📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মক্কায় খোজাআ’ গোত্রের শাসন

📄 মক্কায় খোজাআ’ গোত্রের শাসন


জোরহোম গোত্র মক্কায় পাপাচার শুরু করে, বহিরাগত লোকদের উপর জুলুম-নির্যাতন আরম্ভ করে, কা'বা শরীফের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত উপহার সামগ্রী ভোগ করা শুরু করে এবং কাবা শরীফের ভেতরে জেনা-ব্যভিচারের সূচনা করে। তখন আল্লাহ তাদের উপর ইয়েমেনের কাহতান সম্প্রদায়ের 'খোজাআ' বংশকে বিজয়ী করেন এবং জোরহোম গোত্রকে পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। এই ঘটনা ৩ শত খৃষ্টাব্দের শেষ কিংবা ৪শ' খৃস্টাব্দের প্রথমে সংঘটিত হয়।

আমর বিন মাউসামা প্রখ্যাত কবি ইমরাউল কায়েসের বংশধর এবং কাহতানী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তিনি দক্ষিণ আরবের অধিবাসী ছিলেন। প্রখ্যাত আরম বন্যার কারণে তিনি ও তাঁর বংশের লোকেরা নিজ এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন এবং এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। যেখানেই তাঁরা গিয়েছেন সেখানেই তারা স্থানীয় লোকদের উপর বিজয়ী হয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁরা উত্তম-জায়গার তালাশে মক্কা আসেন। তাঁরা মক্কার শাসক ২য় মোদাদকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর আহবান জানান। কিন্তু মোদাদ তা অস্বীকার করেন। ফলে তাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং তিন দিন পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। যুদ্ধে জোরহোম গোত্র পরাজিত হয় এবং দেশত্যাগী ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ জীবিত নেই। তখন থেকেই মক্কায় 'খোজাআ' গোত্রের শাসন শুরু হয়। নতুন শাসকদের কাছে বনী ইসমাঈলরা আসে এবং মক্কায় থাকার অনুমতি চায়। ২য় মোদাদের ছেলে হারেসের পক্ষে মক্কা ত্যাগ করা খুবই কষ্ট হচ্ছিল। তিনি পুনরায় মক্কায় বাস করার আগ্রহ নিয়ে 'খোজাআ' গোত্রের কাছে অনুমতি চান। খোজাআ গোত্র অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। 'খোজাআ' গোত্রের আমর বিন লুহাই মক্কার শাসক নিযুক্ত হন। তিনিই প্রথম মক্কায় মোটা-তাজা উট জবাই করে এর সুরুয়ার সাথে রুটি মিশ্রিত করে প্রখ্যাত আরব খাবার 'সারীদ' তৈরি করে হাজীদেরকে খাওয়ান এবং প্রত্যেক হাজীকে ইয়েমেনের তৈরি ৩টি চাদর উপহার দেন। তিনিই পরবর্তীতে কা'বা শরীফের চতুর্দিকে বিভিন্ন কুসংস্কার চালু করেন, কা'বাঘরের চতুষ্পার্শ্বে মূর্তি বসান এবং সুদূর ইয়েমেন থেকে অভিশপ্ত হোবল দেবতাকে এখানে নিয়ে আসেন। এখানেই কোরাইশ ও আরবরা তীর দ্বারা ভাগ্য পরীক্ষা করত। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর দীনের বিকৃতি সাধন করেন।

আমর বিন লুহাই ও তাঁর বংশধররা ৫শ' খৃস্টাব্দ পর্যন্ত কা'বা শরীফের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তারা কা'বা শরীফের কোনকিছু নষ্ট করেনি এবং এতে কোন সংস্কার বা নতুন নির্মাণও করেনি।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 আবরাহা বাদশাহর কা’বা ধংস অভিযান

📄 আবরাহা বাদশাহর কা’বা ধংস অভিযান


রাসূলুল্লাহ (সা) এর যে বছর জন্ম হয় সে বছর মহরম মাসে আবরাহার হস্তিবাহিনী কাবা আক্রমণ করতে এসে ধ্বংস হয়। আর রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মগ্রহণ করেন রবিউল আউয়াল মাসে। রাসূলুল্লাহ (সা) ৫৭০ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। কারো কারো মতে, হাতী বাহিনীর ঘটনার ৫০ দিন পর রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মগ্রহণ করেন। তখন মক্কার সরদার ছিলেন আবদুল মুত্তালিব।

আবরাহা শব্দটি সুরিয়ানী আব্রাহাম শব্দের হাবশী উচ্চারণ হতে পারে। ইয়েমেনে আবরাহার ক্ষমতা পাকাপোক্ত হওয়ার পর সে দুটো উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কাজ শুরু করে। তখন পৃথিবীতে দুটো বৃহৎ শক্তি ছিল। রোমান ও পারস্য শক্তি। রোমান সম্রাট খৃষ্টান সাম্রাজ্যের অধিকারী। হাবসা (ইথিওপিয়া) হচ্ছে রোমান সম্রাটের মিত্র শক্তি আর ইয়েমেন হচ্ছে হাবশার খৃষ্টান সরকারের প্রভাবিত দেশ। আবরাহার লক্ষ্য ছিল আরবদেশে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার করা এবং আরবদের প্রাচ্যদেশসহ অন্যান্য দেশে পরিচালিত বাণিজ্য করায়ত্ত করা।

খৃষ্টান মিশনারী তৎপরতার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আবরাহা ইয়েমেনের রাজধানী সানআয় একটি গীর্জা তৈরি করে। এর নাম হচ্ছে কুলাইস গীর্জা। মুহাম্মদ বিন ইসহাক লিখেছেন, গীর্জা তৈরির পর সে হাবশার বাদশাহকে লিখে, আমি কা'বা হতে আরবদের হজ্জকে এই গীর্জায় অবশ্যই স্থানান্তরিত করব। ইয়েমেনে একথা প্রচার করে দিয়ে সে অপেক্ষা করতে লাগল, কোন আরব একথা শুনে রাগ করে কিছু করে বসলে তা মক্কা আক্রমণের সরাসরি কারণ ও অজুহাত হয়ে দাঁড়াবে। ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন, এই ঘোষণায় রাগান্বিত হয়ে- কানানা গোত্রের একজন আরব গীর্জায় পেশাব-পায়খানা করে দেয়। মুকাতিল বিন সুলায়মানের মতে কয়েকজন আরব রাগান্বিত হয়ে গীর্জায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনার রেশ ধরে বাদশা আবরাহা মক্কা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

