📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের পানির বৈশিষ্ট্য

📄 যমযমের পানির বৈশিষ্ট্য


ইমাম বদরুদ্দিন বিন সাহেব মিসরী যমযমের পানিকে অন্য পানির সাথে তুলনামূলক ওজন করে দেখেছেন যে, যমযমের পানি অন্য পানির চাইতে এক চতুর্থাংশ বেশী ভারী। তারপর তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলনা করে বলেন, এটি অন্য যে কোন পানির চাইতে সেরা এবং শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি এটাকে অন্য সকল পানির চাইতে সর্বশ্রেষ্ঠ দেখতে পেয়েছেন।

'আর-রেহলাতুল হেজাযিয়াহ' বই এর লেখক মুহাম্মদ লবীব বিতুনী যমযমের পক্ষে ও বিপক্ষে কিছু উল্টা মন্তব্য করেছেন। তার মতে, যমযমের পানি এক হওয়া সত্বেও বিভিন্ন ভক্তের কাছে তাদের নিজস্ব ধারণা-বিশ্বাসের কারণে, তার স্বাদ বিভিন্ন রকম। কারুর কাছে তা দুধ ও মধুর মত স্বাদ এবং কারুর তাতে ক্ষুধা পর্যন্ত মিটে যায়। হাদীসের আলোকে, মক্কাবাসীরা এটাকে সকল কিছুর জন্য উপকারী মনে করে। তার মতে, এ জাতীয় ধারণা-বিশ্বাস শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যেমন হিন্দুরা গঙ্গার পানিকে পবিত্র মনে করে তাতে স্নান করে এবং খৃষ্টানরা বাইতুল মাকদেসের ২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত জর্দান নদীর পানিকেও পবিত্র মনে করে।

যমযমের পানি রোগের চিকিৎসা এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা) এর যে হাদীস রয়েছে, সে ব্যাপারে তার বক্তব্য হল, এই পানির প্রকৃতি অনুযায়ী তা যে সকল রোগের নিরাময় করে সে সকল রোগের জন্যই তা চিকিৎসা স্বরূপ। তিনি উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, মূলতঃ যমযমের পানি ক্ষার জাতীয় (এলকালিন)। এতে সোডিয়াম, ক্লোরিন, ক্যালসিয়াম, সালফার ও নাইট্রোজেন জাতীয় এসিড এবং পটাসিয়াম সল্ট রয়েছে যার ফলে এটি খনিজ জাতীয় স্বাস্থ্যকর পানির সমতুল্য। তাই যমযমের পানি অল্প পান করা উচিত। বেশী পরিমাণ পান করা ক্ষতিকর। বিশেষ করে হজ্জ মওসুমের পর অবশ্যই অল্প পরিমাণ পানি পান করা উচিত। কেননা, তখন যমযম কূপ অব্যবহৃত থাকে এবং মক্কার লোকেরা এর পানি সামান্যই পান করে। কেননা এই পানি লবণাক্ত। ফলে, এতে নাইট্রোজেন জাতীয় গ্যাস জমে বলে তা পান করার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

'তারীখ ইমারাতুল মসজিদিল হারাম' এর লেখক হুসাইন আবদুল্লাহ বাসালামাহ লবীব বিতুনীর উপরোক্ত বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন এবং বলেন, মিঃ লবীব বিতুনী তার চিন্তা ও গবেষণায় সংশয়যুক্ত। তিনি একদিকে যমযমের পানির রাসায়নিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল বর্ণনা করে বলেন, এর পানি পান করা উপকারী। আবার বলেন, হজ্জ মওসুম ছাড়া অন্য মওসুমে তা কম পান করা উচিত। কেননা, বেশী পরিমাণ পান করলে তাতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। মক্কাবাসীরা হজ্জ ছাড়া অন্য মওসুমে তা পরিত্যাগ করে এবং এর পানি পান করে না বলে তা পান করার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

তার এ সকল বিপরীতমুখী ও পরস্পর সংঘর্ষমুখর বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তিনি তার গবেষণায় সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে ডুবে আছেন এবং সঠিক কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি না হাদীসের সাথে চলতে পারেন এবং না পারেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে চলতে। তার আকীদা-বিশ্বাসে না কোন দৃঢ়তা আছে এবং না তিনি অভিজ্ঞতা ও অভ্যাসের সাথে পরিচিত হতে পেরেছেন।

