📄 উম্মে আইমান রা.
প্রিয় রাসূলের ধাত্রী মা
কে এই উম্মে আইমান?
তাকে ঠিক কত বছর বয়সে দাসী হিসেবে বিক্রির জন্য আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় আনা হয়েছিল—তা আমাদের জানা নেই। তার পিতা-মাতা, কিংবা বংশপরিচয় সম্পর্কেও কিছু জানা সম্ভব হয়নি। সেই সময় তার মতো অনেককেই দাস-দাসী হিসেবে মক্কার বাজারে বিক্রির জন্য বিভিন্ন জায়গা থকে ধরে আনা হতো। আর যাদের নিষ্ঠুর মনিবদের কাছে বিক্রি করা হতো, তাদের জন্য অপেক্ষা করত নির্মম অত্যাচার আর অমানবিক আচরণ। তবে সবার ক্ষেত্রেই যে এমনটা হতো তা কিন্তু নয়; এদের মধ্যে অনেক সৌভাগ্যবানও ছিল—তাদের মনিবরা ছিল অনেক ভালো আর দয়াবান।
আবিসিনিয় কিশোরী বারাকাহ (উম্মে আইমান) ছিলেন সেই সৌভাগ্যবানদের একজন। কারণ, তার মনিব ছিল আব্দুল মুত্তালিবের ছেলে আব্দুল্লাহ। যিনি ছিলেন মক্কার সুদর্শন আর দয়াবান যুবকদের একজন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা আব্দুল্লাহ সিরিয়া থেকে বাণিজ্য করে ফেরার পথে দুম্মাতুল জান্দাল থেকে আশি দিনারে ক্রয় করে আনেন উম্মে আইমানকে। এর এক বছর পর বিবি আমেনার সাথে আব্দুল্লাহর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের পর স্বামী আব্দুল্লাহ উম্মে আইমানকে দাসী হিসাবে বিবি আমেনার নিকট সোপর্দ করেন। দাসীর খেদমতে বিবি আমেনা অত্যন্ত খুশি হয়ে তাকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে দেন।
আমেনা বললেন, 'ওহে উম্মে আইমান, তুমি এখন আযাদ। যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পার।' তিনি জবাব দিলেন, 'এমন দয়ালু মনিব ছেড়ে যাবই বা কোথায়। এই পৃথিবী আমার অপরিচিত। তাছাড়া দস্যুর কবলে পড়ে আমার পিতা-মাতা নিরুদ্দেশ। বাইরে বের হলে হয়তো আমাকে আবার কারও দাসত্বই বরণ করে নিতে হবে। আমি যাব না। যতদিন বেঁচে থাকি ততদিন আপনার সেবিকা হিসাবেই থাকতে চাই।'
আব্দুল্লাহ অত্যন্ত খুশি হলেন উম্মে আইমানের কথা শুনে এবং তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, 'বেশ তো তোমার মন চাইলে তুমি থাকতে পার।' উম্মে আইমান রা. সেদিন থেকে নবী পরিবারের সদস্যা হিসাবে বসবাস শুরু করেন। বিবি আমেনা উম্মে আইমানকে ছোট বোন হিসাবেই দেখতেন।
উম্মে আইমান রা.-এর ভাষ্যমতে, বিয়ের দুই সপ্তাহ হতে না হতেই পিতা আব্দুল মুত্তালিবের নির্দেশে ব্যবসার কাজে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়েছিল সদ্যবিবাহিত আব্দুল্লাহকে। ব্যাপারটাতে নববধূ আমিনা খুব হতাশ হয়ে বললেন, 'কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! হাতের মেহেদির রঙ পর্যন্ত (মুছে) যায়নি এখনো আমার, এই অবস্থায় একজন নববধূকে একা রেখে তার স্বামী সিরিয়া যায় কী করে?'
যেভাবে ইয়াতীম হন শিশু মুহাম্মাদ
আব্দুল্লাহর এই প্রস্থান ছিল আমিনার জন্য খুবই হৃদয়বিদারক। আর সেই কষ্টে নববধূ আমিনা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। বারাকাহ বলেন, 'তিনি চলে যাওয়ার পর আমি দেখলাম, তার স্ত্রী বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছেন। ভয়ে আর কষ্টে আমি অনেক জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। এ চিৎকার শুনে তিনি চোখ খুললেন। তার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছে। অতিকষ্টে কান্না চেপে তিনি বললেন, 'বারাকাহ, আমাকে একটু বিছানায় শুইয়ে দাও।'
এর পর সেই কষ্টে অনেকদিন শয্যাশায়ী ছিলেন আমিনা। তার পর থেকে কারও সাথেই কথা বলতেন না তিনি। এমনকি সেসময় তার শ্বশুর বৃদ্ধ আব্দুল মুত্তালিব ছাড়া যারা তাকে দেখতে আসতেন, তাদের দিকে ফিরেও তাকাতেন না। আব্দুল্লাহ সিরিয়া যাওয়ার দুমাস পর আমিনা এক ভোরে আমাকে হঠাৎ করেই ডাকলেন। তাকে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল সেই সময়।
তিনি বললেন, 'বারাকা, আমি না অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেছি আজ।'
'নিশ্চয় ভালো কিছু, তাই না?' জিজ্ঞাস করলাম আমি।
তিনি বললেন, 'আমি দেখলাম আমার তলপেট থেকে আশ্চর্য একটা আলো বের হয়ে মক্কার আশেপাশের সমস্ত পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা—সবকিছুই আলোকিত করে দিল হঠাৎ।'
'আপনি কি সন্তানসম্ভবা?' আমি জিজ্ঞাস করলাম।
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, কিন্তু অন্য সন্তানসম্ভাবা মহিলাদের মতো কোনো ব্যথা, কষ্ট বা অসুস্থতা অনুভব করছি না আমি।'
আমি বললাম, 'নিশ্চয় আপনি এমন একটা সন্তান জন্ম দেবেন যে সবার জন্য কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে। যে মানুষকে নিয়ে আসবে অন্ধকার থেকে আলোর পথে।'³⁷⁰
যতদিন আব্দুল্লাহ দূরে ছিল, আমিনা বেশ বিষণ্ণ ও বিষাদগ্রস্ত ছিলেন। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বারাকা প্রায়ই তার পাশে থেকে বিভিন্ন গালগল্প করতেন এবং বিভিন্ন কথাবার্তা বলে তাকে হাসিখুশি উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করতেন; কিন্তু তিনি আরও বেশি বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন—যখন একদিন শ্বশুর আব্দুল মুতালিব এসে বললেন, তাদের সবাইকে ঘর ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিতে হবে; কারণ ইয়েমেনের তৎকালীন শাসক আব্রাহা তার শক্তিশালী দলবল নিয়ে মক্কা আক্রমণ করতে আসছিল। তখন আমিনা তাকে বললেন, তিনি এতই দুর্বল আর বিষণ্ণ যে, তার পক্ষে ঘর ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়া সম্ভব না। আমিনা আরও বললেন যে, আব্রাহা কখনোই মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না আর পবিত্র কাবা গৃহ ধ্বংস করতে পারবে না। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ ওটাকে রক্ষা করবেন। কথাটা শুনে শ্বশুর আব্দুল মুতালিব বেশ রাগান্বিত হয়ে পড়লেন; কিন্তু পুত্রবধূ আমিনাকে বেশ নির্ভীক দেখাচ্ছিল এ ব্যাপারে। তার চোখে মুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। আর আমিনার কথাই সত্যি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। আমিনার কথামত মক্কায় প্রবেশের পূর্বেই আব্রাহা তার হস্তীবাহিনীসহ পরাজিত আর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা বারাকা (উম্মে আইমান) আমিনার পাশে থাকতেন। তার ভাষ্যমতে, আমি তার পায়ের কাছে ঘুমাতাম আর তার ঘুমের মাঝে স্বামীর জন্য তার বিলাপ আর কান্না শুনতে পেতাম নিয়মিত। মাঝে মাঝে তার কান্নার শব্দে আমার ঘুম পর্যন্ত ভেঙে যেত, তখন আমি বিছানা থেকে উঠে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম।
ইতোমধ্যে সিরিয়া যাওয়া বণিকদের অনেকেই ফিরে এসেছে এবং তাদের পরিবার-পরিজন তাদের আনন্দের সহিত অভ্যর্থনা দিল; কিন্তু আব্দুল্লাহর কোনো খবর জানা গেল না। বারাকা গোপনে আব্দুল্লাহর খবর নেওয়ার জন্য আব্দুল মুত্তালিবের বাসায় গেল, কিন্তু কোনো খবর পেল না। শুনলে কষ্ট পাবে ভেবে বারাকা আমিনাকে খবরটা জানাল না। ইতিমধ্যে সিরিয়া যাত্রী বণিকদের সবাই ফিরে এলো, শুধু মাত্র আব্দুল্লাহ ছাড়া!
পরে ইয়াসরিব থেকে যখন আব্দুল্লাহর মৃত্যুর খবর এল, তখন বারাকা আব্দুল মুত্তালিবের ঘরেই ছিল। বারাকা বলেন, 'মক্কার সবচাইতে সুদর্শন যুবক, কুরাইশদের গর্ব আব্দুল্লাহ, যার ফেরার জন্য এত অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম আমরা সবাই, সেই আব্দুল্লাহ আর কখনোই ফিরবে না! খবরটা শোনামাত্রই আমি জোরে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলাম, আর চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে আমিনার কাছে ছুটে গেলাম।'
দুঃসংবাদটা শোনামাত্রই অজ্ঞান হয়ে গেল আমিনা। এই জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তার পাশেই ছিলাম আমি। আমিনার ঘরে আমি ছাড়া আর কেউই ছিল না তখন। এইভাবে আসমান-যমীন আলোকিত করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম পর্যন্ত দিবারাত্রি সর্বক্ষণ আমিনার সেবায় নিয়োজিত ছিলাম আমি।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন উম্মে আইমান প্রথম তাকে কোলে তুলে নিয়েছিল। তারপর দাদা আব্দুল মুতালিব এসে কাবায় নিয়ে গেল তাকে, সেখানে সমগ্র মক্কাবাসী উৎসবের মাধ্যমে বরণ করে নিল তাকে। এরপর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন সুস্বাস্থ্যকর উত্তম পরিবেশে লালনপালনের জন্য হালিমার সাথে 'বাদিয়াতে' (মরুভূমি) পাঠানো হয়েছিল বেশ কয়েক বছরের জন্য। তখনো উম্মে আইমান রা. আমিনার সাথে থেকে তাকে সাহায্য সহযোগিতা করত। পাঁচ বছর বয়সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন মক্কায় ফিরিয়ে আনা হলো তখন মা আমিনা ও বারাকা তাকে পরম আনন্দে গ্রহণ করে নিল। আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন ছয় বছর, তখন মা আমিনা তার স্বামীর কবর যিয়ারতের মনস্থির করলেন।
শ্বশুর আব্দুল মুত্তালিব আর বারাকাহ দুজনেই তাকে নিরুৎসাহিত করতে চাইল এ ব্যাপারে; কিন্তু কোনোভাবেই নিরুৎসাহিত করা গেল না আমিনাকে। সুতরাং একদিন সকালে বড় একটি উটে চড়ে সিরিয়াগামী মরুযাত্রীদের সাথে আমিনা, বারাকাহ ও শিশু মুহাম্মাদকে সাথে নিয়ে ইয়াসরিবের (মদীনা) উদ্দ্যশ্যে রওনা দিলেন। সফরের আসল কারণ জেনে গেলে শিশু মুহাম্মাদ মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে। এজন্য তারা যে তার পিতার কবর যিয়ারত করতে যাচ্ছেন, তা তখন আর তাকে জানাননি।
তাদের কাফেলাটি বেশ দ্রুতই আগাচ্ছিল। উম্মে আইমান রা. আমিনাকে অন্ততপক্ষে তার সন্তানের স্বার্থে হলেও শান্ত থাকতে বলছিল বার বার। আর এদিকে শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাত্রার প্রায় পুরো সময় জুড়েই বারাকার গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিল।
মদীনায় পৌঁছাতে প্রায় দশদিনের মতো লেগেছিল তাদের। প্রতিদিন আব্দুল্লাহর কবরে যাবার সময় আমিনা শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার বনু নাজ্জার গোত্রীয় ভাইদের কাছে রেখে যেতেন। এভাবে প্রায় কয়েক সপ্তাহ যাবত প্রতিদিন আমিনা আব্দুল্লাহর কবরে যেতেন। এসময় আমিনা আরও বেশি শোকার্ত হয়ে পড়েছিলেন।
এরপর মক্কা ফেরার পথে আমিনা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লেন হঠাৎ। মক্কা আর মদীনার মাঝামাঝি আবওয়া নামক একটা জায়গায় যাত্রা বিরতি করতে বাধ্য হলেন তারা। আমিনার অবস্থা আরও বেশি খারাপ হতে লাগল। এক অমাবস্যার রাতে, তার জ্বর মারাত্মক রকম বেড়ে গেল। এমন সময় আমিনা উম্মে আইমানকে কাছে ডেকে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে কানে কানে বললেন, বারাকা, আমি তো আর বেশিক্ষণ বাঁচবো না। আমি আমার সন্তান মুহাম্মাদকে তোমার দায়িত্বে দিয়ে গেলাম। পেটে থাকা অবস্থায় বাবাকে হারিয়েছে সে। আর এখন তার চোখের সামনেই তার মাকে হারাতে যাচ্ছে সে। তার মা হয়েই থেকো তুমি, বারাকাহ। কখনোই ছেড়ে যেয়ো না তাকে তুমি!
উম্মে আইমান বলেন, কথাটা শোনামাত্র হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেল আমার, কান্না আর ধরে রাখতে পারলাম না আমি। আমার কান্না দেখে শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও কাঁদা শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সে; জড়িয়ে ধরল তাকে গলায়। আমিনা শেষবারের মতো আর্তনাদ করে উঠলেন একবার। তারপর আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না তাঁর। সারাজীবনের জন্যই নীরব হয়ে গেলেন তিনি।³⁷¹
উম্মে আইমানের কান্না থামল না আর। কাঁদতেই থাকল সে অঝোর ধারায়। ধূ ধূ মরুর বুকে নিজ হাতেই কবর খুঁড়ল সে। আর নিজ হাতেই প্রিয় আমিনাকে দাফন করল। উম্মে আইমানের চোখের জলে ভিজল আমিনার কবর। মা-বাবা হারানো ইয়াতীম শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে দাফন শেষে মক্কায়তার দাদা আব্দুল মুতালিবের কাছে ফিরল সে।
বিবি আমেনার ইন্তেকালের পর শিশু নবীকে তার দাদার কাছে পৌঁছে দেন উম্মে আইমান। তার সেবা-যত্নে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শৈশব ও কৈশোর জীবন পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ২৫ বছর বয়সে যখন বিবি খাদিজার সাথে বিবাহ হয়েছিল তখনো উম্মে আইমান মায়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও হযরত উম্মে আইমানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। মাতৃভক্তির চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে গিয়েছেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
উবাইদের সাথে বিয়ে
খাদীজা রা.-এর সাথে বিয়ের পর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন উম্মে আইমান রা.-কে ডেকে বললেন, 'ইয়া উম্মাহ, (উম্মে আইমানকে তিনি 'মা' বলেই সম্বোধন করতেন সবসময়) এখন তো আমি বিবাহিত। আর আপনি বিয়েই করেননি এখনো। কেউ যদি এখন বিয়ে করতে চায় আপনাকে?' উম্মে আইমান মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে এক পলক তাকালেন, আর বললেন, 'তোমাকে ছেড়ে কখনোই যাব না আমি। মা কি তার ছেলেকে ছেড়ে যেতে পারে কখনো?'
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হাসলেন, আর উম্মে আইমান- এর কপালে চুমু খেলেন। আর স্ত্রী খাদীজার দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখ, এটাই হলো উম্মে আইমান। আমার নিজের মায়ের পরে ইনিই আমার মা, আমার পরিবার।
তখন খাদিজা বললেন, উম্মে আইমান, আপনি আপনার যৌবন বিসর্জন দিয়েছেন আপনার প্রিয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য। সে আপনার প্রতি তার দায়িত্ব সম্পাদন করতে চাচ্ছে। তাই আমার আর আপনার প্রিয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্বার্থে বৃদ্ধ হয়ে যাবার আগেই এই বিয়েতে রাজি হয়ে যান আপনি।
উম্মে আইমান বললেন, ‘কে আমাকে বিয়ে করবে, খাদিজা?’ ‘ওই যে ইয়াসরিবের খাযরায গোত্রের উবাইদ ইবনে যায়িদ আমাদের কাছে এসেছিল আপনার বিয়ের ব্যাপারে। দয়া করে ‘না’ বলবেন না।’ উম্মে আইমান রাজি হয়ে গেলেন। বিয়ের পর উবাইদ ইবনে যায়িদের সাথে ইয়াসরিব চলে গেলেন তিনি। সেখানে তাদের সন্তানও হয়েছিল একজন। যার নাম ছিল আইমান। এরপর থেকে লোকে তাকে ‘উম্মে আইমান’ অর্থাৎ, আইমানের মা বলেই ডাকত।
তার বিয়ে অবশ্য বেশিদিন টেকেনি। হঠাৎ স্বামী মারা গেল তাঁর। আবার তিনি মক্কায় ফিরে এলেন—তার ‘ছেলে’ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে। তখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খাদীজার সাথে আলী ইবনে আবি তালিব, খাদীজার প্রথম স্বামীর কন্যা হিন্দা, আর যায়িদ ইবনে হারিসাও থাকতেন।
যায়িদ ছিল আরবের কাল্ব গোত্রের লোক। যাকে তার ছেলেবেলায় মক্কায় দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। তখন খাদিজার ভাইপো কিনে নিয়েছিল তাকে খাদিজার সেবা করার জন্য। খাদীজার গৃহে যায়িদ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংস্পর্শে আসার পর তার সেবায় নিয়োজিত করল নিজেকে। তাদের দু-জনের সম্পর্ক ছিল বাবা-ছেলের মতোই। সম্পর্কটা এতই সুন্দর ছিল যে যায়িদের বাবা যখন তার ছেলে খোঁজে মক্কায় এলেন তখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদকে বললেন, তুমি স্বাধীন, ইচ্ছা হলে আমার সাথে থাকতে পার তুমি অথবা তোমার বাবার সাথে চলে যেতে পার। তখন যায়িদ তার বাবাকে বললেন, তাঁকে (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে) ছেড়ে কখনোই যাব না আমি। একজন বাবা তার সন্তানকে আদর করেন যেভাবে তার চেয়েও বেশি আদর করেছেন তিনি আমাকে। তিনি এত ভালোবাসতেন আমাকে যে, একদিনের জন্যও মনে হয়নি আমার যে আমি তার চাকর। তিনি হলেন সৃষ্টির সেরা মানব। তাকে ছেড়ে কী করে আমি আপনার সাথে যাব? তাকে ছেড়ে কখনোই যাব না আমি!”
