📄 আতিকা বিনতে যায়িদ রা.
যে ব্যক্তি শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে সে যেন আতিকা বিনতে যায়েদকে বিয়ে করে
তাঁর সম্পর্কে মদীনাবাসী বলত, ‘যে ব্যক্তি শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে সে যেন আতিকা বিনতে যায়েদকে বিয়ে করে।’ তিনি যখন আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর রা.-এর ঘরে ছিলেন তখন আবদুল্লাহ শাহাদাতবরণ করেন। এরপর হযরত উমর রা.-এর স্ত্রী হিসেবে তার ঘরে গেলে তিনিও শহীদ হন। পরবর্তী সময়ে তিনি হযরত যুবাইর রা.-এর ঘরণী হন এবং যুবাইর রা.ও শাহাদাতের অমীয় সুধা পানে ধন্য হন।
তিনি এমন এক মহীয়সী সাহাবিয়া যাঁর ভেতর সমাবেশ ঘটেছিল অজস্র গুণ ও গৌরবের—আমাদের কলম যার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিতে অক্ষম।
তিনি হযরত সাঈদ ইবনে যায়িদ রা.-এর বোন—যিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত মহান দশ সাহাবীর অন্যতম সদস্য।
তাঁর মা হচ্ছেন কুরাইয বিনতুল হাযরামী।
তাঁর মামা হচ্ছেন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আলা ইবনুল হাযরামী রা.। যাঁর সম্পর্কে হযরত আনাস রা. বলেন, হযরত উমর রা. একদল সৈন্য প্রস্তুত করে আলা ইবনুল হাযরামীকে তাদের অধিনায়ক মনোনীত করলেন। আনাস বলেন, আমি তার সাথে তার (সেই) যুদ্ধাভিযানে ছিলাম। আমরা নির্ধারিত যুদ্ধক্ষেত্রে এসে দেখলাম, শত্রুরা আমাদের পূর্বেই সেখানে পৌঁছে পানির উৎসের নিদর্শনসমূহ নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। আর তখন ছিল প্রচণ্ড গরমের দিন। এদিকে আমরা তীব্র পিপাসায় কাহিল হয়ে পড়লাম। আমাদের পশুপালেরও একই অবস্থা। উল্লেখ্য, সেদিন ছিল জুমআর দিন। এরপর সূর্য যখন ঢলে পড়ল, তখন তিনি আমাদের নিয়ে দু-রাকাআত নামায পড়লেন। তারপর আসমানের দিকে হাত প্রসারিত করলেন। অথচ এ সময় আকাশে মেঘের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত ছিল না। আনাস রা. বলেন, তার হাত নামাতে না নামাতেই আল্লাহ বায়ু পাঠালেন এবং মেঘ সৃষ্টি করলেন। এরপর সেই মেঘ বর্ষণ করে গর্ত ও গিরিখাদসমূহ ভরে ফেলল। তখন আমরা পান করলাম, আমাদের পশুপালকে পান করালাম এবং পান করার জন্য পানি সংগ্রহ করে নিলাম।
এরপর আমরা শত্রুর পিছু নিলাম। এদিকে তারা সাগরের একটি খাড়ি পার হয়ে এক দ্বীপে পৌঁছে। আমাদেরকে নিয়ে খাড়ির পাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি দুআ করলেন, হে সুউচ্চ, হে সুমহান, হে সহনশীল, হে মহানুভব! তারপর আমাদের বললেন, 'আল্লাহর নামে অগ্রসর হও।' আনাস রা. বলেন, তখন আমরা অগ্রসর হয়ে পানি অতিক্রম করতে লাগলাম; কিন্তু পানি আমাদের বাহনের খুরও সিক্ত করল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা শত্রুদের নাগালে পেলাম। তখন আমরা অনেককে হত্যা করলাম এবং অনেক যোদ্ধা ও নারী শিশুদের বন্দী করলাম। তারপর আমরা সেই খাড়ি পাড়ে এসে উপস্থিত হলাম। আর তিনি তার পূর্বের কথার ন্যায় বললেন। এবারও আমরা তা পার হলাম, কিন্তু পানি আমাদের বাহনসমূহের পায়ের খুর ভেজালো না। আনাস রা. বলেন, এর কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হলো। তখন আমরা তার জন্যে কবর খুঁড়ে তাকে গোসল করালাম এবং দাফন করলাম। তার দাফন সম্পন্ন করার পর এক ব্যক্তি এসে বলল, ইনি (মৃত্যুবরণকারী) কে? আমরা বললাম, ইনি সর্বোত্তম মানুষ। ইনি হলেন ইবনুল হাযরামী রা.। তখন সে বলল, এই ভূখণ্ড মৃতদেহ উদগীরণ করে দেয়। তোমরা যদি পার তাহলে বহন করে এক বা দুই মাইল দূরে মৃতদেহ গ্রহণকারী ভূখণ্ডে নিয়ে যাও। আমরা তখন বললাম, আমরা আমাদের এই পুণ্যবান সঙ্গীকে হিংস্র প্রাণীদের খোরাক হওয়ার জন্য এখানে এ অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারি না।
আনাস রা. বলেন, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কবর খুঁড়তে লাগলাম। এরপর আমরা যখন তার কবরের অভ্যন্তরে পৌঁছলাম, তখন দেখলাম, আমাদের সঙ্গী সেখানে নেই আর কবরের অভ্যন্তরে দৃষ্টিসীমানা পর্যন্ত আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে আছে। আনাস রা. বলেন, তখন আমরা কবরে আবার মাটি চাপা দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলাম।৫১৬
এই মহান সাহাবীই হচ্ছেন হযরত আতিকা বিনতে যায়িদ রা.-এর মামা।
তাঁর খালা হচ্ছেন উসবা বিনতুল হাযরামী। যিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত মহান দশ সাহাবীর অন্যতম সদস্য হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা.-এর সম্মানিতা আম্মাজান।
আতিকা বিনতে যায়িদ রা.-এর প্রথম স্বামী হচ্ছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা.। যিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবী ও প্রথম আশারায়ে মুবাশশারার সন্তান।
প্রথম স্বামীর ইন্তেকালে পর আতিকা বিনতে যায়িদ রা. স্বামী হিসেবে বরণ করে নেন হযরত উমর রা.-কে। তিনিও আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম সদস্য ও ইসলামের মহান দ্বিতীয় খলীফা।
হযরত উমর রা.-এর ইন্তেকালের পর আতিকা বিনতে যায়িদ রা. হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর স্ত্রীত্বে আসেন। তিনিও আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম সদস্য।
কুরাইশ নারীদের মাঝে হযরত আতিকা বিনতে যায়িদ রা. একজন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও বাগ্মীরূপে প্রসিদ্ধ ছিলেন। রূপে-গুণে ছিলেন অদ্বিতীয়া। এক কথায় একজন নারীর জন্য যত ভালো গুণ থাকতে পারে তার সব কিছুরই সমাবেশ ঘটেছিল হযরত আতিকা বিনতে যায়িদ রা.-এর ক্ষেত্রে।
যেমন বৃক্ষ তেমন ফল
আতিকা বিনতে যায়িদ রা. পিতা যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়িল ছিলেন জাহিলী যুগের মক্কার মুষ্টিমেয় সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের একজন—যাঁরা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেই শিরক ও পৌত্তলিকতা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখেন, সব রকম পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকেন। এমনকি মুশরিকদের হাতে যবেহ করা জন্তুর গোশতও পরিহার করতেন। একবার নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বে ‘বালদাহ’ উপত্যকায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে খাবার আনা হলে তিনি খেতে অস্বীকৃতি জানান। যায়িদকে খাওয়ার অনুরোধ করা হলে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদেরকে বলেন, ‘তোমাদের দেব-দেবীর নামে যবেহকৃত পশুর গোশত আমি খাই না।’
এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত যে, ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বে একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কার নিম্নাঞ্চলে 'বালদা' নামক স্থানে যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েলের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মুখে খাবার-ভর্তি একটি বড় পাত্র পেশ করা হলো। তিনি তা থেকে কিছু খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। এরপর যায়িদ রা. বললেন, আমিও ওই সব জন্তুর গোশত খাই না যা তোমরা তোমাদের দেব-দেবীর নামে জবাই কর। আল্লাহর নামে জবাইকৃত ব্যতীত অন্যের নামে যবাই করা জন্তর গোশত আমি খাই না। যায়িদ ইবনে আমর কুরাইশের যবাইকৃত জন্তু সম্পর্কে তাদের ওপর দোষারোপ করতেন এবং বলতেন, বকরীকে সৃষ্টি করলেন আল্লাহ, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করলেন। ভূমি থেকে উৎপন্ন করলেন তৃণলতা, অথচ তোমরা আল্লাহ তাআলার দানসমূহ অস্বীকার করে প্রতিমার প্রতি সম্মান করে আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করছ।'
জাহিলী যুগে সাধারণত কন্যা সন্তান জীবন্ত দাফন করা হতো। কোথাও কোনো কন্যা সন্তান হত্যা বা দাফন করা হচ্ছে শুনতে পেলে যায়িদ তার অভিভাবকের কাছে চলে যেতেন এবং সন্তানটিকে নিজ দায়িত্বে নিয়ে নিতেন। তারপর সে বড় হলে তার পিতার কাছে নিয়ে গিয়ে বলতেন, ইচ্ছে করলে এখন তুমি নিজ দায়িত্বে নিতে পার অথবা আমার দায়িত্বে ছেড়ে দিতে পার।৫১৭
কুরাইশরা তাদের কোনো একটি উৎসব পালন করছে। মানুষের ভিড় থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়িল তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি দেখছে পুরুষেরা তাদের মাথায় বেঁধেছে দামী রেশমী পাগড়ী, গায়ে জড়িয়েছে মূল্যবান ইয়ামেনী চাদর। সবাই অনেকগুলো ছাগল মূল্যবান সাজে সুসজ্জিত করে হাঁকিয়ে নিয়ে চলেছে তাদের দেব-দেবীর সামনে বলি দেওয়ার জন্য।
তিনি কাবার দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, 'কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, এই ছাগলগুলো সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তাআলা। তিনিই আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে তাদের পান করান, যমীনে ঘাস সৃষ্টি করে তাদের আহার দান করেন। আর তোমরা অন্যের নামে সেগুলো জবাই কর? আমি তোমাদেরকে একটি মূর্খ সম্প্রদায়রূপে দেখতে পাচ্ছি।
এ কথা শুনে তার চাচা ও উমর ইবনুল খাত্তাবের পিতা আল খাত্তাব উঠে দাঁড়িয়ে তার গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলল, তোর সর্বনাশ হোক! সব সময় আমরা তোর মুখ থেকে এ ধরনের বাজে কথা শুনে সহ্য করে আসছি। এখন আমাদের সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেছে। তারপর তার গোত্রের বোকা লোকদের উত্তেজিত করে তুলল তাকে কষ্ট দিয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত করে তুলতে। অবশেষে তিনি বাধ্য হলেন মক্কা ছেড়ে হেরা পর্বতে আশ্রয় নিতে। তাতেও তারা ক্ষান্ত হলো না। গোপনেও যাতে তিনি মক্কায় প্রবেশ করতে না পারেন, সেদিকে সর্বক্ষণ দৃষ্টি রাখার জন্য একদল কুরাইশ যুবককে সে নিয়োগ করে রাখা হলো।
