📄 হিন্দা বিনতে উতবা রা.
নিশ্চয় মানুষের অন্তরের অবস্থান মহান আল্লাহর কুদরতী হাতের দুই আঙুলের মাঝে। আল্লাহ তাআলা যাকে যখন যেমন চান, তেমন করে থাকেন।
হযরত হিন্দা বিনতে উতবা রা. ইসলামের ইতিহাসের খুবই আকর্ষণীয় এক নারী-চরিত্র। যিনি জীবনের এক পর্বে পিতা ও স্বামীর সাথে সমানে ইসলামদ্রোহিতা চালিয়ে গেছেন। ইসলাম, মুসলমান ও নবী সা.-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘ বিশ বছরেরও অধিক সময় চরম শত্রুতা করে গেছেন। জান-মাল বিলিয়ে দিয়েছিলেন ইসলামবিদ্বেষের তরে। আরেক পর্বে এসে সর্বতোভাবে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন ইসলামের সেবায়। ফতহে মক্কার পর থেকে সম্পূর্ণ পাল্টে যান তিনি। আবির্ভূত হন ইসলামের নিষ্ঠাবতী সেবকরূপে।
কোনো সন্দেহ নেই, হযরত হিন্দা রা. ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বশালিনী ও বুদ্ধিমতী। কথাবার্তায় ছিলেন স্পষ্টভাষী। তার বংশলতিকা হচ্ছে, হিন্দা বিনতে উতবা বিনতে রাবীআ ইবনে আবদু মান্নাফ ইবনে আবদু শামস আল আবশামিয়া আল কারশিয়া। তিনি ইসলামের পূর্বে ও পরে আরবের একজন বিশিষ্ট মহীয়সী নারী হিসেবে পরিচিত এবং উমাইয়া খলীফা হযরত মুআবিয়া ইবনে আবি সুফইয়ান রা.-এর আম্মাজান।
যেমন ছিল শুরুটা
রূপ-সৌন্দর্য, মতামত-সিদ্ধান্ত, বুদ্ধি-বিচক্ষণতা, ভাষার শুদ্ধতা ও অলঙ্কার, সাহিত্য, কবিতা, বীরত্ব-সাহসিকতা ও আত্মসম্মানবোধের অধিকারিণী ছিলেন হিন্দা বিনতে উতবা। ইমাম যাহাবী বলেন, 'হিন্দা ছিলেন কুরাইশ নারীদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়া সুন্দরী ও জ্ঞানী।
কুরাইশ বংশের যুবক আল ফাকিহ ইবনুল মুগীরা আলমাখযুমীর সাথে হিন্দার প্রথম বিয়ে হয়, কিন্তু সে বিয়ে টেকেনি। অতঃপর আবু সুফইয়ান ইবনে হারব রা.-এর সাথে তার বিয়ে হয়। এ ঘরে মুআবিয়া ও উতবা জন্মগ্রহণ করেন।
বিশ্ববাসীকে অন্ধকারের গভীর অমানিশা থেকে আলোর পথে নিয়ে আসতে এক সময় মক্কায় ইসলামের অভ্যুদয় হলো। পরবর্তী বিশ বছর পর্যন্ত হিন্দা ইসলামের আহবানের প্রতি কর্ণপাত করেননি; বরং তার এ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে আল্লাহর রাসূল, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধচরণ ও শত্রুতায়। এ সময় শত্রুতা প্রকাশের কোনো সুযোগই তিনি হাতছাড়া করেননি।
হিজরী দ্বিতীয় সনে সিরিয়া থেকে মক্কা অভিমুখী আবু সুফইয়ানের একটি বাণিজ্য কাফেলা নির্বিঘ্নে পার করা এবং মুসলমানদের চিরতরে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে মক্কার পৌত্তলিকদের বিশাল একটি বাহিনী বের হয়। এই বাহিনীর পুরোভাগে ছিল কুরাইশদের বড় বড় নেতারা। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, বদরে পৌঁছে উট জবাই করে ভুরিভোজ এবং মদ পান করে আনন্দ ফুর্তি করবে। তারপর মুসলমানদের শিকড়সহ উৎখাত করবে। যাতে আরবের আর কেউ কোনো দিন তাদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দুঃসাহস না করে।
