📘 মজার গল্প > 📄 হযরত লোকমানের নসীহত

📄 হযরত লোকমানের নসীহত


আমরা অনেক জ্ঞানীর কথা জানি। জ্ঞানবান ও বুদ্ধিমান লোকেরা তাঁদের জ্ঞান ও বুদ্ধির সাহায্যে অনেক অসাধ্য সাধন করেছেন। তাঁরা বড় বড় বই লিখেছেন। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার করেছেন। নানা ধরনের মেশিন-কলকব্জা তাঁদের দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ। বেতার, টেলিভিশন, বিজলী, রেলগাড়ি, উড়োজাহাজ, নৌযান ইত্যাদি তৈরি করে তাঁরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁদের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার কথা অস্বীকার করবে দুনিয়ায় এমন একজন লোকও নেই।

কিন্তু যাঁরা বুদ্ধি খাটিয়ে বড় বড় মেশিন তৈরি করেছেন এবং সেগুলোকে কাজে লাগাবার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন তাঁরা যদি এই এত বড় বিশ্ব জাহানের সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও পরিচালককে চিনতে না পারেন, দুনিয়ায় ও আকাশে তাঁর কর্মকুশলতা দেখতে না পান, তাহলে তাঁদের বুদ্ধিকে আমরা কি বলে অভিহিত করবো? তাঁরা কি সত্যি বুদ্ধিকে ঠিক মত ব্যবহার করছেন? তাঁরা এত কথা চিন্তা করেন, এত বড় বড় জিনিস আবিষ্কার করেন কিন্তু একবারও ভেবে দেখেন না তাঁরা নিজেরা কোথা থেকে এসেছেন? কেন এসেছেন? এ বিশ্ব জাহান কে সৃষ্টি করেছেন? তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্ক কি?

হযরত লোকমান ছিলেন একজন বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী পুরুষ। আল্লাহ তাঁকে সত্যকে জানার জ্ঞান দিয়েছিলেন। মানুষের মধ্যে সেই বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী যে তার সৃষ্টিকর্তা ও প্রকৃত মালিক আল্লাহকে চিনতে পারে। হযরত লোকমান তাঁর সৃষ্টিকর্তা ও মালিক আল্লাহকে চিনতেন। তিনি জানতেন বিশ্ব জগতের সমস্ত জিনিস কে তৈরি করেছেন। কে তিনি যিনি মানুষকে এ অপার নেয়ামত দান করেছেন। আবার তিনি এই দয়াময় মহান প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা কিভাবে প্রকাশ করতে হয় তাও জানতেন।

হযরত লোকমান ছিলেন বড়ই নেকবখত ও আল্লাহর প্রিয় বান্দা। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাঁর কথা বলেছেন। অনেকে তো এমন কথাও বলেছেন যে, হযরত লোকমান ছিলেন আল্লাহর নবী এবং হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের আত্মীয়। আবার অনেকে বলেন, তিনি আল্লাহর নবী নন তবে তাঁর সময়ের অনেক বড় জ্ঞানী, পণ্ডিত ও সৎ লোক। সে যাই হোক তিনি নবী না হলেও ছিলেন তো একজন মস্ত বড় বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ও সৎ লোক। আল্লাহ নিজেই বলেছেন: আমি লোকমানকে দিয়েছিলাম জ্ঞান। উদ্দেশ্য ছিল, এর সাহায্যে সে আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।

জ্ঞান আল্লাহর একটি নেয়ামত। এ নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের একটাই পদ্ধতি। যেহেতু এ নেয়ামত আল্লাহ দান করেছেন তাই এজন্যে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হলে তার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে এই যে, তাঁর নেয়ামত এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না যাতে তিনি নারাজ হন। তিনি যে সব নেয়ামত দান করেছেন সেগুলো তাঁর দেয়া নিয়ম অনুযায়ী তাঁর হুকুমমতো এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্যে ব্যবহার করতে হবে। সাধারণত আমরা কারোর কোনো দানের বিনিময়ে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। এতে তার কিছু লাভও হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর নেয়ামতের জন্যে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তাতে আমাদেরই লাভ হয়, আল্লাহর কোনো লাভ হয় না। আল্লাহর সত্তা এ ধরনের কোনো লাভ ও লোকসানের অনেক ঊর্ধ্বে।

সন্তানও আল্লাহর একটি নেয়ামত। এ নেয়ামতের জন্যে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মানুষের অবশ্য কর্তব্য। আর স্বাভাবিকভাবেই এ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পদ্ধতি হবে এই যে, মানুষ তার সন্তানকে এমনভাবে লালন পালন করবে যার ফলে সে বড় হয়ে আল্লাহর একান্ত অনুগত বান্দায় পরিণত হয়। সে হয় একজন সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ। হযরত লোকমানকেও আল্লাহ সন্তান দান করেছিলেন। তিনি এ নেয়ামতের জন্যে কিভাবে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন কুরআনে তা বর্ণনা করা হয়েছে।

হযরত লোকমান প্রথমেই অত্যন্ত স্নেহ ও মমতা সহকারে তাঁর ছেলেকে বললেনঃ হে আমার প্রিয় পুত্র! আমার, তোমার এবং এ সমগ্র বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও প্রভু যে আল্লাহ তাঁর কোনো শরীক, সাথী ও সহযোগী নেই। তিনি একা। তাঁর মতো বা তাঁর সমান কেউ নেই। তাঁর কোনো পিতা নেই এবং তিনিও কারোর পিতা নন। তিনি এমন সব গুণের অধিকারী যা আর কারোর নেই। যেমন, তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সব কিছু দেখতে পান। এটা অন্য কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি যেমন সব কিছু শুনতে পান অন্য কারোর সে ক্ষমতা নেই। মনের গোপন চিন্তা, গোপন কথা ও গোপন অভিসন্ধি একমাত্র তিনিই জানতে পারেন, অন্য কেউ এর কোনো কল্পনাই করতে পারে না।

