📄 যমযমের ব্যবহৃত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা
যমযম কূপের পানির স্তর বর্তমানে প্রাকৃতিক কারণে নীচে নেমে গেছে। এই স্তর নীচে নামার আগে যমযমের পানি ইয়াখুর নামক ড্রেন দিয়ে নিষ্কাশন করা হত। যমযমের পানিস্তর নীচে নেমে যাওয়ায় ঐ ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন অসম্ভব হয়ে পড়ে। 'ইয়াখুর' একটি তুর্কী শব্দ। ধারণা করা হয় যে, তুর্কী শাসনামলে যমযমের ব্যবহৃত ও মসজিদের বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য এই গভীর ড্রেনটি নির্মাণ করা হয়। সম্ভবতঃ এই ড্রেনটি মসজিদ থেকে দূরে একটি গভীর কূপের সাথে সংযুক্ত। কিন্তু কূপটির অবস্থানস্থল অজানা। বেশী গভীরতার জন্যই এটিকে কূপ বলা হয়। মেসফালার বাড়ী-ঘরসমূহের নীচে কিছু ছোট ছোট নালাার সন্ধান পাওয়া যায়। সম্ভবতঃ তুর্কীরা ইয়াখুর কূপের পানি বের করার জন্যই ঐ সকল ছোট নালাগুলো নির্মাণ করে। হারাম এলাকার উন্নয়ন, বহুতল বিশিষ্ট বহু সংখ্যক ইমারত নির্মাণ এবং সেগুলো থেকে ময়লা পানি নিষ্কাশনের জন্য যে সকল নালা ইয়াখুর কূপে গিয়ে মিলিত হয়েছে তার ফলে ইয়াখুর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্ভবতঃ অচল হয়ে গেছে। ফলে, ইয়াখুর ড্রেন পদ্ধতি তার কাঙ্খিত পানি নিষ্কাশনের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। ইয়াখুর কূপ ও ড্রেন নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা না থাকায় তা আবিষ্কার করার পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। কেননা, এতে ব্যাপক খননকার্য পরিচালনা করতে হবে, অসংখ্য বাড়ী-ঘরের ভিত্তি নষ্ট হবে, ট্রাফিক ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে, এবং মোটা অংকের অর্থ ব্যয় হবে। অনুমানের ভিত্তিতে খনন কাজ হবে, তারপরও লক্ষ্যে পৌঁছার কোন নিশ্চিত সম্ভাবনা নেই।
পরে জাবালে আবু কোবায়েসের নীচ দিয়ে মসজিদে হারামের ধোয়া ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি ড্রেন নির্মাণ করা হয় যা কিলা পাহাড়ের তলদেশ দিয়ে প্রধান সড়ক বরাবর মেসফালায় বিদ্যমান শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ড্রেনের সাথে গিয়ে সংযুক্ত হয়। পরে মসজিদে হারামের সর্বনিম্ন স্থানের লেবেল থেকে যমযমের ব্যবহৃত পানি এবং মসজিদে হারামের অন্যান্য স্থান থেকে, স্বাভাবিকভাবে গড়িয়ে আসার সুবিধার্থে, আরেকটি ড্রেন নির্মাণ করা হয়। এই দুটি ড্রেনের মাধ্যমে যমযম ও মসজিদে হারামের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়।
ইতিপূর্বে, মসজিদে হারাম থেকে মেসফালার দিকে হিজলা রোডে বিদ্যমান শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ড্রেনের সাথে সংযোগ দিয়ে যমযম এবং মসজিদে হারামের পানি নিষ্কাশনের জন্য দুটো পৃথক ড্রেন নির্মাণ করার প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়।
মসজিদে হারামের সর্বনিম্ন স্থানের লেবেল থেকে যমযমের ব্যবহৃত পানি ও মসজিদে হারামের পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন কাটার পর যমযমের পানির স্তর নীচে নেমে যায়। ফলে, ড্রেনের কাজ বন্ধ রাখা হয় এবং বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য কয়েকটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিগুলো গঠনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যমযমের পানির স্তর স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা এবং বাইরের দূষিত পানি যাতে কূপে প্রবেশ করতে না পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করা।
শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে আসা হয় যে, অতীতে যমযমের পানি এত বেশী পরিমাণ ছিল না এবং যমযমের পানির স্তরও এত উঁচু ছিলনা। কোন কোন সময় যমযম কূপ শুকিয়ে পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই পানির স্তর কমে যাওয়ার বিষয়টি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত না হয়ে তাকে যমযমের জন্য কল্যাণকর মনে করা হয়। এতে করে আরো প্রমাণিত হয় যে, ড্রেনের ফলে, ভূগর্ভের পানি যমযমে এসে মিশতে পারে না। তাই যমযমের বর্তমান পানি শুধুমাত্র যমযমেরই পানি যা যমযমের মূল উৎস থেকে উৎসারিত। এর ফলে ড্রেনের স্থগিত কাজ পুনরায় শুরু করতে আর কোন সমস্যা নেই। পরে ড্রেন তৈরির কাজ সমাপ্ত করা হয়।
টিকাঃ
২৭. যমযম, ইয়াহইয়া কোশাক।
📄 যমযমের পরিমাপ ও পানির উৎস
আযরাকী উল্লেখ করেছেন যে, যমযম উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ৬০ হাত এবং নীচের মেঝেতে তিনটি ঝর্ণাধারা রয়েছে। ঝর্ণাধারাগুলোর একটি হচ্ছে হাজারে আসওয়াদমুখী, একটি সাফা ও জাবালে আবু কোবায়েসমুখী এবং অন্যটি হচ্ছে মারওয়াহ পাহাড়মুখী।
২২৩ ও ২২৪ হিজরীতে, যমযমের পানি কমে শুকিয়ে গিয়েছিল। তখন নীচের দিকে আরো ৯ হাত গভীর করে তা খনন করা হয় এবং ভিটির পার্শ্বেও কিছুটা খনন করে তা চওড়া করা হয় যেন পানি প্রবাহ বাড়ে। ২২৫ হিজরীতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় যমযমের পানির স্তর বৃদ্ধি পায়।
আব্বাসী খলীফা হারুনুর রশীদের আমলে, সালেম বিন জাররাহ যমযম কূপ কয়েক হাত নীচের দিকে গভীর করেন। তিনি খলীফা মাহদীর আমলেও যমযম কূপকে আরো গভীর করেন।
