📄 উম্মে শুরাইক রা.
দ্বীনের দাওয়াত: নববী আমল
আজ আমরা এমন এক মহীয়সীর জীবনচরিত আলোচনা করব—যিনি নিজ মাথায় বহন করেছিলেন দ্বীনী দাওয়াতের মহাভার। এ লক্ষ্যে তিনি মানুষের ময়দানে বেরিয়ে পড়েছিলেন; যাতে মানুষ ওই মহান সৃষ্টিকর্তার ইবাদতে আত্মনিয়োগ করে—যিনি আসমান-যমীনের সৃষ্টিকর্তা। এই চেতনা আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন। ফলে ইসলামের জন্য তিনি বয়ে আনেন প্রভূত কল্যাণ।
তিনি হচ্ছেন উম্মে শুরাইক রা.। যাঁর আসল নাম গাযিয়া বিনতে জাবির ইবনে হাকীম রা.। যদিও তার ঘটনা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার কীর্তি বিশাল। বহু সংখ্যক পথহারা মানুষ দিশা পেয়েছে তার দাওয়াতে। বহু মানুষ কত শত বছর বেঁচে থাকে; কিন্তু তাদের দ্বারা একজন মানুষও দ্বীনের সঠিক দিশা পায় না। আবার অনেক মহামানব এমনও আছেন যারা বেঁচে থাকেন অল্প কিছুদিন; কিন্তু তাদের চেতনা ও দাওয়াতের ফলে অগণিত মানুষ হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়, পেয়ে যায় প্রভু সন্তুষ্টির উপকরণ। আমাদের আজকের অতিথিও তেমনই জীবন লাভ করেছিলেন এবং এ জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহর দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকার পথে।
দাওয়াত : নববী আমল
وَ مَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَ عَمِلَ صَالِحًا وَ قَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
ওই ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম কথা কার, যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। ৫৩৮
পৃথিবীতে যতজন নবী এবং রাসূল আগমন করেছেন তাদের সকলেরই মিশন ছিল দাওয়াত। দাওয়াত দানের মাধ্যমেই তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে আলোর ফল্গুধারা প্রবাহিত করেছেন। কুরআন ও হাদিসে অসংখ্যবার দাওয়াতের গুরুত্বের কথা উঠে এসেছে।
আল্লাহর বাণী, 'বলুন, এটাই আমার পথ... ৫৩৯ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন এই রাস্তায় আল্লাহর দিকে আহবান করেন। অতঃপর যিনি আল্লাহর দিকে ডাকেন তিনি যেন রাসূলের পথে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে তার অনুসারী হয়ে ডাকেন। আর যিনি এটা ছাড়া মানুষকে আহবান করলেন, তিনি এই রাস্তায় জাগ্রত জ্ঞান সহকারে তার অনুসারী না হয়ে আহবান করলেন। আল্লাহর দিকে আহবান নবী ও তাদের অনুসারীদের কাজ এবং রাসূলদের উম্মতদের মধ্যে তাদের অনুসারীদের কাজ। মানুষেরা তাদের অনুসরণ করে। আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে, তার নিকটে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যেন পৌঁছে দেন। আল্লাহ তা সংরক্ষণ করবেন এবং মানুষের বাধা থেকে মুক্ত রাখবেন। আর তার উম্মতদের মধ্যে যারা উক্ত কাজ করবে তাদেরকেও তিনি হেফাযত করবেন ও দ্বীনের ওপর অটল থাকা ও দাওয়াতী কাজের বাধা থেকে প্রচ্ছন্ন রাখবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি আয়াতও জানা থাকলে তা প্রচারের কথা নির্দেশ দিয়েছেন। ৫৪০
দাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
فَلِذلِكَ فَادْعُ وَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَ لَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ وَقُلْ آمَنْتُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنْ كِتَبٍ وَ أُمِرْتُ لِأَعْدِلَ بَيْنَكُمْ اللَّهُ رَبُّنَا وَ رَبُّكُمْ لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ لَا حُجَّةَ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ اللَّهُ يَجْمَعُ بَيْنَنَا وَ إِلَيْهِ الْمَصِيرُ
অতএব, আপনি তার দিকে আহবান করুন ও তাতেই দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকুন যেভাবে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন এবং তাদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করবেন না। বলো, আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন আমি তাতে বিশ্বাস করি এবং আমি আদিষ্ট হয়েছি তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে। আল্লাহই আমাদের প্রতিপালক। আমাদের কর্ম আমাদের ও তোমাদের কর্ম তোমাদের। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ নেই। আল্লাহই আমাদের একত্র করবেন এবং প্রত্যাবর্তন তাঁরই দিকে। ৫৪১
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يُقَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللَّهِ وَامِنُوا بِهِ يَغْفِرُ لَكُمْ مِّنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرُكُمْ مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ
হে আমাদের সম্প্রদায়, আল্লাহর দিকে আহবানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন এবং মর্মন্তুদ শাস্তি হতে রক্ষা করবেন। ৫৪২
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَ اعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ
হে ঈমানদারগণ, রাসূল যখন তোমাদের এমন কিছুর দিকে আহবান করেন, যা তোমাদের প্রাণবন্ত করে, তখন আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দেবে। জেনে রাখ, আল্লাহ সম্মুখ ও তার অন্তরের মধ্যবর্তী হয়ে থাকেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদের একত্র করা হবে। ৫৪৩
হাদীস শরীফে এসেছে, ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুআয ইবনে জাবাল রা.-কে ইয়ামানে পাঠালেন, তখন তিনি তাকে বললেন, তুমি আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছ। সুতরাং তাদেরকে প্রথম আহবান করবে, তারা যেন আল্লাহ তাআলার একত্বকে মেনে নেয়। যদি তারা তা স্বীকার করে তবে তাদের বলবে, আল্লাহ তাদের ওপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তারা যদি সালাত আদায় করে তবে তাদের জানাবে, আল্লাহ তাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন, যা ধনীদের নিকট থেকে আদায় করা হবে এবং গরীবদের মাঝে বিতরণ করা হবে। তারা যদি এটা মেনে নেয় তাহলে তাদের নিকট থেকে তা গ্রহণ করবে। তবে মানুষের সম্পদের মূল্যের ব্যাপারে সাবধান থাকবে। ৫৪৪
আবু হুরায়রা রা. বলেন, একবার আমরা মসজিদে নববীতে বসে ছিলাম। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হয়ে বললেন, তোমরা ইহুদীদের কাছে চলো। আমরা চললাম এবং তাদের পাঠক্রমে পৌঁছলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বললেন, তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, তাহলে নিরাপত্তা পাবে। জেনে রাখ, পৃথিবী আল্লাহ এবং তার রাসূলের। আমি ইচ্ছা করছি তোমাদের এই দেশে হতে নির্বাসিত করব। যদি কেউ তার মালের বিনিময়ে কিছু পায়, তবে সে যেন তা বিক্রি করে। জেনে রাখ, পৃথিবী আল্লাহ এবং তার রাসূলের। ৫৪৫
'জুনাদা ইবনে উমাইয়া রা. বলেন, আমরা উবাদা ইবনে সামিত রা.-এর কাছে গেলাম। তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। আমরা বললাম, আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করুন! আমাদের একটি হাদীস বর্ণনা করুন, যা আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছেন এবং আল্লাহ আমাদের উপকার করবেন। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার আমাদের ডাকলেন এবং তার নিকট আনুগত্যের বাইআত করলাম। তিনি যে সমস্ত বিষয়ে আমদের বাইআত নিলেন তা হলো, সুখে-দুঃখে, দুর্দিনে-সুদিনে, স্বচ্ছলতা-অস্বচ্ছলতায়, এমনকি কোনো ব্যক্তিকে আমাদের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হলেও আমরা নেতার আনুগত্য করব এবং কাউকে দায়িত্ব অর্পণ করা হলে আমরা তাতে বাধা দেব না। তিনি আরও বলেন, কিন্তু তোমরা যদি তাকে প্রকাশ্য কুফরীতে লিপ্ত দেখ, স্পষ্ট প্রমাণ সহকারে (তখন কোনো আনুগত্য নেই)। ৫৪৬
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি কি তোমাদের এমন বিষয় সম্পর্কে বলে দেব না, যে কারণে আল্লাহ তোমাদের গোনাহসমূহ মুছে দিবেন এবং তোমাদের মর্যাদাকে সমুন্নত করবেন? সাহাবীরা বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তখন তিনি বললেন কষ্ট সত্ত্বেও পূর্ণরূপে ওযু করা, বেশি বেশি মসজিদের দিকে যাওয়া এবং এক সালাত শেষ করার পর অপর সালাতের অপেক্ষায় থাকা। আর এটিই 'রিবাত'। ৫৪৭
হাসান বসরী রহ. সূরা ফুসসিলাতের ৩৩ নং আয়াত তথা 'কথায় কে উত্তম ওই ব্যক্তি অপেক্ষা, যে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে আমি তো মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত' তিলাওয়াত করলেন। অতঃপর বললেন, এই ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয়পাত্র, আল্লাহর অলী, একনিষ্ঠ বন্ধু, আল্লাহর উত্তম বস্তু, পৃথিবীবাসীর মধ্যে আল্লাহর নিকট তিনি সর্বাধিক প্রিয়। আল্লাহ তার দুআ কবুল করেন। আল্লাহ যা কবুল করেন তার দিকেই তিনি মানুষকে দাওয়াত দেন এবং তআর আলোকেই আমলে সালেহ করেন। আর বলেন, আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। তিনিই আল্লাহ কর্তৃক দায়িত্বশীল। ৫৪৮
আকাশ থেকে পিপাসা নিবারণ
মূলত ইসলামের দাওয়াত দেওয়া তথা সৎ কাজের আদেশ (আমর বিন মা'রুফ) এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা (নাহি আনিল মুনকার) প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্যই মহান আল্লাহ তাআলা অত্যাবশ্যক করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَ تَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের পাঠানো হয়েছে। তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে। ৫৪৯
এই আয়াতটিতে আল্লাহ শুধু পুরুষদেরকে উল্লেখ করেননি; বরং নারী-পুরুষ উভয়কেই নির্দেশ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদের রা. জীবনী থেকে দেখা যায় পুরুষ সাহাবী রা.-দের মতো মহিলা সাহাবীরাও দাওয়াতি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। তারা রা. আল্লাহর এই নির্দেশে সাড়া দিয়েই সেই কাজ করেছেন।
আমরা যদি উম্মে শুরাইক রা. এর জীবনচরিত দেখি, তাহলে দেখব, তিনি ছিলেন মক্কার একজন নারী। তার নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর নেমে পড়েন দাওয়াতী কাজে। তিনি বিভিন্ন বাড়িতে যেতেন। বাড়ির মহিলাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। সুযোগ বুঝে ইসলামের মর্মকথা তুলে ধরতেন তাদের কাছে। যদিও তিনি জানতেন, এই কথা জানাজানি হলে তার রক্ষা নেই!
আজকের মুসলিম নারীরা উম্মে শুরাইক রা.-কে অনুসরণ করে ইসলামী দাওয়াত মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারে। কেননা, এটি একজন মুসলমান নারীর জন্য ফরয। যদিওবা এই জন্য তাকে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। যেমন প্রতিকুল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল উম্মে শুরাইক রা.-কে।
শুরাইকা রা. যে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন, তা একসময় জানাজানি হয়ে যায়। তখন মুশরিক নেতারা তাকে আটক করে। তুলে দেয় তার গোত্রের লোকদের হাতে। তাকে শাস্তি দিতে বলে। তার গোত্রের লোকেরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে শুকনো রুটি ও মধু খেতে বাধ্য করে। অতঃপর তাকে প্রচণ্ড রোদে গরম বালুর ওপর শুইয়ে দেয়।
প্রচণ্ড রোদ আর গরম বালুর উত্তাপে তিনি ছটফট করতে থাকেন। পিপাসায় কাতরাতে থাকেন। একটু পানি দেবার জন্য লোকদের বার বার অনুরোধ করতে থাকেন। কেউ তার অনুরোধে সাড়া দিল না। কেউ তাকে একটু পানি দিল না। এইভাবে কেটে যায় তিনটি দিন। প্রচণ্ড উত্তাপ ও পিপাসায় তিনি মুমূর্ষু হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে এসে তিনি বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেন। যালিমরা তাকে ইসলাম ত্যাগ করতে বলত; কিন্তু বোধশক্তি হারিয়ে ফেলায় তিনি তাদের কথা বুঝে ওঠতে পারতেন না। তৃতীয় দিন একব্যক্তি আসমানের দিকে ইশারা করে তাকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান ত্যাগ করতে বলে। অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যে যা বোঝাতে চেয়েছিল তিনি তা বুঝতে সক্ষম হন। চিৎকার দিয়ে তিনি বলে ওঠেন, 'আল্লাহর কসম! আমি তো এখনো সেই ঈমানের ওপরই অটল আছি।'
আল্লাহু আকবার! এই ছিল উম্মে শুরাইক রা.-এর ঈমান। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য যিনি জীবন উৎসর্গ করতেও রাজি ছিলেন। তারা এসব কষ্টকে কষ্টই মনে করতেন না। কারণ তারা জানতেন জাহান্নামের আজাব আরও ভয়াবহ।
এ ছাড়া আল্লাহপাক শুধু ঈমানের মৌখিক স্বীকৃতিতেই তার বান্দাদের নিষ্কৃতি দেবেন না। তিনি যাচাই করে নিবেন তার কোনো বান্দা বা বান্দী সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর আদেশ সঠিকভাবে পালন করেছেন আর কোনো বান্দা করেননি।
তাই দাওয়াতী কাজে বাধা দিয়ে, বিপদ দিয়ে আল্লাহ তার বান্দাদের পরীক্ষায় ফেলতে পারেন। এই পরীক্ষা তার বান্দাদের ঈমানকে যাচাইয়ের পরীক্ষা; কিন্তু সেই পরীক্ষাকে ভয় না পেয়ে জয় করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে, এসব বিপদ-আপদের মধ্যেও আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য কল্যাণ রেখেছেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যান চান তাকে বিপদে (পরীক্ষায়) ফেলেন।
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি হেদায়াতের দিকে আহবান করবে তার জন্য তার অনুসারী ব্যক্তির সমপরিমাণ নেকী রয়েছে; কিন্তু তার নেকী থেকে বিন্দু পরিমাণ হ্রাস পাবে না। যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে আহবান করবে তার জন্য তার অনুসারী ব্যক্তির সমপরিমাণ পাপ রয়েছে; কিন্তু তার পাপ থেকে বিন্দু পরিমাণ হ্রাস পাবে না। ৫৫০
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৫৩৮ সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৩।
৫৩৯ সূরা ইউসুফ, ৪১:১২:১০৮।
৫৪০ জালাউল আফহাম, ৪১৫।
৫৪১ সূরা শূরা, ৪২:১৫।
৫৪২ সূরা আহকাফ, ৪৬:৩১।
৫৪৩ সূরা আনফাল, ৮:২৪।
৫৪৪ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৭৩৭২।
৫৪৫ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩১৬৭।
৫৪৬ সহীহ, মুসলিম: হাদীস নং ৪৮৭৭।
৫৪৭ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৬১০।
৫৪৮ তাফসীর ইবনে কাসীর, ৪/১০১।
৫৪৯ সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০।
৫৫০ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৬৯৮০।
📄 উমামা বিনতে আবিল আস রা.