তাঁর অধিকারেও কেউ তাঁর শরীক নেই। মানুষ তাঁর সামনে হাত বেঁধে দাঁড়াবে এবং তাঁর বন্দেগী করবে, এটা তাঁর অধিকার। তাঁর অধিকার হচ্ছে, মানুষ তাঁর হুকুম মেনে চলবে এবং তাঁর কাছে নজরানা ও মানত পেশ করবে। হুকুম দেয়া ও দুনিয়ায় মানুষের চলার জন্যে আইন রচনা করা তাঁর অধিকার। এসব অধিকার ভোগ করার মতো তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো সত্তা নেই।

ক্ষমতায়ও আল্লাহর সাথে কেউ শরীক নেই। জীবন-মৃত্যু তাঁর হাতে। মানুষের প্রার্থনা, আবেদন-নিবেদন ও ফরিয়াদ তিনি শোনেন। ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি সব তাঁর আয়ত্তে রয়েছে। তিনিই কাউকে সফলতা দান করেন আবার কাউকে ব্যর্থ করে দেন। এ ক্ষমতার ছিটেফোঁটাও অন্য কারোর আয়ত্তে নেই।

হযরত লোকমান বলেনঃ হে আমার প্রিয় পুত্র! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করাই হচ্ছে এ দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় জুলুম। মানুষের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে তার নিজের ও এ বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তাকে জানতে ও চিনতে হবে এবং তাঁর হুকুম মেনে চলতে হবে।

আল্লাহর হুকুম মানা ও তাঁর বন্দেগীর পর মানুষের জন্যে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাপ-মায়ের অধিকার। আল্লাহর অধিকারের পর মানুষের জন্যে বাপ-মায়ের অধিকারের চাইতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো জিনিস নেই। কুরআন মজীদে হযরত লোকমানের নসীহতের আলোচনার মাঝখানে আল্লাহ বাপ-মায়ের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন: “মানুষকে তার বাপ-মায়ের অধিকারের প্রতি নজর রাখার জন্যে আমি কঠোরভাবে তাকিদ করেছি। কেমন বিপদ মাথায় নিয়ে তার মা তাকে লালন পালন করেছে। কতদিন পর্যন্ত সে তাকে নিজের পেটের মধ্যে রেখেছে এবং বিপদের পর বিপদের মুখোমুখি হয়ে নির্দিষ্ট সময়কাল পূর্ণ করেছে। তারপর দু'বছর পর্যন্ত দুধ পান করিয়েছে।"

হযরত লোকমানের নসীহতের মাঝখানে আল্লাহ আরো কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে উপদেশ দেন। তারপর আবার হযরত লোকমানের নসীহত শুরু হয়ে যায়। এ পর্যায়ে তিনি বলেন: "হে আমার প্রিয় পুত্র! আল্লাহর জ্ঞান বড়ই সুদূর প্রসারী। যদি কোনো জিনিস হয় সরিষার দানার সমান এবং লুকিয়ে থাকে কোনো কঠিন পাথরের বুকে অথবা সুদূর মহাশূন্যে আকাশের নীলিমায় কোথাও তা উড়ে চলে যায় কিংবা মাটির বুকে কোথাও তাকে প্রোথিত রাখা হয়, তাহলে তা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে যেতে পারে না। আল্লাহ যখনই চাইবেন তাকে নিজের সামনে হাজির করতে পারবেন। তাঁর জ্ঞান বড়ই ব্যাপক ও বিস্তৃত। তিনি সব খবর রাখেন, সব কিছু দেখেন, সব কিছু শোনেন এবং সব জিনিস খুব ভালোভাবে জানেন।"

আল্লাহর এ গুণাবলীকে হযরত লোকমান এজন্যে পরিষ্কার করে তাঁর ছেলের সামনে তুলে ধরেন যে, এগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে আল্লাহর মূল সত্তা সম্পর্কেও সঠিক ধারণা সৃষ্টি হবে না। ফলে আল্লাহর প্রতি ঈমান পূর্ণতা লাভ করবে না।

আল্লাহর গুণাবলীর কথা ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়ার পর এবার হযরত লোকমান তাঁর ছেলেকে বলেছেন নামায পড়ার জন্যে। তিনি বলেন: “হে আমার প্রিয় পুত্র! তুমি নামায কায়েম করো।" নামায এমন একটি কাজ যা মানুষকে আল্লাহর পথে প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারে। আল্লাহকে জানা, তাঁকে চিনে নেয়া এবং তাঁর গুণাবলীর প্রতি ঈমান আনার পর জীবনকে তাঁর হুকুমের ছাঁচে ঢেলে সাজাতে হলে নামায কায়েম করার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। যদি দুনিয়ায় ও আখেরাতে সফলকাম হতে হয় তাহলে নামায কায়েম করা ছাড়া দ্বিতীয় আর কোনো পথ নেই।

নামায কায়েম করা ও নামায পড়ার মধ্যে একটা পার্থক্য অবশ্যই আছে। নামায কায়েম করা মানে হচ্ছে, নামায পড়ার জন্যে যত রকম নিয়ম কানুন আছে সব ঠিকমতো ও ভালোভাবে মেনে চলা। যেমন পাক-পবিত্রতা, সময়ের প্রতি নজর রাখা, জামায়াতের সাথে নিষ্ঠা, মনোযোগ ও বিনয়-নম্রতা সহকারে নামায পড়া। জেনে বুঝে এমন কোনো কাজ না করা যাতে নামাযে কোনো ত্রুটি দেখা দেয়।

শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর গুণাবলী মেনে নেয়া এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ইসলামের মৌলিক বিধানগুলো মেনে চলাই একজন মুসলমানের জন্যে যথেষ্ট নয়। তাই হযরত লোকমান এসব কথা বলার পর তাঁর ছেলেকে একথাও বলেছেন: “হে আমার প্রিয় পুত্র! মানুষকে ভালো কাজ করার আদেশ দাও এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখো।” আসলে দুনিয়ায় মুসলমান হয় আল্লাহর সেনা। দুনিয়ায় আল্লাহর নাফরমানী হতে দেখলে সবার আগে মুসলমান বাধা দেয়ার জন্যে এগিয়ে যায়। মুসলমান কেবল নিজে ভালো হয়ে যাওয়াকে যথেষ্ট মনে করে না বরং অন্যকেও ভালো করা এবং তাকে সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করাকেও সে নিজের কর্তব্য মনে করে। এজন্যে শুধুমাত্র উপদেশ ও অনুরোধ যথেষ্ট হয় না। কারণ যারা আল্লাহর হুকুম মানেনা, তারা নাফরমানী করে এবং অসৎ পথে চলে। তারা দু-চার কথায় নিজেদের পথ ছেড়ে ভালো পথে চলে আসতে রাজী হয় না। তারা বাধা দিতে থাকে। ফলে আল্লাহর সৎ মুমিন বান্দাদের জন্যে এটা হয় বেশ কঠিন পরীক্ষার সময়।

তাই হযরত লোকমান তাঁর ছেলেকে এ কঠিন সংকটের মোকাবেলা করার জন্যে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন : “হে প্রিয় পুত্র! এ পথে যেসব বাধা-বিপত্তি আসে, ধৈর্যের সাথে তার মোকাবেলা করো। এটাই মানুষের করার মতো সবচেয়ে বড় কাজ।”

আল্লাহর দীনের দিকে মানুষকে আহ্বান করার হিম্মত এবং দৃঢ়তা ও ধৈর্য সহকারে এ পথে সমস্ত প্রতিকূলতার মোকাবেলা করার সাথে সাথে আর একটা জিনিসেরও প্রয়োজন। সেটা হচ্ছে চারিত্রিক মাধুর্য। যে ব্যক্তি কোমল স্বভাবের নয় এবং মানুষের সাথে অমায়িক ব্যবহার করতে পারে না, সে কখনো আল্লাহর দীনের একজন ভালো আহ্বায়ক হতে পারে না। একজন বদমেজাজী ও অহংকারী কখনো অন্যের মনে নিজের কথা প্রবেশ করাতে পারে না।

তাই হযরত লোকমান নিজের ছেলেকে যে শেষ ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ নসীহতটি করেন সেটা হচ্ছেঃ “হে প্রিয় পুত্র! অহংকারের বশে মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কথা বলো না। গর্বভরে বুক চিতিয়ে মাটির ওপর চলাফেরা করো না। আল্লাহ অহংকারী ও নিজেদের যারা বড় মনে করে তাদেরকে মোটেই পছন্দ করেন না। মাটির ওপর দিয়ে যখন চলবে ভালো লোকের মতো চলার মধ্যে সমতা রেখে চলবে। কারোর সাথে কথা বলার সময় অনর্থক চেঁচিয়ে কথা বলবে না বরং কথা বলার ভঙ্গি ও আওয়াজের মধ্যে সমতা রেখে কথা বলবে। গাধাকে দেখো, কেমন চিৎকার করে। সবাই জানে গাধার চিৎকার সব চেয়ে কর্কশ ও শ্রুতিকটু।”

এ হচ্ছে পুত্রের প্রতি একজন ভালো পিতার নসীহত। এগুলো পালন করে প্রত্যেকটি ছেলে-মেয়ে যেমন সুসন্তান হতে পারে তেমনি হতে পারে দেশের দায়িত্বশীল নাগরিক।

প্রশ্নের জবাব দাও
১. হযরত লোকমান কে ছিলেন?
২. এ দুনিয়ায় সব চেয়ে বড় জুলুম কি?
৩. কুরআনে বাপ-মায়ের অধিকার প্রসংগে মায়ের ব্যাপারে কি বলা হয়েছে?
৪. নামায কি? নামাযের প্রয়োজন কেন?
৫. হযরত লোকমানের শেষ নসীহতটি কি ছিল?

📘 মজার গল্প > 📄 লা-জওয়াব নমরুদ

📄 লা-জওয়াব নমরুদ


'কি হে তোমাদের কি হয়ে গেলো, খাচ্ছোনা কেন? এতো এতো সব খাবার-দাবার, ফল-ফলার, মিষ্টান্ন। নাও আর দেরি করো না। সবাই মেলায় চলে গেছে এবার নিশ্চিন্তে খেতে থাকো।'

'কি ব্যাপার, তোমাদের হলো কি? কেউ কোনো কথা বলছো না কেন?'

'তোমরা না সবার প্রার্থনা পূর্ণ করে থাকো। যে যা চায় তাকে তাই দিয়ে দাও। কিন্তু কই কেউ তো দেখি একটু নড়াচড়াও করতে পারো না। আমি জানি তোমরা মাটি আর পাথরের তৈরি মূর্তি ছাড়া আর কিছুই নও।'

এই বলে হাতের কুড়ালটা নিয়ে ঝপাঝপ মারতে থাকলেন কোপ মূর্তিগুলোর ঘাড়ে, মাথায়, কোমরে, পিঠে, যার যেখানে হাত চলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মূর্তিগুলো ভেঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। এখন রয়ে গেলো শুধু বড় মূর্তিটা। ওটাকে আর না ভেঙ্গে ওটারই গলায় ঝুলিয়ে দিলেন কুড়ালটা এবং তারপর বেরিয়ে পড়লেন মন্দির থেকে।

বেলা শেষে মেলা থেকে লোকেরা ফিরে আসতে লাগলো। জনসমাগমে শহর আবার গমগম করতে লাগলো। কিন্তু মন্দিরের মধ্যে ঢুকে তো লোকদের চোখ ছানাবড়া। ঠাকুর-দেবতাদের একি অবস্থা! ভেঙ্গেচুরে চারদিকে একেবারে ছত্রখান হয়ে আছে! যেন বিরাট যুদ্ধ হয়ে গেছে। এদের এ অবস্থা করলো কে?

