📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 খানসা রা.

📄 খানসা রা.


একগাছি ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশির বিন্দুতেও সূর্য কিরণ পতিত হয়। ইসলামের আলোও তেমন আল্লাহর প্রিয়ভাজনদের মধ্যে প্রতিবিম্বিত হয়ে ঔজ্জ্বল্য সৃষ্টি করে। এমনই উত্তম দৃষ্টান্ত ছিলেন হযরত খানসা রা.।
মক্কায় যখন নবুওয়াতের সূর্য উদয় হয় এবং তার কিরণে সারা বিশ্ব আলোকিত হয়ে উঠে, তখন খানসা রা.-এর দুই চোখ বিশ্বাসের দীপ্তিতে ঝলমল করে ওঠে। তিনি নিজ গোত্রের কিছু লোকের সাথে মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে ছুটে যান এবং ইসলামের ঘোষণা দেন। এ সাক্ষাতে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীর্ঘক্ষণ ধৈর্যসহকারে তার আবৃত্তি শোনেন এবং তার ভাষার শুদ্ধতা ও শিল্পরূপ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে আরও শোনার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তাঁর আসল নাম হলো, তুমাদির বিনতে আমর ইবনে শারীদ। তিনি ছিলেন কায়স গোত্রের সুলায়ম খান্দানের সন্তান। খানসা রা. কবি ছিলেন। তবে তিনি কাব্যজীবনের প্রথম পর্বে মাঝে মধ্যে দুই-চারটি বয়েত (শ্লোক) রচনা করতেন। আরবের বিখ্যাত আসাদ গোত্রের সাথে তার গোত্রের যে যুদ্ধ হয়, তাতে তার আপন ভাই মুআবিয়া নিহত হন এবং সৎ ভাই সাখর প্রতিপক্ষের আবু সাওর আল আসাদী নামের এক ব্যক্তির নিক্ষিপ্ত নিযায় মারাত্মকভাবে আহত হন। প্রায় এক বছর যাবত সীমাহীন কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করে ভাইকে সুস্থকরে তোলার চেষ্টা করেন; কিন্তু তার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। ক্ষত খুব মারাত্মক ছিল। প্রিয় বোনকে দুখের সাগরে ভাসিয়ে তিনি একদিন ইহলোক ত্যাগ করেন।
খানসা রা. তার পরলোকগত দু-টি ভাইকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। বিশেষত সাখরের জ্ঞান, বুদ্ধি, ধৈর্য, বীরত্ব, দানশীলতা, সুদর্শন চেহেরা ইত্যাদি কারণে তার স্থান ছিল খানসার রা. অন্তরের অতি গভীরে। একারণে তার মৃত্যুতে তিনি সীমাহীন দুঃখ পান। আর সেদিন থেকেই তিনি সাখরের স্মরণে অতুলনীয় সব মরসিয়া (শোকগাঁথা) রচনা করতে থাকেন। সাখরের স্মরণে রচিত মরসিয়ায় হযরত খানসা রা. এমন সব অন্তর গলানো শব্দ নিজের তীব্র ব্যথা-বেদনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন যা শুনে বা পাঠ করে মানুষ অস্থির না হয়ে পারে না। যে কোনো লোকের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
أعيني جودا ولا تجهدا الاتبكيان لصخر الندى ألا تبكيان الجريء الجميل ألا تبكيان الفتى السيدا رفيع العماد طويل النجاد سـاد عـشــيــرتـــه أمــــــردا إذا القوم مدوا بأيديهم إلى المجد مد إلـيـه يـــــدا إذا القوم مدوا بأيديهم إلى المجـد مـن إلـيـه يــــدا يحمله القوم ما عالهم وإن كان أصغر هم مولدا وإن ذكر المجد ألفيته تأزر بالمجد ثم ارتدى
হে মোর চক্ষদ্বয়, বদান্যতা অবলম্বন কর, কার্পণ্য করো না। সাখর এর মতো দানশীলের জন্য তোমাদের কি কান্না আসে না? তোমরা কি রোদন করো না তার জন্য, যে ছিল সাহসী এবং সুন্দর।
যে ছিল যুব নেতা, তোমরা কি তার জন্য কাঁদবে না? যার বংশ মর্যাদা ছিল সুউচ্চ আর সে নিজেও ছিল দীর্ঘকায়। যখন তার দাড়ি-গোফ গজায়নি, তখনই সে গোত্রের নেতা হয়েছিল।
জাতি যখন মর্যাদায় দিকে হাত প্রসারিত করে, তখন সেও হাত বাড়ায়। সে এমন মর্যাদায় পৌঁছে, যা ছিল অন্যদের হাতে অনেক ঊর্ধ্বে। এমন সৌভাগ্য নিয়েই সে তিরোহিত হয়।
তুমি দেখবে, শ্রেষ্ঠত্ব তার ঘরের পথ দেখায়। প্রশংসিত হওয়াতেই সে মনে করত সবচেয়ে বড় মর্যাদা। ইজ্জত-শরাফত আলোচিত হলে তুমি দেখবে যে, ইজ্জতের চাদরে সে আবৃত।
তিনি আরও বলতেন.
يذكرني طلوع الشمس صخرا وأذكره لكل غروب شمس فلولا كثرة الباكين حولي على إخوانهم لقتلت نفسي
প্রতিদিনের সূর্যোদয় আমাকে সাখরের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। আর আমি তাকে স্মরণ করি প্রতিটি সূর্যাস্তের সময়। যদি আমার চারপাশে নিজ নিজ মৃতদের জন্য প্রচুর বিলাপকারী না থাকত, তবে আমি আত্মহত্যা করতাম।
এসব মর্সিয়া বা শোকগাঁথার জন্যই তিনি গোটা আরবে খ্যাত হন। সব রকম কবিতা বিশেষ করে মর্সিয়া বা শোকগাঁথা রচনায় হযরত খানসা ছিলেন অনন্য। উসদুল গাবাহ গ্রন্থের রচয়িতা লেখেন,
اجمع أهل العلم بالشعر إنه لم تكن امرأة قبلها ولا بعدها أشعر منها
সকল কাব্য রসিক এ ব্যাপারে একমত যে, খানসার আগে বা পরে তার চেয়ে বড় মহিলা কবি আর কেউ ছিল না।
আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থে বলা হয়েছে, কবি জারীরকে (উমাইয়া যুগের প্রসিদ্ধ কবি মৃত্যু ১১০ হিজরী) জিজ্ঞেস করা হয়, সবচেয়ে বড় কবি কে? জবাবে বলেন, খানসা না হলে আমি হতাম সবচেয়ে বড় কবি। আরবের একজন বড় কবি বাশার বলেন, নারীদের কবিতা বিশেষভাবে দেখলে তাতে কোনো না কোনো ত্রুটি বা দুর্বলতা অবশ্যই পাওয়া যায়। কেউ জিজ্ঞেস করেন, খানসার কবিতারও কি এ দশা? জবাবে তিনি বলেন, তিনি তো পুরুষদের চেয়েও অগ্রসর। আরবের সকল কবি লায়লা আখিলিয়াকে মহিলা কবিদের শিরোমণি বলে স্বীকার করেন, কিন্তু তারাও খানসাকে ব্যতিক্রম বলে মনে করেন।
জাহেলী যুগের সাধারণ নিয়ম ছিল যে, আরবের লোকেরা নানা স্থানে আসর জমিয়ে বসত। তাদের এসব আসরের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় এবং কাব্যচর্চা। এসব কবিতা প্রতিযোগিতায় নারী-পুরুষ সমভাবে অংশ গ্রহণ করত। এ আসর শুরু হতো রবিউল আউয়াল মাসে। অর্থাৎ, বসন্তকালের শুরুতে। আরবের দূর-দূরান্ত থেকে কাজ-কর্ম ছেড়ে লোকেরা ছুটে আসত এসব আসরে অংশ গ্রহণ করার জন্য। রবিউল আউয়াল এর শুরুতে এই মেলা জমে উঠত প্রথমে দুমাতুল জ্বন্দলে, সেখান থেকে আসত হিজর-এর বাজারে, পরে ওম্মান এবং হাযরা মাওত এ গমন করত। সেখান থেকেই ইয়ামান-এর সানআয়। এসব মেলা কোথাও দশ দিন, কোথাও বিশ দিন স্থায়ী হতো। সারা দেশে মেলা শেষে জিলকদ মাসে সর্বশেষ মেলা বসত ওকায বজারে। পবিত্র হজকে সামনে রেখে মক্কার অদূরে অনুষ্ঠিত এ শেষ মেলায় আরবের সকল সর্দার-গোত্রপতিরা অবশ্যই যোগ দিত। কোনো কারণে কোনো গোত্রপতি যোগ দিতে না পারলে তিনি প্রতিনিধি পাঠাতেন। এই শেষ মেলায় আরবদের সব বিষয় চূড়ান্ত করা হতো। অর্থাৎ, এখানেই বিভিন্ন গোত্রের সরদার নিয়োগ করা হতো, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা হতো, নিজেদের মধ্যকার রক্তপাত এবং যুদ্ধ-বিগ্রহের মীমাংসা হতো। ওকাযের এই মেলায় কুরাইশ বংশের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল সবচেয়ে বেশি। সকল বিষয় নিষ্পত্তি হওয়ার পর প্রত্যেক কবীলার কবিরা নিজ নিজ কবিতা শোনাতেন। এসব কবিতায় থাকত স্ব-স্ব গোত্রের বাহাদুরী, উদারাতা-দানশীলতা, অতিথি পরায়ণতা, পূর্ব পুরুষদের গুরুত্বপূর্ণ কীর্তিগাথা, শিকার এবং রক্তপাতের বর্ণনা। এখানেই কবি এবং বক্তার মর্যাদা নির্ণীত হতো।
মহিলা কবি খানসাও এসব আসর-মেলায় যোগ দিতেন। এসব আসরে পঠিত তার মর্সিয়া কাব্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলে স্বীকৃতি লাভ করত। তিনি উটের পিঠে আরোহণ করে মেলায় উপস্থিত হলে কবিরা এসে তার চারপাশে জড়ো হতো কবিতা শোনার জন্য। এরপর তিনি মর্সিয়া বা শোকগাঁথা শোনাতেন। তার তাঁবুর সামনে একটা পতাকায় লেখা থাকত, العرب أرثى 'আরবের সবচেয়ে বড় শোকগাঁথা রচয়িতা।' এমন গৌরব অন্য কোনো কবির ভাগ্য জুটেনি।
হযরত খানসা রা. জাহিলী জীবন থেকে ইসলামী জীবনে উত্তরণের পর আচার-আচরণ, চিন্তা ও বিশ্বাসে একজন খাঁটি মুসলমানে পরিণত হন। নিরন্তর জিহাদই যে একজন সত্যিকার মুসলমানের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য, কথাটি তিনি অনুধাবনে সক্ষম হন। আর এ জন্য তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি কুরবানী করতে কুণ্ঠিত হননি।
হিজরী ষোলো সনে খলীফা উমর রা.-এর খিলাফতকালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক কাদেসিয়া যুদ্ধ। এ যুদ্ধে বিশাল পারস্য বাহিনী অত্যন্ত সাহস ও দক্ষতার সাথে মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলা করে। উভয়পক্ষের অসংখ্য সৈনিক হতাহত হয়। হযরত খানসা রা. তার চার ছেলেকে সঙ্গে করে এ যুদ্ধে যোগ দেন। চূড়ান্ত যুদ্ধের আগের রাতে তিনি চার ছেলেকে একত্র তাদের সামনে উৎসাহ ও উদ্দীপনামূলক যে ভাষণটি দান করেন ইতিহাসে তা সংরক্ষিত হয়েছে। ভাষণে তিনি বলেন, 'আমার প্রিয় সন্তানরা, তোমরা আনুগত্য সহকারে ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং হিজরত করেছ স্বেচ্ছায়। সেই আল্লাহর নামের কসম, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। নিশ্চয়ই তোমরা একজন পুরুষেরই সন্তান, যেমন তোমরা একজন নারীর সন্তান। আমি তোমাদের পিতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, তোমাদের মাতৃকুলকে লজ্জায় ফেলিনি এবং তোমাদের বংশ ও মান-মর্যাদায় কোনো রকম কলঙ্ক লেপনও করিনি। তোমরা জানো, কাফেরদের বিপক্ষে জিহাদে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য কত বড় সাওয়াব নির্ধারণ করে রেখেছেন। তোমরা এ কথাটি ভালো রকম জেনে নাও যে, ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের চেয়ে পরকালের অনন্ত জীবন উত্তম। মহামহিম আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধারণ করো এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন করো। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সামর্থ হতে পার।
আগামীকাল প্রত্যুষে তোমরা শত্রু নিধনে দূরদর্শিতার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার সাহায্য কামনা করবে।
মায়ের অনুগত ছেলেরা মনোযোগ দিয়ে মায়ের কথা শুনল। রাত কেটে গেল। প্রত্যুষে তারা একসাথে আরবী কবিতার কিছু পংক্তি আওড়াতে আওড়াতে রণক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে গেল। এক পর্যায়ে তারা চূড়ান্ত রকমের বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে সকলে শাহাদাত বরণ করে। শাহাদাতের খবর মা খানসা রা. শোনার পর যে বাক্যটি উচ্চারণ করেন তা একটু দেখার বিষয়। তিনি উচ্চারণ করেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাদেরকে শাহাদাত দান করে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর আমি আমার রবের নিকট আশা করি, তিনি আখিরাতে তার অনন্ত রহমতের ছায়াতলে তাদের সাথে আমাকে একত্র করবেন'।
যে মহিলা জাহিলী যুগে এক সৎ ভাইয়ের মৃত্যুতে সারা জীবন মরসিয়া লিখে ও শোক প্রকাশ করে গোটা আরবে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন, তিনিই এভাবে একসাথে চার ছেলের শাহাদাতের খবর শুনে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর হযরত খানসা রা. মাঝে মধ্যে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে যেতেন। তিনি তৎকালীন আরবের প্রথা অনুযায়ী শোকের প্রতীক হিসেবে মাথায় একটি কালো কাপড় বেঁধে রাখতেন। একবার হযরত আয়েশা রা. তাকে বললেন, এভাবে শোকের প্রতীক ধারণ করা ইসলামে নিষেধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পরে আমিও এ ধরনের কোনো শোকের প্রতীক ধারণ করিনি। খানসা রা. বললেন, নিষেধ, একথা আমার জানা ছিল না। তবে আমার এ প্রতীক ধারণ করার একটা বিশেষ কারণ আছে। আয়েশা রা. কারণটি জানতে চাইলেন।
খানসা রা. বললেন, আমার পিতা যার সাথে আমার বিয়ে দিয়েছিলেন, সে ছিল তার গোত্রের এক নেতা। তবে ভীষণ উড়নচণ্ডি মানুষ ছিল। তার ও আমার সকল অর্থ-সম্পদ জুয়া খেলে উড়িয়ে দেয়। আমরা যখন একেবারে সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়লাম, তখন আমার ভাই সাখর তার সব অর্থ-সম্পদ সমান ভাগ করে ভালো ভাগটি আমাকে দেয়। আমার স্বামী কিছুদিনের মধ্যে তাও উড়িয়ে ফেলে। সাখর আমার দুরবস্থা দেখে দুঃখ প্রকাশ করে এবং আবার তার সকল সম্পদ সমান দুইভাগ করে ভালো ভাগটি আমাকে বেছে নিতে বলে। তার স্ত্রী তখন বলে ওঠে, 'এর আগে একবার খানসাকে তোমার সম্পদের অর্ধেক দিয়েছ, তাও ভালো ভাগটি, এখনো আবার ভালো ভাগটি বেছে নিতে বলছ। তা এভাবে আর কতকাল চলবে? তার স্বামীর অবস্থা তো সেই পূর্বের মতোই আছে। সে জুয়া খেলেই সব শেষ করে ফেলবে।' সাখর তখন স্ত্রীকে একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনাল:
وَالله لا أمنحها شرارها وهي حصان قد كفتني عارها ولو هلكت مزقت خمارها واتخذت من شعر صدارها
আল্লাহর কসম, আমি তাকে আমার সম্পদের নিকৃষ্ট অংশ দেব না। সে একজন সতী-সাধ্বী নারী, আমার জন্য হেয় ও লাঞ্ছনা যথেষ্ট। আমি মারা গেলে সে তার ওড়না আমার শোকে ফেঁড়ে ফেলবে এবং কেশ দিয়ে শোকের প্রতীক ফিতা বানিয়ে নিবে।
কাদেসিয়া যুদ্ধের প্রায় সাত বৎসর পর ২৪ হিজরীতে হযরত খানসা ইন্তেকাল করেন। বর্ণনামতে, মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের শাসনকালে কোনো বিজন প্রান্তরে তিনি ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৫৯৮. উসুদুল গাবাহ, ৫/৪৪১; আল ইসাবাহ, ৪/৫৫০।
৫৯৯. আল ইসাবাহ, ৮/১১২।
৬০০. সূরা আল-ইমরান, ৩:২০০।
৬০১. আল ইসাবাহ, ৪/২৮৮।
৬০২. আল ইসতিআব, ৪/২৯৬; আল ইসাবাহ, ৪/২৮৮।
৬০৩. উসুদুল গাবাহ, ৫/৪৪২; জামহারাতুল খুতাবিল আরাব, ১/২৩১।
৬০৪. আল ইসাবাহ, ৮/১১২।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 উম্মে মা‘বাদ আল খাযাইয়া রা.

