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো এত সুবিন্যস্ত ছিল না। তাই জাহেলিয়াতের যুগে কোরাইশদের প্রশাসনিক কাঠামোও সাদা-সিধে ছিল। তাদের সমাজ ছিল গোত্র ভিত্তিক। তারা মক্কার একটি নগররাষ্ট্র বাস করত।

বনি কানানা গোত্রের কুসাই বিন কিলাব একই সাথে মক্কার শাসনভার, হাজীদের সেবা, পানি পান করানো, খাওয়ানো এবং সম্মেলন করাসহ সকল কিছুর দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি কোরাইশদেরকে মক্কায় একত্রিত করেন বলে তাকে কোরাইশ বংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। এর আগে কোরাইশরা আরব দেশের সর্বত্র বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত ছিল। তিনিই তাদেরকে মক্কায় একত্রিত করেন। তখন থেকে কোরাইশরা মক্কায় বসবাস শুরু করে। ঐ বছরই কোরাইশরা 'কোরাইশ' নাম ধারণ করে। এর আগে, কোরাইশ নামে কেউ পরিচিত ছিল না। কোন কোন আরব অঞ্চলে تَقَرَّشُ শব্দের অর্থ হচ্ছে تَجَمَّعَ বা একত্রিত হওয়া . تَقَرُّش. শব্দ থেকেই মূল কোরাইশ শব্দের উৎপত্তি।

কুসাই তাঁর গোত্রের লোকদের ধারণা থেকে আরো বেশী বাস্তবধর্মী ছিলেন। তিনি মক্কায় ক্ষমতা লাভ করার পর কোরাইশদের শলা-পরামর্শের জন্য দারুন-নাদওয়া প্রতিষ্ঠা করেন এবং ৪০ বছরের কম বয়স্ক কোন কোরাইশীর জন্য এতে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তাও আবার যে সমস্ত লোক সমাজ সেবা ও বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী ছিলেন তিনি তাদেরকেই এই পরামর্শ সভার সদস্য করতেন। হাশেম, উমাইয়া, মাখযুম, জুমাহ, সাহাম, আদী আসাদ, নওফল এবং গোহরা প্রমুখ পরামর্শ সভার সদস্য ছিলেন। অপরদিকে, কুসাই তাঁর সন্তানদেরকে, বয়সের ভেদ-বিচার না করে যাকে ইচ্ছে তাকেই পরামর্শ সভায় আসার অনুমতি দিতেন। এই ক্ষেত্রে তিনি পুরো স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন করেন।

কুসাই হাজীদের পানি পান করানোর বিষয়টির উপর বেশ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি কা'বা শরীফের পার্শ্বে, চামড়ার বড় বড় মশক ভর্তি করে পানি রাখার ব্যবস্থা করেন এবং মক্কার চতুর্দিক থেকে উটের পিঠে বোঝাই করে বিভিন্ন কূপ থেকে মিষ্টি পানি সংগ্রহ করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি হারাম শরীফের বর্তমান 'বাবুল অদা'র কাছে একটি কূপ খনন করেন। তিনি রদমের মসজিদ আর-রায়ার কাছে আরেকটি কূপ খনন করেন। বর্তমানে আলুজ্ফালী ভবনের সামনের গলিতে, আলুজ্ফালীয়া নামক স্থানের কূপটিই সেই কূপ। পরবর্তীতে এটাকে 'জোবায়ের বিন মোতয়েম' কূপ বলা হয়। কেননা, এক সময় ঐ কূপটি মাটির নীচে চাপা পড়ে যাওয়ায় জোবায়ের সেটিকে পুনরায় খনন করেন। কুসাইর পরে, তাঁর বংশে মিষ্টি পানির সন্ধান করে সেখানে কূপ খনন করে কা'বা শরীফে মিষ্টি পানি সরবরাহ করা কুসাইর সুন্নতে পরিণত হয়। এইভাবে তারা হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। কুসাই হাজীদেরকে খানা খাওয়ানোর ব্যাপারেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেন।

এই উদ্দেশ্যে তিনি সকল কোরাইশী থেকে হজ্জ হওসুমে চাঁদা আদায় করতেন এবং গরীব ও দরিদ্র হাজীদের জন্য ঐ অর্থ দিয়ে খাবার তৈরী করে তাদেরকে খাওয়াতেন। তিনি চাঁদার অর্থ দিয়ে আটা কিনতেন এবং কোরবানীর পশুর রানের গোশত সংগ্রহ করতেন। গোশতের সাথে আটা মিশিয়ে খাবার তৈরী করে তা গরীব নিঃস্ব হাজীদেরকে খাওয়াতেন। কুসাইর মৃত্যুর পরও ঐ ব্যবস্থা অব্যাহত ছিল। কুসাইর নাতি উমরের শাসনামলে, মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ায় তিনি কোরাইশদের কাছ থেকে সংগৃহীত চাঁদা নিয়ে সিরিয়া যান এবং সেখান থেকে আটা ও কেক কিনে নিয়ে আসেন। তারপর উট জবাই করে আরবদের প্রসিদ্ধ খাবার 'সারীদ' তৈরী করে হাজীদেরকে খাওয়ান।

ইসলাম আসার পরও রাসূলুল্লাহ (সা) হাজীদেরকে খাওয়ানোর সুন্নত অব্যাহত রাখেন। ৯ হিজরী সালে, তিনি হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রা) কে আমীরে হজ্জ বানিয়ে মক্কায় পাঠানোর সময় হাজীদের উদ্দেশ্যে খাবার তৈরীর নির্দেশ দিয়েছিলেন। অবশিষ্ট খোলাফায়ে রাশেদাও (রা) ঐ পদ্ধতি চালু রাখেন। আবুল অলীদ আযরাকী বলেন যে, তাঁর সময় পর্যন্ত ঐ পদ্ধতি চালু ছিল। তিনি হিজরী ৩য় শতকের মাঝামাঝি মারা যান। পরবর্তীতে কখন এই প্রথাটি বন্ধ হয়ে যায় তা সঠিকভাবে জানা যায় না। সম্ভবতঃ যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু হওয়ার পর এই প্রথাটি বন্ধ হয়ে গেছে। ইসলাম আসার পর এই আতিথেয়তার পরিধি অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং এটি মক্কার জাতীয় প্রথায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী শাসকেরা যুদ্ধে ক্লান্ত-শ্রান্ত থাকায় তারা হাজীদের তওয়াফ করানোর খেদমত ছাড়া অন্য কোন বড় খেদমত আঞ্জাম দিতে পারেনি।

টিকাঃ
৩. তারীখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী, মক্কা।

আজকের মত, পূর্বে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো এত সুবিন্যস্ত ছিল না। তাই জাহেলিয়াতের যুগে কোরাইশদের প্রশাসনিক কাঠামোও সাদা-সিধে ছিল। তাদের সমাজ ছিল গোত্র ভিত্তিক। তারা মক্কার একটি নগররাষ্ট্রে বাস করত।

বনি কানানা গোত্রের কুসাই বিন কিলাব একই সাথে মক্কার শাসনভার, হাজীদের সেবা, পানি পান করানো, খাওয়ানো এবং সম্মেলন করাসহ সকল কিছুর দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি কোরাইশদেরকে মক্কায় একত্রিত করেন বলে তাকে কোরাইশ বংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। এর আগে কোরাইশরা আরব দেশের সর্বত্র বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত ছিল। তিনিই তাদেরকে মক্কায় একত্রিত করেন। তখন থেকে কোরাইশরা মক্কায় বসবাস শুরু করে। ঐ বছরই কোরাইশরা 'কোরাইশ' নাম ধারণ করে। এর আগে, কোরাইশ নামে কেউ পরিচিত ছিল না। কোন কোন আরব অঞ্চলে تَقَرَّشُ শব্দের অর্থ হচ্ছে تَجَمَّعَ বা একত্রিত হওয়া . تَقَرُّش. শব্দ থেকেই মূল কোরাইশ শব্দের উৎপত্তি।

কুসাই তাঁর গোত্রের লোকদের ধারণা থেকে আরো বেশী বাস্তবধর্মী ছিলেন। তিনি মক্কায় ক্ষমতা লাভ করার পর কোরাইশদের শলা-পরামর্শের জন্য দারুন-নাদওয়া প্রতিষ্ঠা করেন এবং ৪০ বছরের কম বয়স্ক কোন কোরাইশীর জন্য এতে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তাও আবার যে সমস্ত লোক সমাজ সেবা ও বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী ছিলেন তিনি তাদেরকেই এই পরামর্শ সভার সদস্য করতেন। হাশেম, উমাইয়া, মাখযুম, জুমাহ, সাহাম, আদী আসাদ, নওফল এবং গোহরা প্রমুখ পরামর্শ সভার সদস্য ছিলেন। অপরদিকে, কুসাই তাঁর সন্তানদেরকে, বয়সের ভেদ-বিচার না করে যাকে ইচ্ছে তাকেই পরামর্শ সভায় আসার অনুমতি দিতেন। এই ক্ষেত্রে তিনি পুরো স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন করেন।

কুসাই হাজীদের পানি পান করানোর বিষয়টির উপর বেশ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি কা'বা শরীফের পার্শ্বে, চামড়ার বড় বড় মশক ভর্তি করে পানি রাখার ব্যবস্থা করেন এবং মক্কার চতুর্দিক থেকে উটের পিঠে বোঝাই করে বিভিন্ন কূপ থেকে মিষ্টি পানি সংগ্রহ করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি হারাম শরীফের বর্তমান 'বাবুল অদা'র কাছে একটি কূপ খনন করেন। তিনি রদমের মসজিদ আর-রায়ার কাছে আরেকটি কূপ খনন করেন। বর্তমানে আল-জুফালী ভবনের সামনের গলিতে, আল-জুদারিয়া নামক স্থানের কূপটিই সেই কূপ। পরবর্তীতে এটাকে 'জোবায়ের বিন মোতয়েম' কূপ বলা হয়। কেননা, এক সময় ঐ কূপটি মাটির নীচে চাপা পড়ে যাওয়ায় জোবায়ের সেটিকে পুনরায় খনন করেন। কুসাইর পরে, তাঁর বংশে মিষ্টি পানির সন্ধান করে সেখানে কূপ খনন করে কা'বা শরীফে মিষ্টি পানি সরবরাহ করা কুসাইর সুন্নতে পরিণত হয়। এইভাবে তারা হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব আঞ্জাম দেন।

কুসাই হাজীদেরকে খানা খাওয়ানোর ব্যাপারেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি সকল কোরাইশী থেকে হজ্জ হওসুমে চাঁদা আদায় করতেন এবং গরীব ও দরিদ্র হাজীদের জন্য ঐ অর্থ দিয়ে খাবার তৈরী করে তাদেরকে খাওয়াতেন। তিনি চাঁদার অর্থ দিয়ে আটা কিনতেন এবং কোরবানীর পশুর রানের গোশত সংগ্রহ করতেন। গোশতের সাথে আটা মিশিয়ে খাবার তৈরী করে তা গরীব নিঃস্ব হাজীদেরকে খাওয়াতেন। কুসাইর মৃত্যুর পরও ঐ ব্যবস্থা অব্যাহত ছিল। কুসাইর নাতি উমরের শাসনামলে, মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ায় তিনি কোরাইশদের কাছ থেকে সংগৃহীত চাঁদা নিয়ে সিরিয়া যান এবং সেখান থেকে আটা ও কেক কিনে নিয়ে আসেন। তারপর উট জবাই করে আরবদের প্রসিদ্ধ খাবার 'সারীদ' তৈরী করে হাজীদেরকে খাওয়ান।

