📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 উম্মে উমারা রা.

📄 উম্মে উমারা রা.


রাসূলকে বাঁচাতে যে নারী উহুদে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন

মক্কায় তখন ইসলামের সূচনাকাল। পুণ্যপ্রত্যাশী অন্তরগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে আশ্রয় নিচ্ছে ইসলামের ছায়াতলে। কুরআনের আয়াত তাদের অন্তর- যমীনকে উর্বর করে তুলছিল। দিন দিন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنْ كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّنَ الْبَعْثِ فَإِنَّا خَلَقْتُكُمْ مِّنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُّطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ مِنْ مُّضْغَةٍ مُّخَلَّقَةٍ وَ غَيْرِ مُخَلَّقَةٍ لِنُبَيِّنَ لَكُمْ وَنُقِرُّ فِي الْأَرْحَامِ مَا نَشَاءُ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى ثُمَّ نُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ وَ مِنْكُمْ مَّنْ يُتَوَفَّى وَ مِنْكُمْ مَّنْ يُرَدُّ إِلَى أَرْذَلِ الْعُمُرِ لِكَيْلَا يَعْلَمَ مِنْ بَعْدِ عِلْمٍ شَيْئًا وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ وَ اثْبَتَتْ مِنْ كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ
হে মানুষ, যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক তবে নিশ্চয়ই জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্র থেকে, তারপর আলাকা থেকে, তারপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট অথবা অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট গোশত থেকে। তোমাদের নিকট বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করার নিমিত্তে। আর আমি যা ইচ্ছা করি তা একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত মাতৃগর্ভে অবস্থিত রাখি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, পরে যাতে তোমরা যৌবনে উপনীত হও। তোমাদের মধ্যে কারও কারও মৃত্যু দেওয়া হয় এ বয়সেই, আবার কাউকে কাউকে ফিরিয়ে নেওয়া হয় হীনতম বয়সে, যাতে সে জ্ঞান লাভের পরও কিছু না জানে। তুমি যমীনকে দেখতে পাও শুষ্কাবস্থায়, অতঃপর যখনই আমি তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদগত করে সকল প্রকার সুদৃশ্য উদ্ভিদ। ৪২৬

মক্কায় ইসলামের সেই সোনালী উষালগ্নে ঈমানদাররা রাসূলের কাছে সমবেত হয়ে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে থাকেন। তাদের অন্তর দ্বীনের আলোয় উদ্ভাসিত হতে থাকে। এই আলোক দিশারীদের একজন হচ্ছেন হযরত উম্মে উমারা রা.। এই বিশিষ্ট সাহাবিয়ার গুণাবলী সম্পর্কে আবু নুয়াইম বলেন, 'উম্মে উমারা আকাবায় বাইআত গ্রহণকারী, পুরুষদের সাথে যুদ্ধকারী। তিনি ছিলেন যথেষ্ট ত্যাগী বীর সাহাবিয়া; রোযাদার, কঠিন ত্যাগ ও দৃঢ় বিশ্বাসের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।'

তাঁর সম্পর্কে ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, 'উম্মে উমারা রা.-এর আসল নাম নুসাইবা। পিতার নাম কাআব ইবনে আমর। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার কন্যা। বিখ্যাত বদরী সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কাব আল মাযিনীর বোন। উম্মে উমারা রা. উহুদ, হুদাইবিয়া, খায়বার, কাযা উমরা আদায়, হুনাইন ও ইয়ামামার যুদ্ধ ও অভিযানে যোগ দেন। তার সম্পর্কে বহু হাদীস বর্ণিত আছে। জিহাদে তার হাত কেটে যায়।৪২৭

উম্মু উমারার প্রথম বিয়ে হয় যায়িদ ইবনে আসিম ইবনে আমরের সাথে। এই যায়িদ ছিলেন তার চাচাতো ভাই। তার মৃত্যুর পর গাযিয়্যা ইবনে আমরের সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। প্রথম স্বামীর ঘরে আবদুল্লাহ ও হাবীব এবং দ্বিতীয় স্বামী ঘরে তামীম ও খাওলা নামক মোট চার সন্তানের মা হন তিনি।

কেমন সেই মর্যাদা
প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন নারীজাতির নেত্রী। এত কীর্তি ও গুণের অধিকারী তিনি—যার কৃতিত্ব ও গুণাবলী পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করতে আমাদের কলম অপারগ। আমরা যদি তার দাম্পত্য জীবনের কথা আলোচনা করতে যাই, তখন দেখতে পাই তিনি স্বামীর হক আদায়ের ব্যাপারে খুবই সচেতন। তার মাতৃত্বের কথা স্মরণ হলে আমরা দেখতে পাই, একজন কোমল, দয়ালু ও স্নেহশীল মা। তার ইবাদতের দিকে দৃষ্টি দিলে তাকে আমরা পাই সার্বক্ষণিক রোজাদার ও ইবাদতগুজাররূপে। আর জিহাদের ময়দানে বীরত্বের ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রশংসা করেছেন। সুতরাং কেমন হতে পারেন তিনি-তা সহজেই অনুমেয়।

তাই আমি সঠিক বুঝতে পারছি না, কোথা হতে এই মহীয়সী সাহাবিয়ার জীবনকীর্তি আলোচনা করব।

দ্বিতীয় আকাবার বাইআতে অনন্য অংশগ্রহণ
ইসলামের তখন সূচনাপর্ব। হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় ও তার আশে-পাশের জনপদে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন এবং দিন দিন কঠোর থেকে কঠোরতর প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছেন। তার আহ্বানে আশাব্যঞ্জক সাড়া না পেলেও আল্লাহর সাহায্যের উপর নির্ভর করে ইসলামের প্রচার-প্রসারের কাজ অব্যাহত রেখেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কী জীবনের এমন এক প্রক্ষাপটে ইয়াসরিবের ছয় ব্যক্তি মক্কায় আসেন। তারা রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; তার কথা শোনেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে ইয়াসরিবে ফিরে যান। পরের বছর হজ মওসুমে তারা আরও ছয় জনকে সঙ্গে করে মক্কায় যান এবং গোপনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করে বাই'আত করেন। যাকে আকাবার প্রথম বাই'আত বলা হয়। ইয়াসরিব তথা মদীনায় ইসলাম প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে এবং তাদের অনুরোধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দা'ঈ হিসেবে মুসআব ইবনে উমাইর রা.-কে তাদের সাথে মদীনায় পাঠান। এই ছোট্ট দলটি পরবর্তী বছর মদীনায় ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রচারের কাজ নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। তারা এত আন্তরিকভাবে কাজ করেন যে, মাত্র এক বছরের মধ্যে মদীনার প্রতিটি ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌছে যায়।

এ সময়ের মধ্যে মদীনার অনেক বড় বড় নেতা ও অভিজাত ঘরের নারী-পুরুষ ইসলামের দাওয়াত কবুল করেন। যার ফল এই দাঁড়ায় যে, পরবর্তী হজ মওসুমে তিয়াত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জনের বিশাল একটি দল নিয়ে মুসআব মক্কায় যান এবং আকাবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করেন। আর সেখানে অনুষ্ঠিত হয় আকাবার দ্বিতীয় বাইআত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরতের পূর্বে হযরত মুসআবের তাবলীগে মদীনার যে সকল নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেন উম্মে উমারা রা. তাদের একজন। কেবল তিনি নন, এ সময়কালে তার গোটা খানদান মুসলমান হন। এভাবে তিনি হলেন প্রথম পর্বের একজন মুসলমান আনসারী মহিলা।

হযরত উম্মে উমারার জীবনের বড় ঘটনা আকাবার বাইআতে অংশগ্রহণ। আকাবার দ্বিতীয় বাইআতে পঁচাত্তর জন মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। তার মধ্যে দুই জন মহিলা ছিলেন। তাদের একজন হচ্ছেন আমাদের আজকের আলোচিত মেহমান উম্মে উমারা নাসীবা বিনতে কাআব রা.। দ্বিতীয় মহিলা ছিলেন উম্মে মানী রা.।

আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের তার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ
ঐতিহাসিকদের বর্ণনামতে, হরযত উম্মে উমারা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বাইআতে আকাবা, উহুদ, হুদাইবিয়া, খায়বার, উমরাতুল কাযা, ফাতহে মক্কা ও হুনাইনে অংশগ্রহণ করেন।৪২৮ এ ছাড়া তিনি মুরতাদবিরোধী অভিযানে ইয়ামামার দিনে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

হিজরী দ্বিতীয় সনে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধেও উম্মে উমারা রা. যোগ দেন। এ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত হামযা রা.সহ বহু মুসলমান শহীদ হন। উম্মে উমারা তার স্বামী গাযিয়্যা ইবনে আমর ও দুই ছেলে আবদুল্লাহ ও হাবীবের সাথে উহুদে যোগদান করেন। মূলত তিনি গিয়েছিলেন একটি পুরানো মশক সঙ্গে নিয়ে যোদ্ধাদের পানি পান করানোর উদ্দেশ্যে; কিন্তু এক পর্যায়ে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন; চমৎকার রণকৌশলের স্বাক্ষর রাখেন। শত্রুর বারোটি মতান্তরে তেরোটি আঘাতে তার দেহ জর্জরিত হয়।৪২৯

শুধু তাই নয়; এ যুদ্ধে তিনি তীর-বর্শা দ্বারা আহত করেন বারোজন পৌত্তলিক সৈন্যকে।৪৩০

উহুদযুদ্ধের এক পর্যায়ে শত্রু বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে মুসলিম বাহিনীর মনোবল ভেঙে যায়। মুষ্টিমেয় কয়েকজন জানবাজ মুজাহিদ ছাড়া আর সকলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ছেড়ে ময়দান থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। যে কয়েকজন মুজাহিদ নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিরাপত্তা বিধান করেন তাদের মধ্যে উম্মে উমারা, আর স্বামী গাযিয়্যা ও দুই ছেলে আবদুল্লাহ ও হাবীবও ছিলেন।

রণক্ষেত্রের এই নাজুক অবস্থার আগে যখন মুসলিম বাহিনী খুব শক্তভাবে শত্রুবাহিনীর মোকাবেলা করছিল এবং বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল তখনও উম্মে উমারা রা. হাত পা গুটিয়ে বসে ছিলেন না। মশকে পানি ভরে নিয়ে মুজাহিদদের পান করাচ্ছিলেন। এমন সময় দেখলেন যে সবাই ময়দান ছেড়ে পালাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে মাত্র গুটিকয়েক মুজাহিদ। তিনিও এগিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে জীবন বাজি রেখে অটল হয়ে দাঁড়ালেন। আর তার পাশে এসে অবস্থান নিলেন স্বামী ও দুই ছেলে। তিনি একদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর কাফেরদের আক্রমণ প্রতিহত করছিলেন, অপর দিকে তাদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে অনেককে ধরাশায়ী করে ফেরেছিলেন।

উহুদ যুদ্ধের সেই মারাত্মক পর্যায়ের বর্ণনা উম্মে উমারা দিয়েছেন এভাবে : ‘আমি দেখলাম, লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ছেড়ে পালাচ্ছে। মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন যাদের সংখ্যা দশও হবে না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে আছি। আমি, আমার দুই ছেলে ও স্বামী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে রক্ষা করেছি। তখন অন্য মুজাহিদরা পরাজিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন আমার হাতে কোনো ঢাল নেই। তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে পালাচ্ছে এবং তার হাতে একটি ঢাল। তিনি তাকে বললেন, 'ওহে, তুমি তোমার ঢালটি যে লড়ছে এমন কারও দিকে ছুড়ে মার।' সে ঢালটি ছুড়ে মারে এবং আমি তা হতে তুলে নিই। সেই ঢাল দিয়েই আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আড়াল করতে থাকি। সেদিন অশ্বারোহী যোদ্ধারা যদি আমাদের মতো পদাতিক হতো, তাহলে আমরা শত্রুদের ক্ষতি করতে সক্ষম হতাম।

তিনি আরও বলেছেন, কোনো অশ্বারোহী আমাদের দিকে এগিয়ে এসে আমাকে তরবারির আঘাত করছিল, আর আমি সে আঘাত ঢাল দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। আমার কিছুই করতে সক্ষম হয়নি। তারপর যেই না সে পিছন ফিরে যেতে উদ্যত হচ্ছিল অমনি আমি তার ঘোড়ার পিছন পায়ে তরবারির কোপ বসিয়ে দিচ্ছিলাম। ঘোড়াটি আরোহীসহ মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। তখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ছেলেকে ডেকে বলছিলেন, 'ওহে উম্মে উমারার ছেলে, তোমার মাকে সাহায্য কর।' সে ছুটে এসে আমাকে সাহায্য করছিল। এভাবে আমি তাকে মৃত্যুর ঠিকানায় পাঠিয়ে দিচ্ছিলাম।৪৩১

উম্মু উমারার ছেলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। যখন মুসলিম মুজাহিদরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তখন আমি ও আমার মা তার নিকট গিয়ে কাফেরদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে শুরু করলাম। এসময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি উম্মে উমারার ছেলে? বললাম হ্যাঁ। তিনি বললেন, শত্রুদের দিকে কিছু ছুঁড়ে মার। আমি আমার সামনের একটি লোকের দিকে একটি পাথর ছুড়ে মারলাম। লোকটি ছিল ঘোড়ার পিঠে। নিক্ষিপ্ত পাথরটি গিয়ে লাগল ঘোড়ার একটি চোখে। ঘোড়াটি ছটফট করতে করতে তার আরোহীসহ মাটিতে পড়ে গেল। আর আমি লোকটির ওপর পাথর ছুঁড়ে মারতে লাগলাম। আমার একাজ দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হাসতে থাকেন।৪৩২

এ সময় এক কাফিরের নিক্ষিপ্ত একটি আঘাতে হযরত রাসূলে পাকের একটি দাঁত ভেঙে যায়। পাষণ্ড ইবনে কামিআ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাক করে তরবারির একটি কোপ মারে, কিন্তু তা ফসকে যায়। মুহূর্তে উমারা রা. ফিরে দাঁড়ান। তিনি নরপশু ইবনে কামিআর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন; কিন্তু তার সারা দেহ বর্ম আচ্ছাদিত থাকায় বিশেষ কার্যকর হলো না। তবে সে উম্মে উমারাকে তাক করে এবার একটি কোপ মারে এবং তা উম্মে উমারার কাঁধে লাগে। এতে তিনি মারাত্মক আহত হন।৪০৩

জান্নাতের রাসূলের বন্ধু
ইবন কামিআ তো ভেগে প্রাণ বাঁচাল; কিন্তু উম্মে উমারার আঘাতটি ছিল অতি মারাত্মক। তার সারা দেহ রক্তে ভিজে গেল। তার ছেলে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: আমার মা সেদিন মারাত্মকভাবে আহত হন। রক্ত বন্ধই হচ্ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, তোমার ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ কর। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে আহত হতে দেখে তার ছেলে আবদুল্লাহকে ডেকে বলেন, তোমার মাকে দেখ, তোমার মাকে দেখ। তার ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ কর। হে আল্লাহ, তাদের সবাইকে জান্নাতে আমার বন্ধু করে দাও। উম্মে উমারা বলেন, দুনিয়ায় আমার যে কষ্ট ও বিপদ আপদ এসেছে, তাতে আমার কোনো পরোয়া নাই।৪০৪

সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তার ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধেন। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন সাহসী সাহাবীদের নাম উচ্চারণ করে বলেন: উম্মে উমারার আজকের কর্মকাণ্ড তাদের কর্মকাণ্ড থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। এরপর প্রায় একবছর যাবত তার ক্ষতস্থানের চিকিৎসা করা হয়।

উহুদের এই মারাত্মক আক্রমণে উম্মে উমারার ছেলে আবদুল্লাহও মারাত্মকভাবে আহত হলেন। আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: সেদিন আমি মারাত্মক ভাবে আহত হলাম। রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছিল না। তা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমার আহত স্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধ। কিছুক্ষণ পর আমার মা অনেকগুলো ব্যান্ডেজ হাতে নিয়ে আমার দিকে ছুটে আসেন এবং আমার আহত স্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন পাশেই দাঁড়িয়ে। ব্যান্ডেজ বাঁধা শেষ করে মা আমাকে বলেন, বেটা ওঠো। শত্রু সৈন্যদের গর্দান মার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বলেন, ওহে উম্মে উমারা, তুমি যতখানি শক্তি ও সামর্থ্য রাখ, অন্যের মধ্যে তা কোথায়?