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরে প্রকাশ্যে মুক্ত ঘোষণা করেছিলেন যায়িদকে; কিন্তু তারপরও যায়িদ তাকে ছেড়ে যায়নি; বরং তার সাথে থেকে তার সেবায়আরও বেশি মনোনিবেশ করেছিলেন।
পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নবুওয়াতপ্রাপ্ত হলেন, তাতে প্রথম বিশ্বাস স্থাপনকারীদের মধ্যে যায়িদ এবং উম্মে আইমান তথা বারাকা ছিলেন অন্যতম। প্রথম মুসলিম হিসেবে কুরাইশদের অমানুষিক নির্যাতনও সহ্য করতে হয়েছিল তাদের।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসলাম প্রচারের মিশনে তাদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সেসময় ইসলামের বিরুদ্ধে মুশরিকদের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা সম্পর্কে গোপনে তথ্য সংগ্রহের জন্য নিজেদের জীবন পর্যন্ত বাজি রেখেছিল তারা।
'যে জান্নাতী নারী বিয়ে করতে চায়'
এক রাতে মুশরিকরা যখন দারুল আরকামে যাবার পথ অবরোধ করে বসল, উম্মে আইমান সেই অবরোধের মধ্যেই তার জীবন বাজি রেখে খাদীজার পাঠানো গোপন বার্তা নিয়ে দারুল আরকামে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে হাজির হয়েছিলেন। যখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে খবরটা জানালেন, তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হেসে বললেন, 'আপনি অনেক ভাগ্যবতী, উম্মে আইমান! নিঃসন্দেহে জান্নাতের অধিবাসী হবেন আপনি।'
উম্মে আইমান রা. সেখান থেকে চলে যাবার পর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমাদের মাঝে কেউ যদি জান্নাতী কোনো মহিলাকে বিয়ে করবার ইচ্ছা পোষণ কর তবে তার উচিত উম্মে আইমানকে বিয়ে করা।'
এই কথা শোনার পর সব সাহাবীই নীরব হয়ে গেলেন হঠাৎ। কোনো সাড়া পাওয়া গেল না কারও কাছ থেকে। কেননা, উম্মে আইমান না ছিলেন সুন্দরী না ছিলেন আকর্ষণীয়া। বয়স ইতিমধ্যেই পঞ্চাশের কাছাকাছি হয়ে গেছে তার, দেখতেও বৃদ্ধ বৃদ্ধ লাগত তাকে; কিন্তু যায়িদ ইবনে হারিসা এগিয়ে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আমিই বিয়ে করব উম্মে আইমানকে। আল্লাহর কসম! সুন্দরী রূপবতী মহিলাদের চাইতে তিনিই উত্তম।'
এরপর যথারীতি বিয়ে হয়ে গেল তাদের দুজনের। একটা সন্তানও জন্ম নিয়েছিল তাদের সংসারে। তার নাম ছিল উসামা। উসামাকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি প্রায়সময়ই খেলাধুলা করতেন তার সাথে, আদর করতেন তাকে চুমু দিয়ে আর খাইয়ে দিতেন তাকে নিজ হাতে। একারণে মুসলিমরা 'প্রিয় নবীর প্রিয় সন্তান' হিসেবেই জানত তাকে। অল্প বয়স থেকেই উসামা নিজেকে ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত করেন। পরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেন তার ওপর।
বরকতময় হিজরত
সাহাবাদের ওপর মক্কার মুশরিকরা নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদেরকে মদীনায় হিজরতের অনুমতি দেন। এই হিজরতকারীদের মধ্যে হযরত উম্মে আইমান রা. অন্যতম। তিনি যখন হিজরত করছিলেন তখন পথিমধ্যে এক স্থানে সন্ধ্যা হলো এবং তিনি পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লেন। ধারে কাছে কোথাও পানি ছিল না। এমন সময় আকাশ থেকে সাদা রশিতে ঝোলানো এক বালতি পানি তার সামনে এসে দাঁড়াল। তিনি পেট ভরে সেই পানি পান করলেন। ফল এই দাঁড়ায় যে, তিনি জীবনে আর কখনো পিপাসায় কাতর হননি। তিনি বলতেন, প্রচণ্ড গরমের দুপুরে রোযা অবস্থায় আমার পিপাসা হয় না।³⁷²
হযরত উম্মে আইমান রা. আজীবন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। আলী ও ফাতিমার বিয়ের সময়ও আমরা উম্মে আইমান রা.-কে সবার আগ্রভাগে দেখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদরের কন্যা ফাতিমাকে স্বামীগৃহে পাঠালেন, পরদিন সকালেই মেয়ে-জামাইকে দেখার জন্য ছুটে গেলেন জামাই বাড়ি। উম্মে আইমান রা. রাতে আলীর বাড়িতেই ছিলেন।
অষ্টম হিজরীতে যায়নাব বিনতু রাসূলিল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল হলে অন্য মহিলাদের সাথে তার গোসলে অংশগ্রহণ করেন। তার পূর্বে বদর যুদ্ধের সময় রুকাইয়্যা বিনতে রাসূলিল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল হলে তাকেও গোসল দেন উম্মে আইমান রা.। আল কালবী বলেন, উম্মুল মুমিনীন খাদীজা রা. মৃত্যুবরণ করলে তাকে গোসল দেন উম্মে আইমান ও উম্মুল ফাদ।³⁷³
রণাঙ্গনে উম্মে আইমান
উম্মে আইমান মদীনায় গিয়েও ইসলামের সেবায় পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করেন নিজেকে তিনি। উহুদের যুদ্ধে তৃষ্ণার্তদের মাঝে পানি বিতরণ করেন তিনি এবং আহত সৈনিকদের সেবা শুশ্রূষা করেন। খাইবার ও হুনাইনের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযানেও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পাশে ছিলেন তিনি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় সাহাবী উম্মে আইমানের পুত্র আইমান হিজরি অষ্টম বর্ষে হুনাইনের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। তার স্বামী যায়িদও মুতার যুদ্ধে শহীদ হন। ইতোমধ্যে উম্মে আইমানের বয়স সত্তরের কাছাকাছি হয়ে গিয়েছিল। বার্ধক্যের কারণে বেশিরভাগ সময় ঘরে বসেই কাটাতে হতো তাঁর। আবু বকর রা. ও উমর রা.-কে সাথে নিয়ে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই তাকে দেখতে যেতেন এবং জিজ্ঞাস করতেন, ইয়া উম্মি (ও আমার মা), কেমন আছেন আপনি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলতেন, হে আল্লাহর নবী, ইসলাম যতক্ষণ ভালো, আমিও ভালো ততক্ষণ।
উহুদযুদ্ধের সময় উম্মে আইমান পানির মশক পিঠে নিয়ে পিপাসার্ত মুসলিম মুজাহিদদের পানি পান করাতেন। মুসলিম সৈন্যগণ যখন ছত্রভঙ্গ হয়েছিলেন তখন উম্মে আইমান পালন করেছিলেন সাহসী এক সৈনিকের ভূমিকা। উহুদের যুদ্ধে হযরত উম্মে আয়মানের শরীরে ছাব্বিশটি তীরের এবং চারটি তলোয়ারের আঘাত লেগেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধাত্রী উম্মে আইমান রা. উহুদযুদ্ধে আনসার মহিলাদের সাথে মুসলিম মুজাহিদদের পানি পান করাচ্ছিলেন। তাকে লক্ষ্য করে হিব্বান ইবনে আরাকা একটি তীর নিক্ষেপ করে। তীরটি তার ঝালরে লাগে এবং তার দেহের কিছু অংশ বেরিয়ে পড়ে। তা দেখে তীর নিক্ষেপকারী অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের হাতে তীর ধরিয়ে দিয়ে বলেন, এটি মার। সাআদ তীরটি ছুঁড়ে মারলেন এবং তা হিব্বানের গায়ে লাগে। সাথে সাথে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং মারা যায়। তা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনভাবে হেসে দেন যে, তার দাঁত দেখা যায়।
এরপর থেকে ইসলামের প্রতিটি যুদ্ধে উম্মে আইমান রা. সেবিকা হিসাবে যেতেন। বায়তুল মাল থেকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারবর্গ যে ভাতা পেতেন সদস্যা হিসাবে উম্মে আইমানকেও এক অংশ দিতেন। খায়বারের যুদ্ধের পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বাগান বাড়ি ভাগে পেয়েছিলেন তার একটা অংশ উম্মে আইমানকে হেবাস্বরূপ দান করেছিলেন। মৃতার যুদ্ধে উম্মে আইমানের স্বামী যায়িদ রা. শহীদ হয়েছিলেন।
উসামার প্রতি ভালোবাসা
যায়িদ ও উম্মে আইমান দম্পতির সন্তান হযরত উসামা রা.-কে ভীষণ ভালোবাসতেন প্রিয়নবী। হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি সেনাবাহিনী পাঠানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং উসামাহ ইবনে যায়িদ রা.-কে উক্ত বাহিনীর নেতা মনোনীত করেন। কিছুসংখ্যক লোক তার নেতৃত্বের ওপর মন্তব্য প্রকাশ করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তার নেতৃত্বের প্রতি তোমরা সমালোচনা করছ। ইতোপূর্বে তার পিতার নেতৃত্বের প্রতিও তোমরা সমালোচনা করেছ। আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই সে নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি ছিল এবং আমার প্রিয়পাত্রদের একজন ছিল। অতঃপর তার পুত্র আমার প্রিয়পাত্রদের একজন।'³⁷⁴
হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার এক কায়িফ (রেখা চিহ্নে অভিজ্ঞ) ব্যক্তি আসে, সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত ছিলেন। উসামা রা. ও তার পিতা শুয়েছিলেন। কায়িফ বলে উঠল, এ পাগুলো একটি অন্যটির অংশ। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত খুশি হলেন এবং আয়েশা রা.-কেও এ খবর জানালেন।³⁷⁵
বিদায় হজের সময়ও হযরত উম্মে আইমান প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময় বালকপুত্র উসামাকে নবীজীর খাদেম হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। একজন বলেছিলেন, 'তোমার একমাত্র পুত্র যদি কাফেরদের হাতে শহীদ হয়?' উত্তেজিত কণ্ঠে হযরত উম্মে আইমান জবাব দিলেন, 'আল্লাহর ইচ্ছা হলে শহীদ হবে, তাতে তোমার আমার কী করার আছে? আল্লাহ যদি আমাকে একটি সন্তান না দিয়ে এক হাজার সন্তান দিতেন, তাহলে প্রতিটি সন্তান আল্লাহ ও তার রাসূলের পথে কুরবান করে দিতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম।'
প্রিয় রাসূলের ইন্তেকালে
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর প্রায়সময়ই কাঁদতে দেখা যেত উম্মে আইমান রা.-কে। তাকে যখন একবার জিজ্ঞাস করা হয়েছিল, 'আপনি এত কাঁদছেন কেন?' তিনি বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ইন্তেকাল করবেন, তা আমি জানতাম। কিন্তু আমি একারণে কাঁদছি যে, তার মৃত্যুর পর আমাদের প্রতি আর কখনো আল্লাহর ওহী নাযিল হবে না।'
উম্মে আইমানই হলেন একমাত্র মহিলা যে কিনা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম থেকে শুরু করে ইন্তেকাল পর্যন্ত পাশে ছিলেন। সারাজীবন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও শ্রম দিয়ে গেছেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বাত্মক সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। সর্বোপরি ইসলামের ক্রান্তি-লগ্নে এবং ইসলামের আবির্ভাবের সময় দ্বীনের প্রতি তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবদ্দশায় উম্মে আইমানের সাথে মাঝে মাঝে দেখা করতেন। এরই অনুসরণ করে আবু বকর রা. ও উমর রা. একদিন উম্মে আইমানের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তারা দুজন উম্মে আইমানের নিকট পৌঁছলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তারা বললেন, 'আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহর নিকট যা কিছু আছে, তা তার রাসূলের জন্য উত্তম।' উম্মে আইমান বললেন, 'আমি তা জানি। আমি এজন্য কাঁদছি যে, আকাশ থেকে ওহী আসা বন্ধ হয়ে গেল।' এ কথা শুনে আবু বকর রা. ও উমর রা. উভয়ে কাঁদতে লাগলেন।³⁷⁶
অনুরূপ দ্বিতীয় খলীফা উমর রা. শাহাদাত বরণ করলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, 'আজ ইসলাম দুর্বল হয়ে গেল।'³⁷⁷
মহান প্রভুর সান্নিধ্যে
হযরত হাসান রা.-এর খেলাফতকালে পবিত্র জুমুআর দিন রাতে নিজ ঘরে পবিত্র কুরআনের সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াতরত অবস্থায় মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে যান। ইন্তেকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ১০৫ বছর। জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়। তার সোনালী জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে মা-বোনদের উচিত আদর্শ ও সুন্দর জীবন গঠনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা।
টিকাঃ
৩৭০. ওয়াকফাত তারবাবিয়া, শায়খ আহমাদ ফরীদ, ৪৭।
৩৭১. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৬৮; তালকীহ ফুহূমি আহলিল আসার, ৭।
৩৭২. তাবাকাতে ইবেন সাআদ, ৮/২২৪; আল ইসাবাহ, ১৩/১৭৮।
৩৭৩. আনসাবুল আশরাফ, ১/৪০০, ৪০১, ৪০৬।
৩৭৪. সহীহ, বুখারী, ৩৭৩০; সহীহ, মুসলিম, ২৪২৬।
৩৭৫. সহীহ, বুখারী, ৩৭৩১; সহীহ, মুসলিম, ১৪৫৯।
৩৭৬. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫৪; সুনান, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৬৩৫।
৩৭৭. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২২৭।
📄 ফাতিমা বিনতে আসাদ রা.
যাঁর কবরে বিছানো হয়েছিল রাসূলের পবিত্র জামা
আজ আমরা এমন একজন মহীয়সী সাহাবীয়র জীবনেতিহাস নিয়ে আলোচনা করব—যার মর্যাদা ও সম্মান এতই ঊর্ধ্বে যা কল্পনা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
ইসলামের প্রথম যুগে যে সকল মহীয়সী মহিলার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে, তাদের মধ্যে তিনিও একজন। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর তিনি রাসূলের লালন-পালনের সুযোগলাভে ধন্য হন। তিনি ছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলীফা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী বীর সৈনিক আলী ইবনে আবি তালিবের রা.-এর গর্বিত মা। তিনি ছিলেন জান্নাতের অধিকারী যুবকদের দু-নেতা হযরত হাসান ও হুসাইন রা.-এর দাদী। মৃতার যুদ্ধে মহান শহীদদের অন্যতম জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর মা। সর্বোপরি তিনি ছিলেন রাসূলুল্লহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রিয়তমা কন্যা, হাসান-হুসাইনের রা.-এর জননী হযরত ফাতিমা আয-যাহরার রা.-এর শ্বাশুড়ী। ইসলামের প্রথম হিজরতকারী দলের সদস্যা। প্রথম হাশিমী নারী—যিনি একজন হাশিমী সন্তান জন্মদান করেছিলেন।³⁷⁸
তাঁর বিশেষ মর্যাদা
ফাতিমার পিতার নাম আসাদ। পিতামহ হাশিম, প্রপিতামহ আব্দে মানাফ ইবনে কুসাঈ। তিনি কুরাইশ গোত্রের হাশিমী শাখার কন্যা এবং আলী ইবনে আবি তালিবের মা। পিতামহ হাশিমে গিয়ে তার বংশধারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধারার সাথে মিলিত হয়েছে। আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
خَيْرُ نِسَاءٍ رَكِبْنَ الإِبِلَ صَالِحُ نِسَاءِ قُرَيْشٍ أَحْنَاهُ عَلَى وَلَدٍ فِي صِغَرِهِ وَأَرْعَاهُ عَلَى زَوْجٍ فِي ذَاتِ يَدِهِ
উষ্ট্রারোহী মহিলাদের মধ্যে কুরাইশ বংশীয়া মহিলারা সর্বোত্তম। তারা শিশু সন্তানদের প্রতি স্নেহশীল এবং স্বামীর মর্যাদার উত্তম রক্ষাকারিণী।³⁷⁹
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন একদিকে তার শ্বশুর এবং অন্য দিকে চাচা।
এখান থেকে শুরু
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভীষণ ভালোবাসতেন। তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে, তার জীবনসন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে তখন তিনি ছেলে আবু তালিবকে ডেকে তার ইয়াতিম ভাতিজা মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহর লালন-পালানের ভার তার ওপর অর্পণ করেন। তিনি চান যেন তার ইয়াতিম পৌত্রটি আবু তালিব ও তার স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠে। তিনি তাদেরকে মুহাম্মদের প্রতি বিশেষ যত্নবান হতে তাগিদ দেন। আর সেই থেকে বালক মুহাম্মাদ তার চাচা-চাচী আবু তালিব ও ফাতিমার রা. সংসারের সাথে যুক্ত হন। ফাতিমা তার স্বামীর সাথে একযোগে মুহাম্মদের তত্ত্বাবধান ও প্রতিপালনে মনোযোগী হন।
বরকতের নবী
বালক মুহাম্মাদ তার পরিবারে যুক্ত হওয়ার পর তিনি দেখতে পান, তার ছেলে-মেয়েরা যখন মুহাম্মাদের সাথে আহার করে তখন তাদের খাবারে দারুণ বরকত হয়। আবু তালিবের ছিল অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে। নিতান্ত অভাবী মানুষ। প্রতিবেলা তার পরিবারের জন্য যে খাদ্য-খাবারের ব্যবস্থা করা হতো তা সবাই এক সাথে অথবা পৃথকভাবে খেলে সবার পেট ভরত না; কিন্তু যখন তাদের সাথে মুহাম্মাদ খেতেন তখন সবারই পেট ভরে যেত।
এ কারণে ছেলে-মেয়েরা যখন খেতে বসত তখন আবু তালিব বলতেন, 'তোমরা একটু অপেক্ষা কর, আমার ছেলে মুহাম্মাদ আসুক।'
তিনি আসতেন, এক সাথে খেতেন এবং তাদের খাবার বেঁচে যেত। এক পেয়ালা দুধ থেকে তিনি প্রথমে পান করলে তারা সবাই তৃপ্ত হয়ে যেত- যদিও তাদের একজনই সেই পূর্ণ পেয়ালাটি শেষ করে ফেলতে পারত। তাই আবু তালিব তাকে বলতেন, তুমি বড় বরকতময় ছেলে।
সাধারণত শিশু-কিশোররা উসকো-খুশকো ও ধুলিমলিন থাকে, কিন্তু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় তেল-সুরমা লাগিয়ে পরিপাটি অবস্থায় থাকতেন।³⁸⁰
ফাতিমা বিনতে আসাদ এ সবকিছু দেখতেন। আর এতে মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি স্নেহ-মমতা আরও বেড়ে যেত। তার প্রতি আরও যত্নবান হতেন। এভাবে তাকে শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত, তথা হযরত খাদীজার রা. সাথে বিয়ের আগ পর্যন্ত নিজের সন্তানের থেকেও অধিক স্নেহ-মমতা দিয়ে লালন-পালন করেন। সব রকমের অশুভ ও অকল্যাণ থেকে আঁচলে লুকিয়ে রাখার মতো তাকে আগলে রাখেন। এ কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা জীবন চাচী ফাতিমা বিনতে আসাদের মধ্যে নিজের মা আমিনা বিনতে ওহাবের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেতেন। তাকে গর্ভধারিণী মায়ের পরে দ্বিতীয় মা বলে মনে করতেন।
হযরত ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে লোকেরা যা কিছু বলাবলি করত, বিশেষত স্বামী আবু তালিব যে প্রায়ই বলতেন, আমার এ ভাতিজা একজন বড় সম্মানের অধিকারী ব্যক্তি হবে-কান লাগিয়ে শুনতেন।³⁸¹ তিনি স্বামীর মুখে আরও শোনেন সিরিয়া সফরের সময় কিশোর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেন্দ্র করে যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল তার বর্ণনা। তাছাড়া তিনি আরও শোনেন, হযরত খাদীজার দাস মাইসারার বর্ণনা যা তিনি যুবক মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে সিরিয়া, ভ্রমণের সময় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি নিজে মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধ্যে যা কিছু দেখেছিলেন এবং অন্যদের মুখে তার সম্পর্কে যেসব কথা শুনেছিলেন তাতে এত প্রভাবিত ও মুগ্ধ হন যে, কলিজার টুকরো আলীকে তার তত্ত্বাবধানে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা-সংকোচ করেননি।³⁸²
