📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 সুমাইয়া বিনতে খুবাত রা.

📄 সুমাইয়া বিনতে খুবাত রা.


ইসলামের প্রথম শহীদ

বিপদশঙ্কুল বৈরী পরিবেশে ধৈর্যধারণের অনন্য দীক্ষা দিয়ে গেছেন যেই মহীয়সী নারী, তিনি হলেন ইসলামের প্রথম শহীদ হযরত সুমাইয়া বিনতে খুব্বাত রা.। ইসলামের ইতিহাসে তার সম্মান ও মর্যাদা সুউচ্চ। এটা তো ধ্রুব সত্য যে, হযরত ইয়াসির এবং তার পরিবার জান্নাতের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী,
صَبْرًا إِلَ يَاسِرٍ ، فَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْجَنَّةُ
হে ইয়াসিরের পরিবার, ধৈর্য ধরো। নিশ্চয় তোমাদের ঠিকানা জান্নাত।

এ কথা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে কেবল সান্ত্বনাই দেননি; বরং তিনি এই বাস্তবতার ঘোষণা ও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন—যা তিনি জানতেন যে, ঘটনা নিশ্চিত এমনই হবে। প্রকৃতপক্ষে তা তিনি আপন অন্তঃকরণ ও নিজ চোখ দ্বারা অনুধাবন করেছিলেন।

হযরত আম্মার রা.-এর পিতা ইয়াসির ইয়ামানের মাজহাজ গোত্রের আনসী শাখার সন্তান। তবে তার ছেলে আম্মার মক্কার বনু মাখযুমের আযাদকৃত দাস। ইয়াসির তার দু'ভাই—হারিস ও মালিককে সঙ্গে নিয়ে তাদের নিখোঁজ চতুর্থ ভাইয়ের সন্ধানে মক্কায় আসেন। হারিস ও মালিক স্বদেশ ইয়ামানে ফিরে গেলেন; কিন্তু ইয়াসির মক্কায় থেকে যান। মক্কার রীতি অনুযায়ী তিনি আবু হুযায়ফা ইবনে মুগীরা মাখযুমীর সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে থাকেন। আবু হুজাইফা তার দাসী সুমাইয়াকে ইয়াসিরের সাথে বিয়ে দেন এবং তাদের ছেলে আম্মারের জন্ম হয়।৪৯২

আবু হুজাইফা আম্মারকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে নিজের সাথে রেখে দেন। যতদিন আবু হুজাইফা জীবিত ছিলেন আম্মার তার সাথেই ছিলেন। উল্লেখ্য যে, এই আবু হুজাইফা ছিলেন নরাধম আবু জাহলের চাচা।

হযরত সুমাইয়া রা. যখন বার্ধক্যে দুর্বল হয়ে পড়েছেন তখন মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা হয়। তিনি প্রথম ভাগেই স্বামী ইয়াসির ও ছেলে আম্মারসহ গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন। মক্কায় তাদের এমন কোনো আত্মীয়-বন্ধু ছিল না যারা তাদেরকে কুরাইশদের নিষ্ঠুরতার হাত থেকে বাঁচাতে পারত। এজন্য তারা তাদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালাতে কোনো রকম সংশয়বোধ করেনি।

আরবের আগুনঝরা মধ্যাহ্ন। ঊর্ধ্বাকাশ থেকে মরু-সূর্য যেন আগুন বৃষ্টি করছে। মরুর লু হাওয়া আগুনের দাব-দাহ নিয়ে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে চারদিক। এমনি সময় আগুন ঝরা মরুভূমির বুকে নির্যাতন চলছে এক নারীর ওপর—সুমাইয়ার ওপর। সুমাইয়ার নারী দেহ ভঙ্গুর, কিন্তু আত্মা তো অজেয়। বক্ষে তার বিশ্বাস-ঈমানের দুর্জয় শক্তি ও সাহস। সে প্রাণবহ্নি নির্বাপিত হবার মতো নয়।

সুমাইয়ার ওপর এ নির্যাতন কেন? কেন তাকে এই প্রখর মধ্যাহ্নে সূর্যের বহ্নিতলে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হচ্ছে? তাঁর অপরাধ—এক আল্লাহকে প্রভু হিসেবে স্বীকার করেছেন, যুগ যুগ ধরে পূজ্য লাত উজ্জা-হোবলদের বিরোধিতা করেছেন, তাঁর জীবন মৃত্যু-সাধনা সব কিছুই নিবেদন করেছেন আল্লাহর নামে। অমানুষিক নির্যাতনেও সুমাইয়া অচল অটল।

তাঁর দেহ নির্যাতন নিপীড়নে জর্জরিত হোক, তার কোমল দেহ পুড়ে ছাই হয়ে যাক, তবু অসত্যের কাছে, অত্যাচারের কাছে তাঁর অমর আত্মা কখনো নতি স্বীকার করবে না। এত কষ্ট দিয়েও শত্রুর মন টলল না।

ইমাম আহমাদ ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, প্রথম যারা ইসলামের ঘোষণা দান করেন, তাঁরা হলেন সাতজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর, আম্মার, আম্মারের মা সুমাইয়া, সুহাইব, বিলাল ও মিকদাদ রা.। আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার চাচার দ্বারা এবং আবু বকরকে তার গোত্রের দ্বারা নিরাপত্তা বিধান করেন। আর অন্যদেরকে মুশরিকরা লোহার বর্ম পরিয়ে প্রচণ্ড রোদে দাঁড় করিয়ে রাখত।৪৯৩

সেই সময়টাতে এই স্বামী-স্ত্রীর ইসলাম গ্রহণ ওই সকল পুণ্যাত্মাদের মতো ছিল যাদের আল্লাহর নেয়ামত-হেদায়াত দ্বারা পুরস্কৃত করা হয়েছিল। নতুন হেদায়াতপ্রাপ্ত পুণ্যাত্মারা কুরাইশের নানাবিধ কষ্ট-নির্যাতন ও অত্যাচারের স্টিমরোলারের সর্বোচ্চ মাত্রা সহ্য করেছেন।৪৯৪

কুরাইশরা মুমিনদের ওপর নিত্যনতুন ও অভিনব শাস্তির পাহাড় মাড়িয়ে চলেছে। ঈমান আনা ব্যক্তি যদি নিজ গোত্রের নেতা বা সম্মানিত শ্রেণির হতো, সেক্ষেত্রে কুরাইশরা শুধু তাদেরকে ধমক দিত এবং মন্দভাবে গালাগাল করত। এমন কোনো মর্যাদাবান মুমিন আবু জাহালের সামনে পড়লে আবু জাহাল বলত, তুমি নিজ বাপ-দাদার ধর্ম পরিত্যাগ করেছ, অথচ তারা তোমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। এখন তো আমরা তোমাকে নির্বোধ ও অজ্ঞই মনে করছি। তোমার মান-মর্যাদা আমরা ধূলিস্যাত করে দেব। তোমার ব্যবসা-বাণিজ্য, কায়-কারবার ধ্বংস করে দেব, তোমার ধন-সম্পদ নিঃশেষ করে ছাড়বো।

এরপর কুরাইশরা সেই সব মুমিনদের সাথে অবরোধের যুদ্ধ আরোপ করে দিতে থাকে। আর যদি মুমিনরা হয়ে থাকে মক্কার কোনো দুর্বল, দুঃস্থ বা গোলাম তথা ক্রীতদাস শ্রেণির লোক, তাহলে তাদেরকে পুড়িয়ে মারতেও কুণ্ঠাবোধ করত না কুরাইশরা। ইয়াসির পরিবার এই দ্বিতীয় শ্রেণিরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাদেরকে কঠিন শাস্তি ও নির্যাতনে নিঃশেষ করে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় বনু মাখযূমের ওপর। এরা সকলে মিলে ওই পরিবার তথা হযরত ইয়াসির রা., হযরত সুমাইয়া রা. ও হযরত আম্মার রা.-কে মক্কার উত্তপ্ত মরুভূমিতে নিয়ে যেত। সেখানে তাদের খুব নির্মমভাবে নির্যাতন করত।

শাস্তির এই নির্মমতার মধ্যে যা হযরত সুমাইয়া রা.-এর ললাটে যা জুটেছে, তা বড়ই হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী। আমরা সে ব্যাপারে আলোকপাত করব না। অত্যুক্তি ছাড়া শুধু এটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করছি যে, শহীদদের সরদার হযরত সুমাইয়া রা. সেদিন যেভাবে অটল ছিলেন, এতে তিনি মানবতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক কালজয়ী ও উপমারহিত ইতিহাসই সৃষ্টি করে গেছেন। সর্বকালের সর্বযুগের মুমিনদের হৃদয়ে তিনি এক মহাত্মা মা হিসেবে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন খবর পেতেন, অমুক স্থানে ইয়াসির পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তখন তিনি সেখানে যেতেন। এটা ওই সময়ের ঘটনা, যখন রাসূলের নিকট মক্কার কাফেরদের পক্ষ থেকে আপতিত শাস্তি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার মতো কোনো উপায়-উপকরণ ছিল না। এটা ছিল আল্লাহ তাআলারই অভিপ্রায়।

নতুন দ্বীন, অর্থাৎ ইবরাহীমের ভারসাম্যপূর্ণ মিল্লাত যার ঝাণ্ডা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তুলে ধরছেন; এটা তো সংস্কারের সাময়িক বা নির্দিষ্ট কোনো বিপ্লব নয়; বরং এটা ছিল বিশ্বমানবতার এক পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এক কালজয়ী ইতিহাস বিনির্মাণে মুমিনদের এমন কষ্ট-নির্যাতন ও ত্যাগ-বিসর্জনের বিকল্প ছিল না। তাদের আত্মদান ও অপরিসীম ত্যাগই সেই কংক্রিট যাঁর ওপর নির্মিত হয়েছে দ্বীনী ও আকীদার দৃঢ় ইমারত—কখনো যা টলবে না, হেলে পড়বে না।

এ সব ত্যাগ-তিতিক্ষা ওই সুগন্ধী যার সুবাসে মুমিনদের অন্তরে নিষ্ঠা ও ভালোবাসা চির জাগরূক রয়েছে। এটা ওই মিনার যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দ্বীনের প্রকৃত রূপ এবং এর সত্যতা ও মর্যাদার দিকে চিরদিন আহ্বান করে যাবে। এটা জরুরি ছিল যে, ইসলাম গ্রহণকারী ও পালনকারীরা তাদের দ্বীনের জন্য এমন ত্যাগ ও কুরবানীর পরাকাষ্ঠা দেখাবে যা ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। কুরআনে কারীমের অধিকাংশ আয়াতে এমন মর্মই বিবৃত হয়েছে। কুরআন বলছে,

أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ
মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? ৪৯৫

أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّبِرِينَ
তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো জানেননি তাদেরকে যারা তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদের। ৪৯৬

وَ لَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَ لَيَعْلَمَنَّ الْكَذِبِينَ
আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী। ৪৯৭

أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تُتْرَكُوا وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جُهَدُوا مِنْكُمْ وَلَمْ يَتَّخِذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَ لَا رَسُوْلِهِ وَ لَا الْمُؤْمِنِينَ وَلِيْجَةً وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে? অথচ এখনো আল্লাহ যাচাই করেননি যে, তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করেছে এবং কারা আল্লাহ, তার রাসূল ও মুমিনগণ ছাড়া কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেনি। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। ৪৯৮

مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَ مَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُّسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ فَأْمِنُوا بِاللَّهِ وَ رُسُلِهِ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ
আল্লাহ এমন নন যে, তিনি মুমিনদের (এমন অবস্থায়) ছেড়ে দেবেন যার ওপর তোমরা আছ। যতক্ষণ না তিনি পৃথক করবেন অপবিত্রকে পবিত্র থেকে। আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের গায়েব সম্পর্কে জানাবেন। তবে আল্লাহ তার রাসূলদের মধ্য থেকে যাকে চান বেছে নেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনো। আর যদি তোমরা ঈমান আনো এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপ্রতিদান। ৪৯৯

وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ
আর তোমাদের ওপর যে বিপদ এসেছিল দুই দল মুখোমুখি হওয়ার দিন তা আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি মুমিনদেরকে জেনে নেন। ৫০০

أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَ الَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَّا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
নাকি তোমরা ভেবেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো তোমাদের নিকট তাদের মতো কিছু আসেনি, যারা তোমাদের পূর্বে বিগত হয়েছে। তাদেরকে স্পর্শ করেছিল কষ্ট ও দুর্দশা এবং তারা কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তার সাথী মুমিনগণ বলছিল, 'কখন আল্লাহর সাহায্য (আসবে)'? জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী। ৫০১

আল্লাহু আকবার! কুরআন তার বাহক ও অনুসারীদের এটা শিখিয়েছে যে, ত্যাগই ঈমানের অলংকার। যুলুম, অন্যায় ও অত্যাচারের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া এমন একটি বিষয় যা ঈমানের ক্ষেত্রে ঈর্ষাযোগ্য মর্যাদার দাবি রাখে। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বোঝা যায়, কিছু কিছু কঠিন পরীক্ষা আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তি স্থাপন করে। কিছু আবার খুঁটি হিসেবে গেঁথে থাকে এবং একটি স্বতন্ত্র অবয়বে রূপ দেয়, ত্যাগ ও কুরবানীর পরকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করে। এই ঐতিহাসিক কীর্তির সামনে নিষ্ঠা আর আত্মসংশোধনের ওপর উৎসর্গিত একটি দল মনোনীত করা হয় যারা অনাগত মুমিনদের জন্য উন্নত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

উসমান রা. বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বাতহা উপত্যকায় হাঁটছিলাম। তখন দেখতে পেলাম, আম্মারের পিতা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে বলে ওঠেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ, কালচক্র এ রকম? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে ইয়াসিরের পরিবার-পরিজন! ধৈর্য ধরো। হে আল্লাহ, ইয়াসিরের পরিবারবর্গকে ক্ষমা করুন।৫০২

ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করে এসেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিদিন ইয়াসির পরিবারের সাহস ও ধৈর্যে উদ্দীপনা যোগাতে তাদের কাছে যেতেন। তাদেরকে যখন অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হতে দেখতেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুবই মর্মাহত হতেন। একদিন তিনি ওই খান্দানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হচ্ছে।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা শুনে বললেন,
صَبْرًا أَبَا الْيَقْظَانِ.. صَبْرًا اَل يَاسِرٍ ، فَإِنَّ مَوْعِدَكُم الجَنَّة
আবুল ইয়াকযান, ধৈর্যধারণ করো। হে ইয়াসির পরিবার, ধৈর্যধারণ করো। তোমাদের ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত।৫০৩

সারাদিন এভাবে শাস্তি ভোগ করার পর সন্ধ্যায় তারা মুক্তি পেতেন। শাস্তি ভোগ করে হযরত সুমায়্যা প্রতিদিনের মতো একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেন। পাষণ্ড আবু জাহেল তাকে অশালীন ভাষায় গালি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তার পশুত্বের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়। সে সুমায়্যার দিকে বর্শা ছুড়ে মারে এবং সেটি তার শরীরে গিয়ে বিদ্ধ হয়। আর তাতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।৫০৪

মায়ের এমন অসহায় মৃত্যুবরণে ছেলে আম্মারের দুঃখের অন্ত ছিল না। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, এখন তো যুলুম-অত্যাচার সীমাহীন হয়ে উঠেছে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিলেন। তারপর বললেন, 'হে আল্লাহ, তুমি ইয়াসিরের পরিবারের কাউকে জাহান্নামের আগুনের শাস্তি দিয়ো না।’৫০৫

হযরত সুমাইয়া রা.-এর শাহাদাতের ঘটনাটি হিজরতের পূর্বের। এ কারণে তিনিই হলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। হযরত মুজাহিদ রহ. বলেন, ইসলামের প্রথম শহীদ হলেন আম্মারের মা সুমাইয়া।৫০৬

হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. এবং তাদের পরিবারের বিভিন্ন কষ্ট-যন্ত্রণা ও নির্যাতনের কথা তার বন্ধুরা পরস্পর বলাবলি করতেন। আমর ইবনে হাকাম বলতেন, 'আম্মারকে এত ভয়ঙ্কর নির্যাতন করা হতো যে, সে বলতে পারত না সে কী বলছে।' আমর ইবনে মাইমূন বলতেন, 'একদিন মুশরিকরা আম্মারকে আগুনের অঙ্গারের ওপর শুইয়ে দিয়েছে। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি ব্যথিত চিত্তে আম্মারের মাথায় হাত রেখে বললেন,
يُنَارُ كُونِي بَرْدًا وَ سَلَمًا عَلَى عَمَّارٍ ، كَمَا كُنْتَ بَرْدًا وَ سَلَمَا عَلَى إِبْرَاهِيمَ
হে আগুন, ইব্রাহিমের মতো তুমি আম্মারের জন্য ঠাণ্ডা হয়ে যাও।

একদিন মুশরিকরা তাকে অনেকক্ষণ পানিতে ডুবিয়া রাখে। এতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ অবস্থায় শত্রুরা তার মুখ দিয়ে তাদের ইচ্ছেমতো স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। তিনি চেতনা ফিরে পেয়ে অনুশোচনায় জর্জরিত হতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, 'আম্মার, খবর কী?' আম্মার জবাব দিলেন, 'আজ আপনার শানে কিছু খারাপ এবং তাদের উপাস্যদের সম্পর্কে কিছু ভালো কথা না বলা পর্যন্ত আমি মুক্তি পাইনি।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার অন্তর কী বলছে?' আম্মার বললেন, 'আমার অন্তর ঈমানে পরিপূর্ণ।' প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত দরদের সাথে তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন, 'কোনো ক্ষতি নেই। এমন অবস্থার মুখোমুখি হলে আবারও এমনটি করবে।' তারপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করেন,
إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيْمَانِ
যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর কুফরী করে, তবে যাদেরকে বাধ্য করা হয় এবং তাদের অন্তর ঈমানের ওপর দৃঢ় (তাদের কোনো দোষ নেই)।৫০৭

হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে এ কথা শোনার পর অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করলেন। কাফেরদের নির্যাতনে আক্রান্ত শরীরের ক্ষতের কথা ভুলে যান এবং এ ব্যথার কোনো তোয়াক্কা করেন না।

আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়ে যান আম্মারের মা সুমাইয়ার ওপর। অনুগ্রহ বর্ষণ করুন ইসলামের প্রথম শহীদের প্রতি; সেই মহীয়সী নারীর ওপর যাঁর ছেলে আম্মার নামায পড়েছেন ইসলামের প্রথম মসজিদে। আল্লাহর শান্তি ও সন্তুষ্টি বর্ষিত হোক তার পরিবারের প্রতি। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৪৯২. আসহাবুর রাসূল, ৫২৩-৫২৪।
৪৯৩. আল বিদায়া ওয়াননিহায়া, ৩/২৮; আল ইসাবাহ, ৪/৩৩৫।
৪৯৪. আল ইসতিআব, ৪/৩২৪।
৪৯৫. সূরা আনকাবুত, ২৯:২।
৪৯৬. সূরা আল-ইমরান, ৩:১৪২।
৪৯৭. সূরা আনকাবুত, ২৯:৩।
৪৯৮. সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১৬।
৪৯৯. সূরা আল-ইমরান, ৩:১৭৯।
৫০০. সূরা আল-ইমরান, ৩:১৬৬।
৫০১. সূরা আল-বাকারা, ২:২১৪।
৫০২. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৩/১৭৭; কানযুল উম্মাল, ৭/৭২।
৫০৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৩/১১৮।
৫০৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৫/৫৯।
৫০৫. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৩১৯।
৫০৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/৫৯।
৫০৭. সূরা নাহল, ১৬:১০৬।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা.

📄 সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা.


রাসূলের দেহরক্ষীর মা ও মুশরিক হত্যাকারী প্রথম নারী

ইসলামী ইতিহাসের অসংখ্য রোমাঞ্চকর ঘটনাবলী পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মনে হয়, দ্বীনী-চেতনা যখন অন্তরের গভীরে দৃঢ়মূল হয়ে ওঠে এবং মৃত্যুর কোনো পরোয়া থাকে না, একমাত্র তখনই মানুষের মধ্যে অকুতোভয় অমিত শক্তিধর ব্যক্তিত্বের উন্মেষ ঘটে। তারা বীরত্বের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে জীবন ও জগতকে সূর্যাস্তের রক্তিম আভার মতো রাঙিয়ে পরম আশ্রয়ের সান্নিধ্যে পাড়ি জমায়।

মুমিনগণের হৃদয় থেকে কীভাবে বীরাঙ্গনার সৃষ্টি হয়, ইসলামের ইতিহাসে তার এক অত্যুজ্জ্বল চরিত্র হলেন হযরত সাফিয়্যা বিনতে আব্দুল মুত্তালিব রা.।

সব দিক থেকেই পরিপূর্ণ যিনি
হযরত সাফিয়্যা বিনতে আব্দুল মুত্তালিব রা. সব দিক দিয়েই সৌভাগ্যবতী একজন মহীয়সী নারী। মর্যাদা ও গৌরব তাকে বেষ্টন করে রেখেছিল। তাঁর পিতা হলেন আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম—যিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর সম্মানিত দাদা এবং কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট নেতা। তাঁর মাতা হচ্ছেন, হালাহ বিনতে ওয়াহাব—রাসূলুল্লাহ সা.-এর মাতা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের বোন। তাঁর প্রথম স্বামী হলেন বনী উমাইয়্যার বিশিষ্ট নেতা আবু সুফইয়ান ইবনে হারব রা.-এর ভাই হারিস ইবনে হারব। তিনি ইন্তেকাল করলে হযরত সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর দ্বিতীয় স্বামী হন আউয়াম ইবনে খুওয়াইলিদ যিনি জাহিলী যুগের নারীনেত্রী এবং ইসলামের প্রথম উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদের ভাই। তাঁর ছেলে যুবাইর ইবনুল আউয়াম—যিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাওয়ারী তথা দেহরক্ষী।

হযরত সাফিয়্যা রা. এমন ঘরে লালিত-পালিত হন, যে ঘরটি ছিল কুরাইশ নেতা আবদুল মুত্তালিবের বাসস্থান। বীরত্ব ও সাহসিকতাকে সম্বল করে বেড়ে ওঠেন তিনি। ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ ও সাহসী অশ্বারোহী।৫০৮ এদিকে তার সন্তান হলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর দেহরক্ষী হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.। একজন বীর যোদ্ধার অভ্যাস-প্রকৃতি তার সত্তার সঙ্গে মিশে ছিল। লড়াইয়ের ময়দানে যদি তাকে মাত্র একশ সাথী আর সৈনিক দিয়ে পাঠানো হয়, তাহলে তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে এমন তীব্রভাবে আক্রমণ চালাতেন, যেন রণাঙ্গনে তিনি একাই লড়াই করছেন। বিজয় আর নুসরাত যেন তার একার ওপরই ন্যস্ত। এমন দায়িত্বশীলতা আর ওফাদারির সাথে তিনি জিহাদ করতেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর ছিল গভীর হৃদ্যতা ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এ বাক্যে সুসংবাদ জানিয়েছেন,
إِنَّ لِكُلِّ نَبِي حَوَارِيًّا ، وَإِنَّ حَوَارِيَّ الزُّبَيْرُ بْنُ العَوَّامِ
প্রত্যেক নবীর জন্য হাওয়ারী তথা সার্বক্ষণিক সহচর থাকে, আমার হাওয়ারী হচ্ছে যুবাইর ইবনুল আউয়াম।

হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর মা হযরত সাফিয়্যা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু। সুতরাং যুবাইর ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফাতো ভাই। অন্যদিকে হযরত সিদ্দীকে আকবরের কন্যা হযরত আসমাকে বিয়ে করায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন তার ভায়রা। হযরত আসমা রা. ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর বোন। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন অনুপম নিষ্ঠাবান, অদম্য শক্তিশালী ও সাগরের মতো বিশাল মনের অধিকারী। নিজের ধন-সম্পদ, জান-মাল আল্লাহর জন্য উৎসর্গকারী মুমিন। তার দানশীলতা ও বদান্যতা ছিল দু-টি দ্রুতগামী ঘোড়ার মতো।

