📄 চাষী আল্লাহর অনুগত
এক ছিল চাষী। তার ছিল জমি। এক চিলতে নয়, বেশ খানিকটা। আর সেই জমিতে সে করতো চাষ-আবাদ। চাষী ছিল যেমন সৎ তেমনি চরিত্রবান। সে কারোর জমির আইল ঠেলতো না। প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া-ঝাঁটি করতো না। সব কাজে আল্লাহর হুকুম মেনে চলতো।
চাষী চাষ করতো নিজের জমি। সকাল হলেই ফজরের নামায সেরে গরুর কাঁধে লাঙ্গল দিয়ে মাঠে নামতো। ক্ষেতে লাঙ্গল দিতো, সার দিতো, বীজ বুনতো, সব কিছু করতো কিন্তু ভরসা রাখতো আল্লাহর রহমতের ওপর। আল্লাহও তেমনি তার মেহনতের ফল দিতেন। তার ক্ষেতে শস্য ঢেলে দিতেন অজস্র। আশে-পাশের সব ক্ষেতের তুলনায় তার ক্ষেতে শস্য হতো অনেক বেশী। আর সব ক্ষেত শুকিয়ে গেলেও বা কোন প্রকার দুর্যোগে ফসল নষ্ট হয়ে গেলেও তার ক্ষেত সব সময় শস্য-শ্যামল থাকতো।
কিন্তু তার ক্ষেতে এই অজস্র ফসলের রহস্য খুব কম লোকই জানতো। সবাই মনে করতো এ সব বুঝি তার বেশী মেহনতের ফল।
একবার ভীষণ গরম পড়লো। রোদের তাপে ক্ষেতের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেলো। পুকুরের পানিও শুকিয়ে যেতে লাগলো। গাছ পালায়, ঘরের চালে কাকেরা কা কা চীৎকার করতে লাগলো। সারাটা দুনিয়া যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। হায় আল্লাহ, একি হলো! মানুষ সব সময় আকাশের দিকে চেয়ে থাকতো মেঘের আশায়। কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে যেতো। কিন্তু আবার পরক্ষণেই প্রবল বাতাস সেগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতো দেশ থেকে দেশান্তরে। একটু আগেই যেখানে বিপুল আশায় মানুষের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। সেখানে আবার নিমেষেই সব আশা উবে যেতো। মানুষের দুর্ভাবনা বেড়ে গেল। সবাই চিন্তা করতে লাগলো, এবার কি হবে। বৃষ্টির অভাবে এবার ক্ষেতে ফসল হবেই বা কেমন করে!
কিন্তু ওই সৎ চাষীর কোন চিন্তাই ছিল না। তার মনে কোন দুঃখ বা খেদও ছিল না। লোকেরা মনে করলো, এ বছর বৃষ্টি হচ্ছে না। কাজেই ক্ষেতে ফসল হবে না। ক্ষেতে মেহনত করেই বা কি হবে? আর সৎ চাষীর ক্ষেতে বা ফসল হবে কেমন করে? সে ক্ষেতে মেহনত করলেও তার সব মেহনত বিফলে যাবে। পানির অভাবে একদানাও শস্য পাবে না সে।
এভাবে কিছু দিন কেটে গেলো। একদিন আকাশে কালো মেঘ দেখা গেলো। দেখতে দেখতে সারা আকাশ মেঘে ছেয়ে গেলো। মানুষের মনে আশা জাগলো এবার বুঝি বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি হলো, সত্যি বৃষ্টি হলো। কিন্তু কোথায় যেখানে মাটি নেই, ক্ষেত নেই, পাথর শুধু পাথর। মেঘ তার সব সম্পদ পাথরের ওপর পাহাড়ের বুকে ঢেলে দিয়ে চলে গেলো। মানুষ আবার নিরাশায় ডুবে গেলো।
আল্লাহর মহিমা বোঝা কার সাধ্যি! যে পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছিল তার ওপর থেকে একটি নালা নীচে ক্ষেতের দিকে নেমে এসেছিল। নালাটি ওই সৎ চাষীর ক্ষেতের পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল। বৃষ্টি নামতে দেখে ওই ব্যক্তি নিজের ক্ষেতে পৌঁছে গেলো। সে আল্লাহর শোকর গুজারী করলো। কোদাল দিয়ে নালার মুখটি কেটে নিজের ক্ষেতের দিকে ঘুরিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে তার ক্ষেত পানিতে ভরে গেলো। ফলে অন্যান্য ক্ষেতে কোনো ফসল হলো না। কিন্তু তার ক্ষেতে শস্য ভরে গেলো।
তার ক্ষেতের অবস্থা দেখে, মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগলো। কারোর ক্ষেতে ফসল হলো না, তার ক্ষেতে ফসল হলো কেমন করে?
"এবার তার সব পরিশ্রম মেহনতই তো অর্থহীন ছিল?"
"তা ঠিক, তবে তার জমির মাটি উর্বর।”
"না কখখনো না, আর সব জমির মতো তার জমিও সমান উর্বর।”
"তাহলে কি ব্যাপার? তার জমিতে ফসল হলো কেন?"
লোকেরা অনেক চিন্তা করলো, অনেক বাদানুবাদ করলো কিন্তু এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলো না। অবশেষে সবাই একবাক্যে বললোঃ "চলো তার কাছ থেকেই এর কারণ জানা যাক।" চলো তার কাছে চলো। তারা সবাই তার কাছে এলো। তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ "ভাই, একটা ব্যাপারের কোনো রহস্যই আমরা বুঝতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়ে তোমার কাছে এসেছি। তুমি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে অনেক কিছু জানো। যদি তুমি অসন্তুষ্ট না হও তাহলে তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই।"
"নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবে। অসন্তুষ্ট হবো কেন?”