খলীফা আমীন মুহাম্মদ বিন রশীদের আমলে, তাঁর ডাক বিভাগের তত্ত্বাবধানকারী এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির কেয়ারটেকার উমর বিন হামান যমযমের পানি কমে যাওয়ায় তা খনন করে আরো গভীর করেন। খনন কাজে অংশগ্রহণকারী তায়েফের অধিবাসী মুহাম্মদ বিন মুশীর বলেন, আমি যমযমের মেঝেতে নামায পড়েছি। উপর থেকে নীচের দিকের পাকা অংশের পরিমাণ হচ্ছে ৪০ হাত এবং সেখান থেকে নীচের মেঝের দূরত্বের পরিমাণ হচ্ছে ২৯ হাত। নিম্নের এই অংশটুকু সম্পূর্ণ পাথর কাটা অর্থাৎ এই অংশে কোন প্লাস্টার নেই। তিনি আরো বলেন, তখন উপরে যমযমের মুখের ঘেরাও-এর উচ্চতা ছিল আড়াই হাত, চারদিকে গোলাকার ঐ বেড়ার আয়তন ছিল ১১ হাত এবং যমযমের মুখের প্রশস্ততা ছিল ৩৬ হাত। যমযম কূপের উপর সাজ কাঠের একটি ফ্রেমওয়ার্ক ছিল এবং তাতে পানি তোলার জন্য ১২টি কপিকল লাগানো ছিল।
ইমাম ফাসী বলেন, আমার কিছু সাথী আমার সামনে যমীন থেকে যমযমের মুখের উচ্চতা, প্রশস্ততা ও গোলাকৃতি সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, এর মুখের উচ্চতা পৌনে দু'হাত, প্রশস্ততা সাড়ে ৪ হাত এবং গোলাকৃতি ১৫ হাত থেকে সামান্য কম। তবে হাত বলতে এখানে পূর্বে প্রচলিত লোহার গজ বুঝানো হয়েছে। 'নগর অভিধানের' লেখক ইয়াকুত হামাওয়ী লিখেছেন, যমযম উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ৬০ হাত লম্বা, এর তলদেশে তিনটি ঝর্ণাধারা আছে। একটি হাজারে আসওয়াদ, একটি সাফা ও আবু কোবায়েস পাহাড় এবং অন্যটি মারওয়ার দিক থেকে এসেছে। তারপর এর পানি কমে যায় এবং ২২৩ কিংবা ২২৪ হিজরীতে তা শুকিয়ে যায়। তখন মক্কার গভর্নর উমর বিন ফারাজ রাখজীর উত্তরসুরী ও ডাক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক মুহাম্মদ বিন দাহহাক তা ৯ হাত নীচের দিকে গভীর করেন। ফলে এর পানি বৃদ্ধি পায়। তারপর ২২৫ হিজরীতে আল্লাহর ইচ্ছায় বৃষ্টিপাত হওয়ায় পানির পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। তিনি বলেন, এর গভীরতা উপর থেকে নীচের কাটা অংশের শুরু পর্যন্ত ১১ হাত, সেখান থেকে সর্বশেষ তলা পর্যন্ত ২৯ হাত এবং এই অংশ সবটুকুই পাথর কাটা। এর মুখের গোলাকার চক্রের পরিমাণ হচ্ছে ১১ হাত ও মুখের প্রশস্ততা হচ্ছে ৩৯ হাত।
উপরোক্ত আলোচনায় আযরাকী, ফাসী এবং হামাওয়ীর বক্তব্যে যমযমের পরিমাপে পার্থক্য দেখা যায়। হাতের পার্থক্য এবং কালের ব্যবধানে এর মধ্যে যে সকল নির্মাণ, সংস্কার ও ভাঙ্গা গড়া হয়েছে সেগুলোই এই পার্থক্যের মূল কারণ।
আযরাকী, যমযমের ৩টি উৎসের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, যমযমের তলদেশে তিনটি ঝর্ণাধারা থেকেই যমযমের পানি উৎসারিত হয়। ফাকেহী বলেছেন, হযরত আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিব (রা) কা'ব-আল আহবারকে জিজ্ঞেস করেন, কোন্ ঝর্ণাধারাটি থেকে বেশী পানি নির্গত হয়? কা'ব বলেন, হাজারে আসওয়াদের দিক থেকে আগত ঝর্ণাধারাটি থেকে। তখন হযরত আব্বাস (রা) বলেন, তুমি যথার্থই বলেছ।
দারু কুতনী ইবনে সিরীন থেকে বর্ণনা করেছেন, একবার এক নিগ্রো কূপে পড়ে মারা যায়। হযরত ইবনে আব্বাস মৃত ব্যক্তির লাশটি উঠানো এবং কূপের সকল পানি বের করার নির্দেশ দেন। কূপের পানি বের করার সময় তারা হাজারে আসওয়াদের দিক থেকে আগত ঝর্ণাধারার বেগবান উৎসের সম্মুখীন হন। তারা বস্তা ও মোটা কাপড় দিয়ে তা বন্ধ করেন এবং পানি তোলার পর ঐ উৎস থেকে পানি ফেটে পড়ে।
ইমাম তাহাওয়ী শরহে মাআনী আল-আসার বইতে লিখেছেন এবং ইবনে শায়বা আতা বিন আবী রেবাহ থেকে সহীহ সনদ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি একবার কূপে পড়ে মারা যায়। তখন ইবনে যুবায়ের (রা) লাশ উঠানোর পর কূপের সকল পানি সেচ করে বাইরে ফেলে দেয়ার নির্দেশ দেন। অবিরাম পানি সেচের পরও পানি আর শেষ হয় না। তখন দেখা গেল যে, হাজারে আসওয়াদের দিক থেকে একটি বেগবান উৎস হতে পানি আসার কারণেই সেচ করে পানি শেষ করা যাচ্ছে না। তখন ইবনে যুবায়ের (রা) বলেন, এই পর্যন্তই যথেষ্ট।
উমরী তার মাসালেক আল-আবসার বইতে লিখেছেন, কূপে একবার হাবশার একজন লোক পড়ে মারা যায়। তখন কূপের পানি সব তুলে ফেলার চেষ্টার সময় দেখা যায় যে, তিন দিক থেকে পানি এসে যমযমে পড়ছে এবং এর মধ্যে শক্তিশালী উৎসটি হচ্ছে কাবা শরীফের দিক থেকে আগত ঝর্ণাধারা। (২৮) (দারু কুতনী) ১৪০০ হিজরীতে, যমযম কূপ পরিচ্ছন্নতাকালীন সময়ে যমযমের সকল পানি সেচ করে বাইরে ফেলে দেয়ার উদ্দেশ্যে বড় বড় কয়েকটি দমকল বসানো হয়। ফলে, পানি সেচের মাধ্যমে যমযমের পানির উৎসের নীচ পর্যন্ত, কূপের সঠিক পরিমাপ, দেয়াল ও পানির উৎস সম্পর্কে জানা যায় এবং এর সাধারণ ছবি ও মুভি ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়।
পরিচ্ছন্নতা কাজে অংশগ্রহণকারী ২ জন ডুবুরীর সাহায্যে জানা যায় যে, কূপের ব্যাস হচ্ছে ৪ মিটার। তাঁরা বলেন, আমরা দেখতে পাই যে, কূপের উপর থেকে ১৪.৮০ মিটার নীচ পর্যন্ত মজবুত প্লাস্টার। এর নীচে যমযমে পানি সরবরাহকারী দুটো উৎস রয়েছে। একটি কা'বার দিক থেকে এবং অন্যটি জিয়াদের দিক থেকে এসেছে। এই উৎসদ্বয়ের নীচে কূপের তলদেশ পর্যন্ত ১৭.২০ মিটার পাথর কাটা অংশ। এই অংশটুকু পাথরের ভেতর সিলিন্ডারের মতো পিলারের আকৃতিতে বেঁকে গেছে। এর মাঝের প্রশস্ততা হচ্ছে ১.৮০ মিটার এবং নীচে বদ্ধমুখ। এটিকে যমযমের ক্ষুদ্র জলাধার বলা যায়। সেখানকার লাল পাথর বিশিষ্ট দেয়ালের গায়ে باذن আল্লাহ 'আল্লাহর হুকুমে' এই কথাটি খোদিত আছে।