উহুদ যুদ্ধ শেষ হলো। মুজাহিদরা ঘরে ফিরতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে কাআব মাযিনীকে পাঠিয়ে উম্মে উমারার অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল না হয়ে ঘরে ফিরলেন না।

উহুদ যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘোষণা মদীনার মুজাহিদদেরকে ‘হামরা আল আসাদ’ এর দিকে বেরিয়ে পড়ার ঘোষণা দেন। উম্মে উমারা সেখানে যাওয়ার জন্য মাজার কাপড় পেঁচিয়ে প্রস্তুত হয়ে যান; কিন্তু ক্ষত থেকে রক্ত ক্ষরণের কারণে সক্ষম হননি।

হযরত উম্মে উমারা রা. ছিলেন একজন মহিলা বীর যোদ্ধা। তার বীরত্ব ও সাহসিকতার বিস্ময়কর বাস্তবতা আমরা বিভিন্ন রণাঙ্গনে প্রত্যক্ষ করেছি। তার যে রণমূর্তি আমরা উহুদ ও ইয়ামামার যুদ্ধে দেখি, তার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন তার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি। তার ভালোবাসার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন উহুদের ময়দানে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বাড়িতে মাঝে মাঝে যেতেন। একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসলেন। তিনি তাকে খাবার দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকেও তার সাথে খেতে বললেন। উম্মে উমারা বললেন, আমি রোযা আছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যখন রোযাদারের নিকট কিছু খাওয়া হয় তখন ফেরেশতারা তার জন্য দুআ করে।৪৩৫

বাইআতে রিষওয়ানে অংশগ্রহণ
হুদাইবিয়ায় গমনকালে হযরত উম্মে উমারা রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে অংশগ্রহণ করেন। ঘটনাটি হচ্ছে: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা যিয়ারতের সিদ্ধান্ত নেন। চৌদ্দশত মুসলিম রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংগী হন। মুসলিমদের কোনো সামরিক উদ্দেশ্যে ছিল না। প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল মাত্র একখানি কোষবদ্ধ তলোয়ার। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদাইবিয়া নামক স্থানে এসে পৌঁছেন। এদিকে কুরাইশদের যুদ্ধপ্রস্তুতির খবর তার কাছে আসতে থাকে। বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে কুরাইশদের বোঝানো হলো যে, কাবা যিয়ারাত ছাড়া তার আর কোনো উদ্দেশ্যে নেই; কিন্তু কুরাইশরা মুসলিমদের মক্কায় প্রবেশ করতে দিতে রাজী হলো না।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসমান ইবনে আফফান রা.-কে দূতরূপে কুরাইশদের নিকট পাঠান। কুরাইশরা তাকে আটক রাখে। এই দিকে উসমান রা. শহীদ হয়েছেন বলে মুসলিমদের নিকট খবর আসে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বাবলা গাছের নীচে বসে সকলের নিকট থেকে এই শপথ নেন, আমরা শেষ হয়ো যাব, কিন্তু লড়াই থেকে পিছু হটবো না। এই শপথের নাম বাইয়াতে রিদওয়ান। মুসলিমদের এই শপথের কথা কুরাইশদের নিকট পৌঁছালা। উসমান রা. নিরাপদে ফিরে এলেন। এই বাইআত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
لَقَدْ رَضِيَ اللهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا
অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার হাতে বাইআত গ্রহণ করেছিল; অতঃপর তিনি তাদের অন্তরে কী ছিল তা জেনে নিয়েছেন, ফলে তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে পুরস্কৃত করলেন নিকটবর্তী বিজয় দিয়ে।৪৩৬

এই বাইআতে হযরত উম্মে উমারা রা. অংশগ্রহণ করেছেন এবং মৃত্যুর ওপর শপথ করেছিলেন। যেই বাইআতে রিযওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'বৃক্ষের নিচের বাইআতে যারা অংশগ্রহণ করেছে তারা কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।৪৩৭ সুসংবাদের আলোয় উদ্ভাসিত এই ভাগ্যবানদের অন্যতম হযরত উম্মে উমারা রা.-এর মর্যাদাও ছিল ঈর্ষণীয়।

হিজরী সপ্তম সন। হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্ত মুতাবিক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরাহের জন্য মক্কায় আসেন। সঙ্গে আসেন মুসলিমদের বিরাট দল। তারা তিনদিন মক্কায় থাকেন। নির্বিগ্নে উমরাহ উদযাপন করেন। তাদের চরিত্র ও আচরণ দেখে অনেকেই অবাক ও মুগ্ধ হয়। মুসলিমদের কাবা তাওয়াফ করতে দেখে মুশরিকরা হিংসার আগুনে পুড়তে থাকে।

হুদাইবিয়ার চুক্তি তাদের অনুকূল হয়েছে ভেবে তারা খুব উৎফুল্ল ছিল। এখন সেই চুক্তি তাদের নিকট অর্থহীন মনে হতে লাগল। যথারীতি উমরাহ পালন করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় ফিরে আসেন। এই উমরাহকেই উমরাতুল কাযা বলা হয়। এতেও অংশগ্রহণ করেন হযরত উম্মে উমারা রা.।

হুনাইনে তার বীরত্ব
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হুনাইনের যুদ্ধের ঘোষণা দেন, তখন রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে হযরত উম্মে উমারা রা.ও এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কাবাসীদের মধ্য থেকে দুই হাজার এবং মক্কা বিজয়ের সময় তার সাথে মদীনা থেকে আগত দশ হাজার সাহাবীসহ মোট বারো হাজার সৈন্য নিয়ে অভিযানে বের হলেন। এই সময় অবশিষ্ট মক্কাবাসীর জন্য তিনি আত্তাব ইবনে উসাইদকে মক্কার শাসক নিযুক্ত করেন এবং নিজে সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাওয়াযিনের মুকাবিলায় অগ্রসর হন।

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমরা হুনাইন প্রান্তরের কাছাকাছি এলাম,, এবং তিহামার একটি প্রশস্ত পার্বত্য উপত্যকার মধ্য দিয়ে নেমে চলতে লাগলাম। তখনো ভোরের আলো দেখা দেয়নি। শত্রু সেনারা আমাদের আগেই ওই উপত্যকায় আশ্রয় নিয়েছিল এবং সংকীর্ণ দুর্গম গিরিগুহায় ও তার আশেপাশে লুকিয়ে আমাদের জন্য ওঁত পেতে ছিল। তারা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষমাণ ছিল। আমরা সম্পূর্ণ নিঃশংকচিত্তে গিরিপথ দিয়ে নেমে চলেছি—এই সময় হঠাৎ তারা একযোগে আমাদের ওপর প্রচণ্ড হামলা চালাল। হামলার আকস্মিকতায় হতবুদ্ধি হয়ে আমাদের লোকেরা যে যেদিকে পারল উঠিপড়ি করে ছুটে পালাতে লাগল এবং একজন আরেকজনের প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপই করল না। কারও দিকে কারও বিন্দুমাত্র লক্ষ্য করার যেন ফুরসত নেই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডান দিকে সরে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'হে সৈনিকরা, তোমরা কোথায় যাচ্ছ? আমার কাছে এসো। আমি আল্লাহর রাসূল। আমি আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ। কীসের জন্য উটের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছ?' কিন্তু স্বল্পসংখ্যক মুহাজির, আনসার ও পরিবারভুক্ত লোক ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে কেউ থাকল না। সবাই চলে গেল।৪৩৮

আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তার সাদা খচ্চরটির লাগাম ধরে বলেছিলাম। আমি খুব মোটাসোটা ও বুলন্দ কণ্ঠের অধিকারী ছিলাম। ভীতসন্ত্রত হয়ে মুসলিম সৈনিকদের ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে লোকেরা, আমি তোমাদেরকে কারও প্রতি ফিরে তাকাতে দেখছি না!' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, 'আব্বাস! চিৎকার করে এভাবে ডাক দাও, হে আনসারগণ, ওহে বাবুলবৃক্ষের নীচে অংগীকারদাতাগণ!'

আমি আদেশ অনুসারে ডাকতে লাগলে প্রত্যেকে লাব্বায়েক বলে সাড়া দিতে লাগল।৪৩৯ এই সময় অশ্বারোহী সাহাবীদের কেউ কেউ ছুটন্ত ও পলায়নরত উটের গতি ফিরাতে ব্যর্থ হয়ে বর্ম দিয়ে তার স্কন্ধে আঘাত করেন। তাতেও ফিরতে না পেরে অস্ত্র নিয়ে নিয়ে উট থেকে নেমে আসেন এবং উট ছেড়ে দেন। অতঃপর যেদিক থেকে আওয়ায আসছে সেদিকে এগিয়ে যান এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট পৌছে যান। এভাবে একশজনের মতো সাহাবী জমায়েত হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন এবং তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। এই যোদ্ধাদের একজন হচ্ছেন হযরত উম্মে উমারা রা.।

শহীদমাতার আত্মত্যাগ
দক্ষিণ আরব উপত্যকায় এক ভণ্ড ব্যক্তি মিথ্যা নবুওয়াতের দাবি করে বসে। একদিন মুসায়লামা তার অনুগত ব্যক্তিদের মধ্য হতে দুজনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একটি পত্র পাঠাল। সে লিখেছে,
مِنْ مُسَيْلَمَةَ رَسُولِ اللَّهِ، إِلَى مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ .. سَلَامٌ عَلَيْكَ .. أَمَّا بَعْدُ، فَإِنِّي قَدْ أَشْرَكْتُ فِي الْأَمْرِ مَعَكَ، وَإِنَّ لَنَا نِصْفُ الْأَرْضِ، وَلِقُرَيْشٍ نِصْفُهَا، وَلَكِنَّ قُرَيْشًا قَوْمٌ يَعْتَدُونَ
মুসায়লামা রাসূলুল্লাহর পক্ষ থেকে মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি। তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। পর সমাচার, শুনে রাখুন, আমি এ ব্যাপারে তোমার অংশীদার। অর্ধেক যমীন তোমার হবে, আর অর্ধেক হবে আমার; কিন্তু কুরাইশরা এমন এক জাতি-যারা জুলুম করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসায়লামার চিঠির উত্তর দিচ্ছেন এভাবে,
بسمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ، إِلَى مُسَيْلَمَةِ الْكَذَّابِ السَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى.. أَمَّا بَعْدُ، فَإِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُوْرِثُهَا مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হতে মিথ্যাবাদী মুসায়লামার প্রতি... যারা হেদায়াতের অনুসরণ করে তাদের ওপর রহমত বর্ষিত হোক। সালামের পর বলছি, পৃথিবী আল্লাহর যিনি তার বান্দাদের মধ্য হতে যাঁকে ইচ্ছা তাকে তার উত্তরাধিকারী বানান। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরোক্ত বাক্য ছিল প্রভাতের মতো আলোকস্নিগ্ধ। এদিকে মিথ্যাবাদী মুয়ায়লামার অসৎ কর্মকাণ্ড দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। তার অনিষ্টাচরণ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নিকট একটি পত্র পাঠিয়ে তাকে তার ভ্রষ্টতা থেকে বিরত রাখতে ইচ্ছে করলেন। পত্র বয়ে নেওয়ার জন্য বিশিষ্ট সাহাবী হযরত হাবীব ইবনে যায়েদকে আহ্বান করলেন। তখন তিনি ছিলেন সজীব ও সুস্বাস্থ্যের পরিপূর্ণ যুবক। মাথার তালু থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত তিনি একজন ঈমানদীপ্ত পুরুষ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পেয়ে তিনি অবিরাম চলতে লাগলেন। কোথাও বিশ্রাম নিলেন না। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি ছুটে চললেন। অবশেষে নজদের উঁচু এলাকায় বনু হানীফার বস্তিতে গিয়ে মুসায়লামার হাতে পত্রটি দিলেন।

পত্রপাঠেরর পরপরই বিদ্বেষ আর হিংসা মুসায়লামা জ্বলতে থাকে। তার কুৎসিত হলুদ চেহারার রেখায় রেখায় বিশ্বাসঘাতকতা আর কুচিন্তা ফুটে ওঠে। সে হযরত হাবীব ইবনে যায়িদ রা.-কে বন্দী করে পরদিন সকালে তার নিকট নিয়ে আসার নির্দেশ দিল।

পরের দিন সকালে মুসায়লামা তার মজলিসের মাঝে গিয়ে বসল। তার ডানে-বামে তার বিভ্রান্ত অনুসারীদের শীর্ষ ব্যক্তিরা বসল। সাধারণ মানুষের সমাগমও কম ছিল না। তারপর হযরত হাবীব ইবনে যায়িদ রা.-কে আনার নির্দেশ দেওয়া হলো। তিনি শিকলাবদ্ধ অবস্থায় ধীরে ধীরে এলেন। হিংসার টইটম্বুর সমবেত লোকদের মাঝে হযরত হাবীব ইবনে যায়িদ রা. আত্মমর্যাদা নিয়ে শির উঁচু করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। মুসায়লামা তার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। এ কথা শুনে মুসায়লামা ক্রোধে ফেটে পড়ে। সে বলল, তুমি সাক্ষ্য দাও, আমি আল্লাহর রাসূল? হযরত হাবীব ইবনে যায়িদ রা. তখন কঠিনভাবে তিরস্কার করে বললেন, আমার দু-কানে বধিরতা রয়েছে। আমি তোমার কথা শুনি না।

মুসায়লামার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। ক্রোধে ঠোঁট দু-টি কেঁপে উঠল। জল্লাদকে বলল, তার শরীরের একটি অংশ কেটে ফেল। নির্দেশ পেয়ে জল্লাদ তরবারি দ্বারা আঘাত করে হযরত হাবীব ইবনে যায়িদ রা.এর শরীরের একটি অংশ কেটে ফেলল। আর তা মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। তারপর মুসায়লামা তাকে সেই প্রশ্ন করল। বলল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। এ কথা শুনে মুসায়লামা ক্রোধে ফেটে পড়ে। সে বলল, তুমি সাক্ষ্য দাও, আমি আল্লাহর রাসূল? হযরত হাবীব ইবনে যায়িদ রা. তখন কঠিনভাবে তিরস্কার করে বললেন, আমার দু-কানে বধিরতা রয়েছে। আমি তোমার কথা শুনি না। এভাবে হযরত হাবীব অত্যন্ত শক্তভাবে তার দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। নবুয়তের মিথ্যা দাবীদার মুসায়লামা হযরত হাবীবের একটি হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তারপর সে হাবীবের নিকট একই স্বীকৃতি দাবি করে। তিনি পূর্বের মতোই অস্বীকৃতি জানান। পাষাণ মুসায়লামা তার দ্বিতীয় হাতটি কেটে দেয়। মোটকথা, নরাধম মুসায়লামা তার দাবীর ওপর অটল থাকে, আর হযরত হাবীবও অটল থাকেন নিজের শক্ত বিশ্বাসের উপর। পাষণ্ড মুসায়লামা একটি একটি করে হযরত হাবীবের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আল্লাহর এই বান্দা জীবন দেওয়া সহজ মনে করেছেন, কিন্তু বিশ্বাস থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হওয়া সমীচীন মনে করেননি।880

এ ঘটনার কথা উম্মে উমারার রা. কানে পৌঁছলে তিনি মনকে শক্ত করেন এবং মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, যদি কখনো মুসলিম বাহিনী এই ভণ্ড নবীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে তখন তিনিও অংশগ্রহণ করবেন এবং আল্লাহ চাইলে নিজের হাতে এই জালিমকে জাহান্নামের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবেন।881

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর ইয়ামামার অধিবাসী এবং তথাকার নেতা মুসায়লামা আল-কাজ্জাব মুরতাদ হয়ে যায়। সে ছিল একজন নিষ্ঠুর প্রকৃতির অত্যাচারী মানুষ। তার গোত্রে প্রায় চল্লিশ হাজার যুদ্ধ করার মতো লোক ছিল। তারা সবাই তাকে সমর্থন করে। নিজের শক্তির অহমিকায় সে নিজেকে একজন নবী বলে দাবি করে এবং তার সমর্থকদের সবার নিকট থেকে জোর-জবরদস্তীভাবে স্বীকৃতি আদায় করতে থাকে। আর যারা তার নবুয়তের মিথ্যা দাবীকে মানতে অস্বীকৃতি জানায় তাদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালাত।

ইয়ামামার বীরাঙ্গনা
মুসায়লামার এহেন ঔদ্ধত্য ও বাড়াবাড়ির কথা খলীফা হযরত আবু বকরের রা. কানে এলো। তিনি এই ধর্মদ্রোহিতার মূল উপড়ে ফেলার লক্ষ্যে চারহাজার সৈন্যসহ হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ রা.-কে পাঠান। উম্মে উমারা রা. তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য এটাকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করলেন। তিনি খলীফার নিকট এই অভিযানে অংশগ্রহণের অনুমতি চাইলেন। খলীফা অনুমতি দিলেন। উম্মে উমারা রা. খালিদ ইবনে ওয়ালিদের রা. বাহিনীর সাথে ইয়ামামায় গেলেন। প্রচণ্ড যুদ্ধ হলো। বারো শো মুজাহিদ শহীদ হলেন। অন্যদিকে ঐতিহাসিকদের বর্ণনামতে, মুসায়লামার আট-নয় হাজার সৈন্য মারা যায়। অবশেষে মুসায়রামার হত্যার মধ্য দিয়ে মুসলিম বহিনীর বিজয় হয়।

প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। উম্মে উমারা রা. সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। তার একমাত্র লক্ষ্য তার ছেলের ঘাতক পাষণ্ড মুসায়লামা আল-কাজ্জাব। এক সময় তিনি এক হাতে বর্শা ও অন্য হতে তারবারি চালাতে চালাতে শত্রু বাহিনীর ব্যূহ ভেদ করে মুসায়লামার কছে পৌঁছে যান। এ পর্যন্ত পৌঁছতে তার দেহের এগারটি স্থান নিযা ও তরবারির আঘাতে আহত হয়। শুধু তাই নয়, একটি হাত বাহু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতেও তার সিদ্ধান্ত টলেনি। মোটেও ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি। তিনি আরও একটি এগিয়ে গেলেন। মুসায়লামাকে তাক করে তরবারির কোপ মারবেন, ঠিক এমন সময় হঠাৎ এক সাথে দুইখানি তরবারির কোপ মুসায়লামার ওপর এসে পড়ে। আর সে কেটে ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটেকে পড়ে। তিনি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেন, ছেলে আবদুল্লাহ পাশে দড়িয়ে। জিজ্ঞেস করলেন, তুমিই কি তাকে হত্যা করেছ? আবদুল্লাহ জবাব দিলেন, একটি কোপ আমার অন্যটি ওয়াহশীর। আমি বুঝতে পারছি না—কার কোপে সে নিহত হয়েছে। উম্মে উমারা রা. দারুণ উৎফুল্ল হলেন এবং তখনই সিজদায়ে শুকর আদায় করলেন।৪৪২

