📄 উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা.
শহীদ ও অতুল ধৈর্যবতী
মানবজাতি তখন অজ্ঞতা ও পাপাচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত। এমন সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক পবিত্র দ্বীন তথা জীবন বিধান নিয়ে আসেন। তিনি মানব জাতিকে শিরক ও কুফরের গহীন অন্ধকার থেকে বের করে তাওহীদ ও ঈমানের শুভ্র-সফেদ আলোর দিকে পথ দেখান। এমন পরিস্থিতিতে উত্তম চরিত্র ও ভালো মনের মানুষেরা সাড়া দেন তার ডাকে। জাহিলিয়াতের পোশাক খুলে তারা গায়ে জড়িয়ে নেন ইসলামের আলোকোজ্জ্বল পোশাক। আল্লাহর ইবাদত ও দ্বীনের খেদমতে তারা সর্বান্তকরণে নিজেদের বিলিয়ে দেন। ইসলামের সূচনাপর্বেই তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে যায় দ্বীনের দাওয়াতের অদম্য স্পৃহা। এভাবেই তাঁরা অগ্রগামী মুসলমানদের মধ্য হতে গণ্য হন। আর আল্লাহ তাআলা দুনিয়া-আখিরাতের তাদের সার্বিক সফলতার প্রতিশ্রুতি দেন এভাবে:
আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।৪৯৫
হযরত উম্মে হারাম রা. মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গাত্রের নাজ্জার শাখার কন্যা। পিতা মিলহান ইবনে খালিদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাদিম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালিকের খালা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সরাসরি নিজেই তাকে শাহাদাতের সুসংবাদ দেন।
আসুন, আমরা এই মহান সাহাবিয়ার জীবনীপাঠে আত্মাকে পরিতৃপ্ত করি।
পূর্ণিমার চাঁদ ছুঁয়েছে যার বংশপরম্পরা
তাঁর পবিত্র জীবনী শুরু করার পূর্বে আমরা তাঁর বরকতময় বংশের সাথে পরিচিত হই।
✓ হযরত উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা. হচ্ছেন গুমাইসা (উম্মে সুলাইম) রা.-এর বোন। উভয়েই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তা।
✓ তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক রা.-এর খালা—যিনি আলোকিত করে রেখেছেন হাদীসে রাসূলের বিশাল জগত এবং রাসূলের খাদেম হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।
✓ তাঁর দুই ভাই হারাম ও সুলাইম রা. বদর ও উহুদ যোদ্ধা ছিলেন। উভয়ে বি’রে মা’উনার অন্যতম সদস্য ছিলেন এবং সেখানে শাহাদাত বরণ করেন।
✓ তাঁর ছেলে কায়স ইবনে আমর ইবনে কায়স এবং তার প্রথম স্বামী আমর ইবনে কায়স ইবনে যায়িদ উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানে শাহাদাত বরণ করেন।
এভাবেই আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি গভীর প্রেম ও ভালোবাসা এ পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ের গভীরে স্থান করে নেয়। তাদের নারী-পুরুষ সকলে জিহাদ, জ্ঞানচর্চা, ইসলামের সেবায় জীবন দান, বদান্যতাসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলেছেন। বিশেষত হজ মওসুমে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত লোকদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। আকাবায় অংশগ্রহণকারীরা মদীনায় ফিরে এসে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন তখন গোটা আনসার সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এমন কোনো ঘর ছিল না যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চর্চা হতো না। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুরোধ করবেন, তিনি যেমন মদীনায় একজন প্রচারক পাঠান, যিনি মদীনায় কুরআন শিক্ষা দেবেন। তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসআব ইবনে উমাইরকে মদীনায় পাঠান। এভাবেই হযরত হারিসা রা.-এর ঘরে উঁকি দেয় ইসলামের আলোকোজ্জ্বল প্রভা।
মক্কার মুশরিকরা রাসূলের সাহাবীদের ওপর কষ্ট-নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে সাহাবারা আনসারদের সান্নিধ্যে চলে যান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা.-এর হিজরতের আলোচনা চলাকালের মদীনার প্রতিটি মানুষের মনে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। তারা রাসূলুল্লাহ সা.-কে মদীনায় অভ্যর্থনা জানাতে প্রতিদিন মদীনার উপকণ্ঠে চলে আসেন। এদের দলেও ছিলেন হযরত উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা. ও তার পরিবার বিশেষ করে তার কন্যা হযরত উম্মে হিশাম রা.।
উম্মে হারামের পরিবার যখন দেখলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা.-এর ঘরে তাশরীফ রেখেছেন, তখন তার আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তিনি রাসূলুল্লাহ সা.কে খুব কাছে পাবার সৌভাগ্য লাভ করেন। রাসূলের কাছ থেকে বেশি বেশি ইলম অর্জনের সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেননি। রাসূলুল্লাহ সা.-এর অনুপম চরিত্র ও দিকনির্দেশনা দ্বারা পুরোপুরি উপকার লাভ করেছেন। এতে রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি তার ভালোবাসা বেড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সা.ও তাকে অত্যধিক ভালোবাসতেন যখন দেখলেন তার ভেতরে রয়েছে পরিচ্ছন্ন মন, শেখার মতো মানসিকতা ও মানবতা ও সত্যবাদিতার নিদর্শন।
দাম্পত্য জীবন
হযরত উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা.-এর ঈমান-আমল দিন দিন বাড়তে থাকে। এমন সময় আল্লাহ তাআলা তার সাথে হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা.-এর বিয়ের ব্যবস্থা করে দেন। যাঁর সম্পর্কে হযরত উমর রা. বলেন, উবাদা রা. এমন ব্যক্তি— যিনি হাজার পুরুষের সমতুল্য।৪৭৬ এই উবাদা রা. একজন প্রথম-সারির মহান আনসারী সাহাবী, আকাবার সদস্য, নাকীব, বদর-উহুদ-খন্দকের সাহসী মুজাহিদ এবং বাইআতে রিদওয়ানসহ উল্লেখযোগ্য সকল ঘটনার অংশীদার।
হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. সবেমাত্র যৌবনে পা দিয়েছেন, এমন সময় মক্কায় ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। তিনি সেই মুষ্টিমেয় ভাগ্যবানদের একজন- যারা ইসলামের প্রথম আহবান কানে আসতেই সাড়া দেন। আকাবার প্রথম শপথে যেবার ছয়জন মদীনাবাসী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে হাত রেখে বাইআত করেন, তিনি তাদের একজন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় আকাবায়ও শরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। অনেকের মতে, তিনি দ্বিতীয় আকাবায় বারোজনের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তৃতীয় তথা শেষ আকাবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনোনীত বারো নাকীবের (দায়িত্বশীল) অন্যতম নাকীব। তিনি হন বনী কাওয়াকিল-এর নাকীব।
হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. বিভিন্ন সময়ে ইসলামী খিলাফতের তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। যথা: সাদাকা বিষয়ক কর্মকর্তা, ফিলিস্তিনের কাজী ও হিমসের আমীর।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় যে পাঁচজন আনসারী ব্যক্তি সমগ্র কুরআন হিফজ (মুখস্থ) করেন হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন শিক্ষিত ও সম্মানিত সাহাবীদের একজন। ইলমুল কিরআতে ছিল তার বিশেষ পারদর্শিতা। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় মদীনায় আসহাবে সুফ্ফার জন্য ইসলামের প্রথম যে মাদ্রাসাতুল কিরাআহ প্রতিষ্ঠিত হয় তিনি ছিলেন তার দায়িত্বে। অতি সম্মানিত ও মর্যাদাবান আসহাবে সুফ্ফার সাহাবীরা তার কাছে শিক্ষা লাভ করেন। এই মাদ্রাসায় কুরআনের তালীমের সাথে সাথে লেখাও শেখানো হতো। বহু লোক এই মাদ্রাসা থেকে কিরাআত ও লেখার তালীম নিয়ে বের হন। এই মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত কোনো কোনো ছাত্রের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও তিনি করতেন।
হুদাইবিয়ায় গমনকালে হযরত উবাদা রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে অংশগ্রহণ করেন। ঘটনাটি হচ্ছে: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা যিয়ারতের সিদ্ধান্ত নেন। চৌদ্দশত মুসলিম রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঙ্গী হন। মুসলিমদের কোনো সামরিক উদ্দেশ্যে ছিল না। প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল মাত্র একখানি কোষবদ্ধ তলোয়ার। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদাইবিয়া নামক স্থানে এসে পৌঁছেন। এদিকে কুরাইশদের যুদ্ধ প্রস্তুতির খবর তার কাছে আসতে থাকে। বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে কুরাইশদের বোঝানো হলো যে, কাবা যিয়ারাত ছাড়া তার আর কোনো উদ্দেশ্যে নেই; কিন্তু কুরাইশরা মুসলিমদের মক্কায় প্রবেশ করতে দিতে রাজী হলো না।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসমান ইবনে আফফান রা.- কে দূতরূপে কুরাইশদের নিকট পাঠান। কুরাইশরা তাকে আটক রাখে। এই দিকে উসমান রা. শহীদ হয়েছেন বলে মুসলিমদের নিকট খবর আসে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বাবলা গাছের নীচে বসে সকলের নিকট থেকে এই শপথ নেন, আমরা শেষ হয়ে যাব, কিন্তু লড়াই থেকে পিছু হটবো না। এই শপথের নাম বাইয়াতে রিযওয়ান। মুসলিমদের এই শপথের কথা কুরাইশদের নিকট পৌঁছল। উসমান রা. নিরাপদে ফিরে এলেন।