আজ আমরা এমন এক পুষ্পিত মানবীর জীবনচরিত নিয়ে আলোচনা করব মানুষের পৃথিবীতে যাঁর দৃষ্টান্ত মেলা ভার। তিনি রাসূল সা.-এর ঘরের একজন প্রিয়ভাজন ব্যক্তিত্ব। তাঁকে পিঠে নিয়ে নামায পড়েছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি তাঁকে অত্যধিক স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। এক পবিত্র ও নিষ্কলুষ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি।
এই মহীয়সী মানবী হলেন হযরত উমামা বিনতে আবিল আস রা.। তিনি হলেন যায়নাব বিনতে রাসূলিল্লাহ-এর আদরের মেয়ে। সহজেই অনুমান করা যায়, কেমন অনুপম পরিবারের সন্তান তিনি!
যেমন বৃক্ষ তেমন ফল
আমরা যদি এই ফলের পরিচয় নিতে চাই তাহলে সর্বাগ্রে আমাদের ফলের গাছটির দিকে নজর দিতে হবে। যেখান থেকে উৎপন্ন হয়েছেন তিনি। যাঁদের সান্নিধ্যে বেড়ে উঠেছেন:
✓ তাঁর নানা হচ্ছেন সায়্যিদুল আউয়্যালীন ওয়াল আখিরীন, রাসূলু রাব্বিল আলামীন মুহাম্মাদ সা.। যাঁকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন।
✓ তাঁর নানী হচ্ছেন উভয় জগতের নারী মহলের নেত্রী, উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা.। যিনি প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং সত্যয়ন করেছেন পরম সত্যবাদী ও আমানতদার নবী সা.কে।
✓ তাঁর মা হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর বড় মেয়ে, ধৈর্যশীলা, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারিণী হযরত যায়নাব রা.।
✓ তাঁর খালা হচ্ছেন ফাতিমা বিনতে রাসূলিল্লাহ। যিনি জান্নাতী নারীদের নেত্রী।
✓ তাঁর স্বামী হচ্ছেন আসাদুল্লাহিল গালিব হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা.
এই হচ্ছে হযরত উমামা বিনতে আবিল আস রা. এর ঈমানদীপ্ত পরিবার। যেখান থেকে তিনি ইসলামের সুমহান শিক্ষা লাভ করেছেন।
মা-বাবার ভালোবাসা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম হযরত খাদীজা রা.-কে বিয়ে করেন। তার গর্ভেই আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে সন্তান দান করেন। তন্মধ্যে যায়নাব রা. হচ্ছেন সবার বড় মেয়ে। যায়নাব রা.-এর স্বামী আবুল আস ইবনুর রবী' ইবনে আবদুল উয্যা ছিলেন যায়নাবের খালাতো ভাই। মা হযরত খাদীজার রা. আপন ছোট বোন হালা বিনতে খুওয়াইলিদের ছেলে।
বিয়ের সময় বাবা-মা মেয়েকে যে সকল উপহার সামগ্রী দিয়েছিলেন তার মধ্যে ইয়ামেনী আকীকের একটি হারও ছিল। হারটি দিয়েছিলেন মা খাদীজা রা.। তার নানা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী লাভ করে নবী হলেন। মেয়ে যায়নাব রা. তার মার সাথে মুসলমান হলেন। স্বামী আবুল আস তখন ইসলাম গ্রহণ করেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করলেন। পরে হযরত যায়নাব রা. স্বামীকে মুশরিক অবস্থায় মক্কায় রেখে মদীনায় হিজরত করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যায়নাব রা. ও আবুল আসের মধ্যের গভীর সম্পর্ক এবং ভদ্রোচিত কর্মপদ্ধতির প্রায়ই প্রশংসা করতেন।
মক্কায় ইসলামের শুরুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ অল্পসংখ্যক মুসলমানদের শক্তি তেমন মজবুত ছিল না। আর কাফেরদের যুলুম-অত্যাচারের প্লাবন ছিল সবেগে প্রবহমান। সঙ্গতকারণেই ইসলামের প্রচার-প্রসারের কর্মকাণ্ড খুবই ধীর গতিতে এগোচ্ছিল। এসব বিবেচনা করে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ না ঘটানোই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমীচীন মনে করেন।
আবুল আস স্ত্রী যায়নাব রা.-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং সম্মানও করতেন; কিন্তু তিনি পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে প্রিয়তমা স্ত্রীর নতুন দ্বীন কবুল করতে কোনোভাবেই রাজী হলেন না। এ অবস্থা চলতে লাগল। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কুরাইশদের মধ্যে মারাত্মক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত শুরু হয়ে গেল। কুরাইশরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল, তোমাদের সর্বনাশ হোক! তোমরা মুহাম্মাদের মেয়েদের বিয়ে করে তার দুশ্চিন্তা নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছ। তোমরা যদি এ সকল মেয়েকে তার কাছে ফেরত পাঠাতে তাহলে সে তোমাদের ছেড়ে তাদেরকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ত। তাদের মধ্যে অনেকে এ কথা সমর্থন করে বলল, এ তো অতি চমৎকার যুক্তি। তারা দল বেঁধে আবুল আসের কাছে গিয়ে বলল, আবুল আস, তুমি তোমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তার পিতার কাছে পাঠিয়ে দাও। তার পরিবর্তে তুমি যে কুরাইশ সুন্দরীকে চাও, আমরা তাকে তোমার সাথে বিয়ে দেব। আবুল আস বললেন, 'আল্লাহর কসম! না, তা হয় না। আমার স্ত্রীকে আমি ত্যাগ করতে পারি না। তার পরিবর্তে সকল নারী আমাকে দিলেও আমার তা পছন্দ নয়।' একারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার আত্মীয়তাকে খুব ভালো মনে করতেন এবং প্রশংসা করতেন।
বাবা যখন বদরের বন্দী
হযরত যায়নাব রা.ও স্বামী আবুল আসকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসা ও ত্যাগের অবস্থা নিম্নের ঘটনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
নবুয়তের তেরোতম বছরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। হযরত যায়নাব রা. স্বামীর সাথে মক্কায় থেকে যান। কুরাইশদের সাথে মদীনার মুসলমানদের সামরিক সংঘাত শুরু হলো। কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বদরে সমবেত হলো। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবুল আস কুরাইশদের সাথে বদলে গেলেন। কারণ, কুরাইশদের মধ্যে তার যে স্থান তাতে না গিয়ে উপায় ছিল না। বদরে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। তাদের বেশ কিছু নেতা নিহত হয় এবং বহু সংখ্যক যোদ্ধা বন্দী হয়। আর অবশিষ্টরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এই বন্দীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামাই হযরত যায়নাব রা.-এর স্বামী আবুল আসও ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর ইবনে নুমান রা. তাকে বন্দী করেন।
বন্দীদের সামাজিক মর্যাদা এবং ধনী-দরিদ্র প্রভেদ অনুযায়ী এক হাজার থেকে চার হাজার দিরহাম মুক্তিপণ নির্ধারিত হলো। বন্দীদের প্রতিনিধিরা ধার্যকৃত মুক্তিপণ নিয়ে মক্কা-মদীনা ছুটাছুটি শুরু করে দিল। নবী দুহিতা হযরত যায়নাব রা. স্বামী আবুল আসের মুক্তিপণসহ মদীনায় লোক পাঠালেন। আবুল আসের মুক্তিপণ নিয়ে মদীনায় এসেছিল তার ভাই আমর ইবনে রবী। হযরত যায়নাব মুক্তিপণ দিরহামের পরিবর্তে একটি হার পাঠিয়েছিলেন। এই হারটি তার জননী হযরত খাদীজা রা. বিয়ের সময় তাকে উপহার দিয়েছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারটি দেখেই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন এবং নিজের বিষণ্ণ মুখটি একটি পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেললেন। জান্নাতবাসিনী প্রিয়তমা স্ত্রী ও অতি আদরের মেয়ের স্মৃতি তার মানসপটে ভেসে উঠেছিল।
কিছুক্ষণ পর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন, 'যায়নাব তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে এই হারটি পাঠিয়েছে। তোমরা ইচ্ছে করলে তার বন্দীকে ছেড়ে দিতে পার এবং হারটিও তাকে ফেরত দিতে পার।'
সাহাবীরা রাজী হয়ে গেলেন। তারা আবুল আসকে মুক্তি দিলেন, আর সেই সাথে ফেরত দিলেন তার মুক্তিপণের হারটি। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবুল আসের নিকট থেকে এ অঙ্গীকার নিলেন যে, মক্কায় ফিরে অনতিবিলম্বে সে যায়নাবকে যেন মদীনায় পাঠিয়ে দেয়।
হিজরতকালে যায়নাবের দুর্দশা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাব রা.-কে নেওয়ার জন্য আবুল আসের সঙ্গে হযরত যায়িদ ইবনে হারিসা রা.-কে পাঠন। তাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করতে বলেন। যায়নাব রা. মক্কা থেকে সেখানে পৌঁছলে তাকে নিয়ে মদীনায় চলে আসতে বলেন। আবুল আস মক্কায় পৌঁছে যায়নাব রা.-কে সফরের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আছেন, এমন সময় হিন্দা বিনতে উতবা এসে হাজির হলো। প্রস্তুতি দেখে বলল, মুহাম্মাদের মেয়ে! তুমি কি তোমার বাপের কাছে যাচ্ছ? যায়নাব রা. বললেন, এই মুহূর্তে তো তেমন উদ্দেশ্য নেই, তবে ভবিষ্যতে আল্লাহর যা ইচ্ছ হয়। হিন্দা ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বলল, বোন, এটা গোপন করার কী আছে। সত্যিই যদি তুমি যাও তাহলে পথে দরকার পড়ে এমন কোনো কিছু প্রয়োজন হলে রাখঢাক না করে বলে ফেলতে পার, আমি তোমার সেবার জন্য প্রস্তুত আছি।
হযরত যায়নাব রা. বলেন, হিন্দা যা বলেছিল, অন্তরের কথাই বলেছিল। অর্থাৎ, আমার যদি কোনো জিনিসের প্রয়োজন হতো, তাহলে অবশ্যই সে তা পূরণ করত; কিন্তু সে সময়ের অবস্থা চিন্তা করে আমি অস্বীকার করি।
সফরের প্রস্তুতি শেষ হলে যায়নাব রা.-এর দেবর কিনানা ইবনে রবী একটি উট এনে দাঁড় করাল। যায়নাব উটের ফিঠের হাওদায় উঠে বসলেন। আর কিনানা স্বীয় ধনুকটি কাঁধে ঝুলিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি হাতে নিয়ে দিনে দুপুরে উট হাঁকিয়ে মক্কা থেকে বের হলো। কুরাইশদের মধ্যে হই চই পড়ে গেল। তারা ধাওয়া করে মক্কার অদূরে 'জী-তুওয়া' উপত্যকায় তাদের দুইজনকে ধরে ফেলল। কিনানা কুরাইশদের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে কাঁধের ধনুকটি হাতে নিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, তোমাদের কেউ যায়নাবের নিকটে যাওয়ার চেষ্টা করলে তার সিনা হবে আমার তীরের লক্ষ্যস্থল। কিনানা ছিল একজন দক্ষ তীরন্দাজ। তার নিক্ষিপ্ত কোনো তীর সচরাচর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। তার এ হুমকি শুনে আবু সুফইয়ান ইবনে হারব তার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে বলল, 'ভাতিজা, তুমি যে তীরটি আমাদের দিকে তাক করে রেখেছ, তা একটু ফেরাও। আমরা তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।' কিনানা তীরটি নামিয়ে নিয়ে বলল, কী বলতে চান, বলে ফেলুন। আবু সুফইয়ান বলল, 'তোমার কাজটি ঠিক হয়নি। তুমি প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে মানুষের সামনে দিয়ে যায়নাবকে নিয়ে বের হয়েছ, আর আমরা বসে বসে তা দেখছি। গোটা আরববাসী জানে, বদরে আমাদের কী দুর্দশা ঘটেছে এবং যায়নাবের বাপ আমাদের কী সর্বনাশটাই না করেছে। তুমি যদি এভাবে প্রকাশ্যে তার মেয়েকে আমাদের নাকের ওপর দিয়ে নিয়ে যাও তাহলে সবাই আমাদের কাপুরুষ ভাববে এবং এ কাজটি আমাদের জন্য অপমান বলে বিবেচনা করবে। তুমি আজ যায়নাবকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কিছুদিন সে স্বামীর ঘরে থাকুক। এদিকে লোকেরা যখন বলতে শুরু করবে যে, আমরা যায়নাবকে মক্কা থেকে যেতে বাধা দিয়েছি, তখন একদিন গোপনে তাকে তার বাপের কাছে পৌছে দিয়ো।
তাবারানী উরওয়া ইবনে যুবাইর হতে বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি যায়নাব বিনতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে মক্কা থেকে বের হলে কুরাইশদের দুই ব্যক্তি পিছু ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলে। তারা যায়নাব রা.-এর সঙ্গী লোকটিকে কাবু করে যায়নাব রা.-কে উটের পিঠ থেকে ফেলে দেয়। তিনি একটি পাথরের ওপর ছিটকে পড়লে শরীর ফেটে রক্ত বের হয়ে যায়। এ অবস্থা তারা যায়নাব রা.-কে মক্কায় আবু সুফইয়ানের নিকট নিয়ে যায়। আবু সুফইয়ান তাকে বনী হাশিমের মেয়েদের কাছে সোপর্দ করে। পরে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। উঠের পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ায় তিনি যে আঘাত পান, আমরণ সেখানে ব্যথা অনুভব করতেন এবং সেই ব্যথায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। এজন্য তাকে শহীদ মনে করা হতো।
