📄 বিশ্বের ইসলামী নেতৃত্বে ইবরাহীম (আ) এর নিযুক্তি
এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তাঁকে সমগ্র দুনিয়ার ইমাম বা নেতা বানিয়ে দিলেন। আল্লাহ বলেন,
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَهُنَّ طَ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا .
অর্থ: 'এবং যখন ইবরাহীম (আ) কে তাঁর রব কয়েকটি ব্যাপারে পরীক্ষা করলেন এবং তিনি সে সকল পরীক্ষা সম্পন্ন করলেন, তখন আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে সকল মানুষের ইমাম বা নেতা নিযুক্ত করছি।' (সূরা বাকারা: ১২৪)
এইভাবে হযরত ইবরাহীমকে (আ) সারা দুনিয়ার নেতৃত্বদান করা হল এবং তাঁকে বিশ্বব্যাপী ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনের নেতা নিযুক্ত করা হল। এখন এই দাওয়াতী আন্দোলনের প্রচার-প্রসারের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে ও দেশে তাঁর কিছু সংখ্যক সহযোগী আবশ্যক। এই ব্যাপারে তিন ব্যক্তি হযরত ইবরাহীম (আ) এর ডান হাত হিসেবে কাজ করেছেন। একজন তাঁর ভাতিজা হযরত লূত (আ), দ্বিতীয় তাঁর বড় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ) এবং তৃতীয় হচ্ছেন তাঁর ছোট পুত্র হযরত ইসহাক (আ)। তাঁরা তিনজনই নবী ছিলেন। ভাতিজা হযরত লূত (আ) কে 'সাদুম' (ট্রান্স-জর্দান) এলাকায় বসালেন। এখানে সেকালের সর্বাপেক্ষা লম্পট জাতি বাস করত। তাদের নৈতিকতাহীনতা সর্বনিম্নে পৌঁছে গিয়েছিল। নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ের পরিবর্তে পুরুষে পুরুষে সমকামিতার সয়লাব শুরু হয়েছিল। ইরান-ইরাক এবং মিসরের ব্যবসায়ীরা এই পথ দিয়ে যেত। তাদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পিত হয়। ছোট পুত্র হযরত ইসহাক (আ) কে তিনি কেনয়ান বা ফিলিস্তিনে বসান। এটি সিরিয়া এবং মিসরের মধ্যবর্তী স্থান। এই স্থান থেকেই হযরত ইসহাক (আ) এর পুত্র ইয়াকুব যার অপর নাম ইসরাইল এবং পৌত্র হযরত ইউসুফ (আ) এর মাধ্যমে মিসরে ইসলামের আহবান পৌছে।
বড়পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ) কে মক্কায় বসান এবং পিতা-পুত্র দু'জনে মিলেই মক্কায় মুসলমানদের বিশ্ব ইসলামী কেন্দ্র, কা'বা নির্মাণ করেন। এই খানেই বিশ্বের মুসলমানদের হজ্জের ব্যবস্থা করা হয়। আল্লাহ নিজেই এই কেন্দ্র নির্দিষ্ট করেছিলেন এবং নিজেই তা নির্মাণের স্থানও নির্ধারিত করেছিলেন। কা'বা শরীফের চারপার্শ্বে মসজিদে হারাম গড়ে তোলা হয়। কিন্তু এই মসজিদটি সাধারণ মসজিদের মত শুধু নির্দিষ্ট এবাদতের স্থান নয়, প্রথম দিন থেকেই এটি, দ্বীন ইসলামের বিশ্ব আন্দোলনের প্রচার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কা'বা নির্মাণের উদ্দেশ্য হল, পৃথিবীর নিকট ও দূরবর্তী অঞ্চলসমূহ হতে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী সকল মানুষ এখানে এসে মিলিত হবে এবং সংঘবদ্ধভাবে এক আল্লাহর এবাদত করবে। আবার এখান থেকেই ইসলামের বিপ্লবী পয়গাম নিয়ে তারা নিজ নিজ দেশে ফিরে যাবে। বিশ্ব মুসলিমের এই সম্মেলনের নাম হল হজ্জ। হজ্জ ইসলামের ৫ খুঁটির অন্যতম খুঁটি।