এই বাইআতে হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. অংশগ্রহণ করেছেন এবং মৃত্যুর ওপর শপথ করেছিলেন। যেই বাইআতে রিযওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'বৃক্ষের নিচের বাইআতে যারা অংশগ্রহণ করেছে তারা কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।৪৭৭
সুসংবাদের আলোয় উদ্ভাসিত এই ভাগ্যবানদের অন্যতম হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. এর মর্যাদাও ছিল ঈর্ষণীয়।
হাদীস বর্ণনা
হযরত উম্মে হারাম রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার থেকে মোট পাঁচটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি হাদীস মুত্তাফাকুন আলাইহি।৪৭৮ সে সব হাদীস উঁচু স্তরের অনেক সাহাবী ও তাবিয়ী বর্ণনা করেছেন। যেমন: আনাস ইবনে মালিক রা., আমর ইবনে আসওয়াদ রা., উবাদা ইবনে আস-সামিত রা., আতা ইবনে ইয়াসার, ইয়ালা ইবনে শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।৪৮৯
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। তার আগেই সাহাবায়ে কেরাম মদীনায় হিজরত করেন। সে সব মুজাহির সাহাবায়ে কেরামদেরও হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. ধন-সম্পদ দিয়ে সার্বিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবীরা মদীনায় হিজরত করে গেলে এবং সেখানে বসবাস করতে থাকলে দ্বীনের জন্য আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাহায্য-সহযোগিতার দায়িত্ব আঞ্জাম দেন এবং এক্ষেত্রে শক্তি ও সাহস যোগান হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা.।
রাসূলের কাছে তার মর্যাদা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উম্মে হারাম রা.-কে যথেষ্ট মর্যাদা ও গুরুত্ব দিতেন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার কেন্দ্রস্থল থেকে দুই মাইল দূরে তাকওয়া ও খোদাভীত্তির ওপর ভিত্তি করে যে মসজিদটি নির্মাণ করেন সেটি হলো, মসজিদুল কুবা। কুবার এই পবিত্র মসজিদের পাশে ছিল উম্মে হারামের পরিবারের বসবাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝে মাঝে তার গৃহে যেতেন এবং দুপুরে বিশ্রামও নিতেন। তার বোন হচ্ছেন হযরত উম্মে সুলাইম রা.।৪৮০
হযরত আনাস রা. বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট আসলেন। তখন বাড়িতে কেবল আমি, আমার মা (উম্মে সুলাইম) ও আমার খালা উম্মে হারাম ছিলেন। তিনি আমাদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা এসো, আমি তোমাদের নিয়ে নামায আদায় করি। তখন কোনো নামাযের ওয়াক্ত ছিল না। তিনি আমাদের নিয়ে নামায আদায় করলেন এবং আমাদের পরিবারের সকলের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কল্যান কমনা করে দুআ করলেন।৪৮১
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে হারামের রা. গৃহে এলে তিনি খাবার তৈরি করে তাকে খাওয়ান। আহার শেষে একটু বিশ্রাম নিতে থাকেন, আর উম্মে হারাম রা. রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথার চুল বিলি দিয়ে উকুন দেখতে শুরু করেন। এমতাবস্থায় রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটু হালকা ঘুমের ভাব এসে যায়। একটু পরে জেগে উঠে মৃদু হেসে উম্মে হারাম রা.-কে শাহাদাতের সুসংবাদ দান করেন। আর সেদিন থেকেই তাকে ‘আশ শাহীদা' (মহিলা শহীদ) বলা হতে থাকে।৪৮২ এ ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে,
হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা.-এর নিকট যাতায়াত করতেন এবং তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে খেতে দিতেন। উম্মে হারাম রা. ছিলেন, উবাদাহ ইবনে সামিত রা.-এর স্ত্রী। একবার আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ঘরে গেলে তিনি তাকে আহার করান এবং তার মাথার উকুন বাছতে থাকেন। এক সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমিয়ে পড়েন। তিনি হাসতে হাসতে ঘুম থেকে জাগলেন। উম্মে হারাম রা. বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল, হাসির কারণ কী?' তিনি বললেন, 'আমার উম্মাতের কিছু ব্যক্তিকে আল্লাহর পথে জিহাদরত অবস্থায় আমার সামনে পেশ করা হয়। তারা এ সমুদ্রের মাঝে এমন আরোহী যেমন বাদশাহ তখতের উপর, অথবা বলেছেন, বাদশাহর মতো তখতে উপবিষ্ট।' এ শব্দ বর্ণনায় ইসহাক রহ. সন্দেহ করেছেন।
উম্মে হারাম রা. বলেন, 'আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর নিকট দুআ করুন—যেন আমাকে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।' আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করলেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার ঘুমিয়ে পড়েন। অতঃপর হাসতে হাসতে জেগে উঠলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আপনার হাসার কারণ কী?' তিনি বললেন, 'আমার উম্মতের মধ্য থেকে আল্লাহর পথে জিহাদরত কিছু ব্যক্তিকে আমার সামনে পেশ করা হয়।' পরবর্তী অংশ প্রথম উক্তির মতো। উম্মে হারাম রা. বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আল্লাহর নিকট দুআ করুন, যেন আমাকে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বললেন, তুমি তো প্রথম দলের মধ্যেই আছ। অতঃপর মুআবিয়া ইবনে আবু সুফইয়ান রা.-এর সময় উম্মে হারাম রা. জিহাদের উদ্দেশে সামুদ্রিক সফরে যান এবং সমুদ্র থেকে যখন বের হন তখন তিনি তার সওয়ারী থেকে ছিটকে পড়েন। এতে তিনি শাহাদাত লাভ করেন।৪৮৩
ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন
সময় গড়িয়ে চলল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফা আবু বকর ও উমর রা. একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। ইসলামী খিলাফতের সীমানা বৃদ্ধি পেতে লাগল। তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রা. খিলাফতের মসনদে আসীন। সিরিয়ার আমীর হযরত মুআবিয়া ইবনে আবি সুফইয়ান রা. খলীফার নিকট সাগর দ্বীপ কুবরুস (সাইপ্রাস) অভিযানের অনুমতি চাইলেন। উল্লেখ্য যে, এ সময় কুবরুস ছিল বাইজান্টাইন রোমান শাসিত একটি দ্বীপ। ইতোপূর্বে মুসলমানদের যেমন কোনো নৌ-বাহিনী ছিল না তেমনি ছিল না জলপথে অভিযানের কোনো অভিজ্ঞতা। তাই আমীর মুআবিয়া রা.-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত উসমান রা. মজলিসে শূরার বৈঠক আহ্বান করলেন। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর নৌ-বাহিনী গঠন ও জলপথে কুবরুস অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়। এটাই ছিল মুসলমানদের নৌপথে প্রথম অভিযান। তাই দারুণ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।
মজলিসে শূরার সিদ্ধান্তমতে, হযরত উসমান রা. হিজরী ২৭ সনে সাগর পাড়ি দিয়ে কুবরুস অভিযানের নির্দেশ দেন। হযরত মুআবিয়া রা. একটি নৌ-বাহিনী গঠন করেন। এই নৌবাহিনীতে হযরত আবু যর গিফারী রা., আবুদ দারদা রা., উবাদা ইবনে সামিত রা. প্রমুখের মতো বহু উঁচু স্তরের সাহাবীকে অন্তর্ভুক্ত করেন।৪৮৪
যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে হারামকে নৌ-যুদ্ধে অংশ গ্রহণের ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং যেদিন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে একথা,
أَوَّلُ جَيْشِ مِنْ أُمَّتِي يَغْزُونَ الْبَحْرَ قَدْ أَوْجَبُوا قَالَتْ أُمُّ حَرَامٍ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنَا فِيهِمْ قَالَ أَنتِ فِيهِمْ
আমার উম্মাতের মধ্যে প্রথম যে দলটি নৌ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে তারা যেন জান্নাত অবধারিত করে ফেলল। উম্মে হারাম রা. বলেন, আমি কি তাদের মধ্যে হবো? তিনি বললেন, তুমি তাদের মধ্যে হবে।৪৮৫
সেদিন থেকে হযরত উম্মে হারাম রা. এমন একটি নৌ-অভিযানের প্রতীক্ষায় ছিলেন। দীর্ঘদিন পরে সে সুযোগ এসে গেল। তিনি স্বামী উবাদা ইবনে সামিত রা.-এর সঙ্গে জিহাদে বেরিয়ে পড়লেন। তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ সাগর পাড়ি দিয়ে মুসলিম বাহিনী কুবরুস অবতরণ করে এবং রোমান বাহিনীকে তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে ইসলামী পতাকা উড্ডীন করেন। মূলত যুদ্ধ ছাড়াই কেবল সন্ধির মাধ্যমে কুবরুস বিজিত হয়। কুবরুস বিজয় শেষে বাহিনী যখন মূল ভূমিতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন একদিন উম্মে হারাম রা. একটি বাহন পশুর পিঠে চড়তে গিয়ে পড়ে যান। ভীষণ আঘাত পান এবং সেই আঘাতে সেখানে ইন্তেকাল করেন। সাগর দ্বীপ কুবরুসের মাটিতেই তাকে দাফন করা হয়। ইমাম যাহাবী বলেন, ফ্রান্সে তার কবর অবস্থিত।৪৮৬ আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৪৯৫. সূরা তাওবাহ, ৯:১০০।
৪৭৬. আসহাবুর রাসূল, ২/১২৫।
৪৭৭. সহীহ, মুসলিম; মুসনাদ, আহমাদ; সুনান, আবু দাউদ; সুনান, তিরমিযী।
৪৭৮. আল মুজতাবা, ১০৫।
৪৮৯. আল ইসাবা, ৪/৪২৪; তারীখুল ইসলাম, ২/৩১৮।
৪৮০. শারহুন নববী লিমুসলিম, ১৬/১৫।
৪৮১. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৬৬২।
৪৮২. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৭৮৮।
৪৮৩. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৭৮৮।
৪৮৪. উসদুল গাবাহ, ভাষ্য নং ৭৪০৩।
৪৮৫. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৯২৪।
৪৮৬. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৩১৭।
📄 কাবশাহ বিনতে রাফে‘ রা.