'নিশ্চয়ই এ সেই যুবকটির কাজ', কয়েকজন একসাথে বলে উঠলো, 'তাকে আমাদের দেবতাদের বিরুদ্ধে যা তা বলতে শুনেছি।'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই। সেতো মেলায় যায়নি। বলছিল তার শরীর নাকি খারাপ।' পাশ থেকে আরো কয়েকজন ফুঁসে উঠলো। 'তার নাম বুঝি ইবরাহিম।'

কাজেই কিছুক্ষণের মধ্যেই হযরত ইবরাহিমকে পাকড়াও করে আনা হলো মন্দিরের মধ্যে। সব লোকেরা সেখানে জড়ো হয়ে গিয়েছিল।

'তুমি এ কাজ করেছো? ইবরাহিম! তুমিই কি এ দুর্গতি করেছো আমাদের দেবমূর্তিগুলোর?'

'বাহ! অবাক করলে তোমরা। আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন? এতদিন ধরে তোমরা এদের পূজা করে এলে। এতো ক্ষমতা এদের। কত বড় বড় জিনিস তোমরা এদের কাছে চেয়েছো। এরা সংগে সংগেই তোমাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে দিয়েছে। এদেরকেই জিজ্ঞেস করো, এরাই বলে দিতে পারবে। আমাতো মনে হয় এই বড়টাই এ কাজ করেছে। দেখছো না কুড়ালটা এর গলাতেই ঝুলছে।'

'তুমি তো জানো ইবরাহিম, আমাদের দেবতারা কথা বলতে পারে না।'

'তাহলে ভেবে দেখো, যখন এরা কথাও বলতে পারে না, নিজেরাই নিজেদের সাহায্য করতে পারেনা, তখন তোমাদের সাহায্য করবে কেমন করে? তোমরা কি এমনসব প্রাণহীন অবোধ মূর্তিদের পূজা করবে যারা তোমাদের কোন কল্যাণও করতে পারে না, কোন ক্ষতিও করতে পারে না? তোমাদের জন্যে দুঃখ হয় এবং তোমাদের এ ঠাকুর দেবতাদের জন্যেও। তোমরা আল্লাহর পূজা করোনা। অথচ তিনি সকল ক্ষমতার আধার। তোমরা এই এদেরকে পূজা করো। অথচ এদের কোন ক্ষমতাই নেই। তোমরা একটু বুদ্ধি খাটাও, চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করো।'

হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দুঃসাহসের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। উত্তেজিত লোকেরা তাঁর চার পাশে জড়ো হতে লাগলো। দেখতে দেখতে জমায়েত অনেক ভারী হয়ে উঠলো। সুযোগ বুঝে হযরত ইবরাহিম সবাইকে সম্বোধন করে বলে উঠলেন:

"আমি অবাক হচ্ছি, নিজের হাতে তোমরা যেসব মূর্তি তৈরি করো তাদেরকেই আবার পূজা করো। কিন্তু আসলে তোমাদেরকে তো আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যা কিছু তৈরি করো তা সবই তাঁরই সৃষ্টি।”

জনসমুদ্রে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের উপদেশের কোন প্রভাব পড়লো না। তারা তো হুজুগে মেতে উঠেছিল। হুজুগের কাছে সত্য ও যুক্তির কোন দামই ছিল না। উল্টো তারা মারমুখী হয়ে উঠলো। দেবতাদের বিরুদ্ধে গোস্তাখী করার জন্যে তাঁর উপর চড়াও হলো। একদল বললো, 'চলো তাকে বাদশাহর কাছে নিয়ে যাই। বাদশাহর আদেশে তাকে চরম শাস্তি দিতে হবে।' ইতিমধ্যে বাদশাহর দরবারেও এ খবর পৌঁছে গিয়েছিল। এ সময় ইরাকের বাদশাহর উপাধি ছিল নমরূদ। নমরূদ কেবল প্রজাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাই ছিল না বরং সে তাদের খোদা ও উপাস্য হিসেবেও নিজেকে জাহির করেছিল। ফলে প্রজারা বিভিন্ন দেব-দেবীর সাথে সাথে তারও পূজা করতো।

হযরত ইবরাহিমের ঘটনা শুনে নমরূদ ক্ষেপে গেলো। সে ভাবলো ইবরাহিমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে সে আমার খোদায়ী তো আছেই এমনকি আমার বাদশাহীর জন্যেও চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। তাই তাঁকে উচিত শাস্তি দেয়ার জন্যে দরবারে হাজির করলো। নমরূদ বললোঃ

'তোমার এত বড় স্পর্ধা, আমার রাজ্যে বাস করে আমাদের বাপ-দাদার ধর্ম অস্বীকার করো? আমাকে খোদা বলে মানো না?'

'আমি এক আল্লাহর ইবাদত করি' হযরত ইবরাহিম (আ) বললেন, 'তাঁর সাথে কাউকে শরীক করি না। পৃথিবী, আকাশ ও এ সবের মধ্যে যা কিছু আছে এ সবই তাঁর সৃষ্টি। তিনি সবার মালিক ও প্রভু। তুমিও আমাদের মতো একজন মানুষ। কাজেই তুমি কেমন করে খোদা বা উপাস্য হতে পারো? এবং এই প্রাণ ও বাকশক্তিহীন মাটি ও পাথরের মূর্তিগুলোই বা খোদা হয় কেমন করে?'