উম্মু উমারার রা. যখম ছিল খুবই মারাত্মক। একটি হাতও কাটা গিয়েছিল। এ কারণে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। বাহিনী প্রধান হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ ছিলেন তার বীরত্ব ও সাহসিকতার একজন গুণমুগ্ধ ব্যক্তি। তিনি তাকে খুব সম্মানও করতেন। তিনি আপন তত্ত্বাবধানে তার সেবা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। তার চিকিৎসায় যাতে কোনো ত্রুটি না হয় সে ব্যাপারে সর্বক্ষণ সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তাই তিনি সুস্থ হয়ে সারাজীবন খালিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। তার প্রশংসায় তিনি বলতেন, তিনি একজন সহমর্মী, উঁচুমনা ও বিনয়ী নেতা। তিনি খুব আন্তরিকতার সাথে আমার সেবা ও চিকিৎসা করেন। মদীনায় ফেরার পর খলীফা আবু বকর রা. তাকে প্রায়ই দেখতে যেতেন।

খলীফা হযরত উমর রা.-ও উম্মে উমারা রা.-এর সম্মান ও মর্যাদার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তার খেলাফত কালে একবার গনীমতের মালের মধ্যে কিছু চাদর আসে। তার মধ্যে একটি চাদর ছিল খুবই সুন্দর ও দামী। অনেকে বললেন, এটি খলীফা তনয় আবদুল্লাহ রা.-এর স্ত্রীকে দেওয়া হোক। অনেকে খলীফার স্ত্রী কুলসুম বিনতে আলী রা.-কে দেওয়ার কথা বললেন। খলীফা কারও কথায় কান দিলেন না। তিনি বললেন, আমি এ চাদরের সবচেয়ে বেশি হকদার উম্মে উমারাকে মনে করি। এটি তাকেই দেব। কারণ, আমি উহুদের দিন তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বলতে শুনেছি, 'আমি যে দিকেই দৃষ্টিপাত করছিলাম, শুধু উম্মে উমারাকেই লড়তে দেখছিলাম।' অতপর তিনি চাদরটি তার কাছে পাঠিয়ে দেন।

শেষ বিদায়
অবশেষে রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিখাদ ভক্ত, আল্লাহর দ্বীনের একনিষ্ঠ সেবিকা, নববী আদর্শের আপোষহীন পতাকাবাহী এই মহীয়সী ১৩ হিজরীতে মহান প্রভুর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় নেন। চির নিদ্রায় শায়িত হন জান্নাতুল বাকীতে। আল্লাহ তাআলা উম্মে উমারা রা.-এর প্রতি যেন খুশি হয়ে যান এবং তাকে খুশি করে দেন। কারণ তিনি ছিলেন মুমিন নারীদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অবিচল ও অটল জিহাদকারিণীদের মাঝে তিনি ছিলেন অনন্য অনুপম। তাকে আমরা ভুলব না। তার সম্পর্কে আমরা এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করব:
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّتٍ وَ نَهَرٍ فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِيكٍ مُّقْتَدِرٍ
নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণাধারার মধ্যে। যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতির নিকটে।৪৪৩

**টিকাঃ**
* আলাকা মানে যুক্ত ও ঝুলন্ত বস্তু। পূর্ববর্তী তাফসীরকারকদের অনেকে এর অর্থ করেছেন রক্তপিন্ড। তবে আধুনিক জীববিজ্ঞানীদের মতে, পুরুষের শুক্র ও নারীর ডিম্বানু মিলিত হয়ে মাতৃগর্ভে যে ভ্রূণের সৃষ্টি হয় তা পরে জরায়ু গাত্রে সংযুক্ত হয়ে পড়ে। এ জন্য 'আলাকা শব্দের অনুবাদ এখন করা হয়, এমন কিছু যা যুক্ত হয়ে থাকে। (অনুবাদক)।
৪২৬. সূরা হজ, ২২:৫।
৪২৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২৭৮।
৪২৮. আল ইসাবাহ, ৪/৪৫৭; সিফাতুস সাফওয়া, ২/৬৩; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৪১২।
৪২৯. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৪১২; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৭৯।
৪৩০. আনসাবুল আশরাফ, ১/৩২৫।
৪৩১. তাবাকাতে ইবেন সাআদ, ৮/৪১৩।
৪৩২. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৮০।
৪০৩. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৮১-৮২।
৪০৪. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৪১৪-৪১৫।
৪৩৫. মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৪৩৯; সুনান, আত-তিরমিযী, ৭৮৫; সুনান, ইবনে মাজাহ, ১৭৪৮।
৪৩৬. সূরা ফাতহ, ৪৮:১৮।
৪৩৭. সহীহ, মুসলিম; মুসনাদ, আহমাদ; সুনান, আবু দাউদ; সুনান, আত-তিরমিযী।
৪৩৮. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/২৮৯।
৪৩৯. সহীহ, মুসলিম, ২/১০০।
880. ইসতিআব, ১/৩২৭; ইসতিবসার, ৮১-৮২; হিলইয়া, ২/৬৪।
881. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৮১।
৪৪২. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৪৬৬।
৪৪৩. সূরা কামার, ৫৪:৫৪-৫৫।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 আসমা বিনতে আবি বকর রা.

📄 আসমা বিনতে আবি বকর রা.


দু-টি কোমরবন্ধনীর অধিকারী

এখন আমরা এমন এক ফুলে-ফলে ভরা অপরূপ কাননে প্রবেশ করব যে কাননের ফুলের সুবাসে গোটা ভুবন মাতোয়ারা। যে কানন ঈমানের সুঘ্রাণে মোহিত ও ওহীর জলে স্নাত। যার সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে পূর্ব-পশ্চিম দিগন্তজুড়ে।

তাঁর জীবনেতিহাসের আলোচনা আমাদের অন্তরকে শীতল করে তুলবে। তিনি এমন এক মহীয়সী সাহাবিয়া—যাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবন বৃত্তান্ত কেবল একটি বাক্যেই যথেষ্ট, আর তা হচ্ছে তিনি হলেন হযরত আসমা বিনতে আবি বকর রা.! তিনি আবু বকর রা.-এর কন্যা—এই পরিচয়টাই তার জন্য যথেষ্ট।

বরকতময় বৃক্ষ
তিনি এমন এক মহান বৃক্ষের ফল যার শেকড় প্রোথিত মাটির গভীরে, আর যার শিখর ছুঁয়েছে আকাশ।
তাঁর পিতা হচ্ছেন, নবী-রাসূলের পর পৃথিবীর বুকে সর্বোৎকৃষ্ট মানব। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত মহান দশ সাহাবীর প্রথম সদস্য—হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.।
তাঁর বোনের স্বামী হচ্ছেন, সায়্যিদুল আউয়ালীন ওয়াল আখিরীন মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ সা.।
তাঁর বোন হচ্ছেন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.।
তাঁর স্বামী হচ্ছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাওয়ারী, চাচাতো ভাই, আশারায়ে মুবাশশারা তথা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জনের অন্যতম সদস্য এবং আল্লাহর রাস্তায় প্রথম তরবারি উত্তোলনকারী হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.।
✓ তার দাদা হচ্ছেন, আবু কুহাফাহ রা.; যিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে রাসূলের সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
✓ তার দাদী হচ্ছেন, উম্মুল খাইর সালমা বিনতে সাখার; তিনিও ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে রাসূলের সাহচর্যলাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
✓ তার তিন ফুফু হচ্ছেন, আবু কুহাফার কন্যা যথাক্রমে উম্মে আমের, কুরাইবাহ ও উম্মে ফারওয়াহ।
✓ তাঁর ছেলে হচ্ছেন, খলীফা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-যিনি ছিলেন বিশিষ্ট আবেদ ও মুজাহিদ।
✓ তাঁর সহোদর হচ্ছেন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ রা.।
✓ তার আরেক ভাই হচ্ছেন, আবদুর রহমান রা.; যিনি একজন ঐতিহাসিক বীর সৈনিক সাহাবী।

এ কারণে বলা হয়, আবু বকরের ঘর ছাড়া অন্য এমন কোনো ঘর পাওয়া যায় যায় না, যার চার প্রজন্ম ছিলেন আল্লাহর রাসূলের মহান সাহাবী। হযরত আসমা রা., তার পিতা, তার দাদা এবং তার ছেলে ইবনে যুবাইর—চারজনই সাহাবী।

এই হচ্ছে সেই পবিত্র বৃক্ষ, যেখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন আয়েশা রা.। সুতরাং এই গোলাপের কেমন ভুবনমোহিনী সুবাস হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

হযরত আসমা বিনতে আবি বকর রা. হিজরতের ২৭ (সাতাশ) বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হচ্ছেন নবী-রাসূলের পর পৃথিবীর বুকে সর্বোৎকৃষ্ট মানব হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. যার ভেতর সমাবেশ ঘটেছিল সব সৎকর্মের। যাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন.
مَا لأَحَدٍ عِنْدَنَا يَدْ إِلَّا وَقَدْ كَافَيْنَاهُ مَا خَلَا أَبَا بَكْرٍ فَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا يَدًا يُكَافِتُهُ اللهُ بِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَا نَفَعَنِي مَالُ أَحَدٍ قَطُّ مَا نَفَعَنِي مَالُ أَبِي بَكْرٍ وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذَا خَلِيلاً لاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلاً أَلَا وَإِنَّ صَاحِبَكُمْ خَلِيلُ اللَّهِ
আবু বকর ছাড়া আর কারও যে কোনো ধরনের দয়া আমার ওপর ছিল আমি তার প্রতিদান দিয়েছি। আমার ওপর তার যে দয়া রয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে তার প্রতিদান দেবেন। আর আমাকে কারও সম্পদ এতটা উপকৃত করেনি, যতটা আবু বকরের সম্পদ আমাকে উপকৃত করেছে। আমি যদি কাউকে অন্তরঙ্গভাবে গ্রহণ করতাম, তাহলে আবু বকরকেই একনিষ্ঠ বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম। অবগত হও! তোমাদের এই সাথী আল্লাহ তাআলার অন্তরঙ্গ বন্ধু।৪৪৪

মক্কার মাটিতে ইসলামের সূর্য উদিত হলে পুরুষের মধ্যে প্রথম তার পিতা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ের পরিবারের মধ্যে আবু বকর রা. দ্বীনের দাওয়াত দিলে হযরত আসমা রা. ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। ঈমানী কাফেলার ক্রমধারায় তার ক্রমিক ১৮। তার পূর্বে মাত্র ১৭ জন নর-নারী ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারীদের তালিকায় উঠে আসে তার নাম। যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।৪৪৫

জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তের সাথে শুভ পরিণয়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাওয়ারী তথা বিশেষ সাহায্যকারী যুবায়র ইবনুল আওয়াম রা.-কে তিনি স্বামী হিসেবে পান। হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা. ইসলামী দাওয়াতের প্রথম সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সেই মহান সাত ব্যক্তির অন্যতম একজন-যারা ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে সবার চেয়ে অগ্রগামী। দারুল আরকামে ইসলামের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর বয়স তখন সবেমাত্র পনেরো বছর, যখন হেদায়াতের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন, পরম সৌভাগ্য আর প্রভূত কল্যাণে সম্মানিত হয়েছেন।

যদিও তার বয়স ছিল কম তবুও দৃঢ়তা ও জীবনবাজি রাখার ক্ষেত্রে কারও থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। তার ইসলাম গ্রহণের পর একবার কেউ রটিয়ে দিয়েছিল, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বন্দী অথবা হত্যা করে ফেলেছে। একথা শুনে তিনি আবেগ ও উত্তেজনায় এতই আত্মভোলা হয়ে পড়েছিলেন যে, তখনই একটানে তরবারি কোষমুক্ত করে মানুষের ভিড় ঠেলে আল্লাহর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দরবারে গিয়ে হাজির হন। সীরাত-লেখকদের বর্ণনা, এটাই হচ্ছে প্রথম তলোয়ার যা আত্মোৎসর্গের উদ্দেশ্যে একজন বালক উন্মুক্ত করেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে যুবাইর?' তিনি বললেন, 'শুনেছিলাম, আপনি বন্দী অথবা নিহত হয়েছেন।' রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত খুশি হয়ে তার জন্য তরবারিতে বিজয়ী হওয়ার জন্য দুআ করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.-এর ছিল গভীর হৃদ্যতা ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এ বাক্যে সুসংবাদ জানিয়েছেন,
إِنَّ لِكُلِّ نَبِي حَوَارِيًّا ، وَإِنَّ حَوَارِيَّ الزُّبَيْرُ بْنُ العَوَّامِ
প্রত্যেক নবীর জন্য হাওয়ারী তথা সার্বক্ষণিক সহচর থাকে, আমার হাওয়ারী হচ্ছে যুবাইর ইবনুল আউয়াম।

শুরুর সময়ে যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা. ছিলেন এক দরিদ্র যুবক। যখন তিনি আসমা রা.-কে বিয়ে করেন তখন তার কাজে সাহায্য কারার মতো কোনো খাদেম ছিল না। সংগৃহীত একটি ঘোড়া ছাড়া তার এমন কোনো সম্পদও ছিল না যা দ্বারা পরিবারের অভাব ও প্রয়োজন মেটাবেন। তা সত্ত্বেও হযরত আসমা রা. নিজেকে স্বামীর সম্মুখে তুলে ধরেছিলেন আদর্শ স্ত্রীরূপে। তিনি তার সেবা করতেন। তার ঘোড়ার দেখাশোনা করতেন। খাবার সংগ্রহসহ সব কাজ সম্পন্ন করতেন। এভাবেই একদিন আল্লাহ তাআলা তার স্বামীর জন্য বরকতের দুয়ার খুলে দিলেন। তিনি হয়ে গেলেন সর্বাধিক সম্পদশালী সাহাবীদের একজন।

দুটি কোমরবন্ধনীর অধিকারী
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু করার পর তথাকার মুশরিক প্রতিপক্ষ তার ওপর অত্যাচর-উৎপীড়ন আরম্ভ করে। দিনে দিনে এর মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন তিনি মক্কা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় পর্যন্ত মক্কায় যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন আবু বকর রা. তাদের অন্যতম। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতি বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। একদিন রাতের বেলা সকলের অগোচরে চুপে চুপে আবু বকর রা.-কে সঙ্গে করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে বের হন এবং মক্কার উপকণ্ঠে 'সাওর' পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নেন। এজন্য আবু বকর রা.-কে 'রফীকুল গার' বা গুহার বন্ধু বলা হয়। মক্কার মুশরিকরা তাদের খোঁজে পর্বতের এ গুহার মুখ পর্যন্ত উপস্থিত হয়, কিন্তু আল্লাহ তার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিশেষ ব্যবস্থায় রক্ষা করেন। এ সময় গোপনে যাঁরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও সাহায্য করতেন হযরত আসমা রা. তাদের অন্যতম। তিনি প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে একাকী বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে গুহায় যেতেন এবং তাদেরকে আহার করিয়ে আবার ফিরে আসতেন।

আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রা. সাওর পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। তারা সেখানে তিনটি রাত অবস্থান করলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা. তাদের পাশেই রাত্রি যাপন করতেন। তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন তরুণ। তিনি শেষ রাত্রে ওখান হতে বেরিয়ে মক্কায় রাত্রিযাপনকারী কুরাইশদের সঙ্গে মিলিত হতেন এবং তাদের দু-জনের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করা হতো তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, ও স্মরণ রাখতেন। যখন আঁধার ঘনিয়ে আসত তখন তিনি সংবাদ নিয়ে তাদের উভয়ের কাছে যেতেন। আবু বকর রা.-এর গোলাম আমির ইবনে যুহাইরাহ তাদের কাছেই দুধালো বকরীর পাল চরিয়ে বেড়াত। রাতের কিছু সময় চলে গেলে পর সে বকরীর পাল নিয়ে তাদের নিকটে যেত এবং তারা দু-জন দুধ পান করে আরামে রাত্রিযাপন করতেন। তারা বকরীর দুধ দোহন করে সাথে সাথেই পান করতেন। তারপর শেষ রাতে আমির ইবনে ফুহাইরাহ বকরীগুলি হাঁকিয়ে নিয়ে যেত। এ তিন রাতের প্রতি রাতে সে এমনই করল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রা. বনী আবদ ইবনে আদি গোত্রের এক ব্যক্তিকে মজুরির বিনিময়ে পথ প্রদর্শক নিযুক্ত করেছিলেন। দক্ষ পথপ্রদর্শককে 'খিররীত' বলা হয়। আদী গোত্রের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। সে ছিল কাফের কুরাইশের ধর্মাবলম্বী। তারা উভয়ে তাকে বিশ্বস্ত মনে করে তাদের উট দু-টি তার হাতে দিয়ে দিলেন এবং তৃতীয় রাত্রের পরে সকালে উট দু-টি সাওর গুহার নিকট নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন। আর সে যথা সময়ে তা পৌঁছিয়ে দিল। আর আমির ইবনে ফুহাইরাহ ও পথপ্রদর্শক তাদের উভয়ের সঙ্গে চলল। প্রদর্শক তাদের নিয়ে উপকূলের পথ ধরে চলতে লাগল।

মক্কার মুশরিকরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও যখন তাদের কোনো খোঁজ পেল না তখন ঘোষণা করে দিল যে, কেউ তাদের সন্ধান দিতে পারলে একশ উট পুরস্কার দেওয়া হবে। এমতাবস্থায় তৃতীয় রাতে হযরত আসমা তাদের জন্য খাবার নিয়ে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি ফিরে গিয়ে আলী রা.-কে বলবে, সে যেন আগামী কাল রাতে তিনটি উট এবং একজন পথ প্রদর্শক নিয়ে এই গুহায় আসে। নির্দেশমতো আলী রা. তিনটি উট ও একজন পথপ্রদর্শক নিয়ে হাজির হন। আর হযরত আসমা রা. তাদের দুই-তিন দিনের পাথেয় সামগ্রী নিয়ে উপস্থিত হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্রুত যাত্রার প্রস্তুতি নিতে বলেন। পাথেয় সামগ্রীর পটলার ও পানির মশকের মুখ বাঁধার প্রয়োজন দেখা দিল। তাড়াহুড়োর মধ্যে হাতের কাছে কোনো রশি পাওয়া গেল না। তখন আসমা রা. নিজের 'নিতাক' বা কোমরবন্ধনী খুলে দুই টুকরো করেন। একটি দিয়ে পাথেয় সামগ্রী ও অন্যটি দিয়ে মশকের মুখ বাঁধেন।

