📄 মাইমুনা বিনতুল হারিস রা.
আমাদের মধ্যে মায়মুনা সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয় করতেন এবং সবচেয়ে বেশি আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখতেন। -আয়েশা রা.
আজ আমরা এমন এক মর্যাদাসম্পন্না মহীয়সী মায়ের জীবনকাহিনী শুনব—যাঁর ত্যাগ, মায়া-মমতা ও পরম ভালোবাসায় তৃপ্তি ও শান্তির ছোঁয়া পেয়েছিলেন প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আজ আমরা এক ভুবনমোহিনী বাগানের ফুল নিয়ে আলোচনা করব যাঁর ত্যাগ, ঈমান ও তাকওয়া আমাদের জান্নাতের পথ দেখাতে পারে। হ্যাঁ, আমরা আমাদের আম্মাজান মাইমুনা বিনতে হারিস আল হিলালিয়্যাহ'র জীবনেতিহাস পাঠের জন্য উন্মুখ হয়ে আছি।
**পরিচয়পর্ব**
তিনিই সেই নারী যাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ বিয়ে করেন। তার এক বোন উম্মুল ফযল লুবাবা আল কুবরা ছিলেন হযরত আব্বাস রা.-এর স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাঁর গুণকীর্তন ও প্রশংসা করতেন। তার গুণাবলীর মাধুর্য তুলে ধরে বলতেন,
هُذِهِ بَقِيَّةُ آبَائِ
তিনি হচ্ছেন আমার বাপ-দাদার নিদর্শন।
هُذَا الْعَبَّاسُ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ أَجْوَدُ قُرَيْشٍ كَفَا وَأَوْصَلُهَا
এই আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব হচ্ছেন কুরাইশের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তি। আত্মীয়তার সম্পর্ক তিনি খুব উত্তমভাবে রক্ষা করেন।
তাঁর দ্বিতীয় বোন লুবাবা সুগরা ছিলেন হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদের রা.-এর মা যাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
খালিদ আল্লাহর একটি তরবারি যা আল্লাহ কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে কোষমুক্ত করেছেন। খালিদ আল্লাহর কতই না ভালো বান্দা এবং গোত্রের কতই না ভালো ভ্রাতা।
হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা. ছিলেন তার বৈপিত্রেয় বোন। হযরত জাফর রা.-এর ঔরসে আবদুল্লাহ, মুহাম্মাদ ও আউন নামের তিনি ছেলে ছিল। হযরত জাফর রা. মৃতার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করার পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. তাকে বিয়ে করেন এবং তার ঔরসে মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর জন্মগ্রহণ করেন। হযরত আবু বকরের রা. ইন্তেকালের পর হযরত আসমা রা.-কে বিয়ে করেন হযরত আলী রা.। তাঁর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন ইয়াহইয়া ও আউন নামের দুই ছেলে।
হযরত মায়মূনা রা.-এর বৈপিত্রেয় আরেক বোন সালমা বিনতে উমাইস রা. ছিলেন হযরত হামযা রা.-এর স্ত্রী।
হযরত মায়মূনা রা.-এর প্রথম বিয়ে হয় মাসউদ ইবনে আমর ইবনে উমাইর আস-সাকাফীর সঙ্গে। মাসউদ ইবনে আমরের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর আবু রুহমের সাথে বিয়ে হয়। হিজরী ৭ম সনে আবু রুহমের মৃত্যু হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেগমের মর্যাদা লাভ করেন। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বশেষ বেগম। তার পর আর কোনো নারীকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেগমের মর্যাদা দান করেননি। আসুন, তার পবিত্র এই বিয়ে সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা করা যাক।
**উমরাতুল কাযা ও সেই শুভক্ষণ**
খাইবার থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় রবিউল আউয়াল থেকে শাওয়াল মাস পর্যন্ত অবস্থান করেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন সামরিক অভিযানে নিজে গমন করেন অথবা অন্য সাহাবীদের পাঠান।
এরপর যুলকাদা মাসে তিনি আগের বছরের পরিত্যক্ত উমরার কাযা আদায় করার জন্য মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। আগের বছর এই মাসেই মুশরিকরা তাঁতে পথিমধ্যে বাধা দেয় ও উমরা বাদ দিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য করে। ওই একই সফরে আগের বছর তার সহচরবৃন্দ অত্যন্ত অভাব অনটন ও দুঃখ-কষ্টের মধ্যে কালতিপাত করছে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, কুরাইশরা রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবাদের দেখবার জন্য তাদের সম্মিলন গৃহ 'দারুন নাদওয়া'তে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন তখন তার চাদর ডান বগলের নীচে ও বাম কাঁধের ওপর পেঁচিয়ে পরলেন এবং ডান হাত উঁচু করে ডান বগল ফাঁক করে বললেন, 'আজকে যে ব্যক্তি নিজেকে শক্তিমান বলে জাহির করবে আল্লাহ তার ওপর রহমত করবেন।'
একথা বলার পর তিনি হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন। অতঃপর তিনি ও তার সাহাবাগণ জোরে জোরে বীরোচিত ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগলেন। কাবা ঘরের আড়ালে গিয়ে কুরাইশদের দৃষ্টির অন্তরালে গেলে রুকনে ইয়ামনী চুম্বন করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে রুকনে আসওয়াদে পৌঁছে এক চক্কর সমাপ্ত করলেন। অতঃপর আগের মতো বীরোচিত ভঙ্গিতে জোরে জোরে হাঁটলেন। এভাবে তিন চক্কর দিলেন এবং বাকি চক্করগুলি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে সম্পন্ন করলেন।
এই সফরেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় মাইমুনা বিনতে হারিস রা.-কে বিয়ে করেন। আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. এই বিয়ের উদ্যোক্তা ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনদিন মক্কায় অবস্থান করলেন। তৃতীয় দিন হুয়াইতিব ইবনে আবদুল উযযার নেতৃত্বে কুরাইশদের কয়েকজন এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলল, 'তোমরা মক্কায় থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অতএব, তুমি মক্কা ত্যাগ করো।'
কুরাইশরা তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এখানে তোমাদের উপস্থিতিতে আমি যদি বিয়ে সম্পন্ন করি এবং তোমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করি আর তোমরা তাতে যোগ দাও তাহলে ক্ষতি কি?' তারা বলল 'তোমার খাবারে আমাদের প্রয়োজন নেই। তমি চলে যাও।' ইবনে হিশামের বর্ণনামতে, মায়মুনা রা. বিয়ের দায়িত্ব উম্মুল ফাযলের ওপর ছেড়ে দেন। আর তিনি সে দায়িত্ব ছেড়ে দেন স্বামী আব্বাস রা.-এর হাতে। এই উমরার ইহরামের অবস্থায় হিজরী ৭ম সনের জিলকাদা মাসের পাঁচ শত মতান্তরে চারশত দিরহাম দেন-মাহরের বিনিময়ে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মায়মূনা রা.-কে বিয়ে করেন।
উমরা আদায়ের পর মদীনা ফেরার পথে মক্কা হতে ছয় থেকে বারো মাইল দূরে 'সারাফ' নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদেম হযরত আবু রাফে হযরত মায়মূনা রা.-কে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। এই 'সারাফে' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য নির্মিত তাঁবুতে হযরত মায়মূনা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মিলিত হন।
ইবন আব্বাস রা.-এর একটি বর্ণনায় জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মায়মূনার রা. বিয়ে হয় উমরা আদায়কালীন মক্কাতে। উমরা উপলক্ষে তিনদিন সেখানে অবস্থান করেন। তৃতীয় দিনে হুয়ায়তিব ইবনে আবদিল উযযা আরও কয়েজন কুরাইশ ব্যক্তিকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দেখা করে বলে, হুদায়বিয়ার চুক্তি অনুযায়ী আপনার অবস্থানের মেয়াদ আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। আপনি মক্কা ছেড়ে চলে যান।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাকে আরও একটু সময় দিলে তোমাদের এমন কী হতো। আমি তোমাদের মধ্যে মায়মুনার সাথে মিলিত হতাম এবং তোমাদের জন্য ওলীমার খাবার তৈরি করতাম।' তারা বলল, 'আপনার এ খাবারের আমাদের প্রয়োজন নেই। আপনি মক্কা ছাড়ুন।
এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব দ্রুত মক্কা থেকে বেরিয়ে সারাফে এসে অবস্থান করতে থাকেন এবং সেখানে মায়মুনার সাথে বাসর করেন।
ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম অবস্থায় মাইমুনা রা.-কে বিবাহ করেছেন।
'আবু রাফে' বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরামমুক্ত অবস্থায় হযরত মাইমুনা রা.-কে বিয়ে করেন। আর আমি তাদের দু-জনের মাঝে দূতিয়ালীর দায়িত্ব পালন করি।
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরাতুল কাযা'র সময়কালে হযরত মায়মূনা রা.-কে বিয়ে করেন। এ ব্যাপারে সকল সীরাতবিশেষজ্ঞ একমত। তবে ফকীহদের মধ্যে এ ব্যাপারে ভীষণ মতপার্থক্য রয়েছে যে, বিয়ের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম অবস্থান ছিলেন না হালাল অবস্থায়। ইবন হাজার রহ. এই মতপার্থক্যের সমন্বয় করতে গিয়ে বলেছেন, ইহরাম অবস্থায় বিয়ে সম্পন্ন হয়, আর মিলন হয় উমরা আদায়ের পর হালাল অবস্থায়।
তিনি খুব পরিচ্ছন্ন বিশ্বাস ও শুদ্ধ ধ্যান-ধারণার নারী ছিলেন। বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে তার স্বচ্ছ চিন্তা-বিশ্বাসের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন: একবার এক মহিলা অসুস্থ অবস্থায় মানত মানেন যে, আল্লাহ তাকে সুস্থ করলে বায়তুল মুকাদ্দাসে গিয়ে নামায আদায় করবেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এখন তিনি মানত পূর্ণ করতে বায়তুল মাকদাসে যাবেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি হযরত মায়মূনা রা.-এর নিকট বিদায় নিতে আসেন। হযরত মায়মূনা রা. তাকে বোঝালেন যে, মসজিদে নববীতে নামায আদায়ের সাওয়াব অন্য মসজিদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি। সুতরাং তুমি সেখানে না গিয়ে এখানে থাক।
হযরত মায়মূনা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৪৬টি, মতান্তরে ৭৬টি। তার মধ্যে সাতটি মুত্তাফাক আলাইহি। একটি বুখারী ও পাঁচটি মুসলিম স্বতন্ত্রভাবে বর্ণনা করেছেন। অন্যগুলো হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। তার থেকে বর্ণিত কিছু হাদীসের মাধ্যমে শরীয়তের গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়।
হযরত মায়মূনা রা.-এর নিকট থেকে যারা হাদীস শুনেছেন এবং বর্ণনা করেছেন, তাদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন, ইবনে আব্বাস রা. আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ ইবনুল হাদ, আবদুর রহমান ইবনুস সায়িব, ইয়াযীদ ইবনে আসাম, (তারা সবাই তাঁর বোনের ছেলে), 'উবায়দুল্লাহ আল-খাওলানী, নাদবা (দাসী), আতা ইবনে ইয়াসার মুসায়মান ইবনে ইয়াসার প্রমুখ।
**অন্তিম সময়**
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর হযরত মাইমুনা রা. নামায, রোযা, তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদতে জীবনের মূল্যবান সময়টুকু ব্যয় করতে থাকেন। এভাবেই এক সময় তিনি মহান রাব্বে কারীমের ডাকে সাড়া দেন। রাসূলের পরবর্তী খিলাফতে রাশেদার সম্মানিত খলীফাগণ তাঁকে ভীষণ সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন। হযরত আমীরে মুআবিআ রা. খিলাফতকালে তিনি পরপারে পাড়ি জমান।
তাঁর মৃত্যুর স্থানের ব্যাপারে আমরা একটি বিষয় জেনে নিতে পারি। ইয়াযীদ ইবনে আসাম হতে বর্ণিত, উম্মুল মুমিনীন মাইমুনা রা.-এর মক্কার জীবন বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের কেউই তখন মক্কায় ছিলেন না। তাই তিনি বললেন, আমাকে মক্কা থেকে নিয়ে যাও, কারণ আমি এখানে মারা যাব না। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন, আমি মক্কায় মারা যাব না।
তাঁর জীবনের এটাও এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা যে, একদিন যে সারাফ নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করে প্রথম মিলিত হন, তার প্রায় ৪৪ বছর পর সেখানেই ইন্তেকাল করেন। যে স্থানটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বাসর করেন, ঠিক সেখানেই সমাহিত হন। ইয়াযীদ ইবনে আসাম বলেন, 'আমি ও ইবনে আব্বাস রা. মাইমুনা রা.-কে দাফন করি। ৫১ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
হযরত আয়েশা রা. হযরত মায়মূনা রা.-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, আমাদের মধ্যে মায়মূনা সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয় করতেন এবং সবচেয়ে বেশি আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখতেন।
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّتٍ وَنَهَرٍ فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِيكٍ مُّقْتَدِرٍ
নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণাধারার মধ্যে। যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতির নিকটে।
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৩০১. ইবনে আসাকির হাদীসটি হযরত উমর রা. হতে বর্ণনা করেছেন। আলবানী সহীহুল জামে, ৩২০৭ নম্বরে হাদীসটি বিশুদ্ধ বলেছেন।
৩০২. আল ইসাবাহ, ৮/৪৫০।
৩০৩. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৩৭২।
৩০৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৯।
৩০৫. হায়াতুস সাহাবা, ২/৬৬৫।
৩০৬. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১৮৩৭; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪১০।
৩০৭. মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩৯৩; সুনান, তিরমিযী, হাদীস নং ৮৪১।
৩০৮. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৩৩-১৩৬।
৩০৯. আসাহহুস সিয়ার, ৬৪৯।
৩১০. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৩৯।
৩১১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৯।
৩১২. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৩৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ৪/৩১।
৩১৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৩৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ৪/৩২।
৩১৪. সূরা কামার, ৫৪: ৫৪-৫৫।
📄 ফাতিমা বিনতে রাসূলিল্লাহ সা.
জান্নাতী নারীদের নেত্রী
হযরত ফাতিমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কতখানি প্রিয় ছিলেন, তা উপলব্ধি করাও আমাদের সাধ্যের বাইরে। তবে এটুকু মোটামুটি বলা যায়— সায়্যিদা হযরত ফাতিমা রা. ছিলেন তাঁর মহামহিম পিতার সত্তার গভীরে, অস্তিত্বে একাকার হয়ে।
জন্ম ও শুভ সূচনা
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতলাভের পাঁচ বছর পূর্বে উম্মুল কুরা তথা মক্কা নগরীতে হযরত ফাতিমা রা. জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আল্লাহর রাসূল আবুল কাসিম মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে আব্দুল মাত্তালিব এবং মাতা সারা বিশ্বের নারীজাতির নেত্রী, প্রথম মুসলমান উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা.।
সায়্যিদা ফাতিমা রা.-এর যখন জন্ম হয় তখন মক্কার কুরাইশরা পবিত্র কাবা ঘরের সংস্কার কাজ চালাচ্ছে; সেটা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতলাভের পাঁচ বছর পূর্বের ঘটনা। ফাতিমার জন্মগহণে তাঁর মহান পিতা-মাতা দারুণ খুশি হন। ফাতিমা ছিলেন কনিষ্ঠা মেয়ে। মা খাদীজা রা. তাঁর অন্য সন্তানদের জন্য ধাত্রী রাখলেও ফাতিমাকে ধাত্রীর হাতে ছেড়ে দেননি। তিনি তাঁর অতি আদরের ছোট মেয়েকে নিজে দুধ পান করান। এভাবে হযরত ফাতিমা রা. একটি পূতঃপবিত্র গৃহে তাঁর মহান পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন এবং নবুয়তের স্বচ্ছ ঝর্ণাধারায় স্নাত হন।
পবিত্রতম সান্নিধ্যে
হযরত ফাতিমার রা. মহত্ত্ব, মর্যাদা, আভিজাত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের মধ্যে উল্লেযোগ্য হচ্ছে :
✓ তাঁর পিতা মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম আ.-এর শ্রেষ্ঠ সন্তান রাহমাতুল্লিল আলামীন আমাদের মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
✓ তাঁর মা বিশ্বের নারীজাতির নেত্রী, প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা.।
✓ স্বামী দুনিয়া ও আখিরাতের নেতা আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী রা.।
✓ তাঁর দুই পুত্র হাসান ও হোসাইন রা. জান্নাতের যুবকদের দুই মহান নেতা এবং রাসূলুল্লাহর রা. সুগন্ধি।
✓ তাঁর এক দাদা শহীদদের মহান নেতা হযরত হামযা রা.।
✓ অন্য এক দাদা প্রতিবেশীর মান-মর্যাদার রক্ষক, বিপদ-আপদে মানুষের জন্য নিজের অর্থ-সম্পদ খরচকারী, উলঙ্গ ব্যক্তিকে বস্ত্র দানকারী, অভুক্ত ও অনাহার-ক্লিষ্টকে খাদ্য দানকারী হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব রা.।
✓ তাঁর এক চাচা মহান শহীদ নেতা ও সেনানায়ক হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.।
উল্লিখিত গৌরবের অধিকারী বিশ্বের নারীজাতির মধ্যে আর কেউ কি আছে?
