📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 আসমা বিনতে উমাইস রা.

📄 আসমা বিনতে উমাইস রা.


যাঁকে বিয়ে করেছেন তিনজন জান্নাতী যুবক

মহান আল্লাহ তাআলার অসীম অনুগ্রহে আজ আমরা এমন এক মহীয়সী নারীর জীবনকাহিনীর দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয়েছি—যিনি ছিলেন ঈমানী কাননের এক প্রস্ফুটিত ও সুবাসিত ফুল। যাঁর ইসলামের ফসল ওহীর সিঞ্চনে হয়ে উঠেছিল অত্যধিক সতেজ। যার সুবাসে মোহিত বিশ্ববাসী। তার মহৎ জীবনী আমাদের নারী সমাজকে দ্বীন ও বিশ্বাসে অবিচল থাকার অনন্য শিক্ষা দিয়ে যায়।

সেই মহীয়সী নারী হলেন হযরত আসমা বিনতে উমাইস ইবনে মাআদ আল খাসামিয়্যাহ। তিনি এমন সৌভাগ্যবতী আল্লাহভীরু নারী—যাঁকে বিয়ে করেছেন তিনজন জান্নাতী যুবক। ঈমান, পবিত্রতা, নিষ্কলুষতা, মহানুভবতার অতুল দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি।

শুরুটা এখান থেকে
হযরত আবু বকর রা. যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন তার ওপর ন্যস্ত হলো মহান আমানত—দাওয়াতের গুরু দায়িত্ব। তিনি বেরিয়ে পড়লেন মানুষকে দ্বীনের পথে আল্লাহর দিকে ডাকতে। এমন জান্নাতের দিকে তিনি সকল মানুষকে আহ্বান করলেন—যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি; যেই জান্নাতের নেয়ামত সম্পর্কে এবং কোনো হৃদয় যার কল্পনা করতে সক্ষম নয়।

মুষ্টিমেয় যে সব লোক তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. ও তার স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস রা.। ইসলামের একেবারে শুরুলগ্নে রাসূলুল্লাহ সা.-এর দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বেই তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। ৫২৩

এভাবেই তারা ইসলামের অগ্রগামী দলের সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। যেই গৌরবের কোনো তুলনা হয় না।

জাফর ইবনে আবি তালিব রা. ও তার সহধর্মিণী আসমা বিনতে উমাইস রা. ইসলামী নূরের কাফেলার যাত্রাপথেই ইসলামে যোগদান করার ফলে প্রথম যুগের মুসলমানরা যেসব দৈহিক ও মানসিক কষ্ট ভোগ করেছিল, তার সবই এ হাশিমী যুবক ও তার যুবতী স্ত্রী ভোগ করেছিলেন। কিন্তু কখনো তারা ধৈর্যহারা হননি। তারা জানতেন, সফলতার পথ এত সহজ নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কুরাইশরা তাদের জন্য ওঁৎ পেতে থেকে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ গড়ে তুলত। এমনই এক মুহূর্তে জাফর ইবনে আবি তালিব, তার স্ত্রী এবং আরও কিছু সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আবিসিনিয়ায় হিজরতের অনুমতি চাইলেন। অত্যন্ত বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তাদের অনুমতি দেন। এখানে তারা বেশ ক'বছর অবস্থান করেন। সে সময় আল্লাহ তাদেরকে মুহাম্মাদ, আবদুল্লাহ ও আউফ নামীয় সন্তান দান করেন।

আবিসিনিয়ায় হিজরত
হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. আবিসিনিয়ায় ইসলাম ও ইসলামের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দক্ষ ও সফল মুখপাত্র ও প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন। আল্লাহ তাআলা তাকে উন্নত মন-মানসিকতা, প্রভাবপূর্ণ বাগ্মিতা ও বয়ানের পূর্ণ যোগ্যতা দান করেছিলেন। মুতার যুদ্ধের সারাটি দিন—যেদিন তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেছিলেন—যা তার জীবনের এক বিস্ময়কর ও চিরজাগ্রত মর্যাদা ও সম্মানের এক অম্লান অধ্যায়; এর পাশাপাশি সেই দিনটিও কম মর্যাদাপূর্ণ নয় যেদিন বাদশাহ নাজ্জাশী তাকে দরবারে ডেকে নিয়েছিলেন।

আবিসিনিয়া অভিমুখে মুসলমানদের হিজরতের পরও কাফেরদের হিংসা-ক্ষোভ বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি; বরং কুরাইশরা চিন্তা করতে থাকে যে, হিজরতের কারণে মুসলমানরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং তাদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে। তারা তাদের মধ্য থেকে শক্তিমান ও তাগড়া জোয়ান দু-ব্যক্তিকে নির্বাচন করে নাজ্জাশীর কাছে পাঠাল। এ দু-ব্যক্তি হলো, আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবীয়া যারা তখনো মুসলমান হয়নি। তাদের একটাই লক্ষ্য, বাদশাহ নাজ্জাশী যেন তার দেশ থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করেন।

আবিসিনিয়ার রাজত্বে আসীন তখন বাদশাহ নাজ্জাশী। যিনি ঈমানের তাপ অনুভব করেছিলেন। তিনি একনিষ্ঠভাবে খ্রিস্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। অহংকার ও দাম্ভিকতা মুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন ভীষণ নীতিপরায়ণ। তার খ্যাতি তখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামদের জন্য তার দেশকে হিজরতের ক্ষেত্র হিসেবে মনোনীত করেন।

দুই হিজরতের অধিকারিণী
হযরত আবু মূসা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইয়ামানে থাকা অবস্থায় আমাদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের খবর পৌঁছল। তাই আমি ও আমার দু-ভাই আবু বুরদা ও আবু রুহম এবং আমাদের গোত্রের আরও মোট বায়ান্ন কি তিপ্পান্ন কিংবা আরও কিছু লোকজনসহ আমরা হিজরতের উদ্দেশে বের হলাম। আমি ছিলাম আমার অপর দু-ভাইয়ের চেয়ে বয়সে ছোট। আমরা একটি জাহাজে উঠলাম। জাহাজটি আমাদেরকে আবিসিনিয়া দেশের (বাদশাহ্) নাজ্জাশীর নিকট নিয়ে গেল। সেখানে আমরা জাফর ইবনে আবু তালিবের সাক্ষাৎ পেলাম এবং তার সঙ্গেই আমরা থেকে গেলাম। অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খায়বার বিজয়ের সময় সকলে এক যোগে (মদিনায়) এসে তার সঙ্গে মিলিত হলাম। এ সময়ে মুসলিমদের কেউ কেউ আমাদের অর্থাৎ, জাহাজে আগমনকারীদের বলল, হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী। আমাদের সঙ্গে আগমনকারী আসমা বিনতে উমাইস রা. একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণী হাফসা'র সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তিনিও (তাঁর স্বামী জাফরসহ) নাজ্জাশীর দেশে হিজরাতকারীদের সঙ্গে হিজরত করেছিলেন। আসমা রা. হাফসা'র কাছেই ছিলেন। এ সময়ে উমর রা. তার ঘরে প্রবেশ করলেন। উমর রা. আসমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? হাফসা রা. বললেন, তিনি আসমা বিনতে উমাইস রা.। উমর রা. বললেন, 'ইনি আবিসিনিয়ায় হিজরাতকারিণী আসমা? ইনিই কি সমুদ্রগামিনী?' আসমা রা. বললেন, 'হ্যাঁ!' তখন উমর রা. বললেন, 'হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে আগে আছি। সুতরাং তোমাদের তুলনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি আমাদের হক অধিক।' এতে আসমা রা. রেগে গেলেন এবং বললেন,

কখনো হতে পারে না। আল্লাহর কসম, আপনারা তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন, তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন, আপনাদের অবুঝ লোকদের নসীহত করতেন। আর আমরা ছিলাম এমন এক এলাকায় অথবা তিনি বলেছেন এমন এক দেশে-যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বহু দূরে এবং সর্বদা শত্রুবেষ্টিত আবিসিনিয়া (আবিসিনিয়া) দেশে। আল্লাহ ও তার রাসূলের উদ্দেশ্যেই ছিল আমাদের এ হিজরত। আল্লাহর কসম, আমি কোনো খাবার খাব না, পানিও পান করব না যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি যা বলেছেন তা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে না জানাব। সেখানে আমাদের কষ্ট দেওয়া হতো, ভয় দেখানো হতো। শীঘ্রই আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এসব কথা বলব এবং তাকে জিজ্ঞেস করব। তবে আল্লাহর কসম, আমি মিথ্যা বলব না, পেঁচিয়ে বলব না, বাড়িয়েও কিছু বলব না। ৫২৪

এরই মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে উপস্থিত হন। আসমা রা. তাকে সব কথা খুলে বলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারা তো এক হিজরত করেছে, আর তোমরা করেছ দুই হিজরত। এদিক দিয়ে তোমাদের মর্যাদা বেশি। ৫২৫

আমির থেকে বর্ণিত হয়েছে, আসমা অভিযোগ করেন এই ভাষায়, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই লোকেরা মনে করে যে, আমরা মুহাজির নই।' জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যারা এমন কথা বলে তারা অসত্য বলে। তোমাদের হিজরত দুইবার হয়েছে। একবার তোমরা নাজ্জাশীর নিকট হিজরত করেছ। আরেকবার আমার নিকট। ৫২৬

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া এই সুসংবাদ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী ব্যক্তিরা দারুণ উৎফুল্ল হন। তারা আসমার নিকট এসে এ সুসংবাদের সত্যতা যাচাই করে যেতেন। ৫২৭

মৃতার যুদ্ধে জাফরের অনন্য বীরত্ব
এমন সময়ে মৃতার যুদ্ধের দামামা বাজতে থাকে। লড়াইয়ে মোকাবেলার জন্য নিশানা তাক করা হয়। হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. সেই যুদ্ধে নিজ প্রত্যাশা পূরণের উপাদান খুঁজে পান। হয় তিনি দুনিয়ার বুকে আল্লাহর দ্বীন বুলন্দ করার জন্য প্রাণপণে লড়ে যাবেন, অথবা আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করবেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ যুদ্ধে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেন। এ যুদ্ধ যেমন তেমন যুদ্ধ ছিল না। এমন ভয়ঙ্কর যুদ্ধ ছিল— ইতোপূর্বে ইসলামের সামনে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ আর দেখা যায়নি। এটা ছিল পৃথিবীর বিশাল অঞ্চলের বাদশার বিরুদ্ধে এক বিস্ময়কর অসম শক্তির লড়াই। সিরিয়ার রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ। যায়িদ বিন হারিসাকে সেনাপতি নিয়োগ করে তিনি বললেন, ‘যায়িদ নিহত হলে আমীর হবে জাফর ইবনে আবি তালিব। জাফর নিহত বা আহত হলে আমীর হবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। আর সে নিহত বা আহত হলে মুসলমানরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর নির্বাচন করবে।’

