📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 রাসূলুল্লাহর (সা) যমযমের পানি পান

📄 রাসূলুল্লাহর (সা) যমযমের পানি পান


আযরাকী হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তওয়াফে এফাদা শেষে এক বালতি যমযমের পানি তোলার আদেশ দেন। তিনি সেই পানি দিয়ে অজু করেন এবং বলেন, হে বনি আবদুল মোত্তালিব! তোমরা পানি তোল, তোমরা পানি না তুললে অন্যরা তোমাদেরকে ঐ কাজ থেকে বঞ্চিত করবে।

আযরাকী আরো বলেন, তাউস বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবায়ে কেরামকে দিনে তওয়াফে এফাদা করার নির্দেশ দেন এবং নিজে রাত্রে তওয়াফে এফাদা করেন। তিনি তাঁর উষ্ট্রীর উপর সাওয়ার হয়ে তওয়াফ করেন। তারপর যমযমের কাছে এসে বলেন, আমাকে এক বালতি পানি তুলে দাও। তিনি নিজে পানি পান করলেন এবং গড়গড়া সহকারে কুলি করলেন। তারপর বালতির অবশিষ্ট পানি কূপে ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন: তোমরা পানি তুলতে না পারলে তোমাদের কাছ থেকে অন্যরা এই অধিকার নিয়ে যাবে। তারপর তিনি খেজুর মিশ্রিত মিষ্টি পানীয় (নাবীজ) পান করার স্থানে গিয়ে তা পান করতে চান। হযরত আব্বাস (রা) বলেন, আজ সকাল থেকে লোকদের হাতে তা কিছুটা অপরিষ্কার হয়ে গেছে। ঘরে পরিষ্কার নাবীজ আছে, আপনি সেখান থেকে পান করুন। হযরত আব্বাস ৩ বার একথা বলেন, আর রাসূলুল্লাহ (সা) প্রত্যেকবারই তা অস্বীকার করে এখান থেকেই পানি পান করার উপর জোর দেন। পরে তিনি উপস্থিত স্থান থেকেই নাবীজ পান করেন। ইবনে জুরাইজ বলেন, তাউস তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নাবীজ এবং যমযমের পানি পান করেন এবং বলেন, নাবীজ পান করা সুন্নত না হলে তা বাতিল করা হত। তিনি আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) নাবীজ পান করার পর মন্তব্য করেন, এটা বড় ভাল কাজ, তা অব্যাহত রাখ। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নাবীজের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক সন্তোষ প্রকাশ করায় তা আমাদের কাছে উপত্যকা ভর্তি দুধ ও মধুর চাইতেও অপেক্ষাকৃত উত্তম। তিনি আরো বলেন, সম্ভবতঃ এই সুন্নত পরে বাতিল হয়ে গেছে।

আতা বিন আবী রেবাহ বলেন, তওয়াফে এফাদার পর যমযমের পানি পান করতে আমার কখনও ভুল হবে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর এই সুন্নত অনুসরণের উদ্দেশ্যে আগে আমি অন্য লোকদের সাথে মিলে পানি তুলে পান করতাম। কিন্তু পরে যখন আমি বুড়ো হয়ে গেলাম তখন অন্য লোকেরা পানি তুলে দিত এবং আমি তা পান করতাম। পিপাসা না থাকলেও শুধু সুন্নত পালনের উদ্দেশ্যেই আমি তা করতাম। কোন কোন সময় আমি খেজুর মিশ্রিত মিষ্টি পানি (নাবীজ) পান করতাম এবং কোন সময় করতাম না। যমযমের পানি পান করা যে সুন্নত এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই।

টিকাঃ
২০. প্রাগুক্ত।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের পানি পানের আদব

📄 যমযমের পানি পানের আদব


আযরাকী ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন আমি নবী করীম (সা) এর জন্য এক বালতি যমযমের পানি তুলতে এবং তাঁকে তা দাঁড়িয়ে পান করতে দেখি। হযরত ইবনে আব্বাসের অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বিসমিল্লাহ বলে বালতি ধরেন এবং অনেকক্ষণ যাবত পানি পান করেন। তারপর মাথা উপরের দিকে তুলে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলেন। এইভাবে তিনি তিনবার পানি পান করেন। ২য় বার আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম সময় এবং ৩য় বার আরো কম সময় ধরে তিনি পানি পান করেন।