অগ্রগামী মুসলিম
হযরত রাসূলে কারীমের রা. ওপর ওহী নাযিল হবার পর উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা. প্রথম তার প্রতি ঈমান আনেন এবং তার রিসালাতকে সত্য বলে গ্রহণ করেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি প্রথম পর্বে যেসব মহিলা ঈমান আনেন তাদের পুরো ভাগে ছিলেন তার পূতঃপবিত্র কন্যাগণ। তারা হলেন—যায়নাব, রুকাইয়্যা, উম্মে কুলসূম ও ফাতিমা রা.। তারা তাদের পিতার নবুওয়াত ও রিসালাতের প্রতি ঈমান আনেন তাদের মহীয়সী মা খাদীজার রা. সাথে।
ইবন ইসহাক হযরত আয়েশা রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ যখন তার নবীকে নবুয়তে ভূষিত করলেন তখন খাদীজা ও তার কন্যারা ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যারা তাদের মায়ের সঙ্গে সূচনাতেই ইসলামের আঙিনায় প্রবেশ করেন এবং তাদের পিতার রিসালাতে বিশ্বাস স্থাপন করেন। নবুওয়াতলাভের পূর্বেই তারা উন্নত নৈতিক গুণাবলীতে বিভূষিত হন। ইসলামের পরে তা আরও সুশোভিত হয়ে ওঠে।
শৈশব-কৈশোরে পিতার সহযোগিতা
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিল হলো। তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ মতো মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে লাগলেন এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করলেন। আর এজন্য তিনি যত দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, অত্যাচার নির্যাতন, অস্বীকৃতি, মিথ্যা দোষারোপ ও বাড়াবাড়ির মুখোমুখি হলেন, সবকিছুই তিনি উপেক্ষা করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে চরম বাড়াবাড়ি ও শত্রুতা করতে লাগল। তারা তাকে ঠাট্টাবিদ্রুপ করতে লাগল, তার প্রতি মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতে আরম্ভ করল। হযরত ফাতিমা রা. তখন জীবনের শৈশব অবস্থা অতিক্রম করছেন। পিতা যে তার জীবনের একটা কঠিন সময় অতিবাহিত করছেন, মেয়ে ফাতিমা এত অল্পবয়সেও তা বুঝতে পারতেন। অনেক সময় তিনি পিতার সাথে ধারে-কাছে এদিক ওদিক যেতেন।
একবার দুরাচারী উকবা ইবনে আবি মুয়াইতকে তার পিতার সাথে এমন একটি নিকৃষ্ট আচরণ করতে দেখেন যা তিনি আজীবন ভুলতে পারেননি। এই উকবা নিজেকে মক্কার কুরাইশ বংশের বলে পরিচয় দিত। আসলে তার জন্মের কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিল না। একজন নিকৃষ্ট ধরনের পাপাচারী ও দুর্বৃত্ত হিসেবে সে বেড়ে ওঠে। তার জন্মের এই কালিমা ঢাকার জন্য সে সব সময় আগ বাড়িয়ে নানা রকম দুষ্কর্ম করে কুরাইশ নেতৃবৃন্দের প্রীতিভাজন হওয়ার চেষ্টা করত।
উরওয়া ইবনে যুবায়র রহ. বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা.-এর নিকটে বললাম, মক্কার মুশরিক কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সর্বাপেক্ষা কঠোর আচরণের বর্ণনা দিন। তিনি বললেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা শরীফের হিজর নামক স্থানে সালাত আদায় করছিলেন। তখন উকবা ইবনে আবু মুয়াইত এলো এবং তার চাদর দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কণ্ঠনালি পেঁচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলল। তখন আবু বকর রা. এগিয়ে এসে উকবাকে কাঁধে ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হতে হটিয়ে দিলেন এবং বললেন, 'তোমরা এমন লোককে হত্যা করতে চাও যিনি বলেন, একমাত্র আল্লাহই আমার রব।'³¹⁵
সেই কিশোরী বয়সে ফাতিমা পিতার হাত ধরে একদিন গেছেন কাবার আঙিনায়। তিনি দেখলেন, পিতা যেই না হাজারে আসওয়াদের কাছাকাছি গেছেন অমনি মুশরিকদের একদল একযোগে তাকে ঘিরে ধরে বলতে লাগল, 'আপনি কি সেই ব্যক্তি নন যিনি এমন এমন কথা বলে থাকেন?' তারপর তারা এক এক করে বলতে থাকে 'আপনি আমাদের বাপ-দাদাদের গালি দেন, উপাস্যদের মন্দ বলেন, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোকদেরকে নির্বোধ ও বোকা মনে করেন।'
তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমিই সেই ব্যক্তি।
এর পরের ঘটনা দেখে বালিকা ফাতিমার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তিনি ভয়ে অসাড় হয়ে পড়েন। দেখেন, তাদের একজন তার পিতার গায়ের চাদরটি তার গলায় পেঁচিয়ে জোরে টানতে শুরু করেছে। আর আবু বকর রা. তাদের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত উত্তেজিত কণ্ঠে বলছেন, তোমরা একটি লোককে শুধু এ জন্য হত্যা করবে যে, তিনি বলেন: আল্লাহ আমার রব, প্রতিপালক?
লোকগুলো আগুনঝরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। তার দাড়ি ধরে টানল, তারপর মাথা ফাটিয়ে রক্ত ঝরিয়ে ছাড়ল।³¹⁶ আরেক হাদীসে এসেছে,
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদারত অবস্থায় ছিলেন। অন্য সূত্রে আহমাদ ইবনে উসমান রহ. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা বায়তুল্লাহর পাশে সালাত আদায় করছিলেন এবং সেখানে আবু জাহাল ও তার সাথীরা বসা ছিল। এমন সময় তাদের একজন অন্যজনকে বলে উঠল 'তোমাদের মধ্যে কে অমুক গোত্রের উটনীর নাড়িভুঁড়ি এনে মুহাম্মাদ যখন সিজদা করেন তখন তার পিঠের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে'? তখন গোত্রের বড় পাষণ্ড (উকবা) তাড়াতাড়ি গিয়ে তা নিয়ে এলো এবং তার প্রতি লক্ষ্য রাখল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সিজদায় গেলেন, তখন সে তার পিঠের ওপর দুই কাঁধের মাঝখানে তা রেখে দিল।
ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি (এ দৃশ্য) দেখছিলাম; কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। হায়! আমার যদি বাধা দেবার শক্তি থাকত! তিনি বলেন, তারা হাসতে লাগল এবং একে অন্যের ওপর লুটোপুটি খেতে লাগল। আর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সিজদায় থাকলেন, মাথা উঠালেন না। অবশেষে ফাতিমা রা. এসে সেটি তার পিঠের ওপর হতে ফেলে দিলেন।
অতঃপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আল্লাহ, আপনি কুরাইশকে ধ্বংস করুন। এরূপ তিনবার বললেন। তিনি যখন তাদের বদ দুআ করেন তখন তা তাদের অন্তরে ভয় জাগিয়ে তুলল। বর্ণনাকারী বলেন, তারা জানত যে, এ শহরে দুআ কবুল হয়। অতঃপর তিনি নাম ধরে বললেন, হে আল্লাহ, আবু জাহালকে ধ্বংস করুন এবং উতবাহ ইবনে রবীআহ, শায়বাহ ইবনে রবীআ, ওয়ালীদ ইবনে উতবাহ, উমাইয়াহ বিন খালাফ ও উকবাহ ইবনে আবি মুআইতকে ধ্বংস করুন। রাবী বলেন, তিনি সপ্তম ব্যক্তির নামও বলেছিলেন কিন্তু তিনি স্মরণ রাখতে পারেননি। ইবনে মাসউদ রা. বলেন, সেই সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের নাম উচ্চারণ করেছিলেন, তাদের আমি বদরের কূপের মধ্যে নিহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।³¹⁷
এভাবে আবু বকর রা. সেদিন নিজের জীবন বিপন্ন করে পাষণ্ডদের হাত থেকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ছাড়ালেন। ছাড়া পেয়ে তিনি বাড়ির পথ ধরলেন। মেয়ে ফাতিমা পিতার পেছনে পেছনে চললেন। পথে স্বাধীন ও দাস যাদের সাথে দেখা হলো, প্রত্যেকেই নানা রকম অশালীন মন্তব্য ছুঁড়ে ভীষণ কষ্ট দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোজা বাড়িতে গেলেন এবং মারাত্মক রকমের বিধ্বস্ত অবস্থায় বিছানায় এলিয়ে পড়লেন। বালিকা ফাতিমার চোখের সামনে এ ঘটনা ঘটল।³¹⁸
অবরুদ্ধ সময়ের সেই দুঃসহ যন্ত্রণা
৬ষ্ঠ হিজরীতে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও হযরত উমর রা. ইসলাম গ্রহণ করেন তখন কুরাইশ গোত্রের মুশরিকরা প্রচণ্ড রাগান্বিত হলো। তাদের ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেল। কুরাইশ গোত্রের সকল লোক এই সিদ্ধান্ত করল যে, যতদিন বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব মুহাম্মাদকে হত্যা করার জন্য তাদের কাছে অর্পন না করবে ততদিন তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখা যাবে না। তাদের কাছে কোনো জিনিস বিক্রয় করা যাবে না। তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না, তাদের খোলা জায়গায় থাকতে দেওয়া যাবে না, এই সিদ্ধান্ত লিখে সবাই এতে দস্তখত করল, কেউ কেউ টিপ দিল। এরপর তা কাবা শরীফের দেয়ালে ঝুলিয়ে দিল।
যখন বনু হাশিমের এই ভয়াবহ বয়কট সম্পর্কে জানা হলো, তখন তারা দিশেহারা হননি, তারা তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করল। বংশের সম্মানীত ব্যক্তি আবু তালিব বনু হাশিম ও আব্দুল মুত্তালিবের পরিবারের সকল সন্তানাদি নিয়ে শিয়াবে আবি তালিবে আশ্রয় নিলেন। তাদের মধ্যে বৃদ্ধা, যুবতী মহিলা ও শিশুরাও ছিল। শুধু মাত্র আবু লাহাব ও তার অধীন কয়েকজন মুশরিকদের পক্ষাবলম্বনকারী ছিল।
মক্কার মুশরিকরা ১লা মুহাররম ৭ হিজরীতে শিয়াবে আবি তালিব ঘেরাও করল। আর এমন কঠোরভাবে ঘেরাও করল যে, বাহির থেকে কোনো খাবার ভেতরে ঢুকতে দিত না। যদি কোনো ব্যবসায়ী খাবার বিক্রি করার জন্য আসত, তাহলে তার সব খাবার ক্রয় করে নিত; যাতে করে শিয়ায়ে আবি তালিবে আবদ্ধ এমন কেউ আর কোনো খাবার ক্রয় করতে না পারে।
বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের শিশুরা যখন ক্ষুধার যাতনায় চিৎকার করত, তখন মুশরিকরা খুব আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠত। মহিলাদের স্তনের দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। অবরুদ্ধদের মুখে কয়েকদিনেও কোনো খাবার জুটত না। যদি কখনো হাশিমী গোত্রের লোকেরা ছাড়া অন্য কোনো কিছু গোপন, জানবাজি রেখে নিয়ে আসত, তাহলে এর পরিমাণ হতো একেবারে কম—এক-দুদিনও যেত না। অবরুদ্ধরা ক্ষুধার যাতনায় গাছের পাতা ভক্ষণ করত।
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস একদিন প্রাকৃতিক প্রয়োজনে একটু দূরে কোনো এক স্থানে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি এক টুকরো চামড়া পড়ে থাকতে দেখলেন। তিনি সেটা উঠিয়ে নিলেন, ধৌত করলেন, রান্না করলেন এবং সেটা ভক্ষণ করলেন।
মোটকথা, বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব ধারাবাহিক তিন বছর শিয়ায়ে আবি তালিবে অবরুদ্ধ জীবন যাপন করেন। কষ্ট ও দুঃখের যে পরিমাণ সহ্য করেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। হযরত ফাতিমাতুয যাহরা রা. তার পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের সঙ্গে মুসিবতের সময় অবরুদ্ধ অবস্থায় কষ্টকর জীবন কাটিয়েছেন। সকল দুঃখ কষ্টকে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন।
তিন বছরে যখন হজের মওসুম আসত তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুয়াবে আবি তালিব থেকে বের হতেন। মানুষকে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। হতভাগ্য আবু লাহাব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেছনে পেছনে যেত এবং বলত আমার এই ভাতিজা পাগল হয়ে গেছে (নাউযুবিল্লাহ) তার কথায় তোমরা কর্ণপাত করবে না। অন্যথায় তোমাদের সীমাহীন ক্ষতি হবে।
মুশরিকদের মধ্যে কয়েকজন এমনও ছিল যাদের হৃদয় বনু হাশিমের দুঃখ-কষ্ট দেখে নরম হতো; কিন্তু প্রকাশ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা করলে সকল মুশরিকদের রোষানলে পড়তে হবে—এই ভেবে নীরব থাকে।
একদিনের একটি আশ্চার্যকর ঘটনা, উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা রা.-এর ভাতিজা হাকীম ইবনে হিসাম (যিনি তখনো মুসলমান হননি) তার গোলামের হাতে কিছু গম দিয়ে বলল, 'এগুলো আমার ফুফু হযরত খাদিজা রা.-এর কাছে পৌঁছে দিয়ো।' গোলাম গম নিয়ে রওনা হলো। রাস্তায় আবু জাহেলের সঙ্গে দেখা হলো। আবু জাহেল বলল, 'গমের বস্তা নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?' গোলাম বলল, 'শিয়াবে আবি তালেবের অবরুদ্ধদের কাছে।' আবু জাহেল তাকে বাধা দিল এবং বলল, 'এটা কখনো হতে পারে না। বনু হাশিমকে আমরা গমের একটি দানাও দেব না।'
ঘটনাক্রমে আবুল বুখতারী ইবনে হিশাম মুশরিকদের একদলের সর্দার। তবে মুসলমানদের দুঃখ কষ্টের জন্য তার মন কাঁদত। তিনি ওই দিক দিয়েই যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, 'তোমরা পরস্পর কেন ঝগড়া করছ?' তখন আবু জাহেল পুরো ঘটনা বলল।
আবুল বুখতারী সবকিছু শুনে বললেন, 'খাদিজা তার ভাতিজার কাছে কিছু গম আমানত রেখেছিল। সে এগুলো ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছে। এতে আমাদের অসুবিধা কী?'
আবু জাহেল বলল, 'তুমি বনু হাশিমের কল্যাণকামী মনে হচ্ছে। এই গমের বস্তা শিয়াবে আবি তালেবে পৌঁছতে পারবে না। এটাই শেষ কথা।'
আবুল বুখতারী রেগে গেলেন। ধমক দিয়ে বললেন, 'ঠিক আছে দেখা যাবে কীভাবে তুমি বাঁধা দাও। এই গম বনু হাশিমের লোকদের নিকট পৌঁছবেই।'
তিনি আবু জাহেলকে যমীনে ফেলে দিলেন এবং খুব পিটালেন। পিটিয়ে তাকে রক্তাক্ত করে ফেললেন। আবুল বুখতারীর সঙ্গে সে না পেরে আবু জাহেল স্থান ত্যাগ করল। তারপর হাকীম ইবনে হিসামের গোলাম শিয়াবে আবি তালিবে গমের বস্তা পৌঁছে দিল।
আবু জাহলের অপমান হওয়ার কথা ফাঁস হয়ে গেলে মানুষ বিভিন্ন রকম কথা বলা শুরু করল। আর কিছু লোক প্রকাশ্যে অবরুদ্ধদের সঙ্গে সহমর্মিতা শুরু করে দিলেন। বনু মাখযুমের এক সুহৃদয় ব্যক্তি হিশাম আমেরী আব্দুল মুত্তালিবের নাতী যুহাইর ইবনে আবু উমাইয়্যার কাছে গেলেন, বলতে লাগলেন, 'হে যুহাইর, তুমি কীভাবে এটা করতে পারলে যে, তুমি দুবেলা পেট ভর্তি করে খাও আর তোমার মামা একটি রুটির টুকরাও খেতে পারে না!' যুহাইর বলল, 'হে চাচাতো ভাই, যদি আমার সাধ্য থাকত, তাহলে এই নাপাক অঙ্গীকার আমি ভেঙে ফেলতাম।' কিন্তু আফসোস, আমি একা। একা তো আর পারি না। হিসাম বললেন, আমি তোমার সঙ্গে আছি। তুমি একা নও। হিম্মত করো। আরও সাথী পাবে।
যুহাইর ও হিশাম উভয়ে মুতইম ইবনে আদী এর কাছে গেলেন, যেখানে যুমআ ইবনে আসওয়াদ ও আবুল বুখতারীকেও সামনে পেলেন। দ্বিতীয় দিন বনু হাশিমের ও মুত্তালিবের সকল কল্যাণকামী কাবা ঘরে গেলেন, কুরাইশদের একত্র করে বললেন, 'হে কুরাইশ, এটা কি যুলুম নয় যে, আমরা পেট ভর্তি করে খাব, আর বনু হাশিম ও মুত্তালিব যারা আমাদের ভাই, তারা অনাহারে থাকবে? গমের একটি দানাও পর্যন্ত তারা পাচ্ছে না। তাদের শিশু ও মহিলারা ক্ষুধার তাড়নায় ধ্বংস হতে চলেছে। আল্লাহর কসম! যতক্ষণ এই সিদ্ধান্ত ভেঙে ফেলা না হবে, আমরা শান্তি পাব না।'
আবু জাহেল রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল। কারও ক্ষমতা নেই; এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের। এই সিদ্ধান্ত ততদিন বলবৎ থাকবে যতদিন বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব মুহাম্মদকে আমাদের হাতে অর্পণ না করবে।
যুমআ ইবনে আসওয়াদ বলল, 'তুমি মিথ্যা কথা বলছ। আমরা তো প্রথম দিনেই এই সিদ্ধান্তে রাজি ছিলাম না।' মুতইম ইবনে আদী ও আবুল বুখতারী হাত বাড়িয়ে চুক্তিপত্রটি কাবা থেকে নামিয়ে সেটি টুকরো টুকরো করে বাতাসে উড়িয়ে দিল। মুশরিকরা তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এরপর ঘুমআ, আবুল বুখতারী, যুহাইর, মুতইম ও অন্যান্য সাথীরা একসঙ্গে শিয়াবে আবি তালিবে পৌঁছে অবরুদ্ধদের বের করে আনলেন। তিন বছর অবর্ণনীয় কষ্ট করার পর তারা আবার নিরাপদ জীবন করতে লাগলেন। এক- দুদিন নয়, এক-দু সপ্তাহ নয়, এক-দুমাস নয়, ধারাবাহিক তিন বছর কষ্ট, যাতনা সহ্য করেছেন। তাদের হিম্মত ভাঙেনি। দৃঢ়তার এমন পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন যে, ইতিহাস এর দৃষ্টান্ত পাওয়া কঠিন। দৃঢ়তার এই সময়ে শিশু হযরত ফাতিমা রা. নিজের পিতা মাতার সঙ্গে অটল অবিচল ছিলেন। এই কষ্ট সহ্য করেছেন।
এই অবরুদ্ধদের মধ্যে ফাতিমাও রা. ছিলেন। এই অবরোধ তার স্বাস্থ্যের ওপর দারুণ প্রভাব ফেলে। এখানে অনাহারে থেকে যে অপুষ্টির শিকার হন তা আমরণ বহন করে চলেন।³¹⁹
খাদীজা রা.-এর ইন্তেকাল
অবরুদ্ধ জীবনের দুঃখ-বেদনা ভুলতে তিনি আরেকটি বড় রকম দুঃখের মুখোমুখী হন। স্নেহময়ী মা হযরত খাদীজা রা.- যিনি তাদের সবাইকে আগলে রেখেছিলেন, যিনি অতি নীরবে পুণ্যময় নবীগৃহের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে চলছিলেন, ইন্তেকাল করেন। তিনি আল্লাহর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাবতীয় দায়িত্ব যেন কন্যা ফাতিমার ওপর অর্পণ করে যান। তিনি অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়তার সাথে পিতার পাশে এসে দাঁড়ান। পিতার আদর ও স্নেহ বেশি মাত্রায় পেতে থাকেন। মদীনায় হিজরতের আগ পর্যন্ত মক্কায় পিতার দাওয়াতী কার্যক্রমের সহযোগী হিসেবে অবদান রাখতে থাকেন। আর এ কারণেই তার ডাকনাম হয়ে যায়—‘উম্মু আবীহা’ (তাঁর পিতার মা)।³²⁰
পবিত্র হিজরত
হযরত আয়েশা রা. বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করেন। তখন তিনি আমাকে এবং তাঁর মেয়ে হযরত ফাতিমাকে মক্কায় রেখে যান। যখন নবীজী মদীনায় পৌঁছেন তখন তিনি হযরত যায়িদ বিন হারেসা রা.-কে প্রেরণ করেন এবং তাঁর সঙ্গে গোলাম আবু রাফে'কে পাঠান। তাঁদের দুজনকে দু-টি উট এবং সঙ্গে আবু বকর রা.-এর কাছ থেকে পাঁচশত দিরহাম নিয়ে তাঁদের দুজনকে এই জন্য দিয়ে দেন যে, যখন প্রয়োজন পড়বে তখন সওয়ারি কিনবে এবং তাঁদের দুজনের সঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতকে দুই বা অথবা তিনটি উট দিয়ে পাঠান এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা.-কে এই চিঠি লিখে পাঠান যে, আমার মা রুম্মান এবং আমাকে এবং আমার বোন আসমা যিনি হযরত যুবায়ের রা.-এর বিবি ছিলেন, আমাদেরকে সওয়ারির ওপর বসিয়ে যেন রওনা করিয়ে দেয়।
এই তিনজন মদীনা থেকে একসঙ্গে রওনা দেন। কাদীদ নামক স্থানে পৌঁছে হযরত যায়িদ রা. ওই পাঁচশত দিরহাম দিয়ে আমাদের জন্য তিনটি উট ক্রয় করেন। অতঃপর মক্কায় প্রবেশ করলে তাঁর সঙ্গে তালহা বিন উবায়দুল্লাহ রা.-এর সঙ্গে দেখা হয়। তিনিও হিজরতের জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। এরপর আমরা সকলে মক্কা থেকে রওনা হই। আবু রাফে ও যায়িদ ইবনে হারিসার সঙ্গে ফাতিমা, উম্মে কুলসুম, সাওদা বিনতে যামআ রা., উম্মে আইমান ও উসামা ইবনে যায়িদ যাত্রা করে। যায়িদ রা. উম্মে আইমান ও উসামাকে একটি উটের ওপর আরোহণ করান। যখন আমরা বাইদা নামক স্থানে পৌঁছি, তখন আমার উট ভয় পেয়ে গেল। উটটি কাফেলা থেকে দ্রুত গতিতে ছুটে পালালো। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি হাওদা ছিটকে পড়বে। আমি হাওদায় ছিলাম। আমার সঙ্গে আমার মা ছিলেন। তখন আমার মা বলতে লাগলেন, 'হায়! আমার কন্যা! হায় দুলহান! (কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল হিজরতের আগে)। পরিশেষে উটটিকে বশে আনা হয়।
যখন আমরা মদীনায় পৌঁছি, তখন পিতা আবু বকর আমাকে নামিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে পৌঁছে দেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদ নির্মাণ করছিলেন। মসজিদের পাশে আরেকটি ছোট ঘর তৈরি করেন এবং তার মধ্যে আমাকে রাখেন।³²¹
আলী রা.-এর সাথে বিয়ে
আনসার ও মুহাজিরদের এক দল হযরত আলী রা.-কে ফাতিমা রা.-এর বিবাহের পয়গাম পৌঁছাবার প্রতি উৎসাহিত করলেন। হযরত আলী রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হলেন এবং আসল উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেন, 'আহলান ওয়া মারহাবান; খোশ আমদেদ।' পরে চুপ হয়ে গেলেন। সাহাবা রা.-এর জামাত বাহিরে অপেক্ষমাণ। হযরত আলী রা. তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জওয়াব শোনালেন। তারা হযরত আলী রা.-কে মুবারকবাদ দিয়ে বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন।
এক বর্ণনায় এটাও আছে যে, হযরত আলী রা.-কে এক আযাদকৃত বাঁদী একদিন জিজ্ঞাসা করল, কে হুজুরের কাছে ফাতিমা রা.-এর প্রস্তাব পাঠিয়েছে? হযরত আলী রা. জওয়াব দিলেন, আমি জানি না। সে বলল, 'আপনি কেন প্রস্তাব দেননি?' আলী রা. বললেন, 'আমার কি আছে যে আমি বিয়ে করব?' এই সৌভাগ্য হযরত আলী মুরতাযা রা.-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে পাঠাল। তিনি নবীর দরবারে হাযির হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শান-শওকত আর স্বভাবগত লজ্জায় মুখে কিছু না বলে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তাকে জিজ্ঞাস করলেন, 'আলী, অভ্যাস বহির্ভুত একেবারে চুপচাপ আছ, তুমি কি ফাতিমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছ?' হযরত আলী রা. বললেন, 'অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কাছে মোহর আদায় করার মতো কিছু আছে?'