যাঁর ছেলের ইন্তেকালে কেঁপে উঠেছিল আল্লাহর আরশ
মদীনা থেকে কিছু মানুষ মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোপনে আকাবায় সাক্ষাৎ করেন। তারা রাসূলের উপর ঈমান আনেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর মদীনায় ফিরে যান। এসব নও-মুসলিমদের দ্বীনের তালীম দেওয়া ও ইসলামের আরও প্রচার-প্রসার করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুসআব ইবনে উমাইর রা.-কে দূত হিসাবে মদীনা পাঠালেন। এভাবে তিনি হলেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম দূত।
মক্কায় তখন মুসআব রা.-এর চেয়ে বয়সে ও মর্যাদায় বড় আরও অনেক সাহাবীই ছিলেন; ছিলেন আরও বহু নিকটজন। কিন্তু এ গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসআব ইবনে উমাইরকেই বেছে নেন। মুসআব রা. তার আল্লাহপ্রদত্ত বুদ্ধি, মেধা ও মহৎ চরিত্রের সাহায্যে অত্যন্ত আমানতদারীর সাথে এ কঠিন দায়িত্ব পালন করেন। কঠোর সাধনা, নিষ্ঠা ও মহত্ত্বের সাহায্যে তিনি মদীনাবাসীর হৃদয়ের সাথে সংলাপ করেন। ফলে দলে দলে তারা আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে থাকে।
মক্কা থেকে রওনা হয়ে হযরত মুসআব ইবনে উমাইর রা. মদীনায় এলেন। এর আগে মদীনার মাত্র বারো জন লোক আকাবায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু তিনি মদীনায় আসার পর কয়েক মাস যেতে না যেতেই বহু মানুষ তার দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। হজ মওসুমে মদীনার মুসলমানদের বাহাত্তরজনের একটি প্রতিনিধিদল তাদের শিক্ষক ও নবীর দূত মুসআব ইবনে উমাইর রা.-এর সাথে মক্কায় এলো এবং আকাবায় আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মিলিত হলো।
মুসআব তার দায়িত্বে গুরুত্ব এবং সে দায়িত্বের সীমা সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, তিনি আল্লাহর দিকে আহ্হ্বানকারী এবং আল্লাহর এমন এক দ্বীনের সুসংবাদ দানকারী যা মানবসমাজকে হিদায়াত ও সরল সোজা পথের দিকে আহ্হ্বান জানায়। তার ওপর দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো দায়িত্ব নেই।
মুসআব মদীনায় পৌঁছে আসআদ ইবনে যারারার অতিথি হলেন। তারা উভয়ে মদীনার বিভিন্ন গোত্রে, বিভিন্ন বাড়িতে এবং সমাবেশে এক আল্লাহর দিকে মানুষকে দাওয়াত দিতে লাগলেন। নানারকম বাধারও সম্মুখীন হলেন। কিন্তু সব বাধা তারা অতিক্রম করলেন বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও বিচক্ষণতায়। তাঁর দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেন আমাদের আজকের অতিথি হযরত কাবাশাহ বিনতে রাফে' রা.। এই দ্বীনের নুসরাতে যার অবদান অপরিসীম। তিনি মহান সাহাবী হযরত সাআদ ইবনে মুআয রা.-এর সম্মানিত মাতা। সাআদ ইবনে মুআয রা. ছিলেন বদর দিনের আনসারদের ঝাণ্ডাবাহী এবং সেই দিনের মজলিসে শূরার অন্যতম সদস্য; যাঁর ইন্তেকালে কেঁপে উঠেছিল আল্লাহর আরশ।
এই বিশিষ্ট আনসারী মহিলা সাহাবিয়ার নাম হচ্ছে কাবাশাহ বিনতে রাফে' ইবনে মুআবিয়া ইবনে উবাইদ ইবনুল আবজার আল খাযরিয়া। হযরত সাআদ ইবনে মুআয আল আশহালী রা.-এর সম্মানিত মাতা তিনি।৪৮৭
বনী আবদিল আশহালের মুআয ইবনে নু'মানের স্ত্রী তিনি। সাআদ ছাড়াও তার অন্যান্য সন্তানরা হলেন, আমর ইবনে মুআয, ইয়াস, আউস, আকরাব ও উম্মে হাযাম।
হযরত কাবাশাহ রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। মুসলিম নারীর ইতিহাসে তার রয়েছে অনন্য কীর্তি। হেদায়াতের সূর্য উদিত হলে মদীনা আলোকিত হয়ে ওঠে। সাআদের মাতা সর্বস্ব বিলিয়ে ইসলামের সেবায় ব্রতী হন।৪৮৮ আমরা তাহলে সেখানকার গোড়ার ঘটনার দিকে তাকাই।
মদীনায় তাওহীদের আলো
মদীনা থেকে কতিপয় লোক মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোপনে আকাবায় সাক্ষাৎ করল এবং তার ওপর ঈমান এনে বাইয়াত করল। তারা মদীনায় ফিরে গেল। তাদেরকে দ্বীনের তালীম দেওয়ার এবং অন্যদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে এবং মদীনাকে হিজরতের জন্য প্রস্তুত করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুসআব ইবনে উমাইর রা.কে দূত হিসাবে মদীনা পাঠালেন। এভাবে তিনি হলেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম দূত।
ইসলামের ইতিহাসে তিনি একজন সফল দাঈ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তিনি নিরলস চেষ্টার মাধ্যমে মদীনার প্রতিটি লোকের কানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। তিনি মদীনার একটি কুয়োর ধারে দেওয়ালের ওপর বসলেন। আর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এমন কিছু লোক তাদের পাশে জড়ো হলেন। সাআদ ইবনে মুয়াজ ও উসাইদ ইবনে হুযাইর উভয়ই তখন বনী আবদুল আশহাল গোত্রের নেতা। খবরটি সাআদ ও উসাইদের কানে গেল। সাথে সাথে সাআদ উসাইদকে বললেন, 'তোমার বাপের সর্বনাশ হোক। তুমি এখনই এ দুজন লোকের কাছে যাও। তারা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে আমাদের বাড়ির ওপর চড়াও হয়েছে। তাদের তাড়িয়ে দাও, এ পথ মাড়াতে নিষেধ কর। উসাইদ অস্ত্র সজ্জিত হয়ে তাদের নিকট গেলেন। উল্টো ফল ফললো। তাড়াতে গিয়ে নিজেই তাদের কথায় প্রভাবিত হলেন এবং ইসলাম কবুল করলেন। এবার সেই কুয়ার ধারে মুসআবের কাছে গেলে সাআদ। তিনি সাথে সাথে উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়ালেন এবং বর্শাটি হাতে তুলে নিয়ে তাদের দুজনের দিকে ছুটলেন। নিকটে পৌঁছে যখন তিনি দেখলেন, তারা অত্যন্ত শান্ত ও স্থিরভাবে বসে আছেন।
মুসআব অত্যন্ত নরম মেজাজে সাআদকে বললেন, 'আপনি কি একটু বসে আমার কথা শুনবেন? আমার কথা পছন্দ হলে, ভালো লাগলে, মানবেন। আর পছন্দ না হলে, খারাপ লাগলে আমরা চলে যাব।' সাআদ বললেন, 'এ তো খুব ইনসাফের কথা।' তিনি মাটিতে বর্শাটি গেঁড়ে বসে পড়লেন। মুসআব অত্যন্ত ধীর-স্থিরভাবে তার সামনে ইসলামের দা'ওয়াত পেশ করলেন, তাকে কুরআন পাঠ করে শোনালেন। মুসআব ও সাআদ দু-জনেই বর্ণনা করেছেন, ইসলামের দাওয়াত পেশ করার পর সাআদ কোনো কথা বলার পূর্বেই আমরা তার চেহারায় ইসলামের দীপ্তি লক্ষ্য করেছিলাম। ইসলামের দাওয়াত শোনার পর সাআদ তাদের কাছে জানতে চান? 'তোমাদের এই ইসলাম, এই দ্বীনে প্রবেশ করতে হলে কী কী কাজ করতে হয়?' তারা বললেন, 'গোসল করে পবিত্র হতে হয়, পোশাক পরিচ্ছদ করতে হয়, তারপর কালিমা শাহাদাত উচ্চারণ করে দু-রাকাআত সালাত আদায় করতে হয়।' সাআদ তাই করলেন। তারপর বর্শাটি হাতে তুলে নিয়ে উসাইদের সাথে গোত্রীয় আড্ডার দিকে রওনা দিলেন।
তাদেরকে ফিরতে দে'খে গোত্রীয় লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, 'সাআদ যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিলেন এখন তার সেই চেহারা নেই। তাকে ভিন্ন এক চেহারায় দেখা যাচ্ছে।' সাআদ নিকটে এসে গোত্রীয় লোকদের বললেন, 'ওহে আবদুল আশহাল গোত্রের লোকেরা, বিভিন্ন ব্যাপারে তোমরা আমার কাজ-কর্ম কেমন দেখে থাক?' তারা সমস্বরে জবাব দিল, 'আপনি আমাদের নেতা, আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মতামতের অধিকারী ব্যক্তি এবং আমারে বিশ্বস্ত নকীব বা দায়িত্বশীল।' সাআদ বললেন, তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি ঈমান আনবে তোমাদের কোনো নারী-পুরুষের সাথে কথা বলা আমার জন্য হারাম।'
মদীনার রূপ পাল্টে যেতে থাকে। সেখানে উদিত হয় এক নতুন সূর্য। যে দীপ্তিতে হযরত সাআদ ইবনে মুআয রা.-এর অবদান ছিল অনন্য। এই গৌরবে অন্য কোনো সাহাবী তার জুড়ি নেই। কারণ, একজন মানুষের ইসলাম গ্রহণের প্রভাবে গোটা গোত্রের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা শুধু তার ক্ষেত্রে ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না।৪৮৯
এই সময়েই হযরত সাআদ ইবনে মুআয রা.-এর আম্মাজান ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। গোটা আউস গোত্রের মধ্যে আবদুল আশহাল শাখাটি ছিল সর্বাধিক অভিজাত এবং বংশানুক্রমে নেতৃত্ব ছিল তাদেরই হাতে। সাআদ ছিলেন তার সময়ে একজন বড় মাপের নেতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করলে আবদুল আশহাল গোত্রের দরজা ছিল মুহাজিরদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। তারা অকুণ্ঠচিত্তে কোনোরূপ কষ্ট ও হিসাব ব্যতিরেকে মুহাজিরদের সেবায় এগিয়ে এসে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
বদরের প্রাক্কালে সাআদের ঐতিহাসিক ভূমিকা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদরের দিকে যাত্রার প্রাক্কালে মুহাজির ও আনসারদের সাথে পরামর্শে বসেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনসারদের লক্ষ্য করে বলেন, 'ওহে লোকেরা, আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।' সাথে সাথে সাআদ ইবনে মুয়াজ উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, সম্ভবত আপনি আমাদেরকে উদ্দেশ্য করেছেন?' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ। সাআদ বললেন, 'আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্যবাদী বলে জেনেছি, আর আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি যে, যা কিছু আপনি নিয়ে এসেছেন তা সবই সত্য। আপনার কথা শোনার ও আপনার আনুগত্য করার আমরা অঙ্গীকার করেছি। ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনার যা ইচ্ছা করুন, আমরা আপনার সাথে আছি। সেই সত্তার নামে শপথ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। যদি আপনি আমাদের সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশও দেন, আমরা ঝাঁপিয়ে পড়বো। আমাদের একজনও পেছনে থাকবে না। আগামী কালই আপনি আমাদেরকে নিয়ে শত্রুর সম্মুখীন হোন, আমরা তাতে ক্ষুণ্ণ হবো না। যুদ্ধে আমরা দারুণ ধৈর্যশীল, শত্রুর মুকাবিলায় পরম সত্যনিষ্ঠ। আল্লাহ আমাদের থেকে আপনাকে এমন আচরণ প্রত্যক্ষ করাবেন যাতে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। আল্লাহর ওপর ভরসা করে আমাদের সাথে নিয়ে আপনি অগ্রসর হোন।৪৯০
উহুদের প্রান্তরে