মুসলিম বাহিনী জর্দানের সিরিয়া সীমান্তের ‘মৃতা’ নামক স্থানে পৌঁছে দেখতে পেল, এক লাখ রোমান সৈন্য তাদের মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত এবং তাদের সাহায্যের জন্য লাখম, জুজাম, কুদাআ ইত্যাদি আরব গোত্রের আরও এক লাখ খ্রিস্টান সৈন্য পেছনে প্রতীক্ষা করছে। অন্যদিকে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা মাত্র তিন হাজার।

যুদ্ধ শুরু হতেই যায়িদ বিন হারিসা বীরের ন্যায় শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর জাফর বিন আবি তালিব তার ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়েন এবং শত্রুবাহিনী যাতে সেটি ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য নিজের তরবারি দ্বারা ঘোড়াটিকে হত্যা করে ফেলেন। তারপর পতাকাটি তুলে ধরেন রোমান বাহিনীর অভ্যন্তরভাগে বহু দূর পর্যন্ত প্রবেশ করে শত্রুনিধনকার্য চালাতে থাকেন। এমতাবস্থায় তার ডান হাতটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তিনি বাম হাতে পতাকা উঁচু করে ধরেন। তিনি বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। পাশাপাশি এ কবিতার চরণটি আবৃত্তি করে যান,

ياحبذا الجنة واقترابها طيبة، وبارد شرابها
والروم روم ، قد دنا عذابه كافرة بعيدة أنسابها
علي اذا لاقيتها ضرابها

জান্নাত ও জান্নাতের চতুর্পার্শ্ব কতই না মনোমুগ্ধকর! সেখানে রয়েছে শীতল ও পবিত্র পানীয়। আর রোম... রোমের ললাটে শীঘ্রই আসছে ভয়ঙ্কর শাস্তি। এরা তো কাফের। যাদের বংশ পরিক্রমা বহুদূর বিস্তৃত। তাদের কেউ আমার সামনে এলে, এদের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া আমার জন্য জরুরি।

রোমানরা এই ব্যক্তির অসীম শক্তি আর অদম্য সাহস দেখে বিস্ময়াভূত হয়ে পড়ে। তারা তাকে খুন করার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে। কাফেরদের তরবারির আঘাতে তার বাম হাতটিও দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবুও তিনি হাল ছাড়লেন না। বাহু দিয়ে বুকের সাথে জাপ্টে ধরে তিনি ইসলামী পতাকা সমুন্নত রাখলেন। এ অবস্থায় কিছুক্ষণ পর তরবারির তৃতীয় একটি আঘাত তার দেহটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। অতঃপর পতাকাটি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা তুলে নিলেন।

এভাবেই হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. নিজের মৃত্যুকে মানবতার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করলেন। পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে প্রাণপণ লড়াই করে ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে চলে যান।

তাঁর শাহাদাতের খবর শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দারুণভাবে ব্যথিত হন। বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তার চাচাত ভাই জাফরের বাড়িতে যান। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু-চোখ ছিল অশ্রুতে ভেজা। এরপর তিনি সাহাবাদের মজলিসে ফিরে আসেন। বিশিষ্ট সাহাবী কবি হযরত হাসসান ইবনে সাবিত রা. ও হযরত কাআব ইবনে মালিক রা. হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর শানে মর্সিয়া আবৃত্তি করতে থাকেন। জাফর ছিলেন গরীব-মিসকীনদের প্রতি ভীষণ দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। এ কারণে তাকে ডাকা হতো 'আবুল মাসাকীন' বা মিসকীনদের পিতা বলে। এ শ্রেণির সব লোক এসে খুবই কান্নাকাটি করতে থাকল। আবু হুরায়রা রা. বলেন, 'আমাদের মিসকীন সম্প্রদায়ের জন্য জাফর ইবনে আবি তালিব ছিলেন সর্বোত্তম ব্যক্তি। তিনি আমাদের সঙ্গে করে তার গৃহে নিয়ে যেতেন, যা কিছু তার কাছে থাকত তা আমাদের খাওয়াতেন। যখন তার খাবার শেষ হয়ে যেত তখন তার ছোট্ট শূন্য ঘি-এর মশকটি বের করে দিতেন। আমরা তা ফেঁড়ে ভেতরে যা কিছু লেগে থাকত চেটেপুটে খেতাম।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, জাফরের লাশ তালাশ করে দেখা গেল, শুধু তার সামনের দিকেই পঞ্চাশটি ক্ষতচিহ্ন। সারা দেহে তার নব্বইটিরও বেশি ক্ষত ছিল। কিন্তু তার একটিও পেছন দিকে ছিল না।

হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. অজস্র তীরের আঘাতে জর্জরিত শরীর নিয়ে জান্নাতে চলে গেছেন। আপনি যদি ইচ্ছে করেন, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তিটি শুনে নিতে পারেন : 'আল্লাহ তাআলা জাফরকে তার দুটি কর্তিত হাতের পরিবর্তে নতুন দুটি রক্তরাঙা হাত দান করেছেন এবং তিনি জান্নাতে ফেরেশতাদের সাথে উড়ে বেড়াচ্ছেন।'

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুতার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদ ইবনে হারিসা রা.-কে (সেনাপতি নিযুক্ত করে) বলেছিলেন, যদি যায়িদ রা. শহীদ হয়ে যায় তাহলে জাফর ইবনে আবি তালিব রা. (সেনাপতি হবে)। যদি জাফর রা.-ও শহীদ হয়ে যায় তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. (সেনাপতি হবে)। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, ওই যুদ্ধে তাদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। (যুদ্ধ শেষে) আমরা জাফর ইবনে আবু তালিব রা.-কে তালাশ করলে তাকে শহীদগণের মধ্যে পেলাম। তখন আমরা তার দেহে বর্শা ও তীরের নব্বইটিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। ৫২৮

আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মৃতা যুদ্ধের অবস্থা বর্ণনায়) বললেন, যায়িদ রা. পতাকা বহন করেছে অতঃপর শহীদ হয়েছে। অতঃপর জাফর রা. (পতাকা) হাতে নিয়েছে, সেও শহীদ হয়। অতঃপর আবদুল্লাহ্ ইবনে রাওয়াহা রা. (পতাকা) ধারণ করে এবং সেও শহীদ হয়। এ খবর বলছিলেন এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু-চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল। অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম পরামর্শক্রমে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর হাতে পতাকা তুলে দেন এবং তার দ্বারাই বিজয় লাভ হয়।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত যে, সেদিন (মৃতার যুদ্ধের দিন) তিনি শাহাদাতপ্রাপ্ত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর লাশের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। (তিনি বলেন,) আমি জাফর রা.-এর দেহে তখন বর্শা ও তরবারির পঞ্চাশটি আঘাতের চিহ্ন গুণেছি। তার মধ্যে কোনোটাই তার পশ্চাৎ দিকে ছিল না।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. যখন জাফর রা.-এর ছেলেকে সালাম করতেন তখন বলতেন, হে, দু-বাহুওয়ালা ব্যক্তির ছেলে। ৫২৯

মৃতার যুদ্ধে কাফেরদের তীরের আঘাতে যখন জাফর ইবনে আবি তালিবের হাত দুটি দেহ হতে পৃথক হয়ে যায় তখন তিনি ওই দু-হাতের বদলে আল্লাহর তরফ হতে দুটি ডানা লাভ করেন। সেগুলোর সাহায্যে তিনি ফেরেশতাদের সাথে আকাশে উড়তে থাকেন। পিতার এই অনন্য বৈশিষ্ট্য ও ফযীলতের স্মৃতিচারণার্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহীদের পুত্রকে 'দুডানা বিশিষ্ট ব্যক্তির পুত্র' বলে সম্বোধন করতেন। হাদীসটি তিরমিযীতে বর্ণিত রয়েছে। ৫৩০

শোকাহত আসমা
হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা.-এর স্বামী জাফর রা. ছিলেন এ যুদ্ধের একজন সেনা অধিনায়ক। যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। খবরটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পৌঁছর পর তিনি আসমার রা. বাড়িতে ছুটে যান এবং বলেন, 'জাফরের ছেলেদের আমার সামনে নিয়ে এসো।' আসমা ছেলেদের গোসল করিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে হাজির করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখ দু-টি পানিতে ভিজে গেল। তিনি ছেলেদের জাড়িয়ে চুমু দেন। আসমা জিজ্ঞেস করলেন, 'জাফরের কি কোনো খবর পেয়েছেন?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, সে শহীদ হয়েছে।' এতটুকু শুনতেই আসমা চিৎকার দিয়ে ওঠেন এবং বাড়িতে একটা মাতমের রূপ ধারণ করে। প্রতিবেশী মহিলারা তার পাশে সমবেত হয় এবং তাকে বলে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুকে হাত মারতে নিষেধ করছেন।' সেখান থেকে উঠে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ঘর ফিরে এলেন এবং বললেন, 'তোমরা জাফরের ছেলেদের জন্য খাবার তৈরি করো। কারণ, তাদের মা আসমা শোক ও দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছে। ৫০১

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যথিত অন্তরে মসজিদে গিয়ে বসেন এবং হযরত জাফর রা.-এর শাহাদাতের খবর ঘোষণা করেন। ঠিক এ সময় এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলে, জাফরের স্ত্রী মাতম শুরু করেছেন এবং কান্নাকাটি করছেন। তিনি লোকটিকে বলেন, তুমি যাও এবং তাদেরকে এমন করতে বারণ করো। কিছুক্ষণ পর লোকটি আবার ফিরে এসে বলে, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তারা তো বিরত হচ্ছে না। তিনি লোকটিকে আবার একই কথা বলে পাঠালেন; কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তার মুখে মাটি ভরে দাও। সহীহ বুখারীতে একথাও এসেছে যে, হযরত আয়েশা রা. ওই লোকটিকে বলেন, 'আল্লাহর কসম! তোমরা যদি এ কাজ (মুখে মাটি ভরা) না কর তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট থেকে মুক্তি পাবেন না। তৃতীয় দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসমার বাড়ি যান এবং তাকে শোক পালন করতে বারণ করেন। ৫০২

স্বামী হযরত জাফর রা.-এর শাহাদাতের ছয় মাস পরে অষ্টম হিজরীর শাওয়াল মাসে হুনাইন যুদ্ধের সময়কালে হযরত আবু বকর রা.-এর সাথে আসমার দ্বিতীয় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং বিয়ে পড়িয়েছেন। ৫৩৩ এই বিয়ের দুই বছর পর দশম হিজরীর যুলকাদা মাসে আবু বকর রা.-এর ঔরসে ছেলে মুহাম্মাদ ইবনে আবি বাকরের জন্ম হয়। আসমা তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায় হজের কাফেলার সাথে শরীক হয়ে মক্কার পথে ছিলেন। যুল হুলায়ফা পৌঁছার পর মুহাম্মাদ ভূমিষ্ঠ হয়। এখন তিনি হজ আদায়ের ব্যাপারে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। স্বামী আবু বকরও তাকে মদীনায় ফেরত পাঠাতে চাইলেন। অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতামত জানতে চাওয়া হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তাকে বলো, সে যেন গোসল করে হজের ইহরাম বেঁধে নেয়। ৫৩৪

