📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মক্কার ভৌগোলিক বর্ণনা

📄 মক্কার ভৌগোলিক বর্ণনা


পবিত্র মক্কা ২১.৫০ অক্ষাংশ, ৪০ দ্রাঘিমাংশ এবং সমুদ্রের স্তর থেকে ২৮০ মিটার উপরে অবস্থান করছে। মক্কার আবহাওয়া উষ্ণ। বছরে ৭ মাস প্রচণ্ড গরম থাকে এবং ৫ মাস আবহাওয়া ঠান্ডা থাকে। ঐ ৫ মাসকে মক্কায় শীত মওসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের শীতের মাত্রার চেয়ে তা অনেক কম। তখন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রীর কাছে থাকে। গরম কালে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রী থেকে ৪৮ ডিগ্রী পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

মিসরের দু'জন ভূগোল বিজ্ঞানী গবেষণা করে প্রমাণ করেছেন যে, মক্কা ভূমণ্ডলের মাঝামাঝি অবস্থান করছে। সম্ভবতঃ আল্লাহ তায়ালা বিশ্বের সকল অঞ্চলের মানুষের কাছে এর দূরত্বের ব্যবধান সমান করতে চেয়েছেন। অপরদিকে, আল্লাহর কুদরতে প্রথমে নতুন চাঁদ মক্কার নিকটবর্তী অঞ্চলের আকাশে দেখা যায়। তারপরের দিন মক্কার পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলোতে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হয়। যেমন, একদিন পর লণ্ডন ও বাংলাদেশে নতুন চাঁদ দেখা যায়। এর দ্বারা মক্কা ভূমণ্ডলের কেন্দ্রবিন্দু বলে মনে হয়।

হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আল্লাহ মক্কাকে মহান ও সম্মানিত করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি যমীন সৃষ্টির ১ হাজার বছর আগে মক্কা সৃষ্টি করে ফেরেশতাদেরকে দিয়ে তা ঘেরাও করে রেখেছিলেন। তারপর মদীনা ও বায়তুল মাকদেস সৃষ্টি করে ঐ দুটোকে মক্কার সাথে যুক্ত করে দেন। তারও ১ হাজার বছর পর তিনি সমগ্র যমীন একসাথে সৃষ্টি করেন।

পবিত্র মক্কা নগরী পাহাড়-পর্বতে ভরা। যেদিকেই দৃষ্টি যায় সেদিকেই শুধু পাহাড় আর পাহাড়। সে পাহাড়গুলো কঠিন পাথর দ্বারা গঠিত। তাতে বালুর নাম নিশানাও নেই, নেই কোন গাছপালা। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে, মাঝে মাঝে কিছু ছোট গাছ ও ঘাস দেখা যায়। এটা হচ্ছে পরিপূর্ণ মরুভূমি। এখানে কোন পুকুর ও নদীনালা নেই। মাটির নীচে, অদূরেই পানির স্তর রয়েছে। যমীন খুবই উর্বর। পানি সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ করলে যথেষ্ট ফসল উৎপাদন হয়। বর্তমানে মক্কায় কিছু চাষাবাদ শুরু হয়েছে এবং ভাল ফলন পাওয়া যাচ্ছে। ভূতত্ববিদদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় যে, আজকের বিশাল মরু মক্কা পূর্বে ইতিহাসের কোন এক অজ্ঞাত সময়ে, সবুজ শ্যামল এবং জনবসতিপূর্ণ ছিল। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত বায়ুর কারণে এখানকার আবহাওয়া আর্দ্র ছিল। মক্কার উঁচু পাহাড়সমূহে বৃষ্টি বর্ষিত হত এবং নীচু উপত্যকাসমূহ দিয়ে স্রোত প্রবাহিত হত। ফলে এখানকার মাটি সেই পানিতে সিক্ত হত এবং এখানে ফসলাদি উৎপন্ন হত। আজকে মক্কার মাটির নীচে, অদূরেই পানির যে স্তর রয়েছে তাও সে কথার প্রমাণ বহন করে। রাস্তা মেরামতের জন্য সমান্য খনন কাজ করলেই নীচে পানি আর পানি দেখতে পাওয়া যায়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক তকীউদ্দিন আলফাসী তার 'শেফাউল গারাম' বইতে ৩য় হিজরী শতকের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আলফাকেহীর বরাত দিয়ে লিখেছেন যে, ইবনে ইসহাক বলেছেন, হেজায অঞ্চল আল্লাহর নেয়ামতে ভরা এবং সেখানে অধিক পানির সমারোহ। ভূতত্ববিদগণ বলেছেন, ক্রমান্বয়ে প্রাকৃতিক খরার কারণে, শত শত বছর ধরে, তা কঠোর মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে এবং প্রবাহিত নদী-নালা থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