হযরত সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা. ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর ফুফু এবং আল্লাহর সিংহ হযরত হামযা রা.-এর আপন বোন। তার বীরত্ব ও সাহসিকতার বেশ কিছু অংশও জুটেছে তার ললাটে।৫০৯ তাঁর জীবন গঠনের শুরুর দিকে আমরা দেখতে পাই, হযরত সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর স্বামী আল আউয়াম ইবনে খুওয়াইলিদ যখন মারা গেলেন, তার জন্য রেখে গেলেন একটি ছোট্ট শিশু। সেই শিশুপুত্র যুবাইরকে তিনি কঠোরতা ও কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে লালন-পালন করেন। তাকে অশ্ব পরিচালনা এবং যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী করে তুলেন। তার খেলা ও খেলনার কৌতূহলকে তিনি তীর, ধনুক আর বর্শার দিকে ঝুঁকিয়েছিলেন। সকল ভয় ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির দিকে তিনি তাকে ঠেলে দিতেন। ঝুঁকি নিতে উৎসাহ জোগাতেন। যখনই দেখতেন ভয়ে পিছপা হয়েছে কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তখন তাকে ভীষণ প্রহার করতেন। যে কারণে তাকে অভিযুক্ত করে পুত্রের চাচারা বলতেন, 'এটা তো কঠিন ও রূঢ় আচরণ। মমতাময়ী মায়ের শাসন এমন হতে পারে না।' হযরত সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা. তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করে বলতেন,
من قال قد ابغضته فقد كذب
وانما اضربه لكي يلب
و يهزم الجيش وياتي بالسلب
যে বলে তাকে প্রহার করে রাগ ঝেড়েছি, সে মিথ্যা বলে। অকর্মণ্য ও আলস্য ছেড়ে সে বিচক্ষণ হবে, সে লক্ষ্যেই তাকে মায়ের শাসন করেছি। যাতে সে শত্রুকে হারাতে পারে এবং লুণ্ঠিত মাল ফিরিয়ে আনতে পারে নিজ শক্তিতে।৫১০

নিকটাত্মীয়দের হুঁশিয়ার করুন
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তাআলা কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল করলেন, 'আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করে দিন,' (সূরা শুআরা, ২৬:২১৪), তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়ালেন এবং বললেন, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়, কিংবা অনুরূপ শব্দ বললেন, তোমরা আত্মরক্ষা করো। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোনো উপকার করতে পারব না। হে বনু আব্দে মানাফ, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোনো উপকার করতে পারব না। হে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না। হে সাফিয়্যাহ, আল্লাহর রাসূলের ফুফু, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না। হে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ, আমার ধন-সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না।৫১১

এই ঘোষণার সাথে সাথেই হযরত সাফিয়্যা রা.-এর অন্তরে জ্বলে উঠে ইসলামের আলো। তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। তার ছেলে যুবাইরও অগ্রবর্তী মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। ফলে তাদেরকেও ভোগ করতে হলো কুরাইশের চাপানো নির্যাতন, দুর্ভোগ আর বাড়াবাড়ির কষ্ট—যা সহ্য করেছিলেন প্রাথমিক ও অগ্রগামী সকল মুসলিম। ফলে আল্লাহ তাআলা যখন তার নবীকে এবং তার সঙ্গী মুমিনদেরকে মদীনায় হিজরতের অনুমতি দিলেন, এই মহীয়সী হাশিমী নারী মক্কায় নিজের বহুমুখী গৌরব ও সুকীর্তির সকল স্মৃতি ফেলে রওনা হলেন মদীনার অভিমুখে। আল্লাহ ও রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে দ্বীন রক্ষার স্বার্থে হিজরত করলেন মদীনায়। এমন সময়ে এই মহীয়সী অতিক্রম করছিলেন জীবনের প্রায় ষাট বছর।

উহুদের অনন্য বীরত্ব
জিহাদের বিভিন্ন ময়দানে তার রয়েছে এমন কিছু অবস্থান—ইতিহাস যার আলোচনা আজও অব্যাহত রেখেছে প্রশংসা ও মুগ্ধতায় পঞ্চমুখ হয়ে। উহুদ যুদ্ধেও হযরত সাফিয়্যা অংশগ্রহণ করেন এবং সাহসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলমানরা কুরাইশ বাহিনীর আক্রমণে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং পালাতে থাকে। তখন মূলত এক রকম পরাজয়ই ঘটে গিয়েছিল। তখন হযরত সাফিয়্যা রা. হাতে একটি বর্শা নিয়ে রণক্ষেত্র থেকে পলায়নপর সৈনিকদের যাকে সামনে পাচ্ছিলেন, পেটাচ্ছিলেন, আর উত্তেজিত কণ্ঠে বলছিলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ফেলে পালাচ্ছ? এ অবস্থা তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টিতে পড়েন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবাইরকে বলেন, তিনি যেন হামযার লাশ দেখতে না পান। কারণ, কুরাইশরা লাশের সাথে অমানবিক আচরণ করে। কেটে-কুটে তারা লাশ বিকৃত করে ফেলে। ভাইয়ের লাশের এমন বিভৎস অবস্থা দেখে তিনি ধৈর্যহারা হয়ে পড়তে পারেন, এমন চিন্তা করেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবাইরকে এ নির্দেশ দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ মতো যুবাইর রা. মার নিকট এসে বলেন, মা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে ফিরে যাবার জন্য বলেছেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি জেনেছি, আমার ভাইয়ের লাশ বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। আল্লাহ জানেন, আমার ভাইয়ের লাশের সাথে এমন আচরণ আমার মোটেও পছন্দ নয়, তবুও আমি অবশ্যই ধৈর্যধারণ করব। ইনশাআল্লাহ নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখবো। মায়ের এসব কথা যুবাইর রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালেন। তারপর তিনি সাফিয়্যা রা.-কে ভাইয়ের লাশের কাছে যাবার অনুমতি দান করেন। হযরত সাফিয়্যা ভাইয়ের লাশের নিকট যান এবং দেহের টুকরো টুকরো অংশগুলি দেখেন। নিজেকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখেন। মুখে শুধু (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) উচ্চারণ করে তার মাগফিরাত কামনা করে দুআ করতে থাকেন। তিনি চলে যাবার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হামযার রা. লাশ দাফনের নির্দেশ দান করেন।৫১২

এটা ছিল উহুদের ময়দানে সাফিয়্যা রা.-এর অবস্থান। এদিকে খন্দকের যুদ্ধে তার অবস্থান-সে তো বীরত্বের কাহিনী! এ কাহিনীর পরতে পরতে তার বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা প্রস্ফুটিত হয়েছে, প্রকাশিত হয়েছে তার সাহসিকতা ও দৃঢ় সংকল্প।

খন্দকে ঐতিহাসিক কীর্তি
খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেদের স্ত্রীদের, ফুফুদের এবং একদল মুসলিম স্ত্রীদেরকে রেখে গেলেন হাসসান ইবনে সাবিতের মীরাসসূত্রে প্রাপ্ত দুর্গে, এটিই ছিল মদীনার সর্বাধিক সুরক্ষিত দুর্গ।

মুসলমানরা যখন খন্দকের আশপাশে কুরাইশ ও তার মিত্রদের মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করছিলেন, নারী ও শিশুদের শত্রুর আক্রমণ নিয়ে ভাবার সুযোগ যখন তাদের ছিল না। সাফিয়্যা রা. তখন ফজরের অন্ধকারে একটি ছায়ামূর্তির নড়াচড়া দেখতে পেলেন। কান পেতে সেদিকে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন এক ইহুদী দুর্গের দিকে এগিয়ে আসছে এবং দুর্গের চারপাশে সন্দেহজনক দৃষ্টি দিচ্ছে। আড়ি পেতে জানতে চাচ্ছে কারা রয়েছে এর ভেতরে।

তিনি বুঝে ফেললেন, নিশ্চয়ই তার গোত্রের কোনো গুপ্তচর সে। জানতে এসেছে—এখানে আক্রমণ প্রতিরোধকারী পুরুষ মানুষ আছে, না শুধুই নারী আর শিশু এখানে অবস্থান করছে?

তিনি মনে মনে ভাবলেন, বনী কুরাইযার ইহুদীরা রাসূলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে কৃত চুক্তি ভেঙে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশ ও মিত্রদের সাহায্য করছে। আর এ মুহূর্তে আমাদের ওপর ওরা কোনো আক্রমণ করলে তা ঠেকানোর জন্য কোনো একজন মুসলিম পুরুষ আমাদের পাশে নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সঙ্গীরা রয়েছেন শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানে। এ অবস্থায় আল্লাহর ওই দুশমন যদি আমাদের প্রকৃত পরিস্থিতির খবর তাদের গোত্রের কাছে পৌঁছাতে সফল হয়, তাহলে ইহুদীরা নারীদের বন্দী করবে এবং শিশুদের দাস-দাসী বানিয়ে ছাড়বে। সেটা মুসলমানদের জন্য ভয়াবহ বিপদ ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

এ সব ভেবে তিনি নিজের ওড়না মাথায় জড়ালেন। কোমরে শক্ত করে গামছা বেঁধে কাঁধে তুলে নিলেন একটি লৌহখণ্ড। নেমে এলেন দুর্গের প্রধান ফটকের কাছে। খুব ধীরে ও সাবধানে সেখানে তৈরি করলেন একটি ছিদ্র। সেই ছিদ্রপথ দিয়েই আল্লাহর দুশমনকে নিরীক্ষণ করতে থাকলেন সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টিতে। এক সময় তিনি লোকটির অবস্থান দেখে নিশ্চিত হলেন এবার তার ওপর আক্রমণ চালানো সম্ভব। নিশ্চিত হয়েই চালিয়ে দিলেন চরম হামলা। সর্বশক্তি দিয়ে লৌহদণ্ডের আঘাত হানলেন তার মাথায়। এমন ভয়াবহ আঘাত সহ্য করা ছিল অসম্ভব। তৎক্ষণাৎ লোক ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কাল বিলম্ব না করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আঘাত হেনে তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিলেন হযরত সাফিয়্যা রা.।

প্রাণহীন নিথর দেহের কাছে দ্রুত নেমে এলেন। নিজের সঙ্গে রাখা ছুরি দিয়ে মাথা কেটে দেহ থেকে আলাদা করে ফেললেন। দুর্গের উঁচুস্থান থেকে ছুঁড়ে মারলেন নিচের দিকে। ঢাল বেয়ে সেটা গড়াতে গড়াতে গিয়ে থামল সেই ইহুদীদের সামনে যারা ওই সঙ্গীর সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষা করছিল।৫১৩

ইহুদীর কর্তিত মস্তক দেখে তারা পরস্পর বলাবলি করতে থাকল, আরে! এটা তো আমরা নিশ্চিতরূপেই জানতাম যে, মুহাম্মাদ কখনোই নারী ও শিশুদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা না করে যাবার মানুষ নয়! এখন তো নিজের চোখেই দেখলাম! এ সব বলতে বলতে তারা নিজেদের গন্তব্যের দিকে ফিরে গেল।

এভাবেই ইতিহাস তার সোনালী পাতায় উজ্জ্বল অক্ষরে লিখে রেখেছে। 'সাফিয়্যা বিনতে আবদিল মুত্তালিব ছিলেন প্রথম সেই নারী—যিনি ইসলাম ধর্মে একজন মুশরিককে হত্যা করেছেন।'

রাসূলের ইন্তেকাল
হযরত সাফিয়্যা রা. এভাবেই অসীম বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে রাসূলের সঙ্গে বিভিন্ন জিহাদের অংশ নিতেন। তার কাছ থেকে দ্বীন শিখতেন; কিন্তু একসময় প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দেন। এই দুঃখজনক সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল, মদীনার চতুর্দিক যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। আনাস রা. বলেন, আমি ওইদিনের মতো উত্তম ও উজ্জ্বল আর কোনো দিন দেখিনি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট শুভাগমন করেছিলেন। আর আমি ওই দিনের মতো দুঃখজনক ও অন্ধকার দিন আর পাইনি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন।৫১৪

অন্তিম সময়
রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পর হযরত সাফিয়্যা রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর দেখানো পথে জীবনযাপন করতে থাকেন। তিনি ছিলেন প্রভুর ইবাদতকারিণী। সব সময় তিনি রোযা রাখতেন এবং আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করতেন। এক সময় তিনিও সাড়া দেন মহান প্রভুর ডাকে। মহান দয়ালু প্রভুর এমন জান্নাতে চলে যান যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তর যা কল্পনাও করতে পারেনি।

২০ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। জান্নাতুল বাকীতে প্রায় সত্তর বছর বয়সে তিনি পরপারে পাড়ি জমান।৫১৫

আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হোন সাফিয়্যা বিনতে আবদিল মুত্তালিবের প্রতি। তিনি ছিলেন মুসলিম নারীদের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একাই করেছেন সন্তানের লালন-পালন, তবুও তাকে গড়ে তুলেছিলেন আদর্শরূপে। আপন ভাইয়ের ভয়াবহ শাহাদাতের বিপদে আক্রান্ত হয়েছেন, সেখানে তিনি দেখিয়েছেন ধৈর্যের পরম পরাকাষ্ঠা। কষ্ট-ক্লেশের ধকল বয়ে গেছে তার ওপর দিয়ে, তবুও তার মাঝে পাওয়া গেছে এক দৃঢ়সংকল্প, বিচক্ষণ ও সাহসী নারীর স্বরূপ। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৫০৮. সুয়ারুম মিন সিয়ারিস সাহাবিয়াত, ২৮৩।
৫০৯. ঊদাতুল হিজাব, ১৯৯-২০০।
৫১০. সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ, ২৩।
৫১১. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৭৫৩; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২০৪; সুনান, তিরমিযী, হাদীস নং ৩১৮৫।
৫১২. আর রাউযুল উনফ, ৩/১৭২।
৫১৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৭।
৫১৪. সুনান, তিরমিযী: ১৩/১০৪-১০৫।
৫১৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২৭১।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 আতিকা বিনতে যায়িদ রা.

