📄 উম্মুল ফযল লুবাবা বিনতুল হারিস রা.
প্রতিটি মুমিনের অন্তরেই তার প্রকৃত মাহবুব হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভক্তি শ্রদ্ধা ও প্রীতি-ভালোবাসার সর্বোচ্চ স্থান দখল করে আছেন। কারণ, তিনিই যে মুমিনের প্রকৃত প্রেমাস্পদ এবং মাহবুব, তাঁরই প্রেম-মাধুরী মুমিনের অন্তরে শক্তি ও সাহস যোগায়, জীবনীশক্তিহীন আত্মায় নবচেতনার সঞ্চার করে। মানুষ যখন আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয় বিস্মৃত হয়ে অধঃপতনের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছিল, মানবতার এমনি এক দুর্দিনে বিশ্বমানবের প্রকৃত সুহৃদ ও কল্যাণকামী, ত্রাণকর্তা ও মুক্তিদাতা হযরত মুহম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুক্তির জিয়নকাঠি নিয়ে আবির্ভূত হন। আত্মভোলা মানুষকে তিনি আত্মোপলব্ধির আহবান জানান, পথহারা মানুষকে তিনি দান করেন সঠিক পথের সন্ধান। তার প্রদর্শিত পথের পথিক হয়েই মুমিন আত্মপরিচয় লাভে ধন্য হয়েছে, পেয়েছে মুক্তিপথের সন্ধান। তাই তার অন্তরে এই মহামানবের প্রতি এত শ্রদ্ধা, ভক্তি ও প্রেমসুধার অন্তহীন ফল্গুধারা সদা প্রবাহিত। দুনিয়ার যে কোনো ব্যক্তি ও বস্তুর তুলনায় তাঁরই প্রতি মুমিনের সর্বাধিক হৃদ্যিক আকর্ষণ। কারণ, তাঁরই বদৌলতে মুমিন তার হারানো সম্পদ ফিরে পেয়েছে, স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে তার সান্নিধ্য লাভের পথ খুঁজে পেয়েছে।
চরম অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও অপমানিত জিন্দেগীর গ্লানিমুক্ত হয়ে উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ জিন্দেগীর আস্বাদ ফিরে পেয়েছে। জগতের বুকে নিজেদের জন্যে এক মর্যাদাপূর্ণ আসন নির্ণয় করে নিতে সক্ষম হয়েছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও চারিত্রিক দিক থেকে একটি উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে স্থান অধিকার করে নেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। আর এই সব কিছুই সম্ভব হয়েছে নবী হযরত মুহম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বদৌলতে। কারণ, তিনিই বিশ্ববাসীকে এক উন্নত জীবনবিধান, এক উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থা ও উন্নত সভ্যতা উপহার দিয়েছেন। মুসলিমগণ এই সম্পদে সম্পদশালী হয়েই গৌরব ও মর্যাদার আসনে সমাসীন হয়েছে। কাজেই মুসলিম মিল্লাতের সকল প্রকার গৌরব ও মর্যাদার উৎসই হচ্ছেন নবী মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আমাদের ঈমান ও বিশ্বাস হলো, ইসলাম ধর্ম হিসেবে আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত এক রব্বানী হিদায়াত, সমাজ ও রাষ্ট্র হিসেবে নির্ভরস্থল একমাত্র নবী মুহম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র সত্তা।
আল্লাহপাক আমাদের সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালতের বদৌলতেই আমাদের অন্তরে তাওহীদের জীবন সঞ্চার হয়েছে। তৎপূর্বে আমরা মূলত শব্দহীন অক্ষর বিশেষের ন্যায়ই ছিলাম। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালত তা সুবিন্যস্ত করে অর্থবহ শব্দে রূপান্তরিত করেছে। রিসালতের দ্বারাই জগতে আমাদের অস্তিত্বে স্থায়িত্ব, রিসালতের মাধ্যমেই আমাদের ধর্ম ও আইন-কানুন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَأَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمْ بُرْهَانٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَ أَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُّبِينًا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَاعْتَصَمُوا بِهِ فَسَيْدُ خِلُهُمْ فِي رَحْمَةٍ مِّنْهُ وَفَضْلٍ وَيَهْدِيهِمْ إِلَيْهِ صِرَاطًا مُسْتَقِيمَانَ
হে মানুষ, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের নিকট স্পষ্ট আলো নাযিল করেছি। অতঃপর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাকে আঁকড়ে ধরেছে তিনি অবশ্যই তাদেরকে তার পক্ষ থেকে দয়া ও অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন এবং তার দিকে সরল পথ দেখাবেন।
আজ আমরা এমন এক মহীয়সী সাহাবিয়ার জীবনকথা আলোচনা করব যিনি ইসলামের প্রারম্ভলগ্নে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। ইসলামের হকের কথা শোনার সাথে সাথে তিনি আর দেরি করেননি, সাড়া দেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর ডাকে।
গৌরব ও মর্যাদার জননী
এই মহীয়সী সাহাবিয়া হচ্ছেন হযরত উম্মুল ফযল লুবাবা বিনতুল হারিস রা.। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহতারাম চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব রা. তাকে বিয়ে করেন। সুতরাং উম্মুল ফযল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন সম্মানিত চাচী। হযরত আব্বাস রা.-এর ছেলে-মেয়েরা হচ্ছেন, ফযল, আবদুল্লাহ, উবাইদুল্লাহ, মা'বাদ, কুসাম, আবদুর রহমান ও উম্মে হাবীব। তিনি সকলের গর্ভধারিণী মা। আরব কবি আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ হিলালী বলেছেন, 'উম্মুল ফাদলের গর্ভের ছয় সন্তানের মতো কোনো সন্তান আরবের কোনো মহীয়সী নারী জন্মদান করেননি।
তাঁর অনেকগুলো সহোদর, বৈপিত্রেয় ও বৈমাত্রেয় ভাই-বোন ছিলেন, যাঁদের অনেকে বিভিন্ন দিক দিয়ে ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন। যেমন মায়মূনা বিনতে হারিস যিনি লুবাবাতুস সুগরা নামে পরিচিত, প্রখ্যাত সাহাবী ও সেনানায়ক খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর গর্বিত মা। আযযা বিনতে হারিস ও হুযাইলা বিনতে হারিস। শেষোক্ত তিনজন তার বৈমাত্রের বোন। আর মাহমিয়্যা ইবনে জাযাআ আয যুবাইদী, সুলমা, আসমা ও সালামা- সবাই তার বৈপিত্রেয় ভাই-বোন।
সুতরাং দেখা গেল, তিনি উম্মুল মুমিনীন মায়মূনার আপন বোন ও সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালীদের খালা। বোন সালমা ছিলেন হযরত হামযা রা.-এর স্ত্রী এবং আসমা ছিলেন হযরত আলী রা.-এর ভাই প্রখ্যাত সেনানায়ক ও শহীদ সাহাবী হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর স্ত্রী। জাফরের শাহাদাতের পর প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. হন তার দ্বিতীয় স্বামী। হযরত আবু বকর রা.-এর ইন্তেকালের পর হযরত আলী রা. হন তার তৃতীয় স্বামী। উম্মুল ফযলের মা এদিক দিয়ে সৌভাগ্যবতী যে, তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ ঘরের সর্বোত্তম সন্তানদেরকে কন্যাদের বর হিসেবে লাভ করেন। আর এ সৌভাগ্যের ব্যাপারে অন্য কোনো নারী তার সমকক্ষ নেই।
প্রথম সারির মুসলমান
তিনি মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের প্রথম ভাগে মুসলমান হন। বর্ণিত আছে, তিনি মক্কার প্রথম মহিলা যিনি হযরত খাদীজা রা.-এর পরে ইসলামগ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেন। ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, খাদীজার পর লুবাবা বিনতুল হারিসের পূর্বে কোনো মহিলা ইসলাম গ্রহণ করেননি। এভাবেই তিনি গণ্য হন প্রথম সারির মুসলমান হিসেবে।
ধৈর্য ও প্রতিদানের প্রত্যাশা
কুরাইশরা যখন রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবায়ে কেরামগণের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানতে পারল, তখন তারা মুসলমানদের ওপর নির্যাচতেনর স্টিমরোলার চালাতে আরম্ভ করল। হযরত উম্মুল ফযল রা. সাহাবাদের এ সব কষ্টের চিত্র দেখতেন আর বুকফাটা অন্তর্জালায় দগ্ধ হতেন। বড় মর্মপীড়ায় ভুগতেন। এছাড়া যে তার আর কিছুই করার ছিল না!
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَ الْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَاءِ وَ الْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَّنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَلْ لَّنَا مِنْ لَّدُنْكَ نَصِيرًا
আর তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছ না! অথচ দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুরা বলছে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করুন এ জনপদ থেকে যার অধিবাসীরা যালিম এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নির্ধারণ করুন। আর নির্ধারণ করুন আপনার পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী।
উম্মুল ফযল রা.-এর ছেলে হযরত আবদুল্লাহর ইবনে আব্বাস রা. পরবর্তীকালে উপরোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলতেন, এ আয়াতে যে দুর্বল নারী ও শিশুদের পক্ষে যুদ্ধ করতে বলা হয়েছে, আমার মা ও আমি হলাম সেই নারী ও শিশু। হাদীস দ্বারা বোঝা যায় তারা হযরত আব্বাস রা.- এর আগে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হিজরত করতে অক্ষম ছিলেন।
মক্কার আদি পর্বের মুসলমান হলেও স্বামী হযরত আব্বাস রা.-এর মদীনায় হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত কত প্রতিকূলতার মধ্যেও মক্কার মাটি আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকেন তিনি। হযরত আব্বাস রা. অনেক দেরীতে ইসলামের ঘোষণা দেন এবং মক্কা বিজয়ের পর মদীনায় হিজরত করেন। আর তখনেই উম্মুল ফযল রা. তার সন্তানদেরসহ মদীনায় হিজরত করেন।
আকাবার বাইআতে তার স্বামীর অনন্য ভূমিকা
মদীনার ৭২ জন আনসার সাহাবী হজের মওসুমে মক্কায় গিয়ে মিনার এক গোপন শিবিরে যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মদীনায় হিজরতের আহ্বান জানাতে এবং তার হাতে বাইআত গ্রহণ করতে আসেন, ইতিহাসে এ বাইআতকে আকাবার দ্বিতীয় শপথ বলা হয়। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের আগমনের সংবাদ হযরত আব্বাস রা. পর্যন্ত পৌঁছান। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচার সকল প্রকার মতামত ও রায়ের ব্যাপারে পূর্ণ আস্থাশীল ছিলেন। গোপনে বৈঠকের সময় হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচা আব্বাস রা.-কে সঙ্গে নিয়ে সেই স্থানে পৌঁছেন যেখানে আনসাররা অপেক্ষা করছিলেন। আমরা সেই কথোপকথনের বর্ণনা সেই দলটির একজন সদস্যের ওপর ছেড়ে দিলাম। এই সদস্য হচ্ছেন হযরত কাব ইবনে মালিক রা.। তিনি বলেন, 'আমরা ঘাঁটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অপেক্ষায় বসে আছি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাশরীফ আনেন। তার সঙ্গে ছিলেন হযরত আব্বাস রা.। আব্বাস রা. এ উপলক্ষে উপস্থিত মদীনাবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, 'খাযরাজ কাওমের লোকেরা আপনাদের জানা আছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় গোত্রের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার সাথেই আছেন। শত্রুর মোকাবেলায় সর্বক্ষণ আমরা তাকে নিরাপত্তা দিয়ে আসছি। এখন তিনি আপনাদের নিকট যেতে চান। যদি আপনারা জীবন পণ করে তাকে সহায়তা করতে পারেন তাহলে খুবই ভালো কথা। অন্যথায় এখনই সাফ সাফ বলে দিন।'
তিনি তাদেরকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন, 'যদি তারা তাদের প্রতিজ্ঞা পালনে নিশ্চিত হন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে সুরক্ষাদানে সক্ষম হন, তবে তার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারেন; কিন্তু যদি তারা মনে করেন যে, তিনি তাদের সাথে যোগদানের পর চাপের মুখে তাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন কিংবা তাকে শত্রুদের নিকট সমর্পণ করবেন, তাহলে তিনি যে অবস্থায় আছেন তাকে সে অবস্থায় থাকতে দেওয়াই বাঞ্ছনীয় হবে।'
হযরত আব্বাস রা. যখন এমন স্পষ্টভাবে কথাগুলো বলছিলেন তখন তার চোখ ছিল আনসার সাহাবীদের চেহারার দিকে। তিনি তার কথার উত্তর শোনার অপেক্ষায় আছেন। এবার তিনি আরেকটি ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে বললেন, আমাকে বলুন, আপনার শত্রুদের বিপক্ষে কীভাবে যুদ্ধ করে থাকেন?
