📘 মজার গল্প > 📄 গোলাম হলো পুত্র

📄 গোলাম হলো পুত্র


ইহুদী সাল্লাম বিন জুবাইর সেই সকাল থেকে বসে আছে ইয়াসরিবের বাজারে। তার সব মাল-সামান বিক্রি হয়ে গেছে। লাভও হয়েছে দেদার্ কিন্তু এই গোলাম বাচ্চাটা যেন তার গলায় কাঁটার মতো আটকে আছে। সেই সকাল থেকে এটার কাছেও কেউ ঘেঁসছে না। এই বাচ্চাটা না দু'পয়সা আয়-রোজগার করতে পারবে আর না করতে পারবে ঘরের কোনো কাজ-কাম, এ চিন্তাই বোধ হয় খদ্দেরদের ঠেকিয়ে রেখেছে।

এসব সাতপাঁচ ভাবছিল সাল্লাম। এমন সময় আওস গোত্রের সুন্দরী যুবতী সাবিতা বিনতে ইয়ারিবের নজরে পড়লো এই ছোট্ট গোলামটি। সাবিতা বিড়বিড় করলোঃ ইস না জানি কার কলিজার টুকরো। বাচ্চাটাকে কিনে নেবার ইচ্ছে জাগলো তার মনে। জিজ্ঞেস করলোঃ কি হে সাল্লাম! তোমার এ গোলামটার নাম কি?

বনি কালব গোত্রের যে ব্যক্তি একে আমার কাছে বিক্রি করেছে সে এর নাম বলেছিল সালেম।

এর বাপের নাম কি? তাতো জানি না। তবে ঐ কালবি লোকটি বলেছিল, শিশুটি ভদ্র ও অভিজাত বংশের। আর এ নাকি ইসতাখার খান্দানের......। হাঁ-হাঁ ঐ যে ইসতাখার খান্দান উবলায় বাস করতো। সারা ইরাকে এদের ব্যবসা ছড়িয়ে আছে। আচ্ছা এসব আমি ভালো করেই জানি। এখন আমি গোলামটাকে কিনতে চাই।

ভালো দামেই সাবিতা গোলামটাকে কিনে নিল। আয়-রোজগার করার জন্যে বা নিজের খেদমত করার জন্যে সে গোলামটাকে কিনেনি। আসলে শিশুটির প্রতি করুণা ও মমতার বশেই সে তাকে কিনে নিয়েছিল। পথে যেতে যেতে সে মনে মনে বিড়বিড় করছিল- লা'নত! হাজার বার লা'নত! যারা মানুষের প্রতি রহম করেনা, দুর্বলের প্রতি করুণা করে না- তাদের ওপর লা'নত! যে মায়ের ছেলে হারিয়ে যায় আহ! তার কী কষ্ট! যে ছোট্ট শিশুটি এখনো মাকে চেনে না, বাপকে চেনে না, নিজের কোন আত্মীয় স্বজনের চেহারা যার চোখে ভাসে না, আহা সে কতবড় হতভাগা! আহ এ রকম যদি আমার কোন বাচ্চা হতো। ডাকাতরা যদি আমার ওপর হামলা করে তাকে লুট করে নিয়ে যেতো, তাহলে আমার দশাটা কেমন হতো! এ অবস্থায় আমি কেমন করে বেঁচে থাকতাম। জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত কি আমি নিজের বাচ্চাটির কথা ভুলতে পারতাম? কখনোই না। দুনিয়ায় বেঁচে থাকাই তো আমার জন্যে অসম্ভব হয়ে পড়তো। দুনিয়ার সব নিয়ামত আমার ওপর হারাম হয়ে যেতো।

সাবিতা নিজের মনের আয়নায় যেন বাচ্চার মাকে দেখতে পাচ্ছিল। সে ভাবছিল কিসরার সৈন্যরা যখন একে লুটেরাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি তখন এই ইয়াসরিবে একে কিভাবে রক্ষা করবো? এ শহরে তো আগে থেকেই বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে আছে। তার ওপর ইহুদী ও বদ্দুরা একে ঘিরে আছে চারদিক থেকে।

এ ঘটনার পর সাবিতার বিয়ের পয়গাম এলো আওস ও খাযরাজদের বড় বড় ঘর থেকে। কিন্তু সে এখন বিয়ে করতে রাজি ছিল না। নানান অজুহাত দেখিয়ে বিয়ে এড়িয়ে গেলো। ছোট্ট সালেমকে নিয়েই সে মেতে রইলো। এর এক বছর পরে কুরাইশদের একটি কাফেলা সিরিয়া থেকে ফেরার পথে ইয়াসরিবে কয়েক দিন বিশ্রাম নিল। এই কাফেলায় ছিলেন আবু হুযাইফা হাইসাম বিন উতবাহ। সাবিতার সম্পর্কে অনেক কথাই শুনেছিলেন আবু হুযাইফা। আর তার গোলামটির কথাও। লোকের মুখে মেয়েটির অসম্ভব গুণপনার কথা শুনে আবু হুযাইফা বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন সাবিতার কাছে। সাবিতা প্রথমে কানই দেয়নি। কিন্তু পরে শুনলো কুরাইশ বংশে আবু হুযাইফার মর্যাদার কথা। এমন এক কাবাগৃহের তারা খাদেম যে গৃহের ওপর আক্রমণকারী হস্তী সেনাদলকে আল্লাহ আবাবিল পাখি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। সাবিতা বিয়েতে রাজী হয়ে গেলো।

বিয়ের পর আবু হুযাইফা স্ত্রী ও গোলামটিকে সাথে নিয়ে মক্কায় চলে এলেন। আবু হুযাইফা ছিলেন জোয়ান। কুরাইশদের বিভিন্ন আসরে তাঁকে দেখা যেতো সব সময় সরগরম। কিন্তু এবারের মজলিস তেমন জমছিল না। কোথাও যেন কিছু ঘটে গেছে বলে তাঁর মনে হচ্ছিল। এবারের মজলিসগুলো যেন কিছুটা প্রাণহীন। যেন কিসের অভাব। তিনি একটু গম্ভীরভাবে ভেবে দেখলেন। তাইতো এখানে উসমান বিন আফফানকে দেখি না তো। তালহা বিন উবায়দুল্লাহ তামিমী কোথায়? অমুক বন্ধু, অমুক দোস্ত, কই তাদের দেখছি না তো? তারা কোথায়? তারা কেন আসে না? যাকে জিজ্ঞেস করেন আবু হুযাইফা সেই চুপ করে থাকে। কেউ কেউ জবাব দিলেও তা ইঙ্গিতপূর্ণ, বুঝে ওঠা মুশকিল।

বন্ধুদের খুঁজে খুঁজে হতাশ হয়ে শেষে ভাবলেন তারা তো এই শহরেই থাকে, আচ্ছা তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখি না কেন? প্রথমে গেলেন উসমানের বাড়িতে। উসমানের বয়স চল্লিশ। তাঁর চেয়ে দশ বছর বেশী। কিন্তু তাঁর প্রাণের দোস্ত। সবচেয়ে বেশী ভালোবাসেন তাঁকে। যেমন রুচিশীল, তেমনি জ্ঞানী, তেমনি আবার মধুর স্বভাবের। বাড়িতেই পেলেন উসমানকে। উসমান তাঁকে সাদরে গ্রহণ করলেন। হাসি মুখে বললেন, কেমন আছো আবু হুযাইফা?