হযরত সাআদ ইবনে মুয়ায রা. উহুদ যুদ্ধেও যোগদান করেন। এ যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থান স্থলের পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন। প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনীর বিজয় হলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের প্রবল আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটে গেল। দারুন একটা বিপর্যয় ঘটে গেল। এ সময় হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অটল ও দৃঢ় থাকেন। অন্য যে পনেরো ব্যক্তি রাসূলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাশে অটল থাকেন তাদের একজন সা'আদ ইবনে মু'য়ায। এই উম্মু তার ভাই আমর ইবনে মু'য়ায শাহাদাতবরণ করেন।
খন্দকের ঘটনা
মদীনার ইহুদী গোত্র বনী কুরাইযার নেতা কা'আব ইবনে আসাদ তার গোত্রের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে একটি মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেছিল। খন্দক যুদ্ধের সময় সে বনী নাযার গোত্রের নেতা হুয়ায় ইবনে আখতাবের কুপরামর্শ ও উস্কানিতে সেই চুক্তি ভেংগে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। একথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ মুসলমানদের কানে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘটনার যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য আউস গোত্রের পক্ষ থেকে সা'আদ ইবনে মুয়ায ও খাযরাজ গোত্রের পক্ষ থেকে সা'আদ ইবনে উবাদাকে পাঠান। তাদের সাথে আরও যান আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও খাওয়াত ইবনে যুবায়ের। তারা বনী কুরাইযা যান এবং তাদের সাথে আলোচনা ও বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে, বিষয়টি সত্য। তারা ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট তাদের তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট পেশ করেন।
গাতফান গোত্রের নেতা আল-হারেস ইবনে আউফ ও উয়ায়না ইবনে হিসনের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ শর্তে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা করলেন যে, তাদের পক্ষ থেকে মদীনার প্রতি কোনো প্রকার হুমকী থাকবে না এবং বিনিময়ে তারা মদীনার উৎপন্ন শস্যের এক তৃতীয়াংশ লাভ করবে। এর মধ্যে হিজরী ৫ম সনে খন্দক যুদ্ধের ডামাডোল। মদীনার দারুণ অভাব দেখা দিল। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সন্ধির ব্যাপারে সা'আদ ইবনে মু'য়ায ও সা'আদ ইবনে উবাদার সাথে পরামর্শ করলেন। তারা দু-জন বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! এ যদি আপনার পছন্দ হয়, আমরা তা পালন করব। যদি আল্লাহর নির্দেশ হয়, তা হলে তো অবশ্যই পালনীয়। তবে কি এটা আমাদের কথা চিন্তা করে করছেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তোমাদের কথা চিন্তা করেই করছি। আমি দেখেছি, গোটা আরব এখন তোমাদের বিরুদ্ধে। আমি চেয়েছি, অন্তত এর বিনিময়ে তাদের শত্রুতা কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকুক।' একথা শুনে সাআদ ইবনে মুয়াজ বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, তারা ও আমরা ছিলাম এক সাথে পৌত্তলিক। আমরা কেউ আল্লাহর ইবাদত করতাম না, তাকে জানতামও না। তখনো তারা ব্যবসা উপলক্ষে এবং অতিথি হিসেবে ছাড়া আমাদের একটি খেজুরও খাওয়ার আশা করেনি। আজ আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি, আল্লাহ ইসলাম ও আপনার দ্বারা আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আর এখন কিনা আমাদের সম্পদের একটি অংশ তাদেরকে দিতে হবে? এমন সন্ধির প্রয়োজন আমাদের নেই। আল্লাহ আমাদের ও তাদের মধ্যে চূড়ান্ত ফায়সালা না করা পর্যন্ত শুধু তরবারি ছাড়া আর কিছুই আমরা তাদের দেব না।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কথা মেনে নিলেন।
যুদ্ধ শুরুর সময় প্রায় কাছাকাছি। সাআদ বর্ম পরে হাতে বর্শা নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে যাচ্ছেন। পথে বনী হারেসার দুর্গে তার মা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর পাশে বসে ছিলেন। তিনি দেখলেন, তার ছেলে একটি কবিতার চরণ আবৃত্তি করতে করতে চলেছে। তার একটি পংক্তি এমন : 'যখন আজল এসে যায় তখন আর মৃত্যুর জন্য আপত্তি কীসের?'
মা কাবাশাহ বিনতে রাফে' রা. চেঁচিয়ে বললেন, 'ছেলে, তুমি তো পেছনে পড়ে গেছ, তাড়াতাড়ি যাও।' সাআদের যে হাতে বর্শা ছিল সেই হাতটি বর্মের বাইরে বেরিয়ে ছিল। সে দিকে ইঙ্গিত করে হযরত আয়েশা বললেন, 'সাআদের মা, দেখ, তার বর্মটি কত ছোট।' যুদ্ধ ক্ষেত্রে পৌঁছার সাথে সাথে তাকে লক্ষ্য করে হিববান ইবনে আবদি মান্নাফ একটি তীর ছোঁড়ে। কোনো কোনো বর্ণনায় হিববানের পরিবর্তে আবু উসামা অথবা খাফাজা ইবনে আসিমের নাম এসেছে। তীরটি তার হাতে লেগে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি করে।
সেকালে মসজিদে নববীতে যুদ্ধে আহতদের সেবা ও চিকিৎসার জন্য একটি শিবির স্থাপন করা হয়েছিল। সম্ভবত এই শিবিরের প্রতিষ্ঠা হয় উহুদ যুদ্ধের পর এবং তা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হুজরার নিকটে।
খন্দক যুদ্ধে সাআদ ইবনে মুয়াজ আহত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দেন, 'তোমরা সাআদকে রুফাইদার তাঁবুতে রাখ। তাহলে আমি নিকট থেকেই তার দেখাশোনা করতে পারব।' হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিদিন এই শিবিরে এসে অসুস্থ সাআদের দেখাশোনা করতেন। তিনি নিজের জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েন, তাই আল্লাহর দরবারে দুআ করেন,
اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ أَبْقَيْتَ مِنْ حَرْبِ قُرَيْشٍ شَيْئًا فَأَبْقِنِي لَهَا ، فَإِنَّهُ لَا قَوْمَ أَحَبُّ إِلَيَّ أَنْ أُجَاهِدَهُمْ مِنْ قَوْمٍ آذَوْا رَسُولَكَ وَكَذَّبُوهُ وَأَخْرَجُوهُ اللَّهُمَّ وَإِنْ كُنْتَ قَدْ وَضَعْتَ الْحَرْبَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ ، فَاجْعَلْهُ لِي شَهَادَةً ، وَلَا تُمِتْنِي حَتَّى تُقِرَّ عَيْنَيَّ مِنْ بَنِي قُرَيْظَةَ
হে আল্লাহ, কুরাইশদের সাথে এ সংঘাত যদি এখনো অবশিষ্ট থাকে তবে আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন। তাদের সাথে লড়াই করার আমার খুব সাধ। কারণ, আপনার রাসূলকে তারা কষ্ট দিয়েছে, তাকে অস্বীকার করেছে এবং মাতৃভূমি মক্কা থেকে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আর যদি সংঘাত শেষ হওয়ার সময় হয়ে থাকে তাহলে এই ক্ষতের দ্বারাই আমাকে শাহাদাত দান করুন। আর বনী কুরাইযার ব্যাপারে আমার চোখে প্রশান্তি না আসা পর্যন্ত আমার মরণ দিয়ো না।
আল্লাহপাক তার দুআর শেষ কথাটি কবুল করেন।
খন্দকযুদ্ধে কুরাইশ ও তাদের মিত্র বাহিনীর পশ্চাদপসরণের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার যাবতীয় ফাসাদের উৎস ইহুদী গোত্র বনু কুরাইযাকে শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, তারা চুক্তিভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এই বনী কুরাইযার সাথে প্রাচীনকাল থেকে মদীনার আউস গোত্রের মৈত্রীচুক্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাদেরকে শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত নিলেন তখন আউস গোত্রের লোকেরা বলল, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাদের প্রতিপক্ষ খাযরাজ গোত্রের বিরুদ্ধে তারা ছিল আমাদের মিত্র। এর আগে আপনি আমাদের ভাই খাযরাজীদের মিত্র গোত্র বনী কায়নুকা'র বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তা তো আপনার জানা আছে।' মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুলও একই রকম কথা বলল। আসলে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে বনী কুরাইযার ব্যাপারে কোনো কঠিন দণ্ডের আশংকা করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ওহে আউস গোত্রের লোকেরা, তোমাদের গোত্রের কেউ একজন তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দিলে তোমরা কি তাতে খুশি হবে?' তারা বলল, হ্যাঁ, খুশি হবো।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তাদের ব্যাপারে সাআদ ইবনে মু'য়ায রায় দেবে।'
বনী কুরাইযার ভাগ্য নির্ধারণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে সাআদ ইবনে মু'য়াযকে বিচারক নিয়োগ করলেন। সাআদ তো তখন আহত অবস্থায় দারুণ অসুস্থ। আউস গোত্রের লোকেরা উটের পিঠে গদি বসিয়ে তার ওপর সা'দকে উঠিয়ে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট নিয়ে গেল। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সা'দকে লক্ষ্য করে বলেন, 'এই লোকেরা তোমার রায়ের অপেক্ষায় আছে।' সাআদ বললেন,
আমি আমার রায় ঘোষণা করছি : তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধ করার উপযুক্ত তাদেরকে হত্যা করা, তাদের নারী ও শিশুদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করা এবং তাদের ধন-সম্পদ বণ্টন করে দেওয়া হোক।
সাআদের অন্তিম শয্যা
দিন দিন হযরত সাআদ রা.-এর ক্ষত বেড়েই চলল। এমন কি প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় তা বাড়তে থাকে। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তার ক্ষতে সেঁক দেন। তাতে রক্ত ঝরা বন্ধ হয়ে ফুলে যায়। হঠাৎ একদিন ক্ষতটি ফেটে তীব্র বেগে রক্ত ঝরতে থাকে। ইবনে আব্বাস বলেন, যখন সা'দের ক্ষত থেকে রক্ত প্রবাহ শুরু হয় তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৌড়ে এসে তার মাথাটি কোলের ওপর উঠিয়ে নেন। সা'দের রক্তে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চেহারা ও দাড়ি ভিজে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি সাদা চাদর দিয়ে তার দেহটি ঢেকে দেন। চাদরটি এত ছোট ছিল যে, মাথা ঢাকলে পা এবং পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যাচ্ছিল। সাআদ ছিলেন ফর্সা মোটা মানুষ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাআদের জন্য দুআ করেন এই বলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّ سَعْدًا قَدْ جَاهَدَ فِي سَبِيلِكَ ، وَصَدَّقَ رَسُولَكَ ، وَقَضَى الَّذِي عَلَيْهِ ، فَتَقَبَّلُ رُوحَهُ بِخَيْرِ مَا تَقَبَّلْتَ بِهِ رُوحًا