আসমা রা. হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রা. যখন মদীনায় যাওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন আমি তাদের জন্য সফরের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করলাম। আর আমার পিতাকে বললাম, থলের মুখ বাঁধার জন্য আমার কোমরবন্দ ছাড়া অন্য কিছু পাচ্ছি না তিনি বললেন, ওটা তুমি টুকরো করে নাও। আমি তাই করলাম। এ কারণে আমার নাম হয়ে গেল, 'যাতুন্ নিতাকাইন' (কোমরবন্দ দু-ভাগে বিভক্তকারিণী)।৪৪৬

এভাবে তিনি 'জাতুন নিতাকাইন' (দুইটি কোমরবন্ধনীর অধিকারিণী) উপাধি লাভ করেন। রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র মুখ থেকে উচ্চারিত এ উপাধিটি আল্লাহ কবুল করেন। আর তাই আজ প্রায় দেড় হাজার বছর পরেও তিনি বিশ্ববাসীর নিকট এ উপাধিতে প্রসিদ্ধ হয়ে আছেন।

আসমা রা.-এর 'যাতুন নিকাতাইন' উপাধি লাভের কারণ সম্পর্কে আরও কয়েকটি মত আছে। কেউ বলেছেন, তিনি একটি কোমরবন্ধনীর ওপর আরেকটি কোমরবন্ধনী বাঁধতেন, তাই এ উপাধি লাভ করেছেন। কেউ বলেছেন, তার দুইটি নিতাক বা কোমরবন্ধনী ছিল। একটি কোমরে বাঁধতেন, আর অন্যটি দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রয়োজনীয় আহার্য সামগ্রী বেঁধে গুহায় নিয়ে যেতেন। তাই এই উপাধি পেয়েছেন। উল্লেখ্য যে, কোমরবন্ধনী বাঁধা আরব নারীদের সাধারণ অভ্যাস।৪৪৭

ইবন হাজার রহ. বলেন, 'তিনি তার নিতাকটি ছিঁড়ে দু-টুকরো করেন। একটি দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকরের রা. পাথেয় বাঁধেন, আর অন্যটি দ্বারা নিজের কোমর বন্ধনীর কাজ চালান। আর সেখান থেকেই তাকে বলা হতে থাকে 'যাতুন নিতাক' বা 'যাতুন নিতাকাইন' অর্থাৎ, একটি কোমরবন্ধনী বা দুটি কোমরবন্ধনীর অধিকারিণী।'৪৪৮

বিচক্ষণতা ও কৌশল
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন নগদে তার হাতে প্রায় এক লাখ দিরহাম ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের প্রচার-প্রসার এবং নও-মুসলিমদের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য নিজের সব ধন-সম্পদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে তুলে দেন। এ কারণে হিজরতের সময় তার হাতে দেড় মতান্তরে পাঁচ অথবা ছয় হাজারের মতো যে অর্থ ছিল তার সবগুলো নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজনকে আল্লাহর যিম্মাদারিতে ছেড়ে যান। সাওর পর্বত থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রা.-কে বিদায় দিয়ে আসমা রা. ঘরে ফিরে আসেন। আবু বকরের রা. পিতা আবি কুহাফা, আসমা'র দাদা—যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি, বয়সের ভারে বড় দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন এবং দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি সকালে লোকমুখে ছেলের নিরুদ্দেশের কথা শুনে ছেলের বাড়িতে আসেন এবং অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে থাকেন, আফসোস! আবু বকর নিজেও চলে গেল এবং সব অর্থ-সম্পদ সঙ্গে নিয়ে ছেলে-মেয়েদেরকে বিপদে ফেলে গেল। হযরত আসমা রা. সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, না দাদা, তিনি আমাদের জন্য অনেক অর্থ রেখে গেছেন।

একথা বলে আসমা রা. বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দানের জন্য একটি থলিতে পাথর ভরে মুখ বেঁধে সেখানে রাখেন যেখানে আবু বকর রা. তার সঞ্চিত অর্থ রাখতেন। তারপর সেটি একখণ্ড কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। এরপর তিনি দাদার হাত ধরে সেই অর্থভাণ্ডারের নিকট নিয়ে যান এবং তার একটি হাত ধরে সেই পাথরভর্তি থলের ওপর আস্তে করে ঘোরাতে থাকেন। বৃদ্ধ ভাণ্ডারের যথেষ্ট অর্থ জমা আছে মনে করে আশ্বস্ত হলেন। হযরত আসমা রা. বলেছেন, আমি কেবল তাকে সান্ত্বনা দানের জন্য এমনটি করেছিলাম। আল্লাহর কসম! তিনি আমাদের জন্য কোনো কিছুই রেখে যাননি।৪৪৯

ধৈর্য ও অবিচলতা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রা. রাতের অন্ধকারে মক্কা ছেড়ে চলে গেলে তখন মুশরিকদের যেন মাথা খারাপ হয়ে গেল। এই উম্মাতের ফিরআউন-তুল্য আবু জাহেল ও মক্কার অন্যান্য পৌত্তলিক নেতৃবৃন্দ মক্কার উঁচু ও নীচু ভূমিতে অবস্থিত বনু হাশিম ও তার শাখা গোত্রগুলোর বাড়িঘর তন্ন তন্ন করে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল। অভিশপ্ত দুশমন আবু জাহলের নেতৃত্বে কুরাইশদের একদল মানুষ আবু বকরের রা. বাড়ি ঘেরাও করে। দলটির নেতা আবু জাহেল এগিয়ে গিয়ে দরজায় টোকা দেয়। বাড়িতে তখন আসমা, তার বোন আয়েশা ও আয়েশা রা.-এর মা উম্মুর রুমান রা. ছাড়া কেউ ছিলেন না। আসমা রা. বলেন, আমি দরজা খুলে তাদের সামনে গেলাম। তারা বলল, আবু বকরের মেয়ে, তোমার আব্বা কোথায়?

বললাম, আল্লাহর কসম! আমার আব্বা কোথায় তা আমি জানি না। সাথে সাথে আবু জাহেল তার একটি হাত উঁচু করে। সে ছিল একজন নীচ প্রকৃতির দুষ্কর্মকারী। সে আমার গালে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। আর তাতে আমার কানের দুলটি ছিটকে পড়ে।৪৫০

আবু জাহেল যে কত বড় নীচ পাপাচারী ছিল তা এই ঘটনা দ্বারা কিছুটা অনুমান করা যায়। যে গৃহে এই ঘটনাটি ঘটেছিল তখন সেই গৃহে কোনো পুরুষ ছিল না। আসমা রা. তখন গর্ভবতী এবং তার মহান স্বামী যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. তখন অনুপস্থিত। তিনি এ ঘটনার আগেই মদীনায় হিজরত করেছেন। এই যুবায়ের রা. ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর অশ্বারোহী যোদ্ধা। তার উপস্থিতিতে মক্কার কোনো পাষণ্ডের এমন বুকের পাটা ছিল না যে, তার স্ত্রীর দিকে চোখ উঁচু করে তাকায়, হাত উঠানো তো দূরের কথা।

হিজরত ও মুহাজিরদের প্রথম সন্তান
হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর সিদ্দীক রা. মদীনা পৌঁছে নতুন স্থানের প্রাথমিক সমস্যা কাটিয়ে একটু স্থির হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেন যে, মক্কা থেকে মহিলাদের আনার ব্যবস্থা করতে হবে। উল্লেখ্য যে, হযরত আসমার স্বামী যুবাইর রা. নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্বেই মদীনায় পৌঁছে গেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদ ইবনে হারিসা রা. ও স্বীয় দাস রাফে'কে মক্কায় পাঠালেন। আর এদিকে আবু বকর রা. এক ব্যক্তিকে পাঠালেন।

আবু বকর রা.-এর ছেলে আবদুল্লাহ তার মা, দুই বোন আসমা ও আয়েশা এবং পরিবারের কয়েকজন মহিলাকে নিয়ে মদীনার পথ ধরেন। আসমা রা. তখন আসন্ন প্রসবা মহিলা। মদীনার কুবা পল্লীতে পৌঁছার পর গর্ভস্থ সন্তান আবদুল্লাহর জন্ম হয়।৪৫১ এ সম্পর্কে আসমার রা. বলেন, 'আমার তখন পূর্ণ গর্ভাবস্থা। এ অবস্থায় আমি মদীনায় পৌঁছে কুবায় ঠাঁই নিলাম। তারপর আবদুল্লাহকে প্রসব করলাম। তাকে নিয়ে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোলে রাখলাম। তিনি একটি খেজুর আনিয়ে চিবালেন এবং সেই থুথু তার মুখে দিলেন। এভাবে জন্মের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের থুথুই প্রথমে তার পেটে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করে দুআও করেন। সে ছিল মদীনার মুহাজিরদের ঘরে জন্ম নেওয়া প্রথম শিশু।৪৫২

মদীনার কোনো মুহাজির দম্পতির কোনো সন্তান না হওয়ায় লোকেরা বলাবলি করত যে, ইহুদীরা তাদের জাদু করেছে তাই তাদের কোনো সন্তান হবে না। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে আবদুল্লাহ ভূমিষ্ঠ হলে মুহাজিরদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। তারা তাকবীর ধ্বনি দিয়ে ইহুদীদের অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানায়।

আসমা বিনতে আবু বকর রা. হতে বর্ণিত, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়রকে মক্কায় গর্ভে ধারণ করেন। তিনি বলেন, গর্ভকাল পূর্ণ হওয়া অবস্থায় আমি বেরিয়ে মদীনায় এলাম এবং কুবায় অবতরণ করলাম। কুবাতেই আমি তাকে প্রসব করি। তারপর তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তাকে তার কোলে রাখলাম। তিনি একটি খেজুর আনতে বললেন। তা চিবিয়ে তিনি তার মুখে দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই লালাই প্রথম তার পেটে প্রবেশ করেছিল। তারপর তিনি খেজুর চিবিয়ে তাহনীক করলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করলেন। হিজরতের পরে ইসলামে জন্মলাভকারী সে-ই ছিল প্রথম সন্তান। তাই তার জন্যে মুসলিমরা মহা আনন্দে আনন্দিত হয়েছিলেন। কারণ, তাদের বলা হতো ইহুদীরা তোমাদের যাদু করেছে, তাই তোমাদের সন্তান হয় না।৪৫৩

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানের নানা আবু বকর রা.-কে নির্দেশ দেন তার দু-কানে আযান দেওয়ার জন্য। তিনি আযান দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুর নাম রাখেন আবদুল্লাহ এবং কুনিয়াত বা ডাকনাম রাখেন নানার ডাক নামে—আবু বকর। পরবর্তী সময়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র রা. একটু গর্বের সাথে বলতেন, 'আমি মায়ের পেটে থাকতেই হিজরত করেছি।' তিনি আরও বলতেন, 'আমার মা আমাকে পেটে নিয়ে হিজরত করেছেন। তিনি যত ক্লান্তি ও ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করেছেন তার সবই আমিও সহ্য করেছি।৪৫৪

হযরত আসমা রা. তার এই সন্তান আবদুল্লাহকে অন্তর উজাড় করা স্নেহ-মমতা দিয়ে লালন-পালন করেন যাতে পরবর্তীকালে ইসলামের একজন সেরা সন্তান হতে পারে। আসমার রা. স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে। এ পৃথিবীতে সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় যাঁর জীবন দান করে গেছেন তাদের সেই তালিকায় আসমার রা. এই সন্তানও নিজের নামটি অন্তর্ভুক্ত করে যেতে সক্ষম হয়েছেন।

বালাযুরীর বর্ণনা মতে, হযরত যুবায়র ইবনুল আওয়াম রা.-এর ঔরসে এবং আসমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন, পুত্র আবদুল্লাহ, মুনযির, উরওয়াহ, আসিম এবং কন্যা উম্মুল হাসান ও আয়েশা।৪৫৫

দানশীলতা ও বদান্যতার অনন্য গুণ
হযরত আসমার রা. চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দানশীলতা। আর এ গুণটি তিনি অর্জন করেন আল্লাহর প্রতি তার দৃঢ় ঈমান ও পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে। পিতা আবু বকরের রা. দানশীলতার গুণটি তার তিন কন্যা—আসমা, আয়েশা ও উম্মে কুলসুম রা. পূর্ণরূপে ধারণ করেন। দানশীলতার এ গুণটি তাদের সত্তায় পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়। এমনকি তাদের সময়ে এ ক্ষেত্রে তারা দৃষ্টান্তে পরিণত হন। মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির বলেন, 'আসমা ছিলেন একজন উদারপ্রাণ দানশীল স্বভাবের মহিলা।৪৫৬

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. তার মা ও খালার দানশীলতার কথা বলছেন এভাবে: 'আমি আমার মা আসমা ও খালা আয়েশা রা. থেকে অধিক দানশীলা কোনো নারী দেখিনি। তাদের দু'জনের দান প্রকৃতির মধ্যে কিছু ভিন্নতা ছিল। খালা আয়েশার স্বভাব ছিল প্রথমত তিনি বিভিন্ন জিনিস একত্র করতেন। যখন দেখতেন যে যথেষ্ট পরিমাণে জমা হয়ে গেছে তখন হঠাৎ করে একদিন তা সবই বিলিয়ে দিতেন; কিন্তু আমার মা আসমার রা. স্বভাব ছিল ভিন্নরূপ। তিনি আগামীকাল পর্যন্ত কোনো জিনিস নিজের কাছে জমা করে রাখতেন না।৪৫৭

সম্ভবত আসমা রা. এই দানশীতার ক্ষেত্রে তার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপদেশ বাণীর অনুসরণ করতেন। তিনি আসমাকে কোনো জিনিস জমা করে রাখতে এবং গুনে গুনে খরচ করতে নিষেধ করেন এবং বলেন তুমি যদি এমন কর তাহলে আল্লাহ তোমার প্রতিও এমন করবেন। তোমর রুযি-রিযিকের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘হে আসমা, তুমি হিসাব কর না। তাহলে আল্লাহও তোমাকে দানের ক্ষেত্রে হিসাব করবেন’।৪৫৮

আসমা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই উপদেশ বাণীর পর থেকে আমি কী খরচ করলাম এবং কী আমার হতে এলো তা আর হিসাব করিনি। যা কিছুই আমি খরচ করেছি আল্লাহ আমাকে তা পূরণ করে দিয়েছেন।৪৫৯

তিনি তার ছেলে-মেয়েদের এই বলে উপদেশ দিতেন যে, তোমরা ধন-সম্পদ অন্যের সাহায্য ও উপকারের জন্য দেওয়া হয়, জমা করার জন্য নয়। তুমি তোমার অর্থ-বিত্ত আল্লাহর বান্দাদের জন্য খরচ না কর এবং কৃপণতা কর তাহলে আল্লাহও তার অনুগ্রহ থেকে তোমাকে বঞ্চিত করবেন। তুমি যা কিছু দান করবে অথবা খরচ করবে, প্রকৃতপক্ষে তাই হবে তোমার সঞ্চয়, এ সঞ্চয় কখনো কম হবে না, অথবা নষ্টও হবে না।৪৬০

হযরত আসমা রা. কখনো অসুস্থ হলে তার মালিকানার সকল দাসকে মুক্ত করে দিতেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. মৃত্যুকালে এক খণ্ড ভূমি রেখে যান যা উত্তরাধিকার হিসেবে আসমা রা. লাভ করেন। তিনি সেই ভূমিটুকু এক লাখ দিরহামে বিক্রি করেন এবং সকল অর্থ আত্মীয় ও পরিজনদের মধ্যে বিলি করে দেন।

একবার হযরত আসমা রা.-এর মা মদীনায় তার নিকট আসেন এবং কিছু অর্থ সাহায্য চান। তিনি তার অভ্যাস মতো রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট ছুটে যান এবং জিজ্ঞেস করেন, 'আমার মা একজন মুশরিক (পৌত্তলিক), আমার নিকট কিছু অর্থ সাহায্য চাচ্ছেন, আমি কি তাকে সাহায্য করতে পারি?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তিনি তোমার মা। অর্থাৎ তাকে তুমি সাহায্য করতে পার।'

ইবাদত-বন্দেগী
আল্লাহর পথে সবকিছু বিলিয়ে দেওয়া, দানশীলতা, উন্নত নৈতিকতা যেমন তার চরিত্রকে মাধুর্যমণ্ডিত করেছিল তেমনিভাবে জ্ঞান, খোদাভীতি, বুদ্ধিমত্তা, ফিকহ্ বিষয়ে পরদর্শিতা তার সত্তাকে আরও মহিয়ান করে তোলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা, জিহাদে অংশগ্রহণ এবং এ জাতীয় অন্যান্য কাজে তার সমান অংশীদারত্ব লক্ষ্য করা যায়। বিনীত ও বিনম্রভাবে ইবাদতে মশগুল থাকতেন এবং একাগ্রচিত্তে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। বিশেষ কোনো আয়াত পাঠের সময় বিগলিত চিত্তে বার বার তা আওড়াতে থাকতেন। তার স্বামী বর্ণনা করেছেন, একদিন আমি আসমার (র) ঘরে ঢুকে দেখি সে নামাযে দাঁড়িয়ে এ আয়াত—
فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ
অতঃপর আমাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। ৪৬১
-পাঠ করল। তারপর পাঠ করল আউযুবিল্লাহ। আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম, কিন্তু সে কাঁদছে আর আউযুবিল্লাহ পাঠ করছে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমি বাজারে গেলাম। কাজ সেরে আবার সেখানে ফিরে গিয়ে দেখলাম, তখনও সে কাঁদছে আর আউযুবিল্লাহ পাঠ করছে।৪৬২