স্বামী যখন সিদ্দীকে আকবার
হিজরী অষ্টম সনে প্রথম স্বামী জাফরের ইন্তেকালে হযরত আসমা রা. ভীষণ ব্যথা পান; কিন্তু আল্লাহ ও তার রাসূলের সন্তুষ্টি লাভের আশায় এই শোক ও দুঃখকে তিনি সবর ও শোকরে রূপান্তরিত করেন; কিন্তু হিজরী ১৩ সনে দ্বিতীয় স্বামী হযরত আবু বকর রা.-এর মৃত্যুতে তিনি আবার শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে তিনি এ শোকও কাটিয়ে ওঠেন। মৃত্যুকালে আবু বকর রা. অসিয়ত করে যান, স্ত্রী আসমা তাকে অন্তিম গোসল দেবেন। আসমা তাকে গোসল দেন। গোসল দেওয়া শেষ হলে তিনি উপস্থিত মুহাজিরদের লক্ষ্য করে বলেন, 'আমি রোযা আছি। আর দিনটিও ভীষণ ঠাণ্ডার। আমাকেও গোসল করতে হবে?' লোকেরা বলল, 'না। ৫৩৫

আলী রা.-এর ঘরে
হযরত আবু বকর রা.-এর মৃত্যুর পর হযরত আসমা হযরত আলী রা.-কে তৃতীয় স্বামী হিসেবে গ্রহণ কনে। শিশু মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর মায়ের সাথে সৎ পিতা আলীর রা. সংসারে চলে আসেন এবং তার স্নেহছায়ায় ও তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।

হযরত আসমার দুই ছেলের নামই মুহাম্মাদ। মুহাম্মাদ ইবনে জাফর ও মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর। একদিন এই দুই ছেলে একজন আরেকজনের ওপর কৌলীন্য ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে বলতে থাকে, আমি তোমার চেয়ে বেশি মর্যাদাবান। আমার পিতা তোমার পিতার চেয়ে বেশি সম্মানীয়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাদের এ বিতর্ক চলতে থাকে। হযরত আলী রা. তাদের মা আসমাকে বললেন, তুমিই তাদের এ বিবাদের ফয়সালা করে দাও। আসমা বললেন, আমি আরব যুবকদের মধ্যে জাফরের চেয়ে ভালো কাউকে পাইনি, আর বৃদ্ধদের মধ্যে আবু বকরের চেয়ে বেশি ভালো কাউকে দেখিনি। আলী রা. বললেন, তুমি তো আমার বলার কিছু রাখলে না। তুমি যা বলেছ, তাছাড়া অন্য কিছু বললে আমি অসন্তুষ্ট হতাম। আসমা তখন বলেন, আর ভালো মানুষ হিসেবে আপনি তিনজনের মধ্যে তৃতীয়। ৫৩৬

অন্তিম মুহূর্ত
জীবনের দীর্ঘ একটি সময় হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা. আল্লাহর ইবাদতে কাটান এবং আল্লাহর দ্বীনের জন্য অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের সময় তার ওপর তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন এবং তার স্বামীরাও ছিলেন তার ওপর রাযী-খুশি। অতঃপর হযরত আলী রা.-এর ইন্তেকালে কিছু পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। ইমাম যাহাবী বলেন, হযরত আলী রা.-এরপরও তিনি বেঁচেছিলেন। ৫৩৭

আল্লাহ তাআলা হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা.-এর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, যাঁকে তিনি গৌরব ও মর্যাদার স্বর্ণশিখরে আরোহণ করিয়েছেন।

**টিকাঃ**
৫২৩ আসহাবুর রাসূল সা., ১/৫৫০।
৫২৪ সহীহ, বুখারী, ৪২৩০; সহীহ, মুসলিম, ২৫০২।
৫২৫ ফাতহুল বারী, ৭/৩১৭; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৫০৩; কানযুল উম্মাল ৮/৩৩৩।
৫২৬ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৮১; আল ইসাবাহ, ৪/২৩১।
৫২৭ সহীহ, বুখারী, ২/৬০৭-৬০৮; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৮১।
৫২৮ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪২৬১।
৫২৯ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৭০৯।
৫৩০ ফাতহুল বারী, ৭/৯৬।
৫০১ আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আলবানী হাদীসটি 'হাসান' বলেছেন।
৫০২ মুসনাদ, আহমাদ: ৬/৩৬৯।
৫৩৩ আল-ইসাবা, ৪/২৩১।
৫৩৪ তাবাকাত, ৮/২৮২; মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩৬৯; সহীহ, মুসলিম, ৩/১৮৫-১৮৬।
৫৩৫ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২০৮।
৫৩৬ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২০৮-২০৯; আল ইসাবাহ, ৭/৪৯১।
৫৩৭ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৮৭।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 উম্মে শুরাইক রা.

📄 উম্মে শুরাইক রা.


দ্বীনের দাওয়াত: নববী আমল

আজ আমরা এমন এক মহীয়সীর জীবনচরিত আলোচনা করব—যিনি নিজ মাথায় বহন করেছিলেন দ্বীনী দাওয়াতের মহাভার। এ লক্ষ্যে তিনি মানুষের ময়দানে বেরিয়ে পড়েছিলেন; যাতে মানুষ ওই মহান সৃষ্টিকর্তার ইবাদতে আত্মনিয়োগ করে—যিনি আসমান-যমীনের সৃষ্টিকর্তা। এই চেতনা আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন। ফলে ইসলামের জন্য তিনি বয়ে আনেন প্রভূত কল্যাণ।

তিনি হচ্ছেন উম্মে শুরাইক রা.। যাঁর আসল নাম গাযিয়া বিনতে জাবির ইবনে হাকীম রা.। যদিও তার ঘটনা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার কীর্তি বিশাল। বহু সংখ্যক পথহারা মানুষ দিশা পেয়েছে তার দাওয়াতে। বহু মানুষ কত শত বছর বেঁচে থাকে; কিন্তু তাদের দ্বারা একজন মানুষও দ্বীনের সঠিক দিশা পায় না। আবার অনেক মহামানব এমনও আছেন যারা বেঁচে থাকেন অল্প কিছুদিন; কিন্তু তাদের চেতনা ও দাওয়াতের ফলে অগণিত মানুষ হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়, পেয়ে যায় প্রভু সন্তুষ্টির উপকরণ। আমাদের আজকের অতিথিও তেমনই জীবন লাভ করেছিলেন এবং এ জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহর দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকার পথে।

দাওয়াত : নববী আমল
وَ مَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَ عَمِلَ صَالِحًا وَ قَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
ওই ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম কথা কার, যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। ৫৩৮

পৃথিবীতে যতজন নবী এবং রাসূল আগমন করেছেন তাদের সকলেরই মিশন ছিল দাওয়াত। দাওয়াত দানের মাধ্যমেই তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে আলোর ফল্গুধারা প্রবাহিত করেছেন। কুরআন ও হাদিসে অসংখ্যবার দাওয়াতের গুরুত্বের কথা উঠে এসেছে।

আল্লাহর বাণী, 'বলুন, এটাই আমার পথ... ৫৩৯ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন এই রাস্তায় আল্লাহর দিকে আহবান করেন। অতঃপর যিনি আল্লাহর দিকে ডাকেন তিনি যেন রাসূলের পথে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে তার অনুসারী হয়ে ডাকেন। আর যিনি এটা ছাড়া মানুষকে আহবান করলেন, তিনি এই রাস্তায় জাগ্রত জ্ঞান সহকারে তার অনুসারী না হয়ে আহবান করলেন। আল্লাহর দিকে আহবান নবী ও তাদের অনুসারীদের কাজ এবং রাসূলদের উম্মতদের মধ্যে তাদের অনুসারীদের কাজ। মানুষেরা তাদের অনুসরণ করে। আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে, তার নিকটে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যেন পৌঁছে দেন। আল্লাহ তা সংরক্ষণ করবেন এবং মানুষের বাধা থেকে মুক্ত রাখবেন। আর তার উম্মতদের মধ্যে যারা উক্ত কাজ করবে তাদেরকেও তিনি হেফাযত করবেন ও দ্বীনের ওপর অটল থাকা ও দাওয়াতী কাজের বাধা থেকে প্রচ্ছন্ন রাখবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি আয়াতও জানা থাকলে তা প্রচারের কথা নির্দেশ দিয়েছেন। ৫৪০

দাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
فَلِذلِكَ فَادْعُ وَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَ لَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ وَقُلْ آمَنْتُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنْ كِتَبٍ وَ أُمِرْتُ لِأَعْدِلَ بَيْنَكُمْ اللَّهُ رَبُّنَا وَ رَبُّكُمْ لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ لَا حُجَّةَ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ اللَّهُ يَجْمَعُ بَيْنَنَا وَ إِلَيْهِ الْمَصِيرُ
অতএব, আপনি তার দিকে আহবান করুন ও তাতেই দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকুন যেভাবে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন এবং তাদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করবেন না। বলো, আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন আমি তাতে বিশ্বাস করি এবং আমি আদিষ্ট হয়েছি তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে। আল্লাহই আমাদের প্রতিপালক। আমাদের কর্ম আমাদের ও তোমাদের কর্ম তোমাদের। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ নেই। আল্লাহই আমাদের একত্র করবেন এবং প্রত্যাবর্তন তাঁরই দিকে। ৫৪১

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يُقَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللَّهِ وَامِنُوا بِهِ يَغْفِرُ لَكُمْ مِّنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرُكُمْ مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ
হে আমাদের সম্প্রদায়, আল্লাহর দিকে আহবানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন এবং মর্মন্তুদ শাস্তি হতে রক্ষা করবেন। ৫৪২

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَ اعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ
হে ঈমানদারগণ, রাসূল যখন তোমাদের এমন কিছুর দিকে আহবান করেন, যা তোমাদের প্রাণবন্ত করে, তখন আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দেবে। জেনে রাখ, আল্লাহ সম্মুখ ও তার অন্তরের মধ্যবর্তী হয়ে থাকেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদের একত্র করা হবে। ৫৪৩

হাদীস শরীফে এসেছে, ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুআয ইবনে জাবাল রা.-কে ইয়ামানে পাঠালেন, তখন তিনি তাকে বললেন, তুমি আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছ। সুতরাং তাদেরকে প্রথম আহবান করবে, তারা যেন আল্লাহ তাআলার একত্বকে মেনে নেয়। যদি তারা তা স্বীকার করে তবে তাদের বলবে, আল্লাহ তাদের ওপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তারা যদি সালাত আদায় করে তবে তাদের জানাবে, আল্লাহ তাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন, যা ধনীদের নিকট থেকে আদায় করা হবে এবং গরীবদের মাঝে বিতরণ করা হবে। তারা যদি এটা মেনে নেয় তাহলে তাদের নিকট থেকে তা গ্রহণ করবে। তবে মানুষের সম্পদের মূল্যের ব্যাপারে সাবধান থাকবে। ৫৪৪