৫৭০ খৃষ্টাব্দে, আবরাহা ৬০ হাজার সৈন্য এবং ১৩টি বা ৯টি হাতী সহকারে কাবা ধ্বংসের অভিযানে রওয়ানা করে। পথে তায়েফসহ কয়েক জায়গায় যুদ্ধের মাধ্যমে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও সে অগ্রসর হয়। মুগাম্মাছে আসার পর তার অগ্রবাহিনীকে পাঠিয়ে দেয় এবং কোরাইশদের কাছে একজন দূত পাঠিয়ে খবর দেয় যে, কোরাইশরা আলোচনার প্রয়োজন বোধ করলে তা করতে পারে। আবদুল মুত্তালিব গিয়ে আবরাহার সাথে দেখা করেন এবং তার বাহিনী কর্তৃক অপহৃত নিজের উটগুলো ফেরত চান। আবরাহা এতে আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করেন, আপনি তো শুধু আপনার লুঠকৃত উট ফেরত চাইলেন কিন্তু কাবা সম্পর্কে কিছুই বললেন না। উত্তরে আবদুল মুত্তালিব বলেন, এই ঘরের একজন রব আছেন। তিনিই ঘরটিকে রক্ষা করবেন। এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করণীয় নেই। ইবনে ইসহাক এই বর্ণনা দেন। অপর দিকে ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় আবদুল মুত্তালিবের উটের দাবীর কোন কথা উল্লেখ নেই। তিনি বলেন, আবরাহা যখন আরাফার অদূরে সিফাহ নামক স্থানে অবস্থান করেন তখন আবদুল মুত্তালিব তার কাছে হাজির হয়ে বলেন, আপনার এই পর্যন্ত আসার কি দরকার ছিল? কোন কিছু দরকার হলে খবর দিলে আমরাই পাঠিয়ে দিতাম। আবরাহা বলল, আমি কাবাকে ধ্বংস করার জন্য এসেছি। তখন আবদুল মুত্তালিব বলেন, এটি আল্লাহর ঘর। আজ পর্যন্ত এই ঘরের উপর তিনি কাউকে চড়াও হতে দেননি। তাই আপনিও কোনকিছু চাইলে তা নিয়ে ফেরত যান। কিন্তু আবরাহা তাতে রাজী না হয়ে আবদুল মুত্তালিবকে পেছনে রেখে তার বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়।

উভয় বর্ণনার মাধ্যমে একটি সত্য পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, মক্কার লোকেরা আবরাহা বাদশাহর বাহিনীকে বাধা দেয়নি এবং কোন প্রতিরোধও গড়ে তোলেনি। আর এদের পক্ষে আবরাহার ৬০ হাজার সৈন্যের এত বড় বাহিনীর মোকাবিলা করাও সম্ভব ছিল না। আহযাবের যুদ্ধে তারা ইহুদীদেরকে সহ সকল শক্তি সামর্থ যোগাড় করার পর মাত্র ১০/১২ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। অবশ্য তখন আবরাহার হস্তিবাহিনীর ঘটনার পর ৫৭ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। তাহলে, ৫৭ বছর আগে তারা এতবড় আবরাহা বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় সৈন্যসামন্ত পাবে কোথায়?

ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় আরো এসেছে যে, আবদুল মুত্তালিব অন্যান্য কোরাইশ নেতাদেরকে নিয়ে কাবা শরীফে উপস্থিত হন এবং কাবার কড়া ধরে আল্লাহর কাছে এই ঘর রক্ষার দোয়া করেন। তখন কাবায় ৩৬০টি মূর্তি ছিল। কিন্তু তারা ঐ মূর্তিদের কাছে এই ঘর কাবা রক্ষার কোন আবেদন জানায়নি। তারা জানত যে, ঐগুলোর কোন ক্ষমতা নেই তা সত্ত্বেও অযথা সেগুলোর পূজা করত। আল্লাহর কাছে ঐ সকল দোয়া করার পর আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর সাথীরা পাহাড়ে আশ্রয় নেয়।

এদিকে আবরাহা মক্কায় প্রবেশ করার জন্য যে হাতীর উপর সওয়ার ছিল তা সবার আগে চলছিল। হাতীগুলো হঠাৎ করে মুহাসসির উপত্যকায় বসে পড়ল। হাতীগুলোকে চাবুক দিয়ে আঘাত করতে করতে আহত করা হল। তারা একবিন্দুও কাবার উদ্দেশ্যে সামনের দিকে এগুতে চায় না। কিন্তু যখন তাদেরকে বাকী তিনদিকে চালানোর চেষ্টা করা হয় তখন তারা দৌড়াতে থাকে। মক্কার দিকে এক কদমও অগ্রসর হয় না।

ইতিমধ্যেই দেখতে না দেখতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী ঠোঁট ও পাঞ্জায় করে পাথর টুকরো নিয়ে উড়ে এল এবং আবরাহা বাহিনীর উপর পাথরকুচির বৃষ্টি বর্ষণ করতে লাগল। যার উপরই এই পাথরকুচি পড়ত তার শরীর গলে যেত। ইবনে ইসহাক এবং ইকরামার মতে, পাথরকুচির স্পর্শ লাগলেই শরীরে বসন্ত রোগ দেখা দিত। ফলে গোটা আরব দেশে ঐ বছরেই প্রথম বসন্তের ব্যাপক প্রকোপ দেখা দেয়। ইবনে আব্বাসের মতে পাথরকুচি যার উপরই পড়ত তার শরীরে ভয়াবহ চুলকানী শুরু হত, চামড়া ফেটে যেত এবং মাংস ঝরে পড়ত। স্বয়ং আবরাহারই এই অবস্থা দেখা দিল। তার শরীরের রক্ত মাংস ঝরে পড়া শুরু হল। যেখানেই একটি পাথরকুচি পড়ত সেখান থেকেই পুঁজ ও রক্ত বের হত। এরকম ভয়াবহ অবস্থা থেকে তারা ইয়েমেনের দিকে ছুটে পালাতে লাগল এবং পথে পথে মরে পড়ে থাকল। আতা বিন ইয়াসার বলেছেন, তার সব লোক এক সাথে মারা যায়নি।

আবরাহার একজন মন্ত্রী এই ঘটনা বর্ণনা করার জন্য হাবশায় বাদশাহর দরবারে গেল এবং তার মাথার উপর একটি পাখীও উড়ছিল। সে যখন হাবশার বাদশাহর কাছে এ ঘটনা বর্ণনা শেষ করল, তখন পাখিটি তার উপর একই পাথরকুচি বর্ষণ করল এবং সে সেখানেই মারা গেল যা হাবশার বাদশাহ স্বচক্ষে দেখেন।