দুনিয়াব্যাপী ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগ, প্রচার প্রসার, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের প্রতিরোধ, একামতে দীন তথা ইসলামী আন্দোলন, তাওহীদ এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যে নবীকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হল, তাঁর প্রধান কার্যালয় ঠিক করে দেয়া হল মক্কায়। যে যতদূরেই বাস করুক না কেন, মক্কায় এসে উপরোক্ত বিষয়সমূহের উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণের জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দেয়া হল।
মোটকথা, হযরত ইবরাহীম (আ) ইরাকসহ সর্বত্র যে শিরক, বিদআত, কুসংস্কার, মূর্তিপূজা, মানুষের উপর মানুষের শাসন, জুলুম-নির্যাতন ও অন্যান্য ক্ষতিকর নিয়ম পদ্ধতি দেখলেন, তার আমূল পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যেই মক্কায় তাওহীদ, আল্লাহর সার্বভৌমত্বও আইন-কানুন চালুর জন্য তাঁরই নির্দেশে এই বিশ্ব মুসলিম কেন্দ্র নির্মাণ করেন।
📄 মক্কায় জোরহোম গোত্রের শাসন
মক্কায় জোরহোম গোত্রের আবাদীর সাথে তাদের শাসন শুরু হয়। তাদের বংশে হযরত ইসমাঈল (আ) বিয়ে করেন এবং তাদের ভাষা আরবী শিখেন। তাঁর বংশধরদেরকে ঐতিহাসিকরা العرب المستعربة বা 'নতুন আরব' বলে অভিহিত করেন। কেননা, জোরহোম গোত্র ও তদানীন্তন ইয়েমেনের আরবরা ছিল মূল আরবী লোক।
হযরত ইসমাঈল (আ) এর ইন্তেকালের পর জোরহোম গোত্রে তাঁর নাতী মোদাদ বিন আমর আলজোরহোমী পর্যন্ত মক্কার শাসন অবশিষ্ট ছিল। জোরহোমীরা পরে দুই শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। একটি হচ্ছে জোরহোম শাখা আর ২য়টি হচ্ছে কাতুরা শাখা। মোদাদ তাঁর শাখার লোকদেরকে নিয়ে মক্কার উঁচু দিকে এবং কুআইকাআন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস শুরু করেন। অপরদিকে কাতুরা সম্প্রদায়ের প্রধান সুমাইজা' তাঁর শাখার লোকদেরকে নিয়ে জিয়াদ ও মক্কার নীচু দিকে বাস করা শুরু করেন। তবে এক শাখার লোকেরা অন্য শাখার লোকদের বসবাসের এলাকায় আসা-যাওয়া করত না। জোরহোম গোত্র কুআইকাআন, যা আজকে 'জাবালে হিন্দ' নামে পরিচিত, সেই এলাকাসহ উত্তর-পূর্ব দিকে কাসাসিয়া বরাবর মক্কা উপত্যকার উপরিভাগে বাস করত। অপরদিকে, কাতুরা সম্প্রদায়ের লোকেরা জিয়াদের সাদ এলাকা থেকে শুরু করে মেসফালার মুখ পর্যন্ত এলাকায় বাস করা শুরু করে। পরে জোরহোম ও কাতুরা শাখার মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। মোদাদ বিন আমর সুমাইজা'র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য খোলা তলোয়ার ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বের হয়। শাণিত অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে বের হওয়াকে আরবীতে تقعقع 'তাকা'কা' বলে। এই জন্য তাদের বসবাসের এলাকাকে قُعَيقَعَانُ 'কুআইকাআন' বলা হয়। অপরদিকে, 'সুমাইজা' তার দলবল ও ঘোড়া নিয়ে মোকাবিলার জন্য বের হয়। আরবীতে ঘোড়াকে جیاد 'জিয়াদ' বলা হয়। এজন্য তাদের বসবাসের এলাকাকে জিয়াদ বলা হয়। হযরত ইসমাঈল (আ) এর ইন্তেকালের পর তাঁর ছেলে সাবেত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মক্কা শহরের শাসক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোদাদ বিন আমর আলজোরহোমী মক্কা শহরের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁরই বংশ থেকে হযরত ইসমাঈল (আ)-এর বংশধরদের শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করেছে। পরে যখন জোরহোম বংশের লোক বেড়ে যায় এবং