উল্লেখ্য যে, সর্বশেষ এই পরিমাপ যমযমের ইতিহাসে বর্ণিত আগের পরিমাপের নিকটবর্তী। পূর্বের বর্ণনাসমূহের অধিকাংশে একথা বলা হয়েছে যে, যমযমের মুখ থেকে নীচে পাথর কাটা পর্যন্ত প্লাস্টার করা অংশের পরিমাণ হচ্ছে, ৪০ হাত অর্থাৎ ২২.৫০ মিটার এবং নীচের পাথর কাটা অংশের পরিমাপ হচ্ছে, ২৯ হাত অর্থাৎ ১৬.২৫ মিটার। যমযমের প্লাস্টারকৃত অংশের পরিমাপের ব্যাপারে অতীতের ঐতিহাসিক বর্ণনার সাথে বর্তমান পরিমাপের পার্থক্যের কারণ হল, যমযম বর্তমানে মাতাফের নীচে কাবার স্তর থেকে আরো নীচে অবস্থান করছে অর্থাৎ যমযম এখন মাতাফের নীচে। অথচ পূর্বে তা মাতাফের উপর কাবার স্তরের সাথে ছিল। পাথর কাটা অংশের পরিমাপে মাত্র ১ মিটারের ব্যবধান। এটা কূপ পরিষ্কার করার কারণেই হয়েছে। কেননা, কূপে অনেক জিনিসপত্র পড়েছিল। সেগুলো উঠানোর কারণে এর গভীরতা কিছু বেড়েছে। গভীরতার পার্থক্যের কারণে, এর ব্যাসরেখায় ১.৫০ মিটার থেকে ২ মিটার পর্যন্ত ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। কূপের প্লাস্টারকৃত অংশ ও পাথর কাটা অংশের সংযোগস্থলের ব্যাসরেখা হচ্ছে ১.৮০ মিটার। সেই সংযোগ স্থানেই রয়েছে যমযমের পানির প্রধান উৎসসমূহ। এই উৎসগুলো পাথরের দুটো সারির মধ্যে অবস্থিত।
প্রধান উৎসগুলো নিম্নরূপ:
১. প্রধান উৎস বা ঝর্ণাধারা: এটি কা'বা শরীফের হাজারে আসওয়াদের দিক থেকে এসেছে। এই উৎসমুখের দৈর্ঘ্য ৪৫ সেন্টিমিটার এবং উচ্চতা বা প্রশস্ততা হচ্ছে ৩০ সেন্টিমিটার। ভেতরের দিকে তা গভীর। কূপের বেশীর ভাগ পানি এই উৎস থেকেই আসে।
২. দ্বিতীয় উৎস: এর উৎসমুখের দৈর্ঘ ৭০ সেন্টিমিটার। ভেতরে তা আরো দুটো মুখে বিভক্ত। এর প্রশস্ততা বা উচ্চতা হচ্ছে ৩০ সেন্টিমিটার। এটি জিয়াদের দিক থেকে এসেছে।
৩. শাখা উৎসসমূহ: প্লাস্টারকৃত অংশ এবং পাথর কাটা অংশের সংযোগস্থলে পাথরের মাঝে কতগুলো ছোট উৎসমুখ আছে। সেগুলো থেকেও যমযমে পানি আসে। দুই প্রধান উৎসমুখের মাঝখানে ১ মিটারব্যাপী স্থানে, ৫টি ছোট উৎসমুখ আছে। অনুরূপভাবে, প্রথম ও প্রধান উৎসমুখের পার্শ্ব থেকে শুরু করে ২য় প্রধান উৎসমুখ পর্যন্ত, জাবালে আবু কোবায়েস, সাফা এবং মারওয়া পাহাড়ের দিক থেকে ২১টি ছোট উৎসমুখ এসেছে। এগুলো একই স্তরের নয় বরং বিভিন্ন স্তরে অবস্থিত এবং এগুলো থেকে নির্গত পানির পরিমাণও এক নয়।
ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোতে, যমযমের তিনটি উৎসের কথা উল্লেখ আছে। ১টি হচ্ছে কা'বার দিক থেকে, ২য়টি হচ্ছে আবু কোবায়েস এবং সাফা পাহাড়ের দিক থেকে এবং ৩য়টি মারওয়া পাহাড়ের দিক থেকে। কিন্তু বর্তমানে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় মাত্র দুটো উৎসের সন্ধান পাওয়া যায়। একটি কা'বার দিক থেকে এবং অন্যটি জিয়াদের দিক থেকে। তবে অতীতের ঐতিহাসিক বর্ণনায় আবু কোবায়েস ও সাফা পাহাড়ের বর্ণিত উৎসের পরিবর্তে বর্তমানে ২১টি ছোট উৎস দেখতে পাওয়া যায়।
১০২৮ হিজরীতে, যমযম কূপ সংস্কারের সময় ঐ উৎসমুখটি বন্ধ করায় তখন পাথরের ভেতর থেকে বেগে পানি বের হতে থাকে। গাজী তার ইতিহাসে আল্লামা খিদরাওয়ী (রঃ) এর تَاجٌ تَوَارِيعِ الْبَشَرِ কিতাবের বরাত দিয়ে লিখেছেন, ১০২৮ হিজরীর রমযান মাসে যমযমে, পশ্চিম দিক এবং শামীয়ার দিক থেকে অনেক পাথর ধসে পড়ে। একই সালের ৪ঠা শাওয়াল, সোমবার তা পরিষ্কার করা হয় এবং ১৬ই শাওয়ালে, যমযমের ভেতর প্লাস্টারিং এর কাজ শেষ করা হয়। পানির স্তরের সাথে সংযুক্ত অংশের প্লাস্টারে চুন ও জিপসাম ব্যতীত বালু ব্যবহার করা হয় এবং তার উপরের অংশে জিপসাম এবং চুন দিয়ে প্লাস্টার করা হয় যেন আর পাথর ধসে না পড়ে।
যমযমের পাথরযুক্ত অংশের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, এর খাড়া অংশের কিছু পর পাথর কাটার কারণে কূপের আকার আর সোজা ও খাড়া থাকেনি, বরং বাঁকা হয়ে গেছে। প্রধান প্রথম উৎসমুখের নীচে ৪টি পাথর কাটা ও বাঁকা। অনুরূপভাবে, ৪টি পাথর দুই প্রধান উৎসমুখের মাঝে ১ মিটার জায়গায় এবং অন্য ১২টি পাথর ছোট উৎসমুখগুলোর স্থানে কাটা ও বাঁকা।
কাটা পাথরের গায়ে যে গভীরতা তা সর্বোচ্চ ৬ সেন্টিমিটার এবং সর্বনিম্ন নামেমাত্র কাটা। সম্ভবতঃ পানির উৎসগুলো থেকে অব্যাহত পানি বের হওয়ার কারণে তা ক্ষয় হয়েছে কিংবা কূপ থেকে বালতি দিয়ে পানি তোলার কারণে রশির ঘষা লেগে অথবা এই দু'টির যৌথ কারণে তা ক্ষয় হয়েছে। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে যে, ১২টি পর্যন্ত কপিকল ব্যবহার করে বালতির মাধ্যমে যমযম থেকে পানি তোলা হয়েছে। মক্কার উম্মুল কোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন হজ্জ গবেষণা কেন্দ্র, যমযমের মূল উৎসগুলো আরো সঠিকভাবে নির্ধারণ করার জন্য গবেষণা চালাবে বলে জানা গেছে।
টিকাঃ
২৮. তারীখ ইমারাতিল মাসজিদিল হারাম, হোসাইন আবদুল্লাহ বাসালামাহ।
২৯. যমযম, ইয়াহইয়া কোশাক।
📄 যমযমের পানি সরবরাহকারী উপাদান
মাটি ও পাথরের নীচে ভূগর্ভে পানি বিদ্যমান আছে। সেখান থেকেই সাধারণতঃ বিভিন্ন কূপে পানি এসে জমা হয়। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন কূপগুলোর পানির উৎস হিসেবে কাজ করে। আরব উপদ্বীপে, সাধারণতঃ শীতকালে সামান্য বৃষ্টিপাত হয়। এতদঞ্চলে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের কারণেই উক্ত বৃষ্টিপাত হয়। ভূমধ্যসাগর থেকে ঐ ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় এবং দজলা ও ফোরাত অঞ্চলের দিকে তা সম্প্রসারিত হয়। ঐ সকল ঘূর্ণিঝড়ের কিছু লোহিত সাগর উপকূলে আসে এবং তার ফলে, শীত মওসুমে মক্কায় সামান্য বৃষ্টিপাত হয়। সাধারণতঃ মক্কার আকাশ থেকে ১/২ ঘন্টা যাবত মুষলধারে প্রচণ্ড বৃষ্টি বর্ষিত হয়। ১৯৬৯ খৃঃ থেকে ১৯৭২ খৃঃ পর্যন্ত এই তিন বছরে মক্কায় বৃষ্টির যে রেকর্ড করা হয়েছে তাতে সর্বনিম্ন ২১ মিলিমিটার ও সর্বোচ্চ ৮২.৬ মিলিমিটার গড় রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছে।