হযরত আলী রা. উত্তর দিলেন, 'একটি লৌহবর্ম আর একটি ঘোড়া ছাড়া আর কিছুই নেই।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ঘোড়া তো যুদ্ধের জন্য আবশ্যক। লৌহবর্ম বিক্রি করে এর মূল্য নিয়ে আসো।' হযরত আলী রা. নববী আদেশের প্রতি মাথা অবনত করলেন। এরপর হযরত আলী রা. লৌহবর্ম বিক্রি করার জন্য সাহাবীদের সামনে পেশ করলেন। হযরত উসমান রা. ৪৮০ দিরহাম দিয়ে লৌহবর্ম কিনে নিলেন। অতঃপর হাদিয়া স্বরুপ হযরত আলী রা.-কে ফেরত দিলেন। হযরত আলী রা. এ সম্পদ নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উসমান রা.-এর জন্য কল্যাণের দুআ করলেন। এর মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমার সন্তুষ্টি অর্জন করে নিলেন। হযরত আলী রা. লৌহবর্মের বিক্রয়মূল্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে পেশ করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, দুই তৃতীয়াংশ সুগন্ধি ইত্যাদির পেছনে খরচ করো। আর এক তৃতীয়াংশ দিয়ে বিয়ের আসবাব ও পারিবারিক কাজে ব্যয় করো। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আনাস বিন মালেককে হুকুম দিলেন যাও, আবু বকর, উমর, তালহা, যুবাইর, আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. এবং অন্যান্য মুহাজির ও আনসারদেরকে মসজিদে ডাক।
হযরত আনাস রা.-এর বয়ান হলো, এর আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী আসার সময় যে অবস্থা হয় সে রকম অবস্থার অবতারণা হলো, এমন অবস্থা যখন দূর হয়ে গেল তখন তিনি বললেন, জিবরাঈল আমীন আ. আল্লাহর পক্ষ থেকে এই পয়গাম নিয়ে এসেছেন যে, ফাতিমা রা.-এর বিবাহ আলী রা.-এর সঙ্গে দিয়ে দিন। যখন দরবারে রিসালাত মসজিদে নববীতে অনেক সাহাবা রা. একত্র হলেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বারে এসে বললেন, 'হে মুহাজির ও আনসারদের জামাত, আল্লাহ তাআলা ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবাহ আলী ইবনে আবি তালিবের সঙ্গে দেওয়ার আদিষ্ট হয়েছেন। আমি তোমাদের সামনে ওই হুকুম আদায় করছি।' এরপর তিনি এই খুতবা পাঠ করলেন,
প্রশংসা আল্লাহর জন্য-যিনি তার নেয়ামতের কারণে সমস্ত প্রশংসার হকদার এবং তার কুদরতের কারণে ইবাদতের হকদার, তার ক্ষমতা সকল জায়গায় প্রতিষ্ঠিত, তার হুকুম যমীন ও আসমানে প্রযোজ্য, তিনি তার নিজ কুদরতে সমস্ত মাখলুককে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তার হুকুমের মাধ্যমে তাদের পরস্পরে পার্থক্য করেছেন এবং তার দ্বীনের মাধ্যমে ইজ্জত দান করেছেন এবং তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা বিবাহ শাদীকে এক আবশ্যক বিষয় নির্ধারণ করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা ওই পাবত্র সত্তা যিনি মানুষকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর পরস্পরে নারী-পুরুষ বানিয়েছেন। আপনার প্রতিপালক সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ তাআলা সবকিছুকে ক্ষমতা ও ফয়সালার অধীন করে দিয়েছেন। এবং তার ক্ষমতা ও ফায়সালার এক সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর সবকিছু তার নির্ধারিত সময়েই পূর্ণ হয়। আর সকল সময়ের একটি লিপিকা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা যা চান এর থেকে মুছে দেন আর যা চান বহাল রাখেন। তার তাকদীরের লিপিকা। (লওহে মাহফুজে)।
খুতবার পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকি হেসে আলী রা.-কে বললেন, 'আমি চারশত মিসকাল রূপার মোহরের বিনিময়ে ফাতিমাকে তোমার কাছে বিবাহ প্রদান করলাম। কি তুমি কবুল?' হযরত আলী রা. বললেন, 'জি, হ্যাঁ!' এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করলেন,
جَمَعَ اللَّهُ شَمْلَكُمَا وَأَسْعَدَ جِدَّكُمَا وَبَارَكَ عَلَيْكُمَا وَأَخْرَجَ مِنْكُمَا ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً
আল্লাহ তাআলা তোমাদের মধ্যে একতা দান করুন এবং তোমাদের চেষ্টাকে সফলকাম করুন, তোমাদের ওপর বরকত দান করুন এবং তোমাদের থেকে উত্তম সন্তান দান করুন।
তারপর সকলে মিলে কল্যাণ ও বরকতের দুআ করলেন। এবং একপাত্র খেজুর উপস্থিতদের মাঝে ছিটিয়ে দিলেন। কারও কথা অনুযায়ী উপস্থিতদের মাঝে মধুর শরবত ও খেজুর বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। অন্য এক বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে খুরমা বণ্টন করেছিলেন। এর ওপর ভিত্তি করেই কোনো ফকীহ বিবাহের সময় খুরমা অথবা বাদাম বা চিনি ছিটানোকে মুস্তাহাব বলেছেন।³²²
এক বর্ণনায় আছে, যখন ফাতিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিদায় নিয়ে স্বামীর ঘরে যাচ্ছিলেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রা.-কে বললেন, আমার জন্য অপেক্ষা করো। তারপর হযরত আলী রা. এবং হযরত ফাতিমা রা. তাদের ঘরে গিয়ে এক প্রান্তে বসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর সরওয়ারে আলম ঘরের দরজায় গিয়ে উপস্থিত হলেন। এবং ভেতরে আসার অনুমতি চাইলেন। হযরত উম্মে আইমান রা. দরজা খুলে আসলে তাদের দুজনের মাঝে কথোপকথন হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার ভাই এখানে আছে? হযরত উম্মে আইমান রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, তিনি আপনার ভাই হন কী করে? আপনি তো তার কাছে আপনার কন্যা বিবাহ দিয়েছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ এটা জায়েয। এখানে কি আসমা বিনতে উমাইসও আছে? সে কি আল্লাহর রাসূলের মেয়ের সম্মান ও মর্যাদার জন্য এসেছে?
হযরত উম্মে আইমান বললেন, জী হ্যাঁ। আসমা বিনতে উমাইসও এসেছেন। আমি আর তিনি আল্লাহর রাসূলের মেয়ের সম্মান ও মর্যাদার জন্য এসেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে আইমানকে কল্যাণের দুআ করে ভেতরে এসে পানি চাইলেন। এক কাঠের পেয়ালা বা অন্য কোনো পাত্রে করে পানি পেশ করা হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের থেকে কিছু পান করলেন অথবা এর থেকে তার হাতে ঢেলে এবং আল্লাহর মর্জি মোতাবেক এর ওপর কিছু পড়ে হযরত আলী রা.-এর সামনে এনে তার দুই, দুই বাহু ও বুকের ওপর ছিটিয়ে দিলেন। তারপর ফাতেমা রা.-কে ডাকলেন। তিনি লজ্জিত হয়ে সামনে আসলেন তার উপরও পানি ছিটিয়ে দিলেন আর বললেন, হে ফাতিমা! আমি আমার বংশের সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তির কাছে তোমাকে বিয়ে দিয়েছি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের কন্যা হযরত ফাতিমাতুয যাহারা রা.-কে হযরত আলী রা.-এর সঙ্গে বিবাহ দিলেন। যখন হযরত ফাতিমা স্বামীর গৃহে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি হযরত আলী রা.-এর গৃহে একটি খাট, একটি মটকা, আর একটি চামড়ার পাত্র ছাড়া কিছুই দেখতে পাননি। যমীনে পাথরের বিছানা বিছানো ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবর পাঠালেন : যতক্ষণ আমি না আসি ততক্ষণ হযরত ফাতিমার কাছে যাবে না। কিছুক্ষণ পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করলেন। তিনি পানি আনার জন্য বললেন। পানি আনা হলো। তিনি পানিতে কিছু দুআ-যিকির পড়ে ফুঁক দিলেন। এরপর হযরত আলী রা.-এর চোহারায় কিছু পানি ছিটিয়ে দিলেন। এরপর হযরত ফাতিমা রা.-কে ডাকলেন। হযরত ফাতিমা লজ্জায় অবনত হয়ে হাযির হলেন। তিনি তার চেহারাতেও পানি ছিটিয়ে দিলেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমাকে বললেন, মনে রেখো! আমি তোমার বিবাহ এমন লোকের সঙ্গে দিয়েছি যে আমার বংশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী রা.-কে বললেন, 'তুমি তোমার স্ত্রীকে গ্রহণ কর।' তারপর তিনি তাদের জন্য দুআ করতে করতে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন।³²³
মানুষ হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর পাশে বসে কথা শুনছিলেন। কথা প্রসঙ্গে হযরত উমর রা. বললেন, হযরত আলী রা.-এর মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য এমন আছে, যদি এর একটিও আমার থাকত তাহলে এটা আমার কাছে লাল উট অপেক্ষা উত্তম ছিল। মানুষ খুব আগ্রহ নিয়ে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, সেই তিনটি গুণ কী?' তিনি বললেন, 'প্রথমত হচ্ছে, তার বিবাহ ফাতিমার সঙ্গে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তার জন্য মসজিদে অবস্থান হালাল ছিল—যা আমার জন্য হালাল নয়। তৃতীয়ত, খায়বারের যুদ্ধে পতাকা তার হাতে দেওয়া হয়েছিল।³²⁴
ফাতিমা রা.-এর ওলিমা
হযরত বুরাইদ রা. বলেন, আনসারী কিছু লোক হযরত আলী রা.-কে বলল, ‘তুমি হযরত ফাতিমাকে বিবাহের প্রস্তাব দাও।’ হযরত আলী রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আবু তালেবের ছেলের (আলী) কী কাজ?’ হযরত আলী রা. বলেন, ‘আমি রাসূলের কন্যা ফাতিমার বিবাহের প্রস্তাব দিতে চাচ্ছি।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘মারহাবা! আহলান!’ আর কিছুই বললেন না। হযরত আলী রা. বাইরে আসলেন। আনসারি লোকগুলো তার অপেক্ষা করছিল। তারা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে?’
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাব দিলেন, ‘মারহাবা ও আহলান ছাড়া তিনি তো আর কিছুই বললেন না।’ একথা শুনে তারা বলে উঠলেন, ‘আরে আলী, রাসূলের পক্ষ থেকে এ দুটোর একটাই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনি তোমাকে স্বাগত জানিয়েছেন আর তার মেয়েকে দিয়েছেন।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তার সঙ্গে বিবাহ দিলেন তখন তাকে বলেন, ‘হে আলী, নববধূ ঘরে এলে ওলিমা করতে হয়।’
হযরত সাআদ রা. বলেন, আমার কাছে একটি ভেড়া আছে। (আমি সেটা দিচ্ছি)। আনসারিরা হযরত আলী রা. এর জন্য কয়েক সা’ ভুট্টা আনলেন। যখন বধুবিদায়ে রাত আসল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার অপেক্ষা কর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পানি চাইলেন। এর দ্বারা ওযু করলেন এবং পানি হযরত আলী রা.-এর ওপর ছিটিয়ে দিলেন। তারপর এই দুআ করলেন, হে আল্লাহ, তাদের উভয়ের মাঝে বরকত দান করুন। তাদের দু-জনের এ বিবাহের মাঝে বরকত নসীব করুন।³²⁵
তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারিণী
শিশু হযরত ফাতিমা মাঝে মাঝে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত খাদীজাতুল কুবরা রা.-কে এমন এমন প্রশ্ন করত যাতে তার তীক্ষ্ণ মেধা ও বুদ্ধি ফুটে উঠত।
একদিনের ঘটনা। শিশু সায়্যিদাহ হযরত ফাতিমা রা. তার শ্রদ্ধেয় মাতাকে জিজ্ঞেস করল, 'আম্মাজান, আল্লাহ তাআলা আমাদের ও দুনিয়ার সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তাকে কি দেখা যায়?'
হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. বললেন, 'হে আমার কন্যা, যদি আমরা দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করি, তার বান্দাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করি, নিষিদ্ধ বস্তু থেকে বিরত থাকি, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করি, কেবলমাত্র তাকেই ইবাদতের যোগ্য মনে করি, আল্লাহর রাসূলের ওপর ঈমান রাখি-তাহলে কিয়ামতের দিন অবশ্যই আমরা আল্লাহর দিদারে ধন্য হব। ওই দিন নেক ও বদ আমলের হিসাব হবে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ঘরে আসতেন, তখন শিশু সায়্যিদাহ হযরত ফাতিমা রা.-কে এমন এমন বিষয় শেখাতেন, যাতে আল্লাহকে চেনা যায়। মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করা যায়। আল্লাহ তাকে তীক্ষ্ণ মেধা দান করেছিলেন। যে কথা একবার শুনতেন সব সময় মনে রাখতে পারতেন।
যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হতেন তখন শিশু ফাতিমা রা.-কে খাদীজাতুল কুবরা রা. জিজ্ঞেস করতেন যে, আজ তোমার আব্বাজান কি কি বিষয় শিখিয়েছেন? তিনি তৎক্ষণাৎ সব কিছু বলে দিতেন।
সাধাসিধে জীবন
হযরত সায়্যিদাহ ফাতিমা রা.-এর জীবন শৈশবকাল থেকেই দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে মুক্ত ছিল। একদিনের ঘটনা, হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা.-এর কোনো একজন প্রিয় লোকের বিবাহ ছিল। হযরত খাদিজা রা. বিবাহ অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য ভালো কাপড় ও অলংকারের ব্যবস্থা করলেন। যখন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় হলো, তখন ফাতিমা রা. ওই কাপড় ও অলংকার পরিধান করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তারপর সাধারণ কাপড় পরেই বিয়েতে গেলেন। মোটকথা, শৈশবকাল থেকেই দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে দূরে থাকাই তার অভ্যাস ছিল। তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রিয়ভাজন ও পরমুখাপেক্ষিতা মুক্ত ছিল তার গোটা জীবন।
কষ্টের চেয়ে দয়া বেশি
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের শুরুর দিকে একদিন আবু জাহেল ফাতিমাকে থাপ্পর মারলেন। ফাতিমা রা. কাঁদতে কাঁদতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেল। তিনি হযরত ফাতিমা রা.-কে বললেন, যাও আবু সুফিয়ানকে এ বিষয়টি জানাও। হযরত ফাতিমা রা. আবু সুফিয়ানকে পূর্ণ ঘটনা শুনাল। আবু সুফিয়ান সায়্যিদা ফাতিমা রা.-এর আঙুল ধরে সোজা আবু জাহেলের কাছে চলে গেলেন। তিনি ফাতিমা রা.-কে বললেন, যাও যেভাবে সে তোমাকে থাপ্পর দিয়েছিল, তুমিও ঠিক সেই ভাবে তাকে থাপ্পর দাও। যদি সে কিছু করে সেটা আমি দেখব।
ফাতিমা রা. আবু জাহেলকে থাপ্পর দিল, এরপর ঘরে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পূর্ণ ঘটনা শোনালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ানের জন্য দুআ করলেন। হে প্রভু, তুমি আবু সুফিয়ানের এই আচরণকে ভুলো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই দুআর প্রেক্ষিতে মক্কা বিজয়ের পর আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন।
রাসূলের কাছে ফাতিমা রা.-এর মর্যাদা
তাঁর মহত্ত্ব, মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য অনেক। নবী পরিবারের মধ্যে আরও মর্যাদাবান ব্যক্তি আছেন; কিন্তু তাদের মাঝে হযরত ফাতিমার রা. অবস্থান এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থানে। সূরা আল-আহযাবের আয়াতে তাতহীর (পবিত্রকরণের আয়াত) এর নুযূল হযরত ফাতিমার রা. বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করেন।
إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا
হে নবী-পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।³²⁶
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখলাম, তিনি আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসায়ন রা.-কে ডাকলেন এবং তাদের মাথার ওপর একখানা কাপড় ফেলে দিলেন। তারপর বললেন, হে আল্লাহ, এরা আমার পরিবারের সদস্য। তাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করুন!'³²⁷
হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আয়াত নাযিলের পর ছয়মাস পর্যন্ত ফজরের নামাযে যাওয়ার সময় ফাতিমার রা. ঘরের দরজা অতিক্রম করাকালে বলতেন, 'আস্-সালাত, ওহে নবী-পরিবার! আস-সালাত।'³²⁸
ইমাম আহমাদ রা. হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইনের রা. দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, 'তোমাদের সঙ্গে যে যুদ্ধ করে আমি তাদের জন্য যুদ্ধ, তোমাদের সাথে যে শান্তি ও সন্ধি স্থাপন করে আমি তাদের জন্য শান্তি।'³²⁹
হিজরী নবম সনে নাজরানের একটি খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আসে এবং হযরত 'ঈসা আ.-এর ব্যাপারে তারা অহেতুক বিতর্কে লিপ্ত হয়। তখন নাযিল হয় আয়াতে 'মুবাহালা'। মুবাহালার অর্থ হলো, যদি সত্য ও মিথ্যার ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ হয় এবং যুক্তিতর্কে মীমাংসা না হয়, তাহলে তারা সকলে মিলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে, যে পক্ষ এ ব্যাপারে মিথ্যাবাদী, সে যেন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এভাবে প্রার্থনা করাকে 'মুবাহালা' বলা হয়। এই মুবাহালা বিতর্ককারীরা একত্র হয়ে করতে পারে এবং গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য পরিবার-পরিজনকেও একত্র করতে পারে। মুহাবালার আয়াতটি হলো,
فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَ أَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَّعْنَتَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ
তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর যে কেউ এ বিষয়ে তোমার সাথে তর্ক করে তাকে বলো, এসো, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রগণকে, তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারীগণকে, তোমাদের নারীগণকে, আমাদের নিজদিগকে ও তোমাদের নিজদিগকে, অতঃপর আমরা বিনীত আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর দিই আল্লাহর লা'নত।³³⁰
এ আয়াত নাযিলের পর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিনিধিদলকে মুবাহালার আহ্বান জানান এবং নিজেও ফাতিমা, আলী, হসান ও হুসাইন রা.-কে সঙ্গে নিয়ে মুবাহালার জন্য প্রস্তুত হয়ে আসেন এবং বলেন: 'হে আল্লাহ, এই আমার পরিবার-পরিজন। আপনি তাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করে পবিত্র করুন।' এ কথাগুলো তিনবার বলার পর উচ্চারণ করেন: 'হে আল্লাহ আপনি আপনার দয়া ও অনুগ্রহ মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজনকে দান করুন যেমন আপনি করেছেন ইবরাহীমের পরিবার-পরিজনকে। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত।'³³¹
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন ফাতিমা রা.-কে বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমার খুশিতে খুশি হন এবং তোমার অসন্তুষ্টিতে অসন্তুষ্ট হন।'³³²
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো যুদ্ধ বা সফর থেকে ফিরতেন তখন প্রথমে মসজিদে গিয়ে দুই রাক'আত নামায আদায় করতেন। তারপর ফাতিমার ঘরে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করে বেগমদের নিকট যেতেন।³³³
বুখারী শরীফে আছে, একবার আবু জাহলের ভাই হযরত আলী রা.-কে গাওরা বিনতে আবু জাহেলকে বিবাহের প্রস্তাব দিল। তিনি কিছুটা সম্মত হলেন। সুতরাং গাওরা এর অভিভাবকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অনুমতি নেওয়ার জন্য আসল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়টি খুব অপছন্দ করলেন। তিনি মসজিদে গেলেন, মিম্বারে উঠে বললেন, বনু হিশাম ইবনে মুগীরা আলী ইবনে আবি তালিবের সঙ্গে তাদের মেয়ে বিবাহ দিতে চায়, আমার কাছে এসেছে অনুমতি নেওয়ার জন্য। আমি কখনো অনুমতি দিবো না। কখনো দেব না। তবে আলী আমার মেয়েকে তালাক দিয়ে তাকে বিবাহ করতে পারে।
ফাতিমা আমার শরীরের অংশ। যে তাকে কষ্ট দিবে, সে আমাকে কষ্ট দিবে। এরপর যায়নাবের স্বামী আবুল আস রা.-এর দিকে ইশারা করে বললেন, সে যে কথা আমাকে বলেছিল তা সে সত্যে পরিণত করে আমাকে দেখিয়েছে। আর আমি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালালকারী নই; কিন্তু আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূলের মেয়ে আর আল্লাহর দুশমনের মেয়ে একত্র হতে পারে না। হযরত আলী রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাগ দেখে আবু জাহেলের মেয়ের বিবাহের নিয়ত সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিলেন। এরপরে হযরত ফাতিমা রা.-এর জীবদ্দশায় আর কোনো বিবাহের খেয়াল পর্যন্ত মনে আসেনি।
হযরত হাসান রা. বর্ণনা করেন, এক রাতে আমার আম্মাজান নামাযের জন্য দাঁড়ালেন এবং সারারাত নামায পড়লেন। এমতাবস্থায় সকাল হয়ে গেল। আম্মাজান মুমিন পুরুষ ও নারীদের জন্য খুব দুআ করলেন; কিন্তু নিজের জন্য কোনো দুআ করলেন না। আমি বললাম, আম্মাজান! আপনি সবার জন্য দুআ করলেন কিন্তু নিজের জন্য কোনো দুআ করলেন না। হযরত ফাতিমা রা. বললেন, দুআর মধ্যে প্রথম হক হচ্ছে বাহিরের মানুষের, এরপর ঘরের মানুষের।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমা রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বলতে পার মহিলাদের সবচেয়ে ভালো গুণ কোনটি? হযরত ফাতিমা রা. বললেন, মহিলাদের সবচেয়ে ভালো গুণ হলো এই যে, সে কোনো ভিন্ন পুরুষ দেখবে না এবং ভিন্ন কোনো পুরুষও তাকে দেখবে না।
অষ্টম হিজরীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দশ হাজার জান উৎসর্গকারী সাহাবীদের সঙ্গে নিয়ে মক্কা বিজয়ের জন্য রওনা হলেন। হযরত ফাতিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় তার বিদ্যমান থাকার প্রমাণ নিম্নোক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত। উম্মে হানী বর্ণনা করেন, যখন মক্কা বিজয় হয়েছিল (এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় অবস্থান করছিলেন) একদিন ফাতিমা রা. আসলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাম দিকে বসলেন আর আমি ডান দিকে বসেছিলাম। ইতিমধ্যে একজন বাদী একটি পাত্র নিয়ে আসল যাতে পানি রাখা ছিল। বাদী ওই পাত্রটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে দিলেন। তা থেকে অল্প পানি পান করে আমাকে দিয়ে দিলেন। আমি পান করলাম। এরপর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি রোযাদার ছিলাম পানি পান করে ফেলেছি। এখন কী হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন তুমি কোনো কাযা রোযা রেখেছিলে? আমি বললাম না। তিনি বললেন নফল রোযা হয়ে থাকলে কোনো অসুবিধা নেই।
দারিদ্র্যতা নিত্য সঙ্গী
পিতৃগৃহ থেকে ফাতিমা যে স্বামীগৃহে যান সেখানে কোনো প্রাচুর্য ছিল না। বরং সেখানে যা ছিল তাকে দারিদ্রের কঠোর বাস্তবতাই বলা সঙ্গত। সে ক্ষেত্রে তার অন্য বোনদের স্বামীদের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলক অনেক ভালো ছিল। যায়নাবের বিয়ে হয় আবুল আসের রা. সাথে। তিনি মক্কার বড় ধনী ব্যক্তি আবদুল উযযা ইবনে আবদিল মুত্তালিবের দুই ছেলের সাথে। ইসলামের কারণে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর একের পর একজন করে তাদের দু'জনেরই বিয়ে হয় উসমান ইবনে আফফানের রা. সাথে। আর উসমান রা. ছিলেন একজন বিত্তবান ব্যক্তি। তাদের তুলনায় আলী রা. ছিলেন একজন নিতান্ত দরিদ্র মানুষ। তার নিজের অর্জিত সম্পদ বলে যেমন কিছু ছিল না, তেমনি উত্তরাধিকার সূত্রেও কিছু পাননি। তার পিতা মক্কার সবচেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তি ছিলেন। তবে তেমন অর্থ-বিত্তের মালিক ছিলেন না। আর সন্তান ছিল অনেক। তাই বোঝা লাঘবের জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার চাচা আব্বাস তার দুই ছেলের লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেন। এভাবে আলী রা. যুক্ত হন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিবারের সাথে।
এখানে একটি প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, আলীর রা. মতো মক্কার সম্ভ্রান্ত বংশীয় বুদ্ধিমান যুবক এত সীমাহীন দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেন কেন? এর উত্তর আলীর রা. জীবনের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাসূল হলেন। কিশোরদের মধ্যে আলী রা. প্রথম তার প্রতি ঈমান আনলেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী তখন তার বয়স দশ বছর।
আর তখন থেকে তিনি নবী মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠিন বাস্তবতা মোকাবেলা করে নবুওয়াতের দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। রাসূলের সান্নিধ্যে এসে আলী রা.-এর জীবন যেভাবে শুরু হয়, তাতে তার কোনো পেশায় জড়িত হওয়ার সুযোগই ছিল না। মদীনায় হিজরত করেন একেবারে খালি হাতে। সেখানে নতুন জায়গায় নতুনভাবে দাওয়াতী কাজে জড়িয়ে পড়েন। এর মধ্যে বদর যুদ্ধ এসে গেল। তিনি যুদ্ধে গেলেন। যুদ্ধের পর গনীমতের অংশ হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে একটি বর্ম দিলেন। এই প্রথম তিনি একটি সম্পদের মালিক হলেন!
ফাতিমা রা. আঠারো বছরে স্বামী-গৃহে যান। সেখানে যে বিত্ত-বৈভবের কিছু মাত্র চিহ্ন ছিল না, সে কথা সব ঐতিহাসিকই বলেছেন। সেই ঘরে গিয়ে পেলেন খেজুর গাছের ছাল ভর্তি চামড়ার বালিশ, বিছানা, একজোড়া জাঁতা, দুটি মশক, দুটি পানির পাত্র, আর আতর-সুগন্ধি। স্বামী দারিদ্র্যের কারণে ঘরের কাজ-কর্মে তাকে সহায়তা করার জন্য অথবা অপেক্ষাকৃত কঠিন কাজগুলো করার জন্য কোনো দাস-দাসী দিতে পারেননি। ফাতিমা রা. একাই সব ধরনের কাজ করতেন। জাঁতা ঘুরাতে ঘুরাতে তার হাতে কড়া পড়ে যায়, মশক ভর্তি পানি টানতে টানতে কোমড়ে দাগ হয়ে যায় এবং ঘর-বাড়ি ঝাড়ু দিতে দিতে পরিহিত কাপড়-চোপড় ময়লা হয়ে যেত।³³⁴
তাঁর এভাবে কাজ করা আলী রা. মেনে নিতে পারতেন না; কিন্তু তার করারও কিছু ছিল না। যতটুকু পারতেন নিজে তার কাজে সাহায্য করতেন। তিনি সব সময় ফাতিমার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। কারণ, মক্কী জীবনে নানারূপ প্রতিকূল অবস্থায় তিনি যে অপুষ্টির শিকার হন তাতে বেশ ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে পড়েন। ঘরে-বাইর এভাবে দু'জনে কাজ করতে করতে তারা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। একদিন আলী রা. তার মা ফাতিমা বিনতে আসাদ ইবনে হাশিমকে বলেন, তুমি পানি আনা ও বাইরের অন্যান্য কাজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়েকে সাহায্য কর, আর ফাতিমা তোমাকে বাড়িতে গম পেষা ও রুটি বানাতে সাহায্য করবে।
এ সময় ফাতিমার পিতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও যুদ্ধবন্দীসহ বিজয়ীর বেশে একটি যুদ্ধ থেকে মদীনায় ফিরলেন। আলী রা. একদিন বললেন, ফাতিমা, তোমার এমন কষ্ট দেখে আমার বড় দুঃখ হয়। আল্লাহ তাআলা বেশ কিছু যুদ্ধবন্দী দিয়েছেন। তুমি যদি তোমার পিতার কাছে গিয়ে তোমার সেবার জন্য যুদ্ধবন্দী একটি দাসের জন্য আবেদন জানাতে! ফাতিমা ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় হাতের জাঁতা পাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে বলেন, আমি যাব ইনশাআল্লাহ। তারপর বাড়ির আঙিনায় একটু বিশ্রাম নিয়ে চাদর দিয়ে গা-মাথা ঢেকে ধীর পায়ে পিতৃগৃহের দিকে গেলেন। পিতা তাকে দেখে কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, মেয়ে! কেন এসেছ? ফাতিমা বললেন, আপনাকে সালাম করতে এসেছি। তিনি লজ্জায় পিতাকে মনের কথাটি বলতে পারলেন না। বাড়ি ফিরে এলেন এবং স্বামীকে সে কথা বললেন। আলী রা. এবার ফাতিমাকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গেলেন। ফাতিমা পিতার সামনে লজ্জায় মুখ নীচু করে নিজের প্রয়োজনের কথাটি এবার বলে ফেলেন। পিতা তাকে বলেন, আল্লাহর কসম! তোমাদেরকে আমি একটি দাসও দেব না। আহলে সুফফার লোকেরা না খেয়ে নিদারুণ কষ্টে আছে। তাদের জন্য আমি কিছুই করতে পারছি না। এগুলো বিক্রি করে সেই অর্থ আমি তাদের জন্য খরচ করব।
একথা শোনার পর তারা স্বামী-স্ত্রী দু-জন পিতাকে ধন্যবাদ দিয়ে ঘরে ফিরে আসেন। তাদেরকে এভাবে খালি হাতে ফেরত দিয়ে স্নেহশীল পিতা যে পরম শান্তিতে থাকতে পেরেছিলেন তা কিন্তু নয়। সারাটি দিন কর্মক্লান্ত আদরের মেয়েটির চেহারা তার মনের মধ্যে ভাসতে থাকে।
সন্ধা হলো। ঠান্ডাও ছিল প্রচণ্ড। আলী-ফাতিমা শক্ত বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন; কিন্তু এত ঠান্ডায় কি ঘুম আসে? এমন সময় দরজায় করাঘাতের শব্দ। দরজা খুলতেই তারা দেখতে পান পিতা মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে। তিনি দেখতে পান, এই প্রবল শীতে মেয়ে-জামাই যে কম্বলটি গায়ে দিয়ে ঘুমানোর চেষ্ট করছে তা এত ছোট যে দু-জন কোনো রকম গুটিশুঁটি মেরে থাকা যায়। মাথার দিকে টানলে পায়ের দিকে বেরিয়ে যায়। আবার পায়র দিকে সরিয়ে দিলে মাথার দিক আলগা হয়ে যায়। তারা এই মহান অতিথিকে স্বাগতম জানানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি তাদেরকে ব্যস্ত না হয়ে যে অবস্থায় আছে সেভাবে থাকতে বলেন। তিনি তাদের অবস্থা হৃদয় দিয়ে গভীরভাবে উলব্ধি করেন, তারপর কোমল সুরে বলেন: তোমরা আমার কাছে যা চেয়েছিলে তার চেয়ে ভালো কিছু কি আমি তোমাদেরকে বলে দেব?