যেহেতু স্বামী-স্ত্রী দুইজনের মধ্যেকার সম্পর্ক অতি চমৎকার ছিল, এ কারণে হযরত যায়নাব রা. মদীনায় চলে যাওয়ার পর আবুল আস বেশির ভাগ সময় খুবই বিমর্ষ থাকতেন।
হিজরী ৮ম সনে উমামা বিনতে আবিল আস রা.-এর মা এবং দ্বাদশ সনে পিতা ইন্তেকাল করেন।
বিশ্বনবী নানার স্নেহছায়ায়
নানা হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশু উমামাকে অত্যধিক স্নেহ করতেন। সব সময় তাকে সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন। এমনকি নামাযের সময়ও কাছে রাখতেন। মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কাঁধের ওপর বসিয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। রুকূতে যাওয়ার সময় কাঁধ থেকে নামিয়ে দিতেন। তারপর সিজদায় গিয়ে তাকে মাথার ওপর বসাতেন এবং সিজদা থেকে উঠার সময় কাঁধের ওপর নিয়ে আসতেন। এভাবে তিনি নামায শেষ করতেন। এ আচরণ দ্বারা উমামার প্রতি তার স্নেহের আধিক্য কিছুটা অনুমান করা যায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী হযরত আবু কাতাদা রা. বলেন, একদিন বেলাল আযান দেওয়ার পর আমরা যোহর, মতান্তরে আসরের নামাযের জন্য অপেক্ষায় আছি, এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমামা বিনতে আবিল আসকে কাঁধে বসিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযে দাঁড়ালেন এবং আমরাও তার পেছনে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলাম। উমামা তখনও তার নানার কাঁধে একইভাবে বসা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকূতে যাবার সময় তাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে রাখেন। রুকু-সিজদা শেষ করে যখন উঠে দাঁড়ালেন তখন আবার তাকে ধরে কাঁধের ওপর উঠিয়ে নেন। প্রত্যেক রাক'আতে এমনটি করে তিনি নামায শেষ করেন।
উমামার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্নেহের প্রবলতা আরেকটি ঘটনার দ্বারাও অনুমান করা যায়। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট মুক্তাখচিত স্বর্ণের একটি হার আসে। হারটি হাতে করে ঘরে এসে বেগমদের দেখিয়ে বলেন, দেখ তো, এটি কেমন? তারা সবাই বলেন, অতি চমৎকার! এর চেয়ে সুন্দর হার আমরা এর আগে আর দেখিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটি আমি আমার পরিবারের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি প্রিয় তার গলায় পরিয়ে দেব। আম্মাজান হযরত আয়েশা রা. মনে মনে ভাবলেন, না জানি তিনি এটা আমাকে না দিয়ে অন্য কোনো বেগমের গলায় পরিয়ে দেন কি না। অন্য বেগমগণও ধারণা করলেন, এটা হয়তো আয়েশা রা.-এর ভাগ্যেই জুটবে। এদিকে বালিকা উমামা তার নানা ও নানীদের অদূরেই মাটিতে খেলছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগিয়ে গিয়ে তার গলায় হারটি পরিয়ে দেন।
হযরত উমামা রা.-এর পিতা আবুল আস ইবনে রবী রা. হিজরী ১২ সনে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার মামাতো ভাই যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা.-এর সাথে উমামার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা বলে যান। এদিকে উমামার খালা হযরত ফাতিমা রা.ও ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্বামী আলীকে বলে যান, তার পরে তিনি যেন উমামাকে বিয়ে করেন। অতঃপর উমামার বিয়ের বয়স হলো। যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. হযরত ফাতিমার রা. অন্তিম ইচ্ছা পূরণের জন্য উদ্যোমী হলেন। তাঁরই মধ্যস্থতায় আলীর রা. সাথে উমামার রা. বিয়ে সম্পন্ন হলো। তখন আমীরুল মুমিনীন উমর রা.-এর খিলাফতকাল।
হিজরী ৪০ সন পর্যন্ত তিনি আলীর রা. সাথে বৈবাহিক জীবন-যাপন করেন। অবশেষে হিজরী ৪০ সনে তিনি আততায়ীর হাতে মারাত্মকভাবে আহত হন। এই আঘাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্ত্রী উমামাকে বলেন, আমার পরে যদি তুমি কোনো পুরুষের প্রয়োজন বোধ কর, তাহলে মুগীরা ইবনে নাওফালকে বিয়ে করতে পার। তিনি মুগীরাকেও বলে যান, তার মৃত্যুর পর তিনি যেন উমামাকে বিয়ে করেন।
এই মুগীরার স্ত্রী থাকা অবস্থায় মু'আবিয়ার রা. খিলাফতকালে তিনি ইন্তেকাল করেন। আলীর রা. ঘরে উমামা রা.-এর কোনো সন্তান হয়নি। তবে মুগীরা রা.-এর ঘরে তিনি এক ছেলের মা হন এবং তার নাম রাখেন ইয়াহইয়া। এ জন্য মুগীরা রা.-এর ডাকনাম হয় আবু ইয়াহইয়া।
তবে অনেকে বলেছেন, মুগীরার ঘরেও তিনি কোনো সন্তানের মা হননি। তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যাদের মধ্যে একমাত্র ফাতিমা রা. ছাড়া আর কারও বংশধারা অব্যাহত নেই। হতে পারে মুগীরার ঔরসে ইয়াহইয়া নামের এক সন্তানের জন্ম দেন।
অতঃপর হযরত উমামা রা.ও এক সময় সাড়া দেন মহান প্রভুর ডাকে। চলে যান নানা রাসূলুল্লাহ সা., নানী খাদীজা রা., মা যায়নাব রা. ও বাবা আবুল আস রা.-এর সান্নিধ্যে। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৫৫১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৪৬।
৫৫২. সুনান, আবু দাউদ, ১/২২২।
৫৫৩. তাবারী, ৩/১৩৬; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫২।
৫৫৪. আনসাবুল আশরাফ, ১/২৬৯।
৫৫৫. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫৩।
৫৫৬. আল-বিদায়া ওয়াননিহায়াহ, ৩/৩৩০; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫৪-৬৫৫।
৫৫৭. আনসাবুল আশরাফ: ১/৩৫৭, ৩৯৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা ২/২৪৭; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫৭; হায়াতুস সাহাবাহ, ১/৩৭১।
৫৫৮. তারাজিমু সায়্যিদাতি বায়াতিন নুবুওয়াহ, ৫৩৬-৫৩৭।
৫৫৯. সুনান, নাসায়ী, ২/৪৫, ৩/১০; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৩২; আল ইসাবাহ, ৪/২৩৬।
৫৬০. আল ইসতিআব, ৪/২৩৮; উসুদুল গাবা, ৫/৪০০।
৫৬১. উসুদুল গাবাহ, ৫/৪০০।
📄 রুবায়্যি বিনতে মুআত্তাওবিয রা.
ইসলাম মানবজাতিকে বিস্ময়কর এক একটি নারী উপহার দিয়েছে যাঁদের জীবনকথা মনুষ্যত্ব সাধনায় মানুষকে চিরকাল প্রেরণা দেয়। এমন এক অবিস্মরণীয় চরিত্র হলেন হযরত রুবায়্যি বিনতে মুআওবিয রা.। যে সকল আনসার পরিবার ইসলামরে সেবায় মহান ভূমিকা পালন করেছে, তার পরিবারটি এর অন্তর্গত। রুবায়্যি বিনতে মুআওবিয রা. এমন এক গর্বিত নারী যিনি দ্বীনের জন্য নিজের জীবনের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। বাইআতে রিযওয়ানের সেই সৌভাগ্যমতি শপথগ্রহণকারীদের অন্যতম তিনি।
প্রথম পর্বে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ইসলাম ও মক্কা থেকে আগত মুসলমানদের সেবায় এই পরিবারটির রয়েছে গৌরবময় অবদান। তার পিতা হলেন মুআওবিষ ইবনে আফরা আহলে বদরের অন্তর্ভুক্ত।
মুআয বিন রিফাআ ইবনে রাফে' যুরাকী রহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা বদর যুদ্ধে যোগদানকারীদের একজন। তিনি বলেন, একবার জিবরাঈল আ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললেন, 'আপনারা বদর যুদ্ধে যোগদানকারী মুসলিমদের কীরূপ গণ্য করেন?' তিনি বললেন, 'তারা সর্বোত্তম মুসলিম' অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) এরূপ কোনো শব্দ তিনি বলেছিলেন। জিবরাঈল আ. বললেন, 'ফেরেশতাদের মধ্যে বদর যুদ্ধে যোগদানকারীগণও তেমনই মর্যাদার অধিকারী।'
মদীনার যে ছয় ব্যক্তি মক্কায় গিয়ে প্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে গোপনে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করেন রুবায়্যি-এর চাচা আওফ তাদের একজন। তিনি একজন আকাবীও অর্থাৎ, আকাবার দুইটি বাইআতের অংশীদার। তার পিতা মুআওবিয ও অপর চাচা মুআয রা. আকাবার প্রথম বাইআতে অংশগ্রহণ করেন।
রুবায়্যি বিনতে মুআওবিয রা.-এর তখন বাল্যকাল। এমন সময়ে যখন ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের দামামা বেজে উঠল, তখন রুবায়্যি বিনতে মুআওবিয রা.-এর পিতা সাগ্রহে এতে অংশ নেন এবং বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে যুগের নিয়ম অনুযায়ী কুরাইশ পক্ষ মুসলিম পক্ষের বীর যোদ্ধাদের দ্বৈতযুদ্ধে আহ্বান করল। তাদের একই পরিবারের তিনজন সেরা অশ্বারোহী বীর উতবা ও শায়বাহ বিন রাবীআহ এবং ওয়ালীদ বিন উতবা এগিয়ে এলো। জবাবে মুসলিম পক্ষ হতে মুআয ও মুআওবিয ইবনে আফরা রা. কিশোর দুই ভাই ও আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা রা.-এই তিনজন আনসার তরুণ যুবক বীরদর্পে এগিয়ে গেলেন; কিন্তু কুরাইশ পক্ষ বলে উঠল, হে মুহাম্মাদ, আমাদের স্বগোত্রীয় সমকক্ষদের পাঠাও। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হে ওবায়দাহ, হে হামযাহ, হে আলী, তোমরা যাও। অতঃপর আলী তার প্রতিপক্ষ ওয়ালীদ বিন উতবাহকে, হামযাহ তার প্রতিপক্ষ শায়বাহ বিন রাবীআহকে এক নিমিষেই খতম করে ফেললেন। ওদিকে বৃদ্ধ ওবায়দাহ ইবনুল হারিস তার প্রতিপক্ষ উতবা বিন রাবীআহর সঙ্গে যুদ্ধে আহত হলেন। তখন আলী ও হামযাহ তার সাহায্যে এগিয়ে এসে উতবাহকে শেষ করে দেন ও ওবায়দাহকে উদ্ধার করে নিয়ে যান; কিন্তু অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে যুদ্ধশেষে মদীনায় ফেরার পথে ৪র্থ বা ৫ম দিন ওবায়দা শাহাদাত বরণ করেন।
প্রথম আঘাতেই সেরা তিনজন বীরযোদ্ধা ও গোত্র নেতাকে হারিয়ে কুরায়েশ পক্ষ মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এ সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকটে আকুলভাবে নিম্নোক্ত প্রার্থনা করেন,
اللَّهُمَّ أَنْجِزْ لِي مَا وَعَدْتَنِي اللَّهُمَّ إِنِّي أَنْشُدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ ... اللَّهُمَّ إِنْ تَهْلِكُ هَذِهِ الْعِصَابَةُ لَا تُعْبَدُ فِي الْأَرْضِ بَعْدَ الْيَوْمِ أَبَدًا
হে আল্লাহ, তুমি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছিলে তা পূর্ণ করো। হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে তোমার অঙ্গীকার ও ওয়াদা পূরণের প্রার্থনা জানাচ্ছি।... হে আল্লাহ, যদি এই ক্ষুদ্র দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আজকের দিনের পরে তোমার ইবাদত করার মতো কেউ আর ভূপৃষ্ঠে থাকবে না।
তিনি প্রার্থনায় এমন আত্মভোলা ও বিনয়ী হয়ে দুআ করছিলেন যে, তার কাঁধ থেকে চাদর পড়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে আবু বকর ছুটে এসে তার চাদর উঠিয়ে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
حَسْبُكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ، فَقَدْ أَلْحَحْتَ عَلَى رَبِّكَ
হে রাসূল, যথেষ্ট হয়েছে, আপনার পালনকর্তার নিকটে আপনি চূড়ান্ত প্রার্থনা করেছেন।
এ সময় আয়াত নাযিল হলো,
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ
যখন তোমরা তোমাদের পালনকর্তার নিকটে কাতর প্রার্থনা করছিলে, তখন তিনি তোমাদের দুআ কবুল করলেন। আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা, যারা হবে ধারাবাহিকভাবে অবতরণকারী।
মুসলিমবাহিনীর এই হামলার প্রচণ্ডতার সাথে সাথে যোগ হয় ফেরেশতাগণের হামলা। ইকরিমা বিন আবু জাহেল (যিনি ওই যুদ্ধে পিতার সাথে শরীক ছিলেন এবং মক্কা বিজয়ের পরে মুসলমান হন) বলেন, ওইদিন আমাদের লোকদের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যেত, অথচ দেখা যেত না কে মারল। আবু দাউদ আল মাযেনী বলেন, আমি একজন মুশরিক সৈন্যকে মারতে উদ্যত হব। ইতোমধ্যে তার ছিন্ন মস্তক আমার সামনে এসে পড়ল। আমি বুঝতেই পারলাম না, কে ওকে মারল। রাসূলের চাচা আব্বাস যিনি বাহ্যিকভাবে মুশরিকবাহিনীতে ছিলেন, জনৈক আনসার তাকে বন্দী করে আনলে, তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমাকে এ ব্যক্তি বন্দী করেনি; বরং যে ব্যক্তি বন্দী করেছে, তাকে এখন দেখতে পাচ্ছি না। তিনি একজন চুলবিহীন মাথাওয়ালা ও সুন্দর চেহারার মানুষ এবং বিচিত্র বর্ণের একটি সুন্দর ঘোড়ায় তিনি সওয়ার ছিলেন। আনসার বললেন, হে রাসূল, আমিই তাকে বন্দী করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত আনসারকে বললেন,
اسْكُتْ فَقَدْ أَيْدَكَ اللَّهُ بِمَلَكَ كَرِيمٍ
চুপ করো। আল্লাহ এক সম্মানিত ফেরেশতা দ্বারা তোমাকে সাহায্য করেছেন।