মক্কার এই পৌত্তলিক বাহিনীতে ছিল হিন্দার পিতা, ভাই, চাচা ও তার স্বামী। বদর যুদ্ধের সূচনাতেই হিন্দার পিতা, ভাই ও চাচা নিহত হয়। শুধু তাই নয়, মুশরিক বাহিনীর সত্তরজন সাহসী সৈনিকরাও নিহত হয়। তাদের মৃতদেহ বদরে ফেলে রেখে অন্যরা মক্কার পথ ধরে পালিয়ে যায়। এই পলায়নকারীদের পুরোভাগে ছিলেন হিন্দার স্বামী আবু সুফইয়ান। এ বিজয়ে মুসলমানরা যেমন দারুণ উৎফুল্ল হন তেমনই কুরাইশ বাহিনীর খবর মক্কায় পৌঁছলে সেখানের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই হতবাক হয়ে যায়। প্রথমে অনেকে সে খবর বিশ্বাস করতে পারেনি। পরাজিতরা যখন মক্কায় ফিরতে লাগল তখন খবরের যথার্থতা সম্পর্কে আর কোনো সন্দেহ অবশিষ্ট রইল না। ঘটনার ভয়াবহতায় মক্কাবাসীর মথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আবু লাহাব তো শোকে দুঃখে শয্যা নিল এবং সে অবস্থায় সাতদিন পরে জাহান্নামের পথে যাত্রা করে। তার জীবনের অবসান হয়। কুরাইশ নারীরা তাদের নিহতদের স্মরণে এক মাস ব্যাপী শোক পালন করে। বুক চাপড়ে, মাথায় চুল ছিঁড়ে তারা মাতম করতে থাকে। নিহত কোনো সৈনিকের বাহন অথবা ঘোড়ার পাশে সমবেত হয়ে তারা কান্নাকাটি করতে থাকে। একমাত্র হিন্দা ছাড়া এই শোক প্রকাশ ও মাতম করা থেকে মক্কার কোনো নারী বাদ যায়নি। হ্যাঁ, হিন্দা কোনো রকম শোক প্রকাশ করেননি। একদিন কিছু কুরাইশ মহিলা হিন্দার নিকট গিয়ে প্রশ্ন করে, তুমি তোমার পিতা, ভাই, চাচা ও পরিবারের সদস্যদের জন্য একটু কাঁদলে না? বললেন, আমি যদি তাদের জন্য কাঁদি তাহলে সে কথা মুহাম্মাদের নিকট পৌঁছে যাবে।
এতে তারা এবং খাযরাজ গোত্রের নারীরা উৎফুল্ল হবে। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ ও তার সহচরদের নিকট থেকে প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত তেল- সুগন্ধি আমার জন্য হারাম। আমি যদি জানতাম কান্নাকাটি ও মাতম আমার দুঃখ-বেদনা দূর করে দেবে তাহলে আমি কাঁদতাম; কিন্ত আমি জানি আমার প্রিয়জনদের বদলা না নেওয়া পর্যন্ত আমার অন্তরের ব্যথা দূর হবে না। হিন্দা তেল-সুগন্ধির ধারে কাছেও গেলেন না এবং আবু সুফইয়ানের শয্যা থেকেও দূরে থাকলেন। পরবর্তী উহুদ যুদ্ধ পর্যন্ত মক্কাবাসীদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলতে লাগলেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে। আর বদরে নিহতদের স্মরণে রচনা করলেন প্রচুর শোকগাঁথা।
উহুদের প্রতিশোধ
কুরাইশ বাহিনী বদর প্রান্তর থেকে মক্কায় ফেরার পথে এই পরাজয় তাদের জন্য চরম অবমাননাকর হয়ে উঠল। আবু সুফইয়ানের হৃদয় দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল সেদিন—আবু জাহাল, উতবা ইবনে রবীয়া, শাইবা ইবনে রবীয়া, উমাইয়া ইবনে খালফ, উকবা ইবনে আবি মুয়ীত, আসওয়াদ ইবনে আবদিল আসাদ মাখযুমী, ওয়ালীদ ইবনে উতবা, নযর ইবনে হারেস, আস ইবনে সাঈদ ও তাঈমা ইবনে আদীর মতো কুরাইশের দশজন নেতা ও যুবক বীর- বাহাদুরদের যুদ্ধের মাঠে ফেলে চলে যাচ্ছে বিষণ্ণ মনে। ইসলামের হাতে কুরাইশের এমন পরাজয় কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না তারা। তারা পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং নিজেদের বিক্ষিপ্ত শক্তির সমাবেশ ঘটাতে সচেষ্ট হয়। নিজেদের জ্ঞানী মৃত ভাইদের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য শত্রুর বিপক্ষে আরেকবার তুমুল যুদ্ধ করার ইচ্ছায় পাগলপারা হয়ে উঠল।
প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কুরাইশরা যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। উহুদ যুদ্ধের দামামা সন্নিকটে। তারা তাদের সকল সৈন্য-সামন্ত এবং সহযোগী গোত্র- গোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে আবু সুফইয়ানের নেতৃত্বে যুদ্ধের জন্য এগোতে থাকে। কুরাইশ নেতারা তাদের প্রতিশোধের অভীষ্ট লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করে মাত্র দু-জন মানুষকে। তাদের একজন হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আর অপরজন হচ্ছেন হযরত হামযা রা.।