তাঁর দু-জনই এক সাথে বলে উঠলেন, 'বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ,' তিনি বললেন, জিবরাঈল আমাকে এই কথাগুলো শিখিয়েছেন : প্রত্যেক নামাযের পরে তোমরা দু-জন দশবার সুবহানাল্লাহ, দশবার আলহামদু লিল্লাহ ও দশবার আল্লাহু আকবর পাঠ করবে। আর রাতে যখন বিছানায় ঘুমোতে যাবে, তখন সুবহানাল্লাহ তেত্রিশবার, আলহামদুলিল্লাহ তেত্রিশবার, আল্লাহু আকবর চৌত্রিশবার পাঠ করবে। একথা বলে তিনি মেয়ে-জামাইকে রেখে দ্রুত চলে যান।³³⁵
এ ঘটনার কয়েক দশক পরেও হযরত আলী রা.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো এই কথাগুলো আলোচনা করতে শোনা গেছে। তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের এই কথাগুলো শেখানোর পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি একদিনও তা বাদ দিইনি। একবার একজন ইরাকী প্রশ্ন করেন: সিফফীন যুদ্ধের সেই ঘোরতর রাতেও না? তিনি খুব জোর দিয়ে বলেন: সিফফীনের সেই রাতেও না।³³⁶
দারিদ্র্য ও অভাব অনটনের অবস্থা এই ছিল যে, সায়্যিদা হযরত ফাতিমা রা.- এর শরীরে অনেক সময় পোশাক থাকত না। তিনি একবার অসুস্থ হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন সাহাবীসহ তার শুশ্রূষার জন্য গেলেন। দরজায় গিয়ে সালাম করলেন। ভিতরে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। হযরত ফাতিমা রা. মারহাবা বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন আছে, তারাও কি আসবে? তিনি জবাব দিলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই মুহূর্তে আমার পরনে একটি ছোট জামা—যা দ্বারা আমার শরীর ঠিকমতো ঢাকা যাচ্ছে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের চাদর তাকে দিয়ে বললেন, চাদর দিয়ে পর্দা করে নাও। এবারে হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামসহ ঘরে গেলেন। ফাতিমা রা. বললেন, অসুস্থতার কষ্ট ছাড়াও আরও কঠিন পরীক্ষা এই যে, ঘরে খাওয়ার কোনো কিছু নেই। যা দ্বারা আপনাদের খেদমত করতে পারি। জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এতে কি তুমি খুশি নও যে, তুমি বেহেশতে সকল নারীদের সরদার হবে।³³⁷
হে আবু তুরাব, ওঠো
একদিন হযরত আলী রা. হযরত ফাতিমা রা.-এর কাছে এলেন। পরবর্তী সময়ে রাগান্বিত অবস্থায় বের হয়ে গেলেন এবং মসজিদে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমা রা.-এর ঘরে এলেন, কিন্তু আলী রা.-কে ঘরে পেলেন না। তিনি ফাতিমা রা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার চাচাতো ভাই কোথায়?' তিনি বললেন, 'আমার ও তাঁর মধ্যে কিছু ঘটেছে। তিনি আমার সাথে রাগ করে বাইরে চলে গেছেন। আমার কাছে দুপুরের বিশ্রামও করেননি।' তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যাক্তিকে বললেন, 'দেখ তো সে কোথায়?' সে ব্যাক্তি খোঁজে এসে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, তিনি মসজিদে শুয়ে আছেন।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এলেন, তখন আলী রা. কাত হয়ে শুয়ে ছিলেন। তাঁর শরীরের এক পাশের চাঁদর পড়ে গিয়েছে এবং তাঁর শরীরে মাটি লেগেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর শরীরের মাটি ঝেড়ে দিতে দিতে বললেন: উঠ, হে আবু তুরাব! উঠ, হে আবু তুরাব!³³⁸
ক্রন্দনরত ফাতিমা মুচকি হাসলেন
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যখন إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ এই সূরা নাযিল হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমাকে ডেকে বললেন: 'আমাকে আমার মৃত্যুর (নিকটবর্তীতার) কথা জানানো হয়েছে।' এ কথা শুনে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'কেঁদো না, আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সাথে আগে মিলিত হবে।' একথা শুনে তিনি হাসতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কয়েকজন স্ত্রী এ ঘটনা দেখে বললেন, 'হে ফাতিমা, একবার তোমাকে আমরা কাঁদতে দেখলাম, এরপরই আবার হাসতে দেখলাম (ব্যাপারটা কী)?' তখন ফাতিমা রা. বললেন, 'তিনি আমাকে বললেন যে, তাঁকে তাঁর মৃত্যুর (নিকটবর্তীতার) খবর জানানো হয়েছে, তা শুনে আমি কাঁদতে লাগলাম। এরপর তিনি আমাকে বললেন, 'কেঁদো না; কেননা, তুমিই সর্বপ্রথম আমার পরিবারের মধ্য হতে আমার সাথে মিলিত হবে।' তখন আমি হাসলাম।³³⁹
অতুলনীয় দৃষ্টান্ত
একবার হযরত আলী রা. ও ফাতিমা রা. উভয়ে সারাদিন ক্ষুধার্ত ছিলেন। সন্ধ্যাবেলা এক ব্যবসায়ী উট আসে। উটের সামানাপত্র নামানোর জন্য তার একজন শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। হযরত আলী রা. এ কাজের জন্য নিজেকে নিজে পেশ করলেন। দীর্ঘ রাত পর্যন্ত তার উটের সামানাদি নামালেন। ব্যবসায়ী এক দিরহাম পারিশ্রমিক দিল। অনেক রাত হওয়ার কারণে খাবার-দাবারের দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একটি দোকান খোলা ছিল। হযরত আলী রা. ভাবলেন, এখান থেকে যা পাই নিয়ে যাই। শেরে খোদা আলী রা. এক দিরহামের কিছু নিয়ে ঘরে এলেন। আর হযরত ফাতিমা রা. অনেক্ষণ যাবত রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। স্বামীকে আসতে দেখে খুশিতে বাগ বাগ হয়ে যান। তিনি আসার পর এটাকে পিষে খামিরা বানালেন। আগুন জ্বালালেন। রুটি বানিয়ে আলী রা. এর সামনে রাখলেন। তিনি খাওয়ার পর ফাতিমা নিজে খাওয়ার জন্য বসেন। হযরত আলী রা. বলেন, আমার এতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের সরদারের কথা স্মরণ হচ্ছিল যে, ফাতিমা দুনিয়ার উত্তম মহিলাদের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।
একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে খাবারের কিছুই ছিল না। মহিলাদের সরদার হযরত ফাতিমা রা. এর ঘরেরও একই অবস্থা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঝুঁপড়ি থেকে বাহিরে বের হন। রাস্তায় হযরত আবু বকর সিদ্দিক ও হযরত উমর ফারুক রা.-এর সঙ্গে দেখা হলো। ঘটনাক্রমে তারাও সেদিন ক্ষুধার্ত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উভয়কে নিয়ে হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা.-এর বাড়িতে যান। সে সময় তিনি নিজ খেজুরের বাগানে গিয়েছিলেন। ঘরে খাবারের কিছুই ছিল না। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা.-এর স্ত্রী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বাগত জানান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'আবু আইয়ুব কোথায়?'
হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর বাগান ঘরের একদম নিকটেই ছিল। তিনি রহমতে আলমের আওয়াজ শুনে খেজুরের একটি আঁটি পেরে অস্থির হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ঘরে আসেন। আঁটিটা মেহমানের খেদমতে পেশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে একটি বকরীও যবাই করে দেন। অর্ধেক দিয়ে তরকারি আর বাকী অর্ধেক দিয়ে কাবাব বানিয়ে খাবার হুজুরের সামনে রাখেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি রুটিতে কিছু গোশত রেখে বলেন, 'এটা ফাতিমাকে পাঠিয়ে দাও। সে কয়েকদিন যাবত ক্ষুধার্ত।'
হযরত আবু আইয়ুব আনসারী হুকুম পালন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথীদের নিয়ে খানা খেলেন। এ লৌকিকতাপূর্ণ খাবার খেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাঁদতে শুরু করেন আর বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেছেন, কেয়ামতের দিন বান্দাকে দুনিয়ার নেয়ামতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।' (অর্থাৎ, এ নেয়ামতের হক তোমরা কীভাবে আদায় করবে।)
একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমার ঘরে যান। তিনি দেখলেন, মহিলাদের সরদার উটের চামড়া পরিধান করে আছে। তাতে রয়েছে আবার তেরটি পট্টি ও দুর্গন্ধ। তবে মুখে ছিল আল্লাহর যিকির। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দৃশ্য দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে যান। আর বলেন, 'ফাতিমা দুনিয়ার কষ্টে ধৈর্যধারণ করো, আর আখেরাতের চিরস্থায়ী আনন্দের অপেক্ষা করো। আল্লাহ তাআলা তোমাকে উত্তম বদলা দেবেন।'
আলী রা. বলেন, একবার আমাদের ওপর দিয়ে কয়েকদিন এভাবে কেটেছে যে, আমাদের কাছেও খাবারের কিছু ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছেও কিছু ছিল না। সে সময় একদিন আমি কোথাও যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে দেখলাম, এক দিনার পরে আছে। কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম, এটা তুলবো, না তুলবো না। শেষমেষ আমি তা তুলে নিলাম। কারণ, কঠিন বিপদে (দারিদ্রতায়) ছিলাম। এটা নিয়ে দোকানীর কাছে গেলাম। তার থেকে আটা ক্রয় করে ফাতিমার নিকট নিয়ে গেলাম। তাকে বললাম, এটাকে খামিরা বানিয়ে রুটি পাকাও। সে আটা পিষতে শুরু করেছে। তখন ক্ষুধার কারণে তার দুর্বলতার এ অবস্থা হয়েছিল যে, কোমর বেঁকে যায় এবং তার কপালের চুল মোমের আগুন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মোটকথা, সে তড়িঘড়ি করে আটা পিষে রুটি তৈরি করল। অতঃপর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে এ ঘটনা আরয করলাম। তিনি বলেন, 'এটা খেয়ে নাও। আল্লাহ তাআলা তোমাকে এ রিযিক দিয়েছেন।'
ক্ষুধা থেকে মুক্তি
ইমরান ইবনে হোসাইন রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, আমি একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে ছিলাম। সামনের দিক থেকে হযরত ফাতিমা এসে সোজা রাসূলের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। রাসূল বলেন, হে ফাতিমা, কাছে আস। তিনি একটু সামনে আসলেন। রাসূল পুনরায় বলেন, হে ফাতিমা, কাছে আস। তিনি আরেকটু এগিয়ে এসে একেবারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার মুখে তখন হলদে বর্ণের ছাঁপ দেখা যাচ্ছিল। রক্ত একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের আঙুল ছড়িয়ে নিজের তালু হযরত ফাতিমার বুকের ওপর রাখলেন এবং মাথা উঠিয়ে বলেন, 'হে আমার আল্লাহ, ক্ষুধার্তকে পরিতৃপ্তকারী, প্রয়োজন পূর্ণকারী এবং অপদস্তকে মর্যাদানকারী, মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাকে ক্ষুধার্ত রেখ না।'
আমি দেখলাম, ক্ষুধার কারণে হযরত ফাতিমার চেহারায় যে হলদে বর্ণ ছিল তা আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে এবং লালচে দেখা যাচ্ছে। এ ঘটনার কয়েকদিন পর আমি হযরত ফাতিমাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেন, হে ইমরান, এর পর আমার আর কখনো ক্ষুধায় কষ্ট হয়নি।
একবার ফাতিমা রা. এর জ্বর এলো। রাত্রটা খুব অস্থিরতা ও কষ্টে কেটেছে। আলী রা. এর বর্ণনা, আমিও তার সঙ্গে জাগ্রত ছিলাম। শেষ রাতে আমাদের দুজনেরই চোখ লেগে যায়। ফজরের আযান শুনে জাগ্রত হলাম। দেখলাম যে, ফাতিমা ওযু করছে। আমি মসজিদে গিয়ে নামায পড়লাম। ফিরে আসলাম। দেখলাম, ফাতিমা নিয়ম অনুযায়ী চাক্কি ঘুরাচ্ছে।
আমি বললাম, 'ফাতিমা, তোমার কি নিজের ওপর দয়া হয় না। সারারাত জ্বরে কাটিয়েছ। সকালে উঠে ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু করলে। এখন আবার চাক্কি পিষছ। আল্লাহ না করুন, যদি অসুস্থতা বেড়ে যায়।'
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো সাহাবীকে দাফন করে আসছিলেন। রাস্তায় ফাতিমার সঙ্গে দেখা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'মেয়ে, কোথায় গিয়েছিলে এবং ঘর থেকে কেন বের হয়েছ?' হযরত ফাতিমা বলেন, 'প্রতিবেশীর ঘরে মৃত্যু হয়েছে। সেখানে সমবেদনার জন্য গিয়েছিলাম।³⁴⁰
আলী রা. বলেন, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ে ফাতিমাকে বিবাহ করি। দারিদ্র্যতার কারণে অবস্থা এমন ছিল যে, আমাদের নিকট ভেড়ার চামড়া ছাড়া আর কোনো বিছানা ছিল না। যাতে আমরা রাতে শয়ন করতাম। আর দিনের বেলা পানি পানকারী উটকে ঘাস খাওয়াতাম। আমার কাছে ফাতিমা ছাড়া আর কোনো খাদেম ছিল না।³⁴¹
আমলের আগ্রহ
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমার ঘরে তাশরীফ আনলেন। তার পেছনে পেছনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রা. নামক একজন দৃষ্টিহীন সাহাবীও ভেতরে চলে আসে। তাকে দেখে হযরত ফাতিমা রা. দৌড়ে ঝুপড়িতে গিয়ে আড়াল হন। সে চলে যাওয়ার পর হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, বেটি! তুমি কেন লুকিয়ে পড়েছিল? উম্মে মাকতুম তো অন্ধ। হযরত ফাতিমা রা. উত্তর দেন, আব্বাজান, যদিও সে অন্ধ কিন্তু আমি তো অন্ধ নই। অনর্থকই গায়রে মাহরামের সঙ্গে দেখা করব?