ইমাম তকী ফাসী বলেন, যমযমের পানি পান করার মুস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে: পানি পানকারী কেবলামুখী হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করবে। তিনবার শ্বাস নেবে, পেট ভরে পানি পান করবে, পান শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলবে এবং পানি পান করার সময় হযরত ইবনে আব্বাস (রা) যে দোয়া পড়েছিলেন সে দোয়া পড়বে। ইবনে আব্বাস (রা) যমযমের পানি পান করার সময় নিম্নোক্ত দোয়া পড়তেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَ لُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا وَاسِعًا وَشِفَاءٌ مِّنْ كُلِّ دَاء
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে কল্যাণকর জ্ঞান, প্রশস্ত রিস্ক এবং সকল রোগ থেকে আরোগ্য প্রার্থনা করি।
এই দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং অন্যান্য কল্যাণকর দোয়াও পড়া যায়।

উলামায়ে কেরামের মতে, ডান হাতে গ্লাস নিয়ে কিবলামুখী হয়ে বিসমিল্লাহ বলে দাঁড়িয়ে পানি পান করতে হবে। তিনশ্বাসে পানি পান করবে। পান শেষে আল্লাহর হামদ প্রকাশ করবে এবং পেট ভরে পানি পান করবে。

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন ও তা অন্যত্র নেয়া

📄 যমযমের পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন ও তা অন্যত্র নেয়া


আযরাকী উল্লেখ করেছেন, যার বিন হোবাইস বলেন, আমি হযরত আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিবকে মসজিদে হারামে, যমযমের চারপার্শ্বে প্রদক্ষিণ করা অবস্থায় বলতে শুনেছি যে, আমি যমযমের পানিকে গোসলের জন্য জায়েয মনে করিনা; এই পানি দ্বারা অজু করা যাবে এবং তা পান করা যাবে। বনি মাখযুম গোত্রের এক ব্যক্তি যমযমের পার্শ্ববর্তী একটি হাউজ থেকে উলঙ্গ গোসল করার সময় হযরত আব্বাস ঐ কথা বলেন।

ইমাম ফাসী তাঁর শেফাউল গারাম বইতে লিখেছেন, যমযমের পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা সর্বসম্মতভাবে জায়েয। ইমাম নবওয়ী এবং মাওয়ারদী এই কথা উল্লেখ করেছেন। তবে অন্য পানি থাকা অবস্থায় যমযমের পানি দিয়ে এস্তেঞ্জা করা (পবিত্রতা হাসিল করা) ঠিক নয়। লোকেরা বলে, যমযমের পানি দিয়ে এস্তেঞ্জা করলে অর্শ রোগ হয় এবং যারা তা করেছে তাদের অর্শ রোগ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। মুহিব আত তাবারী এর দ্বারা এস্তেঞ্জা করাকে নাজায়েয বলেছেন। মাওয়ারদীর অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যমযমের পানি দিয়ে এস্তেঞ্জা করা এবং মুর্দাকে গোসল দেয়া জায়েয নেই। মালেকী মাজহাবে যমযমের পানি দিয়ে অজু করাকে উত্তম বলা হয়েছে। শাফেঈ মাজহাবে, এই পানি দিয়ে অজু গোসল দুটোই জায়েয আছে। ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের এক রেওয়ায়েতে এই পানি দিয়ে অজু করাকে মাকরূহ বলা হয়েছে।

ফাকেহী উল্লেখ করেছেন মক্কার লোকেরা মুর্দাদের গোসলের পর বরকতের জন্য যমযমের পানি দিয়ে তাদেরকে পুনরায় গোসল দেয়। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা) তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরকে যমযমের পানি দিয়ে গোসল করিয়েছেন। শেখ জামাল উদ্দিন মুহাম্মদ জারুল্লাহ বিন জুহায়রা আল-কোরাইশী তাঁর বইতে লিখেছেন, যমযমের পানি পবিত্র। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তা এস্তেঞ্জায় ব্যবহার করা যাবে না। অপরদিকে, মুহিব আত-তাবারী জোর দিয়ে বলেছেন, যমযমের পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা গেলেও তা দিয়ে শরীরের নাপাকী দূর করা জায়েয হবে না।