ইসলাম আসার পরও রাসূলুল্লাহ (সা) হাজীদেরকে খাওয়ানোর সুন্নত অব্যাহত রাখেন। ৯ হিজরী সালে, তিনি হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রা) কে আমীরে হজ্জ বানিয়ে মক্কায় পাঠানোর সময় হাজীদের উদ্দেশ্যে খাবার তৈরীর নির্দেশ দিয়েছিলেন। অবশিষ্ট খোলাফায়ে রাশেদাও (রা) ঐ পদ্ধতি চালু রাখেন। আবুল অলীদ আযরাকী বলেন যে, তাঁর সময় পর্যন্ত ঐ পদ্ধতি চালু ছিল। তিনি হিজরী ৩য় শতকের মাঝামাঝি মারা যান। পরবর্তীতে কখন এই প্রথাটি বন্ধ হয়ে যায় তা সঠিকভাবে জানা যায় না। সম্ভবতঃ যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু হওয়ার পর এই প্রথাটি বন্ধ হয়ে গেছে। ইসলাম আসার পর এই আতিথেয়তার পরিধি অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং এটি মক্কার জাতীয় প্রথায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী শাসকেরা যুদ্ধে ক্লান্ত-শ্রান্ত থাকায় তারা হাজীদের তওয়াফ করানোর খেদমত ছাড়া অন্য কোন বড় খেদমত আঞ্জাম দিতে পারেনি।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 কোরাইশ আমলে মক্কার বসতি

📄 কোরাইশ আমলে মক্কার বসতি


ইবরাহীম উপত্যকা তথা মক্কা উপত্যকার উচ্চভূমি ও নিম্নভূমির দুই পার্শ্বে, পাহাড়ের পাদদেশে এবং শামীয়া ও কুআইকুআন পাহাড়ের গা ঘেঁষে নিম্নভূমির যে শাখাসমূহ রয়েছে, সেগুলোতে কুরাইশ আমলে বসতি ও ঘর-বাড়ী গড়ে উঠে। প্রত্যেক গোত্র ওয়াদি ইবরাহীম এবং বিভিন্ন দিকে বিস্তৃত এর সমতল শাখাসমূহে ঘর তৈরী করে সেখানে বাস করত। তাই এলাকায় ঘনবসতি গড়ে উঠে। আজকের মত তখনকার দিনে, মক্কার পাহাড়-পর্বত ও ঢালু পাদদেশে কোন লোক বাস করত না।

মক্কার ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, কুসাই বিন কিলাব আজকের মাতাফ (তওয়াফের স্থান) এর সমান পরিমাণ জায়গা, তখন কা'বা শরীফের আঙ্গিনা হিসাবে দাগ দিয়ে চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন। তিনি সবাইকে এর বাইরে এবং কা'বা শরীফের চতুষ্পার্শ্বে ঘর তৈরীর অনুমতি দিলেন। কুসাইর পূর্বে মক্কার লোকেরা কা'বা শরীফের পার্শ্বে বাস করা কিংবা রাত্রিযাপন করাকে জায়েয মনে করত না। কিন্তু কুসাই তাদেরকে এও নির্দেশ দিলেন, তারা যেন কা'বা শরীফের দিকে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পথ রাখে। এর মধ্যে 'বাব বনি শায়বা'র পথটি উল্লেখযোগ্য ছিল। কা'বা শরীফের চাইতে উঁচু করে ঘর না বানানোরও নির্দেশ ছিল, যেন কা'বা শরীফ ঢাকা না পড়ে। তারা কা'বা শরীফের ছায়ায় বসে আলাপ-আলোচনা করত। এই উদ্দেশ্যেই তারা কা'বার পার্শ্বে 'দারুন নাদওয়া' তৈরি করে ও সেখানে বসে আলোচনা করে। এটাই ছিল তাদের বৈঠকের স্থান।

মক্কার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল্লামা আযরাকী তাঁর 'আখবারে মক্কা' বইতে তখনকার দিনে মক্কার জনবসতি সম্পর্কে একটি সুন্দর চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, তখন বাইতুল্লাহর কাছে অনেক ঘর-বাড়ী মওজুদ ছিল। মসজিদে হারামে লোকজনের আনাগোনা বেশী হত। বাবুস সালাম ও বাবে আলীর দিকে সিরিয়ার গাসাসেনা গোত্রের কিছু লোক বাস করত। এই দুই দরজার মাঝখানে মুদী ও কবিরাজী ওষুধের দোকানপাট ছিল। তারপর বাবুন্নবীর পার্শ্বে ছিল হযরত আব্বাস, যোবায়ের বিন মোতয়ে'ম (রা) এবং আমের বিন লুয়াই গোত্রের ঘর-বাড়ী। অতঃপর মক্কার উচ্চভূমির দিকে রওয়ানা হলে, বর্তমান কাসাসিয়ার প্রধান সড়ক যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে ফলের বাজার ছিল, তার পরেই ছিল খেজুরের বাজার। এরপর ছিল বনি আমের গোত্রের সরাইখানা। কাসাসিয়াকে মক্কার লোকেরা 'গাসাসিয়া' বলে। সম্ভবতঃ একাদশ শতাব্দীতে মক্কায় বসবাসকারী 'শেখ কাসাসী'র নামে এই জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছে। এর একটু পরেই রয়েছে মক্কার প্রসিদ্ধ سُوْقُ اللَّيْلِ বা 'নৈশ বাজার'। দিনে মক্কার কঠোর রোদে বের হওয়াই মুশকিল। তাই মক্কার অধিবাসীরা রাত্রে এই বাজারে এসে বেচা-কেনা করত। এজন্য এর নাম হয়েছে নৈশ বাজার। আজও সেই জায়গায় ঐ বাজারটি ঐ নামে চালু রয়েছে। 'সোক আল্লাইল' এর কাছেই ছিল কোরাইশদের دار مال الله 'আল্লাহর সম্পদের ভাণ্ডার' নামক সমাজকল্যাণ কেন্দ্র। ঐ কেন্দ্র থেকে তারা অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য খরচ করত এবং তাদেরকে খাবার দান করত।

এই ঘরের পার্শ্বেই শে'ব ইবনে ইউসুফ অবস্থিত যা আজকে শে'ব আলী নামে পরিচিতি। এর পূর্বের নাম ছিল শে'বে আবি তালিব। পাহাড়ের পাদদেশের ঢালু স্থানকে শে'ব বলে। শে'ব আলীতে, আবদুল মুত্তালিব বিন হাশেমের ঘর ছিল। সেখানে আবু তালেব এবং আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিবের একটি করে ঘর ছিল। এই জায়গাতেই নবী করীম (সা) এর জন্মস্থান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে সেখানে একটি ইসলামী পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। তারপর আবার প্রধান সড়ক ধরে সামনে এগুলে শে'বে বনি আমের শুরু হয় এবং শে'বে বনি আমেরের শুরুতেই আ'স এর বাড়ী ছিল। শে'বে বনি আমেরে বনি বকর গোত্রের ঘরবাড়ী ছিল। এছাড়াও সেখানে বনি আবদুল মোতালিব বিন আবদ মনাফ গোত্রের বাড়ী-ঘরও ছিল। আমরা পুনরায় প্রধান সড়কে এসে দাঁড়ালে সাবেক আল-আবদুল্লাহ বাঁধের সম্মুখীন হবো। এই বাঁধ দ্বারা তাঁরা পাহাড়ী ঢলের মাধ্যমে সৃষ্ট বন্যা প্রতিরোধ করত। সেখানে হাম্মারী গোত্রের লোকেরা বাস করত। এরপর 'মোয়াল্লাহ'র দিকে একটু এগিয়ে গেলে 'শেবে আবি দব' এবং পরে মোয়াল্লাহর কবরস্থান। শে'বে আমেরের যেখানে শেষ, সেখানেই এই কবরস্থান। তারপর শুরু হচ্ছে شعبة الجن জ্বীনদের ঘটনাস্থল। এরপর আল্হুজুন। তারপর আসে شعبُ الْصفى এটার বর্তমান নাম হচ্ছে 'মায়াবদাহ'। সেখানে বনি কানানা গোত্র, উতবা বিন আবি মুয়ীতের বংশ এবং আবদে শাম্স গোত্রের রবীয়ার বংশধররা বাস করত।

এবার সাঈ করার স্থান থেকে বাব বনি শায়বার উত্তর-পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়ালে, বাব বনি শায়বা ও বাব আস্ সালাম বরাবর সামনে, বনি আ'দী গোত্রের বাসস্থান পড়বে। সাঈ করার স্থানের সামনে, ডান দিকের অংশকে হোযামিয়া বলা হত। সেখানে নির্মাণকর্মী বা রাজমিস্ত্রীদের বাসা ছিল। সেখানে সাকীফা এবং হাকাম বিন হেযামের ঘর ছিল। এ ছাড়াও সেখানে, বনি সাহামের আঙ্গিনায় আরো কিছু ঘর ছিল। তারপরেই ছিল হযরত খাদীজা (রা) এর ঘর। বর্তমানে সেখানে 'গাজ্জা' বাজার রয়েছে।

এবার আমরা সাঈ'র স্থানে মারওয়া পাহাড়ে আসি। মারওয়ায় উতবা বিন ফারকাদের বাড়ী এবং ইয়াসের পরিবারের বড় একটি বাড়ী ছিল। বাম পার্শ্বেই ছিল নাপিত ও ক্ষৌরকারগণ। এরপর আটা, ঘি, মধু ও গমের দোকানপাট ছিল। সেখানে আবদ শামস গোত্র ও আবু সুফিয়ানের ঘর ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) এই ঘরের দিকে ইশারা করেই বলেছিলেন, "যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ।" এর পর আব্বাস পরিবারের বাড়ী। তারপর হারেসের বংশধরদের ঘর।

এবার সাঈর স্থানের বাব-বনি শায়বা থেকে পশ্চিম দিকে 'দারুন নাদওয়াহ'র দিকে যাওয়া যাক। সামনেই রোদ থেকে বাঁচার জন্য একটা বড় ছাতা ছিল। এই ছাতা পর্যন্ত পথের দুই ধারে ঘন ঘন ঘর। এক পার্শ্বে শায়বা বিন উসমানের ঘর, কা'বা শরীফের মালগুদাম, ডাক-পিয়নের ঘর, কোষাগার এবং খাত্তাব বিন নওফলের ঘর। ছাতার উত্তর পাশ দিয়ে উপরের দিকে বনি খোজাআ' গোত্রের ঘর-বাড়ী ছিল। মাঝখানে চলার পথ ছিল। এই পথ ধরে সুয়াইকা পর্যন্ত যাওয়া যেত। পথের উল্টো দিকে ছিল তামীম গোত্রের যেরারা পরিবারের ঘর-বাড়ী। সেখান থেকে কোআইকুআন (জাবালে হিন্দ) পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে শামীয়ার দিকে একটি সমতলভূমি রয়েছে। সেখান থেকে ডানে, দাইলামের দিকে একটি সমতল ভূমি রয়েছে। কোয়াইকুআন পাহাড় মসজিদে হারামের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এটি উত্তর দিকে হুজুন, পশ্চিম দিকে বিরে তুওয়া এবং দক্ষিণ দিকে হাররাতুল বাব ও শোবেকা পর্যন্ত বিস্তৃত। আজকাল 'কারারা' নামে পরিচিত ঐ স্থানের কাছেই ছিল দাইলাম। সেখানকার পাহাড় কেটে মোয়াল্লাহর বাজারে যাওয়ার একটি পথ ছিল। যোবাইর বিন আওয়াম এই পথটি তৈরী করেছিলেন। তিনি মোয়াল্লাহর পার্শ্বে তার বাগানের সাথে সুয়াইকার পার্শ্বে ক্রয় করা বাড়ীর সাথে সংযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ঐ পথটি তৈরী করেছিলেন।

এবার মসজিদে হারামের নিম্নভূমির বর্ণনায় আসা যাক। এখন মসজিদে হারামের বাইরে বাবে আজইয়াদ থেকে পূর্বমুখী কিংবা পূর্ব-দক্ষিণমুখী হতে হবে। মসজিদে হারামের আঙ্গিনায়, রোকনে ইয়ামানী থেকে যমযম কূপ বরাবর, বাবে আলীর দিকে বনি আ'য়েজ গোত্রের বাড়ী-ঘর ছিল। বাবে আলীর কাছে সাঈর জায়গার বামে, কা'বা শরীফের দিকে ছিল তাদের নেতৃস্থানীয় লোকজনের ঘর। মসজিদের আঙ্গিনা থেকে সাফা ও বাবে আজইয়াদ এর মধ্যবর্তী স্থানে আ'দী বিন কা'বের ঘর ছিল। পরে তিনি ও তাঁর লোকজন সেখান থেকে আরো দূরে সরে যান।