আল্লাহ তাঁর কুদরত দিয়ে কাবা শরীফকে রক্ষা করেন এবং আবরাহা বাহিনীকে পরাজিত করেন। যে পাখীগুলো ঐ অভিযানে অংশগ্রহণ করে সেগুলো লোহিত সাগরের দিক থেকে এসেছিল। সাঈদ বিন যোবায়ের বলেন, এ ধরনের পাখী আগেও দেখা যায়নি এবং পরেও আর কখনও দেখা যায়নি। ইবনে আব্বাস বলেন, পাখীগুলোর ঠোঁট পাখীর মতই ছিল কিন্তু তাদের পাঞ্জা ছিল কুকুরের মত। প্রত্যেকটা পাখীর ঠোঁটে একটি এবং পাঞ্জায় দুটো করে পাথর কুচি ছিল। মক্কার কোন কোন লোকের কাছে দীর্ঘদিন পর্যন্ত ঐ পাথরকুচির নমুনা সংরক্ষিত ছিল। পাথরগুলো মটরশুঁটির দানার মত এবং কালচে লাল ছিল। ইবনে মারদুইয়ার মতে, ঐগুলো ছাগলের লাদের সমান ছিল। এই সকল বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, সকল পাথরকুচি একই সমান ছিল না। কোনটা ছোট এবং কোনটা বড় ছিল।

কারুর মতে সেই পাখিগুলো ছিল আবাবিল। সেগুলো আকারে খুবই ছোট। অন্যদের মতে, আবাবীল অর্থ ঝাঁকে ঝাঁকে। অগণিত ছোট পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে এসে আবরাহার বাহিনীকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। যাই হোক, আবরাহা বাহিনী পর্যুদস্ত হওয়ার পর কোরাইশরা তাদের অর্থ-সম্পদ, পশু, হাতিয়ার, নগদ অর্থ ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী লাভ করে। আবদুল মুত্তালিব আবরাহা বাহিনীর সম্পদ ও সোনা লাভ করে পরবর্তীতে ধনী হয়ে গেলেন।

আল্লাহ আবরাহা বাহিনীকে ধ্বংস করেই ক্ষান্ত হননি। তারপর তিন-চার বছরের মধ্যে ইয়েমেনের বিভিন্ন গোত্রের সরদাররা বিদ্রোহ ঘোষণা করল এবং ইয়েমেনের উপর হাবশার শাসন এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি খতম হয়ে গেল। হস্তি বাহিনীর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর ইয়েমেনে তাদের শক্তি ও ক্ষমতা শেষ হয়ে গেল। ৫৭৫ খৃষ্টাব্দে, সাইফ বিন যি-ইয়াজান নামক একজন ইয়েমেনী সরদার পারস্য সম্রাটের সাহায্য চাওয়ায় মাত্র ১ হাজার পারসীয় সৈন্য ৬টি জাহাজে চেপে ইয়েমেনে আসে এবং সেখান থেকে হাবশী শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটায়।

এই ঘটনাটিই আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা ফীলে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন,
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحِبِ الْفِيلِ لَا أَلَمْ يَجْعَلْ كَيْدَهُمْ فِي تَضْلِيل وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْرًا أَبَابِيلَ لَا تَرْمِيهِمْ بِحِجَارَةٍ مِّنْ سِجَيْلِ لا فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفُ مَا كُول .
অর্থ: 'তুমি কি দেখনি তোমার আল্লাহ হস্তিবাহিনীর সাথে কি করেছেন? তিনি কি তাদের চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে পুরো নিষ্ফল করে দেননি? তিনি তাদের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী পাঠিয়ে দিলেন যা তাদের উপর পাকা মাটির পাথর নিক্ষেপ করছিল। ফলে তাদের অবস্থা এমন করে দিল যেমন জন্তু জানোয়ারের ভক্ষণ করা ভূষি।'

টিকাঃ
৭. ফী রেহাবিল বাইতিল হারাম, ডঃ মোহাম্মদ আলাওয়ী মালেক।
৮. প্রাগুক্ত।
৯. তাফহীমুল কোরআন, সূরা ফীল, সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 আইয়ামে জাহেলিয়াতের বর্বরতার রূপ

📄 আইয়ামে জাহেলিয়াতের বর্বরতার রূপ


হযরত ইবরাহীম (আ) নিজ পুত্র, ইসমাইল (আ) সহ কাবা নির্মাণ করেন এবং উভয়েই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকেন। পরে তার বংশধরগণ কিছুদিন ইসলামের পথে চলেছে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই তারা তাদের নবীদের শিক্ষা ও প্রদর্শিত পথ ভুলে গিয়ে জাহেলিয়াতের গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা কম-বেশী দু'হাজার বৎসর পর্যন্ত বিরাজমান ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে আরবদেশে কোন নবীর আবির্ভাব হয়নি। তারপর হযরত ইবরাহীম (আ) এর দোয়া কবুল হল এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এসে জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে মানুষকে উদ্ধার করেন। ইবরাহীম (আ) দোয়া করেছিলেন:
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ .
অর্থ: 'হে আল্লাহ এই জাতির মধ্য থেকেই একজন নবী পাঠাও, যিনি তাদেরকে তোমার বাণী শোনাবে, জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা শিক্ষা দিবে এবং তাদের নৈতিক চরিত্র সংশোধন করবে।' (আল বাকারা ১২৯)। হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর নবুওত হযরত ইবরাহীম (আ) এর দোয়ারই ফসল। এখন আসুন, আমরা জাহেলিয়াতের বর্বর আচরণ সম্পর্কে কিছু আলোচনা করি।

আল্লাহর একত্ববাদ ও সার্বভৌমত্বের প্রচারের জন্য যে কাবাঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই কাবার ভেতরই শত শত মূর্তি ও দেবতা ঢুকানো হল। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) এর ভেতর থেকে ৩৬০টি মূর্তি সরান। দুর্বৃত্তরা স্বয়ং হযরত ইবরাহীম এবং ইসমাইল (আ) এর মূর্তি তৈরি করে তা কাবার ভেতর রেখে দেয়। এ ছাড়াও তাতে লাত, মানাত, ওজ্জার ২য় সংস্করণ, আসাফ, নায়েলা, হোবল, নসর, ইয়াগুসসহ অসংখ্য মূর্তি ছিল। প্রতিমা পূজা এমন পর্যায়ে পৌঁছলো যে, পাথর না পেলে, পানি ও মাটি মিশিয়ে একটি প্রতিমূর্তি তৈরি করে এর উপর ছাগলের দুধ ছিটিয়ে দিলেই তাদের মতে সেই নিষ্প্রাণ পিণ্ডটি উপাস্য হয়ে যেত এবং তারা এরই পূজা করত।