আবু হুরায়রা রা. বলেন, একবার আমরা মসজিদে নববীতে বসে ছিলাম। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হয়ে বললেন, তোমরা ইহুদীদের কাছে চলো। আমরা চললাম এবং তাদের পাঠক্রমে পৌঁছলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বললেন, তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, তাহলে নিরাপত্তা পাবে। জেনে রাখ, পৃথিবী আল্লাহ এবং তার রাসূলের। আমি ইচ্ছা করছি তোমাদের এই দেশে হতে নির্বাসিত করব। যদি কেউ তার মালের বিনিময়ে কিছু পায়, তবে সে যেন তা বিক্রি করে। জেনে রাখ, পৃথিবী আল্লাহ এবং তার রাসূলের। ৫৪৫

'জুনাদা ইবনে উমাইয়া রা. বলেন, আমরা উবাদা ইবনে সামিত রা.-এর কাছে গেলাম। তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। আমরা বললাম, আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করুন! আমাদের একটি হাদীস বর্ণনা করুন, যা আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছেন এবং আল্লাহ আমাদের উপকার করবেন। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার আমাদের ডাকলেন এবং তার নিকট আনুগত্যের বাইআত করলাম। তিনি যে সমস্ত বিষয়ে আমদের বাইআত নিলেন তা হলো, সুখে-দুঃখে, দুর্দিনে-সুদিনে, স্বচ্ছলতা-অস্বচ্ছলতায়, এমনকি কোনো ব্যক্তিকে আমাদের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হলেও আমরা নেতার আনুগত্য করব এবং কাউকে দায়িত্ব অর্পণ করা হলে আমরা তাতে বাধা দেব না। তিনি আরও বলেন, কিন্তু তোমরা যদি তাকে প্রকাশ্য কুফরীতে লিপ্ত দেখ, স্পষ্ট প্রমাণ সহকারে (তখন কোনো আনুগত্য নেই)। ৫৪৬

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি কি তোমাদের এমন বিষয় সম্পর্কে বলে দেব না, যে কারণে আল্লাহ তোমাদের গোনাহসমূহ মুছে দিবেন এবং তোমাদের মর্যাদাকে সমুন্নত করবেন? সাহাবীরা বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তখন তিনি বললেন কষ্ট সত্ত্বেও পূর্ণরূপে ওযু করা, বেশি বেশি মসজিদের দিকে যাওয়া এবং এক সালাত শেষ করার পর অপর সালাতের অপেক্ষায় থাকা। আর এটিই 'রিবাত'। ৫৪৭

হাসান বসরী রহ. সূরা ফুসসিলাতের ৩৩ নং আয়াত তথা 'কথায় কে উত্তম ওই ব্যক্তি অপেক্ষা, যে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে আমি তো মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত' তিলাওয়াত করলেন। অতঃপর বললেন, এই ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয়পাত্র, আল্লাহর অলী, একনিষ্ঠ বন্ধু, আল্লাহর উত্তম বস্তু, পৃথিবীবাসীর মধ্যে আল্লাহর নিকট তিনি সর্বাধিক প্রিয়। আল্লাহ তার দুআ কবুল করেন। আল্লাহ যা কবুল করেন তার দিকেই তিনি মানুষকে দাওয়াত দেন এবং তআর আলোকেই আমলে সালেহ করেন। আর বলেন, আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। তিনিই আল্লাহ কর্তৃক দায়িত্বশীল। ৫৪৮

আকাশ থেকে পিপাসা নিবারণ
মূলত ইসলামের দাওয়াত দেওয়া তথা সৎ কাজের আদেশ (আমর বিন মা'রুফ) এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা (নাহি আনিল মুনকার) প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্যই মহান আল্লাহ তাআলা অত্যাবশ্যক করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন,

كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَ تَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের পাঠানো হয়েছে। তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে। ৫৪৯

এই আয়াতটিতে আল্লাহ শুধু পুরুষদেরকে উল্লেখ করেননি; বরং নারী-পুরুষ উভয়কেই নির্দেশ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদের রা. জীবনী থেকে দেখা যায় পুরুষ সাহাবী রা.-দের মতো মহিলা সাহাবীরাও দাওয়াতি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। তারা রা. আল্লাহর এই নির্দেশে সাড়া দিয়েই সেই কাজ করেছেন।

আমরা যদি উম্মে শুরাইক রা. এর জীবনচরিত দেখি, তাহলে দেখব, তিনি ছিলেন মক্কার একজন নারী। তার নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর নেমে পড়েন দাওয়াতী কাজে। তিনি বিভিন্ন বাড়িতে যেতেন। বাড়ির মহিলাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। সুযোগ বুঝে ইসলামের মর্মকথা তুলে ধরতেন তাদের কাছে। যদিও তিনি জানতেন, এই কথা জানাজানি হলে তার রক্ষা নেই!

আজকের মুসলিম নারীরা উম্মে শুরাইক রা.-কে অনুসরণ করে ইসলামী দাওয়াত মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারে। কেননা, এটি একজন মুসলমান নারীর জন্য ফরয। যদিওবা এই জন্য তাকে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। যেমন প্রতিকুল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল উম্মে শুরাইক রা.-কে।

শুরাইকা রা. যে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন, তা একসময় জানাজানি হয়ে যায়। তখন মুশরিক নেতারা তাকে আটক করে। তুলে দেয় তার গোত্রের লোকদের হাতে। তাকে শাস্তি দিতে বলে। তার গোত্রের লোকেরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে শুকনো রুটি ও মধু খেতে বাধ্য করে। অতঃপর তাকে প্রচণ্ড রোদে গরম বালুর ওপর শুইয়ে দেয়।

প্রচণ্ড রোদ আর গরম বালুর উত্তাপে তিনি ছটফট করতে থাকেন। পিপাসায় কাতরাতে থাকেন। একটু পানি দেবার জন্য লোকদের বার বার অনুরোধ করতে থাকেন। কেউ তার অনুরোধে সাড়া দিল না। কেউ তাকে একটু পানি দিল না। এইভাবে কেটে যায় তিনটি দিন। প্রচণ্ড উত্তাপ ও পিপাসায় তিনি মুমূর্ষু হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে এসে তিনি বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেন। যালিমরা তাকে ইসলাম ত্যাগ করতে বলত; কিন্তু বোধশক্তি হারিয়ে ফেলায় তিনি তাদের কথা বুঝে ওঠতে পারতেন না। তৃতীয় দিন একব্যক্তি আসমানের দিকে ইশারা করে তাকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান ত্যাগ করতে বলে। অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যে যা বোঝাতে চেয়েছিল তিনি তা বুঝতে সক্ষম হন। চিৎকার দিয়ে তিনি বলে ওঠেন, 'আল্লাহর কসম! আমি তো এখনো সেই ঈমানের ওপরই অটল আছি।'

আল্লাহু আকবার! এই ছিল উম্মে শুরাইক রা.-এর ঈমান। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য যিনি জীবন উৎসর্গ করতেও রাজি ছিলেন। তারা এসব কষ্টকে কষ্টই মনে করতেন না। কারণ তারা জানতেন জাহান্নামের আজাব আরও ভয়াবহ।

এ ছাড়া আল্লাহপাক শুধু ঈমানের মৌখিক স্বীকৃতিতেই তার বান্দাদের নিষ্কৃতি দেবেন না। তিনি যাচাই করে নিবেন তার কোনো বান্দা বা বান্দী সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর আদেশ সঠিকভাবে পালন করেছেন আর কোনো বান্দা করেননি।

তাই দাওয়াতী কাজে বাধা দিয়ে, বিপদ দিয়ে আল্লাহ তার বান্দাদের পরীক্ষায় ফেলতে পারেন। এই পরীক্ষা তার বান্দাদের ঈমানকে যাচাইয়ের পরীক্ষা; কিন্তু সেই পরীক্ষাকে ভয় না পেয়ে জয় করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে, এসব বিপদ-আপদের মধ্যেও আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য কল্যাণ রেখেছেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যান চান তাকে বিপদে (পরীক্ষায়) ফেলেন।

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি হেদায়াতের দিকে আহবান করবে তার জন্য তার অনুসারী ব্যক্তির সমপরিমাণ নেকী রয়েছে; কিন্তু তার নেকী থেকে বিন্দু পরিমাণ হ্রাস পাবে না। যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে আহবান করবে তার জন্য তার অনুসারী ব্যক্তির সমপরিমাণ পাপ রয়েছে; কিন্তু তার পাপ থেকে বিন্দু পরিমাণ হ্রাস পাবে না। ৫৫০

আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৫৩৮ সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৩।
৫৩৯ সূরা ইউসুফ, ৪১:১২:১০৮।
৫৪০ জালাউল আফহাম, ৪১৫।
৫৪১ সূরা শূরা, ৪২:১৫।
৫৪২ সূরা আহকাফ, ৪৬:৩১।
৫৪৩ সূরা আনফাল, ৮:২৪।
৫৪৪ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৭৩৭২।
৫৪৫ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩১৬৭।
৫৪৬ সহীহ, মুসলিম: হাদীস নং ৪৮৭৭।
৫৪৭ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৬১০।
৫৪৮ তাফসীর ইবনে কাসীর, ৪/১০১।
৫৪৯ সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০।
৫৫০ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৬৯৮০।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 উমামা বিনতে আবিল আস রা.

📄 উমামা বিনতে আবিল আস রা.


আজ আমরা এমন এক পুষ্পিত মানবীর জীবনচরিত নিয়ে আলোচনা করব মানুষের পৃথিবীতে যাঁর দৃষ্টান্ত মেলা ভার। তিনি রাসূল সা.-এর ঘরের একজন প্রিয়ভাজন ব্যক্তিত্ব। তাঁকে পিঠে নিয়ে নামায পড়েছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি তাঁকে অত্যধিক স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। এক পবিত্র ও নিষ্কলুষ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি।
এই মহীয়সী মানবী হলেন হযরত উমামা বিনতে আবিল আস রা.। তিনি হলেন যায়নাব বিনতে রাসূলিল্লাহ-এর আদরের মেয়ে। সহজেই অনুমান করা যায়, কেমন অনুপম পরিবারের সন্তান তিনি!