আল্লাহু আকবার! যুদ্ধের জন্য বের হবার আগে যারাই কুরাইশদের সাথে কথাবার্তা ও সলাপরামর্শ শুনত, তারাই জানে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর হযরত হামযা রা.-কে কীভাবে যুদ্ধের টার্গেট বানানো হয়েছে! কুরাইশরা রওনা হওয়ার পূর্বে একজন লোক নিযুক্ত করল, যাকে হযরত হামযা রা.-কে শেষ পরিণতিতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এই লোক ছিল একজন হাবশী। তীরবাজিতে ছিল সে খুব দক্ষ। কুরাইশরা তাকে শুধু এ দায়িত্ব দিয়েছে যে, সে যেন হামযাকে শিকার করে; দূর থেকে তীরবিদ্ধ করে তার জীবনাবসান ঘটায়। কুরাইশরা তাকে এ উদ্দেশ্য ছাড়া আর কোনো দায়-দায়িত্ব অর্পণ করেনি। যুদ্ধ যেদিকেই গড়াক, যে করেই হোক তুমি তাকে তীরবিদ্ধ করে মেরে ফেলতে ভুলবে না!
কুরাইশরা তাকে বড় বড় পুরস্কারের লোভ দেখায়। তাকে মুক্ত করে দেওয়ার আশ্বাস দেয়। এই হাবশী লোকটির নাম 'ওয়াহশী'। সে ছিল যুবাইর ইবনে মুতআমের গোলাম। যুবাইরের চাচা বদর যুদ্ধে মারা গিয়েছিল। যুবাইর ওয়াহশীকে বলেছে,
أُخْرُجُ مَعَ النَّاسِ وَإِنْ أَنْتَ قَتَلْتَ حَمْزَةَ فَأَنْتَ عَتِيقٌ
তুমিও সবার সাথে যুদ্ধে বের হও। যদি তুমি হামযাকে খুন করতে পার, তাহলে তুমি মুক্ত।
এরপর কুরাইশরা ওয়াহশীকে আবু সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবার কাছে সোপর্দ করে দেয়। যাতে সে তাকে তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে মনোবল বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। আসলে হিন্দার পিতা, চাচা, ভাই ও এক ছেলে বদর যুদ্ধে মারা যায়। তাকে বলা হয়, এদের মধ্যে অনেককে হামযা খুন করেছে, আর অনেককে অন্যরা খুন করেছে। এভাবে অধিকাংশ কুরাইশ নারী-পুরুষের কাছে যুদ্ধের ব্যাপারে প্রেরণা দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। লড়াইকালে যে কোনো মূল্যে হামযার মস্তক যেন ছিন্ন করা হয়—এটাই ছিল সবার পণ।
কুরাইশরা লড়াইয়ে বের হওয়ার কয়েক দিন পূর্ব হতে হিন্দা তার পূর্ণ ক্ষোভ, দুঃখ, হিংসা আর প্রতিশোধস্পৃহা ওয়াহশীর মনে গভীরভাবে গেঁথে দেয়। হামযাকে খুন করার বিনিময়ে বিরাট বিরাট লোভনীয় পুরস্কারের অঙ্গীকার করা হয়। তাকে খুব মূল্যবান স্বর্ণ, রূপা ও মুক্তার অলংকার পুরষ্কার দেওয়ার লোভ দেখানো হয়। হিন্দা নিজের গলার হার, হাতের চুড়িসহ সকল অলংকার ওয়াহশীর সামনে বের করে দেয়। বলে, এ সব কিছুই তুমি পাবে; তুমি কেবল এর বিনিময়ে আমাকে হামযার মস্তক উপহার দেবে।
দুনিয়ার সবচেয়ে দামি দামি অলংকারের মোহে পড়ে যায় ওয়াহশী। সে যুদ্ধের প্রহর গুণতে থাকে, আর তীর নিক্ষেপের অনুশীলন করতে থাকে। হামযাকে খুন করার কাজে কৃতকার্য হতে পারলে করে সে আযাদ হতে পারবে। এর বিনিময়ে কুরাইশের এক নেতা, নেতার স্ত্রী ও নেতার কন্যার গলায় পরা দামি অলংকারও তার হাতে আসবে।
এ সকল অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, যুদ্ধে সবার লক্ষ্যস্থল ও অভীষ্ট আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে হযরত হামযা রা.-কে কতল করা।