কোনো কোনো হাদীসে এসেছে যে, ফেরেশতারা কোনো মুশরিকের উপরে আক্রমণ করার ইচ্ছা করতেই আপনা-আপনি তার মস্তক দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
মুসলিমবাহিনীর দুর্ধর্ষ আক্রমণে পর্যুদস্ত মুশরিক বাহিনী প্রাণভয়ে পালাতে থাকল। এ দৃশ্য দেখে তাদের ধরে রাখার জন্য আবু জাহেল তার লোকদের উদ্দেশ্যে জোরালো ভাষণ দিয়ে বলে উঠল, 'উতবা, শায়বা, ওয়ালীদের মৃত্যুতে ভীত হওয়ার কারণ নেই। কেননা, তাড়াহুড়োর মধ্যে তারা মারা পড়েছেন। লাত ও উয্যার শপথ করে বলছি, ওদেরকে শক্ত করে রশি দিয়ে বেঁধে না ফেলা পর্যন্ত আমরা ফিরে যাব না। অতএব, তোমরা ওদেরকে মেরো না; বরং ধরো এবং বেঁধে ফেলো।'
কিন্তু আবু জাহেলের এই তর্জন-গর্জন অসার প্রমাণিত হলো। আনসারদের বনু সালামাহ গোত্রের কিশোর দুই ভাই মুআয ও মুআওবিয ইবনে আফরা তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল এবং মুআয প্রথম আঘাতেই আবু জাহেলের পা তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। এ সময় তার কাঁধে ইকরিমা বিন আবু জাহেলের তরবারির আঘাতে মুআযের একটি হাত কেটে ঝুলতে থাকলে সে নিজের পা দিয়ে চেপে ধরে এক টানে সেটাকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। তারপর ছোট ভাই মুআওবিযের আঘাতে আবু জাহেল ধরাশায়ী হলে তারা উভয়ে রাসূলের কাছে এসে গর্বভরে বলে উঠলো, 'হে রাসূল, আবু জাহেলকে আমি হত্যা করেছি।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমাদের তরবারি মুছে ফেলেছ কি?' তারা বলল, 'না।'
তারপর উভয়ের তরবারি পরীক্ষা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা উভয়ে তাকে হত্যা করেছ।' অবশ্য এই যুদ্ধে মুআওবিয বিন আফরা পরে শহীদ হন এবং মুআয বিন আফরা হযরত উসমানের খেলাফতকাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।
হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রথম আমিই কিয়ামতের দিন দয়াময়ের সামনে বিবাদ মীমাংসার জন্য হাঁটু গেড়ে বসবো।
কায়স ইবনে উবাদ রা. বলেন, এদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে, هُذَانِ خَصْمَانِ اخْتَصَمُوا فِي رَبِّهِمْ 'এরা দু-টি বিবদমান পক্ষ তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে বিতর্ক করে। তিনি বলেন, (মুসলিম পক্ষের) তারা হলেন হামযা, আলী ও উবাইদাহ অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) আবু উবাইদা ইবনুল হারিস রা. (অপর পক্ষে) শায়বা বিন রাবীআহ, 'উতবা বিন রাবীআহ এবং ওয়ালীদ ইবনে উতবা-যারা বদর যুদ্ধের দিন পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।
আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আমি বদরযুদ্ধে সারিতে দাঁড়িয়ে আছি, আমি আমার ডানে বামে তাকিয়ে দেখলাম, অল্প বয়স্ক দু-জন আনসার যুবকের মাঝখানে আছি। আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাদের চেয়ে শক্তিশালীদের মধ্যে থাকি। তখন তাদের একজন আমাকে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, চাচা! আপনি কি আবু জাহেলকে চেনেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তবে ভাতিজা, তাতে তোমার দরকার কী? সে বলল, আমাকে জানানো হয়েছে যে, সে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালাগালি করে। সে মহান সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ। আমি যদি তাকে দেখতে পাই, তবে আমার দেহ তার দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হবে না যতক্ষণ না আমাদের মধ্যে যার মৃত্যু আগে নির্ধারিত, সে মারা যায়। আমি তার কথায় আশ্চর্য হলাম। তা শুনে দ্বিতীয়জন আমাকে খোঁচা দিয়ে ওই রকমই বলল।
তৎক্ষণাৎ আমি আবু জাহেলকে দেখলাম, সে লোকজনের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন আমি বললাম, এই যে তোমাদের সেই ব্যক্তি-যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে। তারা তৎক্ষণাৎ নিজের তরবারি নিয়ে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাকে আঘাত করে হত্যা করল। অতঃপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে ফিরে এসে তাকে জানাল। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছে? তারা উভয়ে দাবি করল, আমি তাকে হত্যা করেছি। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের তরবারি তোমরা মুছে ফেলনি তো? তারা উভয়ে বলল, না। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উভয়ের তরবারি দেখলেন এবং বললেন, তোমরা উভয়ে তাকে হত্যা করেছ। অবশ্য তার নিকট হতে প্রাপ্ত মালামাল মুআয ইবনে আমর ইবনে জামূহের জন্য। তারা দু-জন হলো, মুআয ইবনে আফরা ও মুআয ইবনে আমর ইবনে জামূহ রা.।
আবু জাহেল যে কিনা এই উম্মতের ফিরআউন অভিধায় ভূষিত, বদরে তাকে আফরা'র দুই ছেলে হত্যা করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেক দুআর অধিকারী হন। তিনি দুআ করেন, 'আল্লাহ আফরা'র দুই ছেলের প্রতি দয়া ও করুণা বর্ষণ করুন যারা এই উম্মাতের ফিরআউন আবু জাহেলকে হত্যায় অংশগ্রহণ করেছে।
আবু জাহেলকে হত্যার পর তারা বীর বিক্রমে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই বদরেই রুবাইয়্যি রা.-এর মহান পিতা মুআওবিয রা. শাহাদাত বরণ করেন।
আবু জাহেলকে হত্যার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাকে হত্যার সঙ্গে তাদের দুইজনের সঙ্গে আর কে ছিল? বললেন, ফেরেশতাগণ এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ শেষ আঘাত হানে।
আবু জাহেলের হত্যার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু জাহেলের অবস্থা কি তা কেউ দেখে আসতে পারবে কি? ইবনে মাসউদ রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি যাচ্ছি। তিনি গিয়ে দেখেন আফরার দুই ছেলে তাকে এমন আঘাত হেনেছে যে, সে একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে।
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরতের পূর্বে আমাদের আজকের আলোচিত মহীয়সী সাহাবিয়া হযরত রুবায়্যি রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তিনি একজন কিশোরী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে কুবায় এসে উঠলেন। সেখানে তিন দিন অবস্থানের পর মদীনার কেন্দ্রস্থলের দিকে যাত্রা করেন এবং মসজিদে নববীর পাশে হযরত আবু আইউব আনসারী রা.-এর গৃহে ওঠেন। তার এই শুভাগমনে গোটা মদীনা আনন্দে দাঁড়িয়ে নেচে-গেয়ে তাকে স্বাগতম জানায়। তাদের স্বাগত সঙ্গীতের একটি চরণ ছিল এরকম: 'আমরা বনু নান-নাজ্জারের কিশোর-কিশোরী। কি মজা! মুহাম্মাদ আমাদের প্রতিবেশী।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা কি আমাকে ভালোবাস? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আল্লাহ জানেন, আমার অন্তর তোমাদের ভালোবাসেন। অনেকে বলেছেন, এই কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে রুবায়্যিও ছিলেন।
বয়স বাড়ার সাথে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ইসলামের প্রচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি নানাভাবে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। বিভিন্ন দৃশ্যপটে তাকে উপস্থিত দেখা যায়। ইসলামের সেবায় অতুলনীয় ত্যাগের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই পরিবারের সদস্যদের বিশেষ মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন। সব সময় হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও সুখ-সুবিধার খোঁজ-খবর রাখতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাজা খেজুরের সাথে কচি শশা খেতে পছন্দ করতেন। রুবায়্যি বলেন, আমার পিতা মুআওবিয ইবনে আফরা রা. একটি পাত্রে এক সা তাজা খেজুর ও তার ওপর কিছু কচি শশা দিয়ে আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পাঠান। তিনি শশা পছন্দ করতেন। সেই সময় বাহরাইন থেকে রাসূলেল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট কিছু গহনা এসেছিল। তিনি তার থেকে একটি গহনা নিয়ে আমাকে দেন। অপর একটি বর্ণনায় স্বর্ণের কথা এসেছে। তারপর বলেন, এ দিয়ে সাজবে। অথবা বলেন, এ দিয়ে গহনা বানিয়ে পরবে।
তাঁর বিয়ের দিন সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বাড়িতে যান এবং তার বিছানায় বসেন। পরবর্তী জীবনে রুবায়্যি রা. অত্যন্ত গর্বের সাথে সেকথা বলেছেন এভাবে : ‘আমার বিয়ের দিন সকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বাড়িতে এসে আমার ঘরে প্রবেশ করেন এবং বিছানায় বসেন। আমাদের ছোট ছোট মেয়েরা দফ বাজিয়ে বদর যুদ্ধে নিহত আমার বাপ-চাচাদের প্রশংসামূলক গীত সুর করে গাচ্ছিল। এর মধ্যে একজন গাইল, আমাদের নবী আছেন যিনি ভবিষ্যতের কথা জানেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'এটা বাদ দাও। আগে তোমরা যা বলছিলে তাই বলো। কেননা, এটা একমাত্র আল্লাহ তাআলার বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
قُلْ لَّا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَ مَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ
বলো, আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও যমীনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না। আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
قُلْ لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَ لَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَا اسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
বলো, আমি আমার নিজের কোনো উপকার ও ক্ষতির ক্ষমতা রাখি না, তবে আল্লাহ যা চান। আর আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলে অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোনো ক্ষতি স্পর্শ করত না। আমি তো একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা এমন কওমের জন্য যারা বিশ্বাস করে।
আবু জাহলের ঘাতক তার মহান পিতাকে নিয়ে রুবায়্যি রা.-এর গর্বের অন্ত ছিল না। আবু জাহলের নিকতাত্মীয় আসমা বিনতে মাখরামার সাথে তার একটি ঘটনা দ্বারা একথা প্রমাণিত হয়। রুবায়্যি রা. বলেন, 'আমি উমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর খিলাফতকালে একদিন কয়েকজন আনসারী মহিলার সাথে আবু জাহলের নিকটাত্মীয় আসমা বিনতে মাখরামামর নিকট গেলাম। আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবীআ (আবু জাহলের বৈপিত্রেয় ভাই) ছিল তার আরেক ছেলে। তিনি ইয়ামেন থেকে মদীনায় তার মা আসমার নিকট আতর পাঠাতেন, আর তিনি তা বিক্রি করতেন। আমরাও তার নিকট থেকে আতর কিনতাম। সেদিন আমার শিশিতে আতর ভরে ওজন দিলেন, যেমন আমার সাথীদের আতর ওজন দিয়েছিলেন। তারপর বললেন, আপনাদের কার নিকট কত পাওনা থাকল তা লিখিয়ে দিন। আমি বললাম, রুবায়্যি বিনতে মুআওবিযের পাওনা লিখুন।
আসমা আমার নাম শুনেই বলে উঠল, 'হালকা!' শব্দটি অভিশাপমূলক। অর্থাৎ, গলায় যন্ত্রণা হয়ে তোমার মরণ হোক। তারপর বললেন, তুমি কি কুরাইশ নেতার হত্যাকারীর মেয়ে? বললাম, নেতার নয়, তাদের দাসের হত্যাকারীর মেয়ে। বললেন, আল্লাহর কসম! তোমার নিকট আমি কিছুই বিক্রি করব না। আমিও বললাম, আল্লাহর কসম! আমিও আপনার নিকট থেকে আর কখনো কিছু কিনবো না।
যুদ্ধের ময়দানে রুবায়্যি রা.-এর পিতা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জিহাদের সূচনা করেন, তার মেয়ে হিসেবে তিনি সে ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। পিতার রক্ত তার ধমনীতে প্রবাহিত ছিল। তাই তার মধ্যে ছিল জিহাদে গমনের অদম্য স্পৃহা। জিহাদের সীমাহীন গুরুত্ব তিনি পূর্ণরূপে অনুধাবন করেন। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে বেশ কিছু জিহাদে যোগ দেন। ইবনে কাসীর রহ. বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে জিহাদে যেতেন। আহতদের ঔষধ সেবন এবং ক্ষত-বিক্ষতদের পানি পান করাতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে জিহাদে যেতাম। মুজাহিদদের পানি পান করাতাম, তাদের সেবা করতাম এবং আহত-নিহতদের মদীনায় পাঠাতাম।