সাফা থেকে দক্ষিণ দিকে বাবে আজইয়াদ হয়ে যে রাস্তা চলে গেছে, সেখানে বনি আ'য়েজ গোত্রের ছায়াদার বিশ্রামাগার এবং কাপড় বিক্রির বাজার ছিল। এর কাছেই, নবুওয়াতের আগে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর অংশীদার সায়েব বিন সায়েব এর সাথে মিলে যে ব্যবসা করেন সেজন্য একটি ঘর নিয়েছিলেন।

এবার বাবুল আজইয়াদ থেকে সামনের দিকে মুখ করে কা'বা শরীফকে পেছনে রেখে দাঁড়ালে দু'টো সরু সমতল ভূমি পাওয়া যাবে। এর একটি চলে গেছে হাতের ডান দিকে। আজকাল সেটির নাম হচ্ছে বীরে বালীলা। এটাকে اجیاد كبير 'বড় আজইয়াদ' ও বলা হয়। অন্যটি চলে গেছে হাতের বাম দিকে। সেটির বর্তমান নাম হচ্ছে আস্-সাদ। এটাকে তারা 'ছোট আজইয়াদ'ও বলত।

বনু তামীম গোত্র, বাবে আজইয়াদ বরাবর কা'বা শরীফের অঙ্গনের আগ পর্যন্ত এই জায়গায় বাস করত। অপর দিকে, বনি মাখযুম গোত্র বড় আজইয়াদের প্রবেশমুখে বাস করত। তাদের পেছনে বাস করত আব্দ গোত্রের একটি দল। এদের পেছনে, অদূরেই ছিল আবু জাহল বিন হিশামের ঘর।

ছোট আজইয়াদে আ'দী বিন আবদ শামস গোত্রের লোকেরা বাস করত। সেখানে আবদুল্লাহ বিন জুদআনেরও ঘর ছিল। আর ঐ ঘরেই প্রখ্যাত সমাজকল্যাণ সংস্থা حلف الفضول "হিলফুল ফুজুল” অবস্থিত ছিল। এই ঘরেই, বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা একত্রিত হয়ে মক্কায় কোন জালেমকে বরদাশত না করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে। নবী করীম (সা) এর নবুওয়াতের পূর্বে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠে।

আজইয়াদ ছেড়ে প্রধান সড়ক ধরে দক্ষিণে মেসফালার দিকে রওনা হলে, بَابُ الوداع বাবুল বিদা'র কাছে ছিল হাযওয়ারা বাজার। এই বাজার থেকে মাতাফের সীমানা পর্যন্ত গম ও আটার বাজার ছিল। ঐ দিকেই সাঈফী গোত্রের লোকেরা বাস করত এবং আবদুদ্ দার পরিবারও সেখানে বাস করত। বনি মাখযুম গোত্রের একটি দলও সেখানে বাস করত।

সেই সময় শোবায়কা, হাররাতুল বাব কিংবা জারওয়ালে অল্প কিছু লোক বাস করত। জারওয়ালের পেছনের দিক যা মেসফালার সাথে মিশে গেছে, সেখানেও কিছু লোক বাস করত। পরবর্তীতে জাবালে উমরে লোকজনের বাস শুরু হয়। যদি আগে সেখানে অন্য কোন লোক বাস করত তাহলে, সেই গোত্রের নামানুসারেই পাহাড়টির নামকরণ করা হত। হযরত উমরের নামের সাথে পাহাড়টির নামকরণের দ্বারা বুঝা যায় যে, সেই পাহাড়ে হযরত উমরের সময় থেকেই বসবাস শুরু হয়েছে।

সানীয়াও কোন লোক বসতি ছিল না। এর অপর নাম ছিল حزنة 'হায়না' এবং বর্তমান নাম হচ্ছে হাফায়ের। এর পেছনের দিক জারওয়ালের পেছনের দিকের সাথে সম্পৃক্ত। হাফায়ের حفر 'হাফর' থেকে এসেছে। এর অর্থ হল খনন করা। এইটি চার পাহাড়ের মধ্যবর্তী একটি নীচু স্থান। কোরাইশদের আমলে, শোবায়কা থেকে জারওয়ালের পেছনের দিকের সাথে যোগাযোগ রক্ষার উদ্দেশ্যে হাফায়েরের উপর দিয়ে পাহাড় কেটে পথচারীদের রাস্তা তৈরী করা হয়নি। বরং আব্বাসী আমলের খালেদ বারমকীর শাসনকালে এই রাস্তাটি বের করা হয়। তিনি জারওয়ালের পশ্চাতে একটি বাগান লাগিয়েছিলেন। সেই বাগানের সাথে সংক্ষিপ্ত যোগাযোগের জন্য এই রাস্তাটি পাহাড় কেটে বা খনন করে বের করেন। মেসফালার পেছনের দিকে মক্কার নিম্নভূমির শুরু। কিন্তু সেখানে তখন কোন লোক বসতির প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবে নগণ্যসংখ্যক লোকের বাসকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। মক্কার উপকণ্ঠে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত কিছু লোক বসতি ছিল।

জাহেলিয়াতের যুগে আকহাওয়ানায় লোক বসতি ছিল। সেখানে বাগান ও বিশ্রামগারায় ছিল। মক্কার বিভিন্ন জায়গায় অবসর বিনোদনের জন্য বাগান ও পার্কের ব্যবস্থা ছিল। মেসফালার কাছে, বড় জিয়াদ হয়ে, শেবে ঘামে অনুরূপ একটি বিনোদাগার ছিল। এ ছাড়াও মায়াবদাহ, হুজুন এবং শুহাদাহসহ বিভিন্ন জায়গায় খেজুর বাগান ছিল। সেগুলোর পার্শ্বে হাল্কা লোক বসতি ছিল তবে হারাম শরীফের পার্শ্বে, এর প্রতিবেশী হওয়ার প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে, লোকবসতি ঘন ছিল।

ইবরাহীম উপত্যকা তথা মক্কা উপত্যকার উচ্চভূমি ও নিম্নভূমির দুই পার্শ্বে, পাহাড়ের পাদদেশে এবং শামীয়া ও কুআইকুআন পাহাড়ের গা ঘেঁষে নিম্নভূমির যে শাখাসমূহ রয়েছে, সেগুলোতে কুরাইশ আমলে বসতি ও ঘর-বাড়ী গড়ে উঠে। প্রত্যেক গোত্র ওয়াদি ইবরাহীম এবং বিভিন্ন দিকে বিস্তৃত এর সমতল শাখাসমূহে ঘর তৈরী করে সেখানে বাস করত। তাই এলাকায় ঘনবসতি গড়ে উঠে। আজকের মত তখনকার দিনে, মক্কার পাহাড়-পর্বত ও ঢালু পাদদেশে কোন লোক বাস করত না।

মক্কার ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, কুসাই বিন কিলাব আজকের মাতাফ (তওয়াফের স্থান) এর সমান পরিমাণ জায়গা, তখন কা'বা শরীফের আঙ্গিনা হিসাবে দাগ দিয়ে চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন। তিনি সবাইকে এর বাইরে এবং কা'বা শরীফের চতুষ্পার্শ্বে ঘর তৈরীর অনুমতি দিলেন। কুসাইর পূর্বে মক্কার লোকেরা কা'বা শরীফের পার্শ্বে বাস করা কিংবা রাত্রিযাপন করাকে জায়েয মনে করত না। কিন্তু কুসাই তাদেরকে এও নির্দেশ দিলেন, তারা যেন কা'বা শরীফের দিকে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পথ রাখে। এর মধ্যে 'বাব বনি শায়বা'র পথটি উল্লেখযোগ্য ছিল। কা'বা শরীফের চাইতে উঁচু করে ঘর না বানানোরও নির্দেশ ছিল, যেন কা'বা শরীফ ঢাকা না পড়ে। তারা কা'বা শরীফের ছায়ায় বসে আলাপ-আলোচনা করত। এই উদ্দেশ্যেই তারা কা'বার পার্শ্বে 'দারুন নাদওয়া' তৈরি করে ও সেখানে বসে আলোচনা করে। এটাই ছিল তাদের বৈঠকের স্থান।

মক্কার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল্লামা আযরাকী তাঁর 'আখবারে মক্কা' বইতে তখনকার দিনে মক্কার জনবসতি সম্পর্কে একটি সুন্দর চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, তখন বাইতুল্লাহর কাছে অনেক ঘর-বাড়ী মওজুদ ছিল। মসজিদে হারামে লোকজনের আনাগোনা বেশী হত। বাবুস সালাম ও বাবে আলীর দিকে সিরিয়ার গাসাসেনা গোত্রের কিছু লোক বাস করত। এই দুই দরজার মাঝখানে মুদী ও কবিরাজী ওষুধের দোকানপাট ছিল। তারপর বাবুন্নবীর পার্শ্বে ছিল হযরত আব্বাস, যোবায়ের বিন মোতয়ে'ম (রা) এবং আমের বিন লুয়াই গোত্রের ঘর-বাড়ী। অতঃপর মক্কার উচ্চভূমির দিকে রওয়ানা হলে, বর্তমান কাসাসিয়ার প্রধান সড়ক যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে ফলের বাজার ছিল, তার পরেই ছিল খেজুরের বাজার। এরপর ছিল বনি আমের গোত্রের সরাইখানা। কাসাসিয়াকে মক্কার লোকেরা 'গাসাসিয়া' বলে। সম্ভবতঃ একাদশ শতাব্দীতে মক্কায় বসবাসকারী 'শেখ কাসাসী'র নামে এই জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছে। এর একটু পরেই রয়েছে মক্কার প্রসিদ্ধ سُوْقُ اللَّيْلِ বা 'নৈশ বাজার'। দিনে মক্কার কঠোর রোদে বের হওয়াই মুশকিল। তাই মক্কার অধিবাসীরা রাত্রে এই বাজারে এসে বেচা-কেনা করত। এজন্য এর নাম হয়েছে নৈশ বাজার। আজও সেই জায়গায় ঐ বাজারটি ঐ নামে চালু রয়েছে। 'সোক আল্লাইল' এর কাছেই ছিল কোরাইশদের دار مال الله 'আল্লাহর সম্পদের ভাণ্ডার' নামক সমাজকল্যাণ কেন্দ্র। ঐ কেন্দ্র থেকে তারা অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য খরচ করত এবং তাদেরকে খাবার দান করত।

এই ঘরের পার্শ্বেই শে'ব ইবনে ইউসুফ অবস্থিত যা আজকে শে'ব আলী নামে পরিচিতি। এর পূর্বের নাম ছিল শে'বে আবি তালিব। পাহাড়ের পাদদেশের ঢালু স্থানকে শে'ব বলে। শে'ব আলীতে, আবদুল মুত্তালিব বিন হাশেমের ঘর ছিল। সেখানে আবু তালেব এবং আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিবের একটি করে ঘর ছিল। এই জায়গাতেই নবী করীম (সা) এর জন্মস্থান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে সেখানে একটি ইসলামী পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। তারপর আবার প্রধান সড়ক ধরে সামনে এগুলে শে'বে বনি আমের শুরু হয় এবং শে'বে বনি আমেরের শুরুতেই আ'স এর বাড়ী ছিল। শে'বে বনি আমেরে বনি বকর গোত্রের ঘরবাড়ী ছিল। এছাড়াও সেখানে বনি আবদুল মোতালিব বিন আবদ মনাফ গোত্রের বাড়ী-ঘরও ছিল। আমরা পুনরায় প্রধান সড়কে এসে দাঁড়ালে সাবেক আল-আবদুল্লাহ বাঁধের সম্মুখীন হবো। এই বাঁধ দ্বারা তাঁরা পাহাড়ী ঢলের মাধ্যমে সৃষ্ট বন্যা প্রতিরোধ করত। সেখানে হাম্মারী গোত্রের লোকেরা বাস করত। এরপর 'মোয়াল্লাহ'র দিকে একটু এগিয়ে গেলে 'শেবে আবি দব' এবং পরে মোয়াল্লাহর কবরস্থান। শে'বে আমেরের যেখানে শেষ, সেখানেই এই কবরস্থান। তারপর শুরু হচ্ছে شعبة الجن জ্বীনদের ঘটনাস্থল। এরপর আল্হুজুন। তারপর আসে شعبُ الْصفى এটার বর্তমান নাম হচ্ছে 'মায়াবদাহ'। সেখানে বনি কানানা গোত্র, উতবা বিন আবি মুয়ীতের বংশ এবং আবদে শাম্স গোত্রের রবীয়ার বংশধররা বাস করত।