শেষে একদিন উহুদ যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধেও হযরত হামযা রা.-এর বীরত্ব ছিল কিংবদন্তিতুল্য। প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তিনি সিংহবিক্রমে লড়াই করছিলেন। তিনি দু-হাতে এমনভাবে তরবারি পরিচালনা করছিলেন যে, শত্রুপক্ষের কেউ তার সামনে টিকতে না পেরে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এদিকে মক্কার নেতা যুবাইর ইবনে মুতইমের হাবশী গোলাম ওয়াহশী ইবনে হারব একটি ছোট বর্শা হাতে নিয়ে আড়ালে ওঁৎ পেতে বসেছিল হামযাহ রা.-কে নাগালে পাওয়ার জন্য। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সিবা ইবনে আব্দুল ওযযা হামযার সামনে আসলে তিনি তাকে আঘাত করেন। ফলে তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তিনি সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। এদিকে বর্শা তাক করে বসে থাকা ওয়াহশী সুযোগ মতো হামযার অগোচরে তার দিকে বর্শা ছুড়ে মারে, যা তার নাভীর নীচে ভেদ করে ওপারে চলে যায়। এরপরেও তিনি তার দিকে তেড়ে যেতে লাগলে পড়ে যান এবং কিছুক্ষণ পরেই শাহাদাত বরণ করেন। এ যুদ্ধে শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত হযরত হামযা রা. একাই ৩০ জনের অধিক শত্রুসেনাকে হত্যা করেন।
উহুদের ময়দানে উভয় বাহিনী পরস্পর যখন মুখোমুখি, তখন কুরাইশরা বদর ও সেখানে নিহতদের স্মৃতিচারণ করছে। হিন্দার নেতৃত্বে কুরাইশ নারীরা দফ তবলা বাজিয়ে নিম্নের এ গানটি গাইতে গাইতে তাদের সারিবদ্ধ সৈনিকদের সামনে দিয়ে চক্কর দিতে লাগল,
ويها بني عبد الدار ويها حماة الأدبار ضربا بكل بتار إن تقبلوا نعانق و نفرش النمارق أو تدبر والفارق فراق غير وامق
বনু আব্দুদ্দার, ও পশ্চাতের সন্ত্রাসীরা! বীর দর্পে চালাও শমশীর! যদি সামনে এগিয়ে যাও, জড়িয়ে নেব বুকে। তোমাদের জন্য গালিচা বিছিয়ে দেব। আর যদি পিছু হটো, তবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব। কোনোদিনও আর পাবে না।
অপরদিকে মুসলমানরা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তার সাহায্যকে স্মরণ করছে। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু দক্ষ তীরন্দাযকে পাহাড়ের ওপর একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়োগ করলেন এবং গোটা বাহিনীকে এমনভাবে সাজালেন যে, কেউ ভুল না করলে আল্লাহর ইচ্ছায় বিজয় অবধারিত।
বিশিষ্ট আনসারী সাহাবী হযরত আবু দুজানা রা.ও উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন এবং চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তেও তার সাথে অটল থাকেন। সেদিন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে মৃত্যুর জন্য বাইআত করেছিলেন। আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, যুদ্ধের পূর্বক্ষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি তরবারি হাতে নিয়ে বললেন, এটি কে নেবে? উপস্থিত সকলেই হাত বাড়িয়ে দিলেন। সবাই চুপ; কিন্তু আবু দুজানা বললেন, আমি পারব এর হক আদায় করতে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, আবু দুজানা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, এর হক কী? তিনি জবাব দিলেন, এ নিয়ে কোনো মুসলমানকে হত্যা না করা, এটি নিয়ে কাফেরদের ভয়ে পালিয়ে না যাওয়া।
যুদ্ধের সময় মাথায় একটি লাল ফিতা বাঁধা ছিল তার অভ্যাস। সেটা বাঁধলে বোঝা যেত তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত থেকে তরবারিটি নিয়ে তিনি মাথায় ফিতা বাঁধলেন। তারপর অসীম সাহসকিতার সঙ্গে সৈনিকদের সারিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ পর কবিতার কিছু পংক্তি গুন গুন করে গাইতে গাইতে শত্রু বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। পংক্তি দু-টি হলো,