এতদঞ্চলের মাটি পাথর দ্বারা গঠিত হওয়ায় তা খুবই শক্ত। বৃষ্টির পানি মাটির নীচে প্রবেশ না করে শক্ত মাটির উপর দিয়ে বিনা বাধায় বন্যার আকারে প্রবাহিত হয়। ফলে, মক্কায় উল্লেখিত সামান্য বৃষ্টিপাত হলেও তাতে বন্যা সৃষ্টি হয় এবং গোটা এলাকাকে প্লাবিত করে। বন্যার শিকার হয়ে বহু মানুষ ও পশু মারা যায় এবং সহায় সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। প্রস্তরময় পাহাড়ের উপর বৃষ্টি বর্ষিত পানি নিম্নভূমির দিকে নেমে আসায় এই বন্যা সৃষ্টি হয়। এখানকার পাহাড় কঠিন পাথর দ্বারা গঠিত।
মসজিদে হারাম যে ইবরাহীম উপত্যকায় অবস্থিত, সেই উপত্যকাটি উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে নিম্নগামী। ফলে, ঐ দুই দিকের প্রচণ্ড বর্ষণের পানি নিষ্কাশনের জন্য মসজিদে হারামের পার্শ্ব দিয়ে প্রবাহিত সংকীর্ণ উপত্যকা ছাড়া আর অন্য কোন নিম্নভূমি নেই। এই সংকীর্ণ উপত্যকাটির আয়তন বেশী বড় নয়, ৬৫০ হেক্টর যমীন মাত্র। ফলে, সংকীর্ণ উপত্যকা দিয়ে দ্রুত পানি সরতে না পারায় সর্বনাশা বন্যার সৃষ্টি হয়। তাই দেখা যায় যে, ১৩৮৮ হিজরীর বন্যা, মাত্র জিয়াদের সাদ এলাকা এবং বালীলা কূপের এলাকায় বর্ষণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। যে কোন বন্যায় মক্কায় জান-মাল এবং বাড়ীঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
মক্কার বন্যা, সাধারণত মিনা, নূর পাহাড় এবং জোরানা উপত্যকা থেকে নেমে আসে। ঐ এলাকাগুলো ইবরাহীম উপত্যকা থেকে উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। প্রায় ৭ হাজার হেক্টর যমীন তথা ২৭ বর্গমাইল এলাকা থেকে মক্কার উপর ঐ বন্যা প্রবাহিত হয়। শিশশা নামক স্থান দিয়েই মিনা থেকে ইবরাহীম উপত্যকায় পানি প্রবেশ করে। অপরদিকে নূর পাহাড় এবং জোরানার পানি প্রবেশ করে পুরাতন রাজপ্রাসাদের নিকট দিয়ে। সোজা উত্তর দিক থেকেও কোন কোন সময় বন্যার পানি মসজিদে হারামে প্রবেশ করে। এই সকল এলাকা থেকে বন্যার সকল স্রোত মসজিদে হারামের নিকট কাসাসিয়া গাজ্জা, হুজুন এবং মোআল্লায় এসে মিলিত হয়। মক্কার অন্যান্য উঁচু ভূমির তুলনায় ইবরাহীম উপত্যকার মুখে অবস্থিত এ সকল নিম্ন জায়গায় এসে সকল স্রোত একাকার হয়ে তা গোটা উপত্যকাকে প্লাবিত করে। এর ব্যতিক্রম হচ্ছে শুধু আবু কোবায়েস পাহাড় এবং জিয়াদে বর্ষিত পানি। কেননা, পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব এলাকার এই পানি বাদশাহ আবদুল আযীয দরজার সামনে দিয়ে মেসফালার দিকে গড়ায়।
ইসলামের আগমনের পর, মক্কায় এ যাবত ৮৬টি বন্যার কথা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। ঐ সকল বন্যার কোন কোনটিতে কা'বা শরীফের ভিটির সমান, হাজারে আসওয়াদের সমান, কা'বার দরজার সমান কিংবা দরজার তালার সমান পানি উঠেছে। এগুলোকে ইতিহাসে নীল নদের পানির সাথেও তুলনা করা হয়েছে। ঐ সকল পানি শুকাতে ২ দিন পর্যন্ত সময়ও লেগেছে।
ইতিহাসে, ঐ সকল বৃষ্টি ও বন্যার সাথে যমযমের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আযরাকী বলেন, হিজরী ২২৩ ও ২২৪ সালে যমযম কূপ শুকিয়ে গিয়েছিল, তারপর নীচের দিকে আরো ৯ হাত খনন করা হয় এবং এর পাশ কেটে সামান্য প্রশস্ত করা হয়। তারপর ২২৫ হিজরীতে বৃষ্টি হওয়ায় যমযমের পানি বৃদ্ধি পায়।
আযরাকী তাঁর বই এর অন্য জায়গায় উল্লেখ করেছেন যে, এমন এক সময় আসবে যখন যমযমের পানি নীল নদ এবং ফোরাত নদীর পানির চাইতেও বেশী মিষ্টি হবে। আবু মুহাম্মদ আল-খোযাঈ বলেন, আমরা ২৮১ হিজরীতে তা দেখেছি। ২৭৯ এবং ২৮০ হিজরীতে মক্কায় প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হয়। তখন যমযমের পানি বেড়ে যায় এমনকি যমযমের মুখ থেকে মাত্র ৭ হাত নীচে পানি দেখতে পাওয়া যায়। আমি নিজে এরূপ কোনদিন দেখিনি এবং কেউ দেখেছে বলেও শুনিনি, শুধু তাই নয়, এর পানি এত বেশী মিষ্টি হয় যে, মক্কার অন্য কোন কূপের পানি এত মিষ্টি নয়। এই পানি বেশী মিষ্টি হওয়ায় আমি নিজে এবং মক্কাবাসীরা এই যমযমের পানি পান করাই বেশী পসন্দ করতাম। কিন্তু হিজরী ২৮৩ সালে, এর পানি ভারী ও লবণাক্ত হয়ে যায়। তবে তাতে পানির প্রাচুর্য অব্যাহত ছিল।
১৩৮৮ হিজরীর বন্যার সময় দেখা গেছে যে, বন্যার পানি কা'বা শরীফের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে। তখন পরীক্ষা করে দেখা হয় যে, যমযমের ভেতর থেকেও জোরে পানি বের হচ্ছে। একটি ২ মিটার বিশিষ্ট পাইপ কূপের মাঝামাঝি রেখে দেখা গেছে যে, পাইপের অপর মুখ দিয়ে পানি বের হচ্ছে। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, যমযমের নীচে পানির চাপ আছে। সে কারণে পানি উপরের দিকে উথলে উঠে। এছাড়াও একখণ্ড টিস্যু পেপার কূপের মুখে ফেলে দেখা গেছে যে, ভেতর থেকে আসা স্রোত ঐ টিস্যু পেপারটিকে ভাসিয়ে অন্য দিকে নিয়ে গেছে।
এই সকল পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রমাণ হয় যে, বৃষ্টির পর যমযম কূপ আর্টেজীয় কূপের আকৃতি ধারণ করে অর্থাৎ যে কূপের পানি আভ্যন্তরীণ চাপে বের হয়ে আসে-সে রকম হয়। বৃষ্টির পর কূপের পানি অধিকতর মিষ্টি হয়। কূপের পানির এই জোর প্রবাহগতি বেশ কিছুদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে এবং পরে তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়। তখন কূপের পানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং মুখ থেকে মাত্র ৩ মিটার নীচে পানি মওজুদ থাকে। পরবর্তীতে কূপের পানির এই স্তর দীর্ঘদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, ভূগর্ভস্থ পানি যমযমের পানির উৎস ও উপাদান নয়, বরং অন্য কিছুই এর মূল উৎস। কেননা, দাউদিয়া কূপে যমযমের মত অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। যদি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধির কারণে যমযমের পানির স্তর বেড়ে থাকে, তাহলে মসজিদে হারামের পার্শ্ববর্তী দাউদিয়া কূপসহ অন্যান্য কূপগুলোর পানির স্তরও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু সেগুলোতে পানির স্তর বাড়েনি। এই তথ্য দ্বারা একথার সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায় যে, মূলতঃ যমযম কূপের পৃথক ও স্বতন্ত্র পানি সরবরাহ উৎস রয়েছে।