হযরত আব্বাস রা. তার অভিজ্ঞতা ও কুরাইশদের সাথে তার অবাধ সম্পর্কের কারণে এটা ভালো করেই জানেন যে, কুরাইশরা কখনো তাদের ক্ষমতা, নেতৃত্ব ও ধর্ম ছাড়তে পারে না। এদিকে ইসলাম যা কখনো বাতিলের সাথে আপোস করতে পারে না। এমতাবস্থায় মদীনাবাসী আনসাররা কি ভবিষ্যতে সংঘটিত লড়াইয়ের ভার বহন করতে পারবে? তারা কি সমরকৌশল ও যুদ্ধের ব্যাপারে অভিজ্ঞ কুরাইশদের বিরুদ্ধে নিজেদের পাল্লা ভারী রাখতে পারবে? এই বিষয়টি সামনে রেখেই তিনি আনসারদের কাছে উপর্যুক্ত প্রশ্নটি রাখেন।
এদিকে আনসাররাও হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনে যাচ্ছিলেন। আব্বাসের কথা শেষ হলে আনসারদের আলোচনা শুরু হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল হারাম রা. হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর উপর্যুক্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'আমরা ... আল্লাহর কসম! যুদ্ধবাজ জাতি। আমাদের যুদ্ধের খাবার ভক্ষণ করানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে। পূর্বপুরুষ সূত্রে বংশপরম্পরায় আমরাও তার উত্তরাধিকারী হয়েছি। আমরা তীরের সাহায্যে তীরন্দাজি করে থাকি, যতক্ষণ পর্যন্ত তীর শেষ না হয়। এরপর আমরা বর্ম দ্বারা আক্রমণ চালাতে থাকি, যতক্ষণ পর্যন্ত বর্ম ভেঙে না পড়ে। তারপর আমরা তরবারি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি এবং তরবারি দ্বারা আক্রমণ করে থাকি। এরপর আমাদের মধ্যে যে আগে মৃত্যুর মুখে আসে, মৃত্যু তাকে গ্রাস করে নেয়। অথবা পরে আমাদের শত্রু মৃত্যু শিকারে পতিত হয়।'
হযরত আব্বাস রা. এ কথা শুনে খুশি হয়ে বললেন, 'তোমাদের কাছে কি ঢাল আছে?' আনসাররা উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, আমাদের কাছে সম্পূর্ণ শরীর ঢাকার মতো ঢাল আছে।' এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আনসারদের মধ্যে ঐতিহাসিক আলোচনা হয়।
এটাই হচ্ছে দ্বিতীয় আকাবার বাইআতের সময় হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর অবস্থান। সেদিন তিনি ইসলামের সত্যের ব্যাপারে সাক্ষী অন্তরে গোপন করে রাখুন বা এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা ও পর্যালোচনা চালিয়ে যেতে থাকুন; তার এই মহা অবস্থান তো নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অন্ধকার আর উদয় হওয়া সূর্যের মতোই আলোকোজ্জ্বল ও ঝলমলে।
মদীনা মুনাওয়ারার পথে
হুদাইবিয়ার সন্ধির পূর্ব পর্যন্ত উম্মুল ফযল রা. আব্বাস রা.-এর সাথে মক্কাতেই অবস্থান করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং অন্যান্য মুসলমানরা উমরাতুল কাযা আদায় করার জন্য মক্কায় এলে এখানে তিনদিন অবস্থান করেন। এ সময়ে উম্মুল ফযলের বোন মাইমুনার বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ইতোপূর্বে যিনি আবু রুহাম ইবনে আবদুল উয্যার স্ত্রী ছিলেন। মাইমুনা রা. মুসলমান হলেও পূর্বের স্বামী ছিল শিরকের ওপর অটল। মাইমুনা রা. তার বোনের বাড়িতে থাকতেন হযরত আব্বাস রা.-এর তত্ত্বাবধানে।
এরপর সকলেই মক্কা হতে বের হয়ে যান। হযরত আব্বাস রা., হযরত উম্মুল ফযল রা. ও পরিবারের অন্যান্য সকল সদস্য মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় রাসূলুল্লাহ সা.-এর ঘরে উম্মুল ফযল রা.-এর জন্য ছিল এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান। সব সময় তিনি প্রিয় নবীজী সা.-এর ঘরে আসতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য-চাই মাইমুনা রা.-এর ঘরে থাকুন বা অন্য কোনো স্ত্রীর ঘরে-সর্বাবস্থায় সকলের দ্বার ছিল উন্মুক্ত ও মর্যাদাবাহক। সকলেই বেশ খাতির-যত্ন করতেন উম্মুল ফযল রা.-কে। এভাবে তিনি আনসারদের আঙিনায় দিন কাটাতে থাকেন। যাঁদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদীনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালোবাসে। আর মুহাজরিদের যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।
হযরত উম্মুল ফযলের সম্মান ছিল সকলের অন্তরে। তিনি সব সময় ইলম অর্জনে সচেষ্ট থাকতেন। কুরআন-সুন্নাহর অনেক কিছু তিনি শিখেছিলেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ তিনি হচ্ছেন এই উম্মতের জ্ঞানের সমুদ্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর সম্মানিত মাতা।
বদরে হযরত আব্বাস রা.-এ ভূমিকা
হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। যার ওপর ভিত্তি করে কতিপয় ইতিহাসবিদ তাকে 'পরবর্তী সময়ের ইসলাম গ্রহণকারী'দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। অথচ অন্যান্য ইতিহাসবিদ এ তথ্য দেয় যে, তিনি প্রথম যুদ্ধে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি গোপন রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাদেম হযরত আবু রাফে' বলেন, 'আমি হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর গোলাম ছিলাম। সে সময় তার ঘরের সদস্যদের মাঝেও ইসলাম প্রবেশ করে। আব্বাস মুসলমান হয়ে গেছেন। তার স্ত্রী উম্মে ফযল মুসলমান হয়েছেন। আমিও মুসলমান হয়েছি। কিন্তু আব্বাস রা. মুসলমান হওয়ার বিষয়টি গোপন রাখেন।'
হযরত আবু রাফে' রা.-এর এই বক্তব্য বদর যুদ্ধের পূর্বে হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর ইসলাম গ্রহণের ইঙ্গিত বহন করে। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের পর আব্বাস রা.-এর মক্কায় অবস্থান গ্রহণের ব্যাপারটি ছিল একটি কৌশলগত বিষয়। এতে তিনি ভালোভাবে তার অবস্থান সৃষ্টি করেন। কুরাইশরা হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর এমন অবস্থানে কখনো কি সন্দেহ না করার সুযোগ পেয়েছে? কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আব্বাস রা.-এর বিরুদ্ধে কথার বলার কোনো উপায় তাদের ছিল না। কেননা, প্রকাশ্যে তিনি এমনভাবে চলাফেরা করতেন, যা কুরাইশরা পছন্দ করত। এভাবে এক সময় বদর যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। কুরাইশরা এবার তার মনে গোপন ইচ্ছার ব্যাপারে পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. খুব ভালো করেই কুরাইশদের এমন হীন অন্যায় সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
তিনি কুরাইশের সকল প্রকার তৎপরতা ও কর্মকাণ্ডের কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। এদিকে কুরাইশরাও তাকে তাদের সাথে করে বদরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সফল হয়েছে। অথচ এ যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষে অংশ নেওয়ার পক্ষে তার বিশ্বাসও ছিল না, কোনো উদ্দেশ্যও তার ছিল না। তারপরও এ যুদ্ধ হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর জন্য একটি সফলতার বার্তা বয়ে এনেছে। যা উল্টো কুরাইশদের ধ্বংস ডেকে এনেছে।
বদরের রণাঙ্গনে উভয় পক্ষ মুখোমুখী। প্রত্যেক দলের তরবারি তাদের প্রতিপক্ষের ওপর তীব্র আক্রমনের জন্য উন্মুখ। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
إِنَّ رِجَالًا مِّنْ بَنِي هَاشِمٍ ، وَمِنْ غَيْرِ بَنِي هَاشِمٍ ، قَدْ أُخْرِجُوا كَرْهًا ، لَا حَاجَةَ لَهُمْ بِقِتَالِنَا .. فَمَنْ لَقِيَ مِنْكُمْ أَحَدَهُمْ فَلَا يَقْتُلُهُ.. وَمَنْ لَقِيَ البَخْتَرِيَّ بُن هِشَامِ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ أَسَدٍ فَلَا يَقْتُلُهُ.. وَمَنْ لَقِيَ الْعَبَّاسَ بْن عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَا يَقْتُلُهُ، فَإِنَّهُ إِنَّمَا أُخْرِجَ مُسْتَكْرَةً
বনু হাশিমের কিছু লোককে এবং বনু হাশিমের বাইরের কিছু লোককে জোর করে যুদ্ধে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের সাথে তোমাদের লড়াই করার কোনো প্রয়োজন নেই। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ তাদের মুখোমুখী হলে তোমরা তাদের হত্যা করবে না। যে ব্যক্তি আবুল বুখতারী ইবনে হিশাম ইবনে হারেস ইবনে আসাদকে পাবে, সে তাকে হত্যা করবে না। আর যে ব্যক্তি আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে পাবে, সেও তাকে হত্যা করবে না। তাদেরকে তো জবরদস্তি করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি আপন চাচা আব্বাসের কোনো বিশেষ গুণ সম্পর্কে আলোকপাত করছেন না। এমন সময়ে তা বলার অবকাশও নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যদি তার চাচা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হতেন, তাহলে তিনি এমন বলতেন না। নিজের সাহাবীদের মস্তক রণাঙ্গনে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হবে, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচার ব্যাপারে সুপারিশ করবেন! এটা হতেই পারে না!
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচা আব্বাস রা.-কে ভীষণ ভালোবাসতেন। বদর যুদ্ধে অন্যান্য কুরাইশ মুশরিকদের সাথে আব্বাস মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। ঘটনাক্রমে, আব্বাসকে শক্তভাবে বাঁধা হয়। এতে তিনি ব্যথায় কোঁকাতে থাকেন। তার সেই কষ্টের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাতে ঘুমোতে পারেননি। সাহাবায়ে কেরাম বিষয়টি জানতে পেরে আব্বাসের বাঁধন ঢিলা করে দেন। তারপর আব্বাসের কোঁকানি বন্ধ হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা জানার পর তখনই তিনি সকল বন্দীর বাঁধন ঢিলা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।'
আব্বাস সম্পদশালী ব্যক্তি হওয়ার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নিকট বন্দী অবস্থা থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য মোটা অংকের মুক্তিপণ চান। আব্বাস এত বেশি অর্থ আদায়ে অক্ষমতা প্রকাশ করে বলেন,
يَا رَسُولَ اللهِ ، إِنِّي كُنْتُ مُسْلِمًا ، وَلَكِنِ الْقَوْمَ اسْتَكْرَهُونِي
অন্তর থেকে আমি আগেই মুসলমান হয়েছিলাম। মুশরিকরা এ যুদ্ধে অংশ নিতে আমাকে বাধ্য করেছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অন্তরের অবস্থা আল্লাহ জানেন। আপনার দাবি সত্য হলে আল্লাহ তার বিনিময় দেবেন। তবে বাহ্যিক অবস্থার বিচারে আপনাকে কোনো প্রকার সুবিধা দেওয়া যাবে না। আর মুক্তিপণ আদায়ে আপনার অক্ষমতাও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, আপনি একজন ধনবান ও দানশীল ব্যক্তি। অতঃপর তিনি নিজের, ভ্রাতুষ্পুত্র আকীল ও নাওফিল ইবনে হারিসের পক্ষ থেকে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করে মুক্তি লাভ করেন এবং মক্কায় রওনা দেন।
বদরযুদ্ধে একজন আনসার সাহাবী হজরত আব্বাস রা.-কে গ্রেফতার করে নিয়ে এলেন। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমাকে তো এ লোকটি বন্দী করে নিয়ে আসেনি। আমাকে মুণ্ডিত মস্তকের একজন লোক গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছে। সুদর্শন লোকটি একটি চিত্রল ঘোড়ার পিঠে আসীন ছিল। এখন তো তাকে দেখা যাচ্ছে না। আনসার সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমিই তো তাকে বন্দী করে নিয়ে এসেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, চুপ করো, মহান আল্লাহ একজন সম্মানিত ফেরেশতা দিয়ে তোমাকে সাহায্য করেছেন।
এভাবে তিনি মুসলমানদের পক্ষ থেকে অকৃত্রিম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন। কেননা, তারা জানতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর কী হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি সম্পর্কে তারা ভালো করেই অবগতি ছিলেন,
إِنَّمَا الْعَبَّاسُ مِنْهُ أَبِي فَمَنْ اذَى الْعَبَّاسَ فَقَدْ آذَانِي
হে লোক সকল, শোনো, আব্বাস আমার কাছে পিতা সমতুল্য। যে ব্যক্তি আব্বাসকে কষ্ট দেবে সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল।
আবু রাফে রা.— যিনি হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের দাস ছিলেন ও পরবর্তী সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আলী রা.-এর প্রিয়ভাজন হিসাবে পরিণত হয়েছিলেন— বর্ণনা করেন, ‘সে সময় ইসলামের আলোয় হযরত আব্বাসের গৃহ আলোকিত হয়েছিল। হযরত আব্বাস, তার স্ত্রী উম্মুল ফযল ও আমি ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু ভয়ে আমাদের ঈমানকে গোপন রেখেছিলাম। ইসলামের শত্রুদের মৃত্যুর খবর মক্কায় পৌঁছলে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম। কিন্তু কুরাইশ ও তাদের সমর্থকরা খুবই ব্যথিত হয়েছিল। আবু লাহাব নিজে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও অন্য এক ব্যক্তিকে তার স্থলে যুদ্ধ করার জন্য ভাড়া করেছিল। ওই মুহূর্তে সে কাবার নিকটবর্তী জমজম কূপের নিকটে বসেছিল। এ সময় খবর পৌঁছল আবু সুফইয়ান মক্কায় পৌঁছেছে। সে আবু সুফইয়ানকে খবর পাঠাল যত দ্রুত সম্ভব যেন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সে এসে আবু লাহাবের পাশে বসল এবং বদরের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিল। ঘটনার বিবরণ তার ওপর বজ্রপাতের মতো আপতিত হলো এবং সে ভয়ে শিহরিত হলো।
বেচারা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব তখন বদরের বন্দি। বাড়িতে ছিলেন তার গোলাম-তীরন্দাজ আবু রাফে। আবু লাহাব ভাইপো আবু সুফইয়ানের কাছে যুদ্ধের সংবাদ শোনার সময় একটি বিস্ময়কর দৃশ্যের কথা শুনছিলেন। বলছিলেন, সাদা পোশাক পরিহিত অশ্বারোহী সৈনিকরা আমাদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। তারা কারা তা জানি না। সঙ্গে সঙ্গে আবু রাফে' উত্তর দেন, তারা ফেরেশতা। পরাজয় সংবাদের উত্তেজিত ক্রোধতপ্ত আবু লাহাব আবু রাফে' রা.-এর মন্তব্যটি সহ্য করতে না পেরে তার মুখের ওপর এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত করে। আবু রাফে' মাটিতে পড়ে যান। আর আবু লাহাব তাকে বেধড়ক মারতে থাকে অকারণে। কাছেই ছিলেন হযরত উম্মুল ফযল রা.। অহেতুক এই মারধরের দৃশ্য দেখতে না পেরে মোটা একটি লাঠি সংগ্রহ করে বসিয়ে দিলেন আবু লাহাবের মাথায়। আর মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল।
অবলা এক নারী দুর্ধর্ষ সবল এক পুরুষকে বীরদর্পে আক্রমণ করলেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিবাদী মনের পবিত্রতার জোরে এবং ইসলামের প্রতি অটুট বিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়ে তিনি এ আক্রমণ করেন। সেদিন উম্মুল ফযল রা.-এর বক্তব্য ছিল, 'আবু রাফে রা. সামান্য একজন গোলাম। তার মনিব অনুপস্থিত। তার দুর্বলতা ও অসহায়তার সুযোগ নিয়ে অকারণে তুমি তার ওপর যুলুম করলে কেন?'