জাহেলিয়াতের যুগে যে সকল মরুদ্যানের অস্তিত্বের কথা বর্ণিত আছে, আজকে তার অধিকাংশই বিলুপ্ত। মদীনার ইহুদীরা, তায়েফের সাকিফ গোত্র এবং মক্কার কোরাইশরা যে সকল মরুদ্যানে চাষাবাদ করত আজ আর সেগুলো নেই। অনেক কূপ শুকিয়ে গেছে এবং মদীনা, তায়েফ ও ওয়াদী ইবরাহীমে প্রবাহিত বন্যার সংখ্যাও অনেক হ্রাস পেয়েছে। ভূতত্ববিদদের মতে, মক্কার খরা ও উষ্ণতা বর্তমানের চাইতে ভবিষ্যতে আরো তীব্র হবে এবং এখানকার ভবিষ্যত নাগরিকেরা এই প্রচণ্ড উষ্ণতার শিকার হবে। মক্কা ও আরবদ্বীপের বিভিন্ন শহরে বসবাসকারীরা ভাল করেই জানে যে মক্কার অতীতের পানি ও উর্বরতা বর্তমানের চাইতে পরিমাণগত দিক থেকে অনেক বেশী ছিল। অতীতের ফল-ফলাদি ও সবজির বাগান মক্কার চতুর্দিকে বিরাট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। দীর্ঘদিনের কঠোর খরা ও রৌদ্রের কারণে আজ তার কোন চিহ্নও অবশিষ্ট নেই।

মক্কা শরীফ বলতে, কাবা শরীফ যে জায়গায় অবস্থিত সে জায়গাসহ পুরো শহর তথা 'হুদুদে হারাম' বা হারাম এলাকার সীমান্তের ভেতরকার সকল এলাকাকে বুঝায়। অবশ্য আজকাল জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে হুদুদে হারামের বাইরেও মক্কা শহরের সম্প্রসারণ হয়েছে।