📄 আতিকা বিনতে যায়িদ রা.


যে ব্যক্তি শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে সে যেন আতিকা বিনতে যায়েদকে বিয়ে করে

তাঁর সম্পর্কে মদীনাবাসী বলত, ‘যে ব্যক্তি শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে সে যেন আতিকা বিনতে যায়েদকে বিয়ে করে।’ তিনি যখন আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর রা.-এর ঘরে ছিলেন তখন আবদুল্লাহ শাহাদাতবরণ করেন। এরপর হযরত উমর রা.-এর স্ত্রী হিসেবে তার ঘরে গেলে তিনিও শহীদ হন। পরবর্তী সময়ে তিনি হযরত যুবাইর রা.-এর ঘরণী হন এবং যুবাইর রা.ও শাহাদাতের অমীয় সুধা পানে ধন্য হন।

তিনি এমন এক মহীয়সী সাহাবিয়া যাঁর ভেতর সমাবেশ ঘটেছিল অজস্র গুণ ও গৌরবের—আমাদের কলম যার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিতে অক্ষম।

তিনি হযরত সাঈদ ইবনে যায়িদ রা.-এর বোন—যিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত মহান দশ সাহাবীর অন্যতম সদস্য।
তাঁর মা হচ্ছেন কুরাইয বিনতুল হাযরামী।

তাঁর মামা হচ্ছেন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আলা ইবনুল হাযরামী রা.। যাঁর সম্পর্কে হযরত আনাস রা. বলেন, হযরত উমর রা. একদল সৈন্য প্রস্তুত করে আলা ইবনুল হাযরামীকে তাদের অধিনায়ক মনোনীত করলেন। আনাস বলেন, আমি তার সাথে তার (সেই) যুদ্ধাভিযানে ছিলাম। আমরা নির্ধারিত যুদ্ধক্ষেত্রে এসে দেখলাম, শত্রুরা আমাদের পূর্বেই সেখানে পৌঁছে পানির উৎসের নিদর্শনসমূহ নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। আর তখন ছিল প্রচণ্ড গরমের দিন। এদিকে আমরা তীব্র পিপাসায় কাহিল হয়ে পড়লাম। আমাদের পশুপালেরও একই অবস্থা। উল্লেখ্য, সেদিন ছিল জুমআর দিন। এরপর সূর্য যখন ঢলে পড়ল, তখন তিনি আমাদের নিয়ে দু-রাকাআত নামায পড়লেন। তারপর আসমানের দিকে হাত প্রসারিত করলেন। অথচ এ সময় আকাশে মেঘের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত ছিল না। আনাস রা. বলেন, তার হাত নামাতে না নামাতেই আল্লাহ বায়ু পাঠালেন এবং মেঘ সৃষ্টি করলেন। এরপর সেই মেঘ বর্ষণ করে গর্ত ও গিরিখাদসমূহ ভরে ফেলল। তখন আমরা পান করলাম, আমাদের পশুপালকে পান করালাম এবং পান করার জন্য পানি সংগ্রহ করে নিলাম।

এরপর আমরা শত্রুর পিছু নিলাম। এদিকে তারা সাগরের একটি খাড়ি পার হয়ে এক দ্বীপে পৌঁছে। আমাদেরকে নিয়ে খাড়ির পাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি দুআ করলেন, হে সুউচ্চ, হে সুমহান, হে সহনশীল, হে মহানুভব! তারপর আমাদের বললেন, 'আল্লাহর নামে অগ্রসর হও।' আনাস রা. বলেন, তখন আমরা অগ্রসর হয়ে পানি অতিক্রম করতে লাগলাম; কিন্তু পানি আমাদের বাহনের খুরও সিক্ত করল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা শত্রুদের নাগালে পেলাম। তখন আমরা অনেককে হত্যা করলাম এবং অনেক যোদ্ধা ও নারী শিশুদের বন্দী করলাম। তারপর আমরা সেই খাড়ি পাড়ে এসে উপস্থিত হলাম। আর তিনি তার পূর্বের কথার ন্যায় বললেন। এবারও আমরা তা পার হলাম, কিন্তু পানি আমাদের বাহনসমূহের পায়ের খুর ভেজালো না। আনাস রা. বলেন, এর কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হলো। তখন আমরা তার জন্যে কবর খুঁড়ে তাকে গোসল করালাম এবং দাফন করলাম। তার দাফন সম্পন্ন করার পর এক ব্যক্তি এসে বলল, ইনি (মৃত্যুবরণকারী) কে? আমরা বললাম, ইনি সর্বোত্তম মানুষ। ইনি হলেন ইবনুল হাযরামী রা.। তখন সে বলল, এই ভূখণ্ড মৃতদেহ উদগীরণ করে দেয়। তোমরা যদি পার তাহলে বহন করে এক বা দুই মাইল দূরে মৃতদেহ গ্রহণকারী ভূখণ্ডে নিয়ে যাও। আমরা তখন বললাম, আমরা আমাদের এই পুণ্যবান সঙ্গীকে হিংস্র প্রাণীদের খোরাক হওয়ার জন্য এখানে এ অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারি না।

আনাস রা. বলেন, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কবর খুঁড়তে লাগলাম। এরপর আমরা যখন তার কবরের অভ্যন্তরে পৌঁছলাম, তখন দেখলাম, আমাদের সঙ্গী সেখানে নেই আর কবরের অভ্যন্তরে দৃষ্টিসীমানা পর্যন্ত আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে আছে। আনাস রা. বলেন, তখন আমরা কবরে আবার মাটি চাপা দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলাম।৫১৬

এই মহান সাহাবীই হচ্ছেন হযরত আতিকা বিনতে যায়িদ রা.-এর মামা।

তাঁর খালা হচ্ছেন উসবা বিনতুল হাযরামী। যিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত মহান দশ সাহাবীর অন্যতম সদস্য হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা.-এর সম্মানিতা আম্মাজান।

আতিকা বিনতে যায়িদ রা.-এর প্রথম স্বামী হচ্ছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা.। যিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবী ও প্রথম আশারায়ে মুবাশশারার সন্তান।

প্রথম স্বামীর ইন্তেকালে পর আতিকা বিনতে যায়িদ রা. স্বামী হিসেবে বরণ করে নেন হযরত উমর রা.-কে। তিনিও আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম সদস্য ও ইসলামের মহান দ্বিতীয় খলীফা।

হযরত উমর রা.-এর ইন্তেকালের পর আতিকা বিনতে যায়িদ রা. হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর স্ত্রীত্বে আসেন। তিনিও আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম সদস্য।

কুরাইশ নারীদের মাঝে হযরত আতিকা বিনতে যায়িদ রা. একজন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও বাগ্মীরূপে প্রসিদ্ধ ছিলেন। রূপে-গুণে ছিলেন অদ্বিতীয়া। এক কথায় একজন নারীর জন্য যত ভালো গুণ থাকতে পারে তার সব কিছুরই সমাবেশ ঘটেছিল হযরত আতিকা বিনতে যায়িদ রা.-এর ক্ষেত্রে।

যেমন বৃক্ষ তেমন ফল
আতিকা বিনতে যায়িদ রা. পিতা যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়িল ছিলেন জাহিলী যুগের মক্কার মুষ্টিমেয় সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের একজন—যাঁরা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেই শিরক ও পৌত্তলিকতা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখেন, সব রকম পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকেন। এমনকি মুশরিকদের হাতে যবেহ করা জন্তুর গোশতও পরিহার করতেন। একবার নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বে ‘বালদাহ’ উপত্যকায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে খাবার আনা হলে তিনি খেতে অস্বীকৃতি জানান। যায়িদকে খাওয়ার অনুরোধ করা হলে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদেরকে বলেন, ‘তোমাদের দেব-দেবীর নামে যবেহকৃত পশুর গোশত আমি খাই না।’

এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত যে, ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বে একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কার নিম্নাঞ্চলে 'বালদা' নামক স্থানে যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েলের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মুখে খাবার-ভর্তি একটি বড় পাত্র পেশ করা হলো। তিনি তা থেকে কিছু খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। এরপর যায়িদ রা. বললেন, আমিও ওই সব জন্তুর গোশত খাই না যা তোমরা তোমাদের দেব-দেবীর নামে জবাই কর। আল্লাহর নামে জবাইকৃত ব্যতীত অন্যের নামে যবাই করা জন্তর গোশত আমি খাই না। যায়িদ ইবনে আমর কুরাইশের যবাইকৃত জন্তু সম্পর্কে তাদের ওপর দোষারোপ করতেন এবং বলতেন, বকরীকে সৃষ্টি করলেন আল্লাহ, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করলেন। ভূমি থেকে উৎপন্ন করলেন তৃণলতা, অথচ তোমরা আল্লাহ তাআলার দানসমূহ অস্বীকার করে প্রতিমার প্রতি সম্মান করে আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করছ।'

জাহিলী যুগে সাধারণত কন্যা সন্তান জীবন্ত দাফন করা হতো। কোথাও কোনো কন্যা সন্তান হত্যা বা দাফন করা হচ্ছে শুনতে পেলে যায়িদ তার অভিভাবকের কাছে চলে যেতেন এবং সন্তানটিকে নিজ দায়িত্বে নিয়ে নিতেন। তারপর সে বড় হলে তার পিতার কাছে নিয়ে গিয়ে বলতেন, ইচ্ছে করলে এখন তুমি নিজ দায়িত্বে নিতে পার অথবা আমার দায়িত্বে ছেড়ে দিতে পার।৫১৭

কুরাইশরা তাদের কোনো একটি উৎসব পালন করছে। মানুষের ভিড় থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়িল তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি দেখছে পুরুষেরা তাদের মাথায় বেঁধেছে দামী রেশমী পাগড়ী, গায়ে জড়িয়েছে মূল্যবান ইয়ামেনী চাদর। সবাই অনেকগুলো ছাগল মূল্যবান সাজে সুসজ্জিত করে হাঁকিয়ে নিয়ে চলেছে তাদের দেব-দেবীর সামনে বলি দেওয়ার জন্য।

তিনি কাবার দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, 'কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, এই ছাগলগুলো সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তাআলা। তিনিই আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে তাদের পান করান, যমীনে ঘাস সৃষ্টি করে তাদের আহার দান করেন। আর তোমরা অন্যের নামে সেগুলো জবাই কর? আমি তোমাদেরকে একটি মূর্খ সম্প্রদায়রূপে দেখতে পাচ্ছি।