এবার সাঈ করার স্থান থেকে বাব বনি শায়বার উত্তর-পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়ালে, বাব বনি শায়বা ও বাব আস্ সালাম বরাবর সামনে, বনি আ'দী গোত্রের বাসস্থান পড়বে। সাঈ করার স্থানের সামনে, ডান দিকের অংশকে হোযামিয়া বলা হত। সেখানে নির্মাণকর্মী বা রাজমিস্ত্রীদের বাসা ছিল। সেখানে সাকীফা এবং হাকাম বিন হেযামের ঘর ছিল। এ ছাড়াও সেখানে, বনি সাহামের আঙ্গিনায় আরো কিছু ঘর ছিল। তারপরেই ছিল হযরত খাদীজা (রা) এর ঘর। বর্তমানে সেখানে 'গাজ্জা' বাজার রয়েছে।

এবার আমরা সাঈ'র স্থানে মারওয়া পাহাড়ে আসি। মারওয়ায় উতবা বিন ফারকাদের বাড়ী এবং ইয়াসের পরিবারের বড় একটি বাড়ী ছিল। বাম পার্শ্বেই ছিল নাপিত ও ক্ষৌরকারগণ। এরপর আটা, ঘি, মধু ও গমের দোকানপাট ছিল। সেখানে আবদ শামস গোত্র ও আবু সুফিয়ানের ঘর ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) এই ঘরের দিকে ইশারা করেই বলেছিলেন, "যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ।" এর পর আব্বাস পরিবারের বাড়ী। তারপর হারেসের বংশধরদের ঘর।

এবার সাঈর স্থানের বাব-বনি শায়বা থেকে পশ্চিম দিকে 'দারুন নাদওয়াহ'র দিকে যাওয়া যাক। সামনেই রোদ থেকে বাঁচার জন্য একটা বড় ছাতা ছিল। এই ছাতা পর্যন্ত পথের দুই ধারে ঘন ঘন ঘর। এক পার্শ্বে শায়বা বিন উসমানের ঘর, কা'বা শরীফের মালগুদাম, ডাক-পিয়নের ঘর, কোষাগার এবং খাত্তাব বিন নওফলের ঘর। ছাতার উত্তর পাশ দিয়ে উপরের দিকে বনি খোজাআ' গোত্রের ঘর-বাড়ী ছিল। মাঝখানে চলার পথ ছিল। এই পথ ধরে সুয়াইকা পর্যন্ত যাওয়া যেত। পথের উল্টো দিকে ছিল তামীম গোত্রের যেরারা পরিবারের ঘর-বাড়ী। সেখান থেকে কোআইকুআন (জাবালে হিন্দ) পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে শামীয়ার দিকে একটি সমতলভূমি রয়েছে। সেখান থেকে ডানে, দাইলামের দিকে একটি সমতল ভূমি রয়েছে। কোয়াইকুআন পাহাড় মসজিদে হারামের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এটি উত্তর দিকে হুজুন, পশ্চিম দিকে বিরে তুওয়া এবং দক্ষিণ দিকে হাররাতুল বাব ও শোবেকা পর্যন্ত বিস্তৃত। আজকাল 'কারারা' নামে পরিচিত ঐ স্থানের কাছেই ছিল দাইলাম। সেখানকার পাহাড় কেটে মোয়াল্লাহর বাজারে যাওয়ার একটি পথ ছিল। যোবাইর বিন আওয়াম এই পথটি তৈরী করেছিলেন। তিনি মোয়াল্লাহর পার্শ্বে তার বাগানের সাথে সুয়াইকার পার্শ্বে ক্রয় করা বাড়ীর সাথে সংযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ঐ পথটি তৈরী করেছিলেন।

এবার মসজিদে হারামের নিম্নভূমির বর্ণনায় আসা যাক। এখন মসজিদে হারামের বাইরে বাবে আজইয়াদ থেকে পূর্বমুখী কিংবা পূর্ব-দক্ষিণমুখী হতে হবে। মসজিদে হারামের আঙ্গিনায়, রোকনে ইয়ামানী থেকে যমযম কূপ বরাবর, বাবে আলীর দিকে বনি আ'য়েজ গোত্রের বাড়ী-ঘর ছিল। বাবে আলীর কাছে সাঈর জায়গার বামে, কা'বা শরীফের দিকে ছিল তাদের নেতৃস্থানীয় লোকজনের ঘর। মসজিদের আঙ্গিনা থেকে সাফা ও বাবে আজইয়াদ এর মধ্যবর্তী স্থানে আ'দী বিন কা'বের ঘর ছিল। পরে তিনি ও তাঁর লোকজন সেখান থেকে আরো দূরে সরে যান।

সাফা থেকে দক্ষিণ দিকে বাবে আজইয়াদ হয়ে যে রাস্তা চলে গেছে, সেখানে বনি আ'য়েজ গোত্রের ছায়াদার বিশ্রামাগার এবং কাপড় বিক্রির বাজার ছিল। এর কাছেই, নবুওয়াতের আগে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর অংশীদার সায়েব বিন সায়েব এর সাথে মিলে যে ব্যবসা করেন সেজন্য একটি ঘর নিয়েছিলেন।

এবার বাবুল আজইয়াদ থেকে সামনের দিকে মুখ করে কা'বা শরীফকে পেছনে রেখে দাঁড়ালে দু'টো সরু সমতল ভূমি পাওয়া যাবে। এর একটি চলে গেছে হাতের ডান দিকে। আজকাল সেটির নাম হচ্ছে বীরে বালীলা। এটাকে اجیاد كبير 'বড় আজইয়াদ' ও বলা হয়। অন্যটি চলে গেছে হাতের বাম দিকে। সেটির বর্তমান নাম হচ্ছে আস্-সাদ। এটাকে তারা 'ছোট আজইয়াদ'ও বলত।

বনু তামীম গোত্র, বাবে আজইয়াদ বরাবর কা'বা শরীফের অঙ্গনের আগ পর্যন্ত এই জায়গায় বাস করত। অপর দিকে, বনি মাখযুম গোত্র বড় আজইয়াদের প্রবেশমুখে বাস করত। তাদের পেছনে বাস করত আব্দ গোত্রের একটি দল। এদের পেছনে, অদূরেই ছিল আবু জাহল বিন হিশামের ঘর।

ছোট আজইয়াদে আ'দী বিন আবদ শামস গোত্রের লোকেরা বাস করত। সেখানে আবদুল্লাহ বিন জুদআনেরও ঘর ছিল। আর ঐ ঘরেই প্রখ্যাত সমাজকল্যাণ সংস্থা حلف الفضول "হিলফুল ফুজুল” অবস্থিত ছিল। এই ঘরেই, বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা একত্রিত হয়ে মক্কায় কোন জালেমকে বরদাশত না করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে। নবী করীম (সা) এর নবুওয়াতের পূর্বে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠে।

আজইয়াদ ছেড়ে প্রধান সড়ক ধরে দক্ষিণে মেসফালার দিকে রওনা হলে, بَابُ الوداع বাবুল বিদা'র কাছে ছিল হাযওয়ারা বাজার। এই বাজার থেকে মাতাফের সীমানা পর্যন্ত গম ও আটার বাজার ছিল। ঐ দিকেই সাঈফী গোত্রের লোকেরা বাস করত এবং আবদুদ্ দার পরিবারও সেখানে বাস করত। বনি মাখযুম গোত্রের একটি দলও সেখানে বাস করত।

সেই সময় শোবায়কা, হাররাতুল বাব কিংবা জারওয়ালে অল্প কিছু লোক বাস করত। জারওয়ালের পেছনের দিক যা মেসফালার সাথে মিশে গেছে, সেখানেও কিছু লোক বাস করত। পরবর্তীতে জাবালে উমরে লোকজনের বাস শুরু হয়। যদি আগে সেখানে অন্য কোন লোক বাস করত তাহলে, সেই গোত্রের নামানুসারেই পাহাড়টির নামকরণ করা হত। হযরত উমরের নামের সাথে পাহাড়টির নামকরণের দ্বারা বুঝা যায় যে, সেই পাহাড়ে হযরত উমরের সময় থেকেই বসবাস শুরু হয়েছে।

সানীয়াও কোন লোক বসতি ছিল না। এর অপর নাম ছিল حزنة 'হায়না' এবং বর্তমান নাম হচ্ছে হাফায়ের। এর পেছনের দিক জারওয়ালের পেছনের দিকের সাথে সম্পৃক্ত। হাফায়ের حفر 'হাফর' থেকে এসেছে। এর অর্থ হল খনন করা। এইটি চার পাহাড়ের মধ্যবর্তী একটি নীচু স্থান। কোরাইশদের আমলে, শোবায়কা থেকে জারওয়ালের পেছনের দিকের সাথে যোগাযোগ রক্ষার উদ্দেশ্যে হাফায়েরের উপর দিয়ে পাহাড় কেটে পথচারীদের রাস্তা তৈরী করা হয়নি। বরং আব্বাসী আমলের খালেদ বারমকীর শাসনকালে এই রাস্তাটি বের করা হয়। তিনি জারওয়ালের পশ্চাতে একটি বাগান লাগিয়েছিলেন। সেই বাগানের সাথে সংক্ষিপ্ত যোগাযোগের জন্য এই রাস্তাটি পাহাড় কেটে বা খনন করে বের করেন। মেসফালার পেছনের দিকে মক্কার নিম্নভূমির শুরু। কিন্তু সেখানে তখন কোন লোক বসতির প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবে নগণ্যসংখ্যক লোকের বাসকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। মক্কার উপকণ্ঠে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত কিছু লোক বসতি ছিল।

জাহেলিয়াতের যুগে আকহাওয়ানায় লোক বসতি ছিল। সেখানে বাগান ও বিশ্রামগারায় ছিল। মক্কার বিভিন্ন জায়গায় অবসর বিনোদনের জন্য বাগান ও পার্কের ব্যবস্থা ছিল। মেসফালার কাছে, বড় জিয়াদ হয়ে, শেবে ঘামে অনুরূপ একটি বিনোদাগার ছিল। এ ছাড়াও মায়াবদাহ, হুজুন এবং শুহাদাহসহ বিভিন্ন জায়গায় খেজুর বাগান ছিল। সেগুলোর পার্শ্বে হাল্কা লোক বসতি ছিল তবে হারাম শরীফের পার্শ্বে, এর প্রতিবেশী হওয়ার প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে, লোকবসতি ঘন ছিল।

কোরাইশ আমলে মক্কার বসতি ইবরাহীম উপত্যকা তথা মক্কা উপত্যকার উচ্চভূমি ও নিম্নভূমির দুই পার্শ্বে, পাহাড়ের পাদদেশে এবং শামীয়া ও কুআইকুআন পাহাড়ের গা ঘেঁষে নিম্নভূমির যে শাখাসমূহ রয়েছে, সেগুলোতে কুরাইশ আমলে বসতি ও ঘর-বাড়ী গড়ে উঠে। প্রত্যেক গোত্র ওয়াদি ইবরাহীম এবং বিভিন্ন দিকে বিস্তৃত এর সমতল শাখাসমূহে ঘর তৈরী করে সেখানে বাস করত। তাই এলাকায় ঘনবসতি গড়ে উঠে। আজকের মত তখনকার দিনে, মক্কার পাহাড়-পর্বত ও ঢালু পাদদেশে কোন লোক বাস করত না।

মক্কার ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, কুসাই বিন কিলাব আজকের মাতাফ (তওয়াফের স্থান) এর সমান পরিমাণ জায়গা, তখন কা'বা শরীফের আঙ্গিনা হিসাবে দাগ দিয়ে চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন। তিনি সবাইকে এর বাইরে এবং কা'বা শরীফের চতুষ্পার্শ্বে ঘর তৈরীর অনুমতি দিলেন। কুসাইর পূর্বে মক্কার লোকেরা কা'বা শরীফের পার্শ্বে বাস করা কিংবা রাত্রিযাপন করাকে জায়েয মনে করত না। কিন্তু কুসাই তাদেরকে এও নির্দেশ দিলেন, তারা যেন কা'বা শরীফের দিকে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পথ রাখে। এর মধ্যে 'বাব বনি শায়বা'র পথটি উল্লেখযোগ্য ছিল। কা'বা শরীফের চাইতে উঁচু করে ঘর না বানানোরও নির্দেশ ছিল, যেন কা'বা শরীফ ঢাকা না পড়ে। তারা কা'বা শরীফের ছায়ায় বসে আলাপ-আলোচনা করত। এই উদ্দেশ্যেই তারা কা'বার পার্শ্বে 'দারুন নাদওয়া' তৈরি করে ও সেখানে বসে আলোচনা করে। এটাই ছিল তাদের বৈঠকের স্থান।