১৪০০ হিজরীতে, জোহায়মান বেগ ও তার দল-বল কর্তৃক মসজিদে হারাম আক্রমণের পর কূপ পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সময় যমযমের মূল ঝর্ণাধারার পানির নমুনা ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, ভূগর্ভস্থ পানির মত তা দূষিত নয়, বরং তা জীবাণুমুক্ত ও বিশুদ্ধ পানি যা কূপের অন্য উৎসগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের।
টিকাঃ
৩০. প্রাগুক্ত।
৩১. প্রাগুক্ত।
মাটি ও পাথরের নীচে ভূগর্ভে পানি বিদ্যমান আছে। সেখান থেকেই সাধারণতঃ বিভিন্ন কূপে পানি এসে জমা হয়। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন কূপগুলোর পানির উৎস হিসেবে কাজ করে। আরব উপদ্বীপে, সাধারণতঃ শীতকালে সামান্য বৃষ্টিপাত হয়। এতদঞ্চলে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের কারণেই উক্ত বৃষ্টিপাত হয়। ভূমধ্যসাগর থেকে ঐ ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় এবং দজলা ও ফোরাত অঞ্চলের দিকে তা সম্প্রসারিত হয়। ঐ সকল ঘূর্ণিঝড়ের কিছু লোহিত সাগর উপকূলে আসে এবং তার ফলে, শীত মওসুমে মক্কায় সামান্য বৃষ্টিপাত হয়। সাধারণতঃ মক্কার আকাশ থেকে ১/২ ঘন্টা যাবত মুষলধারে প্রচণ্ড বৃষ্টি বর্ষিত হয়। ১৯৬৯ খৃঃ থেকে ১৯৭২ খৃঃ পর্যন্ত এই তিন বছরে মক্কায় বৃষ্টির যে রেকর্ড করা হয়েছে তাতে সর্বনিম্ন ২১ মিলিমিটার ও সর্বোচ্চ ৮২.৬ মিলিমিটার গড় রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছে।
এতদঞ্চলের মাটি পাথর দ্বারা গঠিত হওয়ায় তা খুবই শক্ত। বৃষ্টির পানি মাটির নীচে প্রবেশ না করে শক্ত মাটির উপর দিয়ে বিনা বাধায় বন্যার আকারে প্রবাহিত হয়। ফলে, মক্কায় উল্লেখিত সামান্য বৃষ্টিপাত হলেও তাতে বন্যা সৃষ্টি হয় এবং গোটা এলাকাকে প্লাবিত করে। বন্যার শিকার হয়ে বহু মানুষ ও পশু মারা যায় এবং সহায় সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। প্রস্তরময় পাহাড়ের উপর বৃষ্টি বর্ষিত পানি নিম্নভূমির দিকে নেমে আসায় এই বন্যা সৃষ্টি হয়। এখানকার পাহাড় কঠিন পাথর দ্বারা গঠিত।
মসজিদে হারাম যে ইবরাহীম উপত্যকায় অবস্থিত, সেই উপত্যকাটি উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে নিম্নগামী। ফলে, ঐ দুই দিকের প্রচণ্ড বর্ষণের পানি নিষ্কাশনের জন্য মসজিদে হারামের পার্শ্ব দিয়ে প্রবাহিত সংকীর্ণ উপত্যকা ছাড়া আর অন্য কোন নিম্নভূমি নেই। এই সংকীর্ণ উপত্যকাটির আয়তন বেশী বড় নয়, ৬৫০ হেক্টর যমীন মাত্র। ফলে, সংকীর্ণ উপত্যকা দিয়ে দ্রুত পানি সরতে না পারায় সর্বনাশা বন্যার সৃষ্টি হয়। তাই দেখা যায় যে, ১৩৮৮ হিজরীর বন্যা, মাত্র জিয়াদের সাদ এলাকা এবং বালীলা কূপের এলাকায় বর্ষণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। যে কোন বন্যায় মক্কায় জান-মাল এবং বাড়ীঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
মক্কার বন্যা, সাধারণত মিনা, নূর পাহাড় এবং জোরানা উপত্যকা থেকে নেমে আসে। ঐ এলাকাগুলো ইবরাহীম উপত্যকা থেকে উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। প্রায় ৭ হাজার হেক্টর যমীন তথা ২৭ বর্গমাইল এলাকা থেকে মক্কার উপর ঐ বন্যা প্রবাহিত হয়। শিশশা নামক স্থান দিয়েই মিনা থেকে ইবরাহীম উপত্যকায় পানি প্রবেশ করে। অপরদিকে নূর পাহাড় এবং জোরানার পানি প্রবেশ করে পুরাতন রাজপ্রাসাদের নিকট দিয়ে। সোজা উত্তর দিক থেকেও কোন কোন সময় বন্যার পানি মসজিদে হারামে প্রবেশ করে। এই সকল এলাকা থেকে বন্যার সকল স্রোত মসজিদে হারামের নিকট কাসাসিয়া গাজ্জা, হুজুন এবং মোআল্লায় এসে মিলিত হয়। মক্কার অন্যান্য উঁচু ভূমির তুলনায় ইবরাহীম উপত্যকার মুখে অবস্থিত এ সকল নিম্ন জায়গায় এসে সকল স্রোত একাকার হয়ে তা গোটা উপত্যকাকে প্লাবিত করে। এর ব্যতিক্রম হচ্ছে শুধু আবু কোবায়েস পাহাড় এবং জিয়াদে বর্ষিত পানি। কেননা, পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব এলাকার এই পানি বাদশাহ আবদুল আযীয দরজার সামনে দিয়ে মেসফালার দিকে গড়ায়।
ইসলামের আগমনের পর, মক্কায় এ যাবত ৮৬টি বন্যার কথা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। ঐ সকল বন্যার কোন কোনটিতে কা'বা শরীফের ভিটির সমান, হাজারে আসওয়াদের সমান, কা'বার দরজার সমান কিংবা দরজার তালার সমান পানি উঠেছে। এগুলোকে ইতিহাসে নীল নদের পানির সাথেও তুলনা করা হয়েছে। ঐ সকল পানি শুকাতে ২ দিন পর্যন্ত সময়ও লেগেছে।
ইতিহাসে, ঐ সকল বৃষ্টি ও বন্যার সাথে যমযমের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আযরাকী বলেন, হিজরী ২২৩ ও ২২৪ সালে যমযম কূপ শুকিয়ে গিয়েছিল, তারপর নীচের দিকে আরো ৯ হাত খনন করা হয় এবং এর পাশ কেটে সামান্য প্রশস্ত করা হয়। তারপর ২২৫ হিজরীতে বৃষ্টি হওয়ায় যমযমের পানি বৃদ্ধি পায়।