কাবা শরীফ যে জায়গায় অবস্থিত সেটিকে ইসলামী সাহিত্যে 'মক্কা উপত্যকা' কিংবা 'ইবরাহীম উপত্যকা' বলা হয়। এই উপত্যকাটি সুদূর আরাফাত থেকে শুরু হয়েছে এবং মুযদালিফা হয়ে মিনায় এসে সরু হয়ে গেছে। পুনরায় তা বর্তমান শিশা, মায়াবদা (সাবেক বাতহা) ও হুজুন হয়ে কাবা শরীফের দিকে ঢালু হয়ে আরো সামনের দিকে প্রসারিত হয়ে মেসফালা ও কুদাই হয়ে নীচের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। দুই পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত এই দীর্ঘ উপত্যকাটি, কাবা শরীফের কাছে এসে 'মক্কা উপত্যকা' বা 'ইবরাহীম উপত্যকা' নামে পরিচিত হয়েছে। অবশ্য আরাফাত, মিনা ও মুযদালাফার পাহাড়ে বর্ষিত বৃষ্টির পানি আরাফাত থেকে দক্ষিণ দিকে নীচু ভূমির দিকে গড়ায়। নোমান উপত্যকা, বাতহা, হুজুন ও ইবরাহীম উপত্যকার দুই পার্শ্বে অবস্থিত পাহাড়ের বৃষ্টির পানি ইবরাহীম উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত হয়। পূর্বে অতিরিক্ত বর্ষণের ফলে কাবা শরীফের পাশ দিয়ে প্রবাহিত স্রোতে স্বয়ং আল্লাহর ঘর বাইতুল্লাহ কয়েক দফা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবশ্য বর্তমানে মাটির নীচ দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ড্রেন করা হয়েছে এবং ইতিহাসে বর্ণিত মক্কার ভয়াবহ বন্যার মত কোন বন্যা দীর্ঘদিন যাবত হয়নি বলে সাম্প্রতিককালে আমরা ঐ জাতীয় বন্যার কোন ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানতে পারিনি। মক্কার হুজুন ও বাতহার দিকের অংশকে মক্কার উঁচু দিক এবং মেসফালার দিককে নীচু দিক বলা হয়। হিজরী ১৭ সালে হযরত উমর (রা) এর যুগে পাহাড়ের বৃষ্টির পানি দ্বারা মক্কার উঁচুদিক থেকে এক ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয় যা মাকামে ইবরাহীমকে স্থানচ্যুত করে ভাসিয়ে নেয়। সেই বন্যায় উম্মে নাহশাল বিনতে ওবাইদা বিন সাঈদ বিন আল-আস বিন উমাইয়া বিন আবদে শামস মারা যায়। তার নামানুসারে ঐ বন্যাকে 'উম্মে নাহশাল বন্যা' বলা হয়। এ ছাড়াও পরবর্তীতে আরো অনেক বন্যা হয়েছে। মসজিদে হারামে মোট ৩২ বার বন্যা হয়েছে। ১ম বন্যা হয়েছে ১৭ হিজরীতে, হযরত উমর (রা) এর শাসনামলে। আর সর্বশেষ বন্যা হয়েছে ১৩৯৪ হিজরীতে। প্রত্যেক বন্যার সময় মসজিদে হারামে পানি ও বালু-ময়লা প্রবেশ করে। কোন কোন বন্যায় কাবার ভেতরেও পানি প্রবেশ করেছে। এতে মুসল্লীদের নামায আদায়ে অসুবিধার সৃষ্টি হয়।

টিকাঃ
১. তারিখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী।
২. এখানে সেন্টিগ্রেডকে তাপমাত্রার একক ধরা হয়েছে।
৩. ওমদাতুল আখবার ফী মাদীনাতিল মোখতার, প্রকাশক: সাইয়েদ আসয়াদ দারাবযোনী।
৪. তারীখে মক্কা, আহমদ আস-সিবায়ী।
৫. তারীখ ইমারাতুল মসজিদিল হারাম, হোসাইন আবদুল্লাহ বাসালামা।
৬. যমযম, ইয়াহইয়া কোশাক।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মক্কা শহরের উল্লেখযোগ্য স্থানসমূহ

📄 মক্কা শহরের উল্লেখযোগ্য স্থানসমূহ


১. মসজিদে হারাম থেকে পূর্বদিকে: কাসাসিয়া (একে গাসাসিয়াও বলে), সুকুল লাইল, তায়েফ রোড, মিনা।
২. মসজিদে হারাম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে: আযিযিয়াহ, মুযদালিফাহ, আরাফাত, তায়েফ রোড।
৩. মসজিদে হারাম থেকে উত্তর-পূর্ব কোণে: শেবে আমের, মাআবদাহ, ফয়সলিয়াহ, জাবালে নূর বা হেরা পাহাড়।
৪. মসজিদে হারাম থেকে উত্তরে: শামিয়াহ, কারারাহ, আল-নাকা, সোলায়মানিয়া, হুজুন, জুমেজাহ, ওতায়বিয়াহ, ওয়াদী জলীল।
৫. মসজিদে হারাম থেকে উত্তর-পশ্চিম কোণে: জারওয়াল যাহের, তানঈম, যাহরাহ, নোযহা, রাবেতা আলমে ইসলামীর দফতর।
৬. মসজিদে হারাম থেকে পশ্চিমে: শোবেকা, হাররাতুল বাব, হিন্দাওইয়াহ।
৭. মসজিদে হারাম থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে: তান্দুবাই, রোসাইফা।
৮. মসজিদে হারাম থেকে দক্ষিণে: মেসফালাহ, জিয়াদ, জাবালে সাওর (সাওর গুহা)।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মক্কার বিভিন্ন নাম