ইসলামী জীবন গ্রহণ করার পর ঈমান তার অন্তরে এমন দৃঢ়মূল হয় যে, শিরক ও কুফরীর সাথে বিন্দুমাত্র আপোষ করেননি। এমনকি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে—এই চিন্তা করে নিজের অতি নিকটের অমুসলিম আপনজনদের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করেন। আসমা রা.-এর পিতা তার মাকে তালাক দিলে সেই জাহিলী যুগেই তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। আসমার গোটা পরিবার ইসলামী পরিবারে পরিণত হলো। একদিন আসমার রা. মা তার মেয়েকে দেখার জন্য আসলে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট জানতে চান, তার এই মুশরিক মায়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন কি না? তখন এ আয়াত নাযিল হয়,
لَا يَنْهُكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।৪৬৩

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তার মুশরিক মায়ের সাথে সদাচারণের নির্দেশ দিয়ে বলেন, হ্যাঁ, তোমার মায়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখ।৪৬৪

আমির ইবনে আবদিল্লাহ তার পিতা আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, একবার কুতাইলা বিনতে আবদিল উয্যা কিছু কিসমিস, ঘি, পনির ইত্যাগি উপহার নিয়ে কন্যা আসমার গৃহে আসলেন। আসমা রা. তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি তাকে ঘরে ঢুকতে দিলেন না। আয়েশা রা. বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবহিত করে তার মতামত জানতে চান। তখন নাযিল হয় সূরা আল-মুমতাহিনার উক্ত আয়াতটি। তখন আসমা রা. মাকে সাদরে গ্রহণ করে ঘরে নিয়ে বসান এবং তার উপহার সামগ্রী গ্রহণ করেন।৪৬৫

হযরত আসমা রা. ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নিরহঙ্কারী মানুষ। সংসারে যাবতীয় কাজ নিজ হাতে করতে কোনো লজ্জাবোধ করতেন না।

বীরত্ব ও সাহসিকতা
প্রাচীন কাল থেকে আরব বীরত্ব ও সাহসিকতাও তাদের বিশেষ প্রকৃতি ও গুণ। এ কারণে হযরত আসমা রা. দানশীল হিসেবে যেমন খ্যাতি অর্জন করেছেন, তেমনি একজন সাহসী বীর মহিলা হিসেবেও প্রসিদ্ধি পেয়েছে। সাঈদ ইবনে আস রা.-এর সময় যখন মদীনার আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে এবং শহরে ব্যাপকভাবে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে তখন হযরত আসমা রা. একটি তীক্ষ্ণ খঞ্জর বালিশের নীচে রেখে ঘুমাতেন। লোকেরা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো চোর-বাটপার ও দুষ্কৃতিকারী যদি ঘরে ঢুকে যায় এবং আমার ওপর হামলা করে তাহলে আমি তার পেট ফেড়ে ফেলবো।৪৬৬

হযরত আসমা রা. স্বামী যুবাইর রা.-এর সঙ্গে বিখ্যাত ইয়ারমুক যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন। হযরত আসমা রা.-এর পুত্র আবদুল্লাহর রা. বয়স যখন পূর্ণ যৌবনকাল তখন উমাইয়্যা খলীফাদের বিরুদ্ধাচরণ করে হিজায, মিসর, ইরাক ও খুরাসানসহ সিরিয়ার বেশির ভাগ অঞ্চলের লোকেরা তাকে খলীফা বলে মেনে নেয় এবং তার হাতে বাইআত (আনুগত্যের শপথ) করে। উমাইয়্যা খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মুআবিয়া রা. ইন্তেকালের পূর্বে তার তাঁর পুত্র ইয়াযীদকে খিলাফতের উত্তরাধিকারী মনোনীত করে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করে যান; কিন্তু ইয়াযীদের এভাবে রাজতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা গ্রহণ ও তার অনৈসলামী জীবনধারা ইসলামী খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলের জনসাধারণ মেনে নিতে পারেনি। হযরত আবদুল্লাহ রা.-ও ইয়াযীদের বাইআত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তিনি মক্কাকে ইসলামী খিলাফতের রাজধানী ঘোষণা দিয়ে সেখানে অবস্থান নেন। চতুর্দিক থেকে মানুষ দলে দলে এসে তার হাতে বাইআত করতে থাকে। তিনি তার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে শাসনকাজ পরিচালনা করতে থাকেন। যখন আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন তার উযীর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ হযরত আবদুল্লাহ রা.-কে প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিশাল সমরশক্তি নিয়ে হিজরী ৭২ সনের ১লা যুলহিজা মক্কা অবরোধ করেন। বাইরের সকল যোগাযোগ থেকে মক্কা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

একাধারে ছয় মাস উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলে। দীর্ঘ অবরোধের ফলে মক্কার মানুষের জীবনধারা সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। হযরত আবদুল্লাহর রা. সহযোগীদের সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকে। তারা বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা না দেখে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে থাকে। তিনি তার শেষ মুহূর্তের মুষ্টিমেয় কিছু অনুসারীদের নিয়ে কাবার হারাম শরীফে অবস্থান নেন। এখানে উমাইয়্যা সেনাবাহিনীর সাথে চূড়ান্ত সংঘর্ষের কিছুক্ষণ পূর্বে তিনি মা আসমা রা.-এর সাথে শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করতে যান। হযরত আসমা রা. তখন বার্ধক্যের ভারে জর্জরিত ও অন্ধ। হযরত আসমার ঘটনাবহুল জীবনের অনেক কথাই ইতিহাস ধরে রাখতে পারেনি। তবে মাতা-পুত্রের এই শেষ সাক্ষাতের সময় তিনি যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, ঈমানী মজবুতী, চরম আত্মত্যাগ, আল্লাহ নিভর্রতা ও সত্যের প্রতি একনিষ্ঠতার পরিচয় দেন ইতিহাসে তা চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। মাতা-পুত্রের সেই সংলাপটি ছিল নিম্নরূপ:

আবদুল্লাহ : মা, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহু।
আসমা : আবদুল্লাহ, ওয়া আলাইকাস সালাম। হাজ্জাজ-বাহিনীর মিনজানিক হারাম শরীফে অবস্থানরত তোমার বাহিনীর ওপর পাথর নিক্ষেপ করছে, মক্কার বাড়ি-ঘর প্রকম্পিত করে তুলছে, এমন চরম মুহূর্তে তোমার আগমন কী উদ্দেশ্যে?
আবদুল্লাহ: উদ্দেশ্য আপনার সাথে পরামর্শ।
আসমা: পরামর্শ! কী বিষয়ে?
আবদুল্লাহ : হাজ্জাজের ভয়ে অথবা প্রলোভনে আমার সঙ্গীরা আমাকে বিপদের মধ্যে ফেলে চলে গেছে, এমন কি আমার সন্তান এবং আমার পরিবারের লোকেরাও আমাকে পরিত্যাগ করেছে। এখন আমার সাথে অল্প কিছু লোক আছে। তাদের ধৈর্য ও সাহস যত বেশিই হোক না কেন দু-এক ঘণ্টার বেশি কোনোমতেই টিকে থাকতে পারবে না। এদিকে উমাইয়্যারা প্রস্তাব পাঠাচ্ছে, আমি যদি মালিক ইবনে মারওয়ানকে খলীফা হিসেবে স্বীকার করে নিই এবং অস্ত্র ত্যাগ করে তার হাতে বাইআত হই, তাহলে পার্থিব সুখ-সম্পদের যা আমি চাইব তাই তারা দেবে। এমতাবস্থায় আপনি আমাকে কী পরামর্শ দেন?

আসমা রা. একটু উচ্চস্বরে বলেন: ব্যাপারটি একান্তই তোমার নিজের। আর তুমি তোমার নিজের সম্পর্কে বেশি জান। যদি তোমার দৃঢ় প্রত্যয় থাকে যে, তুমি হকের ওপর আছ এবং মানুষকে হকের দিকে আহ্বান করছ, তাহলে যারা তোমার পতাকাতলে অটল থেকে শাহাদাত বরণ করেছে, তাদের মতো তুমিও অটল থাক। আর যদি তুমি দুনিয়ার সুখ-সম্পদের প্রত্যাশী হয়ে থাক, তাহলে তুমি একজন নিকৃষ্টতম মানুষ। তুমি নিজেকে এবং তোমার লোকদের ধ্বংস করছ। পুরুষের মতো যুদ্ধ কর এবং জীবনের ভয়ে কোনো অপমানকে সহ্য কর না। অবমাননাকর জীবনের চেয়ে সম্মানের সাথে তরবারির আঘাত খেয়ে মৃত্যুবরণ করা অনেক শ্রেয়! তুমি শহীদ হলে খুশি হব। আর যদি এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রত্যাশী হও, তাহলে তোমার চেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ আর কে আছে? তুমি যদি এই ভেবে থাক যে, তুমি একা হয়ে গিয়েছ এবং আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, তাহলে এই কর্মপদ্ধতি কোনো সম্মানীয় ব্যক্তির নয়। তুমি কতদিন বেঁচে থাকবে? একটি সুনাম ও সুখ্যাতি নিয়ে মর। তাহলে আমি সান্ত্বনা খুঁজে পাব।

আবদুল্লাহ: তাহলে আজ আমি নিশ্চিত নিহত হব।
আসমা : স্বেচ্ছায় হাজ্জাজের নিকট আত্মসমর্পণ করবে এবং বনী উমাইয়্যার ছোকরারা তোমার মুণ্ডু নিয়ে খেলা করবে, তা থেকে যুদ্ধ করে নিহত হওয়াই উত্তম।
আবদুল্লাহ: মা, আমি নিহত হতে ভয় পাচ্ছি না। আমার ভয় হচ্ছে, তারা আমাকে নানাভাবে শাস্তি দেবে। আমার হাত-পা কেটে, অঙ্গ-প্রতঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে আমাকে বিকৃত করে ফেলবে।
আসমা : বেটা! নিহত হওয়ার পর মানুষের ভয়ের কিছু নেই। যবেহ করা ছাগলের চামড়া ছিলার সময় সে কষ্ট পায় না।

মায়ের একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহর রা. মুখমণ্ডলের দীপ্তি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, আমার কল্যাণময়ী মা, আপনার সুমহান মর্যাদা আরও কল্যাণময় হোক। এ সংকটময় মুহূর্তে আপনার মুখ থেকে কেবল একথাগুলো শোনার জন্য আমি আপনার খেদমতে হাজির হয়েছিলাম। আল্লাহ জানেন, আমি ভীত হইনি, আমি দুর্বল হইনি। তিনিই সাক্ষী, আমি যে জন্য সংগ্রাম করছি, তা কোনো জাগতিক সুখ-সম্পদ ও মান-মর্যাদার প্রতি লোভ-লালসা ও ভালোবাসার কারণে নয়। বরং এ সংগ্রাম হারামকে হালাল ঘোষণা করার প্রতি আমার তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষের কারণেই। আপনি যা পছন্দ করেছেন, আমি এখন সে কাজেই যাচ্ছি। আমি শহীদ হলে আমার জন্য কোনো দুঃখ করবেন না এবং আপনার সবকিছুই আল্লাহর হাতে সোপর্দ করবেন।

আসমা : যদি তুমি অসত্য ও অন্যায়ের ওপর নিহত হও, তাহলে আমি ব্যথিত হব।

আবদুল্লাহ : আম্মা, আপনি বিশ্বাস রাখুন, আপনার এ সন্তান কখনো অন্যায়, অশ্লীল ও অশালীন কাজ করেনি, আল্লাহর আইন লঙ্ঘন করেনি, কারও বিশ্বাস ভঙ্গ করেনি, কোনো মুসলমান বা যিম্মীর ওপর যুলুম করেনি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অপেক্ষা উৎকৃষ্ট কোনো কিছু এ দুনিয়ায় তার কাছে নেই। একথা দ্বারা নিজেকে পবিত্র ও নিষ্পাপ বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। কারণ, আমার সম্পর্কে আল্লাহই বেশি ভালো জানেন। তারপর তিনি আকাশের দিকে মুখ উঠিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেন: ইলাহী, তুমি ভালো করেই জান যে, আমি আমার মাকে যা কিছু বলেছি, তা কেবল তাকে সান্ত্বনা দানের জন্য। যাতে তিনি আমার এই অবস্থা দেখে কষ্ট না পান।

আসমা রা. বললেন, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তার ও আমার পছন্দনীয় কাজের ওপর তোমাকে অটল রেখেছেন। আমার ছেলে, আমি আশা করি তোমার ব্যাপারে আমার ধৈর্য হবে এক অতুলনীয় ধৈর্য। তুমি আমার সামনে নিহত হলে, তা হবে আমার সাওয়াবের উপলক্ষ্য। তুমি বিজয়ী হলে তা হবে আমার জন্য আনন্দের বিষয়। এখন আল্লাহর নাম নিয়ে সামনে এগিয়ে যাও। বৎস! তুমি একটু আমার কাছে এসো, আমি শেষবারের মতো একটু তোমার শরীরের গন্ধ শুকি এবং তোমাকে একটু স্পর্শ করি। কারণ, এটাই তোমার ও আমার ইহজীবনের শেষ সাক্ষাৎ।

আবদুল্লাহ রা. বাঁকা হয়ে মার হাত-পা চুমুতে চুমুতে ভরে দিতে লাগলেন, আর মা ছেলের মাথা, মুখ ও কাঁধে নিজের নাক ও মুখ ঠেকিয়ে শুকতে ও চুমু দিতে লাগলেন এবং তার শরীরে নিজের দু'টি হাতের স্নেহের পরশ বুলিতে দিলেন। বিদায় বেলা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে একথা বলতে বলতে তাকে আবার দূরে ঠেলে দিলেন: আবদুল্লাহ, তুমি এ কী পরেছ?
-আম্মা, এ তো আমার বর্ম।
-বেটা, যারা শাহাদাতের অভিলাষী, এ তাদের পোশাক নয়।
-মা, আপনাকে খুশি করা ও আপনার হৃদয়ে প্রশান্তি দানের উদ্দেশ্যে আমি এ পোশাক পরেছি।
-তুমি এটা খুলে ফেল। তোমার ব্যক্তিত্ব, তোমার সাহস এবং তোমার আক্রমণের পক্ষে উচিত কাজ হবে এটিই। তাছাড়া এ হবে তোমার কর্মতৎপরতা, গতি ও চলাফেরার জন্যও সহজতর। এর পরিবর্তে তুমি লম্বা পাজামা পরো। তাহলে তোমাকে মাটিতে ফেলে দেওয়া হলেও তোমার সতর অপ্রকাশিত থাকবে।

মায়ের কথামত আবদুল্লাহ তার বর্ম খুলে পাজামা পরলেন এবং একথা বলতে বলতে হারাম শরীফের দিকে যুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে চলে গেলেন।
: মা, আমার জন্য দুআ করতে ভুলবেন না-আমার নিহত হওয়ার পূর্বে ও পরে উভয় অবস্থায়।
আসমা : আল্লাহর দরবারে দুআ করতে আমি কখনো ভুলব না। কেউ অসত্যের ওপর যুদ্ধ করে, কিন্তু তোমার এ যুদ্ধ সত্যের জন্য।

তারপর তিনি দুটি হাত আকাশের দিকে তুলে দুআ করলেন: হে আল্লাহ, রাতের অন্ধকারে মানুষ যখন গভীর ঘুমে অচেতন থাকে, তখন রাত জেগে জেগে তার দীর্ঘ ইবাদত ও উচ্চকণ্ঠে কান্নার জন্য আপনি তার ওপর রহম করুন। হে আল্লাহ, রোযা অবস্থায় মক্কা ও মদীনাতে মধ্যাহ্নকালীন ক্ষুধা ও পিপাসার জন্য তার ওপর দয়া করুন। হে আল্লাহ, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের জন্য তার প্রতি আপনি করুণা বর্ষণ করুন। হে আল্লাহ, আমি তাকে আপনারই নিকট সোপর্দ করেছি। তার জন্য আপনি যে ফয়সালা করবেন তাতেই আমি রাজী। এর বিনিময়ে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের প্রতিদান দান করুন।

মা হযরত আসমা রা.-এর কথাগুলো হযরত আবদুল্লাহর রা. অন্তরে প্রশান্তি বয়ে আনে। তিনি চলে যান এবং অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে যুদ্ধ করে শহীদ হন। মৃত্যুর পূর্বে তার মুখ থেকে নিম্নের চরণ দু-টি উচ্চারিত হচ্ছিল,
اسماء ان قتلت لا تبكيني
لم يبق الا حسبی و دینی
و صارم لانت به یمینی
আমার মা আসমা, আমি নিহত হলে আমার জন্য কাঁদবেন না। আমার আভিজাত্য ও আমার দ্বীনদারী ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আর অবশিষ্ট আছে একখানি ধারালো তরবারি যা দিয়ে আঘাত করতে করতে আমার ডান হাত দুর্বল হয়ে গেছে।

সে দিন সূর্য অস্ত যাবার আগেই হযরত আবদুল্লাহ রা. তার মহাপ্রভুর সাথে মিলিত হন। হত্যার পর হাজ্জাজ তার লাশ ঝুলিয়ে রেখেছিল। দাসীকে সঙ্গে করে মা আসমা রা. এলেন ছেলের লাশ দেখতে। দেখলেন, নীচের দিকে মুখ করে লাশ ঝুলানো রয়েছে। লাশের পাশে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শান্ত ও দৃঢ়ভাবে বললেন, 'ইসলামের এ অশ্বারোহীর এখনো কি অশ্বের পিঠ থেকে নামার সময় হলো না?' জনতার ভিড় কমানোর উদ্দেশ্যে তাকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য হাজ্জাজ লোক পাঠায়। তিনি যেতে অস্বীকৃতি জানান। সে আবারো লোক মারফত বলে পাঠায়, এবার না এলে চুলের গোছা ধরে টেনে আনা হবে। হযরত আসমা রা. হাজ্জাজের ভয়ে ভীত হলেন না। তার ধমকে মোটেই কান দিলেন না।