📄 উম্মে মা‘বাদ আল খাযাইয়া রা.


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের মদীনায় হিজরতের অনুমতি দিলেন। তারা দ্রুত মদীনায় হিজরত করতে লাগলেন। ইতোপূর্বে আমরা জেনেছি, আবু সালামার পথ ধরে লোকেরা একের পর এক মদীনায় হিজরত করতে লাগল। এক পর্যায়ে মক্কাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর রা. এবং আলী রা. ব্যাতীত অন্য কোনো মুসলিম অবশিষ্ট রইল না। আবু বকর রা. ও আলী রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশেই মক্কায় রয়ে গিয়েছিলেন। আরও কিছু মুসলিম যাদের কুরাইশরা বন্দী করে রেখেছিল, তারা বাধ্য হয়েই মক্কায় অবস্থান করছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের জন্য প্রস্তুত হয়ে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় ছিলেন। আবু বকর রা.-ও প্রস্তুত ছিলেন।
মুশরিকরা যখন দেখল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথীগণ বের হয়ে যাচ্ছেন এবং সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদ নিয়ে মদীনায় পাড়ি জমাচ্ছেন তখন তারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে নিল, মুসলিমগণ অচিরেই মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবেন। তারা জানত যে, মদীনা সুরক্ষিত একটি দেশ এবং তার অধিবাসীরা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। অচিরেই মদীনায় মুসলিমগণ শক্তিশালী হয়ে যাবে। তাই তারা আশঙ্কা করল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও মদীনায় চলে যাবেন। সুতরাং বিষয়টি তাদের কাছে খুব বড় হয়ে দেখা দিল। তারা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দারুন নাদওয়ায় একত্র হলো। তাদের বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ লোকদের কেউ অনুপস্থিত রইল না। তাদের বন্ধু ও মুরব্বী ইবলীসও একজন নাজদী শাইখের বেশ ধরে এবং শরীরে লম্বা চাদর জড়িয়ে বৈঠকে যথাসময়ে উপস্থিত হলো। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে পরামর্শ শুরু করল। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মত প্রকাশ করতে লাগল; কিন্তু ইবলীস কোনো রায়কেই পছন্দ করছিল না। পরিশেষে আবু জাহেল বলল, আমি মনে করি, প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী যুবককে আমরা বেছে নেব। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে ধারালো তলোয়ার থাকবে। তারা সকলে মিলে এক সাথে এক আঘাতেই মুহাম্মাদকে হত্যা করে ফেলবে। এতে সকল গোত্রের মধ্যে তার রক্ত ভাগ হয়ে যাবে। তারপর আবদে মানাফ গোত্রের (মুহাম্মাদের গোত্রের) লোকেরা এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তাদের পক্ষে সকল গোত্রের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করা ও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। আর দিয়্যত দেওয়ার প্রয়োজন হলে আমরা সকলে মিলেই তা পরিশোধ করে দিব।
এই প্রস্তাব শুনে শয়তান বলল, আল্লাহর শপথ! এটিই হচ্ছে সঠিক প্রস্তাব। সুতরাং তারা সকলে এই প্রস্তাবের উপরেই একমত হয়ে মজলিস ত্যাগ করল। ও দিকে জিবরাঈল ফেরেশতা আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে ওহীর মাধ্যমে এই ষড়যন্ত্রের কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিলেন এবং সেই রাত্রে তাকে নিজ বিছানায় শয়ন করতে নিষেধ করলেন। পরের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় চেহারা মুবারক আবৃত করে দিবসের মধ্যভাগে আবু বকরের বাড়িতে উপস্থিত হলেন। অথচ তিনি এ রকম সময়ে ইতোপূর্বে কখনোই আবু বকরের বাড়িতে আসতেন না। তিনি সেখানে গিয়ে বললেন, তোমার কাছে যারা আছে তাদের সকলকে বের করে দাও। আবু বকর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এরা তো আপনারই পরিবার। তিনি তখন বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন। আবু বকর তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমিও আপনার সাথে যেতে চাই। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাই হবে। আবু বকর বললেন, আমার মা-বাপ আপনার জন্য কুরবান হোক! এই দু-টি বাহনের যে কোনো একটি আপনি গ্রহণ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- হ্যাঁ, তবে মূল্য পরিশোধ করেই তা গ্রহণ করব। আলী রা.কে সেই রাত্রে তার বিছানায় ঘুমাতে বললেন।
ওদিকে সন্ধ্যা নেমে আসতেই কুরাইশদের নির্বাচিত যুবকেরা একত্র হলো। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরের দরজায় পাহারা দিতে লাগল এবং তিনি কখন ঘরে প্রবেশ করে নিদ্রা যাবেন সেই সময়ের অপেক্ষা করতে লাগল। তারা পরস্পর পরামর্শ করতে লাগল যে, কোন বদনসীব যুবক সর্বাগ্রে আক্রমণ করার ঘৃণিত কাজটি সম্পন্ন করবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে এক মুষ্ঠি মাটি হাতে নিয়ে কাফেরদের মাথায় নিক্ষেপ করতে লাগলেন। তারা তাকে দেখতেই পায়নি। তিনি মাটি নিক্ষেপ করছিলেন আর কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করছিলেন,
وَجَعَلْنَا مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ سَدًّا وَ مِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَأَغْشَيْتُهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ
এবং আমি তাদের সামনে ও পিছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি, অতঃপর তাদেরকে আবৃত করে দিয়েছি, ফলে তারা দেখে না।
তিনি আবু বকরের বাড়ির দিকে গেলেন। তারা উভয়েই রাতের অন্ধকারে বের হয়ে পড়লেন। তারা উভয়ে বের হয়ে যাওয়ার পর এক লোক এসে দেখল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরের দরজায় লোকেরা অপেক্ষা করছে। সে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কীসের অপেক্ষা করছ? তারা বলল, আমরা মুহাম্মাদের অপেক্ষা করছি। সে বলল, তোমরা ব্যর্থ হয়েছ ও তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হওয়ার নয়। আল্লাহর শপথ! সে তোমাদের পাশ দিয়েই বের হয়ে গেছে। সে তোমাদের মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে চলে গেছে। তারা দাঁড়িয়ে নিজেদের মাথা হতে মাটি ঝেড়ে ফেলতে লাগল। সকাল হলে আলী রা. ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন। তারা তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।
অতঃপর তিনি এবং আবু বকর রা. গারে সাওরের কাছে গিয়ে তাতে প্রবেশ করলেন। প্রবেশ করার পর গুহার মুখে মাকড়সা জাল বুনে ফেলল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রা. মদীনার রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পূর্ব হতেই আব্দুল্লা ইবনে উরাইকীত লাইসীকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিযুক্ত করে রেখেছিলেন। সে মদীনার রাস্তা সম্পর্কে খুব পারদর্শী ছিল এবং সে তার গোত্রের ধর্মের ওপরই ছিল। সে ছিল একজন বিশ্বস্ত লোক। তাই তার কাছে তাদের বাহন দুটি সোপর্দ করলেন এবং তিন দিন পর গারে সাওরের নিকট আসতে বললেন।
ওইদিকে কুরাইশরা তাদের সন্ধানে কোনো প্রকার অলসতা করল না। 'কাফা' তথা পদচিহ্ন দেখে যারা পথচারীর পরিচয় ও গতিপথ জানতে পারে তারা এমন লোককে সাথে নিয়েও অনুসন্ধান চালাল। অনুসন্ধান করতে করতে তারা একদম গুহার দরজায় এসে দাঁড়াল।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, আবু বকর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, তাদের কেউ যদি তার দৃষ্টি একটু নীচু করে তাহলেই আমাদের দেখে ফেলবে। এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে আবু বকর, চুপ থাক। সেই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? যাদের তৃতীয়জন হচ্ছেন আল্লাহ। তুমি চিন্তা করো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। আবু বকর এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মাথার ওপরে কাফেরদের কথা শুনছিলেন; কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অন্ধ করে দিলেন। আমের বিন ফুহায়রা আবু বকরের ছাগল চরাত। আবু বকর ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে মক্কায় যা বলা হতো সে তা শ্রবণ করত এবং গুহায় এসে তাদের কাছে সেই খবর পৌঁছে দিত। কিন্তু শেষ রাতে সে মক্কায় গিয়ে মক্কাবাসীদের সাথেই রাত্রি যাপন করত এবং সকালে তাদের সাথেই ঘর থেকে বের হতো।
তারা গুহায় তিন দিন অবস্থান করলেন। কুরাইশদের অনুসন্ধানের আগুন যখন নিভে গেল তখন আব্দুল্লাহ্ ইবনে উরাইকীত বাহন দু-টি নিয়ে গুহার নিকট এসে উপস্থিত হলো। তারা মদীনার পথে যাত্রা শুরু করলেন। আমের ইবনে ফুহায়রা আবু বকরের পিছনে আরোহণ করলেন। পথপ্রদর্শক ছিল তাদের সামনে। আল্লাহর চোখ তাদেরকে পাহারা দিচ্ছিল, তার সাহায্য তাদের সঙ্গী ছিল এবং আল্লাহর রহমত ও দয়ার ছায়ায় নবীর কাফেলা মদীনার পথে অগ্রসর হতে লাগল।