মক্কার পার্বত্য শহরে তাদের সংকুলান কষ্টকর হয়ে উঠে, তখন তাঁদের কিছু লোক বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। তাঁরা যখনই যে শহরে গিয়েছেন, সেখানেই হযরত ইসমাঈল (আ) এর দীনের সঠিক অনুসরণ করার কারণে আল্লাহ তাদেরকে সম্মান দিয়েছেন। ফলে তাঁরা বিভিন্ন জায়গার নেতৃত্ব লাভ করেন এবাং আমালিকা সম্প্রদায়ের লোকদের সেখান থেকে বিতাড়িত করেন। মানুষ চারদিক থেকে কা'বা শরীফের তওয়াফ ও যিয়ারত করতে আসা শুরু করে। ফলে, মক্কা শহরের শাসক হিসাবে জোরহোম গোত্রের সম্মান ও মর্যাদা অনেক বেড়ে যায়। কেউ তাদের সাথে ঝগড়া-সংঘর্ষে অবতীর্ণ হয় না। কেননা, এমনিতেই মক্কায় সংঘর্ষ ও যুদ্ধ বিগ্রহ-নিষিদ্ধ।
পরবর্তীতে ২য় মোদাদ বিন আমরের শাসনামলে, জোরহোম গোত্র আল্লাহর ঘরের মর্যাদা খাটো করে দেখা শুরু করে। তারা বড় ধরনের গুনাহ ও অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ২য় মোদাদ বিন আমর, নিজের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে এক বক্তৃতায় বলেন, “হে আমার জাতি, তোমরা বিদ্রোহকে ভয় কর। কেননা, জালেম বিদ্রোহীরা ধ্বংস হতে বাধ্য। তোমরা দেখেছ তোমাদের আগে আমালিক সম্প্রদায়ের লোকেরাও হারাম এলাকার মর্যাদাকে খাটো করে দেখার কারণে তাদের মর্যাদা কমে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে পারস্পরিক লড়াই-ঝগড়া শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিল। আল্লাহ তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করেছেন, তোমরা তাদেরকে মক্কা থেকে বের করে দিয়েছ। তারা বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের কোন সম্মান নেই। এই শহরে ও হারাম শরীফের প্রতি সম্মান দেখানোর উদ্দেশ্যে কিংবা কেউ যদি এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসে, তাহলে তাদের উপর জুলুম করো না। যদি তা কর, তাহলে আমি তোমাদেরকে এখান থেকে বেইজ্জত হয়ে, বিতাড়িত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছি। ফলে তোমাদের কেউ এই হারাম কিংবা বাইতুল্লাহর কাছেও আসতে পারবে না। অথচ এটা তোমাদেরসহ সকলের জন্য, এমনকি পশুপাখীর জন্য নিরাপদ এলাকা।" এই বক্তৃতার জবাবে তাঁর সম্প্রদায়ের 'ইয়াজদা' নামক এক ব্যক্তি বলেন, "কে আমাদেরকে এই শহর থেকে বিতাড়িত করতে পারে? আমরা কি সমস্ত আরবদের মধ্যে বেশী অস্ত্র ও অর্থের অধিকারী নই?" এর জবাবে ২য় মোদাদ বলেন, "যখন ঐ রকম অবস্থা সৃষ্টি হবে তখন তোমার এ সকল ধ্যান-ধারণা ভুল প্রমাণিত হবে।"
📄 মক্কায় খোজাআ’ গোত্রের শাসন
জোরহোম গোত্র মক্কায় পাপাচার শুরু করে, বহিরাগত লোকদের উপর জুলুম-নির্যাতন আরম্ভ করে, কা'বা শরীফের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত উপহার সামগ্রী ভোগ করা শুরু করে এবং কাবা শরীফের ভেতরে জেনা-ব্যভিচারের সূচনা করে। তখন আল্লাহ তাদের উপর ইয়েমেনের কাহতান সম্প্রদায়ের 'খোজাআ' বংশকে বিজয়ী করেন এবং জোরহোম গোত্রকে পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। এই ঘটনা ৩ শত খৃষ্টাব্দের শেষ কিংবা ৪শ' খৃস্টাব্দের প্রথমে সংঘটিত হয়।