অতঃপর যায়িদ ইবনে আমর কুরাইশদের অগোচরে ওয়ারাকা ইবনে নাওফিল, আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসমান ইবনুল হারিস এবং মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহর ফুফু উমাইমা বিনতু আবদিল মুত্তালিবের সাথে গোপনে মিলিত হলেন। আরববাসী যে চরম গোরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত সে ব্যাপারে তিনি তাদের সাথে মতবিনিময় করলেন। যায়িদ তাদেরকে বললেন, 'আল্লাহর কসম! আপনারা জেনে রাখুন, আপনাদের এ জাতি কোনো ভিত্তির ওপর নেই। তারা দ্বীনে ইবরাহীমকে বিকৃত করে ফেলেছে, তার বিরুদ্ধাচরণ করে চলছে। আপনারা যদি মুক্তি চান, নিজেদের জন্য একটি দ্বীন অনুসন্ধান করুন।'
অতঃপর এ চার ব্যক্তি ইহুদী, নাসারা ও অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুদের নিকট গেলেন দ্বীনে ইবরাহীম তথা দ্বীনে হানীফ সম্পর্কে জানার জন্য। ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল খৃস্ট ধর্ম অবলম্বন করলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও উসমান ইবনুল হারিস কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলেন না। আর যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়িলের জীবনে ঘটে গেল এক চমকপ্রদ ঘটনা।
ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, যায়িদ ইবনে আমর তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত দ্বীনের তালাশে সিরিয়ায় গমন করলেন। সে সময় একজন ইহুদী আলেমের সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। তিনি তার নিকট তাদের দ্বীন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন এবং বললেন, 'হয়ত আমি তোমাদের দ্বীনের অনুসারী হব, আমাকে সে সম্পর্কে অবহিত কর।' তিনি বললেন, 'তুমি আমাদের দ্বীন গ্রহণ করবে না। গ্রহণ করলে যে পরিমাণ গ্রহণ করবে, সে পরিমাণ আল্লাহর গযব তোমার ওপর আপতিত হবে।' যায়িদ বললেন, 'আমি তো আল্লাহর গযব থেকে পালিয়ে এসেছি। আল্লাহর সামান্যতম গযবকেও আমি বহন করব না। আর আমি কি তা বহনের শক্তি-সামর্থ্য আছে? তুমি কি আমাকে এ ছাড়া অন্য কোনো পথের সন্ধান দিতে পার?' সে বলল, 'আমি তা জানি না। তবে তুমি দ্বীনে হানীফ গ্রহণ করে নাও।' যায়িদ জিজ্ঞাসা করলেন, '(দ্বীনে) হানীফ কী?' সে বলল, 'তা হলো ইবরাহীম আ.-এর দ্বীন। তিনি ইহুদীও ছিলেন না নাসারাও ছিলেন না। তিনি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করতেন না।'
তখন যায়িদ বের হলেন এবং তার সাথে একজন খ্রিস্টান আলিমের সাক্ষাৎ হলো। ইহুদী আলিমের নিকট ইতোপূর্বে তিনি যা যা বলেছিলেন, তার কাছেও তা বললেন। তিনি বললেন, 'তুমি আমাদের দ্বীন গ্রহণ করবে না। গ্রহণ করলে যে পরিমাণ গ্রহণ করবে, সে পরিমাণ আল্লাহর লানত তোমার ওপর আপতিত হবে।'
যায়েদ রা. বললেন, 'আমি তো আল্লাহর লানত থেকে পালিয়ে এসেছি এবং আমি আল্লাহর লানত ও গযবের সামান্যতম অংশ বহন করতে রাজি নই। আর আমি কি তা বহনের শক্তি রাখি? তুমি কি আমাকে এ ছাড়া অন্য কোনো পথের সন্ধান দেবে?' সে বলল, 'আমি অন্য কিছু জানি না। শুধু এটুকু বলতে পারি যে, তুমি দ্বীনে হানীফ গ্রহণ কর।' তিনি বললেন, 'হানীফ কী?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তা হলো ইবরাহীম আ.-এর দ্বীন। তিনি ইহুদীও ছিলেন না, খ্রিস্টানও ছিলেন না। তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত করতেন না।' যায়িদ যখন ইবরাহীম আ. সম্পর্কে তাদের মন্তব্য জানতে পারলেন, তখন তিনি দু-হাত উঠিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ, আমি তোমাকে সাক্ষী রেখে বলছি আমি দ্বীনে ইবরাহীম আ.-এর ওপর আছি।'
সুতরাং বোঝা গেল, আতিকা বিনতে যায়িদ রা.-এর বাবা যায়িদ ছিলেন হানীফ ঘরানার লোক। যারা তাদের বিবেকের তাড়নায় নীতিহীনতার পথ থেকে বিরত থেকেছেন। দেব-দেবীকে প্রণাম করেননি কোনো দিন। সমকালীন জাহেলিয়াতের প্রভাব থেকে তিনি নিজেকে রক্ষা করেছেন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।
হযরত আতিকা রা.-এর পিতা যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল ছুটে চললেন মহা সত্যের সন্ধানে। তিনি নিজেই সে বিষয়ে বর্ণনা করেছেন, আমি ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্ম সম্বন্ধে অবগত হলাম; কিন্তু মানসিক প্রশান্তি লাভের মতো কোনো কিছু সেখানে দেখতে পেলাম না। একপর্যায়ে আমি সত্যের সন্ধানে সিরিয়া গিয়ে উপস্থিত হলাম। আমি সেখানে একজন বিজ্ঞ রাহিবকে খুঁজে পেলাম। তার নিকট উপস্থিত হয়ে আমি তাকে আমার ব্যাপারে বিস্তারিত অবহিত করলাম। তিনি আমার সব কথা শোনার পর বললেন, 'হে মক্কার অধিবাসী, তুমি সম্ভবত দ্বীনে ইবরাহীমের অনুসন্ধান করছ?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, আমি সত্য দ্বীন খুঁজে ফিরছি।' এরপর রাহিব বললেন, 'এ সময় দ্বীনে ইবরাহীম খুঁজে পাওয়া যাবে না। সত্য তো তোমার শহরেই প্রকাশিত হবে। আমি তোমাকে একটি শুভসংবাদ দিচ্ছি, আল্লাহ তোমার কওমের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন, যিনি দ্বীনে ইবরাহীমকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। যদি তার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হয়, তাহলে তুমি তার অনুসরণ করবে।' রাহেবের কথা শুনে যায়িদ প্রতিশ্রুত মহামানবকে খুঁজে বের করতে মক্কার পথে ফিরে চললেন। তিনি যখন মক্কা থেকে সামান্য দূরে, তখন শেষ নবী মুহাম্মাদে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রকাশ হলো; কিন্তু দুর্ভাগ্য যায়েদের। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ পেলেন না। কারণ মক্কায় পৌঁছার আগেই একদল ডাকাত তার ওপর চড়াও হয়ে তাকে হত্যা করে।৫১৮
মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে দুআ করেছিলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি যদি আমাকে এ মহাকল্যাণ (দ্বীনে হক) থেকে মাহরুম কর, তার পরও আমার পুত্র সাঈদকে তুমি তা থেকে বঞ্চিত করো না।'
মহান আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছিলেন। তাই তার পুত্র সাঈদ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলাম প্রচার শুরু করার প্রথম দিকেই সস্ত্রীক মুসলমান হয়ে প্রথম সারির মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। মহা সত্যের সন্ধানে আজীবন ছুটে চলে সে সত্যের দোরগোড়ায় এসে আত্মোৎসর্গকারী বাবার ঔরসে জন্ম নিয়েছেন হজরত সাঈদ রা। তিনি তার যৌবনের শুরুতেই সে সত্যকে কবুল করেছেন। তারপর ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য নিজ জীবনের সর্বস্বকে উজাড় করে দিয়েছেন। এই সাঈদ রা.-এরই বোন আমাদের আজকের আলোচিত অতিথি হযরত আতিকা রা.।
বিয়ে-শাদী
হযরত আয়েশা রা.-এর উদ্ধৃতিতে আবু নুয়াইম বর্ণনা করেন, আতিকা রা. ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা.-এর স্ত্রী। আবু উমর বলেন, তিনি ছিলেন একজন মুহাজির নারী। তাকে বিয়ে করেন হযরত আবু বকর রা.-এর পুত্র আবদুল্লাহ রা.। আতিকা ছিলেন অত্যধিক সুন্দরী ও রূপসী। তার কাছে আবদুল্লাহ সময় কাটাতেন বেশি। তাই তার পিতা আবু বকর রা. তাকে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেন।
অনিচ্ছা ও নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও তালাক দেওয়ার নির্দেশ শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়েন আবদুল্লাহ। মন ভেঙে যায় তাঁর। পরবর্তী সময়ে এ খবর জানতে পারলে আবু বকর রা. তাকে তালাক দিতে বারণ করেন। তায়েফে অবরুদ্ধ অবস্থায় তীরবিদ্ধ হন আবদুল্লাহ রা.। এমতাবস্থায় তিনি মদীনায় এলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।৫১৯
ফারুকে আযমের সাথে বিয়ে
অতঃপর ফারুকে আযম হযরত উমর রা.-এর সাথে তার বিয়ে হয়। তার কাছ থেকে তিনি রপ্ত করেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আল্লাহভীতি ও তাকওয়া। আবু উমর তামহীদ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হযরত উমর রা. যখন তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান, তখন তিনি উমর রা.-কে তিনটি শর্ত দেন। যথা: তাকে প্রহার করা যাবে না, তার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা যাবে না এবং মসজিদে নববীতে নামায পড়া হতে বিরত রাখা যাবে না।
রাসূলুল্লাহ সা.-এর অন্তিম সময়
রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মদীনার চতুর্দিকে যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। আনাস রা. বলেন, আমি ওই দিনের মতো উত্তম ও উজ্জ্বল আর কোনো দিন দেখিনি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট শুভাগমন করেছিলেন। আর আমি ওই দিনের মতো দুঃখজনক ও অন্ধকার দিন আর পাইনি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুবরণ করলে ফাতিমা রা. শোকাহত হয়ে বলেন, হায় আব্বাজান! যিনি প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দিয়েছেন, হায় আব্বাজান! যার ঠিকানা হচ্ছে জান্নাতুল ফিরদাউস। হায় আব্বাজান! আমি তো আপনার মৃত্যুশোক সংবাদ জিবরাঈল আ.-কে শোনাচ্ছি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের খবর জানতে পেরে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'কতগুলো মুনাফেক বলে বেড়াচ্ছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গেছেন। আল্লাহর কসম, তিনি মারা যাননি। তিনি কেবল মূসা আ.-এর মতো সাময়িকভাবে আল্লাহর কাছে গেছেন। মূসা আ. চল্লিশ দিনের জন্য আল্লাহর কাছে গিয়েছিলেন। তখন প্রচার করা হয়েছিল যে, তিনি মারা গেছেন। অথচ তার পরে তিনি ফিরে এসেছিলেন। আল্লাহর কসম! মূসা আ.-এর মতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার ফিরে আসবেন। এখন যারা বলছে যে, তিনি মারা গেছেন তাদের হাত-পা কেটে দেওয়া হবে।'