যেমন বৃক্ষ তেমন ফল
আমরা যদি এই ফলের পরিচয় নিতে চাই তাহলে সর্বাগ্রে আমাদের ফলের গাছটির দিকে নজর দিতে হবে। যেখান থেকে উৎপন্ন হয়েছেন তিনি। যাঁদের সান্নিধ্যে বেড়ে উঠেছেন:
✓ তাঁর নানা হচ্ছেন সায়্যিদুল আউয়্যালীন ওয়াল আখিরীন, রাসূলু রাব্বিল আলামীন মুহাম্মাদ সা.। যাঁকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন।
✓ তাঁর নানী হচ্ছেন উভয় জগতের নারী মহলের নেত্রী, উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা.। যিনি প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং সত্যয়ন করেছেন পরম সত্যবাদী ও আমানতদার নবী সা.কে।
✓ তাঁর মা হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর বড় মেয়ে, ধৈর্যশীলা, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারিণী হযরত যায়নাব রা.।
✓ তাঁর খালা হচ্ছেন ফাতিমা বিনতে রাসূলিল্লাহ। যিনি জান্নাতী নারীদের নেত্রী।
✓ তাঁর স্বামী হচ্ছেন আসাদুল্লাহিল গালিব হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা.
এই হচ্ছে হযরত উমামা বিনতে আবিল আস রা. এর ঈমানদীপ্ত পরিবার। যেখান থেকে তিনি ইসলামের সুমহান শিক্ষা লাভ করেছেন।

মা-বাবার ভালোবাসা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম হযরত খাদীজা রা.-কে বিয়ে করেন। তার গর্ভেই আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে সন্তান দান করেন। তন্মধ্যে যায়নাব রা. হচ্ছেন সবার বড় মেয়ে। যায়নাব রা.-এর স্বামী আবুল আস ইবনুর রবী' ইবনে আবদুল উয্যা ছিলেন যায়নাবের খালাতো ভাই। মা হযরত খাদীজার রা. আপন ছোট বোন হালা বিনতে খুওয়াইলিদের ছেলে।
বিয়ের সময় বাবা-মা মেয়েকে যে সকল উপহার সামগ্রী দিয়েছিলেন তার মধ্যে ইয়ামেনী আকীকের একটি হারও ছিল। হারটি দিয়েছিলেন মা খাদীজা রা.। তার নানা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী লাভ করে নবী হলেন। মেয়ে যায়নাব রা. তার মার সাথে মুসলমান হলেন। স্বামী আবুল আস তখন ইসলাম গ্রহণ করেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করলেন। পরে হযরত যায়নাব রা. স্বামীকে মুশরিক অবস্থায় মক্কায় রেখে মদীনায় হিজরত করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যায়নাব রা. ও আবুল আসের মধ্যের গভীর সম্পর্ক এবং ভদ্রোচিত কর্মপদ্ধতির প্রায়ই প্রশংসা করতেন।
মক্কায় ইসলামের শুরুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ অল্পসংখ্যক মুসলমানদের শক্তি তেমন মজবুত ছিল না। আর কাফেরদের যুলুম-অত্যাচারের প্লাবন ছিল সবেগে প্রবহমান। সঙ্গতকারণেই ইসলামের প্রচার-প্রসারের কর্মকাণ্ড খুবই ধীর গতিতে এগোচ্ছিল। এসব বিবেচনা করে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ না ঘটানোই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমীচীন মনে করেন।
আবুল আস স্ত্রী যায়নাব রা.-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং সম্মানও করতেন; কিন্তু তিনি পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে প্রিয়তমা স্ত্রীর নতুন দ্বীন কবুল করতে কোনোভাবেই রাজী হলেন না। এ অবস্থা চলতে লাগল। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কুরাইশদের মধ্যে মারাত্মক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত শুরু হয়ে গেল। কুরাইশরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল, তোমাদের সর্বনাশ হোক! তোমরা মুহাম্মাদের মেয়েদের বিয়ে করে তার দুশ্চিন্তা নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছ। তোমরা যদি এ সকল মেয়েকে তার কাছে ফেরত পাঠাতে তাহলে সে তোমাদের ছেড়ে তাদেরকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ত। তাদের মধ্যে অনেকে এ কথা সমর্থন করে বলল, এ তো অতি চমৎকার যুক্তি। তারা দল বেঁধে আবুল আসের কাছে গিয়ে বলল, আবুল আস, তুমি তোমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তার পিতার কাছে পাঠিয়ে দাও। তার পরিবর্তে তুমি যে কুরাইশ সুন্দরীকে চাও, আমরা তাকে তোমার সাথে বিয়ে দেব। আবুল আস বললেন, 'আল্লাহর কসম! না, তা হয় না। আমার স্ত্রীকে আমি ত্যাগ করতে পারি না। তার পরিবর্তে সকল নারী আমাকে দিলেও আমার তা পছন্দ নয়।' একারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার আত্মীয়তাকে খুব ভালো মনে করতেন এবং প্রশংসা করতেন।

বাবা যখন বদরের বন্দী
হযরত যায়নাব রা.ও স্বামী আবুল আসকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসা ও ত্যাগের অবস্থা নিম্নের ঘটনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
নবুয়তের তেরোতম বছরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। হযরত যায়নাব রা. স্বামীর সাথে মক্কায় থেকে যান। কুরাইশদের সাথে মদীনার মুসলমানদের সামরিক সংঘাত শুরু হলো। কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বদরে সমবেত হলো। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবুল আস কুরাইশদের সাথে বদলে গেলেন। কারণ, কুরাইশদের মধ্যে তার যে স্থান তাতে না গিয়ে উপায় ছিল না। বদরে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। তাদের বেশ কিছু নেতা নিহত হয় এবং বহু সংখ্যক যোদ্ধা বন্দী হয়। আর অবশিষ্টরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এই বন্দীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামাই হযরত যায়নাব রা.-এর স্বামী আবুল আসও ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর ইবনে নুমান রা. তাকে বন্দী করেন।
বন্দীদের সামাজিক মর্যাদা এবং ধনী-দরিদ্র প্রভেদ অনুযায়ী এক হাজার থেকে চার হাজার দিরহাম মুক্তিপণ নির্ধারিত হলো। বন্দীদের প্রতিনিধিরা ধার্যকৃত মুক্তিপণ নিয়ে মক্কা-মদীনা ছুটাছুটি শুরু করে দিল। নবী দুহিতা হযরত যায়নাব রা. স্বামী আবুল আসের মুক্তিপণসহ মদীনায় লোক পাঠালেন। আবুল আসের মুক্তিপণ নিয়ে মদীনায় এসেছিল তার ভাই আমর ইবনে রবী। হযরত যায়নাব মুক্তিপণ দিরহামের পরিবর্তে একটি হার পাঠিয়েছিলেন। এই হারটি তার জননী হযরত খাদীজা রা. বিয়ের সময় তাকে উপহার দিয়েছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারটি দেখেই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন এবং নিজের বিষণ্ণ মুখটি একটি পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেললেন। জান্নাতবাসিনী প্রিয়তমা স্ত্রী ও অতি আদরের মেয়ের স্মৃতি তার মানসপটে ভেসে উঠেছিল।
কিছুক্ষণ পর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন, 'যায়নাব তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে এই হারটি পাঠিয়েছে। তোমরা ইচ্ছে করলে তার বন্দীকে ছেড়ে দিতে পার এবং হারটিও তাকে ফেরত দিতে পার।'
সাহাবীরা রাজী হয়ে গেলেন। তারা আবুল আসকে মুক্তি দিলেন, আর সেই সাথে ফেরত দিলেন তার মুক্তিপণের হারটি। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবুল আসের নিকট থেকে এ অঙ্গীকার নিলেন যে, মক্কায় ফিরে অনতিবিলম্বে সে যায়নাবকে যেন মদীনায় পাঠিয়ে দেয়।

হিজরতকালে যায়নাবের দুর্দশা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাব রা.-কে নেওয়ার জন্য আবুল আসের সঙ্গে হযরত যায়িদ ইবনে হারিসা রা.-কে পাঠন। তাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করতে বলেন। যায়নাব রা. মক্কা থেকে সেখানে পৌঁছলে তাকে নিয়ে মদীনায় চলে আসতে বলেন। আবুল আস মক্কায় পৌঁছে যায়নাব রা.-কে সফরের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আছেন, এমন সময় হিন্দা বিনতে উতবা এসে হাজির হলো। প্রস্তুতি দেখে বলল, মুহাম্মাদের মেয়ে! তুমি কি তোমার বাপের কাছে যাচ্ছ? যায়নাব রা. বললেন, এই মুহূর্তে তো তেমন উদ্দেশ্য নেই, তবে ভবিষ্যতে আল্লাহর যা ইচ্ছ হয়। হিন্দা ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বলল, বোন, এটা গোপন করার কী আছে। সত্যিই যদি তুমি যাও তাহলে পথে দরকার পড়ে এমন কোনো কিছু প্রয়োজন হলে রাখঢাক না করে বলে ফেলতে পার, আমি তোমার সেবার জন্য প্রস্তুত আছি।
হযরত যায়নাব রা. বলেন, হিন্দা যা বলেছিল, অন্তরের কথাই বলেছিল। অর্থাৎ, আমার যদি কোনো জিনিসের প্রয়োজন হতো, তাহলে অবশ্যই সে তা পূরণ করত; কিন্তু সে সময়ের অবস্থা চিন্তা করে আমি অস্বীকার করি।
সফরের প্রস্তুতি শেষ হলে যায়নাব রা.-এর দেবর কিনানা ইবনে রবী একটি উট এনে দাঁড় করাল। যায়নাব উটের ফিঠের হাওদায় উঠে বসলেন। আর কিনানা স্বীয় ধনুকটি কাঁধে ঝুলিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি হাতে নিয়ে দিনে দুপুরে উট হাঁকিয়ে মক্কা থেকে বের হলো। কুরাইশদের মধ্যে হই চই পড়ে গেল। তারা ধাওয়া করে মক্কার অদূরে 'জী-তুওয়া' উপত্যকায় তাদের দুইজনকে ধরে ফেলল। কিনানা কুরাইশদের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে কাঁধের ধনুকটি হাতে নিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, তোমাদের কেউ যায়নাবের নিকটে যাওয়ার চেষ্টা করলে তার সিনা হবে আমার তীরের লক্ষ্যস্থল। কিনানা ছিল একজন দক্ষ তীরন্দাজ। তার নিক্ষিপ্ত কোনো তীর সচরাচর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। তার এ হুমকি শুনে আবু সুফইয়ান ইবনে হারব তার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে বলল, 'ভাতিজা, তুমি যে তীরটি আমাদের দিকে তাক করে রেখেছ, তা একটু ফেরাও। আমরা তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।' কিনানা তীরটি নামিয়ে নিয়ে বলল, কী বলতে চান, বলে ফেলুন। আবু সুফইয়ান বলল, 'তোমার কাজটি ঠিক হয়নি। তুমি প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে মানুষের সামনে দিয়ে যায়নাবকে নিয়ে বের হয়েছ, আর আমরা বসে বসে তা দেখছি। গোটা আরববাসী জানে, বদরে আমাদের কী দুর্দশা ঘটেছে এবং যায়নাবের বাপ আমাদের কী সর্বনাশটাই না করেছে। তুমি যদি এভাবে প্রকাশ্যে তার মেয়েকে আমাদের নাকের ওপর দিয়ে নিয়ে যাও তাহলে সবাই আমাদের কাপুরুষ ভাববে এবং এ কাজটি আমাদের জন্য অপমান বলে বিবেচনা করবে। তুমি আজ যায়নাবকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কিছুদিন সে স্বামীর ঘরে থাকুক। এদিকে লোকেরা যখন বলতে শুরু করবে যে, আমরা যায়নাবকে মক্কা থেকে যেতে বাধা দিয়েছি, তখন একদিন গোপনে তাকে তার বাপের কাছে পৌছে দিয়ো।
তাবারানী উরওয়া ইবনে যুবাইর হতে বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি যায়নাব বিনতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে মক্কা থেকে বের হলে কুরাইশদের দুই ব্যক্তি পিছু ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলে। তারা যায়নাব রা.-এর সঙ্গী লোকটিকে কাবু করে যায়নাব রা.-কে উটের পিঠ থেকে ফেলে দেয়। তিনি একটি পাথরের ওপর ছিটকে পড়লে শরীর ফেটে রক্ত বের হয়ে যায়। এ অবস্থা তারা যায়নাব রা.-কে মক্কায় আবু সুফইয়ানের নিকট নিয়ে যায়। আবু সুফইয়ান তাকে বনী হাশিমের মেয়েদের কাছে সোপর্দ করে। পরে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। উঠের পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ায় তিনি যে আঘাত পান, আমরণ সেখানে ব্যথা অনুভব করতেন এবং সেই ব্যথায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। এজন্য তাকে শহীদ মনে করা হতো।
যেহেতু স্বামী-স্ত্রী দুইজনের মধ্যেকার সম্পর্ক অতি চমৎকার ছিল, এ কারণে হযরত যায়নাব রা. মদীনায় চলে যাওয়ার পর আবুল আস বেশির ভাগ সময় খুবই বিমর্ষ থাকতেন।
হিজরী ৮ম সনে উমামা বিনতে আবিল আস রা.-এর মা এবং দ্বাদশ সনে পিতা ইন্তেকাল করেন।