أنا الذي عاهدني خليلي ونحن بالسفح لدى النخيل أن لا أقوم الدهر في الكيول أضرب بسيف الله والرسول
আমি সেই ব্যক্তি যাকে আমার বন্ধু পাহাড়ের পাদদেশে খেজুর বাগানের সন্নিকটে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন। আমি যেন সৈনিকদের সারির শেষ প্রান্তে অবস্থান না করি। আর তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরবারি দ্বারা শত্রু নিধনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. বলেন, আবু দুজানার আগেই আমি তরবারিটি চেয়েছিলাম; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে না দিয়ে দিলেন তাকে। অথচ আমি হলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু সাফিয়্যা বিনতু আবদুল মুত্তালিবের ছেলে। তাই তরবারিটি তাঁকে দেওয়ার রহস্য জানার জন্য আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদত্ত তরবারি হাতে নিয়ে অগ্রসর হলেন। যে দিকে এগোতে লাগলেন শত্রুদের মাঝে ত্রাস ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এক সময় তিনি পাহাড়ের ঢালে নেমে গেলেন, যেখানে কুরাইশ রমণীরা হিন্দার নেতৃত্বে রণসঙ্গীত গেয়ে তাদের সৈনিকদের উৎসাহিত করছিল। তারা আবু দুজানাকে দেখে ভীত হয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরু করে দিল; কিন্তু কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে এলো না। তবে আবু দুজানা মহিলাদের কোনো ক্ষতি না করেই ফিরে আসেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, হিন্দার মাথার ওপর তরবারি রেখে তিনি আবার তা উঠিয়ে নেন। যুবাইর রা. তাঁর পেছনে ছিলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। তিনি এর কারণ জানতে চাইলেন। আবু দাজানা জবাব দিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরবারি দিয়ে অসহায় কোনো নারীকে হত্যা করতে আমার ইচ্ছা হয়নি।
উহুদের বিপর্যয়ের সময় যে মুষ্টিমেয় সৈনিক রাসূল রা.-কে ঘিরে নিজেরে দেহকে ঢাল বানিয়ে অটল হয়ে দাঁড়ায় তাদের মধ্যে আবু দুজানা অন্যতম। এদিন তিনি নিজের পিঠ পেতে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিঠ রক্ষা করেছিলেন। তাই শত্রুর নিক্ষিপ্ত তীর ও বর্শার আঘাতেই তার পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল।
হামযা রা.-এর দেহ বিকৃতি
যুদ্ধ শুরু হলো। প্রথম দিকে মুশরিক বাহিনীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। মুসলিম বাহিনী বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেল। কুরাইশ বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল। কুরাইশ রমণীরা হেয়, লাঞ্ছিত অবস্থায় যুদ্ধবন্দিনী হতে চলছিল। যুদ্ধের এমন এক পর্যায়ে কিছু মুসলিম সৈনিক শত্রুপক্ষের পরিত্যক্ত জিনিসপত্র সংগ্রহে মনোযোগী হয়ে পড়ল, আর পাহাড়ের ওপর নিয়োগকৃত তীরন্দায বাহিনীর কিছু সদস্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশের কথা ভুলে গিয়ে স্থান ত্যাগ করল। মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের রূপ পাল্টে গেল। পলায়নপর পৌত্তলিক বাহিনী মুসলমানদের এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করল। তারা ফিরে দাঁড়িয়ে পাল্টা আক্রমণ করে বসল। মুসলিম বাহিনী হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। আবার যুদ্ধ শুরু হলো। বহু হতাহতসহ ৭০ জন মুসলিম সৈনিকের শাহাদাত বরণের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটল। ওয়াহশীর হাতে শহীদ হলেন হযরত হামযা রা.।