ফাতিমা রা. সুন্নতের প্রতি এতটাই অনুরাগিণী ছিলেন যে, কখনো কখনো স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই যখন নিজের পূর্বের কোনো -আমল অথবা হুকুম অথবা ইরশাদ (আল্লাহর নির্দেশ) পরিবর্তন করতেন, তখন তিনি সে সুন্নাত সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবহিত করতেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো এ কথা অমুক সময় এমন বলেছেন। এখন কেন এমন করছেন। এটা কেন? অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটি জেনেশুনেই করতেন। কেননা, যখন কোনো উপকারের প্রতি লক্ষ্য করে আল্লাহর নির্দেশে প্রথম হুকুম রহিত হয়ে যেত, তখন তিনি আল্লাহর নির্দেশেই আবার নতুন মাসআলা বর্ণনা করতেন। কখনো জায়েযের জন্য করতেন-এটাও ঠিক। সেটাও ঠিক।
প্রিয় সন্তানেরা
একবার হযরত আলী রা. ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন যে, তাদের দুই শিশু সন্তান (হাসান ও হুসাইন) কান্নাকাটি করছে। হযরত ফাতিমা রা.-এর কাছে তাদের কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন? হযরত ফাতিমা রা. বললেন, 'বাচ্চারা ক্ষুধার তাড়নায় কাঁদছে।' ঘরে খাবার নেই-এই কথা শুনে হযরত আলী রা. বাইরে বের হলেন। কিছুক্ষণ পর দিনার নিয়ে আসলেন। হযরত ফাতিমা রা.-কে বললেন, 'আমি একটি দিনার নিয়ে এসেছি।' ফাতিমা রা. বললেন, 'দিনার নিয়ে অমুক ইহুদীর দোকান থেকে আটা ক্রয় করে নিয়ে আসেন।' হযরত আলী রা. ইহুদীর দোকানে আটা কিনতে গেলেন। দোকানদার যদিও ইহুদী ছিল, তবুও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে সুধারণা ছিল। দোকানদার জিজ্ঞাস করল, 'আপনি তো ওই লোকের জামাতা-যিনি নিজেকে নবী দাবি করেন?' হযরত আলী রা. বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছ।' দোকানদার বলল, 'আপনি আটা নিয়ে যান, দিনারও নিয়ে যান।' হযরত আলী রা. দিনার দেওয়ার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করার পরও সে নিল না।
হযরত আলী রা. আটা নিয়ে এসে হযরত ফাতিমা রা.-কে বললেন, 'ইহুদী বিনামূল্যে আটা দিয়েছে।' হযরত ফাতিমা রা. বললেন, 'এবার বাজারে গিয়ে এক দিরহাম দিয়ে গোশত নিয়ে আসেন।' হযরত আলী রা. গোশত নিয়ে আসেন। হযরত ফাতিমা রা. খানা রান্না করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও দাওয়াত দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসার পর ফাতিমা রা. তাকে আটা ও গোশত সম্পর্কে বিস্তারিত ঘটনা জানালেন। এখানে উদ্দেশ্য ছিল, যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দেন তাহলে তারা তা খাবেন, অন্যথায় নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিলেন এবং বললেন, ‘বিসমিল্লাহ বলে খেয়ে নাও।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও খেলেন।³⁴²
হযরত হাসান রা. ১৫ই রমজান ৩য় হিজরীতে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম রাখলেন হাসান। সপ্তম তারীখে তার আকীকা করলেন। মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজন পরিমাণ রূপা সাদাকা করার জন্য বললেন।³⁴³
হযরত হাসান রা.-এর জন্মের পূর্বে উম্মুল ফযল রা. একটি স্বপ্ন দেখলেন। এতে হযরত হাসান রা.-এর জন্মের শুভ সংবাদের ইশারা ছিল। স্বপ্ন দেখে হযরত উম্মুল ফযল রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির হয়ে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার ঘরে আপনার শরীরের একটি টুকরা!’ এটা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তুমি একটি ভালো স্বপ্ন দেখেছ। ফাতিমার ঘরে একজন ছেলে সন্তান হবে। আর তুমি (তোমার ছেলে) কাসাম-এর দুধের অংশ তাকে পান করাবে।’ ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী হযরত ফাতিমা রা. একজন ছেলে সন্তান (হাসান রা.) প্রসব করলেন। আর উম্মুল ফযল রা. তার ছেলে কাসাম-এর দুধ তাকে পান করালেন।³⁴⁴
একদা হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমা রা.-এর ঘরে গেলেন। হযরত ফাতিমা রা. ও হযরত আলী রা. শুয়ে ছিলেন। হযরত হাসান রা. ক্ষুধার কারণে কাঁদছিলেন এবং খাবার চাচ্ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে জাগানো উপযোগী মনে না করে একটি বকরীর দুধ দোহন করে হযরত হাসান রা.-কে নিজের হাতে পান করালেন। হযরত হাসান রা. পরিতৃপ্ত হয়ে পান করলেন। ফলে তার ক্ষুধা দূর হয়ে গেল।³⁴⁵
হযরত হুসাইন রা. ৫ই শাবান ৪র্থ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া) তাকে একটি কাপড় আবৃত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে আনা হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দিলেন। এরপর মিষ্টিজাতীয় বস্তু চিবিয়ে তার মুখে দিলেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পবিত্র থুথু তার মুখে দিয়ে তার জন্য দুআ করলেন। তাকে খালুকের সুগন্ধি দিয়ে হযরত ফাতিমা রা.-এর কাছে দিয়ে দিলেন। পরবর্তী সময়ে শিশু হযরত হুসাইন রা. এর মাথা মুণ্ডন করা হলো এবং তার ওজন পরিমাণ রূপা দান করা হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম রাখলেন হুসাইন। হযরত হুসাইন রা.-এর আকীকায় দুটি দুম্বা জবেহ করা হলো। একটির রান ধাত্রিকে দেওয়া হলো। পরবর্তী সময়ে তার খৎনা করা হলো।³⁴⁶
হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেউ জিজ্ঞেস করল আপনার পরিবার-পরিজনের মধ্যে কাকে বেশি মহব্বত করেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হাসান-হুসাইনকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝে মধ্যে বলতেন, আমার বাচ্চাদেরকে নিয়ে আসো। যখন হযরত হাসান- হুসাইনকে নিয়ে আসতেন তখন তিনি তাদেরকে স্নেহ করতেন এবং বুকের সঙ্গে লাগাতেন।³⁴⁷
জান্নাতী নারীদের সর্দার
হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান বর্ণনা করেন, একবার আমি আমার মাতার কাছে আরয করলাম, আপনি আমাকে অনুমতি দিন-আমি আজ রাসূলের সঙ্গে মাগরীবের নামায পড়ব এবং রাসূলের কাছে আরজ করব, তিনি যেন আপনার আমার জন্য মাগফিরাতের দুআ করেন। আমার মাতা আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি রাসূলের খেদমতে এলাম এবং মাগরীবের নামায পড়লাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাগরীবের পর নফল পড়তে পড়তে ঈশা হয়ে গেল। ঈশার নাময পড়ে যখন ঘরের দিকে রওনা হলেন আমি তার পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে? হুযাইফা নাকি? আমি বললাম, জি, হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার কি প্রয়োজন? আল্লাহ তোমাকে ও তোমার মাতাকে মাফ করে দিন। একজন ফেরেশতা—যিনি ইতোপূর্বে দুনিয়াতে আসেননি—এসে সালাম দিয়ে এই সুসংবাদ দিলেন, ফাতিমা রা. জান্নাতী নারীদের নেত্রী এবং হাসান-হুসাইন জান্নাতী যুবকদের নেতা।'³⁴⁸
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পারলেন যে, হযরত আলী ও হযরত ফাতিমা রা. অসন্তুষ্ট। তিনি দ্রুত তাদের ঘরে গেলেন এবং পরস্পর সমঝতা করালেন। যখন তিনি বাহিরে বের হলেন, তখন লোকেরা জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার? আপনি যখন ফাতিমার ঘরে গেলেন তখন আপনার চেহারায় মলিনতা ছিল। যখন বের হলেন তখন আপনার চেহারায় খুশি দেখা যাচ্ছে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমাদের জানা নেই যে, আমি এমন দুজনের মধ্যে সমঝতা করেছি যারা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।'³⁴⁹
একবার ফাতিমা রা. চাক্কী (যা দারা আটা পেষা হয়) দ্বারা আটা পিষছিলেন। তখন তার হাতে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। শরীর ঘেমে ভিজে গিয়েছিল। তিনি হাঁফাতে লাগলেন। এমতাবস্থায় পাশে একটি করুণ আওয়ায শুনতে পেয়ে চাক্কী বন্ধ করে ওই বাড়িতে চলে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, একজন প্রসব ব্যথায় কাতরাচ্ছে। সে জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। গৃহবাসী চিন্তিত ও পেরেশান কী করবে, কাকে ডাকবে। হযরত ফাতিমা রা. তাদেরকে সান্ত্বনা দিলেন এবং মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিরাপদে বাচ্চা হয়ে গেল। তিনি ঘরে ফিরে এলেন এবং এত আনন্দিত হলেন যেন উভয় জাহানের ধনভাণ্ডার পেয়ে গেছেন!³⁵⁰
একবার হযরত ফাতিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দরিদ্রতার অভিযোগ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সময় নামাযে বসা ছিলেন। তিনি বললেন, ফাতিমা, তুমি আমার কাছে আস। যখন তিনি কাছে আসলেন তখন বললেন, তুমি যদি দুনিয়া চাও তাহলে আমি তোমাকে তা আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে দেব; কিন্তু জেনে রেখো, তুমি আল্লাহ থেকে গাফেল হয়ে যাবে। আর পরকাল থেকে হবে বঞ্চিত। তুমি যা নিতে চাও, যেই পরিমাণ নিতে চাও, নিয়ে নাও। কোনো বাধা নেই; কিন্তু জেনে রেখো, পরকালে তুমি কিছুই পাবে না। এটা শুনে ফাতিমা রা. সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন এবং তাওবা ইস্তিগফার করতে লাগলেন।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে কিছু গোলাম আসল। এবারও হযরত আলী রা. হযরত ফাতিমা রা.-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পাঠালেন যেন কাম-কাজের জন্য একজন বাদী নিয়ে যায়। হযরত ফাতিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, আব্বাজান আমার একজন বাদী প্রয়োজন। এটা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে ফাতিমা, তুমি কি বলছ, আমি তো এখনো আহলে সুফফার হক আদায় করতে পারিনি এবং তাদের খেদমত থেকে এখনো অবসর হতে পারিনি। এছাড়াও অনেক ইয়াতীম মিসকিন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তোমাকে বাদী দিই কীভাবে? যাও আল্লাহর জিকির করো, ইবাদতে মনোনিবেশ করো, দুনিয়ার সঙ্গে মন লাগিয়ো না। দুনিয়ার সব কিছুকে অপছন্দ করো।³⁵¹
একবার হযরত ফাতিমা রা. অসুস্থ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'কেমন আছ, মেয়ে?' ফাতিমা রা. কিছু অভাব-অনটনের অভিযোগ করলে তিনি বললেন, 'মেয়ে! তুমি বিশ্বের সকল নারীর নেত্রী হও এতে কি সন্তুষ্ট নও?' ফাতিমা রা. বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, তাহলে মারইয়াম বিনতে ইমরানের অবস্থান কোথায়?' জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তিনি ছিলেন তার সময়ের নারীদের নেত্রী, আর তুমি হবে তোমার সময়ের নারীদের নেত্রী। আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতের একজন নেতার সাথে বিয়ে দিয়েছি।' হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেছেন, 'জান্নাতের অধিবাসী নারীদের নেত্রী হলেন ক্রমানুসারে মারইয়াম, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, খাদীজা ও ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া।³⁵²
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটিতে চারটি রেখা টানলেন, তারপর বললেন, তোমরা কি জান এটা কি? সবাই বলল, আল্লাহর ও তাঁর রাসূলই সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালো জানেন। তিনি বললেন, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ, মারইয়াম বিনতে 'ইমরান ও আসিয়া বিনতে মুযাহিম (ফিরআউনের স্ত্রী) –জান্নাতের নারীদের ওপর তাদের রয়েছে এক বিশেষ মর্যাদা।
হযরত ফাতিমা রা. ব্যক্তিত্বের প্রতি যে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে তা রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই হাদীসে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-'পৃথিবীর নারীদের মধ্যে তোমার অনুসরণের জন্য মারইয়াম, খাদীজা, ফাতিমা ও ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া যথেষ্ট।'³⁵³
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে বেশি স্নেহের ও প্রিয় পাত্রী ছিলেন ফাতিমা রা.। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার সবচেয়ে বেশি প্রিয় মানুষটি কে? বললেন, ফাতিমা।³⁵⁴ নারীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিলেন ফাতিমা রা. এবং পুরুষদের মধ্যে আলী রা.।³⁵⁵
রাসূলের অন্তিম শয্যায়
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১২ই রবিউল আউয়াল ১১ হিজরীতে সোমবার দিন ইন্তেকাল করেন। হযরত ফাতিমা রা.-এর জন্য যদিও তা অসহনীয় ছিল তারপরও তিনি ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসিয়তের ওপর আমল করলেন। শোকে অধীর হয়ে বললেন, আমার পিতা রবের দাওয়াতে সাড়া দিলেন। আল্লাহ তাকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন। হে আমার পিতা, আপনার ঠিকানা জান্নাত হোক। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
হযরত ফাতিমাতুয যাহরা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের সময় কিছু কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। তার কবিতা নিম্নরূপ,
يا خاتم الرسول المبارك صلوة صلى عليك منزل القرآن
হে বরকতময় আখেরী নবী, কুরআন অবতীর্ণকারী আপনার ওপর দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
অন্য আরেকটি কবিতা হলো এই,
انا فقد ناك فقد الارض وابلها - وغاب من غبت عنا الوحي والكتب
আমরা আপনর থেকে এইভাবে বঞ্চিত হয়েছি যেভাবে যমীন বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। যখন আপনা ইন্তেকাল হয়েছে তখন থেকে ওহী আসা, কিতাব অবতীর্ণ হওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
ফাতিমা রা.-এর কবিতা দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে শেষ নবী—এর শক্তিশালী প্রমাণ মেলে। একথা খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, তার পর নবুয়তের ধারা বন্ধ। হাকীকী, গায়রে হাকীকী ও জিল্লা ইত্যাদি সব ধরনের নবুওয়াত বন্ধ। যে ব্যক্তি পরে কোনো প্রকার নবী দাবি করবে সে মিথ্যাবাদী। ইসলাম থেকে বঞ্চিত।
একবার হযরত আলী রা. ঘাসের গাট্টি মাথায় নিয়ে ঘরে আসলেন। ফাতিমাকে বললেন, 'গাট্টিটা নামাতে আমাকে একটু সাহায্য করো।' তখন তিনি কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন বিধায় আসতে একটু দেরি হলো। হযরত আলী রা. গাট্টি মাটিতে ফেলে দিয়ে বলেন, 'আমি জানি, তুমি ঘাসের গাট্টি হাতে ধরতে অপমানবোধ করো।'
হযরত ফাতিমা রা. ক্ষমাপ্রার্থনা করে বললেন, 'কক্ষনো না। কাজে ব্যস্ত থাকার ফলে তাড়াতাড়ি আসতে পারিনি। নতুবা যে কাজ আমার আব্বাজান আল্লাহর রাসূল হওয়ার পরও নিজের মোবারক হাত দিয়ে করেছেন, তা করতে আমি কেন অপমান বোধ করব?'
হযরত আলী রা. তার উত্তর শুনে মুচকি হেসে ঘরের ভেতরে চলে যান। এ রকমই ছিল হযরত ফাতিমা রা.-এর গুণাবলী ও স্বভাব! তার মৃত্যুর পর যখনই কেউ আলী রা.-কে জিজ্ঞাসা করত, 'আপনার সঙ্গে ফাতিমা রা.-এর আচরণ কেমন ছিল?' তখনি তিনি অশ্রুসজল হয়ে যেতেন। আর বলতেন, ‘সে এমন এক সুন্দর ফুলের মতো ছিল যে সর্বদাই ঘ্রাণ ছড়াত। সে মরে যাওয়ার পরেও হৃদয় মনকে এখনো সুবাসিত করে। সে তার জীবদ্দশায় আমাকে কখনো কোনো বিষয়ে অভিযোগ করার সুযোগ দেয়নি।’
মহান প্রভুর সান্নিধ্যে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন কেউ কোনো দিন তাকে হাসতে দেখেনি; এমনকি মুচকি হাসিও না। হযরত ফাতিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালে শোকে অধীর হয়ে গিয়েছিলেন; কিন্তু তারপরেও মৃত্যু-দিবস পালন করেননি, শরীয়ত-পরিপন্থী কোনো কাজ করেননি।³⁵⁶
হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুমূর্ষু অবস্থায় নিজ কন্যা ফাতিমা রা.-কে ডেকে কানে কানে কিছু কথা বললেন, আর তিনি কাঁদতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় তাকে ডেকে কানে কানে কিছু কথা বললেন, আর তিনি হাসতে লাগলেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে আমাকে বললেন, এই অসুস্থতায় তার ইন্তেকাল হয়ে যাবে। তো আমি কাঁদতে লাগলাম। পরে তিনি আমাকে বললেন যে, আমি তার খান্দানের মধ্য থেকে প্রথম তার সঙ্গে গিয়ে মিলব। তো আমি হাসতে লাগলাম।
ইবনে সাআদ বলেন, যেমন হাদীস হযরত উম্মে সালমা বর্ণনা করেছেন আমি এমন হাদীস ফাতিমা রা. থেকেও বর্ণনা করেছি। আর এতে আছে, হযরত উম্মে সালমা রা. তাকে প্রথমে কাঁদা এবং পরে হাসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে আমাকে বললেন, খুব শীঘ্রই তার ইন্তেকাল হয়ে যাবে। পরে আবার বললেন, আমি মারইয়াম বিনতে ইমরান আ.-এর পর থেকে জান্নাতের মহিলাদের সরদার হব তো আমি হাসতে লাগলাম।³⁵⁷
হযরত ফাতিমার রা. অপর তিন বোন যেমন তাদের যৌবনে ইন্তেকাল করেন তেমনি তিনিও হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের আট মাস, মতান্তরে সত্তর দিন পর ইহলোক ত্যাগ করেন। অনেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের দুই অথবা চার মাস অথবা আট মাস পরে তার ইন্তেকালের কথাও বলেছেন। তবে এটাই সঠিক যে, হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পর তিনি ইন্তেকাল করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী-'আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই প্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে-সত্যে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতলাভের পাঁচ বছর পূর্বে যদি হযরত ফাতিমার রা. জন্ম ধরা হয় তাহলে মৃত্যুকালে তার বয়স ২৯ বছর হয়। আর কেউ বলেছেন যে, নবুওয়াত লাভের এক বছর পর ফাতিমার রা. জন্ম হয়, এই হিসাবে তার বয়স ২৯ বছর হবে না। যেহেতু অধিকাংশ সীরাতবিশেষজ্ঞ মনে করেন, মৃত্যুকালে ফাতিমার রা. বয়স হয়েছিল ২৯ বছর, তাই তার জন্মও হবে নবুয়তের পাঁচ বছর পূর্বে।³⁵⁸
আল-ওয়াকিদী বলেছেন, হিজরী ১১ সালে রমাযান মাসের তৃতীয় দিন ফাতিমার রা.-এর ইন্তেকাল হয়। হযরত আব্বাস রা. তার জানাযার নামায পড়ান। হযরত আলী, ফযল ও আব্বাস রা. কবরে নেমে দাফন কাজ সম্পন্ন করেন। তার অসিয়ত মতো রাতের বেলা তাকে দাফন করা হয়। একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, আলী, মতান্তরে আবু বকর রা., জানাযার নামায পড়ান। স্বামী আলী রা. ও আসমা বিনতে উমাইস রা. তাকে গোসল দেন।³⁵⁹
ঐতিহাসিক মাসউদী বর্ণনা করেন, সাইয়েদা ফাতিমা রা.-এর দাফনের পর হযরত আলী রা. ঘরে ফিরে আসলেন। তিনি খুব চিন্তিত ছিলেন আর বার বার এই কবিতাগুলো পড়ছিলেন,
ارى علل الدنيا كثيرة وصاحبها حتى الممات عليل لكل اجتماع من عليلين فرقة وكل الذي دون الفراق قليل وان افتقادي فاطمة بعد احمد دليل على ان لا يدوم خليل
আমি দেখছি, দুনিয়ার অসুস্থতা ও মুসিবত চতুর্দিক থেকে আমাকে ঘিরে ফেলেছে। আর দুনিয়াবাসী যতদিন আছে অসুস্থতাও থাকবে। প্রত্যেক মিলনের পরেই দুই প্রিয়ভাজনের মধ্যে বিচ্ছেদ রয়েছে। আর বিচ্ছেদবিহীন সময় একেবারেই অল্প হয়। নিশ্চয়ই আহমদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর ফাতিমার বিচ্ছেদ এ কথারই প্রমাণ যে, প্রিয়জন সবসময় এক সঙ্গে থাকে না।
অন্য আরেক বর্ণনায় আছে হযরত আলী রা. কিছু দিন যাবৎ প্রতিদিন হযরত ফাতিমা রা.-এর কবরে আসেন, হযরত ফাতিমা রা.-কে স্মরণ করে কাঁদতে কাঁদতে এই কবিতা পড়েন,
مالی مررت على القبور مسلماً قبر الحبيب مسلم يرد جوابی ياقبر مالك لا تجيب مناديا امللت بعدي خلة الاحباب
আমার কী হলো! আমি কবরকে সালাম দিতে আসি; কিন্তু প্রিয়জন কবর থেকে আমার প্রশ্নের কোনো উত্তরই দিচ্ছে না। হে কবর, তোমার কী হলো যে, আহ্বানকারীকে কোনো জাওয়াব দাও না? তুমি কি প্রিয়জনের ভালোবাসা থেকে বিরক্ত হয়ে গিয়েছ?