বিশ্বনবী নানার স্নেহছায়ায়
নানা হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশু উমামাকে অত্যধিক স্নেহ করতেন। সব সময় তাকে সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন। এমনকি নামাযের সময়ও কাছে রাখতেন। মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কাঁধের ওপর বসিয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। রুকূতে যাওয়ার সময় কাঁধ থেকে নামিয়ে দিতেন। তারপর সিজদায় গিয়ে তাকে মাথার ওপর বসাতেন এবং সিজদা থেকে উঠার সময় কাঁধের ওপর নিয়ে আসতেন। এভাবে তিনি নামায শেষ করতেন। এ আচরণ দ্বারা উমামার প্রতি তার স্নেহের আধিক্য কিছুটা অনুমান করা যায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী হযরত আবু কাতাদা রা. বলেন, একদিন বেলাল আযান দেওয়ার পর আমরা যোহর, মতান্তরে আসরের নামাযের জন্য অপেক্ষায় আছি, এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমামা বিনতে আবিল আসকে কাঁধে বসিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযে দাঁড়ালেন এবং আমরাও তার পেছনে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলাম। উমামা তখনও তার নানার কাঁধে একইভাবে বসা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকূতে যাবার সময় তাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে রাখেন। রুকু-সিজদা শেষ করে যখন উঠে দাঁড়ালেন তখন আবার তাকে ধরে কাঁধের ওপর উঠিয়ে নেন। প্রত্যেক রাক'আতে এমনটি করে তিনি নামায শেষ করেন।
উমামার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্নেহের প্রবলতা আরেকটি ঘটনার দ্বারাও অনুমান করা যায়। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট মুক্তাখচিত স্বর্ণের একটি হার আসে। হারটি হাতে করে ঘরে এসে বেগমদের দেখিয়ে বলেন, দেখ তো, এটি কেমন? তারা সবাই বলেন, অতি চমৎকার! এর চেয়ে সুন্দর হার আমরা এর আগে আর দেখিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটি আমি আমার পরিবারের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি প্রিয় তার গলায় পরিয়ে দেব। আম্মাজান হযরত আয়েশা রা. মনে মনে ভাবলেন, না জানি তিনি এটা আমাকে না দিয়ে অন্য কোনো বেগমের গলায় পরিয়ে দেন কি না। অন্য বেগমগণও ধারণা করলেন, এটা হয়তো আয়েশা রা.-এর ভাগ্যেই জুটবে। এদিকে বালিকা উমামা তার নানা ও নানীদের অদূরেই মাটিতে খেলছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগিয়ে গিয়ে তার গলায় হারটি পরিয়ে দেন।
হযরত উমামা রা.-এর পিতা আবুল আস ইবনে রবী রা. হিজরী ১২ সনে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার মামাতো ভাই যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা.-এর সাথে উমামার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা বলে যান। এদিকে উমামার খালা হযরত ফাতিমা রা.ও ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্বামী আলীকে বলে যান, তার পরে তিনি যেন উমামাকে বিয়ে করেন। অতঃপর উমামার বিয়ের বয়স হলো। যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. হযরত ফাতিমার রা. অন্তিম ইচ্ছা পূরণের জন্য উদ্যোমী হলেন। তাঁরই মধ্যস্থতায় আলীর রা. সাথে উমামার রা. বিয়ে সম্পন্ন হলো। তখন আমীরুল মুমিনীন উমর রা.-এর খিলাফতকাল।
হিজরী ৪০ সন পর্যন্ত তিনি আলীর রা. সাথে বৈবাহিক জীবন-যাপন করেন। অবশেষে হিজরী ৪০ সনে তিনি আততায়ীর হাতে মারাত্মকভাবে আহত হন। এই আঘাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্ত্রী উমামাকে বলেন, আমার পরে যদি তুমি কোনো পুরুষের প্রয়োজন বোধ কর, তাহলে মুগীরা ইবনে নাওফালকে বিয়ে করতে পার। তিনি মুগীরাকেও বলে যান, তার মৃত্যুর পর তিনি যেন উমামাকে বিয়ে করেন।
এই মুগীরার স্ত্রী থাকা অবস্থায় মু'আবিয়ার রা. খিলাফতকালে তিনি ইন্তেকাল করেন। আলীর রা. ঘরে উমামা রা.-এর কোনো সন্তান হয়নি। তবে মুগীরা রা.-এর ঘরে তিনি এক ছেলের মা হন এবং তার নাম রাখেন ইয়াহইয়া। এ জন্য মুগীরা রা.-এর ডাকনাম হয় আবু ইয়াহইয়া।
তবে অনেকে বলেছেন, মুগীরার ঘরেও তিনি কোনো সন্তানের মা হননি। তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যাদের মধ্যে একমাত্র ফাতিমা রা. ছাড়া আর কারও বংশধারা অব্যাহত নেই। হতে পারে মুগীরার ঔরসে ইয়াহইয়া নামের এক সন্তানের জন্ম দেন।
অতঃপর হযরত উমামা রা.ও এক সময় সাড়া দেন মহান প্রভুর ডাকে। চলে যান নানা রাসূলুল্লাহ সা., নানী খাদীজা রা., মা যায়নাব রা. ও বাবা আবুল আস রা.-এর সান্নিধ্যে। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৫৫১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৪৬।
৫৫২. সুনান, আবু দাউদ, ১/২২২।
৫৫৩. তাবারী, ৩/১৩৬; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫২।
৫৫৪. আনসাবুল আশরাফ, ১/২৬৯।
৫৫৫. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫৩।
৫৫৬. আল-বিদায়া ওয়াননিহায়াহ, ৩/৩৩০; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫৪-৬৫৫।
৫৫৭. আনসাবুল আশরাফ: ১/৩৫৭, ৩৯৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা ২/২৪৭; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫৭; হায়াতুস সাহাবাহ, ১/৩৭১।
৫৫৮. তারাজিমু সায়্যিদাতি বায়াতিন নুবুওয়াহ, ৫৩৬-৫৩৭।
৫৫৯. সুনান, নাসায়ী, ২/৪৫, ৩/১০; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৩২; আল ইসাবাহ, ৪/২৩৬।
৫৬০. আল ইসতিআব, ৪/২৩৮; উসুদুল গাবা, ৫/৪০০।
৫৬১. উসুদুল গাবাহ, ৫/৪০০।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 রুবায়্যি বিনতে মুআত্তাওবিয রা.

📄 রুবায়্যি বিনতে মুআত্তাওবিয রা.


