📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 আবদুল মুত্তালিবের হাতে যমযমের পুনরাবিষ্কার

📄 আবদুল মুত্তালিবের হাতে যমযমের পুনরাবিষ্কার


কোরাইশ গোত্রের মধ্যে ১৫টি দায়িত্বপূর্ণ পদ ছিল। ঐ সকল দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কোরাইশরা নিজেদের এবং হাজীদের সেবা করত। এর মধ্যে سَدَانَةً বা 'কাবার সেবক' এই পদটি সবচাইতে বেশী সম্মানিত ছিল। কাবার সেবকের কাছে কাবার দরজার চাবি থাকতো। তিনি লোকদের জন্য কাবার দরজা খুলতেন এবং বন্ধ করতেন। ২য় গুরুত্বপূর্ণ পদটি ছিল سقَايَةَ বা পানি 'পান করানো'। হাজীদের পানি পান করানো খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। কেননা, মক্কায় পানির স্বল্পতার কারণে, এই দায়িত্ব পালনকারী বনি হাশেম বিন আবদে মন্নাফ গোত্রকে কাবার পার্শ্বে চামড়ার মশকে পানি জমা করতে হত এবং ঐ সকল পানি মক্কার বাইর থেকে উটের পিঠে করে বহন করে আনা হত। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদটি ছিল হাজীদেরকে খাওয়ানো رفَادَة। কোরাইশরা তাদের ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে গরীব হাজীদের খানা খাওয়ানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করত এবং ঐ দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির হাতে তা অর্পণ করত।

কুসাই বিন কিলাব নিজে ঐ তিনটি দায়িত্বসহ দারুন্ নাদওয়াহ পরিচালনা এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দুই ছেলে আবদুদ দার এবং আবদে মন্নাফের মধ্যে ঝগড়া-সংঘর্ষের পর তা বন্টন করা হয়। ঐ বন্টন অনুযায়ী বনি আবদে মন্নাফ 'পানি পান করানো' এবং হাজীদেরকে খানা খাওয়ানোর দায়িত্ব পায়। অপরদিকে, 'কাবার সেবা' এবং দারুন নাদওয়াহর দায়িত্ব অর্পিত হয় বনি আবদুদ্ দারের উপর। পরে হাশেম বিন আবদ মন্নাফের কাছ থেকে তাঁর ভাই মোত্তালিবের উপর ঐ দায়িত্ব অর্পিত হয়। তারপর আবদুল মোত্তালিব বড় হলে তিনি ঐ পদটি লাভের জন্য নিজ চাচার সাথে ঝগড়া করেন এবং পদটি লাভ করেন। তিনি তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব এত বেশী যোগ্যতার সাথে পালন করেন যা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে। এর ফলে তাঁর সম্মান ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

তখন পর্যন্ত যমযম কূপ অনাবিষ্কৃত থাকে। কিন্তু পরে তিনি স্বপ্নে যমযমের অবস্থান সংক্রান্ত লক্ষণের উপর ভিত্তি করে তা খুঁড়ে আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এতে করে তাঁর সুনাম ও যোগ্যতা আরো অনেক বৃদ্ধি পায়। আযরাকী আবদুল মোত্তালিবের যমযম কূপ সংক্রান্ত স্বপ্নটি বর্ণনা করে বলেন, আবদুল মোত্তালিবের বড় ছেলে হারেস বড় হওয়ার পর আবদুল মোত্তালিব রাত্রে স্বপ্নে দেখেন যে কেউ তাকে নির্দেশ দিচ্ছে, 'কাবার সামনে অবস্থিত মূর্তি বরাবর পিঁপড়ার বসতিতে ময়লা ও রক্তের মাঝে কাকের ঠোঁকরে সৃষ্ট ছিদ্রের মধ্যে খনন করে যমযম কূপ আবিষ্কার কর।' তিনি মসজিদে হারামে যান এবং স্বপ্নের লক্ষণগুলো দেখার জন্য সেখানে অপেক্ষা করেন। তখন মসজিদে হারামের বাইরে হাযওয়ারা নামক স্থানে একটি গাভী জবেহ করা হয়। গাভীটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে কসাইর কাছ থেকে ভেগে যমযমের স্থানে এসে পড়তে সক্ষম হয়। পরে কসাই এখানেই গাভীটির জবেহ কাজ সমাপ্ত করে এবং গোশত বহন করে নিয়ে যায়। তখন একটি কাক এসে গাভীর ময়লার উপর বসে এবং পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।

এই সকল লক্ষণ দেখার পর আবদুল মোত্তালিব যমযম কূপ খনন শুরু করেন। খনন কাজ দেখে কোরাইশরা আবদুল মোত্তালিবের কাছে ছুটে আসে এবং বলে, আমরা তো আপনাকে মূর্খ মনে করি না কিন্তু আপনি কেন আমাদের মসজিদে হারামের কাছে খনন কাজ করে মসজিদটিকে নষ্ট করছেন? আবদুল মোত্তালিব জবাব দেন, আমি একাজ অব্যাহত রাখবো এবং কেউ আমাকে বাধা দিলে তার মুকাবিলা করবো। তিনি তাঁর একমাত্র ছেলে হারেসকে নিয়ে খনন কাজ অব্যাহত রাখায় কোরাইশরা তাঁর সাথে ঝগড়া শুরু করে। কিছু সংখ্যক কোরাইশ তাঁর যোগ্যতা, প্রজ্ঞা ও বংশের প্রতি শ্রদ্ধার কারণে বিরোধীদেরকে বিরত রাখে। শেষ পর্যন্ত তিনি কূপটি খনন করতে সক্ষম হন। কূপটি খনন করার সময়কার বাধা-বিপত্তি এবং কষ্ট বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি তা সহজ করার জন্য আল্লার কাছে মান্নত করেন যে, যদি তার ১০টি ছেলে সন্তান হয় তাহলে তিনি একটিকে আল্লাহর নামে কোরবান করবেন।

কূপ খননের এক স্তরে তিনি কাবার দাফনকৃত তলোয়ারগুলো দেখতে পান। কোরাইশরা তলোয়ার দেখে তাতে নিজেদের অংশ দাবী করে। আবদুল মোত্তালিব বলেন, এতে তোমাদের কোন অংশ নেই। এগুলো আল্লাহর ঘরের তলোয়ার। তিনি পানির স্তর পর্যন্ত পৌছেন। তিনি কূপকে আরো একটু প্রশস্ত করেন যাতে করে এতে পর্যাপ্ত পানি থাকে এবং না শুকায়।

তিনি কূপের পার্শ্বে পানি সংরক্ষণের জন্য একটি হাউজ নির্মাণ করেন এবং পিতা-পুত্র দু'জনে মিলে সেই হাউজটিতে পানি তুলে ভর্তি করে রাখতেন। হাজীরা সেই হাউজ থেকে পানি পান করত। কিন্তু কোরাইশদের মধ্যে তাঁর প্রতি হিংসা পোষণকারী লোকেরা রাত্রে এসে হাউজটি ভেঙ্গে যেত এবং তিনি প্রতিদিন ভোরে তা পুনঃনির্মাণ করতেন। কোরাইশদের উৎপাত বেড়ে যাওয়ার কারণে তিনি তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। ফলে, তাঁকে স্বপ্নে দেখানো হয় যে, তুমি বল, “হে আল্লাহ! আমি এর পানি গোসলের জন্য নিষিদ্ধ করছি এবং শুধু পিপাসা নিবারণের জন্য পান করাকে বৈধ ঘোষণা করছি।” আবদুল মোত্তালিব মসজিদে হারামে যান এবং উপস্থিত কোরাইশদেরকে স্বপ্নের কথা শুনান। এর পর থেকে তাঁর তৈরী হাউজ কেউ নষ্ট করতে আসলে শরীরে বিভিন্ন রোগ দেখা দিত। ফলে, তারা তাঁর হাউজ এবং সেখান থেকে পানি পান করা ত্যাগ করে।