এ কথা শুনে তার চাচা ও উমর ইবনুল খাত্তাবের পিতা আল খাত্তাব উঠে দাঁড়িয়ে তার গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলল, তোর সর্বনাশ হোক! সব সময় আমরা তোর মুখ থেকে এ ধরনের বাজে কথা শুনে সহ্য করে আসছি। এখন আমাদের সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেছে। তারপর তার গোত্রের বোকা লোকদের উত্তেজিত করে তুলল তাকে কষ্ট দিয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত করে তুলতে। অবশেষে তিনি বাধ্য হলেন মক্কা ছেড়ে হেরা পর্বতে আশ্রয় নিতে। তাতেও তারা ক্ষান্ত হলো না। গোপনেও যাতে তিনি মক্কায় প্রবেশ করতে না পারেন, সেদিকে সর্বক্ষণ দৃষ্টি রাখার জন্য একদল কুরাইশ যুবককে সে নিয়োগ করে রাখা হলো।

অতঃপর যায়িদ ইবনে আমর কুরাইশদের অগোচরে ওয়ারাকা ইবনে নাওফিল, আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসমান ইবনুল হারিস এবং মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহর ফুফু উমাইমা বিনতু আবদিল মুত্তালিবের সাথে গোপনে মিলিত হলেন। আরববাসী যে চরম গোরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত সে ব্যাপারে তিনি তাদের সাথে মতবিনিময় করলেন। যায়িদ তাদেরকে বললেন, 'আল্লাহর কসম! আপনারা জেনে রাখুন, আপনাদের এ জাতি কোনো ভিত্তির ওপর নেই। তারা দ্বীনে ইবরাহীমকে বিকৃত করে ফেলেছে, তার বিরুদ্ধাচরণ করে চলছে। আপনারা যদি মুক্তি চান, নিজেদের জন্য একটি দ্বীন অনুসন্ধান করুন।'

অতঃপর এ চার ব্যক্তি ইহুদী, নাসারা ও অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুদের নিকট গেলেন দ্বীনে ইবরাহীম তথা দ্বীনে হানীফ সম্পর্কে জানার জন্য। ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল খৃস্ট ধর্ম অবলম্বন করলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও উসমান ইবনুল হারিস কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলেন না। আর যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়িলের জীবনে ঘটে গেল এক চমকপ্রদ ঘটনা।

ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, যায়িদ ইবনে আমর তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত দ্বীনের তালাশে সিরিয়ায় গমন করলেন। সে সময় একজন ইহুদী আলেমের সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। তিনি তার নিকট তাদের দ্বীন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন এবং বললেন, 'হয়ত আমি তোমাদের দ্বীনের অনুসারী হব, আমাকে সে সম্পর্কে অবহিত কর।' তিনি বললেন, 'তুমি আমাদের দ্বীন গ্রহণ করবে না। গ্রহণ করলে যে পরিমাণ গ্রহণ করবে, সে পরিমাণ আল্লাহর গযব তোমার ওপর আপতিত হবে।' যায়িদ বললেন, 'আমি তো আল্লাহর গযব থেকে পালিয়ে এসেছি। আল্লাহর সামান্যতম গযবকেও আমি বহন করব না। আর আমি কি তা বহনের শক্তি-সামর্থ্য আছে? তুমি কি আমাকে এ ছাড়া অন্য কোনো পথের সন্ধান দিতে পার?' সে বলল, 'আমি তা জানি না। তবে তুমি দ্বীনে হানীফ গ্রহণ করে নাও।' যায়িদ জিজ্ঞাসা করলেন, '(দ্বীনে) হানীফ কী?' সে বলল, 'তা হলো ইবরাহীম আ.-এর দ্বীন। তিনি ইহুদীও ছিলেন না নাসারাও ছিলেন না। তিনি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করতেন না।'

তখন যায়িদ বের হলেন এবং তার সাথে একজন খ্রিস্টান আলিমের সাক্ষাৎ হলো। ইহুদী আলিমের নিকট ইতোপূর্বে তিনি যা যা বলেছিলেন, তার কাছেও তা বললেন। তিনি বললেন, 'তুমি আমাদের দ্বীন গ্রহণ করবে না। গ্রহণ করলে যে পরিমাণ গ্রহণ করবে, সে পরিমাণ আল্লাহর লানত তোমার ওপর আপতিত হবে।'

যায়েদ রা. বললেন, 'আমি তো আল্লাহর লানত থেকে পালিয়ে এসেছি এবং আমি আল্লাহর লানত ও গযবের সামান্যতম অংশ বহন করতে রাজি নই। আর আমি কি তা বহনের শক্তি রাখি? তুমি কি আমাকে এ ছাড়া অন্য কোনো পথের সন্ধান দেবে?' সে বলল, 'আমি অন্য কিছু জানি না। শুধু এটুকু বলতে পারি যে, তুমি দ্বীনে হানীফ গ্রহণ কর।' তিনি বললেন, 'হানীফ কী?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তা হলো ইবরাহীম আ.-এর দ্বীন। তিনি ইহুদীও ছিলেন না, খ্রিস্টানও ছিলেন না। তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত করতেন না।' যায়িদ যখন ইবরাহীম আ. সম্পর্কে তাদের মন্তব্য জানতে পারলেন, তখন তিনি দু-হাত উঠিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ, আমি তোমাকে সাক্ষী রেখে বলছি আমি দ্বীনে ইবরাহীম আ.-এর ওপর আছি।'

সুতরাং বোঝা গেল, আতিকা বিনতে যায়িদ রা.-এর বাবা যায়িদ ছিলেন হানীফ ঘরানার লোক। যারা তাদের বিবেকের তাড়নায় নীতিহীনতার পথ থেকে বিরত থেকেছেন। দেব-দেবীকে প্রণাম করেননি কোনো দিন। সমকালীন জাহেলিয়াতের প্রভাব থেকে তিনি নিজেকে রক্ষা করেছেন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।

হযরত আতিকা রা.-এর পিতা যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল ছুটে চললেন মহা সত্যের সন্ধানে। তিনি নিজেই সে বিষয়ে বর্ণনা করেছেন, আমি ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্ম সম্বন্ধে অবগত হলাম; কিন্তু মানসিক প্রশান্তি লাভের মতো কোনো কিছু সেখানে দেখতে পেলাম না। একপর্যায়ে আমি সত্যের সন্ধানে সিরিয়া গিয়ে উপস্থিত হলাম। আমি সেখানে একজন বিজ্ঞ রাহিবকে খুঁজে পেলাম। তার নিকট উপস্থিত হয়ে আমি তাকে আমার ব্যাপারে বিস্তারিত অবহিত করলাম। তিনি আমার সব কথা শোনার পর বললেন, 'হে মক্কার অধিবাসী, তুমি সম্ভবত দ্বীনে ইবরাহীমের অনুসন্ধান করছ?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, আমি সত্য দ্বীন খুঁজে ফিরছি।' এরপর রাহিব বললেন, 'এ সময় দ্বীনে ইবরাহীম খুঁজে পাওয়া যাবে না। সত্য তো তোমার শহরেই প্রকাশিত হবে। আমি তোমাকে একটি শুভসংবাদ দিচ্ছি, আল্লাহ তোমার কওমের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন, যিনি দ্বীনে ইবরাহীমকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। যদি তার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হয়, তাহলে তুমি তার অনুসরণ করবে।' রাহেবের কথা শুনে যায়িদ প্রতিশ্রুত মহামানবকে খুঁজে বের করতে মক্কার পথে ফিরে চললেন। তিনি যখন মক্কা থেকে সামান্য দূরে, তখন শেষ নবী মুহাম্মাদে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রকাশ হলো; কিন্তু দুর্ভাগ্য যায়েদের। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ পেলেন না। কারণ মক্কায় পৌঁছার আগেই একদল ডাকাত তার ওপর চড়াও হয়ে তাকে হত্যা করে।৫১৮

মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে দুআ করেছিলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি যদি আমাকে এ মহাকল্যাণ (দ্বীনে হক) থেকে মাহরুম কর, তার পরও আমার পুত্র সাঈদকে তুমি তা থেকে বঞ্চিত করো না।'

মহান আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছিলেন। তাই তার পুত্র সাঈদ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলাম প্রচার শুরু করার প্রথম দিকেই সস্ত্রীক মুসলমান হয়ে প্রথম সারির মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। মহা সত্যের সন্ধানে আজীবন ছুটে চলে সে সত্যের দোরগোড়ায় এসে আত্মোৎসর্গকারী বাবার ঔরসে জন্ম নিয়েছেন হজরত সাঈদ রা। তিনি তার যৌবনের শুরুতেই সে সত্যকে কবুল করেছেন। তারপর ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য নিজ জীবনের সর্বস্বকে উজাড় করে দিয়েছেন। এই সাঈদ রা.-এরই বোন আমাদের আজকের আলোচিত অতিথি হযরত আতিকা রা.।

বিয়ে-শাদী
হযরত আয়েশা রা.-এর উদ্ধৃতিতে আবু নুয়াইম বর্ণনা করেন, আতিকা রা. ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা.-এর স্ত্রী। আবু উমর বলেন, তিনি ছিলেন একজন মুহাজির নারী। তাকে বিয়ে করেন হযরত আবু বকর রা.-এর পুত্র আবদুল্লাহ রা.। আতিকা ছিলেন অত্যধিক সুন্দরী ও রূপসী। তার কাছে আবদুল্লাহ সময় কাটাতেন বেশি। তাই তার পিতা আবু বকর রা. তাকে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেন।

অনিচ্ছা ও নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও তালাক দেওয়ার নির্দেশ শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়েন আবদুল্লাহ। মন ভেঙে যায় তাঁর। পরবর্তী সময়ে এ খবর জানতে পারলে আবু বকর রা. তাকে তালাক দিতে বারণ করেন। তায়েফে অবরুদ্ধ অবস্থায় তীরবিদ্ধ হন আবদুল্লাহ রা.। এমতাবস্থায় তিনি মদীনায় এলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।৫১৯

ফারুকে আযমের সাথে বিয়ে
অতঃপর ফারুকে আযম হযরত উমর রা.-এর সাথে তার বিয়ে হয়। তার কাছ থেকে তিনি রপ্ত করেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আল্লাহভীতি ও তাকওয়া। আবু উমর তামহীদ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হযরত উমর রা. যখন তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান, তখন তিনি উমর রা.-কে তিনটি শর্ত দেন। যথা: তাকে প্রহার করা যাবে না, তার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা যাবে না এবং মসজিদে নববীতে নামায পড়া হতে বিরত রাখা যাবে না।

রাসূলুল্লাহ সা.-এর অন্তিম সময়
রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মদীনার চতুর্দিকে যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। আনাস রা. বলেন, আমি ওই দিনের মতো উত্তম ও উজ্জ্বল আর কোনো দিন দেখিনি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট শুভাগমন করেছিলেন। আর আমি ওই দিনের মতো দুঃখজনক ও অন্ধকার দিন আর পাইনি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুবরণ করলে ফাতিমা রা. শোকাহত হয়ে বলেন, হায় আব্বাজান! যিনি প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দিয়েছেন, হায় আব্বাজান! যার ঠিকানা হচ্ছে জান্নাতুল ফিরদাউস। হায় আব্বাজান! আমি তো আপনার মৃত্যুশোক সংবাদ জিবরাঈল আ.-কে শোনাচ্ছি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের খবর জানতে পেরে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'কতগুলো মুনাফেক বলে বেড়াচ্ছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গেছেন। আল্লাহর কসম, তিনি মারা যাননি। তিনি কেবল মূসা আ.-এর মতো সাময়িকভাবে আল্লাহর কাছে গেছেন। মূসা আ. চল্লিশ দিনের জন্য আল্লাহর কাছে গিয়েছিলেন। তখন প্রচার করা হয়েছিল যে, তিনি মারা গেছেন। অথচ তার পরে তিনি ফিরে এসেছিলেন। আল্লাহর কসম! মূসা আ.-এর মতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার ফিরে আসবেন। এখন যারা বলছে যে, তিনি মারা গেছেন তাদের হাত-পা কেটে দেওয়া হবে।'