হুদায়বিয়াতে মক্কার পৌত্তলিকদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেই চৌদ্দশো মাজাহিদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জীবন বাজি রাখার যে বাইআত অনুষ্ঠিত হয়, তিনিও সে বাইআত করেন। এ বাইআতকে বাইআতে রিযওয়ান ও বাইআতে শাজারা বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এ বাইআতের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে এ বাইআতকে খুবই পছন্দ করেছেন তা কুরআন ও হাদীসের বাণীতে স্পষ্ট জানা যায়। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَنْ نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنْكُثُ عَلَى نَفْسِهِ وَ مَنْ أَوْفَى بِمَا عُهَدَ عَلَيْهِ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
যারা তোমার হাতে বাইআত করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বাইআত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর। অতঃপর যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করার পরিণাম তারই এবং যে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পূর্ণ করে তিনি অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দেন।
এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে হাত রেখে বাইআত করাকে আল্লাহর হাতে হাত রেখে বাইআত করা বলা হয়েছে। এতে এ বাই’আতের বিরাট গুরুত্ব প্রমাণিত হয়। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বাইআতের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, 'বৃক্ষের নীচে বাইআতকারীদের কেউই জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুবায়্যি'উ-এর বাড়িতে ওযু করেন। কীভাবে তিনি ওযু করেছিলেন, রুবায়্যি রা. তা প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তা বর্ণনা করতেন। সে বর্ণনা শোনার জন্য বহু মানুষ তার নিকট আসতেন। একবার আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আসেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওযুর অবস্থা বর্ণনা করার অনুরোধ জানান।
কেবল জিহাদে গমনের ক্ষেত্রেই তার প্রবল আগ্রহ ছিল তা নয়, শরীয়তের বিভিন্ন বিষয় জানা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী শোনা ও আচরণ পর্যবেক্ষণেও তার ছিল সমান আগ্রহ। আর এ উদ্দেশ্যে তিনি প্রায়ই উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট যেতেন। তিনি রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহচর্য যেমন পেয়েছেন তেমনি তাঁর হাদীসও বর্ণনা করেছেন।
উঁচু স্তরের অনেক আলিম তাবেয়ী তাঁর নিকট হাদীস শুনেছেন এবং তাঁর সূত্রে বর্ণনাও করেছেন। সেই সকল বিখ্যাত তাবিয়ীদের কয়েকজন হলেন, সুলায়মান ইবনে ইয়াসার ও আবু সালামা ইবনে আবদির রহমান। এ দুইজন হলেন সাতজন প্রথম সরির আলিম তাবেয়ীর অন্তর্গত। তাছাড়া আবু উবায়দা মুহাম্মাদ ইবনে আম্মার ইবনে ইয়াসির, ইবনে উমারের রা. আযাদকৃত দাস নাফে', উবাদা ইবনে আল-ওয়ালীদ ইবনে উবাদা ইবনে আস-সামিত রা., খালিদ ইবনে যাকওয়ান, আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আকীল, আয়েশা বিনতে আনাস ইবনে মালিক প্রমুখ।
হযরত রুবায়্যি রা. দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তিনি হিজরী ৭০ সনের পরে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের খিলাফতকালে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৫৬২. মুসতাদরাকে হাকিম।
৫৬৩. সূরা হজ, ২২:১৯।
৫৬৪. সহীহ, বুখারী, ৩১৪১; সহীহ, মুসলিম: ৪২, ১৭৫২।
৫৬৫. আসসীরাতুন নববিয়্যা, ১/৩৮৯।
৫৬৬. আল ইসতিবসার, ৬৬।
৫৬৭. উয়ূনুল আসার, ১/৩১৫; সীরাতে হালরিয়্যা, ২/৪৩৩।
৫৬৮. নিসাউম মিন আসারিন নুবুওয়াহ: ১৫০, ১৫১।
৫৬৯. সহীহ, বুখারী, ৯/৪৯৫; সহীহ, মুসলিম: ২০৪৩; সুনান, আত-তিরমিযী, ১৮৪৫ ও সুনান, ইবনে মাজাহ, ৩৩২৫।
৫৭০. সহীহ, বুখারী, ৫১৪৭; সুনান, তিরমিযী: ১০৯০; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৩২৮।
৫৭১. সূরা নামাল, ২৭:৬৫।
৫৭২. সূরা আ'রাফ, ৭:১৮৮।
৫৭৩. ইসাবাহ, ৪/২৩২; তাবাকাতে ইবন সাআদ, ৪/১২৯।
৫৭৪. সিফাতুস সাফওয়া, ২/৭১।
৫৭৫. সূরা ফাতহ, ৪৮:১০।
৫৭৬. সহীহ, মুসলিম, ২৪৯৬।
৫৭৭. তাফসীরে কুরতুবী, ৬/৮৯।
৫৭৮. বানাতুস সাহাবাহ, ১৬৭, ১৬৮।
৫৭৯. তাহযীবুত তাহযীব, ১২/৪১৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৩/১৯৮।
📄 উম্মুল ফযল লুবাবা বিনতুল হারিস রা.
প্রতিটি মুমিনের অন্তরেই তার প্রকৃত মাহবুব হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভক্তি শ্রদ্ধা ও প্রীতি-ভালোবাসার সর্বোচ্চ স্থান দখল করে আছেন। কারণ, তিনিই যে মুমিনের প্রকৃত প্রেমাস্পদ এবং মাহবুব, তাঁরই প্রেম-মাধুরী মুমিনের অন্তরে শক্তি ও সাহস যোগায়, জীবনীশক্তিহীন আত্মায় নবচেতনার সঞ্চার করে। মানুষ যখন আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয় বিস্মৃত হয়ে অধঃপতনের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছিল, মানবতার এমনি এক দুর্দিনে বিশ্বমানবের প্রকৃত সুহৃদ ও কল্যাণকামী, ত্রাণকর্তা ও মুক্তিদাতা হযরত মুহম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুক্তির জিয়নকাঠি নিয়ে আবির্ভূত হন। আত্মভোলা মানুষকে তিনি আত্মোপলব্ধির আহবান জানান, পথহারা মানুষকে তিনি দান করেন সঠিক পথের সন্ধান। তার প্রদর্শিত পথের পথিক হয়েই মুমিন আত্মপরিচয় লাভে ধন্য হয়েছে, পেয়েছে মুক্তিপথের সন্ধান। তাই তার অন্তরে এই মহামানবের প্রতি এত শ্রদ্ধা, ভক্তি ও প্রেমসুধার অন্তহীন ফল্গুধারা সদা প্রবাহিত। দুনিয়ার যে কোনো ব্যক্তি ও বস্তুর তুলনায় তাঁরই প্রতি মুমিনের সর্বাধিক হৃদ্যিক আকর্ষণ। কারণ, তাঁরই বদৌলতে মুমিন তার হারানো সম্পদ ফিরে পেয়েছে, স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে তার সান্নিধ্য লাভের পথ খুঁজে পেয়েছে।
চরম অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও অপমানিত জিন্দেগীর গ্লানিমুক্ত হয়ে উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ জিন্দেগীর আস্বাদ ফিরে পেয়েছে। জগতের বুকে নিজেদের জন্যে এক মর্যাদাপূর্ণ আসন নির্ণয় করে নিতে সক্ষম হয়েছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও চারিত্রিক দিক থেকে একটি উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে স্থান অধিকার করে নেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। আর এই সব কিছুই সম্ভব হয়েছে নবী হযরত মুহম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বদৌলতে। কারণ, তিনিই বিশ্ববাসীকে এক উন্নত জীবনবিধান, এক উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থা ও উন্নত সভ্যতা উপহার দিয়েছেন। মুসলিমগণ এই সম্পদে সম্পদশালী হয়েই গৌরব ও মর্যাদার আসনে সমাসীন হয়েছে। কাজেই মুসলিম মিল্লাতের সকল প্রকার গৌরব ও মর্যাদার উৎসই হচ্ছেন নবী মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আমাদের ঈমান ও বিশ্বাস হলো, ইসলাম ধর্ম হিসেবে আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত এক রব্বানী হিদায়াত, সমাজ ও রাষ্ট্র হিসেবে নির্ভরস্থল একমাত্র নবী মুহম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র সত্তা।
আল্লাহপাক আমাদের সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালতের বদৌলতেই আমাদের অন্তরে তাওহীদের জীবন সঞ্চার হয়েছে। তৎপূর্বে আমরা মূলত শব্দহীন অক্ষর বিশেষের ন্যায়ই ছিলাম। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালত তা সুবিন্যস্ত করে অর্থবহ শব্দে রূপান্তরিত করেছে। রিসালতের দ্বারাই জগতে আমাদের অস্তিত্বে স্থায়িত্ব, রিসালতের মাধ্যমেই আমাদের ধর্ম ও আইন-কানুন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَأَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمْ بُرْهَانٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَ أَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُّبِينًا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَاعْتَصَمُوا بِهِ فَسَيْدُ خِلُهُمْ فِي رَحْمَةٍ مِّنْهُ وَفَضْلٍ وَيَهْدِيهِمْ إِلَيْهِ صِرَاطًا مُسْتَقِيمَانَ
হে মানুষ, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের নিকট স্পষ্ট আলো নাযিল করেছি। অতঃপর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাকে আঁকড়ে ধরেছে তিনি অবশ্যই তাদেরকে তার পক্ষ থেকে দয়া ও অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন এবং তার দিকে সরল পথ দেখাবেন।
আজ আমরা এমন এক মহীয়সী সাহাবিয়ার জীবনকথা আলোচনা করব যিনি ইসলামের প্রারম্ভলগ্নে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। ইসলামের হকের কথা শোনার সাথে সাথে তিনি আর দেরি করেননি, সাড়া দেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর ডাকে।
গৌরব ও মর্যাদার জননী
এই মহীয়সী সাহাবিয়া হচ্ছেন হযরত উম্মুল ফযল লুবাবা বিনতুল হারিস রা.। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহতারাম চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব রা. তাকে বিয়ে করেন। সুতরাং উম্মুল ফযল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন সম্মানিত চাচী। হযরত আব্বাস রা.-এর ছেলে-মেয়েরা হচ্ছেন, ফযল, আবদুল্লাহ, উবাইদুল্লাহ, মা'বাদ, কুসাম, আবদুর রহমান ও উম্মে হাবীব। তিনি সকলের গর্ভধারিণী মা। আরব কবি আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ হিলালী বলেছেন, 'উম্মুল ফাদলের গর্ভের ছয় সন্তানের মতো কোনো সন্তান আরবের কোনো মহীয়সী নারী জন্মদান করেননি।
তাঁর অনেকগুলো সহোদর, বৈপিত্রেয় ও বৈমাত্রেয় ভাই-বোন ছিলেন, যাঁদের অনেকে বিভিন্ন দিক দিয়ে ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন। যেমন মায়মূনা বিনতে হারিস যিনি লুবাবাতুস সুগরা নামে পরিচিত, প্রখ্যাত সাহাবী ও সেনানায়ক খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর গর্বিত মা। আযযা বিনতে হারিস ও হুযাইলা বিনতে হারিস। শেষোক্ত তিনজন তার বৈমাত্রের বোন। আর মাহমিয়্যা ইবনে জাযাআ আয যুবাইদী, সুলমা, আসমা ও সালামা- সবাই তার বৈপিত্রেয় ভাই-বোন।
সুতরাং দেখা গেল, তিনি উম্মুল মুমিনীন মায়মূনার আপন বোন ও সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালীদের খালা। বোন সালমা ছিলেন হযরত হামযা রা.-এর স্ত্রী এবং আসমা ছিলেন হযরত আলী রা.-এর ভাই প্রখ্যাত সেনানায়ক ও শহীদ সাহাবী হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর স্ত্রী। জাফরের শাহাদাতের পর প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. হন তার দ্বিতীয় স্বামী। হযরত আবু বকর রা.-এর ইন্তেকালের পর হযরত আলী রা. হন তার তৃতীয় স্বামী। উম্মুল ফযলের মা এদিক দিয়ে সৌভাগ্যবতী যে, তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ ঘরের সর্বোত্তম সন্তানদেরকে কন্যাদের বর হিসেবে লাভ করেন। আর এ সৌভাগ্যের ব্যাপারে অন্য কোনো নারী তার সমকক্ষ নেই।
প্রথম সারির মুসলমান
তিনি মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের প্রথম ভাগে মুসলমান হন। বর্ণিত আছে, তিনি মক্কার প্রথম মহিলা যিনি হযরত খাদীজা রা.-এর পরে ইসলামগ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেন। ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, খাদীজার পর লুবাবা বিনতুল হারিসের পূর্বে কোনো মহিলা ইসলাম গ্রহণ করেননি। এভাবেই তিনি গণ্য হন প্রথম সারির মুসলমান হিসেবে।
ধৈর্য ও প্রতিদানের প্রত্যাশা
কুরাইশরা যখন রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবায়ে কেরামগণের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানতে পারল, তখন তারা মুসলমানদের ওপর নির্যাচতেনর স্টিমরোলার চালাতে আরম্ভ করল। হযরত উম্মুল ফযল রা. সাহাবাদের এ সব কষ্টের চিত্র দেখতেন আর বুকফাটা অন্তর্জালায় দগ্ধ হতেন। বড় মর্মপীড়ায় ভুগতেন। এছাড়া যে তার আর কিছুই করার ছিল না!