সাইয়েদ কুতুব উল্লেখ করেছেন যে, প্রত্যেক গোত্রের একটি করে মূর্তি ছিল। এমনকি প্রত্যেক শহর ও লোকালয়ের পৃথক পৃথক মূর্তি ছিল।

আলকিন্দি লিখেছেন, মক্কার প্রত্যেক ঘরে একটি করে মূর্তি ছিল। মক্কার কোন লোক সফরে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তার সর্বশেষ কাজ ছিল পারিবারিক মূর্তির সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাকে প্রণাম জানানো। সফর থেকে ফিরে আসার পরও প্রথম কাজটি ছিল ঘরের মূর্তিটিকে প্রণাম করা।

মূর্তি সংগ্রহ করা এবং এদেরকে রাখার জন্য মন্দির তৈরি করার ব্যাপারে লোকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল। যারা অনুরূপ পাথর বা মূর্তি সংগ্রহ করতে পারত না তারা কাবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তির প্রণাম করত। ঐ সকল মূর্তি বা পাথরগুলোকে 'আনসাব' বলা হত।

বুখারী শরীফে আবু রাজোয়া আল-আতারিদী থেকে বর্ণিত আছে যে, 'আমরা পাথরপূজা করতাম। যখন আমরা নতুন ভাল পাথর পেতাম তখন পুরাতন পাথরটি ফেলে দিতাম। কোন পাথর না পেলে আমরা মাটির মূর্তি তৈরি করে তার উপর ছাগলের দুধ ছিটিয়ে দিতাম।' যখন কোন পর্যটক কোন স্থানে যাত্রা বিরতি করত, তখন সে চারটি পাথর সংগ্রহ করত। সে এর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্টটির পূজা করত এবং বাকী তিনটা দিয়ে চুলা তৈরি করে এর উপর খাবার পাকাত।

যে মূর্তিপূজা ও ঠাকুরবাদের ব্যাপারে তাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ) গোটা ইরাকের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন তারা আবার তাই শুরু করে দিল। কা'বা শরীফকে মূর্তিপূজার আড্ডাখানা বানিয়ে তারা ঠাকুর সেজে বসল। তারা ভূত-প্রেত, জ্বীন, ফেরেশতা এবং মৃতপূর্বপুরুষদের আত্মার পূজাও করত।

আল-কালবী লিখেছেন যে, খোজাআ গোত্রের বনি মালিক শাখার লোকেরা জ্বীনের পূজা করত। সাঈদ উল্লেখ করেছেন যে, হিমিয়ার গোত্র সূর্য এবং কাইয়ারা গোত্র চাঁদের পূজা করত। বনু কায়েস গোত্র বুধ, শুক্র, শনি ও বৃহস্পতি গ্রহের পূজা করত।

মক্কায় হজ্জের মওসুমে তিনটি মেলা বসত। সবচাইতে বড় মেলাটি বসত ওকাজ বাজারে। সেখানে প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা যেত, তাদের কবিরা নিজ নিজ গোত্রের খ্যাতি, বীরত্ব, শক্তি, সম্মান ও দানের প্রশংসায় আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলত এবং গৌরব ও অহংকার প্রকাশের ব্যাপারে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হত। প্রত্যেক গোত্রের প্রধানরা নিজেদের সুনাম অর্জনের জন্য বড় বড় ডেগ চড়াত এবং উটের পর উট জবাই করে মেলার মানুষদেরকে খাওয়াত। এই অপচয়ের উদ্দেশ্য হল, মেলায় আগত লোকদের মাধ্যমে গোটা আরব দেশে তাদের সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। এই সকল মেলায় নাচ-গান, মদ এবং ব্যভিচারসহ সকল প্রকার নির্লজ্জ কাজ অনুষ্ঠিত হত।

তারা উলঙ্গ হয়ে কাবার তওয়াফ করত এবং বিকৃত উপায়ে এবাদত করত। তারা কাবার পার্শ্বে হাততালি দিত, বাঁশী বাজাত এবং শিঙ্গায় ফুঁ দিত। তারা সেখানে পশু কোরবানী দিত। কোরবানীর রক্ত কাবার দেয়ালে লেপে দিত এবং গোশত কাবার দরজার সামনে ফেলে রাখত। তাদের মতে, (নাউজুবিল্লাহ) আল্লাহ এগুলো কবুল করবেন।

হযরত ইবরাহীম (আ) ৪ মাসের মধ্যে রক্তপাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু যখন তারা যুদ্ধ করতে চাইত তখন তারা এক বছরের নিষিদ্ধ মাসগুলোকে হালাল গণ্য করে যুদ্ধ করত এবং পরের বছর এর কাজা আদায় করত।

তারা হজ্জের সফরে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা আয়-রোজগার করাকে নাযায়েজ মনে করত।

তারা হজ্জের সময় পানাহার পর্যন্ত বন্ধ করে দিত। এগুলোকে তারা এবাদত মনে করত। কোন কোন লোক হজ্জে যাত্রা করলে কথাবার্তা বন্ধ করে দিত। এর নাম ছিল হজ্জে 'মুছমেত' বা বোবা হজ্জ।

ইসলামের প্রথম দিকে আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরতকারী মুসলিম দলপতি বাদশাহ নাজ্জাসীর দরবারে বলেন, আমরা ছিলাম মূর্খ লোক, আমরা শুধু মূর্তিপূজা করতাম। এমন কোন অন্যায় আচরণ বাকী নেই যা আমরা করিনি। আমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং প্রতিবেশীদের অধিকার আদায় করি না। দুর্বলের উপর অত্যাচারকারীকে আমাদের মধ্যে বেশী শক্তিশালী বিবেচনা করা হয়। আমাদের মধ্যে আল্লাহর নবী আসার পূর্ব পর্যন্ত আমরা অন্ধকারে ছিলাম। তিনি আমাদেরকে এইসব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

যুদ্ধবিগ্রহ ও দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ তাদের নিত্যকার সাথী ছিল। এক গোত্র আরেক গোত্রের সাথে বছরের পর বছর যুদ্ধে লিপ্ত থাকত। ওয়ায়েল, বকর এবং তামীম গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ ৪০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়। এই যুদ্ধে দুই গোত্র প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। দাহিস এবং আল-গাবরাআর যুদ্ধও অনুরূপ আরেকটি প্রমাণ। কায়েস বিন যুহাইরের দাহিস নামক ঘোড়াটি হোজাইফা বিন বদরের ঘোড়ার সাথে প্রতিযোগিতায় অগ্রগামী থাকায় হোজাইফার পরামর্শক্রমে আসাদ গোত্রের এক বেদুইন সেই অগ্রগামী ঘোড়াটির কপালে আঘাত হানে। ফলে, অন্যান্য ঘোড়াগুলো এই যন্ত্রণাকাতর ঘোড়াটির আগে চলে যায়। তখন একটি শিশুও মারা যায়। ফলে দুই গোত্র নিহত শিশুর প্রতিশোধে মরিয়া হয়ে উঠে। সেই যুদ্ধে বহু সংখ্যক লোক মারা যায়। উটকে পানি খাওয়ানোর বিবাদে আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে ১২০ বছর পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। কত লোক ঐ যুদ্ধে মারা যায় তার কোন শেষ নেই।