মক্কার মুশরিকরা যখন নিরাশ হলো তখন তারা আবু বকর ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গ্রেপ্তারের বিনিময়ে বিরাট পুরস্কারের ঘোষণা দিল। লোকেরা পুরস্কারের আশায় তাদের অনুসন্ধানে কঠোর পরিশ্রম করল; কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছাই বিজয়ী হবে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাফেলা যখন কুদাইদের ওপর দিয়ে বনী মুদলাজ গোত্রের বস্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন বস্তির একজন লোক তাদেরকে দেখে ফেলে। সে সকলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আমি এই মাত্র সাগরের তীর বেয়ে একটি কাফেলাকে অতিক্রম করতে দেখেছি। আমার মনে হয় মুহাম্মাদ এবং তার সাথীরা এই কাফেলায় রয়েছে। কথাটি শুনেই সুরাকা বিন মালেক বুঝে ফেলল এবং নিজেই সেই পুরস্কারটি অর্জন করতে চাইল। অতীতে এ রকম অনেক পুরস্কারই সে পেয়েছে। সে অন্যদের থেকে বিষয়টি গোপন রাখার মানসে বলতে লাগল, তোমার এই কথা বাদ দাও তো, তারা হচ্ছে অমুক এবং অমুক। তারা তাদের প্রয়োজনে বের হয়েছে। এই বলে সে সামান্য সময় অবস্থান করল। অতঃপর সে তার তাঁবুতে প্রবেশ করে খাদেমকে বলল, তাঁবুর পিছন দিয়ে ঘোড়াটি নিয়ে বের হও। টিলার পিছনে একটু পরেই আমি তোমার সাথে মিলিত হবো। অতঃপর সে বর্শা হাতে নিয়ে বর্শার উপরের অংশ মাটির সাথে লাগিয়ে তা দিয়ে দাগ টানতে টানতে অগ্রসর হতে লাগল। ঘোড়ার নিকট পৌঁছে তাতে লাফ দিয়ে আরোহণ করল এবং দ্রুত গতিতে চলতে লাগল। দ্রুত গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে সে একদম তাদের কাছে চলে গেল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুরআন তিলাওয়াত শুনতে পেল। তিনি ডানে বামে তাকাচ্ছিলেন না। আর আবু বকর রা. খুব বেশি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। আবু বকর তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই তো সুরাকা আমাদের কাছে এসে গেছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। তার ঘোড়ার সামনে পা দু-টি মাটিতে দেবে গেল। সুরাকা বলল, আমি অবশ্যই জানি, তোমাদের বদ দুআর কারণেই এমনটি হয়েছে। আল্লাহর নিকট আমার জন্য দুআ কর। আমি অঙ্গীকার করছি যে, যারা তোমাদের সন্ধানে বের হয়েছে আমি তাদেরকে ফিরিয়ে দেব।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করলেন। ঘোড়ার পা উঠে গেল। এবার সুরাকা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একটি পত্র লিখে দেওয়ার আবেদন করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশে আবু বকর রা. এক খণ্ড চামড়ার ওপর (নিরাপত্তা প্রদান সম্পর্কে) কিছু লিখে দিলেন। পত্রটি মক্কা বিজয়ের দিন পর্যন্ত তার সাথেই ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন সুরাকা পত্রটি নিয়ে আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করলেন এবং বললেন, আজ ওয়াদা-অঙ্গীকার পূর্ণ করার দিন, আজ উত্তম আচরণের দিন। সুরাকা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকরের জন্য পাথেয় এবং বাহন পেশ করলে তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তারা বললেন, আমাদের তালাশে যারা বের হয়েছে তুমি শুধু তাদেরকে দূরে রাখ এবং তাদের কাছে আমাদের খবর গোপন রাখ। সে বলল, অবশ্যই তা করব। সে ফেরত গিয়ে দেখল অনেকেই তাদের সন্ধান করছে। সুরাকা তাদেরকে বলতে লাগল, আমি তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট খবর নিয়ে এসেছি। তারা এই দিকে নয়। সুরাকা দিনের প্রথমভাগে রাসূলের শত্রু ছিল। আর দিবসের শেষভাগে তার বন্ধু এবং রক্ষকে পরিণত হলো।
তারা চলতে লাগলেন। চলার পথে উম্মে মা'বাদের তাঁবুর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। উম্মে মা'বাদ ছিলেন একজন সদাচরণকারী মহিলা— তিনিই আমাদের আজকের আলোচিত অতিথি।
তাঁবুর পাশ দিয়ে অতিক্রমকারী লোকদের তিনি পানাহার করাতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রা. তার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে খাবার কিছু আছে কি? সে বলল, আল্লাহর শপথ! আমার কাছে খাবার কিছু থাকলে আমি আপনাদের মেহমানদারী করতে মোটেই কার্পণ্য করতাম না।
সেটি ছিল অভাবের বছর। খাদ্যাভাবে উম্মে মা'বাদের বকরীগুলো শুকিয়ে গিয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁবুর এক পার্শ্বে একটি বকরী দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, 'ওহে উম্মে মা'বাদ! এই বকরীটি এখানে কেন?' উম্মে মা'বাদ বলল, 'দুর্বলতার কারণে এটি অন্যান্য বকরীর সাথে চলতে পারে না। তাই এটি পেছনে রয়ে গেছে।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'বকরীটি কি দুধ দেয়?' উম্মে মা'বাদ বলল, 'এটি দুর্বলতার কারণে চলতেই পারছে না। দুধ আসবে কোত্থেকে?' তিনি বললেন, 'তুমি কি আমাকে এটি দোহন করার অনুমতি দিবে?' সে বলল, 'আমার মা-বাপ আপনার জন্য কুরবান হোক! আপনি যদি তাতে কোনো দুধ দেখেন তাহলে দোহন করতে পারেন!' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বকরীর স্তনে হাত রাখলেন, বিসমিল্লাহ পাঠ করলেন এবং বরকতের দুআ করলেন। দুধে বকরীর স্তন ভর্তি হয়ে গেল। তিনি পাত্র আনতে বললেন। পাত্র আনা হলে তাতে দুধ দোহন করলেন। পাত্র ভর্তি হয়ে দুধের ফেনা ওপরে উঠতে লাগল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করলেন এবং তার সঙ্গীগণও পান করলেন। তিনি পুনরায় পান করলেন। দ্বিতীয়বারও তিনি পাত্র ভর্তি করে দুধ দোহন করে উম্মে মা'বাদের তাঁবু ত্যাগ করলেন।
কিছুক্ষণ পর উম্মে মা'বাদের স্বামী আবু মা'বাদ বকরীগুলো চালিয়ে নিয়ে ফেরত এলো। তাঁবুতে দুধ দেখে আবু মা'বাদ আশ্চার্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি দুধ কোথায় পেলে? বকরীগুলো খাদ্যাভাবে শুকিয়ে রয়েছে। বাড়িতে কোনো দুধের ছাগলও নেই। সে বলল, 'আল্লাহর শপথ! আমাদের কাছ দিয়ে একজন বরকতময় লোক অতিক্রম করেছেন। তার অবস্থা ছিল এরকম এরকম...।' আবু মা'বাদ বলল, 'আল্লাহর শপথ! আমার ধারণা এই লোকটিকেকেই কুরাইশরা খুঁজছে। হে উম্মে মা'বাদ আমার কাছে তার গুণাগুণ বর্ণনা করো।' উম্মে মাবাদ আবু মাবাদের কাছে অত্যন্ত চমৎকার ও সুন্দরভাবে এবং হৃদয়গ্রাহী করে রাসূলের গুণাগুণ ও পরিচয় তুলে ধরলেন।
উম্মে মা'বাদ মহানবীর কাফেলার আগমন, শীর্ণকায় ছাগী থেকে দুধ দোহনসহ সব ঘটনা খুলে বললেন। কাফেলার লোকদেরও বর্ণনা দিলেন উম্মে মা'বাদ। বেদুঈন জীবনের মুক্ত মন নিয়ে সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে মহানবীর যে বর্ণনা উম্মে মা'বাদ দিয়েছিলেন তা হলো, 'তাঁর উজ্জ্বল বদনকান্তি, প্রফুল্ল মুখশ্রী, অতি ভদ্র ও নম্র ব্যবহার। তার উদরে স্ফীতি নেই, মস্তকে খালিত্য নেই। সুন্দর, সুদর্শন। সুবিস্তৃত কৃষ্ণবর্ণ নয়নযুগল, কেশ দীর্ঘ ঘনসন্নিবেশিত। তার স্বর গম্ভীর। গ্রিবা উচ্চ। নয়নযুগলে যেন প্রকৃতি নিজেই কাজল দিয়ে রেখেছে। চোখের পুতুলি দু-টি সদা উজ্জ্বল, ঢল ঢল। ভ্রুযুগল নাতিসূক্ষ্ম, পরস্পর সংযোজিত। স্বতঃকুঞ্চিত ঘন কেশদাম। মৌনাবলম্বন করলে তার চেহারা থেকে গুরুগম্ভীরভাবের অভিব্যক্তি হতে থাকে। আবার কথা বললে মনপ্রাণ মোহিত হয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে তার সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর, কাছে এলে আরও বেশি সুন্দর। ভাষা অতি মিষ্ট ও প্রাঞ্জল, তাতে ত্রুটি নেই, বাহুল্য নেই, বাক্যগুলো যেন মুক্তার হার। তার দেহ এত খর্ব নয় যা দর্শনে ক্ষুদ্রত্বের ভাব মনে আসে বা এমন দীর্ঘ নয় যা দেখতে বিরক্তি বোধ করে, তিনি নাতিদীর্ঘ নাতিখর্ব। পুষ্টি ও পুলকে সে দেহ যেন কুসুমিত নববিটপীর সদ্য পল্লবিত নবিন প্রশাখা। সে মুখশ্রী বড় সুন্দর, বড় সুদর্শন ও সুমহান। তার সঙ্গীরা সর্বদাই তাকে বেষ্টন করে থাকে। তারা তার কথা আগ্রহ সহকারে শ্রবণ করে এবং তার আদেশ উৎফুল্লচিত্তে পালন করে।'
স্ত্রীর মুখে এই বর্ণনা শুনে আবু মা'বাদ উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন, 'আল্লাহর শপথ, ইনি নিশ্চয়ই কুরাইশদের সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে আমরা সত্য-মিথ্যা অনেক কিছু শ্রবণ করেছি। হায় আমার ভাগ্য! আমি অনুপস্থিত ছিলাম! উপস্থিত থাকলে আমি তার আশ্রয় নিতাম। আমি বলছি, সুযোগ পেলে এখনো তা করব।'
ওইদিকে মক্কায় উঁচু কণ্ঠে একটি কবিতা আবৃত্তির আওয়ায শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু কে তা আবৃত্তি করছে, তাকে দেখা যাচ্ছিল না, যার প্রথম লাইন হচ্ছে,
جزى الله رب العرش خير جزائه رفيقين حلا خيمتي أم معبد
আরশের প্রভু আল্লাহ তাআলা ওই দুইজন বন্ধুকে সর্বোত্তম বিনিময় দান করুন, যারা উভয়েই উম্মে মাবাদের তাঁবুতে অবতরণ করেছেন।
আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, আমরা জানতাম না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো দিকে গিয়েছেন; কিন্তু মক্কার নীচু ভূমিতে একটি জিন এসে কবিতার এই লাইনগুলো আবৃত্তি করতে লাগল। লোকেরা সেই আওয়ায শুনে পিছে পিছে চলা শুরু করল। তবে তারা সেই জিনকে দেখতে পাচ্ছিল না। পরিশেষে জিন মক্কার উঁচু ভূমি দিয়ে বের হয়ে গেল। আসমা বলেন, এই কবিতা শুনে আমরা বুঝতে পারলাম যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার দিকে চলে গেছেন।
হযরত উম্মে মা'বাদ এর বাড়ি থেকে বেরিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথীদেরকে নিয়ে সোজা চলতে লাগলেন মদীনার দিকে। এখন তার মনে কেবল মদীনা, শুধুই মদীনা। এদিকে মদীনার লোকেরাও তাঁরই জন্য অধীর অপেক্ষা করছেন।
পরবর্তী সময়ে উম্মে মা'বাদ রা. রাসূলের সান্নিধ্যে থেকে দ্বীন ও দ্বীনের দাওয়াতের দীক্ষা নেন এবং আজীবন ইবাদত-বন্দেগীতে কাটান। যখন তিনি শুনতেন মুসলমানরা বিজয় লাভ করেছে, তখন অত্যন্ত খুশি হতেন। পক্ষান্তরে মুসলমানদের যে কোনো দুঃখ-দুর্দশায় দগ্ধ হতো তার অন্তর। এরই ধারাবাহিকতায় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালে বুকটা শোকে চৌচির হয়ে যায় তাঁর। ভীষণ ভেঙে পড়েন তিনি। দীর্ঘ হায়াত প্রাপ্ত হয়ে এক সময় তিনিও ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৬০৫. সূরা ইয়াসীন, ৩৬:৯।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা রা.