হযরত আবু বকর রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের সংবাদ জানতে পেরে দ্রুত ছুটে এলেন। উমর রা. তখনো ওই কথাগুলো ক্রমাগত বলে যাচ্ছেন। আবু বকর রা. সেদিকে কর্ণপাত না করে তিনি সরাসরি আয়শা রা.-এর ঘরে চলে গেলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেহ মুবারক ঘরের এক কোণে ইয়ামানী কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল। তিনি রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখের কাপড় সরিয়ে চুমু খেলেন। অতঃপর বললেন, 'আপনার জন্য আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক! আল্লাহ আপনার জন্য যে মৃত্যু নির্ধারিত রেখেছিলেন, তা আপনি পেয়েছেন। এরপর আর আপনার কাছে কখনো মৃত্যু আসবে না।'
إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ
(হে নবী!) তুমি তো মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।৫২০
একদিন সবাইকে মরতেই হবে। তখন যার যার পরিণাম জানতে পারবে।
এরপর তিনি বাইরে এসে দেখেন উমর রা. সেই একই কথা বলে যাচ্ছেন। তিনি বললেন, উমর, তুমি ক্ষান্ত হও! চুপ করো।' উমর রা. কিছুতেই থামতে রাজী হচ্ছিলেন না। এ অবস্থা দেখে আবু বকর রা. সমবেত লোকদের লক্ষ করে কথা বলতে শুরু করলেন। তার কথা শুনে জনতা উমর রা.-কে রেখে তার দিকে এগিয়ে এলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করার পর বললেন, 'হে জনমণ্ডলী, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের পূজা করত সে জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করত সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব ও অবিনশ্বর।'
তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল বৈ আর কিছুই নন। তার পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা ইসলাম থেকে ফিরে যাবে? যে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কৃতজ্ঞ লোকদের আল্লাহ যথোচিত পুরস্কার দেবেন।৫২১
মানসিক যন্ত্রণায় দিশেহারা এবং অস্থির সাহাবায়ে কেরাম আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর বক্তব্য শুনে বিশ্বাস করলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃতই ইন্তেকাল করেছেন। এরপর মানুষের মধ্যে এমন ভাবান্তর ঘটল যে, মনে হচ্ছিল তারা যেন আবু বকরের মুখে শোনার আগে এ আয়াত কখনো শোনেইনি। তারা আয়াতটি আবু বকর রা.-এর নিকট থেকে মুখস্থ করে অনবরত তিলাওয়াত করতে থাকলেন। অতঃপর উমর রা. বললেন, 'আবু বকরের মুখে এ আয়াত শোনার পর আমি হতবাক ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে গেলাম। পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। আমি তখনই অনুভব করলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যিই ইন্তেকাল করেছেন।'
উমর রা.-এর ইন্তেকাল
প্রিয় নবীজীর ইন্তেকালে ভীষণ ভেঙে পড়েন হযরত আতিকা রা.। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় তার হৃদয়। এ সময় তিনি বেশ কিছু শোক কবিতা আবৃত্তি করেন। এভাবে এক সময় হযরত উমর ফারুক রা.ও মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে হযরত আতিকা রা.-কে শোক সাগরে ভাসিয়ে দেন। হযরত উমর রা.-এর মৃত্যুর ঘটনাটি হচ্ছে এমন: মদীনায় মুগীরা ইবনে শু'বা রা.-এর আবু লুলু নামক একজন ইরানী গোলাম ছিল। একদিন সে উমর রা. এর নিকট তার মনিবের বিরুদ্ধে নালিশ দিল যে, আমার মনিব আমার প্রতি অতিরিক্ত মাশুল আরোপ করে রেখেছেন। আপনি তা কমিয়ে দিন। উমর রা. তাকে মাশুলের পরিমাণ কত জিজ্ঞাসা করলে সে উত্তর দিল দুই দিরহাম। এবার জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কী কাজ কর? সে বলল, আমি ছুতার মিস্ত্রি, ভাস্কর, ও কর্মকার। এটা শুনে উমর রা. তাকে বললেন, তাহলে এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত মাশুল নয়। গোলামটি এই জবাব শুনে খুবই অসন্তুষ্ট হলো এবং বলল, আচ্ছা বুঝে নেব। এই বলে সে চলে গেল। উমর রা. বললেন, এক গোলাম আমাকে হুমকি দিল। এর পর তিনি নীরব রইলেন।
পরের দিন খুব ভোরে উমর রা. নামাযের জন্য মসজিদে যান। আবু লুলু বিষাক্ত ছুরি লুকিয়ে রেখে পূর্ব থেকেই ওঁৎ পেতে দাঁড়িয়েছিল। উমর রা. নামাযের তাকবীর বলার সঙ্গে সঙ্গে সে উক্ত বিষাক্ত ছুরি দ্বারা তার কাঁধে ও নাভীতে ক্ষীপ্ত হস্তে ছয়টি আঘাত করে। পার্শ্ববর্তী লোকেরা আবু লুলুকে ধরার জন্য এলে তাদেরকেও উক্ত ছুরি দ্বারা আঘাত করে। পরে যখন দেখল তার নিজের পরিত্রাণের উপায় নেই, তখন সে নিজে নিজেই উক্ত ছুরি দ্বারা আত্মহত্যা করল।
আহত হওয়ার পর উমর রা. আব্দুর রাহমান ইবনে আওফ রা.-কে নামায পড়াবার নির্দেশ দিলেন। ইবনে আওফ রা. অতিদ্রুত নামায় আদায় করলেন। এদিকে উমর রা. মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। নামায শেষ হওয়ার পর উমর রা.-কে তার বাড়িতে আনা হলো। তিনি লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমার হত্যাকারী কে?' উত্তর দেওয়া হলো, আবু লুলু। আবু লুলুর নাম শুনে তিনি এই বলে আল্লাহর শোকর আদায় করলেন যে, আমার রক্তে কোনো মুসলমানের হাত রঞ্জিত হয়নি।
মৃত্যুর সময় উমর রা. আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে শুরু করেন। এ সময় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আরজ করেন, হে আমিরুল মুমিনীন, আপনার জন্য সুসংবাদ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায়ের কালে আপনার ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন। এখন আপনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছেন সকল মুসলমান আপনার প্রতি সন্তুষ্ট। এসব সান্ত্বনা বাণী শুনেও উমর রা. আল্লাহর ভয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ! তোমরা আমাকে আখিরাতের ঘাঁটিসমূহের বিপদের জন্যই ভীত করাচ্ছ। এখন যদি বিশ্বের সমস্ত অর্থ ভাণ্ডার আমার নিকট থাকে আর আমি তা মুক্তিপণ হিসেবে দিয়ে জীবন বাঁচাতে পারি তাহলে আমি এ সওদা খুবই কম মনে করব।
আহত হবার তৃতীয় দিনে ২৭শে জিলহজ রাতে উমর রা. মুসলিম বিশ্বকে শোক সাগরে নিমজ্জিত করে দুনিয়ার জীবনের পরিসমাপ্তি লাভ করেন। পরের দিন সকালে তার দাফন সমাপ্ত হয়। এ সময় তার বয়ষ তার দুই সম্মানিত বন্ধুর মতোই ৬৩ বৎসর ছিল। এভাবে আবারও বৈধব্য জীবন বরণ করে নেন হযরত আতিকা রা.।
যুবাইরের সহধর্মিণী হিসেবে
পরবর্তী সময়ে তার বিয়ে হয় রাসূলুল্লাহ সা.-এর দেহরক্ষী বিশিষ্ট সাহাবী হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর সাথে। তিনিও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাত দশ সাহাবীর একজন। যিনি ইসলামী দাওয়াতের প্রথম সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সেই মহান সাত ব্যক্তির অন্যতম একজন যারা ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে সবার চেয়ে অগ্রগামী। দারুল আরকামে ইসলামের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর বয়স তখন সবেমাত্র ১৫ বছর, যখন হেদায়াতের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন, পরম সৌভাগ্য আর প্রভূত কল্যাণে সম্মানিত হয়েছেন।
একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে তার অভ্যাস-প্রকৃতি তার সত্তাজুড়ে পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও নির্ভরতায় ছেয়ে পড়েছিল। লড়াইয়ের ময়দানে যদি তাকে মাত্র একশ সাথী আর সৈনিক দিয়ে পাঠানো হয়, তাহলে তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে এমন তীব্রভাবে আক্রমণ চালাতেন, যেন রণাঙ্গনে তিনি একাই লড়াই করছেন। বিজয় আর নুসরাত যেন তার একার ওপরই ন্যস্ত। এমন দায়িত্বশীলতা আর ওফাদারির সাথে তিনি জিহাদ করতেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর ছিল গভীর হৃদ্যতা ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এ বাক্যে সুসংবাদ জানিয়েছেন, 'প্রত্যেক নবীর জন্য হাওয়ারী তথা সার্বক্ষণিক সহচর থাকে, আমার হাওয়ারী হচ্ছে যুবাইর ইবনুল আউয়াম।৫২২
হযরত আলী রা.-এর সামনে হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর তরবারি পেশ করা হলে তিনি তলোয়ার খানিতে চুমু দেন। কাঁদতে কাঁদতে তরবারির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তিনি অসংখ্যবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মুখ থেকে মুসিবতের মেঘমালা অপসারণ করেছেন। নিশ্চয় যুবাইরের খুনী জাহান্নামী।'
হযরত আতিকা রা.ও বর্ণিল দীর্ঘ জীবন শেষে এক সময় সাড়া দেন মহান রাব্বুল আলামীনের ডাকে। হযরত মুআবিয়া ইবনে আবি সুফইয়ানের খিলাফতের শুরুর দিকে ৪১ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৫১৬. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/২৬৫-২৬৬।
৫১৭. সহীহ, বুখারী, ৩৮২৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ৩/৪০৪; তিনি বর্ণনাটি বিশুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন।
৫১৮. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৯১-১৯৮।
৫১৯. আল ইসাবাহ, ৮/২২৭১।
৫২০. সূরা যুমার, ৩৯:৩০।
৫২১. সূরা আল-ইমরান, ৩:১৪৪।
৫২২. মুসতাদরাকে হাকিম, ৩/৩৬৭।
📄 আসমা বিনতে উমাইস রা.