নমরূদ বললো, 'আমি ছাড়া যদি তোমার অন্য কোন রব থাকে, তাহলে তার এমন কিছু গুণাবলী বর্ণনা করো, যেগুলো আমার মধ্যে নেই।'

হযরত ইবরাহিম (আ) বললেন, 'আমার রব জীবন ও মৃত্যুর অধিকারী। তিনিই মৃত্যু দান করেন এবং তিনিই জীবন দান করেন।'

নাদান বাদশাহ নমরূদ জীবন ও মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য না বুঝে বলে দিল, 'আমিও জীবন মৃত্যু দান করি।' এই বলে তখনই একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে ধরে এনে হত্যা করলো এবং একজন ফাঁসির আসামীকে মুক্তি দিয়ে দিল। তারপর ইবরাহিমের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললো, দেখলে তো আমি কিভাবে জীবন ও মৃত্যু দান করি, এখন বলো কোথায় থাকলো তোমার খোদার বিশেষ গুণ?''

হযরত ইবরাহিম (আ) বুঝতে পারলেন, নমরূদ তার লোকদের ধোকা দেয়ার চেষ্টা করছে অথবা সে জীবন ও মৃত্যুর রহস্য বোঝে না। কাউকে ফাঁসির মঞ্চ বা মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো তো তাকে জীবন দান এবং কাউকে হত্যা করা তো তাকে মৃত্যু দান করা হয় না। এর ফলে ঐ ব্যক্তি জীবন ও মৃত্যুর মালিক হয়ে যায় না। জীবন ও মৃত্যুর সম্পর্ক তো প্রাণের সাথে। কোন ব্যক্তিকে বাঁচাবার পর সে কি তার প্রাণের মালিক হয়ে যায়? সে ব্যক্তির প্রাণ কি তার হাতে এসে যায়? অথবা কোন ব্যক্তিকে মেরে ফেলার পর তার প্রাণ কি তার হাতে এসে যায়? হত্যাকারী কি নিহত ব্যক্তির প্রাণের মালিক হয়ে যায়? তার প্রাণতো তার নির্দিষ্ট জায়গায় চলে যায়, যেখানে হত্যাকারীর কোন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নেই। হত্যাকারী কেবল তার মরা দেহটা আগলে থাকতে পারে, যার মধ্যে প্রাণ নেই। তাহলে প্রাণ তার হাত ছাড়া হয়ে যায়। ফলে প্রকৃত পক্ষে হত্যাকারী ও জীবনদানকারী জীবন ও মৃত্যুর মালিক হয় না। জীবন ও মৃত্যুর মালিক হন তার স্রষ্টা আল্লাহ। কিন্তু সাধারণ লোকের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে ভুল বুঝার অবকাশ ছিল এবং নমরূদ তারই আশ্রয় নিয়েছিল।

এতে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আসল উদ্দেশ্য সফল হচ্ছিল না। তিনি চাচ্ছিলেন আল্লাহর একত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে। তাই তিনি এবার আরো সহজ ও সোজা কথায় চলে এলেন। এবার তিনি বললেন, 'আমি এমন এক আল্লাহকে মানি যিনি পূর্ব দিক থেকে সূর্য উঠান, তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে উঠাও।” এ কথায় নমরূদ হতভম্ব ও লা-জওয়াব হয়ে গেলো। কারণ পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠাবার ক্ষমতা তার ছিল না। কাজেই সাধারণ মানুষকে ধোকা দেয়ার জন্যে সে এবার আর বলতে পারলো না, ঠিক আছে দেখো আমি পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠাচ্ছি।

এভাবে সত্যের কাছে মিথ্যা চিরকাল লা-জওয়াব হয়ে এসেছে। কিন্তু তার গোঁড়ামি যায়নি। এটা তার চিরকালের স্বভাব।

গল্পটি কুরআনের আলোকে রচিত

প্রশ্নের জবাব দাও
১. মূর্তিরা কি কথা বলতে পারে? কাউকে সাহায্য করতে পারে? কারোর কল্যাণ করতে পারে?
২. লোকেরা মেলায় গেলে হযরত ইবরাহিম মন্দিরের মধ্যে কি করেছিলেন?
৩. হযরত ইবরাহিমের সময় ইরাকের বাদশাহ কে ছিল? সে নিজেকে কি বলে দাবি করতো?
৪. জীবন ও মৃত্যুর প্রকৃত মালিক কে? কেমন করে?
৫. হযরত ইবরাহিম কিভাবে নমরূদকে লা-জওয়াব করেছিলেন?

📘 মজার গল্প > 📄 বনি ইসরাঈলের জ্ঞানী বৃদ্ধা

📄 বনি ইসরাঈলের জ্ঞানী বৃদ্ধা


'আমার মনে হচ্ছে আমরা পথ ভুল করেছি।'

'এ কেমন করে হতে পারে হযরত? আপনি আল্লাহর নবী। আপনি পথ ভুল করবেন কেন?'

'মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের পথ ভুল করিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের অথৈ দরিয়া পার করিয়ে দিলেন। জালেম ফেরাউনকে ও তার লোক-লস্করকে দরিয়ার পানিতে ডুবিয়ে মারলেন। কিন্তু এ পারে এসে তো কোনো পথের দিশা পাচ্ছি না।' বললেন আল্লাহর নবী হযরত মূসা আলাইহিস সালাম।

'কিন্তু দরিয়ার ওপারে যখন আমরা ছিলাম, পেছন থেকে ফেরাউন ও তার লোক লস্কররা যখন আমাদের তাড়া করে ফিরছিল তখন তো আপনাকে পথের জন্যে পেরেশান হতে দেখিনি।' বলল একজন ইসরাঈলী জোয়ান।

'কথাটা ঠিকই বলেছো। এটাতো পেরেশানীর কথা, চিন্তার কথা।' একজন বয়োবৃদ্ধ ইসরাঈলী বললো। 'তবে আমাদের আলেম ও লেখাপড়া জানা লোকেরা অনেক কথাই জানে, তারা এ ব্যাপারে কি বলে?'