এছাড়াও সর্বত্র বাণিজ্য কাফেলার উপর ডাকাত পড়ে সব লুটপাট করে নিত। সাধারণ কোন যাত্রীর জানমালের নিরাপত্তা ছিল না। কাবার উদ্দেশ্যে আগত লোকদের জানমালেরও কোনও নিরাপত্তা ছিল না। সর্বত্র এক অরাজক পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল। সর্বত্র খুনী ও লুটেরাদের দৌরাত্ম্য এবং যুদ্ধের আগুন প্রজ্জ্বলিত ছিল। দারিদ্র্য, অভাব-অনটনে মানুষ জর্জরিত ছিল। শান্তি শৃংখলা বলতে কিছুই ছিল না।

বিয়ে প্রথা ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও পৈশাচিক। বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আইয়ামে জাহেলিয়াতে নারী পুরুষের মধ্যে ৪ ধরনের যৌন সম্পর্ক ছিল। ১ম প্রকার সম্পর্ক হচ্ছে, আজকের সমাজের বিয়ের অনুরূপ এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির মেয়ে কিংবা তার জিম্মায় মওজুদ অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব করত এবং বিয়েতে প্রয়োজনীয় দেনমোহর দিত। ২য় প্রকার সম্পর্ক ছিল, এক ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে মাসিক ঋতু শেষ হওয়ার পর কোন নির্দিষ্ট লোকের নাম ধরে বলত, তার কাছে গিয়ে গর্ভধারণ করে আস। ইশারাকৃত লোকটি থেকে বাহ্যিক গর্ভ প্রকাশের আগে স্বামী নিজ স্ত্রীর সাথে যৌন মিলন থেকে দূরে থাকত। স্ত্রীর পেট বড় হলে, স্বামী ইচ্ছা করলে তার সাথে সহবাস করত। কোন উত্তম রক্তের একটি সন্তান লাভ করার জন্যই সে এই অমানবিক পদ্ধতি গ্রহণ করত। ৩য় প্রকারের সম্পর্ক ছিল, কমপক্ষে ১০ ব্যক্তি একজন মহিলাকে শেয়ারে গ্রহণ করত। এদের প্রত্যেকেই মেয়ে লোকটির সাথে সহবাস করত। সে যদি গর্ভধারণ করত, সন্তান প্রসবের কয়েকদিন পর সে ঐ সকল পুরুষদেরকে ডেকে পাঠাত। তাদের একজনও ঐ মিটিং-এ অনুপস্থিত থাকতে পারত না। মেয়েলোকটি উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে বলত আমার এবং তোমাদের মধ্যে কি সম্পর্ক ছিল তাতো কারুর অজানা নয়। সে যাকে ইচ্ছে তাকে সন্তানের বাপ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারত। চিহ্নিত ব্যক্তির তা অস্বীকার করার কোন উপায় ছিল না।

৪র্থ প্রকার সম্পর্ক ছিল, বর্তমান যুগের বেশ্যাবৃত্তির অনুরূপ। বহু সংখ্যক ব্যক্তি একজন মেয়েলোকের কাছে আসত এবং মেয়েলোকটি আগত কোন ব্যক্তিকেই অস্বীকার করতে পারত না। বেশ্যারা নিজেদের ঘরের দরজার সামনে এক ধরনের পতাকা উড়াত। এর দ্বারা তারা কোন ব্যক্তিকে স্বাগত জানায় বলে বুঝাত। বেশ্যাটি কোন সন্তান প্রসব করলে সংশ্লিষ্ট পুরুষরা মিলে মহিলাটিকে চাঁদা দিত এবং সন্তানের পিতা নির্বাচনের জন্য একজন গণকের আশ্রয় নিত। গণকের বক্তব্য অনুযায়ী জারজ সন্তানটির পিতা নির্দিষ্ট হত। ঐ পিতা কিছুতেই সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করতে পারত না।

এই বক্তব্য দ্বারা বুঝা যায় যে, আমরা যেমন গাভী, উষ্ট্রী ও ঘোটকীকে ষাঁড় কিংবা পুরুষ উট ও ঘোড়ার কাছে পাঠাই তারাও নিজের স্ত্রীকে অন্য মানুষের কাছে পাঠিয়ে পশুর স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে বর্ণিত শেষ ও প্রকার হচ্ছে মানবতার জন্য বিরাট অবমাননা ও লাঞ্ছনা।

আবুল হাসান আলী নদভী তাঁর 'ইসলাম এণ্ড দি ওয়ার্ল্ড' বইতে লিখেছেন, জাহেলিয়াতে যুগে মহিলারা ছিল সবচাইতে বেশী নির্যাতিত। সম্পত্তিতে তাদের উত্তরাধিকার স্বীকৃত ছিল না। বিধবা এবং তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদের দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর বড় ছেলে অন্যান্য সম্পত্তির মত, পিতার বিধবা স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী হিসেবে উত্তরাধিকার পেত। নারী এবং পুরুষদের খাবারও পৃথক ধরনের ছিল। মহিলাদের অপেক্ষাকৃত খারাপ ও নিম্নমানের খাবার দেয়া হত।

আইয়ামে জাহেলিয়াতে মেয়েশিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া হত। অর্থহীন গর্ব ও অহংকার প্রকাশের কুপ্রথার কারণে মেয়ে শিশুদেরকে হত্যা করে গোত্রে গোত্রে পুরুষের সংখ্যা বাড়ানোর অপচেষ্টা চলত। হায়সাম বিন আদী বলেন, প্রতি ১০ জনের মধ্যে এক ব্যক্তি জীবন্ত মেয়ে শিশু কবর দেয়ার দায়ে অপরাধী ছিল। কোন কোন সময় দয়ালু গোত্র প্রধানরা মেয়ে-শিশুদের জীবন বাঁচাত। সা'সা' বলেন, ইসলামের কিছু পূর্বে তিনি অর্থের বিনিময়ে ৩ শত মেয়ে-শিশুর প্রাণ রক্ষা করেন। এজন্য তাঁকে বহু অর্থ খরচ করতে হয়েছে।