এরপর আবদুল মোত্তালিব কয়েকটি বিয়ে করেন এবং ১০টি ছেলে-সন্তান লাভ করেন। তিনি আল্লাহর কাছে বলেন, হে আল্লাহ! আমি আমার এক সন্তানকে তোমার উদ্দেশ্যে কোরবানী করার মান্নত করেছিলাম। এখন আমি তাদের মধ্যে লটারী দিয়ে ঠিক করবো যে কাকে কোরবান করবো। তুমি তোমার পছন্দ অনুযায়ী যাকে ইচ্ছা তাকে গ্রহণ কর। লটারীতে তাঁর সর্বাধিক প্রিয় সন্তান আবদুল্লাহর নাম উঠে। তারপর আবদুল মোত্তালিব বলেন, হে আল্লাহ! তুমি আবদুল্লাহ এবং একশত উটের মধ্যে যেটাকে পছন্দ কর সেটাকে গ্রহণ কর। তারপর এর মধ্যে লটারীতে পর্যায়ক্রমে একশত উট উঠায় আবদুল মোত্তালিব ১০০ উট কোরবান করেন।

হযরত আলী (রা) থেকে, তাঁর দাদা আবদুল মোত্তালিবের যমযম কূপ পুনরাবিষ্কার সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, আবদুল মোত্তালিব হিজরে ইসমাঈলে শুয়ে থাকা অবস্থায় স্বপ্নে তিনবার কূপ খননের নির্দেশ পান। তারপর তিনি নিজের একমাত্র ছেলে হারেসকে নিয়ে কূপ খনন করা শুরু করেন এবং কূপে পানির সন্ধান পেয়ে তাকবীর দেন। কোরাইশরা আবদুল মোত্তালিবের সাথে যমযমের কূপের মালিকানা দাবী করে। আবদুল মোত্তালিব নিজ মালিকানার সাথে অন্যদেরকে অংশ দিতে রাজী না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বনি সাদ বিন হোযাইম গোত্রের একজন মহিলা গণককে সালিশ মানার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই গণক সিরিয়ার নিকট বাস করত। তারা গণকের কাছে রওনা দেয় এবং হেজায ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী একটি এলাকায় পৌঁছার পর আবদুল মোত্তালিব দলের পানি ফুরিয়ে যায়। ফলে, তারা কঠিন পিপাসার্ত হয়ে পড়ে। অন্য কোরাইশ দল আবদুল মোত্তালিবের দলকে নিজেদের সম্ভাব্য পিপাসার আশংকায় পানি সাহায্য দিতে অস্বীকার করে। পরে দলটির পানিহীন সফরের ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে দলনেতা আবদুল মোত্তালিবের পরামর্শ কামনা করে। আবদুল মোত্তালিব বলেন, পানি ছাড়া আমরা যেহেতু নিশ্চিত মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছি তাই শক্তি থাকতে আমাদের সবাইকে এখন নিজের কবর খুঁড়ে এতে বসে মৃত্যুর অপেক্ষা করা উচিত। সেই অনুযায়ী তাঁর দলের সবাই কবর খুঁড়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু পরে আবদুল মোত্তালিব বললেন, এইভাবে, কবরে পিপাসার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা কঠিন ব্যাপার। চল আমরা রওয়ানা দেই হয়ত আল্লাহ আমাদের বাঁচার কোন ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। অন্য কোরাইশ দলটি নির্দয়ভাবে আবদুল মোত্তালিবের এই প্রস্থান দৃশ্য অবলোকন করে।

ঠিক যে মুহূর্তে তিনি তাঁর উটকে রওয়ানা করাবেন ঠিক সেই মুহূর্তেই উটের পায়ের নীচ থেকে মিষ্টি পানির একটি ফোয়ারা ফুটে উঠে। তারপর আবদুল মোত্তালিব দল খুশীতে তাকবীর ধ্বনি দেয় এবং সওয়ারী থেকে নেমে পানি পান করে ও মশকে পানি ভর্তি করে নেয়। তিনি অন্য কোরাইশ দলটিকেও পানি পান করার আহবান জানিয়ে বলেন, আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর রহমতের করুণা থেকে পানি দিয়েছেন তাই তোমরাও পানি পান কর। তারাও পানি পান করে এবং সাথে পানি নিয়ে নেয়। পরে প্রতিদ্বন্দ্বী কোরাইশ দলটি বলে : হে আবদুল মোত্তালিব, আল্লাহর কসম, আমরা আর তোমার সাথে যমযমের বিষয়ে ঝগড়া করবো না। আল্লাহ এ ব্যাপারে তোমার পক্ষে ফয়সালা জানিয়ে দিয়েছেন। চল, আমরা ফিরে যাই। এরপর তারা মক্কায় ফিরে আসে এবং গণকের কাছে যাওয়া বন্ধ করে।

ইবনে ইসহাক যমযম কূপ পুনরাবিষ্কার সম্পর্কে হযরত আলী (রা) এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। সেই বর্ণনায় অতিরিক্ত যে তথ্য যোগ হয়েছে তা হচ্ছে, কূপ খনন করতে গিয়ে আবদুল মোত্তালিব এতে দাফনকৃত দুটো সোনার হরিণ এবং অস্ত্রশস্ত্র লাভ করনে। কোরাইশরা এই সকল প্রাপ্ত জিনিসে নিজেদের হিসসা দাবী করে। পরে আবদুল মোত্তালিব বলেন, এস আমরা এ ব্যাপারে একটি ইনসাফপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। তিনি প্রস্তাব করেন যে, এজন্য তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে লটারী অনুষ্ঠিত হবে। এতে কাবার জন্য দুটো তীর, আমার জন্য দুটো এবং কোরাইশদের জন্য দুটো তীর থাকবে। কোরাইশরা এই প্রস্তাব মেনে নেওয়ায় তিনি কাবার জন্য দুটো হলুদ তীর, নিজের জন্য দুটো কাল তীর এবং কোরাইশদের জন্য দুটো সাদা তীর নির্বাচন করেন এবং কিছু শ্লোক পাঠ করেন। এরপর লটারী অনুষ্ঠিত হয়। হোবল দেবতার সামনে অনুষ্ঠিত ঐ লটারীতে কাবার হলুদ তীর দু'টো হরিণ, আবদুল মোত্তালিবের কাল তীরগুলো তলোয়ার এবং শিল্ড লাভ করল এবং কোরাইশদের তীর কোন কিছু পেতে ব্যর্থ হল। পরে আবদুল মোত্তালিব তলোয়ার দিয়ে কাবার দরজায় আওয়াজ দেন এবং এতে একটি সোনার হরিণ ঝুলিয়ে রাখেন। কাবার ইতিহাসে এই প্রথম সোনার মাধ্যমে কাবা শরীফ সাজানো হল। তিনি অন্য সোনার হরিণটিকে কাবার অর্থভাণ্ডারে রেখে দেন।

আল্লামা ফাসী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্মের পূর্বে আবদুল মোত্তালিব যমযম কূপ খনন করেন। তখন হারেস ব্যতীত তাঁর কোন ছেলে ছিল না। কিন্তু আযরাকী যোহরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্মের পর আবদুল মোত্তালিব যমযম কূপ খনন করেন। তিনি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন যে, আবু তালেব যমযম কূপ পুনঃনির্মাণ করেন এবং বালক মুহাম্মাদ পাথর যোগান দেন। শেষের বর্ণনাটি দুর্বল এবং আগেরটিই বেশী সহীহ। কেননা, নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী সে সময় হারেস ব্যতীত আবদুল মোত্তালিবের অন্য কোন সন্তানাদি ছিল না। আবু তালিব রাসূলুল্লাহকে নিয়ে পরবর্তীতে যমযম কূপের সংস্কার করেছিলেন। এর সাথে আবদুল মোত্তালিবের যমযম কূপ খনন করার কোন সম্পর্ক নেই।