হে আল্লাহ, সাআদ তোমার রাস্তায় জিহাদ করেছেন, তোমার নবীকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে এবং তার পথে চলেছে। তুমি তার রূহকে সর্বোত্তমভাবে কবুল করো।
রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দুআ শুনে সাআদ চোখ খোলেন এবং বলেন,
السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ .. أَمَا إِنِّي لَأَشْهَدُ إِنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ
আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল।
হযরত সাআদ ইন্তেকাল করলেন। ইবনে ইসহাক বলেন, সাআদ ইবনে মুয়াজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর রাতের বেলা একটি রেশমী পাগড়ী মাথায় বেঁধে জিবরাঈল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলেন, 'ইয়া মুহাম্মাদ, এ মৃত ব্যক্তিটি কে, যার জন্য আসমানের সবগুলি দরজা খুলে গেছে এবং আরশ কেঁপে উঠেছে?' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাপড় টানতে টানতে খুব দ্রুত সাআদের নিকট গিয়ে দেখলেন, তিনি ইন্তেকাল করেছেন।
আবু সায়ীদ খুদরী রা. বলেন, যাঁরা জান্নাতুল বাকী গোরস্তানে সাআদের কবর খুঁড়েছিল আমি তাদের একজন। আমরা কবরের মাটি খোঁড়ার সময় মিশকের ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। শুরাহবীল ইবনে হাসানা বলেন, এক ব্যক্তি সাআদের কবরের মাটি থেকে এক মুঠ মাটি নিয়ে ঘরে রেখে দেয়। কিছুদিন পরে সে দেখে, তা মাটি নয়; বরং মিশক। তার মৃত্যুর ঘটনাটি যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বোঝা যায় তার জানাযায় ফেরেশতাদের অংশগ্রহণ এবং আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠার মাধ্যমে।৪৯১
এ ঘটনার কিছু দিন পরেই হযরত কাবাশাহ রা.-এর ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন ইবাদতগুজার ও রোযাদার। জান-মাল, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তিনি ইসলামের সেবা করে গেছেন। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৪৮৭. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৩৭।
৪৮৮. নিসাউ মুবাশশিরাত বিল জান্নাহ, ১৪১।
৪৮৯. দালাইলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকী, ২/৪৩৮-৪৩৯; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১৫২।
৪৯০. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৪৪৯; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, ৮/৪৬৯; দালাইলুন নুবুওয়াহ, ৩/৩৪; ফাতহুল বারী, ৭/২৮৮; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৭৭৯।
৪৯১. মুত্তাফাকুন আলাইহি।
📄 সুমাইয়া বিনতে খুবাত রা.
ইসলামের প্রথম শহীদ
বিপদশঙ্কুল বৈরী পরিবেশে ধৈর্যধারণের অনন্য দীক্ষা দিয়ে গেছেন যেই মহীয়সী নারী, তিনি হলেন ইসলামের প্রথম শহীদ হযরত সুমাইয়া বিনতে খুব্বাত রা.। ইসলামের ইতিহাসে তার সম্মান ও মর্যাদা সুউচ্চ। এটা তো ধ্রুব সত্য যে, হযরত ইয়াসির এবং তার পরিবার জান্নাতের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী,
صَبْرًا إِلَ يَاسِرٍ ، فَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْجَنَّةُ
হে ইয়াসিরের পরিবার, ধৈর্য ধরো। নিশ্চয় তোমাদের ঠিকানা জান্নাত।
এ কথা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে কেবল সান্ত্বনাই দেননি; বরং তিনি এই বাস্তবতার ঘোষণা ও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন—যা তিনি জানতেন যে, ঘটনা নিশ্চিত এমনই হবে। প্রকৃতপক্ষে তা তিনি আপন অন্তঃকরণ ও নিজ চোখ দ্বারা অনুধাবন করেছিলেন।
হযরত আম্মার রা.-এর পিতা ইয়াসির ইয়ামানের মাজহাজ গোত্রের আনসী শাখার সন্তান। তবে তার ছেলে আম্মার মক্কার বনু মাখযুমের আযাদকৃত দাস। ইয়াসির তার দু'ভাই—হারিস ও মালিককে সঙ্গে নিয়ে তাদের নিখোঁজ চতুর্থ ভাইয়ের সন্ধানে মক্কায় আসেন। হারিস ও মালিক স্বদেশ ইয়ামানে ফিরে গেলেন; কিন্তু ইয়াসির মক্কায় থেকে যান। মক্কার রীতি অনুযায়ী তিনি আবু হুযায়ফা ইবনে মুগীরা মাখযুমীর সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে থাকেন। আবু হুজাইফা তার দাসী সুমাইয়াকে ইয়াসিরের সাথে বিয়ে দেন এবং তাদের ছেলে আম্মারের জন্ম হয়।৪৯২
আবু হুজাইফা আম্মারকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে নিজের সাথে রেখে দেন। যতদিন আবু হুজাইফা জীবিত ছিলেন আম্মার তার সাথেই ছিলেন। উল্লেখ্য যে, এই আবু হুজাইফা ছিলেন নরাধম আবু জাহলের চাচা।
হযরত সুমাইয়া রা. যখন বার্ধক্যে দুর্বল হয়ে পড়েছেন তখন মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা হয়। তিনি প্রথম ভাগেই স্বামী ইয়াসির ও ছেলে আম্মারসহ গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন। মক্কায় তাদের এমন কোনো আত্মীয়-বন্ধু ছিল না যারা তাদেরকে কুরাইশদের নিষ্ঠুরতার হাত থেকে বাঁচাতে পারত। এজন্য তারা তাদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালাতে কোনো রকম সংশয়বোধ করেনি।
আরবের আগুনঝরা মধ্যাহ্ন। ঊর্ধ্বাকাশ থেকে মরু-সূর্য যেন আগুন বৃষ্টি করছে। মরুর লু হাওয়া আগুনের দাব-দাহ নিয়ে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে চারদিক। এমনি সময় আগুন ঝরা মরুভূমির বুকে নির্যাতন চলছে এক নারীর ওপর—সুমাইয়ার ওপর। সুমাইয়ার নারী দেহ ভঙ্গুর, কিন্তু আত্মা তো অজেয়। বক্ষে তার বিশ্বাস-ঈমানের দুর্জয় শক্তি ও সাহস। সে প্রাণবহ্নি নির্বাপিত হবার মতো নয়।
সুমাইয়ার ওপর এ নির্যাতন কেন? কেন তাকে এই প্রখর মধ্যাহ্নে সূর্যের বহ্নিতলে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হচ্ছে? তাঁর অপরাধ—এক আল্লাহকে প্রভু হিসেবে স্বীকার করেছেন, যুগ যুগ ধরে পূজ্য লাত উজ্জা-হোবলদের বিরোধিতা করেছেন, তাঁর জীবন মৃত্যু-সাধনা সব কিছুই নিবেদন করেছেন আল্লাহর নামে। অমানুষিক নির্যাতনেও সুমাইয়া অচল অটল।
তাঁর দেহ নির্যাতন নিপীড়নে জর্জরিত হোক, তার কোমল দেহ পুড়ে ছাই হয়ে যাক, তবু অসত্যের কাছে, অত্যাচারের কাছে তাঁর অমর আত্মা কখনো নতি স্বীকার করবে না। এত কষ্ট দিয়েও শত্রুর মন টলল না।
ইমাম আহমাদ ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, প্রথম যারা ইসলামের ঘোষণা দান করেন, তাঁরা হলেন সাতজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর, আম্মার, আম্মারের মা সুমাইয়া, সুহাইব, বিলাল ও মিকদাদ রা.। আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার চাচার দ্বারা এবং আবু বকরকে তার গোত্রের দ্বারা নিরাপত্তা বিধান করেন। আর অন্যদেরকে মুশরিকরা লোহার বর্ম পরিয়ে প্রচণ্ড রোদে দাঁড় করিয়ে রাখত।৪৯৩
সেই সময়টাতে এই স্বামী-স্ত্রীর ইসলাম গ্রহণ ওই সকল পুণ্যাত্মাদের মতো ছিল যাদের আল্লাহর নেয়ামত-হেদায়াত দ্বারা পুরস্কৃত করা হয়েছিল। নতুন হেদায়াতপ্রাপ্ত পুণ্যাত্মারা কুরাইশের নানাবিধ কষ্ট-নির্যাতন ও অত্যাচারের স্টিমরোলারের সর্বোচ্চ মাত্রা সহ্য করেছেন।৪৯৪
কুরাইশরা মুমিনদের ওপর নিত্যনতুন ও অভিনব শাস্তির পাহাড় মাড়িয়ে চলেছে। ঈমান আনা ব্যক্তি যদি নিজ গোত্রের নেতা বা সম্মানিত শ্রেণির হতো, সেক্ষেত্রে কুরাইশরা শুধু তাদেরকে ধমক দিত এবং মন্দভাবে গালাগাল করত। এমন কোনো মর্যাদাবান মুমিন আবু জাহালের সামনে পড়লে আবু জাহাল বলত, তুমি নিজ বাপ-দাদার ধর্ম পরিত্যাগ করেছ, অথচ তারা তোমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। এখন তো আমরা তোমাকে নির্বোধ ও অজ্ঞই মনে করছি। তোমার মান-মর্যাদা আমরা ধূলিস্যাত করে দেব। তোমার ব্যবসা-বাণিজ্য, কায়-কারবার ধ্বংস করে দেব, তোমার ধন-সম্পদ নিঃশেষ করে ছাড়বো।
এরপর কুরাইশরা সেই সব মুমিনদের সাথে অবরোধের যুদ্ধ আরোপ করে দিতে থাকে। আর যদি মুমিনরা হয়ে থাকে মক্কার কোনো দুর্বল, দুঃস্থ বা গোলাম তথা ক্রীতদাস শ্রেণির লোক, তাহলে তাদেরকে পুড়িয়ে মারতেও কুণ্ঠাবোধ করত না কুরাইশরা। ইয়াসির পরিবার এই দ্বিতীয় শ্রেণিরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাদেরকে কঠিন শাস্তি ও নির্যাতনে নিঃশেষ করে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় বনু মাখযূমের ওপর। এরা সকলে মিলে ওই পরিবার তথা হযরত ইয়াসির রা., হযরত সুমাইয়া রা. ও হযরত আম্মার রা.-কে মক্কার উত্তপ্ত মরুভূমিতে নিয়ে যেত। সেখানে তাদের খুব নির্মমভাবে নির্যাতন করত।
শাস্তির এই নির্মমতার মধ্যে যা হযরত সুমাইয়া রা.-এর ললাটে যা জুটেছে, তা বড়ই হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী। আমরা সে ব্যাপারে আলোকপাত করব না। অত্যুক্তি ছাড়া শুধু এটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করছি যে, শহীদদের সরদার হযরত সুমাইয়া রা. সেদিন যেভাবে অটল ছিলেন, এতে তিনি মানবতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক কালজয়ী ও উপমারহিত ইতিহাসই সৃষ্টি করে গেছেন। সর্বকালের সর্বযুগের মুমিনদের হৃদয়ে তিনি এক মহাত্মা মা হিসেবে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন খবর পেতেন, অমুক স্থানে ইয়াসির পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তখন তিনি সেখানে যেতেন। এটা ওই সময়ের ঘটনা, যখন রাসূলের নিকট মক্কার কাফেরদের পক্ষ থেকে আপতিত শাস্তি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার মতো কোনো উপায়-উপকরণ ছিল না। এটা ছিল আল্লাহ তাআলারই অভিপ্রায়।
নতুন দ্বীন, অর্থাৎ ইবরাহীমের ভারসাম্যপূর্ণ মিল্লাত যার ঝাণ্ডা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তুলে ধরছেন; এটা তো সংস্কারের সাময়িক বা নির্দিষ্ট কোনো বিপ্লব নয়; বরং এটা ছিল বিশ্বমানবতার এক পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এক কালজয়ী ইতিহাস বিনির্মাণে মুমিনদের এমন কষ্ট-নির্যাতন ও ত্যাগ-বিসর্জনের বিকল্প ছিল না। তাদের আত্মদান ও অপরিসীম ত্যাগই সেই কংক্রিট যাঁর ওপর নির্মিত হয়েছে দ্বীনী ও আকীদার দৃঢ় ইমারত—কখনো যা টলবে না, হেলে পড়বে না।