যাঁকে বিয়ে করেছেন তিনজন জান্নাতী যুবক
মহান আল্লাহ তাআলার অসীম অনুগ্রহে আজ আমরা এমন এক মহীয়সী নারীর জীবনকাহিনীর দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয়েছি—যিনি ছিলেন ঈমানী কাননের এক প্রস্ফুটিত ও সুবাসিত ফুল। যাঁর ইসলামের ফসল ওহীর সিঞ্চনে হয়ে উঠেছিল অত্যধিক সতেজ। যার সুবাসে মোহিত বিশ্ববাসী। তার মহৎ জীবনী আমাদের নারী সমাজকে দ্বীন ও বিশ্বাসে অবিচল থাকার অনন্য শিক্ষা দিয়ে যায়।
সেই মহীয়সী নারী হলেন হযরত আসমা বিনতে উমাইস ইবনে মাআদ আল খাসামিয়্যাহ। তিনি এমন সৌভাগ্যবতী আল্লাহভীরু নারী—যাঁকে বিয়ে করেছেন তিনজন জান্নাতী যুবক। ঈমান, পবিত্রতা, নিষ্কলুষতা, মহানুভবতার অতুল দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি।
শুরুটা এখান থেকে
হযরত আবু বকর রা. যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন তার ওপর ন্যস্ত হলো মহান আমানত—দাওয়াতের গুরু দায়িত্ব। তিনি বেরিয়ে পড়লেন মানুষকে দ্বীনের পথে আল্লাহর দিকে ডাকতে। এমন জান্নাতের দিকে তিনি সকল মানুষকে আহ্বান করলেন—যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি; যেই জান্নাতের নেয়ামত সম্পর্কে এবং কোনো হৃদয় যার কল্পনা করতে সক্ষম নয়।
মুষ্টিমেয় যে সব লোক তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. ও তার স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস রা.। ইসলামের একেবারে শুরুলগ্নে রাসূলুল্লাহ সা.-এর দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বেই তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। ৫২৩
এভাবেই তারা ইসলামের অগ্রগামী দলের সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। যেই গৌরবের কোনো তুলনা হয় না।
জাফর ইবনে আবি তালিব রা. ও তার সহধর্মিণী আসমা বিনতে উমাইস রা. ইসলামী নূরের কাফেলার যাত্রাপথেই ইসলামে যোগদান করার ফলে প্রথম যুগের মুসলমানরা যেসব দৈহিক ও মানসিক কষ্ট ভোগ করেছিল, তার সবই এ হাশিমী যুবক ও তার যুবতী স্ত্রী ভোগ করেছিলেন। কিন্তু কখনো তারা ধৈর্যহারা হননি। তারা জানতেন, সফলতার পথ এত সহজ নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কুরাইশরা তাদের জন্য ওঁৎ পেতে থেকে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ গড়ে তুলত। এমনই এক মুহূর্তে জাফর ইবনে আবি তালিব, তার স্ত্রী এবং আরও কিছু সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আবিসিনিয়ায় হিজরতের অনুমতি চাইলেন। অত্যন্ত বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তাদের অনুমতি দেন। এখানে তারা বেশ ক'বছর অবস্থান করেন। সে সময় আল্লাহ তাদেরকে মুহাম্মাদ, আবদুল্লাহ ও আউফ নামীয় সন্তান দান করেন।
আবিসিনিয়ায় হিজরত
হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. আবিসিনিয়ায় ইসলাম ও ইসলামের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দক্ষ ও সফল মুখপাত্র ও প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন। আল্লাহ তাআলা তাকে উন্নত মন-মানসিকতা, প্রভাবপূর্ণ বাগ্মিতা ও বয়ানের পূর্ণ যোগ্যতা দান করেছিলেন। মুতার যুদ্ধের সারাটি দিন—যেদিন তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেছিলেন—যা তার জীবনের এক বিস্ময়কর ও চিরজাগ্রত মর্যাদা ও সম্মানের এক অম্লান অধ্যায়; এর পাশাপাশি সেই দিনটিও কম মর্যাদাপূর্ণ নয় যেদিন বাদশাহ নাজ্জাশী তাকে দরবারে ডেকে নিয়েছিলেন।
আবিসিনিয়া অভিমুখে মুসলমানদের হিজরতের পরও কাফেরদের হিংসা-ক্ষোভ বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি; বরং কুরাইশরা চিন্তা করতে থাকে যে, হিজরতের কারণে মুসলমানরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং তাদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে। তারা তাদের মধ্য থেকে শক্তিমান ও তাগড়া জোয়ান দু-ব্যক্তিকে নির্বাচন করে নাজ্জাশীর কাছে পাঠাল। এ দু-ব্যক্তি হলো, আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবীয়া যারা তখনো মুসলমান হয়নি। তাদের একটাই লক্ষ্য, বাদশাহ নাজ্জাশী যেন তার দেশ থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করেন।
আবিসিনিয়ার রাজত্বে আসীন তখন বাদশাহ নাজ্জাশী। যিনি ঈমানের তাপ অনুভব করেছিলেন। তিনি একনিষ্ঠভাবে খ্রিস্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। অহংকার ও দাম্ভিকতা মুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন ভীষণ নীতিপরায়ণ। তার খ্যাতি তখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামদের জন্য তার দেশকে হিজরতের ক্ষেত্র হিসেবে মনোনীত করেন।
দুই হিজরতের অধিকারিণী
হযরত আবু মূসা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইয়ামানে থাকা অবস্থায় আমাদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের খবর পৌঁছল। তাই আমি ও আমার দু-ভাই আবু বুরদা ও আবু রুহম এবং আমাদের গোত্রের আরও মোট বায়ান্ন কি তিপ্পান্ন কিংবা আরও কিছু লোকজনসহ আমরা হিজরতের উদ্দেশে বের হলাম। আমি ছিলাম আমার অপর দু-ভাইয়ের চেয়ে বয়সে ছোট। আমরা একটি জাহাজে উঠলাম। জাহাজটি আমাদেরকে আবিসিনিয়া দেশের (বাদশাহ্) নাজ্জাশীর নিকট নিয়ে গেল। সেখানে আমরা জাফর ইবনে আবু তালিবের সাক্ষাৎ পেলাম এবং তার সঙ্গেই আমরা থেকে গেলাম। অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খায়বার বিজয়ের সময় সকলে এক যোগে (মদিনায়) এসে তার সঙ্গে মিলিত হলাম। এ সময়ে মুসলিমদের কেউ কেউ আমাদের অর্থাৎ, জাহাজে আগমনকারীদের বলল, হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী। আমাদের সঙ্গে আগমনকারী আসমা বিনতে উমাইস রা. একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণী হাফসা'র সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তিনিও (তাঁর স্বামী জাফরসহ) নাজ্জাশীর দেশে হিজরাতকারীদের সঙ্গে হিজরত করেছিলেন। আসমা রা. হাফসা'র কাছেই ছিলেন। এ সময়ে উমর রা. তার ঘরে প্রবেশ করলেন। উমর রা. আসমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? হাফসা রা. বললেন, তিনি আসমা বিনতে উমাইস রা.। উমর রা. বললেন, 'ইনি আবিসিনিয়ায় হিজরাতকারিণী আসমা? ইনিই কি সমুদ্রগামিনী?' আসমা রা. বললেন, 'হ্যাঁ!' তখন উমর রা. বললেন, 'হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে আগে আছি। সুতরাং তোমাদের তুলনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি আমাদের হক অধিক।' এতে আসমা রা. রেগে গেলেন এবং বললেন,
কখনো হতে পারে না। আল্লাহর কসম, আপনারা তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন, তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন, আপনাদের অবুঝ লোকদের নসীহত করতেন। আর আমরা ছিলাম এমন এক এলাকায় অথবা তিনি বলেছেন এমন এক দেশে-যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বহু দূরে এবং সর্বদা শত্রুবেষ্টিত আবিসিনিয়া (আবিসিনিয়া) দেশে। আল্লাহ ও তার রাসূলের উদ্দেশ্যেই ছিল আমাদের এ হিজরত। আল্লাহর কসম, আমি কোনো খাবার খাব না, পানিও পান করব না যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি যা বলেছেন তা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে না জানাব। সেখানে আমাদের কষ্ট দেওয়া হতো, ভয় দেখানো হতো। শীঘ্রই আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এসব কথা বলব এবং তাকে জিজ্ঞেস করব। তবে আল্লাহর কসম, আমি মিথ্যা বলব না, পেঁচিয়ে বলব না, বাড়িয়েও কিছু বলব না। ৫২৪
এরই মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে উপস্থিত হন। আসমা রা. তাকে সব কথা খুলে বলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারা তো এক হিজরত করেছে, আর তোমরা করেছ দুই হিজরত। এদিক দিয়ে তোমাদের মর্যাদা বেশি। ৫২৫
আমির থেকে বর্ণিত হয়েছে, আসমা অভিযোগ করেন এই ভাষায়, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই লোকেরা মনে করে যে, আমরা মুহাজির নই।' জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যারা এমন কথা বলে তারা অসত্য বলে। তোমাদের হিজরত দুইবার হয়েছে। একবার তোমরা নাজ্জাশীর নিকট হিজরত করেছ। আরেকবার আমার নিকট। ৫২৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া এই সুসংবাদ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী ব্যক্তিরা দারুণ উৎফুল্ল হন। তারা আসমার নিকট এসে এ সুসংবাদের সত্যতা যাচাই করে যেতেন। ৫২৭
মৃতার যুদ্ধে জাফরের অনন্য বীরত্ব
এমন সময়ে মৃতার যুদ্ধের দামামা বাজতে থাকে। লড়াইয়ে মোকাবেলার জন্য নিশানা তাক করা হয়। হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. সেই যুদ্ধে নিজ প্রত্যাশা পূরণের উপাদান খুঁজে পান। হয় তিনি দুনিয়ার বুকে আল্লাহর দ্বীন বুলন্দ করার জন্য প্রাণপণে লড়ে যাবেন, অথবা আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করবেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ যুদ্ধে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেন। এ যুদ্ধ যেমন তেমন যুদ্ধ ছিল না। এমন ভয়ঙ্কর যুদ্ধ ছিল— ইতোপূর্বে ইসলামের সামনে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ আর দেখা যায়নি। এটা ছিল পৃথিবীর বিশাল অঞ্চলের বাদশার বিরুদ্ধে এক বিস্ময়কর অসম শক্তির লড়াই। সিরিয়ার রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ। যায়িদ বিন হারিসাকে সেনাপতি নিয়োগ করে তিনি বললেন, ‘যায়িদ নিহত হলে আমীর হবে জাফর ইবনে আবি তালিব। জাফর নিহত বা আহত হলে আমীর হবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। আর সে নিহত বা আহত হলে মুসলমানরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর নির্বাচন করবে।’
মুসলিম বাহিনী জর্দানের সিরিয়া সীমান্তের ‘মৃতা’ নামক স্থানে পৌঁছে দেখতে পেল, এক লাখ রোমান সৈন্য তাদের মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত এবং তাদের সাহায্যের জন্য লাখম, জুজাম, কুদাআ ইত্যাদি আরব গোত্রের আরও এক লাখ খ্রিস্টান সৈন্য পেছনে প্রতীক্ষা করছে। অন্যদিকে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা মাত্র তিন হাজার।
যুদ্ধ শুরু হতেই যায়িদ বিন হারিসা বীরের ন্যায় শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর জাফর বিন আবি তালিব তার ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়েন এবং শত্রুবাহিনী যাতে সেটি ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য নিজের তরবারি দ্বারা ঘোড়াটিকে হত্যা করে ফেলেন। তারপর পতাকাটি তুলে ধরেন রোমান বাহিনীর অভ্যন্তরভাগে বহু দূর পর্যন্ত প্রবেশ করে শত্রুনিধনকার্য চালাতে থাকেন। এমতাবস্থায় তার ডান হাতটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তিনি বাম হাতে পতাকা উঁচু করে ধরেন। তিনি বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। পাশাপাশি এ কবিতার চরণটি আবৃত্তি করে যান,
ياحبذا الجنة واقترابها طيبة، وبارد شرابها
والروم روم ، قد دنا عذابه كافرة بعيدة أنسابها
علي اذا لاقيتها ضرابها
জান্নাত ও জান্নাতের চতুর্পার্শ্ব কতই না মনোমুগ্ধকর! সেখানে রয়েছে শীতল ও পবিত্র পানীয়। আর রোম... রোমের ললাটে শীঘ্রই আসছে ভয়ঙ্কর শাস্তি। এরা তো কাফের। যাদের বংশ পরিক্রমা বহুদূর বিস্তৃত। তাদের কেউ আমার সামনে এলে, এদের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া আমার জন্য জরুরি।
রোমানরা এই ব্যক্তির অসীম শক্তি আর অদম্য সাহস দেখে বিস্ময়াভূত হয়ে পড়ে। তারা তাকে খুন করার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে। কাফেরদের তরবারির আঘাতে তার বাম হাতটিও দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবুও তিনি হাল ছাড়লেন না। বাহু দিয়ে বুকের সাথে জাপ্টে ধরে তিনি ইসলামী পতাকা সমুন্নত রাখলেন। এ অবস্থায় কিছুক্ষণ পর তরবারির তৃতীয় একটি আঘাত তার দেহটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। অতঃপর পতাকাটি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা তুলে নিলেন।
