📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ইউনিফাইড যামায়েমা দফতর

📄 ইউনিফাইড যামায়েমা দফতর


সাক্কেল যামাযেমা মক্কায় যমযমের পানি সরবরাহ কেন্দ্র। ১৪০২ হিজরী পর্যন্ত তা চালু ছিল। ১৪০৩ হিজরীতে, হজ্জ ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে, এর নাম পরিবর্তন করে এর নামকরণ করা হয় 'ইউনিফাইড যামায়েমা দফতর' (مَكْتَبُ الزَّمَازِمَةُ الْمُوَحِدِ)। তখন থেকে এই দফতর স্বতন্ত্রভাবে, জেদ্দায় এবং পবিত্র মক্কা নগরীতে আগত হাজীদের আবাসস্থলে যমযমের পানি সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে আসছে।

এই দফতরের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে নিম্নরূপ:
১. হাজীদেরকে মক্কায় তাদের আবাসস্থলে পানি পৌঁছে দেয়া।
২. হজ্জ মওসুমে মসজিদে হারামের প্রবেশ পথসমূহে পানি বিতরণ করা।
৩. জেদ্দার বিমান বন্দর ও সামুদ্রিক বন্দরে আগত এবং বহির্গামী হাজীদেরকে পানি পান করানো।
৪. মক্কা-জেদ্দা এক্সপ্রেস রোডের চেকপোস্টে হাজীদেরকে পানি পান করানো।
৫. মদীনা মুনাওয়ারা চেকপোস্টে হাজীদেরকে পানি পান করানো।

এই দফতর হজ্জ মওসুমে ২০ লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন কনটেইনার ভর্তি করে হাজীদের আবাসস্থলে পানি সরবরাহ করে। যাতে করে হাজীরা দিনরাত সবসময় পানি পান করতে পারে।

এই দফতর ১৪০৯ হিজরীর হজ্জ মওসুমে, ২০ লিটার পানি ধারণকারী ১ লক্ষ ৩৫ হাজার ৮৩৮টি এবং ৪০ লিটার পানি ধারণক্ষম ২ হাজার ১২৪টি কনটেইনার ভর্তি করে হাজীদের ঘরে ঘরে পানি সরবরাহ করেছে। এছাড়াও ১৪০৩-১৪০৯ হিজরী পর্যন্ত এই ৬ বছরে প্লাস্টিকের গ্লাসে ২ কোটি ১৪ লক্ষ ১৪ হাজার ২২৩ গ্লাস পানি হাজীদেরকে পান করিয়েছে।

১৪০৯ হিজরীতে, এই দফতর প্লাস্টিকের গ্লাসে ৩৯ লক্ষ ৭০ হাজার গ্লাস পানি হাজীদেরকে পান করিয়েছে।

এই দফতর ১৪০৩ হিজরী থেকে ১৪০৯ হিজরী পর্যন্ত ১ কোটি ৬০ লক্ষ ২৪ হাজার ৫৯টি কনটেইনার পানি হাজীদের আবাসস্থলে সরবরাহ করেছে। ১৪০৯ হিজরীতে মক্কায় ২৫ লক্ষ ৪০ হাজার ৯০০ কনটেইনার পানি সরবরাহ করেছে।

উল্লেখ্য যে, মসজিদে হারামের ভেতরে যমযমের পানি সরবরাহের দায়িত্ব হারামাইন শরীফাইন প্রেসিডেন্সীর উপর ন্যস্ত। যামায়েমা দফতর মসজিদে হারামের বাইরে ও হাজীদের ঘরে ঘরে পানি সরবরাহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত।

যামায়েমা দফতর কুদাই নামক স্থানে পানি ভর্তি করার এক বিশাল স্বয়ংক্রিয় কারখানা স্থাপন করেছে। এখান থেকে বোতল ও কন্টেইনারে পানি ভর্তি করে হাজীদের কাছে সরবরাহ করা হয়।

টিকাঃ
২৬. 'মাতাফ' অর্থ তওয়াফের স্থান। সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে সাঈর স্থানকে 'মাসআ' বলে।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের হিমাগার