মক্কার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল্লামা আযরাকী তাঁর 'আখবারে মক্কা' বইতে তখনকার দিনে মক্কার জনবসতি সম্পর্কে একটি সুন্দর চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, তখন বাইতুল্লাহর কাছে অনেক ঘর-বাড়ী মওজুদ ছিল। মসজিদে হারামে লোকজনের আনাগোনা বেশী হত। বাবুস সালাম ও বাবে আলীর দিকে সিরিয়ার গাসাসেনা গোত্রের কিছু লোক বাস করত। এই দুই দরজার মাঝখানে মুদী ও কবিরাজী ওষুধের দোকানপাট ছিল। তারপর বাবুন্নবীর পার্শ্বে ছিল হযরত আব্বাস, যোবায়ের বিন মোতয়ে'ম (রা) এবং আমের বিন লুয়াই গোত্রের ঘর-বাড়ী। অতঃপর মক্কার উচ্চভূমির দিকে রওয়ানা হলে, বর্তমান কাসাসিয়ার প্রধান সড়ক যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে ফলের বাজার ছিল, তার পরেই ছিল খেজুরের বাজার। এরপর ছিল বনি আমের গোত্রের সরাইখানা। কাসাসিয়াকে মক্কার লোকেরা 'গাসাসিয়া' বলে। সম্ভবতঃ একাদশ শতাব্দীতে মক্কায় বসবাসকারী 'শেখ কাসাসী'র নামে এই জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছে। এর একটু পরেই রয়েছে মক্কার প্রসিদ্ধ سُوْقُ اللَّيْلِ বা 'নৈশ বাজার'। দিনে মক্কার কঠোর রোদে বের হওয়াই মুশকিল। তাই মক্কার অধিবাসীরা রাত্রে এই বাজারে এসে বেচা-কেনা করত। এজন্য এর নাম হয়েছে নৈশ বাজার। আজও সেই জায়গায় ঐ বাজারটি ঐ নামে চালু রয়েছে। 'সোক আল্লাইল' এর কাছেই ছিল কোরাইশদের دار مال الله 'আল্লাহর সম্পদের ভাণ্ডার' নামক সমাজকল্যাণ কেন্দ্র। ঐ কেন্দ্র থেকে তারা অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য খরচ করত এবং তাদেরকে খাবার দান করত।

এই ঘরের পার্শ্বেই শে'ব ইবনে ইউসুফ অবস্থিত যা আজকে শে'ব আলী নামে পরিচিতি। এর পূর্বের নাম ছিল শে'বে আবি তালিব। পাহাড়ের পাদদেশের ঢালু স্থানকে শে'ব বলে। শে'ব আলীতে, আবদুল মুত্তালিব বিন হাশেমের ঘর ছিল। সেখানে আবু তালেব এবং আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিবের একটি করে ঘর ছিল। এই জায়গাতেই নবী করীম (সা) এর জন্মস্থান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে সেখানে একটি ইসলামী পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। তারপর আবার প্রধান সড়ক ধরে সামনে এগুলে শে'বে বনি আমের শুরু হয় এবং শে'বে বনি আমেরের শুরুতেই আ'স এর বাড়ী ছিল। শে'বে বনি আমেরে বনি বকর গোত্রের ঘরবাড়ী ছিল। এছাড়াও সেখানে বনি আবদুল মোতালিব বিন আবদ মনাফ গোত্রের বাড়ী-ঘরও ছিল। আমরা পুনরায় প্রধান সড়কে এসে দাঁড়ালে সাবেক আল-আবদুল্লাহ বাঁধের সম্মুখীন হবো। এই বাঁধ দ্বারা তাঁরা পাহাড়ী ঢলের মাধ্যমে সৃষ্ট বন্যা প্রতিরোধ করত। সেখানে হাম্মারী গোত্রের লোকেরা বাস করত। এরপর 'মোয়াল্লাহ'র দিকে একটু এগিয়ে গেলে 'শেবে আবি দব' এবং পরে মোয়াল্লাহর কবরস্থান। শে'বে আমেরের যেখানে শেষ, সেখানেই এই কবরস্থান। তারপর শুরু হচ্ছে شعبة الجن জ্বীনদের ঘটনাস্থল। এরপর আল্হুজুন। তারপর আসে شعبُ الْصفى এটার বর্তমান নাম হচ্ছে 'মায়াবদাহ'। সেখানে বনি কানানা গোত্র, উতবা বিন আবি মুয়ীতের বংশ এবং আবদে শাম্স গোত্রের রবীয়ার বংশধররা বাস করত।

এবার সাঈ করার স্থান থেকে বাব বনি শায়বার উত্তর-পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়ালে, বাব বনি শায়বা ও বাব আস্ সালাম বরাবর সামনে, বনি আ'দী গোত্রের বাসস্থান পড়বে। সাঈ করার স্থানের সামনে, ডান দিকের অংশকে হোযামিয়া বলা হত। সেখানে নির্মাণকর্মী বা রাজমিস্ত্রীদের বাসা ছিল। সেখানে সাকীফা এবং হাকাম বিন হেযামের ঘর ছিল। এ ছাড়াও সেখানে, বনি সাহামের আঙ্গিনায় আরো কিছু ঘর ছিল। তারপরেই ছিল হযরত খাদীজা (রা) এর ঘর। বর্তমানে সেখানে 'গাজ্জা' বাজার রয়েছে।

এবার আমরা সাঈ'র স্থানে মারওয়া পাহাড়ে আসি। মারওয়ায় উতবা বিন ফারকাদের বাড়ী এবং ইয়াসের পরিবারের বড় একটি বাড়ী ছিল। বাম পার্শ্বেই ছিল নাপিত ও ক্ষৌরকারগণ। এরপর আটা, ঘি, মধু ও গমের দোকানপাট ছিল। সেখানে আবদ শামস গোত্র ও আবু সুফিয়ানের ঘর ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) এই ঘরের দিকে ইশারা করেই বলেছিলেন, "যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ।" এর পর আব্বাস পরিবারের বাড়ী। তারপর হারেসের বংশধরদের ঘর।

এবার সাঈর স্থানের বাব-বনি শায়বা থেকে পশ্চিম দিকে 'দারুন নাদওয়াহ'র দিকে যাওয়া যাক। সামনেই রোদ থেকে বাঁচার জন্য একটা বড় ছাতা ছিল। এই ছাতা পর্যন্ত পথের দুই ধারে ঘন ঘন ঘর। এক পার্শ্বে শায়বা বিন উসমানের ঘর, কা'বা শরীফের মালগুদাম, ডাক-পিয়নের ঘর, কোষাগার এবং খাত্তাব বিন নওফলের ঘর। ছাতার উত্তর পাশ দিয়ে উপরের দিকে বনি খোজাআ' গোত্রের ঘর-বাড়ী ছিল। মাঝখানে চলার পথ ছিল। এই পথ ধরে সুয়াইকা পর্যন্ত যাওয়া যেত। পথের উল্টো দিকে ছিল তামীম গোত্রের যেরারা পরিবারের ঘর-বাড়ী। সেখান থেকে কোয়াইকুআন (জাবালে হিন্দ) পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে শামীয়ার দিকে একটি সমতলভূমি রয়েছে। সেখান থেকে ডানে, দাইলামের দিকে একটি সমতল ভূমি রয়েছে। কোয়াইকুআন পাহাড় মসজিদে হারামের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এটি উত্তর দিকে হুজুন, পশ্চিম দিকে বিরে তুওয়া এবং দক্ষিণ দিকে হাররাতুল বাব ও শোবেকা পর্যন্ত বিস্তৃত। আজকাল 'কারারা' নামে পরিচিত ঐ স্থানের কাছেই ছিল দাইলাম। সেখানকার পাহাড় কেটে মোয়াল্লাহর বাজারে যাওয়ার একটি পথ ছিল। যোবাইর বিন আওয়াম এই পথটি তৈরী করেছিলেন। তিনি মোয়াল্লাহর পার্শ্বে তার বাগানের সাথে সুয়াইকার পার্শ্বে ক্রয় করা বাড়ীর সাথে সংযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ঐ পথটি তৈরী করেছিলেন।

এবার মসজিদে হারামের নিম্নভূমির বর্ণনায় আসা যাক। এখন মসজিদে হারামের বাইরে বাবে আজইয়াদ থেকে পূর্বমুখী কিংবা পূর্ব-দক্ষিণমুখী হতে হবে। মসজিদে হারামের আঙ্গিনায়, রোকনে ইয়ামানী থেকে যমযম কূপ বরাবর, বাবে আলীর দিকে বনি আ'য়েজ গোত্রের বাড়ী-ঘর ছিল। বাবে আলীর কাছে সাঈর জায়গার বামে, কা'বা শরীফের দিকে ছিল তাদের নেতৃস্থানীয় লোকজনের ঘর। মসজিদের আঙ্গিনা থেকে সাফা ও বাবে আজইয়াদ এর মধ্যবর্তী স্থানে আ'দী বিন কা'বের ঘর ছিল। পরে তিনি ও তাঁর লোকজন সেখান থেকে আরো দূরে সরে যান।

সাফা থেকে দক্ষিণ দিকে বাবে আজইয়াদ হয়ে যে রাস্তা চলে গেছে, সেখানে বনি আ'য়েজ গোত্রের ছায়াদার বিশ্রামাগার এবং কাপড় বিক্রির বাজার ছিল। এর কাছেই, নবুওয়াতের আগে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর অংশীদার সায়েব বিন সায়েব এর সাথে মিলে যে ব্যবসা করেন সেজন্য একটি ঘর নিয়েছিলেন।

এবার বাবুল আজইয়াদ থেকে সামনের দিকে মুখ করে কা'বা শরীফকে পেছনে রেখে দাঁড়ালে দু'টো সরু সমতল ভূমি পাওয়া যাবে। এর একটি চলে গেছে হাতের ডান দিকে। আজকাল সেটির নাম হচ্ছে বীরে বালীলা। এটাকে اجیاد كبير 'বড় আজইয়াদ' ও বলা হয়। অন্যটি চলে গেছে হাতের বাম দিকে। সেটির বর্তমান নাম হচ্ছে আস্-সাদ। এটাকে তারা 'ছোট আজইয়াদ'ও বলত।

বনু তামীম গোত্র, বাবে আজইয়াদ বরাবর কা'বা শরীফের অঙ্গনের আগ পর্যন্ত এই জায়গায় বাস করত। অপর দিকে, বনি মাখযুম গোত্র বড় আজইয়াদের প্রবেশমুখে বাস করত। তাদের পেছনে বাস করত আব্দ গোত্রের একটি দল। এদের পেছনে, অদূরেই ছিল আবু জাহল বিন হিশামের ঘর।

ছোট আজইয়াদে আ'দী বিন আবদ শামস গোত্রের লোকেরা বাস করত। সেখানে আবদুল্লাহ বিন জুদআনেরও ঘর ছিল। আর ঐ ঘরেই প্রখ্যাত সমাজকল্যাণ সংস্থা حلف الفضول "হিলফুল ফুজুল” অবস্থিত ছিল। এই ঘরেই, বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা একত্রিত হয়ে মক্কায় কোন জালেমকে বরদাশত না করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে। নবী করীম (সা) এর নবুওয়াতের পূর্বে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠে।

আজইয়াদ ছেড়ে প্রধান সড়ক ধরে দক্ষিণে মেসফালার দিকে রওনা হলে, بَابُ الوداع বাবুল বিদা'র কাছে ছিল হাযওয়ারা বাজার। এই বাজার থেকে মাতাফের সীমানা পর্যন্ত গম ও আটার বাজার ছিল। ঐ দিকেই সাঈফী গোত্রের লোকেরা বাস করত এবং আবদুদ্ দার পরিবারও সেখানে বাস করত। বনি মাখযুম গোত্রের একটি দলও সেখানে বাস করত।