"এই কাঠফাটা রোদ্দুরে সবার ক্ষেত ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।----।”
"হ্যাঁ, তা জানি।”
"কিন্তু তোমার ক্ষেত শস্য-শ্যামল হয়ে উঠেছে।"
"হ্যাঁ তাতো সবাই জানে।"
“এই প্রচণ্ড গ্রীষ্মে সবার ক্ষেতের মাটিগুলোই শুধু আছে। বৃষ্টি না হবার কারণে কেউ শস্যের একটি দানাও পায়নি।"
"তা অবশ্য আমি জানি।"
"কিন্ত তোমার ক্ষেতে সবুজের সমারোহ, শস্যে সমগ্র ক্ষেত ভরে গেছে।"
"এতে কোন সন্দেহ নেই।"
"আমরা মনে করেছিলাম সবার ক্ষেতের যা অবস্থা তোমার তাই হবে। তবে যেহেতু তুমি বেশী মেহনত করো, ক্ষেতের ও ফসলের বেশী যত্ন নাও, তাই আগে তুমি বেশী ফসল পেতে এবং এবারও কিছুটা পাবে। কিন্তু এত বড় পার্থক্য কেমন করে হলো? কেউ একটি দানাও পেলো না অথচ তুমি পুরো ফসল পেলে, এর কারণ কি?"
“এটাই তো আসল কথা। অথচ এটা তোমরা বুঝতে পারো না।” সে বলতে শুরু করলো। "তোমরা যতটুকু মেহনত করো আমিও ঠিক ততটুকুই করি। তোমাদের চাইতে বেশী মেহনত করার শক্তি আমার কোথায়? বরং তোমাদের মধ্যে আমার চাইতে বেশী শক্তিমান লোক আছে। তারা আমার চাইতে অনেক বেশী মেহনত করে। তাদের তুলনায় আমার মেহনত কিছুই নয়।”
"তোমার কথা এক বর্ণও মিথ্যা নয়। তাহলে এর কারণ কি?” তারা বিস্ময় প্রকাশ করলো।
“এর একটি মাত্র কারণ, আল্লাহর রহমত আমার ওপর বিশেষভাবে বর্ষিত হয়। এই সেদিনকার কথাই ধরো। আল্লাহ সেদিন এমনভাবে বৃষ্টি দিলেন যে, তা পাহাড়ের ওপর দিয়ে গড়িয়ে নালার সাহায্যে আমার ক্ষেতের মধ্যে এসে পৌঁছলো। যার ফলে আমার ক্ষেত শস্য-শ্যামল হয়ে উঠলো। অথচ অন্য ক্ষেত এক বিন্দুও পানি পেলো না। ফলে সেখানে সব শুকিয়ে গেছে। এর মধ্যে আমার মেহনতের কোন বিশেষ ভূমিকা নেই।”
"হ্যাঁ, ঠিক কথা, তাঁর রহমত ছাড়া এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। কিন্তু তোমার ওপর আল্লাহর এই বিশেষ রহমতের কারণ কি? আমরা সবাই তাঁর এই রহমত থেকে বঞ্চিত কেন?"
সে বলতে শুরু করলোঃ "ঠিক কথা, আল্লাহ যেমন আমার তেমনি তোমাদেরও। কিন্তু আমার ও তোমাদের মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। আমি তাঁর প্রত্যেকটি হুকুম মেনে চলি। প্রতি পদে পদে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করি। আমার কোনো কাজের কারণে আমার আল্লাহ আমার প্রতি বিরূপ হয়ে গেলেন কিনা সব সময় আমার মনে এ ভয় জাগরূক থাকে। যেমন ধরো আমার ক্ষেতে যে ফসল উৎপন্ন হয়, ফসল ওঠার সাথে সাথেই আমি তার তিন ভাগের এক ভাগ আল্লাহর পথে খয়রাত করে দেই। বাকী দু'ভাগের এক ভাগ পুনরায় বীজ হিসেবে ক্ষেতে বপন করি এবং অবশিষ্ট এক ভাগ নিজের গৃহে রাখি। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমি এ ব্যাপারে কখনও কোনো প্রকার লোভ করি না। আল্লাহ যা দেন তাই তাঁর নেয়ামত মনে করে গ্রহণ করি। তাতেই সন্তুষ্ট থাকি। তাঁর ওপর সবর করি এবং আল্লাহর শোকর গুজারী করি--- কিন্তু তোমরা --- তাঁর একটি হুকুমও মেনে চলো না। তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একটুও চেষ্টা করো না। তাঁর পথে এক দানা শস্যও দান করা পছন্দ করো না। তোমরাই বলো, এ অবস্থায় আল্লাহর দৃষ্টিতে আমার ও তোমাদের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য অবশ্যই হওয়া উচিত কিনা? তোমরাই চিন্তা করো, যাদের চোখ আছে আর যাদের চোখ নেই তারা কি সমান হতে পারে? যারা অন্যের দান গ্রহণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আর যারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, তারা কি কখনো সমান হতে পারে? এই পার্থক্যটাকেই আমি আল্লাহর রহমত বলে মনে করি। আমি জানি না তোমরা একে কি মনে করবে?"
একথা বলেই সে চুপ করে গেলো। আল্লাহর অনুগত চাষীর কথায় সবার টনক নড়লো। সবাই এক সাথে বলে উঠলোঃ ঠিক বলেছো ভাই। আমরা তো আসলে আল্লাহর বান্দা, তাঁর দাস। তাঁর মেহেরবানী হয় বলেই আমরা জমিতে ফসল পাই। কাজেই এ ফসলে অন্যদের হক আদায় করতে হবে। আমাদের হতে হবে আল্লাহর অনুগত চাষী।
একটি হাদীসের আলোকে গল্পটি রচিত।
প্রশ্নের জবাব দাও
১. সৎ চাষীর ক্ষেতে বৃষ্টির পানি নেমে এলো কিভাবে?