আসুন! এই খুনের ঘটনা আমরা ওয়াহশীর মুখ থেকেই শুনি, 'আমি ছিলাম যুবাইর ইবনে মুতইমের ক্রীতদাস। তার চাচা তুয়াইমা ইবনে আদী বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। কুরাইশরা উহুদ যুদ্ধে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে যুবাইর ইবনে মুতইম আমাকে বললেন, যদি তুমি মুহাম্মাদের চাচা হামযাকে আমার চাচার হত্যার প্রতিশোধস্বরূপ হত্যা করতে পার, তবে তুমি মুক্তি পাবে।
এই প্রস্তাব পাওয়ার পর কুরাইশদের সাথে উহুদের যুদ্ধের জন্যে আমি রওনা হলাম। আমি ছিলাম আবিসিনিয়ার অধিবাসী। আবিসিনিয়দের মতো আমিও ছিলাম বর্শা নিক্ষেপে সুদক্ষ। আমার নিক্ষিপ্ত বর্শা কমই লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো। ব্যাপকভাবে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর আমি হযরত হামযা রা.-কে খুঁজতে শুরু করলাম। এক সময় তাকে দেখতেও পেলাম। তিনি জেদী উটের মতো সামনের লোকদের ছিন্নভিন্ন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তার সামনে কোনো বাধাই টিকতে পারছিল না। কেউ তার সামনে দাঁড়াতেই পারছিল না।
আল্লাহর শপথ! আমি হযরত হামযা রা.-এর ওপর হামলার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলাম এবং একটি পাথর অথবা বৃক্ষের আড়ালে ছিলাম, এমন সময় সাবা ইবনে আবদুল ওযযা আমাকে ডিঙিয়ে তার কাছে পৌঁছে গেল। হযরত হামযা রা. হুঙ্কার দিয়ে সাবাকে বললেন, ওরে লজ্জাস্থানের চামড়া কর্তনকারীর সন্তান! এই নে।
একথা বলে তিনি সাবার ঘাড়ে এমনভাবে তরবারির আঘাত করলেন এবং তার মাথা এমনভাবে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল যেন তার ঘাড়ে মাথা ছিলই না। আমি তখন বর্শা তুলে হযরত হামযা রা.-এর প্রতি নিক্ষেপ করলাম। বর্শা নাভির নীচে বিদ্ধ হয়ে দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে পেছনে পৌঁছে গেল।
তিনি পড়ে গিয়ে উঠতে চাইলেন কিন্তু সক্ষম হননি। তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত আমি তাকে যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় রেখে দিলাম। এক সময় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। আমি তার কাছে গিয়ে বর্শা বের করে কুরাইশদের মধ্যে গিয়ে বসে রইলাম। হযরত হামযা রা. ছাড়া অন্য কাউকে আঘাত করার ইচ্ছা ও প্রয়োজনই আমার ছিল না। আমি মুক্তি পাওয়ার জন্যেই হযরত হামযা রা.-কে হত্যা করেছি। এরপর মক্কা ফিরে এসেই আমি মুক্তি লাভ করলাম।'
আল্লাহ ও তার রাসূলের সিংহ হযরত হামযা রা. শহীদ হয়ে নিথর দেহে পড়ে রয়েছেন। জীবিত থাকা অবস্থায় তিনি যেমন ছিলেন একজন ভয়ঙ্কর সাহসী, তদ্রুপ মৃত্যুর পরও তাকে ভয়ঙ্কর সাহসী হিসেবে দেখা যায়। তার শত্রুরা কেবল তাকে খুন করেই ক্ষান্ত হয়নি, আর ক্ষান্তই-বা কীভাবে হবে! তিনি তো এমন ব্যক্তি ছিলেন যাঁর বিরুদ্ধে লড়তে শত্রুপক্ষের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা থেকে শুরু করে লড়াকু হিংস্ররা একাট্টা হয়ে উহুদে এসেছিল। দুজন ব্যক্তি ছিলেন তাদের টার্গেটের সর্বোচ্চ প্রান্তসীমায়। একজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, অপরজন তার চাচা হযরত হামযা রা.।