📄 উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা রা.


অন্ধকারে আলোর মুকুল হয়ে ফুটেছিল একটি ফুল। তার নাম উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা রা.। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন শত্রু পরিবেশে থেকেই। হযরত উম্মে কুলসুম রা.-এর পিতা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কী জীবনের একজন চরম শত্রু। মক্কায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও দুর্বল মুসলমানদের ওপর বাড়াবাড়ি রকমের নির্যাতনের জন্য ইতিহাসে সে খ্যাত হয়ে আছে। বদরযুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয় এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়। উম্মে কুলসুম রা. তখন মক্কায়। পাষণ্ড পিতার হত্যার খবর শোনার পর তার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানিও পড়েনি বলে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন।
এমন ঘরেই জন্ম হয়েছিল হযরত উম্মে কুলসুমের। তিনি মক্কায় অল্প বয়সে পিতৃগৃহে থাকা অবস্থায় ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন এবং সেখানেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পূর্বে তার নিকট বাইআত করেন। আল্লাহ ও রাসূলকে তিনি ভালোবাসতেন পিতা-মাতা ও অন্যান্য সকল মানুষের চেয়ে বেশি। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে ইরশাদ করেন,
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَ عَشِيْرَتُكُمْ وَ أَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفُسِقِينَ
বলো, তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তার রাসূল ও তার পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তার নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।

কেমন ছিল তার পিতা?
وَ يَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يُلَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا يُوَيْلَتُى لَيْتَنِي لَمْ اتَّخِذُ فُلَانًا خَلِيلًا لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَنُ لِلْإِنْسَانِ خَذُولًا
আর সেদিন যালিম নিজের হাত দুটো কামড়ে বলবে, হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোনো পথ অবলম্বন করতাম! হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! অবশ্যই সে তো আমাকে উপদেশবাণী থেকে বিভ্রান্ত করেছিল, আমার কাছে তা আসার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য চরম প্রতারক।
উকবা ইবনে আবি মুয়িত ছিল মক্কার মুশরিকদের অন্যতম সর্দার। সে কোনো সফর থেকে ফিরে এলে শহরের গণ্যমান্য লোকদের দাওয়াত করত।
একবার নিয়ম অনুযায়ী সে শহরের গণ্যমান্য লোকদের দাওয়াত করল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও দাওয়াত করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াত গ্রহণ করলেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে খাবার উপস্থিত করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার খাদ্য গ্রহণ করতে পারি না যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সাক্ষ্য না দাও যে, আল্লাহ এক, তার কোনো অংশিদার নেই এবং আমি তার রাসূল।
উকবা দেখল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি না খায় তাহলে তার সম্মান নষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য সে কালিমা উচ্চারণ করল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শর্ত অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করলেন।
উবাই ইবনে খালফ ছিল উকবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে যখন উকবার ইসলাম গ্রহণের কথা জানতে পারল তখন খুবই রাগান্বিত হলো। উকবা ওযর পেশ করল যে, কুরাইশ বংশের সম্মানিত অতিথি আমার গৃহে আগমন করেছিলেন। তিনি খাদ্য গ্রহণ না করে ফিরে যাওয়াটা আমার জন্য অপমান। তাই আমি এই কালিমা উচ্চারণ করেছি। উবাই বলল, আমি এ ওযর কবুল করব না যে পর্যন্ত তুমি মুহাম্মাদের মুখে থুথু নিক্ষেপ না করবে। হতভাগা তার বন্ধুর কথায় এই ধৃষ্টতা প্রদর্শনে সম্মত হলো। এ ব্যাপারে উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই দুজনের অবস্থা হাশরের দিন একই অবস্থা হবে তখন উকবা বলবে, 'হায়! আমি যদি উবাই এর বন্ধু না হতাম, মুহাম্মাদের কথা মানতাম তাহলে আমার এ অবস্থা হতো না।'
নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর শুরুর দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কাবাসীর কাছে সত্য ও হকের দাওয়াত তুলে ধরতেন তখন কুরাইশ লোকেরা শক্তভাবে এসবের প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এসব গালিগালাজ এবং বিরোধিতার পরও কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে তার দাওয়াত চালিয়ে যেতেন। বয়স কম হওয়ায় হযরত ফাতিমা রা. তার বাবার সাথে বের হতেন। এমনই একদিন মক্কার কাফের উকবা ইবনে আবি মুয়িত (আল্লাহ তাকে চির অপমানিত করুন) বাচ্চা প্রসবের সময় উটনীর পেট থেকে যেসব নাড়িভূড়ি বের হয়ে আসে, সেসব রক্তাক্ত দুর্গন্ধযুক্ত নাড়িভুড়ি নিয়ে বের হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কাবাচত্বরে গিয়ে সিজদায় অবনত হলেন, তখন সে এগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিঠের ওপর নিক্ষেপ করল। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষটির সাথে এমন বেআদবি দেখেও মক্কার কাফের কুরাইশ নেতারা হাসি-ঠাট্টায় একে অপরের ওপর গড়িয়ে পড়ছিল। স্বল্পবয়সী নবীকন্যা ফাতিমা রা. তার বাবা রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীরের ওপর থেকে এসব আবর্জনা সরাচ্ছিলেন এবং ময়লাগুলো ধুয়ে দিলেন। তারপর মক্কার ওইসব সর্দারদের সামনে গিয়ে তাদেরকে ইচ্ছেমতো বকাঝকা করে আসলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এমন দুর্ব্যবহারে খুব কষ্ট পেলেন। তিনি তার দু হাত তুলে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, শায়বা ইবনে রবিয়ার বিচারের দায়িত্ব আপনার, আবু জাহেলের বিচারের দায়িত্ব আপনার, উকবা বিন আবু মুয়িতের বিচারের দায়িত্ব আপনার, হে আল্লাহ, উমাইয়া বিন খালফের বিচারের দায়িত্বও আপনার।'
যখন তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে এমন বদদোয়া শুনতে পেল, ভয়ে চুপ হয়ে গেল। পরবর্তী সময়ে বদর ময়দানে তারা সবাই নিহত হয়েছিল।
ইবনে হিশাম বলেন, উকবাকে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা. হত্যা করেন। যুহরী এবং একদল আলেম এ অভিমত পোষণ করেছেন।