মক্কাবাসীরা যমযমের পানিকে উপকারী বলে মনে করে মর্মে তার বক্তব্য সম্পর্কে বলা যায় যে, এটা মক্কাবাসীদের মনে করার বিষয় নয় বরং এটা তাদের গভীর আকীদা-বিশ্বাস। হাদীসের উপর ভিত্তি করেই তাদের এই গভীর বিশ্বাস জন্মেছে। মক্কার লোকদের হজ্জ মওসুম ছাড়া অন্য মওসুমে যমযমের পানি পান না করার অভ্যাস ও অভিজ্ঞতা তিনি কোথা থেকে আবিষ্কার করলেন, সেটা তিনিই ভাল জানেন। মক্কায় বসবাসকারী প্রতিটি লোক সাক্ষী যে সত্য এর বিপরীত। রাত-দিন ২৪ ঘন্টা যমযম কূপের পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। পৃথিবীর সকল লোক মিলে পরীক্ষা করলেও এটাকেই সত্য বলে স্বীকার করবে। মিঃ বিতুনী খাম-খেয়ালীবশতঃ এ জাতীয় এলোপাথাড়ি মন্তব্য করেছেন। আইয়ামে জাহেলিয়াত থেকে আজ পর্যন্ত শীত ও গরম মওসুমে, সবসময় মানুষ পেট ভর্তি করে যমযমের পানি পান করছে এবং মুহূর্তের জন্যও তাকে ত্যাগ করেনি। যমযমের পানি সম্পর্কে যে সকল হাদীস রয়েছে তিনি সেগুলো সম্পর্কে জেনেও বিকৃত তথ্য পেশ করে যমযমের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করে কাফেরদেরকে সন্তুষ্ট করতে চান।

তিনি হিন্দুদের গঙ্গা ও খৃষ্টানদের জর্দান নদীর প্রতি পবিত্রতার মনোভাব তুলে ধরে যমযমের প্রতি মুসলমানদের মনোভাবকেও দুর্বল ও অর্থহীন করে তুলতে চান। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন যে, তার এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য। হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি মানুষের অভিজ্ঞতা দ্বারা যমযমের পানির উপকারিতা সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত। পরবর্তীতে আরো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তার কল্যাণ ও উপকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এ ছাড়াও 'আত্-তারীখ আল কাদীম লি-মক্কাহ ওয়া বাইতিল্লাহিল কারীম' বইয়ের লেখক আল কুর্দী যমযমের পানিতে রোগ-জীবাণুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন এবং বলেন, কিছুসংখ্যক ডাক্তার মন্তব্য করেছে যে তারা যমযমের পানি পরীক্ষা করে এতে জীবাণু দেখতে পেয়েছে। তাদের মতে, বন্যা, বৃষ্টি এবং পার্শ্ববর্তী বাড়ীসমূহের পয়ঃপ্রণালী থেকে ঐ সকল রোগ জীবাণু যমযমের পানির সাথে মিশায় তা পান করার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কুর্দী বলেন, এই সকল বক্তব্যকে অস্বীকার করার জন্য আমাদের কাছে নিম্নোক্ত যুক্তিগুলো রয়েছে।

১. আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে এই উষর মরুভূমিতে আল্লাহর হুকুমে জিবরীল (আ) হযরত ইসমাইল (আ) এর জন্য এই কূপটি বের করেন।
২. এটি কাবা এবং মহান নিদর্শন সাফা-মারওয়াহর দিক থেকে উৎসারিত।
৩. রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় হিজরত করার পর মক্কা থেকে যমযমের পানি মদীনায় পাঠানোর জন্য বলেছেন।
৪. রাসূলুল্লাহ (সা) এই পানি উদর ভর্তি করে পান করার জন্য উৎসাহিত করেছেন।
৫. যমযমের পানি খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসা এবং অন্য যে কোন নিয়তে পান করা হবে, তা পূরণ হবে এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে একাধিক হাদীস বর্ণিত আছে।
৬. হযরত জিবরীল (আ) যমযমের পানি দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বুক চিরে তা ধুয়েছেন।
৭. বহু সংখ্যক নবী, নেক বান্দাহ, আলেম, ইমাম ও বুজুর্গানে দ্বীন এই পানি পান করেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত অগণিত মানুষ এই পানি পান করবে। যমযমের পানির রং অন্য পানির রং এর মত হওয়া সত্বেও এর স্বাদ অন্য যে কোন পানির চাইতে ভিন্ন। এ ছাড়াও রয়েছে এর অগণিত কল্যাণ ও উপকার। প্রশ্ন হচ্ছে, রোগ জীবাণু কি এই যুগেই এতে প্রবেশ করেছে না আগেও করেছিল? অতীতে যমযমের পানি পান করার কারণে কোন লোক অসুস্থ হয়েছে বলে কোন প্রমাণ নেই। বরং অতীতে, লোকেরা চিকিৎসাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনকে সামনে রেখে যমযমের পানি পান করে উপকার পেয়েছে। শুধু তাই নয়, বর্তমান যুগেও যারা অনুরূপ নিয়ত করে যমযমের পানি পান করেছে তারাও সমান উপকার পাচ্ছে। এখনও যে কোন লোক তা পরীক্ষা করে দেখতে পারে। কিন্তু অতীত থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত যমযমের পানি পান করার কারণে ক্ষতি হওয়ার কোন রেকর্ড নেই। যদি ধরেও নেয়া হয় যে, বন্যা বা বৃষ্টির পানিতে এতে রোগ জীবাণু প্রবেশ করেছে তথাপি সেটি আল্লাহর কুদরতী কূপে তাঁরই ইশারায় নষ্ট হয়ে যায়। এতে পানির উপর কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না।

ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে, বেদুঈনরা তাদের পশুকে নিয়ে এসে যমযমের পানি পান করাতো। সেই সকল পশুর গায়ে মারাত্মক রোগ পর্যন্ত ছিল। কিন্তু তার পরও যমযমের পানি দূষিত হয়নি বরং বিপরীত পক্ষে, তা সবার জন্য উপকারীই প্রমাণিত হয়েছে। এটা হচ্ছে আগের যুগের কথা যখন যমযম কূপের পরিচ্ছন্নতার মজবুত ব্যবস্থা ছিল না কিন্তু বর্তমান যুগে এর সুষ্ঠু পরিচ্ছন্নতা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কুর্দী তাঁর বই এর অন্য জায়গায় বলেছেন, ১৩৭৬ হিজরীতে যমযমের পানিতে কিছুটা লবণাক্ততা দেখা দেয় এবং পানি ভারী হয়ে যায়। এর কারণ অজানা ছিল। কিন্তু ১৩৭৫ হিজরীতে সৌদী সরকার মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ কর্মসূচীর জন্য যখন মাসআর দিকের ঘর বাড়ীগুলো ভেঙ্গে ফেলে এবং ১৩৭৬ হিজরীতে মাসআ অর্থাৎ সাফা হতে মারওয়া এবং বাবুল অদাআ' পর্যন্ত ভিত্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে গভীর গর্ত খনন করে। তখন প্রাচীন বাড়ী-ঘরসমূহের সাথে মসজিদে হারামের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে যমযমের পানি পুনরায় স্বচ্ছ ও মিষ্টি হয়ে আসে। তাই কুর্দী বলেন, যমযমের পানিতে লবণাক্ততা আছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে, তাতে ঐ রকম বেশী লবণাক্ততা নেই, যা পান করার অনুপযোগী। বরং এতে সামান্য লবণাক্ততা আছে, যা পান করার উপযোগী। সম্ভবতঃ দুর্বল ও সন্দেহভাজন ঈমানদারের কাছে ত্রুটিপূর্ণ লবণাক্ত মনে হবে। যে কারণে, তারা যমযমের পানি পেট ভরে পান করতে পারে না। তাই রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, পেট ভরে পানি পান করার বিষয়টি আমাদের ও মুনাফিকদের মধ্যে একটি পার্থক্য সৃষ্টিকারী বিষয়।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 রাসূলুল্লাহর (সা) যমযমের পানি পান

📄 রাসূলুল্লাহর (সা) যমযমের পানি পান


আযরাকী হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তওয়াফে এফাদা শেষে এক বালতি যমযমের পানি তোলার আদেশ দেন। তিনি সেই পানি দিয়ে অজু করেন এবং বলেন, হে বনি আবদুল মোত্তালিব! তোমরা পানি তোল, তোমরা পানি না তুললে অন্যরা তোমাদেরকে ঐ কাজ থেকে বঞ্চিত করবে।