হযরত আবু বকর রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের সংবাদ জানতে পেরে দ্রুত ছুটে এলেন। উমর রা. তখনো ওই কথাগুলো ক্রমাগত বলে যাচ্ছেন। আবু বকর রা. সেদিকে কর্ণপাত না করে তিনি সরাসরি আয়শা রা.-এর ঘরে চলে গেলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেহ মুবারক ঘরের এক কোণে ইয়ামানী কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল। তিনি রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখের কাপড় সরিয়ে চুমু খেলেন। অতঃপর বললেন, 'আপনার জন্য আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক! আল্লাহ আপনার জন্য যে মৃত্যু নির্ধারিত রেখেছিলেন, তা আপনি পেয়েছেন। এরপর আর আপনার কাছে কখনো মৃত্যু আসবে না।'

إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ
(হে নবী!) তুমি তো মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।৫২০
একদিন সবাইকে মরতেই হবে। তখন যার যার পরিণাম জানতে পারবে।

এরপর তিনি বাইরে এসে দেখেন উমর রা. সেই একই কথা বলে যাচ্ছেন। তিনি বললেন, উমর, তুমি ক্ষান্ত হও! চুপ করো।' উমর রা. কিছুতেই থামতে রাজী হচ্ছিলেন না। এ অবস্থা দেখে আবু বকর রা. সমবেত লোকদের লক্ষ করে কথা বলতে শুরু করলেন। তার কথা শুনে জনতা উমর রা.-কে রেখে তার দিকে এগিয়ে এলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করার পর বললেন, 'হে জনমণ্ডলী, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের পূজা করত সে জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করত সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব ও অবিনশ্বর।'

তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল বৈ আর কিছুই নন। তার পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা ইসলাম থেকে ফিরে যাবে? যে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কৃতজ্ঞ লোকদের আল্লাহ যথোচিত পুরস্কার দেবেন।৫২১

মানসিক যন্ত্রণায় দিশেহারা এবং অস্থির সাহাবায়ে কেরাম আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর বক্তব্য শুনে বিশ্বাস করলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃতই ইন্তেকাল করেছেন। এরপর মানুষের মধ্যে এমন ভাবান্তর ঘটল যে, মনে হচ্ছিল তারা যেন আবু বকরের মুখে শোনার আগে এ আয়াত কখনো শোনেইনি। তারা আয়াতটি আবু বকর রা.-এর নিকট থেকে মুখস্থ করে অনবরত তিলাওয়াত করতে থাকলেন। অতঃপর উমর রা. বললেন, 'আবু বকরের মুখে এ আয়াত শোনার পর আমি হতবাক ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে গেলাম। পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। আমি তখনই অনুভব করলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যিই ইন্তেকাল করেছেন।'

উমর রা.-এর ইন্তেকাল
প্রিয় নবীজীর ইন্তেকালে ভীষণ ভেঙে পড়েন হযরত আতিকা রা.। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় তার হৃদয়। এ সময় তিনি বেশ কিছু শোক কবিতা আবৃত্তি করেন। এভাবে এক সময় হযরত উমর ফারুক রা.ও মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে হযরত আতিকা রা.-কে শোক সাগরে ভাসিয়ে দেন। হযরত উমর রা.-এর মৃত্যুর ঘটনাটি হচ্ছে এমন: মদীনায় মুগীরা ইবনে শু'বা রা.-এর আবু লুলু নামক একজন ইরানী গোলাম ছিল। একদিন সে উমর রা. এর নিকট তার মনিবের বিরুদ্ধে নালিশ দিল যে, আমার মনিব আমার প্রতি অতিরিক্ত মাশুল আরোপ করে রেখেছেন। আপনি তা কমিয়ে দিন। উমর রা. তাকে মাশুলের পরিমাণ কত জিজ্ঞাসা করলে সে উত্তর দিল দুই দিরহাম। এবার জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কী কাজ কর? সে বলল, আমি ছুতার মিস্ত্রি, ভাস্কর, ও কর্মকার। এটা শুনে উমর রা. তাকে বললেন, তাহলে এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত মাশুল নয়। গোলামটি এই জবাব শুনে খুবই অসন্তুষ্ট হলো এবং বলল, আচ্ছা বুঝে নেব। এই বলে সে চলে গেল। উমর রা. বললেন, এক গোলাম আমাকে হুমকি দিল। এর পর তিনি নীরব রইলেন।

পরের দিন খুব ভোরে উমর রা. নামাযের জন্য মসজিদে যান। আবু লুলু বিষাক্ত ছুরি লুকিয়ে রেখে পূর্ব থেকেই ওঁৎ পেতে দাঁড়িয়েছিল। উমর রা. নামাযের তাকবীর বলার সঙ্গে সঙ্গে সে উক্ত বিষাক্ত ছুরি দ্বারা তার কাঁধে ও নাভীতে ক্ষীপ্ত হস্তে ছয়টি আঘাত করে। পার্শ্ববর্তী লোকেরা আবু লুলুকে ধরার জন্য এলে তাদেরকেও উক্ত ছুরি দ্বারা আঘাত করে। পরে যখন দেখল তার নিজের পরিত্রাণের উপায় নেই, তখন সে নিজে নিজেই উক্ত ছুরি দ্বারা আত্মহত্যা করল।

আহত হওয়ার পর উমর রা. আব্দুর রাহমান ইবনে আওফ রা.-কে নামায পড়াবার নির্দেশ দিলেন। ইবনে আওফ রা. অতিদ্রুত নামায় আদায় করলেন। এদিকে উমর রা. মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। নামায শেষ হওয়ার পর উমর রা.-কে তার বাড়িতে আনা হলো। তিনি লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমার হত্যাকারী কে?' উত্তর দেওয়া হলো, আবু লুলু। আবু লুলুর নাম শুনে তিনি এই বলে আল্লাহর শোকর আদায় করলেন যে, আমার রক্তে কোনো মুসলমানের হাত রঞ্জিত হয়নি।

মৃত্যুর সময় উমর রা. আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে শুরু করেন। এ সময় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আরজ করেন, হে আমিরুল মুমিনীন, আপনার জন্য সুসংবাদ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায়ের কালে আপনার ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন। এখন আপনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছেন সকল মুসলমান আপনার প্রতি সন্তুষ্ট। এসব সান্ত্বনা বাণী শুনেও উমর রা. আল্লাহর ভয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ! তোমরা আমাকে আখিরাতের ঘাঁটিসমূহের বিপদের জন্যই ভীত করাচ্ছ। এখন যদি বিশ্বের সমস্ত অর্থ ভাণ্ডার আমার নিকট থাকে আর আমি তা মুক্তিপণ হিসেবে দিয়ে জীবন বাঁচাতে পারি তাহলে আমি এ সওদা খুবই কম মনে করব।

আহত হবার তৃতীয় দিনে ২৭শে জিলহজ রাতে উমর রা. মুসলিম বিশ্বকে শোক সাগরে নিমজ্জিত করে দুনিয়ার জীবনের পরিসমাপ্তি লাভ করেন। পরের দিন সকালে তার দাফন সমাপ্ত হয়। এ সময় তার বয়ষ তার দুই সম্মানিত বন্ধুর মতোই ৬৩ বৎসর ছিল। এভাবে আবারও বৈধব্য জীবন বরণ করে নেন হযরত আতিকা রা.।

যুবাইরের সহধর্মিণী হিসেবে
পরবর্তী সময়ে তার বিয়ে হয় রাসূলুল্লাহ সা.-এর দেহরক্ষী বিশিষ্ট সাহাবী হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর সাথে। তিনিও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাত দশ সাহাবীর একজন। যিনি ইসলামী দাওয়াতের প্রথম সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সেই মহান সাত ব্যক্তির অন্যতম একজন যারা ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে সবার চেয়ে অগ্রগামী। দারুল আরকামে ইসলামের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর বয়স তখন সবেমাত্র ১৫ বছর, যখন হেদায়াতের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন, পরম সৌভাগ্য আর প্রভূত কল্যাণে সম্মানিত হয়েছেন।

একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে তার অভ্যাস-প্রকৃতি তার সত্তাজুড়ে পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও নির্ভরতায় ছেয়ে পড়েছিল। লড়াইয়ের ময়দানে যদি তাকে মাত্র একশ সাথী আর সৈনিক দিয়ে পাঠানো হয়, তাহলে তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে এমন তীব্রভাবে আক্রমণ চালাতেন, যেন রণাঙ্গনে তিনি একাই লড়াই করছেন। বিজয় আর নুসরাত যেন তার একার ওপরই ন্যস্ত। এমন দায়িত্বশীলতা আর ওফাদারির সাথে তিনি জিহাদ করতেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর ছিল গভীর হৃদ্যতা ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এ বাক্যে সুসংবাদ জানিয়েছেন, 'প্রত্যেক নবীর জন্য হাওয়ারী তথা সার্বক্ষণিক সহচর থাকে, আমার হাওয়ারী হচ্ছে যুবাইর ইবনুল আউয়াম।৫২২

হযরত আলী রা.-এর সামনে হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর তরবারি পেশ করা হলে তিনি তলোয়ার খানিতে চুমু দেন। কাঁদতে কাঁদতে তরবারির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তিনি অসংখ্যবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মুখ থেকে মুসিবতের মেঘমালা অপসারণ করেছেন। নিশ্চয় যুবাইরের খুনী জাহান্নামী।'

হযরত আতিকা রা.ও বর্ণিল দীর্ঘ জীবন শেষে এক সময় সাড়া দেন মহান রাব্বুল আলামীনের ডাকে। হযরত মুআবিয়া ইবনে আবি সুফইয়ানের খিলাফতের শুরুর দিকে ৪১ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৫১৬. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/২৬৫-২৬৬।
৫১৭. সহীহ, বুখারী, ৩৮২৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ৩/৪০৪; তিনি বর্ণনাটি বিশুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন।
৫১৮. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৯১-১৯৮।
৫১৯. আল ইসাবাহ, ৮/২২৭১।
৫২০. সূরা যুমার, ৩৯:৩০।
৫২১. সূরা আল-ইমরান, ৩:১৪৪।
৫২২. মুসতাদরাকে হাকিম, ৩/৩৬৭।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 আসমা বিনতে উমাইস রা.

📄 আসমা বিনতে উমাইস রা.


যাঁকে বিয়ে করেছেন তিনজন জান্নাতী যুবক

মহান আল্লাহ তাআলার অসীম অনুগ্রহে আজ আমরা এমন এক মহীয়সী নারীর জীবনকাহিনীর দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয়েছি—যিনি ছিলেন ঈমানী কাননের এক প্রস্ফুটিত ও সুবাসিত ফুল। যাঁর ইসলামের ফসল ওহীর সিঞ্চনে হয়ে উঠেছিল অত্যধিক সতেজ। যার সুবাসে মোহিত বিশ্ববাসী। তার মহৎ জীবনী আমাদের নারী সমাজকে দ্বীন ও বিশ্বাসে অবিচল থাকার অনন্য শিক্ষা দিয়ে যায়।

সেই মহীয়সী নারী হলেন হযরত আসমা বিনতে উমাইস ইবনে মাআদ আল খাসামিয়্যাহ। তিনি এমন সৌভাগ্যবতী আল্লাহভীরু নারী—যাঁকে বিয়ে করেছেন তিনজন জান্নাতী যুবক। ঈমান, পবিত্রতা, নিষ্কলুষতা, মহানুভবতার অতুল দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি।

শুরুটা এখান থেকে
হযরত আবু বকর রা. যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন তার ওপর ন্যস্ত হলো মহান আমানত—দাওয়াতের গুরু দায়িত্ব। তিনি বেরিয়ে পড়লেন মানুষকে দ্বীনের পথে আল্লাহর দিকে ডাকতে। এমন জান্নাতের দিকে তিনি সকল মানুষকে আহ্বান করলেন—যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি; যেই জান্নাতের নেয়ামত সম্পর্কে এবং কোনো হৃদয় যার কল্পনা করতে সক্ষম নয়।

মুষ্টিমেয় যে সব লোক তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. ও তার স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস রা.। ইসলামের একেবারে শুরুলগ্নে রাসূলুল্লাহ সা.-এর দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বেই তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। ৫২৩

এভাবেই তারা ইসলামের অগ্রগামী দলের সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। যেই গৌরবের কোনো তুলনা হয় না।