আবু হুযাইফা নিজের মনের প্রশ্নের জবাব খুঁজছিলেন। কোথায় কিসের যেন পরিবর্তন উসমানের চেহারার মধ্যে তিনি পেলেন। আগের চাইতেও উসমানকে যেন আরো বেশী গম্ভীর, আরো বেশী সহনশীল মনে হচ্ছে।

"উসমান! তোমাকে আমি মক্কার সব আসরে খুঁজে বেড়িয়েছি। সিরিয়া থেকে বাণিজ্য কাফেলা ফিরে আসার পর থেকেই তোমাকে খুঁজে ফিরছি। বলতো, তোমার কি হয়েছে? তুমি কেন মজলিসে যাওয়া ছেড়ে দিলে?"

"এ মজলিস আমার একদম পছন্দ নয়। ওখানকার আলোচনাগুলোও একেবারে বাজে।"

"ব্যাপার কি? তোমার কওম কি তোমাকে কোনো কষ্ট দিয়েছে?” উসমান চুপ করে থাকলেন। কোনো কথা বললেন না।

"তাহলে উসমান! কিছু নিশ্চয়ই ঘটেছে। তোমাকে লাত ও উযযার কসম....।" লাত ও উযযার নাম শুনতেই আবু হুযাইফা দেখলেন, বন্ধুর কপালে ভাঁজ পড়ে গেছে। মুখে বিরক্তি। চোখে ক্রোধের ছায়া। এমন তো তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি থেমে গেলেন। এবার কথা ঘুরিয়ে নিলেন।

"উসমান! তোমার সাথে আমার কতকালের দোস্তি। তুমি আমার প্রাণের দোস্ত। তোমাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসি। সবচেয়ে বেশী বিশ্বাস করি। তোমার সাথে এতদিনের বন্ধুত্বের দোহাই, বলো, বলো, তোমার প্রাণে কিসের ব্যথা? তোমার মনের কথা বলো।"

উসমান অত্যন্ত ঠান্ডা মেজাজে কোমল ভাষায় বললেন: “দেখো আবু হুযাইফা, আমাদের বন্ধুত্ব যদি টিকিয়ে রাখতে চাও তাহলে তোমার ঐসব দেবতাদের লাত ও উয্যার দোহাই দিতে পারবে না আমার কাছে, যারা আসলে কোন ক্ষমতাই রাখে না।" আবু হুযাইফা তো অবাক! বলে কি উসমান! প্রথমে তিনি চুপ হয়ে গেলেন। তারপর বিরক্তিভরা কণ্ঠে বললেন, "উসমান! তাহলে তো মনে হচ্ছে তুমি বিধর্মী হয়ে গেছো।" "না...না... আবু হুযাইফা আমি বিধর্মী হয়ে যাইনি বরং আমি সত্য ধর্মের সন্ধান পেয়ে গেছি। আবু হুযাইফা, তুমি তো একজন বুদ্ধিমান যুবক। তোমার বয়স তেমন বেশী না হলেও তুমি তো দুনিয়ার অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছো। অনেক দেশ দেখেছো। অনেক জাতির কথা শুনেছো। দেশে দেশে জাতির মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখেছো। কালের যুগের অনেক ভাঙ্গাগড়ার ঘটনা তোমার সামনে আছে। তা থেকে অনেক জ্ঞান, অনেক অভিজ্ঞতা তুমি সঞ্চয় করেছো। আচ্ছা তুমি বলো, তোমার মতো বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা কেমন করে এই সব কাঠের তৈরী, ইট-পাথর ও মাটির তৈরী মূর্তিগুলোর পূজা করতে পারে? এগুলোকে তো আমার তোমার মতো মানুষেরাই বানিয়েছে। আবার যে কেউ চাইলে এগুলো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলতেও পারে।"

সত্যিই আবু হুযাইফা চিন্তায় পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে বললেন: "উসমান! তুমি আমাকে ভাবিয়ে তুললে। এমন করে তো কোনদিন ভেবে দেখিনি। সত্যিই অবাক হচ্ছি, তুমি যা বলছো তা একশো ভাগ সত্যি। আশ্চর্যের ব্যাপার, আজ পর্যন্ত এ কথাটা একবারও মনে জাগেনি। বাপ-দাদারা ওই মূর্তিগুলোকে পূজা করে আসছে। তাদের দেখাদেখি আমরাও পূজায় যোগ দিয়েছি।”

"তাহলে এখন তো সত্য প্রকাশ হয়ে গেছে? এখন তো জানলে? কি করবে এখন?

"আমাকে নিয়ে চলো সেখানে যেখান থেকে তোমরা পেয়েছো এই সত্যের আলো।"

"কবে যাবে?” "আজ, এখনই।”

বিকেলে সন্ধ্যে হবার আগেই আবু হুযাইফা ইসলাম গ্রহণ করলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে। মুসলমান হয়ে ঘরে ফিরে এলেন। প্রিয়তমা স্ত্রী সাবিতা শুনলেন সব কথা স্বামীর মুখ থেকে। কী অনাবিল আনন্দে উদ্ভাসিত তার স্বামীর হৃদয়! সাবিতা সহজেই এটা অনুভব করতে সক্ষম হলেন। এই আনন্দের সন্ধানই তো তিনি করে ফিরছেন গত কয়েক বছর ধরে। সাবিতা ঈমান আনলেন আল্লাহ ও তাঁর নবী মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর। তাঁদের গোলাম সালেমের মনও স্বামী স্ত্রীর কথাবার্তা শুনে সত্যের ডাকে সাড়া দিল। সেও ঈমান আনলো। এভাবে সেদিন রাত হবার আগে আগেই মক্কায় মুসলিম ঘরানার সংখ্যা আরো একটি বেড়ে গেলো।

কিছুদিন পরে সাবিতা শুনলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাত লাভের সুখবর শুনাচ্ছেন তাদের যারা গোলাম আযাদ করে দিচ্ছে। তখনি তিনি তার ইরানী গোলামকে ডেকে বললেন:

"সালেম! আজ থেকে তুমি মুক্ত স্বাধীন। এখন তুমি যাকে ইচ্ছা তাকে নিজের অভিভাবক বানাতে পারো।”

সালেম আবু হুযাইফাকে বললোঃ "আপনি কি আমার অভিভাবক হবেন?” আবু হুযাইফা বললেনঃ “না, হে খোকা। আমি তোমার অভিভাবক হতে যাবো কেন? তুমি তো আজ থেকে আমার ছেলে।"

হাদীস অবলম্বনে গল্পটি রচিত

প্রশ্নের জবাব দাও
১. সাবিতা আবু হুযাইফার বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হলো কেন?
২. লাত ও উযযার কসম শুনে উসমানের কপালে ভাঁজ পড়লো কেন?
৩. সত্যের আলো এনেছেন কে?
৪. সাবিতার আনন্দ কিসে?
৫. সালেম গোলামী থেকে মুক্তি লাভ করলো কিভাবে?

📘 মজার গল্প > 📄 আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন

📄 আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন


হঠাৎ মরিয়মের ঘুম ভেঙ্গে যায়। এত রাতে কিসের আওয়াজ! চারদিক নীরব নিস্তব্ধ। শুধু একটানা ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। আবার সেই আওয়াজ। আওয়াজটা অবশ্য খুব আস্তে ধীরে। তবুও তার বুঝতে মোটেই কষ্ট হয় না কোন কিছুর ওপর লোহা দিয়ে পিটানো হচ্ছে। কিন্তু এত রাতে কে পিটাচ্ছে? কি পিটাচ্ছে?

মরিয়মের কৌতূহল ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। আওয়াজটা মনে হয় পাশের কোন কামরা থেকে আসছে। সে ওঠে। পাশে শুয়ে আছে তার নতুন ভাইটি। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন যেন কোন অচীন দেশের রাজ কুমার। মাত্র তিন মাস হলো তার এই নতুন ভাইটি তাদের ছোট্ট ঘরখানা আলো করেছে। কচি মুখখানি নিবিড় মমতায় ভরা।

কিন্তু ভাইয়ের চিন্তা রেখে সে এখন নিশুতি রাতের আওয়াজের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। পাশের ঘরের দরজা খুলতেই দেখে তার আম্মিজান একটি কাঠের বাক্স তৈরী করছেন।

"আম্মি। এত রাতে...."