তিনি অতি নিকট থেকে মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধ্যে স্নেহময় পিতার রূপ দেখেছিলেন। তিনি লক্ষ করেছিলেন, আলীর জন্মের পর থেকে তার প্রতি মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যাধিক আগ্রহ ও উৎসাহকে। বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলতেন, আলীর জন্মের পর মুহাম্মাদ তার নিজের মুখ থেকে একটু থুথু নিয়ে তার মুখে দেয়। তারপর সে জিহ্বা চাটতে চাটতে ঘুমিয়ে যায়। পরদিন সকালে আমরা আলীর জন্য ধাত্রী ডেকে পাঠালাম; কিন্তু কারও স্তনই গ্রহণ করল না। আমি মুহাম্মাদকে ডাকলাম। সে তার জিহ্বায় একটু দুধ দিল। আর আলী তা চাটতে চাটতে ঘুমিয়ে গেল। আল্লাহ যতদিন ইচ্ছা করলেন এভাবে চলতে লাগল। এ সবকিছু দেখে-শুনে মুহাম্মদের প্রতি ফাতিমা বিনতে আসাদের স্নেহ-মমতা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা দিন দিন বেড়ে যেতে থাকে। তিনি ছেলে আলীকে মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সার্বাক্ষণিক সহচর হওয়ার তাকিদ দেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম দিকে যখন কাবার চত্বরে নামায আদায় করতেন তখন কুরাইশরা তেমন গুরুত্ব দিত না। পরে যখন নিয়মিত পড়তে লাগলেন, তখন আলী ও যায়িদ তাকে পাহারা দিতেন। পরে এমন হলো যে, তারা দু-জন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হলে সর্বক্ষণ তার সঙ্গে থাকতেন। একদিন আলী রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন, তখন আবু তালিব তাকে ডেকে পেলেন না। আলীর মা ফাতিমা বললেন, আমি তাকে মুহাম্মাদের সাথে যেতে দেখেছি। আবু তালিব তাদেরকে তালাশ করতে করতে শিআবে আবি দাব-এ গিয়ে পেলেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযে দাঁড়িয়ে, আর আলী রা. তাকে পাহারা দিচ্ছেন।³⁸³
সৌভাগ্যের পরশমনি
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত লাভ করলেন। নিজ গোত্র ও আত্মীয়-বন্ধুদের ইসলামের দিকে আহবান জানানোর নির্দেশ লাভ করলেন। আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন, 'তুমি তোমার নিকট-আত্মীয়দের সতর্ক করো।³⁸⁴ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রভুর নির্দেশ পালন করলেন। নিকট-আত্মীয়দের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের দিকে আহবান জানালেন। তাদেরকে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনার তাগিদ দিলেন। ইসলামের সেই একেবারে সূচনা পর্বে যে ক'জন মুষ্টিমেয় মহিলা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনে মুসলমান হন তাদের মধ্যে ফাতিমা বিনতে আসাদ অন্যতম। সেদিন তার স্বামী আবু তালিব ভাতিজা মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবেদনে সাড়া দিতে অপারগ হলেও তাদের কিশোর ছেলে আলী রা. আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনেন।³⁸⁵
দুঃখের পরে সুখের দিন
এখান থেকেই এই মহীয়সী সাহাবীয়া ফাতি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করেন, তার প্রশংসা করেন এবং নিজের জামা দিয়ে তার কাফন দেন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বসে ছিলাম। এমন একজন এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আলী, জাফর ও আকীলের মা মারা গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা সবাই আমার মার কাছে চলো। আমরা উঠলাম এবং এমন নিঃশব্দে পথ চললাম যেন আমাদের প্রত্যেকের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। বাড়ির দরজায় পৌঁছার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গায়ের জামাটি খুলে পরিবারেরে লোকদের হাতে দিয়ে বলেন, তার গোসল দেওয়া শেষ হলে এটি তার কাফনের নীচে দিয়ে দেবে।
যখন লোকেরা দাফনের জন্য লাশ নিয়ে বের হলো তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার খাটিয়ায় কাঁধ দেন, একবার খাটিয়ার সামনে যান, আরেকবার পেছনে আসেন। এভাবে তিনি কবর পর্যন্ত পৌঁছেন। তারপর কবরে নেমে গড়াগড়ি দিয়ে আবার উপরে উঠে আসেন। তারপর বলেন, আল্লাহর নামের সাথে এবং আল্লাহর নামের ওপরে তোমরা তাকে কবরে নামাও। দাফন কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার মা ও প্রতিপালনকারিণী! আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন। আপনি ছিলেন আমার একজন চমৎকার মা ও চমৎকার প্রতিপালনকারিণী। জাবির বলেন, আমরা বললাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি এখানে এমন দু-টি কাজ করেছেন, আমরা কখনো আপনাকে এ ধরনের কাজ করতে দেখি না।' বললেন, 'সে দুটি কাজ কী?' বললাম, 'আপনার জামা খুলে দেওয়া এবং কবরে গড়াগড়ি দেওয়া।' বললেন, 'জামাটির ব্যাপার হলো, আমি চেয়েছি তাকে যেন কখনো জাহান্নামের আগুন স্পর্শ না করে। যদি আল্লাহ চান। আর কবরে আমার গড়াগড়ি দেওয়া—আমি চেয়েছি আল্লাহ যেন তার কবরটি প্রশস্ত করে দেন।³⁹³
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. নিশ্চিতভাবেই জান্নাতে যাবেন। ইমাম কুরতুবী বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা তার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যে, কবরে তার ওপর দলন-পেষণ চালানো হবে না। যেহেতু তিনি ফাতিমা বিনতে আসাদের কবরে শুয়েছেন, এজন্য তার বরকতে ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. কবরের পেষণ থেকে মুক্তি পেয়ে গিয়েছেন।'
হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বলেছেন, যখন আলী রা.-এর মা ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. মারা গেলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বাড়িতে গেলেন এবং তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'হে আমার মা, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন। আমার মায়ের পরে আপনি অভুক্ত থেকে আমার পেট ভরাতেন, আপনি না পরে আমাকে পরাতেন এবং ভালো কিছু নিজে না খেয়ে আমাকে খাওয়াতেন। আর এর দ্বারা আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালে সফলতা লাভের আশা করতেন। ’³⁹⁴
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আব্বাস রা. ও আবু বকর সিদ্দিক রা. তার লাশ কবরে নামান।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত বড় মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন যে, কেউ তার প্রতি সামান্য দয়া ও অনুগ্রহ দেখালে তা কোনোদিন ভোলেননি। কথায় ও কর্মের দ্বারা সবসময় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাহলে ফাতিমা বিনতে আসাদ রা., যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে মায়ের ভূমিকা পালন করেছেন, আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য হিজরত করেছেন এবং সারাটি জীবন রাসূলের কল্যাণ-চিন্তা করেছেন, তাকে তিনি ভুলবেন কেমন করে? তার সাথে যেমন আচরণ করা দরকার তা তিনি করেছেন।
টিকাঃ
৩৭৮. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা, ২/১১৮।
৩৭৯. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫০৮২।
৩৮০. উয়ূনুল আসার, ১/৫১; সীরাতে হালাবিয়া, ১/১৮৯।
৩৮১. সীরাতে হালাবিয়া, ১/১৮৯।
৩৮২. নিসাউম মুবাশশিরাত বিল জান্নাহ, ৪১।
৩৮৩. আনসাবুল আশরাফ, ১/১১১।
৩৮৪. সূরা শু'আরা, ৪২:২১৪।
৩৮৫. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/২০৯।
৩৮৬. নিসাউম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ৪৩।
৩৮৭. আল ইসতিয়াব, ৪/৩৭০।
৩৮৮. উসুদুল গাবাহ, ৭১৬৮।
৩৮৯. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২২২; সিফাতুল সাফওয়া, ২/৫৪; আল ইসাবাহ, ৪/৩৮০।
৩৯০. সিফাতস সাফওয়া, ২/৫৪; উসুদুল গাবাহ, ৫/৫১৭।
৩৯১. আল ইসাবাহ, ৪/৩৭০; উসদুল গাবাহ, ভাষ্য নং ৭১৭২।
৩৯২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৪৯।
৩৯৩. কানযুল উম্মাল, ১৩/৬৩৬; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১১৮।
৩৯৪. মাজমাউয যাওয়াইদ, ১৫৩৯৯।
📄 উম্মে সুলাইম রা.
যাঁর মোহর ছিল ইসলাম
ইসলাম মানবজাতিকে বিস্ময়কর এক নারী উপহার দিয়েছেন, যাঁর জীবনকথা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য মানবিকবোধ বিকাশ ও উন্নতিতে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। এমন এক অবিস্মরণীয় চরিত্র হলেন হযরত উম্মে সুলাইম রা.। তার আসল নামের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। যথা: সাহলা, রুমাইলা, মুলাইকা, গুমাইসা ও রুমাইসা। তিনি বনু নাজ্জারের একজন প্রসিদ্ধ মহিলা আনসারী সাহাবী; প্রখ্যাত সাহাবী ও রাসূলুল্লাহর অতি স্নেহের খাদেম হযরত আনাস রা.-এর গর্বিত মা।
জাহিলী যুগে প্রথম জীবনে তিনি মালিক ইবনে নাযারকে বিয়ে করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরতের দশ বছর পূর্বেই তারই ঔরসে পুত্র আনাসের জন্ম হয়। আনসারদের মধ্যে যাঁরা প্রথম ভাগে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি তাদের অন্যতম। তার ইসলাম গ্রহণ করার কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার স্বামী মালিক তাকে ও তার সন্তানকে ফেলে দেশান্তরী হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় আসার আগেই উম্মে সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু তালহার সাথে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, আবু তালহা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উম্মে সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। জবাবে উম্মে সুলাইম বলেন, আবু তালহা, আপনি কি জানেন না, যে ইলাহ্ ইবাদত আপনি করেন তা মাটি দ্বারা তৈরি? তিনি বললেন, তা ঠিক। উম্মে সুলাইম আবার বললেন, একটি গাছের পূজা করতে আপনার লজ্জা হয় না? আপনি ইসলাম গ্রহণ করলে আপনার সাথে বিয়েতে আমার আপত্তি থাকবে না। আর সে ক্ষেত্রে আপনার ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো মোহরের দাবীও থাকবে না।
'বিষয়টি আমি ভেবে দেখবো'- একথা বলে আবু তালহা চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এসে পাঠ করলেন, 'আশহাদু আল-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ।'
অতঃপর উম্মে সুলাইম ছেলে আনাসকে ডেকে বললেন, আনাস, আবু তালহার বিয়ের ব্যবস্থা করো। আনাস রা. তার মাকে আবু তালহার সাথে বিয়ে দিলেন। ঘটনাটি বিভিন্ন সনদে বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।³⁹⁵
রাসূলের কাছে তার মর্যাদা
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন স্ত্রীদের ব্যতীত অন্য কোনো নারীর গৃহে ঢুকতেন না; কিন্তু উম্মে সুলায়মের নিকট যেতেন। লোকেরা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, এর ওপর আমার বড় মায়া হয়। আমার সাথে থেকে তার ভাই নিহত (শহীদ) হয়েছে।³⁹⁶
উম্মু সুলাইমের প্রথম স্বামীর পক্ষে আনাস এবং দ্বিতীয় স্বামী হযরত আবু তালহার পক্ষে দু-ছেলে আবু উমাইর ও আবদুল্লাহর জন্ম হয়। আবু উমাইর শৈশবে মারা যায়। অপর দু'জনের মাধ্যমে বংশ বিস্তার হয়।
আবু উমাইরের মৃত্যুতে উম্মে সুলাইম যে ধৈর্য অবলম্বন করেন তা মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয়। আবু উমাইর যখন মারা যায় তখন সে কেবল হাঁটতে শিখেছে। ছোট ছোট পা ফেলে যখন সে হাঁটে বাবা-মা অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকেন। এমন সময় আল্লাহপাক তাকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেন। ছেলেটি আবু তালহা খুব আদরের ছিল। হাদীসে এসেছে,
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু তালহার ঔরসজাত উম্মে সুলাইমের একটি ছেলে মৃত্যুবরণ করল। তখন উম্মে সুলাইম রা. তার পরিবার-পরিজনের ব্যক্তিদের বলল, আবু তালহাকে তার পুত্রের সংবাদ দিয়ো না, যতক্ষণ আমি না বলি। আবু তালহা রা. আসলেন। উম্মে সুলাইম রা. রাতের খানা সম্মুখে নিয়ে এলে তিনি খাবার খেলেন। এরপর উম্মে সুলাইম আগের চাইতে ভালো মতো সাজগোজ করলেন। আবু তালহা রা. তার সঙ্গে মিলিত হলেন। যখন উম্মে সুলাইম রা. দেখলেন যে, তিনি মিলনে পরিতৃপ্ত। তখন তাকে বললেন, 'হে আবু তালহা, কেউ যদি কারও কোনো জিনিস রাখতে দেয়, তারপর তা নিয়ে নেয় তবে কি সে তা ফেরাতে পারে?' আবু তালহা রা. বললেন, 'না।' উম্মে সুলাইম রা. বললেন, 'তাহলে তোমার ছেলের ব্যাপারে মনে কর (আল্লাহ তাকে নিয়ে নিয়েছেন)।' আবু তালহা রা. রেগে গিয়ে বললেন, 'তুমি আমাকে আগে বলনি, এখন আমি অপবিত্র, এখন ছেলের সংবাদটা দিলে!' অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে ছেলের যা ঘটেছে সব জানালেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমাদের গত রাতটিতে আল্লাহ তাআলা বরকত দিন।' উম্মে সুলাইম গর্ভবতী হলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সফরে ছিলেন, উম্মে সুলাইমও এ সফরে তার সঙ্গে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো সফর হতে প্রত্যাবর্তন করতেন, তখন রাতের বেলা মাদীনায় ঢুকতেন না। যখন লোকেরা মাদীনার কাছাকাছি পৌঁছল, তখন উম্মে সুলাইমের প্রসব-বেদনা আরম্ভ হলো। আবু তালহা রা. তার নিকট থেকে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেলা নিয়ে চলে গেলেন। আবু তালহা রা. এবং উম্মে সুলাইম রা. থেকে গেলেন।
তখন আবু তালহা রা. বললেন, 'হে প্রতিপালক, তুমি তো জান যে, যখন তিনি বের হন আমার ভালো লাগে তোমার রাসূলের সঙ্গে বের হতে এবং যখন তিনি প্রবেশ করেন তার সাথে প্রবেশ করতে; কিন্তু তুমি জানো, কেন আমি থেমে গেছি।'
উম্মে সুলাইম রা. বললেন, 'হে আবু তালহা, আগের মতো যাতনা আমার নেই। চলুন আমরা চলে যাই।' স্বামী-স্ত্রী মাদীনায় পৌঁছলে উম্মে সুলাইমের ব্যথা আবার আরম্ভ হলো। আর তিনি একটি শিশু ছেলে প্রসব করলেন। আমার মা বললেন, 'হে আনাস, শিশুটিকে যেন কেউ দুধ না খাওয়ায়, যতক্ষণ তুমি তাকে ভোরবেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিয়ে না যাও।'
সকাল হলে আমি সন্তানটিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গেলাম। আমি লক্ষ করলাম, তার হাতে উট দাগানোর যন্ত্র। আমাকে যখন তিনি দেখলেন, বললেন, 'হয়তো উম্মে সুলাইম এ পুত্রটি প্রসব করেছে।' আমি বললাম, 'হ্যাঁ'। তিনি সে যন্ত্রটি হাত থেকে রেখে দিলেন। আমি শিশুটিকে নিয়ে তার কোলে রাখলাম। তিনি মাদীনার আজওয়া খেজুর আনালেন এবং নিজের মুখে দিয়ে চিবুলেন। যখন খেজুর গলে গেল, তখন শিশুটির মুখে দিলেন। শিশুটি তা চুষতে লাগল। আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দেখ, আনসারদের খেজুর-প্রীতি।' অবশেষে তিনি শিশুর মুখে হাত বুলিয়ে তার নাম 'আবদুল্লাহ' রাখলেন।³⁹⁷
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আসার পরপরই উম্মে সুলাইম ছোট্ট ছেলে আনাসের হাত ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিয়ে গিয়ে বলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, এই থাকল আনাস। সে আপনার খিদমত করবে।' আনাস তখন দশ বছরের বালক মাত্র। তখন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাত পর্যন্ত আনাস তার খিদমত করেন। এ কারণে তিনি 'খাদেমুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম' খ্যাতি অর্জন করেন।³⁹⁸
অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি আরও আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি তার জন্য একটু দুআ করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআও করেন।³⁹⁹
জিহাদের ময়দানে অনন্য কীর্তি
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যে ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন, একটি বর্ণনামতে সে বৈঠকটি হয়েছিল উম্মে সুলাইমের বাড়িতে। হযরত উম্মে সুলাইম অত্যন্ত আগ্রহের সাথে বড় বড় যুদ্ধে কিছু আনসারী মহিলাকে সাথে নিয়ে যেতেন। তারা সৈনিকদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের সেবা করতেন।⁴⁰⁰
উহুদযুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয় হয় তখনো তিনি অতি সাহসিকতার সাথে নিজ দায়িত্ব পালন করেন। আনাস রা. বলেন, আমি আয়েশা ও উম্মে সুলাইমকে মশক ভরে পানি এনে আহতদের পান করাতে দেখেছি। মশক খালি হয়ে গেলে তারা আবার ভরে এনে পান করিয়েছেন।⁴⁰¹
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর রা. থেকে বর্ণিত, হুনাইনযুদ্ধে উম্মে সুলাইম খঞ্জর হাতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। এক সময় যুদ্ধের মধ্যে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নযরে পড়লেন। তিনি তখন কোমরে চাদর পেঁচিয়ে স্বামী আবু তালহার পাশে দাঁড়িয়ে। আবদুল্লাহ ইবনে আবি তালহা তখন তার পেটে। তার সাথে আবু তালহার উট। উটটি বশে আনার জন্য তারা মাথার কেশ ও লাগামের মধ্যে হাত দিয়ে রেখেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডাকলেন, উম্মে সুলাইম? তিনি সাড়া দিলেন, 'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক! আপনার বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করছে, আপনি যেভাবে তাদের হত্যা করছেন, আমিও ঠিক সেভাবে যারা আপনাকে ছেড়ে রণক্ষেত্র থেকে পালাবে তাদের হত্যা করব। কারণ, তারা হত্যারই উপযুক্ত।' তার কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'উম্মে সুলাইম, আল্লাহ কি এ ব্যাপারে যথেষ্ট নন?' উম্মে সুলাইমের হাতে তখন একটি খঞ্জর। সেদিকে ইঙ্গিত করে আবু তালহা বললেন, 'উম্মে সুলাইম তোমার হাতে এ খঞ্জর কেন?' বললেন, 'কোনো মুশরিক (পৌত্তলিক) আমার নাগালের মধ্যে এলে এ খঞ্জর দিয়ে আমি তার পেট ফেঁড়ে ফেলব।' এ কথা শুনে আবু তালহা বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, উম্মে সুলাইম যা বলছে তা কি শুনেছেন!' এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হেসে দেন।