একজন ইসরাঈলী আলেম বললো, 'হ্যাঁ, একটা কথা আমাদের বাপ-দাদাদের মুখ থেকে শুনেছিলাম। সেটাই হয়তো আমাদের এই পথ ভুলের কারণ হতে পারে।'

'কি সে কথা?'

'কেন? তোমাদের অনেকেই তা শুনেছো। তবে সেটাকে হয়তো এর সাথে মেলাতে পারছো না।'

'বলুন তো ব্যাপারটা কি? আমরা তো কিছুই ভাবতে পারছি না।

'কেন তোমরা শোনোনি? মিসরে বনি ইসরাঈলী মিল্লাতের প্রতিষ্ঠাতা আল্লাহর নবী হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাঁর ইন্তিকালের সময় আমাদের পরদাদাদের থেকে এই মর্মে ওয়াদা নিয়েছিলেন যে, তাঁর কবর থেকে তাঁর হাড্ডিগুলো উঠিয়ে সাথে না নিয়ে তারা এদেশ ত্যাগ করবে না।'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমরা শুনেছি।' অনেক আলেম একসাথে বলে উঠলো। আমাদের পথ ভুল হওয়ার এটা একটা কারণ হতে পারে।'

হযরত মূসা বললেন, 'আমাদের পূর্ব পুরুষদের ওয়াদা অবশ্যই আমাদের পালন করতে হবে। তার ওপর আমাদের মহান নবী হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের দিলের খাহেশ পূরণ করা আমাদের জন্যে একটি অবশ্য করণীয় কাজ। আল্লাহ তাঁকে এদেশে এনেছিলেন। তিনি ছিলেন এদেশে আমাদের প্রথম পুরুষ। তাঁর দিনগুলো ছিল অত্যন্ত মর্যাদা ও গৌরবের। আমাদের পূর্ব পুরুষরা ছিল কৃষি ও পশু পালনে অভ্যস্ত। তিনি তাদেরকে মিসরের নগর জীবনের সাথে জড়িত না করে গ্রামে ও পাহাড়ে জঙ্গলে আবাদ করেন। তাই শত শত বছর পরে আজো আমরা নগরবাসীদের শিরকী জীবনে অভ্যস্ত হইনি। আমরা আজো আল্লাহ ও তাঁর নবীর দীন ও শরীয়ত মেনে চলছি।'

'হে আল্লাহর নবী, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের আজকের তওহিদী জীবন, আমাদের ইবাদত-বন্দেগী এবং আল্লাহর শরীয়ত মেনে চলার জন্যে আমাদের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা এ সব কিছুর পেছনে আমাদের মহান পূর্ব পুরুষ এবং আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সেদিনের সিদ্ধান্ত অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে।' বললেন একজন বনি ইসরাঈলী আলেম।

'হ্যাঁ, ঠিকই। যদি আমরা নগরবাসী হতাম। নাগরিক জীবনের আরাম আয়েশে অভ্যস্ত হয়ে পড়তাম। মিসরীয়দের মতো আল্লাহর ইবাদত না করে হয়তো পুতুল পূজাই করতাম।' বললেন আর একজন আলেম।

'আল্লাহর বড় মেহেরবাণী। তিনি আমাদের তাঁর সঠিক দীনের অনুসারী রেখেছেন।' বললেন হযরত মূসা আলাইহিস সালাম। 'আর এটি সম্ভব হয়েছে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সঠিক সিদ্ধান্তের ফলে।'

হযরত মূসা আবার বললেন, 'কাজেই আমাদের এদেশ ছেড়ে চলে যাবার সময় তাঁর হাড়-গোড়গুলো আমাদের সাথে নিয়ে গিয়ে আমাদের পিতৃভূমিতে কবরস্থ করার যে দাবি তিনি করেন তা আমার কাছে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে হয়। কিন্তু তাঁর কবর কোথায়? কে বলতে পারে একথা?

সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো। তারপর কিছু লোক বলে উঠলো, 'হাঁ, একথা বলতে পারে মাত্র একজনই।'

'কে সে? তার নাম বলো। কোথায় থাকে?'

'সে এক বৃদ্ধা। অতিরিক্ত বয়সের ভারে ন্যুব্জ পৃষ্ঠ এক বনি ইসরাঈলী বৃদ্ধা।'

তার কাছে একজনকে পাঠালেন হযরত মূসা আলাইহিস সালাম। তাকে ডেকে আনলেন। তাকে নিজের কাছে বসালেন। বললেন, 'বুড়িমা, আপনি কি আল্লাহর প্রিয় নবী এবং আমাদের মহান পূর্ব পুরুষ হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কবরটি কোথায় তা আমাদের দেখিয়ে দেবেন?'

'আল্লাহর কসম আমি দেখাবো না। তবে একটি শর্ত আছে যদি শর্তটি পূরণ করেন তাহলে অবশ্যই দেখিয়ে দেবো।'

'শর্তটি কি বলুন।'

'শর্তটি হচ্ছে আপনাকে ওয়াদা করতে হবে জান্নাতে আমি আপনার সাথে থাকবো।'

আল্লাহর নবী মূসা বনি ইসরাঈলের এই বৃদ্ধার শর্তটি পছন্দ করতে পারলেন না। কারণ এটা সম্পূর্ণ আল্লাহর ব্যাপার। কেবলমাত্র নেকীর জোরে বা কারোর সুপারিশে কেউ জান্নাতে যাবে না। আল্লাহ কাকে জান্নাতে নেবেন আর কাকে নেবেন না এটা তাঁর এখতিয়ার।

মূসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন বৃদ্ধার শর্ত মেনে নাও। কাজেই হযরত মূসা বললেন, 'বুড়িমা আমি আপনার শর্ত মেনে নিলাম।' আনন্দে বনি ইসরাঈলের বৃদ্ধার দুটি চোখ চকচক করে উঠলো। যেন সেখানে ঝাড় লণ্ঠন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। যেন সাত রাজার ধনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু তার হাতে এসে গেছে।