আযরাকী তাঁর বই এর অন্য জায়গায় উল্লেখ করেছেন যে, এমন এক সময় আসবে যখন যমযমের পানি নীল নদ এবং ফোরাত নদীর পানির চাইতেও বেশী মিষ্টি হবে। আবু মুহাম্মদ আল-খোযাঈ বলেন, আমরা ২৮১ হিজরীতে তা দেখেছি। ২৭৯ এবং ২৮০ হিজরীতে মক্কায় প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হয়। তখন যমযমের পানি বেড়ে যায় এমনকি যমযমের মুখ থেকে মাত্র ৭ হাত নীচে পানি দেখতে পাওয়া যায়। আমি নিজে এরূপ কোনদিন দেখিনি এবং কেউ দেখেছে বলেও শুনিনি, শুধু তাই নয়, এর পানি এত বেশী মিষ্টি হয় যে, মক্কার অন্য কোন কূপের পানি এত মিষ্টি নয়। এই পানি বেশী মিষ্টি হওয়ায় আমি নিজে এবং মক্কাবাসীরা এই যমযমের পানি পান করাই বেশী পসন্দ করতাম। কিন্তু হিজরী ২৮৩ সালে, এর পানি ভারী ও লবণাক্ত হয়ে যায়। তবে তাতে পানির প্রাচুর্য অব্যাহত ছিল।
১৩৮৮ হিজরীর বন্যার সময় দেখা গেছে যে, বন্যার পানি কা'বা শরীফের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে। তখন পরীক্ষা করে দেখা হয় যে, যমযমের ভেতর থেকেও জোরে পানি বের হচ্ছে। একটি ২ মিটার বিশিষ্ট পাইপ কূপের মাঝামাঝি রেখে দেখা গেছে যে, পাইপের অপর মুখ দিয়ে পানি বের হচ্ছে। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, যমযমের নীচে পানির চাপ আছে। সে কারণে পানি উপরের দিকে উথলে উঠে। এছাড়াও একখণ্ড টিস্যু পেপার কূপের মুখে ফেলে দেখা গেছে যে, ভেতর থেকে আসা স্রোত ঐ টিস্যু পেপারটিকে ভাসিয়ে অন্য দিকে নিয়ে গেছে।
এই সকল পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রমাণ হয় যে, বৃষ্টির পর যমযম কূপ আর্টেজীয় কূপের আকৃতি ধারণ করে অর্থাৎ যে কূপের পানি আভ্যন্তরীণ চাপে বের হয়ে আসে-সে রকম হয়। বৃষ্টির পর কূপের পানি অধিকতর মিষ্টি হয়। কূপের পানির এই জোর প্রবাহগতি বেশ কিছুদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে এবং পরে তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়। তখন কূপের পানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং মুখ থেকে মাত্র ৩ মিটার নীচে পানি মওজুদ থাকে। পরবর্তীতে কূপের পানির এই স্তর দীর্ঘদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, ভূগর্ভস্থ পানি যমযমের পানির উৎস ও উপাদান নয়, বরং অন্য কিছুই এর মূল উৎস। কেননা, দাউদিয়া কূপে যমযমের মত অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। যদি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধির কারণে যমযমের পানির স্তর বেড়ে থাকে, তাহলে মসজিদে হারামের পার্শ্ববর্তী দাউদিয়া কূপসহ অন্যান্য কূপগুলোর পানির স্তরও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু সেগুলোতে পানির স্তর বাড়েনি। এই তথ্য দ্বারা একথার সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায় যে, মূলতঃ যমযম কূপের পৃথক ও স্বতন্ত্র পানি সরবরাহ উৎস রয়েছে।
১৪০০ হিজরীতে, জোহায়মান বেগ ও তার দল-বল কর্তৃক মসজিদে হারাম আক্রমণের পর কূপ পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সময় যমযমের মূল ঝর্ণাধারার পানির নমুনা ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, ভূগর্ভস্থ পানির মত তা দূষিত নয়, বরং তা জীবাণুমুক্ত ও বিশুদ্ধ পানি যা কূপের অন্য উৎসগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের।
টিকাঃ
৩০. প্রাগুক্ত।
৩১. প্রাগুক্ত।
📄 যমযমের পানি উৎপাদন ক্ষমতা
১৩৯১ হিজরীতে, সৌদী কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যমযমের পানি উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারণের জন্য একটি উদ্যোগ নেয়া হয়। এই উদ্যোগের আওতায় যমযমের মুখে বিদ্যুত চালিত দু'টো পাম্প মেশিন বসানো হয়। বড় পাম্প মেশিনটি ৫০ অশ্বশক্তি সম্পন্ন এবং ঘন্টায় ৩০ ঘন মিটার পানি উত্তোলন করতে সক্ষম। ছোট পাম্প মেশিনটি ঘন্টায় ১১.৬ ঘনমিটার পানি তুলতে সক্ষম।
ছোট পাম্প মেশিন দ্বারা পানি তোলার ফলে, শুরু করার ৭ মিনিটের মধ্যে কূপের পানির স্থায়ী স্তর ২.১৬ মিটার থেকে ১.৭৪ মিটারে নেমে আসে। ১৮ মিনিট পর ২.১০ মিটার এবং ৪৭ মিনিট পর ২.১২ মিটারে নেমে আসে।
এরপর ছোট পাম্প মেশিনটি বন্ধ করে বড় পাম্প মেশিন চালু করা হয়। শুরুর ৭৭ মিনিট পর পানির স্তর ২.২৭ মিটার, ৯৬ মিনিট পর ২.৩২ মিটার, ১১৭ মিনিট পর ২.৩১ মিটার এবং ১২৩ মিনিট পর ২.৩২ মিটারে অবস্থান করে। তারপর দু'টো মেশিনকে এক সাথে চালু করলে ৪ ঘন্টায় পানির স্তর ২.৬৪ মিটারে নেমে আসে। ৩ দিন পর্যন্ত একই পরীক্ষা চালানো হয়।
দু'টো পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে যমযমের পানি উৎপাদনের ব্যাপারে যে তথ্য পাওয়া যায় তা হচ্ছে, প্রতি মিনিটে ১৬৪.৫ থেকে ২১৭.৩ গ্যালন পানি অর্থাৎ প্রতি সেকেণ্ডে ১.০৪ লিটার থেকে ১.৩৭ লিটার পানি তোলা সম্ভব হয়েছে। পানি উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ওয়াটসন কনসালটিং কোম্পানী, পাকিস্তানী কনসালটেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিয়ন এবং পশ্চিম জার্মানীর W.F ক্রোনার কনসালটিং ফার্ম পাম্প মেশিন দ্বারা উত্তোলিত পানির অনুপাত দ্বারা যমযমের উৎপাদন ক্ষমতা ঘন্টায় ৬০ ঘন মিটার নির্ধারণ করে এবং তা নিম্নের পরিমাপের আগ পর্যন্ত বহাল থাকে।
১৪০০ হিজরীতে, মসজিদে হারামে জোহায়মান বেগ ও তার সাথী-সঙ্গীরা আক্রমণ করার পর ঐ দুর্ঘটনা শেষে যমযম কূপ পরিষ্কার করার সময় যমযমের উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে পুনরায় পরিমাপ করা হয়।
এই পরিমাপে ৪টি FLYGT মডেল বি ২১৫১ এইচ টি সাবমার্জড পাম্প ব্যবহার করা হয়। প্রথমটি কূপের ভেতর ২৫ মিটার গভীরে, ২য় টি ২২ মিটার, ৩য় টি ১৯ মিটার এবং ৪র্থ টি ১৭ মিটার গভীরে বসানো হয়। ৪ টা মেশিন একসাথে চালু করা হয়। ২৫ মিটার গভীরে বসানো প্রথম পাম্প মেশিনটি বেশী চাপের কারণে এর বৈদ্যুতিক কয়েলে পানি ঢুকায় তা বন্ধ হয়ে যায়। অবশিষ্ট তিনটি পাম্প চলতে থাকে। এই পাম্পগুলো বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ড্রেনে পানি ফেলে। একই সাথে যমযমের পার্শ্বে দুটো গর্ত থেকে ভূগর্ভস্থ পানিও একই ড্রেনে তুলে ফেলার জন্য আরো দু'টো পাম্প মেশিন বন্ধ করে দেয়া হয়।