সত্য উচ্চারণ ছিল হযরত আসমার রা. চরিত্রের উজ্জ্বলতম বৈশিষ্ট্য। হাজ্জাজের মতো নরঘাতক অত্যাচারীর সামনে অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে সত্য উচ্চারণ করেছেন। তার সামনা সামনি দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে তার অহঙ্কার চূর্ণ করে দিয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহর রা. শাহাদাতের পর হাজ্জাজ হযরত আসমার রা. নিকট এসে বলে, আপনার ছেলে আল্লাহর ঘরে ধর্মবিরোধী কাজ করেছে ও নাস্তিকতা প্রচার করেছে। তাই আল্লাহ তাকে কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করিয়েছেন।

দৃঢ় কণ্ঠে আসমা রা. জবাব দেন, 'তুমি মিথ্যাবাদী, আমার ছেলে নাস্তিক ছিল না। সে ছিল সাওম পালনকারী, পিতামাতার অনুগত ও বাধ্য সন্তান। তবে আমি রাসূলের মুখ থেকে শুনেছি, সাকীফ বংশে একজন মিথ্যাবাদী ও ভণ্ড এবং আরেকজন যালিম পয়দা হবে। মিথ্যাবাদী (আল-মুখতার আস-সাকাফী)-কে তো আগেই দেখেছি। আর যালিম, সে তুমিই-যাকে আমি এখন দেখছি।' হযরত আসমার রা. একথা শুনে হাজ্জাজ ভীষণ উত্তেজিত হয় এবং বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যায়; কিন্তু কোনো কিছু বলার সাহস হারিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।৪৬৭

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। হাজ্জাজ আসমা রা.-কে লক্ষ্য করে বলে, 'বলুন তো, আমি আল্লাহর দুশমন আবদুল্লাহর সাথে কেমন ব্যবহার করেছি?' আসমা জবাব দেন, 'তুমি তার দুনিয়া নষ্ট করেছ, আর সে নষ্ট করেছে তোমার আখিরাত। আমি শুনেছি, তুমি নাকি তাকে 'যাতুন নিতাকাইন' তনয় বলে ঠাট্টা করেছ! আল্লাহর কসম, আমিই 'যাতুন নিতাকাইন'। আমি একটি নিতাক দিয়ে রাসূলুল্লাহ রা. ও আবু বকরের রা. খাবার বেঁধেছি। আরেকটি নিতাক আমার কোমরেই আছে।৪৬৮

একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, হাজ্জাজ আসমার রা. নিকট এসে বলে, মা, আমীরুল মু'মিনীন আপনার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। আপনার কোনো প্রয়োজন আছে কি? আসমা রা. অত্যন্ত কঠোরভাবে বলেন, আমি তোমার মা নই। আমি রাস্তার মাথায় শূলীতে ঝোলানো ব্যক্তির মা। আমার কোনো প্রয়োজন নেই।৪৬৯

হযরত আবদুল্লাহ রা.-এর শাহাদাতের পর একদিন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে বলা হলো, আসমা রা. মসজিদের এক কোণে বসে আছেন। তিনি তার দিকে একটু ঝুঁকে বললেন, 'এই প্রাণহীন দেহ কিছুই না। রূহ তো আল্লাহর নিকট পৌঁছে গেছে। আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং ধৈর্য অবলম্বন করুন।' আসমা বললেন, 'আমাকে তা করতে কীসে বারণ করেছে? নবী ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়ার মাথাও বনী ইসরাঈলের এক পতিতাকে উপহার দেওয়া হয়েছিল!'৪৭০

হযরত আবদুল্লাহর লাশ কয়েকদিন যাবত ঝোলানো অবস্থায় থাকার সময় হযরত আসমা রা. আল্লাহর নিকট দুআ করতেন এই বলে যে, 'হে আল্লাহ, আবদুল্লাহর গোসল দেওয়া ও কাফন-দাফনের ব্যবস্থার না করে যেন আমার মৃত্যু না হয়।' লাশ নামানোর পর আসমা রা. তা চেয়ে এনে অতিকষ্টে যমযমের পানি দিয়ে গোসল দেন।৪৭১

আল ফাকিহী বলেন, 'বরকত হিসেবে মক্কাবাসীরা তাদের মৃতদের যমযমের পানি দিয়ে গোসল করাত।৪৭২ মাংস পঁচে-গলে গিয়েছিল। আসমা রা. নিজের ছেলের এ অবস্থা দেখেও মোটেই ভেঙে পড়েননি। ধৈর্যধারণ করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন।

ইবন মুলাইকা বলেন, গোসলের দায়িত্ব যাদের ওপর পড়েছিল তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আমরা একটি অঙ্গ ধরছিলাম, আর তা আমাদের হাতে সাথে চলে আসছিল। সেটি ধুয়ে আমরা কাফনের ওপর রেখে আরেকটি অঙ্গ ধরছিলাম। এভাবে আমরা তার গোসল সম্পন্ন করি। তারপর তার মা আসমা দাঁড়িয়ে জানাযার নামায পড়েন। মক্কার আল-মুআল্লাত কবরস্থানে তাকে দাফন করেন।৪৭৩

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র রা. হিজরী ৭৩ সনের জুমাদাল ঊলা মাসের ১৭ তারিখ শাহাদাত বরণ করেন। এর কয়েকদিন পরে হিজরী ৭৩ সনের মক্কায় হযরত আসাম রা.ও ইহলোক ত্যাগ করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল একশ বছর। মুহাজির পুরুষ ও মহিলা সাহাবীদের মধ্যে তিনিই সর্বশেষে মৃত্যুবরণ করেন।৪৭৪

এ দীর্ঘ জীবনে তার একটি দাঁতও পড়েনি বা সামান্য স্মৃতিবিভ্রমও দেখা যায়নি। মক্কায় তার ছেলে আবদুল্লাহ রা.-এর পাশেই তাকে দাফন করা হয়। তার পবিত্র আত্মা উড়ে যায় মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে। তার সুরভিত জীবন কাহিনী এখানে থেমে গেলেও তার জীবনের শিক্ষা সর্বকালের সর্বযুগের নারী ও মা-বোনদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে অমর আছে। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন。

**টিকাঃ**
৪৪৪. সুনান, তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬৬১; আলবানী হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
৪৪৫. সূরা তাওবাহ, ৯:১০০।
৪৪৬. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৯০৭।
৪৪৭. নিসাউম মিন আসারিন নুবুওয়াহ, ২৩৮।
৪৪৮. বানাতুস সাহাবা, ৫০।
৪৪৯. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৪৪৮।
৪৫০. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২৯০।
৪৫১. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৩; উসুদুল গাবাহ, ৫/৩৯২।
৪৫২. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৯০৯।
৪৫৩. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫৪৬৯।
৪৫৪. আল ইসাবাহ, ৫/২২৯।
৪৫৫. আনসাবুল আশরাফ, ১/৪২২।
৪৫৬. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৫৩।
৪৫৭. তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওয়াল আ'লাম, ৩/১৩৫।
৪৫৮. সহীহ, বুখারী: হাদীস নং ১৪৩৩; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১০২৯; দুররে মানসূর, ৭/৬৩৫।
৪৫৯. নিসাউম মিন আসারিন নুবুওয়াহ, ৩৫৭।
৪৬০. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৩৫৭।
৪৬১. সূরা আত-তুর, ৫২:২৭।
৪৬২. হিলয়াতুল আওলিয়া, ২/৫৫; আদ দুররুল মানসুর, ৭/৬৩৫।
৪৬৩. সূরা মুমতাহিনা, ৬০:৮।
৪৬৪. তাফসীরে কুরতুবী, ১০/২৩৯; মুসনাদ, আহমাদ: ৬/৩৪৪, ৩৪৭, ৩৫৫।
৪৬৫. মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩৪৪; দুররে মানছুর, ৮/১৩১।
৪৬৬. নিসাউন হাওলার রাসূল, ১৮৪।
৪৬৭. সহীহ, মুসলিম, ২৫৪৫; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৫৪; মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩৫১; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৯৬।
৪৬৮. তারীখু ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওয়াল আ'লাম, ৩/১৩৬।
৪৬৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৯৪।
৪৭০. তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত, ২/৩৩০।
৪৭১. যাদুল মা'আদ, ১/১৪০।
৪৭২. নিসাউম মুবাশশারাত ফিল জান্নাহ, ২৬৬।
৪৭৩. বানাতুস সাহাবা, ৭১।
৪৭৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৯৬।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা.

📄 উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা.


শহীদ ও অতুল ধৈর্যবতী

মানবজাতি তখন অজ্ঞতা ও পাপাচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত। এমন সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক পবিত্র দ্বীন তথা জীবন বিধান নিয়ে আসেন। তিনি মানব জাতিকে শিরক ও কুফরের গহীন অন্ধকার থেকে বের করে তাওহীদ ও ঈমানের শুভ্র-সফেদ আলোর দিকে পথ দেখান। এমন পরিস্থিতিতে উত্তম চরিত্র ও ভালো মনের মানুষেরা সাড়া দেন তার ডাকে। জাহিলিয়াতের পোশাক খুলে তারা গায়ে জড়িয়ে নেন ইসলামের আলোকোজ্জ্বল পোশাক। আল্লাহর ইবাদত ও দ্বীনের খেদমতে তারা সর্বান্তকরণে নিজেদের বিলিয়ে দেন। ইসলামের সূচনাপর্বেই তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে যায় দ্বীনের দাওয়াতের অদম্য স্পৃহা। এভাবেই তাঁরা অগ্রগামী মুসলমানদের মধ্য হতে গণ্য হন। আর আল্লাহ তাআলা দুনিয়া-আখিরাতের তাদের সার্বিক সফলতার প্রতিশ্রুতি দেন এভাবে:
আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।৪৯৫

হযরত উম্মে হারাম রা. মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গাত্রের নাজ্জার শাখার কন্যা। পিতা মিলহান ইবনে খালিদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাদিম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালিকের খালা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সরাসরি নিজেই তাকে শাহাদাতের সুসংবাদ দেন।

আসুন, আমরা এই মহান সাহাবিয়ার জীবনীপাঠে আত্মাকে পরিতৃপ্ত করি।

পূর্ণিমার চাঁদ ছুঁয়েছে যার বংশপরম্পরা
তাঁর পবিত্র জীবনী শুরু করার পূর্বে আমরা তাঁর বরকতময় বংশের সাথে পরিচিত হই।
✓ হযরত উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা. হচ্ছেন গুমাইসা (উম্মে সুলাইম) রা.-এর বোন। উভয়েই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তা।
✓ তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক রা.-এর খালা—যিনি আলোকিত করে রেখেছেন হাদীসে রাসূলের বিশাল জগত এবং রাসূলের খাদেম হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।
✓ তাঁর দুই ভাই হারাম ও সুলাইম রা. বদর ও উহুদ যোদ্ধা ছিলেন। উভয়ে বি’রে মা’উনার অন্যতম সদস্য ছিলেন এবং সেখানে শাহাদাত বরণ করেন।
✓ তাঁর ছেলে কায়স ইবনে আমর ইবনে কায়স এবং তার প্রথম স্বামী আমর ইবনে কায়স ইবনে যায়িদ উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানে শাহাদাত বরণ করেন।

এভাবেই আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি গভীর প্রেম ও ভালোবাসা এ পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ের গভীরে স্থান করে নেয়। তাদের নারী-পুরুষ সকলে জিহাদ, জ্ঞানচর্চা, ইসলামের সেবায় জীবন দান, বদান্যতাসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলেছেন। বিশেষত হজ মওসুমে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত লোকদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। আকাবায় অংশগ্রহণকারীরা মদীনায় ফিরে এসে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন তখন গোটা আনসার সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এমন কোনো ঘর ছিল না যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চর্চা হতো না। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুরোধ করবেন, তিনি যেমন মদীনায় একজন প্রচারক পাঠান, যিনি মদীনায় কুরআন শিক্ষা দেবেন। তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসআব ইবনে উমাইরকে মদীনায় পাঠান। এভাবেই হযরত হারিসা রা.-এর ঘরে উঁকি দেয় ইসলামের আলোকোজ্জ্বল প্রভা।

মক্কার মুশরিকরা রাসূলের সাহাবীদের ওপর কষ্ট-নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে সাহাবারা আনসারদের সান্নিধ্যে চলে যান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা.-এর হিজরতের আলোচনা চলাকালের মদীনার প্রতিটি মানুষের মনে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। তারা রাসূলুল্লাহ সা.-কে মদীনায় অভ্যর্থনা জানাতে প্রতিদিন মদীনার উপকণ্ঠে চলে আসেন। এদের দলেও ছিলেন হযরত উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা. ও তার পরিবার বিশেষ করে তার কন্যা হযরত উম্মে হিশাম রা.।

উম্মে হারামের পরিবার যখন দেখলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা.-এর ঘরে তাশরীফ রেখেছেন, তখন তার আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তিনি রাসূলুল্লাহ সা.কে খুব কাছে পাবার সৌভাগ্য লাভ করেন। রাসূলের কাছ থেকে বেশি বেশি ইলম অর্জনের সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেননি। রাসূলুল্লাহ সা.-এর অনুপম চরিত্র ও দিকনির্দেশনা দ্বারা পুরোপুরি উপকার লাভ করেছেন। এতে রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি তার ভালোবাসা বেড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সা.ও তাকে অত্যধিক ভালোবাসতেন যখন দেখলেন তার ভেতরে রয়েছে পরিচ্ছন্ন মন, শেখার মতো মানসিকতা ও মানবতা ও সত্যবাদিতার নিদর্শন।

দাম্পত্য জীবন
হযরত উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা.-এর ঈমান-আমল দিন দিন বাড়তে থাকে। এমন সময় আল্লাহ তাআলা তার সাথে হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা.-এর বিয়ের ব্যবস্থা করে দেন। যাঁর সম্পর্কে হযরত উমর রা. বলেন, উবাদা রা. এমন ব্যক্তি— যিনি হাজার পুরুষের সমতুল্য।৪৭৬ এই উবাদা রা. একজন প্রথম-সারির মহান আনসারী সাহাবী, আকাবার সদস্য, নাকীব, বদর-উহুদ-খন্দকের সাহসী মুজাহিদ এবং বাইআতে রিদওয়ানসহ উল্লেখযোগ্য সকল ঘটনার অংশীদার।

হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. সবেমাত্র যৌবনে পা দিয়েছেন, এমন সময় মক্কায় ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। তিনি সেই মুষ্টিমেয় ভাগ্যবানদের একজন- যারা ইসলামের প্রথম আহবান কানে আসতেই সাড়া দেন। আকাবার প্রথম শপথে যেবার ছয়জন মদীনাবাসী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে হাত রেখে বাইআত করেন, তিনি তাদের একজন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় আকাবায়ও শরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। অনেকের মতে, তিনি দ্বিতীয় আকাবায় বারোজনের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তৃতীয় তথা শেষ আকাবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনোনীত বারো নাকীবের (দায়িত্বশীল) অন্যতম নাকীব। তিনি হন বনী কাওয়াকিল-এর নাকীব।

হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. বিভিন্ন সময়ে ইসলামী খিলাফতের তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। যথা: সাদাকা বিষয়ক কর্মকর্তা, ফিলিস্তিনের কাজী ও হিমসের আমীর।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় যে পাঁচজন আনসারী ব্যক্তি সমগ্র কুরআন হিফজ (মুখস্থ) করেন হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন শিক্ষিত ও সম্মানিত সাহাবীদের একজন। ইলমুল কিরআতে ছিল তার বিশেষ পারদর্শিতা। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় মদীনায় আসহাবে সুফ্ফার জন্য ইসলামের প্রথম যে মাদ্রাসাতুল কিরাআহ প্রতিষ্ঠিত হয় তিনি ছিলেন তার দায়িত্বে। অতি সম্মানিত ও মর্যাদাবান আসহাবে সুফ্ফার সাহাবীরা তার কাছে শিক্ষা লাভ করেন। এই মাদ্রাসায় কুরআনের তালীমের সাথে সাথে লেখাও শেখানো হতো। বহু লোক এই মাদ্রাসা থেকে কিরাআত ও লেখার তালীম নিয়ে বের হন। এই মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত কোনো কোনো ছাত্রের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও তিনি করতেন।

হুদাইবিয়ায় গমনকালে হযরত উবাদা রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে অংশগ্রহণ করেন। ঘটনাটি হচ্ছে: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা যিয়ারতের সিদ্ধান্ত নেন। চৌদ্দশত মুসলিম রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঙ্গী হন। মুসলিমদের কোনো সামরিক উদ্দেশ্যে ছিল না। প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল মাত্র একখানি কোষবদ্ধ তলোয়ার। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদাইবিয়া নামক স্থানে এসে পৌঁছেন। এদিকে কুরাইশদের যুদ্ধ প্রস্তুতির খবর তার কাছে আসতে থাকে। বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে কুরাইশদের বোঝানো হলো যে, কাবা যিয়ারাত ছাড়া তার আর কোনো উদ্দেশ্যে নেই; কিন্তু কুরাইশরা মুসলিমদের মক্কায় প্রবেশ করতে দিতে রাজী হলো না।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসমান ইবনে আফফান রা.- কে দূতরূপে কুরাইশদের নিকট পাঠান। কুরাইশরা তাকে আটক রাখে। এই দিকে উসমান রা. শহীদ হয়েছেন বলে মুসলিমদের নিকট খবর আসে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বাবলা গাছের নীচে বসে সকলের নিকট থেকে এই শপথ নেন, আমরা শেষ হয়ে যাব, কিন্তু লড়াই থেকে পিছু হটবো না। এই শপথের নাম বাইয়াতে রিযওয়ান। মুসলিমদের এই শপথের কথা কুরাইশদের নিকট পৌঁছল। উসমান রা. নিরাপদে ফিরে এলেন।