জাফর ইবনে আবি তালিব রা. ও তার সহধর্মিণী আসমা বিনতে উমাইস রা. ইসলামী নূরের কাফেলার যাত্রাপথেই ইসলামে যোগদান করার ফলে প্রথম যুগের মুসলমানরা যেসব দৈহিক ও মানসিক কষ্ট ভোগ করেছিল, তার সবই এ হাশিমী যুবক ও তার যুবতী স্ত্রী ভোগ করেছিলেন। কিন্তু কখনো তারা ধৈর্যহারা হননি। তারা জানতেন, সফলতার পথ এত সহজ নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কুরাইশরা তাদের জন্য ওঁৎ পেতে থেকে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ গড়ে তুলত। এমনই এক মুহূর্তে জাফর ইবনে আবি তালিব, তার স্ত্রী এবং আরও কিছু সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আবিসিনিয়ায় হিজরতের অনুমতি চাইলেন। অত্যন্ত বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তাদের অনুমতি দেন। এখানে তারা বেশ ক'বছর অবস্থান করেন। সে সময় আল্লাহ তাদেরকে মুহাম্মাদ, আবদুল্লাহ ও আউফ নামীয় সন্তান দান করেন।

আবিসিনিয়ায় হিজরত
হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. আবিসিনিয়ায় ইসলাম ও ইসলামের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দক্ষ ও সফল মুখপাত্র ও প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন। আল্লাহ তাআলা তাকে উন্নত মন-মানসিকতা, প্রভাবপূর্ণ বাগ্মিতা ও বয়ানের পূর্ণ যোগ্যতা দান করেছিলেন। মুতার যুদ্ধের সারাটি দিন—যেদিন তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেছিলেন—যা তার জীবনের এক বিস্ময়কর ও চিরজাগ্রত মর্যাদা ও সম্মানের এক অম্লান অধ্যায়; এর পাশাপাশি সেই দিনটিও কম মর্যাদাপূর্ণ নয় যেদিন বাদশাহ নাজ্জাশী তাকে দরবারে ডেকে নিয়েছিলেন।

আবিসিনিয়া অভিমুখে মুসলমানদের হিজরতের পরও কাফেরদের হিংসা-ক্ষোভ বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি; বরং কুরাইশরা চিন্তা করতে থাকে যে, হিজরতের কারণে মুসলমানরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং তাদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে। তারা তাদের মধ্য থেকে শক্তিমান ও তাগড়া জোয়ান দু-ব্যক্তিকে নির্বাচন করে নাজ্জাশীর কাছে পাঠাল। এ দু-ব্যক্তি হলো, আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবীয়া যারা তখনো মুসলমান হয়নি। তাদের একটাই লক্ষ্য, বাদশাহ নাজ্জাশী যেন তার দেশ থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করেন।

আবিসিনিয়ার রাজত্বে আসীন তখন বাদশাহ নাজ্জাশী। যিনি ঈমানের তাপ অনুভব করেছিলেন। তিনি একনিষ্ঠভাবে খ্রিস্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। অহংকার ও দাম্ভিকতা মুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন ভীষণ নীতিপরায়ণ। তার খ্যাতি তখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামদের জন্য তার দেশকে হিজরতের ক্ষেত্র হিসেবে মনোনীত করেন।

দুই হিজরতের অধিকারিণী
হযরত আবু মূসা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইয়ামানে থাকা অবস্থায় আমাদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের খবর পৌঁছল। তাই আমি ও আমার দু-ভাই আবু বুরদা ও আবু রুহম এবং আমাদের গোত্রের আরও মোট বায়ান্ন কি তিপ্পান্ন কিংবা আরও কিছু লোকজনসহ আমরা হিজরতের উদ্দেশে বের হলাম। আমি ছিলাম আমার অপর দু-ভাইয়ের চেয়ে বয়সে ছোট। আমরা একটি জাহাজে উঠলাম। জাহাজটি আমাদেরকে আবিসিনিয়া দেশের (বাদশাহ্) নাজ্জাশীর নিকট নিয়ে গেল। সেখানে আমরা জাফর ইবনে আবু তালিবের সাক্ষাৎ পেলাম এবং তার সঙ্গেই আমরা থেকে গেলাম। অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খায়বার বিজয়ের সময় সকলে এক যোগে (মদিনায়) এসে তার সঙ্গে মিলিত হলাম। এ সময়ে মুসলিমদের কেউ কেউ আমাদের অর্থাৎ, জাহাজে আগমনকারীদের বলল, হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী। আমাদের সঙ্গে আগমনকারী আসমা বিনতে উমাইস রা. একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণী হাফসা'র সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তিনিও (তাঁর স্বামী জাফরসহ) নাজ্জাশীর দেশে হিজরাতকারীদের সঙ্গে হিজরত করেছিলেন। আসমা রা. হাফসা'র কাছেই ছিলেন। এ সময়ে উমর রা. তার ঘরে প্রবেশ করলেন। উমর রা. আসমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? হাফসা রা. বললেন, তিনি আসমা বিনতে উমাইস রা.। উমর রা. বললেন, 'ইনি আবিসিনিয়ায় হিজরাতকারিণী আসমা? ইনিই কি সমুদ্রগামিনী?' আসমা রা. বললেন, 'হ্যাঁ!' তখন উমর রা. বললেন, 'হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে আগে আছি। সুতরাং তোমাদের তুলনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি আমাদের হক অধিক।' এতে আসমা রা. রেগে গেলেন এবং বললেন,

কখনো হতে পারে না। আল্লাহর কসম, আপনারা তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন, তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন, আপনাদের অবুঝ লোকদের নসীহত করতেন। আর আমরা ছিলাম এমন এক এলাকায় অথবা তিনি বলেছেন এমন এক দেশে-যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বহু দূরে এবং সর্বদা শত্রুবেষ্টিত আবিসিনিয়া (আবিসিনিয়া) দেশে। আল্লাহ ও তার রাসূলের উদ্দেশ্যেই ছিল আমাদের এ হিজরত। আল্লাহর কসম, আমি কোনো খাবার খাব না, পানিও পান করব না যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি যা বলেছেন তা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে না জানাব। সেখানে আমাদের কষ্ট দেওয়া হতো, ভয় দেখানো হতো। শীঘ্রই আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এসব কথা বলব এবং তাকে জিজ্ঞেস করব। তবে আল্লাহর কসম, আমি মিথ্যা বলব না, পেঁচিয়ে বলব না, বাড়িয়েও কিছু বলব না। ৫২৪

এরই মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে উপস্থিত হন। আসমা রা. তাকে সব কথা খুলে বলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারা তো এক হিজরত করেছে, আর তোমরা করেছ দুই হিজরত। এদিক দিয়ে তোমাদের মর্যাদা বেশি। ৫২৫

আমির থেকে বর্ণিত হয়েছে, আসমা অভিযোগ করেন এই ভাষায়, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই লোকেরা মনে করে যে, আমরা মুহাজির নই।' জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যারা এমন কথা বলে তারা অসত্য বলে। তোমাদের হিজরত দুইবার হয়েছে। একবার তোমরা নাজ্জাশীর নিকট হিজরত করেছ। আরেকবার আমার নিকট। ৫২৬

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া এই সুসংবাদ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী ব্যক্তিরা দারুণ উৎফুল্ল হন। তারা আসমার নিকট এসে এ সুসংবাদের সত্যতা যাচাই করে যেতেন। ৫২৭

মৃতার যুদ্ধে জাফরের অনন্য বীরত্ব
এমন সময়ে মৃতার যুদ্ধের দামামা বাজতে থাকে। লড়াইয়ে মোকাবেলার জন্য নিশানা তাক করা হয়। হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. সেই যুদ্ধে নিজ প্রত্যাশা পূরণের উপাদান খুঁজে পান। হয় তিনি দুনিয়ার বুকে আল্লাহর দ্বীন বুলন্দ করার জন্য প্রাণপণে লড়ে যাবেন, অথবা আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করবেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ যুদ্ধে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেন। এ যুদ্ধ যেমন তেমন যুদ্ধ ছিল না। এমন ভয়ঙ্কর যুদ্ধ ছিল— ইতোপূর্বে ইসলামের সামনে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ আর দেখা যায়নি। এটা ছিল পৃথিবীর বিশাল অঞ্চলের বাদশার বিরুদ্ধে এক বিস্ময়কর অসম শক্তির লড়াই। সিরিয়ার রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ। যায়িদ বিন হারিসাকে সেনাপতি নিয়োগ করে তিনি বললেন, ‘যায়িদ নিহত হলে আমীর হবে জাফর ইবনে আবি তালিব। জাফর নিহত বা আহত হলে আমীর হবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। আর সে নিহত বা আহত হলে মুসলমানরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর নির্বাচন করবে।’

মুসলিম বাহিনী জর্দানের সিরিয়া সীমান্তের ‘মৃতা’ নামক স্থানে পৌঁছে দেখতে পেল, এক লাখ রোমান সৈন্য তাদের মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত এবং তাদের সাহায্যের জন্য লাখম, জুজাম, কুদাআ ইত্যাদি আরব গোত্রের আরও এক লাখ খ্রিস্টান সৈন্য পেছনে প্রতীক্ষা করছে। অন্যদিকে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা মাত্র তিন হাজার।

যুদ্ধ শুরু হতেই যায়িদ বিন হারিসা বীরের ন্যায় শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর জাফর বিন আবি তালিব তার ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়েন এবং শত্রুবাহিনী যাতে সেটি ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য নিজের তরবারি দ্বারা ঘোড়াটিকে হত্যা করে ফেলেন। তারপর পতাকাটি তুলে ধরেন রোমান বাহিনীর অভ্যন্তরভাগে বহু দূর পর্যন্ত প্রবেশ করে শত্রুনিধনকার্য চালাতে থাকেন। এমতাবস্থায় তার ডান হাতটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তিনি বাম হাতে পতাকা উঁচু করে ধরেন। তিনি বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। পাশাপাশি এ কবিতার চরণটি আবৃত্তি করে যান,

ياحبذا الجنة واقترابها طيبة، وبارد شرابها
والروم روم ، قد دنا عذابه كافرة بعيدة أنسابها
علي اذا لاقيتها ضرابها

জান্নাত ও জান্নাতের চতুর্পার্শ্ব কতই না মনোমুগ্ধকর! সেখানে রয়েছে শীতল ও পবিত্র পানীয়। আর রোম... রোমের ললাটে শীঘ্রই আসছে ভয়ঙ্কর শাস্তি। এরা তো কাফের। যাদের বংশ পরিক্রমা বহুদূর বিস্তৃত। তাদের কেউ আমার সামনে এলে, এদের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া আমার জন্য জরুরি।

রোমানরা এই ব্যক্তির অসীম শক্তি আর অদম্য সাহস দেখে বিস্ময়াভূত হয়ে পড়ে। তারা তাকে খুন করার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে। কাফেরদের তরবারির আঘাতে তার বাম হাতটিও দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবুও তিনি হাল ছাড়লেন না। বাহু দিয়ে বুকের সাথে জাপ্টে ধরে তিনি ইসলামী পতাকা সমুন্নত রাখলেন। এ অবস্থায় কিছুক্ষণ পর তরবারির তৃতীয় একটি আঘাত তার দেহটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। অতঃপর পতাকাটি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা তুলে নিলেন।

এভাবেই হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. নিজের মৃত্যুকে মানবতার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করলেন। পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে প্রাণপণ লড়াই করে ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে চলে যান।