"চুপ” আম্মি ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে দেন, "আস্তে কথা বলো।”

"আম্মিজান! এই দুপুর রাতে বসে বসে আপনি এ কি বানাচ্ছেন।”

আম্মি বাক্স তৈরীতে মশগুল ছিলেন। আরেকটা পেরেকের মাথায় আস্তে করে কয়েক ঘা বসিয়ে দিয়ে মেয়ের কানে কানে বলেন, "ভাইয়া ঘুমুচ্ছে না? তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে।”

"হাঁ ঘুমুচ্ছে তো।”

"যাও তাকে নিয়ে এসো। যেন ঘুম ভেঙ্গে না যায়।"

"কেন আম্মি? সে তো খুব আরামে ঘুমুচ্ছে।”

"যাও, ভালো মেয়ের মতো যা বলি শোনো। হাঁ, তবে সাবধান, যেন ঘুম ভেঙ্গে না যায়।” আম্মি আবার চুপি চুপি বলেন।

মেয়ে মায়ের আদেশ পালন করে। সে গিয়ে কচি একরত্তি ভাইটিকে আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠায়। ক্ষুদে রাজকুমারটি তখনো গভীর ঘুমে অচেতন। সে তাকে মায়ের কাছে আনে। মায়ের হাতে তুলে দেয়। মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। নরম তুলতুলে গালটায় আলতোভাবে একটা চুমো খান। তারপর বাক্সের ঢাকনাটা খুলে তার মধ্যে ছেলেকে শুইয়ে দেন। এবার ঢাকনাটা বন্ধ করতে থাকেন।

"হায়, হায়, আম্মি! এ আপনি কি করেন? ভাইয়া যে দম আটকে মারা যাবে।” বলতে বলতে ভীত-বিহবল মেয়ে মায়ের হাত টেনে ধরে।

“চুপ করো, চিৎকার করো না। সবর কর মরিয়ম। এটাই আল্লাহর হুকুম।” একথা বলতে বলতে মা বাক্সের ঢাকনাটি বন্ধ করে দেন। মরিয়ম অবাক হয়ে এ দৃশ্য দেখতে থাকে। তার মা মোম দিয়ে বাক্সের চারদিক বন্ধ করে দেন। ঢাকনায় কয়েকটা ছোট ছোট ফুটো ছিল। মরিয়ম ভাবতে থাকে বোধ হয় বাতাস যাওয়া-আসা করার জন্য এই ফুটোগুলো রাখা হয়েছে। তাহলে তার ভাইয়া মারা যাবে না। এর মধ্যে ঘুমিয়ে থাকবে। মরিয়ম বুঝতে পারে না তার আম্মি কি চান। ভাইয়াকে বাক্সে ভরে কি করবেন? পরক্ষণে মনে পড়ে, আম্মি বলেছেন, এটাই আল্লাহর হুকুম।

মরিয়ম এতক্ষণ চিন্তায় ডুবে ছিল। হঠাৎ দেখে তার আম্মি বাক্সটি কাঁধে তুলে নিয়েছেন। ধীর পদক্ষেপে দরজার দিকে চলেছেন। মরিয়ম মার পেছনে পেছনে চলতে থাকে। আহা! কি আনন্দেই না সে ছোট্ট ফুটফুটে ভাইটিকে নিয়ে খেলা করছিল। কিন্তু আর সে ভাইয়ার সাথে খেলতে পারবে না। আজ না জানি আম্মি ভাইটিকে বক্সে ভরে নিয়ে কোথায় চলেছেন। কিছু জিজ্ঞেস করলে ভালো করে বলেও না। মরিয়মের মন বিষিয়ে ওঠে। তার মনে ইচ্ছা জাগে, সে মায়ের কাছ থেকে বাক্সটা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাবে বনের মধ্যে। একদম গভীর বনের মধ্যে। সেখানে কোন মানুষের হিংস্র দৃষ্টি পৌঁছুতে পারবে না কোন দিন। শুধু সে আর তার কচি ভাইটি মনের সুখে খেলা করবে সেখানে। প্রিয় ভাইটিকে সে শুধু আদর করবে। গাছ থেকে ফল পেড়ে এনে নিজে খাবে আর কচি ভাইটিকে খাওয়াবে মিষ্টি মধুর ফলের রস। কেউ তার ভাইয়াকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। সে এগিয়ে গিয়ে মায়ের কাপড় টেনে ধরে।

"আম্মি! আমার আম্মি!......"

"চুপ, মরিয়ম, চুপ করো? ........."

"হায়! হায়! আম্মি আপনি ভাইয়াকে ........."

“চুপ করো, একদম চুপি চুপি বেরিয়ে যেতে হবে এই পাড়া থেকে, তারপর যেখানে লোকজন নেই......."

"এই দুপুর রাতে যেখানে লোকজন নেই? ......"

“হাঁ, হাঁ, চুপ করো, নিরবে হেঁটে চলো। নাহলে তোমার ভাইয়ার ক্ষতি হবে।"

মরিয়ম এবার একদম চুপ হয়ে যায়। লোকালয়ের বাইরে আসতেই সে আর একদণ্ড চুপ থাকতে পারে না। জিজ্ঞেস করে, "আম্মি! আমার আম্মি! এবার বলেন ভাইয়াকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?"

"তোমার ভাইয়াকে নীল নদে ভাসিয়ে দেবো।"

"হায়, হায়, আম্মি! আপনি এ কি কথা বললেন? তাহলে ভাইয়া বাঁচবে কেমন করে? কে তাকে দুধ খাওয়াবে? আমার ভাইয়া যে কেঁদে কেঁদে মারা যাবে। আর নীলের কিনারায় যেসব জন্তু জানোয়ার আছে তারা তাকে খেয়ে ফেলবে। হায়, আমার আম্মি! আপনি কেন এমন কাজ করতে যাচ্ছেন? আপনার দিলে কি একটুও দয়ামায়া নেই? আপনার কলিজার টুকরোকে আপনি এভাবে জন্তু-জানোয়ারের মুখে ছেড়ে দিচ্ছেন? আম্মি! আপনি না পারেন ভাইয়াকে আমার হাতে দিয়ে দিন। আমি তাকে নিয়ে গভীর বনে চলে যাবো। সেখানে কেউ আমাদের নাগাল পাবে না। বাদশাহ ফেরাউনের গুপ্তচরেরা হাজার চেষ্টা করেও আমাদের সন্ধান পাবে না।"

মরিয়ম মায়ের পথ আগলে দাঁড়ায়। বাক্সের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

"না, মরিয়ম না, আমার পথে বাধা দিয়ো না। সবর করো। এটাই আল্লাহর হুকুম। নিশ্চিন্ত থাকো, আল্লাহ তোমার ভাইয়াকে রক্ষা করবেন।”

“এটাই আল্লাহর হুকুম? সত্যি, এটাই আল্লাহর হুকুম?

"হাঁ, মরিয়ম......"

"আহ! আ-ল্লা-হ..! তুমি আমার ভাইয়াকে রক্ষা করো।"

মরিয়ম চোখের পানি মুছতে থাকে। মায়ের পেছনে পেছনে নিরবে চলতে থাকে সে। এখন তারা নীলের কিনারে পৌঁছে গিয়েছে। বর্ষার নীল পানিতে টইটুম্বুর। ছলাৎ ছলাৎ করে বড় ঢেউগুলো এসে কিনারায় আছড়ে পড়ছে। পানির স্রোতও প্রবল। মা এতক্ষণে কাঁধ থেকে কাঠের বাক্সটি নামান। নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে বাক্সটি ভাসাতে যাবেন এমন সময় মেয়ে মায়ের হাত টেনে ধরে।

"আম্মি পানির তোড় দেখছেন না? বাক্সটি এখনি তলিয়ে যাবে।”

“তা ঠিকই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এটাই আল্লাহর হুকুম।” মা বাক্সটি পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে বড়ই নিশ্চিন্তে একটা শ্বাস ফেলেন। বলতে থাকেন: “হে আল্লাহ! আমি তোমার হুকুম পালন করেছি। তোমার হুকুম এক চুলও অমান্য করিনি। হে আল্লাহ! হে রব্বুল আলামীন! আমার সব ভুল-ত্রুটি সব গুনাহ মাফ করে দিয়ো। হে পরওয়ারদিগার! তোমার আমানত তোমারই হাওয়ালা করে দিয়েছি।” মেয়েকে বলেন: “যাও নীলের কিনারে দেখতে দেখতে যাও। দেখো আল্লাহ তার বান্দাকে কিভাবে রক্ষা করেন।"

একথা বলে মা ঘরের পথ ধরেন। মরিয়ম তার ভাইয়ার বাক্সটির ওপর নজর রেখে নীলের কিনারা ধরে হাঁটতে থাকে। কোন বড় ঢেউ এসে যখন বাক্সের গায়ে আছড়ে পড়ে এবং বাক্সটি ঢেউয়ের মাথায় একটি মোচার খোলার মতো ওঠানামা করতে থাকে তখন ভয়ে মরিয়মের মুখ থেকে বের হয়ে পড়েঃ “হে আল্লাহ! এবার বুঝি সব শেষ।” সে বাক্সটি নজরে রেখে 'আল্লাহ' 'আল্লাহ' বলতে থাকে আর চলতে থাকে। কখনো ঢেউয়ের ধাক্কায় বাক্সটি একেবারে নদীর কিনারে চলে আসে। তার মন চায় বাক্সটি তুলে নিয়ে একেবারে বনের গভীরে চলে যায়। কিন্তু আবার মায়ের সেই কথাই মনে পড়ে, “এটাই আল্লাহর হুকুম। দেখো, আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কিভাবে রক্ষা করেন।"

সে চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দেখতে দেখতে পূর্ব দিক ফর্সা হয়ে আসে। ধীরে ধীরে সূর্য উঠে দুনিয়ার সব আঁধার দূর করে দেয়। এমন সময় হঠাৎ সামনে পড়ে একটি বিরাট প্রাসাদ। অনেকখানি জায়গা জুড়ে একেবারে নদীর কিনারা ঘেঁষে এর অবস্থান। নদীর কিনার ধরে সামনে আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সে ভাবে, এবার কি হবে? বাক্সের অনুসরণ করা তো আর সম্ভব হচ্ছে না। প্রাসাদ ঘুরে নদীর কিনারে আসতে আসতে বাক্স অনেক দূর চলে যাবে। এখন কি করা যায়। সে এসব সাত-পাঁচ ভাবছিল এমন সময় দেখে নদীর দিকে প্রাসাদের একটি দরজা খুলে গেছে। মূল্যবান পোশাকে সজ্জিতা অনেকগুলো মেয়ে ঘাটে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে একজন যে সবচাইতে মূল্যবান পোশাকে সজ্জিতা এবং যাঁকে সবচেয়ে সম্মানিতা ও প্রাসাদের কর্ত্রী বলে মনে হয়, তিনি হাত বাড়িয়ে নদীতে বাক্সটির দিকে দেখান। তিনি পাশে দাঁড়ানো একজনকে কি যেন বলেন। তারপর সে দেখে জাল নিয়ে একদল জেলের আবির্ভাব। মুহূর্তের মধ্যে তারা বাক্সটি জালে আটকে ফেলে প্রসাদের দিকে নিয়ে চলে। মরিয়ম দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সেও জেলেদের পেছনে পেছনে চলে। জেলেদের সাথে সাথে সে প্রাসাদের মধ্যে প্রবেশ করে। জেলেরা বাক্সটিকে সেই সুসজ্জিতা ও সম্মানিতা মহিলার হাতে সোপর্দ করে নিজেদের পারিশ্রমিক ও পুরস্কার নিয়ে চলে যায়।

মরিয়ম দাঁড়িয়ে থাকে। সে দেখতে পায় সম্মানিতা মহিলা বাক্সটির ডালা উঠিয়ে ফেলেছেন। বাক্স খুলতেই মহিলার চোখে মুখে বিস্ময় দেখা দেয়। তার মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, "শিশু”।

মরিয়মের বুক দুরু দুরু করতে থাকে। সে প্রাসাদ কর্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে থাকে। তার পা কাঁপতে থাকে। মনে হয় ভাইয়াকে ছিনিয়ে নিয়ে এখনই সে এক ছুটে প্রাসাদের বাইরে চলে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই তার কানে আওয়াজ ভেসে আসেঃ “দেখো, আল্লাহ তার বান্দাকে কিভাবে রক্ষা করেন।” সে নিজের বুকে হাত চেপে ধরে।

প্রাসাদ কর্ত্রী বাক্স থেকে শিশুটি বের করেন। দুহাতের ওপর রেখে তাকে উঁচু করে ধরেন। নিজের ভাইয়াকে জীবিত অবস্থায় আঙ্গুল চুষতে দেখে মরিয়মের আনন্দের সীমা থাকে না। সে চুপচাপ দেখতে থাকে।

প্রাসাদ কর্ত্রী ফুটফুটে শিশুটিকে নিজের মুখের কাছে তুলে আনেন। অসীম মমতায়, মাতৃত্বের গভীর আবেগে আপনা আপনি তার মুখ নেমে যায় শিশুর ঠোঁটের ওপর। তাকে চুমো খান। আদর করেন। তার পাশে দাঁড়ানো দাসীদের হুকুম দেনঃ "এখনি চলে যাও, নগরের সবচেয়ে ভদ্র, অভিজাত, সুন্দরী, যুবতী দাইকে এখানে হাজির করো।"

ব্যাস, শুধু যেন হুকুমেরই অপেক্ষায় ছিল সবাই। তারপর দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যে একের পর এক দাই আসতে থাকে। তারা শিশুকে দুধ পান করাতে চায়। কিন্তু শিশু যেন মুখ বন্ধ করে আছে। মুখ খোলেই না। বিপুল পুরস্কার আর বৃত্তির লোভে অনেকে অনেক রকম কায়দা কসরত চালায়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না।

মরিয়ম এসব দেখতে থাকে। হঠাৎ সে এগিয়ে এসে প্রাসাদ কর্ত্রীর সামনে দাঁড়ায়। সে গভীর প্রত্যয় সহকারে বলে: "যদি আপনি অনুমতি দেন তাহলে আমি এমন এক দাইকে হাজির করতে পারি, যার দুধ এই শিশু খাবে বলে আমার নিশ্চিত বিশ্বাস।”

"যাও, এখনই চলে যাও। তাকে নিয়ে এসো।"

মরিয়ম একছুটে প্রাসাদ থেকে বের হয়। তার খুশীর আর অন্ত নেই। মহান ও অসীম ক্ষমতাশালী আল্লাহর প্রশংসা করার ভাষা তার ছিল না। সারাটা পথ যেন সে বাতাসে উড়ে আসে। কোন পাথরে ঠোকর লেগে তার পায়ের নখ ফেটে গেছে, শরীরের কোথাও মারাত্মক আঘাত লেগেছে অথবা পথের পাশের কাঁটাগাছের ঘষা লেগে তার পায়ের চামড়া কোথাও ছিঁড়ে গেছে- এসব সে কোনো রকম টেরই পায়নি। কোনো এক দুর্বার আকর্ষণ, কোন এক অপরিসীম মোহ যেন তাকে পেয়ে বসেছে।

সে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। "আম্মি..... আম্মি..."

মা যেন এই ডাকের প্রতীক্ষায় ছিলেন। তিনি যেন তৈরী হয়েই বসে ছিলেন। "এই যে মরিয়ম বাছা আমার,” বলে তিনি লাফিয়ে মেয়ের সামনে আসেন। তার মুখে হাত চাপা দিয়ে ঘরের এক কোণে তাকে টেনে নিয়ে যান।

মরিয়ম বলে চলে, "আম্মিজান, আল্লাহ তার বান্দাকে রক্ষা করেছেন।" মেয়ে মায়ের চোখের দিকে তাকায়। তার আম্মি কি চিন্তিত? কই না তো, চিন্তার লেশমাত্র তাঁর চোখের কোণায় দেখা যাচ্ছে না। আশঙ্কার কোন ছাপ নেই সেখানে। আল্লাহর হুকুমের ওপর কী অটল বিশ্বাস! এজন্যেই তো সে তার আম্মিকে এতো ভালবাসে। মা মেয়ের মনের কথা টের পায়। বলেন, মরিয়ম, আল্লাহর হুকুমে আমি বিশ্বাস করেছিলাম। আমি জানতাম আল্লাহ আমার ছেলেকে রক্ষা করবেন। জালেম বাদশাহ ফেরাউনের জল্লাদের হাত থেকে আমার ছেলেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। আল্লাহ ফেরাউনের প্রাসাদেই তার বাঁচার ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর অসীম দয়া। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় তাঁর দুচোখ পানিতে ভরে গেলো।

মরিয়ম বলে উঠলো "আম্মি, তাহলে চলেন রাজপ্রাসাদে। ভাইয়া যে আপনার দুধ ছাড়া আর কারোর দুধ খাবে না।"

কাপড়ের পোটলা একটা বগলে নিয়ে মা ও মেয়ে বেরিয়ে পড়ে। যখন তারা রাজ প্রাসাদে পৌঁছুলো তখন ভিড় আরো বেড়ে গেছে। প্রাসাদকর্ত্রীর মুখে দস্তুরমতো হতাশার ছায়া পড়েছে। অত্যন্ত বিমর্ষ মনে হচ্ছিল তাঁকে। ওদের দেখেই বলে উঠলো। "এই যে মেয়ে, তুমি না বলেছিলে ভাল দাই আনবে?"

"এই যে এনেছি বেগম সাহেবা।" মরিয়ম তার আম্মিকে এগিয়ে দেয়। আম্মি এগিয়ে যান। মনে মনে আল্লাহর শোকর আদায় করেন। ছেলেকে কোলে তুলে নেন। ততক্ষণে শিশু মায়ের কোলে উঠে চুক্ চুক্ করে দুধ খেতে শুরু করেছে।

কুরআনে বর্ণিত মুসা আলাইহিস সালামের কাহিনী অবলম্বনে রচিত।

প্রশ্নের জবাব দাও
১. মরিয়মের মা শিশুপুত্রকে বাক্সবন্দী করে নীলের পানিতে ভাসিয়ে দেন কেন? কার ভয়ে? শিশুর বয়স ছিল কত?
২. কে বাক্সটি উঠিয়ে নেয়? কিভাবে উঠিয়ে নেয়?
৩. আল্লাহ ফেরাউনের জল্লাদের হাত থেকে কিভাবে শিশুকে রক্ষা করেন?
৪. ফেরাউনের হুকুমটি কি ছিল?
৫. শিশু কিভাবে তার মায়ের কোলে ফিরে এলো?

📘 মজার গল্প > 📄 হযরত লোকমানের নসীহত

📄 হযরত লোকমানের নসীহত


আমরা অনেক জ্ঞানীর কথা জানি। জ্ঞানবান ও বুদ্ধিমান লোকেরা তাঁদের জ্ঞান ও বুদ্ধির সাহায্যে অনেক অসাধ্য সাধন করেছেন। তাঁরা বড় বড় বই লিখেছেন। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার করেছেন। নানা ধরনের মেশিন-কলকব্জা তাঁদের দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ। বেতার, টেলিভিশন, বিজলী, রেলগাড়ি, উড়োজাহাজ, নৌযান ইত্যাদি তৈরি করে তাঁরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁদের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার কথা অস্বীকার করবে দুনিয়ায় এমন একজন লোকও নেই।

কিন্তু যাঁরা বুদ্ধি খাটিয়ে বড় বড় মেশিন তৈরি করেছেন এবং সেগুলোকে কাজে লাগাবার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন তাঁরা যদি এই এত বড় বিশ্ব জাহানের সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও পরিচালককে চিনতে না পারেন, দুনিয়ায় ও আকাশে তাঁর কর্মকুশলতা দেখতে না পান, তাহলে তাঁদের বুদ্ধিকে আমরা কি বলে অভিহিত করবো? তাঁরা কি সত্যি বুদ্ধিকে ঠিক মত ব্যবহার করছেন? তাঁরা এত কথা চিন্তা করেন, এত বড় বড় জিনিস আবিষ্কার করেন কিন্তু একবারও ভেবে দেখেন না তাঁরা নিজেরা কোথা থেকে এসেছেন? কেন এসেছেন? এ বিশ্ব জাহান কে সৃষ্টি করেছেন? তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্ক কি?

হযরত লোকমান ছিলেন একজন বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী পুরুষ। আল্লাহ তাঁকে সত্যকে জানার জ্ঞান দিয়েছিলেন। মানুষের মধ্যে সেই বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী যে তার সৃষ্টিকর্তা ও প্রকৃত মালিক আল্লাহকে চিনতে পারে। হযরত লোকমান তাঁর সৃষ্টিকর্তা ও মালিক আল্লাহকে চিনতেন। তিনি জানতেন বিশ্ব জগতের সমস্ত জিনিস কে তৈরি করেছেন। কে তিনি যিনি মানুষকে এ অপার নেয়ামত দান করেছেন। আবার তিনি এই দয়াময় মহান প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা কিভাবে প্রকাশ করতে হয় তাও জানতেন।

হযরত লোকমান ছিলেন বড়ই নেকবখত ও আল্লাহর প্রিয় বান্দা। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাঁর কথা বলেছেন। অনেকে তো এমন কথাও বলেছেন যে, হযরত লোকমান ছিলেন আল্লাহর নবী এবং হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের আত্মীয়। আবার অনেকে বলেন, তিনি আল্লাহর নবী নন তবে তাঁর সময়ের অনেক বড় জ্ঞানী, পণ্ডিত ও সৎ লোক। সে যাই হোক তিনি নবী না হলেও ছিলেন তো একজন মস্ত বড় বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ও সৎ লোক। আল্লাহ নিজেই বলেছেন: আমি লোকমানকে দিয়েছিলাম জ্ঞান। উদ্দেশ্য ছিল, এর সাহায্যে সে আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।

জ্ঞান আল্লাহর একটি নেয়ামত। এ নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের একটাই পদ্ধতি। যেহেতু এ নেয়ামত আল্লাহ দান করেছেন তাই এজন্যে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হলে তার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে এই যে, তাঁর নেয়ামত এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না যাতে তিনি নারাজ হন। তিনি যে সব নেয়ামত দান করেছেন সেগুলো তাঁর দেয়া নিয়ম অনুযায়ী তাঁর হুকুমমতো এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্যে ব্যবহার করতে হবে। সাধারণত আমরা কারোর কোনো দানের বিনিময়ে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। এতে তার কিছু লাভও হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর নেয়ামতের জন্যে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তাতে আমাদেরই লাভ হয়, আল্লাহর কোনো লাভ হয় না। আল্লাহর সত্তা এ ধরনের কোনো লাভ ও লোকসানের অনেক ঊর্ধ্বে।