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَ الْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَاءِ وَ الْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَّنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَلْ لَّنَا مِنْ لَّدُنْكَ نَصِيرًا
আর তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছ না! অথচ দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুরা বলছে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করুন এ জনপদ থেকে যার অধিবাসীরা যালিম এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নির্ধারণ করুন। আর নির্ধারণ করুন আপনার পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী।
উম্মুল ফযল রা.-এর ছেলে হযরত আবদুল্লাহর ইবনে আব্বাস রা. পরবর্তীকালে উপরোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলতেন, এ আয়াতে যে দুর্বল নারী ও শিশুদের পক্ষে যুদ্ধ করতে বলা হয়েছে, আমার মা ও আমি হলাম সেই নারী ও শিশু। হাদীস দ্বারা বোঝা যায় তারা হযরত আব্বাস রা.- এর আগে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হিজরত করতে অক্ষম ছিলেন।
মক্কার আদি পর্বের মুসলমান হলেও স্বামী হযরত আব্বাস রা.-এর মদীনায় হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত কত প্রতিকূলতার মধ্যেও মক্কার মাটি আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকেন তিনি। হযরত আব্বাস রা. অনেক দেরীতে ইসলামের ঘোষণা দেন এবং মক্কা বিজয়ের পর মদীনায় হিজরত করেন। আর তখনেই উম্মুল ফযল রা. তার সন্তানদেরসহ মদীনায় হিজরত করেন।
আকাবার বাইআতে তার স্বামীর অনন্য ভূমিকা
মদীনার ৭২ জন আনসার সাহাবী হজের মওসুমে মক্কায় গিয়ে মিনার এক গোপন শিবিরে যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মদীনায় হিজরতের আহ্বান জানাতে এবং তার হাতে বাইআত গ্রহণ করতে আসেন, ইতিহাসে এ বাইআতকে আকাবার দ্বিতীয় শপথ বলা হয়। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের আগমনের সংবাদ হযরত আব্বাস রা. পর্যন্ত পৌঁছান। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচার সকল প্রকার মতামত ও রায়ের ব্যাপারে পূর্ণ আস্থাশীল ছিলেন। গোপনে বৈঠকের সময় হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচা আব্বাস রা.-কে সঙ্গে নিয়ে সেই স্থানে পৌঁছেন যেখানে আনসাররা অপেক্ষা করছিলেন। আমরা সেই কথোপকথনের বর্ণনা সেই দলটির একজন সদস্যের ওপর ছেড়ে দিলাম। এই সদস্য হচ্ছেন হযরত কাব ইবনে মালিক রা.। তিনি বলেন, 'আমরা ঘাঁটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অপেক্ষায় বসে আছি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাশরীফ আনেন। তার সঙ্গে ছিলেন হযরত আব্বাস রা.। আব্বাস রা. এ উপলক্ষে উপস্থিত মদীনাবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, 'খাযরাজ কাওমের লোকেরা আপনাদের জানা আছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় গোত্রের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার সাথেই আছেন। শত্রুর মোকাবেলায় সর্বক্ষণ আমরা তাকে নিরাপত্তা দিয়ে আসছি। এখন তিনি আপনাদের নিকট যেতে চান। যদি আপনারা জীবন পণ করে তাকে সহায়তা করতে পারেন তাহলে খুবই ভালো কথা। অন্যথায় এখনই সাফ সাফ বলে দিন।'
তিনি তাদেরকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন, 'যদি তারা তাদের প্রতিজ্ঞা পালনে নিশ্চিত হন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে সুরক্ষাদানে সক্ষম হন, তবে তার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারেন; কিন্তু যদি তারা মনে করেন যে, তিনি তাদের সাথে যোগদানের পর চাপের মুখে তাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন কিংবা তাকে শত্রুদের নিকট সমর্পণ করবেন, তাহলে তিনি যে অবস্থায় আছেন তাকে সে অবস্থায় থাকতে দেওয়াই বাঞ্ছনীয় হবে।'
হযরত আব্বাস রা. যখন এমন স্পষ্টভাবে কথাগুলো বলছিলেন তখন তার চোখ ছিল আনসার সাহাবীদের চেহারার দিকে। তিনি তার কথার উত্তর শোনার অপেক্ষায় আছেন। এবার তিনি আরেকটি ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে বললেন, আমাকে বলুন, আপনার শত্রুদের বিপক্ষে কীভাবে যুদ্ধ করে থাকেন?
হযরত আব্বাস রা. তার অভিজ্ঞতা ও কুরাইশদের সাথে তার অবাধ সম্পর্কের কারণে এটা ভালো করেই জানেন যে, কুরাইশরা কখনো তাদের ক্ষমতা, নেতৃত্ব ও ধর্ম ছাড়তে পারে না। এদিকে ইসলাম যা কখনো বাতিলের সাথে আপোস করতে পারে না। এমতাবস্থায় মদীনাবাসী আনসাররা কি ভবিষ্যতে সংঘটিত লড়াইয়ের ভার বহন করতে পারবে? তারা কি সমরকৌশল ও যুদ্ধের ব্যাপারে অভিজ্ঞ কুরাইশদের বিরুদ্ধে নিজেদের পাল্লা ভারী রাখতে পারবে? এই বিষয়টি সামনে রেখেই তিনি আনসারদের কাছে উপর্যুক্ত প্রশ্নটি রাখেন।
এদিকে আনসাররাও হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনে যাচ্ছিলেন। আব্বাসের কথা শেষ হলে আনসারদের আলোচনা শুরু হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল হারাম রা. হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর উপর্যুক্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'আমরা ... আল্লাহর কসম! যুদ্ধবাজ জাতি। আমাদের যুদ্ধের খাবার ভক্ষণ করানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে। পূর্বপুরুষ সূত্রে বংশপরম্পরায় আমরাও তার উত্তরাধিকারী হয়েছি। আমরা তীরের সাহায্যে তীরন্দাজি করে থাকি, যতক্ষণ পর্যন্ত তীর শেষ না হয়। এরপর আমরা বর্ম দ্বারা আক্রমণ চালাতে থাকি, যতক্ষণ পর্যন্ত বর্ম ভেঙে না পড়ে। তারপর আমরা তরবারি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি এবং তরবারি দ্বারা আক্রমণ করে থাকি। এরপর আমাদের মধ্যে যে আগে মৃত্যুর মুখে আসে, মৃত্যু তাকে গ্রাস করে নেয়। অথবা পরে আমাদের শত্রু মৃত্যু শিকারে পতিত হয়।'
হযরত আব্বাস রা. এ কথা শুনে খুশি হয়ে বললেন, 'তোমাদের কাছে কি ঢাল আছে?' আনসাররা উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, আমাদের কাছে সম্পূর্ণ শরীর ঢাকার মতো ঢাল আছে।' এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আনসারদের মধ্যে ঐতিহাসিক আলোচনা হয়।
এটাই হচ্ছে দ্বিতীয় আকাবার বাইআতের সময় হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর অবস্থান। সেদিন তিনি ইসলামের সত্যের ব্যাপারে সাক্ষী অন্তরে গোপন করে রাখুন বা এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা ও পর্যালোচনা চালিয়ে যেতে থাকুন; তার এই মহা অবস্থান তো নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অন্ধকার আর উদয় হওয়া সূর্যের মতোই আলোকোজ্জ্বল ও ঝলমলে।
মদীনা মুনাওয়ারার পথে
হুদাইবিয়ার সন্ধির পূর্ব পর্যন্ত উম্মুল ফযল রা. আব্বাস রা.-এর সাথে মক্কাতেই অবস্থান করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং অন্যান্য মুসলমানরা উমরাতুল কাযা আদায় করার জন্য মক্কায় এলে এখানে তিনদিন অবস্থান করেন। এ সময়ে উম্মুল ফযলের বোন মাইমুনার বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ইতোপূর্বে যিনি আবু রুহাম ইবনে আবদুল উয্যার স্ত্রী ছিলেন। মাইমুনা রা. মুসলমান হলেও পূর্বের স্বামী ছিল শিরকের ওপর অটল। মাইমুনা রা. তার বোনের বাড়িতে থাকতেন হযরত আব্বাস রা.-এর তত্ত্বাবধানে।
এরপর সকলেই মক্কা হতে বের হয়ে যান। হযরত আব্বাস রা., হযরত উম্মুল ফযল রা. ও পরিবারের অন্যান্য সকল সদস্য মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় রাসূলুল্লাহ সা.-এর ঘরে উম্মুল ফযল রা.-এর জন্য ছিল এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান। সব সময় তিনি প্রিয় নবীজী সা.-এর ঘরে আসতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য-চাই মাইমুনা রা.-এর ঘরে থাকুন বা অন্য কোনো স্ত্রীর ঘরে-সর্বাবস্থায় সকলের দ্বার ছিল উন্মুক্ত ও মর্যাদাবাহক। সকলেই বেশ খাতির-যত্ন করতেন উম্মুল ফযল রা.-কে। এভাবে তিনি আনসারদের আঙিনায় দিন কাটাতে থাকেন। যাঁদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদীনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালোবাসে। আর মুহাজরিদের যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।
হযরত উম্মুল ফযলের সম্মান ছিল সকলের অন্তরে। তিনি সব সময় ইলম অর্জনে সচেষ্ট থাকতেন। কুরআন-সুন্নাহর অনেক কিছু তিনি শিখেছিলেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ তিনি হচ্ছেন এই উম্মতের জ্ঞানের সমুদ্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর সম্মানিত মাতা।
বদরে হযরত আব্বাস রা.-এ ভূমিকা
হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। যার ওপর ভিত্তি করে কতিপয় ইতিহাসবিদ তাকে 'পরবর্তী সময়ের ইসলাম গ্রহণকারী'দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। অথচ অন্যান্য ইতিহাসবিদ এ তথ্য দেয় যে, তিনি প্রথম যুদ্ধে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি গোপন রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাদেম হযরত আবু রাফে' বলেন, 'আমি হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর গোলাম ছিলাম। সে সময় তার ঘরের সদস্যদের মাঝেও ইসলাম প্রবেশ করে। আব্বাস মুসলমান হয়ে গেছেন। তার স্ত্রী উম্মে ফযল মুসলমান হয়েছেন। আমিও মুসলমান হয়েছি। কিন্তু আব্বাস রা. মুসলমান হওয়ার বিষয়টি গোপন রাখেন।'
হযরত আবু রাফে' রা.-এর এই বক্তব্য বদর যুদ্ধের পূর্বে হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর ইসলাম গ্রহণের ইঙ্গিত বহন করে। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের পর আব্বাস রা.-এর মক্কায় অবস্থান গ্রহণের ব্যাপারটি ছিল একটি কৌশলগত বিষয়। এতে তিনি ভালোভাবে তার অবস্থান সৃষ্টি করেন। কুরাইশরা হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর এমন অবস্থানে কখনো কি সন্দেহ না করার সুযোগ পেয়েছে? কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আব্বাস রা.-এর বিরুদ্ধে কথার বলার কোনো উপায় তাদের ছিল না। কেননা, প্রকাশ্যে তিনি এমনভাবে চলাফেরা করতেন, যা কুরাইশরা পছন্দ করত। এভাবে এক সময় বদর যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। কুরাইশরা এবার তার মনে গোপন ইচ্ছার ব্যাপারে পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. খুব ভালো করেই কুরাইশদের এমন হীন অন্যায় সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
তিনি কুরাইশের সকল প্রকার তৎপরতা ও কর্মকাণ্ডের কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। এদিকে কুরাইশরাও তাকে তাদের সাথে করে বদরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সফল হয়েছে। অথচ এ যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষে অংশ নেওয়ার পক্ষে তার বিশ্বাসও ছিল না, কোনো উদ্দেশ্যও তার ছিল না। তারপরও এ যুদ্ধ হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর জন্য একটি সফলতার বার্তা বয়ে এনেছে। যা উল্টো কুরাইশদের ধ্বংস ডেকে এনেছে।
বদরের রণাঙ্গনে উভয় পক্ষ মুখোমুখী। প্রত্যেক দলের তরবারি তাদের প্রতিপক্ষের ওপর তীব্র আক্রমনের জন্য উন্মুখ। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
إِنَّ رِجَالًا مِّنْ بَنِي هَاشِمٍ ، وَمِنْ غَيْرِ بَنِي هَاشِمٍ ، قَدْ أُخْرِجُوا كَرْهًا ، لَا حَاجَةَ لَهُمْ بِقِتَالِنَا .. فَمَنْ لَقِيَ مِنْكُمْ أَحَدَهُمْ فَلَا يَقْتُلُهُ.. وَمَنْ لَقِيَ البَخْتَرِيَّ بُن هِشَامِ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ أَسَدٍ فَلَا يَقْتُلُهُ.. وَمَنْ لَقِيَ الْعَبَّاسَ بْن عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَا يَقْتُلُهُ، فَإِنَّهُ إِنَّمَا أُخْرِجَ مُسْتَكْرَةً
বনু হাশিমের কিছু লোককে এবং বনু হাশিমের বাইরের কিছু লোককে জোর করে যুদ্ধে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের সাথে তোমাদের লড়াই করার কোনো প্রয়োজন নেই। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ তাদের মুখোমুখী হলে তোমরা তাদের হত্যা করবে না। যে ব্যক্তি আবুল বুখতারী ইবনে হিশাম ইবনে হারেস ইবনে আসাদকে পাবে, সে তাকে হত্যা করবে না। আর যে ব্যক্তি আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে পাবে, সেও তাকে হত্যা করবে না। তাদেরকে তো জবরদস্তি করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি আপন চাচা আব্বাসের কোনো বিশেষ গুণ সম্পর্কে আলোকপাত করছেন না। এমন সময়ে তা বলার অবকাশও নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যদি তার চাচা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হতেন, তাহলে তিনি এমন বলতেন না। নিজের সাহাবীদের মস্তক রণাঙ্গনে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হবে, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচার ব্যাপারে সুপারিশ করবেন! এটা হতেই পারে না!