এই বাইআতে হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. অংশগ্রহণ করেছেন এবং মৃত্যুর ওপর শপথ করেছিলেন। যেই বাইআতে রিযওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'বৃক্ষের নিচের বাইআতে যারা অংশগ্রহণ করেছে তারা কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।৪৭৭

সুসংবাদের আলোয় উদ্ভাসিত এই ভাগ্যবানদের অন্যতম হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. এর মর্যাদাও ছিল ঈর্ষণীয়।

হাদীস বর্ণনা
হযরত উম্মে হারাম রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার থেকে মোট পাঁচটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি হাদীস মুত্তাফাকুন আলাইহি।৪৭৮ সে সব হাদীস উঁচু স্তরের অনেক সাহাবী ও তাবিয়ী বর্ণনা করেছেন। যেমন: আনাস ইবনে মালিক রা., আমর ইবনে আসওয়াদ রা., উবাদা ইবনে আস-সামিত রা., আতা ইবনে ইয়াসার, ইয়ালা ইবনে শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।৪৮৯

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। তার আগেই সাহাবায়ে কেরাম মদীনায় হিজরত করেন। সে সব মুজাহির সাহাবায়ে কেরামদেরও হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা. ধন-সম্পদ দিয়ে সার্বিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবীরা মদীনায় হিজরত করে গেলে এবং সেখানে বসবাস করতে থাকলে দ্বীনের জন্য আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাহায্য-সহযোগিতার দায়িত্ব আঞ্জাম দেন এবং এক্ষেত্রে শক্তি ও সাহস যোগান হযরত উবাদা ইবনে সামিত রা.।

রাসূলের কাছে তার মর্যাদা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উম্মে হারাম রা.-কে যথেষ্ট মর্যাদা ও গুরুত্ব দিতেন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার কেন্দ্রস্থল থেকে দুই মাইল দূরে তাকওয়া ও খোদাভীত্তির ওপর ভিত্তি করে যে মসজিদটি নির্মাণ করেন সেটি হলো, মসজিদুল কুবা। কুবার এই পবিত্র মসজিদের পাশে ছিল উম্মে হারামের পরিবারের বসবাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝে মাঝে তার গৃহে যেতেন এবং দুপুরে বিশ্রামও নিতেন। তার বোন হচ্ছেন হযরত উম্মে সুলাইম রা.।৪৮০

হযরত আনাস রা. বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট আসলেন। তখন বাড়িতে কেবল আমি, আমার মা (উম্মে সুলাইম) ও আমার খালা উম্মে হারাম ছিলেন। তিনি আমাদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা এসো, আমি তোমাদের নিয়ে নামায আদায় করি। তখন কোনো নামাযের ওয়াক্ত ছিল না। তিনি আমাদের নিয়ে নামায আদায় করলেন এবং আমাদের পরিবারের সকলের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কল্যান কমনা করে দুআ করলেন।৪৮১

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে হারামের রা. গৃহে এলে তিনি খাবার তৈরি করে তাকে খাওয়ান। আহার শেষে একটু বিশ্রাম নিতে থাকেন, আর উম্মে হারাম রা. রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথার চুল বিলি দিয়ে উকুন দেখতে শুরু করেন। এমতাবস্থায় রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটু হালকা ঘুমের ভাব এসে যায়। একটু পরে জেগে উঠে মৃদু হেসে উম্মে হারাম রা.-কে শাহাদাতের সুসংবাদ দান করেন। আর সেদিন থেকেই তাকে ‘আশ শাহীদা' (মহিলা শহীদ) বলা হতে থাকে।৪৮২ এ ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে,

হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা.-এর নিকট যাতায়াত করতেন এবং তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে খেতে দিতেন। উম্মে হারাম রা. ছিলেন, উবাদাহ ইবনে সামিত রা.-এর স্ত্রী। একবার আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ঘরে গেলে তিনি তাকে আহার করান এবং তার মাথার উকুন বাছতে থাকেন। এক সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমিয়ে পড়েন। তিনি হাসতে হাসতে ঘুম থেকে জাগলেন। উম্মে হারাম রা. বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল, হাসির কারণ কী?' তিনি বললেন, 'আমার উম্মাতের কিছু ব্যক্তিকে আল্লাহর পথে জিহাদরত অবস্থায় আমার সামনে পেশ করা হয়। তারা এ সমুদ্রের মাঝে এমন আরোহী যেমন বাদশাহ তখতের উপর, অথবা বলেছেন, বাদশাহর মতো তখতে উপবিষ্ট।' এ শব্দ বর্ণনায় ইসহাক রহ. সন্দেহ করেছেন।

উম্মে হারাম রা. বলেন, 'আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর নিকট দুআ করুন—যেন আমাকে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।' আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করলেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার ঘুমিয়ে পড়েন। অতঃপর হাসতে হাসতে জেগে উঠলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আপনার হাসার কারণ কী?' তিনি বললেন, 'আমার উম্মতের মধ্য থেকে আল্লাহর পথে জিহাদরত কিছু ব্যক্তিকে আমার সামনে পেশ করা হয়।' পরবর্তী অংশ প্রথম উক্তির মতো। উম্মে হারাম রা. বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আল্লাহর নিকট দুআ করুন, যেন আমাকে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বললেন, তুমি তো প্রথম দলের মধ্যেই আছ। অতঃপর মুআবিয়া ইবনে আবু সুফইয়ান রা.-এর সময় উম্মে হারাম রা. জিহাদের উদ্দেশে সামুদ্রিক সফরে যান এবং সমুদ্র থেকে যখন বের হন তখন তিনি তার সওয়ারী থেকে ছিটকে পড়েন। এতে তিনি শাহাদাত লাভ করেন।৪৮৩

ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন
সময় গড়িয়ে চলল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফা আবু বকর ও উমর রা. একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। ইসলামী খিলাফতের সীমানা বৃদ্ধি পেতে লাগল। তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রা. খিলাফতের মসনদে আসীন। সিরিয়ার আমীর হযরত মুআবিয়া ইবনে আবি সুফইয়ান রা. খলীফার নিকট সাগর দ্বীপ কুবরুস (সাইপ্রাস) অভিযানের অনুমতি চাইলেন। উল্লেখ্য যে, এ সময় কুবরুস ছিল বাইজান্টাইন রোমান শাসিত একটি দ্বীপ। ইতোপূর্বে মুসলমানদের যেমন কোনো নৌ-বাহিনী ছিল না তেমনি ছিল না জলপথে অভিযানের কোনো অভিজ্ঞতা। তাই আমীর মুআবিয়া রা.-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত উসমান রা. মজলিসে শূরার বৈঠক আহ্বান করলেন। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর নৌ-বাহিনী গঠন ও জলপথে কুবরুস অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়। এটাই ছিল মুসলমানদের নৌপথে প্রথম অভিযান। তাই দারুণ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।

মজলিসে শূরার সিদ্ধান্তমতে, হযরত উসমান রা. হিজরী ২৭ সনে সাগর পাড়ি দিয়ে কুবরুস অভিযানের নির্দেশ দেন। হযরত মুআবিয়া রা. একটি নৌ-বাহিনী গঠন করেন। এই নৌবাহিনীতে হযরত আবু যর গিফারী রা., আবুদ দারদা রা., উবাদা ইবনে সামিত রা. প্রমুখের মতো বহু উঁচু স্তরের সাহাবীকে অন্তর্ভুক্ত করেন।৪৮৪

যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে হারামকে নৌ-যুদ্ধে অংশ গ্রহণের ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং যেদিন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে একথা,
أَوَّلُ جَيْشِ مِنْ أُمَّتِي يَغْزُونَ الْبَحْرَ قَدْ أَوْجَبُوا قَالَتْ أُمُّ حَرَامٍ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنَا فِيهِمْ قَالَ أَنتِ فِيهِمْ
আমার উম্মাতের মধ্যে প্রথম যে দলটি নৌ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে তারা যেন জান্নাত অবধারিত করে ফেলল। উম্মে হারাম রা. বলেন, আমি কি তাদের মধ্যে হবো? তিনি বললেন, তুমি তাদের মধ্যে হবে।৪৮৫

সেদিন থেকে হযরত উম্মে হারাম রা. এমন একটি নৌ-অভিযানের প্রতীক্ষায় ছিলেন। দীর্ঘদিন পরে সে সুযোগ এসে গেল। তিনি স্বামী উবাদা ইবনে সামিত রা.-এর সঙ্গে জিহাদে বেরিয়ে পড়লেন। তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ সাগর পাড়ি দিয়ে মুসলিম বাহিনী কুবরুস অবতরণ করে এবং রোমান বাহিনীকে তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে ইসলামী পতাকা উড্ডীন করেন। মূলত যুদ্ধ ছাড়াই কেবল সন্ধির মাধ্যমে কুবরুস বিজিত হয়। কুবরুস বিজয় শেষে বাহিনী যখন মূল ভূমিতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন একদিন উম্মে হারাম রা. একটি বাহন পশুর পিঠে চড়তে গিয়ে পড়ে যান। ভীষণ আঘাত পান এবং সেই আঘাতে সেখানে ইন্তেকাল করেন। সাগর দ্বীপ কুবরুসের মাটিতেই তাকে দাফন করা হয়। ইমাম যাহাবী বলেন, ফ্রান্সে তার কবর অবস্থিত।৪৮৬ আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৪৯৫. সূরা তাওবাহ, ৯:১০০।
৪৭৬. আসহাবুর রাসূল, ২/১২৫।
৪৭৭. সহীহ, মুসলিম; মুসনাদ, আহমাদ; সুনান, আবু দাউদ; সুনান, তিরমিযী।
৪৭৮. আল মুজতাবা, ১০৫।
৪৮৯. আল ইসাবা, ৪/৪২৪; তারীখুল ইসলাম, ২/৩১৮।
৪৮০. শারহুন নববী লিমুসলিম, ১৬/১৫।
৪৮১. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৬৬২।
৪৮২. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৭৮৮।
৪৮৩. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৭৮৮।
৪৮৪. উসদুল গাবাহ, ভাষ্য নং ৭৪০৩।
৪৮৫. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৯২৪।
৪৮৬. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৩১৭।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 কাবশাহ বিনতে রাফে‘ রা.

📄 কাবশাহ বিনতে রাফে‘ রা.


যাঁর ছেলের ইন্তেকালে কেঁপে উঠেছিল আল্লাহর আরশ

মদীনা থেকে কিছু মানুষ মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোপনে আকাবায় সাক্ষাৎ করেন। তারা রাসূলের উপর ঈমান আনেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর মদীনায় ফিরে যান। এসব নও-মুসলিমদের দ্বীনের তালীম দেওয়া ও ইসলামের আরও প্রচার-প্রসার করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুসআব ইবনে উমাইর রা.-কে দূত হিসাবে মদীনা পাঠালেন। এভাবে তিনি হলেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম দূত।

মক্কায় তখন মুসআব রা.-এর চেয়ে বয়সে ও মর্যাদায় বড় আরও অনেক সাহাবীই ছিলেন; ছিলেন আরও বহু নিকটজন। কিন্তু এ গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসআব ইবনে উমাইরকেই বেছে নেন। মুসআব রা. তার আল্লাহপ্রদত্ত বুদ্ধি, মেধা ও মহৎ চরিত্রের সাহায্যে অত্যন্ত আমানতদারীর সাথে এ কঠিন দায়িত্ব পালন করেন। কঠোর সাধনা, নিষ্ঠা ও মহত্ত্বের সাহায্যে তিনি মদীনাবাসীর হৃদয়ের সাথে সংলাপ করেন। ফলে দলে দলে তারা আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে থাকে।

মক্কা থেকে রওনা হয়ে হযরত মুসআব ইবনে উমাইর রা. মদীনায় এলেন। এর আগে মদীনার মাত্র বারো জন লোক আকাবায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু তিনি মদীনায় আসার পর কয়েক মাস যেতে না যেতেই বহু মানুষ তার দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। হজ মওসুমে মদীনার মুসলমানদের বাহাত্তরজনের একটি প্রতিনিধিদল তাদের শিক্ষক ও নবীর দূত মুসআব ইবনে উমাইর রা.-এর সাথে মক্কায় এলো এবং আকাবায় আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মিলিত হলো।

মুসআব তার দায়িত্বে গুরুত্ব এবং সে দায়িত্বের সীমা সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, তিনি আল্লাহর দিকে আহ্হ্বানকারী এবং আল্লাহর এমন এক দ্বীনের সুসংবাদ দানকারী যা মানবসমাজকে হিদায়াত ও সরল সোজা পথের দিকে আহ্হ্বান জানায়। তার ওপর দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো দায়িত্ব নেই।

মুসআব মদীনায় পৌঁছে আসআদ ইবনে যারারার অতিথি হলেন। তারা উভয়ে মদীনার বিভিন্ন গোত্রে, বিভিন্ন বাড়িতে এবং সমাবেশে এক আল্লাহর দিকে মানুষকে দাওয়াত দিতে লাগলেন। নানারকম বাধারও সম্মুখীন হলেন। কিন্তু সব বাধা তারা অতিক্রম করলেন বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও বিচক্ষণতায়। তাঁর দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেন আমাদের আজকের অতিথি হযরত কাবাশাহ বিনতে রাফে' রা.। এই দ্বীনের নুসরাতে যার অবদান অপরিসীম। তিনি মহান সাহাবী হযরত সাআদ ইবনে মুআয রা.-এর সম্মানিত মাতা। সাআদ ইবনে মুআয রা. ছিলেন বদর দিনের আনসারদের ঝাণ্ডাবাহী এবং সেই দিনের মজলিসে শূরার অন্যতম সদস্য; যাঁর ইন্তেকালে কেঁপে উঠেছিল আল্লাহর আরশ।

এই বিশিষ্ট আনসারী মহিলা সাহাবিয়ার নাম হচ্ছে কাবাশাহ বিনতে রাফে' ইবনে মুআবিয়া ইবনে উবাইদ ইবনুল আবজার আল খাযরিয়া। হযরত সাআদ ইবনে মুআয আল আশহালী রা.-এর সম্মানিত মাতা তিনি।৪৮৭

বনী আবদিল আশহালের মুআয ইবনে নু'মানের স্ত্রী তিনি। সাআদ ছাড়াও তার অন্যান্য সন্তানরা হলেন, আমর ইবনে মুআয, ইয়াস, আউস, আকরাব ও উম্মে হাযাম।

হযরত কাবাশাহ রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। মুসলিম নারীর ইতিহাসে তার রয়েছে অনন্য কীর্তি। হেদায়াতের সূর্য উদিত হলে মদীনা আলোকিত হয়ে ওঠে। সাআদের মাতা সর্বস্ব বিলিয়ে ইসলামের সেবায় ব্রতী হন।৪৮৮ আমরা তাহলে সেখানকার গোড়ার ঘটনার দিকে তাকাই।

মদীনায় তাওহীদের আলো
মদীনা থেকে কতিপয় লোক মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোপনে আকাবায় সাক্ষাৎ করল এবং তার ওপর ঈমান এনে বাইয়াত করল। তারা মদীনায় ফিরে গেল। তাদেরকে দ্বীনের তালীম দেওয়ার এবং অন্যদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে এবং মদীনাকে হিজরতের জন্য প্রস্তুত করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুসআব ইবনে উমাইর রা.কে দূত হিসাবে মদীনা পাঠালেন। এভাবে তিনি হলেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম দূত।

ইসলামের ইতিহাসে তিনি একজন সফল দাঈ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তিনি নিরলস চেষ্টার মাধ্যমে মদীনার প্রতিটি লোকের কানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। তিনি মদীনার একটি কুয়োর ধারে দেওয়ালের ওপর বসলেন। আর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এমন কিছু লোক তাদের পাশে জড়ো হলেন। সাআদ ইবনে মুয়াজ ও উসাইদ ইবনে হুযাইর উভয়ই তখন বনী আবদুল আশহাল গোত্রের নেতা। খবরটি সাআদ ও উসাইদের কানে গেল। সাথে সাথে সাআদ উসাইদকে বললেন, 'তোমার বাপের সর্বনাশ হোক। তুমি এখনই এ দুজন লোকের কাছে যাও। তারা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে আমাদের বাড়ির ওপর চড়াও হয়েছে। তাদের তাড়িয়ে দাও, এ পথ মাড়াতে নিষেধ কর। উসাইদ অস্ত্র সজ্জিত হয়ে তাদের নিকট গেলেন। উল্টো ফল ফললো। তাড়াতে গিয়ে নিজেই তাদের কথায় প্রভাবিত হলেন এবং ইসলাম কবুল করলেন। এবার সেই কুয়ার ধারে মুসআবের কাছে গেলে সাআদ। তিনি সাথে সাথে উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়ালেন এবং বর্শাটি হাতে তুলে নিয়ে তাদের দুজনের দিকে ছুটলেন। নিকটে পৌঁছে যখন তিনি দেখলেন, তারা অত্যন্ত শান্ত ও স্থিরভাবে বসে আছেন।