আবদুল মোত্তালিব তাঁর যমযম খনন করা সংক্রান্ত স্বপ্নকে প্রথমে ভেবেছিলেন যে, এটি হয়তো কোন অশুভ মুর্দার আত্মা কিংবা জিন ও শয়তানের ওয়াসওয়াসা হতে পারে। তিনি এজন্য তা পুরো বিশ্বাস করতে পারেননি। তাই নিজ ছেলে হারেসকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে কূপ খনন করতে থাকেন। যদি ঐটি শয়তানের স্বপ্ন হয়ে থাকে তাহলে অন্যরা জানলে তা লজ্জার বিষয় হবে। নচেৎ মক্কার সর্দার হিসেবে যমযম কূপের মত এত মহান কূপের খনন কাজে মক্কার অন্যান্য লোকজনের সহযোগিতার কোন অভাব হওয়ার কথা ছিল না।

এক বর্ণনায় এসেছে যে, আবদুল মোত্তালিব কর্তৃক যমযম কূপ সফলভাবে খনন সম্পন্ন হলে এবং ১০ জন পুত্র সন্তান লাভ করলে একজনকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার মান্নত করেন। পরবর্তীতে তাঁর ১০ জন পুত্র সন্তান হয়। তাদের নাম হচ্ছে: ১. হারেস ২. আবদুল্লাহ ৩. যোবায়ের ৪. আব্বাস ৫. দারার ৬. আবু লাহাব ৭. গীদাক ৮. হামযা ৯. মোকাওয়াস এবং ১০. আবু তালিব। তিনি তাঁর ১০ ছেলের মধ্যে যে লটারী দেন তাতে সর্বাধিক প্রিয় ছেলে আবদুল্লাহর নাম উঠে। তিনি হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পিতা। আবদুল মোত্তালিব তাকে জবেহ করার জন্য রওয়ানা হলে আবদুল্লাহর মামা বনু মাখযুম এবং কোরাইশ গোত্রের সরদার, জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিবর্গ তাতে বাধা দেয় এবং বলে, তুমি তাকে জবেহ করলে আমাদের সন্তানদের ব্যাপারে ভবিষ্যতে তা একটি প্রথার রূপ নেবে এবং গোটা আরবে তা একটি পদ্ধতি হিসেবে চালু হবে। তারা পরামর্শ দিল যে, মদীনায় তেখাইবার নামক একজন মহিলা ভবিষ্যদ্বাণী করে। তার কাছে গিয়ে এ সমস্যার একটি সমসাধান যেন নিয়ে আসা হয়। পরামর্শ অনুযায়ী আবদুল মোত্তালিব মদীনায় যান এবং ঐ মহিলার কাছে গিয়ে গোটা ঘটনা বর্ণনা করেন। মহিলাটি বলে, আজ যাও এবং আগামীকাল আমার চাকরেরা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। পরের দিন তারা তার কাছে পৌছার পর সে জানায় যে, হ্যাঁ, আমার কাছে খবর এসে গেছে। তবে আমার জিজ্ঞাস্য হচ্ছে, তোমাদের দিয়াহ বা রক্তপণের পরিমাণ কত? তারা বলল, ১০টি উট। সে বলে, তোমরা যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফিরে যাও এবং ১০টি উট ও লোকটির মধ্যে লটারী দাও। লটারীতে উট উঠলে সে উটগুলো জবেহ কর। আর যদি লোকটি উঠে তাহলে এর সাথে আরো ১০টি করে উট যোগ করে লটারী দিতে থাকবে, যে পর্যন্ত না তোমাদের রব তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হন। আবদুল মোত্তালিব মক্কায় ফিরে আসার পর ৯ বার লটারী দেন এবং প্রতিবারই আবদুল্লাহর নাম উঠে। দশমবারে উটের পরিমাণ যখন একশতে দাঁড়ায় তখন উটের নাম উঠে। আবদুল মোত্তালিব বলেন, আমি তিনবার লটারী না দেয়া পর্যন্ত আল্লাহর প্রতি ইনসাফ করছি বলে মনে হচ্ছে না। কোরাইশগণ বলেছে, আবদুল মোত্তালিব তুমি ১শ' উট জবেহ কর। তোমার রব সন্তুষ্ট হয়েছে। কিন্তু আবদুল মোত্তালিব তিনবার ১০০ উট এবং আবদুল্লাহর মাঝে লটারী দেয়ার পর প্রত্যেকবারই ১০০ উট উঠাতে প্রশান্ত হন। তিনি উপত্যকা, গিরিপথ এবং পাহাড়ের চূড়ায় ঐ সকল উট জবেহ করেন এবং কোন মানুষ, হিংস্র প্রাণী ও পাখীকে গোশত খাওয়া থেকে বাধা দেয়া হয়নি। তবে তাঁর সন্তানেরা কেউ ঐ গোশত খায়নি। ফলে বহু বেদুইন মক্কায় এসে জড়ো হয় এবং বহু নেকড়ে বাঘ ঐ সকল উটের গোশত খেতে আসে। উটের মাধ্যমে এটাই হচ্ছে প্রথম দিয়াহ বা রক্তপণ। পরবর্তীতে ইসলাম এই রক্তপণ পদ্ধতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

এইভাবে আল্লাহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্মদাতা পিতাকে হেফাজত করেন এবং তার ঔরসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্মকে সুনিশ্চিত করেন।

সেই দিনই আবদুল মোত্তালিব ঘরে ফেরার পথে ওহাব বিন আবদে মন্নাফ বিন কিলাবকে মসজিদে হারামে বসা দেখতে পান। তিনি মক্কার একজন সম্ভ্রান্ত লোক ছিলেন। তিনি নিজ কন্যা আমিনাকে আবদুল্লাহ বিন আবদুল মোত্তালিবের সাথে বিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নানার বাড়ী হচ্ছে মক্কায়, মদীনায় নয়। তাঁর মা বাপ দু'জনই কোরেশী ছিলেন।

টিকাঃ
৪. যমযম, ইয়াহইয়া কোশাক।
৫. প্রাগুক্ত।
৬. প্রাগুক্ত।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের পানি সেবা

📄 যমযমের পানি সেবা


ফাসী বলেন, আবদুল মোত্তালিবের অনেক উট ছিল। হজ্জের মওসুমে তিনি সকল উটকে জড়ো করে দুধ দোহন করে তাতে মধু মিশিয়ে যমযমের পাশে চামড়ার বড় মশকে হাজীদের পান করার উদ্দেশ্যে রেখে দিতেন। এ ছাড়াও তিনি কিসমিস খরিদ করে তা যমযমের পানিতে ভিজিয়ে শরাব তৈরী করতেন। কেননা, তখন যমযমের পানি ভারী ও লবণাক্ত ছিল। আমৃত্যু তিনি ঐ কাজ অব্যাহত রাখেন এবং হাজীদেরকে পানি পান করান।

আবদুল মোত্তালিবের মৃত্যুর পর আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিবের উপর سقاية বা পানি পান করানোর দায়িত্ব অর্পিত হয়। তায়েফে তাঁর আঙ্গুর বাগান ছিল। তিনি সেই বাগান থেকে কিসমিস সংগ্রহ করতেন এবং তায়েফবাসীদের কাছ থেকে আরো অতিরিক্ত কিসমিস কিনে তা দিয়ে শরাব তৈরী করে হাজীদেরকে পান করাতেন। এই অবস্থা আইয়ামে জাহেলিয়াত এবং ইসলামের ১ম যুগ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। তারপর মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আব্বাস থেকে পানি পান করানোর দায়িত্ব এবং উসমান বিন তালহা থেকে কাবার সেবার দায়িত্ব ও চাবি নিজ হাতে নেন। তখন হযরত আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে গিয়ে হাত পাতেন এবং বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার জন্য আমার মা-বাপ কোরবান হউক। আমাকে কাবার সেবা, চাবি ও পানি পান করানোর দায়িত্ব দিন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) কা'বার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, জাহেলিয়াতের খুন, সম্পদ ও প্রতিশোধসহ সবকিছু আমার দুই পায়ের নীচে। অর্থাৎ জাহেলিয়াতের সকল পদ্ধতি ও সেবা বাতিল। শুধু কাবার সেবা এবং হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব অপরিবর্তিত থাকবে। এগুলো জাহেলিয়াতের সময় যে রকম ছিল সে রকমই অব্যাহত থাকবে। তখন হযরত আব্বাস (রা) পানি পান করানোর দায়িত্ব পুনরায় পান।

বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (সা) যমযম কূপের কাছে যান এবং যমযম কূপ থেকে বড় এক বালতি পানি ভর্তি করার আহবান জানান। পানি পান করানোর অধিকার হচ্ছে হযরত আব্বাস (রা) এর। তাই তাদের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য তিনি নিজ হাতে পানি না উঠিয়ে তাদেরকেই পানি উঠাতে বলেন। তিনি বলেন, 'হে আবদুল মোত্তালিবের সন্তানেরা! পানি উঠাও। নচেৎ অন্যরা তোমাদেরকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে।' তিনি নিজে আবদুল মোত্তালিবের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও নিজ হাতে এজন্য পানি উঠাননি যাতে করে পরবর্তীতে অন্যরা তাঁর অনুসরণে পানি না উঠায়। কেননা এতে বনি আব্বাস ঐ কাজ থেকে বঞ্চিত হবে।

আযরাকী আব্বাসী পানি সেবার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, পানি পান করানোর জায়গার দৈর্ঘ্য ২৪ হাত এবং প্রস্থ ১৯ হাত ছিল। এর চার দেয়ালে ৪টি স্তম্ভ ছিল এবং প্রত্যেক দেয়ালের মাঝখানে ছিল আরেকটি স্তম্ভ। এক স্তম্ভ আরেক স্তম্ভের সাথে কাঠের উন্নত তখতা দ্বারা সংযুক্ত। প্রত্যেক দেয়ালের উচ্চতা ছিল ৮ গজ এবং তখতার দৈর্ঘ্য ছিল সাড়ে ছয় হাত। পানি পান করার দেয়ালের উপর ৪৬টি আসন ছিল। কাবার সাথে সংলগ্ন দেয়ালে ছিল ১৩টি, মাসআর সাথে সংলগ্ন দেয়ালে ছিল ১৩টি, দারুন নাদওয়াহ সংলগ্ন দেয়ালে ১০টি, এবং উপত্যকা সংলগ্ন দেয়ালে ছিল ১০টি আসন। এগুলো হচ্ছে খলীফা মাহদীর নির্মিত। ২শ' হিজরীতে, হুসাইন বিন হাসান আলাওয়ী ফিতনার সময় তা ভেঙ্গে ফেলেন। তিনি দেয়াল সরু করেন, দরজা ভেঙ্গে ফেলেন এবং আসনকে সংযুক্তকারী কাঠগুলো সরিয়ে ফেলেন, এর ছাদ ফেলে দেন এবং ভিটিতে পাথরের টুকরা বিছিয়ে দেন। লোকেরা এতে নামায পড়া শুরু করে। হজ্জের সময় এর দরজাগুলো পূর্বের মতই আবার লাগানো হত। মোবারক আত্তাবারীর আমলে কাঠের তখতা পুনর্বহাল করা হল, ছাদ দেয়া হল এবং ভিটি থেকে পাথরের টুকরাগুলো সরিয়ে ফেলা হল। পানি পানের জায়গায় কাবার দিকে দুটো দরজা ছিল। প্রত্যেক দরজার দুটো অংশ ছিল। উপত্যকা বরাবর ছিল ৩য় দরজাটি। এতে পানি পান করার ৬টি হাউজ ছিল। প্রত্যেক হাউজের দৈর্ঘ্য হচ্ছে সাড়ে ৫ গজ, চওড়া হচ্ছে ২ গজ এবং উচ্চতা হচ্ছে সাড়ে তিন হাত। প্রত্যেক হাউজে একটি চামড়ার মশক ছিল এতে হাজীদের জন্য মদ রাখা হত এবং যমযমের পানির সাথে পাইপের মাধ্যমে এর সংযোগ রাখা হয়েছিল। টিউব পাইপ যে কক্ষে রাখা হয়েছিল তা কানীসা নামক ছায়াদার শেডের দিক থেকে আসার সময় বামে, যমযমের উপর নির্মিত হয়েছিল। সেখানে একটি কাঠের হাউজ ছিল।

যমযমের পানি পান করার স্থানের এই চেহারা ২২৯ হিজরীতে, উমর বিন ফারাজ রাখজী কর্তৃক তা ধ্বংস করার আগ পর্যন্ত বহাল ছিল। তিনি কূপের নীচের অংশ সাদা নকশা খোদাই পাথর দ্বারা নির্মাণ করেন, প্রবেশ পথকে রোমান নির্মাণ পদ্ধতি অনুযায়ী সাজান এবং উপরের অংশ ইট ও টাইলস দ্বারা নির্মাণ করেন। তিনি দেয়ালের মধ্যে লোহার তৈরী জানালা এবং দরজা লাগান। আর কানীসার উপর তিনটি ছোট গম্বুজ তৈরি করেন এবং তাতে মোজাইক করেন। তিনি পানি পান করার জায়গার ভেতর কাঠের তৈরী একটি বড় হাউজ নির্মাণ করেন এবং এর ভেতর চামড়ার তৈরি মশকে হাজীদের জন্য মিষ্টি পানি 'নাবীজ' সরবরাহ করেন।

তকী ফাসী আব্বাসের পানি সেবার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, পানি পান করানোর ঘরটি বর্গাকৃতির এবং উপরে ছিল একটি বড় গম্বুজ যা সমস্ত ঘরকে আবৃত করে রেখেছিল। গম্বুজটি ইট ও চুনার তৈরি ছিল। দক্ষিণ দিক ব্যতীত ঘরের অন্যান্য সকল দিকের দেয়ালে প্রতিটিতে দুটো করে লোহার জানালা ছিল। এর উত্তরাংশের বাইরের দিকে মার্বেল পাথরের তৈরি দুটো হাউজ ছিল এবং একটি দরজা দ্বারা হাউজ দুটো একটা থেকে আরেকটা পৃথক ছিল।

ঘরের ভেতর একটি বড় কূয়া ছিল। সেটি যমযমের পানি দ্বারা ভর্তি করা হত। নলাকৃতির একটি লম্বা কাঠ দিয়ে কূপ থেকে ঐ কুয়ায় পানি নিয়ে আসা হত। এটি যমযম কূপের উপর নির্মিত কক্ষের পূর্বের দেয়ালের সাথে লাগানো ছিল এবং সেখান থেকে উল্লেখিত দেয়ালের দিকে জোরে পানি প্রবাহিত হত। মাঝে একটা ঝর্ণা ছিল। সেটি থেকে মাটির নীচের একটি সরু খাল দিয়ে বেগে কুয়াতে পানি আসত। ৮০৭ হিজরীতে যমযমের উপর নির্মিত গম্বুজটির সর্বশেষ সংস্কার করা হয়। কেননা, উইপোকা এর কাঠের কিছু অংশ খেয়ে ফেলায় তা ধসে পড়ে। হাজারে আসওয়াদ থেকে পানি পান করানোর জায়গার দূরত্ব হচ্ছে ৮০ হাত।

হুসাইন বাসালামাহ বলেন, তকী ফাসী ৮০৭ হিজরীতে যমযমের গম্বুজের সর্বশেষ যে সংস্কারের কথা বলেন, তা হচ্ছে তাঁর সমসাময়িক সংস্কার। এর আগে খলীফা মুহাম্মদ আল মাহদী আব্বাসী এর সংস্কার করেন। আল্লামা সুয়ূতী বলেন, খলীফা মাহদী দুটো গম্বুজ তৈরি করেন। একটি হচ্ছে যমযমের উপর। আর অন্যটি তিনি মসজিদে হারামে ওয়াকফকৃত সম্পদ রাখার জন্য নির্মাণ করেন। এতে কথিত মোসহাফে উসমানীসহ আরো কুরআন শরীফে রাখা হত। ইবনে জোবায়ের তাঁর মক্কা ভ্রমণ বইতে লিখেছেন, আব্বাসের নির্মিত গম্বুজে একটি বড় বাক্স ছিল। এতে কুরআন শরীফ রাখা হত।