বরকতময় হিজরত
হুদায়বিয়ার সন্ধির অব্যবহিত পরে মদীনায় হিজরতের সুযোগ আসে হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা রা.-এর জীবনে। মক্কা থেকে পালিয়ে মদীনায় উপস্থিত হন তিনি। হুদায়বিয়ার সন্ধির একটি শর্ত ছিল, মক্কার কেউ ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় গেলে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে। উম্মে কুলসুম রা. মদীনায় পৌঁছার দুই দিন পর তার দুই সহোদর ওয়ালীদ ও উমারা ইবনে আকবা তাঁকে ফেরত পাওয়ার দাবি নিয়ে মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পৌঁছে। তখন নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়।
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِذَا جَآءَكُمُ ٱلْمُؤْمِنَـٰتُ مُهَـٰجِرَٰتٍ فَٱمْتَحِنُوهُنَّ ۖ ٱللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَـٰنِهِنَّ ۖ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَـٰتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى ٱلْكُفَّارِ ۖ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ ۖ وَءَاتُوهُم مَّآ أَنفَقُواْ ۚ وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ أَن تَنكِحُوهُنَّ إِذَآ ءَاتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ ۚ وَلَا تُمْسِكُواْ بِعِصَمِ ٱلْكَوَافِرِ وَسْـَٔلُواْ مَآ أَنفَقْتُمْ وَلْيَسْـَٔلُواْ مَآ أَنفَقُواْ ۚ ذَٰلِكُمْ حُكْمُ ٱللَّهِ ۖ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ وَإِن فَاتَكُمْ شَىْءٌ مِّنْ أَزْوَٰجِكُمْ إِلَى ٱلْكُفَّارِ ۞ اَلْكُفَّارِ فَعَاقَبْتُمْ فَأْتُوا الَّذِيْنَ ذَهَبَتْ أَزْوَاجُهُمْ مِّثْلَ مَا أَنْفَقُوْا وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي أَنْتُمْ بِهِ مُؤْمِنُوْنَ
হে মুমিনগণ, তোমাদের নিকট মুমিন নারীরা হিজরত করে এলে তাদের পরীক্ষা করবে; আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে অবগত আছেন। যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা মুমিন তবে তাদেরকে কাফেরদের নিকট ফেরত পাঠাবে না। মুমিন নারীগণ কাফেরদের জন্য বৈধ নয় এবং কাফেরগণ মুমিন নারীদের জন্য বৈধ নয়। কাফেররা যা ব্যয় করেছে তা তাদেরকে ফিরিয়ে দাও। অতঃপর তোমরা তাদেরকে বিয়ে করলে তোমাদের কোনো অপরাধ হবে না যদি তোমরা তাদেরকে মোহর দাও। তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা যা ব্যয় করেছ তা ফেরত চাইবে এবং কাফেররা ফেরত চাইবে যা তারা ব্যয় করেছে। এটাই আল্লাহর বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে থাকেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যদি কেউ হাতছাড়া হয়ে কাফেরদের মধ্যে থেকে যায় এবং তোমাদের যদি সুযোগ আসে তখন যাদের স্ত্রীগণ হাতছাড়া হয়ে গেছে তাদেরকে, তারা যা ব্যয় করেছে তার সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করবে। ভয় কর আল্লাহকে, যার প্রতি তোমরা ঈমান এনেছ।
উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে কুলসুম রা.-কে তার ভাইয়ের হাতে অর্পণ করতে অস্বীকার করেন। তিনি তাদেরকে বলেন, 'শর্ত ছিল পুরুষদের সম্পর্কে, স্ত্রীলোকদের সম্পর্কে নয়।
হযরত উম্মে কুলসুম রা.-এর মদীনায় হিজরতের ঘটনাটি বেশ চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, তিনি একাকী মক্কা থেকে বের হন এবং পথে খুযাআ গোত্রে এক ব্যক্তিকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন। পায়ে হেঁটে, মতান্তরে উটের পিঠে চড়ে মদীনায় পৌঁছেন। একমাত্র উম্মে কুলসুম রা. ছাড়া অন্য কোনো কুরাইশ মহিলার ইসলাম সহকারে একাকী আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে হিজরত করেননি।
আমরা হযরত উম্মে কুলসুম রা.-এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের কাহিনী ও কৌশলের কথা তার মুখেই শুনতে পারি। তিনি বলেন, 'আমার পরিবারের একাংশ থাকত মরুদ্যানে। আমি সেখানে একাকী যেতাম এবং তিন-চারদিন সেখানে অবস্থান করে আবার মক্কায় ফিরে আসতাম। আমার এমন যাওয়া কেউ বারণ করত না। এক পর্যায়ে আমি মদীনায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। একদিন গ্রামের উদ্দেশে মক্কা থেকে বের হলাম। আমাকে যারা এগিয়ে দিতে এসেছিল তারা কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে ফিরে গেল। আমি একাকী চলছি, এমন সময় খুযাআ গোত্রের এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কোথায় যাবে?' আমি জানতে চাইলাম, 'আপনি এ প্রশ্ন করছেন কেন এবং আপনি কে?' তিনি বললেন, 'আমি খুযাআ গোত্রের লোক।'
তিনি খুযা'আ গোত্রের লোক বলাতে আমি নিশ্চিন্ত হলাম। কারণ, এ গোত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সন্ধি ও শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেছিল। আমি আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি কুরাইশ গোত্রের একজন নারী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট যেতে চাই, কিন্তু আমার পথ জানা নেই। তিনি বললেন, আমি তোমাকে মদীনায় পৌঁছে দিচ্ছি। তারপর তিনি একটি উট আমার কাছে নিয়ে আসলেন। আমি তার পিঠে চড়ে বসলাম।
এক সময় আমরা মদীনা পৌঁছলাম। তিনি ছিলেন একজন উত্তম সঙ্গী। আল্লাহ তাকে ভালো প্রতিদান দিন। আমি উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা.-এর নিকট গিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তার রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিকে হিজরত করেছ? বললাম, হ্যাঁ। তবে আমার ভয় হচ্ছে, আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় কি না।
একটু পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামা রা.-এর নিকট আসলেন। উম্মে সালামা রা. তাকে আমার বিষয়টি জানালে তিনি আমাকে 'মারহাবান ওয়া আহলান' বলে স্বাগত জানালেন।
আমি বললাম, আমি আমার দ্বীনের জন্য আপনার নিকট পালিয়ে এসেছি। আমাকে আশ্রয় দিন। ফেরত পাঠাবেন না। ফেরত পাঠালে আমাকে এমন শাস্তি দেবে যা আমি সহ্য করতে পারব না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ মহিলাদের ব্যাপারে সন্দ্বিচুক্তি অকার্যকর ঘোষণা করেছেন। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুদায়বিয়ার সন্দ্বিচুক্তির যে ধারাতে মক্কাবাসীদের ফেরত দানের কথা ছিল, তাতে কেবল পুরুষদের কথা উল্লেখ ছিল, মহিলাদের সম্পর্কে কোনো কথা ছিল না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপর্যুক্ত আয়াতটি পাঠ করেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে কুলসুম রা. এবং তার পরে যে সকল নারী মদীনায় এসেছেন তাদের সকলকে এ আয়াতের আলোকে পরীক্ষা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস রা.-কে প্রশ্ন করা হলো, নারীদের পরীক্ষা করার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদ্ধতি কী ছিল? বললেন, তিনি মদীনায় আগত মহিলাদের এভাবে শপথ করাতেন : আল্লাহর কসম, স্বামীর প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষবশত আমি ঘর থেকে বের হইনি। আল্লাহর কসম! এক যমীন থেকে অন্য এক যমীনের প্রতি আকর্ষণবশত বের হইনি। আল্লাহর কসম! পার্থিব কোনো লোভ-লালসাবশত ঘর ত্যাগ করিনি। আল্লাহর কসম! কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বতে ঘর ত্যাগ করেছি।
উপরোক্ত ঘটনার মাধ্যমে উম্মে কুলসুমের রা. তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও দৃঢ় ঈমানের পরিচয় পাওয়া যায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে কেন্দ্র করে ইসলামী শরীয়াতের অনেকগুলো বিশেষ বিধান জারী করেন। এ তার জন্য এক বিশেষ মর্যাদার বিষয়।
মাদানী জীবনে হযরত উম্মে কুলসুম রা. মহিলা সাহাবীদের মধ্যে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সম্মানের দৃষ্টিতে এবং তাঁর ঈমানী সততাকে খুব বড় করে দেখতেন। কোনো কোনো জিহাদে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন এবং আহতদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন। যুদ্ধলব্ধ গনীমতেও তাঁকে অংশ দিয়েছেন।

শুভ পরিণয়
হযরত উম্মে কুলসুম রা. হিজরতের আগ পর্যন্ত বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি। মদীনায় আসার পর প্রখ্যাত চারজন সাহাবী তাকে বিয়ের পয়গাম পাঠান। তারা হলেন: যুবাইর ইবনুল আওয়াম, যায়িদ ইবনে হারিসা, আবদুল রহমান ইবনে আউফ ও আমর ইবনুল আস রা.। তিনি বৈপিত্রেয় ভাই উসমান ইবনে আফফান রা.-এর সাথে পরামর্শ করেন। উসমান রা. তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে পরামর্শ করতে বলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট যান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তার পরামর্শ চান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, তুমি যায়িদ ইবনে হারিসাকে বিয়ে করো। তোমার জন্য ভালো হবে। তিনি যায়িদকে বিয়ে করেন।
হযরত যায়িদ রা. মুতার যুদ্ধে শহীদ হলেন। অতঃপর হযরত যুবায়ির ইবনুল আওয়াম রা. তাকে বিয়ে করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের ছাড়াছড়ি হয়ে যাওয়ার পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. তাকে বিয়ে করেন। আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. রোগাক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তখন হযরত আমর ইবনুল আস রা. তাকে বিয়ে করেন। তার ঘরেই হযরত আলী রা.-এর খিলাফতকালে তিনি ইন্তেকাল করেন।
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৬০৬. সূরা তাওবাহ, ৯:২৪।
৬০৭. সূরা ফুরকান, ২৫:২৭-২৯।
৬০৮. তাফসীরে কাবীর, ২৪/৭৫।
৫০৯. সহীহ, মুসলিম, ৪৬৪b; দালায়েলুন নবুওয়াতু।
৫১০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/৩১।
৬১১. সূরা মুমতাহিনা, ৬০:১০-১১।
৬১২. ইসতিআব, ৪/৪৬৫।
৬১৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৩০।
৬১৪. মুখতাসার তাফসীর ইবনে কাসীর, ৩/৪৮৫; সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/২৬২; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৭৬; যাদুল মাআদ, ৩/৩০০।
৬১৫. নিসা মিন আসরিন নবুওয়াহ, ৩৮৬।
৬১৬. তাহযীবুত তাহযীব, ১২/৪৭৭; আনসাবুল আশরাফ, ১/৪৭১; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৭৭।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 হিন্দা বিনতে উতবা রা.