আবু সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা ওয়াহশীকে নির্দেশ দিয়েছিল, যেন হামযার কলিজা তার সামনে পেশ করা হয়। ওয়াহশী এই মর্মন্তুদ কাণ্ডটি ঘটিয়ে ফেলে। হামযার কলিজা নিয়ে সে হিন্দার কাছে এলে, এক হাতে সে কলিজাটি হস্তান্তর করে, আর অন্য হাতে হিন্দা তার দামী গহনা ওয়াহশীর হাতে সোপর্দ করে। এটা যে ওয়াহশীর কীর্তির প্রতিদান ছিল! এরপর আবু সুফইয়ানের স্ত্রী, বদর প্রান্তরে খুন হওয়া উতবার কন্যা হিন্দা হামযার কলিজা চিবুতে আরম্ভ করে। সে এভাবে তার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, ক্রোধ আর হিংসার অনল নেভাতে চেষ্টা করে; কিন্তু কলিজা তার গলায় আটকে যায়। সে কিছুতেই তা গিলতে সক্ষম হয় না। সে তা বাইরে নিক্ষেপ করে বলতে থাকে,
نحن جزيناكم بيوم بدر والحرب بعد الحرب ذات سعر ما كان عن عتبة لي من صبر ولا أخي وعمــه وبـــكـــري شفيت نفسي وقضيت نذري أزاح وحشي غــلــيــل صـدري
আমি তোমার কাছ থেকে বদরে নিহতদের প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছি। লড়াইয়ের পর লড়াই করা তো পাগলামির নামান্তর। আমি আমার পিতা উতবা, চাচা শাইবা এবং ভাই ও ছেলের মৃত্যুতে ধৈর্য সংবরণ করে রাখতে পারিনি। এখন আমার মন শান্ত হয়ে গেছে। আমি আমার প্রতিশ্রুতি পূরণ করে নিয়েছি। ওয়াহশী আমার ভেতরকার ক্ষোভ মিটিয়ে দিয়েছে।
লড়াই শেষ হলে মুশরিকরা উট ও ঘোড়ার ওপর সাওয়ার হয়ে কাফেলাবদ্ধ হয়ে মক্কা অভিমুখে চলে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের শহীদদের দেখে দেখে চিহ্নিত করছেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় অকাতরে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন।
বাইআত গ্রহণ
মক্কা বিজয়ের পর পৃথিবীর বুকে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়। হযরত আবু সুফইয়ান রা. মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিলেন তিনি। হিন্দা ইবনে উতবা রা.-এর নিকটও ইসলামের সত্যতা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তিনি কয়েকজন সত্যান্বেষিণী মহিলার সঙ্গে বোরকা আবৃত হয়ে হাজির হলেন রাসূলের দরবারে। রাসূলুল্লাহ সা.-এর অমায়িক মধুর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে সন্তুষ্টচিত্তে ইসলাম কবুল করেন হিন্দা। সেদিন থেকে হিন্দা হলেন রাযিয়াল্লাহ আনহা।
হিন্দা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাদের কাছ থেকে কী কী অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক কর না।' হিন্দা বললেন, 'এ অঙ্গীকার আপনি পুরুষদের কাছ থেকে তো নেননি। তবুও আমি এটা মেনে নিলাম।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'চুরি করবে না।' হিন্দা বললেন, 'আমি আমার স্বামী আবু সুফিয়ানের সম্পত্তি থেকে কখনো কখনো দু-চার দিরহাম নিয়ে থাকি। জানি না এটাও জায়েজ, না নাজায়েজ।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'নিজের সন্তানদের হত্যা করবে না।' হিন্দা বললেন, 'আমরা তো শৈশবে তাদের লালন পালন করেছি। বড় হলে বদরের ময়দানে আপনারাই তাদের হত্যা করেছেন। এখন তাদের কী হবে, সেটা আপনারাই জানেন।'