নাজমুদ্দিন বিন ফাহাদ আল কোরাইশী তাঁর الْخَافُ الْوَ'رى বইতে লিখেছেন, মোসেলের শাসকের মন্ত্রী জাওয়াদ ৫৫১ হিজরীতে যমযমের উপর যে গম্বুজ তৈরি করেন তা পোকায় খাওয়াতে ধসে পড়ায় ৮০৭ হিজরীতে পুনরায় তা মেরামত করা হয়। পরবর্তীতে যমযমের পার্শ্বে আব্বাসের বৈঠকখানাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। সেটি بَابُ الْخَلْوَةَ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। বাবুল খালওয়াতে একটি গম্বুজ বিশিষ্ট কূপ তৈরি করা হয়। সাফা পাহাড়ের দিকের দেয়ালে তামার তৈরি পানির টেপ লাগানো হয় এবং সেখানে নীচে পাথর বিছিয়ে দেয়া হয়। লোকেরা এর উপর অজু করে। গম্বুজ বিশিষ্ট কুয়ার একটি জানালা কাবার দিকে এবং অন্যটি সাফার দিকে নির্মাণ করা হয়। গভর্ণর বাইসাক তুর্কী ঐ সকল নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। ইবনে বতুতা তাঁর সফর কাহিনীতে বলেন, যমযমের গম্বুজের নীচে কলসীতে পানি রাখা হত এবং ঠাণ্ডা হলে তা লোকেরা পান করত। ঐ কলসীগুলোকে দাওরাক বলা হত। সেই গম্বুজের নীচে কুরআন এবং মসজিদে হারামের নামে ওয়াকফকৃত বই-পুস্তকগুলোও রাখা হয়। এতে একটি বাক্স ছিল। সেই বাক্সে রাসূলুল্লাহ (সা) এর ইন্তেকালের ১৮ বছর পর হযরত যায়েদ বিন সাবিতের হাতের লেখা এক কপি কুরআন মজীদও সংরক্ষিত ছিল।

১৩০১ হিজরীতে মক্কার গভর্নর শরীফ আউন রফিক এবং শেখুল হারাম উসমান নূরী পাশা পূর্বোল্লেখিত গম্বুজগুলো ভেঙ্গে ফেলেন। কারণ হল, তখন মসজিদে হারামে বন্যার পানি প্রবেশ করায় গম্বুজের নীচে সংরক্ষিত প্রচুর বই-পুস্তক ও অন্যান্য জিনিসপত্র নষ্ট হয়। তখন বাবে দোরাইবায় অবস্থিত মাদ্রাসার লাইব্রেরীতে ঐ সকল কিতাব স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং মসজিদের অঙ্গন সম্প্রসারণ করে তা মুসল্লীদের নামাজের জায়গায় রূপান্তরিত করা হয়।

কুর্দী তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন যে, বাবুল খালওয়ায় হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) বসতেন। কেউ কেউ বলেছেন, এটিই হযরত আব্বাসের পানি পান করানোর স্থান ছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, এটি খলীফা মাহদীর মেয়ে যুবাইদার ইচ্ছা অনুযায়ী যমযমের পানি পান করা এবং গোসল করার জন্য নির্মিত হয়েছিল।

বাদশাহ আবদুল আযীয বিন সউদ নিজ খরচে যমযমের পূর্বে ও দক্ষিণে পানি পান করানোর জন্য দু'টো স্থান নির্মাণ করেন। দক্ষিণ দিকে ৬টি এবং পূর্ব দিকে ৩টি টেপ লাগানো হয়। এগুলোতে গিয়ে লোকেরা পানি পান করে। দক্ষিণ দিকের সাবীল তৈরি হয় ১৩৪৬ হিজরীতে এবং পূর্বদিকের সাবীলটি তৈরি হয় ১৩৪৫ হিজরীতে।

আযরাকী উল্লেখ করেছেন যে, খলীফা সোলায়মান বিন আবদুল মালেক বিন মারওয়ান মক্কার শাসক খালেদ বিন আবদুল্লাহ কোসারীর কাছে পাহাড় কেটে কূপ খনন করে যমযম এবং হাজারে আসওয়াদের মাঝখানে মিষ্টি পানির একটি ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করার নির্দেশ দেন। আদেশ অনুযায়ী খালেদ কোসারী সাবীর পাহাড়ের মূলে, একটি মিষ্টি পানির কূপ খনন করেন। সেই কূপটি আজ পর্যন্ত বিদ্যমান আছে। একে কোসারী কূপ কিংবা 'বারদী বাবীর মায়মুন কূপ'ও বলা হয়। তিনি নকশা করা লম্বা পাথর দিয়ে তা মজবুতভাবে নির্মাণ করেন এবং সেখান থেকে একটি ঝর্ণাধারা নির্মাণ করেন। তাতে বাঁধ দিয়ে তিনি একটি কূয়া তৈরি করেন, সেখান থেকে মসজিদে হারাম পর্যন্ত একটি নালা তৈরি করেন এবং তা থেকে মার্বেল পাথরের তৈরি একটি হাউজে এসে ঝর্ণার মত পানি পড়ার ব্যবস্থা করেন। নালাটি সীসার তৈরি পাইপ দ্বারা নির্মাণ করা হয়। এই ঝর্ণাধারা নির্মাণ শেষে কোসারী মক্কায় উট জবেহ করে গোশত বিতরণের নির্দেশ দেন এবং লোকদেরকে খানা খাওয়ান। তারপর তিনি মিম্বারে উঠে লোকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতায় বলেন, তোমরা খলীফার জন্য দোয়া কর। কেননা, তিনি তোমাদেরকে যমযমের লবণাক্ত পানির পরিবর্তে মিষ্টি পানি পান করানোর ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু লোকেরা এই মিষ্টি পানির চাইতে যমযমের পানি পান করতেই বেশী আগ্রহী ছিল।

এই অবস্থা দেখে খালেদ অন্য একদিন বক্তৃতায় মক্কাবাসীদের সমালোচনা করেন। এর পর দাউদ বিন আলী বিন আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের খেলাফতের সময় ঐ ঝর্ণাধারাটি বন্ধ করে দেয়ায় লোকেরা খুশী হয়। কেননা, এতে করে পুনরায় যমযমের প্রধান্য বৃদ্ধি পায়।

তকী ফাসী এই ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আযরাকী উল্লেখ করেছেন যে, খালেদ কোসারী অনেক মহান কাজ আঞ্জাম দিয়ে গেছেন। তাঁর এবং তাঁর খলীফার পক্ষ থেকে অনুরূপ নিন্দনীয় কাজ সংঘটিত হতে পারে বলে বিশ্বাস করা মুশকিল।

টিকাঃ
৭. মাসআ' হচ্ছে সাঈ' করার জায়গা। অর্থাৎ সাফা-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থান।
৮. তারীখ ইমারাতিল মাসজিদিল হারাম, হোসাইন আবদুল্লাহ বাসালামাহ।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের বিভিন্ন নাম

📄 যমযমের বিভিন্ন নাম


ফাকেহী লিখেছেন, আহমদ বিন ইবরাহীম আমাকে একটি কিতাব দিয়েছেন। সেটি তাঁর মক্কার শিক্ষকদের লেখা। সেই কিতাবে যমযমের নিম্নোক্ত নামগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

১) هَزْمَةُ جِبْرِيلَ (২) سُفْيَا اللَّهِ إِسْمَاعِيلَ (৩) لَأَشَرْقِ (৪) لَأَنْزَمْ (৫) بركة (৬) سَيِّدَة (৭) نَافِعَة (৮) مَضْنُونَة (৯) عَوْفَة (১০) بشرى (১১) صَافِيَة (১২) بَرَةُ (১৩) عِصْمَة (১৪) سَالِمَة (১৫) مَيْمُونَةُ (১৬) مُبَارَكَة (১৭) كَافِيَة (১৮) عَافِيَة (১৯) مُغَذِّيَة ২০) طاهرة (২১) مَفداة (২২) حَرَمِيَّة (২৩) مَرْوِيَّة (২৪) مُؤْنِسَة (২৫) طَعَامُ طَعْمِ (২৬) شِفَاءُ سُقْمِ (২৭) طَيِّبَة (২৮) تَكَتُمْ ২৯) شَبَاعَةُ الْعَمَالِ (৩০) شَرَابُ الأَبْرَار (৩১) قَرْيَةُ النَّمْلُ (৩২) نَقْرَةُ الْغُرَابِ (৩৩) هَزْمَةُ إِسْمَاعِيلَ (৩৪) حَفِيْرَةُ الْعَبَّاسَ .