২. সৎ চাষীর ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় কেন?
৩. যাদের চোখ আছে আর যাদের চোখ নেই তারা কি সমান হতে পারে? এ কথাটি কে বলেছিল এবং কেন বলেছিল?
৪. চাষীর ফসলে আর কাদের হক আছে এবং সে হক কিভাবে আদায় করতে হবে?
📄 রুজির মালিক আল্লাহ জেনো
এক শহরে ছিল এক সৎ যুবক। সারাদিন খাটা-খাটনি করে যা কিছু পেতো তা দিয়ে গুড়-মুড়ি কিনে কোন রকমে কায়ক্লেশে দিন গুজরান করতো। আর আল্লাহর শোকর গুজারী করতো। আল্লাহর প্রতি ঈমান তার কখনো টলমল করেনি। সে বিশ্বাস করতো, আল্লাহ যখন তাকে সৃষ্টি করেছেন তখন তার আহারও যোগাবেন। আল্লাহ তাকে অনাহারে মারবেন না। তাই কোনদিন কিছু উপার্জন করতে না পারলেও সে কারো কাছে হাত পাততো না। মানুষের কাছে ভিক্ষা চাওয়াকে সে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় অপমান মনে করতো।
একবার সে বড়ই কষ্টে পড়লো। কোথাও কোন কাজ পেলো না। পরপর ক'দিন অনাহারে কাটালো। ক্ষুধায় কাতর হয়েও সে কাজের সন্ধানে ফিরতে লাগলো। অবশেষে দুর্বলতার কারণে তার পক্ষে পথ চলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। এখন কি করবে সে ভেবে কোন কুল-কিনারা করতে পারছিল না। তবুও সে চলতে লাগলো। মনে মনে ভাবলো, আল্লাহ হয়তো কোন একটা উপায় করে দেবেন।
কিছুদূর চলার পর নির্জন পথে হঠাৎ সে একটা কাপড়ের থলি দেখতে পেল। থলিটি বড়ই সুন্দর। কি জানি কার থলি এটা নিয়ে আবার কোন ফ্যাসাদে পড়বো। এ কথা চিন্তা করে সে এগিয়ে গেল। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে আবার মনে হলো, থলিটা আমি না নিলেই বা কি অন্য কেউ তো তুলে নিয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং আমি ওর আসল মালিকের হাতে পৌঁছিয়ে দেই। একথা চিন্তা করে সে আবার ফিরে এসে থলিটা উঠিয়ে নিল। সে থলিটা উঠিয়ে নিয়ে উলটে পালটে দেখলো। মনে হলো এর মধ্যে কিছু মূল্যবান জিনিস আছে। সে থলির মুখটা খুলে ফেললো। তার মধ্যে দেখলো একটা মূল্যবান সোনার হার ও কিছু স্বর্ণমুদ্রা। এমনিতো সে অনাহারে ছিল কয়েকদিন থেকে। ক্ষুধায় নাড়ি চোঁ চোঁ করছিল। তার পা পিছলে যেতে লাগলো। চিন্তা হলোঃ এটা পরের জিনিস। আর পরের জিনিস না বলে নেয়া হারাম। কিন্তু তিন দিনের অনাহারের পর এখন তার ক্ষুধায় মারা পড়ার অবস্থা। এ অবস্থায় হারামও হালাল হয়ে যায়। কাজেই এ থেকে তার প্রয়োজন পরিমাণ একটা মুদ্রা গ্রহণ করলে ক্ষতি কি? কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের বিবেক জেগে উঠলো।
বিবেক তাড়া দিলঃ এ হতে পারে না। তিন দিনের অনাহারের পর তুমি কি আল্লাহর ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেললে? আল্লাহ কি তোমাকে নিজের মেহনতের উপার্জন থেকে অন্ন দান করতে পারেন না? তুমি পরের দ্রব্য গ্রহণ করতে যাবে কেন? হাজার হোক এ স্বর্ণমুদ্রা তো পরের। তুমি ভিখ মেগে নয়, তার অগোচরে তার জিনিস গ্রহণ করতে চাও। অথচ আল্লাহর নিকট থেকে গ্রহণ করতে চাও না। তোমার কাছে ঈমানের সম্পদ আছে। এই তুচ্ছ পার্থিব সম্পদের বিনিময়ে তোমার সেই ঈমানের সম্পদ হারিয়ে ফেলোনা। এটা পরের ধন এবং পরের ধন হারাম এতে সন্দেহ নেই। কাজেই থলির ধনে হাত দিয়ো না। সে বিবেকের ডাকে সাড়া দিল। আল্লাহর কাছে তওবা করল। তারপর থলিটা ঘরে রেখে তার মালিকের খোঁজে বেরিয়ে পড়লো। মনে করল, মালিকের খোঁজ করতে করতে হয়তো একটা কাজের খোঁজও পেয়ে যাবে।
শহরের পথে কিছু দূর চলার পর সে একটা ঘোষণা শুনতে পেলো! এক বৃদ্ধ ঘোষণা করছেঃ "আমার একটা মূল্যবান থলি হারিয়ে গেছে। তার মধ্যে সোনার হার ও স্বর্ণমুদ্রা আছে। যদি কেউ পেয়ে থাকে তাহলে তা ফিরিয়ে দিলে তাকে পাঁচশো টাকা পুরস্কার দেয়া হবে।"
গরীব লোকটি বুঝতে পারলো, সে যে থলিটি পেয়েছে সেটি নিঃসন্দেহে এই বৃদ্ধের। সে দৌড়ে বৃদ্ধের কাছে গিয়ে বললোঃ "আসুন আমার সাথে। আপনার থলির সন্ধান আমি দিচ্ছি।” বৃদ্ধ তার সঙ্গে চললো। ঘরে গিয়ে সে থলিটি বৃদ্ধের সামনে রাখলো। আনন্দে বৃদ্ধের দু' চোখের তারা চক চক করে উঠলো। সে তাকে পুরস্কার দিতে চাইলো। পাঁচশো টাকা তার সামনে রাখলো। "আমি এ পুরস্কার নিতে পারি না,” সে বললো। “কেন?” বৃদ্ধের কণ্ঠে বিস্ময়। "থলি মালিকের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া আমার কর্তব্য ছিল। আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। এজন্য পুরস্কার আল্লাহর নিকট থেকে গ্রহণ করবো।” বৃদ্ধ তার জন্য দোয়া করে চলে গেলো।
তারপর বহু দিন অতিবাহিত হয়েছে। দুনিয়ার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু দরিদ্র যুবকের জীবনে তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি। একদা কাজের সন্ধানে তাকে নিজের দেশ ত্যাগ করতে হলো। সে একটি সামুদ্রিক জাহাজে সফর করছিল। আবহাওয়ার মধ্যে দুর্যোগের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। দেখতে দেখতে ভীষণ ঝড়-তুফান শুরু হয়ে গেলো। পাহাড়ের সমান উঁচু উঁচু ঢেউগুলো জাহাজটাকে মাথায় করে নিয়ে নাচতে লাগলো। হঠাৎ একটি বিরাট ঢেউয়ের আঘাতে জাহাজটি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। জাহাজের একটি ভাঙ্গা তখতার সাহায্যে যুবকটি ভেসে চললো। ভাসতে ভাসতে অনেক দূরে চলে আসার পর সমুদ্র তীরে ঝুঁকে পড়া একটা গাছের ডালে তার তখতা আটকে গেলো। সে লাফিয়ে ডালটি ধরে গাছে চড়ে বসলো। তারপর সমুদ্র তীরে নেমে এলো। নিকটে একটি লোকালয়ের সন্ধান পেয়ে সেখানে চলে গেলো। সেখানে মসজিদে বসে আল্লাহকে স্মরণ করতে লাগলো।
সে অত্যন্ত সুন্দর করে কুরআন শরীফ পড়তে পারতো। তার গলার আওয়াজও ছিল বড় মিষ্টি। তার কুরআন পাঠে মুগ্ধ হয়ে লোকেরা তাকে বেশ আদর করতে লাগলো। সে দিনে ছেলেমেয়েদের ও রাতে বয়স্কদের কুরআন শিক্ষা দিতো। ধীরে ধীরে তার প্রতি এলাকার লোকদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা বেড়ে গেলো। সে ছিল অবিবাহিত। তার বন্ধু ও ভক্তের দল তাকে সেই অঞ্চলে বিয়ে দেবার চেষ্টা করলো। সেখানকার জনৈক খোদাভীরু ধনী বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছিল। তার একটি অবিবাহিত কন্যা ছিল। তার সাথে ঐ যুবকের বিয়ে দেয়া হলো।
বিয়ের রাতে বর-কনের সাক্ষাত হলো। "এ কি!” কনের গলায় যে হার ঝুলছে তা যে তার নিজের দেশে সেই কুড়িয়ে পাওয়া হার। হারটি সে ভালো করেই চেনে। সে হার তো সেই পথিক ধনী বৃদ্ধকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। তাহলে ------ তাহলে সেই বৃদ্ধের কন্যাই কি তার স্ত্রী?
সে ভাবতে লাগলো। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো সেই বৃদ্ধই তার পিতা। আল্লাহর অপার মহিমা ও করুণা দর্শনে যুবক বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়লো। তার মাথাটি আপনা আপনি আল্লাহর দরবারে নুয়ে পড়লো।
প্রশ্নের জবাব দাও
১. বৃদ্ধের থলিতে কি কি জিনিস ছিল?
২. সৎ যুবক থলিটি বৃদ্ধকে ফেরত দিল কেন?
৩. যুবক কিভাবে দুনিয়ায় তার সততার পুরস্কার পেলো?
৪. ভিখ মাগা, চুরি করা ও মেহনতের উপার্জন কোনটি মানুষের জন্য গ্রহণীয় এবং কেন?
📄 যারা পেলেন কবি
মারা গেলেন কবি আজিম-উশ শান। নামে যেমন আজিম-উশ-শান তেমনি নামও করেছিলেন কবি আজিম উশ-শান। দেদার গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, নাটক ও উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি। অনেক হাসির কাহিনী লিখে তিনি মানুষকে প্রচুর আনন্দ দিয়েছিলেন। তাঁর ভক্তের সংখ্যা ছিল অগণিত। সারা দেশে কবি আজিম উশ-শানের নাম জানেনা এমন লোক হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না। যুব কিশোররা তাঁর আশে পাশে সব সময় ভিড় করে থাকতো। ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ সবাই তাঁকে চিনতো। তাঁর লেখা সবাই পড়তো। তাঁর মৃত্যুতে সারাদেশে শোকের ছায়া নামলো।
জানাজা কাঁধে কবরস্তানের দিকে চললো কবির পরিবার পরিজন, ভক্ত-অনুরক্তের দল। সবারই মুখ মলিন বিষণ্ণ। মুখে কালেমা পড়ছে সবাই আর মনে মনে কবির জন্য মাগফেরাত কামনা করছে আল্লাহর দরবারে। দেশ জুড়ে শোক সভা হলো। অনেক শোক গাথা রচিত হলো। ভক্তজনেরা কবির প্রশংসায় গদগদ হলো। যুব-কিশোর সমাজ কবিকে নতুন পথের দিশারী রূপে বরণ করলো। কবির নির্দেশিত পথে তারা পুরাতন রীতি নীতি ও ঘুণে ধরা সমাজ প্রথার বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ অভিযান চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা করলো। কবি মরে গিয়েও লাখো মানুষের মনে অমর হয়ে রইলেন।
সেদিন কবির কবরের পাশে আর একটি কবর দেয়া হলো। শহরের এক মস্ত বড় গুন্ডাও মারা গিয়েছিল সেদিন। নামজাদা কবির কবরের পাশে রচিত হলো নামজাদা গুন্ডার কবর। কবরস্তান থেকে সবাই চলে আসার সাথেই আল্লাহর হুকুমে আজাবের ফেরেশতারা নেমে এলেন। উভয়ের গোর আজাব শুরু হলো। কবি আর গুন্ডা উভয়ের ওপর সমানে আজাব চলতে থাকলো। যতই দিন যেতে থাকলো ততই আজাব বাড়তে থাকলো, আজাবের রূপ ভয়াবহ হতে লাগলো। অবশেষে একদিন আজাবের ফেরেশতারা গুন্ডার আজাব বন্ধ করে দিল। কিন্তু কবির আজাব তখনো সমানে চলছিল। বরং দিনের পর দিন বেড়েই চলছিল।
কবির ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলো কবি আজিম-উশ-শান: হে আল্লাহ! আমার প্রতিবেশী গুন্ডার আজাব বন্ধ হয়ে গেলো। সে কত বদ লোক। শহরে একশত লোক খুন করেছে। কত লোকের মালমাত্তা লুট করেছে, কত গরীবকে কাঁদিয়েছে। তার অত্যাচারে শহরের লোকেরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তার মৃত্যুতে লাখো লাখো মানুষ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। মানবতার এত বড় দুশমন যে গুন্ডা তার আজাব বন্ধ হয়ে গেলো। আর আমার আজাব এখনো বন্ধ হলো না। আমি কত গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস ও নাটক লিখেছি, কত লোককে আনন্দ দিয়েছি। আমার মৃত্যুতে নগরে শোকসভা হয়েছে। নওজোয়ানরা শোক মিছিল বের করেছে। আমার মৃত্যুতে মানবতার কতই না ক্ষতি হয়েছে। অথচ আমার এই আজাব এখনো বন্ধ হলো না। আর ওই গুন্ডাটার আজাব বন্ধ হয়ে গেলো। হে আল্লাহ! তোমার এই ইনসাফ তো আমি বুঝতে পারছি না। আমি কি ওই গুন্ডাটার চাইতেও খারাপ? ওর চাইতেও বেশী গুনাহগার?"
আল্লাহ বললেন : "হে আজিম-উশ-শান! আমি ইনসাফ করেছি। আমার জাহানে কনামাত্রও বে-ইনসাফী নেই। সে গুন্ডা। কিছু লোককে সে খুন করেছিল। কয়েকজনের টাকা-কড়ি লুঠ করেছিল। মাত্র কয়েকজনের। সে মারা গেছে। তার কাজও শেষ হয়ে গেছে। তার কাজগুলো খুবই খারাপ। তার যা শাস্তি পাবার সে পেয়ে গেছে। তার শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তুমি? তুমি কবি। তুমি গল্প রচয়িতা। তুমি প্রবন্ধকার। তুমি নাট্যকার। তুমি লেখক। লেখার সাহায্যে তুমি মানুষকে পরিচালিত করেছো। আমি তোমাকে প্রতিভা দান করেছিলাম। কিন্তু তুমি তার সদ্ব্যবহার করোনি বরং তাকে অসৎ পথে ব্যয় করে মানুষের মহা ক্ষতি সাধন করেছো। কিয়ামত পর্যন্ত এ ক্ষতি পূরণের আর কোন সম্ভাবনা নেই। তুমি নিজের লেখার সাহায্যে মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত না করে অসৎ পথে চালিয়েছো। তোমার লেখা পাঠ করে যুব সমাজ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে ব্যভিচার, গুন্ডামী এমনকি কথায় কথায় নরহত্যার প্রবণতাও জাগছে। তারা সততা, ন্যায়-নীতি বিসর্জন দিয়েছে। ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা ও বড়দের প্রতি সম্মানবোধ বিলুপ্ত হচ্ছে। এগুলোকে তারা সেকেলে রেওয়াজ বলে মনে করছে। শিক্ষকদের অসম্মান করতে পারলে তারা গর্ব অনুভব করে। আরো বহু অসৎ কাজ করে যাচ্ছে। তাদের এসব অসৎ কাজের অংশ তুমিও লাভ করছো।”
“তবু এরও তো একটা শেষ আছে, হে আল্লাহ?” কবির কণ্ঠ থেকে নিরাশা ঝরে পড়ছিল।
"না এর শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না," আল্লাহ বলে যেতে লাগলেন। "তুমি মরে গেছো। কিন্তু তোমার লেখা বেঁচে আছে। তোমার গল্পের বই আবার ছাপা হচ্ছে। তোমার কবিতার বই আবার ছাপা হবে। তোমার লেখা নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। তোমার লেখা বহু লোক পড়েছে। আরো বহু লোক পড়বে। বহুদিন ধরে পড়বে। দুনিয়ার কয়েকটি ভাষায় তোমার লেখার অনুবাদও চলছে। কাজেই তোমার লেখার সাহায্যে তুমি দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছো। তোমার লেখায় অনুপ্রাণিত হয়ে দুনিয়ার যেখানে যে অসৎ কাজটি হচ্ছে তার গোনাহর অংশ তোমার আমল নামায়ও লেখা হচ্ছে। আবার তোমার লেখার কথা একদিন মানুষ ভুলে গেলেও তোমার সাহিত্যর আদর্শ গ্রহণ করে অনেক নতুন লেখক এগিয়ে আসবে। তাদের মাধ্যমে মানুষের অসৎ কাজ থেকে তুমি নিজের অংশ পেতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত। তাই তোমার শাস্তিও চলতে থাকবে।"
"তাহলে কি আমার কোন আশা নেই?" কবি কাঁদতে লাগলো।
“কোনো আশা নেই। তবে যদি তুমি লেখার সাহায্যে মানুষকে সৎপথে চালাতে তাহলে তার সুফলও এমনিভাবে পেতে। তুমি যদি ভালো ভালো কবিতা লিখতে। ভালো ভালো উপন্যাস নাটক রচনা করতে। তোমার কবিতা, উপন্যাস, নাটকে প্রভাবিত হয়ে যদি সমাজে সুকৃতির প্রচলন হতো এবং দুষ্কৃতি নির্মূল হবার পথ তৈরি হতো তাহলে সুকৃতি প্রতিষ্ঠিত হতো এবং দুষ্কৃতি খতম হয়ে যেতো। তোমার রচনায় প্রভাবিত হয়ে যে সব যুবক সমাজ পুনর্গঠনের কাজে লিপ্ত হতো তারা যে পরিমাণ নেকী অর্জন করতো সেই পরিমাণ নেকী তোমার ভাগেও লেখা হতে থাকতো। তাহলে তোমার মর্যাদা আরো বেড়ে যেতে থাকতো। এটা কিয়ামত পর্যন্ত বাড়তেই থাকতো। তোমার প্রতিভা ও ক্ষমতা ছিল অনেক বেশী। কিন্তু তুমি তার সদ্ব্যবহার করোনি। নফসের তাবেদারী করে নিজের খেয়াল খুশী মতো চলেছো। খেয়াল খুশী মতো লিখেছো। আমার অনুগত হয়ে তোমার কলম পরিচালনা করোনি। তুমি মানুষকে খুব বেশী গোমরাহ করেছো। তার সমস্ত ফল তোমাকে ভোগ করতে হবে। নিজের দোষেই তুমি আজাব ভোগ করছো।” কবির ওপর শাস্তি চলতে থাকলো পুরোদমে।
প্রশ্নের জবাব দাও
১. কবি ও সাহিত্যিক কাকে বলে?
২. সৎ কবি, সৎ লেখক ও সৎ সাহিত্যিক কাকে বলে?
৩. অসৎ কবি ও অসৎ সাহিত্যিক কার তাবেদারী করে? কেমন করে?
৪. মানুষ শাস্তি ও আজাব ভোগ করে কার দোষে?
৫. সৎ সাহিত্যিক কিভাবে তার সৎকাজের পুরস্কার পাবে?
📄 গোলাম হলো পুত্র
ইহুদী সাল্লাম বিন জুবাইর সেই সকাল থেকে বসে আছে ইয়াসরিবের বাজারে। তার সব মাল-সামান বিক্রি হয়ে গেছে। লাভও হয়েছে দেদার্ কিন্তু এই গোলাম বাচ্চাটা যেন তার গলায় কাঁটার মতো আটকে আছে। সেই সকাল থেকে এটার কাছেও কেউ ঘেঁসছে না। এই বাচ্চাটা না দু'পয়সা আয়-রোজগার করতে পারবে আর না করতে পারবে ঘরের কোনো কাজ-কাম, এ চিন্তাই বোধ হয় খদ্দেরদের ঠেকিয়ে রেখেছে।
এসব সাতপাঁচ ভাবছিল সাল্লাম। এমন সময় আওস গোত্রের সুন্দরী যুবতী সাবিতা বিনতে ইয়ারিবের নজরে পড়লো এই ছোট্ট গোলামটি। সাবিতা বিড়বিড় করলোঃ ইস না জানি কার কলিজার টুকরো। বাচ্চাটাকে কিনে নেবার ইচ্ছে জাগলো তার মনে। জিজ্ঞেস করলোঃ কি হে সাল্লাম! তোমার এ গোলামটার নাম কি?
বনি কালব গোত্রের যে ব্যক্তি একে আমার কাছে বিক্রি করেছে সে এর নাম বলেছিল সালেম।
এর বাপের নাম কি? তাতো জানি না। তবে ঐ কালবি লোকটি বলেছিল, শিশুটি ভদ্র ও অভিজাত বংশের। আর এ নাকি ইসতাখার খান্দানের......। হাঁ-হাঁ ঐ যে ইসতাখার খান্দান উবলায় বাস করতো। সারা ইরাকে এদের ব্যবসা ছড়িয়ে আছে। আচ্ছা এসব আমি ভালো করেই জানি। এখন আমি গোলামটাকে কিনতে চাই।
ভালো দামেই সাবিতা গোলামটাকে কিনে নিল। আয়-রোজগার করার জন্যে বা নিজের খেদমত করার জন্যে সে গোলামটাকে কিনেনি। আসলে শিশুটির প্রতি করুণা ও মমতার বশেই সে তাকে কিনে নিয়েছিল। পথে যেতে যেতে সে মনে মনে বিড়বিড় করছিল- লা'নত! হাজার বার লা'নত! যারা মানুষের প্রতি রহম করেনা, দুর্বলের প্রতি করুণা করে না- তাদের ওপর লা'নত! যে মায়ের ছেলে হারিয়ে যায় আহ! তার কী কষ্ট! যে ছোট্ট শিশুটি এখনো মাকে চেনে না, বাপকে চেনে না, নিজের কোন আত্মীয় স্বজনের চেহারা যার চোখে ভাসে না, আহা সে কতবড় হতভাগা! আহ এ রকম যদি আমার কোন বাচ্চা হতো। ডাকাতরা যদি আমার ওপর হামলা করে তাকে লুট করে নিয়ে যেতো, তাহলে আমার দশাটা কেমন হতো! এ অবস্থায় আমি কেমন করে বেঁচে থাকতাম। জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত কি আমি নিজের বাচ্চাটির কথা ভুলতে পারতাম? কখনোই না। দুনিয়ায় বেঁচে থাকাই তো আমার জন্যে অসম্ভব হয়ে পড়তো। দুনিয়ার সব নিয়ামত আমার ওপর হারাম হয়ে যেতো।
সাবিতা নিজের মনের আয়নায় যেন বাচ্চার মাকে দেখতে পাচ্ছিল। সে ভাবছিল কিসরার সৈন্যরা যখন একে লুটেরাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি তখন এই ইয়াসরিবে একে কিভাবে রক্ষা করবো? এ শহরে তো আগে থেকেই বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে আছে। তার ওপর ইহুদী ও বদ্দুরা একে ঘিরে আছে চারদিক থেকে।
এ ঘটনার পর সাবিতার বিয়ের পয়গাম এলো আওস ও খাযরাজদের বড় বড় ঘর থেকে। কিন্তু সে এখন বিয়ে করতে রাজি ছিল না। নানান অজুহাত দেখিয়ে বিয়ে এড়িয়ে গেলো। ছোট্ট সালেমকে নিয়েই সে মেতে রইলো। এর এক বছর পরে কুরাইশদের একটি কাফেলা সিরিয়া থেকে ফেরার পথে ইয়াসরিবে কয়েক দিন বিশ্রাম নিল। এই কাফেলায় ছিলেন আবু হুযাইফা হাইসাম বিন উতবাহ। সাবিতার সম্পর্কে অনেক কথাই শুনেছিলেন আবু হুযাইফা। আর তার গোলামটির কথাও। লোকের মুখে মেয়েটির অসম্ভব গুণপনার কথা শুনে আবু হুযাইফা বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন সাবিতার কাছে। সাবিতা প্রথমে কানই দেয়নি। কিন্তু পরে শুনলো কুরাইশ বংশে আবু হুযাইফার মর্যাদার কথা। এমন এক কাবাগৃহের তারা খাদেম যে গৃহের ওপর আক্রমণকারী হস্তী সেনাদলকে আল্লাহ আবাবিল পাখি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। সাবিতা বিয়েতে রাজী হয়ে গেলো।
বিয়ের পর আবু হুযাইফা স্ত্রী ও গোলামটিকে সাথে নিয়ে মক্কায় চলে এলেন। আবু হুযাইফা ছিলেন জোয়ান। কুরাইশদের বিভিন্ন আসরে তাঁকে দেখা যেতো সব সময় সরগরম। কিন্তু এবারের মজলিস তেমন জমছিল না। কোথাও যেন কিছু ঘটে গেছে বলে তাঁর মনে হচ্ছিল। এবারের মজলিসগুলো যেন কিছুটা প্রাণহীন। যেন কিসের অভাব। তিনি একটু গম্ভীরভাবে ভেবে দেখলেন। তাইতো এখানে উসমান বিন আফফানকে দেখি না তো। তালহা বিন উবায়দুল্লাহ তামিমী কোথায়? অমুক বন্ধু, অমুক দোস্ত, কই তাদের দেখছি না তো? তারা কোথায়? তারা কেন আসে না? যাকে জিজ্ঞেস করেন আবু হুযাইফা সেই চুপ করে থাকে। কেউ কেউ জবাব দিলেও তা ইঙ্গিতপূর্ণ, বুঝে ওঠা মুশকিল।
বন্ধুদের খুঁজে খুঁজে হতাশ হয়ে শেষে ভাবলেন তারা তো এই শহরেই থাকে, আচ্ছা তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখি না কেন? প্রথমে গেলেন উসমানের বাড়িতে। উসমানের বয়স চল্লিশ। তাঁর চেয়ে দশ বছর বেশী। কিন্তু তাঁর প্রাণের দোস্ত। সবচেয়ে বেশী ভালোবাসেন তাঁকে। যেমন রুচিশীল, তেমনি জ্ঞানী, তেমনি আবার মধুর স্বভাবের। বাড়িতেই পেলেন উসমানকে। উসমান তাঁকে সাদরে গ্রহণ করলেন। হাসি মুখে বললেন, কেমন আছো আবু হুযাইফা?
আবু হুযাইফা নিজের মনের প্রশ্নের জবাব খুঁজছিলেন। কোথায় কিসের যেন পরিবর্তন উসমানের চেহারার মধ্যে তিনি পেলেন। আগের চাইতেও উসমানকে যেন আরো বেশী গম্ভীর, আরো বেশী সহনশীল মনে হচ্ছে।
"উসমান! তোমাকে আমি মক্কার সব আসরে খুঁজে বেড়িয়েছি। সিরিয়া থেকে বাণিজ্য কাফেলা ফিরে আসার পর থেকেই তোমাকে খুঁজে ফিরছি। বলতো, তোমার কি হয়েছে? তুমি কেন মজলিসে যাওয়া ছেড়ে দিলে?"
"এ মজলিস আমার একদম পছন্দ নয়। ওখানকার আলোচনাগুলোও একেবারে বাজে।"
"ব্যাপার কি? তোমার কওম কি তোমাকে কোনো কষ্ট দিয়েছে?” উসমান চুপ করে থাকলেন। কোনো কথা বললেন না।
"তাহলে উসমান! কিছু নিশ্চয়ই ঘটেছে। তোমাকে লাত ও উযযার কসম....।" লাত ও উযযার নাম শুনতেই আবু হুযাইফা দেখলেন, বন্ধুর কপালে ভাঁজ পড়ে গেছে। মুখে বিরক্তি। চোখে ক্রোধের ছায়া। এমন তো তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি থেমে গেলেন। এবার কথা ঘুরিয়ে নিলেন।
"উসমান! তোমার সাথে আমার কতকালের দোস্তি। তুমি আমার প্রাণের দোস্ত। তোমাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসি। সবচেয়ে বেশী বিশ্বাস করি। তোমার সাথে এতদিনের বন্ধুত্বের দোহাই, বলো, বলো, তোমার প্রাণে কিসের ব্যথা? তোমার মনের কথা বলো।"
উসমান অত্যন্ত ঠান্ডা মেজাজে কোমল ভাষায় বললেন: “দেখো আবু হুযাইফা, আমাদের বন্ধুত্ব যদি টিকিয়ে রাখতে চাও তাহলে তোমার ঐসব দেবতাদের লাত ও উয্যার দোহাই দিতে পারবে না আমার কাছে, যারা আসলে কোন ক্ষমতাই রাখে না।" আবু হুযাইফা তো অবাক! বলে কি উসমান! প্রথমে তিনি চুপ হয়ে গেলেন। তারপর বিরক্তিভরা কণ্ঠে বললেন, "উসমান! তাহলে তো মনে হচ্ছে তুমি বিধর্মী হয়ে গেছো।" "না...না... আবু হুযাইফা আমি বিধর্মী হয়ে যাইনি বরং আমি সত্য ধর্মের সন্ধান পেয়ে গেছি। আবু হুযাইফা, তুমি তো একজন বুদ্ধিমান যুবক। তোমার বয়স তেমন বেশী না হলেও তুমি তো দুনিয়ার অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছো। অনেক দেশ দেখেছো। অনেক জাতির কথা শুনেছো। দেশে দেশে জাতির মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখেছো। কালের যুগের অনেক ভাঙ্গাগড়ার ঘটনা তোমার সামনে আছে। তা থেকে অনেক জ্ঞান, অনেক অভিজ্ঞতা তুমি সঞ্চয় করেছো। আচ্ছা তুমি বলো, তোমার মতো বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা কেমন করে এই সব কাঠের তৈরী, ইট-পাথর ও মাটির তৈরী মূর্তিগুলোর পূজা করতে পারে? এগুলোকে তো আমার তোমার মতো মানুষেরাই বানিয়েছে। আবার যে কেউ চাইলে এগুলো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলতেও পারে।"
সত্যিই আবু হুযাইফা চিন্তায় পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে বললেন: "উসমান! তুমি আমাকে ভাবিয়ে তুললে। এমন করে তো কোনদিন ভেবে দেখিনি। সত্যিই অবাক হচ্ছি, তুমি যা বলছো তা একশো ভাগ সত্যি। আশ্চর্যের ব্যাপার, আজ পর্যন্ত এ কথাটা একবারও মনে জাগেনি। বাপ-দাদারা ওই মূর্তিগুলোকে পূজা করে আসছে। তাদের দেখাদেখি আমরাও পূজায় যোগ দিয়েছি।”
"তাহলে এখন তো সত্য প্রকাশ হয়ে গেছে? এখন তো জানলে? কি করবে এখন?
"আমাকে নিয়ে চলো সেখানে যেখান থেকে তোমরা পেয়েছো এই সত্যের আলো।"
"কবে যাবে?” "আজ, এখনই।”
বিকেলে সন্ধ্যে হবার আগেই আবু হুযাইফা ইসলাম গ্রহণ করলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে। মুসলমান হয়ে ঘরে ফিরে এলেন। প্রিয়তমা স্ত্রী সাবিতা শুনলেন সব কথা স্বামীর মুখ থেকে। কী অনাবিল আনন্দে উদ্ভাসিত তার স্বামীর হৃদয়! সাবিতা সহজেই এটা অনুভব করতে সক্ষম হলেন। এই আনন্দের সন্ধানই তো তিনি করে ফিরছেন গত কয়েক বছর ধরে। সাবিতা ঈমান আনলেন আল্লাহ ও তাঁর নবী মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর। তাঁদের গোলাম সালেমের মনও স্বামী স্ত্রীর কথাবার্তা শুনে সত্যের ডাকে সাড়া দিল। সেও ঈমান আনলো। এভাবে সেদিন রাত হবার আগে আগেই মক্কায় মুসলিম ঘরানার সংখ্যা আরো একটি বেড়ে গেলো।
কিছুদিন পরে সাবিতা শুনলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাত লাভের সুখবর শুনাচ্ছেন তাদের যারা গোলাম আযাদ করে দিচ্ছে। তখনি তিনি তার ইরানী গোলামকে ডেকে বললেন:
"সালেম! আজ থেকে তুমি মুক্ত স্বাধীন। এখন তুমি যাকে ইচ্ছা তাকে নিজের অভিভাবক বানাতে পারো।”
সালেম আবু হুযাইফাকে বললোঃ "আপনি কি আমার অভিভাবক হবেন?” আবু হুযাইফা বললেনঃ “না, হে খোকা। আমি তোমার অভিভাবক হতে যাবো কেন? তুমি তো আজ থেকে আমার ছেলে।"
হাদীস অবলম্বনে গল্পটি রচিত
প্রশ্নের জবাব দাও
১. সাবিতা আবু হুযাইফার বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হলো কেন?
২. লাত ও উযযার কসম শুনে উসমানের কপালে ভাঁজ পড়লো কেন?
৩. সত্যের আলো এনেছেন কে?
৪. সাবিতার আনন্দ কিসে?
৫. সালেম গোলামী থেকে মুক্তি লাভ করলো কিভাবে?