📄 যমযমের হিমাগার


বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আযীয ১৪০৬ হিজরীর ১০ই রমযান, মসজিদে হারামের যমযমের পানি সরবরাহের একটি নতুন প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্পের আওতায়, যমযমের পানিকে ঠান্ডা করে তা সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়।

প্রকল্পটি মসজিদে হারামের দক্ষিণে এবং ছোট সুড়ঙ্গ পথের নিকটবর্তী সাবেক হাযওয়ারা নামক স্থানে অবস্থিত। এতে প্রতি ঘন্টায় ১২০ ঘনমিটার পানি ঠান্ডা করা হয়। যমযম থেকে দুটি শক্তিশালী পাম্পের মাধ্যমে পানি হিমাগারে আনা হয়। হিমাগার থেকে ঠান্ডা করে তা পুনরায় মসজিদে হারামে এবং যমযম সেবাকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়।

এই হিমাগার তৈরি এবং এর সাথে মসজিদে হারামের সংযোগ স্থাপনের জন্য মোট ৫ কোটি রিয়াল খরচ হয়। হিমাগারে পানি ঠান্ডা করার জন্য ৩টি ইউনিট আছে।

যমযম থেকে হিমাগার পর্যন্ত পানি সরবরাহের জন্য যে পাইপ ব্যবহার করা হয়েছে, তার ব্যাস ২০ সেন্টিমিটার এবং এটি স্টেইনলেস স্টীলের তৈরি। মসজিদে হারামের ভেতরে বিতরণের জন্য যে পাইপ ব্যবহার করা হয়েছে, তাও স্টেইনলেস স্টীলের তৈরি। এই পাইপগুলো বিশেষ ইনসুলেশন দ্বারা আবৃত, যাতে পানির তাপমাত্রা বজায় থাকে।

হিমাগারে পানি ঠান্ডা করার পর তা পুনরায় যমযম এলাকায় অবস্থিত সরবরাহ কেন্দ্রে এবং মসজিদে হারামের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। সরবরাহ কেন্দ্র থেকে সাধারণ মানুষ ও হাজীরা ঠান্ডা পানি পান করতে পারে।

এছাড়াও মসজিদে হারামের বিভিন্ন স্থানে ৫ হাজারেরও বেশি থার্মস জগে ঠান্ডা পানি সরবরাহ করা হয়। এই পানি বরফ ও যমযমের পানি মিশিয়ে ঠান্ডা করা হয়।

এই প্রকল্পের ফলে, হাজীরা গরমের দিনেও ঠান্ডা যমযমের পানি পান করার সুযোগ পায়। এটি বাদশাহ ফাহাদের এক অনন্য অবদান।

টিকাঃ

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের ব্যবহৃত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা

📄 যমযমের ব্যবহৃত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা


যমযম কূপের পানির স্তর বর্তমানে প্রাকৃতিক কারণে নীচে নেমে গেছে। এই স্তর নীচে নামার আগে যমযমের পানি ইয়াখুর নামক ড্রেন দিয়ে নিষ্কাশন করা হত। যমযমের পানিস্তর নীচে নেমে যাওয়ায় ঐ ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন অসম্ভব হয়ে পড়ে। 'ইয়াখুর' একটি তুর্কী শব্দ। ধারণা করা হয় যে, তুর্কী শাসনামলে যমযমের ব্যবহৃত ও মসজিদের বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য এই গভীর ড্রেনটি নির্মাণ করা হয়। সম্ভবতঃ এই ড্রেনটি মসজিদ থেকে দূরে একটি গভীর কূপের সাথে সংযুক্ত। কিন্তু কূপটির অবস্থানস্থল অজানা। বেশী গভীরতার জন্যই এটিকে কূপ বলা হয়। মেসফালার বাড়ী-ঘরসমূহের নীচে কিছু ছোট ছোট নালাার সন্ধান পাওয়া যায়। সম্ভবতঃ তুর্কীরা ইয়াখুর কূপের পানি বের করার জন্যই ঐ সকল ছোট নালাগুলো নির্মাণ করে। হারাম এলাকার উন্নয়ন, বহুতল বিশিষ্ট বহু সংখ্যক ইমারত নির্মাণ এবং সেগুলো থেকে ময়লা পানি নিষ্কাশনের জন্য যে সকল নালা ইয়াখুর কূপে গিয়ে মিলিত হয়েছে তার ফলে ইয়াখুর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্ভবতঃ অচল হয়ে গেছে। ফলে, ইয়াখুর ড্রেন পদ্ধতি তার কাঙ্খিত পানি নিষ্কাশনের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। ইয়াখুর কূপ ও ড্রেন নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা না থাকায় তা আবিষ্কার করার পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। কেননা, এতে ব্যাপক খননকার্য পরিচালনা করতে হবে, অসংখ্য বাড়ী-ঘরের ভিত্তি নষ্ট হবে, ট্রাফিক ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে, এবং মোটা অংকের অর্থ ব্যয় হবে। অনুমানের ভিত্তিতে খনন কাজ হবে, তারপরও লক্ষ্যে পৌঁছার কোন নিশ্চিত সম্ভাবনা নেই।