সেই সময় শোবায়কা, হাররাতুল বাব কিংবা জারওয়ালে অল্প কিছু লোক বাস করত। জারওয়ালের পেছনের দিক যা মেসফালার সাথে মিশে গেছে, সেখানেও কিছু লোক বাস করত। পরবর্তীতে জাবালে উমরে লোকজনের বাস শুরু হয়। যদি আগে সেখানে অন্য কোন লোক বাস করত তাহলে, সেই গোত্রের নামানুসারেই পাহাড়টির নামকরণ করা হত। হযরত উমরের নামের সাথে পাহাড়টির নামকরণের দ্বারা বুঝা যায় যে, সেই পাহাড়ে হযরত উমরের সময় থেকেই বসবাস শুরু হয়েছে। সানীয়াও কোন লোক বসতি ছিল না। এর অপর নাম ছিল حزنة 'হায়না' এবং বর্তমান নাম হচ্ছে হাফায়ের। এর পেছনের দিক জারওয়ালের পেছনের দিকের সাথে সম্পৃক্ত। হাফায়ের حفر 'হাফর' থেকে এসেছে। এর অর্থ হল খনন করা। এইটি চার পাহাড়ের মধ্যবর্তী একটি নীচু স্থান। কোরাইশদের আমলে, শোবায়কা থেকে জারওয়ালের পেছনের দিকের সাথে যোগাযোগ রক্ষার উদ্দেশ্যে হাফায়েরের উপর দিয়ে পাহাড় কেটে পথচারীদের রাস্তা তৈরী করা হয়নি। বরং আব্বাসী আমলের খালেদ বারমকীর শাসনকালে এই রাস্তাটি বের করা হয়। তিনি জারওয়ালের পশ্চাতে একটি বাগান লাগিয়েছিলেন। সেই বাগানের সাথে সংক্ষিপ্ত যোগাযোগের জন্য এই রাস্তাটি পাহাড় কেটে বা খনন করে বের করেন। মেসফালার পেছনের দিকে মক্কার নিম্নভূমির শুরু। কিন্তু সেখানে তখন কোন লোক বসতির প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবে নগণ্যসংখ্যক লোকের বাসকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। মক্কার উপকণ্ঠে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত কিছু লোক বসতি ছিল।

জাহেলিয়াতের যুগে আকহাওয়ানায় লোক বসতি ছিল। সেখানে বাগান ও বিশ্রামগারায় ছিল। মক্কার বিভিন্ন জায়গায় অবসর বিনোদনের জন্য বাগান ও পার্কের ব্যবস্থা ছিল। মেসফালার কাছে, বড় জিয়াদ হয়ে, শেবে ঘামে অনুরূপ একটি বিনোদাগার ছিল। এ ছাড়াও মায়াবদাহ, হুজুন এবং শুহাদাহসহ বিভিন্ন জায়গায় খেজুর বাগান ছিল। সেগুলোর পার্শ্বে হাল্কা লোক বসতি ছিল তবে হারাম শরীফের পার্শ্বে, এর প্রতিবেশী হওয়ার প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে, লোকবসতি ঘন ছিল।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 কোরাইশ আমলে মক্কার ধর্মীয় দিক

📄 কোরাইশ আমলে মক্কার ধর্মীয় দিক


কুসাই বিন কিলাবের সময় থেকেই মক্কায় মূর্তিপূজা চালু হয়। খোজাআ' গোত্রের শাসক আমর বিন লুহাই সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে অবস্থিত দুটো মূর্তির পূজা করার আদেশ দেন। কুসাইর আমলে মূর্তি দুটোকে সেখান থেকে সরিয়ে আনা হয়। একটিকে কা'বা শরীফের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং অপরটিকে যমযম কূপের, কাছে রাখা হয়। জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা মূর্তি দুটোর কাছে পশু জবেহ করত এবং সেগুলোর গায়ে হাত লাগিয়ে কল্যাণ কামনা করত। পরবর্তীতে মূর্তিপূজা চরম রূপ ধারণ করে। এমনকি মক্কাবাসীরা মূর্তির চতুর্দিকে তওয়াফ শুরু করে।

বেদুঈনরা মূর্তি কিনে ঘরে নিয়ে যেত এবং তার পূজা করত। কোরাইশদের এমন কোন ঘর বাকী ছিল না, যেখানে কমপক্ষে একটি মূর্তি ছিল না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এবং ঘরে প্রবেশের সময় তারা এর গায়ে হাত মুছে বরকত হাসিলের চেষ্টা করত। তাছাড়া কাবা শরীফের ভেতরে তাদের ৩৬০টি মূর্তি ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন পর্যন্ত কা'বা শরীফে ঐ মূর্তিগুলো মওজুদ ছিল। জাহেলিয়াতের প্রসিদ্ধ মূর্তিগুলোর মধ্যে একটা ছিল হোবল। এটি কা'বা শরীফের মাঝামাঝি স্থানে ছিল। তায়েফের পথে নাখলা শামীয়া উপত্যকায় ছিল ওজ্জা নামক দেবতা। তায়েফে ছিল লাত নামক মূর্তি। সেটি ছিল মসজিদে ইবনে আব্বাসের কাছে 'মাগিবুস শামছ' নামক জায়গায়। লোহিত সাগরের তীরে, কাদীদ নামক স্থানে ছিল 'মানাত' নামক আরেকটি প্রসিদ্ধ মূর্তি। এমনকি, জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা কাবা শরীফ তওয়াফ করার সময় বলতঃ

وَاللَّاتُ وَالْعُزَّى - وَمَنَاةُ الثَّالِثَةُ الأُخْرَى - تِلْكَ الْغَرَانِيقُ الْعُلا . وَأَنَّ شَفَاعَتَهُنَّ لَتُرْتَجِى .
অর্থ : 'লাত, ওজ্জা ও ৩য় দেবতা মানাতের মত মহতী সুন্দরী দেবীর সুফারিশ কবুল হওয়ার আশা করা যায়।'

হোজাইল গোত্রের سواع 'সূয়া' নামক একটি মূর্তি ছিল। তারা এটির পূজা করত।

কা'বা শরীফে জাহেলিয়াতের লোকদের অনেকগুলো পাত্র ছিল। কোন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ হলে কিংবা কোন কাজ করার ইচ্ছা করলে, তারা সেগুলোতে 'হ্যাঁ, বা না সূচক বাণী লিখে, লটারীর মাধ্যমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। মূর্তিপ্রীতি তাদের মন মানসিকতায় পুরো বসে গিয়েছিল।

ঐতিহাসিকরা জাহেলিয়াতের যুগে আরবদের ধর্মীয় আচরণকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে ১حَلَّ ও حَمْسٌ 'হাল্লা' ও 'হাম্ম্স'। হাল্লা হচ্ছে, হারাম এলাকার বাইরের লোকদের পূজা অর্চনার পদ্ধতি সংক্রান্ত। আর হাম্স হচ্ছে, হারাম এলাকার বাসিন্দাদের পূজা-পার্বণ পদ্ধতি সংক্রান্ত। এই দলটি পূজা-পার্বনের ক্ষেত্রে চরমপন্থী বলে পরিচিত ছিল। কানানা, খোজাআ', আউস এবং খাযরাজ ইত্যাদি গোত্রসমূহ এই শেষোক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোরাইশরা এদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশী চরমপন্থী ছিল। এমনকি, তাদের কেউ হজ্ব কিংবা উমরাহ করার জন্য ইহরাম পরার পর, শত প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও পুনরায় নিজ ঘরে কিংবা বাগানে ফিরে যাওয়া পছন্দ করত না। তারা পেছনের দিকে ফিরে, নিজের পরিবারের লোকদের প্রতি তার প্রয়োজনীয় জিনিস দেয়ার আহবান জানাত। ইহরাম পরার পর তারা নিজেদের জন্য ঘি, দুধ, মাখন ও পশমী কাপড় পরিধান হারাম করে নিত।

হজ্জের সময় বহিরাগত হাজীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করত। কিন্তু মক্কার লোকেরা হারামের বাসিন্দা হিসেবে এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আরাফায় না গিয়ে নামেরায় অবস্থান করত এবং অন্যদের থেকে নিজেদেরকে পৃথক রাখত। তারা হারাম এলাকার বাইরের লোকদের জন্য তাদের আহমসী নামক কাপড় ক্রয় করা, ভাড়ায় নেয়া কিংবা ধার নেয়া ব্যতীত কা'বা শরীফের তওয়াফ করার অনুমতি দিত না। ঐ কাপড় সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে, বহিরাগত পুরুষদের জন্য দিনে এবং নারীদের জন্য রাত্রে উলঙ্গ তওয়াফ করার অনুমতি দিত। তারা মসজিদের বাইরে কাপড় খুলে আসত এবং সে কাপড় তাদের ফিরে আসার আগ পর্যন্ত কেউ স্পর্শ করত না। মক্কার কিছু সংখ্যক যুবক এই সুযোগের সদ্যবহার করত এবং তারা এ জাতীয় উলঙ্গ তওয়াফকারিণী মহিলার অপেক্ষায় থাকত। উলঙ্গ কোন তওয়াফকারিণী নারীকে দেখার পর পছন্দ হলে সেই যুবকটি নিজেও উলঙ্গ হয়ে, ঐ রমণীর সাথে তওয়াফ শুরু করে দিত। শেষ পর্যন্ত তাদের দুইজন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যেত। তাছাড়া, জাহেলিয়াতের যুগে অনেক নারী-পুরুষ কাবাশরীফে উলঙ্গ তওয়াফ করত। মহিলারা শুধু নিজের লজ্জাস্থানের উপর একটুকরো কাপড় বেঁধে রাখত। এছাড়াও, কোরাইশরা বহিরাগত লোকদের মক্কায় থাকা অবস্থায় সাথে নিয়ে আসা খাবার খাওয়ার অনুমতি দিত না। এর ফলে, বহিরাগত লোকদের মক্কার মেহমানখানা কিংবা বাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বাধ্য করা হত।

কোরাইশদের যুবতী মেয়েদেরকে বিয়ের বয়সে উপনীত হওয়ার পর ভাল করে সাজিয়ে-গুজিয়ে খোলাভাবে মাতাফে নিয়ে আসা হত এবং পরে ঘরে ফিরিয়ে নেয়া হত। বিয়ের আগ পর্যন্ত তাদের ঘরের বাইরে যেতে দেয়া হত না। এরপর যার সাথে বিয়ে হবে তার ঘর ছাড়া আর কোথাও যাওয়া তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। যুবতী মেয়েদেরকে হারাম শরীফে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হল, পাত্রদের সামনে পাত্রীকে পেশ করা। যেন তারা ভাল করে দেখতে পায় ও পরে বিয়ের পয়গাম পাঠায়। বিশেষ করে কাবা শরীফের পার্শ্বে পাত্রী দেখার মধ্যে অসদুদ্দেশ্য থাকতে পারে না। এটি একটি মহৎ ব্যবস্থা বলে তারা মনে করত।

তাদের তওয়াফের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন ধরনের। তারা তওয়াফের শুরুতে হাজারে আসওয়াদে চুমু খেত। তারপর কা'বা শরীফকে ডানে রেখে তওয়াফ শুরু করত। ৭ চক্কর তওয়াফ শেষে, হাজারে আসওয়াদকে চুমু দেয়ার পর 'নায়লা' মূর্তিতে চুমু খেত। তাদের তওয়াফ ছিল ইসলামের তওয়াফ থেকে ভিন্ন ধরনের। ইসলাম হাজারে আসওয়াদে চুমু খাওয়ার পর, কা'বা শরীফকে বামে রেখে তওয়াফের পদ্ধতি চালু করেছে।

জাহেলিয়াতের যুগে নারীদেরকে ঘৃণা ও অবমাননার চোখে দেখা হত। এজন্য তারা মেয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে অসন্তুষ্ট হত এবং তাদেরকে জীবন্ত কবর দিত। তাদের একজন মন্তব্যও করেছিল যে, دَفْنُ الْبَنَاتِ مِنَ الْمُكَرَّمَاتِ ‘মেয়েদেরকে দাফন করে দেয়া সম্মানের বিষয়।' অবশ্য তাদের মধ্যে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি এই ধারণার বিরোধী ছিলেন। এদের মধ্যে যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল আল কোরাইশী ৯৬টি মেয়েকে দাফনের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন।