নগর অভিধানের লেখক ইয়াকুত হামাওয়ী শেষোক্ত ৮টি নামের কথা উল্লেখ করেছেন। যমযম শব্দের অর্থ নিয়ে মতভেদ আছে। ইবনে হিশামের মতে, আরবদের নিকট زمزمة শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রাচুর্য এবং জমা হওয়া। যমযমের প্রচুর পানির কারণে একে যমযম বলে। কারুর মতে এটি زمة শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ হল অবরুদ্ধ হওয়া। যমযম মাটির বাঁধে অবরুদ্ধ হওয়াতে এর পানি ডানে-বামে প্রবাহিত হতে পারেনি। যদি তাকে বাঁধ দিয়ে আটক করা না হত তাহলে এর পানি মাটির উপর দিয়ে গড়াত, এটা হযরত ইবনে আব্বাসের মত।

হারবীর মতে زَمْزَمَةَ الْمَاء শব্দের অর্থ হচ্ছে পানির শব্দ। যমযম এই শব্দ থেকেই উৎপত্তি লাভ করেছে। তাই এর অর্থ হচ্ছে শব্দ করা। কেউ কেউ বলেছেন, প্রথম যুগে এটি পারস্যবাসীদের হজ্জের স্থান ছিল এবং তারা এখানে জড় হত। এটি অনারববাসীদের শব্দ। মাসউদীর মতে, زمزمة হচ্ছে ঘোড়ার পানি পান করার সময় নাকের ভেতর থেকে যে আওয়ায বের হয় তা। হযরত উমর (রা)– তাঁর কর্মচারীদের কাছে লিখেছিলেন, أَنْهَوا الْفُرْسَ عَنِ الزَّمْزَمَةِ ঘোড়াদেরকে শব্দ করা থেকে বিরত রাখ।' ইয়াকুত আল হামাওয়ী লিখেছেন, পানির প্রাচুর্যের জন্যই যমযমকে যমযম নামকরণ করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, জিবরীল (আ) এর আওয়ায এবং কূপটি সম্পর্কে কথা বলার কারণে এর যমযম নামকরণ করা হয়েছে।

যমযমের উপরে বর্ণিত নামসমূহের কিছু ব্যাখ্যা উলামায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত আছে। মুহাম্মদ আলাওয়ী মালিকের মতে (৯) (ক) شَبَاعَة শব্দের অর্থ হচ্ছে ক্ষুধা নিবারণকারী। ক্ষুধা দূর করার উদ্দেশ্যে যমযমের পানি পান করলে ক্ষুধা দূর হয়। তাই একে 'শাব্বাআ' বলা হয়। (খ) مَرْوِيَّة শব্দটি رَى থেকে নির্গত হয়েছে। এর অর্থ হল 'তৃষ্ণা নিবারণকারী'। আরবীতে বলা হয় رَوِيَ مِنَ اللَّبَنِ وَالْمَاءِ অর্থ 'দুধ ও পানি দ্বারা পিপাসা মিটাল।' (গ) نَافِعَة শব্দের অর্থ হচ্ছে উপকারী। যমযমের পানি অনেক উপকারে আসে তাই একে 'নাফেআ' বলা হয়। (ঘ) عَافِیَةَ অর্থ মুক্তি লাভ করা। এই কূপের পানি পান করার মাধ্যমে বহু লোক বিভিন্ন রোগ ও বিপদ থেকে মুক্তি পেয়েছে। (ঙ) مَيْمُونَةَ শব্দটি يَمْنُ শব্দ থেকে বের হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে বরকত। এর বরকত সম্পর্কে বহু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। অতীত ও বর্তমানের বহুলোক এই কূপের পানি পান করে বরকত হাসিল করেছে। (চ) برة শব্দটি بر থেকে এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে কল্যাণ ও ইহসান। যমযমের পানি পান করে বহু লোক কল্যাণ ও ইহসান লাভ করেছে। (ছ) مضنونة এর অর্থ হচ্ছে ভাল জিনিস থেকে কাউকে বারণ করা। এটি একটি উত্তম কূপ বলে আল্লাহ তাঁর নাফরমান বান্দাহদের একটি জাতিকে এই পানি থেকে বঞ্চিত করেছেন এবং তাদেরকে এখান থেকে বিতাড়িত করেছেন। (জ) كَافِيَةُ শব্দটি كفاية শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ হল যথেষ্ট। এই পানি পিপাসা মিটানোর জন্য যথেষ্ট। অন্য কোন পানির প্রয়োজন নেই। (ঝ) شِفَاءُ سُقْمٍ এর অর্থ হচ্ছে রোগের চিকিৎসা। এই কূপের পানি দ্বারা বহু রোগের চিকিৎসা হয়। এর অর্থ হচ্ছে ক্ষুধার খাবার। ক্ষুধার সময় এই পানি পান করলে ক্ষুধার তৃপ্তি হয়। (ট) هَزمه جبريل এর অর্থ হচ্ছে জিবরীলের আঘাতের স্থান। (ঠ) حَرَمَيَّةَ এটি হারামে অবস্থিত বলে একে حَرَمَيَّةَ বলা হয়। (ড) تكَتُمْ শব্দের অর্থ হচ্ছে গোপন করা। এটা এক সময় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল বলে একে তাকাতুম বলা হয়। (ঢ) نَقْرَةُ الْغُرَاب এর অর্থ হচ্ছে, কাকের ঠোঁকরানো। আবদুল মোত্তালিব কাকের ঠোঁকরানোর চিহ্ন অনুযায়ী যমযম কূপ খনন করে পুনরাবিষ্কার করেন। (ণ) شَرَابُ الأبرار এর অর্থ হচ্ছে নেককারদের পানীয়। হযরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, নেককারদের পানীয় অর্থাৎ যমযমের পানি পান কর। (ত) قَرْيَةُ النَّمْلِ এর অর্থ হচ্ছে পিঁপড়ার বসতি। আবদুল মোত্তালিব যমযম কূপ খননের পূর্বে স্বপ্নে পিঁপড়ার বসতি খুঁড়ে যমযম আবিষ্কার করার জন্য আদিষ্ট হন। (খ) سُقْيَا اللَّهِ اِسْمَاعِيلَ এর অর্থ হচ্ছে ইসমাঈলের জন্য আল্লাহর পানীয়। (দ) সাফিয়া صَافِيَة শব্দের অর্থ হচ্ছে পরিচ্ছন্ন। যমযমের পানিও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। (ধ) مُغَذِّيَةٌ এর অর্থ হচ্ছে খাবারদানকারী। যমযমের পানিতে ক্ষুধা ও পিপাসা মিটে। কেউ কেউ এর নাম বলেছেন مُعَذِّبَةٌ । এটি عَذْبٌ শব্দ থেকে বেরিয়েছে। এর অর্থ হল, মিষ্টি পানি দানকারী। (ন) مُؤْنِسَةٌ শব্দের অর্থ হল প্রিয়। এই পানি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তাই এর এই নামকরণ করা হয়েছে।

টিকাঃ
৯. ফী রেহাবিল বাইতিল হারাম।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 যমযমের পানির ফজীলেত

📄 যমযমের পানির ফজীলেত


আযরাকী লিখেছেন, ওহাব বিন মোনাব্বিহ যমযম সম্পর্কে বলেন: আল্লাহর কসম, এটি আল্লাহর কিতাবে উত্তম কল্যাণকর, নেককারদের পানীয়, ক্ষুধা নিবৃত্তি এবং রোগের চিকিৎসা হিসেবে লিখিত আছে।