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচা আব্বাস রা.-কে ভীষণ ভালোবাসতেন। বদর যুদ্ধে অন্যান্য কুরাইশ মুশরিকদের সাথে আব্বাস মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। ঘটনাক্রমে, আব্বাসকে শক্তভাবে বাঁধা হয়। এতে তিনি ব্যথায় কোঁকাতে থাকেন। তার সেই কষ্টের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাতে ঘুমোতে পারেননি। সাহাবায়ে কেরাম বিষয়টি জানতে পেরে আব্বাসের বাঁধন ঢিলা করে দেন। তারপর আব্বাসের কোঁকানি বন্ধ হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা জানার পর তখনই তিনি সকল বন্দীর বাঁধন ঢিলা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।'
আব্বাস সম্পদশালী ব্যক্তি হওয়ার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নিকট বন্দী অবস্থা থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য মোটা অংকের মুক্তিপণ চান। আব্বাস এত বেশি অর্থ আদায়ে অক্ষমতা প্রকাশ করে বলেন,
يَا رَسُولَ اللهِ ، إِنِّي كُنْتُ مُسْلِمًا ، وَلَكِنِ الْقَوْمَ اسْتَكْرَهُونِي
অন্তর থেকে আমি আগেই মুসলমান হয়েছিলাম। মুশরিকরা এ যুদ্ধে অংশ নিতে আমাকে বাধ্য করেছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অন্তরের অবস্থা আল্লাহ জানেন। আপনার দাবি সত্য হলে আল্লাহ তার বিনিময় দেবেন। তবে বাহ্যিক অবস্থার বিচারে আপনাকে কোনো প্রকার সুবিধা দেওয়া যাবে না। আর মুক্তিপণ আদায়ে আপনার অক্ষমতাও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, আপনি একজন ধনবান ও দানশীল ব্যক্তি। অতঃপর তিনি নিজের, ভ্রাতুষ্পুত্র আকীল ও নাওফিল ইবনে হারিসের পক্ষ থেকে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করে মুক্তি লাভ করেন এবং মক্কায় রওনা দেন।
বদরযুদ্ধে একজন আনসার সাহাবী হজরত আব্বাস রা.-কে গ্রেফতার করে নিয়ে এলেন। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমাকে তো এ লোকটি বন্দী করে নিয়ে আসেনি। আমাকে মুণ্ডিত মস্তকের একজন লোক গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছে। সুদর্শন লোকটি একটি চিত্রল ঘোড়ার পিঠে আসীন ছিল। এখন তো তাকে দেখা যাচ্ছে না। আনসার সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমিই তো তাকে বন্দী করে নিয়ে এসেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, চুপ করো, মহান আল্লাহ একজন সম্মানিত ফেরেশতা দিয়ে তোমাকে সাহায্য করেছেন।
এভাবে তিনি মুসলমানদের পক্ষ থেকে অকৃত্রিম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন। কেননা, তারা জানতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর কী হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি সম্পর্কে তারা ভালো করেই অবগতি ছিলেন,
إِنَّمَا الْعَبَّاسُ مِنْهُ أَبِي فَمَنْ اذَى الْعَبَّاسَ فَقَدْ آذَانِي
হে লোক সকল, শোনো, আব্বাস আমার কাছে পিতা সমতুল্য। যে ব্যক্তি আব্বাসকে কষ্ট দেবে সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল।
আবু রাফে রা.— যিনি হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের দাস ছিলেন ও পরবর্তী সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আলী রা.-এর প্রিয়ভাজন হিসাবে পরিণত হয়েছিলেন— বর্ণনা করেন, ‘সে সময় ইসলামের আলোয় হযরত আব্বাসের গৃহ আলোকিত হয়েছিল। হযরত আব্বাস, তার স্ত্রী উম্মুল ফযল ও আমি ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু ভয়ে আমাদের ঈমানকে গোপন রেখেছিলাম। ইসলামের শত্রুদের মৃত্যুর খবর মক্কায় পৌঁছলে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম। কিন্তু কুরাইশ ও তাদের সমর্থকরা খুবই ব্যথিত হয়েছিল। আবু লাহাব নিজে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও অন্য এক ব্যক্তিকে তার স্থলে যুদ্ধ করার জন্য ভাড়া করেছিল। ওই মুহূর্তে সে কাবার নিকটবর্তী জমজম কূপের নিকটে বসেছিল। এ সময় খবর পৌঁছল আবু সুফইয়ান মক্কায় পৌঁছেছে। সে আবু সুফইয়ানকে খবর পাঠাল যত দ্রুত সম্ভব যেন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সে এসে আবু লাহাবের পাশে বসল এবং বদরের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিল। ঘটনার বিবরণ তার ওপর বজ্রপাতের মতো আপতিত হলো এবং সে ভয়ে শিহরিত হলো।
বেচারা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব তখন বদরের বন্দি। বাড়িতে ছিলেন তার গোলাম-তীরন্দাজ আবু রাফে। আবু লাহাব ভাইপো আবু সুফইয়ানের কাছে যুদ্ধের সংবাদ শোনার সময় একটি বিস্ময়কর দৃশ্যের কথা শুনছিলেন। বলছিলেন, সাদা পোশাক পরিহিত অশ্বারোহী সৈনিকরা আমাদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। তারা কারা তা জানি না। সঙ্গে সঙ্গে আবু রাফে' উত্তর দেন, তারা ফেরেশতা। পরাজয় সংবাদের উত্তেজিত ক্রোধতপ্ত আবু লাহাব আবু রাফে' রা.-এর মন্তব্যটি সহ্য করতে না পেরে তার মুখের ওপর এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত করে। আবু রাফে' মাটিতে পড়ে যান। আর আবু লাহাব তাকে বেধড়ক মারতে থাকে অকারণে। কাছেই ছিলেন হযরত উম্মুল ফযল রা.। অহেতুক এই মারধরের দৃশ্য দেখতে না পেরে মোটা একটি লাঠি সংগ্রহ করে বসিয়ে দিলেন আবু লাহাবের মাথায়। আর মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল।
অবলা এক নারী দুর্ধর্ষ সবল এক পুরুষকে বীরদর্পে আক্রমণ করলেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিবাদী মনের পবিত্রতার জোরে এবং ইসলামের প্রতি অটুট বিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়ে তিনি এ আক্রমণ করেন। সেদিন উম্মুল ফযল রা.-এর বক্তব্য ছিল, 'আবু রাফে রা. সামান্য একজন গোলাম। তার মনিব অনুপস্থিত। তার দুর্বলতা ও অসহায়তার সুযোগ নিয়ে অকারণে তুমি তার ওপর যুলুম করলে কেন?'