'আমার সাথে এসো' বলে বৃদ্ধা হাঁটা দিল একদিকে। বৃদ্ধার পেছনে পেছনে চললো সবাই। একসময় সবাই এসে পৌঁছুলো একটি পানি ভরা ডোবার কাছে। 'পানি ছেঁচে ডোবাটা খালি করো।' সবাই পানি ছেঁচার কাজে লেগে পড়লো। এক সময় ডোবাটি পানি শূন্য হলো।

'এবার কোদাল আনো'। ডোবার মাঝখানের মাটি কেটে উপরে ওঠাও। ঠকঠক আওয়াজ শুরু হলো। মাটির নিচ থেকে বের হয়ে এলো একটি শরীরের হাড়গোড়।

হযরত মূসা হাড়গুলো জমা করলেন। সেগুলো নিয়ে আবার রওয়ানা হলেন। এবার পথ তাঁর কাছে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো দিনের আলোর মতো।

মুসতাদরাক হাকেম বর্ণিত একটি হাদীসের ভিত্তিতে গল্পটি রচিত।

প্রশ্নের জবাব দাও
১. আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আ) কখন এবং কোথায় পথ ভুল করেছিলেন?
২. কেন পথ ভুল করেছিলেন?
৩. হযরত ইউসূফ (আ) এর কবরের সন্ধান কে জানতো?
৪. কবরটির অবস্থান কোথায় ছিল?
৫. বনি ইসরাঈলের বৃদ্ধা কবরটি দেখাবার জন্যে কি শর্ত আরোপ করেছিল?
৬. কে জান্নাতে যাবে?

📘 মজার গল্প > 📄 আল্লাহর নবী ও পিঁপড়ে

📄 আল্লাহর নবী ও পিঁপড়ে


মহান আল্লাহ পৃথিবীতে জীব ও জড় যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটা অনুভূতি আছে। মানুষ ছাড়া তাদের প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছায় এবং সচেতনভাবে আল্লাহর তাসবীহ পড়ছে, তাঁর গুণগান ও প্রশংসা করছে। মানুষ চাইলে আল্লাহর গুণগান করতে পারে আবার চাইলে নাও করতে পারে। এ স্বাধীনতা মানুষকে দেয়া হয়েছে। তবে আল্লাহর গুণগান করলে মানুষের লাভ। আর আল্লাহর গুণগান না করলে মানুষের ক্ষতি।

পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, গাছ-পালা সবাই আল্লাহর তাসবীহ পড়ে, তাঁর গুণগান করে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, 'কিন্তু তাদের তাসবীহ পড়া এবং তাদের আল্লাহর গুণগান করা তোমরা বুঝতে পারো না।'

ছোট্ট একটা পিঁপড়েও আল্লাহর তাসবীহ পড়ে। এ সম্পর্কে হাদীসের একটা ঘটনা আজ তোমাদের শুনাবো। দুটি প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থ বুখারী ও মুসলিমে এ ঘটনাটির কথা বলা হয়েছে।

কয়েক হাজার বছর আগের একটা ঘটনা। আল্লাহর এক নবী মনে হয় অনেক দূরের সফর থেকে আসছিলেন। সংগে ছিল তাঁর লোকজন। অনেক মালসামান সফর সামগ্রী। ছিলেন শ্রান্ত ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। চাইলেন একটু বিশ্রাম ও আরাম করতে। একটা বড় গাছ দেখলেন। তার ছায়ায় নেমে পড়লেন। মাল সামান গাছের নিচে রেখে বিছানা পেতে শুয়ে পড়লেন তার ছায়ায়। সবেমাত্র চোখ বুজেছেন এমন সময় কুট করে কামড় দিল একটা ডাঁশা পিঁপড়ে। তাঁর কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তিনি বিরক্ত হলেন, রেগে গেলেন খুব। খুব মানে অনেক বেশি।

আল্লাহর নবী হলেও সবার মতো তিনিও মানুষ। অত্যন্ত পরিশ্রান্ত অবস্থায় ঘুমের ব্যাঘাত হওয়ায় তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে লোকদের হুকুম দিলেন, গাছের নিচে আমাদের যা মাল সামান জিনিসপত্র আছে সব বের করে নিয়ে এসো। জিনিসপত্র সব বের করে নিয়ে এসে বাইরে এক জায়গায় জড়ো করা হলো, তারপর হুকুম দিলেন, পিঁপড়ের সারিগুলোতে, ওদের ঢিবিগুলোতে এবং ওদের আবাসগুলোতে আগুন লাগিয়ে দাও।

কাজেই শত শত হাজার হাজার পিঁপড়ে পুড়ে মারা গেলো। আল্লাহ তাঁর নবীর এ কাজটি অত্যন্ত অপছন্দ করলেন। সংগে সংগেই ওহীর মাধ্যমে নবীকে তাঁর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধের কথা জানিয়ে দিয়ে বললেন, প্রতিশোধ নিতে হলে একটি পিঁপড়ে মারতে যে তোমাকে কামড়েছিল। কিন্তু একজনের দোষে পিঁপড়ের একটা দল এবং একটা উম্মতকে খতম করে দেয়া কোন ধরনের ইনসাফ? অথচ এরা আমার তাসবীহ ও গুণগান করে।

তাই বিনা কারণে কোনো পিঁপড়েকে মারা যাবে না। কেবল পিঁপড়ে কেন, কোনো নিরীহ প্রাণীকে বিনা কারণে হত্যা করা যাবে না। বিভিন্ন হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে চারটি প্রাণীর নাম নিয়ে তাদেরক মারতে নিষেধ করেছেন। সেই চারটি প্রাণীর একটি হচ্ছে পিঁপড়ে। দ্বিতীয়টি মৌমাছি, তৃতীয়টি হুদ হুদ পাখি। আর চতুর্থটি হচ্ছে, সুরদ নামক একটি বিশেষ পাখি। তবে সাপ, বিছা ইত্যাদি যেসব প্রাণী মানুষের ক্ষতি করে তাদেরকে হত্যা করা বৈধ ঘোষণা করেছেন।