আমর বিন মাউসামা প্রখ্যাত কবি ইমরাউল কায়েসের বংশধর এবং কাহতানী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তিনি দক্ষিণ আরবের অধিবাসী ছিলেন। প্রখ্যাত আরম বন্যার কারণে তিনি ও তাঁর বংশের লোকেরা নিজ এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন এবং এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। যেখানেই তাঁরা গিয়েছেন সেখানেই তারা স্থানীয় লোকদের উপর বিজয়ী হয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁরা উত্তম-জায়গার তালাশে মক্কা আসেন। তাঁরা মক্কার শাসক ২য় মোদাদকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর আহবান জানান। কিন্তু মোদাদ তা অস্বীকার করেন। ফলে তাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং তিন দিন পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। যুদ্ধে জোরহোম গোত্র পরাজিত হয় এবং দেশত্যাগী ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ জীবিত নেই। তখন থেকেই মক্কায় 'খোজাআ' গোত্রের শাসন শুরু হয়। নতুন শাসকদের কাছে বনী ইসমাঈলরা আসে এবং মক্কায় থাকার অনুমতি চায়। ২য় মোদাদের ছেলে হারেসের পক্ষে মক্কা ত্যাগ করা খুবই কষ্ট হচ্ছিল। তিনি পুনরায় মক্কায় বাস করার আগ্রহ নিয়ে 'খোজাআ' গোত্রের কাছে অনুমতি চান। খোজাআ গোত্র অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। 'খোজাআ' গোত্রের আমর বিন লুহাই মক্কার শাসক নিযুক্ত হন। তিনিই প্রথম মক্কায় মোটা-তাজা উট জবাই করে এর সুরুয়ার সাথে রুটি মিশ্রিত করে প্রখ্যাত আরব খাবার 'সারীদ' তৈরি করে হাজীদেরকে খাওয়ান এবং প্রত্যেক হাজীকে ইয়েমেনের তৈরি ৩টি চাদর উপহার দেন। তিনিই পরবর্তীতে কা'বা শরীফের চতুর্দিকে বিভিন্ন কুসংস্কার চালু করেন, কা'বাঘরের চতুষ্পার্শ্বে মূর্তি বসান এবং সুদূর ইয়েমেন থেকে অভিশপ্ত হোবল দেবতাকে এখানে নিয়ে আসেন। এখানেই কোরাইশ ও আরবরা তীর দ্বারা ভাগ্য পরীক্ষা করত। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর দীনের বিকৃতি সাধন করেন।
আমর বিন লুহাই ও তাঁর বংশধররা ৫শ' খৃস্টাব্দ পর্যন্ত কা'বা শরীফের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তারা কা'বা শরীফের কোনকিছু নষ্ট করেনি এবং এতে কোন সংস্কার বা নতুন নির্মাণও করেনি।
📄 আবরাহা বাদশাহর কা’বা ধংস অভিযান
রাসূলুল্লাহ (সা) এর যে বছর জন্ম হয় সে বছর মহরম মাসে আবরাহার হস্তিবাহিনী কাবা আক্রমণ করতে এসে ধ্বংস হয়। আর রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মগ্রহণ করেন রবিউল আউয়াল মাসে। রাসূলুল্লাহ (সা) ৫৭০ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। কারো কারো মতে, হাতী বাহিনীর ঘটনার ৫০ দিন পর রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মগ্রহণ করেন। তখন মক্কার সরদার ছিলেন আবদুল মুত্তালিব।
আবরাহা শব্দটি সুরিয়ানী আব্রাহাম শব্দের হাবশী উচ্চারণ হতে পারে। ইয়েমেনে আবরাহার ক্ষমতা পাকাপোক্ত হওয়ার পর সে দুটো উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কাজ শুরু করে। তখন পৃথিবীতে দুটো বৃহৎ শক্তি ছিল। রোমান ও পারস্য শক্তি। রোমান সম্রাট খৃষ্টান সাম্রাজ্যের অধিকারী। হাবসা (ইথিওপিয়া) হচ্ছে রোমান সম্রাটের মিত্র শক্তি আর ইয়েমেন হচ্ছে হাবশার খৃষ্টান সরকারের প্রভাবিত দেশ। আবরাহার লক্ষ্য ছিল আরবদেশে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার করা এবং আরবদের প্রাচ্যদেশসহ অন্যান্য দেশে পরিচালিত বাণিজ্য করায়ত্ত করা।