📄 হিন্দা বিনতে উতবা রা.


নিশ্চয় মানুষের অন্তরের অবস্থান মহান আল্লাহর কুদরতী হাতের দুই আঙুলের মাঝে। আল্লাহ তাআলা যাকে যখন যেমন চান, তেমন করে থাকেন।
হযরত হিন্দা বিনতে উতবা রা. ইসলামের ইতিহাসের খুবই আকর্ষণীয় এক নারী-চরিত্র। যিনি জীবনের এক পর্বে পিতা ও স্বামীর সাথে সমানে ইসলামদ্রোহিতা চালিয়ে গেছেন। ইসলাম, মুসলমান ও নবী সা.-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘ বিশ বছরেরও অধিক সময় চরম শত্রুতা করে গেছেন। জান-মাল বিলিয়ে দিয়েছিলেন ইসলামবিদ্বেষের তরে। আরেক পর্বে এসে সর্বতোভাবে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন ইসলামের সেবায়। ফতহে মক্কার পর থেকে সম্পূর্ণ পাল্টে যান তিনি। আবির্ভূত হন ইসলামের নিষ্ঠাবতী সেবকরূপে।
কোনো সন্দেহ নেই, হযরত হিন্দা রা. ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বশালিনী ও বুদ্ধিমতী। কথাবার্তায় ছিলেন স্পষ্টভাষী। তার বংশলতিকা হচ্ছে, হিন্দা বিনতে উতবা বিনতে রাবীআ ইবনে আবদু মান্নাফ ইবনে আবদু শামস আল আবশামিয়া আল কারশিয়া। তিনি ইসলামের পূর্বে ও পরে আরবের একজন বিশিষ্ট মহীয়সী নারী হিসেবে পরিচিত এবং উমাইয়া খলীফা হযরত মুআবিয়া ইবনে আবি সুফইয়ান রা.-এর আম্মাজান।

যেমন ছিল শুরুটা
রূপ-সৌন্দর্য, মতামত-সিদ্ধান্ত, বুদ্ধি-বিচক্ষণতা, ভাষার শুদ্ধতা ও অলঙ্কার, সাহিত্য, কবিতা, বীরত্ব-সাহসিকতা ও আত্মসম্মানবোধের অধিকারিণী ছিলেন হিন্দা বিনতে উতবা। ইমাম যাহাবী বলেন, 'হিন্দা ছিলেন কুরাইশ নারীদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়া সুন্দরী ও জ্ঞানী।
কুরাইশ বংশের যুবক আল ফাকিহ ইবনুল মুগীরা আলমাখযুমীর সাথে হিন্দার প্রথম বিয়ে হয়, কিন্তু সে বিয়ে টেকেনি। অতঃপর আবু সুফইয়ান ইবনে হারব রা.-এর সাথে তার বিয়ে হয়। এ ঘরে মুআবিয়া ও উতবা জন্মগ্রহণ করেন।
বিশ্ববাসীকে অন্ধকারের গভীর অমানিশা থেকে আলোর পথে নিয়ে আসতে এক সময় মক্কায় ইসলামের অভ্যুদয় হলো। পরবর্তী বিশ বছর পর্যন্ত হিন্দা ইসলামের আহবানের প্রতি কর্ণপাত করেননি; বরং তার এ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে আল্লাহর রাসূল, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধচরণ ও শত্রুতায়। এ সময় শত্রুতা প্রকাশের কোনো সুযোগই তিনি হাতছাড়া করেননি।
হিজরী দ্বিতীয় সনে সিরিয়া থেকে মক্কা অভিমুখী আবু সুফইয়ানের একটি বাণিজ্য কাফেলা নির্বিঘ্নে পার করা এবং মুসলমানদের চিরতরে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে মক্কার পৌত্তলিকদের বিশাল একটি বাহিনী বের হয়। এই বাহিনীর পুরোভাগে ছিল কুরাইশদের বড় বড় নেতারা। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, বদরে পৌঁছে উট জবাই করে ভুরিভোজ এবং মদ পান করে আনন্দ ফুর্তি করবে। তারপর মুসলমানদের শিকড়সহ উৎখাত করবে। যাতে আরবের আর কেউ কোনো দিন তাদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দুঃসাহস না করে।
মক্কার এই পৌত্তলিক বাহিনীতে ছিল হিন্দার পিতা, ভাই, চাচা ও তার স্বামী। বদর যুদ্ধের সূচনাতেই হিন্দার পিতা, ভাই ও চাচা নিহত হয়। শুধু তাই নয়, মুশরিক বাহিনীর সত্তরজন সাহসী সৈনিকরাও নিহত হয়। তাদের মৃতদেহ বদরে ফেলে রেখে অন্যরা মক্কার পথ ধরে পালিয়ে যায়। এই পলায়নকারীদের পুরোভাগে ছিলেন হিন্দার স্বামী আবু সুফইয়ান। এ বিজয়ে মুসলমানরা যেমন দারুণ উৎফুল্ল হন তেমনই কুরাইশ বাহিনীর খবর মক্কায় পৌঁছলে সেখানের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই হতবাক হয়ে যায়। প্রথমে অনেকে সে খবর বিশ্বাস করতে পারেনি। পরাজিতরা যখন মক্কায় ফিরতে লাগল তখন খবরের যথার্থতা সম্পর্কে আর কোনো সন্দেহ অবশিষ্ট রইল না। ঘটনার ভয়াবহতায় মক্কাবাসীর মথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আবু লাহাব তো শোকে দুঃখে শয্যা নিল এবং সে অবস্থায় সাতদিন পরে জাহান্নামের পথে যাত্রা করে। তার জীবনের অবসান হয়। কুরাইশ নারীরা তাদের নিহতদের স্মরণে এক মাস ব্যাপী শোক পালন করে। বুক চাপড়ে, মাথায় চুল ছিঁড়ে তারা মাতম করতে থাকে। নিহত কোনো সৈনিকের বাহন অথবা ঘোড়ার পাশে সমবেত হয়ে তারা কান্নাকাটি করতে থাকে। একমাত্র হিন্দা ছাড়া এই শোক প্রকাশ ও মাতম করা থেকে মক্কার কোনো নারী বাদ যায়নি। হ্যাঁ, হিন্দা কোনো রকম শোক প্রকাশ করেননি। একদিন কিছু কুরাইশ মহিলা হিন্দার নিকট গিয়ে প্রশ্ন করে, তুমি তোমার পিতা, ভাই, চাচা ও পরিবারের সদস্যদের জন্য একটু কাঁদলে না? বললেন, আমি যদি তাদের জন্য কাঁদি তাহলে সে কথা মুহাম্মাদের নিকট পৌঁছে যাবে।
এতে তারা এবং খাযরাজ গোত্রের নারীরা উৎফুল্ল হবে। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ ও তার সহচরদের নিকট থেকে প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত তেল- সুগন্ধি আমার জন্য হারাম। আমি যদি জানতাম কান্নাকাটি ও মাতম আমার দুঃখ-বেদনা দূর করে দেবে তাহলে আমি কাঁদতাম; কিন্ত আমি জানি আমার প্রিয়জনদের বদলা না নেওয়া পর্যন্ত আমার অন্তরের ব্যথা দূর হবে না। হিন্দা তেল-সুগন্ধির ধারে কাছেও গেলেন না এবং আবু সুফইয়ানের শয্যা থেকেও দূরে থাকলেন। পরবর্তী উহুদ যুদ্ধ পর্যন্ত মক্কাবাসীদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলতে লাগলেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে। আর বদরে নিহতদের স্মরণে রচনা করলেন প্রচুর শোকগাঁথা।