📄 মক্কার বিভিন্ন নাম


পবিত্র মক্কা নগরীর অনেকগুলো নাম রয়েছে এবং সেগুলোর নামকরণেরও বিভিন্ন কারণ আছে। প্রধানতঃ এই শহরের দুটো নাম বেশী প্রসিদ্ধ। সেগুলো হচ্ছে: ১. মক্কা ও ২. বাক্কা। এখন আমরা এর বিভিন্ন নামকরণের উপর আলোচনা করবো।

১. মক্কা নামকরণের কারণ সম্পর্কে কতগুলো মতভেদ রয়েছে। মতভেদগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ:
(১) মক্কা শব্দের অর্থ দূর করা। এই শহর জালেম ক্ষমতাধরদের শৌর্য-বীর্যকে দূর করে দেয়। তাই এটাকে মক্কা বলা হয়।
(২) এই শহর পাপী ও ফাসেকদেরকে বের করে দেয় বলে একে মক্কা বলা হয়।
(৩) হাড়ের ভেতর থেকে মগজ বের করার মতই এই শহর তার অধিবাসীদেরকে কঠোর ও হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমী করে গড়ে তোলে।
(৪) এই শহর মানুষকে আকৃষ্ট করে। বাছুর যখন মায়ের স্তন চুষে সব দুধ পান করে শেষ করে ফেলে তখন উপরোক্ত কথা বলা হয়। মক্কাও মানুষকে তার দিকে মাতৃসুলভ আকর্ষণ করে।
(৫) পানির স্বল্পতার জন্য এই শহরকে মক্কা বলা হয়। কেননা, মক্কার এক অর্থ হচ্ছে স্বল্পতা।
(৬) এই শহর গুনাহ দূর করে বলে একে মক্কা বলা হয়।

২. এই শহরের ২য় নাম হল বাক্কা (بَكَّةُ)। এই শব্দের অর্থ হল ঠোঁকরানো বা আঘাত করা। এই শহর জালেম শক্তিধরদের ঘাড়ে আঘাত করে অথবা এই শহরে লোকদের ভিড় হয়। এই কারণে একে বাক্কা বলা হয়। এ দুটো হচ্ছে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের মত। ইমাম তিরমিজীর মতে, এই শহর অহংকারীদের দাপট চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয় বলে একে বাক্কা বলা হয়।
শহরের নাম দুটো পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত দুটো আয়াত থেকে এসেছে-
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبْرَكًا وَهُدًى لِّلْعَلَمِينَ . (العمران - ٩٦)
অর্থ: মানুষের এবাদতের জন্য প্রথম যে ঘরটি বাক্কায় বানানো হয়েছে তা বরকতময় এবং গোটা বিশ্ববাসীর জন্য পথ প্রদর্শনের প্রতীক স্বরূপ। এখানে মক্কা শহরকে বাক্কা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيهِمْ عَنْكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنِ مَكَّةَ - (الفتح - ٢٤)
অর্থ: 'তিনি সে সত্তা যিনি মক্কার উপকন্ঠে তোমাদের উপর থেকে তাদের হাতকে এবং তোমাদের হাতকেও তাদের উপর থেকে দূরে রেখেছেন।' এই আয়াতে সরাসরি মক্কা শব্দের উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়াও এই পবিত্র নগরীর আরো কয়েকটি নাম রয়েছে।