ইসলাম মানবজাতিকে বিস্ময়কর এক একটি নারী উপহার দিয়েছে যাঁদের জীবনকথা মনুষ্যত্ব সাধনায় মানুষকে চিরকাল প্রেরণা দেয়। এমন এক অবিস্মরণীয় চরিত্র হলেন হযরত রুবায়্যি বিনতে মুআওবিয রা.। যে সকল আনসার পরিবার ইসলামরে সেবায় মহান ভূমিকা পালন করেছে, তার পরিবারটি এর অন্তর্গত। রুবায়্যি বিনতে মুআওবিয রা. এমন এক গর্বিত নারী যিনি দ্বীনের জন্য নিজের জীবনের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। বাইআতে রিযওয়ানের সেই সৌভাগ্যমতি শপথগ্রহণকারীদের অন্যতম তিনি।
প্রথম পর্বে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ইসলাম ও মক্কা থেকে আগত মুসলমানদের সেবায় এই পরিবারটির রয়েছে গৌরবময় অবদান। তার পিতা হলেন মুআওবিষ ইবনে আফরা আহলে বদরের অন্তর্ভুক্ত।
মুআয বিন রিফাআ ইবনে রাফে' যুরাকী রহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা বদর যুদ্ধে যোগদানকারীদের একজন। তিনি বলেন, একবার জিবরাঈল আ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললেন, 'আপনারা বদর যুদ্ধে যোগদানকারী মুসলিমদের কীরূপ গণ্য করেন?' তিনি বললেন, 'তারা সর্বোত্তম মুসলিম' অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) এরূপ কোনো শব্দ তিনি বলেছিলেন। জিবরাঈল আ. বললেন, 'ফেরেশতাদের মধ্যে বদর যুদ্ধে যোগদানকারীগণও তেমনই মর্যাদার অধিকারী।'
মদীনার যে ছয় ব্যক্তি মক্কায় গিয়ে প্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে গোপনে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করেন রুবায়্যি-এর চাচা আওফ তাদের একজন। তিনি একজন আকাবীও অর্থাৎ, আকাবার দুইটি বাইআতের অংশীদার। তার পিতা মুআওবিয ও অপর চাচা মুআয রা. আকাবার প্রথম বাইআতে অংশগ্রহণ করেন।
রুবায়্যি বিনতে মুআওবিয রা.-এর তখন বাল্যকাল। এমন সময়ে যখন ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের দামামা বেজে উঠল, তখন রুবায়্যি বিনতে মুআওবিয রা.-এর পিতা সাগ্রহে এতে অংশ নেন এবং বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে যুগের নিয়ম অনুযায়ী কুরাইশ পক্ষ মুসলিম পক্ষের বীর যোদ্ধাদের দ্বৈতযুদ্ধে আহ্বান করল। তাদের একই পরিবারের তিনজন সেরা অশ্বারোহী বীর উতবা ও শায়বাহ বিন রাবীআহ এবং ওয়ালীদ বিন উতবা এগিয়ে এলো। জবাবে মুসলিম পক্ষ হতে মুআয ও মুআওবিয ইবনে আফরা রা. কিশোর দুই ভাই ও আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা রা.-এই তিনজন আনসার তরুণ যুবক বীরদর্পে এগিয়ে গেলেন; কিন্তু কুরাইশ পক্ষ বলে উঠল, হে মুহাম্মাদ, আমাদের স্বগোত্রীয় সমকক্ষদের পাঠাও। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হে ওবায়দাহ, হে হামযাহ, হে আলী, তোমরা যাও। অতঃপর আলী তার প্রতিপক্ষ ওয়ালীদ বিন উতবাহকে, হামযাহ তার প্রতিপক্ষ শায়বাহ বিন রাবীআহকে এক নিমিষেই খতম করে ফেললেন। ওদিকে বৃদ্ধ ওবায়দাহ ইবনুল হারিস তার প্রতিপক্ষ উতবা বিন রাবীআহর সঙ্গে যুদ্ধে আহত হলেন। তখন আলী ও হামযাহ তার সাহায্যে এগিয়ে এসে উতবাহকে শেষ করে দেন ও ওবায়দাহকে উদ্ধার করে নিয়ে যান; কিন্তু অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে যুদ্ধশেষে মদীনায় ফেরার পথে ৪র্থ বা ৫ম দিন ওবায়দা শাহাদাত বরণ করেন।
প্রথম আঘাতেই সেরা তিনজন বীরযোদ্ধা ও গোত্র নেতাকে হারিয়ে কুরায়েশ পক্ষ মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এ সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকটে আকুলভাবে নিম্নোক্ত প্রার্থনা করেন,
اللَّهُمَّ أَنْجِزْ لِي مَا وَعَدْتَنِي اللَّهُمَّ إِنِّي أَنْشُدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ ... اللَّهُمَّ إِنْ تَهْلِكُ هَذِهِ الْعِصَابَةُ لَا تُعْبَدُ فِي الْأَرْضِ بَعْدَ الْيَوْمِ أَبَدًا
হে আল্লাহ, তুমি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছিলে তা পূর্ণ করো। হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে তোমার অঙ্গীকার ও ওয়াদা পূরণের প্রার্থনা জানাচ্ছি।... হে আল্লাহ, যদি এই ক্ষুদ্র দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আজকের দিনের পরে তোমার ইবাদত করার মতো কেউ আর ভূপৃষ্ঠে থাকবে না।
তিনি প্রার্থনায় এমন আত্মভোলা ও বিনয়ী হয়ে দুআ করছিলেন যে, তার কাঁধ থেকে চাদর পড়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে আবু বকর ছুটে এসে তার চাদর উঠিয়ে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
حَسْبُكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ، فَقَدْ أَلْحَحْتَ عَلَى رَبِّكَ
হে রাসূল, যথেষ্ট হয়েছে, আপনার পালনকর্তার নিকটে আপনি চূড়ান্ত প্রার্থনা করেছেন।
এ সময় আয়াত নাযিল হলো,
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ
যখন তোমরা তোমাদের পালনকর্তার নিকটে কাতর প্রার্থনা করছিলে, তখন তিনি তোমাদের দুআ কবুল করলেন। আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা, যারা হবে ধারাবাহিকভাবে অবতরণকারী।
মুসলিমবাহিনীর এই হামলার প্রচণ্ডতার সাথে সাথে যোগ হয় ফেরেশতাগণের হামলা। ইকরিমা বিন আবু জাহেল (যিনি ওই যুদ্ধে পিতার সাথে শরীক ছিলেন এবং মক্কা বিজয়ের পরে মুসলমান হন) বলেন, ওইদিন আমাদের লোকদের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যেত, অথচ দেখা যেত না কে মারল। আবু দাউদ আল মাযেনী বলেন, আমি একজন মুশরিক সৈন্যকে মারতে উদ্যত হব। ইতোমধ্যে তার ছিন্ন মস্তক আমার সামনে এসে পড়ল। আমি বুঝতেই পারলাম না, কে ওকে মারল। রাসূলের চাচা আব্বাস যিনি বাহ্যিকভাবে মুশরিকবাহিনীতে ছিলেন, জনৈক আনসার তাকে বন্দী করে আনলে, তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমাকে এ ব্যক্তি বন্দী করেনি; বরং যে ব্যক্তি বন্দী করেছে, তাকে এখন দেখতে পাচ্ছি না। তিনি একজন চুলবিহীন মাথাওয়ালা ও সুন্দর চেহারার মানুষ এবং বিচিত্র বর্ণের একটি সুন্দর ঘোড়ায় তিনি সওয়ার ছিলেন। আনসার বললেন, হে রাসূল, আমিই তাকে বন্দী করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত আনসারকে বললেন,
اسْكُتْ فَقَدْ أَيْدَكَ اللَّهُ بِمَلَكَ كَرِيمٍ
চুপ করো। আল্লাহ এক সম্মানিত ফেরেশতা দ্বারা তোমাকে সাহায্য করেছেন।
কোনো কোনো হাদীসে এসেছে যে, ফেরেশতারা কোনো মুশরিকের উপরে আক্রমণ করার ইচ্ছা করতেই আপনা-আপনি তার মস্তক দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
মুসলিমবাহিনীর দুর্ধর্ষ আক্রমণে পর্যুদস্ত মুশরিক বাহিনী প্রাণভয়ে পালাতে থাকল। এ দৃশ্য দেখে তাদের ধরে রাখার জন্য আবু জাহেল তার লোকদের উদ্দেশ্যে জোরালো ভাষণ দিয়ে বলে উঠল, 'উতবা, শায়বা, ওয়ালীদের মৃত্যুতে ভীত হওয়ার কারণ নেই। কেননা, তাড়াহুড়োর মধ্যে তারা মারা পড়েছেন। লাত ও উয্যার শপথ করে বলছি, ওদেরকে শক্ত করে রশি দিয়ে বেঁধে না ফেলা পর্যন্ত আমরা ফিরে যাব না। অতএব, তোমরা ওদেরকে মেরো না; বরং ধরো এবং বেঁধে ফেলো।'
কিন্তু আবু জাহেলের এই তর্জন-গর্জন অসার প্রমাণিত হলো। আনসারদের বনু সালামাহ গোত্রের কিশোর দুই ভাই মুআয ও মুআওবিয ইবনে আফরা তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল এবং মুআয প্রথম আঘাতেই আবু জাহেলের পা তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। এ সময় তার কাঁধে ইকরিমা বিন আবু জাহেলের তরবারির আঘাতে মুআযের একটি হাত কেটে ঝুলতে থাকলে সে নিজের পা দিয়ে চেপে ধরে এক টানে সেটাকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। তারপর ছোট ভাই মুআওবিযের আঘাতে আবু জাহেল ধরাশায়ী হলে তারা উভয়ে রাসূলের কাছে এসে গর্বভরে বলে উঠলো, 'হে রাসূল, আবু জাহেলকে আমি হত্যা করেছি।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমাদের তরবারি মুছে ফেলেছ কি?' তারা বলল, 'না।'
তারপর উভয়ের তরবারি পরীক্ষা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা উভয়ে তাকে হত্যা করেছ।' অবশ্য এই যুদ্ধে মুআওবিয বিন আফরা পরে শহীদ হন এবং মুআয বিন আফরা হযরত উসমানের খেলাফতকাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।
হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রথম আমিই কিয়ামতের দিন দয়াময়ের সামনে বিবাদ মীমাংসার জন্য হাঁটু গেড়ে বসবো।
কায়স ইবনে উবাদ রা. বলেন, এদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে, هُذَانِ خَصْمَانِ اخْتَصَمُوا فِي رَبِّهِمْ 'এরা দু-টি বিবদমান পক্ষ তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে বিতর্ক করে। তিনি বলেন, (মুসলিম পক্ষের) তারা হলেন হামযা, আলী ও উবাইদাহ অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) আবু উবাইদা ইবনুল হারিস রা. (অপর পক্ষে) শায়বা বিন রাবীআহ, 'উতবা বিন রাবীআহ এবং ওয়ালীদ ইবনে উতবা-যারা বদর যুদ্ধের দিন পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।
আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আমি বদরযুদ্ধে সারিতে দাঁড়িয়ে আছি, আমি আমার ডানে বামে তাকিয়ে দেখলাম, অল্প বয়স্ক দু-জন আনসার যুবকের মাঝখানে আছি। আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাদের চেয়ে শক্তিশালীদের মধ্যে থাকি। তখন তাদের একজন আমাকে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, চাচা! আপনি কি আবু জাহেলকে চেনেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তবে ভাতিজা, তাতে তোমার দরকার কী? সে বলল, আমাকে জানানো হয়েছে যে, সে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালাগালি করে। সে মহান সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ। আমি যদি তাকে দেখতে পাই, তবে আমার দেহ তার দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হবে না যতক্ষণ না আমাদের মধ্যে যার মৃত্যু আগে নির্ধারিত, সে মারা যায়। আমি তার কথায় আশ্চর্য হলাম। তা শুনে দ্বিতীয়জন আমাকে খোঁচা দিয়ে ওই রকমই বলল।
তৎক্ষণাৎ আমি আবু জাহেলকে দেখলাম, সে লোকজনের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন আমি বললাম, এই যে তোমাদের সেই ব্যক্তি-যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে। তারা তৎক্ষণাৎ নিজের তরবারি নিয়ে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাকে আঘাত করে হত্যা করল। অতঃপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে ফিরে এসে তাকে জানাল। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছে? তারা উভয়ে দাবি করল, আমি তাকে হত্যা করেছি। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের তরবারি তোমরা মুছে ফেলনি তো? তারা উভয়ে বলল, না। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উভয়ের তরবারি দেখলেন এবং বললেন, তোমরা উভয়ে তাকে হত্যা করেছ। অবশ্য তার নিকট হতে প্রাপ্ত মালামাল মুআয ইবনে আমর ইবনে জামূহের জন্য। তারা দু-জন হলো, মুআয ইবনে আফরা ও মুআয ইবনে আমর ইবনে জামূহ রা.।
আবু জাহেল যে কিনা এই উম্মতের ফিরআউন অভিধায় ভূষিত, বদরে তাকে আফরা'র দুই ছেলে হত্যা করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেক দুআর অধিকারী হন। তিনি দুআ করেন, 'আল্লাহ আফরা'র দুই ছেলের প্রতি দয়া ও করুণা বর্ষণ করুন যারা এই উম্মাতের ফিরআউন আবু জাহেলকে হত্যায় অংশগ্রহণ করেছে।
আবু জাহেলকে হত্যার পর তারা বীর বিক্রমে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই বদরেই রুবাইয়্যি রা.-এর মহান পিতা মুআওবিয রা. শাহাদাত বরণ করেন।