এ সব ত্যাগ-তিতিক্ষা ওই সুগন্ধী যার সুবাসে মুমিনদের অন্তরে নিষ্ঠা ও ভালোবাসা চির জাগরূক রয়েছে। এটা ওই মিনার যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দ্বীনের প্রকৃত রূপ এবং এর সত্যতা ও মর্যাদার দিকে চিরদিন আহ্বান করে যাবে। এটা জরুরি ছিল যে, ইসলাম গ্রহণকারী ও পালনকারীরা তাদের দ্বীনের জন্য এমন ত্যাগ ও কুরবানীর পরাকাষ্ঠা দেখাবে যা ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। কুরআনে কারীমের অধিকাংশ আয়াতে এমন মর্মই বিবৃত হয়েছে। কুরআন বলছে,
أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ
মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? ৪৯৫
أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّبِرِينَ
তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো জানেননি তাদেরকে যারা তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদের। ৪৯৬
وَ لَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَ لَيَعْلَمَنَّ الْكَذِبِينَ
আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী। ৪৯৭
أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تُتْرَكُوا وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جُهَدُوا مِنْكُمْ وَلَمْ يَتَّخِذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَ لَا رَسُوْلِهِ وَ لَا الْمُؤْمِنِينَ وَلِيْجَةً وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে? অথচ এখনো আল্লাহ যাচাই করেননি যে, তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করেছে এবং কারা আল্লাহ, তার রাসূল ও মুমিনগণ ছাড়া কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেনি। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। ৪৯৮
مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَ مَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُّسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ فَأْمِنُوا بِاللَّهِ وَ رُسُلِهِ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ
আল্লাহ এমন নন যে, তিনি মুমিনদের (এমন অবস্থায়) ছেড়ে দেবেন যার ওপর তোমরা আছ। যতক্ষণ না তিনি পৃথক করবেন অপবিত্রকে পবিত্র থেকে। আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের গায়েব সম্পর্কে জানাবেন। তবে আল্লাহ তার রাসূলদের মধ্য থেকে যাকে চান বেছে নেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনো। আর যদি তোমরা ঈমান আনো এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপ্রতিদান। ৪৯৯
وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ
আর তোমাদের ওপর যে বিপদ এসেছিল দুই দল মুখোমুখি হওয়ার দিন তা আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি মুমিনদেরকে জেনে নেন। ৫০০
أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَ الَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَّا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
নাকি তোমরা ভেবেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো তোমাদের নিকট তাদের মতো কিছু আসেনি, যারা তোমাদের পূর্বে বিগত হয়েছে। তাদেরকে স্পর্শ করেছিল কষ্ট ও দুর্দশা এবং তারা কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তার সাথী মুমিনগণ বলছিল, 'কখন আল্লাহর সাহায্য (আসবে)'? জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী। ৫০১
আল্লাহু আকবার! কুরআন তার বাহক ও অনুসারীদের এটা শিখিয়েছে যে, ত্যাগই ঈমানের অলংকার। যুলুম, অন্যায় ও অত্যাচারের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া এমন একটি বিষয় যা ঈমানের ক্ষেত্রে ঈর্ষাযোগ্য মর্যাদার দাবি রাখে। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বোঝা যায়, কিছু কিছু কঠিন পরীক্ষা আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তি স্থাপন করে। কিছু আবার খুঁটি হিসেবে গেঁথে থাকে এবং একটি স্বতন্ত্র অবয়বে রূপ দেয়, ত্যাগ ও কুরবানীর পরকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করে। এই ঐতিহাসিক কীর্তির সামনে নিষ্ঠা আর আত্মসংশোধনের ওপর উৎসর্গিত একটি দল মনোনীত করা হয় যারা অনাগত মুমিনদের জন্য উন্নত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
উসমান রা. বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বাতহা উপত্যকায় হাঁটছিলাম। তখন দেখতে পেলাম, আম্মারের পিতা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে বলে ওঠেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ, কালচক্র এ রকম? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে ইয়াসিরের পরিবার-পরিজন! ধৈর্য ধরো। হে আল্লাহ, ইয়াসিরের পরিবারবর্গকে ক্ষমা করুন।৫০২
ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করে এসেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিদিন ইয়াসির পরিবারের সাহস ও ধৈর্যে উদ্দীপনা যোগাতে তাদের কাছে যেতেন। তাদেরকে যখন অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হতে দেখতেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুবই মর্মাহত হতেন। একদিন তিনি ওই খান্দানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হচ্ছে।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা শুনে বললেন,
صَبْرًا أَبَا الْيَقْظَانِ.. صَبْرًا اَل يَاسِرٍ ، فَإِنَّ مَوْعِدَكُم الجَنَّة
আবুল ইয়াকযান, ধৈর্যধারণ করো। হে ইয়াসির পরিবার, ধৈর্যধারণ করো। তোমাদের ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত।৫০৩
সারাদিন এভাবে শাস্তি ভোগ করার পর সন্ধ্যায় তারা মুক্তি পেতেন। শাস্তি ভোগ করে হযরত সুমায়্যা প্রতিদিনের মতো একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেন। পাষণ্ড আবু জাহেল তাকে অশালীন ভাষায় গালি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তার পশুত্বের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়। সে সুমায়্যার দিকে বর্শা ছুড়ে মারে এবং সেটি তার শরীরে গিয়ে বিদ্ধ হয়। আর তাতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।৫০৪
মায়ের এমন অসহায় মৃত্যুবরণে ছেলে আম্মারের দুঃখের অন্ত ছিল না। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, এখন তো যুলুম-অত্যাচার সীমাহীন হয়ে উঠেছে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিলেন। তারপর বললেন, 'হে আল্লাহ, তুমি ইয়াসিরের পরিবারের কাউকে জাহান্নামের আগুনের শাস্তি দিয়ো না।’৫০৫
হযরত সুমাইয়া রা.-এর শাহাদাতের ঘটনাটি হিজরতের পূর্বের। এ কারণে তিনিই হলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। হযরত মুজাহিদ রহ. বলেন, ইসলামের প্রথম শহীদ হলেন আম্মারের মা সুমাইয়া।৫০৬
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. এবং তাদের পরিবারের বিভিন্ন কষ্ট-যন্ত্রণা ও নির্যাতনের কথা তার বন্ধুরা পরস্পর বলাবলি করতেন। আমর ইবনে হাকাম বলতেন, 'আম্মারকে এত ভয়ঙ্কর নির্যাতন করা হতো যে, সে বলতে পারত না সে কী বলছে।' আমর ইবনে মাইমূন বলতেন, 'একদিন মুশরিকরা আম্মারকে আগুনের অঙ্গারের ওপর শুইয়ে দিয়েছে। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি ব্যথিত চিত্তে আম্মারের মাথায় হাত রেখে বললেন,
يُنَارُ كُونِي بَرْدًا وَ سَلَمًا عَلَى عَمَّارٍ ، كَمَا كُنْتَ بَرْدًا وَ سَلَمَا عَلَى إِبْرَاهِيمَ
হে আগুন, ইব্রাহিমের মতো তুমি আম্মারের জন্য ঠাণ্ডা হয়ে যাও।
একদিন মুশরিকরা তাকে অনেকক্ষণ পানিতে ডুবিয়া রাখে। এতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ অবস্থায় শত্রুরা তার মুখ দিয়ে তাদের ইচ্ছেমতো স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। তিনি চেতনা ফিরে পেয়ে অনুশোচনায় জর্জরিত হতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, 'আম্মার, খবর কী?' আম্মার জবাব দিলেন, 'আজ আপনার শানে কিছু খারাপ এবং তাদের উপাস্যদের সম্পর্কে কিছু ভালো কথা না বলা পর্যন্ত আমি মুক্তি পাইনি।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার অন্তর কী বলছে?' আম্মার বললেন, 'আমার অন্তর ঈমানে পরিপূর্ণ।' প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত দরদের সাথে তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন, 'কোনো ক্ষতি নেই। এমন অবস্থার মুখোমুখি হলে আবারও এমনটি করবে।' তারপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করেন,
إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيْمَانِ
যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর কুফরী করে, তবে যাদেরকে বাধ্য করা হয় এবং তাদের অন্তর ঈমানের ওপর দৃঢ় (তাদের কোনো দোষ নেই)।৫০৭
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে এ কথা শোনার পর অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করলেন। কাফেরদের নির্যাতনে আক্রান্ত শরীরের ক্ষতের কথা ভুলে যান এবং এ ব্যথার কোনো তোয়াক্কা করেন না।
আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়ে যান আম্মারের মা সুমাইয়ার ওপর। অনুগ্রহ বর্ষণ করুন ইসলামের প্রথম শহীদের প্রতি; সেই মহীয়সী নারীর ওপর যাঁর ছেলে আম্মার নামায পড়েছেন ইসলামের প্রথম মসজিদে। আল্লাহর শান্তি ও সন্তুষ্টি বর্ষিত হোক তার পরিবারের প্রতি। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৪৯২. আসহাবুর রাসূল, ৫২৩-৫২৪।
৪৯৩. আল বিদায়া ওয়াননিহায়া, ৩/২৮; আল ইসাবাহ, ৪/৩৩৫।
৪৯৪. আল ইসতিআব, ৪/৩২৪।
৪৯৫. সূরা আনকাবুত, ২৯:২।
৪৯৬. সূরা আল-ইমরান, ৩:১৪২।
৪৯৭. সূরা আনকাবুত, ২৯:৩।
৪৯৮. সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১৬।
৪৯৯. সূরা আল-ইমরান, ৩:১৭৯।
৫০০. সূরা আল-ইমরান, ৩:১৬৬।
৫০১. সূরা আল-বাকারা, ২:২১৪।
৫০২. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৩/১৭৭; কানযুল উম্মাল, ৭/৭২।
৫০৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৩/১১৮।
৫০৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৫/৫৯।
৫০৫. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৩১৯।
৫০৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/৫৯।
৫০৭. সূরা নাহল, ১৬:১০৬।
📄 সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা.