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, আমি খুব ক্ষুধার্ত। তখন তিনি তার সহধর্মিণীদের নিকট পাঠালেন; কিন্তু তিনি তাদের কাছে কিছুই পেলেন না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এমন কেউ আছে কি, যে আজ রাতে এ লোকটিকে মেহমানদারী করতে পারে? আল্লাহ তার প্রতি রহমত করবেন। তখন আনসারদের এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আছি, হে আল্লাহর রাসূল, এরপর তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং নিজ স্ত্রীকে বললেন, ইনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহমান। কোনো জিনিস জমা করে রাখবে না। মহিলা বলল, আল্লাহর কসম! আমার কাছে ছেলে-মেয়েদের খাবার ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি বললেন, ছেলেমেয়েরা রাতের খাবার চাইলে তুমি তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ো, (খাবার নিয়ে) আমার কাছে এসো, অতঃপর বাতিটি নিভিয়ে দিয়ো। আজ রাতে আমরা ভুখা থাকব। সুতরাং মহিলা তা-ই করল। পরদিন সকালে আনসারী সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে আসলেন। তিনি বললেন, অমুক ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন অথবা অমুক অমুকের কাজে আল্লাহ হেসেছেন। এরপর আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন—'এবং তারা তাদের নিজেদের ওপর অন্যদের প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও।' সেই আনসারী সাহাবী ছিলেন হযরত আবু তালহা রা. এবং সেই মহীয়সী নারী ছিলেন হযরত উম্মে সুলাইম রা.।
তাঁর মায়ের একটি ছাগী ছিল। তিনি তার দুধ থেকে ঘি তৈরি করে একটি চামড়ার পাত্রে ভরেন। একদিন পাত্রটি রাবীবার হাতে দিয়ে বলেন, 'এটা রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিয়ে এসো, তিনি তরকারি হিসেবে খাবেন।' রাবীবা সেটি হাতে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, এক উক্কা বা পাত্র ঘি উম্মে সুলাইম পাঠিয়েছেন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের বললেন, 'তোমরা ঘি ঢেলে রেখে পাত্রটি তাকে ফেরত দাও।' খালি পাত্রটি তাকে ফেরত দেওয়া হলো। তিনি পাত্রটি একটি খুঁটির সাথে ঝুলিয়ে রাখলেন।
উম্মে সুলাইম বাড়ি এসে দেখেন, পাত্রটি হতে ঘি উপচে পড়ছে। রাবীবা তখন বললেন, 'আমি তো আপনার কথা পালন করেছি। যদি বিশ্বাস না হয় আমার সাথে চলুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করুন।' উম্মে সুলাইম রাবীবাকে সাথে করে রাসূলের নিকট গিয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি তার মাধ্যমে এক পাত্র ঘি পাঠিয়েছিলাম।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, সে তা দিয়েছে।' উম্মে সুলাইম তখন বললেন, 'যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন, সে সত্তার শপথ! পাত্রটি তো এখনো ঘি-ভরা এবং তা উপচে পড়ছে।' একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'উম্মে সুলাইম, আল্লাহ তোমাকে খাওয়ান যেভাবে তুমি তার নবীকে খাইয়েছ, এতে কি তুমি বিস্মিত হচ্ছ? নিজে খাও এবং অপরকে খাওয়াও।' উম্মে সুলাইম বলেন, 'আমি বাড়ি ফিরে এসে তা কয়েকটি গ্লাসে ভাগ করে রাখলাম এবং এক অথবা দুমাস যাবত আমরা তা খেয়েছি।⁴⁰²
ইমাম মুসলিম আর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আনাস বলেন, একদিন আবু তালহা আমার মা উম্মে সুলাইমকে বললেন, 'আজ আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কণ্ঠস্বর একটু দুর্বল শুনতে পেলাম। মনে হলো তিনি ক্ষুধার্ত। তোমার কাছে কোনো খাবার আছে কি?' মা বললেন, 'আছে।' তিনি কয়েক টুকরো রুটি আমার কাপড়ে জড়িয়ে দিয়ে আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পাঠালেন। আমাকে দেখেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজেজ্ঞস করলেন, 'আবু তালহা পাঠিয়েছে?' আমি বললাম, 'হাঁ।' তিনি বললেন, 'খাবার?' বললাম, 'হ্যাঁ।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথের লোকদের বললেন, 'তোমরা ওঠো।' তারা উঠলেন এবং আমি তাদের আগে আগে চললাম। আবু তালহা সকলকে দেখে স্ত্রীকে ডেকে বললেন, 'উম্মে সুলাইম, দেখ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকজন সঙ্গে করে চলে এসেছেন। সবাইকে খেতে দেওয়ার মতো খাবার তো নেই।' উম্মে সুলাইম বললেন, 'আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে কথা ভালোই জানেন।'
আবু তালহা অতিথিদের নিয়ে বসালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে ঢুকে বললেন, 'যা আছে নিয়ে আস।' সামান্য খাবার ছিল তাই হাজির করা হলো। তিনি বললেন, 'প্রথমে দশজনকে আসতে বলো।' দশজন ঢুকে পেট ভরে খেয়ে বের হয়ে গেল। তারপর আর দশজন। এভাবে মোট সত্তর অথবা আশিজন পেট ভরে সেই খাবার খেয়েছিল।⁴⁰³
উম্মে সুলাইম রা. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সীমাহীন ভালোবাসতেন। নবী কারীমও সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই উম্মে সুলাইমের গৃহে যেতেন এবং দুপুরে সেখানে বিশ্রাম নিতেন। এ সুযোগে উম্মে সুলাইম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘাম ও ঝরে পড়া লোম সংগ্রহ করতেন।
আনাস রা. বলেন, একদিন দুপুরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বাড়িতে এসে বিশ্রাম নিলেন এবং ঘেমে গেলেন। আমার মা একটি বোতল এনে সেই ঘাম ভরতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জেগে উঠে বললেন, 'উম্মে সুলাইম! এ কী করছ?' মা বললেন, 'আপনার এ ঘাম আমাদের জন্য সুগন্ধি।' আনাস বলতেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘামের সুগন্ধি থেকে অধিকতর সুগন্ধিযুক্ত মিশকের অথবা আম্বরের ঘ্রাণ আমার জীবনে আর আমি গ্রহণ করিনি।⁴⁰⁴
উম্মু সুলাইম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খালা হতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবের মা সালমা বিনতে আমর-এর নসব আমির ইবনে গানাম-এ গিয়ে আনাসের মার বংশের সাথে মিলিত হয়েছে।⁴⁰⁵
তিনি কোনো দ্বীনী বিষয়ে জানার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করতে লজ্জা পেতেন না। হযরত আয়েশা রা. বলেন, আনসারদের মেয়েরা কত ভালো। দ্বীনী বিষয়ে প্রশ্ন করতে এবং দ্বীনকে জানার ব্যাপারে লজ্জা তাদেরকে বিরত রাখতে পারে না। ইমাম আহমাদ উম্মে সুলাইম থেকে করেন, তার প্রশংসা করেন এবং নিজের জামা দিয়ে তার কাফন দেন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বসে ছিলাম। এমন একজন এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আলী, জাফর ও আকীলের মা মারা গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা সবাই আমার মার কাছে চলো। আমরা উঠলাম এবং এমন নিঃশব্দে পথ চললাম যেন আমাদের প্রত্যেকের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। বাড়ির দরজায় পৌঁছার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গায়ের জামাটি খুলে পরিবারেরে লোকদের হাতে দিয়ে বলেন, তার গোসল দেওয়া শেষ হলে এটি তার কাফনের নীচে দিয়ে দেবে।
যখন লোকেরা দাফনের জন্য লাশ নিয়ে বের হলো তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার খাটিয়ায় কাঁধ দেন, একবার খাটিয়ার সামনে যান, আরেকবার পেছনে আসেন। এভাবে তিনি কবর পর্যন্ত পৌঁছেন। তারপর কবরে নেমে গড়াগড়ি দিয়ে আবার উপরে উঠে আসেন। তারপর বলেন, আল্লাহর নামের সাথে এবং আল্লাহর নামের ওপরে তোমরা তাকে কবরে নামাও। দাফন কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার মা ও প্রতিপালনকারিণী! আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন। আপনি ছিলেন আমার একজন চমৎকার মা ও চমৎকার প্রতিপালনকারিণী। জাবির বলেন, আমরা বললাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি এখানে এমন দু-টি কাজ করেছেন, আমরা কখনো আপনাকে এ ধরনের কাজ করতে দেখি না।' বললেন, 'সে দুটি কাজ কী?' বললাম, 'আপনার জামা খুলে দেওয়া এবং কবরে গড়াগড়ি দেওয়া।' বললেন, 'জামাটির ব্যাপার হলো, আমি চেয়েছি তাকে যেন কখনো জাহান্নামের আগুন স্পর্শ না করে। যদি আল্লাহ চান। আর কবরে আমার গড়াগড়ি দেওয়া—আমি চেয়েছি আল্লাহ যেন তার কবরটি প্রশস্ত করে দেন।³⁹³
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. নিশ্চিতভাবেই জান্নাতে যাবেন। ইমাম কুরতুবী বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা তার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যে, কবরে তার ওপর দলন-পেষণ চালানো হবে না। যেহেতু তিনি ফাতিমা বিনতে আসাদের কবরে শুয়েছেন, এজন্য তার বরকতে ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. কবরের পেষণ থেকে মুক্তি পেয়ে গিয়েছেন।'
হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বলেছেন, যখন আলী রা.-এর মা ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. মারা গেলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বাড়িতে গেলেন এবং তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'হে আমার মা, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন। আমার মায়ের পরে আপনি অভুক্ত থেকে আমার পেট ভরাতেন, আপনি না পরে আমাকে পরাতেন এবং ভালো কিছু নিজে না খেয়ে আমাকে খাওয়াতেন। আর এর দ্বারা আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালে সফলতা লাভের আশা করতেন।’³⁹⁴
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আব্বাস রা. ও আবু বকর সিদ্দিক রা. তার লাশ কবরে নামান।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত বড় মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন যে, কেউ তার প্রতি সামান্য দয়া ও অনুগ্রহ দেখালে তা কোনোদিন ভোলেননি। কথায় ও কর্মের দ্বারা সবসময় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাহলে ফাতিমা বিনতে আসাদ রা., যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে মায়ের ভূমিকা পালন করেছেন, আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য হিজরত করেছেন এবং সারাটি জীবন রাসূলের কল্যাণ-চিন্তা করেছেন, তাকে তিনি ভুলবেন কেমন করে? তার সাথে যেমন আচরণ করা দরকার তা তিনি করেছেন।
টিকাঃ
৩৭৮. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা, ২/১১৮।
৩৭৯. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫০৮২।
৩৮০. উয়ূনুল আসার, ১/৫১; সীরাতে হালাবিয়া, ১/১৮৯।
৩৮১. সীরাতে হালাবিয়া, ১/১৮৯।
৩৮২. নিসাউম মুবাশশিরাত বিল জান্নাহ, ৪১।
৩৮৩. আনসাবুল আশরাফ, ১/১১১।
৩৮৪. সূরা শু'আরা, ৪২:২১৪।
৩৮৫. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/২০৯।
৩৮৬. নিসাউম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ৪৩।
৩৮৭. আল ইসতিয়াব, ৪/৩৭০।
৩৮৮. উসুদুল গাবাহ, ৭১৬৮।
৩৮৯. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২২২; সিফাতুল সাফওয়া, ২/৫৪; আল ইসাবাহ, ৪/৩৮০।
৩৯০. সিফাতস সাফওয়া, ২/৫৪; উসুদুল গাবাহ, ৫/৫১৭।
৩৯১. আল ইসাবাহ, ৪/৩৭০; উসদুল গাবাহ, ভাষ্য নং ৭১৭২।
৩৯২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৪৯।
৩৯৩. কানযুল উম্মাল, ১৩/৬৩৬; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১১৮।
৩৯৪. মাজমাউয যাওয়াইদ, ১৫৩৯৯।
যাঁর মোহর ছিল ইসলাম
ইসলাম মানবজাতিকে বিস্ময়কর এক নারী উপহার দিয়েছেন, যাঁর জীবনকথা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য মানবিকবোধ বিকাশ ও উন্নতিতে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। এমন এক অবিস্মরণীয় চরিত্র হলেন হযরত উম্মে সুলাইম রা.। তার আসল নামের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। যথা: সাহলা, রুমাইলা, মুলাইকা, গুমাইসা ও রুমাইসা। তিনি বনু নাজ্জারের একজন প্রসিদ্ধ মহিলা আনসারী সাহাবী; প্রখ্যাত সাহাবী ও রাসূলুল্লাহর অতি স্নেহের খাদেম হযরত আনাস রা.-এর গর্বিত মা।
জাহিলী যুগে প্রথম জীবনে তিনি মালিক ইবনে নাযারকে বিয়ে করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরতের দশ বছর পূর্বেই তারই ঔরসে পুত্র আনাসের জন্ম হয়। আনসারদের মধ্যে যাঁরা প্রথম ভাগে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি তাদের অন্যতম। তার ইসলাম গ্রহণ করার কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার স্বামী মালিক তাকে ও তার সন্তানকে ফেলে দেশান্তরী হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় আসার আগেই উম্মে সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু তালহার সাথে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, আবু তালহা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উম্মে সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। জবাবে উম্মে সুলাইম বলেন, আবু তালহা, আপনি কি জানেন না, যে ইলাহ্ ইবাদত আপনি করেন তা মাটি দ্বারা তৈরি? তিনি বললেন, তা ঠিক। উম্মে সুলাইম আবার বললেন, একটি গাছের পূজা করতে আপনার লজ্জা হয় না? আপনি ইসলাম গ্রহণ করলে আপনার সাথে বিয়েতে আমার আপত্তি থাকবে না। আর সে ক্ষেত্রে আপনার ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো মোহরের দাবীও থাকবে না।
'বিষয়টি আমি ভেবে দেখবো'- একথা বলে আবু তালহা চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এসে পাঠ করলেন, 'আশহাদু আল-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ।'
অতঃপর উম্মে সুলাইম ছেলে আনাসকে ডেকে বললেন, আনাস, আবু তালহার বিয়ের ব্যবস্থা করো। আনাস রা. তার মাকে আবু তালহার সাথে বিয়ে দিলেন। ঘটনাটি বিভিন্ন সনদে বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।³⁹⁵
রাসূলের কাছে তার মর্যাদা
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন স্ত্রীদের ব্যতীত অন্য কোনো নারীর গৃহে ঢুকতেন না; কিন্তু উম্মে সুলায়মের নিকট যেতেন। লোকেরা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, এর ওপর আমার বড় মায়া হয়। আমার সাথে থেকে তার ভাই নিহত (শহীদ) হয়েছে।³⁹⁶
উম্মু সুলাইমের প্রথম স্বামীর পক্ষে আনাস এবং দ্বিতীয় স্বামী হযরত আবু তালহার পক্ষে দু-ছেলে আবু উমাইর ও আবদুল্লাহর জন্ম হয়। আবু উমাইর শৈশবে মারা যায়। অপর দু'জনের মাধ্যমে বংশ বিস্তার হয়।
আবু উমাইরের মৃত্যুতে উম্মে সুলাইম যে ধৈর্য অবলম্বন করেন তা মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয়। আবু উমাইর যখন মারা যায় তখন সে কেবল হাঁটতে শিখেছে। ছোট ছোট পা ফেলে যখন সে হাঁটে বাবা-মা অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকেন। এমন সময় আল্লাহপাক তাকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেন। ছেলেটি আবু তালহা খুব আদরের ছিল। হাদীসে এসেছে,
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু তালহার ঔরসজাত উম্মে সুলাইমের একটি ছেলে মৃত্যুবরণ করল। তখন উম্মে সুলাইম রা. তার পরিবার-পরিজনের ব্যক্তিদের বলল, আবু তালহাকে তার পুত্রের সংবাদ দিয়ো না, যতক্ষণ আমি না বলি। আবু তালহা রা. আসলেন। উম্মে সুলাইম রা. রাতের খানা সম্মুখে নিয়ে এলে তিনি খাবার খেলেন। এরপর উম্মে সুলাইম আগের চাইতে ভালো মতো সাজগোজ করলেন। আবু তালহা রা. তার সঙ্গে মিলিত হলেন। যখন উম্মে সুলাইম রা. দেখলেন যে, তিনি মিলনে পরিতৃপ্ত। তখন তাকে বললেন, 'হে আবু তালহা, কেউ যদি কারও কোনো জিনিস রাখতে দেয়, তারপর তা নিয়ে নেয় তবে কি সে তা ফেরাতে পারে?' আবু তালহা রা. বললেন, 'না।' উম্মে সুলাইম রা. বললেন, 'তাহলে তোমার ছেলের ব্যাপারে মনে কর (আল্লাহ তাকে নিয়ে নিয়েছেন)।' আবু তালহা রা. রেগে গিয়ে বললেন, 'তুমি আমাকে আগে বলনি, এখন আমি অপবিত্র, এখন ছেলের সংবাদটা দিলে!' অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে ছেলের যা ঘটেছে সব জানালেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমাদের গত রাতটিতে আল্লাহ তাআলা বরকত দিন।' উম্মে সুলাইম গর্ভবতী হলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সফরে ছিলেন, উম্মে সুলাইমও এ সফরে তার সঙ্গে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো সফর হতে প্রত্যাবর্তন করতেন, তখন রাতের বেলা মাদীনায় ঢুকতেন না। যখন লোকেরা মাদীনার কাছাকাছি পৌঁছল, তখন উম্মে সুলাইমের প্রসব-বেদনা আরম্ভ হলো। আবু তালহা রা. তার নিকট থেকে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেলা নিয়ে চলে গেলেন। আবু তালহা রা. এবং উম্মে সুলাইম রা. থেকে গেলেন।
তখন আবু তালহা রা. বললেন, 'হে প্রতিপালক, তুমি তো জান যে, যখন তিনি বের হন আমার ভালো লাগে তোমার রাসূলের সঙ্গে বের হতে এবং যখন তিনি প্রবেশ করেন তার সাথে প্রবেশ করতে; কিন্তু তুমি জানো, কেন আমি থেমে গেছি।'
উম্মে সুলাইম রা. বললেন, 'হে আবু তালহা, আগের মতো যাতনা আমার নেই। চলুন আমরা চলে যাই।' স্বামী-স্ত্রী মাদীনায় পৌঁছলে উম্মে সুলাইমের ব্যথা আবার আরম্ভ হলো। আর তিনি একটি শিশু ছেলে প্রসব করলেন। আমার মা বললেন, 'হে আনাস, শিশুটিকে যেন কেউ দুধ না খাওয়ায়, যতক্ষণ তুমি তাকে ভোরবেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিয়ে না যাও।'
সকাল হলে আমি সন্তানটিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গেলাম। আমি লক্ষ করলাম, তার হাতে উট দাগানোর যন্ত্র। আমাকে যখন তিনি দেখলেন, বললেন, 'হয়তো উম্মে সুলাইম এ পুত্রটি প্রসব করেছে।' আমি বললাম, 'হ্যাঁ'। তিনি সে যন্ত্রটি হাত থেকে রেখে দিলেন। আমি শিশুটিকে নিয়ে তার কোলে রাখলাম। তিনি মাদীনার আজওয়া খেজুর আনালেন এবং নিজের মুখে দিয়ে চিবুলেন। যখন খেজুর গলে গেল, তখন শিশুটির মুখে দিলেন। শিশুটি তা চুষতে লাগল। আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দেখ, আনসারদের খেজুর-প্রীতি।' অবশেষে তিনি শিশুর মুখে হাত বুলিয়ে তার নাম 'আবদুল্লাহ' রাখলেন।³⁹⁷
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আসার পরপরই উম্মে সুলাইম ছোট্ট ছেলে আনাসের হাত ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিয়ে গিয়ে বলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, এই থাকল আনাস। সে আপনার খিদমত করবে।' আনাস তখন দশ বছরের বালক মাত্র। তখন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাত পর্যন্ত আনাস তার খিদমত করেন। এ কারণে তিনি 'খাদেমুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম' খ্যাতি অর্জন করেন।³⁹⁸
অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি আরও আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি তার জন্য একটু দুআ করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআও করেন।³⁹⁹
জিহাদের ময়দানে অনন্য কীর্তি
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যে ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন, একটি বর্ণনামতে সে বৈঠকটি হয়েছিল উম্মে সুলাইমের বাড়িতে। হযরত উম্মে সুলাইম অত্যন্ত আগ্রহের সাথে বড় বড় যুদ্ধে কিছু আনসারী মহিলাকে সাথে নিয়ে যেতেন। তারা সৈনিকদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের সেবা করতেন।⁴⁰⁰
উহুদযুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয় হয় তখনো তিনি অতি সাহসিকতার সাথে নিজ দায়িত্ব পালন করেন। আনাস রা. বলেন, আমি আয়েশা ও উম্মে সুলাইমকে মশক ভরে পানি এনে আহতদের পান করাতে দেখেছি। মশক খালি হয়ে গেলে তারা আবার ভরে এনে পান করিয়েছেন।⁴⁰¹
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর রা. থেকে বর্ণিত, হুনাইনযুদ্ধে উম্মে সুলাইম খঞ্জর হাতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। এক সময় যুদ্ধের মধ্যে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নযরে পড়লেন। তিনি তখন কোমরে চাদর পেঁচিয়ে স্বামী আবু তালহার পাশে দাঁড়িয়ে। আবদুল্লাহ ইবনে আবি তালহা তখন তার পেটে। তার সাথে আবু তালহার উট। উটটি বশে আনার জন্য তারা মাথার কেশ ও লাগামের মধ্যে হাত দিয়ে রেখেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডাকলেন, উম্মে সুলাইম? তিনি সাড়া দিলেন, 'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক! আপনার বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করছে, আপনি যেভাবে তাদের হত্যা করছেন, আমিও ঠিক সেভাবে যারা আপনাকে ছেড়ে রণক্ষেত্র থেকে পালাবে তাদের হত্যা করব। কারণ, তারা হত্যারই উপযুক্ত।' তার কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'উম্মে সুলাইম, আল্লাহ কি এ ব্যাপারে যথেষ্ট নন?' উম্মে সুলাইমের হাতে তখন একটি খঞ্জর। সেদিকে ইঙ্গিত করে আবু তালহা বললেন, 'উম্মে সুলাইম তোমার হাতে এ খঞ্জর কেন?' বললেন, 'কোনো মুশরিক (পৌত্তলিক) আমার নাগালের মধ্যে এলে এ খঞ্জর দিয়ে আমি তার পেট ফেঁড়ে ফেলব।' এ কথা শুনে আবু তালহা বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, উম্মে সুলাইম যা বলছে তা কি শুনেছেন!' এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হেসে দেন।
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, আমি খুব ক্ষুধার্ত। তখন তিনি তার সহধর্মিণীদের নিকট পাঠালেন; কিন্তু তিনি তাদের কাছে কিছুই পেলেন না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এমন কেউ আছে কি, যে আজ রাতে এ লোকটিকে মেহমানদারী করতে পারে? আল্লাহ তার প্রতি রহমত করবেন। তখন আনসারদের এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আছি, হে আল্লাহর রাসূল, এরপর তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং নিজ স্ত্রীকে বললেন, ইনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহমান। কোনো জিনিস জমা করে রাখবে না। মহিলা বলল, আল্লাহর কসম! আমার কাছে ছেলে-মেয়েদের খাবার ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি বললেন, ছেলেমেয়েরা রাতের খাবার চাইলে তুমি তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ো, (খাবার নিয়ে) আমার কাছে এসো, অতঃপর বাতিটি নিভিয়ে দিয়ো। আজ রাতে আমরা ভুখা থাকব। সুতরাং মহিলা তা-ই করল। পরদিন সকালে আনসারী সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে আসলেন। তিনি বললেন, অমুক ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন অথবা অমুক অমুকের কাজে আল্লাহ হেসেছেন। এরপর আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন—'এবং তারা তাদের নিজেদের ওপর অন্যদের প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও।' সেই আনসারী সাহাবী ছিলেন হযরত আবু তালহা রা. এবং সেই মহীয়সী নারী ছিলেন হযরত উম্মে সুলাইম রা.।
তাঁর মায়ের একটি ছাগী ছিল। তিনি তার দুধ থেকে ঘি তৈরি করে একটি চামড়ার পাত্রে ভরেন। একদিন পাত্রটি রাবীবার হাতে দিয়ে বলেন, 'এটা রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিয়ে এসো, তিনি তরকারি হিসেবে খাবেন।' রাবীবা সেটি হাতে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, এক উক্কা বা পাত্র ঘি উম্মে সুলাইম পাঠিয়েছেন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের বললেন, 'তোমরা ঘি ঢেলে রেখে পাত্রটি তাকে ফেরত দাও।' খালি পাত্রটি তাকে ফেরত দেওয়া হলো। তিনি পাত্রটি একটি খুঁটির সাথে ঝুলিয়ে রাখলেন।
উম্মে সুলাইম বাড়ি এসে দেখেন, পাত্রটি হতে ঘি উপচে পড়ছে। রাবীবা তখন বললেন, 'আমি তো আপনার কথা পালন করেছি। যদি বিশ্বাস না হয় আমার সাথে চলুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করুন।' উম্মে সুলাইম রাবীবাকে সাথে করে রাসূলের নিকট গিয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি তার মাধ্যমে এক পাত্র ঘি পাঠিয়েছিলাম।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, সে তা দিয়েছে।' উম্মে সুলাইম তখন বললেন, 'যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন, সে সত্তার শপথ! পাত্রটি তো এখনো ঘি-ভরা এবং তা উপচে পড়ছে।' একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'উম্মে সুলাইম, আল্লাহ তোমাকে খাওয়ান যেভাবে তুমি তার নবীকে খাইয়েছ, এতে কি তুমি বিস্মিত হচ্ছ? নিজে খাও এবং অপরকে খাওয়াও।' উম্মে সুলাইম বলেন, 'আমি বাড়ি ফিরে এসে তা কয়েকটি গ্লাসে ভাগ করে রাখলাম এবং এক অথবা দুমাস যাবত আমরা তা খেয়েছি।⁴⁰²
ইমাম মুসলিম আর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আনাস বলেন, একদিন আবু তালহা আমার মা উম্মে সুলাইমকে বললেন, 'আজ আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কণ্ঠস্বর একটু দুর্বল শুনতে পেলাম। মনে হলো তিনি ক্ষুধার্ত। তোমার কাছে কোনো খাবার আছে কি?' মা বললেন, 'আছে।' তিনি কয়েক টুকরো রুটি আমার কাপড়ে জড়িয়ে দিয়ে আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পাঠালেন। আমাকে দেখেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজেজ্ঞস করলেন, 'আবু তালহা পাঠিয়েছে?' আমি বললাম, 'হাঁ।' তিনি বললেন, 'খাবার?' বললাম, 'হ্যাঁ।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথের লোকদের বললেন, 'তোমরা ওঠো।' তারা উঠলেন এবং আমি তাদের আগে আগে চললাম। আবু তালহা সকলকে দেখে স্ত্রীকে ডেকে বললেন, 'উম্মে সুলাইম, দেখ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকজন সঙ্গে করে চলে এসেছেন। সবাইকে খেতে দেওয়ার মতো খাবার তো নেই।' উম্মে সুলাইম বললেন, 'আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে কথা ভালোই জানেন।'
আবু তালহা অতিথিদের নিয়ে বসালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে ঢুকে বললেন, 'যা আছে নিয়ে আস।' সামান্য খাবার ছিল তাই হাজির করা হলো। তিনি বললেন, 'প্রথমে দশজনকে আসতে বলো।' দশজন ঢুকে পেট ভরে খেয়ে বের হয়ে গেল। তারপর আর দশজন। এভাবে মোট সত্তর অথবা আশিজন পেট ভরে সেই খাবার খেয়েছিল।⁴⁰³
উম্মে সুলাইম রা. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সীমাহীন ভালোবাসতেন। নবী কারীমও সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই উম্মে সুলাইমের গৃহে যেতেন এবং দুপুরে সেখানে বিশ্রাম নিতেন। এ সুযোগে উম্মে সুলাইম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘাম ও ঝরে পড়া লোম সংগ্রহ করতেন।
আনাস রা. বলেন, একদিন দুপুরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বাড়িতে এসে বিশ্রাম নিলেন এবং ঘেমে গেলেন। আমার মা একটি বোতল এনে সেই ঘাম ভরতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জেগে উঠে বললেন, 'উম্মে সুলাইম! এ কী করছ?' মা বললেন, 'আপনার এ ঘাম আমাদের জন্য সুগন্ধি।' আনাস বলতেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘামের সুগন্ধি থেকে অধিকতর সুগন্ধিযুক্ত মিশকের অথবা আম্বরের ঘ্রাণ আমার জীবনে আর আমি গ্রহণ করিনি।⁴⁰⁴
উম্মু সুলাইেন সিরিয়া সফরের সময় কিশোর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেন্দ্র করে যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল তার বর্ণনা। তাছাড়া তিনি আরও শোনেন, হযরত খাদীজার দাস মাইসারার বর্ণনা যা তিনি যুবক মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে সিরিয়া, ভ্রমণের সময় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি নিজে মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধ্যে যা কিছু দেখেছিলেন এবং অন্যদের মুখে তার সম্পর্কে যেসব কথা শুনেছিলেন তাতে এত প্রভাবিত ও মুগ্ধ হন যে, কলিজার টুকরো আলীকে তার তত্ত্বাবধানে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা-সংকোচ করেননি।³⁸²
তিনি অতি নিকট থেকে মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধ্যে স্নেহময় পিতার রূপ দেখেছিলেন। তিনি লক্ষ করেছিলেন, আলীর জন্মের পর থেকে তার প্রতি মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যাধিক আগ্রহ ও উৎসাহকে। বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলতেন, আলীর জন্মের পর মুহাম্মাদ তার নিজের মুখ থেকে একটু থুথু নিয়ে তার মুখে দেয়। তারপর সে জিহ্বা চাটতে চাটতে ঘুমিয়ে যায়। পরদিন সকালে আমরা আলীর জন্য ধাত্রী ডেকে পাঠালাম; কিন্তু কারও স্তনই গ্রহণ করল না। আমি মুহাম্মাদকে ডাকলাম। সে তার জিহ্বায় একটু দুধ দিল। আর আলী তা চাটতে চাটতে ঘুমিয়ে গেল। আল্লাহ যতদিন ইচ্ছা করলেন এভাবে চলতে লাগল। এ সবকিছু দেখে-শুনে মুহাম্মদের প্রতি ফাতিমা বিনতে আসাদের স্নেহ-মমতা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা দিন দিন বেড়ে যেতে থাকে। তিনি ছেলে আলীকে মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সার্বাক্ষণিক সহচর হওয়ার তাকিদ দেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম দিকে যখন কাবার চত্বরে নামায আদায় করতেন তখন কুরাইশরা তেমন গুরুত্ব দিত না। পরে যখন নিয়মিত পড়তে লাগলেন, তখন আলী ও যায়িদ তাকে পাহারা দিতেন। পরে এমন হলো যে, তারা দু-জন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হলে সর্বক্ষণ তার সঙ্গে থাকতেন। একদিন আলী রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন, তখন আবু তালিব তাকে ডেকে পেলেন না। আলীর মা ফাতিমা বললেন, আমি তাকে মুহাম্মাদের সাথে যেতে দেখেছি। আবু তালিব তাদেরকে তালাশ করতে করতে শিআবে আবি দাব-এ গিয়ে পেলেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযে দাঁড়িয়ে, আর আলী রা. তাকে পাহারা দিচ্ছেন।³⁸³
সৌভাগ্যের পরশমনি
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত লাভ করলেন। নিজ গোত্র ও আত্মীয়-বন্ধুদের ইসলামের দিকে আহবান জানানোর নির্দেশ লাভ করলেন। আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন, 'তুমি তোমার নিকট-আত্মীয়দের সতর্ক করো।³⁸⁴ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রভুর নির্দেশ পালন করলেন। নিকট-আত্মীয়দের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের দিকে আহবান জানালেন। তাদেরকে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনার তাগিদ দিলেন। ইসলামের সেই একেবারে সূচনা পর্বে যে ক'জন মুষ্টিমেয় মহিলা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনে মুসলমান হন তাদের মধ্যে ফাতিমা বিনতে আসাদ অন্যতম। সেদিন তার স্বামী আবু তালিব ভাতিজা মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবেদনে সাড়া দিতে অপারগ হলেও তাদের কিশোর ছেলে আলী রা. আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনেন।³⁸⁵
দুঃখের পরে সুখের দিন
এখান থেকেই এই মহীয়সী সাহাবীয়া ফাতিমা বিনতে আসাদের রা. জীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলো। কুরাইশরা মুহাম্মাদ ও তার দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে লেগে গেল। তারা বনু হাশিমের সাথে বিবাদে লিপ্ত হলো। যখন তারা দেখল, আবু তালিব ও তার স্ত্রী মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমর্থন ও আশ্রয় দিচ্ছেন তখন তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের হাতে সমর্পণের দাবি জানাল; কিন্তু চাচা-চাচী ভাতিজা মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পক্ষে অটল থাকলেন। কোনো চাপের কাছেই নত হলেন না। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের হতে অর্পণের আবদার শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন। ফলে যারা ঈমান এনে মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুসারী হয়েছিল তাদের প্রতি তারা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দেখলেন কুরাইশরা তার অনুসারীদের ওপর অত্যাচার-উৎপীড়নের ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে তখন তিনি তাদেরকে আবিসিনিয়ায় হিজরতের অনুমতি দান করেন। কুরাইশদের অত্যাচার থেকে বাচার জন্য মুসলমানদের যে দলটি প্রথম আবিসিনিয়া হিজরত করেন তার মধ্যে ফাতিমা বিনতে আসাদের কলিজার টুকরা জাফর ইবনে আবি তালিব রা. ও তার স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইসও রা. ছিলেন। যাত্রাকালে মা ফাতিমা রা.-এর এই ছেলেটি ছিল চেহারা-সুরুতে ও আদবে-আখলাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুরূপ। কুরাইশদের যে পাঁচ ব্যক্তিকে লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুরূপ বলে মনে করত, তারা হলেন: জাফর ইবনে আবি তালিব, কুসাম ইবনে আল-আব্বাস, আস-সায়িব ইবনে উবায়দ ইবনে আবদি ইয়াযীদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আবু সুফিয়ান ইবনে আল-হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব ও আল-হাসান ইবনে আলী ইবনে আবি তালিব রা.।
কুরাইশরা যখন দেখল, বিষয়টি আস্তে আস্তে তাদের ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, তারা বনু হাশিম ও বনু আবদিল মুত্তালিবের নারী-পুরুষ ও শিশু-যুবক-বৃদ্ধ সকলকে শিআবে আবি তালিব উপত্যকায় অবরুদ্ধ অবস্থায় রাখার সিদ্ধান্ত নিল। ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অন্য নারীদের সাথে এ অবরোধ মেনে নেন। অন্যদের সাথে তিনিও এ অবরুদ্ধ জীবনের তিনটি বছর সীমাহীন ক্ষুধা ও অনাহারের মুখোমুখি হন এবং গাছের পাতা খেয়ে কোনো রকম জীবন রক্ষা করেন। অবশেষে তিন বছর পর নবুয়তের দশম বছরে তারা অবরোধ তুলে নেয়। অন্য মুসলমানদের সাথে ফাতিমাও রা. মুক্ত জীবনে ফিরে আসেন। এ তিনটি বছর মহিলারা চরম ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দান করেন।
শিআবে আবি তালব থেকে মুক্ত হওয়ার পর নবুয়তের দশম বছরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতি আপন দুব্যক্তি মাত্র অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে ইন্তেকাল করেন। প্রথমে তার প্রিয়তমা স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা. ও পরে চাচা আবু তালিব এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। এতদিন এ দুজনই ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে ঢালস্বরূপ। এখন এ দুজনের অবর্তমানে অত্যাচারী কুরাইশরা আরও তীব্রভাবে রাসূল ও তার অনুসারীদের ওপর যুলুম-নির্যাতন করতে শুরু করে। অবশেষে আল্লাহ তাআলা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলমানদের মদীনায় হিজরতের অনুমতি দান করেন।³⁸⁶
মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সঙ্গী-সাথীরা মদীনায় হিজরত করলেন। ফাতিমা বিনতে আসাদ রা.ও অন্যদের সাথে মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় চলে গেলেন। যুবাইর ইবনে বকর তার ইসলাম ও হিজরত সম্পর্কে বলেন, 'তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে হিজরত করেন।³⁸⁷ অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী ইমাম আশ-শা'বী রহ. তার ইসলাম ও হিজরত সম্পর্কে বলেন, 'আলী ইবনে আবি তালিবের রা. মা ফাতিমা বিনতে আসাদ ইবনে হাশিম ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় হিজরত করেন। '³⁸⁸
রাসূলের কাছে তার মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ফাতিমা বিনতে আসাদের রা. মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে ইবনে সাআদ বলেন, 'ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি একজন সৎকর্মশীল মহিলা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখতে যেতেন এবং তার গৃহে দুপুরে বিশ্রাম নিতেন।³⁸⁹
তার সত্যনিষ্ঠা ও ধর্মপরায়ণতার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে অতিমাত্রায় ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। তাকে লালন-পালন, আদব-আখলাক শিক্ষাদান ও তার সাথে সুন্দর ব্যবহারের প্রতিদানে রাসূলও সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে সবসময় সদ্ব্যবহার করতেন। তার ছেলে আলীর রা. সাথে রাসূলুল্লাহর কন্যা ফাতিমার রা. বিয়ে হলো। তখন তিনি একজন মমতাময়ী মা ও একজন আদর্শ শ্বাশুড়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাদের জীবন তো আর এমন বিত্ত-বৈভবের জীবন ছিল না। সব কাজ নিজেদেরই করতে হতো। নবী দুহিতা ফাতিমা রা.-কে ঘরে আনার পর আলী রা. মাকে বললেন, আমি পানি আনা, প্রয়োজনে এদিক-ওদিক যাওয়ার ব্যাপারে ফাতিমা বিনতে রাসূলুল্লাহকে সাহায্য করব, আর আপনি তাকে ঘরের কাজে, গম পেষা ও আটা চটকানোর কাজে সাহায্য করবেন।³⁹⁰
ফাতিমা বিনতে আসাদ রা.-এর প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা থাকার কারণে তিনি মাঝে মাঝে তাকে বিভিন্ন জিনিস উপহার-উপঢৌকন পাঠাতেন। জাদা ইবনে হুবায়রা আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট এক জোড়া অতি উন্নতমানের নতুন কাপড় পাঠালেন। সাথে সাথে এ কথাও বলে পাঠালেন যে, ‘এ দু-টোকে নিকাবের কাপড় বানিয়ে ফাতিমাদের মধ্যে ভাগ করে দাও।' আমি চার টুকরো করলাম। এক টুকরো দিলাম ফাতিমা বিনতে রাসূলুল্লাহকে, এক টুকরো ফাতিমা বিনতে আসাদকে এবং আর এক টুকরো ফাতিমা বিনতে হামযা রা.-কে। তবে তিনি চতুর্থ টুকরোটি যে কাকে দেন তা বলেননি।³⁹¹
সাহাবাদের অন্তরে তার মর্যাদা
সাহাবায়ে কেরামের অন্তরেও ফাতিমা বিনতে আসাদ রা.-এর একটা মর্যাদাপূর্ণ আসন ছিল। জাফর ইবনে আবি তালিব রা. মুতায় শহীদ হওয়ার পর কবি হাসসান ইবনে সাবিত রা. তার স্মরণে যে কবিতাটি রচনা করেন তাতে তার মা ফাতিমারও ভূয়সী প্রশংসা করেন। তেমনিভাবে কবি হাজ্জাজ ইবনে আলাত সুলামীও উহুদ যুদ্ধে হযরত আলীর রা. বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রশংসা করতে গিয়ে তার মায়েরও প্রশংসা করেন।³⁹²