পরে জাবালে আবু কোবায়েসের নীচ দিয়ে মসজিদে হারামের ধোয়া ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি ড্রেন নির্মাণ করা হয় যা কিলা পাহাড়ের তলদেশ দিয়ে প্রধান সড়ক বরাবর মেসফালায় বিদ্যমান শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ড্রেনের সাথে গিয়ে সংযুক্ত হয়। পরে মসজিদে হারামের সর্বনিম্ন স্থানের লেবেল থেকে যমযমের ব্যবহৃত পানি এবং মসজিদে হারামের অন্যান্য স্থান থেকে, স্বাভাবিকভাবে গড়িয়ে আসার সুবিধার্থে, আরেকটি ড্রেন নির্মাণ করা হয়। এই দুটি ড্রেনের মাধ্যমে যমযম ও মসজিদে হারামের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়।

ইতিপূর্বে, মসজিদে হারাম থেকে মেসফালার দিকে হিজলা রোডে বিদ্যমান শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ড্রেনের সাথে সংযোগ দিয়ে যমযম এবং মসজিদে হারামের পানি নিষ্কাশনের জন্য দুটো পৃথক ড্রেন নির্মাণ করার প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়।

মসজিদে হারামের সর্বনিম্ন স্থানের লেবেল থেকে যমযমের ব্যবহৃত পানি ও মসজিদে হারামের পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন কাটার পর যমযমের পানির স্তর নীচে নেমে যায়। ফলে, ড্রেনের কাজ বন্ধ রাখা হয় এবং বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য কয়েকটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিগুলো গঠনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যমযমের পানির স্তর স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা এবং বাইরের দূষিত পানি যাতে কূপে প্রবেশ করতে না পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করা।

শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে আসা হয় যে, অতীতে যমযমের পানি এত বেশী পরিমাণ ছিল না এবং যমযমের পানির স্তরও এত উঁচু ছিলনা। কোন কোন সময় যমযম কূপ শুকিয়ে পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই পানির স্তর কমে যাওয়ার বিষয়টি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত না হয়ে তাকে যমযমের জন্য কল্যাণকর মনে করা হয়। এতে করে আরো প্রমাণিত হয় যে, ড্রেনের ফলে, ভূগর্ভের পানি যমযমে এসে মিশতে পারে না। তাই যমযমের বর্তমান পানি শুধুমাত্র যমযমেরই পানি যা যমযমের মূল উৎস থেকে উৎসারিত। এর ফলে ড্রেনের স্থগিত কাজ পুনরায় শুরু করতে আর কোন সমস্যা নেই। পরে ড্রেন তৈরির কাজ সমাপ্ত করা হয়।

টিকাঃ
২৭. যমযম, ইয়াহইয়া কোশাক।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের পরিমাপ ও পানির উৎস

📄 যমযমের পরিমাপ ও পানির উৎস


আযরাকী উল্লেখ করেছেন যে, যমযম উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ৬০ হাত এবং নীচের মেঝেতে তিনটি ঝর্ণাধারা রয়েছে। ঝর্ণাধারাগুলোর একটি হচ্ছে হাজারে আসওয়াদমুখী, একটি সাফা ও জাবালে আবু কোবায়েসমুখী এবং অন্যটি হচ্ছে মারওয়াহ পাহাড়মুখী।