এভাবেই হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. নিজের মৃত্যুকে মানবতার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করলেন। পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে প্রাণপণ লড়াই করে ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে চলে যান।
তাঁর শাহাদাতের খবর শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দারুণভাবে ব্যথিত হন। বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তার চাচাত ভাই জাফরের বাড়িতে যান। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু-চোখ ছিল অশ্রুতে ভেজা। এরপর তিনি সাহাবাদের মজলিসে ফিরে আসেন। বিশিষ্ট সাহাবী কবি হযরত হাসসান ইবনে সাবিত রা. ও হযরত কাআব ইবনে মালিক রা. হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর শানে মর্সিয়া আবৃত্তি করতে থাকেন। জাফর ছিলেন গরীব-মিসকীনদের প্রতি ভীষণ দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। এ কারণে তাকে ডাকা হতো 'আবুল মাসাকীন' বা মিসকীনদের পিতা বলে। এ শ্রেণির সব লোক এসে খুবই কান্নাকাটি করতে থাকল। আবু হুরায়রা রা. বলেন, 'আমাদের মিসকীন সম্প্রদায়ের জন্য জাফর ইবনে আবি তালিব ছিলেন সর্বোত্তম ব্যক্তি। তিনি আমাদের সঙ্গে করে তার গৃহে নিয়ে যেতেন, যা কিছু তার কাছে থাকত তা আমাদের খাওয়াতেন। যখন তার খাবার শেষ হয়ে যেত তখন তার ছোট্ট শূন্য ঘি-এর মশকটি বের করে দিতেন। আমরা তা ফেঁড়ে ভেতরে যা কিছু লেগে থাকত চেটেপুটে খেতাম।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, জাফরের লাশ তালাশ করে দেখা গেল, শুধু তার সামনের দিকেই পঞ্চাশটি ক্ষতচিহ্ন। সারা দেহে তার নব্বইটিরও বেশি ক্ষত ছিল। কিন্তু তার একটিও পেছন দিকে ছিল না।
হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. অজস্র তীরের আঘাতে জর্জরিত শরীর নিয়ে জান্নাতে চলে গেছেন। আপনি যদি ইচ্ছে করেন, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তিটি শুনে নিতে পারেন : 'আল্লাহ তাআলা জাফরকে তার দুটি কর্তিত হাতের পরিবর্তে নতুন দুটি রক্তরাঙা হাত দান করেছেন এবং তিনি জান্নাতে ফেরেশতাদের সাথে উড়ে বেড়াচ্ছেন।'
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুতার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদ ইবনে হারিসা রা.-কে (সেনাপতি নিযুক্ত করে) বলেছিলেন, যদি যায়িদ রা. শহীদ হয়ে যায় তাহলে জাফর ইবনে আবি তালিব রা. (সেনাপতি হবে)। যদি জাফর রা.-ও শহীদ হয়ে যায় তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. (সেনাপতি হবে)। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, ওই যুদ্ধে তাদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। (যুদ্ধ শেষে) আমরা জাফর ইবনে আবু তালিব রা.-কে তালাশ করলে তাকে শহীদগণের মধ্যে পেলাম। তখন আমরা তার দেহে বর্শা ও তীরের নব্বইটিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। ৫২৮
আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মৃতা যুদ্ধের অবস্থা বর্ণনায়) বললেন, যায়িদ রা. পতাকা বহন করেছে অতঃপর শহীদ হয়েছে। অতঃপর জাফর রা. (পতাকা) হাতে নিয়েছে, সেও শহীদ হয়। অতঃপর আবদুল্লাহ্ ইবনে রাওয়াহা রা. (পতাকা) ধারণ করে এবং সেও শহীদ হয়। এ খবর বলছিলেন এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু-চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল। অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম পরামর্শক্রমে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর হাতে পতাকা তুলে দেন এবং তার দ্বারাই বিজয় লাভ হয়।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত যে, সেদিন (মৃতার যুদ্ধের দিন) তিনি শাহাদাতপ্রাপ্ত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর লাশের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। (তিনি বলেন,) আমি জাফর রা.-এর দেহে তখন বর্শা ও তরবারির পঞ্চাশটি আঘাতের চিহ্ন গুণেছি। তার মধ্যে কোনোটাই তার পশ্চাৎ দিকে ছিল না।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. যখন জাফর রা.-এর ছেলেকে সালাম করতেন তখন বলতেন, হে, দু-বাহুওয়ালা ব্যক্তির ছেলে। ৫২৯
মৃতার যুদ্ধে কাফেরদের তীরের আঘাতে যখন জাফর ইবনে আবি তালিবের হাত দুটি দেহ হতে পৃথক হয়ে যায় তখন তিনি ওই দু-হাতের বদলে আল্লাহর তরফ হতে দুটি ডানা লাভ করেন। সেগুলোর সাহায্যে তিনি ফেরেশতাদের সাথে আকাশে উড়তে থাকেন। পিতার এই অনন্য বৈশিষ্ট্য ও ফযীলতের স্মৃতিচারণার্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহীদের পুত্রকে 'দুডানা বিশিষ্ট ব্যক্তির পুত্র' বলে সম্বোধন করতেন। হাদীসটি তিরমিযীতে বর্ণিত রয়েছে। ৫৩০
শোকাহত আসমা
হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা.-এর স্বামী জাফর রা. ছিলেন এ যুদ্ধের একজন সেনা অধিনায়ক। যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। খবরটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পৌঁছর পর তিনি আসমার রা. বাড়িতে ছুটে যান এবং বলেন, 'জাফরের ছেলেদের আমার সামনে নিয়ে এসো।' আসমা ছেলেদের গোসল করিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে হাজির করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখ দু-টি পানিতে ভিজে গেল। তিনি ছেলেদের জাড়িয়ে চুমু দেন। আসমা জিজ্ঞেস করলেন, 'জাফরের কি কোনো খবর পেয়েছেন?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, সে শহীদ হয়েছে।' এতটুকু শুনতেই আসমা চিৎকার দিয়ে ওঠেন এবং বাড়িতে একটা মাতমের রূপ ধারণ করে। প্রতিবেশী মহিলারা তার পাশে সমবেত হয় এবং তাকে বলে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুকে হাত মারতে নিষেধ করছেন।' সেখান থেকে উঠে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ঘর ফিরে এলেন এবং বললেন, 'তোমরা জাফরের ছেলেদের জন্য খাবার তৈরি করো। কারণ, তাদের মা আসমা শোক ও দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছে। ৫০১
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যথিত অন্তরে মসজিদে গিয়ে বসেন এবং হযরত জাফর রা.-এর শাহাদাতের খবর ঘোষণা করেন। ঠিক এ সময় এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলে, জাফরের স্ত্রী মাতম শুরু করেছেন এবং কান্নাকাটি করছেন। তিনি লোকটিকে বলেন, তুমি যাও এবং তাদেরকে এমন করতে বারণ করো। কিছুক্ষণ পর লোকটি আবার ফিরে এসে বলে, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তারা তো বিরত হচ্ছে না। তিনি লোকটিকে আবার একই কথা বলে পাঠালেন; কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তার মুখে মাটি ভরে দাও। সহীহ বুখারীতে একথাও এসেছে যে, হযরত আয়েশা রা. ওই লোকটিকে বলেন, 'আল্লাহর কসম! তোমরা যদি এ কাজ (মুখে মাটি ভরা) না কর তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট থেকে মুক্তি পাবেন না। তৃতীয় দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসমার বাড়ি যান এবং তাকে শোক পালন করতে বারণ করেন। ৫০২
স্বামী হযরত জাফর রা.-এর শাহাদাতের ছয় মাস পরে অষ্টম হিজরীর শাওয়াল মাসে হুনাইন যুদ্ধের সময়কালে হযরত আবু বকর রা.-এর সাথে আসমার দ্বিতীয় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং বিয়ে পড়িয়েছেন। ৫৩৩ এই বিয়ের দুই বছর পর দশম হিজরীর যুলকাদা মাসে আবু বকর রা.-এর ঔরসে ছেলে মুহাম্মাদ ইবনে আবি বাকরের জন্ম হয়। আসমা তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায় হজের কাফেলার সাথে শরীক হয়ে মক্কার পথে ছিলেন। যুল হুলায়ফা পৌঁছার পর মুহাম্মাদ ভূমিষ্ঠ হয়। এখন তিনি হজ আদায়ের ব্যাপারে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। স্বামী আবু বকরও তাকে মদীনায় ফেরত পাঠাতে চাইলেন। অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতামত জানতে চাওয়া হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তাকে বলো, সে যেন গোসল করে হজের ইহরাম বেঁধে নেয়। ৫৩৪
স্বামী যখন সিদ্দীকে আকবার
হিজরী অষ্টম সনে প্রথম স্বামী জাফরের ইন্তেকালে হযরত আসমা রা. ভীষণ ব্যথা পান; কিন্তু আল্লাহ ও তার রাসূলের সন্তুষ্টি লাভের আশায় এই শোক ও দুঃখকে তিনি সবর ও শোকরে রূপান্তরিত করেন; কিন্তু হিজরী ১৩ সনে দ্বিতীয় স্বামী হযরত আবু বকর রা.-এর মৃত্যুতে তিনি আবার শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে তিনি এ শোকও কাটিয়ে ওঠেন। মৃত্যুকালে আবু বকর রা. অসিয়ত করে যান, স্ত্রী আসমা তাকে অন্তিম গোসল দেবেন। আসমা তাকে গোসল দেন। গোসল দেওয়া শেষ হলে তিনি উপস্থিত মুহাজিরদের লক্ষ্য করে বলেন, 'আমি রোযা আছি। আর দিনটিও ভীষণ ঠাণ্ডার। আমাকেও গোসল করতে হবে?' লোকেরা বলল, 'না। ৫৩৫
আলী রা.-এর ঘরে
হযরত আবু বকর রা.-এর মৃত্যুর পর হযরত আসমা হযরত আলী রা.-কে তৃতীয় স্বামী হিসেবে গ্রহণ কনে। শিশু মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর মায়ের সাথে সৎ পিতা আলীর রা. সংসারে চলে আসেন এবং তার স্নেহছায়ায় ও তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।
হযরত আসমার দুই ছেলের নামই মুহাম্মাদ। মুহাম্মাদ ইবনে জাফর ও মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর। একদিন এই দুই ছেলে একজন আরেকজনের ওপর কৌলীন্য ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে বলতে থাকে, আমি তোমার চেয়ে বেশি মর্যাদাবান। আমার পিতা তোমার পিতার চেয়ে বেশি সম্মানীয়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাদের এ বিতর্ক চলতে থাকে। হযরত আলী রা. তাদের মা আসমাকে বললেন, তুমিই তাদের এ বিবাদের ফয়সালা করে দাও। আসমা বললেন, আমি আরব যুবকদের মধ্যে জাফরের চেয়ে ভালো কাউকে পাইনি, আর বৃদ্ধদের মধ্যে আবু বকরের চেয়ে বেশি ভালো কাউকে দেখিনি। আলী রা. বললেন, তুমি তো আমার বলার কিছু রাখলে না। তুমি যা বলেছ, তাছাড়া অন্য কিছু বললে আমি অসন্তুষ্ট হতাম। আসমা তখন বলেন, আর ভালো মানুষ হিসেবে আপনি তিনজনের মধ্যে তৃতীয়। ৫৩৬
অন্তিম মুহূর্ত
জীবনের দীর্ঘ একটি সময় হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা. আল্লাহর ইবাদতে কাটান এবং আল্লাহর দ্বীনের জন্য অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের সময় তার ওপর তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন এবং তার স্বামীরাও ছিলেন তার ওপর রাযী-খুশি। অতঃপর হযরত আলী রা.-এর ইন্তেকালে কিছু পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। ইমাম যাহাবী বলেন, হযরত আলী রা.-এরপরও তিনি বেঁচেছিলেন। ৫৩৭
আল্লাহ তাআলা হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা.-এর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, যাঁকে তিনি গৌরব ও মর্যাদার স্বর্ণশিখরে আরোহণ করিয়েছেন।
**টিকাঃ**
৫২৩ আসহাবুর রাসূল সা., ১/৫৫০।
৫২৪ সহীহ, বুখারী, ৪২৩০; সহীহ, মুসলিম, ২৫০২।
৫২৫ ফাতহুল বারী, ৭/৩১৭; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৫০৩; কানযুল উম্মাল ৮/৩৩৩।
৫২৬ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৮১; আল ইসাবাহ, ৪/২৩১।
৫২৭ সহীহ, বুখারী, ২/৬০৭-৬০৮; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৮১।
৫২৮ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪২৬১।
৫২৯ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৭০৯।
৫৩০ ফাতহুল বারী, ৭/৯৬।
৫০১ আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আলবানী হাদীসটি 'হাসান' বলেছেন।
৫০২ মুসনাদ, আহমাদ: ৬/৩৬৯।
৫৩৩ আল-ইসাবা, ৪/২৩১।
৫৩৪ তাবাকাত, ৮/২৮২; মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩৬৯; সহীহ, মুসলিম, ৩/১৮৫-১৮৬।
৫৩৫ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২০৮।
৫৩৬ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২০৮-২০৯; আল ইসাবাহ, ৭/৪৯১।
৫৩৭ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৮৭।
📄 উম্মে শুরাইক রা.