হযরত উম্মুল ফযল লুবাবা বিনতুল হারিস রা. এমনই এক ঈমানী আত্মার ঝলক। তার ধর্মনিষ্ঠাও ছিল বিস্ময়কর।
ইসলামের প্রথম যুদ্ধ ছিল বদরের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কুরাইশ কাফের বাহিনী চরমভাবে পরাজিত হয়। অথচ চালাকি করে আবু লাহাব বদরের যুদ্ধে যোগদান করেনি। ধন-সম্পদ দিয়ে সে অন্যদের পাঠায়।
যুদ্ধে তার সেই সাথীরাসহ কুরাইশের বড় বড় নেতা সবাই মারা যায়। ফলে আবু লাহাব তখন সাংঘাতিকভাবে আঘাত পায়। আর তার মরণঘণ্টা এভাবেই শুরু হয়। বদরের যুদ্ধের পর সাত দিন যেতে না যেতেই আবু লাহাবের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু ছিল খুবই করুণ, হৃদয়বিদারক। সে সাংঘাতিক ধরনের ফুসকুড়ি রোগে আক্রান্ত হয়। যাকে বলা হয় সংক্রামক রোগ। এর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য পরিবারের লোকেরা সবাই তাকে ত্যাগ করে। তার শরীরে পচন ধরে। দেহ হয়ে যায় দুর্গন্ধময়। মহামারী এই রোগের আঘাতে আঘাতে আবু লাহাব একদিন মরে যায়। তার লাশ একটি ঘরে পড়ে থাকে। পঁচে দুর্গন্ধের ভয়াবহতা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দুঃসহ ছিল সেই দুর্গন্ধ। বাঁচার জন্য এলাকাবাসী দুর্গন্ধময় লাশ লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দূরে অনেক দূরে নিয়ে ফেলে দিয়ে আসে। মাটির নিচে তার লাশ পুঁতে রেখে এলাকাকে দুর্গন্ধমুক্ত করা হয়। এটাই হলো আবু লাহাবের পতন ও পরাজয়। দ্বীনের বিরোধিতা করতে গিয়ে সে এভাবে আল্লাহর অভিশপ্ত হয়। চরম লাঞ্ছনা নিয়ে সে মত্যুবরণ করে।
হযরত উম্মুল ফযল রা.-এর স্বামী হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. ছিলেন দানশীল। অনেক বড় দানশীল। তিনি পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের সম্পর্ক দৃঢ় রাখার চেষ্টা করতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ধন-সম্পদ, ত্যাগ-সাধনা কোনো বিষয়েই কৃপণতার আশ্রয় নিতেন না। আত্মীয়তা রক্ষা ও স্বজনদের মাঝে সদ্ভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি। এই বিচক্ষণতার কারণে কুরাইশদের মাঝে তিনি একটি স্বতন্ত্র আসন তৈরি করে নিতে সক্ষম হন। এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দ্বীনের দাওয়াতের কাজ আরম্ভ করেন, তখন হযরত আব্বাস রা. তাকে বহু কষ্ট-নির্যাতন থেকে রক্ষা করার প্রয়াস পান।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল ফযলসহ তার অন্য বোনদেরকে ঈমানদার বলে ঘোষণা দান করেছেন। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে মায়মূনা, উম্মুল ফযল, লুবাবা সুগরা, হুযাইলা, আযযা, আসমা ও সালমা- এই বোনদের নাম আলোচনা করা হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই সকল বোন মুমিনা বা ঈমানদার।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের কিছু কিছু ঘটনা দ্বারা জানা যায়, তিনি চাচী উম্মুল ফযলকে যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি গুরুত্বও দিতেন। চাচীও তাকে খুবই আদর করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই চাচীকে দেখার জন্যে তার গৃহে যেতেন এবং দুপুরে কিছুক্ষণ সেখানে বিশ্রাম নিতেন।
আজলাহ যায়িদ ইবনে আলী ইবনে হোসাইনের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াতলাভের পর একমাত্র উম্মুল ফযল ছাড়া অন্য কোনো মহিলার কোলে মাথা রাখেননি এবং তা রাখা তার জন্যে বৈধও ছিল না। উম্মুল ফযল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথা নিজের কোলের ওপর রেখে সাফ করে দিতেন এবং চোখে সুরমা লাগিয়ে দিতেন। একদিন তিনি যখন সুরমা লাগাচ্ছেন, তখন হঠাৎ তার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গণ্ডে পড়ে। তিনি মাথা উঁচু করে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে? উম্মুল ফযল বলেন, আল্লাহ আপনাকে মৃত্যু দান করবেন। যদি এ নেতৃত্ব ও ক্ষমতা আমাদের মধ্যে থাকে অথবা অন্যদের হাতে চলে যায় তাহলে আমাদের মধ্যে কে আপনার স্থলাভিষিক্ত হবে তা যদি বলে যেতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার পরে তোমরা হবে ক্ষমতাহীন, দুর্বল। ইমাম আহমদের বর্ণনায় জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তিম রোগ শয্যায় এ ঘটনাটি ঘটে।
জ্ঞানের সমুদ্রের মা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের মাত্র তিন বছর আগে উম্মুল ফযল রা.-এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর জন্ম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। তিনি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সম্পদ। শান ও গৌরব। বয়সের কামনা-বাসনা কিংবা শৈশবের হেয়ালিপনা তাকে স্পর্শ করেনি। সব প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে ঊষালগ্ন থেকেই ছুটে চলেছেন জ্ঞানের পথে। আলোর পথে। তিন বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সোহবতের থেকে নিজেকে উপনীত করেন স্বর্ণশিখরে। দেহ সত্তায় উদ্ভাস ঘটান হেরার দ্যুতি। আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় এ সাহাবীকে দান করেন কুরআনের তাফসীরের বিশেষ ইলম। কুরআনের নিগূঢ় রহস্যাবলি মুহূর্তেই উদ্ভাসিত হয়ে যেত তার সম্মুখে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করেন,
اللَّهُمَّ فَقِهُهُ فِي الدِّينِ وَعَلِّمُهُ التَّأْوِيلَ
হে আল্লাহ, আপনি তাকে দ্বীনে ইলমে প্রাজ্ঞতা দান করুন এবং কুরআনের ব্যাখ্যাবলি অবহিত করুন।
সত্যিই তাই হয়েছিলেন। সব সাহাবী থেকে এটা তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। বয়সের স্বল্পতা সত্ত্বেও বড় বড় সাহাবী তাকে সম্মান করতেন। বিশেষ মর্যাদা প্রদান করতেন। তাফসীর সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যায় সবাই তার শরণাপন্ন হতেন। তাফসীর শাস্ত্রের পাশাপাশি অন্য বিষয়েও তার সমান দখল ছিল। হাদীস, ফিকহ, ভাষা-সাহিত্যেও ছিল বিশেষ দক্ষতা।
সাত বছর থেকেই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেবা ও খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। অজুর প্রয়োজন হলে তিনি পানির ব্যবস্থা করতেন, নামাযে দাঁড়ালে তার পেছনে দাঁড়িয়ে ইকতিদা করতেন এবং সফরে রওনা হলে তিনি তার বাহনের পেছনে আরোহণ করে তার সফরসঙ্গী হতেন। এভাবে ছায়ার ন্যায় তিনি তাকে অনুসরণ করতেন এবং নিজের মধ্যে সর্বদা বহন করে নিয়ে বেড়াতেন একটি সজাগ অন্তঃকরণ, পরিচ্ছন্ন মস্তিষ্ক এবং আধুনিক যুগের যাবতীয় রেকর্ডিং যন্ত্রপাতি থেকে অধিক শক্তিশালী একটি স্মৃতিশক্তি।
আল্লাহপাক তার প্রিয় নবীর এ দুআ কবুল করেন এবং হাশিমী বালককে এত অধিক জ্ঞান দান করেন যে, বড় বড় জ্ঞানীদের তিনি ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হন। খলীফা উমর রা. তাকে স্বীয় সান্নিধ্যে তত্ত্বাবধানে রাখেন। তাকে গুরুত্বপূর্ণ মজলিসে বড় বড় সাহাবীদের সাথে বসার অনুমতি দিতেন। বদরী সাহাবীদের সাথেও বসার অনুমতি তাকে দেওয়া হয়। মুহাদ্দিস ইবনে আবদিল বার বলেন, উমর রা. ইবনে আব্বাসকে ভালোবাসতেন এবং তাকে সান্নিধ্য দান করতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. জ্ঞানার্জনের জন্য অক্লান্ত সাধনা ও পরিশ্রম করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি সব ধরনের পথ ও পন্থা অবলম্বন করেন। রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবদ্দশায় তিনি তার অমিয় ঝর্ণাধারা থেকে দু-টি অঞ্জলি ভরে গ্রহণ করেন এবং তার ওফাতের পর বিশিষ্ট সাহাবীদের নিকট থেকে জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে থাকেন। জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে তিনি যে কত বিনয়ী ও কষ্টসহিষ্ণু ছিলেন তার নিজের একটি বর্ণনা থেকেই তা অনুমান করা যায়। তিনি বলেন, 'আমি যখনই অবগত হয়েছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো সাহাবীর নিকট তার একটি হাদীস সংরক্ষিত আছে, আমি তার ঘরের দরজায় উপনীত হয়েছি। মধ্যাহ্নকালীন বিশ্রামের সময় উপস্থিত হলে তার দরজার সামনে চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়েছি। বাতাস ধূলাবালি উড়িয়ে আমার জামা-কাপড় ও শরীর হয়তো একাকার করে ফেলেছে। অথচ আমি সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তখনই অনুমতি দিতেন। শুধুমাত্র তাকে প্রশ্ন করার উদ্দেশ্যেই আমি এমনটি করেছি। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে আমার এ দুরবস্থা দেখে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই, আপনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন? আমাকে খবর দেননি কেন, আমি নিজেই গিয়ে দেখা করে আসতাম। বলেছি, আপনার নিকট আমারই আসা উচিত। কারণ জ্ঞান এসে গ্রহণ করার বস্তু, গিয়ে দেওয়ার বস্তু নয়। তারপর তাকে আমি হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি।'
জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে ইবনে আব্বাস ছিলেন বিনয়ী। তিনি জ্ঞানীদের উপযুক্ত কদরও করতেন। হিশাম ইবনে উরওয়া তার পিতা উরওয়াহকে ইবনে আব্বাসের জ্ঞানের গভীরতা ও তার মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'ইবনে আব্বাসের তুল্য জ্ঞানী লোক আমার নজরে পড়েনি।' তাফসীর শাস্ত্র ও অন্যান্য ইসলামী বিষয়সমূহে তার অসাধারণ পাণ্ডিত্যের মূলে ছিল প্রথমত তার রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্য লাভ ও সেবার সুযোগ। দ্বিতীয়ত তার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআ। তৃতীয়ত জ্ঞান অর্জনের প্রতি তার অপরিসীম আগ্রহ এবং অক্লান্ত চেষ্টা সাধনা।