২২৩ ও ২২৪ হিজরীতে, যমযমের পানি কমে শুকিয়ে গিয়েছিল। তখন নীচের দিকে আরো ৯ হাত গভীর করে তা খনন করা হয় এবং ভিটির পার্শ্বেও কিছুটা খনন করে তা চওড়া করা হয় যেন পানি প্রবাহ বাড়ে। ২২৫ হিজরীতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় যমযমের পানির স্তর বৃদ্ধি পায়।

আব্বাসী খলীফা হারুনুর রশীদের আমলে, সালেম বিন জাররাহ যমযম কূপ কয়েক হাত নীচের দিকে গভীর করেন। তিনি খলীফা মাহদীর আমলেও যমযম কূপকে আরো গভীর করেন।

খলীফা আমীন মুহাম্মদ বিন রশীদের আমলে, তাঁর ডাক বিভাগের তত্ত্বাবধানকারী এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির কেয়ারটেকার উমর বিন হামান যমযমের পানি কমে যাওয়ায় তা খনন করে আরো গভীর করেন। খনন কাজে অংশগ্রহণকারী তায়েফের অধিবাসী মুহাম্মদ বিন মুশীর বলেন, আমি যমযমের মেঝেতে নামায পড়েছি। উপর থেকে নীচের দিকের পাকা অংশের পরিমাণ হচ্ছে ৪০ হাত এবং সেখান থেকে নীচের মেঝের দূরত্বের পরিমাণ হচ্ছে ২৯ হাত। নিম্নের এই অংশটুকু সম্পূর্ণ পাথর কাটা অর্থাৎ এই অংশে কোন প্লাস্টার নেই। তিনি আরো বলেন, তখন উপরে যমযমের মুখের ঘেরাও-এর উচ্চতা ছিল আড়াই হাত, চারদিকে গোলাকার ঐ বেড়ার আয়তন ছিল ১১ হাত এবং যমযমের মুখের প্রশস্ততা ছিল ৩৬ হাত। যমযম কূপের উপর সাজ কাঠের একটি ফ্রেমওয়ার্ক ছিল এবং তাতে পানি তোলার জন্য ১২টি কপিকল লাগানো ছিল।

ইমাম ফাসী বলেন, আমার কিছু সাথী আমার সামনে যমীন থেকে যমযমের মুখের উচ্চতা, প্রশস্ততা ও গোলাকৃতি সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, এর মুখের উচ্চতা পৌনে দু'হাত, প্রশস্ততা সাড়ে ৪ হাত এবং গোলাকৃতি ১৫ হাত থেকে সামান্য কম। তবে হাত বলতে এখানে পূর্বে প্রচলিত লোহার গজ বুঝানো হয়েছে। 'নগর অভিধানের' লেখক ইয়াকুত হামাওয়ী লিখেছেন, যমযম উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ৬০ হাত লম্বা, এর তলদেশে তিনটি ঝর্ণাধারা আছে। একটি হাজারে আসওয়াদ, একটি সাফা ও আবু কোবায়েস পাহাড় এবং অন্যটি মারওয়ার দিক থেকে এসেছে। তারপর এর পানি কমে যায় এবং ২২৩ কিংবা ২২৪ হিজরীতে তা শুকিয়ে যায়। তখন মক্কার গভর্নর উমর বিন ফারাজ রাখজীর উত্তরসুরী ও ডাক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক মুহাম্মদ বিন দাহহাক তা ৯ হাত নীচের দিকে গভীর করেন। ফলে এর পানি বৃদ্ধি পায়। তারপর ২২৫ হিজরীতে আল্লাহর ইচ্ছায় বৃষ্টিপাত হওয়ায় পানির পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। তিনি বলেন, এর গভীরতা উপর থেকে নীচের কাটা অংশের শুরু পর্যন্ত ১১ হাত, সেখান থেকে সর্বশেষ তলা পর্যন্ত ২৯ হাত এবং এই অংশ সবটুকুই পাথর কাটা। এর মুখের গোলাকার চক্রের পরিমাণ হচ্ছে ১১ হাত ও মুখের প্রশস্ততা হচ্ছে ৩৯ হাত।