দ্বীনের দাওয়াত: নববী আমল
আজ আমরা এমন এক মহীয়সীর জীবনচরিত আলোচনা করব—যিনি নিজ মাথায় বহন করেছিলেন দ্বীনী দাওয়াতের মহাভার। এ লক্ষ্যে তিনি মানুষের ময়দানে বেরিয়ে পড়েছিলেন; যাতে মানুষ ওই মহান সৃষ্টিকর্তার ইবাদতে আত্মনিয়োগ করে—যিনি আসমান-যমীনের সৃষ্টিকর্তা। এই চেতনা আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন। ফলে ইসলামের জন্য তিনি বয়ে আনেন প্রভূত কল্যাণ।
তিনি হচ্ছেন উম্মে শুরাইক রা.। যাঁর আসল নাম গাযিয়া বিনতে জাবির ইবনে হাকীম রা.। যদিও তার ঘটনা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার কীর্তি বিশাল। বহু সংখ্যক পথহারা মানুষ দিশা পেয়েছে তার দাওয়াতে। বহু মানুষ কত শত বছর বেঁচে থাকে; কিন্তু তাদের দ্বারা একজন মানুষও দ্বীনের সঠিক দিশা পায় না। আবার অনেক মহামানব এমনও আছেন যারা বেঁচে থাকেন অল্প কিছুদিন; কিন্তু তাদের চেতনা ও দাওয়াতের ফলে অগণিত মানুষ হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়, পেয়ে যায় প্রভু সন্তুষ্টির উপকরণ। আমাদের আজকের অতিথিও তেমনই জীবন লাভ করেছিলেন এবং এ জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহর দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকার পথে।
দাওয়াত : নববী আমল
وَ مَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَ عَمِلَ صَالِحًا وَ قَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
ওই ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম কথা কার, যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। ৫৩৮
পৃথিবীতে যতজন নবী এবং রাসূল আগমন করেছেন তাদের সকলেরই মিশন ছিল দাওয়াত। দাওয়াত দানের মাধ্যমেই তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে আলোর ফল্গুধারা প্রবাহিত করেছেন। কুরআন ও হাদিসে অসংখ্যবার দাওয়াতের গুরুত্বের কথা উঠে এসেছে।
আল্লাহর বাণী, 'বলুন, এটাই আমার পথ... ৫৩৯ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন এই রাস্তায় আল্লাহর দিকে আহবান করেন। অতঃপর যিনি আল্লাহর দিকে ডাকেন তিনি যেন রাসূলের পথে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে তার অনুসারী হয়ে ডাকেন। আর যিনি এটা ছাড়া মানুষকে আহবান করলেন, তিনি এই রাস্তায় জাগ্রত জ্ঞান সহকারে তার অনুসারী না হয়ে আহবান করলেন। আল্লাহর দিকে আহবান নবী ও তাদের অনুসারীদের কাজ এবং রাসূলদের উম্মতদের মধ্যে তাদের অনুসারীদের কাজ। মানুষেরা তাদের অনুসরণ করে। আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে, তার নিকটে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যেন পৌঁছে দেন। আল্লাহ তা সংরক্ষণ করবেন এবং মানুষের বাধা থেকে মুক্ত রাখবেন। আর তার উম্মতদের মধ্যে যারা উক্ত কাজ করবে তাদেরকেও তিনি হেফাযত করবেন ও দ্বীনের ওপর অটল থাকা ও দাওয়াতী কাজের বাধা থেকে প্রচ্ছন্ন রাখবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি আয়াতও জানা থাকলে তা প্রচারের কথা নির্দেশ দিয়েছেন। ৫৪০
দাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
فَلِذلِكَ فَادْعُ وَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَ لَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ وَقُلْ آمَنْتُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنْ كِتَبٍ وَ أُمِرْتُ لِأَعْدِلَ بَيْنَكُمْ اللَّهُ رَبُّنَا وَ رَبُّكُمْ لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ لَا حُجَّةَ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ اللَّهُ يَجْمَعُ بَيْنَنَا وَ إِلَيْهِ الْمَصِيرُ
অতএব, আপনি তার দিকে আহবান করুন ও তাতেই দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকুন যেভাবে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন এবং তাদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করবেন না। বলো, আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন আমি তাতে বিশ্বাস করি এবং আমি আদিষ্ট হয়েছি তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে। আল্লাহই আমাদের প্রতিপালক। আমাদের কর্ম আমাদের ও তোমাদের কর্ম তোমাদের। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ নেই। আল্লাহই আমাদের একত্র করবেন এবং প্রত্যাবর্তন তাঁরই দিকে। ৫৪১
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يُقَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللَّهِ وَامِنُوا بِهِ يَغْفِرُ لَكُمْ مِّنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرُكُمْ مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ
হে আমাদের সম্প্রদায়, আল্লাহর দিকে আহবানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন এবং মর্মন্তুদ শাস্তি হতে রক্ষা করবেন। ৫৪২
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَ اعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ
হে ঈমানদারগণ, রাসূল যখন তোমাদের এমন কিছুর দিকে আহবান করেন, যা তোমাদের প্রাণবন্ত করে, তখন আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দেবে। জেনে রাখ, আল্লাহ সম্মুখ ও তার অন্তরের মধ্যবর্তী হয়ে থাকেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদের একত্র করা হবে। ৫৪৩
হাদীস শরীফে এসেছে, ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুআয ইবনে জাবাল রা.-কে ইয়ামানে পাঠালেন, তখন তিনি তাকে বললেন, তুমি আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছ। সুতরাং তাদেরকে প্রথম আহবান করবে, তারা যেন আল্লাহ তাআলার একত্বকে মেনে নেয়। যদি তারা তা স্বীকার করে তবে তাদের বলবে, আল্লাহ তাদের ওপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তারা যদি সালাত আদায় করে তবে তাদের জানাবে, আল্লাহ তাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন, যা ধনীদের নিকট থেকে আদায় করা হবে এবং গরীবদের মাঝে বিতরণ করা হবে। তারা যদি এটা মেনে নেয় তাহলে তাদের নিকট থেকে তা গ্রহণ করবে। তবে মানুষের সম্পদের মূল্যের ব্যাপারে সাবধান থাকবে। ৫৪৪
আবু হুরায়রা রা. বলেন, একবার আমরা মসজিদে নববীতে বসে ছিলাম। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হয়ে বললেন, তোমরা ইহুদীদের কাছে চলো। আমরা চললাম এবং তাদের পাঠক্রমে পৌঁছলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বললেন, তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, তাহলে নিরাপত্তা পাবে। জেনে রাখ, পৃথিবী আল্লাহ এবং তার রাসূলের। আমি ইচ্ছা করছি তোমাদের এই দেশে হতে নির্বাসিত করব। যদি কেউ তার মালের বিনিময়ে কিছু পায়, তবে সে যেন তা বিক্রি করে। জেনে রাখ, পৃথিবী আল্লাহ এবং তার রাসূলের। ৫৪৫
'জুনাদা ইবনে উমাইয়া রা. বলেন, আমরা উবাদা ইবনে সামিত রা.-এর কাছে গেলাম। তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। আমরা বললাম, আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করুন! আমাদের একটি হাদীস বর্ণনা করুন, যা আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছেন এবং আল্লাহ আমাদের উপকার করবেন। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার আমাদের ডাকলেন এবং তার নিকট আনুগত্যের বাইআত করলাম। তিনি যে সমস্ত বিষয়ে আমদের বাইআত নিলেন তা হলো, সুখে-দুঃখে, দুর্দিনে-সুদিনে, স্বচ্ছলতা-অস্বচ্ছলতায়, এমনকি কোনো ব্যক্তিকে আমাদের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হলেও আমরা নেতার আনুগত্য করব এবং কাউকে দায়িত্ব অর্পণ করা হলে আমরা তাতে বাধা দেব না। তিনি আরও বলেন, কিন্তু তোমরা যদি তাকে প্রকাশ্য কুফরীতে লিপ্ত দেখ, স্পষ্ট প্রমাণ সহকারে (তখন কোনো আনুগত্য নেই)। ৫৪৬
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি কি তোমাদের এমন বিষয় সম্পর্কে বলে দেব না, যে কারণে আল্লাহ তোমাদের গোনাহসমূহ মুছে দিবেন এবং তোমাদের মর্যাদাকে সমুন্নত করবেন? সাহাবীরা বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তখন তিনি বললেন কষ্ট সত্ত্বেও পূর্ণরূপে ওযু করা, বেশি বেশি মসজিদের দিকে যাওয়া এবং এক সালাত শেষ করার পর অপর সালাতের অপেক্ষায় থাকা। আর এটিই 'রিবাত'। ৫৪৭
হাসান বসরী রহ. সূরা ফুসসিলাতের ৩৩ নং আয়াত তথা 'কথায় কে উত্তম ওই ব্যক্তি অপেক্ষা, যে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে আমি তো মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত' তিলাওয়াত করলেন। অতঃপর বললেন, এই ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয়পাত্র, আল্লাহর অলী, একনিষ্ঠ বন্ধু, আল্লাহর উত্তম বস্তু, পৃথিবীবাসীর মধ্যে আল্লাহর নিকট তিনি সর্বাধিক প্রিয়। আল্লাহ তার দুআ কবুল করেন। আল্লাহ যা কবুল করেন তার দিকেই তিনি মানুষকে দাওয়াত দেন এবং তআর আলোকেই আমলে সালেহ করেন। আর বলেন, আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। তিনিই আল্লাহ কর্তৃক দায়িত্বশীল। ৫৪৮
আকাশ থেকে পিপাসা নিবারণ
মূলত ইসলামের দাওয়াত দেওয়া তথা সৎ কাজের আদেশ (আমর বিন মা'রুফ) এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা (নাহি আনিল মুনকার) প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্যই মহান আল্লাহ তাআলা অত্যাবশ্যক করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَ تَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের পাঠানো হয়েছে। তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে। ৫৪৯
এই আয়াতটিতে আল্লাহ শুধু পুরুষদেরকে উল্লেখ করেননি; বরং নারী-পুরুষ উভয়কেই নির্দেশ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদের রা. জীবনী থেকে দেখা যায় পুরুষ সাহাবী রা.-দের মতো মহিলা সাহাবীরাও দাওয়াতি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। তারা রা. আল্লাহর এই নির্দেশে সাড়া দিয়েই সেই কাজ করেছেন।
আমরা যদি উম্মে শুরাইক রা. এর জীবনচরিত দেখি, তাহলে দেখব, তিনি ছিলেন মক্কার একজন নারী। তার নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর নেমে পড়েন দাওয়াতী কাজে। তিনি বিভিন্ন বাড়িতে যেতেন। বাড়ির মহিলাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। সুযোগ বুঝে ইসলামের মর্মকথা তুলে ধরতেন তাদের কাছে। যদিও তিনি জানতেন, এই কথা জানাজানি হলে তার রক্ষা নেই!