জ্ঞান অন্বেষণে হযরত ইবনে ইবন আব্বাসের অভ্যাস, একাগ্রতা কর্মপদ্ধতি দেখে সে যুগের বড় বড় জ্ঞানী ও মনীষীরা চরম বিস্ময়বোধ করেছেন। মাসরুক ইবনুল আজদা একজন শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী। তিনি বলেন, 'আমি যখন ইবনে আব্বাসকে দেখলাম, বললাম, 'সুন্দরতম ব্যক্তি।' যখন তিনি কথা বললেন, বললাম, 'সর্বোত্তম প্রাঞ্জলভাষী' এবং যখন তিনি আলোচনা করলেন, বললাম, 'সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি।'
জ্ঞানার্জনের পর তিনি মানুষকে শিক্ষাদানের ব্রত কাঁধে তুলে নিলেন। আর তখন থেকেই তার বাড়িটি একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। যে অর্থে আজ আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটি ব্যবহার করে থাকি সে অর্থে তার বাড়িটিকে বিশ্ববিদ্যালয় বললে অত্যুক্তি হয় না। তবে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইবনে আব্বাস বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যে পার্থক্য এখানে যে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন বহু শিক্ষক আর সেখানে ছিলেন একজন শিক্ষক। তিনি ইবনে আব্বাস রা.।
হযরত উম্মুল ফযল রা. একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আপনার দেহের একটি অঙ্গ আমার ঘরে আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, স্বপ্নের তাবীর ইনশাআল্লাহ, ভালো। ফাতিমার একটি পুত্র সন্তান হবে এবং আপনি তাকে দুধ পান করাবেন। এভাবে আপনি হবেন তার তত্ত্বাধায়িকা। ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী হযরত ফাতিমা রা. হযরত হুসাইন রা.-কে জন্ম দেন এবং উম্মুল ফযল রা. তাকে দুধও পান করান।
হযরত উম্মুল ফযল রা. জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো কাটান প্রিয়নবী সা.-এর পবিত্র সান্নিধ্যে। তার চরিত্র ও জ্ঞানে নিজের জীবনকে সাজিয়ে তোলেন এবং তার কাছ থেকে বহু হাদীস বর্ণনা করেন। উম্মুল ফযল থেকে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন, আবদুল্লাহ, তাম্মাম, আনাস ইবনে মালিক, আবদুল্লাহ ইবনে হারিসা রা. প্রমুখ।
বিদায় হজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে উম্মুল ফযলও হজ করেন। আরাফাতে অবস্থানের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা অবস্থায় আছেন কিনা, সে ব্যাপারে সাহাবীরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলেন। এক পর্যায়ে তারা তাদের সে দ্বিধার কথা উম্মুল ফযলের নিকট প্রকাশ করেন। উম্মুল ফযল বিষয়টি নিশ্চিত হবার জন্য এক পেয়ালা দুধ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে পেশ করেন এবং তিনি তা পান করেন। এভাবে তাদের সব দ্বিধা-সংশয় দূর হয়ে যায়। এ ব্যাপারে বুখারী শরীফে এসেছে, 'উম্মুল ফযল বিনতে হারিস রা. সূত্রে বর্ণনা করেন যে, কিছু সংখ্যক লোক আরাফাতের দিনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সওম পালন সম্পর্কে তার কাছে সন্দেহ প্রকাশ করে। তাদের কেউ বলল, তিনি সওম পালন করেছেন। আর কেউ বলল, না, তিনি করেননি। এতে উম্মুল ফযল রা. এক পেয়ালা দুধ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পাঠিয়ে দিলেন এবং তিনি তা পান করে নিলেন। এ সময় তিনি উটের পিঠে (আরাফাতে) উকূফ অবস্থায় ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালে উম্মুল ফযল রা. শোকে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। অন্তর ফেটে চৌচির হয়ে যায়; কিন্তু তিনি সবর করেন এবং এর বিনিময়ে সাওয়াবের আশা রাখেন। রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পর তিনি নামায, রোযা ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগীতে দিনাতিপাত করতে থাকেন। ইলমের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করেন এবং অধিকহারে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকার ব্যাপারে সচেষ্ট হন।
হযরত আবু বকর, উমর ও উসমান রা. তাকে খুব সম্মান করতেন। রাসূলের কাছে তার মর্যাদা সম্পর্কে তারা সকলে ছিলেন অবগত। তাই যত্ন ও সম্মানের কোনো ত্রুটি করতেন না। কারণ তিনি অগ্রবর্তী মুসলিমদের মধ্যে অন্যতম। দ্বীনের তরে তার ত্যাগ অবিস্মরণীয়।
অন্তিম মুহূর্ত
জীবনের দীর্ঘ একটি সময় পাড়ি দেওয়ার পর এক সময় তিনিও শায়িত হন চির নিদ্রার বিছানায়। আর রেখে যান গৌরবদীপ্ত বর্ণাঢ্য জীবন। বিশেষ করে উম্মতের জ্ঞানের সমুদ্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. তো আছেনই। কিয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লায় তার ইলম ও আমলই উম্মুল ফযল রা.-এর মর্যাদা শুধু বাড়াতে থাকবে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মানুষ যখন মারা যায় তখন তার সব আমলের পথ রুদ্ধ হয়ে যায় তিনটি বস্তু ছাড়া। তা হচ্ছে, সাদাকায়ে জারিয়া—এমন ইলম যা অন্যদের উপকৃত করে এবং এমন সৎকর্মশীল সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৫৮০. সূরা নিসা, ৪:১৭৪-১৭৫।
৫৮১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৩১৪; আনসাবুল আশরাফ, ১/৪৪১।
৫৮২. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৭৭।
৫৮৩. উসুদুল গাবাহ, ৫/৫৩৯।
৫৮৪. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৭৮
৫৮৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/৩১৫।
৫৮৬. সূরা নিসা, ৪:৭৫।
৫৮৭. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৩১৫।
৫৮৮. সূরা হাশর, ৫৯:৯।
৫৮৯. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৪৫৮-৪৫৯।
৫৯০. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৪/১২।
৫৯১. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৭৮।
৫৯২. উসুদুল গাবাহ, ৫/৫৩৯।
৫৯৩. হায়াতুস সাহাবাহ, ২/৩৩৭; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৭৮।
৫৯৪. সহীহ, বুখারী, ১৪৭।
৫৯৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/৩১৫।
৫৯৬. সহীহ, বুখারী, ১৯৮৮; সহীহ, মুসলিম, ১১০ ও ১১২৩।
৫৯৭. হযরত আবু হোরায়রা রা. হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসায়ী।
📄 খানসা রা.
একগাছি ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশির বিন্দুতেও সূর্য কিরণ পতিত হয়। ইসলামের আলোও তেমন আল্লাহর প্রিয়ভাজনদের মধ্যে প্রতিবিম্বিত হয়ে ঔজ্জ্বল্য সৃষ্টি করে। এমনই উত্তম দৃষ্টান্ত ছিলেন হযরত খানসা রা.।
মক্কায় যখন নবুওয়াতের সূর্য উদয় হয় এবং তার কিরণে সারা বিশ্ব আলোকিত হয়ে উঠে, তখন খানসা রা.-এর দুই চোখ বিশ্বাসের দীপ্তিতে ঝলমল করে ওঠে। তিনি নিজ গোত্রের কিছু লোকের সাথে মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে ছুটে যান এবং ইসলামের ঘোষণা দেন। এ সাক্ষাতে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীর্ঘক্ষণ ধৈর্যসহকারে তার আবৃত্তি শোনেন এবং তার ভাষার শুদ্ধতা ও শিল্পরূপ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে আরও শোনার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তাঁর আসল নাম হলো, তুমাদির বিনতে আমর ইবনে শারীদ। তিনি ছিলেন কায়স গোত্রের সুলায়ম খান্দানের সন্তান। খানসা রা. কবি ছিলেন। তবে তিনি কাব্যজীবনের প্রথম পর্বে মাঝে মধ্যে দুই-চারটি বয়েত (শ্লোক) রচনা করতেন। আরবের বিখ্যাত আসাদ গোত্রের সাথে তার গোত্রের যে যুদ্ধ হয়, তাতে তার আপন ভাই মুআবিয়া নিহত হন এবং সৎ ভাই সাখর প্রতিপক্ষের আবু সাওর আল আসাদী নামের এক ব্যক্তির নিক্ষিপ্ত নিযায় মারাত্মকভাবে আহত হন। প্রায় এক বছর যাবত সীমাহীন কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করে ভাইকে সুস্থকরে তোলার চেষ্টা করেন; কিন্তু তার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। ক্ষত খুব মারাত্মক ছিল। প্রিয় বোনকে দুখের সাগরে ভাসিয়ে তিনি একদিন ইহলোক ত্যাগ করেন।
খানসা রা. তার পরলোকগত দু-টি ভাইকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। বিশেষত সাখরের জ্ঞান, বুদ্ধি, ধৈর্য, বীরত্ব, দানশীলতা, সুদর্শন চেহেরা ইত্যাদি কারণে তার স্থান ছিল খানসার রা. অন্তরের অতি গভীরে। একারণে তার মৃত্যুতে তিনি সীমাহীন দুঃখ পান। আর সেদিন থেকেই তিনি সাখরের স্মরণে অতুলনীয় সব মরসিয়া (শোকগাঁথা) রচনা করতে থাকেন। সাখরের স্মরণে রচিত মরসিয়ায় হযরত খানসা রা. এমন সব অন্তর গলানো শব্দ নিজের তীব্র ব্যথা-বেদনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন যা শুনে বা পাঠ করে মানুষ অস্থির না হয়ে পারে না। যে কোনো লোকের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
أعيني جودا ولا تجهدا الاتبكيان لصخر الندى ألا تبكيان الجريء الجميل ألا تبكيان الفتى السيدا رفيع العماد طويل النجاد سـاد عـشــيــرتـــه أمــــــردا إذا القوم مدوا بأيديهم إلى المجد مد إلـيـه يـــــدا إذا القوم مدوا بأيديهم إلى المجـد مـن إلـيـه يــــدا يحمله القوم ما عالهم وإن كان أصغر هم مولدا وإن ذكر المجد ألفيته تأزر بالمجد ثم ارتدى
হে মোর চক্ষদ্বয়, বদান্যতা অবলম্বন কর, কার্পণ্য করো না। সাখর এর মতো দানশীলের জন্য তোমাদের কি কান্না আসে না? তোমরা কি রোদন করো না তার জন্য, যে ছিল সাহসী এবং সুন্দর।
যে ছিল যুব নেতা, তোমরা কি তার জন্য কাঁদবে না? যার বংশ মর্যাদা ছিল সুউচ্চ আর সে নিজেও ছিল দীর্ঘকায়। যখন তার দাড়ি-গোফ গজায়নি, তখনই সে গোত্রের নেতা হয়েছিল।
জাতি যখন মর্যাদায় দিকে হাত প্রসারিত করে, তখন সেও হাত বাড়ায়। সে এমন মর্যাদায় পৌঁছে, যা ছিল অন্যদের হাতে অনেক ঊর্ধ্বে। এমন সৌভাগ্য নিয়েই সে তিরোহিত হয়।
তুমি দেখবে, শ্রেষ্ঠত্ব তার ঘরের পথ দেখায়। প্রশংসিত হওয়াতেই সে মনে করত সবচেয়ে বড় মর্যাদা। ইজ্জত-শরাফত আলোচিত হলে তুমি দেখবে যে, ইজ্জতের চাদরে সে আবৃত।
তিনি আরও বলতেন.