জাহেলিয়াতের এই করুণ চিত্র মানব ইতিহাসের এক জঘন্যতম অধ্যায়। ঠিক এই ঘোর অমানিশার সময়ই আল্লাহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) কে মানবতার জন্য রহমতস্বরূপ মক্কায় পাঠান। তিনি মানুষকে এই কঠিন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন এবং মানবতার মুক্তিসনদ আল-কুরআন অনুসরণের আহ্বান জানান।

টিকাঃ
১০. হজ্জের হাকীকত, সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী।
১১. তারীখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী।
১২. হজ্জের হাকীকত, সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মক্কায় হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্ম ও ইসলামের আগমন

📄 মক্কায় হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্ম ও ইসলামের আগমন


জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশার সময় ঊষার আলো জ্বালানোর তাকিদে এবং মানুষের উপর মানুষ ও দেব দেবীর প্রভুত্বকে খতম করে সেই স্থানে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে সাবেক আসমানী কিতাবসমূহের ভবিষ্যদ্বাণী ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) কে মানবতার মুক্তিদূত ও একমাত্র নেতা হিসেবে মক্কায় পাঠান। তিনি হাতী বাহিনী তথা আবরাহা বাদশাহর কাবা ধ্বংসের অভিযানের বছর ৯ই রবিউল আউয়াল (বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী) রোজ সোমবার সকালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাপের নাম আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব এবং মায়ের নাম আমিনা বিনতে ওহাব। জন্মের আগে বাপ মারা যান। তার প্রতিপালনের ভার পড়ে দাদার উপর।

হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্মের ৬ষ্ঠ দিবসে কাবার পার্শ্বে ঘুমন্ত অবস্থায় দাদা আবদুল মুত্তালিব স্বপ্নে দেখেন, নবজাত শিশুর নাম রাখতে হবে মুহাম্মদ। মা আমেনাও একই স্বপ্ন দেখেন। ৭ম দিবসে তার নাম রাখা হয় মুহাম্মদ বা প্রশংসিত। তার জন্মের সাথে সাথে পারস্য সম্রাটের পূজার আগুন নিভে যায়। ৭ম দিবসেই তাঁকে আরবদের রীতি অনুযায়ী খতনা করানো হয়। মা আমিনার পর সর্বপ্রথম যে ধাত্রী তাকে দুধ পান করান তিনি হচ্ছেন আবু লাহাবের দাসী সাওবিয়া।

শহুরে যিন্দেগী থেকে দূরে মরুভূমির তাজা হাওয়ায় সন্তান লালন পালনের রীতি অনুযায়ী, আবদুল মুত্তালিব হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্য হালিমা বিনতে আবি জোয়াইব আল-সাদীয়া নাম্নী এক বেদুইন মহিলাকে দুধ পানের জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নির্ধারণ করেন। গরীব হালিমার বুকে দুধ কম। পেটের জ্বালায় ধাত্রীর কাজ করতে চান। হযরত মুহাম্মদ (সা) কে দুধ পান করানোর সাথে সাথে দুধে বুক ভরে আসে। হযরত মুহাম্মদ (সা) কে নিয়ে তারা ঘরে ফিরে এলে সবকিছুতে পরিবর্তন ও উন্নয়নের হাওয়া বইতে শুরু করে। তাদের ফসল বৃদ্ধি পায়, খেজুর গাছে অনেক বেশী খেজুর ধরে। তাদের উট প্রচুর দুধ দান শুরু করে। বালক মুহাম্মদ তাদের জন্য রহমত ও বরকতের বিরাট উৎস হয়ে দাঁড়ান।

বালক মুহাম্মদ অন্যান্য খেলার সাথীদের সাথে মাঠে বকরী- দুম্বা চরান। একসময় দু'জন ফেরেশতা এসে তাঁর বুক চিরে অন্তর ধুয়ে পরিষ্কার করে দিয়ে যেতে খেলার সাথীরা দেখে। এই ঘটনা শুনে হালিমা ভয়ে তাঁকে মা আমিনার কাছে পাঠান। তখন তিনি যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান ও মোটা-তাজা।

আমেনা মৃত স্বামীর কবর যিয়ারতের জন্য ইয়াসরিবের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে ১ মাস থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে পথে আবওয়া নামক স্থানে মারা যান। পথের সঙ্গিনী চাকরাণী উম্মে আইমন ৬ বছরের বালক মুহাম্মদকে সাথে করে মক্কায় এসে আবদুল মুত্তালিবের হাতে সোপর্দ করে। তাঁর বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন, তখন দাদাও মারা যান। এবার তাঁকে লালন পালন করেন আপন চাচা আবু তালিব। একবার মক্কায় দুর্ভিক্ষ ও খরা দেখা দেয়ায় কোরাইশরা আবু তালিবের কাছে দোয়ার জন্য অনুরোধ করে। আবু তালিব বালক মুহাম্মদের আঙ্গুল ধরে কাবার পার্শ্বে হাত উঠালে মেঘবিহীন আকাশে বৃষ্টির ঘনঘটা শুরু হয়।

বালক মুহাম্মদের বয়স যখন ১২ বছর তখন আবু তালিব তাঁকে সাথে করে সিরিয়ায় রওনা হন এবং পথে একজন খৃষ্টান ধর্মযাজক বুহাইরা তাঁকে দেখে চিনতে পারেন যে, তিনি আগামী দিনের শেষ নবী। তখন তিনি আবু তালিবকে বলেন, সিরিয়ার ইহুদীরা এই বালককে চিনতে পারলে মেরে ফেলবে। পরে আবু তালেব তাঁকে মক্কায় ফেরত পাঠান।

১৫ বছর বয়সে কোরাইশ ও কানানা গোত্রের সাথে কায়েস গোত্রের যে যুদ্ধ হয় তাতে হযরত মুহাম্মদ (সা)ও অংশগ্রহণ করেন। কোরাইশরা যুদ্ধে জয়লাভ করে। এই যুদ্ধ নিষিদ্ধ মাসকে লংঘন করে সংঘটিত হওয়ায় একে 'হারবুল ফুজ্জার' বা 'পাপীদের যুদ্ধ' বলা হয়।

এই যুদ্ধের পরপরই জিলকদ মাসে সকল কোরাইশ গোত্র মিলে, 'হিলফুল ফুদুল' নামক একটি সমাজকল্যাণ সংস্থা কায়েম করে। এই সংস্থার লক্ষ্য হল, যুলুম-নির্যাতন প্রতিরোধ করা এবং দুঃস্থ ও অভাবী মানুষকে সাহায্য করা। হযরত মুহাম্মদ (সা) আবদুল্লাহ বিন জাদআনের ঘরে অনুষ্ঠিত উক্ত বৈঠকে নিজেও উপস্থিত ছিলেন।