কোনো বর্ণনায় আছে যখন মদীনাবাসী ফাতিমাতুয যাহরা রা.-এর মৃত্যুর খবর পেল তখন সকল নারী ও পুরুষ অশ্রুসজল হলো। মানুষের ওপর এমন পেরেশানী ও বিস্ময় নেমে এলো যেমন এসেছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের দিন। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা., হযরত উমর রা. প্রতিদিন আলী মুরতাযা রা.-এর কাছে গিয়ে সমবেদনা জ্ঞাপন করতেন।³⁶⁰
উম্মু সালমা রা. বলেন, ফাতিমার রা. ওফাতের সময় আলী রা. পাশে ছিলেন না। তিনি আমাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, আমার গোসলের জন্য পানির ব্যবস্থা করুন। নতুন পরিচ্ছন্ন কাপড় বের করুন, পরব। আমি পানির ব্যবস্থা করে নতুন কাপড় বের করে দিলাম। তিনি উত্তমরূপে গোসল করে নতুন কাপড় পরেন। তারপর বলেন, আমার বিছানা করে দিন বিশ্রাম করব। আমি বিছানা করে দিলাম। তিনি কিবলামুখী হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তারপর আমাকে বলেন, আমার বিদায়ের সময় অতি নিকটে। আমি গোসল করেছি। দ্বিতীয়বার গোসল দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমার পরিধেয় বস্ত্রও খোলার প্রয়োজন নেই। এরপর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
আলী রা. ঘরে আসার পর আমি তাকে এসব ঘটনা বললাম। তিনি ফাতিমার রা. সেই গোসলকেই যথেষ্ট মনে করলেন এবং সেই অবস্থায় দাফন করেন। এ রকম বর্ণনা উম্মে রাফি থেকেও পাওয়া যায়। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস এবং আলী রা. ফাতিমাকে গোসল দিয়েছেন।³⁶¹
ফাতিমা রা. এই পরিমাণ লাজ-লজ্জাসম্পন্না ছিলেন যে, তিনি যখন মুমূর্ষ অবস্থায়—তখন একদিকে অসুস্থতার কষ্ট, অন্যদিকে চিন্তা করতেন, যদি জানাযা খোলামেলা নেওয়া হয় তাহলে মানুষ আমার অবয়ব দেখে ফেলবে। আর এটা লজ্জাশীল মহিলাদের মর্যাদার পরিপন্থী। এই জন্য তিনি হযরত আবু বকর রা.-এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস রা.-কে বললেন, ‘হে উমাইস, মেয়েদের লাশ উন্মুক্ত অবস্থায় যে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়—এটা আমার পছন্দ নয়। এতে বেপর্দা হয়। নারী-পুরুষের লাশের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করা হয় না। পুরুষরা যে মেয়েদের লাশ খোলা অবস্থায় বহন করেন, এটা তাদের একটা মন্দ কাজ।’ আসমা বিনতে উমাইস রা. প্রথম স্বামী জাফর ইবনে আবি তালিবের সঙ্গে আবিসিনিয়ায় ছিলেন। সেখানকার সব অবস্থা সম্পর্কে তার জানা ছিল। উমায়েস রা. বলতে লাগলেন, ‘হে রাসূলের মেয়ে, আমি আবিসিনিয়াতে মহিলাদের জানাযায় নেওয়ার একটি পদ্ধতি দেখেছি।’ হযরত ফাতিমা রা. বললেন, ‘তাহলে আমাকে বলো সেটা কীভাবে।’ হযরত ফাতিমা রা.-এর আগ্রহের কথা শুনে হযরত আসমা রা. কয়েকটি খেজুরের ডাল নিয়ে মুড়িয়ে গোলাকৃতি করে খাটের ওপর রাখলেন। তারপর এগুলোকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন। ফলে এটি পালকির মতো হয়ে গেল যা পর্দাবৃত। হযরত ফাতিমা রা. এটা দেখে খুব খুশি হলেন এবং মুচকি হেসে বললেন, ‘আমার জানাযা যেন এভাবে নিয়ে যাওয়া হয়; কোনো প্রকার পর্দার যেন অসুবিধা না হয়।’ হযরত আলী রা.-কে বললেন, ‘তুমি আমাকে রাতে দাফন দিয়ো যেন জানাযায় কোনো বেগানা পুরুষের দৃষ্টি না পড়ে।’ হযরত আলী রা. তার অসিয়ত পালন করলেন।
হযরত ফাতিমা রা.-এর লাশ পর্দার মধ্য দিয়ে কবর পর্যন্ত নেওয়া হয়। ইসলামে প্রথম এভাবে তার লাশটিই নেওয়া হয়। তার পরে উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশের লাশটিও এভাবে কবর পর্যন্ত বহন করা হয়। হযরত আলী রা. স্ত্রী ফাতিমা রা.-এর দাফন-কাফনের কাজ সম্পন্ন করে যখন ঘরে ফিরলেন, তখন তাকে বেশ বিষণ্ণ ও বেদনাকাতর দেখাচ্ছিল।
আল-ওয়াকিদী বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনে আবিল মাওলাকে বললাম, 'বেশিরভাগ মানুষ বলে থাকে যে, ফাতিমা রা.-কে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়েছে। আপনি কী মনে করেন?' তিনি জবাব দিলেন: 'জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়নি। তাকে আকীলের বাড়ির এক কোণে দাফন করা হয়েছে। তার কবর ও রাস্তার মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় সাত হাত।'
মহান আল্লাহ তার ইচ্ছাকে সর্বদায় পরিপূর্ণতা দান করে থাকেন। মানুষ যত বড়ই হোক না কেন একদিন তাকে নিঃশেষ হয়ে যেতে হবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যা জান্নাতী মহিলাদের সরদার ফাতিমা রা. একই বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তিনি তার পিতৃশোক বেশি দিন সহ্য করতে পারেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের ছয় মাস পরেই পিতার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তার সঙ্গে মিলিত হন। তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র উনত্রিশ বছর।
হযরত ফাতিমা রা.-এর জানাযায় হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. পড়িয়েছিলেন। অন্য রেওয়াতে আছে হযরত আলী রা.। আল্লাহু আকবার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ের পর্দার প্রতি কি পরিমাণ গুরুত্ব দিতেন। তিনি তার জানাযা খোলা নিয়ে যাওয়াকে অপছন্দ করতেন এবং এই চিন্তায় অস্থির ছিলেন যে কোনো বেগানা পুরুষ দেখে ফেলে কি না। এই ঘটনায় আমাদের জন্য এই শিক্ষা রয়েছে যে, মহিলাদের জানাযায় পর্দার খুব খেয়াল রাখা। যে কোনো মূল্যেই হোক পর্দার লঙ্ঘন করা এবং বেগানা পুরুষ মহিলাদের দেখা অনেক বড় গোনাহ। দ্বিতীয় শিক্ষা এই যে, মহিলাদের লজ্জাশীল হওয়া উচিত। যে যত বেশি লজ্জাশীল হবে সে দুনিয়া আখেরাতে ততবেশী মর্যাদা পাবে। হযরত ফাতিমা রা.-কে বাকী নামক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
হযরত আলী রা. ফাতিমার মৃত্যুতে ভীষণ কষ্ট পেলেন। সাহাবায়ে কেরামও একইভাবে দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠেন। তারা এসে আলী রা.-কে সান্ত্বনা দেন। ফাতিমা রা.-এর ইন্তেকালের পর হযরত আলী রা. যদিও অন্য বিবাহ করেছিলেন, তারপরেও হযরত ফাতিমাকে কখনো ভোলেননি। মাঝে মধ্যে তার গুণাগুণ স্মরণ করতেন এবং কাঁদতেন করতেন। কেউ তাকে একবার ফাতিমা রা.-এর পরিচিতি জিজ্ঞেস করল—তিনি কেমন গুণের অধিকারী ছিল? জবাবে হযরত আলী রা. বললেন, 'তার পরিচিতি ও গুণাগুণ কয়েক শব্দে বর্ণনা করা যাবে না। সে পৃথিবীর সকল মহিলাদের থেকে ভালো ছিল।'
মোটকথা, আমাদের মা-বোন মেয়ে-স্ত্রীগণ যদি হযরত ফাতিমা রা.-এর জীবনীকে আদর্শ বানায় তাহলে সে কখনো বিভ্রান্ত হবে না। হযরত ফাতিমা রা.-এর পবিত্র আমল ও আদর্শ থেকে সে এমন শিক্ষা নিতে পারবে যা তার দুনিয়া আখিরাতকে সুন্দর ও আলোকিত করবে। এবং সে আল্লাহ তাআলার কাছে মাকবুল ও উঁচু মর্যাদা পাবে।
টিকাঃ
৩১৫. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৮৫৬।
৩১৬. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৩১০।
৩১৭. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৪০।
৩১৮. তারাজিমু সায়্যিদাতি বায়তিন নুবুওয়াহ, ৫৯২।
৩১৯. নিসাউম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ২০৬।
৩২০. উসুদুল গাবাহ, ৫/২৫০; আল ইসাবাহ, ৪/৪৫০।
৩২১. হায়াতুস সাহাবা, ১/৪৯৪।
৩২২. সিরাতে ফাতেমাতুয যাহরা, ৯১-৯৩।
৩২৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৪/২৬।
৩২৪. তারীখুল খুলাফা সূযুতী, ২৭৫।
৩২৫. হায়াতুস সাহাবা, ২/৪৩০।
৩২৬. সূরা আহযাব, ৩৩:৩৩।
৩২৭. মুখতাসার তাফসীর ইবনে কাসীর, ৩/৯৪।
৩২৮. উসুদুল গাবাহ, ৭১৭৫; আদ-দুররুল মানসূর, ৬/৬০৫; নিসাউম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ২১৯।
৩২৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১২৩।
৩৩০. সূরা আলে ইমরান, ৩:৬১।
৩৩১. মুসনাদ, আহমাদ, ৪/১০৭; মুখতাসার তাফসীর ইবনে কাসীর, ১/২৮৭-২৮৯।
৩৩২. তাহযীবুত তাহযীব, ১২/৪৪২; আল ইসাবাহ, ৪/৩৬৬।
৩৩৩. উসুদুল গাবাহ, ৫/৫৩৫।
৩৩৪. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৫৯; আল ইসাবাহ, ৪/৪৫০।
৩৩৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৫।
৩৩৬. সহীহ, মুসলিম, ২০৯১।
৩৩৭. আল ইসাবাহ, ৪/২৮৩।
৩৩৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪২৮।
৩৩৯. সুনান, আদ-দারেমী, হাদীস নং ৮০; হায়াতুস সাহাবা, ২/৪৩০।
৩৪০. সুনান, আবু দাউদ, ৩১৩৩; সুনান, নাসায়ী, ১৮৮১।
৩৪১. হায়াতুস সাহাবা, ১/৪৩৭।
৩৪২. সুনান, আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭১৬।
৩৪৩. তাহযীবুল আসমা, ১৬২।
৩৪৪. সুনান, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৯১৩।
৩৪৫. তরজমায়ে আবনাউন নবী, ১৭৪।
৩৪৬. তরজমায়ে ইমাম হুসাইন রা., ২২।
৩৪৭. সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৭৭২।
৩৪৮. সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৫৭০।
৩৪৯. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৬।
৩৫০. সিরাতে ফাতিমা, ৯৮।
৩৫১. সুনান, আবু দাউদ, হাদীস নং ২৯৮৯।
৩৫২. মুসনাদ, আহমাদ: ১/২৯৩; মুসতাদরাকে হাকিম, ২/৫৯৪।
৩৫৩. সুনান, আত-তিরমিযী, ৩৮৭৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ৩/১৫৫।
৩৫৪. আস সিয়ার, ২/১৩৩।
৩৫৫. সুনান, আত-তিরমিযী, ৩৮৬৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ৩/১৫৭।
৩৫৬. সীরাতে ফাতিমা, ১৩৪-১৩৬।
৩৫৭. হায়াতুস সাহাবা, ২/৪৩১।
৩৫৮. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১২৭।
৩৫৯. আল-ইসতিআব, ৪/৩৬৭, ৩৬৮; আনসাবুল আশরাফ, ১/৪০২, ৪০৫।
৩৬০. সিরাতে ফাতিমাতুয যাহরা, ১৭৮।
৩৬১. দেখুন তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৭; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১২৯।
📄 হালীমা সা‘দিয়া রা.
রাসূলের দুধ মা
ব্যক্তিত্বসম্পন্না এই মহীয়সী নারী প্রতিটি মুসলমানের কাছে খুবই সম্মানিতা। প্রত্যেক মুমিনেরই প্রিয় পাত্রী তিনি। কারণ, তার স্তন থেকেই দুধ পান করেছেন পরম সৌভাগ্যবান শিশু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.।
তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসাপূর্ণ কোলে ঘুমিয়েছেন। তার মাতৃমমতায় উপচে পড়া কোলে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তিনি তার ও তার গোত্র বনু সাআদের স্পষ্ট ও মিষ্টি ভাষা থেকে উপকৃত হয়েছেন। ফলে তিনি হয়েছিলেন আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ স্পষ্টভাষী এবং ভাষা-অলঙ্কার ও বাগ্মিতায় হয়েছেন সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ।³⁶²
জগদ্বিখ্যাত সেই মানবী হচ্ছেন হযরত হালীমা সা'দিয়া রা.। রাসূলুল্লাহ সা.-এর সম্মানিতা দুধ মা।
দুগ্ধপানের ঘটনা
হালীমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই আবু সুফইয়ান ইবনুল হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিবের ধাত্রী ও দুধ মা ছিলেন। বনু সাআদ গোত্রের এক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হামযা ইবনে আবদিল মুত্তালিবের ধাত্রী ও দুধ মা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হালীমার কাছে তখন একদিন হামযা রা.-এর দুধ মা তাকে নিজের বুকের দুধ পান করান। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হালীমার নিকট যাওয়ার আগে কিছু দিন আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবার দুধ পান করেছিলেন। সুওয়াইবা কিছুদিন হামযাকেও দুধ পান করিয়েছিলেন। তাই হামযা বনু সাআদ ও সুওয়াইবা দু'দিক দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুধভাই।³⁶³
হালীমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুধপান করিয়েছেন। এ কারণে তিনি দুধ পানকারিণী হিসেবে আরবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিনি দুধের শিশু হিসেবে যেভাবে লাভ করেন তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, সে ছিল অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষের বছর। আমি বনু সাআদের আরও দশজন মহিলার সাথে সাদা রঙের একটি দুর্বল মাদি গাধার ওপর সওয়ার হয়ে দুগ্ধপোষ্য শিশুর খোঁজে বের হলাম। আমাদের সাথে একটা বুড়ো মাদি উটও ছিল। আল্লাহর কসম! তার ওলান থেকে এক কাতরা দুধও বের হচ্ছিল না। খিদের জ্বালায় আমাদের শিশুদের কান্নাকাটির কারণে আমরা রাতে মোটেও ঘুমোতে পারতাম না। আমার বুকের ও আমাদের উটনীর দুধে আমার শিশু পুত্র আবদুল্লাহর পেট ভরত না। তবে আমরা বৃষ্টি ও সচ্ছলতার আশা করতাম।
অবশেষে আমরা মক্কায় পৌঁছলাম। আমাদের প্রত্যেকের সামনে শিশু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপস্থাপন করা হলো। তিনি ইয়াতীম শিশু—একথা শোনার পর কেউ আর তাকে নিতে আগ্রহ দেখাল না। কারণ, আমরা শিশুর পিতা-মাতার নিকট থেকে ভালো কিছু লাভের আশা করতাম। আমরা বলাবলি করতাম—শিশুটি ইয়াতীম। তার মা ও দাদা তেমন কী আর দিতে পারবে? এ কারণে আমরা তাকে অপছন্দ করলাম। এর মধ্যে দলের একমাত্র আমি ছাড়া আর সবাই স্তন্যপায়ী শিশু পেয়ে গেল।
যখন আমরা আমাদের গোত্রে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম তখন আমি আমার স্বামীকে বললাম, আল্লাহর কসম! অন্যরা স্তন্যপায়ী শিশু নিয়ে ফিরবে আর আমি শূন্য হাতে ফিরবো, এ আমার মোটেই পছন্দ নয়। আমি এই হাশিমী ইয়াতীম শিশুটির নিকট যাব এবং তাকেই নিয়ে ফিরবো। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি তাই কর। হতে পারে তার মধ্যে আমাদের জন্য বরকত ও সমৃদ্ধি রেখেছেন। অতঃপর তার বাড়িতে গিয়ে নিয়ে এলাম।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গ্রহণের সাথে সাথে হালীমা ও তার স্বামীর নিকট কল্যাণ ও সমৃদ্ধি নেমে এলো। হালীমা শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোলে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরার সাথে সাথে তার শুকনো বুক দুধে ভরে গেল। তিনি পেট ভরে পান করলেন। তারপর হালীমা ওঁর নিজের শিশু সন্তান আবদুল্লাহকে স্তন দিলেন, সেও পেট ভরে পান করল। তারপর দু'শিশুই ঘুমিয়ে পড়ল।
হালীমা ও তার স্বামী দুজনই ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর ছিলেন। যেহেতু তাদের মাদী উটটি ওলান ছিল শুকনো। তারা খাবার বা দুধ পাবেন কোথায়? কিন্তু হঠাৎ করে তাদের অবস্থা বদলে গেল। এ সম্পর্কে হালীমা নিজেই বলেছেন, 'আমার স্বামী আমাদের গাধীটির কাছে গিয়ে দেখলেন, তার ওলানটি দুধে পূর্ণ হয়ে আছে। তিনি দুধ দুইলেন এবং আমরা দুজন পেট ভরে পান করলাম। সে রাতটি আমাদের পরম সুখে কাটল। সকালে স্বামী আমাকে বললেন, 'আল্লাহর কসম, হালীমা! জেনে রাখ, তুমি একটি কল্যাণময় শিশু গ্রহণ করেছ।"
আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, আমি তা-ই আশা করি।' তারপর আমরা আমাদের পল্লীতে ফেরার জন্য বের হলাম। আমি শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে আমার মাদী গাধাটির ওপর উঠে বসলাম। কী আশ্চর্য! সেটি এত দ্রুত চলতে লাগল যে, কাফেলার অন্য কারও গাধা তার সাথে পেরে উঠছিল না। এক সময় আমার সঙ্গী-মহিলারা আমাকে বলল, যুওয়ায়িবের মেয়ে, আচ্ছা বলো তো, এটা কি তোমার সেই গাধী—যার ওপর সাওয়ার হয়ে তুমি গিয়েছিলে? আমি বললাম, নিশ্চয়, এটা সেই গাধী। তারা বলল, আল্লাহর কসম, তাহলে অন্য কোনো ব্যাপার আছে।³⁶⁴
কাফেলা বনু সাআদের পল্লীতে পৌঁছল। সে বছর এই পল্লীতে অভাব ও দারিদ্র্যের একটা ছাপ সর্বত্র বিরাজমান ছিল। হালীমা সেখানে পৌঁছার পরই এই ইয়াতীম শিশুর বরকত ও কল্যাণ প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন। সবকিছুতেই তাদের বরকত ও সমৃদ্ধি হতে লাগল। তার ছাগল-ভেড়া শুকনো চারণভূমিতে অন্যদের ছাগল-ভেড়ার সাথে চরতে যেত। যখন ফিরত তখন তার গুলোর ওলান দুধে পূর্ণ থাকত, কিন্তু অন্যদের গুলো যেমন যেত তেমনই ফিরত। তাই তার গোত্রের লোকেরা তাদের নিজ নিজ রাখালদেরকে বলত, তোমাদের কী হয়েছে, আবু যুওয়ায়িবের মেয়ের রাখাল যেখানে তার ছাগল চরায় সেখানে তোমরা চরাতে পার না? কিন্তু তা করেও তারা দেখল, তাতে কোনো লাভ হয় না।