হযরত উম্মুল ফযল লুবাবা বিনতুল হারিস রা. এমনই এক ঈমানী আত্মার ঝলক। তার ধর্মনিষ্ঠাও ছিল বিস্ময়কর।
ইসলামের প্রথম যুদ্ধ ছিল বদরের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কুরাইশ কাফের বাহিনী চরমভাবে পরাজিত হয়। অথচ চালাকি করে আবু লাহাব বদরের যুদ্ধে যোগদান করেনি। ধন-সম্পদ দিয়ে সে অন্যদের পাঠায়।
যুদ্ধে তার সেই সাথীরাসহ কুরাইশের বড় বড় নেতা সবাই মারা যায়। ফলে আবু লাহাব তখন সাংঘাতিকভাবে আঘাত পায়। আর তার মরণঘণ্টা এভাবেই শুরু হয়। বদরের যুদ্ধের পর সাত দিন যেতে না যেতেই আবু লাহাবের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু ছিল খুবই করুণ, হৃদয়বিদারক। সে সাংঘাতিক ধরনের ফুসকুড়ি রোগে আক্রান্ত হয়। যাকে বলা হয় সংক্রামক রোগ। এর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য পরিবারের লোকেরা সবাই তাকে ত্যাগ করে। তার শরীরে পচন ধরে। দেহ হয়ে যায় দুর্গন্ধময়। মহামারী এই রোগের আঘাতে আঘাতে আবু লাহাব একদিন মরে যায়। তার লাশ একটি ঘরে পড়ে থাকে। পঁচে দুর্গন্ধের ভয়াবহতা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দুঃসহ ছিল সেই দুর্গন্ধ। বাঁচার জন্য এলাকাবাসী দুর্গন্ধময় লাশ লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দূরে অনেক দূরে নিয়ে ফেলে দিয়ে আসে। মাটির নিচে তার লাশ পুঁতে রেখে এলাকাকে দুর্গন্ধমুক্ত করা হয়। এটাই হলো আবু লাহাবের পতন ও পরাজয়। দ্বীনের বিরোধিতা করতে গিয়ে সে এভাবে আল্লাহর অভিশপ্ত হয়। চরম লাঞ্ছনা নিয়ে সে মত্যুবরণ করে।
হযরত উম্মুল ফযল রা.-এর স্বামী হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. ছিলেন দানশীল। অনেক বড় দানশীল। তিনি পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের সম্পর্ক দৃঢ় রাখার চেষ্টা করতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ধন-সম্পদ, ত্যাগ-সাধনা কোনো বিষয়েই কৃপণতার আশ্রয় নিতেন না। আত্মীয়তা রক্ষা ও স্বজনদের মাঝে সদ্ভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি। এই বিচক্ষণতার কারণে কুরাইশদের মাঝে তিনি একটি স্বতন্ত্র আসন তৈরি করে নিতে সক্ষম হন। এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দ্বীনের দাওয়াতের কাজ আরম্ভ করেন, তখন হযরত আব্বাস রা. তাকে বহু কষ্ট-নির্যাতন থেকে রক্ষা করার প্রয়াস পান।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল ফযলসহ তার অন্য বোনদেরকে ঈমানদার বলে ঘোষণা দান করেছেন। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে মায়মূনা, উম্মুল ফযল, লুবাবা সুগরা, হুযাইলা, আযযা, আসমা ও সালমা- এই বোনদের নাম আলোচনা করা হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই সকল বোন মুমিনা বা ঈমানদার।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের কিছু কিছু ঘটনা দ্বারা জানা যায়, তিনি চাচী উম্মুল ফযলকে যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি গুরুত্বও দিতেন। চাচীও তাকে খুবই আদর করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই চাচীকে দেখার জন্যে তার গৃহে যেতেন এবং দুপুরে কিছুক্ষণ সেখানে বিশ্রাম নিতেন।
আজলাহ যায়িদ ইবনে আলী ইবনে হোসাইনের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াতলাভের পর একমাত্র উম্মুল ফযল ছাড়া অন্য কোনো মহিলার কোলে মাথা রাখেননি এবং তা রাখা তার জন্যে বৈধও ছিল না। উম্মুল ফযল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথা নিজের কোলের ওপর রেখে সাফ করে দিতেন এবং চোখে সুরমা লাগিয়ে দিতেন। একদিন তিনি যখন সুরমা লাগাচ্ছেন, তখন হঠাৎ তার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গণ্ডে পড়ে। তিনি মাথা উঁচু করে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে? উম্মুল ফযল বলেন, আল্লাহ আপনাকে মৃত্যু দান করবেন। যদি এ নেতৃত্ব ও ক্ষমতা আমাদের মধ্যে থাকে অথবা অন্যদের হাতে চলে যায় তাহলে আমাদের মধ্যে কে আপনার স্থলাভিষিক্ত হবে তা যদি বলে যেতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার পরে তোমরা হবে ক্ষমতাহীন, দুর্বল। ইমাম আহমদের বর্ণনায় জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তিম রোগ শয্যায় এ ঘটনাটি ঘটে।
জ্ঞানের সমুদ্রের মা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের মাত্র তিন বছর আগে উম্মুল ফযল রা.-এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর জন্ম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। তিনি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সম্পদ। শান ও গৌরব। বয়সের কামনা-বাসনা কিংবা শৈশবের হেয়ালিপনা তাকে স্পর্শ করেনি। সব প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে ঊষালগ্ন থেকেই ছুটে চলেছেন জ্ঞানের পথে। আলোর পথে। তিন বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সোহবতের থেকে নিজেকে উপনীত করেন স্বর্ণশিখরে। দেহ সত্তায় উদ্ভাস ঘটান হেরার দ্যুতি। আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় এ সাহাবীকে দান করেন কুরআনের তাফসীরের বিশেষ ইলম। কুরআনের নিগূঢ় রহস্যাবলি মুহূর্তেই উদ্ভাসিত হয়ে যেত তার সম্মুখে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করেন,
اللَّهُمَّ فَقِهُهُ فِي الدِّينِ وَعَلِّمُهُ التَّأْوِيلَ
হে আল্লাহ, আপনি তাকে দ্বীনে ইলমে প্রাজ্ঞতা দান করুন এবং কুরআনের ব্যাখ্যাবলি অবহিত করুন।
সত্যিই তাই হয়েছিলেন। সব সাহাবী থেকে এটা তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। বয়সের স্বল্পতা সত্ত্বেও বড় বড় সাহাবী তাকে সম্মান করতেন। বিশেষ মর্যাদা প্রদান করতেন। তাফসীর সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যায় সবাই তার শরণাপন্ন হতেন। তাফসীর শাস্ত্রের পাশাপাশি অন্য বিষয়েও তার সমান দখল ছিল। হাদীস, ফিকহ, ভাষা-সাহিত্যেও ছিল বিশেষ দক্ষতা।
সাত বছর থেকেই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেবা ও খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। অজুর প্রয়োজন হলে তিনি পানির ব্যবস্থা করতেন, নামাযে দাঁড়ালে তার পেছনে দাঁড়িয়ে ইকতিদা করতেন এবং সফরে রওনা হলে তিনি তার বাহনের পেছনে আরোহণ করে তার সফরসঙ্গী হতেন। এভাবে ছায়ার ন্যায় তিনি তাকে অনুসরণ করতেন এবং নিজের মধ্যে সর্বদা বহন করে নিয়ে বেড়াতেন একটি সজাগ অন্তঃকরণ, পরিচ্ছন্ন মস্তিষ্ক এবং আধুনিক যুগের যাবতীয় রেকর্ডিং যন্ত্রপাতি থেকে অধিক শক্তিশালী একটি স্মৃতিশক্তি।
আল্লাহপাক তার প্রিয় নবীর এ দুআ কবুল করেন এবং হাশিমী বালককে এত অধিক জ্ঞান দান করেন যে, বড় বড় জ্ঞানীদের তিনি ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হন। খলীফা উমর রা. তাকে স্বীয় সান্নিধ্যে তত্ত্বাবধানে রাখেন। তাকে গুরুত্বপূর্ণ মজলিসে বড় বড় সাহাবীদের সাথে বসার অনুমতি দিতেন। বদরী সাহাবীদের সাথেও বসার অনুমতি তাকে দেওয়া হয়। মুহাদ্দিস ইবনে আবদিল বার বলেন, উমর রা. ইবনে আব্বাসকে ভালোবাসতেন এবং তাকে সান্নিধ্য দান করতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. জ্ঞানার্জনের জন্য অক্লান্ত সাধনা ও পরিশ্রম করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি সব ধরনের পথ ও পন্থা অবলম্বন করেন। রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবদ্দশায় তিনি তার অমিয় ঝর্ণাধারা থেকে দু-টি অঞ্জলি ভরে গ্রহণ করেন এবং তার ওফাতের পর বিশিষ্ট সাহাবীদের নিকট থেকে জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে থাকেন। জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে তিনি যে কত বিনয়ী ও কষ্টসহিষ্ণু ছিলেন তার নিজের একটি বর্ণনা থেকেই তা অনুমান করা যায়। তিনি বলেন, 'আমি যখনই অবগত হয়েছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো সাহাবীর নিকট তার একটি হাদীস সংরক্ষিত আছে, আমি তার ঘরের দরজায় উপনীত হয়েছি। মধ্যাহ্নকালীন বিশ্রামের সময় উপস্থিত হলে তার দরজার সামনে চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়েছি। বাতাস ধূলাবালি উড়িয়ে আমার জামা-কাপড় ও শরীর হয়তো একাকার করে ফেলেছে। অথচ আমি সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তখনই অনুমতি দিতেন। শুধুমাত্র তাকে প্রশ্ন করার উদ্দেশ্যেই আমি এমনটি করেছি। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে আমার এ দুরবস্থা দেখে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই, আপনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন? আমাকে খবর দেননি কেন, আমি নিজেই গিয়ে দেখা করে আসতাম। বলেছি, আপনার নিকট আমারই আসা উচিত। কারণ জ্ঞান এসে গ্রহণ করার বস্তু, গিয়ে দেওয়ার বস্তু নয়। তারপর তাকে আমি হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি।'
জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে ইবনে আব্বাস ছিলেন বিনয়ী। তিনি জ্ঞানীদের উপযুক্ত কদরও করতেন। হিশাম ইবনে উরওয়া তার পিতা উরওয়াহকে ইবনে আব্বাসের জ্ঞানের গভীরতা ও তার মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'ইবনে আব্বাসের তুল্য জ্ঞানী লোক আমার নজরে পড়েনি।' তাফসীর শাস্ত্র ও অন্যান্য ইসলামী বিষয়সমূহে তার অসাধারণ পাণ্ডিত্যের মূলে ছিল প্রথমত তার রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্য লাভ ও সেবার সুযোগ। দ্বিতীয়ত তার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআ। তৃতীয়ত জ্ঞান অর্জনের প্রতি তার অপরিসীম আগ্রহ এবং অক্লান্ত চেষ্টা সাধনা।
জ্ঞান অন্বেষণে হযরত ইবনে ইবন আব্বাসের অভ্যাস, একাগ্রতা কর্মপদ্ধতি দেখে সে যুগের বড় বড় জ্ঞানী ও মনীষীরা চরম বিস্ময়বোধ করেছেন। মাসরুক ইবনুল আজদা একজন শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী। তিনি বলেন, 'আমি যখন ইবনে আব্বাসকে দেখলাম, বললাম, 'সুন্দরতম ব্যক্তি।' যখন তিনি কথা বললেন, বললাম, 'সর্বোত্তম প্রাঞ্জলভাষী' এবং যখন তিনি আলোচনা করলেন, বললাম, 'সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি।'
জ্ঞানার্জনের পর তিনি মানুষকে শিক্ষাদানের ব্রত কাঁধে তুলে নিলেন। আর তখন থেকেই তার বাড়িটি একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। যে অর্থে আজ আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটি ব্যবহার করে থাকি সে অর্থে তার বাড়িটিকে বিশ্ববিদ্যালয় বললে অত্যুক্তি হয় না। তবে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইবনে আব্বাস বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যে পার্থক্য এখানে যে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন বহু শিক্ষক আর সেখানে ছিলেন একজন শিক্ষক। তিনি ইবনে আব্বাস রা.।
হযরত উম্মুল ফযল রা. একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আপনার দেহের একটি অঙ্গ আমার ঘরে আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, স্বপ্নের তাবীর ইনশাআল্লাহ, ভালো। ফাতিমার একটি পুত্র সন্তান হবে এবং আপনি তাকে দুধ পান করাবেন। এভাবে আপনি হবেন তার তত্ত্বাধায়িকা। ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী হযরত ফাতিমা রা. হযরত হুসাইন রা.-কে জন্ম দেন এবং উম্মুল ফযল রা. তাকে দুধও পান করান।
হযরত উম্মুল ফযল রা. জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো কাটান প্রিয়নবী সা.-এর পবিত্র সান্নিধ্যে। তার চরিত্র ও জ্ঞানে নিজের জীবনকে সাজিয়ে তোলেন এবং তার কাছ থেকে বহু হাদীস বর্ণনা করেন। উম্মুল ফযল থেকে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলেন, আবদুল্লাহ, তাম্মাম, আনাস ইবনে মালিক, আবদুল্লাহ ইবনে হারিসা রা. প্রমুখ।
বিদায় হজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে উম্মুল ফযলও হজ করেন। আরাফাতে অবস্থানের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা অবস্থায় আছেন কিনা, সে ব্যাপারে সাহাবীরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলেন। এক পর্যায়ে তারা তাদের সে দ্বিধার কথা উম্মুল ফযলের নিকট প্রকাশ করেন। উম্মুল ফযল বিষয়টি নিশ্চিত হবার জন্য এক পেয়ালা দুধ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে পেশ করেন এবং তিনি তা পান করেন। এভাবে তাদের সব দ্বিধা-সংশয় দূর হয়ে যায়। এ ব্যাপারে বুখারী শরীফে এসেছে, 'উম্মুল ফযল বিনতে হারিস রা. সূত্রে বর্ণনা করেন যে, কিছু সংখ্যক লোক আরাফাতের দিনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সওম পালন সম্পর্কে তার কাছে সন্দেহ প্রকাশ করে। তাদের কেউ বলল, তিনি সওম পালন করেছেন। আর কেউ বলল, না, তিনি করেননি। এতে উম্মুল ফযল রা. এক পেয়ালা দুধ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পাঠিয়ে দিলেন এবং তিনি তা পান করে নিলেন। এ সময় তিনি উটের পিঠে (আরাফাতে) উকূফ অবস্থায় ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালে উম্মুল ফযল রা. শোকে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। অন্তর ফেটে চৌচির হয়ে যায়; কিন্তু তিনি সবর করেন এবং এর বিনিময়ে সাওয়াবের আশা রাখেন। রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পর তিনি নামায, রোযা ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগীতে দিনাতিপাত করতে থাকেন। ইলমের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করেন এবং অধিকহারে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকার ব্যাপারে সচেষ্ট হন।
হযরত আবু বকর, উমর ও উসমান রা. তাকে খুব সম্মান করতেন। রাসূলের কাছে তার মর্যাদা সম্পর্কে তারা সকলে ছিলেন অবগত। তাই যত্ন ও সম্মানের কোনো ত্রুটি করতেন না। কারণ তিনি অগ্রবর্তী মুসলিমদের মধ্যে অন্যতম। দ্বীনের তরে তার ত্যাগ অবিস্মরণীয়।
অন্তিম মুহূর্ত
জীবনের দীর্ঘ একটি সময় পাড়ি দেওয়ার পর এক সময় তিনিও শায়িত হন চির নিদ্রার বিছানায়। আর রেখে যান গৌরবদীপ্ত বর্ণাঢ্য জীবন। বিশেষ করে উম্মতের জ্ঞানের সমুদ্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. তো আছেনই। কিয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লায় তার ইলম ও আমলই উম্মুল ফযল রা.-এর মর্যাদা শুধু বাড়াতে থাকবে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মানুষ যখন মারা যায় তখন তার সব আমলের পথ রুদ্ধ হয়ে যায় তিনটি বস্তু ছাড়া। তা হচ্ছে, সাদাকায়ে জারিয়া—এমন ইলম যা অন্যদের উপকৃত করে এবং এমন সৎকর্মশীল সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৫৮০. সূরা নিসা, ৪:১৭৪-১৭৫।
৫৮১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৩১৪; আনসাবুল আশরাফ, ১/৪৪১।
৫৮২. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৭৭।
৫৮৩. উসুদুল গাবাহ, ৫/৫৩৯।
৫৮৪. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৭৮
৫৮৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/৩১৫।
৫৮৬. সূরা নিসা, ৪:৭৫।
৫৮৭. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৩১৫।
৫৮৮. সূরা হাশর, ৫৯:৯।
৫৮৯. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৪৫৮-৪৫৯।
৫৯০. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৪/১২।
৫৯১. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৭৮।
৫৯২. উসুদুল গাবাহ, ৫/৫৩৯।
৫৯৩. হায়াতুস সাহাবাহ, ২/৩৩৭; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৭৮।
৫৯৪. সহীহ, বুখারী, ১৪৭।
৫৯৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/৩১৫।
৫৯৬. সহীহ, বুখারী, ১৯৮৮; সহীহ, মুসলিম, ১১০ ও ১১২৩।
৫৯৭. হযরত আবু হোরায়রা রা. হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসায়ী।