হযরত মুহাম্মদ (সা) এর বিশ্বস্ততা ও আমানতদারীর জন্য তাঁকে আল আমীন বলা হত। ২৫ বছর বয়সে মক্কার ধনী মহিলা খাদীজা বিনতু খোয়াইলিদ তাঁকে ব্যবসার কাজে নিয়োজিত করেন এবং বাণিজ্য কাফেলার সাথে সিরিয়া পাঠান। ঐ ব্যবসায় বিধবা খাদীজার প্রচুর লাভ হয়। পরে ৪০ বছর বয়স্কা খাদীজার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। সিরিয়ায় কাফেলার দু'টো ঘটনা ঘটে। একটি হচ্ছে খাদীজার গোলাম মাইসারা এই সফরে হযরত মুহাম্মদের সাথী ছিল। যাওয়ার পথে বিশ্রাম নেয়ার সময় একজন ধর্মযাজক মাইসারাকে বলেন, এই লোকটি ভবিষ্যতে নবী হবে। সিরিয়া থেকে মক্কায় ফেরার পথে মাইসারা গরম রোদের সময় দু'জন ফেরেশতাকে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর মাথার উপর ছায়া দিতে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়।

হযরত মুহাম্মদ (সা) এর ৩৫ বছর বয়সে কা'বায় আগুন লেগে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোরাইশরা কা'বা পুনঃনির্মাণ করে। কিন্তু সম্মান লাভের প্রতিযোগিতায় কোন গোত্রের লোকেরা হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে রাখবে তা নিয়ে বিরাট সমস্যা দেখা দেয়। পরে হযরত মুহাম্মদ (সা) একটি চাদর বিছান এবং নিজ হাতে এর উপর হাজরে আসওয়াদ রেখে সকল গোত্রের লোকদেরকে চাদর ধরে তা উপরে উঠাতে বলেন। পরে তিনি নিজ হাতে পাথরটিকে যথাস্থানে বসান। এইভাবে একটা কঠিন সমস্যার সমাধান হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা) কখনও মূর্তিপূজা করেননি, মদ পান করেননি, দেবতার নামে বলি দেয়া পশুর গোশত খাননি, অশ্লীল কোন কাজ করেননি এবং কারোর অপকার করেননি। কোরাইশদের কা'বা নির্মাণের সময় হযরত মুহাম্মদ (সা) তাঁর চাচা আব্বাস (রা) এর সাথে মিলে পাথর টানেন। হযরত আব্বাস বলেন, তোমার লুঙ্গি (ইযার) হাঁটুর উপরে উঠালে তাতে আর ময়লা লাগবে না। কাপড় উঠানোর সাথে সাথে তিনি বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যান এবং চোখ আকাশের দিকে বড় হয়ে উঠে। হুঁশ আসার পর তিনি চিৎকার করতে থাকেন, আমার লুঙ্গি, আমার লুঙ্গি। তারপর তাঁর লুঙ্গি তাঁকে ঠিক করে বেঁধে দেয়া হয়।

তিনি নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একবার ময়দানে বকরী চরানোর সময় সাথী অন্য রাখালকে বলেন, তুমি আমার বকরীগুলোর দেখাশুনা কর, আমি শহরে গিয়ে চাঁদের আলোতে অন্য যুবকদের সাথে রাতের বেলায় আনন্দ করবো। রাখাল সাথী রাজী হওয়ায় তিনি শহরে এসে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গানের মজলিশে হাজির হন। কিন্তু আল্লাহ তাঁর শ্রবণশক্তি বন্ধ করে দেন এবং তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। পরের দিন রোদের তাপে তিনি ঘুম থেকে জাগেন। আরেকদিনও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, নবুওতের পূর্বে আমি জীবনে দু'বার জাহেলিয়াতের কাজের ইচ্ছা করেছিলাম। কিন্তু দুইবারই আল্লাহ আমার ও সেই মন্দ কাজের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করেন। ফলে আমি তা আর করতে পারিনি।

রাসূলুল্লাহ (সা) এর বয়স যখন চল্লিশের কাছাকাছি তখন তিনি একাকীত্ব ভালবাসতেন এবং গভীর চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। তারপর তিনি হেরা গুহায় বসে ধ্যান করতে থাকেন। তিনি তাঁর কওমের এবাদত উপাসনায় অসন্তুষ্ট এবং মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে হেদায়াত চান। তিনি ৪০ বছর বয়সে রমযান মাসে হেরা গুহায় অপেক্ষা করেন। তখনই হযরত জিবরীল (আ) বলেন, হে মুহাম্মদ পড়। তিনি উত্তরে বলেন, আমি পড়তে পারি না। জিবরীল তাঁকে জড়িয়ে ধরে চাপ দেন এবং বলেন, পড়। তিনি এবারও বলেন, আমি পড়তে পারি না। এবারও জিবরীল তাঁকে জোরে আঁকড়ে ধরেন এবং বলেন, পড়। তৃতীয়বারও পড়তে বলায় তিনি পড়তে না পারার কথা জানানোর কারণে জিবরীল তাঁকে পূর্বের মত আঁকড়ে ধরেন। তারপর জিবরীল সূরা আলাকের ৫টি আয়াত পড়েন এবং রাসূলুল্লাহও (সা) তাঁর সাথে সেই আয়াতগুলো পড়েন। এভাবেই রাসূলুল্লাহ (সা) এর নবুওয়াত ও রিসালতের সূচনা হয়।

জিবরীল চলে যাওয়ার সময় বলে গেলেন, আমি আল্লাহর ফেরেশতা জিবরীল, আর আপনি আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে এসে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়েন এবং হযরত খাদীজা (রা) কে সব কথা খুলে বলেন। খাদীজা তাঁকে আশ্বাস ও অভয় দেন এবং নিজ চাচাত ভাই ওয়ারাকা বিন নওফলের কাছে গিয়ে বিস্তারিত ঘটনা বলেন। ওয়ারাকা শুনা মাত্রই বলেন যে, এই তো শেষ নবী। লোকেরা তাঁর বিরোধিতা করবে। আমি বেঁচে থাকলে তাঁকে সাহায্য করতাম। খাদীজাই প্রথম রাসূলুল্লাহ (সা) এর নবুওয়াতে বিশ্বাস স্থাপন করেন।

যাই হোক, রাসূলুল্লাহ (সা) নতুন দ্বীনের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন। প্রথমে আত্মীয় স্বজনদের কাছেই দাওয়াত পেশ করেন। তিনি কালেমা লাইলাহা ইল্লাল্লাহর দাওয়াত পেশ করেন। প্রথমে দাওয়াত গোপনে চলতে থাকে। তিন বছর পর আল্লাহ তাঁকে প্রকাশ্যে দাওয়াত পেশ করার নির্দেশ দেন।