উহুদের প্রতিশোধ
কুরাইশ বাহিনী বদর প্রান্তর থেকে মক্কায় ফেরার পথে এই পরাজয় তাদের জন্য চরম অবমাননাকর হয়ে উঠল। আবু সুফইয়ানের হৃদয় দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল সেদিন—আবু জাহাল, উতবা ইবনে রবীয়া, শাইবা ইবনে রবীয়া, উমাইয়া ইবনে খালফ, উকবা ইবনে আবি মুয়ীত, আসওয়াদ ইবনে আবদিল আসাদ মাখযুমী, ওয়ালীদ ইবনে উতবা, নযর ইবনে হারেস, আস ইবনে সাঈদ ও তাঈমা ইবনে আদীর মতো কুরাইশের দশজন নেতা ও যুবক বীর- বাহাদুরদের যুদ্ধের মাঠে ফেলে চলে যাচ্ছে বিষণ্ণ মনে। ইসলামের হাতে কুরাইশের এমন পরাজয় কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না তারা। তারা পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং নিজেদের বিক্ষিপ্ত শক্তির সমাবেশ ঘটাতে সচেষ্ট হয়। নিজেদের জ্ঞানী মৃত ভাইদের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য শত্রুর বিপক্ষে আরেকবার তুমুল যুদ্ধ করার ইচ্ছায় পাগলপারা হয়ে উঠল।
প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কুরাইশরা যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। উহুদ যুদ্ধের দামামা সন্নিকটে। তারা তাদের সকল সৈন্য-সামন্ত এবং সহযোগী গোত্র- গোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে আবু সুফইয়ানের নেতৃত্বে যুদ্ধের জন্য এগোতে থাকে। কুরাইশ নেতারা তাদের প্রতিশোধের অভীষ্ট লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করে মাত্র দু-জন মানুষকে। তাদের একজন হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আর অপরজন হচ্ছেন হযরত হামযা রা.।
আল্লাহু আকবার! যুদ্ধের জন্য বের হবার আগে যারাই কুরাইশদের সাথে কথাবার্তা ও সলাপরামর্শ শুনত, তারাই জানে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর হযরত হামযা রা.-কে কীভাবে যুদ্ধের টার্গেট বানানো হয়েছে! কুরাইশরা রওনা হওয়ার পূর্বে একজন লোক নিযুক্ত করল, যাকে হযরত হামযা রা.-কে শেষ পরিণতিতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এই লোক ছিল একজন হাবশী। তীরবাজিতে ছিল সে খুব দক্ষ। কুরাইশরা তাকে শুধু এ দায়িত্ব দিয়েছে যে, সে যেন হামযাকে শিকার করে; দূর থেকে তীরবিদ্ধ করে তার জীবনাবসান ঘটায়। কুরাইশরা তাকে এ উদ্দেশ্য ছাড়া আর কোনো দায়-দায়িত্ব অর্পণ করেনি। যুদ্ধ যেদিকেই গড়াক, যে করেই হোক তুমি তাকে তীরবিদ্ধ করে মেরে ফেলতে ভুলবে না!
কুরাইশরা তাকে বড় বড় পুরস্কারের লোভ দেখায়। তাকে মুক্ত করে দেওয়ার আশ্বাস দেয়। এই হাবশী লোকটির নাম 'ওয়াহশী'। সে ছিল যুবাইর ইবনে মুতআমের গোলাম। যুবাইরের চাচা বদর যুদ্ধে মারা গিয়েছিল। যুবাইর ওয়াহশীকে বলেছে,
أُخْرُجُ مَعَ النَّاسِ وَإِنْ أَنْتَ قَتَلْتَ حَمْزَةَ فَأَنْتَ عَتِيقٌ
তুমিও সবার সাথে যুদ্ধে বের হও। যদি তুমি হামযাকে খুন করতে পার, তাহলে তুমি মুক্ত।
এরপর কুরাইশরা ওয়াহশীকে আবু সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবার কাছে সোপর্দ করে দেয়। যাতে সে তাকে তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে মনোবল বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। আসলে হিন্দার পিতা, চাচা, ভাই ও এক ছেলে বদর যুদ্ধে মারা যায়। তাকে বলা হয়, এদের মধ্যে অনেককে হামযা খুন করেছে, আর অনেককে অন্যরা খুন করেছে। এভাবে অধিকাংশ কুরাইশ নারী-পুরুষের কাছে যুদ্ধের ব্যাপারে প্রেরণা দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। লড়াইকালে যে কোনো মূল্যে হামযার মস্তক যেন ছিন্ন করা হয়—এটাই ছিল সবার পণ।
কুরাইশরা লড়াইয়ে বের হওয়ার কয়েক দিন পূর্ব হতে হিন্দা তার পূর্ণ ক্ষোভ, দুঃখ, হিংসা আর প্রতিশোধস্পৃহা ওয়াহশীর মনে গভীরভাবে গেঁথে দেয়। হামযাকে খুন করার বিনিময়ে বিরাট বিরাট লোভনীয় পুরস্কারের অঙ্গীকার করা হয়। তাকে খুব মূল্যবান স্বর্ণ, রূপা ও মুক্তার অলংকার পুরষ্কার দেওয়ার লোভ দেখানো হয়। হিন্দা নিজের গলার হার, হাতের চুড়িসহ সকল অলংকার ওয়াহশীর সামনে বের করে দেয়। বলে, এ সব কিছুই তুমি পাবে; তুমি কেবল এর বিনিময়ে আমাকে হামযার মস্তক উপহার দেবে।
দুনিয়ার সবচেয়ে দামি দামি অলংকারের মোহে পড়ে যায় ওয়াহশী। সে যুদ্ধের প্রহর গুণতে থাকে, আর তীর নিক্ষেপের অনুশীলন করতে থাকে। হামযাকে খুন করার কাজে কৃতকার্য হতে পারলে করে সে আযাদ হতে পারবে। এর বিনিময়ে কুরাইশের এক নেতা, নেতার স্ত্রী ও নেতার কন্যার গলায় পরা দামি অলংকারও তার হাতে আসবে।
এ সকল অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, যুদ্ধে সবার লক্ষ্যস্থল ও অভীষ্ট আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে হযরত হামযা রা.-কে কতল করা।
শেষে একদিন উহুদ যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধেও হযরত হামযা রা.-এর বীরত্ব ছিল কিংবদন্তিতুল্য। প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তিনি সিংহবিক্রমে লড়াই করছিলেন। তিনি দু-হাতে এমনভাবে তরবারি পরিচালনা করছিলেন যে, শত্রুপক্ষের কেউ তার সামনে টিকতে না পেরে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এদিকে মক্কার নেতা যুবাইর ইবনে মুতইমের হাবশী গোলাম ওয়াহশী ইবনে হারব একটি ছোট বর্শা হাতে নিয়ে আড়ালে ওঁৎ পেতে বসেছিল হামযাহ রা.-কে নাগালে পাওয়ার জন্য। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সিবা ইবনে আব্দুল ওযযা হামযার সামনে আসলে তিনি তাকে আঘাত করেন। ফলে তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তিনি সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। এদিকে বর্শা তাক করে বসে থাকা ওয়াহশী সুযোগ মতো হামযার অগোচরে তার দিকে বর্শা ছুড়ে মারে, যা তার নাভীর নীচে ভেদ করে ওপারে চলে যায়। এরপরেও তিনি তার দিকে তেড়ে যেতে লাগলে পড়ে যান এবং কিছুক্ষণ পরেই শাহাদাত বরণ করেন। এ যুদ্ধে শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত হযরত হামযা রা. একাই ৩০ জনের অধিক শত্রুসেনাকে হত্যা করেন।
উহুদের ময়দানে উভয় বাহিনী পরস্পর যখন মুখোমুখি, তখন কুরাইশরা বদর ও সেখানে নিহতদের স্মৃতিচারণ করছে। হিন্দার নেতৃত্বে কুরাইশ নারীরা দফ তবলা বাজিয়ে নিম্নের এ গানটি গাইতে গাইতে তাদের সারিবদ্ধ সৈনিকদের সামনে দিয়ে চক্কর দিতে লাগল,
ويها بني عبد الدار ويها حماة الأدبار ضربا بكل بتار إن تقبلوا نعانق و نفرش النمارق أو تدبر والفارق فراق غير وامق
বনু আব্দুদ্দার, ও পশ্চাতের সন্ত্রাসীরা! বীর দর্পে চালাও শমশীর! যদি সামনে এগিয়ে যাও, জড়িয়ে নেব বুকে। তোমাদের জন্য গালিচা বিছিয়ে দেব। আর যদি পিছু হটো, তবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব। কোনোদিনও আর পাবে না।
অপরদিকে মুসলমানরা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তার সাহায্যকে স্মরণ করছে। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু দক্ষ তীরন্দাযকে পাহাড়ের ওপর একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়োগ করলেন এবং গোটা বাহিনীকে এমনভাবে সাজালেন যে, কেউ ভুল না করলে আল্লাহর ইচ্ছায় বিজয় অবধারিত।
বিশিষ্ট আনসারী সাহাবী হযরত আবু দুজানা রা.ও উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন এবং চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তেও তার সাথে অটল থাকেন। সেদিন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে মৃত্যুর জন্য বাইআত করেছিলেন। আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, যুদ্ধের পূর্বক্ষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি তরবারি হাতে নিয়ে বললেন, এটি কে নেবে? উপস্থিত সকলেই হাত বাড়িয়ে দিলেন। সবাই চুপ; কিন্তু আবু দুজানা বললেন, আমি পারব এর হক আদায় করতে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, আবু দুজানা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, এর হক কী? তিনি জবাব দিলেন, এ নিয়ে কোনো মুসলমানকে হত্যা না করা, এটি নিয়ে কাফেরদের ভয়ে পালিয়ে না যাওয়া।
যুদ্ধের সময় মাথায় একটি লাল ফিতা বাঁধা ছিল তার অভ্যাস। সেটা বাঁধলে বোঝা যেত তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত থেকে তরবারিটি নিয়ে তিনি মাথায় ফিতা বাঁধলেন। তারপর অসীম সাহসকিতার সঙ্গে সৈনিকদের সারিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ পর কবিতার কিছু পংক্তি গুন গুন করে গাইতে গাইতে শত্রু বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। পংক্তি দু-টি হলো,
أنا الذي عاهدني خليلي ونحن بالسفح لدى النخيل أن لا أقوم الدهر في الكيول أضرب بسيف الله والرسول
আমি সেই ব্যক্তি যাকে আমার বন্ধু পাহাড়ের পাদদেশে খেজুর বাগানের সন্নিকটে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন। আমি যেন সৈনিকদের সারির শেষ প্রান্তে অবস্থান না করি। আর তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরবারি দ্বারা শত্রু নিধনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. বলেন, আবু দুজানার আগেই আমি তরবারিটি চেয়েছিলাম; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে না দিয়ে দিলেন তাকে। অথচ আমি হলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু সাফিয়্যা বিনতু আবদুল মুত্তালিবের ছেলে। তাই তরবারিটি তাঁকে দেওয়ার রহস্য জানার জন্য আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদত্ত তরবারি হাতে নিয়ে অগ্রসর হলেন। যে দিকে এগোতে লাগলেন শত্রুদের মাঝে ত্রাস ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এক সময় তিনি পাহাড়ের ঢালে নেমে গেলেন, যেখানে কুরাইশ রমণীরা হিন্দার নেতৃত্বে রণসঙ্গীত গেয়ে তাদের সৈনিকদের উৎসাহিত করছিল। তারা আবু দুজানাকে দেখে ভীত হয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরু করে দিল; কিন্তু কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে এলো না। তবে আবু দুজানা মহিলাদের কোনো ক্ষতি না করেই ফিরে আসেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, হিন্দার মাথার ওপর তরবারি রেখে তিনি আবার তা উঠিয়ে নেন। যুবাইর রা. তাঁর পেছনে ছিলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। তিনি এর কারণ জানতে চাইলেন। আবু দাজানা জবাব দিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরবারি দিয়ে অসহায় কোনো নারীকে হত্যা করতে আমার ইচ্ছা হয়নি।
উহুদের বিপর্যয়ের সময় যে মুষ্টিমেয় সৈনিক রাসূল রা.-কে ঘিরে নিজেরে দেহকে ঢাল বানিয়ে অটল হয়ে দাঁড়ায় তাদের মধ্যে আবু দুজানা অন্যতম। এদিন তিনি নিজের পিঠ পেতে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিঠ রক্ষা করেছিলেন। তাই শত্রুর নিক্ষিপ্ত তীর ও বর্শার আঘাতেই তার পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল।