يذكرني طلوع الشمس صخرا وأذكره لكل غروب شمس فلولا كثرة الباكين حولي على إخوانهم لقتلت نفسي
প্রতিদিনের সূর্যোদয় আমাকে সাখরের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। আর আমি তাকে স্মরণ করি প্রতিটি সূর্যাস্তের সময়। যদি আমার চারপাশে নিজ নিজ মৃতদের জন্য প্রচুর বিলাপকারী না থাকত, তবে আমি আত্মহত্যা করতাম।
এসব মর্সিয়া বা শোকগাঁথার জন্যই তিনি গোটা আরবে খ্যাত হন। সব রকম কবিতা বিশেষ করে মর্সিয়া বা শোকগাঁথা রচনায় হযরত খানসা ছিলেন অনন্য। উসদুল গাবাহ গ্রন্থের রচয়িতা লেখেন,
اجمع أهل العلم بالشعر إنه لم تكن امرأة قبلها ولا بعدها أشعر منها
সকল কাব্য রসিক এ ব্যাপারে একমত যে, খানসার আগে বা পরে তার চেয়ে বড় মহিলা কবি আর কেউ ছিল না।
আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থে বলা হয়েছে, কবি জারীরকে (উমাইয়া যুগের প্রসিদ্ধ কবি মৃত্যু ১১০ হিজরী) জিজ্ঞেস করা হয়, সবচেয়ে বড় কবি কে? জবাবে বলেন, খানসা না হলে আমি হতাম সবচেয়ে বড় কবি। আরবের একজন বড় কবি বাশার বলেন, নারীদের কবিতা বিশেষভাবে দেখলে তাতে কোনো না কোনো ত্রুটি বা দুর্বলতা অবশ্যই পাওয়া যায়। কেউ জিজ্ঞেস করেন, খানসার কবিতারও কি এ দশা? জবাবে তিনি বলেন, তিনি তো পুরুষদের চেয়েও অগ্রসর। আরবের সকল কবি লায়লা আখিলিয়াকে মহিলা কবিদের শিরোমণি বলে স্বীকার করেন, কিন্তু তারাও খানসাকে ব্যতিক্রম বলে মনে করেন।
জাহেলী যুগের সাধারণ নিয়ম ছিল যে, আরবের লোকেরা নানা স্থানে আসর জমিয়ে বসত। তাদের এসব আসরের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় এবং কাব্যচর্চা। এসব কবিতা প্রতিযোগিতায় নারী-পুরুষ সমভাবে অংশ গ্রহণ করত। এ আসর শুরু হতো রবিউল আউয়াল মাসে। অর্থাৎ, বসন্তকালের শুরুতে। আরবের দূর-দূরান্ত থেকে কাজ-কর্ম ছেড়ে লোকেরা ছুটে আসত এসব আসরে অংশ গ্রহণ করার জন্য। রবিউল আউয়াল এর শুরুতে এই মেলা জমে উঠত প্রথমে দুমাতুল জ্বন্দলে, সেখান থেকে আসত হিজর-এর বাজারে, পরে ওম্মান এবং হাযরা মাওত এ গমন করত। সেখান থেকেই ইয়ামান-এর সানআয়। এসব মেলা কোথাও দশ দিন, কোথাও বিশ দিন স্থায়ী হতো। সারা দেশে মেলা শেষে জিলকদ মাসে সর্বশেষ মেলা বসত ওকায বজারে। পবিত্র হজকে সামনে রেখে মক্কার অদূরে অনুষ্ঠিত এ শেষ মেলায় আরবের সকল সর্দার-গোত্রপতিরা অবশ্যই যোগ দিত। কোনো কারণে কোনো গোত্রপতি যোগ দিতে না পারলে তিনি প্রতিনিধি পাঠাতেন। এই শেষ মেলায় আরবদের সব বিষয় চূড়ান্ত করা হতো। অর্থাৎ, এখানেই বিভিন্ন গোত্রের সরদার নিয়োগ করা হতো, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা হতো, নিজেদের মধ্যকার রক্তপাত এবং যুদ্ধ-বিগ্রহের মীমাংসা হতো। ওকাযের এই মেলায় কুরাইশ বংশের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল সবচেয়ে বেশি। সকল বিষয় নিষ্পত্তি হওয়ার পর প্রত্যেক কবীলার কবিরা নিজ নিজ কবিতা শোনাতেন। এসব কবিতায় থাকত স্ব-স্ব গোত্রের বাহাদুরী, উদারাতা-দানশীলতা, অতিথি পরায়ণতা, পূর্ব পুরুষদের গুরুত্বপূর্ণ কীর্তিগাথা, শিকার এবং রক্তপাতের বর্ণনা। এখানেই কবি এবং বক্তার মর্যাদা নির্ণীত হতো।
মহিলা কবি খানসাও এসব আসর-মেলায় যোগ দিতেন। এসব আসরে পঠিত তার মর্সিয়া কাব্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলে স্বীকৃতি লাভ করত। তিনি উটের পিঠে আরোহণ করে মেলায় উপস্থিত হলে কবিরা এসে তার চারপাশে জড়ো হতো কবিতা শোনার জন্য। এরপর তিনি মর্সিয়া বা শোকগাঁথা শোনাতেন। তার তাঁবুর সামনে একটা পতাকায় লেখা থাকত, العرب أرثى 'আরবের সবচেয়ে বড় শোকগাঁথা রচয়িতা।' এমন গৌরব অন্য কোনো কবির ভাগ্য জুটেনি।
হযরত খানসা রা. জাহিলী জীবন থেকে ইসলামী জীবনে উত্তরণের পর আচার-আচরণ, চিন্তা ও বিশ্বাসে একজন খাঁটি মুসলমানে পরিণত হন। নিরন্তর জিহাদই যে একজন সত্যিকার মুসলমানের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য, কথাটি তিনি অনুধাবনে সক্ষম হন। আর এ জন্য তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি কুরবানী করতে কুণ্ঠিত হননি।
হিজরী ষোলো সনে খলীফা উমর রা.-এর খিলাফতকালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক কাদেসিয়া যুদ্ধ। এ যুদ্ধে বিশাল পারস্য বাহিনী অত্যন্ত সাহস ও দক্ষতার সাথে মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলা করে। উভয়পক্ষের অসংখ্য সৈনিক হতাহত হয়। হযরত খানসা রা. তার চার ছেলেকে সঙ্গে করে এ যুদ্ধে যোগ দেন। চূড়ান্ত যুদ্ধের আগের রাতে তিনি চার ছেলেকে একত্র তাদের সামনে উৎসাহ ও উদ্দীপনামূলক যে ভাষণটি দান করেন ইতিহাসে তা সংরক্ষিত হয়েছে। ভাষণে তিনি বলেন, 'আমার প্রিয় সন্তানরা, তোমরা আনুগত্য সহকারে ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং হিজরত করেছ স্বেচ্ছায়। সেই আল্লাহর নামের কসম, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। নিশ্চয়ই তোমরা একজন পুরুষেরই সন্তান, যেমন তোমরা একজন নারীর সন্তান। আমি তোমাদের পিতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, তোমাদের মাতৃকুলকে লজ্জায় ফেলিনি এবং তোমাদের বংশ ও মান-মর্যাদায় কোনো রকম কলঙ্ক লেপনও করিনি। তোমরা জানো, কাফেরদের বিপক্ষে জিহাদে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য কত বড় সাওয়াব নির্ধারণ করে রেখেছেন। তোমরা এ কথাটি ভালো রকম জেনে নাও যে, ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের চেয়ে পরকালের অনন্ত জীবন উত্তম। মহামহিম আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধারণ করো এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন করো। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সামর্থ হতে পার।
আগামীকাল প্রত্যুষে তোমরা শত্রু নিধনে দূরদর্শিতার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার সাহায্য কামনা করবে।
মায়ের অনুগত ছেলেরা মনোযোগ দিয়ে মায়ের কথা শুনল। রাত কেটে গেল। প্রত্যুষে তারা একসাথে আরবী কবিতার কিছু পংক্তি আওড়াতে আওড়াতে রণক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে গেল। এক পর্যায়ে তারা চূড়ান্ত রকমের বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে সকলে শাহাদাত বরণ করে। শাহাদাতের খবর মা খানসা রা. শোনার পর যে বাক্যটি উচ্চারণ করেন তা একটু দেখার বিষয়। তিনি উচ্চারণ করেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাদেরকে শাহাদাত দান করে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর আমি আমার রবের নিকট আশা করি, তিনি আখিরাতে তার অনন্ত রহমতের ছায়াতলে তাদের সাথে আমাকে একত্র করবেন'।
যে মহিলা জাহিলী যুগে এক সৎ ভাইয়ের মৃত্যুতে সারা জীবন মরসিয়া লিখে ও শোক প্রকাশ করে গোটা আরবে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন, তিনিই এভাবে একসাথে চার ছেলের শাহাদাতের খবর শুনে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর হযরত খানসা রা. মাঝে মধ্যে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে যেতেন। তিনি তৎকালীন আরবের প্রথা অনুযায়ী শোকের প্রতীক হিসেবে মাথায় একটি কালো কাপড় বেঁধে রাখতেন। একবার হযরত আয়েশা রা. তাকে বললেন, এভাবে শোকের প্রতীক ধারণ করা ইসলামে নিষেধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পরে আমিও এ ধরনের কোনো শোকের প্রতীক ধারণ করিনি। খানসা রা. বললেন, নিষেধ, একথা আমার জানা ছিল না। তবে আমার এ প্রতীক ধারণ করার একটা বিশেষ কারণ আছে। আয়েশা রা. কারণটি জানতে চাইলেন।
খানসা রা. বললেন, আমার পিতা যার সাথে আমার বিয়ে দিয়েছিলেন, সে ছিল তার গোত্রের এক নেতা। তবে ভীষণ উড়নচণ্ডি মানুষ ছিল। তার ও আমার সকল অর্থ-সম্পদ জুয়া খেলে উড়িয়ে দেয়। আমরা যখন একেবারে সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়লাম, তখন আমার ভাই সাখর তার সব অর্থ-সম্পদ সমান ভাগ করে ভালো ভাগটি আমাকে দেয়। আমার স্বামী কিছুদিনের মধ্যে তাও উড়িয়ে ফেলে। সাখর আমার দুরবস্থা দেখে দুঃখ প্রকাশ করে এবং আবার তার সকল সম্পদ সমান দুইভাগ করে ভালো ভাগটি আমাকে বেছে নিতে বলে। তার স্ত্রী তখন বলে ওঠে, 'এর আগে একবার খানসাকে তোমার সম্পদের অর্ধেক দিয়েছ, তাও ভালো ভাগটি, এখনো আবার ভালো ভাগটি বেছে নিতে বলছ। তা এভাবে আর কতকাল চলবে? তার স্বামীর অবস্থা তো সেই পূর্বের মতোই আছে। সে জুয়া খেলেই সব শেষ করে ফেলবে।' সাখর তখন স্ত্রীকে একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনাল:
وَالله لا أمنحها شرارها وهي حصان قد كفتني عارها ولو هلكت مزقت خمارها واتخذت من شعر صدارها
আল্লাহর কসম, আমি তাকে আমার সম্পদের নিকৃষ্ট অংশ দেব না। সে একজন সতী-সাধ্বী নারী, আমার জন্য হেয় ও লাঞ্ছনা যথেষ্ট। আমি মারা গেলে সে তার ওড়না আমার শোকে ফেঁড়ে ফেলবে এবং কেশ দিয়ে শোকের প্রতীক ফিতা বানিয়ে নিবে।
কাদেসিয়া যুদ্ধের প্রায় সাত বৎসর পর ২৪ হিজরীতে হযরত খানসা ইন্তেকাল করেন। বর্ণনামতে, মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের শাসনকালে কোনো বিজন প্রান্তরে তিনি ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৫৯৮. উসুদুল গাবাহ, ৫/৪৪১; আল ইসাবাহ, ৪/৫৫০।
৫৯৯. আল ইসাবাহ, ৮/১১২।
৬০০. সূরা আল-ইমরান, ৩:২০০।
৬০১. আল ইসাবাহ, ৪/২৮৮।
৬০২. আল ইসতিআব, ৪/২৯৬; আল ইসাবাহ, ৪/২৮৮।
৬০৩. উসুদুল গাবাহ, ৫/৪৪২; জামহারাতুল খুতাবিল আরাব, ১/২৩১।
৬০৪. আল ইসাবাহ, ৮/১১২।
📄 উম্মে মা‘বাদ আল খাযাইয়া রা.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের মদীনায় হিজরতের অনুমতি দিলেন। তারা দ্রুত মদীনায় হিজরত করতে লাগলেন। ইতোপূর্বে আমরা জেনেছি, আবু সালামার পথ ধরে লোকেরা একের পর এক মদীনায় হিজরত করতে লাগল। এক পর্যায়ে মক্কাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর রা. এবং আলী রা. ব্যাতীত অন্য কোনো মুসলিম অবশিষ্ট রইল না। আবু বকর রা. ও আলী রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশেই মক্কায় রয়ে গিয়েছিলেন। আরও কিছু মুসলিম যাদের কুরাইশরা বন্দী করে রেখেছিল, তারা বাধ্য হয়েই মক্কায় অবস্থান করছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের জন্য প্রস্তুত হয়ে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় ছিলেন। আবু বকর রা.-ও প্রস্তুত ছিলেন।