আযরাকী যানজী থেকে এবং তিনি ইবনে খায়সাম থেকে বর্ণনা করেছেন, একবার ওহাব বিন মোনাব্বিহ আমাদের কাছে এসে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর সাথে ছিল কিছু যমযমের পানি। আমরা বললাম, আপনি কিছু মিষ্টি পানি (স্বাভাবিক পানি) কেন পান করছেন না? যমযমের পানি তো যথেষ্ট লবণাক্ত। তখন তিনি জবাব দেন, আমার অসুখ ভাল হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি অন্য কোন পানি পান করবো না। যার হাতে ওহাবের প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছি, আল্লাহর কিতাবে এটি যমযম হিসেবে লিখিত; এটি কখনও শুকাবে না এবং ক্ষতিকর হবে না; এটি আল্লাহর কিতাবে উপকারী এবং নেককার লোকদের পানীয় হিসেবে লিখিত আছে; এটি আল্লাহর কিতাবে উত্তম বলে বিবেচিত; এটি আল্লাহর কিতাবে ক্ষুধা নিবারণ এবং রোগের চিকিৎসা হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে। ওহাবের প্রাণ যে সত্তার হাতে, তাঁর শপথ করে বলছি, কেউ যদি পেট ভর্তি করে এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ত করে তা পান করে অবশ্যই তার রোগের চিকিৎসা হবে এবং সে রোগমুক্ত হবে। মুজাহিদ বলেন,
مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ - إِنْ شَرِبْتَهُ تُرِيدُ شِفَاءً شَفَاكَ اللهُ وَإِنْ شَرِبْتَهُ لِظَمَا أَرْوَاكَ اللهُ - وَإِنْ شَرِبْتَهُ لِجُوعِ أَشْبَعَكَ اللهُ - وَهِيَ هَزْمَةٌ جِبْرِيلَ بِعَقِبِهِ وَسُقْيَا اللهِ إِسْمَاعِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ .
অর্থ: যমযমের পানি যে যে নিয়তে পান করবে তার সেই নিয়ত পূরণ হবে; তুমি যদি রোগমুক্তির জন্য তা পান কর তাহলে, আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। যদি তুমি পিপাসা মিটানোর জন্য পান কর, তাহলে, আল্লাহ তোমার পিপাসা পূরণ করবেন। যদি তুমি ক্ষুধা দূর করার উদ্দেশ্যে তা পান কর তাহলে, আল্লাহ তোমার ক্ষুধা দূর করে তৃপ্তি দান করবেন। এটি জিবরীলের পায়ের গোড়ালীর আঘাতে হযরত ইসমাঈল (আ) এর পানীয় হিসেবে তৈরি হয়েছে।

সুফিয়ান ইবরাহীম থেকে এবং তিনি ইবনে আবী হুসাইন থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সোহাইল বিন আমরের কাছে যমযমের পানি উপহার পাঠিয়েছিলেন। (আযরাকী)

ইকরামা বিন খালেদ বলেন, একদিন গভীর রাত্রে আমি যমযমের পার্শ্বে বসা ছিলাম। তখন একদল সাদা কাপড় পরিহিত লোক কাবার তওয়াফ করছিলেন। এমন ধবধবে সাদা কাপড় আমি আর কখনও দেখিনি। তওয়াফ শেষে তাঁরা আমার কাছে নামায পড়লেন এবং একজন তাঁর অন্য সাথীদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, চল আমরা নেক লোকদের পানীয় পান করি। তাঁরা যমযমে প্রবেশ করলেন। আমি ভাবলাম, আমি তো তাঁদেরকে তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে পারি। তারপর আমি তাঁদের কাছে গেলাম, দেখলাম সেখানে কোন মানুষের নাম-গন্ধও নেই। (আযরাকী)

হযরত আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জাহেলিয়াতের সময় লোকেরা একবার ভীষণ অভাবের সম্মুখীন হয়। ফলে খাবার সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তখন লোকেরা যমযমের পানির জন্য ছুটে আসে, পরিবারসমূহ শিশুদেরকে নিয়ে ভোরে যমযমে হাজির হত। তখন শিশুদের বাঁচানোর জন্য যমযমকে একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হত।

হযরত জাবের (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ .
অর্থ: 'যমযমের পানি যে, যে নিয়তে পান করবে তার সেই নিয়ত পূরণ হবে।' (ইবনে মাজাহ)

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ إِنْ شَرِبْتَهُ تَسْتَشْفِي بِهِ شَفَاكَ اللَّهُ وَإِنْ شَرِيْتَهُ لِقَطَّعَ ظَمْئِكَ قَطَعَهُ اللهُ - هِيَ هَزْمَةٌ جِبْرِيلَ وَسُقْيَا اللَّهِ اسْمَاعِيلَ ـ (زمزم يحيى كوشك)
অর্থ: যমযমের পানি যে যে মকসুদে পান করবে, তার সেই মকসুদ পূরণ হবে; যদি তুমি এই পানি রোগমুক্তির জন্য পান কর তাহলে আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন; যদি তুমি পিপাসা মিটানোর জন্য এই পানি পান কর তাহলে আল্লাহ তোমার পিপাসা দূর করবেন; এটি জিবরীলের পায়ের আঘাতে ইসমাঈলের পানীয় হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে।

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
التَّضَلُّعُ مِنْ مَّاءِ زَمْزَمَ بَرَاءَةٌ مِّنَ النَّفَاقِ - (الازرقى)
অর্থ: 'পেট ভর্তি করে যমযমের পানি পান করা মুনাফেকী থেকে মুক্তির কারণ।

সাঈদ উসমান থেকে, তিনি আবু সাঈদ থেকে তিনি একজন আনসার থেকে এবং ঐ আনসার তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: আমাদের সাথে মুনাফেকদের পার্থক্য হচ্ছে, তারা পেট ভর্তি করে যমযমের পানি পান করে না।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, তোমরা নেক লোকদের নামাযের স্থানে নামায আদায় কর এবং দ্বীনদার লোকদের পানীয় পান কর।
صَلُّوا فِي مُصَلَّى الْأَخْيَارَ وَاشْرَبُوا مِنْ شَرَابِ الْأَبْرَارِ .
তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, নেককারদের মোসাল্লা এবং দ্বীনদারের পানীয় বলতে কি বুঝায়? তিনি জবাব দেন, নেককারদের মোসাল্লা হচ্ছে মীযাবের নীচে নামায পড়া এবং দ্বীনদারের পানীয় হচ্ছে যমযমের পানি। (আযরাকী)

হযরত আবুজর গিফারী (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুওতের খবর জানতে পেরে তাঁর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে নিজ গোত্র থেকে মক্কায় রওনা হন। মক্কায় এসে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করলে কাফেররা তাঁকে পাথর মেরে বেহুঁশ করে ফেলে এবং তাঁর সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি যমযমের কাছে গিয়ে পানি দিয়ে রক্ত ধুয়ে ফেললাম এবং যমযমের পানি পান করলাম। হে ভাতিজা (আবদুল্লাহ বিন সামিত) শোন! আমি সেখানে রাসূলুল্লাহর অপেক্ষায় ৩০ দিন বা রাত (অন্য রেওয়ায়েতে ১৪ দিন) অবস্থান করি। কিন্তু সেখানে যমযম ছাড়া আমার আর অন্য কোন খাবার ছিল না। অথচ, আমি মোটাসোটা হয়ে গেলাম এবং পেটের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে গেল। এমনকি আমি পেটে সামান্য ক্ষুধাও অনুভব করলাম না। দীর্ঘ একমাস কা'বার পার্শ্বে ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করার পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) তাঁকে বুঝতে পেরে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে নিয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এতদিন এখানে কি খেয়েছিলে? তিনি জবাব দিলেন, আমি যমযমের পানি পান করা ছাড়া আর কিছুই খাইনি। এতে আমি মোটা হয়ে গেছি এবং আমার পেটের চামড়ার উপর ভাঁজ পড়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন- إِنَّهَا طَعَامُ طَعْمِ এটি ক্ষুধার সময় খাবারের কাজ করে।

সহীহ ইবনে হিব্বানে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন خَيْرٌ مَاءٍ عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ مَاءُ زَمْزَمَ অর্থ : যমীনের উপর সর্বোত্তম পানি হচ্ছে যমযমের পানি।