উপরোক্ত আলোচনায় আযরাকী, ফাসী এবং হামাওয়ীর বক্তব্যে যমযমের পরিমাপে পার্থক্য দেখা যায়। হাতের পার্থক্য এবং কালের ব্যবধানে এর মধ্যে যে সকল নির্মাণ, সংস্কার ও ভাঙ্গা গড়া হয়েছে সেগুলোই এই পার্থক্যের মূল কারণ।

আযরাকী, যমযমের ৩টি উৎসের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, যমযমের তলদেশে তিনটি ঝর্ণাধারা থেকেই যমযমের পানি উৎসারিত হয়। ফাকেহী বলেছেন, হযরত আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিব (রা) কা'ব-আল আহবারকে জিজ্ঞেস করেন, কোন্ ঝর্ণাধারাটি থেকে বেশী পানি নির্গত হয়? কা'ব বলেন, হাজারে আসওয়াদের দিক থেকে আগত ঝর্ণাধারাটি থেকে। তখন হযরত আব্বাস (রা) বলেন, তুমি যথার্থই বলেছ।

দারু কুতনী ইবনে সিরীন থেকে বর্ণনা করেছেন, একবার এক নিগ্রো কূপে পড়ে মারা যায়। হযরত ইবনে আব্বাস মৃত ব্যক্তির লাশটি উঠানো এবং কূপের সকল পানি বের করার নির্দেশ দেন। কূপের পানি বের করার সময় তারা হাজারে আসওয়াদের দিক থেকে আগত ঝর্ণাধারার বেগবান উৎসের সম্মুখীন হন। তারা বস্তা ও মোটা কাপড় দিয়ে তা বন্ধ করেন এবং পানি তোলার পর ঐ উৎস থেকে পানি ফেটে পড়ে।

ইমাম তাহাওয়ী শরহে মাআনী আল-আসার বইতে লিখেছেন এবং ইবনে শায়বা আতা বিন আবী রেবাহ থেকে সহীহ সনদ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি একবার কূপে পড়ে মারা যায়। তখন ইবনে যুবায়ের (রা) লাশ উঠানোর পর কূপের সকল পানি সেচ করে বাইরে ফেলে দেয়ার নির্দেশ দেন। অবিরাম পানি সেচের পরও পানি আর শেষ হয় না। তখন দেখা গেল যে, হাজারে আসওয়াদের দিক থেকে একটি বেগবান উৎস হতে পানি আসার কারণেই সেচ করে পানি শেষ করা যাচ্ছে না। তখন ইবনে যুবায়ের (রা) বলেন, এই পর্যন্তই যথেষ্ট।

উমরী তার মাসালেক আল-আবসার বইতে লিখেছেন, কূপে একবার হাবশার একজন লোক পড়ে মারা যায়। তখন কূপের পানি সব তুলে ফেলার চেষ্টার সময় দেখা যায় যে, তিন দিক থেকে পানি এসে যমযমে পড়ছে এবং এর মধ্যে শক্তিশালী উৎসটি হচ্ছে কাবা শরীফের দিক থেকে আগত ঝর্ণাধারা। (২৮) (দারু কুতনী) ১৪০০ হিজরীতে, যমযম কূপ পরিচ্ছন্নতাকালীন সময়ে যমযমের সকল পানি সেচ করে বাইরে ফেলে দেয়ার উদ্দেশ্যে বড় বড় কয়েকটি দমকল বসানো হয়। ফলে, পানি সেচের মাধ্যমে যমযমের পানির উৎসের নীচ পর্যন্ত, কূপের সঠিক পরিমাপ, দেয়াল ও পানির উৎস সম্পর্কে জানা যায় এবং এর সাধারণ ছবি ও মুভি ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়।