মুশরিকরা যখন দেখল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথীগণ বের হয়ে যাচ্ছেন এবং সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদ নিয়ে মদীনায় পাড়ি জমাচ্ছেন তখন তারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে নিল, মুসলিমগণ অচিরেই মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবেন। তারা জানত যে, মদীনা সুরক্ষিত একটি দেশ এবং তার অধিবাসীরা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। অচিরেই মদীনায় মুসলিমগণ শক্তিশালী হয়ে যাবে। তাই তারা আশঙ্কা করল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও মদীনায় চলে যাবেন। সুতরাং বিষয়টি তাদের কাছে খুব বড় হয়ে দেখা দিল। তারা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দারুন নাদওয়ায় একত্র হলো। তাদের বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ লোকদের কেউ অনুপস্থিত রইল না। তাদের বন্ধু ও মুরব্বী ইবলীসও একজন নাজদী শাইখের বেশ ধরে এবং শরীরে লম্বা চাদর জড়িয়ে বৈঠকে যথাসময়ে উপস্থিত হলো। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে পরামর্শ শুরু করল। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মত প্রকাশ করতে লাগল; কিন্তু ইবলীস কোনো রায়কেই পছন্দ করছিল না। পরিশেষে আবু জাহেল বলল, আমি মনে করি, প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী যুবককে আমরা বেছে নেব। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে ধারালো তলোয়ার থাকবে। তারা সকলে মিলে এক সাথে এক আঘাতেই মুহাম্মাদকে হত্যা করে ফেলবে। এতে সকল গোত্রের মধ্যে তার রক্ত ভাগ হয়ে যাবে। তারপর আবদে মানাফ গোত্রের (মুহাম্মাদের গোত্রের) লোকেরা এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তাদের পক্ষে সকল গোত্রের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করা ও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। আর দিয়্যত দেওয়ার প্রয়োজন হলে আমরা সকলে মিলেই তা পরিশোধ করে দিব।
এই প্রস্তাব শুনে শয়তান বলল, আল্লাহর শপথ! এটিই হচ্ছে সঠিক প্রস্তাব। সুতরাং তারা সকলে এই প্রস্তাবের উপরেই একমত হয়ে মজলিস ত্যাগ করল। ও দিকে জিবরাঈল ফেরেশতা আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে ওহীর মাধ্যমে এই ষড়যন্ত্রের কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিলেন এবং সেই রাত্রে তাকে নিজ বিছানায় শয়ন করতে নিষেধ করলেন। পরের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় চেহারা মুবারক আবৃত করে দিবসের মধ্যভাগে আবু বকরের বাড়িতে উপস্থিত হলেন। অথচ তিনি এ রকম সময়ে ইতোপূর্বে কখনোই আবু বকরের বাড়িতে আসতেন না। তিনি সেখানে গিয়ে বললেন, তোমার কাছে যারা আছে তাদের সকলকে বের করে দাও। আবু বকর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এরা তো আপনারই পরিবার। তিনি তখন বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন। আবু বকর তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমিও আপনার সাথে যেতে চাই। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাই হবে। আবু বকর বললেন, আমার মা-বাপ আপনার জন্য কুরবান হোক! এই দু-টি বাহনের যে কোনো একটি আপনি গ্রহণ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- হ্যাঁ, তবে মূল্য পরিশোধ করেই তা গ্রহণ করব। আলী রা.কে সেই রাত্রে তার বিছানায় ঘুমাতে বললেন।
ওদিকে সন্ধ্যা নেমে আসতেই কুরাইশদের নির্বাচিত যুবকেরা একত্র হলো। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরের দরজায় পাহারা দিতে লাগল এবং তিনি কখন ঘরে প্রবেশ করে নিদ্রা যাবেন সেই সময়ের অপেক্ষা করতে লাগল। তারা পরস্পর পরামর্শ করতে লাগল যে, কোন বদনসীব যুবক সর্বাগ্রে আক্রমণ করার ঘৃণিত কাজটি সম্পন্ন করবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে এক মুষ্ঠি মাটি হাতে নিয়ে কাফেরদের মাথায় নিক্ষেপ করতে লাগলেন। তারা তাকে দেখতেই পায়নি। তিনি মাটি নিক্ষেপ করছিলেন আর কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করছিলেন,
وَجَعَلْنَا مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ سَدًّا وَ مِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَأَغْشَيْتُهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ
এবং আমি তাদের সামনে ও পিছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি, অতঃপর তাদেরকে আবৃত করে দিয়েছি, ফলে তারা দেখে না।
তিনি আবু বকরের বাড়ির দিকে গেলেন। তারা উভয়েই রাতের অন্ধকারে বের হয়ে পড়লেন। তারা উভয়ে বের হয়ে যাওয়ার পর এক লোক এসে দেখল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরের দরজায় লোকেরা অপেক্ষা করছে। সে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কীসের অপেক্ষা করছ? তারা বলল, আমরা মুহাম্মাদের অপেক্ষা করছি। সে বলল, তোমরা ব্যর্থ হয়েছ ও তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হওয়ার নয়। আল্লাহর শপথ! সে তোমাদের পাশ দিয়েই বের হয়ে গেছে। সে তোমাদের মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে চলে গেছে। তারা দাঁড়িয়ে নিজেদের মাথা হতে মাটি ঝেড়ে ফেলতে লাগল। সকাল হলে আলী রা. ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন। তারা তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।
অতঃপর তিনি এবং আবু বকর রা. গারে সাওরের কাছে গিয়ে তাতে প্রবেশ করলেন। প্রবেশ করার পর গুহার মুখে মাকড়সা জাল বুনে ফেলল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রা. মদীনার রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পূর্ব হতেই আব্দুল্লা ইবনে উরাইকীত লাইসীকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিযুক্ত করে রেখেছিলেন। সে মদীনার রাস্তা সম্পর্কে খুব পারদর্শী ছিল এবং সে তার গোত্রের ধর্মের ওপরই ছিল। সে ছিল একজন বিশ্বস্ত লোক। তাই তার কাছে তাদের বাহন দুটি সোপর্দ করলেন এবং তিন দিন পর গারে সাওরের নিকট আসতে বললেন।
ওইদিকে কুরাইশরা তাদের সন্ধানে কোনো প্রকার অলসতা করল না। 'কাফা' তথা পদচিহ্ন দেখে যারা পথচারীর পরিচয় ও গতিপথ জানতে পারে তারা এমন লোককে সাথে নিয়েও অনুসন্ধান চালাল। অনুসন্ধান করতে করতে তারা একদম গুহার দরজায় এসে দাঁড়াল।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, আবু বকর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, তাদের কেউ যদি তার দৃষ্টি একটু নীচু করে তাহলেই আমাদের দেখে ফেলবে। এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে আবু বকর, চুপ থাক। সেই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? যাদের তৃতীয়জন হচ্ছেন আল্লাহ। তুমি চিন্তা করো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। আবু বকর এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মাথার ওপরে কাফেরদের কথা শুনছিলেন; কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অন্ধ করে দিলেন। আমের বিন ফুহায়রা আবু বকরের ছাগল চরাত। আবু বকর ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে মক্কায় যা বলা হতো সে তা শ্রবণ করত এবং গুহায় এসে তাদের কাছে সেই খবর পৌঁছে দিত। কিন্তু শেষ রাতে সে মক্কায় গিয়ে মক্কাবাসীদের সাথেই রাত্রি যাপন করত এবং সকালে তাদের সাথেই ঘর থেকে বের হতো।
তারা গুহায় তিন দিন অবস্থান করলেন। কুরাইশদের অনুসন্ধানের আগুন যখন নিভে গেল তখন আব্দুল্লাহ্ ইবনে উরাইকীত বাহন দু-টি নিয়ে গুহার নিকট এসে উপস্থিত হলো। তারা মদীনার পথে যাত্রা শুরু করলেন। আমের ইবনে ফুহায়রা আবু বকরের পিছনে আরোহণ করলেন। পথপ্রদর্শক ছিল তাদের সামনে। আল্লাহর চোখ তাদেরকে পাহারা দিচ্ছিল, তার সাহায্য তাদের সঙ্গী ছিল এবং আল্লাহর রহমত ও দয়ার ছায়ায় নবীর কাফেলা মদীনার পথে অগ্রসর হতে লাগল।
মক্কার মুশরিকরা যখন নিরাশ হলো তখন তারা আবু বকর ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গ্রেপ্তারের বিনিময়ে বিরাট পুরস্কারের ঘোষণা দিল। লোকেরা পুরস্কারের আশায় তাদের অনুসন্ধানে কঠোর পরিশ্রম করল; কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছাই বিজয়ী হবে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাফেলা যখন কুদাইদের ওপর দিয়ে বনী মুদলাজ গোত্রের বস্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন বস্তির একজন লোক তাদেরকে দেখে ফেলে। সে সকলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আমি এই মাত্র সাগরের তীর বেয়ে একটি কাফেলাকে অতিক্রম করতে দেখেছি। আমার মনে হয় মুহাম্মাদ এবং তার সাথীরা এই কাফেলায় রয়েছে। কথাটি শুনেই সুরাকা বিন মালেক বুঝে ফেলল এবং নিজেই সেই পুরস্কারটি অর্জন করতে চাইল। অতীতে এ রকম অনেক পুরস্কারই সে পেয়েছে। সে অন্যদের থেকে বিষয়টি গোপন রাখার মানসে বলতে লাগল, তোমার এই কথা বাদ দাও তো, তারা হচ্ছে অমুক এবং অমুক। তারা তাদের প্রয়োজনে বের হয়েছে। এই বলে সে সামান্য সময় অবস্থান করল। অতঃপর সে তার তাঁবুতে প্রবেশ করে খাদেমকে বলল, তাঁবুর পিছন দিয়ে ঘোড়াটি নিয়ে বের হও। টিলার পিছনে একটু পরেই আমি তোমার সাথে মিলিত হবো। অতঃপর সে বর্শা হাতে নিয়ে বর্শার উপরের অংশ মাটির সাথে লাগিয়ে তা দিয়ে দাগ টানতে টানতে অগ্রসর হতে লাগল। ঘোড়ার নিকট পৌঁছে তাতে লাফ দিয়ে আরোহণ করল এবং দ্রুত গতিতে চলতে লাগল। দ্রুত গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে সে একদম তাদের কাছে চলে গেল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুরআন তিলাওয়াত শুনতে পেল। তিনি ডানে বামে তাকাচ্ছিলেন না। আর আবু বকর রা. খুব বেশি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। আবু বকর তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই তো সুরাকা আমাদের কাছে এসে গেছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। তার ঘোড়ার সামনে পা দু-টি মাটিতে দেবে গেল। সুরাকা বলল, আমি অবশ্যই জানি, তোমাদের বদ দুআর কারণেই এমনটি হয়েছে। আল্লাহর নিকট আমার জন্য দুআ কর। আমি অঙ্গীকার করছি যে, যারা তোমাদের সন্ধানে বের হয়েছে আমি তাদেরকে ফিরিয়ে দেব।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করলেন। ঘোড়ার পা উঠে গেল। এবার সুরাকা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একটি পত্র লিখে দেওয়ার আবেদন করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশে আবু বকর রা. এক খণ্ড চামড়ার ওপর (নিরাপত্তা প্রদান সম্পর্কে) কিছু লিখে দিলেন। পত্রটি মক্কা বিজয়ের দিন পর্যন্ত তার সাথেই ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন সুরাকা পত্রটি নিয়ে আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করলেন এবং বললেন, আজ ওয়াদা-অঙ্গীকার পূর্ণ করার দিন, আজ উত্তম আচরণের দিন। সুরাকা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকরের জন্য পাথেয় এবং বাহন পেশ করলে তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তারা বললেন, আমাদের তালাশে যারা বের হয়েছে তুমি শুধু তাদেরকে দূরে রাখ এবং তাদের কাছে আমাদের খবর গোপন রাখ। সে বলল, অবশ্যই তা করব। সে ফেরত গিয়ে দেখল অনেকেই তাদের সন্ধান করছে। সুরাকা তাদেরকে বলতে লাগল, আমি তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট খবর নিয়ে এসেছি। তারা এই দিকে নয়। সুরাকা দিনের প্রথমভাগে রাসূলের শত্রু ছিল। আর দিবসের শেষভাগে তার বন্ধু এবং রক্ষকে পরিণত হলো।
তারা চলতে লাগলেন। চলার পথে উম্মে মা'বাদের তাঁবুর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। উম্মে মা'বাদ ছিলেন একজন সদাচরণকারী মহিলা— তিনিই আমাদের আজকের আলোচিত অতিথি।
তাঁবুর পাশ দিয়ে অতিক্রমকারী লোকদের তিনি পানাহার করাতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রা. তার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে খাবার কিছু আছে কি? সে বলল, আল্লাহর শপথ! আমার কাছে খাবার কিছু থাকলে আমি আপনাদের মেহমানদারী করতে মোটেই কার্পণ্য করতাম না।
সেটি ছিল অভাবের বছর। খাদ্যাভাবে উম্মে মা'বাদের বকরীগুলো শুকিয়ে গিয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁবুর এক পার্শ্বে একটি বকরী দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, 'ওহে উম্মে মা'বাদ! এই বকরীটি এখানে কেন?' উম্মে মা'বাদ বলল, 'দুর্বলতার কারণে এটি অন্যান্য বকরীর সাথে চলতে পারে না। তাই এটি পেছনে রয়ে গেছে।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'বকরীটি কি দুধ দেয়?' উম্মে মা'বাদ বলল, 'এটি দুর্বলতার কারণে চলতেই পারছে না। দুধ আসবে কোত্থেকে?' তিনি বললেন, 'তুমি কি আমাকে এটি দোহন করার অনুমতি দিবে?' সে বলল, 'আমার মা-বাপ আপনার জন্য কুরবান হোক! আপনি যদি তাতে কোনো দুধ দেখেন তাহলে দোহন করতে পারেন!' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বকরীর স্তনে হাত রাখলেন, বিসমিল্লাহ পাঠ করলেন এবং বরকতের দুআ করলেন। দুধে বকরীর স্তন ভর্তি হয়ে গেল। তিনি পাত্র আনতে বললেন। পাত্র আনা হলে তাতে দুধ দোহন করলেন। পাত্র ভর্তি হয়ে দুধের ফেনা ওপরে উঠতে লাগল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করলেন এবং তার সঙ্গীগণও পান করলেন। তিনি পুনরায় পান করলেন। দ্বিতীয়বারও তিনি পাত্র ভর্তি করে দুধ দোহন করে উম্মে মা'বাদের তাঁবু ত্যাগ করলেন।
কিছুক্ষণ পর উম্মে মা'বাদের স্বামী আবু মা'বাদ বকরীগুলো চালিয়ে নিয়ে ফেরত এলো। তাঁবুতে দুধ দেখে আবু মা'বাদ আশ্চার্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি দুধ কোথায় পেলে? বকরীগুলো খাদ্যাভাবে শুকিয়ে রয়েছে। বাড়িতে কোনো দুধের ছাগলও নেই। সে বলল, 'আল্লাহর শপথ! আমাদের কাছ দিয়ে একজন বরকতময় লোক অতিক্রম করেছেন। তার অবস্থা ছিল এরকম এরকম...।' আবু মা'বাদ বলল, 'আল্লাহর শপথ! আমার ধারণা এই লোকটিকেকেই কুরাইশরা খুঁজছে। হে উম্মে মা'বাদ আমার কাছে তার গুণাগুণ বর্ণনা করো।' উম্মে মাবাদ আবু মাবাদের কাছে অত্যন্ত চমৎকার ও সুন্দরভাবে এবং হৃদয়গ্রাহী করে রাসূলের গুণাগুণ ও পরিচয় তুলে ধরলেন।
উম্মে মা'বাদ মহানবীর কাফেলার আগমন, শীর্ণকায় ছাগী থেকে দুধ দোহনসহ সব ঘটনা খুলে বললেন। কাফেলার লোকদেরও বর্ণনা দিলেন উম্মে মা'বাদ। বেদুঈন জীবনের মুক্ত মন নিয়ে সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে মহানবীর যে বর্ণনা উম্মে মা'বাদ দিয়েছিলেন তা হলো, 'তাঁর উজ্জ্বল বদনকান্তি, প্রফুল্ল মুখশ্রী, অতি ভদ্র ও নম্র ব্যবহার। তার উদরে স্ফীতি নেই, মস্তকে খালিত্য নেই। সুন্দর, সুদর্শন। সুবিস্তৃত কৃষ্ণবর্ণ নয়নযুগল, কেশ দীর্ঘ ঘনসন্নিবেশিত। তার স্বর গম্ভীর। গ্রিবা উচ্চ। নয়নযুগলে যেন প্রকৃতি নিজেই কাজল দিয়ে রেখেছে। চোখের পুতুলি দু-টি সদা উজ্জ্বল, ঢল ঢল। ভ্রুযুগল নাতিসূক্ষ্ম, পরস্পর সংযোজিত। স্বতঃকুঞ্চিত ঘন কেশদাম। মৌনাবলম্বন করলে তার চেহারা থেকে গুরুগম্ভীরভাবের অভিব্যক্তি হতে থাকে। আবার কথা বললে মনপ্রাণ মোহিত হয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে তার সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর, কাছে এলে আরও বেশি সুন্দর। ভাষা অতি মিষ্ট ও প্রাঞ্জল, তাতে ত্রুটি নেই, বাহুল্য নেই, বাক্যগুলো যেন মুক্তার হার। তার দেহ এত খর্ব নয় যা দর্শনে ক্ষুদ্রত্বের ভাব মনে আসে বা এমন দীর্ঘ নয় যা দেখতে বিরক্তি বোধ করে, তিনি নাতিদীর্ঘ নাতিখর্ব। পুষ্টি ও পুলকে সে দেহ যেন কুসুমিত নববিটপীর সদ্য পল্লবিত নবিন প্রশাখা। সে মুখশ্রী বড় সুন্দর, বড় সুদর্শন ও সুমহান। তার সঙ্গীরা সর্বদাই তাকে বেষ্টন করে থাকে। তারা তার কথা আগ্রহ সহকারে শ্রবণ করে এবং তার আদেশ উৎফুল্লচিত্তে পালন করে।'
স্ত্রীর মুখে এই বর্ণনা শুনে আবু মা'বাদ উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন, 'আল্লাহর শপথ, ইনি নিশ্চয়ই কুরাইশদের সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে আমরা সত্য-মিথ্যা অনেক কিছু শ্রবণ করেছি। হায় আমার ভাগ্য! আমি অনুপস্থিত ছিলাম! উপস্থিত থাকলে আমি তার আশ্রয় নিতাম। আমি বলছি, সুযোগ পেলে এখনো তা করব।'
ওইদিকে মক্কায় উঁচু কণ্ঠে একটি কবিতা আবৃত্তির আওয়ায শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু কে তা আবৃত্তি করছে, তাকে দেখা যাচ্ছিল না, যার প্রথম লাইন হচ্ছে,
جزى الله رب العرش خير جزائه رفيقين حلا خيمتي أم معبد
আরশের প্রভু আল্লাহ তাআলা ওই দুইজন বন্ধুকে সর্বোত্তম বিনিময় দান করুন, যারা উভয়েই উম্মে মাবাদের তাঁবুতে অবতরণ করেছেন।
আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, আমরা জানতাম না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো দিকে গিয়েছেন; কিন্তু মক্কার নীচু ভূমিতে একটি জিন এসে কবিতার এই লাইনগুলো আবৃত্তি করতে লাগল। লোকেরা সেই আওয়ায শুনে পিছে পিছে চলা শুরু করল। তবে তারা সেই জিনকে দেখতে পাচ্ছিল না। পরিশেষে জিন মক্কার উঁচু ভূমি দিয়ে বের হয়ে গেল। আসমা বলেন, এই কবিতা শুনে আমরা বুঝতে পারলাম যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার দিকে চলে গেছেন।
হযরত উম্মে মা'বাদ এর বাড়ি থেকে বেরিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথীদেরকে নিয়ে সোজা চলতে লাগলেন মদীনার দিকে। এখন তার মনে কেবল মদীনা, শুধুই মদীনা। এদিকে মদীনার লোকেরাও তাঁরই জন্য অধীর অপেক্ষা করছেন।
পরবর্তী সময়ে উম্মে মা'বাদ রা. রাসূলের সান্নিধ্যে থেকে দ্বীন ও দ্বীনের দাওয়াতের দীক্ষা নেন এবং আজীবন ইবাদত-বন্দেগীতে কাটান। যখন তিনি শুনতেন মুসলমানরা বিজয় লাভ করেছে, তখন অত্যন্ত খুশি হতেন। পক্ষান্তরে মুসলমানদের যে কোনো দুঃখ-দুর্দশায় দগ্ধ হতো তার অন্তর। এরই ধারাবাহিকতায় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালে বুকটা শোকে চৌচির হয়ে যায় তাঁর। ভীষণ ভেঙে পড়েন তিনি। দীর্ঘ হায়াত প্রাপ্ত হয়ে এক সময় তিনিও ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৬০৫. সূরা ইয়াসীন, ৩৬:৯।
📄 উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা রা.
অন্ধকারে আলোর মুকুল হয়ে ফুটেছিল একটি ফুল। তার নাম উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা রা.। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন শত্রু পরিবেশে থেকেই। হযরত উম্মে কুলসুম রা.-এর পিতা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কী জীবনের একজন চরম শত্রু। মক্কায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও দুর্বল মুসলমানদের ওপর বাড়াবাড়ি রকমের নির্যাতনের জন্য ইতিহাসে সে খ্যাত হয়ে আছে। বদরযুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয় এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়। উম্মে কুলসুম রা. তখন মক্কায়। পাষণ্ড পিতার হত্যার খবর শোনার পর তার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানিও পড়েনি বলে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন।
এমন ঘরেই জন্ম হয়েছিল হযরত উম্মে কুলসুমের। তিনি মক্কায় অল্প বয়সে পিতৃগৃহে থাকা অবস্থায় ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন এবং সেখানেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পূর্বে তার নিকট বাইআত করেন। আল্লাহ ও রাসূলকে তিনি ভালোবাসতেন পিতা-মাতা ও অন্যান্য সকল মানুষের চেয়ে বেশি। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে ইরশাদ করেন,
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَ عَشِيْرَتُكُمْ وَ أَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفُسِقِينَ
বলো, তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তার রাসূল ও তার পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তার নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।
কেমন ছিল তার পিতা?