৩. এর মধ্যে একটি হলো উম্মুল কোরা (أمُّ الْقُرَى)। আল্লাহ কুরআন পাকে বলেছেন-
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرَأْنَا عَرَبِيًّا لِتُنْذِرَ أُمَّ الْقُرَى - (الشورى - ٧)
অর্থ: 'হে নবী, আমি আপনার নিকট আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করেছি যেন আপনি উম্মুল কোরার অধিবাসীদেরকে আল্লাহর ভয় দেখান।' আরবীতে أُمُّ শব্দের অর্থ হচ্ছে মা বা কোন কিছুর মূল। الْقُرَى শব্দের অর্থ হচ্ছে গ্রামসমূহ বা জনপদসমূহ। أم القرى এর অর্থ হল গ্রামসমূহের মা বা মূল। মক্কাকে কেন উম্মুল কোরা বলা হয় এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, আল্লাহ যমীনকে প্রথম এখান থেকেই সৃষ্টি করেন। এটা হযরত ইবনে আব্বাসের মত। পৃথিবী সৃষ্টির আগে সবকিছু ছিল পানি। আল্লাহ যখন মাটি সৃষ্টি করেন তখন পানির উপর কাবা শরীফের ভিটিটুকু প্রথমে ভেসে উঠে। তাই এটাকে গোটা পৃথিবীর মূল ভূখণ্ড বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- 'আল্লাহ মক্কা থেকেই প্রথমে জমীনকে বিন্যস্ত করেছেন এবং তার নিম্নভাগ থেকেই ভূমণ্ডলকে সম্প্রসারিত করেছেন। তাই এর নামকরণ করা হয়েছে 'উম্মুল কোরা' সকল জনপদের মূল।' পৃথিবীর সর্বপ্রথম পাহাড় আবু কোবায়েস পাহাড়।
কারো কারো মতে, এই গ্রাম বা জনপদটি অত্যন্ত মর্যাদাবান। তাই এটাকে 'উম্মুল কোরা' বলা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এখানে যেহেতু আল্লাহর ঘর রয়েছে সেজন্য এটাকে 'উম্মুল কোরা' বলে। কেননা বাদশাহর শহর অন্য যে কোন শহরের চাইতে মর্যাদাবান বলে এ রকম বলার প্রথা চালু আছে। কেউ বলেছেন, এই শহরে যেহেতু কাবা বা কিবলা রয়েছে এবং সকল মানুষ নামাযে কিবলামুখী হয়ে নামায পড়ে এজন্য এটাকে أم القرى বলা হয়েছে।

৪. এই শহরের আরেকটি নাম হল আল কারইয়া (الْقَرْيَةُ)। মুজাহিদ তাঁর তাফসীরে বলেছেন,
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيْهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّنْ كُلِّ مُكَانٍ - (النحل - ۱۱۷)
এই আয়াতে قَرْيَةُ বলতে মক্কা শহরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থঃ “আল্লাহ এমন একটি গ্রাম বা জনপদের উদাহরণ পেশ করছেন যা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও প্রশান্ত। প্রত্যেক জায়গা থেকে এখানে অফুরন্ত রিযক আসে।” মূলতঃ الْقَرْيَةُ হচ্ছে যেখানে অনেক লোকের সমাবেশ ঘটে। আরবীতে কূপে পানি জমা করাকে বলা হয় قَرَيْتَ الْمَاءَ فِي الْحَوْضِ তুমি কূপে পানি জমা করেছ।'

৫. এর অন্য আরেকটি নাম হল : আল বালাদ (الْبَلَدُ)। আল্লাহ বলেছেন-
لا أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ - (البلد - ١)
অর্থঃ "না..., আমি এই শহরের শপথ করে বলছি।" হযরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, الْبَلَدُ বলতে আল্লাহ এখানে মক্কা শহরকে বুঝিয়েছেন। ফাকেহী লিখেছেন যে, ইবনে আব্বাস বলেছেন, আমার কাছে এর এই অর্থ রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট থেকেই পৌঁছেছে।

৬. কুরআন মজিদে মক্কা শহরকে 'বালাদে আমীন' বলা হয়েছে।
وَالتَّيْنِ وَالزَّيْتُونِ وَطُورِ سِينِينَ وَهُذَا الْبَلَدِ الْأَمِينِ - (التين)
অর্থ : “ডুমুর, যয়তুন, সিনাই পাহাড় ও নিরাপদ নগরীর শপথ।” আল ফাকেহী জায়েদ বিন আসলামের সূত্রে হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, বালাদে আমীন বলতে এখানে মক্কা শহরকে বুঝানো হয়েছে।