আবু জাহেলকে হত্যার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাকে হত্যার সঙ্গে তাদের দুইজনের সঙ্গে আর কে ছিল? বললেন, ফেরেশতাগণ এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ শেষ আঘাত হানে।
আবু জাহেলের হত্যার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু জাহেলের অবস্থা কি তা কেউ দেখে আসতে পারবে কি? ইবনে মাসউদ রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি যাচ্ছি। তিনি গিয়ে দেখেন আফরার দুই ছেলে তাকে এমন আঘাত হেনেছে যে, সে একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে।
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরতের পূর্বে আমাদের আজকের আলোচিত মহীয়সী সাহাবিয়া হযরত রুবায়্যি রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তিনি একজন কিশোরী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে কুবায় এসে উঠলেন। সেখানে তিন দিন অবস্থানের পর মদীনার কেন্দ্রস্থলের দিকে যাত্রা করেন এবং মসজিদে নববীর পাশে হযরত আবু আইউব আনসারী রা.-এর গৃহে ওঠেন। তার এই শুভাগমনে গোটা মদীনা আনন্দে দাঁড়িয়ে নেচে-গেয়ে তাকে স্বাগতম জানায়। তাদের স্বাগত সঙ্গীতের একটি চরণ ছিল এরকম: 'আমরা বনু নান-নাজ্জারের কিশোর-কিশোরী। কি মজা! মুহাম্মাদ আমাদের প্রতিবেশী।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা কি আমাকে ভালোবাস? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আল্লাহ জানেন, আমার অন্তর তোমাদের ভালোবাসেন। অনেকে বলেছেন, এই কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে রুবায়্যিও ছিলেন।
বয়স বাড়ার সাথে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ইসলামের প্রচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি নানাভাবে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। বিভিন্ন দৃশ্যপটে তাকে উপস্থিত দেখা যায়। ইসলামের সেবায় অতুলনীয় ত্যাগের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই পরিবারের সদস্যদের বিশেষ মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন। সব সময় হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও সুখ-সুবিধার খোঁজ-খবর রাখতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাজা খেজুরের সাথে কচি শশা খেতে পছন্দ করতেন। রুবায়্যি বলেন, আমার পিতা মুআওবিয ইবনে আফরা রা. একটি পাত্রে এক সা তাজা খেজুর ও তার ওপর কিছু কচি শশা দিয়ে আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পাঠান। তিনি শশা পছন্দ করতেন। সেই সময় বাহরাইন থেকে রাসূলেল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট কিছু গহনা এসেছিল। তিনি তার থেকে একটি গহনা নিয়ে আমাকে দেন। অপর একটি বর্ণনায় স্বর্ণের কথা এসেছে। তারপর বলেন, এ দিয়ে সাজবে। অথবা বলেন, এ দিয়ে গহনা বানিয়ে পরবে।
তাঁর বিয়ের দিন সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বাড়িতে যান এবং তার বিছানায় বসেন। পরবর্তী জীবনে রুবায়্যি রা. অত্যন্ত গর্বের সাথে সেকথা বলেছেন এভাবে : ‘আমার বিয়ের দিন সকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বাড়িতে এসে আমার ঘরে প্রবেশ করেন এবং বিছানায় বসেন। আমাদের ছোট ছোট মেয়েরা দফ বাজিয়ে বদর যুদ্ধে নিহত আমার বাপ-চাচাদের প্রশংসামূলক গীত সুর করে গাচ্ছিল। এর মধ্যে একজন গাইল, আমাদের নবী আছেন যিনি ভবিষ্যতের কথা জানেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'এটা বাদ দাও। আগে তোমরা যা বলছিলে তাই বলো। কেননা, এটা একমাত্র আল্লাহ তাআলার বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
قُلْ لَّا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَ مَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ
বলো, আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও যমীনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না। আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
قُلْ لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَ لَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَا اسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
বলো, আমি আমার নিজের কোনো উপকার ও ক্ষতির ক্ষমতা রাখি না, তবে আল্লাহ যা চান। আর আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলে অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোনো ক্ষতি স্পর্শ করত না। আমি তো একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা এমন কওমের জন্য যারা বিশ্বাস করে।
আবু জাহলের ঘাতক তার মহান পিতাকে নিয়ে রুবায়্যি রা.-এর গর্বের অন্ত ছিল না। আবু জাহলের নিকতাত্মীয় আসমা বিনতে মাখরামার সাথে তার একটি ঘটনা দ্বারা একথা প্রমাণিত হয়। রুবায়্যি রা. বলেন, 'আমি উমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর খিলাফতকালে একদিন কয়েকজন আনসারী মহিলার সাথে আবু জাহলের নিকটাত্মীয় আসমা বিনতে মাখরামামর নিকট গেলাম। আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবীআ (আবু জাহলের বৈপিত্রেয় ভাই) ছিল তার আরেক ছেলে। তিনি ইয়ামেন থেকে মদীনায় তার মা আসমার নিকট আতর পাঠাতেন, আর তিনি তা বিক্রি করতেন। আমরাও তার নিকট থেকে আতর কিনতাম। সেদিন আমার শিশিতে আতর ভরে ওজন দিলেন, যেমন আমার সাথীদের আতর ওজন দিয়েছিলেন। তারপর বললেন, আপনাদের কার নিকট কত পাওনা থাকল তা লিখিয়ে দিন। আমি বললাম, রুবায়্যি বিনতে মুআওবিযের পাওনা লিখুন।
আসমা আমার নাম শুনেই বলে উঠল, 'হালকা!' শব্দটি অভিশাপমূলক। অর্থাৎ, গলায় যন্ত্রণা হয়ে তোমার মরণ হোক। তারপর বললেন, তুমি কি কুরাইশ নেতার হত্যাকারীর মেয়ে? বললাম, নেতার নয়, তাদের দাসের হত্যাকারীর মেয়ে। বললেন, আল্লাহর কসম! তোমার নিকট আমি কিছুই বিক্রি করব না। আমিও বললাম, আল্লাহর কসম! আমিও আপনার নিকট থেকে আর কখনো কিছু কিনবো না।
যুদ্ধের ময়দানে রুবায়্যি রা.-এর পিতা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জিহাদের সূচনা করেন, তার মেয়ে হিসেবে তিনি সে ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। পিতার রক্ত তার ধমনীতে প্রবাহিত ছিল। তাই তার মধ্যে ছিল জিহাদে গমনের অদম্য স্পৃহা। জিহাদের সীমাহীন গুরুত্ব তিনি পূর্ণরূপে অনুধাবন করেন। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে বেশ কিছু জিহাদে যোগ দেন। ইবনে কাসীর রহ. বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে জিহাদে যেতেন। আহতদের ঔষধ সেবন এবং ক্ষত-বিক্ষতদের পানি পান করাতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে জিহাদে যেতাম। মুজাহিদদের পানি পান করাতাম, তাদের সেবা করতাম এবং আহত-নিহতদের মদীনায় পাঠাতাম।
হুদায়বিয়াতে মক্কার পৌত্তলিকদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেই চৌদ্দশো মাজাহিদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জীবন বাজি রাখার যে বাইআত অনুষ্ঠিত হয়, তিনিও সে বাইআত করেন। এ বাইআতকে বাইআতে রিযওয়ান ও বাইআতে শাজারা বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এ বাইআতের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে এ বাইআতকে খুবই পছন্দ করেছেন তা কুরআন ও হাদীসের বাণীতে স্পষ্ট জানা যায়। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَنْ نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنْكُثُ عَلَى نَفْسِهِ وَ مَنْ أَوْفَى بِمَا عُهَدَ عَلَيْهِ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
যারা তোমার হাতে বাইআত করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বাইআত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর। অতঃপর যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করার পরিণাম তারই এবং যে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পূর্ণ করে তিনি অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দেন।
এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে হাত রেখে বাইআত করাকে আল্লাহর হাতে হাত রেখে বাইআত করা বলা হয়েছে। এতে এ বাই’আতের বিরাট গুরুত্ব প্রমাণিত হয়। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বাইআতের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, 'বৃক্ষের নীচে বাইআতকারীদের কেউই জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুবায়্যি'উ-এর বাড়িতে ওযু করেন। কীভাবে তিনি ওযু করেছিলেন, রুবায়্যি রা. তা প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তা বর্ণনা করতেন। সে বর্ণনা শোনার জন্য বহু মানুষ তার নিকট আসতেন। একবার আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আসেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওযুর অবস্থা বর্ণনা করার অনুরোধ জানান।
কেবল জিহাদে গমনের ক্ষেত্রেই তার প্রবল আগ্রহ ছিল তা নয়, শরীয়তের বিভিন্ন বিষয় জানা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী শোনা ও আচরণ পর্যবেক্ষণেও তার ছিল সমান আগ্রহ। আর এ উদ্দেশ্যে তিনি প্রায়ই উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট যেতেন। তিনি রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহচর্য যেমন পেয়েছেন তেমনি তাঁর হাদীসও বর্ণনা করেছেন।
উঁচু স্তরের অনেক আলিম তাবেয়ী তাঁর নিকট হাদীস শুনেছেন এবং তাঁর সূত্রে বর্ণনাও করেছেন। সেই সকল বিখ্যাত তাবিয়ীদের কয়েকজন হলেন, সুলায়মান ইবনে ইয়াসার ও আবু সালামা ইবনে আবদির রহমান। এ দুইজন হলেন সাতজন প্রথম সরির আলিম তাবেয়ীর অন্তর্গত। তাছাড়া আবু উবায়দা মুহাম্মাদ ইবনে আম্মার ইবনে ইয়াসির, ইবনে উমারের রা. আযাদকৃত দাস নাফে', উবাদা ইবনে আল-ওয়ালীদ ইবনে উবাদা ইবনে আস-সামিত রা., খালিদ ইবনে যাকওয়ান, আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আকীল, আয়েশা বিনতে আনাস ইবনে মালিক প্রমুখ।
হযরত রুবায়্যি রা. দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তিনি হিজরী ৭০ সনের পরে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের খিলাফতকালে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৫৬২. মুসতাদরাকে হাকিম।
৫৬৩. সূরা হজ, ২২:১৯।
৫৬৪. সহীহ, বুখারী, ৩১৪১; সহীহ, মুসলিম: ৪২, ১৭৫২।
৫৬৫. আসসীরাতুন নববিয়্যা, ১/৩৮৯।
৫৬৬. আল ইসতিবসার, ৬৬।
৫৬৭. উয়ূনুল আসার, ১/৩১৫; সীরাতে হালরিয়‍্যা, ২/৪৩৩।
৫৬৮. নিসাউম মিন আসারিন নুবুওয়াহ: ১৫০, ১৫১।
৫৬৯. সহীহ, বুখারী, ৯/৪৯৫; সহীহ, মুসলিম: ২০৪৩; সুনান, আত-তিরমিযী, ১৮৪৫ ও সুনান, ইবনে মাজাহ, ৩৩২৫।
৫৭০. সহীহ, বুখারী, ৫১৪৭; সুনান, তিরমিযী: ১০৯০; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৩২৮।
৫৭১. সূরা নামাল, ২৭:৬৫।
৫৭২. সূরা আ'রাফ, ৭:১৮৮।
৫৭৩. ইসাবাহ, ৪/২৩২; তাবাকাতে ইবন সাআদ, ৪/১২৯।
৫৭৪. সিফাতুস সাফওয়া, ২/৭১।
৫৭৫. সূরা ফাতহ, ৪৮:১০।
৫৭৬. সহীহ, মুসলিম, ২৪৯৬।
৫৭৭. তাফসীরে কুরতুবী, ৬/৮৯।
৫৭৮. বানাতুস সাহাবাহ, ১৬৭, ১৬৮।
৫৭৯. তাহযীবুত তাহযীব, ১২/৪১৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৩/১৯৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00