খৃষ্টান মিশনারী তৎপরতার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আবরাহা ইয়েমেনের রাজধানী সানআয় একটি গীর্জা তৈরি করে। এর নাম হচ্ছে কুলাইস গীর্জা। মুহাম্মদ বিন ইসহাক লিখেছেন, গীর্জা তৈরির পর সে হাবশার বাদশাহকে লিখে, আমি কা'বা হতে আরবদের হজ্জকে এই গীর্জায় অবশ্যই স্থানান্তরিত করব। ইয়েমেনে একথা প্রচার করে দিয়ে সে অপেক্ষা করতে লাগল, কোন আরব একথা শুনে রাগ করে কিছু করে বসলে তা মক্কা আক্রমণের সরাসরি কারণ ও অজুহাত হয়ে দাঁড়াবে। ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন, এই ঘোষণায় রাগান্বিত হয়ে- কানানা গোত্রের একজন আরব গীর্জায় পেশাব-পায়খানা করে দেয়। মুকাতিল বিন সুলায়মানের মতে কয়েকজন আরব রাগান্বিত হয়ে গীর্জায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনার রেশ ধরে বাদশা আবরাহা মক্কা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
৫৭০ খৃষ্টাব্দে, আবরাহা ৬০ হাজার সৈন্য এবং ১৩টি বা ৯টি হাতী সহকারে কাবা ধ্বংসের অভিযানে রওয়ানা করে। পথে তায়েফসহ কয়েক জায়গায় যুদ্ধের মাধ্যমে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও সে অগ্রসর হয়। মুগাম্মাছে আসার পর তার অগ্রবাহিনীকে পাঠিয়ে দেয় এবং কোরাইশদের কাছে একজন দূত পাঠিয়ে খবর দেয় যে, কোরাইশরা আলোচনার প্রয়োজন বোধ করলে তা করতে পারে। আবদুল মুত্তালিব গিয়ে আবরাহার সাথে দেখা করেন এবং তার বাহিনী কর্তৃক অপহৃত নিজের উটগুলো ফেরত চান। আবরাহা এতে আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করেন, আপনি তো শুধু আপনার লুঠকৃত উট ফেরত চাইলেন কিন্তু কাবা সম্পর্কে কিছুই বললেন না। উত্তরে আবদুল মুত্তালিব বলেন, এই ঘরের একজন রব আছেন। তিনিই ঘরটিকে রক্ষা করবেন। এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করণীয় নেই। ইবনে ইসহাক এই বর্ণনা দেন। অপর দিকে ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় আবদুল মুত্তালিবের উটের দাবীর কোন কথা উল্লেখ নেই। তিনি বলেন, আবরাহা যখন আরাফার অদূরে সিফাহ নামক স্থানে অবস্থান করেন তখন আবদুল মুত্তালিব তার কাছে হাজির হয়ে বলেন, আপনার এই পর্যন্ত আসার কি দরকার ছিল? কোন কিছু দরকার হলে খবর দিলে আমরাই পাঠিয়ে দিতাম। আবরাহা বলল, আমি কাবাকে ধ্বংস করার জন্য এসেছি। তখন আবদুল মুত্তালিব বলেন, এটি আল্লাহর ঘর। আজ পর্যন্ত এই ঘরের উপর তিনি কাউকে চড়াও হতে দেননি। তাই আপনিও কোনকিছু চাইলে তা নিয়ে ফেরত যান। কিন্তু আবরাহা তাতে রাজী না হয়ে আবদুল মুত্তালিবকে পেছনে রেখে তার বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়।
উভয় বর্ণনার মাধ্যমে একটি সত্য পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, মক্কার লোকেরা আবরাহা বাদশাহর বাহিনীকে বাধা দেয়নি এবং কোন প্রতিরোধও গড়ে তোলেনি। আর এদের পক্ষে আবরাহার ৬০ হাজার সৈন্যের এত বড় বাহিনীর মোকাবিলা করাও সম্ভব ছিল না। আহযাবের যুদ্ধে তারা ইহুদীদেরকে সহ সকল শক্তি সামর্থ যোগাড় করার পর মাত্র ১০/১২ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। অবশ্য তখন আবরাহার হস্তিবাহিনীর ঘটনার পর ৫৭ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। তাহলে, ৫৭ বছর আগে তারা এতবড় আবরাহা বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় সৈন্যসামন্ত পাবে কোথায়?
ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় আরো এসেছে যে, আবদুল মুত্তালিব অন্যান্য কোরাইশ নেতাদেরকে নিয়ে কাবা শরীফে উপস্থিত হন এবং কাবার কড়া ধরে আল্লাহর কাছে এই ঘর রক্ষার দোয়া করেন। তখন কাবায় ৩৬০টি মূর্তি ছিল। কিন্তু তারা ঐ মূর্তিদের কাছে এই ঘর কাবা রক্ষার কোন আবেদন জানায়নি। তারা জানত যে, ঐগুলোর কোন ক্ষমতা নেই তা সত্ত্বেও অযথা সেগুলোর পূজা করত। আল্লাহর কাছে ঐ সকল দোয়া করার পর আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর সাথীরা পাহাড়ে আশ্রয় নেয়।
এদিকে আবরাহা মক্কায় প্রবেশ করার জন্য যে হাতীর উপর সওয়ার ছিল তা সবার আগে চলছিল। হাতীগুলো হঠাৎ করে মুহাসসির উপত্যকায় বসে পড়ল। হাতীগুলোকে চাবুক দিয়ে আঘাত করতে করতে আহত করা হল। তারা একবিন্দুও কাবার উদ্দেশ্যে সামনের দিকে এগুতে চায় না। কিন্তু যখন তাদেরকে বাকী তিনদিকে চালানোর চেষ্টা করা হয় তখন তারা দৌড়াতে থাকে। মক্কার দিকে এক কদমও অগ্রসর হয় না।
ইতিমধ্যেই দেখতে না দেখতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী ঠোঁট ও পাঞ্জায় করে পাথর টুকরো নিয়ে উড়ে এল এবং আবরাহা বাহিনীর উপর পাথরকুচির বৃষ্টি বর্ষণ করতে লাগল। যার উপরই এই পাথরকুচি পড়ত তার শরীর গলে যেত। ইবনে ইসহাক এবং ইকরামার মতে, পাথরকুচির স্পর্শ লাগলেই শরীরে বসন্ত রোগ দেখা দিত। ফলে গোটা আরব দেশে ঐ বছরেই প্রথম বসন্তের ব্যাপক প্রকোপ দেখা দেয়। ইবনে আব্বাসের মতে পাথরকুচি যার উপরই পড়ত তার শরীরে ভয়াবহ চুলকানী শুরু হত, চামড়া ফেটে যেত এবং মাংস ঝরে পড়ত। স্বয়ং আবরাহারই এই অবস্থা দেখা দিল। তার শরীরের রক্ত মাংস ঝরে পড়া শুরু হল। যেখানেই একটি পাথরকুচি পড়ত সেখান থেকেই পুঁজ ও রক্ত বের হত। এরকম ভয়াবহ অবস্থা থেকে তারা ইয়েমেনের দিকে ছুটে পালাতে লাগল এবং পথে পথে মরে পড়ে থাকল। আতা বিন ইয়াসার বলেছেন, তার সব লোক এক সাথে মারা যায়নি।
আবরাহার একজন মন্ত্রী এই ঘটনা বর্ণনা করার জন্য হাবশায় বাদশাহর দরবারে গেল এবং তার মাথার উপর একটি পাখীও উড়ছিল। সে যখন হাবশার বাদশাহর কাছে এ ঘটনা বর্ণনা শেষ করল, তখন পাখিটি তার উপর একই পাথরকুচি বর্ষণ করল এবং সে সেখানেই মারা গেল যা হাবশার বাদশাহ স্বচক্ষে দেখেন।
আল্লাহ তাঁর কুদরত দিয়ে কাবা শরীফকে রক্ষা করেন এবং আবরাহা বাহিনীকে পরাজিত করেন। যে পাখীগুলো ঐ অভিযানে অংশগ্রহণ করে সেগুলো লোহিত সাগরের দিক থেকে এসেছিল। সাঈদ বিন যোবায়ের বলেন, এ ধরনের পাখী আগেও দেখা যায়নি এবং পরেও আর কখনও দেখা যায়নি। ইবনে আব্বাস বলেন, পাখীগুলোর ঠোঁট পাখীর মতই ছিল কিন্তু তাদের পাঞ্জা ছিল কুকুরের মত। প্রত্যেকটা পাখীর ঠোঁটে একটি এবং পাঞ্জায় দুটো করে পাথর কুচি ছিল। মক্কার কোন কোন লোকের কাছে দীর্ঘদিন পর্যন্ত ঐ পাথরকুচির নমুনা সংরক্ষিত ছিল। পাথরগুলো মটরশুঁটির দানার মত এবং কালচে লাল ছিল। ইবনে মারদুইয়ার মতে, ঐগুলো ছাগলের লাদের সমান ছিল। এই সকল বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, সকল পাথরকুচি একই সমান ছিল না। কোনটা ছোট এবং কোনটা বড় ছিল।