তাঁর শাহাদাতের খবর শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দারুণভাবে ব্যথিত হন। বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তার চাচাত ভাই জাফরের বাড়িতে যান। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু-চোখ ছিল অশ্রুতে ভেজা। এরপর তিনি সাহাবাদের মজলিসে ফিরে আসেন। বিশিষ্ট সাহাবী কবি হযরত হাসসান ইবনে সাবিত রা. ও হযরত কাআব ইবনে মালিক রা. হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর শানে মর্সিয়া আবৃত্তি করতে থাকেন। জাফর ছিলেন গরীব-মিসকীনদের প্রতি ভীষণ দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। এ কারণে তাকে ডাকা হতো 'আবুল মাসাকীন' বা মিসকীনদের পিতা বলে। এ শ্রেণির সব লোক এসে খুবই কান্নাকাটি করতে থাকল। আবু হুরায়রা রা. বলেন, 'আমাদের মিসকীন সম্প্রদায়ের জন্য জাফর ইবনে আবি তালিব ছিলেন সর্বোত্তম ব্যক্তি। তিনি আমাদের সঙ্গে করে তার গৃহে নিয়ে যেতেন, যা কিছু তার কাছে থাকত তা আমাদের খাওয়াতেন। যখন তার খাবার শেষ হয়ে যেত তখন তার ছোট্ট শূন্য ঘি-এর মশকটি বের করে দিতেন। আমরা তা ফেঁড়ে ভেতরে যা কিছু লেগে থাকত চেটেপুটে খেতাম।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, জাফরের লাশ তালাশ করে দেখা গেল, শুধু তার সামনের দিকেই পঞ্চাশটি ক্ষতচিহ্ন। সারা দেহে তার নব্বইটিরও বেশি ক্ষত ছিল। কিন্তু তার একটিও পেছন দিকে ছিল না।

হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. অজস্র তীরের আঘাতে জর্জরিত শরীর নিয়ে জান্নাতে চলে গেছেন। আপনি যদি ইচ্ছে করেন, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তিটি শুনে নিতে পারেন : 'আল্লাহ তাআলা জাফরকে তার দুটি কর্তিত হাতের পরিবর্তে নতুন দুটি রক্তরাঙা হাত দান করেছেন এবং তিনি জান্নাতে ফেরেশতাদের সাথে উড়ে বেড়াচ্ছেন।'

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুতার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদ ইবনে হারিসা রা.-কে (সেনাপতি নিযুক্ত করে) বলেছিলেন, যদি যায়িদ রা. শহীদ হয়ে যায় তাহলে জাফর ইবনে আবি তালিব রা. (সেনাপতি হবে)। যদি জাফর রা.-ও শহীদ হয়ে যায় তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. (সেনাপতি হবে)। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, ওই যুদ্ধে তাদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। (যুদ্ধ শেষে) আমরা জাফর ইবনে আবু তালিব রা.-কে তালাশ করলে তাকে শহীদগণের মধ্যে পেলাম। তখন আমরা তার দেহে বর্শা ও তীরের নব্বইটিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। ৫২৮

আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মৃতা যুদ্ধের অবস্থা বর্ণনায়) বললেন, যায়িদ রা. পতাকা বহন করেছে অতঃপর শহীদ হয়েছে। অতঃপর জাফর রা. (পতাকা) হাতে নিয়েছে, সেও শহীদ হয়। অতঃপর আবদুল্লাহ্ ইবনে রাওয়াহা রা. (পতাকা) ধারণ করে এবং সেও শহীদ হয়। এ খবর বলছিলেন এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু-চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল। অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম পরামর্শক্রমে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর হাতে পতাকা তুলে দেন এবং তার দ্বারাই বিজয় লাভ হয়।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত যে, সেদিন (মৃতার যুদ্ধের দিন) তিনি শাহাদাতপ্রাপ্ত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর লাশের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। (তিনি বলেন,) আমি জাফর রা.-এর দেহে তখন বর্শা ও তরবারির পঞ্চাশটি আঘাতের চিহ্ন গুণেছি। তার মধ্যে কোনোটাই তার পশ্চাৎ দিকে ছিল না।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. যখন জাফর রা.-এর ছেলেকে সালাম করতেন তখন বলতেন, হে, দু-বাহুওয়ালা ব্যক্তির ছেলে। ৫২৯

মৃতার যুদ্ধে কাফেরদের তীরের আঘাতে যখন জাফর ইবনে আবি তালিবের হাত দুটি দেহ হতে পৃথক হয়ে যায় তখন তিনি ওই দু-হাতের বদলে আল্লাহর তরফ হতে দুটি ডানা লাভ করেন। সেগুলোর সাহায্যে তিনি ফেরেশতাদের সাথে আকাশে উড়তে থাকেন। পিতার এই অনন্য বৈশিষ্ট্য ও ফযীলতের স্মৃতিচারণার্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহীদের পুত্রকে 'দুডানা বিশিষ্ট ব্যক্তির পুত্র' বলে সম্বোধন করতেন। হাদীসটি তিরমিযীতে বর্ণিত রয়েছে। ৫৩০

শোকাহত আসমা
হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা.-এর স্বামী জাফর রা. ছিলেন এ যুদ্ধের একজন সেনা অধিনায়ক। যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। খবরটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পৌঁছর পর তিনি আসমার রা. বাড়িতে ছুটে যান এবং বলেন, 'জাফরের ছেলেদের আমার সামনে নিয়ে এসো।' আসমা ছেলেদের গোসল করিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে হাজির করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখ দু-টি পানিতে ভিজে গেল। তিনি ছেলেদের জাড়িয়ে চুমু দেন। আসমা জিজ্ঞেস করলেন, 'জাফরের কি কোনো খবর পেয়েছেন?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, সে শহীদ হয়েছে।' এতটুকু শুনতেই আসমা চিৎকার দিয়ে ওঠেন এবং বাড়িতে একটা মাতমের রূপ ধারণ করে। প্রতিবেশী মহিলারা তার পাশে সমবেত হয় এবং তাকে বলে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুকে হাত মারতে নিষেধ করছেন।' সেখান থেকে উঠে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ঘর ফিরে এলেন এবং বললেন, 'তোমরা জাফরের ছেলেদের জন্য খাবার তৈরি করো। কারণ, তাদের মা আসমা শোক ও দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছে। ৫০১

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যথিত অন্তরে মসজিদে গিয়ে বসেন এবং হযরত জাফর রা.-এর শাহাদাতের খবর ঘোষণা করেন। ঠিক এ সময় এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলে, জাফরের স্ত্রী মাতম শুরু করেছেন এবং কান্নাকাটি করছেন। তিনি লোকটিকে বলেন, তুমি যাও এবং তাদেরকে এমন করতে বারণ করো। কিছুক্ষণ পর লোকটি আবার ফিরে এসে বলে, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তারা তো বিরত হচ্ছে না। তিনি লোকটিকে আবার একই কথা বলে পাঠালেন; কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তার মুখে মাটি ভরে দাও। সহীহ বুখারীতে একথাও এসেছে যে, হযরত আয়েশা রা. ওই লোকটিকে বলেন, 'আল্লাহর কসম! তোমরা যদি এ কাজ (মুখে মাটি ভরা) না কর তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট থেকে মুক্তি পাবেন না। তৃতীয় দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসমার বাড়ি যান এবং তাকে শোক পালন করতে বারণ করেন। ৫০২

স্বামী হযরত জাফর রা.-এর শাহাদাতের ছয় মাস পরে অষ্টম হিজরীর শাওয়াল মাসে হুনাইন যুদ্ধের সময়কালে হযরত আবু বকর রা.-এর সাথে আসমার দ্বিতীয় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং বিয়ে পড়িয়েছেন। ৫৩৩ এই বিয়ের দুই বছর পর দশম হিজরীর যুলকাদা মাসে আবু বকর রা.-এর ঔরসে ছেলে মুহাম্মাদ ইবনে আবি বাকরের জন্ম হয়। আসমা তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায় হজের কাফেলার সাথে শরীক হয়ে মক্কার পথে ছিলেন। যুল হুলায়ফা পৌঁছার পর মুহাম্মাদ ভূমিষ্ঠ হয়। এখন তিনি হজ আদায়ের ব্যাপারে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। স্বামী আবু বকরও তাকে মদীনায় ফেরত পাঠাতে চাইলেন। অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতামত জানতে চাওয়া হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তাকে বলো, সে যেন গোসল করে হজের ইহরাম বেঁধে নেয়। ৫৩৪

স্বামী যখন সিদ্দীকে আকবার
হিজরী অষ্টম সনে প্রথম স্বামী জাফরের ইন্তেকালে হযরত আসমা রা. ভীষণ ব্যথা পান; কিন্তু আল্লাহ ও তার রাসূলের সন্তুষ্টি লাভের আশায় এই শোক ও দুঃখকে তিনি সবর ও শোকরে রূপান্তরিত করেন; কিন্তু হিজরী ১৩ সনে দ্বিতীয় স্বামী হযরত আবু বকর রা.-এর মৃত্যুতে তিনি আবার শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে তিনি এ শোকও কাটিয়ে ওঠেন। মৃত্যুকালে আবু বকর রা. অসিয়ত করে যান, স্ত্রী আসমা তাকে অন্তিম গোসল দেবেন। আসমা তাকে গোসল দেন। গোসল দেওয়া শেষ হলে তিনি উপস্থিত মুহাজিরদের লক্ষ্য করে বলেন, 'আমি রোযা আছি। আর দিনটিও ভীষণ ঠাণ্ডার। আমাকেও গোসল করতে হবে?' লোকেরা বলল, 'না। ৫৩৫

আলী রা.-এর ঘরে
হযরত আবু বকর রা.-এর মৃত্যুর পর হযরত আসমা হযরত আলী রা.-কে তৃতীয় স্বামী হিসেবে গ্রহণ কনে। শিশু মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর মায়ের সাথে সৎ পিতা আলীর রা. সংসারে চলে আসেন এবং তার স্নেহছায়ায় ও তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।

হযরত আসমার দুই ছেলের নামই মুহাম্মাদ। মুহাম্মাদ ইবনে জাফর ও মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর। একদিন এই দুই ছেলে একজন আরেকজনের ওপর কৌলীন্য ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে বলতে থাকে, আমি তোমার চেয়ে বেশি মর্যাদাবান। আমার পিতা তোমার পিতার চেয়ে বেশি সম্মানীয়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাদের এ বিতর্ক চলতে থাকে। হযরত আলী রা. তাদের মা আসমাকে বললেন, তুমিই তাদের এ বিবাদের ফয়সালা করে দাও। আসমা বললেন, আমি আরব যুবকদের মধ্যে জাফরের চেয়ে ভালো কাউকে পাইনি, আর বৃদ্ধদের মধ্যে আবু বকরের চেয়ে বেশি ভালো কাউকে দেখিনি। আলী রা. বললেন, তুমি তো আমার বলার কিছু রাখলে না। তুমি যা বলেছ, তাছাড়া অন্য কিছু বললে আমি অসন্তুষ্ট হতাম। আসমা তখন বলেন, আর ভালো মানুষ হিসেবে আপনি তিনজনের মধ্যে তৃতীয়। ৫৩৬

অন্তিম মুহূর্ত
জীবনের দীর্ঘ একটি সময় হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা. আল্লাহর ইবাদতে কাটান এবং আল্লাহর দ্বীনের জন্য অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের সময় তার ওপর তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন এবং তার স্বামীরাও ছিলেন তার ওপর রাযী-খুশি। অতঃপর হযরত আলী রা.-এর ইন্তেকালে কিছু পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। ইমাম যাহাবী বলেন, হযরত আলী রা.-এরপরও তিনি বেঁচেছিলেন। ৫৩৭

আল্লাহ তাআলা হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা.-এর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, যাঁকে তিনি গৌরব ও মর্যাদার স্বর্ণশিখরে আরোহণ করিয়েছেন।

**টিকাঃ**
৫২৩ আসহাবুর রাসূল সা., ১/৫৫০।
৫২৪ সহীহ, বুখারী, ৪২৩০; সহীহ, মুসলিম, ২৫০২।
৫২৫ ফাতহুল বারী, ৭/৩১৭; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৫০৩; কানযুল উম্মাল ৮/৩৩৩।
৫২৬ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৮১; আল ইসাবাহ, ৪/২৩১।
৫২৭ সহীহ, বুখারী, ২/৬০৭-৬০৮; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৮১।
৫২৮ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪২৬১।
৫২৯ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৭০৯।
৫৩০ ফাতহুল বারী, ৭/৯৬।
৫০১ আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আলবানী হাদীসটি 'হাসান' বলেছেন।
৫০২ মুসনাদ, আহমাদ: ৬/৩৬৯।
৫৩৩ আল-ইসাবা, ৪/২৩১।
৫৩৪ তাবাকাত, ৮/২৮২; মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩৬৯; সহীহ, মুসলিম, ৩/১৮৫-১৮৬।
৫৩৫ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২০৮।
৫৩৬ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২০৮-২০৯; আল ইসাবাহ, ৭/৪৯১।
৫৩৭ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৮৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00