প্রথমে পানির স্তর ছিল ৩.২৩ মিটার গভীরে এবং পানির স্তর ১২.৭২ মিটার গভীরে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি আধা মিনিটে একবার Reading নেয়া হত। একটি মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং তখন গর্তে পানির স্তর ৬৫ সেন্টিমিটারে পৌছে। পানির স্তর ১২.৮৩ মিটারে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি আধা মিনিটে Reading নেয়া হয়। পানির স্তর ১৩.৩৯ মিটারে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি ১ মিনিট অন্তর Reading নেয়া হয়। এই স্তরে পৌঁছার পর কূপে পানি পড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং তখন পর্যন্ত গর্তে একটি মেশিন চালু রাখা হয়। তখন সেখানে পানির স্তর দাঁড়ায় ৬৫.৫ মিটারে। কূপের প্রধান উৎসসমূহ থেকে নমুনা পানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ৬ মিনিট যাবত রিডিং নেয়া বন্ধ রাখা হয়। কূপের অপ্রধান উৎসসমূহ থেকেও নমুনা পানি সংগ্রহ করা হয়।
তারপর একটি মেশিন বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে, কূপের পানির স্তর বাড়তে থাকে এবং তা কূপের মুখ থেকে নীচে ৯.০৫ মিটারে এসে দাঁড়ায়। তারপর দ্বিতীয় মেশিনটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে পানির স্তর বৃদ্ধি পেয়ে মুখ থেকে নীচের দিকে ৬.০৬ মিটারে উঠে। তারপর ৩য় মেশিনটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন ১১ মিনিটের মধ্যে পানির স্তর বৃদ্ধি পেয়ে মুখ থেকে নীচে ৩.৯০ মিটারে দাঁড়ায়। যমযম থেকে প্রতি সেকেণ্ডে ১১-১৮.৫ লিটার পানি উৎপাদন হয়। উৎপাদন সম্পর্কে এটিই সর্বশেষ তথ্য।
এই চিত্র দ্বারা যমযমের পানি উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
টিকাঃ
৩২. প্রাগুক্ত।
১৩৯১ হিজরীতে, সৌদী কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যমযমের পানি উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারণের জন্য একটি উদ্যোগ নেয়া হয়। এই উদ্যোগের আওতায় যমযমের মুখে বিদ্যুত চালিত দু'টো পাম্প মেশিন বসানো হয়। বড় পাম্প মেশিনটি ৫০ অশ্বশক্তি সম্পন্ন এবং ঘন্টায় ৩০ ঘন মিটার পানি উত্তোলন করতে সক্ষম। ছোট পাম্প মেশিনটি ঘন্টায় ১১.৬ ঘনমিটার পানি তুলতে সক্ষম।
ছোট পাম্প মেশিন দ্বারা পানি তোলার ফলে, শুরু করার ৭ মিনিটের মধ্যে কূপের পানির স্থায়ী স্তর ২.১৬ মিটার থেকে ১.৭৪ মিটারে নেমে আসে। ১৮ মিনিট পর ২.১০ মিটার এবং ৪৭ মিনিট পর ২.১২ মিটারে নেমে আসে।
এরপর ছোট পাম্প মেশিনটি বন্ধ করে বড় পাম্প মেশিন চালু করা হয়। শুরুর ৭৭ মিনিট পর পানির স্তর ২.২৭ মিটার, ৯৬ মিনিট পর ২.৩২ মিটার, ১১৭ মিনিট পর ২.৩১ মিটার এবং ১২৩ মিনিট পর ২.৩২ মিটারে অবস্থান করে। তারপর দু'টো মেশিনকে এক সাথে চালু করলে ৪ ঘন্টায় পানির স্তর ২.৬৪ মিটারে নেমে আসে। ৩ দিন পর্যন্ত একই পরীক্ষা চালানো হয়।
দু'টো পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে যমযমের পানি উৎপাদনের ব্যাপারে যে তথ্য পাওয়া যায় তা হচ্ছে, প্রতি মিনিটে ১৬৪.৫ থেকে ২১৭.৩ গ্যালন পানি অর্থাৎ প্রতি সেকেণ্ডে ১.০৪ লিটার থেকে ১.৩৭ লিটার পানি তোলা সম্ভব হয়েছে। পানি উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ওয়াটসন কনসালটিং কোম্পানী, পাকিস্তানী কনসালটেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিয়ন এবং পশ্চিম জার্মানীর W.F ক্রোনার কনসালটিং ফার্ম পাম্প মেশিন দ্বারা উত্তোলিত পানির অনুপাত দ্বারা যমযমের উৎপাদন ক্ষমতা ঘন্টায় ৬০ ঘন মিটার নির্ধারণ করে এবং তা নিম্নের পরিমাপের আগ পর্যন্ত বহাল থাকে।
১৪০০ হিজরীতে, মসজিদে হারামে জোহায়মান বেগ ও তার সাথী-সঙ্গীরা আক্রমণ করার পর ঐ দুর্ঘটনা শেষে যমযম কূপ পরিষ্কার করার সময় যমযমের উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে পুনরায় পরিমাপ করা হয়।
এই পরিমাপে ৪টি FLYGT মডেল বি ২১৫১ এইচ টি সাবমার্জড পাম্প ব্যবহার করা হয়। প্রথমটি কূপের ভেতর ২৫ মিটার গভীরে, ২য় টি ২২ মিটার, ৩য় টি ১৯ মিটার এবং ৪র্থ টি ১৭ মিটার গভীরে বসানো হয়। ৪ টা মেশিন একসাথে চালু করা হয়। ২৫ মিটার গভীরে বসানো প্রথম পাম্প মেশিনটি বেশী চাপের কারণে এর বৈদ্যুতিক কয়েলে পানি ঢুকায় তা বন্ধ হয়ে যায়। অবশিষ্ট তিনটি পাম্প চলতে থাকে। এই পাম্পগুলো বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ড্রেনে পানি ফেলে। একই সাথে যমযমের পার্শ্বে দুটো গর্ত থেকে ভূগর্ভস্থ পানিও একই ড্রেনে তুলে ফেলার জন্য আরো দু'টো পাম্প মেশিন বন্ধ করে দেয়া হয়।
প্রথমে পানির স্তর ছিল ৩.২৩ মিটার গভীরে এবং পানির স্তর ১২.৭২ মিটার গভীরে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি আধা মিনিটে একবার Reading নেয়া হত। একটি মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং তখন গর্তে পানির স্তর ৬৫ সেন্টিমিটারে পৌছে। পানির স্তর ১২.৮৩ মিটারে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি আধা মিনিটে Reading নেয়া হয়। পানির স্তর ১৩.৩৯ মিটারে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি ১ মিনিট অন্তর Reading নেয়া হয়। এই স্তরে পৌঁছার পর কূপে পানি পড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং তখন পর্যন্ত গর্তে একটি মেশিন চালু রাখা হয়। তখন সেখানে পানির স্তর দাঁড়ায় ৬৫.৫ মিটারে। কূপের প্রধান উৎসসমূহ থেকে নমুনা পানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ৬ মিনিট যাবত রিডিং নেয়া বন্ধ রাখা হয়। কূপের অপ্রধান উৎসসমূহ থেকেও নমুনা পানি সংগ্রহ করা হয়।