কালেমার দাওয়াত শুনে ইসলাম বিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কেননা, এই কালেমার অর্থ হচ্ছে মালিক, মনিব, রিযকদাতা, আইনদাতা এবং সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা। তাঁর আইন ছাড়া আর কারুর আইন মানা যাবে না, তাঁর এবাদত ছাড়া অন্য কারো এবাদত করা যাবেনা এবং তাঁর হুকুম ছাড়া অন্য কারো হুকুম মানা যাবে না। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, তথা ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক জীবনে ইসলামী শরীয়াহ বা আল্লাহর হুকুম ও আইন কানুন কায়েম করতে হবে। এই দাওয়াত শুনে কাফেররা তা বরদাশত করতে রাজী ছিল না। কেননা, তাদের সমাজে একদিকে মূর্তিপূজা প্রচলিত ছিল এবং অন্যদিকে ছিল মানুষের উপর মানুষের আইন ও সার্বভৌমত্ব। নিজেদের বর্তমান সামাজিক সুযোগ-সুবিধাকে ত্যাগ করে আল্লাহর পূর্ণ দাসত্বের শৃংখলে নিজেকে সোপর্দ করা- এটা তাদের জন্য অসম্ভব ব্যাপার বলে বিবেচিত হয়। তাই তারা আল্লাহ, রাসূল ও আখেরাতের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা ইসলামের শান্তিভবনে প্রবেশ করতে অস্বীকার করে।

কুরাইশ রীতি অনুসারে একদিন সাফা পাহাড়ে তিনি সবাইকে ডেকে আখেরাতমুখী কালেমার দাওয়াত দেয়ায় আবু লাহাবসহ অন্যরা রাগান্বিত হল। আপন চাচা আবু লাহাব গালি দিল যে, হে মুহাম্মদ, তোমার দুই হাত ধ্বংস হোক। এই জন্যই কি আমাদেরকে এখানে একত্রিত করেছ? কুরআন তার প্রতিবাদে বলল- না, আবু লাহাবের দুই হাতই ধ্বংস হউক।

এরপর ইসলামের বিরুদ্ধে চরম বিরোধিতা শুরু হল। কোরাইশরা আবু তালিবের কাছে একটি প্রতিনিধিদল পাঠাল যেন রাসূলুল্লাহ (সা) কে ঐ দাওয়াত থেকে বিরত রাখা হয়।

তারা হাজীদেরকে হযরত মুহাম্মদ (সা) থেকে দূরে রাখার জন্য চেষ্টা তদবীর শুরু করল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং নওমুসলিমদের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ শুরু করে দিল। কিন্তু ঠাট্টা-বিদ্রুপে কাজ না হওয়ায় নবুওয়াতের চতুর্থ বছরে, কোরাইশ সরদারদের মধ্য থেকে আবু লাহাবের নেতৃত্বে গঠিত ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি রাসূলুল্লাহ ও মুসলমানদের উপর দৈহিক নির্যাতন শুরুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রথম পর্যায়ে সাফা পাহাড়ের পার্শ্বে সাহাবী দারুল আরকামের ঘরে গোপনে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য কাজ চলে এবং তা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এদিকে মক্কার কাফেরগণ নওমুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন শুরু করে। ফলে বহু নওমুসলিম ইথিওপিয়ার নওমুসলিম নাজ্জাশীর দেশে হিজরত করে চলে যান।

ইতিমধ্যে হযরত হামযাহ এবং উমর বিন খাত্তাব মুসলমান হন। এতে নির্যাতিত মুসলমানদের কিছুটা সাহায্য হয়। কাফেররা আবু তালেবকে বার বার হুমকি দিতে থাকে। অবশেষে কাফেররা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে দর কষাকষি করতে আসে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলে দেন, আমার এক হাতে চাঁদ আর অন্য হাতে সূর্য এনে দিলেও আমি আল্লাহর দীনের দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত হতে পারবো না।

কাফেররা রাসূলুল্লাহ (সা) কে হত্যা করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তা সফল হয়নি। ইতিমধ্যে বনি হাশেম ও বনি মুত্তালিবের সকল লোক এক বৈঠকে বসে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পার্শ্বে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে কাফেররা বনি হাশেম ও বনি মুত্তালিবের সাথে সর্বাত্মক বয়কট ঘোষণা করে এবং বিয়ে-শাদী ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল প্রকার অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। ৩ বছর পর ঐ বয়কট প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু নবুওয়াতের ১০ বছরের সময় তাঁর চাচা আবু তালিব মারা যান। ফলে রাসূলুল্লাহ (সা) এর দুঃখ-কষ্ট হাজার গুণ বেড়ে যায়। এদিকে কাফেরদের অত্যাচার তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) তায়েফে গিয়ে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। কিন্তু সেখানে তিনি চরমভাবে নির্যাতিত হন। আদাস নামক একজন দাস ছাড়া আর কেউ সেখানে তাঁর দাওয়াত কবুল করেনি।

নবুওয়াতের ১১ বছরের সময় মদীনা থেকে আগত ৬ জন লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাক্ষাত হয়। তিনি তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। আকাবায় অনুষ্ঠিত উক্ত আলোচনার ফলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর নবুওয়াতের ১১ বছরের শাওয়াল মাসে হযরত আয়িশা বিনতে আবু বকরের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিয়ে হয়।

ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনের বৃহত্তর কর্মসূচী তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর দীন কায়েমের জন্য তাঁকে মিরাজে নেয়া হয়। সেখান থেকে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য করণীয় বৃহত্তর এই কাজের জন্য হাতে কলমে শিক্ষার বৃহত্তর প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন। নবুওআতের দ্বাদশ বছরের হজ্জ মওসুমে আকাবায় মদীনার ১২ জন লোক ইসলাম গ্রহণ করে। নবুওয়াতের ১৩শ বছরে মদীনার ৭০ জন লোক আকাবায় এসে ইসলাম গ্রহণ করে।

এই সকল অবস্থা দেখে কোরাইশ নেতারা রাসূলুল্লাহ (সা) কে হত্যার ঘোষণা দেয়। তখন তিনি হযরত আবু বকর (রা) কে সাথে নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। তারা সরাসরি মদীনা না গিয়ে প্রথমে সাওর গুহায় ৩ রাত কাটান। তারপর নিরাপদ অবস্থার বিবেচনা করে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং মদীনায় পৌঁছেন। মদীনায় পৌছে তিনি সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করেন।

টিকাঃ
১৩. The Life of the Prophet Muhammad, Laila Azzam and Ayesha Gouverneur, London.
১৪. প্রাগুক্ত।
১৫. প্রাগুক্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00