হযরত ফাতিমা বিনতে আসাদ রা.-এর মৃত্যু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবীদের মনে দারুণ বেদনার ছাপ ফেলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করেন, তার প্রশংসা করেন এবং নিজের জামা দিয়ে তার কাফন দেন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বসে ছিলাম। এমন একজন এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আলী, জাফর ও আকীলের মা মারা গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা সবাই আমার মার কাছে চলো। আমরা উঠলাম এবং এমন নিঃশব্দে পথ চললাম যেন আমাদের প্রত্যেকের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। বাড়ির দরজায় পৌঁছার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গায়ের জামাটি খুলে পরিবারেরে লোকদের হাতে দিয়ে বলেন, তার গোসল দেওয়া শেষ হলে এটি তার কাফনের নীচে দিয়ে দেবে।
যখন লোকেরা দাফনের জন্য লাশ নিয়ে বের হলো তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার খাটিয়ায় কাঁধ দেন, একবার খাটিয়ার সামনে যান, আরেকবার পেছনে আসেন। এভাবে তিনি কবর পর্যন্ত পৌঁছেন। তারপর কবরে নেমে গড়াগড়ি দিয়ে আবার উপরে উঠে আসেন। তারপর বলেন, আল্লাহর নামের সাথে এবং আল্লাহর নামের ওপরে তোমরা তাকে কবরে নামাও। দাফন কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার মা ও প্রতিপালনকারিণী! আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন। আপনি ছিলেন আমার একজন চমৎকার মা ও চমৎকার প্রতিপালনকারিণী। জাবির বলেন, আমরা বললাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি এখানে এমন দু-টি কাজ করেছেন, আমরা কখনো আপনাকে এ ধরনের কাজ করতে দেখি না।' বললেন, 'সে দুটি কাজ কী?' বললাম, 'আপনার জামা খুলে দেওয়া এবং কবরে গড়াগড়ি দেওয়া।' বললেন, 'জামাটির ব্যাপার হলো, আমি চেয়েছি তাকে যেন কখনো জাহান্নামের আগুন স্পর্শ না করে। যদি আল্লাহ চান। আর কবরে আমার গড়াগড়ি দেওয়া—আমি চেয়েছি আল্লাহ যেন তার কবরটি প্রশস্ত করে দেন।³⁹³
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. নিশ্চিতভাবেই জান্নাতে যাবেন। ইমাম কুরতুবী বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা তার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যে, কবরে তার ওপর দলন-পেষণ চালানো হবে না। যেহেতু তিনি ফাতিমা বিনতে আসাদের কবরে শুয়েছেন, এজন্য তার বরকতে ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. কবরের পেষণ থেকে মুক্তি পেয়ে গিয়েছেন।'
হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বলেছেন, যখন আলী রা.-এর মা ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. মারা গেলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বাড়িতে গেলেন এবং তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'হে আমার মা, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন। আমার মায়ের পরে আপনি অভুক্ত থেকে আমার পেট ভরাতেন, আপনি না পরে আমাকে পরাতেন এবং ভালো কিছু নিজে না খেয়ে আমাকে খাওয়াতেন। আর এর দ্বারা আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালে সফলতা লাভের আশা করতেন। ’³⁹⁴
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আব্বাস রা. ও আবু বকর সিদ্দিক রা. তার লাশ কবরে নামান।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত বড় মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন যে, কেউ তার প্রতি সামান্য দয়া ও অনুগ্রহ দেখালে তা কোনোদিন ভোলেননি। কথায় ও কর্মের দ্বারা সবসময় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাহলে ফাতিমা বিনতে আসাদ রা., যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে মায়ের ভূমিকা পালন করেছেন, আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য হিজরত করেছেন এবং সারাটি জীবন রাসূলের কল্যাণ-চিন্তা করেছেন, তাকে তিনি ভুলবেন কেমন করে? তার সাথে যেমন আচরণ করা দরকার তা তিনি করেছেন।
টিকাঃ
৩৭৮. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা, ২/১১৮।
৩৭৯. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫০৮২।
৩৮০. উয়ূনুল আসার, ১/৫১; সীরাতে হালাবিয়া, ১/১৮৯।
৩৮১. সীরাতে হালাবিয়া, ১/১৮৯।
৩৮২. নিসাউম মুবাশশিরাত বিল জান্নাহ, ৪১।
৩৮৩. আনসাবুল আশরাফ, ১/১১১।
৩৮৪. সূরা শু'আরা, ৪২:২১৪।
৩৮৫. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/২০৯।
৩৮৬. নিসাউম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ৪৩।
৩৮৭. আল ইসতিয়াব, ৪/৩৭০।
৩৮৮. উসুদুল গাবাহ, ৭১৬৮।
৩৮৯. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২২২; সিফাতুল সাফওয়া, ২/৫৪; আল ইসাবাহ, ৪/৩৮০।
৩৯০. সিফাতস সাফওয়া, ২/৫৪; উসুদুল গাবাহ, ৫/৫১৭।
৩৯১. আল ইসাবাহ, ৪/৩৭০; উসদুল গাবাহ, ভাষ্য নং ৭১৭২।
৩৯২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৪৯।
৩৯৩. কানযুল উম্মাল, ১৩/৬৩৬; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১১৮।
৩৯৪. মাজমাউয যাওয়াইদ, ১৫৩৯৯।
যাঁর মোহর ছিল ইসলাম
ইসলাম মানবজাতিকে বিস্ময়কর এক নারী উপহার দিয়েছেন, যাঁর জীবনকথা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য মানবিকবোধ বিকাশ ও উন্নতিতে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। এমন এক অবিস্মরণীয় চরিত্র হলেন হযরত উম্মে সুলাইম রা.। তার আসল নামের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। যথা: সাহলা, রুমাইলা, মুলাইকা, গুমাইসা ও রুমাইসা। তিনি বনু নাজ্জারের একজন প্রসিদ্ধ মহিলা আনসারী সাহাবী; প্রখ্যাত সাহাবী ও রাসূলুল্লাহর অতি স্নেহের খাদেম হযরত আনাস রা.-এর গর্বিত মা।
জাহিলী যুগে প্রথম জীবনে তিনি মালিক ইবনে নাযারকে বিয়ে করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরতের দশ বছর পূর্বেই তারই ঔরসে পুত্র আনাসের জন্ম হয়। আনসারদের মধ্যে যাঁরা প্রথম ভাগে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি তাদের অন্যতম। তার ইসলাম গ্রহণ করার কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার স্বামী মালিক তাকে ও তার সন্তানকে ফেলে দেশান্তরী হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় আসার আগেই উম্মে সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু তালহার সাথে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, আবু তালহা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উম্মে সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। জবাবে উম্মে সুলাইম বলেন, আবু তালহা, আপনি কি জানেন না, যে ইলাহ্ ইবাদত আপনি করেন তা মাটি দ্বারা তৈরি? তিনি বললেন, তা ঠিক। উম্মে সুলাইম আবার বললেন, একটি গাছের পূজা করতে আপনার লজ্জা হয় না? আপনি ইসলাম গ্রহণ করলে আপনার সাথে বিয়েতে আমার আপত্তি থাকবে না। আর সে ক্ষেত্রে আপনার ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো মোহরের দাবীও থাকবে না।
'বিষয়টি আমি ভেবে দেখবো'- একথা বলে আবু তালহা চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এসে পাঠ করলেন, 'আশহাদু আল-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ।'
অতঃপর উম্মে সুলাইম ছেলে আনাসকে ডেকে বললেন, আনাস, আবু তালহার বিয়ের ব্যবস্থা করো। আনাস রা. তার মাকে আবু তালহার সাথে বিয়ে দিলেন। ঘটনাটি বিভিন্ন সনদে বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।³⁹⁵
রাসূলের কাছে তার মর্যাদা
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন স্ত্রীদের ব্যতীত অন্য কোনো নারীর গৃহে ঢুকতেন না; কিন্তু উম্মে সুলায়মের নিকট যেতেন। লোকেরা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, এর ওপর আমার বড় মায়া হয়। আমার সাথে থেকে তার ভাই নিহত (শহীদ) হয়েছে।³⁹⁶
উম্মু সুলাইমের প্রথম স্বামীর পক্ষে আনাস এবং দ্বিতীয় স্বামী হযরত আবু তালহার পক্ষে দু-ছেলে আবু উমাইর ও আবদুল্লাহর জন্ম হয়। আবু উমাইর শৈশবে মারা যায়। অপর দু'জনের মাধ্যমে বংশ বিস্তার হয়।
আবু উমাইরের মৃত্যুতে উম্মে সুলাইম যে ধৈর্য অবলম্বন করেন তা মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয়। আবু উমাইর যখন মারা যায় তখন সে কেবল হাঁটতে শিখেছে। ছোট ছোট পা ফেলে যখন সে হাঁটে বাবা-মা অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকেন। এমন সময় আল্লাহপাক তাকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেন। ছেলেটি আবু তালহা খুব আদরের ছিল। হাদীসে এসেছে,
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু তালহার ঔরসজাত উম্মে সুলাইমের একটি ছেলে মৃত্যুবরণ করল। তখন উম্মে সুলাইম রা. তার পরিবার-পরিজনের ব্যক্তিদের বলল, আবু তালহাকে তার পুত্রের সংবাদ দিয়ো না, যতক্ষণ আমি না বলি। আবু তালহা রা. আসলেন। উম্মে সুলাইম রা. রাতের খানা সম্মুখে নিয়ে এলে তিনি খাবার খেলেন। এরপর উম্মে সুলাইম আগের চাইতে ভালো মতো সাজগোজ করলেন। আবু তালহা রা. তার সঙ্গে মিলিত হলেন। যখন উম্মে সুলাইম রা. দেখলেন যে, তিনি মিলনে পরিতৃপ্ত। তখন তাকে বললেন, 'হে আবু তালহা, কেউ যদি কারও কোনো জিনিস রাখতে দেয়, তারপর তা নিয়ে নেয় তবে কি সে তা ফেরাতে পারে?' আবু তালহা রা. বললেন, 'না।' উম্মে সুলাইম রা. বললেন, 'তাহলে তোমার ছেলের ব্যাপারে মনে কর (আল্লাহ তাকে নিয়ে নিয়েছেন)।' আবু তালহা রা. রেগে গিয়ে বললেন, 'তুমি আমাকে আগে বলনি, এখন আমি অপবিত্র, এখন ছেলের সংবাদটা দিলে!' অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে ছেলের যা ঘটেছে সব জানালেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমাদের গত রাতটিতে আল্লাহ তাআলা বরকত দিন।' উম্মে সুলাইম গর্ভবতী হলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সফরে ছিলেন, উম্মে সুলাইমও এ সফরে তার সঙ্গে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো সফর হতে প্রত্যাবর্তন করতেন, তখন রাতের বেলা মাদীনায় ঢুকতেন না। যখন লোকেরা মাদীনার কাছাকাছি পৌঁছল, তখন উম্মে সুলাইমের প্রসব-বেদনা আরম্ভ হলো। আবু তালহা রা. তার নিকট থেকে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেলা নিয়ে চলে গেলেন। আবু তালহা রা. এবং উম্মে সুলাইম রা. থেকে গেলেন।
তখন আবু তালহা রা. বললেন, 'হে প্রতিপালক, তুমি তো জান যে, যখন তিনি বের হন আমার ভালো লাগে তোমার রাসূলের সঙ্গে বের হতে এবং যখন তিনি প্রবেশ করেন তার সাথে প্রবেশ করতে; কিন্তু তুমি জানো, কেন আমি থেমে গেছি।'
উম্মে সুলাইম রা. বললেন, 'হে আবু তালহা, আগের মতো যাতনা আমার নেই। চলুন আমরা চলে যাই।' স্বামী-স্ত্রী মাদীনায় পৌঁছলে উম্মে সুলাইমের ব্যথা আবার আরম্ভ হলো। আর তিনি একটি শিশু ছেলে প্রসব করলেন। আমার মা বললেন, 'হে আনাস, শিশুটিকে যেন কেউ দুধ না খাওয়ায়, যতক্ষণ তুমি তাকে ভোরবেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিয়ে না যাও।'
সকাল হলে আমি সন্তানটিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গেলাম। আমি লক্ষ করলাম, তার হাতে উট দাগানোর যন্ত্র। আমাকে যখন তিনি দেখলেন, বললেন, 'হয়তো উম্মে সুলাইম এ পুত্রটি প্রসব করেছে।' আমি বললাম, 'হ্যাঁ'। তিনি সে যন্ত্রটি হাত থেকে রেখে দিলেন। আমি শিশুটিকে নিয়ে তার কোলে রাখলাম। তিনি মাদীনার আজওয়া খেজুর আনালেন এবং নিজের মুখে দিয়ে চিবুলেন। যখন খেজুর গলে গেল, তখন শিশুটির মুখে দিলেন। শিশুটি তা চুষতে লাগল। আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দেখ, আনসারদের খেজুর-প্রীতি।' অবশেষে তিনি শিশুর মুখে হাত বুলিয়ে তার নাম 'আবদুল্লাহ' রাখলেন।মা বিনতে আসাদের রা. জীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলো। কুরাইশরা মুহাম্মাদ ও তার দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে লেগে গেল। তারা বনু হাশিমের সাথে বিবাদে লিপ্ত হলো। যখন তারা দেখল, আবু তালিব ও তার স্ত্রী মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমর্থন ও আশ্রয় দিচ্ছেন তখন তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের হাতে সমর্পণের দাবি জানাল; কিন্তু চাচা-চাচী ভাতিজা মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পক্ষে অটল থাকলেন। কোনো চাপের কাছেই নত হলেন না। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের হতে অর্পণের আবদার শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন। ফলে যারা ঈমান এনে মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুসারী হয়েছিল তাদের প্রতি তারা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দেখলেন কুরাইশরা তার অনুসারীদের ওপর অত্যাচার-উৎপীড়নের ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে তখন তিনি তাদেরকে আবিসিনিয়ায় হিজরতের অনুমতি দান করেন। কুরাইশদের অত্যাচার থেকে বাচার জন্য মুসলমানদের যে দলটি প্রথম আবিসিনিয়া হিজরত করেন তার মধ্যে ফাতিমা বিনতে আসাদের কলিজার টুকরা জাফর ইবনে আবি তালিব রা. ও তার স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইসও রা. ছিলেন। যাত্রাকালে মা ফাতিমা রা.-এর এই ছেলেটি ছিল চেহারা-সুরুতে ও আদবে-আখলাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুরূপ। কুরাইশদের যে পাঁচ ব্যক্তিকে লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুরূপ বলে মনে করত, তারা হলেন: জাফর ইবনে আবি তালিব, কুসাম ইবনে আল-আব্বাস, আস-সায়িব ইবনে উবায়দ ইবনে আবদি ইয়াযীদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আবু সুফিয়ান ইবনে আল-হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব ও আল-হাসান ইবনে আলী ইবনে আবি তালিব রা.।
কুরাইশরা যখন দেখল, বিষয়টি আস্তে আস্তে তাদের ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, তারা বনু হাশিম ও বনু আবদিল মুত্তালিবের নারী-পুরুষ ও শিশু-যুবক-বৃদ্ধ সকলকে শিআবে আবি তালিব উপত্যকায় অবরুদ্ধ অবস্থায় রাখার সিদ্ধান্ত নিল। ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অন্য নারীদের সাথে এ অবরোধ মেনে নেন। অন্যদের সাথে তিনিও এ অবরুদ্ধ জীবনের তিনটি বছর সীমাহীন ক্ষুধা ও অনাহারের মুখোমুখি হন এবং গাছের পাতা খেয়ে কোনো রকম জীবন রক্ষা করেন। অবশেষে তিন বছর পর নবুয়তের দশম বছরে তারা অবরোধ তুলে নেয়। অন্য মুসলমানদের সাথে ফাতিমাও রা. মুক্ত জীবনে ফিরে আসেন। এ তিনটি বছর মহিলারা চরম ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দান করেন।
শিআবে আবি তালব থেকে মুক্ত হওয়ার পর নবুয়তের দশম বছরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতি আপন দুব্যক্তি মাত্র অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে ইন্তেকাল করেন। প্রথমে তার প্রিয়তমা স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা. ও পরে চাচা আবু তালিব এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। এতদিন এ দুজনই ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে ঢালস্বরূপ। এখন এ দুজনের অবর্তমানে অত্যাচারী কুরাইশরা আরও তীব্রভাবে রাসূল ও তার অনুসারীদের ওপর যুলুম-নির্যাতন করতে শুরু করে। অবশেষে আল্লাহ তাআলা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলমানদের মদীনায় হিজরতের অনুমতি দান করেন।³⁸⁶
মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সঙ্গী-সাথীরা মদীনায় হিজরত করলেন। ফাতিমা বিনতে আসাদ রা.ও অন্যদের সাথে মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় চলে গেলেন। যুবাইর ইবনে বকর তার ইসলাম ও হিজরত সম্পর্কে বলেন, 'তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে হিজরত করেন।³⁸⁷ অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী ইমাম আশ-শা'বী রহ. তার ইসলাম ও হিজরত সম্পর্কে বলেন, 'আলী ইবনে আবি তালিবের রা. মা ফাতিমা বিনতে আসাদ ইবনে হাশিম ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় হিজরত করেন।'³⁸⁸
রাসূলের কাছে তার মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ফাতিমা বিনতে আসাদের রা. মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে ইবনে সাআদ বলেন, 'ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি একজন সৎকর্মশীল মহিলা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখতে যেতেন এবং তার গৃহে দুপুরে বিশ্রাম নিতেন।³⁸⁹
তার সত্যনিষ্ঠা ও ধর্মপরায়ণতার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে অতিমাত্রায় ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। তাকে লালন-পালন, আদব-আখলাক শিক্ষাদান ও তার সাথে সুন্দর ব্যবহারের প্রতিদানে রাসূলও সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে সবসময় সদ্ব্যবহার করতেন। তার ছেলে আলীর রা. সাথে রাসূলুল্লাহর কন্যা ফাতিমার রা. বিয়ে হলো। তখন তিনি একজন মমতাময়ী মা ও একজন আদর্শ শ্বাশুড়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাদের জীবন তো আর এমন বিত্ত-বৈভবের জীবন ছিল না। সব কাজ নিজেদেরই করতে হতো। নবী দুহিতা ফাতিমা রা.-কে ঘরে আনার পর আলী রা. মাকে বললেন, আমি পানি আনা, প্রয়োজনে এদিক-ওদিক যাওয়ার ব্যাপারে ফাতিমা বিনতে রাসূলুল্লাহকে সাহায্য করব, আর আপনি তাকে ঘরের কাজে, গম পেষা ও আটা চটকানোর কাজে সাহায্য করবেন।³⁹⁰
ফাতিমা বিনতে আসাদ রা.-এর প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা থাকার কারণে তিনি মাঝে মাঝে তাকে বিভিন্ন জিনিস উপহার-উপঢৌকন পাঠাতেন। জাদা ইবনে হুবায়রা আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট এক জোড়া অতি উন্নতমানের নতুন কাপড় পাঠালেন। সাথে সাথে এ কথাও বলে পাঠালেন যে, ‘এ দু-টোকে নিকাবের কাপড় বানিয়ে ফাতিমাদের মধ্যে ভাগ করে দাও।' আমি চার টুকরো করলাম। এক টুকরো দিলাম ফাতিমা বিনতে রাসূলুল্লাহকে, এক টুকরো ফাতিমা বিনতে আসাদকে এবং আর এক টুকরো ফাতিমা বিনতে হামযা রা.-কে। তবে তিনি চতুর্থ টুকরোটি যে কাকে দেন তা বলেননি।³⁹¹