পরিচ্ছন্নতা কাজে অংশগ্রহণকারী ২ জন ডুবুরীর সাহায্যে জানা যায় যে, কূপের ব্যাস হচ্ছে ৪ মিটার। তাঁরা বলেন, আমরা দেখতে পাই যে, কূপের উপর থেকে ১৪.৮০ মিটার নীচ পর্যন্ত মজবুত প্লাস্টার। এর নীচে যমযমে পানি সরবরাহকারী দুটো উৎস রয়েছে। একটি কা'বার দিক থেকে এবং অন্যটি জিয়াদের দিক থেকে এসেছে। এই উৎসদ্বয়ের নীচে কূপের তলদেশ পর্যন্ত ১৭.২০ মিটার পাথর কাটা অংশ। এই অংশটুকু পাথরের ভেতর সিলিন্ডারের মতো পিলারের আকৃতিতে বেঁকে গেছে। এর মাঝের প্রশস্ততা হচ্ছে ১.৮০ মিটার এবং নীচে বদ্ধমুখ। এটিকে যমযমের ক্ষুদ্র জলাধার বলা যায়। সেখানকার লাল পাথর বিশিষ্ট দেয়ালের গায়ে باذن আল্লাহ 'আল্লাহর হুকুমে' এই কথাটি খোদিত আছে।

উল্লেখ্য যে, সর্বশেষ এই পরিমাপ যমযমের ইতিহাসে বর্ণিত আগের পরিমাপের নিকটবর্তী। পূর্বের বর্ণনাসমূহের অধিকাংশে একথা বলা হয়েছে যে, যমযমের মুখ থেকে নীচে পাথর কাটা পর্যন্ত প্লাস্টার করা অংশের পরিমাণ হচ্ছে, ৪০ হাত অর্থাৎ ২২.৫০ মিটার এবং নীচের পাথর কাটা অংশের পরিমাপ হচ্ছে, ২৯ হাত অর্থাৎ ১৬.২৫ মিটার। যমযমের প্লাস্টারকৃত অংশের পরিমাপের ব্যাপারে অতীতের ঐতিহাসিক বর্ণনার সাথে বর্তমান পরিমাপের পার্থক্যের কারণ হল, যমযম বর্তমানে মাতাফের নীচে কাবার স্তর থেকে আরো নীচে অবস্থান করছে অর্থাৎ যমযম এখন মাতাফের নীচে। অথচ পূর্বে তা মাতাফের উপর কাবার স্তরের সাথে ছিল। পাথর কাটা অংশের পরিমাপে মাত্র ১ মিটারের ব্যবধান। এটা কূপ পরিষ্কার করার কারণেই হয়েছে। কেননা, কূপে অনেক জিনিসপত্র পড়েছিল। সেগুলো উঠানোর কারণে এর গভীরতা কিছু বেড়েছে। গভীরতার পার্থক্যের কারণে, এর ব্যাসরেখায় ১.৫০ মিটার থেকে ২ মিটার পর্যন্ত ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। কূপের প্লাস্টারকৃত অংশ ও পাথর কাটা অংশের সংযোগস্থলের ব্যাসরেখা হচ্ছে ১.৮০ মিটার। সেই সংযোগ স্থানেই রয়েছে যমযমের পানির প্রধান উৎসসমূহ। এই উৎসগুলো পাথরের দুটো সারির মধ্যে অবস্থিত।

প্রধান উৎসগুলো নিম্নরূপ:
১. প্রধান উৎস বা ঝর্ণাধারা: এটি কা'বা শরীফের হাজারে আসওয়াদের দিক থেকে এসেছে। এই উৎসমুখের দৈর্ঘ্য ৪৫ সেন্টিমিটার এবং উচ্চতা বা প্রশস্ততা হচ্ছে ৩০ সেন্টিমিটার। ভেতরের দিকে তা গভীর। কূপের বেশীর ভাগ পানি এই উৎস থেকেই আসে।
২. দ্বিতীয় উৎস: এর উৎসমুখের দৈর্ঘ ৭০ সেন্টিমিটার। ভেতরে তা আরো দুটো মুখে বিভক্ত। এর প্রশস্ততা বা উচ্চতা হচ্ছে ৩০ সেন্টিমিটার। এটি জিয়াদের দিক থেকে এসেছে।
৩. শাখা উৎসসমূহ: প্লাস্টারকৃত অংশ এবং পাথর কাটা অংশের সংযোগস্থলে পাথরের মাঝে কতগুলো ছোট উৎসমুখ আছে। সেগুলো থেকেও যমযমে পানি আসে। দুই প্রধান উৎসমুখের মাঝখানে ১ মিটারব্যাপী স্থানে, ৫টি ছোট উৎসমুখ আছে। অনুরূপভাবে, প্রথম ও প্রধান উৎসমুখের পার্শ্ব থেকে শুরু করে ২য় প্রধান উৎসমুখ পর্যন্ত, জাবালে আবু কোবায়েস, সাফা এবং মারওয়া পাহাড়ের দিক থেকে ২১টি ছোট উৎসমুখ এসেছে। এগুলো একই স্তরের নয় বরং বিভিন্ন স্তরে অবস্থিত এবং এগুলো থেকে নির্গত পানির পরিমাণও এক নয়।

ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোতে, যমযমের তিনটি উৎসের কথা উল্লেখ আছে। ১টি হচ্ছে কা'বার দিক থেকে, ২য়টি হচ্ছে আবু কোবায়েস এবং সাফা পাহাড়ের দিক থেকে এবং ৩য়টি মারওয়া পাহাড়ের দিক থেকে। কিন্তু বর্তমানে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় মাত্র দুটো উৎসের সন্ধান পাওয়া যায়। একটি কা'বার দিক থেকে এবং অন্যটি জিয়াদের দিক থেকে। তবে অতীতের ঐতিহাসিক বর্ণনায় আবু কোবায়েস ও সাফা পাহাড়ের বর্ণিত উৎসের পরিবর্তে বর্তমানে ২১টি ছোট উৎস দেখতে পাওয়া যায়।

১০২৮ হিজরীতে, যমযম কূপ সংস্কারের সময় ঐ উৎসমুখটি বন্ধ করায় তখন পাথরের ভেতর থেকে বেগে পানি বের হতে থাকে। গাজী তার ইতিহাসে আল্লামা খিদরাওয়ী (রঃ) এর تَاجٌ تَوَارِيعِ الْبَشَرِ কিতাবের বরাত দিয়ে লিখেছেন, ১০২৮ হিজরীর রমযান মাসে যমযমে, পশ্চিম দিক এবং শামীয়ার দিক থেকে অনেক পাথর ধসে পড়ে। একই সালের ৪ঠা শাওয়াল, সোমবার তা পরিষ্কার করা হয় এবং ১৬ই শাওয়ালে, যমযমের ভেতর প্লাস্টারিং এর কাজ শেষ করা হয়। পানির স্তরের সাথে সংযুক্ত অংশের প্লাস্টারে চুন ও জিপসাম ব্যতীত বালু ব্যবহার করা হয় এবং তার উপরের অংশে জিপসাম এবং চুন দিয়ে প্লাস্টার করা হয় যেন আর পাথর ধসে না পড়ে।

যমযমের পাথরযুক্ত অংশের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, এর খাড়া অংশের কিছু পর পাথর কাটার কারণে কূপের আকার আর সোজা ও খাড়া থাকেনি, বরং বাঁকা হয়ে গেছে। প্রধান প্রথম উৎসমুখের নীচে ৪টি পাথর কাটা ও বাঁকা। অনুরূপভাবে, ৪টি পাথর দুই প্রধান উৎসমুখের মাঝে ১ মিটার জায়গায় এবং অন্য ১২টি পাথর ছোট উৎসমুখগুলোর স্থানে কাটা ও বাঁকা।

কাটা পাথরের গায়ে যে গভীরতা তা সর্বোচ্চ ৬ সেন্টিমিটার এবং সর্বনিম্ন নামেমাত্র কাটা। সম্ভবতঃ পানির উৎসগুলো থেকে অব্যাহত পানি বের হওয়ার কারণে তা ক্ষয় হয়েছে কিংবা কূপ থেকে বালতি দিয়ে পানি তোলার কারণে রশির ঘষা লেগে অথবা এই দু'টির যৌথ কারণে তা ক্ষয় হয়েছে। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে যে, ১২টি পর্যন্ত কপিকল ব্যবহার করে বালতির মাধ্যমে যমযম থেকে পানি তোলা হয়েছে। মক্কার উম্মুল কোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন হজ্জ গবেষণা কেন্দ্র, যমযমের মূল উৎসগুলো আরো সঠিকভাবে নির্ধারণ করার জন্য গবেষণা চালাবে বলে জানা গেছে।

টিকাঃ
২৮. তারীখ ইমারাতিল মাসজিদিল হারাম, হোসাইন আবদুল্লাহ বাসালামাহ।
২৯. যমযম, ইয়াহইয়া কোশাক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00