আযরাকী আরো বলেন, তাউস বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবায়ে কেরামকে দিনে তওয়াফে এফাদা করার নির্দেশ দেন এবং নিজে রাত্রে তওয়াফে এফাদা করেন। তিনি তাঁর উষ্ট্রীর উপর সাওয়ার হয়ে তওয়াফ করেন। তারপর যমযমের কাছে এসে বলেন, আমাকে এক বালতি পানি তুলে দাও। তিনি নিজে পানি পান করলেন এবং গড়গড়া সহকারে কুলি করলেন। তারপর বালতির অবশিষ্ট পানি কূপে ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন: তোমরা পানি তুলতে না পারলে তোমাদের কাছ থেকে অন্যরা এই অধিকার নিয়ে যাবে। তারপর তিনি খেজুর মিশ্রিত মিষ্টি পানীয় (নাবীজ) পান করার স্থানে গিয়ে তা পান করতে চান। হযরত আব্বাস (রা) বলেন, আজ সকাল থেকে লোকদের হাতে তা কিছুটা অপরিষ্কার হয়ে গেছে। ঘরে পরিষ্কার নাবীজ আছে, আপনি সেখান থেকে পান করুন। হযরত আব্বাস ৩ বার একথা বলেন, আর রাসূলুল্লাহ (সা) প্রত্যেকবারই তা অস্বীকার করে এখান থেকেই পানি পান করার উপর জোর দেন। পরে তিনি উপস্থিত স্থান থেকেই নাবীজ পান করেন। ইবনে জুরাইজ বলেন, তাউস তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নাবীজ এবং যমযমের পানি পান করেন এবং বলেন, নাবীজ পান করা সুন্নত না হলে তা বাতিল করা হত। তিনি আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) নাবীজ পান করার পর মন্তব্য করেন, এটা বড় ভাল কাজ, তা অব্যাহত রাখ। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নাবীজের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক সন্তোষ প্রকাশ করায় তা আমাদের কাছে উপত্যকা ভর্তি দুধ ও মধুর চাইতেও অপেক্ষাকৃত উত্তম। তিনি আরো বলেন, সম্ভবতঃ এই সুন্নত পরে বাতিল হয়ে গেছে।

আতা বিন আবী রেবাহ বলেন, তওয়াফে এফাদার পর যমযমের পানি পান করতে আমার কখনও ভুল হবে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর এই সুন্নত অনুসরণের উদ্দেশ্যে আগে আমি অন্য লোকদের সাথে মিলে পানি তুলে পান করতাম। কিন্তু পরে যখন আমি বুড়ো হয়ে গেলাম তখন অন্য লোকেরা পানি তুলে দিত এবং আমি তা পান করতাম। পিপাসা না থাকলেও শুধু সুন্নত পালনের উদ্দেশ্যেই আমি তা করতাম। কোন কোন সময় আমি খেজুর মিশ্রিত মিষ্টি পানি (নাবীজ) পান করতাম এবং কোন সময় করতাম না। যমযমের পানি পান করা যে সুন্নত এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই।

টিকাঃ
২০. প্রাগুক্ত।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের পানি পানের আদব

📄 যমযমের পানি পানের আদব


আযরাকী ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন আমি নবী করীম (সা) এর জন্য এক বালতি যমযমের পানি তুলতে এবং তাঁকে তা দাঁড়িয়ে পান করতে দেখি। হযরত ইবনে আব্বাসের অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বিসমিল্লাহ বলে বালতি ধরেন এবং অনেকক্ষণ যাবত পানি পান করেন। তারপর মাথা উপরের দিকে তুলে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলেন। এইভাবে তিনি তিনবার পানি পান করেন। ২য় বার আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম সময় এবং ৩য় বার আরো কম সময় ধরে তিনি পানি পান করেন।

ইমাম তকী ফাসী বলেন, যমযমের পানি পান করার মুস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে: পানি পানকারী কেবলামুখী হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করবে। তিনবার শ্বাস নেবে, পেট ভরে পানি পান করবে, পান শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলবে এবং পানি পান করার সময় হযরত ইবনে আব্বাস (রা) যে দোয়া পড়েছিলেন সে দোয়া পড়বে। ইবনে আব্বাস (রা) যমযমের পানি পান করার সময় নিম্নোক্ত দোয়া পড়তেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَ لُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا وَاسِعًا وَشِفَاءٌ مِّنْ كُلِّ دَاء
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে কল্যাণকর জ্ঞান, প্রশস্ত রিস্ক এবং সকল রোগ থেকে আরোগ্য প্রার্থনা করি।
এই দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং অন্যান্য কল্যাণকর দোয়াও পড়া যায়।