ইমাম ফাসী বলেন, ৪ মাজহাবের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী যমযমের পানি অন্য স্থান বা দেশে নেয়া জায়েয আছে। বরং শাফেঈ এবং মালেকী মাজহাবে তা মুস্তাহাব। অথচ শাফেঈ মাজহাবে হারাম এলাকার পাথর অন্যত্র নেয়া জায়েয নেই।

যমযমের পানি স্থানান্তরের ব্যাপারে তিরমিযী শরীফে বর্ণিত একটি হাদীস হচ্ছে এর প্রধান ভিত্তি। হযরত আয়িশা বোতলে করে যমযমের পানি বয়ে নিয়ে গেছেন এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কলসী এবং চামড়ার মশকে করে যমযমের পানি নিয়ে গেছেন, রোগীদেরকে তা পান করিয়েছেন এবং রোগীদের উপর উক্ত পানি ছিটিয়ে দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সোহাইল বিন আমরকে যমযমের পানি উপহার দিয়েছেন। বিনিময়ে সোহাইল রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্য দুটো ভারবাহী পশু উপহার পাঠিয়েছেন।

টিকাঃ
২১. প্রাগুক্ত।
২২. প্রাগুক্ত।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত যমযম কূপের উন্নয়ন

📄 হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত যমযম কূপের উন্নয়ন


আযরাকী লিখেছেন, ইবনে আব্বাসের আমলে, যমযমের পানি পান করার জন্য দু'টো হাউজ ছিল। একটি ছিল, যমযম কূপ এবং হাজারে আসওয়াদের মাঝখানে, পানি পান করার হাউজ। অন্যটি ১ম টির পেছনে বাবুস সাফা বরাবর অজুর হাউজ। ১ম'টা থেকে ২য় টায় অজুর পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। কূপ থেকে চামড়ার মশকে করে পানি তুলে দুই হাউজে ঢালা হত। তখন দুইটি হাউজই কূপের কাছে ছিল এবং মাঝে কোন বেড়া ছিল না।

হযরত মুয়াওয়িয়াহ বিন আবু সুফিয়ান দারুন নাদওয়ায় একটি পানকেন্দ্র স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তখন ইবনে আব্বাস তাঁকে না করেন। যমযম এবং হাজারে আসওয়াদের মাঝে, বাবুস-সাফার দিকে নাবীজ (খেজুর মিশ্রিত মিষ্টি পানি) পান করার হাউজ ছিল।

ইবনে আব্বাসের বসার স্থান ছিল যমযমের পার্শ্বে-সাফা এবং উপত্যকা অভিমুখী। অর্থাৎ যমযমে আসার সময় হাতের বামে। ইবনে আব্বাসের বৈঠকখানার উপর সর্বপ্রথম সোলায়মান বিন আবদুল মালেক গম্বুজ তৈরী করেন। তারপর খলিফা জাফর এর উপর একটি নতুন গম্বুজ তৈরি করেন এবং যমযমে জানালা নির্মাণ করেন। খলীফা আবু জাফরই সর্বপ্রথম যমযম কূপে মার্বেল পাথর লাগান। তিনি যমযমের জানালা এবং ভিটির উপর মার্বেল পাথর লাগান। তারপর খলীফা মাহদীও নতুন করে মার্বেল পাথর লাগান। তিনি যমযমের পার্শ্বে একটি কাঠের স্তম্ভের উপর ছোট একটি গম্বুজ নির্মাণ করেন। এতে তাওয়াফকারীদের সুবিধার্থে রাত্রে বাতি জ্বালানো হত। পরে উমর বিন ফারাজ রাখজী তা ভেঙ্গে ফেলেন।

আযরাকী ২২০ হিজরীতে খলীফা মুতাসিম বিল্লাহর আমলে, যমযম কূপে যে সকল নির্মাণ কাজ সংঘটিত হয়েছে তার বর্ণনা দিয়ে বলেন, যমযম কূপের উপর ছোট একটি গম্বুজ ব্যতীত এর বাকী সকল অংশ খোলা ছিল। উমর বিন ফারাজ রাখজী টিন দিয়ে যমযমের উপর ছাদ নির্মাণ করেন এবং ছাদের ভেতরের অংশ সোনা দ্বারা মোড়ান। হজ্জ মওসুমে বাতি জ্বালানোর উদ্দেশ্যে ছাদের চারদিকে শিকল ঝুলিয়ে তাতে তেলের বাতি লাগান। তিনি যমযম এবং পানকেন্দ্রের মাঝখানে অবস্থিত গম্বুজে মোজাইকের প্রলেপ দেন। এর আগে প্রতিবছর হজ্জের সময় এটিকে সাজানো হত।

আযরাকী যমযম পানকেন্দ্র এবং এর উপরে নির্মিত গম্বুজের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, যমযম এবং পানকেন্দ্রের মধ্যে দূরত্ব ছিল সাড়ে ২১ হাত। মাঝখান থেকে এর প্রশস্ততার পরিমাণ হচ্ছে ১২.৯ হাত, ভেতর থেকে গোলাকার হাউজের মোট আয়তন হচ্ছে ৩৯ হাত এবং বাইরের দিক থেকে এর আয়তন হচ্ছে ৪০ হাত। এর ভিটি এবং দেয়াল মার্বেল পাথরের তৈরী।

পরে রাখজী তা পরিবর্তন করেন এবং তিনি এর দেয়ালে নকশাকৃত পাথর এবং ভিটিতে মার্বেল পাথর লাগান। তাঁর নির্মিত দেয়ালের উচ্চতা ছিল ১০ আঙ্গুল এবং প্রশস্ততা ছিল ৮ আঙ্গুল। এই পানকেন্দ্রের মাঝখানে ছিল নাবীজ বা খেজুর মিশ্রিত মিষ্টি পানির কেন্দ্র। সেখানে মার্বেল পাথরের তৈরী একটি ফোয়ারা ছিল। তাতে সীসা নির্মিত একটি পাইপের মাধ্যমে যমযমের পানি প্রবাহিত হত।

২৫৬ হিজরীতে, খলীফা মাহদীর শাসনামলে, মসজিদে হারামের নির্মাণ কাজের তদারকের জন্য বিসির নামক একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ করা হয়। তিনি গম্বুজের নীচের ভিটির মার্বেল পাথর সরিয়ে ফেলেন এবং সেখানে মাটি ফেলে তা উঁচু করেন। তিনি সেখানে একটি কূয়া নির্মাণ করে মাঝখানে পানি বের হওয়ার জন্য ঝর্ণা তৈরি করেন। চারদিকে কাঠের জানালা এবং খোলা ও বন্ধ করার মত দরজা লাগান। ইতিপূর্বে, এ জায়গায় লোকেরা এবাদত করত এবং ঘুম যেত। তিনি ইবনে মুহাম্মদ বিন দাউদের আমলে বড় গম্বুজের চারকোণে অবস্থিত কাঠের স্তম্ভের উপর নির্মিত ছোট ৪টি গম্বুজও ভেঙ্গে ফেলেন।

গম্বুজ বিশিষ্ট পান কেন্দ্র থেকে গম্বুজহীন হাউজের দূরত্ব ছিল ৫ হাত। গম্বুজহীন হাউজ থেকে গম্বুজ বিশিষ্ট পানকেন্দ্রের মাঝখান থেকে দূরত্ব হচ্ছে ১২.১৮ হাত। ভেতর থেকে ঐ গোলাকার হাউজের আয়তন ১৩ হাত এবং এর দেয়ালের প্রশস্ততা ছিল ৮ আঙ্গুল। হাউজের চারদিকে ৫০টি পাথর এবং হাউজের ভেতর পাথরের উপর মার্বেল পাথর লাগানো হয়। এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু আমরা এখানে তা সংক্ষেপে পেশ করলাম।

৫৭৮ হিজরীতে ইবনে জোবায়ের তার বইতে মক্কা সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেন, যমযমের গম্বুজটি হাজারে আসওয়াদ অভিমুখী ছিল। দুটোর মধ্যে দূরত্ব ছিল ২৪ কদম এবং মাকামে ইবরাহীম থেকে এর দূরত্ব ছিল ১০ কদম। ভেতরে ধবধবে সাদা মার্বেল পাথরের গাঁথুনী। তিনি এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

ইমাম তকী ফাসী যমযমের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, যমযমের উপর একটি বর্গাকৃতির ঘর। ঘরের দেয়ালে ৯টি ছোট হাউজ। একটি খারাপ এবং অবশিষ্টগুলো ভাল। অজু করার জন্য এগুলোতে যমযমের পানি ভর্তি করে রাখা হত। কা'বার দিকের দেয়ালে জানালা ছিল এবং টিন দিয়ে এর ছাদ তৈরী করা হয়। যমযমের কূপের উপর সাধারণ কাঠের একটি জানালা ছিল। তকী ফাসীর এই বর্ণনা আযরাকীর বর্ণনার চাইতে ভিন্ন ধরনের। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, তকী ফাসীর সময়ের আব্বাসী খলীফাগণ ঐ নির্মাণ কাজ করেছেন। তারা আব্বাসী বংশের লোক হিসেবে হযরত আব্বাসের উপর যমযমের পানি পান করানোর অর্পিত দায়িত্বের প্রতি পরবর্তীতে যথেষ্ট ভালবাসা ও গুরুত্ব প্রদান করে।

তকী ফাসী বলেন, যমযমের ছাদের উপর ছিল মুয়াজ্জিনের আজানের স্থান। উইপোকা ছাদের খুঁটি খেয়ে ফেলায় আজানখানাটি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে, ৮২১ হিজরীতে, অন্য কাঠ দিয়ে মজবুত খুঁটি তৈরি করে আজানখানাকে হেফাজত করা হয়। ৮২২ হিজরীতে, যমযমের উপর নির্মিত শেড এর নীচের অলংকারপূর্ণ কাঠামো মেরামতের উদ্দেশ্যে ভেঙ্গে ফেলা হয়। শেড এর চারদিকে রেলিং এর ছোট ছোট খুঁটিগুলোতেও উইপোকা ধরায় সেগুলোও নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কাঠের তৈরি খুঁটির পরিবর্তে দেয়ালের উপর ইট ও চুনা দিয়ে কাবার দিকের দেয়াল, শাফেঈ মাজহাবের নামাযের স্থানের দিকের দেয়াল এবং বাবুল খালওয়াহর দিকের দেয়ালে মজবুত খুঁটি তৈরি করা হয়। যাতে করে আর উইপোকা তা নষ্ট করতে না পারে।

তকী ফাসীর শেফাউল গারাম বই এর নোটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৯৩৩ হিজরীতে, যমযমের উপর নির্মিত কক্ষের আভ্যন্তরীণ দিকের সোনালী কাঠামোতে তুর্কী সুলতান সোলায়মানের নাম লেখা ছিল। ৯৪৮ হিজরীতে, ঐ কক্ষটি সংস্কার করা হয়।

কাজী বিন জুহাইরাহ আল-মাখযুমী তাঁর বইতে লিখেছেন, শাহজাদা খোশকালদী ঐ সংস্কার করেন। তিনি কক্ষটির ভিটি নতুন মার্বেল পাথর দ্বারা এবং শেড নতুন নকশা করা কাঠ দ্বারা তৈরী করেন।

কুর্দী তাঁর বইতে লিখেছেন, ৯৭৩ হিজরীতে সুলতান সোলায়মানের আমলে যমযম কক্ষের সংস্কার করা হয়। তারপর সুলতান আবদুল হামীদ এবং সুলতান আবদুল মজীদ খানের আমলেও অনুরূপ সংস্কার করা হয়। কুর্দী আরো বলেন, সুলতান আহমদ আউয়াল বিন সুলতান মুহাম্মাদ যমযম কূপে একটি লোহার জানালা লাগানোর নির্দেশ দেন যেন কেউ কূপে পড়ে ডুবে না মরে। ১০২৫ হিজরীতে, যমযমের ভেতর ঐ জানালাটি লাগানো হয়। ১০২৭ হিজরীতে যমযমের উক্ত লৌহ জানালার সংস্কার করা হয়। কেননা, ঐ সালেই লোহা ও তাতে শিকল লাগানো জানালাটি যমযমের ভেতর ভেঙ্গে পড়ে এর গভীর তলদেশে নিমজ্জিত হয়। ফলে একদিকে লোহা ও তামার সংমিশ্রণে পানির স্বাদ বিকৃত হয় এবং অন্যদিকে, বালতি দিয়ে পানি উঠানো মুশকিল হয়ে পড়ে। কেননা বালতি তলদেশে ভেঙ্গে পড়া জানালার সাথে আটকে যায়।

এক রাত আফিন্দি শরীফ মুহাম্মদ বিন সাইয়েদ মোস্তফা গিনাওয়ী হঠাৎ করে যমযমের পানি পান করার জন্য মসজিদে হারামে উপস্থিত হন। তিনি পানির স্বাদ বিকৃত হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁকে কারণ জানানো হয়। তিনি পরের দিন সকালে, উক্ত জানালা উঠানোর নির্দেশ দেন। সকালে তা উঠিয়ে আব্বাসী গম্বুজের কাছে রাখা হয়। এর ফলে, পানির স্বাদ পূর্বের মত ফিরে আসে এবং বালতি দিয়ে পানি উঠাতে আর কোন কষ্ট রইল না।

কুর্দী বলেন, ১১১২ হিজরীতে, ইবরাহীম বেগ যমযম কূপের গোলাকৃতির দেয়াল, ভেতর ও বাইরের দিক থেকে প্লাস্টার করে, তাতে সাদা রং লাগান। ১২০০ হিজরীতে ১ম সুলতান আবদুল হামীদ যমযম কূপের কক্ষের কিছু সংস্কার করেন। ১২৭৯ হিজরীতে, সুলতান আবদুল আযীয খানের আমলে, শরীফ আবদুল্লাহ বিন শরীফ এবং আলহাজ্জ ইজ্জত পাশা যমযমের জানালা, কক্ষের ভিটির মার্বেল পাথর, যমযমের মুখ এবং মুখের সাথে সংলগ্ন সিঁড়ির ছোট পিলারগুলোর সংস্কার করেন। তখন যমযমের মুখ ছিল গোলাকার এবং তা মার্বেল পাথরের তৈরি ছিল। ভিটি থেকে উপরের দিকে উচ্চতার পরিমাণ ছিল প্রায় ১২০ সিন্টিমিটার। ভিটিতে সাদা মার্বেল পাথর লাগানো হয়। কূপের মুখে লোহার মোটা রডের ঘেরাও দেয়া হয়।

১৩৩২ হিজরীতে, উক্ত ঘেরাও এর উপর লোহার একটি জানালা দেয়া হয়। কেননা, একজন আফগানী নিজেকে যমযমে নিক্ষেপ করায়, তার লাশ কূপ থেকে উঠানোর পর তুর্কী সরকার উক্ত মজবুত প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করে যাতে অনুরূপ দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

ঐ সময়ে যমযমের শেডে, নামাযের সময় ঘোষণাকারী প্রধান কর্মকর্তার অফিস ছিল। ঐ অফিসের কর্মকর্তারা মসজিদে হারামের ৭ মিম্বারের উপর অবস্থানকারী মুযাজ্জিনদেরকে নামাযের সময় জানিয়ে দিতেন এবং সে অনুযায়ী মুয়াজ্জিনরা আজান দিতেন। তাঁরা সাধারণতঃ জুমা, দুই ঈদের সময় এবং মাকামে ইবরাহীমের পেছনে নামায আদায়কারী ইমামদেরকেও নামাযের সময় অবহিত করতেন। শেডের ছাদে উঠার জন্য একটি সিঁড়ি ছিল।

১৩৪৫ ও '৪৬ হিজরীতে বাদশাহ আবদুল আযীয পানি সরবরাহের জন্য দুটো সুন্দর পানকেন্দ্র নির্মাণ করেন। একটি কেন্দ্র হচ্ছে যমযমের গম্বুজের কাছে। সুন্দর মার্বেল পাথরের তৈরী এই পানকেন্দ্রে ৬টি টেপ লাগান এবং অপরটি নির্মাণ করেন মসজিদে হারামের সংরক্ষণকারী কর্মকর্তাদের কক্ষের কাছে। এতে তিনটি টেপ লাগান। এর ফলে হাজীদের যমযমের পানি পান কেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩টিতে। এগুলো থেকে হাজীরা রাত-দিন পানি পান করতে থাকে।

১৩৭৪ হিজরীতে যমযম কূপের সামনের দুই অংশে একটি ছোট কক্ষ নির্মাণ করা হয়। দেয়ালের উপর ছাদ দেয়ায়, পানি পানকারীরা কিছুটা ছায়া পায়। এতে কিছু জানালা ছিল। এর পার্শ্বে কিছু পানির টেপ লাগানো হয় এবং হাজীরা সেগুলো থেকে পানি পান করে। এছাড়াও যমযম কক্ষের বাইরে একটা সিঁড়ি নির্মাণ করা হয় এবং তা দিয়ে শেডের উপরে উঠার ব্যবস্থা করা হয়। আগে কক্ষের ভেতর দিয়ে ঐ সিঁড়ি বিদ্যমান ছিল।

টিকাঃ
২৩. প্রাগুক্ত।
২৪. প্রাগুক্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00