কারুর মতে সেই পাখিগুলো ছিল আবাবিল। সেগুলো আকারে খুবই ছোট। অন্যদের মতে, আবাবীল অর্থ ঝাঁকে ঝাঁকে। অগণিত ছোট পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে এসে আবরাহার বাহিনীকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। যাই হোক, আবরাহা বাহিনী পর্যুদস্ত হওয়ার পর কোরাইশরা তাদের অর্থ-সম্পদ, পশু, হাতিয়ার, নগদ অর্থ ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী লাভ করে। আবদুল মুত্তালিব আবরাহা বাহিনীর সম্পদ ও সোনা লাভ করে পরবর্তীতে ধনী হয়ে গেলেন।
আল্লাহ আবরাহা বাহিনীকে ধ্বংস করেই ক্ষান্ত হননি। তারপর তিন-চার বছরের মধ্যে ইয়েমেনের বিভিন্ন গোত্রের সরদাররা বিদ্রোহ ঘোষণা করল এবং ইয়েমেনের উপর হাবশার শাসন এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি খতম হয়ে গেল। হস্তি বাহিনীর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর ইয়েমেনে তাদের শক্তি ও ক্ষমতা শেষ হয়ে গেল। ৫৭৫ খৃষ্টাব্দে, সাইফ বিন যি-ইয়াজান নামক একজন ইয়েমেনী সরদার পারস্য সম্রাটের সাহায্য চাওয়ায় মাত্র ১ হাজার পারসীয় সৈন্য ৬টি জাহাজে চেপে ইয়েমেনে আসে এবং সেখান থেকে হাবশী শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটায়।
এই ঘটনাটিই আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা ফীলে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন,
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحِبِ الْفِيلِ لَا أَلَمْ يَجْعَلْ كَيْدَهُمْ فِي تَضْلِيل وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْرًا أَبَابِيلَ لَا تَرْمِيهِمْ بِحِجَارَةٍ مِّنْ سِجَيْلِ لا فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفُ مَا كُول .
অর্থ: 'তুমি কি দেখনি তোমার আল্লাহ হস্তিবাহিনীর সাথে কি করেছেন? তিনি কি তাদের চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে পুরো নিষ্ফল করে দেননি? তিনি তাদের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী পাঠিয়ে দিলেন যা তাদের উপর পাকা মাটির পাথর নিক্ষেপ করছিল। ফলে তাদের অবস্থা এমন করে দিল যেমন জন্তু জানোয়ারের ভক্ষণ করা ভূষি।'
টিকাঃ
৭. ফী রেহাবিল বাইতিল হারাম, ডঃ মোহাম্মদ আলাওয়ী মালেক।
৮. প্রাগুক্ত।
৯. তাফহীমুল কোরআন, সূরা ফীল, সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী।