📄 সামনে নতুন আশা
বেলা শেষ হয়ে এসেছিল। চারদিকে ঘরে ফেরার ব্যস্ততা। এতবড় বাজারটা প্রায় একেবারেই ফাঁকা। মাল-পত্তর কেনা-বেচা শেষ করে সবাই যে যার ঘরের পানে ছুটছে। শুধু এক কোণে ছিল একটা ছোটখাট ভিড়। উম্মে আনমার সেদিকে এগিয়ে চললেন।
“এ্যাঁ, তোমরা এই এক রত্তি বাচ্চাটার ওপর একি জুলুম করছো?” উম্মে আনমার ক্রোধে ফেটে পড়লেন। “তোমরা কি একে মেরে ফেলবে? এতটুকুন বাচ্চার ওপর সবাই মিলে এভাবে কিল, চড়, লাথি, ঘুষি চালাচ্ছো কেন?” বলতে বলতে উম্মে আনমার আমের গোত্রের গোঁয়ার গুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কারো পিঠে ঘুষি চালালেন, কারো বুকে। কাউকে হাত ধরে দূরে হটিয়ে দিলেন।
আশ্চর্য! এক রত্তি রোগা-পটকা ছেলেটা একটু উহ আহ্ করছে না! মরার মত ধুলোয় পড়ে রয়েছে। কি জানি, দেহে প্রাণ আছে কিনা? উম্মে আনমার টেনে তুললেন ছেলেটাকে। তার গায়ের ধুলো ঝেড়ে দিতে লাগলেন। অবাক হলেন তার সহ্য শক্তি দেখে। আমের গোত্রের এই দলটি তাদের সমস্ত মাল-পত্তর বিক্রি করে দিয়েছিল, এমনকি মালবাহী উটগুলোও। শুধু রয়ে গিয়েছিল এই বাচ্চা রোগা পটকা গোলামটি। এখন ব্যবসায়ের জিনিস-পত্তর কেনার জন্য তারা যাত্রা করবে ইরাকের পথে। তারা মনে করেছিল এতবড় হাটে যখন গোলামটি কেনার লোক পাওয়া গেল না তখন পথে কোনো আরব গোত্রের হাতে তাকে বেচে দিয়ে যাবে। কিন্তু সে তো মাটি কামড়ে পড়ে আছে। এক চুলও নড়ছে না এখান থেকে।
"মক্কায় না হয়ে যদি নজদে হতো তাহলে তোমাকে এক হাত দেখিয়ে দিতাম।" এতক্ষণে আমের দলপতি রাগত স্বরে বলল।
“দেখলাম তো, একটুখানি বাচ্চার ওপরই তোমাদের যতো বাহাদুরী।"
“এই অবাধ্য গোলামটির প্রতি এতো মায়া কেন বিবি সাহেবা? এতোই যদি দরদ, তাহলে একে কিনেই নাও না?"
"হ্যাঁ, কিনবোই তো।”
দাম ঠিক হয়ে গেল। উম্মে আনমার বলতে গেলে দিরহামগুলো প্রায় ওদের গায়ের ওপর ছুঁড়ে মারলেন। লিকলিকে তালপাতার সেপাইটার হাত ধরে জোহরা গোত্রের মধ্য দিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলছিলেন উম্মে আনমার। এ বাড়ি ওবাড়ি থেকে টিটকারীর আওয়াজ কানে আসছিলঃ
"ও বিবি সাহেবা, এ লাশটাকে টেনে নিয়ে যাও কোথায়?"
"যেখানেই নিয়ে যাইনা কেন, তোমাদের তাতে কি? এ আমার খেদমত করবে। আমার বাচ্চার সাথে খেলবে।"
সকালে উঠে ঘরের কাজগুলো সেরে উম্মে আনমার বের হলেন বাইরের কাজে। বিকেলে বাসায় ফিরে এসে দেখেন বাচ্চা দুটো খেলার মধ্যে ডুবে আছে। বাচ্চাদের খাইয়ে দাইয়ে কাছে নিয়ে গল্প করতে বসলেন। গোলামটির মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন :
"তোমার নামটা কি বলতো দেখি বাবা?"
"খাব্বাব।"
"তোমার আব্বার নাম।"
"আরাত।"
"আচ্ছা, তোমার মায়ের নাম।"
বাচ্চার মুখ দিয়ে আর কোনো জবাব বের হল না। সে কাঁদতে লাগল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। উম্মে আনমার তার চোখের পানি মুছে দিলেন। তাকে আদর করলেন। কাঁদতে কাঁদতে খাব্বাব যা বলল তার সার কথা হলঃ আমের গোত্রের লোকেরা একদিন ধোকা দিয়ে অতর্কিতে তাদের পল্লীতে আক্রমণ চালায়। তার আব্বা ছাড়া গোত্রের পুরুষেরা কেউ বাড়িতে ছিল না। তার আব্বা একাই ডাকাতদের সাথে লড়াই করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে ডাকাতরা তাঁকে কাবু করে ফেলে এবং স্ত্রী, ছেলেমেয়ের সামনে তাঁকে জবাই করে। তার মাকে ও বোনকে অন্য গোত্রের হাতে বিক্রি করে। খাব্বাবের দুঃখের কাহিনী শুনে উম্মে আনমারের দু' চোখ পানিতে ভরে উঠল। উম্মে আনমার খাব্বাবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তাকে আদর করলেন। তাকে নিজের ছেলের মত মানুষ করতে লাগলেন। একটু বয়স হলে তাকে লাগিয়ে দিলেন কামারের দোকানে কাজ শিখতে। উম্মে আনমারকে সে নিজের মায়ের মত মনে করতো।
সমবয়সী গোলামদের সাথে খাব্বাব কাজ করে কামারের দোকানে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার অনুভূতিও বাড়তে থাকে। তখন সে নিজেকে একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে ভাবতে পারে না। গোলামীর জীবন তাকে বেশ পীড়া দিতে থাকে। প্রায়ই তার সমবয়সী গোলামরা নির্জনে বসে আড্ডা জমাতো। কথাবার্তার মধ্যে নিজেদের দুরবস্থার ছবিই তাদের চোখের সামনে বার ব্যবহার ভেসে উঠতো। রাগে, দুঃখে তারা কেঁদে ফেলতো। অনেক সময় কঠিন পণ করে বসতো। কিন্তু পরক্ষণেই আশেপাশের আরব পল্লীগুলোর গোলামদের দুরবস্থার কাহিনী তাদের মনে জাগিয়ে তুলতো অন্তহীন নিরাশা।
একদিন পথে এক বন্ধুর সাথে দেখা। একথা সেকথা নানা কথা। এবারের কথাবার্তায় বন্ধুর মধ্যে নতুন একটা কিছু দেখতে পেল খাব্বাব। মনে হল তার এই বন্ধু নিরাশার সাগর পার হয়ে এসেছে। দুঃখ ও হাতাশার কোন চিহ্নই তার মুখে নেই। আশা আর আনন্দ যেন বারে বারে তার কথার মাঝখানে ছলকে পড়ছে। ব্যাপার কি? হঠাৎ এমন পরিবর্তন। একটু অবাকই হলো খাব্বাব। বেশীক্ষণ নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারল না সে। এক সময় জিজ্ঞেস করেই বসলো:
"ব্যাপারখানা কি, একটু খুলেই বল দেখি। আজ তোমার মধ্যে যেন একটা নতুন জিনিস দেখছি। অন্য বন্ধুদের সাথে আলাপ আলোচনায় এ জিনিসটি চোখে পড়েছে বলে মনে হয়নিতো কোন দিন। তুমি কি নতুন কিছুর সন্ধান পেয়েছো?”
বন্ধুটি সাধারণত যেভাবে তার কথার জবাব দিয়ে থাকে সেভাবে না বলে একটু অন্যভাবে বলল:
“পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। পড়ো, তোমার প্রতিপালক অতি মহান! তিনি কলমের সাহায্যে শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন মানুষকে যা সে কোন দিন জানত না। কিন্তু মানুষ সীমা লঙ্ঘন করে কারণ সে নিজেকে মনে করে অভাব মুক্ত। কিন্তু অবশেষে তোমার প্রতিপালকের কাছে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে।"
বন্ধু বলে চলছিল আর খাব্বাবের সমস্ত মন দুলে উঠছিল। মনে হচ্ছিল চারদিকে সমস্ত প্রকৃতিও যেন ঝড়ের আবেগে লুটোপুটি খাচ্ছে। সে আর দাঁড়াতে পারছিল না। তার শরীর দারুণভাবে কাঁপছে। তার দাঁতে দাঁত লেগে খটখট আওয়াজ হচ্ছে। মনে হল বুঝি সে এখুনি পড়ে যাবে। বন্ধু তাকে এ অবস্থার মধ্যে ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে তার শরীরের কাঁপুনি থেমে গেল। জ্ঞান ও অনুভূতি সজাগ হল। তখন সে বন্ধুকে বলল।
"কি বললে? কি পড়লে তুমি? আমি তো কিছুই শুনতে পেলাম না। আমার যেন কেমন হয়ে গেল। আবার বল! আবার বল!"
খাব্বাবের অনুরোধে বন্ধু বার বার তাকে পড়ে শোনাতে লাগল। খাব্বাব যেন এক নতুন স্বাদ পেল। তার সমস্ত মন-প্রাণ নেচে উঠল। বন্ধুর বলা কথাগুলো বার বার আওড়াতে থাকল সে-
"কিন্তু মানুষ সীমা লঙ্ঘন করে- কারণ সে নিজেকে মনে করে অভাবমুক্ত। কিন্তু অবশেষে তোমার প্রতিপালকের কাছে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে।"
"বন্ধু তুমি একথা কোথায় পেলে? এগুলো তোমার কথা বলে তো মনে হচ্ছে না। বল, বল, কোথা থেকে এসব কথা শুনলে? আমি কি শুনতে পারি না সেখান থেকে?”
"হ্যাঁ, তুমিও শুনতে পার। কোন বাধা নেই। এ কথা, এ বাণী আমার নয়, আসমান থেকে এসেছে। তাহলে চল আমার সাথে আল আমীনের কাছে। তিনিই এসব কথা সবাইকে শুনাচ্ছেন। আমাদের সব দুঃখ ঘুচে যাবে। আমরা সবাই একমাত্র আল্লাহর গোলাম। সবাই ভাই ভাই। সবাই সমান। নিরাশার মেঘ তোমার আকাশ থেকেও কেটে যাবে। মুক্তি পাবে মানুষের গোলামী থেকে। তবে চল আমার সাথে।”
দু' বন্ধু এগিয়ে চলল। চলল মহানবীর কাছে। সামনে নতুন দিন। নতুন আশা নতুন আলো। খাব্বাবের চোখে নতুন স্বপ্ন।
প্রশ্নের জবাব দাও
১. খাব্বাবের মনে নিরাশা জেগেছিল কেন?
২. বন্ধুটি খাব্বাবের প্রশ্নের জবাবে যা বললো তাতে খাব্বাবের মন দুলে উঠলো কেন?
৩. অবশেষে কোথায় ফিরে যেতে হবে?
৪. বন্ধুটি খাব্বাবকে যে কথাগুলো শুনালো সেগুলো কার কথা? কোথা থেকে এসেছে সেগুলো? কে এনেছেন?
৫. তুমি কি বলতে পারো সামনে কোন্ নতুন দিনটি আসছে এবং কোন্ নতুন আশা জাগছে?
৬. খাব্বাবের চোখে কিসের স্বপ্ন?
📄 আবু জেহেলের হতাশা
বেলা পড়ে এসেছে। সূর্যটা এখন দেখাচ্ছে একটা লাল গোল থালার মতো। দ্রুত নেমে যাচ্ছে নীচের দিকে। একটু পরেই পাহাড়টার কিনারায় মাথা ঠেকবে। তারপর আস্তে আস্তে আলো সরে যাবে। আঁধারে ডুবে যাবে সমস্ত মক্কা শহর, পাহাড়, উপত্যকা আর বালুর প্রান্তর।
না আর নয়। আজই শেষ করতে হবে। মনে মনে বিড়বিড় করতে করতে হাতের ছড়িটি ঘোরাতে লাগলো বন্ বন্ করে। ছাগলগুলোকে হাঁকিয়ে নিয়ে চললো সে উকবা বিন আবী মুঈতের খোঁয়াড়ের দিকে। সে ভাবছে। কিন্তু ভাবনার কোনো কুল কিনারা পাচ্ছে না। খোঁয়াড়ে পৌঁছে ছাগলগুলোকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে খেজুর পাতার দরজাটা ভালো করে বেঁধে দিল। চারদিকে চেয়ে মালিককে খুঁজতে লাগলো। হ্যাঁ, ওইতো উকবা দাঁড়িয়ে আছে ঘরের বারান্দায়। ছেলে ওলীদ ও লোকজন নিয়ে সলা-পরামর্শ করছে মনে হয়। সে তাদের থেকে কিছু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো।
কি, তুমি কিছু বলবে?
হ্যাঁ আবুল ওলীদ, কাল থেকে নতুন কোনো লোক বা গোলাম দেখো। আমি আর তোমার ছাগল চরাতে পারবো না।
কি ব্যাপার? তুমি হঠাৎ আমাদের ওপর এমন নারাজ হয়ে গেলে কেন? আমরা কেউ কি তোমাকে কোনো কষ্ট দিয়েছি? আমাদের ছাগলগুলো কি তোমার কোনো ক্ষতি করেছে?
না, কেউ আমাকে কোনো কষ্ট দেয়নি। কেউ আমার কোনো ক্ষতি করেনি। আমি এমনি চাকরিতে ইস্তফা দিচ্ছি। ছাগল চরানোর কাজ আমি আর করবো না।
একথা বলেই সে পেছনে ফিরলো। ছড়িটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ফিরে চললো আবার পাহাড়ের দিকে। উকবার কোনো জবাব শুনতেও সে প্রস্তুত ছিল না। তার পেছনে তার সম্পর্কে কে কি বলাবলি করছে সে দিকেও তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজের চিন্তার অথৈ সাগরে যেন সে হারিয়ে গেছে। চিন্তা করতে করতে কখন যে সে পাহাড়ের কোলে আবার সেই জায়গায় ফিরে এসেছে যেখানে সে দিনের বেলা ছাগলগুলো চরাচ্ছিল, তা তার খেয়াল নেই।
সেখানে পৌঁছেই তার মনে পড়লো সেই দুজন লোকের কথা যারা আজ দুপুরে অদ্ভুত সব কাজ করেছিলেন এখানে। অবাক লাগছে তার কাছে এখনো। কেমন করেই বা এটা সম্ভব হলো? তাঁরা ছিলেন দুজন, মরুভূমির মধ্য দিয়ে হেঁটে আসছিলেন। মনে হয় অনেক দূর থেকে আসছিলেন। তাঁরা দুধ চাইলেন আমার কাছে। আমি অস্বীকার করলাম। কোথায় পাবো আমি দুধ। আমার কোনো ছাগল তো বাচ্চা দেয়নি। পেটে বাচ্চা আছে, দু' চার দিনের মধ্যে বাচ্চা দেবে এমন একটি ছাগলও তো আমার নেই। কিন্তু কী আশ্চর্য! তাঁদের একজন। তাঁর চেহারাটি অতিশয় মহিমাময়। অনেক বেশী ভদ্র এবং শান্ত তিনি। কি যেন পড়লেন দোয়া। কি মধুর সে বাণী। এখনো যেন কানে তার প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। তারপর তিনি কি করলেন ভাবতে এখনো অবাক লাগে। না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে চাইবে না। সব চেয়ে রোগা ছাগলটির স্তনে হাত বুলালেন। আর অমনি ঝর ঝর করে দুধ পড়তে লাগলো স্তন থেকে। সে দুধ তাঁরা দু জনে তো খেলেন পেট ভরে। আমিও খেলাম। কী আশ্চর্য, তবুও দুধ শেষ হয় না। আর তার স্বাদই আলাদা। এমন সুস্বাদু দুধ জীবনে কোন দিন খাইনি। দোয়ার বাক্যগুলো যেন এখনো কানে ভেসে আসছে। কিন্তু সবটুকু মনে পড়ছে না।
সে সুমধুর বাণী যেন তার মনে নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। সে চেষ্টা করে। কিন্তু সেই মধুর কথাগুলো আর স্মরণ করতে পারে না। সে পাগল হয়ে যাবে নাকি?
সে ওই রাতে আর ঘরে ফিরতে পারলো না। মানসিক অস্থিরতা খুবই বেড়ে গেলো। মক্কার আশে পাশে পাগলের মতো ঘোরাফেরা করতে থাকলো সারারাত ধরে। এক সময় রাত শেষ হলো। পুব দিকে আলোর রেখা দেখা দিল। রাখালরা ছাগল আর ভেড়ার পাল নিয়ে শহর থেকে বের হয়ে পড়েছে। এমন সময় সে শহরে প্রবেশ করলো কিন্তু তার অশান্ত মন শান্ত হলো না। সেই প্রশান্ত ও উজ্জ্বল চেহারার লোকটি ও তাঁর সাথীকে খুঁজে বের না করা পর্যন্ত সে শান্ত হতে পারল না। তাঁদের গোপন আড্ডাটির সন্ধানও সে জেনে নিল। তার খুশি আর দেখে কে। সে যেন সাত রাজার ধন পেয়ে গেছে। সে তাঁকে দেখলো। জানলো তিনি নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সে তাঁর মজলিসে বসলো। তাঁর কাছে গেলো। আরো কাছে। অনেক কাছে। তাঁর একেবারে মুখোমুখি হলো। উদ্বেগ আকুল স্বরে বলতে থাকলো, আমাকে আর একবার শুনান সেই কথাগুলো যেগুলো গতকাল বলেছিলেন। সেগুলো আমাকে শিখিয়ে দিন।
তিনি প্রশান্ত হাসি হাসলেন। সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। গাঢ় স্বরে বললেনঃ আমি জানি তুমি লেখাপড়া জানো। তোমার তো বেশ বুদ্ধি জ্ঞান হয়েছে। মক্কার এই কিশোরটির মনে ঝড় উঠলো। কি জানি তার যেন কেবল মনে হতে থাকলোঃ তার জন্ম বৃথা নয়। সে নিজের জন্য জন্মেনি। সে নিজের পরিবারের লোকদের জন্য জন্মেনি। উকবা বিন আবী মুঈতের ছাগলের পাল চরাবার জন্য তার জন্ম হয়নি। তার জন্মের একটিই মাত্র উদ্দেশ্য। তার জন্ম হয়েছে আজীবন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থাকার জন্য। তাঁর কাছে বসার, তাঁর বাণী শুনার, সেগুলো মুখস্ত করার এবং তাঁর কথা মানুষের কাছে প্রচার করার জন্য।
এই হালকা পাতলা গড়নের কিশোরটি যেমন ছিল রোগা তেমনি দুর্বল। কিন্তু বুদ্ধি ছিল এমন তীক্ষ্ণ যেন ধারাল ছুরির ফলা। গতি ছিল তার এত দ্রুত যেমন গনগনে আগুনের শিখা। কিছু দিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সোহবতে থেকে সে অনেক কথা শিখে ফেললো। ইসলামের অনেক কিছু জেনে নিল। এখন তাকে দেখা যায় মক্কার সবখানে। কখনো বাজারে, কখনো রাস্তায়, কখনো পথের চৌমাথায়, কখনো মাঠের এক কিনারে রাখালদের মধ্যে, কখনো কাবাঘরের চত্বরে। যেখানেই তার সন্ধান পাওয়া যায়, দেখা যায় সে কিছু বলছে এবং তার চারদিকে উৎসুক জনতা। সব জায়গায় সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা প্রচার করে বেড়ায়। আল্লাহর বাণী মানুষকে শোনায়। তার প্রচারের তীব্রতা কুরাইশদের কাছে একটা নতুন বিপদ মনে হলো। তারা তার প্রচার কাজে বাধা দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। কিন্তু তার নাগাল পাওয়া ভার। শুনলো সে উকায বাজারে বক্তৃতা দিচ্ছে। লোকেরা তার কথা গোগ্রাসে গিলছে। অনেক লোক তার দিকে ঢলে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে। একথা শুনে কুরাইশদের একটি দল ছুটলো উকাযের দিকে। কিন্তু গিয়ে দেখল সে আর নেই। সেখানে জানা গেলো বাতহা উপত্যকায় চলে গেছে সে। বাতহার লোকেরা তার কথায় মুগ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাতহায় গিয়েও তারা তাকে পেল না। শুনলো এই মাত্র সে চলে গেছে আমের গোত্রের মধ্যে। এভাবে কিছু দিনের মধ্যে কুরাইশদেরকে নাকাল করে দিল সে। এই এখানে তো এই সেখানে। এখন আছে এখন নেই। যেন মুহূর্তে কপূরের মত উবে গেলো। একদিন আল্লাহর দুশমন আবু জেহেল বিরক্তি ও ক্ষোভের চরমে পৌঁছে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল:
মুহাম্মদের কোনো সাথী আমাকে এতো কষ্ট দেয়নি যেমন এ নওজোয়ানটি দিচ্ছে। সব জায়গায় সে মুহাম্মদের দাওয়াত ছড়াচ্ছে, লোকদের আকীদা-বিশ্বাস-ধর্ম নষ্ট করে বেড়াচ্ছে। এতো করেও তাকে ধরতে পারছি না। কিন্তু একবার বাগে পেলে হয় বাছাধনটি, মায়ের দুধ মনে করিয়ে দেবো।
একদিন আবু জেহেল দেখলো দূর থেকে কাবা ঘরের পাশে কে একজন দাঁড়িয়ে কিছু বলছে। চারদিকে লোকের ভিড়। হালকা পাতলা যুবকটি কিন্তু কণ্ঠ বেশ জোরালো। তবুও সে কি বলছে জানার জন্যে দেয়ালের আড়ালে আড়ালে গুটি গুটি মেরে এগিয়ে চললো আবু জেহেল। কাছে গিয়ে বাড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে সে শুনতে পেলো যুবকটির কথা। কী মধুর স্বরে সে বলে চলেছে: আর আল্লাহর বান্দা তো তারাই যারা হেঁটে চলে জমিনের ওপর দিয়ে ধীরে সুস্থে, আর মুর্খরা যখন তাদের সাথে কথা বলে তখন 'সালাম' বলে দেয় তাদেরকে। আর তারা যারা তাদের প্রতিপালকের সামনে সিজদায় নত হয়ে দীনতা ও নম্রতার সাথে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। আর যারা দোয়া করে- হে আমাদের প্রতিপালক প্রভু! দোজখের আযাব থেকে আমাদের দূরে রাখো, সন্দেহ নেই দোজখের আযাব বড়ই কষ্টকর।
আল্লাহর এ কালাম শুনে আবু জেহেলের বুক দূরু দূরু করতে লাগলো। কেঁপে উঠলো তার সমস্ত শরীর। তার মনকে সে যদি স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিতো তাহলে তার মুখ থেকেও ঐ কথাগুলোই বের হতো। আল্লাহর কালাম সত্য, একথা সে গলা ফাটিয়ে চীৎকার করে বলতো। সে নিজেই বলতো- আমি এই আল্লাহর বান্দাদের দলে শামিল হতে চাই।
কিন্তু আবু জেহেল তা করতে পারলো না। তার মনকে স্বাধীন হতে দিল না। গর্ব আর অহংকার তাকে সত্যের পথে দাঁড়াতে বাধা দিল। সে লোকগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো যেমন বাজপাখি তার শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। দাঁড়া তোকে আজ দেখাচ্ছি মজা।
আবু জেহেলের আকস্মিক আক্রমণে লোকেরা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তার হুংকারে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যার মতো দৌড়ে পালিয়ে গেলো। কিন্তু ইবনে মাসউদ অসম সাহসী বীরের মতো বুক ফুলিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো একা। আবু জেহেল রাগে ফেটে পড়লো:
তোকে বহুদিন থেকে খুঁজে ফিরছি। আজ হাতের নাগালে পেয়ে গেছি। তুই আমাদের গোলাম আর বন্ধু গোত্রের লোকদের আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছিস। আমি বহুদিন থেকে দেখে আসছি তুই এদের আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছিস। আজ আমার হাতে তোর মৃত্যু হবে।
ইবনে মাসউদ তার একথার জবাব দিতে চাইলো। কিন্তু আবু জেহেল তা শুনতে চাইল না। ধনুকের বাঁটটি দিয়ে কষে মারলো ইবনে মাসউদের মাথায়। মাথা ফেটে গেলো। রক্তে ভেসে গেলো ইবনে মাসউদের কপাল, মুখ, জামা, কাপড়। কিন্তু তার কোনো পরওয়া করলো না সে। ঝাঁপিয়ে পড়লো আবু জেহেলের ওপর।
আচ্ছা, এই কথা? তাহলে জেনে রাখো, আমিও হোযাইল বংশের ছেলে। এই বলে আবু জেহেলের বুকে মারলো এক ঘুষি, একই সঙ্গে মুখে জোরসে এক চড় কষে মারলো। আবু জেহেল ছিটকে পড়ে গেলো। পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলেও তার চেয়ে অনেক বেশী অবাক হলো সে। সে হলো কুরাইশ দলপতি আর তাকে কিনা অপমান করলো আজ হোযাইল গোত্রের একরত্তি একটি ছেলে। এর প্রতিশোধ নিতে হবে।
রাগে, অপমানে, ক্ষোভে ফুলতে ফুলতে সে তার গোত্রের লোকদের কাছে এসে বললোঃ হে বনী মাখযুম! তোমাদের মধ্যে যদি একটুও লজ্জা থাকে, নিজের গোত্রের প্রতি যদি একটুও ভালোবাসা থাকে, তাহলে হোযাইল গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের থেকে আমার প্রতিশোধ নাও। সে আমাকে এমনভাবে অপমান করেছে যে একমাত্র তার রক্ত দিয়েই এ কলংক কালিমা ধোয়া যেতে পারে।
সঙ্গে সঙ্গেই কয়েক ডজন লোক তীর, তলোয়ার, বর্শা নিয়ে ইবনে মাসউদের তালাশে বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু বদরের যুদ্ধের আগে আবু জেহেল আর তার মুখোমুখি হতে পারলো না।
প্রশ্নের জবাব দাও
১. আবুল ওলীদের ছাগল চরাবার কাজে ইস্তফা দিলেন কে? কেন ইস্তফা দিলেন?
২. পাহাড়ের কোলে তিনি কি আশ্চর্য দৃশ্য দেখেছিলেন?
৩. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ কিসের নেশায় অস্থির হয়ে উঠেছিলেন?
৪. ইবনে মাসউদ কিভাবে ইসলামের দাওয়াত দিলেন?
৫. ইবনে মাসউদ কিভাবে আবু জেহেলের আক্রমণের জবাব দিলেন?
📄 কৃতজ্ঞ বান্দা
সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। কতদিন তা ঠিকমত হিসেব কষে বলা সহজ নয়। তবে কয়েক হাজার বছর হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তখন দুনিয়ায় এত লোকবসতি ছিল না। পৃথিবীর নানা জায়গায় মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করতো। সে সময় বনি ইসরাঈলের মধ্যে তিনজন লোকের দুঃখের কোন সীমা ছিল না। তারা অতি কষ্টে দিন কাটাতো। নিজেদের দুর্ভাগ্যের জন্য তারা সব সময় দুঃখ করতো আর কাঁদতো।
তাদের একজন ছিল কুষ্ঠরোগী। তার সারা শরীর ছিল ঘায়ে ভরা। তার দু'হাতের আঙ্গুল, পায়ের আঙ্গুল, নাক ও কান পচে খসে খসে পড়ছিল। সেগুলো থেকে উৎকট দুর্গন্ধ বের হতো। শত শত মাছি সব সময় তার পচা ঘাগুলোর ওপর ভন ভন করতো। মানুষ তাকে দেখে দূরে সরে যেতো। তাকে ঘৃণা করতো।
আর একজনের ছিল মাথাজোড়া টাক। তার মাথার কোথাও একগাছি চুল ছিল না। লোকেরা তাকে সব ভাল কাজের পথে বাধা মনে করতো। সকালে কেউ ঘুম থেকে উঠে প্রথমে তার মুখ দেখা পছন্দ করতো না। সবাই তার সংসর্গ থেকে দূরে সরে থাকতে চাইতো।
তৃতীয় জন ছিল অন্ধ। আল্লাহ তার দু চোখের সব আলো কেড়ে নিয়েছিলেন। দুনিয়ার বুকে সে চলে ফিরে বেড়াতো কিন্তু দুনিয়ার কিছুই দেখতে পেতো না। সবাই তার প্রতি সহানুভূতি দেখাতো। সে ছিল সবার করুণার পাত্র।
আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করার জন্যে তাঁর এক ফেরেশতাকে পাঠালেন।
আল্লাহর ফেরেশতা গেলেন কুষ্ঠরোগীর বাড়ি। দেখলেন তার মুখটা বড়ই মলিন। সে বসে বসে নিরবে চোখের পানি ফেলছে।
"তুমি কাঁদছো কেন বাপু।” ফেরেশতা সহানুভূতির স্বরে জিজ্ঞেস করলো, "আল্লাহর এই বিশাল পৃথিবীতে তোমার কিসের দুঃখ?”
"নিজের দুর্ভাগ্যের কথা মনে করে আমার কাঁদা ছাড়া আর কোনো উপায় আছে কি?” কুষ্ঠরোগী মলিন মুখে জবাব দিল।
"আচ্ছা, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।" ফেরেশতা আবার বললেন।
"কি কথা?”
“এই কুষ্ঠরোগের হাত থেকে মুক্তি ছাড়া আমি আর কি চাইতে পারি?”
"তাহলে তুমি চাও সুন্দর-সুস্থ সবল শরীর, তাই না?
“হ্যাঁ, এ ছাড়া আমার আর কি চাইবার আছে? এই রোগের জ্বালায় আমি শেষ হয়ে গেলাম। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে, তাদের কাছে আমাকে বসতে দেয় না। আমাকে দেখলেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়।”
"তাহলে আল্লাহর কাছে আমি তোমার জন্য দোয়া করছি।” এই বলে ফেরেশতা তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন।
দেখতে দেখতে কুষ্ঠরোগী সেরে উঠলো। তার গায়ের রং পালটে গেল। তার কুৎসিত কদাকার দেহে নতুন লাবণ্য ফুটে উঠলো। কুৎসিত মানুষটির মধ্য থেকে একটি সুশ্রী, সুস্থ, সবল যুবক বের হয়ে এলো।
ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেনঃ “এবার বলো তুমি কোন সম্পদ বেশী ভালবাস?”
"উট” লোভাতুরের ন্যায় ফেরেশতার দিকে তাকিয়ে সে ঝটপট জবাব দিল।
"এই গর্ভবতী উটটি ধরো। আল্লাহ তোমাকে এর মধ্যেই বরকত দেবেন।” একথা বলেই ফেরেশতা গায়েব হয়ে গেলেন।
সেখান থেকে ফেরেশতা এলেন টাক মাথার কাছে। সে তখন একাকী বসে নিজের দুর্ভাগ্যের জন্যে হা-হুতাশ করছিল। অপরিচিত লোককে দেখে খেঁকিয়ে উঠলো, "মরার আর জায়গা পেলেনা? আমাকে জ্বালাতে এলে কেন?"
“একটা কথা জানতে এসেছিলাম।” ফেরেশতা সহানুভূতিমাখা কণ্ঠে বললেন।
"আমার কাছে জানবার মত এমন কি কথা আছে?"
“আমাকে তোমার একজন বন্ধু মনে করো।" ফেরেশতা বললেন। "আমি তোমার উপকার করতে চাই। আমি জানতে চাই তুমি কি চাও? কি পেলে তুমি খুশী হও?”
"আমি আমি কি --- চাই, এ্যাঁ--? মাথাভর্তি কালো চুল ছাড়া আর কি চাইব বল?"
"ও, তাহলে তুমি মাথা ভর্তি চুল পেলেই খুশী?”
সে খুশীতে ডগমগ।
"সত্যিই কি এটা সম্ভব? মাথায় চুল ভরে গেলে লোকেরা আর আমাকে বিদ্রূপ করবে না। তখন কতই না মজা হবে। সবাই আমাকে ভালবাসবে- সম্মান করবে। আমি বুক ফুলিয়ে পথ দিয়ে হাঁটতে পারবো। কিন্তু --- কিন্তু, এটা কি সম্ভব?”
“হ্যাঁ, আল্লাহর কাছে তোমার জন্য দোয়া করছি।” এই বলে ফেরেশতা তার টাক মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে তার সারা মাথা কালো কুচকুচে চুলে ভরে গেল। তার চেহারায়ও লাবণ্য ফুটে উঠলো।
ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেনঃ "বলো, তুমি কোন সম্পদ বেশী ভালবাস?"
"গরু, আমি গরু বেশী ভালবাসি" সে সোৎসাহে জবাব দিল।
"তাহলে এই গর্ভবতী গাভীটি রাখো। আল্লাহ তোমাকে এ থেকেই বরকত দেবেন।" একথা বলে ফেরেশতা চলে গেলেন।
এবার ফেরেশতা এলেন অন্ধের কাছে। অন্ধের কাছে সারা দুনিয়াটাই অন্ধকার। সে আল্লাহর এই বিশাল দুনিয়ার কিছুই দেখতে পায় না। তাই নিজের দুঃখের কথা চিন্তা করে বসে বসে চোখের পানি ফেলছিল। ফেরেশতার সাড়া পেয়ে জিজ্ঞেস করলোঃ "কে ভাই তুমি? অন্ধের কুঁড়েঘরে এলে কি উদ্দেশ্যে?"
"তোমার কাছে সবাই অপরিচিত আর আমিতো অনেক অনেক বেশী অপরিচিত।" ফেরেশতা বললেন, "তবে তুমি জেনে রাখ তোমার এক বন্ধু হিসেবে তোমার কিছু উপকার করার জন্যে আমি তোমার কাছে এসেছি।"
"তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।" ফেরেশতা আবার বললেন।
"কি কথা, আমার মতো এক নগণ্য অন্ধের কাছ থেকে আবার কি কথা জানতে চাও?”
"দুনিয়ার কোন জিনিসটি তুমি সবচাইতে বেশী ভালবাস?"
"আমার মতো অন্ধ দু'টি চোখ ছাড়া আর কি ভালবাসতে পারে?"
"যদি তোমার দু'টি চোখ ফিরিয়ে দেয়া হয়--।" ফেরেশতা তার মলিন মুখের দিকে চেয়ে বললেন।
"আহা, তাহলে কতই না ভালো হয়। আল্লাহর এই বিচিত্র দুনিয়ার কত কিছুই আমি দেখতে পাবো? তাহলে আমি আল্লাহর কাছে অসংখ্য শোকরগুজারী করবো।"
"মহান সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে আমি তোমার চোখের জন্যে দোয়া করছি।” এই বলে ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। তার চোখের জ্যোতি ফিরে এলো।
"ইয়া আল্লাহ! ইয়া আল্লাহ! তোমার কি অপার মহিমা! তোমার দয়ার শেষ নেই! তোমার রহমতের অন্ত নেই! আহা! আমি কি দেখছি! আমি সব কিছু দেখতে পাচ্ছি! আহা! কি সুন্দর এই পৃথিবী! গাছ-পালা, আকাশ, মানুষ! আহা সব-সব সুন্দর! আল্লাহ! তুমি কতইনা সুন্দর! কতই না ভালো!!"
"আমি আর একটা কথা জানতে চাই” ফেরেশতা আবার বললেন। “কি কথা?" কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে ফেরেশতার দিকে চেয়ে সে জিজ্ঞেস করলো।
"দুনিয়ার কোন সম্পদ তুমি বেশী ভালবাস?”
"ছাগল আমি সবচেয়ে বেশী ভালবাসি।” সে জবাব দিল।
“এই তোমাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দিলাম। আল্লাহ এর মধ্যে তোমাকে বিপুল বরকত দান করবেন।"
"আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।" ফেরেশতা চলে গেলেন।
কুষ্ঠরোগী, টাকমাথা ও অন্ধ- তিনজনের মনের আনন্দে দিন কাটতে লাগলো। তারা পশুপালনে অত্যন্ত মনোযোগী হয়ে উঠলো। তাদের প্রতি যত্ন নিতে লাগলো। দিনভর পশুদের চারণ ক্ষেত্রে নিয়ে ফিরতো এবং সাঁঝের বেলা পেট ভরিয়ে পানি পান করিয়ে নিয়ে ঘরে ফিরে আসতো। এভাবে ধীরে ধীরে কয়েক বছর গড়িয়ে গেলো। উটের সংখ্যা বেড়ে গেল। গরুর সংখ্যা বেড়ে গেলো। ছাগলের সংখ্যা বেড়ে গেলো। তাদের তিনজনের অভাব ঘুচলো। এখন তাদের খাদ্য-পানীয়, অর্থ, সম্পদ-কোন কিছুর অভাব থাকলো না। তাদের ধনের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। মানুষের চোখে তাদের মান সম্মান-ইজ্জত বেড়ে গেলো।
কিন্তু তাদের পরীক্ষার এখনো বাকি ছিল।
ফেরেশতা আবার এলেন কুষ্ঠরোগীর বাড়িতে। তবে এবার তিনি এলেন দরিদ্রের বেশ ধরে। কুষ্ঠরোগী এখন তো আর রোগী নয়। সে এখন একজন সুন্দর সুশ্রী-সুঠামদেহী যুবক। ধনী যুবক। বহু টাকার মালিক। সে উটের দেখাশুনায় ব্যস্ত ছিল। ফেরেশতা তার সামনে হাজির হলেন।
"তুমি কে হে বাপু? এখানে কি দরকার?” কুষ্ঠরোগী ঝাঁঝালো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
"আমি বড়ই গরীব বাবা। আমি সফর করছিলাম। কিন্তু পথে আমার টাকা-পয়সা সব শেষ হয়ে গেছে। এখন আমার কাছে একটি কানাকড়িও নেই। কিভাবে দেশে ফিরবো সেই চিন্তায় আমি আকুল। আল্লাহ ছাড়া আমার আর কোন সহায় নেই।
"তোমার এ দুরবস্থার জন্যে আমি দায়ী নই। কাজেই এ ব্যাপারে আমি কি করতে পারি?” কুষ্ঠরোগী মুখ বিকৃত করে বললো।
"আমি তোমার কাছে সাহায্য চাইছি। সেই আল্লাহর নামে সাহায্য চাইছি যিনি তোমার দুরারোগ্য কুষ্ঠরোগ সারিয়ে দিয়েছেন। তোমাকে সুন্দর, সবল ও সুস্থ শরীর দান করেছেন। তোমাকে এই অসংখ্য উট ও বিপুল ধন-সম্পদ দিয়েছেন। আল্লাহর নামে আমাকে একটি উট দাও। এই উটে চড়ে আমি নিজের দেশে যাবো। আল্লাহ তোমাকে এর বদলায় আরো অনেক দিয়ে দেবেন।"
"দূর হ, দূর হ, দূর হ, এখান থেকে! তোর মতো অনেক ভিখারী দেখেছি! ভিখারী সাহেব আবার উটে চড়ে দেশে যাবে। ভড়ং দেখাবার জায়গা পায়নি আর। যা যা। দূর হয়ে যা, এখান থেকে দূর হয়ে যা! আমার এখন অনেক কাজ বাকি। অনেকের হক আদায় করতে হবে। তোর মতো ভিনদেশী ভিখারীকে দেবার মত আমার কাছে কিছুই নেই।” কুষ্ঠরোগী রাগে ফেটে পড়লো।
"আমার মনে পড়ছে” ফেরেশতা বলতে লাগলেন, "আগে তুমি কুষ্ঠরোগী ছিলে। মানুষ তোমাকে ঘৃণা করতো। কেউ তোমাকে কাছে বসতে দিতো না। তুমি ছিলে অত্যন্ত গরীব। পরের কাছে চেয়ে-চিন্তে যা পেতে তাতেই তোমার দিন গুজরান হতো। তোমার কোনো সম্মান ছিল না। কেউ তোমাকে ভালবাসতো না। তারপর আল্লাহ তোমার রোগ সারিয়ে দিলেন। তোমাকে ধন-সম্পদ দান করলেন। আর এই পরম করুণাময় আল্লাহর পথে তুমি একটি উটও দান করতে পারছো না?"
“বেশ বাজে বকতে পারোতো তুমি," কুষ্ঠরোগী রাগে দিশেহারা হয়ে পড়লো, "আমার এ ধন সম্পত্তি আমার বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসছে।"
"ভালো কথা, তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে মনে রেখো, তুমি মিথ্যেবাদী হলে আল্লাহ তোমাকে তোমার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেবেন।" এই কথা বলে ফেরেশতা সেখান থেকে টাকমাথার কাছে চলে এলেন।
টাকমাথা তখন গরু দেখাশুনায় ভীষণ ব্যস্ত। তার কারো দিকে ফিরে তাকাবার ফুরসত নেই।
"ওহে আল্লাহর বান্দা! আমার একটি কথাতো শোনো" ফেরেশতা চীৎকার করে বললেন।
"তোমরা আজকাল বড্ড জ্বালাতন করছো, কি বলতে চাও শিগগির বলে ফেলো, আমার সময় কম।” টাকমাথা বিরক্তিমাখা স্বরে বললো।
"আমি বড় গরীব। সফরে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমার হাতে একটি পয়সাও নেই। কেমন করে দেশে ফিরবো ভেবে পাইনে। আল্লাহ ছাড়া আমার আর কোন সম্বল নেই।”
"আমি কি করতে পারি? তোমার এ অবস্থার জন্যে আমি দায়ী নই।” টাকমাথা মুখ ফিরিয়ে নিল।
"আল্লাহর নামে একটা গরু আমাকে দাও। আল্লাহ তোমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন। তোমার মাথায় সুন্দর কালো কালো চুল দিয়েছেন। তোমাকে ধন দৌলত দিয়েছেন, অসংখ্য গরু দিয়েছেন। সমাজে মান-সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি সবই দিয়েছেন।"
"যা যা, তোর মতো অনেক ভিখারী আমার দেখা আছে। আমার দান করার দরকার নেই। এগুলো আমার অনেক মেহনতের ধন। ভাগ ভাগ, তোকে দেবার মত আমার কিছুই নেই।” টাকমাথার কণ্ঠে ক্রোধ ঝরে পড়ছিল।
"আমি জানি তোমার মাথাজোড়া টাক ছিল। লোকেরা তোমাকে ঘৃণা করতো। তুমি ছিলে বড়ই গরীব। আল্লাহ তোমার ওপর মেহেরবাণী করলেন। তোমার মাথায় কালো কুচকুচে চুল দিলেন। তোমাকে অসংখ্য গরু ও বিপুল ধন-সম্পত্তি দিলেন। সমাজে তোমার মান-সম্মান ও প্রতিপত্তি দিলেন। এত বড় করুণাময় আল্লাহর পথে তুমি একটি গরুও দান করতে পারছো না!"
"কি কথা বলো তুমি ভিনদেশী ভিখারী? আমি জানি, ভালো করেই জানি, এই বিপুল সংখ্যক গরু, টাকা-পয়সা সব আমার বাপ-দাদার নিকট থেকেই আমি পেয়েছি।”
"ভালো কথা, তোমার কথা যদি মিথ্যা হয় তাহলে আল্লাহ তোমাকে তোমার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেবেন।"
এই কথা বলে ফেরেশতা সেখান থেকে অন্ধের বাড়ির দিকে চললেন। অন্ধ তখন তার ছাগলের পাল নিয়ে ব্যস্ত।
"একটা কথা শুনে যাও ভাই।" ফেরেশতা অন্ধকে ডেকে বললেন।
"কি কথা বল ভাই।"
"আমি একজন গরীব মুসাফির। আমার সফরের শেষ সম্বলটুকুও ফুরিয়ে গেছে। এখন আল্লাহ ছাড়া আমার কোন সহায় নেই। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে একটা ছাগল দাও। সেটা বিক্রি করে আমি কিছু অর্থ সংগ্রহ করবো এবং তার সাহায্যে আমার সফরের কাজ শেষ করবো।"
"আল্লাহ আমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন। আমাকে এই বিপুল সম্পদ দান করেছেন। এর মধ্যে তোমারও হক আছে। আমার ভাই, আমি আনন্দের সাথে বলছি, তুমি নিজের ইচ্ছেমতো ছাগল নিয়ে যাও, একটা কেন, দুটো তিনটে, চারটে, যেক'টা তোমার প্রয়োজন নিয়ে যাও। বরং আমার ভাই, এসবগুলোই তুমি নিয়ে যাও।”
অন্ধ আবেগ ভরে বলে যাচ্ছিলঃ আমার ভাই! আল্লাহ আমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন। আমি অন্ধ ছিলাম আমাকে চোখ দিয়েছেন। আমি গরীব ছিলাম- আমাকে এই বিপুল সংখ্যক ছাগল দিয়েছেন। আমি তুচ্ছ ও নগণ্য ছিলাম, আমাকে সমাজে সম্মান ও প্রতিপত্তি দান করেছেন। এই বিপুল নেয়ামত-এ সব তাঁরই দান। তাঁর নামে ও তাঁর পথে এসব দান করলে তিনি আবার এর চাইতে বেশী সম্পদ আমাকে দান করবেন। আমার ভাই! যে কটা ছাগল তোমার প্রয়োজন এখান থেকে নিয়ে যাও।"
এভাবে আল্লাহর দানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ফেরেশতা বড়ই আনন্দিত হলেন।
"তোমার ছাগল তোমার থাক। আমার আর প্রয়োজন নেই, ফেরেশতা বলতে লাগলেন, আল্লাহ তোমার সম্পদ আরো বাড়িয়ে দেবেন। তুমি আল্লাহর শোকর আদায় কর কিনা আমি শুধু এতটুকুই দেখতে এসেছিলাম। তোমার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। আল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। তুমি আল্লাহর নেয়ামতের আরো শোকর করতে থাক। আল্লাহ তোমার প্রতি তাঁর করুণা অজস্র ধারায় বর্ষণ করবেন। তোমার অন্য দুই বন্ধু, টাকমাথা ও কুষ্ঠরোগী ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা আল্লাহর নেয়ামতের কদর করেনি। তারা শোকর আদায় করেনি। তাই তারা নিজেদের আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। আমার ভাই! আল্লাহ তোমাকে তাঁর করুনার ছায়াতলে আশ্রয় দান করুন। এবার তাহলে চলি। ফেরেশতা চলে গেলেন।
বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসের ভিত্তিতে গল্পটি রচিত।
প্রশ্নের জবাব দাও
১. আল্লাহ কাদের পরীক্ষা করার জন্যে তাঁর ফেরেশতা পাঠালেন?
২. তারা কে কি সম্পদ চাইলো?
৩. কুষ্ঠরোগী ও টাকমাথা কি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পেরেছিল? না পারলে কেন পারেনি?
৪. অন্ধ কিভাবে পরীক্ষায় সফলকাম হলো?
৫. আল্লাহর শোকর কিভাবে আদায় করতে হয়?
📄 চাষী আল্লাহর অনুগত
এক ছিল চাষী। তার ছিল জমি। এক চিলতে নয়, বেশ খানিকটা। আর সেই জমিতে সে করতো চাষ-আবাদ। চাষী ছিল যেমন সৎ তেমনি চরিত্রবান। সে কারোর জমির আইল ঠেলতো না। প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া-ঝাঁটি করতো না। সব কাজে আল্লাহর হুকুম মেনে চলতো।
চাষী চাষ করতো নিজের জমি। সকাল হলেই ফজরের নামায সেরে গরুর কাঁধে লাঙ্গল দিয়ে মাঠে নামতো। ক্ষেতে লাঙ্গল দিতো, সার দিতো, বীজ বুনতো, সব কিছু করতো কিন্তু ভরসা রাখতো আল্লাহর রহমতের ওপর। আল্লাহও তেমনি তার মেহনতের ফল দিতেন। তার ক্ষেতে শস্য ঢেলে দিতেন অজস্র। আশে-পাশের সব ক্ষেতের তুলনায় তার ক্ষেতে শস্য হতো অনেক বেশী। আর সব ক্ষেত শুকিয়ে গেলেও বা কোন প্রকার দুর্যোগে ফসল নষ্ট হয়ে গেলেও তার ক্ষেত সব সময় শস্য-শ্যামল থাকতো।
কিন্তু তার ক্ষেতে এই অজস্র ফসলের রহস্য খুব কম লোকই জানতো। সবাই মনে করতো এ সব বুঝি তার বেশী মেহনতের ফল।
একবার ভীষণ গরম পড়লো। রোদের তাপে ক্ষেতের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেলো। পুকুরের পানিও শুকিয়ে যেতে লাগলো। গাছ পালায়, ঘরের চালে কাকেরা কা কা চীৎকার করতে লাগলো। সারাটা দুনিয়া যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। হায় আল্লাহ, একি হলো! মানুষ সব সময় আকাশের দিকে চেয়ে থাকতো মেঘের আশায়। কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে যেতো। কিন্তু আবার পরক্ষণেই প্রবল বাতাস সেগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতো দেশ থেকে দেশান্তরে। একটু আগেই যেখানে বিপুল আশায় মানুষের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। সেখানে আবার নিমেষেই সব আশা উবে যেতো। মানুষের দুর্ভাবনা বেড়ে গেল। সবাই চিন্তা করতে লাগলো, এবার কি হবে। বৃষ্টির অভাবে এবার ক্ষেতে ফসল হবেই বা কেমন করে!
কিন্তু ওই সৎ চাষীর কোন চিন্তাই ছিল না। তার মনে কোন দুঃখ বা খেদও ছিল না। লোকেরা মনে করলো, এ বছর বৃষ্টি হচ্ছে না। কাজেই ক্ষেতে ফসল হবে না। ক্ষেতে মেহনত করেই বা কি হবে? আর সৎ চাষীর ক্ষেতে বা ফসল হবে কেমন করে? সে ক্ষেতে মেহনত করলেও তার সব মেহনত বিফলে যাবে। পানির অভাবে একদানাও শস্য পাবে না সে।
এভাবে কিছু দিন কেটে গেলো। একদিন আকাশে কালো মেঘ দেখা গেলো। দেখতে দেখতে সারা আকাশ মেঘে ছেয়ে গেলো। মানুষের মনে আশা জাগলো এবার বুঝি বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি হলো, সত্যি বৃষ্টি হলো। কিন্তু কোথায় যেখানে মাটি নেই, ক্ষেত নেই, পাথর শুধু পাথর। মেঘ তার সব সম্পদ পাথরের ওপর পাহাড়ের বুকে ঢেলে দিয়ে চলে গেলো। মানুষ আবার নিরাশায় ডুবে গেলো।
আল্লাহর মহিমা বোঝা কার সাধ্যি! যে পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছিল তার ওপর থেকে একটি নালা নীচে ক্ষেতের দিকে নেমে এসেছিল। নালাটি ওই সৎ চাষীর ক্ষেতের পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল। বৃষ্টি নামতে দেখে ওই ব্যক্তি নিজের ক্ষেতে পৌঁছে গেলো। সে আল্লাহর শোকর গুজারী করলো। কোদাল দিয়ে নালার মুখটি কেটে নিজের ক্ষেতের দিকে ঘুরিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে তার ক্ষেত পানিতে ভরে গেলো। ফলে অন্যান্য ক্ষেতে কোনো ফসল হলো না। কিন্তু তার ক্ষেতে শস্য ভরে গেলো।
তার ক্ষেতের অবস্থা দেখে, মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগলো। কারোর ক্ষেতে ফসল হলো না, তার ক্ষেতে ফসল হলো কেমন করে?
"এবার তার সব পরিশ্রম মেহনতই তো অর্থহীন ছিল?"
"তা ঠিক, তবে তার জমির মাটি উর্বর।”
"না কখখনো না, আর সব জমির মতো তার জমিও সমান উর্বর।”
"তাহলে কি ব্যাপার? তার জমিতে ফসল হলো কেন?"
লোকেরা অনেক চিন্তা করলো, অনেক বাদানুবাদ করলো কিন্তু এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলো না। অবশেষে সবাই একবাক্যে বললোঃ "চলো তার কাছ থেকেই এর কারণ জানা যাক।" চলো তার কাছে চলো। তারা সবাই তার কাছে এলো। তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ "ভাই, একটা ব্যাপারের কোনো রহস্যই আমরা বুঝতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়ে তোমার কাছে এসেছি। তুমি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে অনেক কিছু জানো। যদি তুমি অসন্তুষ্ট না হও তাহলে তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই।"
"নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবে। অসন্তুষ্ট হবো কেন?”
"এই কাঠফাটা রোদ্দুরে সবার ক্ষেত ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।----।”
"হ্যাঁ, তা জানি।”
"কিন্তু তোমার ক্ষেত শস্য-শ্যামল হয়ে উঠেছে।"
"হ্যাঁ তাতো সবাই জানে।"
“এই প্রচণ্ড গ্রীষ্মে সবার ক্ষেতের মাটিগুলোই শুধু আছে। বৃষ্টি না হবার কারণে কেউ শস্যের একটি দানাও পায়নি।"
"তা অবশ্য আমি জানি।"
"কিন্ত তোমার ক্ষেতে সবুজের সমারোহ, শস্যে সমগ্র ক্ষেত ভরে গেছে।"
"এতে কোন সন্দেহ নেই।"
"আমরা মনে করেছিলাম সবার ক্ষেতের যা অবস্থা তোমার তাই হবে। তবে যেহেতু তুমি বেশী মেহনত করো, ক্ষেতের ও ফসলের বেশী যত্ন নাও, তাই আগে তুমি বেশী ফসল পেতে এবং এবারও কিছুটা পাবে। কিন্তু এত বড় পার্থক্য কেমন করে হলো? কেউ একটি দানাও পেলো না অথচ তুমি পুরো ফসল পেলে, এর কারণ কি?"
“এটাই তো আসল কথা। অথচ এটা তোমরা বুঝতে পারো না।” সে বলতে শুরু করলো। "তোমরা যতটুকু মেহনত করো আমিও ঠিক ততটুকুই করি। তোমাদের চাইতে বেশী মেহনত করার শক্তি আমার কোথায়? বরং তোমাদের মধ্যে আমার চাইতে বেশী শক্তিমান লোক আছে। তারা আমার চাইতে অনেক বেশী মেহনত করে। তাদের তুলনায় আমার মেহনত কিছুই নয়।”
"তোমার কথা এক বর্ণও মিথ্যা নয়। তাহলে এর কারণ কি?” তারা বিস্ময় প্রকাশ করলো।
“এর একটি মাত্র কারণ, আল্লাহর রহমত আমার ওপর বিশেষভাবে বর্ষিত হয়। এই সেদিনকার কথাই ধরো। আল্লাহ সেদিন এমনভাবে বৃষ্টি দিলেন যে, তা পাহাড়ের ওপর দিয়ে গড়িয়ে নালার সাহায্যে আমার ক্ষেতের মধ্যে এসে পৌঁছলো। যার ফলে আমার ক্ষেত শস্য-শ্যামল হয়ে উঠলো। অথচ অন্য ক্ষেত এক বিন্দুও পানি পেলো না। ফলে সেখানে সব শুকিয়ে গেছে। এর মধ্যে আমার মেহনতের কোন বিশেষ ভূমিকা নেই।”
"হ্যাঁ, ঠিক কথা, তাঁর রহমত ছাড়া এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। কিন্তু তোমার ওপর আল্লাহর এই বিশেষ রহমতের কারণ কি? আমরা সবাই তাঁর এই রহমত থেকে বঞ্চিত কেন?"
সে বলতে শুরু করলোঃ "ঠিক কথা, আল্লাহ যেমন আমার তেমনি তোমাদেরও। কিন্তু আমার ও তোমাদের মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। আমি তাঁর প্রত্যেকটি হুকুম মেনে চলি। প্রতি পদে পদে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করি। আমার কোনো কাজের কারণে আমার আল্লাহ আমার প্রতি বিরূপ হয়ে গেলেন কিনা সব সময় আমার মনে এ ভয় জাগরূক থাকে। যেমন ধরো আমার ক্ষেতে যে ফসল উৎপন্ন হয়, ফসল ওঠার সাথে সাথেই আমি তার তিন ভাগের এক ভাগ আল্লাহর পথে খয়রাত করে দেই। বাকী দু'ভাগের এক ভাগ পুনরায় বীজ হিসেবে ক্ষেতে বপন করি এবং অবশিষ্ট এক ভাগ নিজের গৃহে রাখি। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমি এ ব্যাপারে কখনও কোনো প্রকার লোভ করি না। আল্লাহ যা দেন তাই তাঁর নেয়ামত মনে করে গ্রহণ করি। তাতেই সন্তুষ্ট থাকি। তাঁর ওপর সবর করি এবং আল্লাহর শোকর গুজারী করি--- কিন্তু তোমরা --- তাঁর একটি হুকুমও মেনে চলো না। তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একটুও চেষ্টা করো না। তাঁর পথে এক দানা শস্যও দান করা পছন্দ করো না। তোমরাই বলো, এ অবস্থায় আল্লাহর দৃষ্টিতে আমার ও তোমাদের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য অবশ্যই হওয়া উচিত কিনা? তোমরাই চিন্তা করো, যাদের চোখ আছে আর যাদের চোখ নেই তারা কি সমান হতে পারে? যারা অন্যের দান গ্রহণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আর যারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, তারা কি কখনো সমান হতে পারে? এই পার্থক্যটাকেই আমি আল্লাহর রহমত বলে মনে করি। আমি জানি না তোমরা একে কি মনে করবে?"
একথা বলেই সে চুপ করে গেলো। আল্লাহর অনুগত চাষীর কথায় সবার টনক নড়লো। সবাই এক সাথে বলে উঠলোঃ ঠিক বলেছো ভাই। আমরা তো আসলে আল্লাহর বান্দা, তাঁর দাস। তাঁর মেহেরবানী হয় বলেই আমরা জমিতে ফসল পাই। কাজেই এ ফসলে অন্যদের হক আদায় করতে হবে। আমাদের হতে হবে আল্লাহর অনুগত চাষী।
একটি হাদীসের আলোকে গল্পটি রচিত।
প্রশ্নের জবাব দাও
১. সৎ চাষীর ক্ষেতে বৃষ্টির পানি নেমে এলো কিভাবে?
২. সৎ চাষীর ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় কেন?
৩. যাদের চোখ আছে আর যাদের চোখ নেই তারা কি সমান হতে পারে? এ কথাটি কে বলেছিল এবং কেন বলেছিল?
৪. চাষীর ফসলে আর কাদের হক আছে এবং সে হক কিভাবে আদায় করতে হবে?