মুসআব অত্যন্ত নরম মেজাজে সাআদকে বললেন, 'আপনি কি একটু বসে আমার কথা শুনবেন? আমার কথা পছন্দ হলে, ভালো লাগলে, মানবেন। আর পছন্দ না হলে, খারাপ লাগলে আমরা চলে যাব।' সাআদ বললেন, 'এ তো খুব ইনসাফের কথা।' তিনি মাটিতে বর্শাটি গেঁড়ে বসে পড়লেন। মুসআব অত্যন্ত ধীর-স্থিরভাবে তার সামনে ইসলামের দা'ওয়াত পেশ করলেন, তাকে কুরআন পাঠ করে শোনালেন। মুসআব ও সাআদ দু-জনেই বর্ণনা করেছেন, ইসলামের দাওয়াত পেশ করার পর সাআদ কোনো কথা বলার পূর্বেই আমরা তার চেহারায় ইসলামের দীপ্তি লক্ষ্য করেছিলাম। ইসলামের দাওয়াত শোনার পর সাআদ তাদের কাছে জানতে চান? 'তোমাদের এই ইসলাম, এই দ্বীনে প্রবেশ করতে হলে কী কী কাজ করতে হয়?' তারা বললেন, 'গোসল করে পবিত্র হতে হয়, পোশাক পরিচ্ছদ করতে হয়, তারপর কালিমা শাহাদাত উচ্চারণ করে দু-রাকাআত সালাত আদায় করতে হয়।' সাআদ তাই করলেন। তারপর বর্শাটি হাতে তুলে নিয়ে উসাইদের সাথে গোত্রীয় আড্ডার দিকে রওনা দিলেন।

তাদেরকে ফিরতে দে'খে গোত্রীয় লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, 'সাআদ যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিলেন এখন তার সেই চেহারা নেই। তাকে ভিন্ন এক চেহারায় দেখা যাচ্ছে।' সাআদ নিকটে এসে গোত্রীয় লোকদের বললেন, 'ওহে আবদুল আশহাল গোত্রের লোকেরা, বিভিন্ন ব্যাপারে তোমরা আমার কাজ-কর্ম কেমন দেখে থাক?' তারা সমস্বরে জবাব দিল, 'আপনি আমাদের নেতা, আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মতামতের অধিকারী ব্যক্তি এবং আমারে বিশ্বস্ত নকীব বা দায়িত্বশীল।' সাআদ বললেন, তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি ঈমান আনবে তোমাদের কোনো নারী-পুরুষের সাথে কথা বলা আমার জন্য হারাম।'

মদীনার রূপ পাল্টে যেতে থাকে। সেখানে উদিত হয় এক নতুন সূর্য। যে দীপ্তিতে হযরত সাআদ ইবনে মুআয রা.-এর অবদান ছিল অনন্য। এই গৌরবে অন্য কোনো সাহাবী তার জুড়ি নেই। কারণ, একজন মানুষের ইসলাম গ্রহণের প্রভাবে গোটা গোত্রের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা শুধু তার ক্ষেত্রে ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না।৪৮৯

এই সময়েই হযরত সাআদ ইবনে মুআয রা.-এর আম্মাজান ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। গোটা আউস গোত্রের মধ্যে আবদুল আশহাল শাখাটি ছিল সর্বাধিক অভিজাত এবং বংশানুক্রমে নেতৃত্ব ছিল তাদেরই হাতে। সাআদ ছিলেন তার সময়ে একজন বড় মাপের নেতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করলে আবদুল আশহাল গোত্রের দরজা ছিল মুহাজিরদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। তারা অকুণ্ঠচিত্তে কোনোরূপ কষ্ট ও হিসাব ব্যতিরেকে মুহাজিরদের সেবায় এগিয়ে এসে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

বদরের প্রাক্কালে সাআদের ঐতিহাসিক ভূমিকা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদরের দিকে যাত্রার প্রাক্কালে মুহাজির ও আনসারদের সাথে পরামর্শে বসেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনসারদের লক্ষ্য করে বলেন, 'ওহে লোকেরা, আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।' সাথে সাথে সাআদ ইবনে মুয়াজ উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, সম্ভবত আপনি আমাদেরকে উদ্দেশ্য করেছেন?' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ। সাআদ বললেন, 'আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্যবাদী বলে জেনেছি, আর আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি যে, যা কিছু আপনি নিয়ে এসেছেন তা সবই সত্য। আপনার কথা শোনার ও আপনার আনুগত্য করার আমরা অঙ্গীকার করেছি। ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনার যা ইচ্ছা করুন, আমরা আপনার সাথে আছি। সেই সত্তার নামে শপথ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। যদি আপনি আমাদের সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশও দেন, আমরা ঝাঁপিয়ে পড়বো। আমাদের একজনও পেছনে থাকবে না। আগামী কালই আপনি আমাদেরকে নিয়ে শত্রুর সম্মুখীন হোন, আমরা তাতে ক্ষুণ্ণ হবো না। যুদ্ধে আমরা দারুণ ধৈর্যশীল, শত্রুর মুকাবিলায় পরম সত্যনিষ্ঠ। আল্লাহ আমাদের থেকে আপনাকে এমন আচরণ প্রত্যক্ষ করাবেন যাতে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। আল্লাহর ওপর ভরসা করে আমাদের সাথে নিয়ে আপনি অগ্রসর হোন।৪৯০

উহুদের প্রান্তরে
হযরত সাআদ ইবনে মুয়ায রা. উহুদ যুদ্ধেও যোগদান করেন। এ যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থান স্থলের পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন। প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনীর বিজয় হলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের প্রবল আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটে গেল। দারুন একটা বিপর্যয় ঘটে গেল। এ সময় হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অটল ও দৃঢ় থাকেন। অন্য যে পনেরো ব্যক্তি রাসূলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাশে অটল থাকেন তাদের একজন সা'আদ ইবনে মু'য়ায। এই উম্মু তার ভাই আমর ইবনে মু'য়ায শাহাদাতবরণ করেন।

খন্দকের ঘটনা
মদীনার ইহুদী গোত্র বনী কুরাইযার নেতা কা'আব ইবনে আসাদ তার গোত্রের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে একটি মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেছিল। খন্দক যুদ্ধের সময় সে বনী নাযার গোত্রের নেতা হুয়ায় ইবনে আখতাবের কুপরামর্শ ও উস্কানিতে সেই চুক্তি ভেংগে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। একথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ মুসলমানদের কানে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘটনার যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য আউস গোত্রের পক্ষ থেকে সা'আদ ইবনে মুয়ায ও খাযরাজ গোত্রের পক্ষ থেকে সা'আদ ইবনে উবাদাকে পাঠান। তাদের সাথে আরও যান আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও খাওয়াত ইবনে যুবায়ের। তারা বনী কুরাইযা যান এবং তাদের সাথে আলোচনা ও বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে, বিষয়টি সত্য। তারা ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট তাদের তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট পেশ করেন।

গাতফান গোত্রের নেতা আল-হারেস ইবনে আউফ ও উয়ায়না ইবনে হিসনের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ শর্তে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা করলেন যে, তাদের পক্ষ থেকে মদীনার প্রতি কোনো প্রকার হুমকী থাকবে না এবং বিনিময়ে তারা মদীনার উৎপন্ন শস্যের এক তৃতীয়াংশ লাভ করবে। এর মধ্যে হিজরী ৫ম সনে খন্দক যুদ্ধের ডামাডোল। মদীনার দারুণ অভাব দেখা দিল। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সন্ধির ব্যাপারে সা'আদ ইবনে মু'য়ায ও সা'আদ ইবনে উবাদার সাথে পরামর্শ করলেন। তারা দু-জন বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! এ যদি আপনার পছন্দ হয়, আমরা তা পালন করব। যদি আল্লাহর নির্দেশ হয়, তা হলে তো অবশ্যই পালনীয়। তবে কি এটা আমাদের কথা চিন্তা করে করছেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তোমাদের কথা চিন্তা করেই করছি। আমি দেখেছি, গোটা আরব এখন তোমাদের বিরুদ্ধে। আমি চেয়েছি, অন্তত এর বিনিময়ে তাদের শত্রুতা কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকুক।' একথা শুনে সাআদ ইবনে মুয়াজ বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, তারা ও আমরা ছিলাম এক সাথে পৌত্তলিক। আমরা কেউ আল্লাহর ইবাদত করতাম না, তাকে জানতামও না। তখনো তারা ব্যবসা উপলক্ষে এবং অতিথি হিসেবে ছাড়া আমাদের একটি খেজুরও খাওয়ার আশা করেনি। আজ আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি, আল্লাহ ইসলাম ও আপনার দ্বারা আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আর এখন কিনা আমাদের সম্পদের একটি অংশ তাদেরকে দিতে হবে? এমন সন্ধির প্রয়োজন আমাদের নেই। আল্লাহ আমাদের ও তাদের মধ্যে চূড়ান্ত ফায়সালা না করা পর্যন্ত শুধু তরবারি ছাড়া আর কিছুই আমরা তাদের দেব না।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কথা মেনে নিলেন।

যুদ্ধ শুরুর সময় প্রায় কাছাকাছি। সাআদ বর্ম পরে হাতে বর্শা নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে যাচ্ছেন। পথে বনী হারেসার দুর্গে তার মা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর পাশে বসে ছিলেন। তিনি দেখলেন, তার ছেলে একটি কবিতার চরণ আবৃত্তি করতে করতে চলেছে। তার একটি পংক্তি এমন : 'যখন আজল এসে যায় তখন আর মৃত্যুর জন্য আপত্তি কীসের?'

মা কাবাশাহ বিনতে রাফে' রা. চেঁচিয়ে বললেন, 'ছেলে, তুমি তো পেছনে পড়ে গেছ, তাড়াতাড়ি যাও।' সাআদের যে হাতে বর্শা ছিল সেই হাতটি বর্মের বাইরে বেরিয়ে ছিল। সে দিকে ইঙ্গিত করে হযরত আয়েশা বললেন, 'সাআদের মা, দেখ, তার বর্মটি কত ছোট।' যুদ্ধ ক্ষেত্রে পৌঁছার সাথে সাথে তাকে লক্ষ্য করে হিববান ইবনে আবদি মান্নাফ একটি তীর ছোঁড়ে। কোনো কোনো বর্ণনায় হিববানের পরিবর্তে আবু উসামা অথবা খাফাজা ইবনে আসিমের নাম এসেছে। তীরটি তার হাতে লেগে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি করে।

সেকালে মসজিদে নববীতে যুদ্ধে আহতদের সেবা ও চিকিৎসার জন্য একটি শিবির স্থাপন করা হয়েছিল। সম্ভবত এই শিবিরের প্রতিষ্ঠা হয় উহুদ যুদ্ধের পর এবং তা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হুজরার নিকটে।

খন্দক যুদ্ধে সাআদ ইবনে মুয়াজ আহত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দেন, 'তোমরা সাআদকে রুফাইদার তাঁবুতে রাখ। তাহলে আমি নিকট থেকেই তার দেখাশোনা করতে পারব।' হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিদিন এই শিবিরে এসে অসুস্থ সাআদের দেখাশোনা করতেন। তিনি নিজের জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েন, তাই আল্লাহর দরবারে দুআ করেন,
اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ أَبْقَيْتَ مِنْ حَرْبِ قُرَيْشٍ شَيْئًا فَأَبْقِنِي لَهَا ، فَإِنَّهُ لَا قَوْمَ أَحَبُّ إِلَيَّ أَنْ أُجَاهِدَهُمْ مِنْ قَوْمٍ آذَوْا رَسُولَكَ وَكَذَّبُوهُ وَأَخْرَجُوهُ اللَّهُمَّ وَإِنْ كُنْتَ قَدْ وَضَعْتَ الْحَرْبَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ ، فَاجْعَلْهُ لِي شَهَادَةً ، وَلَا تُمِتْنِي حَتَّى تُقِرَّ عَيْنَيَّ مِنْ بَنِي قُرَيْظَةَ
হে আল্লাহ, কুরাইশদের সাথে এ সংঘাত যদি এখনো অবশিষ্ট থাকে তবে আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন। তাদের সাথে লড়াই করার আমার খুব সাধ। কারণ, আপনার রাসূলকে তারা কষ্ট দিয়েছে, তাকে অস্বীকার করেছে এবং মাতৃভূমি মক্কা থেকে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আর যদি সংঘাত শেষ হওয়ার সময় হয়ে থাকে তাহলে এই ক্ষতের দ্বারাই আমাকে শাহাদাত দান করুন। আর বনী কুরাইযার ব্যাপারে আমার চোখে প্রশান্তি না আসা পর্যন্ত আমার মরণ দিয়ো না।

আল্লাহপাক তার দুআর শেষ কথাটি কবুল করেন।
খন্দকযুদ্ধে কুরাইশ ও তাদের মিত্র বাহিনীর পশ্চাদপসরণের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার যাবতীয় ফাসাদের উৎস ইহুদী গোত্র বনু কুরাইযাকে শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, তারা চুক্তিভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এই বনী কুরাইযার সাথে প্রাচীনকাল থেকে মদীনার আউস গোত্রের মৈত্রীচুক্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাদেরকে শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত নিলেন তখন আউস গোত্রের লোকেরা বলল, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাদের প্রতিপক্ষ খাযরাজ গোত্রের বিরুদ্ধে তারা ছিল আমাদের মিত্র। এর আগে আপনি আমাদের ভাই খাযরাজীদের মিত্র গোত্র বনী কায়নুকা'র বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তা তো আপনার জানা আছে।' মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুলও একই রকম কথা বলল। আসলে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে বনী কুরাইযার ব্যাপারে কোনো কঠিন দণ্ডের আশংকা করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ওহে আউস গোত্রের লোকেরা, তোমাদের গোত্রের কেউ একজন তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দিলে তোমরা কি তাতে খুশি হবে?' তারা বলল, হ্যাঁ, খুশি হবো।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তাদের ব্যাপারে সাআদ ইবনে মু'য়ায রায় দেবে।'

বনী কুরাইযার ভাগ্য নির্ধারণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে সাআদ ইবনে মু'য়াযকে বিচারক নিয়োগ করলেন। সাআদ তো তখন আহত অবস্থায় দারুণ অসুস্থ। আউস গোত্রের লোকেরা উটের পিঠে গদি বসিয়ে তার ওপর সা'দকে উঠিয়ে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট নিয়ে গেল। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সা'দকে লক্ষ্য করে বলেন, 'এই লোকেরা তোমার রায়ের অপেক্ষায় আছে।' সাআদ বললেন,
আমি আমার রায় ঘোষণা করছি : তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধ করার উপযুক্ত তাদেরকে হত্যা করা, তাদের নারী ও শিশুদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করা এবং তাদের ধন-সম্পদ বণ্টন করে দেওয়া হোক।

সাআদের অন্তিম শয্যা
দিন দিন হযরত সাআদ রা.-এর ক্ষত বেড়েই চলল। এমন কি প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় তা বাড়তে থাকে। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তার ক্ষতে সেঁক দেন। তাতে রক্ত ঝরা বন্ধ হয়ে ফুলে যায়। হঠাৎ একদিন ক্ষতটি ফেটে তীব্র বেগে রক্ত ঝরতে থাকে। ইবনে আব্বাস বলেন, যখন সা'দের ক্ষত থেকে রক্ত প্রবাহ শুরু হয় তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৌড়ে এসে তার মাথাটি কোলের ওপর উঠিয়ে নেন। সা'দের রক্তে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চেহারা ও দাড়ি ভিজে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি সাদা চাদর দিয়ে তার দেহটি ঢেকে দেন। চাদরটি এত ছোট ছিল যে, মাথা ঢাকলে পা এবং পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যাচ্ছিল। সাআদ ছিলেন ফর্সা মোটা মানুষ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাআদের জন্য দুআ করেন এই বলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّ سَعْدًا قَدْ جَاهَدَ فِي سَبِيلِكَ ، وَصَدَّقَ رَسُولَكَ ، وَقَضَى الَّذِي عَلَيْهِ ، فَتَقَبَّلُ رُوحَهُ بِخَيْرِ مَا تَقَبَّلْتَ بِهِ رُوحًا
হে আল্লাহ, সাআদ তোমার রাস্তায় জিহাদ করেছেন, তোমার নবীকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে এবং তার পথে চলেছে। তুমি তার রূহকে সর্বোত্তমভাবে কবুল করো।

রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দুআ শুনে সাআদ চোখ খোলেন এবং বলেন,
السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ .. أَمَا إِنِّي لَأَشْهَدُ إِنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ
আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল।

হযরত সাআদ ইন্তেকাল করলেন। ইবনে ইসহাক বলেন, সাআদ ইবনে মুয়াজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর রাতের বেলা একটি রেশমী পাগড়ী মাথায় বেঁধে জিবরাঈল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলেন, 'ইয়া মুহাম্মাদ, এ মৃত ব্যক্তিটি কে, যার জন্য আসমানের সবগুলি দরজা খুলে গেছে এবং আরশ কেঁপে উঠেছে?' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাপড় টানতে টানতে খুব দ্রুত সাআদের নিকট গিয়ে দেখলেন, তিনি ইন্তেকাল করেছেন।

আবু সায়ীদ খুদরী রা. বলেন, যাঁরা জান্নাতুল বাকী গোরস্তানে সাআদের কবর খুঁড়েছিল আমি তাদের একজন। আমরা কবরের মাটি খোঁড়ার সময় মিশকের ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। শুরাহবীল ইবনে হাসানা বলেন, এক ব্যক্তি সাআদের কবরের মাটি থেকে এক মুঠ মাটি নিয়ে ঘরে রেখে দেয়। কিছুদিন পরে সে দেখে, তা মাটি নয়; বরং মিশক। তার মৃত্যুর ঘটনাটি যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বোঝা যায় তার জানাযায় ফেরেশতাদের অংশগ্রহণ এবং আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠার মাধ্যমে।৪৯১

এ ঘটনার কিছু দিন পরেই হযরত কাবাশাহ রা.-এর ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন ইবাদতগুজার ও রোযাদার। জান-মাল, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তিনি ইসলামের সেবা করে গেছেন। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

**টিকাঃ**
৪৮৭. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৩৭।
৪৮৮. নিসাউ মুবাশশিরাত বিল জান্নাহ, ১৪১।
৪৮৯. দালাইলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকী, ২/৪৩৮-৪৩৯; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১৫২।
৪৯০. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৪৪৯; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, ৮/৪৬৯; দালাইলুন নুবুওয়াহ, ৩/৩৪; ফাতহুল বারী, ৭/২৮৮; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৭৭৯।
৪৯১. মুত্তাফাকুন আলাইহি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00