রাসূলের দেহরক্ষীর মা ও মুশরিক হত্যাকারী প্রথম নারী
ইসলামী ইতিহাসের অসংখ্য রোমাঞ্চকর ঘটনাবলী পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মনে হয়, দ্বীনী-চেতনা যখন অন্তরের গভীরে দৃঢ়মূল হয়ে ওঠে এবং মৃত্যুর কোনো পরোয়া থাকে না, একমাত্র তখনই মানুষের মধ্যে অকুতোভয় অমিত শক্তিধর ব্যক্তিত্বের উন্মেষ ঘটে। তারা বীরত্বের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে জীবন ও জগতকে সূর্যাস্তের রক্তিম আভার মতো রাঙিয়ে পরম আশ্রয়ের সান্নিধ্যে পাড়ি জমায়।
মুমিনগণের হৃদয় থেকে কীভাবে বীরাঙ্গনার সৃষ্টি হয়, ইসলামের ইতিহাসে তার এক অত্যুজ্জ্বল চরিত্র হলেন হযরত সাফিয়্যা বিনতে আব্দুল মুত্তালিব রা.।
সব দিক থেকেই পরিপূর্ণ যিনি
হযরত সাফিয়্যা বিনতে আব্দুল মুত্তালিব রা. সব দিক দিয়েই সৌভাগ্যবতী একজন মহীয়সী নারী। মর্যাদা ও গৌরব তাকে বেষ্টন করে রেখেছিল। তাঁর পিতা হলেন আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম—যিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর সম্মানিত দাদা এবং কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট নেতা। তাঁর মাতা হচ্ছেন, হালাহ বিনতে ওয়াহাব—রাসূলুল্লাহ সা.-এর মাতা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের বোন। তাঁর প্রথম স্বামী হলেন বনী উমাইয়্যার বিশিষ্ট নেতা আবু সুফইয়ান ইবনে হারব রা.-এর ভাই হারিস ইবনে হারব। তিনি ইন্তেকাল করলে হযরত সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর দ্বিতীয় স্বামী হন আউয়াম ইবনে খুওয়াইলিদ যিনি জাহিলী যুগের নারীনেত্রী এবং ইসলামের প্রথম উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদের ভাই। তাঁর ছেলে যুবাইর ইবনুল আউয়াম—যিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাওয়ারী তথা দেহরক্ষী।
হযরত সাফিয়্যা রা. এমন ঘরে লালিত-পালিত হন, যে ঘরটি ছিল কুরাইশ নেতা আবদুল মুত্তালিবের বাসস্থান। বীরত্ব ও সাহসিকতাকে সম্বল করে বেড়ে ওঠেন তিনি। ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ ও সাহসী অশ্বারোহী।৫০৮ এদিকে তার সন্তান হলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর দেহরক্ষী হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.। একজন বীর যোদ্ধার অভ্যাস-প্রকৃতি তার সত্তার সঙ্গে মিশে ছিল। লড়াইয়ের ময়দানে যদি তাকে মাত্র একশ সাথী আর সৈনিক দিয়ে পাঠানো হয়, তাহলে তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে এমন তীব্রভাবে আক্রমণ চালাতেন, যেন রণাঙ্গনে তিনি একাই লড়াই করছেন। বিজয় আর নুসরাত যেন তার একার ওপরই ন্যস্ত। এমন দায়িত্বশীলতা আর ওফাদারির সাথে তিনি জিহাদ করতেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর ছিল গভীর হৃদ্যতা ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এ বাক্যে সুসংবাদ জানিয়েছেন,
إِنَّ لِكُلِّ نَبِي حَوَارِيًّا ، وَإِنَّ حَوَارِيَّ الزُّبَيْرُ بْنُ العَوَّامِ
প্রত্যেক নবীর জন্য হাওয়ারী তথা সার্বক্ষণিক সহচর থাকে, আমার হাওয়ারী হচ্ছে যুবাইর ইবনুল আউয়াম।
হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর মা হযরত সাফিয়্যা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু। সুতরাং যুবাইর ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফাতো ভাই। অন্যদিকে হযরত সিদ্দীকে আকবরের কন্যা হযরত আসমাকে বিয়ে করায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন তার ভায়রা। হযরত আসমা রা. ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর বোন। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন অনুপম নিষ্ঠাবান, অদম্য শক্তিশালী ও সাগরের মতো বিশাল মনের অধিকারী। নিজের ধন-সম্পদ, জান-মাল আল্লাহর জন্য উৎসর্গকারী মুমিন। তার দানশীলতা ও বদান্যতা ছিল দু-টি দ্রুতগামী ঘোড়ার মতো।
হযরত সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা. ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর ফুফু এবং আল্লাহর সিংহ হযরত হামযা রা.-এর আপন বোন। তার বীরত্ব ও সাহসিকতার বেশ কিছু অংশও জুটেছে তার ললাটে।৫০৯ তাঁর জীবন গঠনের শুরুর দিকে আমরা দেখতে পাই, হযরত সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর স্বামী আল আউয়াম ইবনে খুওয়াইলিদ যখন মারা গেলেন, তার জন্য রেখে গেলেন একটি ছোট্ট শিশু। সেই শিশুপুত্র যুবাইরকে তিনি কঠোরতা ও কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে লালন-পালন করেন। তাকে অশ্ব পরিচালনা এবং যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী করে তুলেন। তার খেলা ও খেলনার কৌতূহলকে তিনি তীর, ধনুক আর বর্শার দিকে ঝুঁকিয়েছিলেন। সকল ভয় ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির দিকে তিনি তাকে ঠেলে দিতেন। ঝুঁকি নিতে উৎসাহ জোগাতেন। যখনই দেখতেন ভয়ে পিছপা হয়েছে কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তখন তাকে ভীষণ প্রহার করতেন। যে কারণে তাকে অভিযুক্ত করে পুত্রের চাচারা বলতেন, 'এটা তো কঠিন ও রূঢ় আচরণ। মমতাময়ী মায়ের শাসন এমন হতে পারে না।' হযরত সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রা. তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করে বলতেন,
من قال قد ابغضته فقد كذب
وانما اضربه لكي يلب
و يهزم الجيش وياتي بالسلب
যে বলে তাকে প্রহার করে রাগ ঝেড়েছি, সে মিথ্যা বলে। অকর্মণ্য ও আলস্য ছেড়ে সে বিচক্ষণ হবে, সে লক্ষ্যেই তাকে মায়ের শাসন করেছি। যাতে সে শত্রুকে হারাতে পারে এবং লুণ্ঠিত মাল ফিরিয়ে আনতে পারে নিজ শক্তিতে।৫১০
নিকটাত্মীয়দের হুঁশিয়ার করুন
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তাআলা কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল করলেন, 'আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করে দিন,' (সূরা শুআরা, ২৬:২১৪), তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়ালেন এবং বললেন, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়, কিংবা অনুরূপ শব্দ বললেন, তোমরা আত্মরক্ষা করো। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোনো উপকার করতে পারব না। হে বনু আব্দে মানাফ, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোনো উপকার করতে পারব না। হে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না। হে সাফিয়্যাহ, আল্লাহর রাসূলের ফুফু, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না। হে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ, আমার ধন-সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না।৫১১
এই ঘোষণার সাথে সাথেই হযরত সাফিয়্যা রা.-এর অন্তরে জ্বলে উঠে ইসলামের আলো। তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। তার ছেলে যুবাইরও অগ্রবর্তী মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। ফলে তাদেরকেও ভোগ করতে হলো কুরাইশের চাপানো নির্যাতন, দুর্ভোগ আর বাড়াবাড়ির কষ্ট—যা সহ্য করেছিলেন প্রাথমিক ও অগ্রগামী সকল মুসলিম। ফলে আল্লাহ তাআলা যখন তার নবীকে এবং তার সঙ্গী মুমিনদেরকে মদীনায় হিজরতের অনুমতি দিলেন, এই মহীয়সী হাশিমী নারী মক্কায় নিজের বহুমুখী গৌরব ও সুকীর্তির সকল স্মৃতি ফেলে রওনা হলেন মদীনার অভিমুখে। আল্লাহ ও রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে দ্বীন রক্ষার স্বার্থে হিজরত করলেন মদীনায়। এমন সময়ে এই মহীয়সী অতিক্রম করছিলেন জীবনের প্রায় ষাট বছর।
উহুদের অনন্য বীরত্ব