সাহাবাদের অন্তরে তার মর্যাদা
সাহাবায়ে কেরামের অন্তরেও ফাতিমা বিনতে আসাদ রা.-এর একটা মর্যাদাপূর্ণ আসন ছিল। জাফর ইবনে আবি তালিব রা. মুতায় শহীদ হওয়ার পর কবি হাসসান ইবনে সাবিত রা. তার স্মরণে যে কবিতাটি রচনা করেন তাতে তার মা ফাতিমারও ভূয়সী প্রশংসা করেন। তেমনিভাবে কবি হাজ্জাজ ইবনে আলাত সুলামীও উহুদ যুদ্ধে হযরত আলীর রা. বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রশংসা করতে গিয়ে তার মায়েরও প্রশংসা করেন।³⁹²
হযরত ফাতিমা বিনতে আসাদ রা.-এর মৃত্যু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবীদের মনে দারুণ বেদনার ছাপ ফেলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করেন, তার প্রশংসা করেন এবং নিজের জামা দিয়ে তার কাফন দেন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বসে ছিলাম। এমন একজন এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আলী, জাফর ও আকীলের মা মারা গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা সবাই আমার মার কাছে চলো। আমরা উঠলাম এবং এমন নিঃশব্দে পথ চললাম যেন আমাদের প্রত্যেকের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। বাড়ির দরজায় পৌঁছার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গায়ের জামাটি খুলে পরিবারেরে লোকদের হাতে দিয়ে বলেন, তার গোসল দেওয়া শেষ হলে এটি তার কাফনের নীচে দিয়ে দেবে।
যখন লোকেরা দাফনের জন্য লাশ নিয়ে বের হলো তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার খাটিয়ায় কাঁধ দেন, একবার খাটিয়ার সামনে যান, আরেকবার পেছনে আসেন। এভাবে তিনি কবর পর্যন্ত পৌঁছেন। তারপর কবরে নেমে গড়াগড়ি দিয়ে আবার উপরে উঠে আসেন। তারপর বলেন, আল্লাহর নামের সাথে এবং আল্লাহর নামের ওপরে তোমরা তাকে কবরে নামাও। দাফন কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার মা ও প্রতিপালনকারিণী! আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন। আপনি ছিলেন আমার একজন চমৎকার মা ও চমৎকার প্রতিপালনকারিণী। জাবির বলেন, আমরা বললাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি এখানে এমন দু-টি কাজ করেছেন, আমরা কখনো আপনাকে এ ধরনের কাজ করতে দেখি না।' বললেন, 'সে দুটি কাজ কী?' বললাম, 'আপনার জামা খুলে দেওয়া এবং কবরে গড়াগড়ি দেওয়া।' বললেন, 'জামাটির ব্যাপার হলো, আমি চেয়েছি তাকে যেন কখনো জাহান্নামের আগুন স্পর্শ না করে। যদি আল্লাহ চান। আর কবরে আমার গড়াগড়ি দেওয়া—আমি চেয়েছি আল্লাহ যেন তার কবরটি প্রশস্ত করে দেন।³⁹³
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. নিশ্চিতভাবেই জান্নাতে যাবেন। ইমাম কুরতুবী বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা তার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যে, কবরে তার ওপর দলন-পেষণ চালানো হবে না। যেহেতু তিনি ফাতিমা বিনতে আসাদের কবরে শুয়েছেন, এজন্য তার বরকতে ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. কবরের পেষণ থেকে মুক্তি পেয়ে গিয়েছেন।'
হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বলেছেন, যখন আলী রা.-এর মা ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. মারা গেলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বাড়িতে গেলেন এবং তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'হে আমার মা, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন। আমার মায়ের পরে আপনি অভুক্ত থেকে আমার পেট ভরাতেন, আপনি না পরে আমাকে পরাতেন এবং ভালো কিছু নিজে না খেয়ে আমাকে খাওয়াতেন। আর এর দ্বারা আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালে সফলতা লাভের আশা করতেন।’³⁹⁴
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আব্বাস রা. ও আবু বকর সিদ্দিক রা. তার লাশ কবরে নামান।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত বড় মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন যে, কেউ তার প্রতি সামান্য দয়া ও অনুগ্রহ দেখালে তা কোনোদিন ভোলেননি। কথায় ও কর্মের দ্বারা সবসময় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাহলে ফাতিমা বিনতে আসাদ রা., যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে মায়ের ভূমিকা পালন করেছেন, আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য হিজরত করেছেন এবং সারাটি জীবন রাসূলের কল্যাণ-চিন্তা করেছেন, তাকে তিনি ভুলবেন কেমন করে? তার সাথে যেমন আচরণ করা দরকার তা তিনি করেছেন।
টিকাঃ
৩৭৮. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা, ২/১১৮।
৩৭৯. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫০৮২।
৩৮০. উয়ূনুল আসার, ১/৫১; সীরাতে হালাবিয়া, ১/১৮৯।
৩৮১. সীরাতে হালাবিয়া, ১/১৮৯।
৩৮২. নিসাউম মুবাশশিরাত বিল জান্নাহ, ৪১।
৩৮৩. আনসাবুল আশরাফ, ১/১১১।
৩৮৪. সূরা শু'আরা, ৪২:২১৪।
৩৮৫. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/২০৯।
৩৮৬. নিসাউম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ৪৩।
৩৮৭. আল ইসতিয়াব, ৪/৩৭০।
৩৮৮. উসুদুল গাবাহ, ৭১৬৮।
৩৮৯. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২২২; সিফাতুল সাফওয়া, ২/৫৪; আল ইসাবাহ, ৪/৩৮০।
৩৯০. সিফাতস সাফওয়া, ২/৫৪; উসুদুল গাবাহ, ৫/৫১৭।
৩৯১. আল ইসাবাহ, ৪/৩৭০; উসদুল গাবাহ, ভাষ্য নং ৭১৭২।
৩৯২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৪৯।
৩৯৩. কানযুল উম্মাল, ১৩/৬৩৬; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১১৮।
৩৯৪. মাজমাউয যাওয়াইদ, ১৫৩৯৯।
যাঁর মোহর ছিল ইসলাম
ইসলাম মানবজাতিকে বিস্ময়কর এক নারী উপহার দিয়েছেন, যাঁর জীবনকথা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য মানবিকবোধ বিকাশ ও উন্নতিতে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। এমন এক অবিস্মরণীয় চরিত্র হলেন হযরত উম্মে সুলাইম রা.। তার আসল নামের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। যথা: সাহলা, রুমাইলা, মুলাইকা, গুমাইসা ও রুমাইসা। তিনি বনু নাজ্জারের একজন প্রসিদ্ধ মহিলা আনসারী সাহাবী; প্রখ্যাত সাহাবী ও রাসূলুল্লাহর অতি স্নেহের খাদেম হযরত আনাস রা.-এর গর্বিত মা।
জাহিলী যুগে প্রথম জীবনে তিনি মালিক ইবনে নাযারকে বিয়ে করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরতের দশ বছর পূর্বেই তারই ঔরসে পুত্র আনাসের জন্ম হয়। আনসারদের মধ্যে যাঁরা প্রথম ভাগে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি তাদের অন্যতম। তার ইসলাম গ্রহণ করার কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার স্বামী মালিক তাকে ও তার সন্তানকে ফেলে দেশান্তরী হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় আসার আগেই উম্মে সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু তালহার সাথে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, আবু তালহা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উম্মে সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। জবাবে উম্মে সুলাইম বলেন, আবু তালহা, আপনি কি জানেন না, যে ইলাহ্ ইবাদত আপনি করেন তা মাটি দ্বারা তৈরি? তিনি বললেন, তা ঠিক। উম্মে সুলাইম আবার বললেন, একটি গাছের পূজা করতে আপনার লজ্জা হয় না? আপনি ইসলাম গ্রহণ করলে আপনার সাথে বিয়েতে আমার আপত্তি থাকবে না। আর সে ক্ষেত্রে আপনার ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো মোহরের দাবীও থাকবে না।
'বিষয়টি আমি ভেবে দেখবো'- একথা বলে আবু তালহা চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এসে পাঠ করলেন, 'আশহাদু আল-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ।'
অতঃপর উম্মে সুলাইম ছেলে আনাসকে ডেকে বললেন, আনাস, আবু তালহার বিয়ের ব্যবস্থা করো। আনাস রা. তার মাকে আবু তালহার সাথে বিয়ে দিলেন। ঘটনাটি বিভিন্ন সনদে বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।³⁹⁵
রাসূলের কাছে তার মর্যাদা
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন স্ত্রীদের ব্যতীত অন্য কোনো নারীর গৃহে ঢুকতেন না; কিন্তু উম্মে সুলায়মের নিকট যেতেন। লোকেরা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, এর ওপর আমার বড় মায়া হয়। আমার সাথে থেকে তার ভাই নিহত (শহীদ) হয়েছে।³⁹⁶
উম্মু সুলাইমের প্রথম স্বামীর পক্ষে আনাস এবং দ্বিতীয় স্বামী হযরত আবু তালহার পক্ষে দু-ছেলে আবু উমাইর ও আবদুল্লাহর জন্ম হয়। আবু উমাইর শৈশবে মারা যায়। অপর দু'জনের মাধ্যমে বংশ বিস্তার হয়।
আবু উমাইরের মৃত্যুতে উম্মে সুলাইম যে ধৈর্য অবলম্বন করেন তা মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয়। আবু উমাইর যখন মারা যায় তখন সে কেবল হাঁটতে শিখেছে। ছোট ছোট পা ফেলে যখন সে হাঁটে বাবা-মা অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকেন। এমন সময় আল্লাহপাক তাকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেন। ছেলেটি আবু তালহা খুব আদরের ছিল। হাদীসে এসেছে,
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু তালহার ঔরসজাত উম্মে সুলাইমের একটি ছেলে মৃত্যুবরণ করল। তখন উম্মে সুলাইম রা. তার পরিবার-পরিজনের ব্যক্তিদের বলল, আবু তালহাকে তার পুত্রের সংবাদ দিয়ো না, যতক্ষণ আমি না বলি। আবু তালহা রা. আসলেন। উম্মে সুলাইম রা. রাতের খানা সম্মুখে নিয়ে এলে তিনি খাবার খেলেন। এরপর উম্মে সুলাইম আগের চাইতে ভালো মতো সাজগোজ করলেন। আবু তালহা রা. তার সঙ্গে মিলিত হলেন। যখন উম্মে সুলাইম রা. দেখলেন যে, তিনি মিলনে পরিতৃপ্ত। তখন তাকে বললেন, 'হে আবু তালহা, কেউ যদি কারও কোনো জিনিস রাখতে দেয়, তারপর তা নিয়ে নেয় তবে কি সে তা ফেরাতে পারে?' আবু তালহা রা. বললেন, 'না।' উম্মে সুলাইম রা. বললেন, 'তাহলে তোমার ছেলের ব্যাপারে মনে কর (আল্লাহ তাকে নিয়ে নিয়েছেন)।' আবু তালহা রা. রেগে গিয়ে বললেন, 'তুমি আমাকে আগে বলনি, এখন আমি অপবিত্র, এখন ছেলের সংবাদটা দিলে!' অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে ছেলের যা ঘটেছে সব জানালেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমাদের গত রাতটিতে আল্লাহ তাআলা বরকত দিন।' উম্মে সুলাইম গর্ভবতী হলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সফরে ছিলেন, উম্মে সুলাইমও এ সফরে তার সঙ্গে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো সফর হতে প্রত্যাবর্তন করতেন, তখন রাতের বেলা মাদীনায় ঢুকতেন না। যখন লোকেরা মাদীনার কাছাকাছি পৌঁছল, তখন উম্মে সুলাইমের প্রসব-বেদনা আরম্ভ হলো। আবু তালহা রা. তার নিকট থেকে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেলা নিয়ে চলে গেলেন। আবু তালহা রা. এবং উম্মে সুলাইম রা. থেকে গেলেন।
তখন আবু তালহা রা. বললেন, 'হে প্রতিপালক, তুমি তো জান যে, যখন তিনি বের হন আমার ভালো লাগে তোমার রাসূলের সঙ্গে বের হতে এবং যখন তিনি প্রবেশ করেন তার সাথে প্রবেশ করতে; কিন্তু তুমি জানো, কেন আমি থেমে গেছি।'
উম্মে সুলাইম রা. বললেন, 'হে আবু তালহা, আগের মতো যাতনা আমার নেই। চলুন আমরা চলে যাই।' স্বামী-স্ত্রী মাদীনায় পৌঁছলে উম্মে সুলাইমের ব্যথা আবার আরম্ভ হলো। আর তিনি একটি শিশু ছেলে প্রসব করলেন। আমার মা বললেন, 'হে আনাস, শিশুটিকে যেন কেউ দুধ না খাওয়ায়, যতক্ষণ তুমি তাকে ভোরবেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিয়ে না যাও।'
সকাল হলে আমি সন্তানটিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গেলাম। আমি লক্ষ করলাম, তার হাতে উট দাগানোর যন্ত্র। আমাকে যখন তিনি দেখলেন, বললেন, 'হয়তো উম্মে সুলাইম এ পুত্রটি প্রসব করেছে।' আমি বললাম, 'হ্যাঁ'। তিনি সে যন্ত্রটি হাত থেকে রেখে দিলেন। আমি শিশুটিকে নিয়ে তার কোলে রাখলাম। তিনি মাদীনার আজওয়া খেজুর আনালেন এবং নিজের মুখে দিয়ে চিবুলেন। যখন খেজুর গলে গেল, তখন শিশুটির মুখে দিলেন। শিশুটি তা চুষতে লাগল। আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দেখ, আনসারদের খেজুর-প্রীতি।' অবশেষে তিনি শিশুর মুখে হাত বুলিয়ে তার নাম 'আবদুল্লাহ' রাখলেন।³⁹⁷
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আসার পরপরই উম্মে সুলাইম ছোট্ট ছেলে আনাসের হাত ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিয়ে গিয়ে বলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, এই থাকল আনাস। সে আপনার খিদমত করবে।' আনাস তখন দশ বছরের বালক মাত্র। তখন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাত পর্যন্ত আনাস তার খিদমত করেন। এ কারণে তিনি 'খাদেমুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম' খ্যাতি অর্জন করেন।³⁹⁸
অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি আরও আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি তার জন্য একটু দুআ করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআও করেন।³⁹⁹
জিহাদের ময়দানে অনন্য কীর্তি
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যে ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন, একটি বর্ণনামতে সে বৈঠকটি হয়েছিল উম্মে সুলাইমের বাড়িতে। হযরত উম্মে সুলাইম অত্যন্ত আগ্রহের সাথে বড় বড় যুদ্ধে কিছু আনসারী মহিলাকে সাথে নিয়ে যেতেন। তারা সৈনিকদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের সেবা করতেন।⁴⁰⁰
উহুদযুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয় হয় তখনো তিনি অতি সাহসিকতার সাথে নিজ দায়িত্ব পালন করেন। আনাস রা. বলেন, আমি আয়েশা ও উম্মে সুলাইমকে মশক ভরে পানি এনে আহতদের পান করাতে দেখেছি। মশক খালি হয়ে গেলে তারা আবার ভরে এনে পান করিয়েছেন।⁴⁰¹
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর রা. থেকে বর্ণিত, হুনাইনযুদ্ধে উম্মে সুলাইম খঞ্জর হাতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। এক সময় যুদ্ধের মধ্যে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নযরে পড়লেন। তিনি তখন কোমরে চাদর পেঁচিয়ে স্বামী আবু তালহার পাশে দাঁড়িয়ে। আবদুল্লাহ ইবনে আবি তালহা তখন তার পেটে। তার সাথে আবু তালহার উট। উটটি বশে আনার জন্য তারা মাথার কেশ ও লাগামের মধ্যে হাত দিয়ে রেখেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডাকলেন, উম্মে সুলাইম? তিনি সাড়া দিলেন, 'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক! আপনার বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী উম্মে সালামার পাশাপাশি ছিলাম। আমি প্রশ্ন করলাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, কোনো মহিলা যদি ঘুমের মধ্যে দেখে যে তার স্বামীর সাথে সহবাস করছে, তাহলে তাকে কি গোসল করতে হবে?' প্রশ্ন শুনে উম্মে সালামা বলে উঠলেন, 'উম্মে সুলাইম, তোমার দু-হাত ধূলিমলিন হোক! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে গোটা নারীকূলকে তুমি লজ্জা দিল।' উত্তরে সুলাইম বললেন, 'সত্য প্রকাশে আল্লাহ লজ্জা পান না। কোনো সমস্যার ব্যাপারে অন্ধকারে থাকার চেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট জিজ্ঞেস করাই উত্তম।'
উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'উম্মে সুলাইম, তোমার দু-হাত ধুলিমলিন হোক। তার ওপর গোসল ফরয হবে, যদি সে ঘুম থেকে জেগে পানি দেখতে পায়।'
উম্মে সুলাইম আবার প্রশ্ন করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, মেয়েদেরও কি পানি আছে?' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'যদি পানিই না থাকবে, তাহলে সন্তান তার মতো হয় কেন? তারা তো পুরুষেরই মতো।⁴⁰⁶
তিনি অন্তর দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসতেন, ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তার কথা কখনো বিস্মৃত হননি। এই সম্মানিত মহিলাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতের সুসংবাদও দান করেছেন।
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে রিওয়ায়াত করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أُرِيتُ الْجَنَّةَ فَرَأَيْتُ امْرَأَةَ أَبِي طَلْحَةَ ثُمَّ سَمِعْتُ خَشْخَشَةً أَمَامِي فَإِذَا بلاك
আমাকে জান্নাত দেখানো হয়েছে। সেখানে আমি আবু তালহার সহধর্মিণীকে দেখলাম। তারপর আমার সম্মুখে পদধ্বনি শুনতে পেলাম, লক্ষ্য করে দেখি তিনি বিলাল।⁴⁰⁷
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি জান্নাতে গিয়ে এক মহিলার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। জানতে চাই এ মহিলা কে? আমাকে জানানো হয়, আনাসের মা গুমাইসা বিন্তু মিলহান। '⁴⁰⁸
এভাবে বহুবিদ অনন্য কৃতির সাক্ষর রেখে গেছেন হযরত উম্মে সুলাইম রা.। এক সময় তিনি মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে পাড়ি জমান পরপারে। তার সুবাসিত জীবনীচর্চা আমাদের কালিমাযুক্ত অন্তরকে পরিষ্কার করে তুলতে পারে। আমরা এতে পেতে পারি পবিত্র জীবনের সন্ধান। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
টিকাঃ
৩৯৫. আল ইসাবাহ, ৪/৪৬১; তাবাকাতে ইবেন সাআদ, ৩/৫০৪; তারীখে ইবনে আসাকির, ৬/৫।
৩৯৬. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫৫।
৩৯৭. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২১৪৪।
৩৯৮. আল ইসাবাহ, ৪/৪৬২।
৩৯৯. সহীহ, বুখারী, ২/৩০২; সহীহ, মুসলিম, ২/৯৪৪।
৪০০. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৮১০।
৪০১. সহীহ, বুখারী, ২/৫৮১।
৪০২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬/১০২; হায়াতুস সাহাবা, ২/৬৩৫।
৪০৩. সহীহ, বুখারী, ২/৩৪২; সহীহ, মুসলিম, ২/১৭৮; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৯/১০৫; হায়াতুস সাহাবা, ২/১৯৩-১৯৪।
৪০৪. তারীখে ইবনে আসাকির, ৩/১৪৪, ১৪৫।
৪০৫. উসুদুল গাবাহ, ১/১২৭; আসাহহুস সীয়ার, ৬০৬।
৪০৬. হায়াতুস সাহাবা, ৩/২২১, ২২২।
৪০৭. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫৭; আবু ইয়া'লা, ৪/৫১।
৪০৮. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫৬; মুসনাদ, আহমাদ, ৩/২৩৯-২৩৮; আবু ইয়া'লা, ৬/২২৩।
📄 উম্মে হিশাম বিনতে হারিসা রা.
বাইআতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী জান্নাতী
এই মহীয়সী সাহাবী এমন এক বরকতময় ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যে ঘর সৌহার্দ, দয়া, সত্যবাদিতার প্রভূত সম্মানে ছিল ভূষিত। তার পিতার দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি তার মায়ের সেবায় সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন এবং শৈশব থেকেই সেবা করে মায়ের দুআ লাভ করেছেন। তিনি তার মহান প্রতিপালকের হক সম্পর্কে অবগত হয়ে সপরিবারে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশ অনুসরণে ব্রতী হয়েছেন।
মর্যাদার সোপানে
হযরত উম্মে হিশাম বিনতে হারিসা রা.-এর জীবনপঞ্জি শুরুর প্রাক্কালে আসুন আমরা তার পবিত্র বরকতময় পরিবারের দিকে দৃষ্টি দিই।
উম্মে হিশামের আম্মাজান হচ্ছেন উম্মে খালিদ বিনতে খালিদ ইবনে ইয়ায়িশ আল আনসারিয়্যাহ। বনী মালিক গোত্রের অধিবাসী তিনি। তিনি নবী সা.-এর হাতে বাইআত হয়েছেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি ছিলেন একজন উঁচু স্তরের সাহাবিয়া। হারিসা ইবনে নুমান আন নাজ্জারীর সাথে তার বিয়ে হয়। সেই ঘরে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান, সাওদাহ, উমারা ও উম্মে হিশাম।৪০৯ এই উম্মে হিশাম হচ্ছেন আমাদের আলোচিত মহীয়সী। এছাড়া হারিসার আরেক স্ত্রীর ঘরে ছিলেন দুই কন্যা। যথাক্রমে উম্মে কুলসুম ও আমাতুল্লাহ।৪১০
এই পরিবারের সকল সদস্য ছিলেন মুসলমান। উম্মে হিশামের বোনেরাও ছিলেন বাইআতপ্রাপ্ত। ইবনে সাআদ বলেন, সাওদাহ, উমারা, উম্মে হিশাম, উম্মে কুলসুম ও আমাতুল্লাহ রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বাইআত হন।
তাঁর পিতা হারিসা ইবনে নুমান রা. ছিলেন একজন বিশিষ্ট আনসারী সাহাবী। বিখ্যাত আনসারী গোত্র 'বনু নাজ্জার'-এ তার জন্ম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি অনেক গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন।
ইবনে সাদ ওয়াকেদির সূত্রে বর্ণনা করেন, আবু জাফর বাকির বলেন, মদিনায় আসার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু আইয়ুব আনসারির গৃহে এক বছরের মতো অবস্থান করেন। আলীর সাথে ফাতিমার বিবাহের পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলীকে বললেন, 'একটি ঘর বানাও!' আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসুলের ঘর থেকে সামান্য দূরে ঘর বানালেন এবং সেই ঘরে ফাতিমাকে তুললেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার এসে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'তোমাকে সরিয়ে আমার ঘরের কাছে আনতে চাই।' ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন, 'তাহলে হারিসা ইবনে নুমানকে বলুন, একটু সরে যেতে।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'সে আমাদের জন্য এতবার তার ঘর সরিয়েছে; যে এখন আমি নিজেই লজ্জিত।'
হারিসা ইবনে নুমান রাসুলের এই কথাগুলো শুনতে পেয়ে প্রথমে তার ঘর সরিয়ে নিলেন। তারপরে রাসুলকে গিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! এই যে আমাদের বসতি। বনু নাজ্জারের সবার চাইতে আমার ঘরই তো আপনার বেশি নিকটবর্তী। নিশ্চয় আমি ও আমার সম্পদ আল্লাহ ও তার রাসুলের জন্য উৎসর্গিত। আল্লাহর শপথ হে রাসুল! আপনি যেই সম্পদ আমার কাছ থেকে নিবেন, তা আমার কাছে অধিক প্রিয়, যে সম্পদ নিবেন না তা থেকে।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি সত্যি বলেছ। আল্লাহ তোমার মাঝে বরকত দিন।' তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমাকে হারিসার ঘরের স্থানে নিয়ে আসলেন।৪১১
ইয়াকুত হামুবী হযরত হারিসা রা.-এর বদান্যতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, 'হযরত হারিসা রা. ছিলেন প্রথম ব্যক্তি—যিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর জন্য নিজের সম্পত্তি ও বাড়ি হেবা করেছিলেন।৪১২
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই হারিসা রা.-এর কণ্ঠস্বর শুনেছেন জান্নাতে। হাদীসে এসেছে, হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
نِمْتُ، فَرَأَيْتُنِي فِي الْجَنَّةِ، فَسَمِعْتُ صَوْتَ قَارِي يَقْرَأُ، فَقُلْتُ: مَنْ هَذَا؟ قَالُوا: هَذَا حَارِثَةُ بْنُ النُّعْمَانِ " فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " كَذَاكَ الْبِرُّ ، كَذَاكَ الْبِرُّ " وَكَانَ أَبَرَّ النَّاسِ بِأُمِّهِ
আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম, জান্নাতে প্রবেশ করেছি। সেখানে কোনো পাঠকের পড়ার আওয়ায শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি কে? তারা (ফেরেশতা) বললেন, ইনি হারিসা ইবনে নুমান। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এমনই হয় সেবা ও সদাচারের প্রতিদান, এমনই হয় সেবা ও সদাচারের বিনিময়। তিনি ছিলেন তার মায়ের প্রতি সর্বাধিক সদ্ব্যবহারকারী।৪১৩
শুধু তাই নয়, হযরত জিবরাঈল আ. হযরত হারিসা রা.-এর সালামের জবাব দিয়েছেন। হাদীসে এসেছে, হযরত হারিসা ইবনে নুমান রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন তার নিকট একজন ব্যক্তি উপবিষ্ট ছিলেন। আমি তাকে সালাম দিলাম। যখন আমি ফিরে আসছি তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার সাথে যিনি বসা ছিলেন, তাকে কি তুমি দেখেছ? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, তিনি হলেন জিবরাঈল, তিনি তোমার সালামের উত্তর দিয়েছেন।৪১৪
ইবনে শাহীনের বর্ণনায় রয়েছে, হারিসা ইবনে নুমান নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এলেন। তিনি তখন এক ব্যক্তির সাথে সঙ্গোপনে কথা বলেছিলেন। তাই হারিসা রা. সালাম না দিয়ে বসে গেলেন। হযরত জিবরাঈল আ. তখন বললেন, তিনি সালাম দিলে আমি তার সালামের উত্তর দিতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জিবরাঈল আ.-কে বললেন, আপনি কি তাকে চেনেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, হুনাইনের যুদ্ধে পরম ধৈর্যের সাথে যে আশিজন যুদ্ধক্ষেত্রে অবিচল ছিলেন তিনি তাদের একজন। তাদেরকে ও তাদের সন্তানদেরকে জান্নাতের রিযিক প্রদান করা হবে।৪১৫
শেষ বয়সে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন, তাই ঘরের দরজা থেকে মসজিদ পর্যন্ত একটা রশি বেঁধে রাখেন, যার সাহায্যে মসজিদে যাতায়াত করতেন। কোনো গরীব-মিসকীন এলে তিনি তার থলে থেকে কিছু বের করতেন। তারপর রশি ধরে ধরে গিয়ে তার হাতে দিয়ে আসতেন। পরিবারের লোকজন বলত, এ কাজ তো আমরাই করতে পারি, আপনি কেন এত কষ্ট করেন। তিনি বলতেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মিসকিনকে হাত বাড়িয়ে কোনো কিছু দান করা খারাপ মৃত্যু থেকে মানুষকে রক্ষা করে।৪১৬
আল্লামা শরফুদ্দীন তীবী রহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই স্বপ্ন দেখার পর সাহাবায়ে কেরামের সামনে বর্ণনা করলেন। যখন তিনি হারিসা ইবনে নুমানের নাম উল্লেখ করলেন, তখন তার সেই অনন্য গুণের প্রতি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করলেন, যার দ্বারা তিনি এই মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন। 'এমনই হয় তোমাদের সেবা ও সদাচারের প্রতিদান'— কথাটি পুনরুক্তির মাধ্যমে তাদেরকে উৎসাহিত করলেন যে, তোমরাও তার মতো মর্যাদার অধিকারী হতে পারবে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে।৪১৭
হযরত হারিসা ইবনে নুমান রা.-এর এমনই পবিত্র ও বরকতমণ্ডিত ঘরে লালিত-পালিত হন হযরত উম্মে হিশাম বিনতে হারিসা রা.। এখানেই তিনি কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলের ওপর আমল করতে থাকেন।
আমরা এখন জানব, কীভাবে হযরত হারিসা রা.-এর ঘরে ইসলামের সোনালী আলো উঁকি দিল—সে বিষয়ে।
হারিসা ইবনে নুমানের ঘরে ঈমানী প্রদীপ
মদীনার আনসার সম্প্রদায়ের খাযরাজ একটি অতি সৌভাগ্যবান গোষ্ঠী বা দল। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলেছেন। বিশেষত হজ মওসুমে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত লোকদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগযোগ করে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। মক্কায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতী জিন্দেগীর এমনই এক পর্যায়ে মদীনার খাযরাজ গোত্রের ছয় ব্যক্তি উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলেন। এই ছয় সদস্যের দলটির সাথে হারেসা ইবনে নুমান রা.ও ছিলেন। তাদের মক্কায় উপস্থিতির খবর পেয়ে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। তারা ধীরস্থির ভাবে মনোযোগ সহকারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্তব্য শোনেন। তারপর তাদের মধ্য থেকে হযরত হারিসা ইবনে নুমান রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) করে মুসলমান হন।
ইসলাম গ্রহণের পর তার মদীনায় ফিরে আসলেন এবং খুব জোরেশোরে ইসলাম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। ইবনুল আসীর বলেন, 'যখন তারা মদীনায় ফিরে এসে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন তখন গোটা আনসার সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এমন কোনো ঘর ছিল না যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চর্চা হতো না।'
এর পরের বছর হারিসা রা.-সহ বারো ব্যক্তি এবং তার পরের বছর ৭০-৭৫ ব্যক্তির সাথে পর পর দুই বার মক্কায় যান এবং ঐতিহাসিক বাইয়াতে আকাবায় অংশগ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বাইয়াত করেন।
একটি বর্ণনায় এসেছে, মদীনায় কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করার পর তারা সর্বসম্মতভাবে ক’জন প্রতিনিধি মক্কায় পাঠান। উদ্দেশ্য, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুরোধ করবেন, তিনি যেমন মদীনায় একজন প্রচারক পাঠান, যিনি মদীনায় আল কুরআন শিক্ষা দেবেন। তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুস'য়াব ইবনে 'উমাইরকে মদীনায় পাঠান। এভাবেই হযরত হারিসা রা.-এর ঘরে উঁকি দেয় ইসলামের আলোকোজ্জ্বল প্রভা।৪১৮
প্রিয়নবীর সান্নিধ্যে
মক্কার মুশরিকরা রাসূলের সাহাবীদের ওপর কষ্ট-নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে সাহাবীগণ আনসারদের সান্নিধ্যে চলে যান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা.-এর হিজরতের আলোচনা চলাকালের মদীনার প্রতিটি মানুষের মনে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। তারা রাসূলুল্লাহ সা.-কে মদীনায় অভ্যর্থনা জানাতে প্রতিদিন মদীনার উপকণ্ঠে চলে আসেন। এদের দলেও ছিলেন হযরত হারিসা ইবনে নুমান রা. ও তার পরিবার বিশেষ করে তার কন্যা হযরত উম্মে হিশাম রা.।
হারিসা যখন দেখলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা.-এর ঘরে তাশরীফ রেখেছেন, তখন তার আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এর কারণ হচ্ছে, হারিসা ছিলেন বনী নাজ্জারের অধিবাসী। এতে করে তিনি রাসূলুল্লাহ সা.-কে খুব কাছে পাবার সৌভাগ্য লাভ করেন। রাসূলের কাছ থেকে বেশি বেশি ইলম অর্জনের সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেননি। রাসূলুল্লাহ সা.-এর অনুপম চরিত্র ও দিকনির্দেশনা দ্বারা পুরোপুরি উপকার লাভ করেছেন। এতে রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি তার ভালোবাসা বেড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সা.ও তাকে অত্যধিক ভালোবাসতেন যখন দেখলেন তার ভেতরে রয়েছে পরিচ্ছন্ন মন, শেখার মতো মানসিকতা, মানবতা ও সত্যবাদিতার নিদর্শন।
প্রতিবেশিত্বের এই সুপ্রভাব পড়েছে সাহাবিয়া উম্মে হিশামের অন্তরে। খুব কাছ থেকেই তিনি নববী নূর অবলোকনের সৌভাগ্য লাভ করেছেন। রাসূলের চরিত্রে নিজ চরিত্র গঠনের প্রয়াস পেয়েছেন। এতে পরিতৃপ্তি লাভ করেছেন তিনি। বিশেষ করে যখন বনু নাজ্জার গোত্রের সৌভাগ্য লাভ হয় রাসূলের কাছে খাবার পৌঁছানোর। নয় মাস আবু আইয়ুব আনসারী রা. ঘরে খাবার পৌঁছানোর সুযোগ লাভ হয় তাঁর। এভাবে হারিসার পরিবার খুব কাছ থেকে রাসূলের শিক্ষা নিজেদের জীবনে ধারণ করেন। এমন কি সূরা 'কাফ' তিনি রাসূলের জুমআর নামাযের তিলাওয়াত থেকে শুনে শুনে মুখস্থ করে ফেলেন।৪১৯
জ্ঞান অন্বেষণের স্পৃহা
হযরত উম্মে হিশাম রা. জ্ঞান পিপাসায় কাতর ছিলেন। সব সময় তিনি জ্ঞানের সন্ধানে থাকতেন। এরই প্রেক্ষিতে কুরআনের অধিকাংশ অংশ তিনি হিফজ করেন। শুধু তাই নয়; হাদীস হিফজের ব্যাপারেও তিনি অধিক গুরুত্ব দিতেন। রাসূলের কাছ থেকে তিনি অসংখ্য হাদীস মুখস্থ করেছেন। তার কাছ থেকে তার বোন উমারা, মুহাম্মাদ ইবনে আবদির রাহমান ইবনে আসআদ ইবনে যুরারাহ, ইয়াহইয়া ইবনে আবদিল্লাহ ও হাবীব ইবনে আবদির রহমান হাদীস বর্ণনা করেছেন।৪২০
আর কী করে তিনি হাদীসের পিয়াসী হবেন না? তিনি তো রাসূলের মুখ থেকে শুনেছেন—'আল্লাহ তাআলার যার মঙ্গল কামনা করেন, তাকে দ্বীনের ফিকহ শিক্ষা দেন'।৪২১
'ইলম লাভের উদ্দেশে যে লোক পথ চলে আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে তাকে জান্নাতের পথে পৌঁছে দেন এবং ফেরেশতাগণ ইলম অন্বেষণকারীর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেন। অতঃপর আসমান-যমীনের সকল প্রাণী (আল্লাহ তাআলার নিকট) আলিমদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, এমনকি পানির জগতের মাছসমূহও। সমস্ত নক্ষত্ররাজির ওপর পূর্ণিমার চাঁদের যে প্রাধান্য, ঠিক তেমনি (মূর্খ) আবিদগণের ওপর আলিমদের মর্যাদা বিদ্যমান। অবশ্যই আলিমগণ নবীদের ওয়ারিস। আর নবীগণ উত্তরাধিকার হিসেবে কোনো দীনার বা দিরহাম রেখে যাননি, বরং তারা রেখে গেছেন মীরাস। হিসেবে ইলম। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম লাভ করেছে, সে পূর্ণ অংশ লাভ করেছে।৪২২
মৃত্যুর বাইআত
হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপটে 'বাইয়াতে রিযওয়ান' বা 'বাইয়াতে শাজারা' এর ইসলামের ইতিহাসে এক বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার ঘটনাকালে হযরত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কার কাফেরদের হাতে হযরত উসমানের শাহাদাতের খবর শুনেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হুদাইবিয়ায় আগত মুসলমানদের নিকট থেকে মৃত্যুর বাইয়াত বা শপথ নেন, তখন হযরত সালামা রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতে তিনবার বাইয়াত করেন। তিনি বলেছেন, 'হুদাইবিয়ার গাছের নীচে আমি রাসূলুল্লাহর হাতে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুর বাইয়াত করলাম। তারপর একপাশে চলে গেলাম। লোকের ভিড় কিছুটা কমে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে দেখে বললেন: সালাম তোমার কী হলো, তুমি যে বাইয়াত করলে না? বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি তো বাইয়াত করেছি। রাসূল বললেন, তাতে কি হয়েছে, আর একবার কর। আমি আবারো বাইয়াত করলাম। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে একটি ঢাল উপহার দেন। এরপর আবার তিনি রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নজরে পড়েন। তিনি জিজ্ঞেস করেন: সালামা, বাইয়াত করবে না?
সালামা আরজ করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি তো দুবার বাইয়াত করেছি। বললেন: আবারো একবার কর। সালামা তৃতীয়বার বাইয়াত করেন। এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করেন, সালামা ঢালটি কি করেছ? তিনি বললেন, আমার চাচা একেবারে খালি হাতে ছিলেন, আমি সেটা তাকে দিয়েছি। তার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ হেসে উঠে বলেন: তোমার দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মতো যে দুআ করে, হে আল্লাহ আমাকে এমন বন্ধু দান কর যে আমার নিজের জীবন অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় হবে।
হুদাইবিয়ায় রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতে বাইয়াত চলছে, এর মধ্যে মক্কাবাসীদের সাথে মুসলমানদের সন্ধি হয়ে গেল। মুসলমানরা শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করতে লাগল। এই বাইআত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
لَقَدْ رَضِيَ اللهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا
অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার হাতে বাইআত গ্রহণ করেছিল; অতঃপর তিনি তাদের অন্তরে কি ছিল তা জেনে নিয়েছেন, ফলে তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে পুরস্কৃত করলেন নিকটবর্তী বিজয় দিয়ে।৪২৩
এই বাইআতে হযরত উম্মে হিশাম রা. অংশগ্রহণ করেছেন এবং মৃত্যুর ওপর শপথ করেছিলেন। যেই বাইআতে রিযওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'বৃক্ষের নিচের বাইআতে যারা অংশগ্রহণ করেছে তারা কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।৪২৪
আল্লাহ তাআলা জান্নাতের মধ্যে উম্মে হিশামের চেহারা উজ্জ্বল ও আলোকিত করুন। তার ওপর বর্ষিত হোক আল্লাহর প্রীতি ও সন্তোষ।
**টিকাঃ**
৪০৯. উসদুল গাবাহ, ভাষ্য নং ৭২৪।
৪১০. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৩/৪৮৭।
৪১১. তবাকাত, ইবনে সাদ, ৮/২২-২৩; আল মুনতাজাম, ৩/৮৭-৮৮।
৪১২. মু'জামুল বুলদান, ৫/৮৬।
৪১৩. মুসনাদ, আহমদ, ৬/১৫১।
৪১৪. মুসনাদ, আহমদ: ৫/৪৩৩।
৪১৫. মাজমাউয যাওয়াইদ, ৯/৩১৪।
৪১৬. তাবারানী, ৩/২৫৮।
৪১৭. শরহুত তীবী, ৯/১৫৮।
৪১৮. রিজালুন মুবাশশিরূনা বিল জান্নাহ, ৩০২।
৪১৯. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৫২, ৮৭৩।
৪২০. তাহযীবুত তাহযীব, ১২/৪৮২; আল ইসাবাহ, ৪/৪৮০।
৪২১. সহীহ, বুখারী, ১/৭১; সহীহ, মুসলিম, ৩/৯৮।
৪২২. সুনান, আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৬৪১; সুনান, তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৮২; সুনান, ইবনে মাজাহ, ২২৩।
৪২৩. সূরা ফাতহ, ৪৮:১৮।
৪২৪. সহীহ, মুসলিম; মুসনাদ, আহমাদ; সুনান, আবু দাউদ; সুনান, আত-তিরমিযী।