وَ يَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يُلَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا يُوَيْلَتُى لَيْتَنِي لَمْ اتَّخِذُ فُلَانًا خَلِيلًا لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَنُ لِلْإِنْسَانِ خَذُولًا
আর সেদিন যালিম নিজের হাত দুটো কামড়ে বলবে, হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোনো পথ অবলম্বন করতাম! হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! অবশ্যই সে তো আমাকে উপদেশবাণী থেকে বিভ্রান্ত করেছিল, আমার কাছে তা আসার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য চরম প্রতারক।
উকবা ইবনে আবি মুয়িত ছিল মক্কার মুশরিকদের অন্যতম সর্দার। সে কোনো সফর থেকে ফিরে এলে শহরের গণ্যমান্য লোকদের দাওয়াত করত।
একবার নিয়ম অনুযায়ী সে শহরের গণ্যমান্য লোকদের দাওয়াত করল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও দাওয়াত করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াত গ্রহণ করলেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে খাবার উপস্থিত করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার খাদ্য গ্রহণ করতে পারি না যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সাক্ষ্য না দাও যে, আল্লাহ এক, তার কোনো অংশিদার নেই এবং আমি তার রাসূল।
উকবা দেখল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি না খায় তাহলে তার সম্মান নষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য সে কালিমা উচ্চারণ করল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শর্ত অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করলেন।
উবাই ইবনে খালফ ছিল উকবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে যখন উকবার ইসলাম গ্রহণের কথা জানতে পারল তখন খুবই রাগান্বিত হলো। উকবা ওযর পেশ করল যে, কুরাইশ বংশের সম্মানিত অতিথি আমার গৃহে আগমন করেছিলেন। তিনি খাদ্য গ্রহণ না করে ফিরে যাওয়াটা আমার জন্য অপমান। তাই আমি এই কালিমা উচ্চারণ করেছি। উবাই বলল, আমি এ ওযর কবুল করব না যে পর্যন্ত তুমি মুহাম্মাদের মুখে থুথু নিক্ষেপ না করবে। হতভাগা তার বন্ধুর কথায় এই ধৃষ্টতা প্রদর্শনে সম্মত হলো। এ ব্যাপারে উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই দুজনের অবস্থা হাশরের দিন একই অবস্থা হবে তখন উকবা বলবে, 'হায়! আমি যদি উবাই এর বন্ধু না হতাম, মুহাম্মাদের কথা মানতাম তাহলে আমার এ অবস্থা হতো না।'
নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর শুরুর দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কাবাসীর কাছে সত্য ও হকের দাওয়াত তুলে ধরতেন তখন কুরাইশ লোকেরা শক্তভাবে এসবের প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এসব গালিগালাজ এবং বিরোধিতার পরও কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে তার দাওয়াত চালিয়ে যেতেন। বয়স কম হওয়ায় হযরত ফাতিমা রা. তার বাবার সাথে বের হতেন। এমনই একদিন মক্কার কাফের উকবা ইবনে আবি মুয়িত (আল্লাহ তাকে চির অপমানিত করুন) বাচ্চা প্রসবের সময় উটনীর পেট থেকে যেসব নাড়িভূড়ি বের হয়ে আসে, সেসব রক্তাক্ত দুর্গন্ধযুক্ত নাড়িভুড়ি নিয়ে বের হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কাবাচত্বরে গিয়ে সিজদায় অবনত হলেন, তখন সে এগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিঠের ওপর নিক্ষেপ করল। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষটির সাথে এমন বেআদবি দেখেও মক্কার কাফের কুরাইশ নেতারা হাসি-ঠাট্টায় একে অপরের ওপর গড়িয়ে পড়ছিল। স্বল্পবয়সী নবীকন্যা ফাতিমা রা. তার বাবা রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীরের ওপর থেকে এসব আবর্জনা সরাচ্ছিলেন এবং ময়লাগুলো ধুয়ে দিলেন। তারপর মক্কার ওইসব সর্দারদের সামনে গিয়ে তাদেরকে ইচ্ছেমতো বকাঝকা করে আসলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এমন দুর্ব্যবহারে খুব কষ্ট পেলেন। তিনি তার দু হাত তুলে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, শায়বা ইবনে রবিয়ার বিচারের দায়িত্ব আপনার, আবু জাহেলের বিচারের দায়িত্ব আপনার, উকবা বিন আবু মুয়িতের বিচারের দায়িত্ব আপনার, হে আল্লাহ, উমাইয়া বিন খালফের বিচারের দায়িত্বও আপনার।'
যখন তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে এমন বদদোয়া শুনতে পেল, ভয়ে চুপ হয়ে গেল। পরবর্তী সময়ে বদর ময়দানে তারা সবাই নিহত হয়েছিল।
ইবনে হিশাম বলেন, উকবাকে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা. হত্যা করেন। যুহরী এবং একদল আলেম এ অভিমত পোষণ করেছেন।
বরকতময় হিজরত
হুদায়বিয়ার সন্ধির অব্যবহিত পরে মদীনায় হিজরতের সুযোগ আসে হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা রা.-এর জীবনে। মক্কা থেকে পালিয়ে মদীনায় উপস্থিত হন তিনি। হুদায়বিয়ার সন্ধির একটি শর্ত ছিল, মক্কার কেউ ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় গেলে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে। উম্মে কুলসুম রা. মদীনায় পৌঁছার দুই দিন পর তার দুই সহোদর ওয়ালীদ ও উমারা ইবনে আকবা তাঁকে ফেরত পাওয়ার দাবি নিয়ে মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পৌঁছে। তখন নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়।
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِذَا جَآءَكُمُ ٱلْمُؤْمِنَـٰتُ مُهَـٰجِرَٰتٍ فَٱمْتَحِنُوهُنَّ ۖ ٱللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَـٰنِهِنَّ ۖ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَـٰتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى ٱلْكُفَّارِ ۖ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ ۖ وَءَاتُوهُم مَّآ أَنفَقُواْ ۚ وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ أَن تَنكِحُوهُنَّ إِذَآ ءَاتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ ۚ وَلَا تُمْسِكُواْ بِعِصَمِ ٱلْكَوَافِرِ وَسْـَٔلُواْ مَآ أَنفَقْتُمْ وَلْيَسْـَٔلُواْ مَآ أَنفَقُواْ ۚ ذَٰلِكُمْ حُكْمُ ٱللَّهِ ۖ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ وَإِن فَاتَكُمْ شَىْءٌ مِّنْ أَزْوَٰجِكُمْ إِلَى ٱلْكُفَّارِ ۞ اَلْكُفَّارِ فَعَاقَبْتُمْ فَأْتُوا الَّذِيْنَ ذَهَبَتْ أَزْوَاجُهُمْ مِّثْلَ مَا أَنْفَقُوْا وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي أَنْتُمْ بِهِ مُؤْمِنُوْنَ
হে মুমিনগণ, তোমাদের নিকট মুমিন নারীরা হিজরত করে এলে তাদের পরীক্ষা করবে; আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে অবগত আছেন। যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা মুমিন তবে তাদেরকে কাফেরদের নিকট ফেরত পাঠাবে না। মুমিন নারীগণ কাফেরদের জন্য বৈধ নয় এবং কাফেরগণ মুমিন নারীদের জন্য বৈধ নয়। কাফেররা যা ব্যয় করেছে তা তাদেরকে ফিরিয়ে দাও। অতঃপর তোমরা তাদেরকে বিয়ে করলে তোমাদের কোনো অপরাধ হবে না যদি তোমরা তাদেরকে মোহর দাও। তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা যা ব্যয় করেছ তা ফেরত চাইবে এবং কাফেররা ফেরত চাইবে যা তারা ব্যয় করেছে। এটাই আল্লাহর বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে থাকেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যদি কেউ হাতছাড়া হয়ে কাফেরদের মধ্যে থেকে যায় এবং তোমাদের যদি সুযোগ আসে তখন যাদের স্ত্রীগণ হাতছাড়া হয়ে গেছে তাদেরকে, তারা যা ব্যয় করেছে তার সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করবে। ভয় কর আল্লাহকে, যার প্রতি তোমরা ঈমান এনেছ।
উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে কুলসুম রা.-কে তার ভাইয়ের হাতে অর্পণ করতে অস্বীকার করেন। তিনি তাদেরকে বলেন, 'শর্ত ছিল পুরুষদের সম্পর্কে, স্ত্রীলোকদের সম্পর্কে নয়।
হযরত উম্মে কুলসুম রা.-এর মদীনায় হিজরতের ঘটনাটি বেশ চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, তিনি একাকী মক্কা থেকে বের হন এবং পথে খুযাআ গোত্রে এক ব্যক্তিকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন। পায়ে হেঁটে, মতান্তরে উটের পিঠে চড়ে মদীনায় পৌঁছেন। একমাত্র উম্মে কুলসুম রা. ছাড়া অন্য কোনো কুরাইশ মহিলার ইসলাম সহকারে একাকী আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে হিজরত করেননি।
আমরা হযরত উম্মে কুলসুম রা.-এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের কাহিনী ও কৌশলের কথা তার মুখেই শুনতে পারি। তিনি বলেন, 'আমার পরিবারের একাংশ থাকত মরুদ্যানে। আমি সেখানে একাকী যেতাম এবং তিন-চারদিন সেখানে অবস্থান করে আবার মক্কায় ফিরে আসতাম। আমার এমন যাওয়া কেউ বারণ করত না। এক পর্যায়ে আমি মদীনায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। একদিন গ্রামের উদ্দেশে মক্কা থেকে বের হলাম। আমাকে যারা এগিয়ে দিতে এসেছিল তারা কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে ফিরে গেল। আমি একাকী চলছি, এমন সময় খুযাআ গোত্রের এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কোথায় যাবে?' আমি জানতে চাইলাম, 'আপনি এ প্রশ্ন করছেন কেন এবং আপনি কে?' তিনি বললেন, 'আমি খুযাআ গোত্রের লোক।'
তিনি খুযা'আ গোত্রের লোক বলাতে আমি নিশ্চিন্ত হলাম। কারণ, এ গোত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সন্ধি ও শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেছিল। আমি আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি কুরাইশ গোত্রের একজন নারী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট যেতে চাই, কিন্তু আমার পথ জানা নেই। তিনি বললেন, আমি তোমাকে মদীনায় পৌঁছে দিচ্ছি। তারপর তিনি একটি উট আমার কাছে নিয়ে আসলেন। আমি তার পিঠে চড়ে বসলাম।
এক সময় আমরা মদীনা পৌঁছলাম। তিনি ছিলেন একজন উত্তম সঙ্গী। আল্লাহ তাকে ভালো প্রতিদান দিন। আমি উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা.-এর নিকট গিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তার রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিকে হিজরত করেছ? বললাম, হ্যাঁ। তবে আমার ভয় হচ্ছে, আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় কি না।
একটু পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামা রা.-এর নিকট আসলেন। উম্মে সালামা রা. তাকে আমার বিষয়টি জানালে তিনি আমাকে 'মারহাবান ওয়া আহলান' বলে স্বাগত জানালেন।
আমি বললাম, আমি আমার দ্বীনের জন্য আপনার নিকট পালিয়ে এসেছি। আমাকে আশ্রয় দিন। ফেরত পাঠাবেন না। ফেরত পাঠালে আমাকে এমন শাস্তি দেবে যা আমি সহ্য করতে পারব না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ মহিলাদের ব্যাপারে সন্দ্বিচুক্তি অকার্যকর ঘোষণা করেছেন। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুদায়বিয়ার সন্দ্বিচুক্তির যে ধারাতে মক্কাবাসীদের ফেরত দানের কথা ছিল, তাতে কেবল পুরুষদের কথা উল্লেখ ছিল, মহিলাদের সম্পর্কে কোনো কথা ছিল না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপর্যুক্ত আয়াতটি পাঠ করেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে কুলসুম রা. এবং তার পরে যে সকল নারী মদীনায় এসেছেন তাদের সকলকে এ আয়াতের আলোকে পরীক্ষা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস রা.-কে প্রশ্ন করা হলো, নারীদের পরীক্ষা করার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদ্ধতি কী ছিল? বললেন, তিনি মদীনায় আগত মহিলাদের এভাবে শপথ করাতেন : আল্লাহর কসম, স্বামীর প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষবশত আমি ঘর থেকে বের হইনি। আল্লাহর কসম! এক যমীন থেকে অন্য এক যমীনের প্রতি আকর্ষণবশত বের হইনি। আল্লাহর কসম! পার্থিব কোনো লোভ-লালসাবশত ঘর ত্যাগ করিনি। আল্লাহর কসম! কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বতে ঘর ত্যাগ করেছি।
উপরোক্ত ঘটনার মাধ্যমে উম্মে কুলসুমের রা. তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও দৃঢ় ঈমানের পরিচয় পাওয়া যায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে কেন্দ্র করে ইসলামী শরীয়াতের অনেকগুলো বিশেষ বিধান জারী করেন। এ তার জন্য এক বিশেষ মর্যাদার বিষয়।
মাদানী জীবনে হযরত উম্মে কুলসুম রা. মহিলা সাহাবীদের মধ্যে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সম্মানের দৃষ্টিতে এবং তাঁর ঈমানী সততাকে খুব বড় করে দেখতেন। কোনো কোনো জিহাদে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন এবং আহতদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন। যুদ্ধলব্ধ গনীমতেও তাঁকে অংশ দিয়েছেন।
শুভ পরিণয়
হযরত উম্মে কুলসুম রা. হিজরতের আগ পর্যন্ত বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি। মদীনায় আসার পর প্রখ্যাত চারজন সাহাবী তাকে বিয়ের পয়গাম পাঠান। তারা হলেন: যুবাইর ইবনুল আওয়াম, যায়িদ ইবনে হারিসা, আবদুল রহমান ইবনে আউফ ও আমর ইবনুল আস রা.। তিনি বৈপিত্রেয় ভাই উসমান ইবনে আফফান রা.-এর সাথে পরামর্শ করেন। উসমান রা. তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে পরামর্শ করতে বলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট যান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তার পরামর্শ চান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, তুমি যায়িদ ইবনে হারিসাকে বিয়ে করো। তোমার জন্য ভালো হবে। তিনি যায়িদকে বিয়ে করেন।
হযরত যায়িদ রা. মুতার যুদ্ধে শহীদ হলেন। অতঃপর হযরত যুবায়ির ইবনুল আওয়াম রা. তাকে বিয়ে করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের ছাড়াছড়ি হয়ে যাওয়ার পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. তাকে বিয়ে করেন। আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. রোগাক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তখন হযরত আমর ইবনুল আস রা. তাকে বিয়ে করেন। তার ঘরেই হযরত আলী রা.-এর খিলাফতকালে তিনি ইন্তেকাল করেন।
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৬০৬. সূরা তাওবাহ, ৯:২৪।
৬০৭. সূরা ফুরকান, ২৫:২৭-২৯।
৬০৮. তাফসীরে কাবীর, ২৪/৭৫।
৫০৯. সহীহ, মুসলিম, ৪৬৪b; দালায়েলুন নবুওয়াতু।
৫১০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/৩১।
৬১১. সূরা মুমতাহিনা, ৬০:১০-১১।
৬১২. ইসতিআব, ৪/৪৬৫।
৬১৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৩০।
৬১৪. মুখতাসার তাফসীর ইবনে কাসীর, ৩/৪৮৫; সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/২৬২; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৭৬; যাদুল মাআদ, ৩/৩০০।
৬১৫. নিসা মিন আসরিন নবুওয়াহ, ৩৮৬।
৬১৬. তাহযীবুত তাহযীব, ১২/৪৭৭; আনসাবুল আশরাফ, ১/৪৭১; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৭৭।