৭. এই শহরের অপর একটি নাম হচ্ছে ‘বালদাহ’। আল্লাহ কুরআন মজীদে এরশাদ করেছেন-
إِنَّمَا أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ رَبِّ هَذِهِ الْبَلْدَة
অর্থ : “এই শহরের রব এর এবাদত করার জন্য আমাকে হুকুম দেয়া হয়েছে।” এখানে বালদাহ বলতে মক্কা শহরকে বুঝানো হয়েছে।

৮. এই শহরের আরেকটি নাম হল ‘মাআদ’। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,
إِنَّ الَّذِي فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لَرَادُّكَ إِلَى مَعَادٍ - (القصص: ৮৫)
‘যে আল্লাহ আপনার উপর কুরআন ফরজ করেছেন তিনিই আপনাকে মাআদে ফিরিয়ে নেবেন।’ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, এখানে মা’আদ শব্দের অর্থ হচ্ছে মক্কা।

এতক্ষণ আমরা কুরআনে বর্ণিত মক্কার মোট ৮টি নাম নিয়ে আলোচনা করলাম। সেগুলো হচ্ছে মক্কা, বাক্কা, উম্মুল কোরা, আল কারইয়া, আল বালাদ, আল বালাদুল আমীন, আল বালদাহ ও মা’য়াদ। এছাড়াও মক্কার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আযরাকী এই শহরের আরেকটি নামের কথা উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো أَلْبَيْتُ الْعَتِيقُ। কেউ কেউ এই শহরের নাম الْمَسْجِدُ الْحَرَامُ উল্লেখ করেছেন। কারো কারো মতে বাক্কা ও মক্কার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাঁরা বলেছেন, বাক্কা শব্দের অর্থ হল কা’বা শরীফের স্থানটুকু এবং মক্কা হচ্ছে গোটা শহরটির নাম। অন্যরা বলেছেন বাক্কা কা’বার স্থান, কিন্তু মক্কা বলতে বুঝায় পুরো হারাম এলাকা।

৯. ওয়াদী, মানে উপত্যকা : কোরআনে আছে-
رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ
‘হে আমাদের রব, তোমার পবিত্র ঘরের কাছে এমন এক উপত্যকায় আমার সন্তানের বসতি স্থাপন করেছি যা কৃষির অনুপযোগী।’ (সূরা ইবরাহীম-৩৭)
মুসলমানদের কাছে মক্কা ও কাবা শরীফের মর্যাদা অনেক বেশী বলেই এর নামকরণ নিয়ে সবাই বেশী আগ্রহ প্রদর্শন করেছেন এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পৃথিবীর অন্য কোন শহরের নাম ও নামকরণ সম্পর্কে এতে বেশী আলোচনা দেখতে পাওয়া যায় না।

টিকাঃ
৭. আল একদুস সামীন ফী তারীখিল বালাদীন আমীন, তকীউদ্দীন আল-ফাসী।
৮. প্রাগুক্ত।
৯. তারিখ আর-রুসুল ওয়াল মুলুক, ইবনে জারীর আত-তাবারী, ১ম খন্ড।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মক্কা শরীফের মর্যাদা

📄 মক্কা শরীফের মর্যাদা


মক্কা শরীফের অনেক ফযীলত আছে। নাসায়ী, তিরমিযী ও ইবনে মাজা আবদুল্লাহ বিন আদী বিন হামরা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে মক্কায় সওয়ারীর উপর আরোহন করা অবস্থায় মক্কাকে লক্ষ্য করে বলতে শুনেছি, "আল্লাহর শপথ, তুমি আল্লাহর যমীনের মধ্যে আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ; যদি আমাকে তোমার কাছ থেকে বের করে দেয়া না হত, তাহলে আমি কিছুতেই বের হতাম না।” ইমাম তিরমিযী এই হাদীসকে হাসান বা উত্তম বলেছেন। হাদীসটি হচ্ছে এই:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَدِي بْنِ الْحَمْرَاءِ الزُّهْرِى أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ وَاقِفُ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِمَكَّةَ يَقُولُ لِمَكَّةَ : وَاللَّهِ إِنَّكَ لَخَيْرُ أَرْضِ اللَّهِ إِلِى اللَّهِ وَلَوْلَا أَنِّي أَخْرَجْتُ مِنْكِ مَا خَرَجْتَ - قال الترمذى هذا حديث حسن صحيح .