তারপর একটি মেশিন বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে, কূপের পানির স্তর বাড়তে থাকে এবং তা কূপের মুখ থেকে নীচে ৯.০৫ মিটারে এসে দাঁড়ায়। তারপর দ্বিতীয় মেশিনটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে পানির স্তর বৃদ্ধি পেয়ে মুখ থেকে নীচের দিকে ৬.০৬ মিটারে উঠে। তারপর ৩য় মেশিনটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন ১১ মিনিটের মধ্যে পানির স্তর বৃদ্ধি পেয়ে মুখ থেকে নীচে ৩.৯০ মিটারে দাঁড়ায়। যমযম থেকে প্রতি সেকেণ্ডে ১১-১৮.৫ লিটার পানি উৎপাদন হয়। উৎপাদন সম্পর্কে এটিই সর্বশেষ তথ্য।
এই চিত্র দ্বারা যমযমের পানি উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
টিকাঃ
৩২. প্রাগুক্ত।
১৩৯১ হিজরীতে, সৌদী কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যমযমের পানি উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারণের জন্য একটি উদ্যোগ নেয়া হয়। এই উদ্যোগের আওতায় যমযমের মুখে বিদ্যুত চালিত দু'টো পাম্প মেশিন বসানো হয়। বড় পাম্প মেশিনটি ৫০ অশ্বশক্তি সম্পন্ন এবং ঘন্টায় ৩০ ঘন মিটার পানি উত্তোলন করতে সক্ষম। ছোট পাম্প মেশিনটি ঘন্টায় ১১.৬ ঘনমিটার পানি তুলতে সক্ষম।
ছোট পাম্প মেশিন দ্বারা পানি তোলার ফলে, শুরু করার ৭ মিনিটের মধ্যে কূপের পানির স্থায়ী স্তর ২.১৬ মিটার থেকে ১.৭৪ মিটারে নেমে আসে। ১৮ মিনিট পর ২.১০ মিটার এবং ৪৭ মিনিট পর ২.১২ মিটারে নেমে আসে।
এরপর ছোট পাম্প মেশিনটি বন্ধ করে বড় পাম্প মেশিন চালু করা হয়। শুরুর ৭৭ মিনিট পর পানির স্তর ২.২৭ মিটার, ৯৬ মিনিট পর ২.৩২ মিটার, ১১৭ মিনিট পর ২.৩১ মিটার এবং ১২৩ মিনিট পর ২.৩২ মিটারে অবস্থান করে। তারপর দু'টো মেশিনকে এক সাথে চালু করলে ৪ ঘন্টায় পানির স্তর ২.৬৪ মিটারে নেমে আসে। ৩ দিন পর্যন্ত একই পরীক্ষা চালানো হয়।
দু'টো পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে যমযমের পানি উৎপাদনের ব্যাপারে যে তথ্য পাওয়া যায় তা হচ্ছে, প্রতি মিনিটে ১৬৪.৫ থেকে ২১৭.৩ গ্যালন পানি অর্থাৎ প্রতি সেকেণ্ডে ১.০৪ লিটার থেকে ১.৩৭ লিটার পানি তোলা সম্ভব হয়েছে। পানি উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ওয়াটসন কনসালটিং কোম্পানী, পাকিস্তানী কনসালটেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিয়ন এবং পশ্চিম জার্মানীর W.F ক্রোনার কনসালটিং ফার্ম পাম্প মেশিন দ্বারা উত্তোলিত পানির অনুপাত দ্বারা যমযমের উৎপাদন ক্ষমতা ঘন্টায় ৬০ ঘন মিটার নির্ধারণ করে এবং তা নিম্নের পরিমাপের আগ পর্যন্ত বহাল থাকে।
১৪০০ হিজরীতে, মসজিদে হারামে জোহায়মান বেগ ও তার সাথী-সঙ্গীরা আক্রমণ করার পর ঐ দুর্ঘটনা শেষে যমযম কূপ পরিষ্কার করার সময় যমযমের উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে পুনরায় পরিমাপ করা হয়।
এই পরিমাপে ৪টি FLYGT মডেল বি ২১৫১ এইচ টি সাবমার্জড পাম্প ব্যবহার করা হয়। প্রথমটি কূপের ভেতর ২৫ মিটার গভীরে, ২য় টি ২২ মিটার, ৩য় টি ১৯ মিটার এবং ৪র্থ টি ১৭ মিটার গভীরে বসানো হয়। ৪ টা মেশিন একসাথে চালু করা হয়। ২৫ মিটার গভীরে বসানো প্রথম পাম্প মেশিনটি বেশী চাপের কারণে এর বৈদ্যুতিক কয়েলে পানি ঢুকায় তা বন্ধ হয়ে যায়। অবশিষ্ট তিনটি পাম্প চলতে থাকে। এই পাম্পগুলো বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ড্রেনে পানি ফেলে। একই সাথে যমযমের পার্শ্বে দুটো গর্ত থেকে ভূগর্ভস্থ পানিও একই ড্রেনে তুলে ফেলার জন্য আরো দু'টো পাম্প মেশিন বন্ধ করে দেয়া হয়।
প্রথমে পানির স্তর ছিল ৩.২৩ মিটার গভীরে এবং পানির স্তর ১২.৭২ মিটার গভীরে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি আধা মিনিটে একবার Reading নেয়া হত। একটি মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং তখন গর্তে পানির স্তর ৬৫ সেন্টিমিটারে পৌছে। পানির স্তর ১২.৮৩ মিটারে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি আধা মিনিটে Reading নেয়া হয়। পানির স্তর ১৩.৩৯ মিটারে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি ১ মিনিট অন্তর Reading নেয়া হয়। এই স্তরে পৌঁছার পর কূপে পানি পড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং তখন পর্যন্ত গর্তে একটি মেশিন চালু রাখা হয়। তখন সেখানে পানির স্তর দাঁড়ায় ৬৫.৫ মিটারে। কূপের প্রধান উৎসসমূহ থেকে নমুনা পানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ৬ মিনিট যাবত রিডিং নেয়া বন্ধ রাখা হয়। কূপের অপ্রধান উৎসসমূহ থেকেও নমুনা পানি সংগ্রহ করা হয়।
তারপর একটি মেশিন বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে, কূপের পানির স্তর বাড়তে থাকে এবং তা কূপের মুখ থেকে নীচে ৯.০৫ মিটারে এসে দাঁড়ায়। তারপর দ্বিতীয় মেশিনটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে পানির স্তর বৃদ্ধি পেয়ে মুখ থেকে নীচের দিকে ৬.০৬ মিটারে উঠে। তারপর ৩য় মেশিনটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন ১১ মিনিটের মধ্যে পানির স্তর বৃদ্ধি পেয়ে মুখ থেকে নীচে ৩.৯০ মিটারে দাঁড়ায়। যমযম থেকে প্রতি সেকেণ্ডে ১১-১৮.৫ লিটার পানি উৎপাদন হয়। উৎপাদন সম্পর্কে এটিই সর্বশেষ তথ্য।
এই চিত্র দ্বারা যমযমের পানি উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
টিকাঃ
৩২. প্রাগুক্ত।