আজকের মুসলিম নারীরা উম্মে শুরাইক রা.-কে অনুসরণ করে ইসলামী দাওয়াত মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারে। কেননা, এটি একজন মুসলমান নারীর জন্য ফরয। যদিওবা এই জন্য তাকে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। যেমন প্রতিকুল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল উম্মে শুরাইক রা.-কে।
শুরাইকা রা. যে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন, তা একসময় জানাজানি হয়ে যায়। তখন মুশরিক নেতারা তাকে আটক করে। তুলে দেয় তার গোত্রের লোকদের হাতে। তাকে শাস্তি দিতে বলে। তার গোত্রের লোকেরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে শুকনো রুটি ও মধু খেতে বাধ্য করে। অতঃপর তাকে প্রচণ্ড রোদে গরম বালুর ওপর শুইয়ে দেয়।
প্রচণ্ড রোদ আর গরম বালুর উত্তাপে তিনি ছটফট করতে থাকেন। পিপাসায় কাতরাতে থাকেন। একটু পানি দেবার জন্য লোকদের বার বার অনুরোধ করতে থাকেন। কেউ তার অনুরোধে সাড়া দিল না। কেউ তাকে একটু পানি দিল না। এইভাবে কেটে যায় তিনটি দিন। প্রচণ্ড উত্তাপ ও পিপাসায় তিনি মুমূর্ষু হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে এসে তিনি বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেন। যালিমরা তাকে ইসলাম ত্যাগ করতে বলত; কিন্তু বোধশক্তি হারিয়ে ফেলায় তিনি তাদের কথা বুঝে ওঠতে পারতেন না। তৃতীয় দিন একব্যক্তি আসমানের দিকে ইশারা করে তাকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান ত্যাগ করতে বলে। অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যে যা বোঝাতে চেয়েছিল তিনি তা বুঝতে সক্ষম হন। চিৎকার দিয়ে তিনি বলে ওঠেন, 'আল্লাহর কসম! আমি তো এখনো সেই ঈমানের ওপরই অটল আছি।'
আল্লাহু আকবার! এই ছিল উম্মে শুরাইক রা.-এর ঈমান। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য যিনি জীবন উৎসর্গ করতেও রাজি ছিলেন। তারা এসব কষ্টকে কষ্টই মনে করতেন না। কারণ তারা জানতেন জাহান্নামের আজাব আরও ভয়াবহ।
এ ছাড়া আল্লাহপাক শুধু ঈমানের মৌখিক স্বীকৃতিতেই তার বান্দাদের নিষ্কৃতি দেবেন না। তিনি যাচাই করে নিবেন তার কোনো বান্দা বা বান্দী সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর আদেশ সঠিকভাবে পালন করেছেন আর কোনো বান্দা করেননি।
তাই দাওয়াতী কাজে বাধা দিয়ে, বিপদ দিয়ে আল্লাহ তার বান্দাদের পরীক্ষায় ফেলতে পারেন। এই পরীক্ষা তার বান্দাদের ঈমানকে যাচাইয়ের পরীক্ষা; কিন্তু সেই পরীক্ষাকে ভয় না পেয়ে জয় করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে, এসব বিপদ-আপদের মধ্যেও আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য কল্যাণ রেখেছেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যান চান তাকে বিপদে (পরীক্ষায়) ফেলেন।
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি হেদায়াতের দিকে আহবান করবে তার জন্য তার অনুসারী ব্যক্তির সমপরিমাণ নেকী রয়েছে; কিন্তু তার নেকী থেকে বিন্দু পরিমাণ হ্রাস পাবে না। যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে আহবান করবে তার জন্য তার অনুসারী ব্যক্তির সমপরিমাণ পাপ রয়েছে; কিন্তু তার পাপ থেকে বিন্দু পরিমাণ হ্রাস পাবে না। ৫৫০
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৫৩৮ সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৩।
৫৩৯ সূরা ইউসুফ, ৪১:১২:১০৮।
৫৪০ জালাউল আফহাম, ৪১৫।
৫৪১ সূরা শূরা, ৪২:১৫।
৫৪২ সূরা আহকাফ, ৪৬:৩১।
৫৪৩ সূরা আনফাল, ৮:২৪।
৫৪৪ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৭৩৭২।
৫৪৫ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩১৬৭।
৫৪৬ সহীহ, মুসলিম: হাদীস নং ৪৮৭৭।
৫৪৭ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৬১০।
৫৪৮ তাফসীর ইবনে কাসীর, ৪/১০১।
৫৪৯ সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০।
৫৫০ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৬৯৮০।
📄 উমামা বিনতে আবিল আস রা.
আজ আমরা এমন এক পুষ্পিত মানবীর জীবনচরিত নিয়ে আলোচনা করব মানুষের পৃথিবীতে যাঁর দৃষ্টান্ত মেলা ভার। তিনি রাসূল সা.-এর ঘরের একজন প্রিয়ভাজন ব্যক্তিত্ব। তাঁকে পিঠে নিয়ে নামায পড়েছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি তাঁকে অত্যধিক স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। এক পবিত্র ও নিষ্কলুষ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি।
এই মহীয়সী মানবী হলেন হযরত উমামা বিনতে আবিল আস রা.। তিনি হলেন যায়নাব বিনতে রাসূলিল্লাহ-এর আদরের মেয়ে। সহজেই অনুমান করা যায়, কেমন অনুপম পরিবারের সন্তান তিনি!
যেমন বৃক্ষ তেমন ফল
আমরা যদি এই ফলের পরিচয় নিতে চাই তাহলে সর্বাগ্রে আমাদের ফলের গাছটির দিকে নজর দিতে হবে। যেখান থেকে উৎপন্ন হয়েছেন তিনি। যাঁদের সান্নিধ্যে বেড়ে উঠেছেন:
✓ তাঁর নানা হচ্ছেন সায়্যিদুল আউয়্যালীন ওয়াল আখিরীন, রাসূলু রাব্বিল আলামীন মুহাম্মাদ সা.। যাঁকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন।
✓ তাঁর নানী হচ্ছেন উভয় জগতের নারী মহলের নেত্রী, উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা.। যিনি প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং সত্যয়ন করেছেন পরম সত্যবাদী ও আমানতদার নবী সা.কে।
✓ তাঁর মা হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর বড় মেয়ে, ধৈর্যশীলা, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারিণী হযরত যায়নাব রা.।
✓ তাঁর খালা হচ্ছেন ফাতিমা বিনতে রাসূলিল্লাহ। যিনি জান্নাতী নারীদের নেত্রী।
✓ তাঁর স্বামী হচ্ছেন আসাদুল্লাহিল গালিব হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা.
এই হচ্ছে হযরত উমামা বিনতে আবিল আস রা. এর ঈমানদীপ্ত পরিবার। যেখান থেকে তিনি ইসলামের সুমহান শিক্ষা লাভ করেছেন।
মা-বাবার ভালোবাসা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম হযরত খাদীজা রা.-কে বিয়ে করেন। তার গর্ভেই আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে সন্তান দান করেন। তন্মধ্যে যায়নাব রা. হচ্ছেন সবার বড় মেয়ে। যায়নাব রা.-এর স্বামী আবুল আস ইবনুর রবী' ইবনে আবদুল উয্যা ছিলেন যায়নাবের খালাতো ভাই। মা হযরত খাদীজার রা. আপন ছোট বোন হালা বিনতে খুওয়াইলিদের ছেলে।
বিয়ের সময় বাবা-মা মেয়েকে যে সকল উপহার সামগ্রী দিয়েছিলেন তার মধ্যে ইয়ামেনী আকীকের একটি হারও ছিল। হারটি দিয়েছিলেন মা খাদীজা রা.। তার নানা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী লাভ করে নবী হলেন। মেয়ে যায়নাব রা. তার মার সাথে মুসলমান হলেন। স্বামী আবুল আস তখন ইসলাম গ্রহণ করেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করলেন। পরে হযরত যায়নাব রা. স্বামীকে মুশরিক অবস্থায় মক্কায় রেখে মদীনায় হিজরত করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যায়নাব রা. ও আবুল আসের মধ্যের গভীর সম্পর্ক এবং ভদ্রোচিত কর্মপদ্ধতির প্রায়ই প্রশংসা করতেন।
মক্কায় ইসলামের শুরুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ অল্পসংখ্যক মুসলমানদের শক্তি তেমন মজবুত ছিল না। আর কাফেরদের যুলুম-অত্যাচারের প্লাবন ছিল সবেগে প্রবহমান। সঙ্গতকারণেই ইসলামের প্রচার-প্রসারের কর্মকাণ্ড খুবই ধীর গতিতে এগোচ্ছিল। এসব বিবেচনা করে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ না ঘটানোই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমীচীন মনে করেন।
আবুল আস স্ত্রী যায়নাব রা.-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং সম্মানও করতেন; কিন্তু তিনি পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে প্রিয়তমা স্ত্রীর নতুন দ্বীন কবুল করতে কোনোভাবেই রাজী হলেন না। এ অবস্থা চলতে লাগল। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কুরাইশদের মধ্যে মারাত্মক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত শুরু হয়ে গেল। কুরাইশরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল, তোমাদের সর্বনাশ হোক! তোমরা মুহাম্মাদের মেয়েদের বিয়ে করে তার দুশ্চিন্তা নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছ। তোমরা যদি এ সকল মেয়েকে তার কাছে ফেরত পাঠাতে তাহলে সে তোমাদের ছেড়ে তাদেরকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ত। তাদের মধ্যে অনেকে এ কথা সমর্থন করে বলল, এ তো অতি চমৎকার যুক্তি। তারা দল বেঁধে আবুল আসের কাছে গিয়ে বলল, আবুল আস, তুমি তোমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তার পিতার কাছে পাঠিয়ে দাও। তার পরিবর্তে তুমি যে কুরাইশ সুন্দরীকে চাও, আমরা তাকে তোমার সাথে বিয়ে দেব। আবুল আস বললেন, 'আল্লাহর কসম! না, তা হয় না। আমার স্ত্রীকে আমি ত্যাগ করতে পারি না। তার পরিবর্তে সকল নারী আমাকে দিলেও আমার তা পছন্দ নয়।' একারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার আত্মীয়তাকে খুব ভালো মনে করতেন এবং প্রশংসা করতেন।
বাবা যখন বদরের বন্দী
হযরত যায়নাব রা.ও স্বামী আবুল আসকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসা ও ত্যাগের অবস্থা নিম্নের ঘটনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
নবুয়তের তেরোতম বছরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। হযরত যায়নাব রা. স্বামীর সাথে মক্কায় থেকে যান। কুরাইশদের সাথে মদীনার মুসলমানদের সামরিক সংঘাত শুরু হলো। কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বদরে সমবেত হলো। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবুল আস কুরাইশদের সাথে বদলে গেলেন। কারণ, কুরাইশদের মধ্যে তার যে স্থান তাতে না গিয়ে উপায় ছিল না। বদরে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। তাদের বেশ কিছু নেতা নিহত হয় এবং বহু সংখ্যক যোদ্ধা বন্দী হয়। আর অবশিষ্টরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এই বন্দীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামাই হযরত যায়নাব রা.-এর স্বামী আবুল আসও ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর ইবনে নুমান রা. তাকে বন্দী করেন।
বন্দীদের সামাজিক মর্যাদা এবং ধনী-দরিদ্র প্রভেদ অনুযায়ী এক হাজার থেকে চার হাজার দিরহাম মুক্তিপণ নির্ধারিত হলো। বন্দীদের প্রতিনিধিরা ধার্যকৃত মুক্তিপণ নিয়ে মক্কা-মদীনা ছুটাছুটি শুরু করে দিল। নবী দুহিতা হযরত যায়নাব রা. স্বামী আবুল আসের মুক্তিপণসহ মদীনায় লোক পাঠালেন। আবুল আসের মুক্তিপণ নিয়ে মদীনায় এসেছিল তার ভাই আমর ইবনে রবী। হযরত যায়নাব মুক্তিপণ দিরহামের পরিবর্তে একটি হার পাঠিয়েছিলেন। এই হারটি তার জননী হযরত খাদীজা রা. বিয়ের সময় তাকে উপহার দিয়েছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারটি দেখেই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন এবং নিজের বিষণ্ণ মুখটি একটি পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেললেন। জান্নাতবাসিনী প্রিয়তমা স্ত্রী ও অতি আদরের মেয়ের স্মৃতি তার মানসপটে ভেসে উঠেছিল।