জিহাদের বিভিন্ন ময়দানে তার রয়েছে এমন কিছু অবস্থান—ইতিহাস যার আলোচনা আজও অব্যাহত রেখেছে প্রশংসা ও মুগ্ধতায় পঞ্চমুখ হয়ে। উহুদ যুদ্ধেও হযরত সাফিয়্যা অংশগ্রহণ করেন এবং সাহসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলমানরা কুরাইশ বাহিনীর আক্রমণে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং পালাতে থাকে। তখন মূলত এক রকম পরাজয়ই ঘটে গিয়েছিল। তখন হযরত সাফিয়্যা রা. হাতে একটি বর্শা নিয়ে রণক্ষেত্র থেকে পলায়নপর সৈনিকদের যাকে সামনে পাচ্ছিলেন, পেটাচ্ছিলেন, আর উত্তেজিত কণ্ঠে বলছিলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ফেলে পালাচ্ছ? এ অবস্থা তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টিতে পড়েন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবাইরকে বলেন, তিনি যেন হামযার লাশ দেখতে না পান। কারণ, কুরাইশরা লাশের সাথে অমানবিক আচরণ করে। কেটে-কুটে তারা লাশ বিকৃত করে ফেলে। ভাইয়ের লাশের এমন বিভৎস অবস্থা দেখে তিনি ধৈর্যহারা হয়ে পড়তে পারেন, এমন চিন্তা করেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবাইরকে এ নির্দেশ দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ মতো যুবাইর রা. মার নিকট এসে বলেন, মা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে ফিরে যাবার জন্য বলেছেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি জেনেছি, আমার ভাইয়ের লাশ বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। আল্লাহ জানেন, আমার ভাইয়ের লাশের সাথে এমন আচরণ আমার মোটেও পছন্দ নয়, তবুও আমি অবশ্যই ধৈর্যধারণ করব। ইনশাআল্লাহ নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখবো। মায়ের এসব কথা যুবাইর রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালেন। তারপর তিনি সাফিয়্যা রা.-কে ভাইয়ের লাশের কাছে যাবার অনুমতি দান করেন। হযরত সাফিয়্যা ভাইয়ের লাশের নিকট যান এবং দেহের টুকরো টুকরো অংশগুলি দেখেন। নিজেকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখেন। মুখে শুধু (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) উচ্চারণ করে তার মাগফিরাত কামনা করে দুআ করতে থাকেন। তিনি চলে যাবার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হামযার রা. লাশ দাফনের নির্দেশ দান করেন।৫১২
এটা ছিল উহুদের ময়দানে সাফিয়্যা রা.-এর অবস্থান। এদিকে খন্দকের যুদ্ধে তার অবস্থান-সে তো বীরত্বের কাহিনী! এ কাহিনীর পরতে পরতে তার বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা প্রস্ফুটিত হয়েছে, প্রকাশিত হয়েছে তার সাহসিকতা ও দৃঢ় সংকল্প।
খন্দকে ঐতিহাসিক কীর্তি
খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেদের স্ত্রীদের, ফুফুদের এবং একদল মুসলিম স্ত্রীদেরকে রেখে গেলেন হাসসান ইবনে সাবিতের মীরাসসূত্রে প্রাপ্ত দুর্গে, এটিই ছিল মদীনার সর্বাধিক সুরক্ষিত দুর্গ।
মুসলমানরা যখন খন্দকের আশপাশে কুরাইশ ও তার মিত্রদের মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করছিলেন, নারী ও শিশুদের শত্রুর আক্রমণ নিয়ে ভাবার সুযোগ যখন তাদের ছিল না। সাফিয়্যা রা. তখন ফজরের অন্ধকারে একটি ছায়ামূর্তির নড়াচড়া দেখতে পেলেন। কান পেতে সেদিকে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন এক ইহুদী দুর্গের দিকে এগিয়ে আসছে এবং দুর্গের চারপাশে সন্দেহজনক দৃষ্টি দিচ্ছে। আড়ি পেতে জানতে চাচ্ছে কারা রয়েছে এর ভেতরে।
তিনি বুঝে ফেললেন, নিশ্চয়ই তার গোত্রের কোনো গুপ্তচর সে। জানতে এসেছে—এখানে আক্রমণ প্রতিরোধকারী পুরুষ মানুষ আছে, না শুধুই নারী আর শিশু এখানে অবস্থান করছে?
তিনি মনে মনে ভাবলেন, বনী কুরাইযার ইহুদীরা রাসূলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে কৃত চুক্তি ভেঙে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশ ও মিত্রদের সাহায্য করছে। আর এ মুহূর্তে আমাদের ওপর ওরা কোনো আক্রমণ করলে তা ঠেকানোর জন্য কোনো একজন মুসলিম পুরুষ আমাদের পাশে নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সঙ্গীরা রয়েছেন শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানে। এ অবস্থায় আল্লাহর ওই দুশমন যদি আমাদের প্রকৃত পরিস্থিতির খবর তাদের গোত্রের কাছে পৌঁছাতে সফল হয়, তাহলে ইহুদীরা নারীদের বন্দী করবে এবং শিশুদের দাস-দাসী বানিয়ে ছাড়বে। সেটা মুসলমানদের জন্য ভয়াবহ বিপদ ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এ সব ভেবে তিনি নিজের ওড়না মাথায় জড়ালেন। কোমরে শক্ত করে গামছা বেঁধে কাঁধে তুলে নিলেন একটি লৌহখণ্ড। নেমে এলেন দুর্গের প্রধান ফটকের কাছে। খুব ধীরে ও সাবধানে সেখানে তৈরি করলেন একটি ছিদ্র। সেই ছিদ্রপথ দিয়েই আল্লাহর দুশমনকে নিরীক্ষণ করতে থাকলেন সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টিতে। এক সময় তিনি লোকটির অবস্থান দেখে নিশ্চিত হলেন এবার তার ওপর আক্রমণ চালানো সম্ভব। নিশ্চিত হয়েই চালিয়ে দিলেন চরম হামলা। সর্বশক্তি দিয়ে লৌহদণ্ডের আঘাত হানলেন তার মাথায়। এমন ভয়াবহ আঘাত সহ্য করা ছিল অসম্ভব। তৎক্ষণাৎ লোক ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কাল বিলম্ব না করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আঘাত হেনে তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিলেন হযরত সাফিয়্যা রা.।
প্রাণহীন নিথর দেহের কাছে দ্রুত নেমে এলেন। নিজের সঙ্গে রাখা ছুরি দিয়ে মাথা কেটে দেহ থেকে আলাদা করে ফেললেন। দুর্গের উঁচুস্থান থেকে ছুঁড়ে মারলেন নিচের দিকে। ঢাল বেয়ে সেটা গড়াতে গড়াতে গিয়ে থামল সেই ইহুদীদের সামনে যারা ওই সঙ্গীর সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষা করছিল।৫১৩
ইহুদীর কর্তিত মস্তক দেখে তারা পরস্পর বলাবলি করতে থাকল, আরে! এটা তো আমরা নিশ্চিতরূপেই জানতাম যে, মুহাম্মাদ কখনোই নারী ও শিশুদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা না করে যাবার মানুষ নয়! এখন তো নিজের চোখেই দেখলাম! এ সব বলতে বলতে তারা নিজেদের গন্তব্যের দিকে ফিরে গেল।
এভাবেই ইতিহাস তার সোনালী পাতায় উজ্জ্বল অক্ষরে লিখে রেখেছে। 'সাফিয়্যা বিনতে আবদিল মুত্তালিব ছিলেন প্রথম সেই নারী—যিনি ইসলাম ধর্মে একজন মুশরিককে হত্যা করেছেন।'
রাসূলের ইন্তেকাল
হযরত সাফিয়্যা রা. এভাবেই অসীম বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে রাসূলের সঙ্গে বিভিন্ন জিহাদের অংশ নিতেন। তার কাছ থেকে দ্বীন শিখতেন; কিন্তু একসময় প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দেন। এই দুঃখজনক সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল, মদীনার চতুর্দিক যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। আনাস রা. বলেন, আমি ওইদিনের মতো উত্তম ও উজ্জ্বল আর কোনো দিন দেখিনি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট শুভাগমন করেছিলেন। আর আমি ওই দিনের মতো দুঃখজনক ও অন্ধকার দিন আর পাইনি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন।৫১৪
অন্তিম সময়
রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পর হযরত সাফিয়্যা রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর দেখানো পথে জীবনযাপন করতে থাকেন। তিনি ছিলেন প্রভুর ইবাদতকারিণী। সব সময় তিনি রোযা রাখতেন এবং আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করতেন। এক সময় তিনিও সাড়া দেন মহান প্রভুর ডাকে। মহান দয়ালু প্রভুর এমন জান্নাতে চলে যান যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তর যা কল্পনাও করতে পারেনি।
২০ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। জান্নাতুল বাকীতে প্রায় সত্তর বছর বয়সে তিনি পরপারে পাড়ি জমান।৫১৫
আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হোন সাফিয়্যা বিনতে আবদিল মুত্তালিবের প্রতি। তিনি ছিলেন মুসলিম নারীদের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একাই করেছেন সন্তানের লালন-পালন, তবুও তাকে গড়ে তুলেছিলেন আদর্শরূপে। আপন ভাইয়ের ভয়াবহ শাহাদাতের বিপদে আক্রান্ত হয়েছেন, সেখানে তিনি দেখিয়েছেন ধৈর্যের পরম পরাকাষ্ঠা। কষ্ট-ক্লেশের ধকল বয়ে গেছে তার ওপর দিয়ে, তবুও তার মাঝে পাওয়া গেছে এক দৃঢ়সংকল্প, বিচক্ষণ ও সাহসী নারীর স্বরূপ। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৫০৮. সুয়ারুম মিন সিয়ারিস সাহাবিয়াত, ২৮৩।
৫০৯. ঊদাতুল হিজাব, ১৯৯-২০০।
৫১০. সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ, ২৩।
৫১১. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৭৫৩; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২০৪; সুনান, তিরমিযী, হাদীস নং ৩১৮৫।
৫১২. আর রাউযুল উনফ, ৩/১৭২।
৫১৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৭।
৫১৪. সুনান, তিরমিযী: ১৩/১০৪-১০৫।
৫১৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২৭১।