কোরাইশরা জুতা পরে কা'বা শরীফে প্রবেশ করত। কিন্তু ওয়ালিদ বিন মুগীরা তাদেরকে জুতা খুলে কা'বা শরীফে প্রবেশ করার নির্দেশ দিল। ঋতুবতী মহিলারা কা'বা শরীফ ও মূর্তিগুলোকে স্পর্শ করত না। তারা এগুলো থেকে দূরে অবস্থান করত। কেউ নামায পড়তে চাইলে, কাবা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়ত এবং অবসরমত যতবার ইচ্ছা ততবার রুকু ও সেজদা করত। নামাযের রাকাত সংখ্যা ও রুকু-সেজদার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম-কানুন ছিল না।

কোরাইশদের মধ্যে মূর্তিপূজার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মমতও বিস্তার লাভ করেছিল। এর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে دَهْريّة 'দাহরিয়া' বা 'কালবাদ'। এই মতবাদ অনুযায়ী মানুষের ধ্বংসের জন্য 'যুগ' বা কালই একান্তভাবে দায়ী। এছাড়া গ্রহ-নক্ষত্র পূজাও তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই দলের মতে, মানুষের ভালমন্দের ব্যাপারে গ্রহনক্ষত্রের প্রভাবই প্রধানতঃ কার্যকর। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইহুদী ধর্ম এবং কেউ কেউ খৃস্টান ধর্মের কাছাকাছি মতবাদও পোষণ করত। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের ধর্মগুলোর প্রভাবে, কোরাইশদের মধ্যে এই সকল ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাদের যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ আসমানী কিতাবসমূহের অনুসরণ করেন তাঁরা হচ্ছেন ওয়ারাকা বিন নওফল, যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল, উমাইয়া বিন আলত, উমাইয়া বিন আওফ আল কানানী এবং হাশেম বিন আবদ মনাফ প্রমুখ। তাদের কেউ কেউ মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেন, এগুলো বর্জন করার জন্য লোকদের উপদেশ দেন এবং তারা পরকালের উত্থান ও বেহেশত-দোযখের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করতেন।

টিকাঃ
৩. তারীখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী, মক্কা।

কুসাই বিন কিলাবের সময় থেকেই মক্কায় মূর্তিপূজা চালু হয়। খোজাআ' গোত্রের শাসক আমর বিন লুহাই সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে অবস্থিত দুটো মূর্তির পূজা করার আদেশ দেন। কুসাইর আমলে মূর্তি দুটোকে সেখান থেকে সরিয়ে আনা হয়। একটিকে কা'বা শরীফের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং অপরটিকে যমযম কূপের, কাছে রাখা হয়। জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা মূর্তি দুটোর কাছে পশু জবেহ করত এবং সেগুলোর গায়ে হাত লাগিয়ে কল্যাণ কামনা করত। পরবর্তীতে মূর্তিপূজা চরম রূপ ধারণ করে। এমনকি মক্কাবাসীরা মূর্তির চতুর্দিকে তওয়াফ শুরু করে।

বেদুঈনরা মূর্তি কিনে ঘরে নিয়ে যেত এবং তার পূজা করত। কোরাইশদের এমন কোন ঘর বাকী ছিল না, যেখানে কমপক্ষে একটি মূর্তি ছিল না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এবং ঘরে প্রবেশের সময় তারা এর গায়ে হাত মুছে বরকত হাসিলের চেষ্টা করত। তাছাড়া কাবা শরীফের ভেতরে তাদের ৩৬০টি মূর্তি ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন পর্যন্ত কা'বা শরীফে ঐ মূর্তিগুলো মওজুদ ছিল। জাহেলিয়াতের প্রসিদ্ধ মূর্তিগুলোর মধ্যে একটা ছিল হোবল। এটি কা'বা শরীফের মাঝামাঝি স্থানে ছিল। তায়েফের পথে নাখলা শামীয়া উপত্যকায় ছিল ওজ্জা নামক দেবতা। তায়েফে ছিল লাত নামক মূর্তি। সেটি ছিল মসজিদে ইবনে আব্বাসের কাছে 'মাগিবুস শামছ' নামক জায়গায়। লোহিত সাগরের তীরে, কাদীদ নামক স্থানে ছিল 'মানাত' নামক আরেকটি প্রসিদ্ধ মূর্তি। এমনকি, জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা কাবা শরীফ তওয়াফ করার সময় বলতঃ

وَاللَّاتُ وَالْعُزَّى - وَمَنَاةُ الثَّالِثَةُ الأُخْرَى - تِلْكَ الْغَرَانِيقُ الْعُلا . وَأَنَّ شَفَاعَتَهُنَّ لَتُرْتَجِى .
অর্থ : 'লাত, ওজ্জা ও ৩য় দেবতা মানাতের মত মহতী সুন্দরী দেবীর সুফারিশ কবুল হওয়ার আশা করা যায়।'

হোজাইল গোত্রের سواع 'সূয়া' নামক একটি মূর্তি ছিল। তারা এটির পূজা করত।

কা'বা শরীফে জাহেলিয়াতের লোকদের অনেকগুলো পাত্র ছিল। কোন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ হলে কিংবা কোন কাজ করার ইচ্ছা করলে, তারা সেগুলোতে 'হ্যাঁ, বা না সূচক বাণী লিখে, লটারীর মাধ্যমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। মূর্তিপ্রীতি তাদের মন মানসিকতায় পুরো বসে গিয়েছিল।

ঐতিহাসিকরা জাহেলিয়াতের যুগে আরবদের ধর্মীয় আচরণকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে ১حَلَّ ও حَمْسٌ 'হাল্লা' ও 'হাম্ম্স'। হাল্লা হচ্ছে, হারাম এলাকার বাইরের লোকদের পূজা অর্চনার পদ্ধতি সংক্রান্ত। আর হাম্স হচ্ছে, হারাম এলাকার বাসিন্দাদের পূজা-পার্বণ পদ্ধতি সংক্রান্ত। এই দলটি পূজা-পার্বনের ক্ষেত্রে চরমপন্থী বলে পরিচিত ছিল। কানানা, খোজাআ', আউস এবং খাযরাজ ইত্যাদি গোত্রসমূহ এই শেষোক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোরাইশরা এদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশী চরমপন্থী ছিল। এমনকি, তাদের কেউ হজ্ব কিংবা উমরাহ করার জন্য ইহরাম পরার পর, শত প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও পুনরায় নিজ ঘরে কিংবা বাগানে ফিরে যাওয়া পছন্দ করত না। তারা পেছনের দিকে ফিরে, নিজের পরিবারের লোকদের প্রতি তার প্রয়োজনীয় জিনিস দেয়ার আহবান জানাত। ইহরাম পরার পর তারা নিজেদের জন্য ঘি, দুধ, মাখন ও পশমী কাপড় পরিধান হারাম করে নিত।

হজ্জের সময় বহিরাগত হাজীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করত। কিন্তু মক্কার লোকেরা হারামের বাসিন্দা হিসেবে এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আরাফায় না গিয়ে নামেরায় অবস্থান করত এবং অন্যদের থেকে নিজেদেরকে পৃথক রাখত। তারা হারাম এলাকার বাইরের লোকদের জন্য তাদের আহমসী নামক কাপড় ক্রয় করা, ভাড়ায় নেয়া কিংবা ধার নেয়া ব্যতীত কা'বা শরীফের তওয়াফ করার অনুমতি দিত না। ঐ কাপড় সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে, বহিরাগত পুরুষদের জন্য দিনে এবং নারীদের জন্য রাত্রে উলঙ্গ তওয়াফ করার অনুমতি দিত। তারা মসজিদের বাইরে কাপড় খুলে আসত এবং সে কাপড় তাদের ফিরে আসার আগ পর্যন্ত কেউ স্পর্শ করত না। মক্কার কিছু সংখ্যক যুবক এই সুযোগের সদ্যবহার করত এবং তারা এ জাতীয় উলঙ্গ তওয়াফকারিণী মহিলার অপেক্ষায় থাকত। উলঙ্গ কোন তওয়াফকারিণী নারীকে দেখার পর পছন্দ হলে সেই যুবকটি নিজেও উলঙ্গ হয়ে, ঐ রমণীর সাথে তওয়াফ শুরু করে দিত। শেষ পর্যন্ত তাদের দুইজন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যেত। তাছাড়া, জাহেলিয়াতের যুগে অনেক নারী-পুরুষ কাবাশরীফে উলঙ্গ তওয়াফ করত। মহিলারা শুধু নিজের লজ্জাস্থানের উপর একটুকরো কাপড় বেঁধে রাখত। এছাড়াও, কোরাইশরা বহিরাগত লোকদের মক্কায় থাকা অবস্থায় সাথে নিয়ে আসা খাবার খাওয়ার অনুমতি দিত না। এর ফলে, বহিরাগত লোকদের মক্কার মেহমানখানা কিংবা বাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বাধ্য করা হত।

কোরাইশদের যুবতী মেয়েদেরকে বিয়ের বয়সে উপনীত হওয়ার পর ভাল করে সাজিয়ে-গুজিয়ে খোলাভাবে মাতাফে নিয়ে আসা হত এবং পরে ঘরে ফিরিয়ে নেয়া হত। বিয়ের আগ পর্যন্ত তাদের ঘরের বাইরে যেতে দেয়া হত না। এরপর যার সাথে বিয়ে হবে তার ঘর ছাড়া আর কোথাও যাওয়া তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। যুবতী মেয়েদেরকে হারাম শরীফে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হল, পাত্রদের সামনে পাত্রীকে পেশ করা। যেন তারা ভাল করে দেখতে পায় ও পরে বিয়ের পয়গাম পাঠায়। বিশেষ করে কাবা শরীফের পার্শ্বে পাত্রী দেখার মধ্যে অসদুদ্দেশ্য থাকতে পারে না। এটি একটি মহৎ ব্যবস্থা বলে তারা মনে করত।

তাদের তওয়াফের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন ধরনের। তারা তওয়াফের শুরুতে হাজারে আসওয়াদে চুমু খেত। তারপর কা'বা শরীফকে ডানে রেখে তওয়াফ শুরু করত। ৭ চক্কর তওয়াফ শেষে, হাজারে আসওয়াদকে চুমু দেয়ার পর 'নায়লা' মূর্তিতে চুমু খেত। তাদের তওয়াফ ছিল ইসলামের তওয়াফ থেকে ভিন্ন ধরনের। ইসলাম হাজারে আসওয়াদে চুমু খাওয়ার পর, কা'বা শরীফকে বামে রেখে তওয়াফের পদ্ধতি চালু করেছে।

জাহেলিয়াতের যুগে নারীদেরকে ঘৃণা ও অবমাননার চোখে দেখা হত। এজন্য তারা মেয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে অসন্তুষ্ট হত এবং তাদেরকে জীবন্ত কবর দিত। তাদের একজন মন্তব্যও করেছিল যে, دَفْنُ الْبَنَاتِ مِنَ الْمُكَرَّمَاتِ ‘মেয়েদেরকে দাফন করে দেয়া সম্মানের বিষয়।' অবশ্য তাদের মধ্যে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি এই ধারণার বিরোধী ছিলেন। এদের মধ্যে যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল আল কোরাইশী ৯৬টি মেয়েকে দাফনের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন।

কোরাইশরা জুতা পরে কা'বা শরীফে প্রবেশ করত। কিন্তু ওয়ালিদ বিন মুগীরা তাদেরকে জুতা খুলে কা'বা শরীফে প্রবেশ করার নির্দেশ দিল। ঋতুবতী মহিলারা কা'বা শরীফ ও মূর্তিগুলোকে স্পর্শ করত না। তারা এগুলো থেকে দূরে অবস্থান করত। কেউ নামায পড়তে চাইলে, কাবা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়ত এবং অবসরমত যতবার ইচ্ছা ততবার রুকু ও সেজদা করত। নামাযের রাকাত সংখ্যা ও রুকু-সেজদার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম-কানুন ছিল না।