তখন তিনি হৃদয়ের আবেগে উদ্বেলিত হয়ে রাসূলুল্লাহ সা.কে সম্বোধন করে বললেন, ইতোপূর্বে কুফুরী অবস্থায় আপনার চেয়ে অধিক ঘৃণিত দুশমন আমার কেউ ছিল না। আর আজ আমার কাছে মনে হচ্ছে আপনার চেয়ে পরম প্রিয় দুনিয়ায় আমার কেউ নেই। তিনি আবেগ আর চেপে রাখতে পারলেন না। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো তার অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। এরচেয়ে মূল্যবান কিছু দরবারে রেসালতে দেওয়ার মতো আপাতত তার কাছে নেই।
এরপর ঘরে গেলেন। ঘরে ঢুকেই মূর্তিগুলো সামনে পড়ল তাঁর। ঈমানী জোশ নাড়া দিল তার পুরো তনুমনে। সঙ্গে সঙ্গে সবগুলো মূর্তি ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়ার পর হযরত হিন্দা বিনতে উতবা রা. নিজের জীবনকে সর্বাত্মকভাবে ইসলামের জন্য ওয়াকফ করে দেন।
এতে কোনো সন্ধেহ নেই, হযরত হিন্দা রা. ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বশালিনী। অভিমানী তো বটেই। সেই সঙ্গে ছিল তার বুদ্ধিমত্তা। নিম্নের হাদীসে আমরা তার প্রমাণ পাই।
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ هِنْدٌ أُمُّ مُعَاوِيَةَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ أَبَا سُفْيَانَ رَجُلٌ شَحِيحٌ فَهَلْ عَلَيَّ جُنَاحٌ أَنْ آخُذَ مِنْ مَالِهِ سِرًّا قَالَ خُذِي أَنْتِ وَبَنُوكِ مَا يَكْفِيكِ بِالْمَعْرُوفِ
হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, মুআবিয়া রা.-এর মা হিন্দা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন, আবু সুফিয়ান রা. একজন কৃপণ ব্যক্তি। এমতাবস্থায় আমি যদি তার মাল হতে গোপনে কিছু গ্রহণ করি, তাতে কি আমার গোনাহ হবে? তিনি বললেন, তুমি তোমার ও সন্তানদের প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায়ভাবে গ্রহণ করতে পার।
হযরত হিন্দা রা. আর কোনোদিন সীরাতুল মুস্তাকীম তথা সরল পথ থেকে সরে যাননি। খলীফা উমর রা.-এর আমলে স্বামীর সঙ্গে তিনিও সিরিয়ায় সংঘটিত যুদ্ধগুলোতে অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে বিখ্যাত ইয়ারমুকের যুদ্ধে সুফিয়ান-দম্পতির একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এ যুদ্ধে রোমক সৈন্যের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লাখ। সেক্ষেত্রে মুসলমানদের সংখ্যা হবে ত্রিশ- চল্লিশ হাজার। মাঝে মাঝে মুসলিম বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিলেন। কিন্তু মহিলারা যুদ্ধ সংগীত গেয়ে তাদের উৎসাহিত করতে থাকেন। এ ব্যাপারে হযরত হিন্দা বিনতে উতবা রা.-এর জুড়ি মেলা ভার। পলায়নপর যুদ্ধবিমুখ সৈন্যরা বস্তুত হিন্দা-বাহিনীর প্রেরণাক্রমেই নব বলে বলীয়ান হয়ে শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এতে যুদ্ধের গতি বদলে যেত। বলাবাহুল্য, ইয়ারমুক যুদ্ধে বিশাল রোমক বাহিনী সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয়।
হযরত হিন্দা বিনতে উতবা রা. হযরত উমর রা.-এর খেলাফতকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকেন। জীবনের এ সময়টা সম্পূর্ণভাবে ইসলামের সেবায় সঁপে দেন। এক সময় মাওলায়ে কারীমের সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৬১৭. তারীখুল ইসলাম, ৩/২৯৮; তারীখে দিমাশক, ৪৩৭; ইসতিআব, ৪/৪০৯।
৬১৮. তারীখুল ইসলাম, ৩/২৯৮।
৬১৯. আর রাহীকুল মাখতুম, ২৭৩-২৭৪।
৬২০. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৬৮-৬৯।
৬২১. সীরাতে ইবনে হিশাম, ৩/৫৮৯।
৬২২. রিজালুন হাওলার রাসূল, ২১৫-২১৬।
৬২৩. সহীহ, মুসলিম, ৭, ১৭১৪।