সন্তানও আল্লাহর একটি নেয়ামত। এ নেয়ামতের জন্যে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মানুষের অবশ্য কর্তব্য। আর স্বাভাবিকভাবেই এ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পদ্ধতি হবে এই যে, মানুষ তার সন্তানকে এমনভাবে লালন পালন করবে যার ফলে সে বড় হয়ে আল্লাহর একান্ত অনুগত বান্দায় পরিণত হয়। সে হয় একজন সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ। হযরত লোকমানকেও আল্লাহ সন্তান দান করেছিলেন। তিনি এ নেয়ামতের জন্যে কিভাবে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন কুরআনে তা বর্ণনা করা হয়েছে।

হযরত লোকমান প্রথমেই অত্যন্ত স্নেহ ও মমতা সহকারে তাঁর ছেলেকে বললেনঃ হে আমার প্রিয় পুত্র! আমার, তোমার এবং এ সমগ্র বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও প্রভু যে আল্লাহ তাঁর কোনো শরীক, সাথী ও সহযোগী নেই। তিনি একা। তাঁর মতো বা তাঁর সমান কেউ নেই। তাঁর কোনো পিতা নেই এবং তিনিও কারোর পিতা নন। তিনি এমন সব গুণের অধিকারী যা আর কারোর নেই। যেমন, তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সব কিছু দেখতে পান। এটা অন্য কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি যেমন সব কিছু শুনতে পান অন্য কারোর সে ক্ষমতা নেই। মনের গোপন চিন্তা, গোপন কথা ও গোপন অভিসন্ধি একমাত্র তিনিই জানতে পারেন, অন্য কেউ এর কোনো কল্পনাই করতে পারে না।

তাঁর অধিকারেও কেউ তাঁর শরীক নেই। মানুষ তাঁর সামনে হাত বেঁধে দাঁড়াবে এবং তাঁর বন্দেগী করবে, এটা তাঁর অধিকার। তাঁর অধিকার হচ্ছে, মানুষ তাঁর হুকুম মেনে চলবে এবং তাঁর কাছে নজরানা ও মানত পেশ করবে। হুকুম দেয়া ও দুনিয়ায় মানুষের চলার জন্যে আইন রচনা করা তাঁর অধিকার। এসব অধিকার ভোগ করার মতো তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো সত্তা নেই।

ক্ষমতায়ও আল্লাহর সাথে কেউ শরীক নেই। জীবন-মৃত্যু তাঁর হাতে। মানুষের প্রার্থনা, আবেদন-নিবেদন ও ফরিয়াদ তিনি শোনেন। ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি সব তাঁর আয়ত্তে রয়েছে। তিনিই কাউকে সফলতা দান করেন আবার কাউকে ব্যর্থ করে দেন। এ ক্ষমতার ছিটেফোঁটাও অন্য কারোর আয়ত্তে নেই।

হযরত লোকমান বলেনঃ হে আমার প্রিয় পুত্র! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করাই হচ্ছে এ দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় জুলুম। মানুষের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে তার নিজের ও এ বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তাকে জানতে ও চিনতে হবে এবং তাঁর হুকুম মেনে চলতে হবে।

আল্লাহর হুকুম মানা ও তাঁর বন্দেগীর পর মানুষের জন্যে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাপ-মায়ের অধিকার। আল্লাহর অধিকারের পর মানুষের জন্যে বাপ-মায়ের অধিকারের চাইতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো জিনিস নেই। কুরআন মজীদে হযরত লোকমানের নসীহতের আলোচনার মাঝখানে আল্লাহ বাপ-মায়ের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন: “মানুষকে তার বাপ-মায়ের অধিকারের প্রতি নজর রাখার জন্যে আমি কঠোরভাবে তাকিদ করেছি। কেমন বিপদ মাথায় নিয়ে তার মা তাকে লালন পালন করেছে। কতদিন পর্যন্ত সে তাকে নিজের পেটের মধ্যে রেখেছে এবং বিপদের পর বিপদের মুখোমুখি হয়ে নির্দিষ্ট সময়কাল পূর্ণ করেছে। তারপর দু'বছর পর্যন্ত দুধ পান করিয়েছে।"

হযরত লোকমানের নসীহতের মাঝখানে আল্লাহ আরো কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে উপদেশ দেন। তারপর আবার হযরত লোকমানের নসীহত শুরু হয়ে যায়। এ পর্যায়ে তিনি বলেন: "হে আমার প্রিয় পুত্র! আল্লাহর জ্ঞান বড়ই সুদূর প্রসারী। যদি কোনো জিনিস হয় সরিষার দানার সমান এবং লুকিয়ে থাকে কোনো কঠিন পাথরের বুকে অথবা সুদূর মহাশূন্যে আকাশের নীলিমায় কোথাও তা উড়ে চলে যায় কিংবা মাটির বুকে কোথাও তাকে প্রোথিত রাখা হয়, তাহলে তা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে যেতে পারে না। আল্লাহ যখনই চাইবেন তাকে নিজের সামনে হাজির করতে পারবেন। তাঁর জ্ঞান বড়ই ব্যাপক ও বিস্তৃত। তিনি সব খবর রাখেন, সব কিছু দেখেন, সব কিছু শোনেন এবং সব জিনিস খুব ভালোভাবে জানেন।"

আল্লাহর এ গুণাবলীকে হযরত লোকমান এজন্যে পরিষ্কার করে তাঁর ছেলের সামনে তুলে ধরেন যে, এগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে আল্লাহর মূল সত্তা সম্পর্কেও সঠিক ধারণা সৃষ্টি হবে না। ফলে আল্লাহর প্রতি ঈমান পূর্ণতা লাভ করবে না।

আল্লাহর গুণাবলীর কথা ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়ার পর এবার হযরত লোকমান তাঁর ছেলেকে বলেছেন নামায পড়ার জন্যে। তিনি বলেন: “হে আমার প্রিয় পুত্র! তুমি নামায কায়েম করো।" নামায এমন একটি কাজ যা মানুষকে আল্লাহর পথে প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারে। আল্লাহকে জানা, তাঁকে চিনে নেয়া এবং তাঁর গুণাবলীর প্রতি ঈমান আনার পর জীবনকে তাঁর হুকুমের ছাঁচে ঢেলে সাজাতে হলে নামায কায়েম করার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। যদি দুনিয়ায় ও আখেরাতে সফলকাম হতে হয় তাহলে নামায কায়েম করা ছাড়া দ্বিতীয় আর কোনো পথ নেই।

নামায কায়েম করা ও নামায পড়ার মধ্যে একটা পার্থক্য অবশ্যই আছে। নামায কায়েম করা মানে হচ্ছে, নামায পড়ার জন্যে যত রকম নিয়ম কানুন আছে সব ঠিকমতো ও ভালোভাবে মেনে চলা। যেমন পাক-পবিত্রতা, সময়ের প্রতি নজর রাখা, জামায়াতের সাথে নিষ্ঠা, মনোযোগ ও বিনয়-নম্রতা সহকারে নামায পড়া। জেনে বুঝে এমন কোনো কাজ না করা যাতে নামাযে কোনো ত্রুটি দেখা দেয়।

শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর গুণাবলী মেনে নেয়া এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ইসলামের মৌলিক বিধানগুলো মেনে চলাই একজন মুসলমানের জন্যে যথেষ্ট নয়। তাই হযরত লোকমান এসব কথা বলার পর তাঁর ছেলেকে একথাও বলেছেন: “হে আমার প্রিয় পুত্র! মানুষকে ভালো কাজ করার আদেশ দাও এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখো।” আসলে দুনিয়ায় মুসলমান হয় আল্লাহর সেনা। দুনিয়ায় আল্লাহর নাফরমানী হতে দেখলে সবার আগে মুসলমান বাধা দেয়ার জন্যে এগিয়ে যায়। মুসলমান কেবল নিজে ভালো হয়ে যাওয়াকে যথেষ্ট মনে করে না বরং অন্যকেও ভালো করা এবং তাকে সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করাকেও সে নিজের কর্তব্য মনে করে। এজন্যে শুধুমাত্র উপদেশ ও অনুরোধ যথেষ্ট হয় না। কারণ যারা আল্লাহর হুকুম মানেনা, তারা নাফরমানী করে এবং অসৎ পথে চলে। তারা দু-চার কথায় নিজেদের পথ ছেড়ে ভালো পথে চলে আসতে রাজী হয় না। তারা বাধা দিতে থাকে। ফলে আল্লাহর সৎ মুমিন বান্দাদের জন্যে এটা হয় বেশ কঠিন পরীক্ষার সময়।

তাই হযরত লোকমান তাঁর ছেলেকে এ কঠিন সংকটের মোকাবেলা করার জন্যে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন : “হে প্রিয় পুত্র! এ পথে যেসব বাধা-বিপত্তি আসে, ধৈর্যের সাথে তার মোকাবেলা করো। এটাই মানুষের করার মতো সবচেয়ে বড় কাজ।”

আল্লাহর দীনের দিকে মানুষকে আহ্বান করার হিম্মত এবং দৃঢ়তা ও ধৈর্য সহকারে এ পথে সমস্ত প্রতিকূলতার মোকাবেলা করার সাথে সাথে আর একটা জিনিসেরও প্রয়োজন। সেটা হচ্ছে চারিত্রিক মাধুর্য। যে ব্যক্তি কোমল স্বভাবের নয় এবং মানুষের সাথে অমায়িক ব্যবহার করতে পারে না, সে কখনো আল্লাহর দীনের একজন ভালো আহ্বায়ক হতে পারে না। একজন বদমেজাজী ও অহংকারী কখনো অন্যের মনে নিজের কথা প্রবেশ করাতে পারে না।

তাই হযরত লোকমান নিজের ছেলেকে যে শেষ ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ নসীহতটি করেন সেটা হচ্ছেঃ “হে প্রিয় পুত্র! অহংকারের বশে মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কথা বলো না। গর্বভরে বুক চিতিয়ে মাটির ওপর চলাফেরা করো না। আল্লাহ অহংকারী ও নিজেদের যারা বড় মনে করে তাদেরকে মোটেই পছন্দ করেন না। মাটির ওপর দিয়ে যখন চলবে ভালো লোকের মতো চলার মধ্যে সমতা রেখে চলবে। কারোর সাথে কথা বলার সময় অনর্থক চেঁচিয়ে কথা বলবে না বরং কথা বলার ভঙ্গি ও আওয়াজের মধ্যে সমতা রেখে কথা বলবে। গাধাকে দেখো, কেমন চিৎকার করে। সবাই জানে গাধার চিৎকার সব চেয়ে কর্কশ ও শ্রুতিকটু।”

এ হচ্ছে পুত্রের প্রতি একজন ভালো পিতার নসীহত। এগুলো পালন করে প্রত্যেকটি ছেলে-মেয়ে যেমন সুসন্তান হতে পারে তেমনি হতে পারে দেশের দায়িত্বশীল নাগরিক।

প্রশ্নের জবাব দাও
১. হযরত লোকমান কে ছিলেন?
২. এ দুনিয়ায় সব চেয়ে বড় জুলুম কি?
৩. কুরআনে বাপ-মায়ের অধিকার প্রসংগে মায়ের ব্যাপারে কি বলা হয়েছে?
৪. নামায কি? নামাযের প্রয়োজন কেন?
৫. হযরত লোকমানের শেষ নসীহতটি কি ছিল?

📘 মজার গল্প > 📄 লা-জওয়াব নমরুদ

📄 লা-জওয়াব নমরুদ


'কি হে তোমাদের কি হয়ে গেলো, খাচ্ছোনা কেন? এতো এতো সব খাবার-দাবার, ফল-ফলার, মিষ্টান্ন। নাও আর দেরি করো না। সবাই মেলায় চলে গেছে এবার নিশ্চিন্তে খেতে থাকো।'

'কি ব্যাপার, তোমাদের হলো কি? কেউ কোনো কথা বলছো না কেন?'

'তোমরা না সবার প্রার্থনা পূর্ণ করে থাকো। যে যা চায় তাকে তাই দিয়ে দাও। কিন্তু কই কেউ তো দেখি একটু নড়াচড়াও করতে পারো না। আমি জানি তোমরা মাটি আর পাথরের তৈরি মূর্তি ছাড়া আর কিছুই নও।'

এই বলে হাতের কুড়ালটা নিয়ে ঝপাঝপ মারতে থাকলেন কোপ মূর্তিগুলোর ঘাড়ে, মাথায়, কোমরে, পিঠে, যার যেখানে হাত চলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মূর্তিগুলো ভেঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। এখন রয়ে গেলো শুধু বড় মূর্তিটা। ওটাকে আর না ভেঙ্গে ওটারই গলায় ঝুলিয়ে দিলেন কুড়ালটা এবং তারপর বেরিয়ে পড়লেন মন্দির থেকে।

বেলা শেষে মেলা থেকে লোকেরা ফিরে আসতে লাগলো। জনসমাগমে শহর আবার গমগম করতে লাগলো। কিন্তু মন্দিরের মধ্যে ঢুকে তো লোকদের চোখ ছানাবড়া। ঠাকুর-দেবতাদের একি অবস্থা! ভেঙ্গেচুরে চারদিকে একেবারে ছত্রখান হয়ে আছে! যেন বিরাট যুদ্ধ হয়ে গেছে। এদের এ অবস্থা করলো কে?

'নিশ্চয়ই এ সেই যুবকটির কাজ', কয়েকজন একসাথে বলে উঠলো, 'তাকে আমাদের দেবতাদের বিরুদ্ধে যা তা বলতে শুনেছি।'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই। সেতো মেলায় যায়নি। বলছিল তার শরীর নাকি খারাপ।' পাশ থেকে আরো কয়েকজন ফুঁসে উঠলো। 'তার নাম বুঝি ইবরাহিম।'

কাজেই কিছুক্ষণের মধ্যেই হযরত ইবরাহিমকে পাকড়াও করে আনা হলো মন্দিরের মধ্যে। সব লোকেরা সেখানে জড়ো হয়ে গিয়েছিল।

'তুমি এ কাজ করেছো? ইবরাহিম! তুমিই কি এ দুর্গতি করেছো আমাদের দেবমূর্তিগুলোর?'

'বাহ! অবাক করলে তোমরা। আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন? এতদিন ধরে তোমরা এদের পূজা করে এলে। এতো ক্ষমতা এদের। কত বড় বড় জিনিস তোমরা এদের কাছে চেয়েছো। এরা সংগে সংগেই তোমাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে দিয়েছে। এদেরকেই জিজ্ঞেস করো, এরাই বলে দিতে পারবে। আমাতো মনে হয় এই বড়টাই এ কাজ করেছে। দেখছো না কুড়ালটা এর গলাতেই ঝুলছে।'

'তুমি তো জানো ইবরাহিম, আমাদের দেবতারা কথা বলতে পারে না।'

'তাহলে ভেবে দেখো, যখন এরা কথাও বলতে পারে না, নিজেরাই নিজেদের সাহায্য করতে পারেনা, তখন তোমাদের সাহায্য করবে কেমন করে? তোমরা কি এমনসব প্রাণহীন অবোধ মূর্তিদের পূজা করবে যারা তোমাদের কোন কল্যাণও করতে পারে না, কোন ক্ষতিও করতে পারে না? তোমাদের জন্যে দুঃখ হয় এবং তোমাদের এ ঠাকুর দেবতাদের জন্যেও। তোমরা আল্লাহর পূজা করোনা। অথচ তিনি সকল ক্ষমতার আধার। তোমরা এই এদেরকে পূজা করো। অথচ এদের কোন ক্ষমতাই নেই। তোমরা একটু বুদ্ধি খাটাও, চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করো।'

হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দুঃসাহসের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। উত্তেজিত লোকেরা তাঁর চার পাশে জড়ো হতে লাগলো। দেখতে দেখতে জমায়েত অনেক ভারী হয়ে উঠলো। সুযোগ বুঝে হযরত ইবরাহিম সবাইকে সম্বোধন করে বলে উঠলেন:

"আমি অবাক হচ্ছি, নিজের হাতে তোমরা যেসব মূর্তি তৈরি করো তাদেরকেই আবার পূজা করো। কিন্তু আসলে তোমাদেরকে তো আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যা কিছু তৈরি করো তা সবই তাঁরই সৃষ্টি।”

জনসমুদ্রে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের উপদেশের কোন প্রভাব পড়লো না। তারা তো হুজুগে মেতে উঠেছিল। হুজুগের কাছে সত্য ও যুক্তির কোন দামই ছিল না। উল্টো তারা মারমুখী হয়ে উঠলো। দেবতাদের বিরুদ্ধে গোস্তাখী করার জন্যে তাঁর উপর চড়াও হলো। একদল বললো, 'চলো তাকে বাদশাহর কাছে নিয়ে যাই। বাদশাহর আদেশে তাকে চরম শাস্তি দিতে হবে।' ইতিমধ্যে বাদশাহর দরবারেও এ খবর পৌঁছে গিয়েছিল। এ সময় ইরাকের বাদশাহর উপাধি ছিল নমরূদ। নমরূদ কেবল প্রজাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাই ছিল না বরং সে তাদের খোদা ও উপাস্য হিসেবেও নিজেকে জাহির করেছিল। ফলে প্রজারা বিভিন্ন দেব-দেবীর সাথে সাথে তারও পূজা করতো।

হযরত ইবরাহিমের ঘটনা শুনে নমরূদ ক্ষেপে গেলো। সে ভাবলো ইবরাহিমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে সে আমার খোদায়ী তো আছেই এমনকি আমার বাদশাহীর জন্যেও চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। তাই তাঁকে উচিত শাস্তি দেয়ার জন্যে দরবারে হাজির করলো। নমরূদ বললোঃ

'তোমার এত বড় স্পর্ধা, আমার রাজ্যে বাস করে আমাদের বাপ-দাদার ধর্ম অস্বীকার করো? আমাকে খোদা বলে মানো না?'

'আমি এক আল্লাহর ইবাদত করি' হযরত ইবরাহিম (আ) বললেন, 'তাঁর সাথে কাউকে শরীক করি না। পৃথিবী, আকাশ ও এ সবের মধ্যে যা কিছু আছে এ সবই তাঁর সৃষ্টি। তিনি সবার মালিক ও প্রভু। তুমিও আমাদের মতো একজন মানুষ। কাজেই তুমি কেমন করে খোদা বা উপাস্য হতে পারো? এবং এই প্রাণ ও বাকশক্তিহীন মাটি ও পাথরের মূর্তিগুলোই বা খোদা হয় কেমন করে?'

নমরূদ বললো, 'আমি ছাড়া যদি তোমার অন্য কোন রব থাকে, তাহলে তার এমন কিছু গুণাবলী বর্ণনা করো, যেগুলো আমার মধ্যে নেই।'

হযরত ইবরাহিম (আ) বললেন, 'আমার রব জীবন ও মৃত্যুর অধিকারী। তিনিই মৃত্যু দান করেন এবং তিনিই জীবন দান করেন।'

নাদান বাদশাহ নমরূদ জীবন ও মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য না বুঝে বলে দিল, 'আমিও জীবন মৃত্যু দান করি।' এই বলে তখনই একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে ধরে এনে হত্যা করলো এবং একজন ফাঁসির আসামীকে মুক্তি দিয়ে দিল। তারপর ইবরাহিমের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললো, দেখলে তো আমি কিভাবে জীবন ও মৃত্যু দান করি, এখন বলো কোথায় থাকলো তোমার খোদার বিশেষ গুণ?''

হযরত ইবরাহিম (আ) বুঝতে পারলেন, নমরূদ তার লোকদের ধোকা দেয়ার চেষ্টা করছে অথবা সে জীবন ও মৃত্যুর রহস্য বোঝে না। কাউকে ফাঁসির মঞ্চ বা মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো তো তাকে জীবন দান এবং কাউকে হত্যা করা তো তাকে মৃত্যু দান করা হয় না। এর ফলে ঐ ব্যক্তি জীবন ও মৃত্যুর মালিক হয়ে যায় না। জীবন ও মৃত্যুর সম্পর্ক তো প্রাণের সাথে। কোন ব্যক্তিকে বাঁচাবার পর সে কি তার প্রাণের মালিক হয়ে যায়? সে ব্যক্তির প্রাণ কি তার হাতে এসে যায়? অথবা কোন ব্যক্তিকে মেরে ফেলার পর তার প্রাণ কি তার হাতে এসে যায়? হত্যাকারী কি নিহত ব্যক্তির প্রাণের মালিক হয়ে যায়? তার প্রাণতো তার নির্দিষ্ট জায়গায় চলে যায়, যেখানে হত্যাকারীর কোন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নেই। হত্যাকারী কেবল তার মরা দেহটা আগলে থাকতে পারে, যার মধ্যে প্রাণ নেই। তাহলে প্রাণ তার হাত ছাড়া হয়ে যায়। ফলে প্রকৃত পক্ষে হত্যাকারী ও জীবনদানকারী জীবন ও মৃত্যুর মালিক হয় না। জীবন ও মৃত্যুর মালিক হন তার স্রষ্টা আল্লাহ। কিন্তু সাধারণ লোকের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে ভুল বুঝার অবকাশ ছিল এবং নমরূদ তারই আশ্রয় নিয়েছিল।

এতে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আসল উদ্দেশ্য সফল হচ্ছিল না। তিনি চাচ্ছিলেন আল্লাহর একত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে। তাই তিনি এবার আরো সহজ ও সোজা কথায় চলে এলেন। এবার তিনি বললেন, 'আমি এমন এক আল্লাহকে মানি যিনি পূর্ব দিক থেকে সূর্য উঠান, তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে উঠাও।” এ কথায় নমরূদ হতভম্ব ও লা-জওয়াব হয়ে গেলো। কারণ পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠাবার ক্ষমতা তার ছিল না। কাজেই সাধারণ মানুষকে ধোকা দেয়ার জন্যে সে এবার আর বলতে পারলো না, ঠিক আছে দেখো আমি পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠাচ্ছি।

এভাবে সত্যের কাছে মিথ্যা চিরকাল লা-জওয়াব হয়ে এসেছে। কিন্তু তার গোঁড়ামি যায়নি। এটা তার চিরকালের স্বভাব।

গল্পটি কুরআনের আলোকে রচিত

প্রশ্নের জবাব দাও
১. মূর্তিরা কি কথা বলতে পারে? কাউকে সাহায্য করতে পারে? কারোর কল্যাণ করতে পারে?
২. লোকেরা মেলায় গেলে হযরত ইবরাহিম মন্দিরের মধ্যে কি করেছিলেন?
৩. হযরত ইবরাহিমের সময় ইরাকের বাদশাহ কে ছিল? সে নিজেকে কি বলে দাবি করতো?
৪. জীবন ও মৃত্যুর প্রকৃত মালিক কে? কেমন করে?
৫. হযরত ইবরাহিম কিভাবে নমরূদকে লা-জওয়াব করেছিলেন?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00