হামযা রা.-এর দেহ বিকৃতি
যুদ্ধ শুরু হলো। প্রথম দিকে মুশরিক বাহিনীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। মুসলিম বাহিনী বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেল। কুরাইশ বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল। কুরাইশ রমণীরা হেয়, লাঞ্ছিত অবস্থায় যুদ্ধবন্দিনী হতে চলছিল। যুদ্ধের এমন এক পর্যায়ে কিছু মুসলিম সৈনিক শত্রুপক্ষের পরিত্যক্ত জিনিসপত্র সংগ্রহে মনোযোগী হয়ে পড়ল, আর পাহাড়ের ওপর নিয়োগকৃত তীরন্দায বাহিনীর কিছু সদস্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশের কথা ভুলে গিয়ে স্থান ত্যাগ করল। মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের রূপ পাল্টে গেল। পলায়নপর পৌত্তলিক বাহিনী মুসলমানদের এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করল। তারা ফিরে দাঁড়িয়ে পাল্টা আক্রমণ করে বসল। মুসলিম বাহিনী হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। আবার যুদ্ধ শুরু হলো। বহু হতাহতসহ ৭০ জন মুসলিম সৈনিকের শাহাদাত বরণের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটল। ওয়াহশীর হাতে শহীদ হলেন হযরত হামযা রা.।
আসুন! এই খুনের ঘটনা আমরা ওয়াহশীর মুখ থেকেই শুনি, 'আমি ছিলাম যুবাইর ইবনে মুতইমের ক্রীতদাস। তার চাচা তুয়াইমা ইবনে আদী বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। কুরাইশরা উহুদ যুদ্ধে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে যুবাইর ইবনে মুতইম আমাকে বললেন, যদি তুমি মুহাম্মাদের চাচা হামযাকে আমার চাচার হত্যার প্রতিশোধস্বরূপ হত্যা করতে পার, তবে তুমি মুক্তি পাবে।
এই প্রস্তাব পাওয়ার পর কুরাইশদের সাথে উহুদের যুদ্ধের জন্যে আমি রওনা হলাম। আমি ছিলাম আবিসিনিয়ার অধিবাসী। আবিসিনিয়দের মতো আমিও ছিলাম বর্শা নিক্ষেপে সুদক্ষ। আমার নিক্ষিপ্ত বর্শা কমই লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো। ব্যাপকভাবে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর আমি হযরত হামযা রা.-কে খুঁজতে শুরু করলাম। এক সময় তাকে দেখতেও পেলাম। তিনি জেদী উটের মতো সামনের লোকদের ছিন্নভিন্ন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তার সামনে কোনো বাধাই টিকতে পারছিল না। কেউ তার সামনে দাঁড়াতেই পারছিল না।
আল্লাহর শপথ! আমি হযরত হামযা রা.-এর ওপর হামলার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলাম এবং একটি পাথর অথবা বৃক্ষের আড়ালে ছিলাম, এমন সময় সাবা ইবনে আবদুল ওযযা আমাকে ডিঙিয়ে তার কাছে পৌঁছে গেল। হযরত হামযা রা. হুঙ্কার দিয়ে সাবাকে বললেন, ওরে লজ্জাস্থানের চামড়া কর্তনকারীর সন্তান! এই নে।
একথা বলে তিনি সাবার ঘাড়ে এমনভাবে তরবারির আঘাত করলেন এবং তার মাথা এমনভাবে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল যেন তার ঘাড়ে মাথা ছিলই না। আমি তখন বর্শা তুলে হযরত হামযা রা.-এর প্রতি নিক্ষেপ করলাম। বর্শা নাভির নীচে বিদ্ধ হয়ে দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে পেছনে পৌঁছে গেল।
তিনি পড়ে গিয়ে উঠতে চাইলেন কিন্তু সক্ষম হননি। তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত আমি তাকে যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় রেখে দিলাম। এক সময় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। আমি তার কাছে গিয়ে বর্শা বের করে কুরাইশদের মধ্যে গিয়ে বসে রইলাম। হযরত হামযা রা. ছাড়া অন্য কাউকে আঘাত করার ইচ্ছা ও প্রয়োজনই আমার ছিল না। আমি মুক্তি পাওয়ার জন্যেই হযরত হামযা রা.-কে হত্যা করেছি। এরপর মক্কা ফিরে এসেই আমি মুক্তি লাভ করলাম।'
আল্লাহ ও তার রাসূলের সিংহ হযরত হামযা রা. শহীদ হয়ে নিথর দেহে পড়ে রয়েছেন। জীবিত থাকা অবস্থায় তিনি যেমন ছিলেন একজন ভয়ঙ্কর সাহসী, তদ্রুপ মৃত্যুর পরও তাকে ভয়ঙ্কর সাহসী হিসেবে দেখা যায়। তার শত্রুরা কেবল তাকে খুন করেই ক্ষান্ত হয়নি, আর ক্ষান্তই-বা কীভাবে হবে! তিনি তো এমন ব্যক্তি ছিলেন যাঁর বিরুদ্ধে লড়তে শত্রুপক্ষের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা থেকে শুরু করে লড়াকু হিংস্ররা একাট্টা হয়ে উহুদে এসেছিল। দুজন ব্যক্তি ছিলেন তাদের টার্গেটের সর্বোচ্চ প্রান্তসীমায়। একজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, অপরজন তার চাচা হযরত হামযা রা.।
আবু সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা ওয়াহশীকে নির্দেশ দিয়েছিল, যেন হামযার কলিজা তার সামনে পেশ করা হয়। ওয়াহশী এই মর্মন্তুদ কাণ্ডটি ঘটিয়ে ফেলে। হামযার কলিজা নিয়ে সে হিন্দার কাছে এলে, এক হাতে সে কলিজাটি হস্তান্তর করে, আর অন্য হাতে হিন্দা তার দামী গহনা ওয়াহশীর হাতে সোপর্দ করে। এটা যে ওয়াহশীর কীর্তির প্রতিদান ছিল! এরপর আবু সুফইয়ানের স্ত্রী, বদর প্রান্তরে খুন হওয়া উতবার কন্যা হিন্দা হামযার কলিজা চিবুতে আরম্ভ করে। সে এভাবে তার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, ক্রোধ আর হিংসার অনল নেভাতে চেষ্টা করে; কিন্তু কলিজা তার গলায় আটকে যায়। সে কিছুতেই তা গিলতে সক্ষম হয় না। সে তা বাইরে নিক্ষেপ করে বলতে থাকে,
نحن جزيناكم بيوم بدر والحرب بعد الحرب ذات سعر ما كان عن عتبة لي من صبر ولا أخي وعمــه وبـــكـــري شفيت نفسي وقضيت نذري أزاح وحشي غــلــيــل صـدري
আমি তোমার কাছ থেকে বদরে নিহতদের প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছি। লড়াইয়ের পর লড়াই করা তো পাগলামির নামান্তর। আমি আমার পিতা উতবা, চাচা শাইবা এবং ভাই ও ছেলের মৃত্যুতে ধৈর্য সংবরণ করে রাখতে পারিনি। এখন আমার মন শান্ত হয়ে গেছে। আমি আমার প্রতিশ্রুতি পূরণ করে নিয়েছি। ওয়াহশী আমার ভেতরকার ক্ষোভ মিটিয়ে দিয়েছে।
লড়াই শেষ হলে মুশরিকরা উট ও ঘোড়ার ওপর সাওয়ার হয়ে কাফেলাবদ্ধ হয়ে মক্কা অভিমুখে চলে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের শহীদদের দেখে দেখে চিহ্নিত করছেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় অকাতরে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন।

বাইআত গ্রহণ
মক্কা বিজয়ের পর পৃথিবীর বুকে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়। হযরত আবু সুফইয়ান রা. মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিলেন তিনি। হিন্দা ইবনে উতবা রা.-এর নিকটও ইসলামের সত্যতা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তিনি কয়েকজন সত্যান্বেষিণী মহিলার সঙ্গে বোরকা আবৃত হয়ে হাজির হলেন রাসূলের দরবারে। রাসূলুল্লাহ সা.-এর অমায়িক মধুর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে সন্তুষ্টচিত্তে ইসলাম কবুল করেন হিন্দা। সেদিন থেকে হিন্দা হলেন রাযিয়াল্লাহ আনহা।
হিন্দা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাদের কাছ থেকে কী কী অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক কর না।' হিন্দা বললেন, 'এ অঙ্গীকার আপনি পুরুষদের কাছ থেকে তো নেননি। তবুও আমি এটা মেনে নিলাম।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'চুরি করবে না।' হিন্দা বললেন, 'আমি আমার স্বামী আবু সুফিয়ানের সম্পত্তি থেকে কখনো কখনো দু-চার দিরহাম নিয়ে থাকি। জানি না এটাও জায়েজ, না নাজায়েজ।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'নিজের সন্তানদের হত্যা করবে না।' হিন্দা বললেন, 'আমরা তো শৈশবে তাদের লালন পালন করেছি। বড় হলে বদরের ময়দানে আপনারাই তাদের হত্যা করেছেন। এখন তাদের কী হবে, সেটা আপনারাই জানেন।'
তখন তিনি হৃদয়ের আবেগে উদ্বেলিত হয়ে রাসূলুল্লাহ সা.কে সম্বোধন করে বললেন, ইতোপূর্বে কুফুরী অবস্থায় আপনার চেয়ে অধিক ঘৃণিত দুশমন আমার কেউ ছিল না। আর আজ আমার কাছে মনে হচ্ছে আপনার চেয়ে পরম প্রিয় দুনিয়ায় আমার কেউ নেই। তিনি আবেগ আর চেপে রাখতে পারলেন না। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো তার অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। এরচেয়ে মূল্যবান কিছু দরবারে রেসালতে দেওয়ার মতো আপাতত তার কাছে নেই।
এরপর ঘরে গেলেন। ঘরে ঢুকেই মূর্তিগুলো সামনে পড়ল তাঁর। ঈমানী জোশ নাড়া দিল তার পুরো তনুমনে। সঙ্গে সঙ্গে সবগুলো মূর্তি ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়ার পর হযরত হিন্দা বিনতে উতবা রা. নিজের জীবনকে সর্বাত্মকভাবে ইসলামের জন্য ওয়াকফ করে দেন।
এতে কোনো সন্ধেহ নেই, হযরত হিন্দা রা. ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বশালিনী। অভিমানী তো বটেই। সেই সঙ্গে ছিল তার বুদ্ধিমত্তা। নিম্নের হাদীসে আমরা তার প্রমাণ পাই।
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ هِنْدٌ أُمُّ مُعَاوِيَةَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ أَبَا سُفْيَانَ رَجُلٌ شَحِيحٌ فَهَلْ عَلَيَّ جُنَاحٌ أَنْ آخُذَ مِنْ مَالِهِ سِرًّا قَالَ خُذِي أَنْتِ وَبَنُوكِ مَا يَكْفِيكِ بِالْمَعْرُوفِ
হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, মুআবিয়া রা.-এর মা হিন্দা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন, আবু সুফিয়ান রা. একজন কৃপণ ব্যক্তি। এমতাবস্থায় আমি যদি তার মাল হতে গোপনে কিছু গ্রহণ করি, তাতে কি আমার গোনাহ হবে? তিনি বললেন, তুমি তোমার ও সন্তানদের প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায়ভাবে গ্রহণ করতে পার।
হযরত হিন্দা রা. আর কোনোদিন সীরাতুল মুস্তাকীম তথা সরল পথ থেকে সরে যাননি। খলীফা উমর রা.-এর আমলে স্বামীর সঙ্গে তিনিও সিরিয়ায় সংঘটিত যুদ্ধগুলোতে অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে বিখ্যাত ইয়ারমুকের যুদ্ধে সুফিয়ান-দম্পতির একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এ যুদ্ধে রোমক সৈন্যের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লাখ। সেক্ষেত্রে মুসলমানদের সংখ্যা হবে ত্রিশ- চল্লিশ হাজার। মাঝে মাঝে মুসলিম বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিলেন। কিন্তু মহিলারা যুদ্ধ সংগীত গেয়ে তাদের উৎসাহিত করতে থাকেন। এ ব্যাপারে হযরত হিন্দা বিনতে উতবা রা.-এর জুড়ি মেলা ভার। পলায়নপর যুদ্ধবিমুখ সৈন্যরা বস্তুত হিন্দা-বাহিনীর প্রেরণাক্রমেই নব বলে বলীয়ান হয়ে শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এতে যুদ্ধের গতি বদলে যেত। বলাবাহুল্য, ইয়ারমুক যুদ্ধে বিশাল রোমক বাহিনী সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয়।
হযরত হিন্দা বিনতে উতবা রা. হযরত উমর রা.-এর খেলাফতকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকেন। জীবনের এ সময়টা সম্পূর্ণভাবে ইসলামের সেবায় সঁপে দেন। এক সময় মাওলায়ে কারীমের সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৬১৭. তারীখুল ইসলাম, ৩/২৯৮; তারীখে দিমাশক, ৪৩৭; ইসতিআব, ৪/৪০৯।
৬১৮. তারীখুল ইসলাম, ৩/২৯৮।
৬১৯. আর রাহীকুল মাখতুম, ২৭৩-২৭৪।
৬২০. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৬৮-৬৯।
৬২১. সীরাতে ইবনে হিশাম, ৩/৫৮৯।
৬২২. রিজালুন হাওলার রাসূল, ২১৫-২১৬।
৬২৩. সহীহ, মুসলিম, ৭, ১৭১৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00