পিঁপিড়ে সম্পর্কে আল্লাহর আর এক নবীর কথা তোমাদের বলবো। খ্রিষ্টপূর্ব ৯৬৫ থেকে নিয়ে ৯২৬ অব্দ পর্যন্ত ৪০ বছর আল্লাহর এই নবী সুলাইমান আলাইহিস সালাম ফিলিস্তীন, জর্দান ও সিরিয়া এলাকা শাসন করেন। আল্লাহ তাঁকে বিভিন্ন প্রাণীর ভাষা শিখিয়েছিলেন। তাঁকে পিঁপড়ের ভাষাও শিখিয়েছিলেন।

একদিন তিনি তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে এমন একটি উপত্যকায় পৌঁছুলেন যেখানে ছিল পিঁপড়েদের আবাস। পিঁপড়েদের সর্দার বুঝতে পারলো সুলাইমান আলাইহিস সালাম ও তাঁর সেনাবাহিনী তাদের এই এলাকার ওপর দিয়ে যাবেন। সর্দার ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী। সে তার দলবলকে হুকুম দিল, তোমরা বাইরে ঘোরাফেরা করো না। তাড়াতাড়ি যার যার ঘরে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে যাও। সুলাইমান তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে এখনই এখান দিয়ে যাবেন। তাদের পায়ের তলায় তোমরা পিষ্ট হয়ে যাবে। অথচ তারা এর কিছুই জানতে পারবেনা।

হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম দূর থেকে পিঁপড়ের সর্দারের কথা শুনতে পেলেন। আল্লাহ তাঁকে এ ক্ষমতা দান করেছিলেন। এ জন্যে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। ফলে তাঁর ও তাঁর সেনাদলের চলাচলে পিঁপড়েদের কোনো ক্ষতি হলো না।

তোমরা পিঁপড়েদের চলাচল করতে দেখেছো। তারা কেমন সুশৃঙ্খল ও সারিবদ্ধভাবে চলে। কোনো খাবার সংগ্রহ করলে খাবার নিয়ে তারা চলে একটা সুশিক্ষিত সেনাবাহিনীর মতো। তাদের একদল খাবারটাকে ঘিরে তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। আর একটা বিশাল বাহিনী সুশৃঙ্খলভাবে পথ তৈরি করে নিয়ে তাদের আবাস ও আস্তানার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পিঁপড়েরা একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়মের অধীনে জীবন যাপন করে। আল্লাহ তাদের এ জীবন যাপনের ধারা শিখিয়ে দিয়েছেন।

কীট পতঙ্গের মধ্যে পিঁপড়েরা সবচেয়ে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করে। মানুষের মতো তাদের মধ্যেও বংশধারা আছে। তারাও বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত। তাদের শাসক আছে। শাসকদের অধীনে তারা নিয়ম শৃঙ্খলার সাথে বিভিন্ন কাজ করে থাকে। যখন কোনো দুশমন কোনো এলাকায় পিঁপড়েদের আবাসস্থল আক্রমণ করতে আসে তখন সেই এলাকার সমস্ত পিঁপড়ে তাদের কাজকাম বন্ধ করে দেয়। তারা দুশমনের সাথে মোকাবিলা করার জন্যে বের হয়ে পড়ে। প্রথমে তাদের মধ্য থেকে একজন দ্রুত এগিয়ে যায়। দুশমনদের সম্পর্কে সমস্ত খবরাখবর সংগ্রহ করে। সে ফিরে এসে সবকিছু জানিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর তিন-চারটি পিঁপড়ে বের হয়। তাদের পেছনে এগিয়ে আসতে থাকে পিঁপড়েদের একটা বিরাট সেনাবাহিনী। তারপর শুরু হয় দুপক্ষের যুদ্ধ। যে এগিয়ে আসে তাকে কামড়ানো ও দংশন করা হয়।

আসলে পিঁপড়ে ক্ষুদ্র একটা কীট হলেও বেশ বুদ্ধিমান প্রাণী। তারা বুঝে শুনে পরিকল্পনা করে কাজ করে। তারা আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহর বান্দা এবং একটি পৃথক উম্মত। কেবল পিঁপড়েই বা কেন, প্রাণী জগতের সকল সৃষ্টিই এক একটি পৃথক উম্মত রূপে বিরাজ করছে। তাই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে বলেছেন:
'জমিনে চলে বেড়ায় এমন কোনো প্রাণী এবং আকাশে দুই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় এমন কোনো পাখি নেই যারা নয় তোমাদের মতো একটা উম্মত।'

তাই সমস্ত জীবের প্রতি আমাদের সদয় ও দায়িত্বশীল ব্যবহার করা উচিত।

প্রশ্নের জবাব দাও
১. কারা আল্লাহর তাসবীহ পড়ে?
২. পিঁপড়ে আল্লাহর নবীকে কামড়ালে তিনি কি করলেন?
৩. নবীর এ কাজকে আল্লাহ কিভাবে গ্রহণ করলেন?
৪. আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষ করে কয়টি প্রাণীকে মারতে নিষেধ করেছেন? সেগুলো কি কি?
৫. আল্লাহর কোন নবী পিঁপড়ের ভাষা জানতেন?
৬. তিনি কত সালে কোন দেশ শাসন করতেন?
৭. পিঁপড়েদের সর্দার বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী ছিল কেন?
৮. পিঁপড়েরা কিভাবে তাদের শত্রুদের মোকাবিলা করে?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00