নাসায়ী শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি হল:
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِى سُوقِ الْحَزْوَرَةِ : يَا مَكَّةُ وَاللَّهِ إِنَّكِ لَخَيْرُ أَرْضِ اللَّهِ وَأَحَبُّ الْبِلَادِ إِلَى اللَّهِ وَلَوْ لَا قَوْمُكِ أَخْرَجُونِي مِنْكِ مَا سَكَنْتُ غَيْرَكَ .
অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সা) হাযওয়ারা নামক বাজারে বলেছিলেন, 'হে মক্কা, আল্লাহর শপথ, তুমি আল্লাহর উত্তম যমীন এবং আল্লাহর প্রিয় শহর; যদি তোমার কওম আমাকে তোমার কাছ থেকে বিতাড়িত না করত, তাহলে আমি কখনও অন্যত্র বাস করতাম না।' ইবনে আসীর বলেছেন, হাযওয়ারা মক্কার একটি জায়গার নাম। এই জায়গাটি বাবে ইবরাহীমের পশ্চিমে, সাবেক সোকে সগীরে অবস্থিত। এটি বর্তমানে মসজিদে হারামের নতুন সম্প্রসারণের অন্তর্ভুক্ত।

ইমাম তিরমিযী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হল:
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِمَكَّةَ : مَا أَطْيَبَكِ وَلَوْ لَا قَوْمُكِ أَخْرَجُونِي مِنْكِ مَا سَكَنْتُ غَيْرَكِ . وَأَحَبَّكِ لِي ، وَلَوْ لَا
অর্থ: 'তুমি, মক্কা, কতইনা ভাল এবং আমার নিকট কতইনা প্রিয়! যদি তোমার লোকেরা আমাকে বের করে না দিত, তাহলে আমি তোমার থেকে দূরে অন্য কোথাও বাস করতাম না।' বর্ণিত হাদীসসমূহের আলোচনা দ্বারা মক্কা শরীফের সম্মান ও মর্যাদা বুঝা গেল। তবে এই নিরাপদ নগরীর সবচাইতে বড় মর্যাদা মসজিদে হারামের অস্তিত্বের কারণেই হয়েছে। আল্লাহ পাক কুরআন মজীদে এরশাদ করেছেন,
جَعَلَ اللَّهُ الْكَعْبَةَ الْبَيْتَ الْحَرَامَ قِيمًا لِّلنَّاس - (المائدة ٩٨)
অর্থ : 'আল্লাহ কাবা শরীফকে সম্মানিত ঘর এবং মানুষের টিকে থাকার কারণ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।'

বাইতুল হারামের এই সম্মানিত এলাকা বলতে হারাম সীমান্তের ভেতরের সকল এলাকাকে বুঝায়। হারাম এলাকার চারদিকের সীমান্তের মধ্যে স্তম্ভ নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। আল্লাহ গোটা হারাম এলাকার মর্যাদা কাবা শরীফের মর্যাদার অনুরূপ করে দিয়েছেন। এতে করে কাবা শরীফের সম্মান বাড়ানোই আল্লাহর উদ্দেশ্য। শরীয়তের বিধি-নিষেধ উভয় জায়গার জন্যই সমান করে দেয়া হয়েছে।

ইমাম যুহরী বলেছেন, হারাম এলাকার সীমানা সর্বপ্রথম হযরত ইবরাহীম (আ) নিজেই নির্ধারণ করেন। হযরত জিবরাঈল (আ) এর নির্দেশক্রমেই তিনি সীমানা চিহ্নিতকরণের কাজ শেষ করেন। তারপর কুসাই বিন কিলাব তা পুনঃনির্মাণ করেন। এরপর মক্কা বিজয়ের বছর, রাসূলুল্লাহ (সা) তামীম বিন উসাইদ আল খোযায়ীকে তা পুনঃনির্মাণের জন্য পাঠান। তিনি সেগুলোর পুনঃসংস্কার করেন। এভাবেই শত বছর ধরে حُدُوْدُ حَرَمْ বা হারাম শরীফের সীমানার হেফাজত করা হচ্ছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00