কিছুক্ষণ পর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন, 'যায়নাব তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে এই হারটি পাঠিয়েছে। তোমরা ইচ্ছে করলে তার বন্দীকে ছেড়ে দিতে পার এবং হারটিও তাকে ফেরত দিতে পার।'
সাহাবীরা রাজী হয়ে গেলেন। তারা আবুল আসকে মুক্তি দিলেন, আর সেই সাথে ফেরত দিলেন তার মুক্তিপণের হারটি। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবুল আসের নিকট থেকে এ অঙ্গীকার নিলেন যে, মক্কায় ফিরে অনতিবিলম্বে সে যায়নাবকে যেন মদীনায় পাঠিয়ে দেয়।
হিজরতকালে যায়নাবের দুর্দশা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাব রা.-কে নেওয়ার জন্য আবুল আসের সঙ্গে হযরত যায়িদ ইবনে হারিসা রা.-কে পাঠন। তাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করতে বলেন। যায়নাব রা. মক্কা থেকে সেখানে পৌঁছলে তাকে নিয়ে মদীনায় চলে আসতে বলেন। আবুল আস মক্কায় পৌঁছে যায়নাব রা.-কে সফরের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আছেন, এমন সময় হিন্দা বিনতে উতবা এসে হাজির হলো। প্রস্তুতি দেখে বলল, মুহাম্মাদের মেয়ে! তুমি কি তোমার বাপের কাছে যাচ্ছ? যায়নাব রা. বললেন, এই মুহূর্তে তো তেমন উদ্দেশ্য নেই, তবে ভবিষ্যতে আল্লাহর যা ইচ্ছ হয়। হিন্দা ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বলল, বোন, এটা গোপন করার কী আছে। সত্যিই যদি তুমি যাও তাহলে পথে দরকার পড়ে এমন কোনো কিছু প্রয়োজন হলে রাখঢাক না করে বলে ফেলতে পার, আমি তোমার সেবার জন্য প্রস্তুত আছি।
হযরত যায়নাব রা. বলেন, হিন্দা যা বলেছিল, অন্তরের কথাই বলেছিল। অর্থাৎ, আমার যদি কোনো জিনিসের প্রয়োজন হতো, তাহলে অবশ্যই সে তা পূরণ করত; কিন্তু সে সময়ের অবস্থা চিন্তা করে আমি অস্বীকার করি।
সফরের প্রস্তুতি শেষ হলে যায়নাব রা.-এর দেবর কিনানা ইবনে রবী একটি উট এনে দাঁড় করাল। যায়নাব উটের ফিঠের হাওদায় উঠে বসলেন। আর কিনানা স্বীয় ধনুকটি কাঁধে ঝুলিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি হাতে নিয়ে দিনে দুপুরে উট হাঁকিয়ে মক্কা থেকে বের হলো। কুরাইশদের মধ্যে হই চই পড়ে গেল। তারা ধাওয়া করে মক্কার অদূরে 'জী-তুওয়া' উপত্যকায় তাদের দুইজনকে ধরে ফেলল। কিনানা কুরাইশদের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে কাঁধের ধনুকটি হাতে নিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, তোমাদের কেউ যায়নাবের নিকটে যাওয়ার চেষ্টা করলে তার সিনা হবে আমার তীরের লক্ষ্যস্থল। কিনানা ছিল একজন দক্ষ তীরন্দাজ। তার নিক্ষিপ্ত কোনো তীর সচরাচর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। তার এ হুমকি শুনে আবু সুফইয়ান ইবনে হারব তার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে বলল, 'ভাতিজা, তুমি যে তীরটি আমাদের দিকে তাক করে রেখেছ, তা একটু ফেরাও। আমরা তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।' কিনানা তীরটি নামিয়ে নিয়ে বলল, কী বলতে চান, বলে ফেলুন। আবু সুফইয়ান বলল, 'তোমার কাজটি ঠিক হয়নি। তুমি প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে মানুষের সামনে দিয়ে যায়নাবকে নিয়ে বের হয়েছ, আর আমরা বসে বসে তা দেখছি। গোটা আরববাসী জানে, বদরে আমাদের কী দুর্দশা ঘটেছে এবং যায়নাবের বাপ আমাদের কী সর্বনাশটাই না করেছে। তুমি যদি এভাবে প্রকাশ্যে তার মেয়েকে আমাদের নাকের ওপর দিয়ে নিয়ে যাও তাহলে সবাই আমাদের কাপুরুষ ভাববে এবং এ কাজটি আমাদের জন্য অপমান বলে বিবেচনা করবে। তুমি আজ যায়নাবকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কিছুদিন সে স্বামীর ঘরে থাকুক। এদিকে লোকেরা যখন বলতে শুরু করবে যে, আমরা যায়নাবকে মক্কা থেকে যেতে বাধা দিয়েছি, তখন একদিন গোপনে তাকে তার বাপের কাছে পৌছে দিয়ো।
তাবারানী উরওয়া ইবনে যুবাইর হতে বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি যায়নাব বিনতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে মক্কা থেকে বের হলে কুরাইশদের দুই ব্যক্তি পিছু ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলে। তারা যায়নাব রা.-এর সঙ্গী লোকটিকে কাবু করে যায়নাব রা.-কে উটের পিঠ থেকে ফেলে দেয়। তিনি একটি পাথরের ওপর ছিটকে পড়লে শরীর ফেটে রক্ত বের হয়ে যায়। এ অবস্থা তারা যায়নাব রা.-কে মক্কায় আবু সুফইয়ানের নিকট নিয়ে যায়। আবু সুফইয়ান তাকে বনী হাশিমের মেয়েদের কাছে সোপর্দ করে। পরে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। উঠের পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ায় তিনি যে আঘাত পান, আমরণ সেখানে ব্যথা অনুভব করতেন এবং সেই ব্যথায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। এজন্য তাকে শহীদ মনে করা হতো।
যেহেতু স্বামী-স্ত্রী দুইজনের মধ্যেকার সম্পর্ক অতি চমৎকার ছিল, এ কারণে হযরত যায়নাব রা. মদীনায় চলে যাওয়ার পর আবুল আস বেশির ভাগ সময় খুবই বিমর্ষ থাকতেন।
হিজরী ৮ম সনে উমামা বিনতে আবিল আস রা.-এর মা এবং দ্বাদশ সনে পিতা ইন্তেকাল করেন।
বিশ্বনবী নানার স্নেহছায়ায়
নানা হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশু উমামাকে অত্যধিক স্নেহ করতেন। সব সময় তাকে সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন। এমনকি নামাযের সময়ও কাছে রাখতেন। মাঝে মাঝে এমনও হতো যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কাঁধের ওপর বসিয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। রুকূতে যাওয়ার সময় কাঁধ থেকে নামিয়ে দিতেন। তারপর সিজদায় গিয়ে তাকে মাথার ওপর বসাতেন এবং সিজদা থেকে উঠার সময় কাঁধের ওপর নিয়ে আসতেন। এভাবে তিনি নামায শেষ করতেন। এ আচরণ দ্বারা উমামার প্রতি তার স্নেহের আধিক্য কিছুটা অনুমান করা যায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী হযরত আবু কাতাদা রা. বলেন, একদিন বেলাল আযান দেওয়ার পর আমরা যোহর, মতান্তরে আসরের নামাযের জন্য অপেক্ষায় আছি, এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমামা বিনতে আবিল আসকে কাঁধে বসিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযে দাঁড়ালেন এবং আমরাও তার পেছনে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলাম। উমামা তখনও তার নানার কাঁধে একইভাবে বসা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকূতে যাবার সময় তাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে রাখেন। রুকু-সিজদা শেষ করে যখন উঠে দাঁড়ালেন তখন আবার তাকে ধরে কাঁধের ওপর উঠিয়ে নেন। প্রত্যেক রাক'আতে এমনটি করে তিনি নামায শেষ করেন।
উমামার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্নেহের প্রবলতা আরেকটি ঘটনার দ্বারাও অনুমান করা যায়। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট মুক্তাখচিত স্বর্ণের একটি হার আসে। হারটি হাতে করে ঘরে এসে বেগমদের দেখিয়ে বলেন, দেখ তো, এটি কেমন? তারা সবাই বলেন, অতি চমৎকার! এর চেয়ে সুন্দর হার আমরা এর আগে আর দেখিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটি আমি আমার পরিবারের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি প্রিয় তার গলায় পরিয়ে দেব। আম্মাজান হযরত আয়েশা রা. মনে মনে ভাবলেন, না জানি তিনি এটা আমাকে না দিয়ে অন্য কোনো বেগমের গলায় পরিয়ে দেন কি না। অন্য বেগমগণও ধারণা করলেন, এটা হয়তো আয়েশা রা.-এর ভাগ্যেই জুটবে। এদিকে বালিকা উমামা তার নানা ও নানীদের অদূরেই মাটিতে খেলছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগিয়ে গিয়ে তার গলায় হারটি পরিয়ে দেন।
হযরত উমামা রা.-এর পিতা আবুল আস ইবনে রবী রা. হিজরী ১২ সনে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার মামাতো ভাই যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা.-এর সাথে উমামার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা বলে যান। এদিকে উমামার খালা হযরত ফাতিমা রা.ও ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্বামী আলীকে বলে যান, তার পরে তিনি যেন উমামাকে বিয়ে করেন। অতঃপর উমামার বিয়ের বয়স হলো। যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. হযরত ফাতিমার রা. অন্তিম ইচ্ছা পূরণের জন্য উদ্যোমী হলেন। তাঁরই মধ্যস্থতায় আলীর রা. সাথে উমামার রা. বিয়ে সম্পন্ন হলো। তখন আমীরুল মুমিনীন উমর রা.-এর খিলাফতকাল।
হিজরী ৪০ সন পর্যন্ত তিনি আলীর রা. সাথে বৈবাহিক জীবন-যাপন করেন। অবশেষে হিজরী ৪০ সনে তিনি আততায়ীর হাতে মারাত্মকভাবে আহত হন। এই আঘাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্ত্রী উমামাকে বলেন, আমার পরে যদি তুমি কোনো পুরুষের প্রয়োজন বোধ কর, তাহলে মুগীরা ইবনে নাওফালকে বিয়ে করতে পার। তিনি মুগীরাকেও বলে যান, তার মৃত্যুর পর তিনি যেন উমামাকে বিয়ে করেন।
এই মুগীরার স্ত্রী থাকা অবস্থায় মু'আবিয়ার রা. খিলাফতকালে তিনি ইন্তেকাল করেন। আলীর রা. ঘরে উমামা রা.-এর কোনো সন্তান হয়নি। তবে মুগীরা রা.-এর ঘরে তিনি এক ছেলের মা হন এবং তার নাম রাখেন ইয়াহইয়া। এ জন্য মুগীরা রা.-এর ডাকনাম হয় আবু ইয়াহইয়া।
তবে অনেকে বলেছেন, মুগীরার ঘরেও তিনি কোনো সন্তানের মা হননি। তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যাদের মধ্যে একমাত্র ফাতিমা রা. ছাড়া আর কারও বংশধারা অব্যাহত নেই। হতে পারে মুগীরার ঔরসে ইয়াহইয়া নামের এক সন্তানের জন্ম দেন।
অতঃপর হযরত উমামা রা.ও এক সময় সাড়া দেন মহান প্রভুর ডাকে। চলে যান নানা রাসূলুল্লাহ সা., নানী খাদীজা রা., মা যায়নাব রা. ও বাবা আবুল আস রা.-এর সান্নিধ্যে। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৫৫১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৪৬।
৫৫২. সুনান, আবু দাউদ, ১/২২২।
৫৫৩. তাবারী, ৩/১৩৬; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫২।
৫৫৪. আনসাবুল আশরাফ, ১/২৬৯।
৫৫৫. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫৩।
৫৫৬. আল-বিদায়া ওয়াননিহায়াহ, ৩/৩৩০; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫৪-৬৫৫।
৫৫৭. আনসাবুল আশরাফ: ১/৩৫৭, ৩৯৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা ২/২৪৭; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৬৫৭; হায়াতুস সাহাবাহ, ১/৩৭১।
৫৫৮. তারাজিমু সায়্যিদাতি বায়াতিন নুবুওয়াহ, ৫৩৬-৫৩৭।
৫৫৯. সুনান, নাসায়ী, ২/৪৫, ৩/১০; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৩২; আল ইসাবাহ, ৪/২৩৬।
৫৬০. আল ইসতিআব, ৪/২৩৮; উসুদুল গাবা, ৫/৪০০।
৫৬১. উসুদুল গাবাহ, ৫/৪০০।