কোরাইশদের মধ্যে মূর্তিপূজার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মমতও বিস্তার লাভ করেছিল। এর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে دَهْريّة 'দাহরিয়া' বা 'কালবাদ'। এই মতবাদ অনুযায়ী মানুষের ধ্বংসের জন্য 'যুগ' বা কালই একান্তভাবে দায়ী। এছাড়া গ্রহ-নক্ষত্র পূজাও তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই দলের মতে, মানুষের ভালমন্দের ব্যাপারে গ্রহনক্ষত্রের প্রভাবই প্রধানতঃ কার্যকর। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইহুদী ধর্ম এবং কেউ কেউ খৃস্টান ধর্মের কাছাকাছি মতবাদও পোষণ করত। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের ধর্মগুলোর প্রভাবে, কোরাইশদের মধ্যে এই সকল ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাদের যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ আসমানী কিতাবসমূহের অনুসরণ করেন তাঁরা হচ্ছেন ওয়ারাকা বিন নওফল, যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল, উমাইয়া বিন আলত, উমাইয়া বিন আওফ আল কানানী এবং হাশেম বিন আবদ মনাফ প্রমুখ। তাদের কেউ কেউ মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেন, এগুলো বর্জন করার জন্য লোকদের উপদেশ দেন এবং তারা পরকালের উত্থান ও বেহেশত-দোযখের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করতেন।

টিকাঃ
৩. তারীখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী, মক্কা।

কুসাই বিন কিলাবের সময় থেকেই মক্কায় মূর্তিপূজা চালু হয়। খোজাআ' গোত্রের শাসক আমর বিন লুহাই সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে অবস্থিত দুটো মূর্তির পূজা করার আদেশ দেন। কুসাইর আমলে মূর্তি দুটোকে সেখান থেকে সরিয়ে আনা হয়। একটিকে কা'বা শরীফের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং অপরটিকে যমযম কূপের, কাছে রাখা হয়। জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা মূর্তি দুটোর কাছে পশু জবেহ করত এবং সেগুলোর গায়ে হাত লাগিয়ে কল্যাণ কামনা করত। পরবর্তীতে মূর্তিপূজা চরম রূপ ধারণ করে। এমনকি মক্কাবাসীরা মূর্তির চতুর্দিকে তওয়াফ শুরু করে।

বেদুঈনরা মূর্তি কিনে ঘরে নিয়ে যেত এবং তার পূজা করত। কোরাইশদের এমন কোন ঘর বাকী ছিল না, যেখানে কমপক্ষে একটি মূর্তি ছিল না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এবং ঘরে প্রবেশের সময় তারা এর গায়ে হাত মুছে বরকত হাসিলের চেষ্টা করত। তাছাড়া কাবা শরীফের ভেতরে তাদের ৩৬০টি মূর্তি ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন পর্যন্ত কা'বা শরীফে ঐ মূর্তিগুলো মওজুদ ছিল। জাহেলিয়াতের প্রসিদ্ধ মূর্তিগুলোর মধ্যে একটা ছিল হোবল। এটি কা'বা শরীফের মাঝামাঝি স্থানে ছিল। তায়েফের পথে নাখলা শামীয়া উপত্যকায় ছিল ওজ্জা নামক দেবতা।

তায়েফে ছিল লাত নামক মূর্তি। সেটি ছিল মসজিদে ইবনে আব্বাসের কাছে 'মাগিবুস শামছ' নামক জায়গায়। লোহিত সাগরের তীরে, কাদীদ নামক স্থানে ছিল 'মানাত' নামক আরেকটি প্রসিদ্ধ মূর্তি। এমনকি, জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা কাবা শরীফ তওয়াফ করার সময় বলতঃ
وَاللَّاتُ وَالْعُزَّى - وَمَنَاةُ الثَّالِثَةُ الأُخْرَى - تِلْكَ الْغَرَانِيقُ الْعُلا . وَأَنَّ شَفَاعَتَهُنَّ لَتُرْتَجِى .
অর্থ : 'লাত, ওজ্জা ও ৩য় দেবতা মানাতের মত মহতী সুন্দরী দেবীর সুফারিশ কবুল হওয়ার আশা করা যায়।'

হোজাইল গোত্রের سواع 'সূয়া' নামক একটি মূর্তি ছিল। তারা এটির পূজা করত। কা'বা শরীফে জাহেলিয়াতের লোকদের অনেকগুলো পাত্র ছিল। কোন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ হলে কিংবা কোন কাজ করার ইচ্ছা করলে, তারা সেগুলোতে 'হ্যাঁ, বা না সূচক বাণী লিখে, লটারীর মাধ্যমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। মূর্তিপ্রীতি তাদের মন মানসিকতায় পুরো বসে গিয়েছিল।

ঐতিহাসিকরা জাহেলিয়াতের যুগে আরবদের ধর্মীয় আচরণকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে ১حَلَّ ও حَمْسٌ 'হাল্লা' ও 'হাম্ম্স'। হাল্লা হচ্ছে, হারাম এলাকার বাইরের লোকদের পূজা অর্চনার পদ্ধতি সংক্রান্ত। আর হাম্স হচ্ছে, হারাম এলাকার বাসিন্দাদের পূজা-পার্বণ পদ্ধতি সংক্রান্ত। এই দলটি পূজা-পার্বনের ক্ষেত্রে চরমপন্থী বলে পরিচিত ছিল। কানানা, খোজাআ', আউস এবং খাযরাজ ইত্যাদি গোত্রসমূহ এই শেষোক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোরাইশরা এদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশী চরমপন্থী ছিল। এমনকি, তাদের কেউ হজ্ব কিংবা উমরাহ করার জন্য ইহরাম পরার পর, শত প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও পুনরায় নিজ ঘরে কিংবা বাগানে ফিরে যাওয়া পছন্দ করত না। তারা পেছনের দিকে ফিরে, নিজের পরিবারের লোকদের প্রতি তার প্রয়োজনীয় জিনিস দেয়ার আহবান জানাত। ইহরাম পরার পর তারা নিজেদের জন্য ঘি, দুধ, মাখন ও পশমী কাপড় পরিধান হারাম করে নিত।

হজ্জের সময় বহিরাগত হাজীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করত। কিন্তু মক্কার লোকেরা হারামের বাসিন্দা হিসেবে এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আরাফায় না গিয়ে নামেরায় অবস্থান করত এবং অন্যদের থেকে নিজেদেরকে পৃথক রাখত। তারা হারাম এলাকার বাইরের লোকদের জন্য তাদের আহমসী নামক কাপড় ক্রয় করা, ভাড়ায় নেয়া কিংবা ধার নেয়া ব্যতীত কা'বা শরীফের তওয়াফ করার অনুমতি দিত না। ঐ কাপড় সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে, বহিরাগত পুরুষদের জন্য দিনে এবং নারীদের জন্য রাত্রে উলঙ্গ তওয়াফ করার অনুমতি দিত। তারা মসজিদের বাইরে কাপড় খুলে আসত এবং সে কাপড় তাদের ফিরে আসার আগ পর্যন্ত কেউ স্পর্শ করত না। মক্কার কিছু সংখ্যক যুবক এই সুযোগের সদ্যবহার করত এবং তারা এ জাতীয় উলঙ্গ তওয়াফকারিণী মহিলার অপেক্ষায় থাকত। উলঙ্গ কোন তওয়াফকারিণী নারীকে দেখার পর পছন্দ হলে সেই যুবকটি নিজেও উলঙ্গ হয়ে, ঐ রমণীর সাথে তওয়াফ শুরু করে দিত। শেষ পর্যন্ত তাদের দুইজন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যেত। তাছাড়া, জাহেলিয়াতের যুগে অনেক নারী-পুরুষ কাবাশরীফে উলঙ্গ তওয়াফ করত। মহিলারা শুধু নিজের লজ্জাস্থানের উপর একটুকরো কাপড় বেঁধে রাখত। এছাড়াও, কোরাইশরা বহিরাগত লোকদের মক্কায় থাকা অবস্থায় সাথে নিয়ে আসা খাবার খাওয়ার অনুমতি দিত না। এর ফলে, বহিরাগত লোকদের মক্কার মেহমানখানা কিংবা বাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বাধ্য করা হত।

কোরাইশদের যুবতী মেয়েদেরকে বিয়ের বয়সে উপনীত হওয়ার পর ভাল করে সাজিয়ে-গুজিয়ে খোলাভাবে মাতাফে নিয়ে আসা হত এবং পরে ঘরে ফিরিয়ে নেয়া হত। বিয়ের আগ পর্যন্ত তাদের ঘরের বাইরে যেতে দেয়া হত না। এরপর যার সাথে বিয়ে হবে তার ঘর ছাড়া আর কোথাও যাওয়া তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। যুবতী মেয়েদেরকে হারাম শরীফে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হল, পাত্রদের সামনে পাত্রীকে পেশ করা। যেন তারা ভাল করে দেখতে পায় ও পরে বিয়ের পয়গাম পাঠায়। বিশেষ করে কাবা শরীফের পার্শ্বে পাত্রী দেখার মধ্যে অসদুদ্দেশ্য থাকতে পারে না। এটি একটি মহৎ ব্যবস্থা বলে তারা মনে করত।

তাদের তওয়াফের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন ধরনের। তারা তওয়াফের শুরুতে হাজারে আসওয়াদে চুমু খেত। তারপর কা'বা শরীফকে ডানে রেখে তওয়াফ শুরু করত। ৭ চক্কর তওয়াফ শেষে, হাজারে আসওয়াদকে চুমু দেয়ার পর 'নায়লা' মূর্তিতে চুমু খেত। তাদের তওয়াফ ছিল ইসলামের তওয়াফ থেকে ভিন্ন ধরনের। ইসলাম হাজারে আসওয়াদে চুমু খাওয়ার পর, কা'বা শরীফকে বামে রেখে তওয়াফের পদ্ধতি চালু করেছে।

জাহেলিয়াতের যুগে নারীদেরকে ঘৃণা ও অবমাননার চোখে দেখা হত। এজন্য তারা মেয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে অসন্তুষ্ট হত এবং তাদেরকে জীবন্ত কবর দিত। তাদের একজন মন্তব্যও করেছিল যে, دَفْنُ الْبَنَاتِ مِنَ الْمُكَرَّمَاتِ ‘মেয়েদেরকে দাফন করে দেয়া সম্মানের বিষয়।' অবশ্য তাদের মধ্যে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি এই ধারণার বিরোধী ছিলেন। এদের মধ্যে যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল আল কোরাইশী ৯৬টি মেয়েকে দাফনের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন।

কোরাইশরা জুতা পরে কা'বা শরীফে প্রবেশ করত। কিন্তু ওয়ালিদ বিন মুগীরা তাদেরকে জুতা খুলে কা'বা শরীফে প্রবেশ করার নির্দেশ দিল। ঋতুবতী মহিলারা কা'বা শরীফ ও মূর্তিগুলোকে স্পর্শ করত না। তারা এগুলো থেকে দূরে অবস্থান করত। কেউ নামায পড়তে চাইলে, কাবা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়ত এবং অবসরমত যতবার ইচ্ছা ততবার রুকু ও সেজদা করত। নামাযের রাকাত সংখ্যা ও রুকু-সেজদার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম-কানুন ছিল না।

কোরাইশদের মধ্যে মূর্তিপূজার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মমতও বিস্তার লাভ করেছিল। এর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে دَهْريّة 'দাহরিয়া' বা 'কালবাদ'। এই মতবাদ অনুযায়ী মানুষের ধ্বংসের জন্য 'যুগ' বা কালই একান্তভাবে দায়ী। এছাড়া গ্রহ-নক্ষত্র পূজাও তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই দলের মতে, মানুষের ভালমন্দের ব্যাপারে গ্রহনক্ষত্রের প্রভাবই প্রধানতঃ কার্যকর। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইহুদী ধর্ম এবং কেউ কেউ খৃস্টান ধর্মের কাছাকাছি মতবাদও পোষণ করত। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের ধর্মগুলোর প্রভাবে, কোরাইশদের মধ্যে এই সকল ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাদের যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ আসমানী কিতাবসমূহের অনুসরণ করেন তাঁরা হচ্ছেন ওয়ারাকা বিন নওফল, যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল, উমাইয়া বিন আলত, উমাইয়া বিন আওফ আল কানানী এবং হাশেম বিন আবদ মনাফ প্রমুখ। তাদের কেউ কেউ মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেন, এগুলো বর্জন করার জন্য লোকদের উপদেশ দেন এবং তারা পরকালের উত্থান ও বেহেশত-দোযখের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00