উলামায়ে কেরামের মতে, ডান হাতে গ্লাস নিয়ে কিবলামুখী হয়ে বিসমিল্লাহ বলে দাঁড়িয়ে পানি পান করতে হবে। তিনশ্বাসে পানি পান করবে। পান শেষে আল্লাহর হামদ প্রকাশ করবে এবং পেট ভরে পানি পান করবে。

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন ও তা অন্যত্র নেয়া

📄 যমযমের পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন ও তা অন্যত্র নেয়া


আযরাকী উল্লেখ করেছেন, যার বিন হোবাইস বলেন, আমি হযরত আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিবকে মসজিদে হারামে, যমযমের চারপার্শ্বে প্রদক্ষিণ করা অবস্থায় বলতে শুনেছি যে, আমি যমযমের পানিকে গোসলের জন্য জায়েয মনে করিনা; এই পানি দ্বারা অজু করা যাবে এবং তা পান করা যাবে। বনি মাখযুম গোত্রের এক ব্যক্তি যমযমের পার্শ্ববর্তী একটি হাউজ থেকে উলঙ্গ গোসল করার সময় হযরত আব্বাস ঐ কথা বলেন।

ইমাম ফাসী তাঁর শেফাউল গারাম বইতে লিখেছেন, যমযমের পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা সর্বসম্মতভাবে জায়েয। ইমাম নবওয়ী এবং মাওয়ারদী এই কথা উল্লেখ করেছেন। তবে অন্য পানি থাকা অবস্থায় যমযমের পানি দিয়ে এস্তেঞ্জা করা (পবিত্রতা হাসিল করা) ঠিক নয়। লোকেরা বলে, যমযমের পানি দিয়ে এস্তেঞ্জা করলে অর্শ রোগ হয় এবং যারা তা করেছে তাদের অর্শ রোগ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। মুহিব আত তাবারী এর দ্বারা এস্তেঞ্জা করাকে নাজায়েয বলেছেন। মাওয়ারদীর অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যমযমের পানি দিয়ে এস্তেঞ্জা করা এবং মুর্দাকে গোসল দেয়া জায়েয নেই। মালেকী মাজহাবে যমযমের পানি দিয়ে অজু করাকে উত্তম বলা হয়েছে। শাফেঈ মাজহাবে, এই পানি দিয়ে অজু গোসল দুটোই জায়েয আছে। ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের এক রেওয়ায়েতে এই পানি দিয়ে অজু করাকে মাকরূহ বলা হয়েছে।

ফাকেহী উল্লেখ করেছেন মক্কার লোকেরা মুর্দাদের গোসলের পর বরকতের জন্য যমযমের পানি দিয়ে তাদেরকে পুনরায় গোসল দেয়। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা) তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরকে যমযমের পানি দিয়ে গোসল করিয়েছেন। শেখ জামাল উদ্দিন মুহাম্মদ জারুল্লাহ বিন জুহায়রা আল-কোরাইশী তাঁর বইতে লিখেছেন, যমযমের পানি পবিত্র। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তা এস্তেঞ্জায় ব্যবহার করা যাবে না। অপরদিকে, মুহিব আত-তাবারী জোর দিয়ে বলেছেন, যমযমের পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা গেলেও তা দিয়ে শরীরের নাপাকী দূর করা জায়েয হবে না।

ইমাম ফাসী বলেন, ৪ মাজহাবের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী যমযমের পানি অন্য স্থান বা দেশে নেয়া জায়েয আছে। বরং শাফেঈ এবং মালেকী মাজহাবে তা মুস্তাহাব। অথচ শাফেঈ মাজহাবে হারাম এলাকার পাথর অন্যত্র নেয়া জায়েয নেই।

যমযমের পানি স্থানান্তরের ব্যাপারে তিরমিযী শরীফে বর্ণিত একটি হাদীস হচ্ছে এর প্রধান ভিত্তি। হযরত আয়িশা বোতলে করে যমযমের পানি বয়ে নিয়ে গেছেন এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কলসী এবং চামড়ার মশকে করে যমযমের পানি নিয়ে গেছেন, রোগীদেরকে তা পান করিয়েছেন এবং রোগীদের উপর উক্ত পানি ছিটিয়ে দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সোহাইল বিন আমরকে যমযমের পানি উপহার দিয়েছেন। বিনিময়ে সোহাইল রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্য দুটো ভারবাহী পশু উপহার পাঠিয়েছেন।

টিকাঃ
২১. প্রাগুক্ত।
২২. প্রাগুক্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00