হযরত আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরীল (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর বুক চিরে হৃদয় বের করে এনে সোনার প্লেটে রাখেন। সেখান থেকে একটি রক্তের চাকা ফেলে দিয়ে বলেন, এটি তোমার মধ্যে শয়তানের একটি অংশ ছিল। তারপর যমযমের পানি দিয়ে ধুয়ে তিনি তা যথাস্থানে রেখে দেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) মাঠে তাঁর অন্য খেলার সাথীদের সাথে খেলাধুলা করছিলেন।

হাফেজ ইরাকী বলেছেন, যমযমের পানি দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বক্ষদেশ ধোয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে তিনি যেন আসমান-যমীন এবং বেহেশত-দোযখ দেখার মত শক্তি লাভ করেন। কেননা, যমযমের পানির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা অন্তরকে শক্তিশালী করে এবং ভয় দূর করে।

যমযমের পানির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, রাসূলুল্লাহ (সা) এর নির্দেশে যমযমের পানি দ্বারা জ্বর দূর হয়েছে। নাসাঈ শরীফে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। দাহ্হাক বিন মোযাহেম বলেন, মাথা-ব্যথার সময় যমযমের পানি পান করলে মাথা-ব্যথা দূর হয় এবং যমযমের দিকে তাকালে দৃষ্টিশক্তি প্রখর হয়।

ইমাম বদরুদ্দিন বিন সাহেব মিসরী বলেছেন, শরীয়াহ এবং চিকিৎসার দৃষ্টিতে, যমযমের পানি পৃথিবীর অন্য যে কোন পানির চাইতে উত্তম। তিনি বলেন, আমি যমযমের পানি এবং মক্কার অন্য কূপের সমপরিমাণ পানি ওজন করে দেখেছি, যমযমের পানির ওজন এক চতুর্থাংশ বেশী।

কথিত আছে যে, শাবানের মাসের রাত্রে যমযমের পানি মিষ্টি হয়ে যায় এবং তা নেককার লোক ছাড়া অন্য কেউ টের পায় না। শেখ আবুল হাসান কারবাজ একবার তা দেখতে পেয়েছেন।

ফাকেহী রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে এক মোরসাল রেওয়ায়েতে (মোরসাল হচ্ছে তাবেঈ রাসূলুল্লাহ (রা) থেকে হাদীস বর্ণনা করা) বলেন, মাকহুল বলেছেন, - النَّظُرُ فِي زَمْزَمَ عِبَادَةُ وَهِيَ تَحُطُ الْخَطَايَا অর্থ: যমযমের প্রতি নজর করা এবাদত। এর ফলে, গুনাহ মাফ হয়।

সাঈদ বিন সালেম উসমান বিন সাজ থেকে, তিনি মোকাতেল থেকে, তিনি দাহ্হাক থেকে এবং তিনি মোযাহেম থেকে বর্ণনা করেন, এমন একদিন আসবে যখন যমযমের পানি নীলনদ এবং ফোরাত নদীর পানি থেকেও অধিকতর মিষ্টি হবে। ২৮১ হিজরীতে আজকের মত যমযমের পানি সেরা মিষ্টি পানিতে পরিণত হয়েছিল।

আল-জামে আল-লতীফে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওয়াহেদী তাঁর তাফসীরে হযরত জাবের থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি কা'বা শরীফে সাত চক্কর তওয়াফ করবে, মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু'রাকাত নামায পড়বে এবং যমযম কূপের পানি পান করবে, তার গুনাহ যত বেশীই হউকনা কেন তা মাফ হয়ে যাবে।

জামে সগীরে আল্লামা মানাওয়ী مَاءُ زَمَزَمَ لِمَاشُرِبَ لَهُ অর্থ : যে যে নিয়তে যমযমের পানি পান করে তার সেই নিয়ত পূরণ হয়। এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, যমযমের উৎপত্তি হয়েছে হযরত ইবরাহীম (আ) এর ছেলে ইসমাঈলের সাহায্যের জন্য। আজও যদি কেউ ইখলাসের সাথে সেই পানি ব্যবহার করে তাহলে সেও আল্লাহর সাহায্য লাভ করবে।

হাকীম তিরমিযী বলেন, যমযমের পানি থেকে উপকার পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করে নিয়তের গভীরতা ও পরিপক্কতার উপর। খালেস নিয়তে ঐ পানি ব্যবহার করলে তার উপকার অবশ্যম্ভাবী।

১৯৮৯ খৃঃ ১ লা মার্চ তারিখে জিদ্দা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ওকাজ পত্রিকা 'যমযমের পানি পান করায় পঙ্গুত্ব সেরে গেছে' এই শিরোনামে খবর দিয়েছে যে, একই সনের ফেব্রুয়ারী মাসে বৃটেনের এক পঙ্গু স্কুলের ৩০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে ২ জন ডাক্তার ও ২ জন সুপারভাইজার মক্কা ও মদীনা যেয়ারতে আসেন। ছাত্র প্রতিনিধিদলে ভারত ও পাকিস্তান বংশোদ্ভূত ৪ জন বৃটিশ পঙ্গু ছাত্র-ছাত্রীও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা প্রথমে মদীনা সফর করেন এবং পরে মক্কায় ওমরাহ আদায় করেন। প্রতিনিধিদলে নয় বছর বয়স্কা রায়হানা আজম নামক এক বালিকার ডান হাতের আঙ্গুল স্থায়ীভাবে পঙ্গু ছিল। ফলে সে তা নাড়াচাড়া করতে পারতনা। হঠাৎ করে দেখা গেল, সে তার আঙ্গুল নাড়াচাড়া করতে পারে এবং তার আঙ্গুলের পঙ্গুত্ব সেরে গেছে। এটা দেখে সবাই আশ্চর্য হয়ে যায়। এর আগে তার পিতা তাকে লণ্ডনের বহু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যায়। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা জানিয়ে দিয়েছিল এ রোগের চিকিৎসা-কিংবা আরোগ্য লাভ সম্ভব নয়। আল্লাহ যমযমের পানির মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে দেন।

একই দিন প্রতিনিধিদলের আরও তিনজন অসুস্থ শিশুর মধ্যেও আরোগ্যের সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়। তাদের মধ্যে রাজিয়া নামক ১০ বছর বয়স্কা একটি মেয়ে বাম চোখে দেখেনা। কিন্তু ২৮শে ফেব্রুয়ারী '৮৯-এর সকাল বেলায় সে বাম চোখে দেখা শুরু করে। আহমদ্দীন নামক অন্য এক শিশুর পা স্থায়ীভাবে পঙ্গু। সে পায়ের উপর ভর দিয়ে চলতে পারেনা। কিন্তু এখন সে পায়ের উপর ভর দিয়ে চলতে পারে। ১২ বছর বয়স্ক ইকরাম ফারুক ছিল বোবা। সে এখন কথা বলতে পারে। এছাড়াও মরক্কোর এক মহিলার পুরো শরীর ক্যান্সারে ছেয়ে যায়। ডাক্তারদের মতে, তা ভাল হবার নয়। মহিলাটি যমযমের পানিকে সর্বশেষ চিকিৎসা বিবেচনা করে স্বামীকে মক্কা আসার জন্য অনুরোধ জানান। স্বামী তাতে সাড়া দেয় এবং তারা মক্কায় এসে ওমরাহ পালন করেন ও যমযমের পানি পান করেন। তাতে মহিলাটির ক্যান্সার ভাল হয়ে যায়।

তাদের আরোগ্য লাভের পর যারা তাদের সাথে সাক্ষাত করতে গিয়েছে, সবাই বলেছে, মজবুত ঈমানের সাথে যমযমের পানি পান করার কারণে আল্লাহ তাদের অসুখ ভাল করে দিয়েছেন।

টিকাঃ
১০. আখবারে মক্কা, আল্লামা আযরাকী।
১১. প্রাগুক্ত।
১২. প্রাগুক্ত।
১৩. প্রাগুক্ত।
১৪. প্রাগুক্ত।
১৫. প্রাগুক্ত।
১৬. প্রাগুক্ত।
১৭. প্রাগুক্ত।
১৮. যমযম, ইয়াহইয়া কোশাক।
১৯. আখবারে মক্কা, আযরাকী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00