হালীমার এভাবে দু-টি বছর কেটে গেল। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতি দিনই তিনি কল্যাণ ও সমৃদ্ধি দেখেতে পেলেন। এর ভেতর দিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুধপানের সময়-সীমা পূর্ণ হয়ে গেল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনভাবে বেড়ে উঠলেন-যা সচরাচর অন্য শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। হালীমা মনে করলেন, এখন তাকে মক্কায় তার মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। তিনি এই শিশুর মধ্যে যে শুভ ও কল্যাণ এ দু-বছর প্রত্যক্ষ করেছেন তাতে স্বভাবতই তাকে আরও কিছু দিন নিজের কাছে রাখার ইচ্ছা করতেন। তা সত্ত্বেও তিনি তাকে মক্কায় নিয়ে গেলেন।
মা আমিনা তার প্রিয় সন্তানকে ফিরে পেয়ে দারুণ খুশি হলেন। বিশেষত যখন দেখলেন, তার সন্তান এমনভাবে বেড়ে উঠেছে যেন সে চার বছরের কোনো শিশু। অথচ তার বয়স এখনো দু-বছর অতিক্রম করেনি। হালীমা শিশুকে আরও কিছু দিন পল্লীতে তার নিকট রাখার জন্য মা আমিনার নিকট আবদার জানালেন। মা রাজী হলেন। হালীমা উৎফুল্ল চিত্তে শিশুকে নিয়ে পল্লীতে ফিরে এলেন। শিশুটিও পল্লী প্রকৃতিতে ফিরে আসতে পেরে দারুণ খুশি। এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু সাআদে দ্বিতীয় বারের জন্য ফিরে এলেন। আর এখানেই তার বক্ষ বিদারণের বিস্ময়কর ঘটনটি ঘটে যখন তার বয়স চার অথবা পাঁচ বছর।
ইমাম মুসলিম তার নিজস্ব সনদে আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য শিশুদের সাথে একদিন খেলছেন, এমন সময় জিবরাঈল আ. তার কাছে আসেন। তারপর তাকে ধরে মাটিতে চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে তার বুকটি ফেঁড়ে ফেলেন। তারপর তার হৃৎপিণ্ডটি (কালব) বের করে তার থেকে একটি রক্তপিণ্ড পৃথক করে বলেন, এ হলো তোমার মধ্যে শয়তানের অংশ। তারপর সেটা একটি সোনার গামলায় যমযমের পানি দিয়ে ধুয়ে যথাস্থানে স্থাপন করেন। খেলার সঙ্গীরা এ দৃশ্য দেখে দৌড়ে তার ধাত্রী মা হালীমার কাছে গিয়ে বলে, মুহাম্মাদকে হত্যা করা হয়েছে। সবাই ছুটে আসে এবং তাকে বিবর্ণ অবস্থায় দেখতে পায়।³⁶⁵
এ ঘটনার পর হালীমা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেন। ইবন ইসহাক বলেন, শিশু মুহাম্মাদকে তাঁর মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে কোনো কোনো আলিম আমাকে একথা বলেছেন যে, দুধ ছাড়ার বয়স হওয়ার পর দ্বিতীয় বার যখন হালীমা রা. মুহাম্মাদকে নিয়ে যান তখন আবিসিনিয়ার কিছু খ্রিস্টধর্মাবলম্বী লোক তাকে দেখে তার পরিচয় জানতে চায় এবং তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তারপর তারা তাকে তাদের দেশে, তাদের রাজার নিকট নিয়ে যেতে চায়। তারা বলে, এই শিশু ভবিষ্যতে বড় কিছু করবে। আমরা তার মধ্যে সেসবের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। হালীমা ভয় পেলেন, তারা হয়তো তাকে চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি তার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেন।³⁶⁶ ছয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি মায়ের স্নেহে লালিত-পালিত হন। তারপর মা ইন্তেকাল করেন।
একটি বর্ণনা এ রকম এসেছে যে, হালীমা যখন শিশু মুহাম্মাদকে শেষ বারের মতো তার মায়ের নিকট নিয়ে আসছিলেন তখন মক্কার উঁচু ভূমিতে পৌঁছার পর তাকে হারিয়ে ফেলেন। পরে ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল ও কুরাইশ গোত্রের অন্য এক ব্যক্তি তাকে পান। তারা দু'জন তাকে নিয়ে আবদুল মুত্তালিবের নিকট এসে বলেন, এই আপনার ছেলে। আমরা তাকে মক্কার উঁচু ভূমিতে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। আমরা তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে সে বলে: আমি মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে আবদিল মুত্তালিব। তাই আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।³⁶⁷
রাসূলের কাছে দুধমাতার মর্যাদা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার নিকট ফিরিয়ে দিয়ে হালীমা তার জনপদে ফিরে গেলেন। বহু বছর চলে গেল। এ দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবক হলেন, বিয়ে করলেন; কিন্তু মা হালীমার স্মৃতি কোনো দিন ভোলেননি। তাঁর স্নেহ-মমতার কথা, লালন-পালনের কথা প্রায়ই তিনি স্ত্রী খাদীজার রা. কাছে বলতেন। খাদীজার রা. মনেও হালীমাকে একটু দেখার ইচ্ছা জাগত। একবার এক অভাবের বছর তিনি আসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সসম্মানে বাড়িতে রাখলেন ও সমাদর করলেন। হালীমা অনাবৃষ্টির কথা বললেন, জীব-জন্তু মারা যাবার কথা শোনালেন এবং তীব্র অভাবের বর্ণনা দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সাহায্যের ব্যাপারে খাদীজার রা. সাথে কথা বললেন। খাদীজা রা. অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাকে চল্লিশটি ছাগল এবং পানি বহন ও এদিক ওদিক যাওয়ার জন্য একটি উট দান করেন। এ যাত্রায় হালীমা তার পরিবারের লোকদের জন্য অনেক উপহার-উপঢৌকন নিয়ে যান।³⁶⁸
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন কোমল মনের দয়াপ্রবণ মানুষ। নিজের আশে পাশের লোকদের শুধু নয়, বরং নিকট ও দূরের সবাইকে ভালোবাসতেন এবং হাদিয়া-তোহফা পাঠাতেন। আর এর থেকে তার দুধ মা হালীমা বাদ পড়তে পারেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা জীবন হালীমার স্নেহ-মমতার কথা মনে রেখেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্তরের গভীরে ছিল মা হালীমার স্থান। তাই চল্লিশ বছরের বেশি বয়সেও তাকে 'মা মা' বলে ডাকতে শোনা যায়, নিজের গায়ের চাদরটি খুলে বিছিয়ে তার বসার স্থান করে দিতে দেখা যায়। শুধু তাই নয়, তার ভালো-মন্দ ও অভাব-অভিযোগের কথাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনতে দেখা যায়। আরও দেখা যায় মায়ের একান্ত অনুগত সন্তানের মতো হৃষ্টচিত্তে হাসি মুখে তার সাথে কথা বলতে।³⁶⁹
হযরত হালীমার রা. দীর্ঘ হায়াত লাভ করেন। মদীনায় তিনি ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
টিকাঃ
৩৬২. সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবিয়্যাত, ৭।
৩৬৩. নিসাউম মিন আসরিন নুবুওয়াহ, ১১; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৬১।
৩৬৪. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৬৪; উসুদুল গাবাহ, ৫/৪২৭; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/২৫৫।
৩৬৫. সহীহ, মুসলিম, ১/১০১।
৩৬৬. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৬৭।
৩৬৭. ইবনে কাসীর, আস সীরাহ, ১/১৫।
৩৬৮. আনসাবুল আশরাফ, ১/৯৫; নিসাউম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ১/৩২।
৩৬৯. আল ইসাবাহ, ৪/২৭৪।
📄 উম্মে আইমান রা.
প্রিয় রাসূলের ধাত্রী মা
কে এই উম্মে আইমান?
তাকে ঠিক কত বছর বয়সে দাসী হিসেবে বিক্রির জন্য আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় আনা হয়েছিল—তা আমাদের জানা নেই। তার পিতা-মাতা, কিংবা বংশপরিচয় সম্পর্কেও কিছু জানা সম্ভব হয়নি। সেই সময় তার মতো অনেককেই দাস-দাসী হিসেবে মক্কার বাজারে বিক্রির জন্য বিভিন্ন জায়গা থকে ধরে আনা হতো। আর যাদের নিষ্ঠুর মনিবদের কাছে বিক্রি করা হতো, তাদের জন্য অপেক্ষা করত নির্মম অত্যাচার আর অমানবিক আচরণ। তবে সবার ক্ষেত্রেই যে এমনটা হতো তা কিন্তু নয়; এদের মধ্যে অনেক সৌভাগ্যবানও ছিল—তাদের মনিবরা ছিল অনেক ভালো আর দয়াবান।
আবিসিনিয় কিশোরী বারাকাহ (উম্মে আইমান) ছিলেন সেই সৌভাগ্যবানদের একজন। কারণ, তার মনিব ছিল আব্দুল মুত্তালিবের ছেলে আব্দুল্লাহ। যিনি ছিলেন মক্কার সুদর্শন আর দয়াবান যুবকদের একজন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা আব্দুল্লাহ সিরিয়া থেকে বাণিজ্য করে ফেরার পথে দুম্মাতুল জান্দাল থেকে আশি দিনারে ক্রয় করে আনেন উম্মে আইমানকে। এর এক বছর পর বিবি আমেনার সাথে আব্দুল্লাহর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের পর স্বামী আব্দুল্লাহ উম্মে আইমানকে দাসী হিসাবে বিবি আমেনার নিকট সোপর্দ করেন। দাসীর খেদমতে বিবি আমেনা অত্যন্ত খুশি হয়ে তাকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে দেন।
আমেনা বললেন, 'ওহে উম্মে আইমান, তুমি এখন আযাদ। যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পার।' তিনি জবাব দিলেন, 'এমন দয়ালু মনিব ছেড়ে যাবই বা কোথায়। এই পৃথিবী আমার অপরিচিত। তাছাড়া দস্যুর কবলে পড়ে আমার পিতা-মাতা নিরুদ্দেশ। বাইরে বের হলে হয়তো আমাকে আবার কারও দাসত্বই বরণ করে নিতে হবে। আমি যাব না। যতদিন বেঁচে থাকি ততদিন আপনার সেবিকা হিসাবেই থাকতে চাই।'
আব্দুল্লাহ অত্যন্ত খুশি হলেন উম্মে আইমানের কথা শুনে এবং তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, 'বেশ তো তোমার মন চাইলে তুমি থাকতে পার।' উম্মে আইমান রা. সেদিন থেকে নবী পরিবারের সদস্যা হিসাবে বসবাস শুরু করেন। বিবি আমেনা উম্মে আইমানকে ছোট বোন হিসাবেই দেখতেন।
উম্মে আইমান রা.-এর ভাষ্যমতে, বিয়ের দুই সপ্তাহ হতে না হতেই পিতা আব্দুল মুত্তালিবের নির্দেশে ব্যবসার কাজে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়েছিল সদ্যবিবাহিত আব্দুল্লাহকে। ব্যাপারটাতে নববধূ আমিনা খুব হতাশ হয়ে বললেন, 'কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! হাতের মেহেদির রঙ পর্যন্ত (মুছে) যায়নি এখনো আমার, এই অবস্থায় একজন নববধূকে একা রেখে তার স্বামী সিরিয়া যায় কী করে?'
যেভাবে ইয়াতীম হন শিশু মুহাম্মাদ
আব্দুল্লাহর এই প্রস্থান ছিল আমিনার জন্য খুবই হৃদয়বিদারক। আর সেই কষ্টে নববধূ আমিনা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। বারাকাহ বলেন, 'তিনি চলে যাওয়ার পর আমি দেখলাম, তার স্ত্রী বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছেন। ভয়ে আর কষ্টে আমি অনেক জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। এ চিৎকার শুনে তিনি চোখ খুললেন। তার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছে। অতিকষ্টে কান্না চেপে তিনি বললেন, 'বারাকাহ, আমাকে একটু বিছানায় শুইয়ে দাও।'
এর পর সেই কষ্টে অনেকদিন শয্যাশায়ী ছিলেন আমিনা। তার পর থেকে কারও সাথেই কথা বলতেন না তিনি। এমনকি সেসময় তার শ্বশুর বৃদ্ধ আব্দুল মুত্তালিব ছাড়া যারা তাকে দেখতে আসতেন, তাদের দিকে ফিরেও তাকাতেন না। আব্দুল্লাহ সিরিয়া যাওয়ার দুমাস পর আমিনা এক ভোরে আমাকে হঠাৎ করেই ডাকলেন। তাকে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল সেই সময়।
তিনি বললেন, 'বারাকা, আমি না অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেছি আজ।'
'নিশ্চয় ভালো কিছু, তাই না?' জিজ্ঞাস করলাম আমি।
তিনি বললেন, 'আমি দেখলাম আমার তলপেট থেকে আশ্চর্য একটা আলো বের হয়ে মক্কার আশেপাশের সমস্ত পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা—সবকিছুই আলোকিত করে দিল হঠাৎ।'
'আপনি কি সন্তানসম্ভবা?' আমি জিজ্ঞাস করলাম।
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, কিন্তু অন্য সন্তানসম্ভাবা মহিলাদের মতো কোনো ব্যথা, কষ্ট বা অসুস্থতা অনুভব করছি না আমি।'
আমি বললাম, 'নিশ্চয় আপনি এমন একটা সন্তান জন্ম দেবেন যে সবার জন্য কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে। যে মানুষকে নিয়ে আসবে অন্ধকার থেকে আলোর পথে।'³⁷⁰
যতদিন আব্দুল্লাহ দূরে ছিল, আমিনা বেশ বিষণ্ণ ও বিষাদগ্রস্ত ছিলেন। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বারাকা প্রায়ই তার পাশে থেকে বিভিন্ন গালগল্প করতেন এবং বিভিন্ন কথাবার্তা বলে তাকে হাসিখুশি উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করতেন; কিন্তু তিনি আরও বেশি বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন—যখন একদিন শ্বশুর আব্দুল মুতালিব এসে বললেন, তাদের সবাইকে ঘর ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিতে হবে; কারণ ইয়েমেনের তৎকালীন শাসক আব্রাহা তার শক্তিশালী দলবল নিয়ে মক্কা আক্রমণ করতে আসছিল। তখন আমিনা তাকে বললেন, তিনি এতই দুর্বল আর বিষণ্ণ যে, তার পক্ষে ঘর ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়া সম্ভব না। আমিনা আরও বললেন যে, আব্রাহা কখনোই মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না আর পবিত্র কাবা গৃহ ধ্বংস করতে পারবে না। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ ওটাকে রক্ষা করবেন। কথাটা শুনে শ্বশুর আব্দুল মুতালিব বেশ রাগান্বিত হয়ে পড়লেন; কিন্তু পুত্রবধূ আমিনাকে বেশ নির্ভীক দেখাচ্ছিল এ ব্যাপারে। তার চোখে মুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। আর আমিনার কথাই সত্যি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। আমিনার কথামত মক্কায় প্রবেশের পূর্বেই আব্রাহা তার হস্তীবাহিনীসহ পরাজিত আর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা বারাকা (উম্মে আইমান) আমিনার পাশে থাকতেন। তার ভাষ্যমতে, আমি তার পায়ের কাছে ঘুমাতাম আর তার ঘুমের মাঝে স্বামীর জন্য তার বিলাপ আর কান্না শুনতে পেতাম নিয়মিত। মাঝে মাঝে তার কান্নার শব্দে আমার ঘুম পর্যন্ত ভেঙে যেত, তখন আমি বিছানা থেকে উঠে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম।
ইতোমধ্যে সিরিয়া যাওয়া বণিকদের অনেকেই ফিরে এসেছে এবং তাদের পরিবার-পরিজন তাদের আনন্দের সহিত অভ্যর্থনা দিল; কিন্তু আব্দুল্লাহর কোনো খবর জানা গেল না। বারাকা গোপনে আব্দুল্লাহর খবর নেওয়ার জন্য আব্দুল মুত্তালিবের বাসায় গেল, কিন্তু কোনো খবর পেল না। শুনলে কষ্ট পাবে ভেবে বারাকা আমিনাকে খবরটা জানাল না। ইতিমধ্যে সিরিয়া যাত্রী বণিকদের সবাই ফিরে এলো, শুধু মাত্র আব্দুল্লাহ ছাড়া!
পরে ইয়াসরিব থেকে যখন আব্দুল্লাহর মৃত্যুর খবর এল, তখন বারাকা আব্দুল মুত্তালিবের ঘরেই ছিল। বারাকা বলেন, 'মক্কার সবচাইতে সুদর্শন যুবক, কুরাইশদের গর্ব আব্দুল্লাহ, যার ফেরার জন্য এত অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম আমরা সবাই, সেই আব্দুল্লাহ আর কখনোই ফিরবে না! খবরটা শোনামাত্রই আমি জোরে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলাম, আর চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে আমিনার কাছে ছুটে গেলাম।'
দুঃসংবাদটা শোনামাত্রই অজ্ঞান হয়ে গেল আমিনা। এই জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তার পাশেই ছিলাম আমি। আমিনার ঘরে আমি ছাড়া আর কেউই ছিল না তখন। এইভাবে আসমান-যমীন আলোকিত করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম পর্যন্ত দিবারাত্রি সর্বক্ষণ আমিনার সেবায় নিয়োজিত ছিলাম আমি।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন উম্মে আইমান প্রথম তাকে কোলে তুলে নিয়েছিল। তারপর দাদা আব্দুল মুতালিব এসে কাবায় নিয়ে গেল তাকে, সেখানে সমগ্র মক্কাবাসী উৎসবের মাধ্যমে বরণ করে নিল তাকে। এরপর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন সুস্বাস্থ্যকর উত্তম পরিবেশে লালনপালনের জন্য হালিমার সাথে 'বাদিয়াতে' (মরুভূমি) পাঠানো হয়েছিল বেশ কয়েক বছরের জন্য। তখনো উম্মে আইমান রা. আমিনার সাথে থেকে তাকে সাহায্য সহযোগিতা করত। পাঁচ বছর বয়সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন মক্কায় ফিরিয়ে আনা হলো তখন মা আমিনা ও বারাকা তাকে পরম আনন্দে গ্রহণ করে নিল। আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন ছয় বছর, তখন মা আমিনা তার স্বামীর কবর যিয়ারতের মনস্থির করলেন।
শ্বশুর আব্দুল মুত্তালিব আর বারাকাহ দুজনেই তাকে নিরুৎসাহিত করতে চাইল এ ব্যাপারে; কিন্তু কোনোভাবেই নিরুৎসাহিত করা গেল না আমিনাকে। সুতরাং একদিন সকালে বড় একটি উটে চড়ে সিরিয়াগামী মরুযাত্রীদের সাথে আমিনা, বারাকাহ ও শিশু মুহাম্মাদকে সাথে নিয়ে ইয়াসরিবের (মদীনা) উদ্দ্যশ্যে রওনা দিলেন। সফরের আসল কারণ জেনে গেলে শিশু মুহাম্মাদ মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে। এজন্য তারা যে তার পিতার কবর যিয়ারত করতে যাচ্ছেন, তা তখন আর তাকে জানাননি।
তাদের কাফেলাটি বেশ দ্রুতই আগাচ্ছিল। উম্মে আইমান রা. আমিনাকে অন্ততপক্ষে তার সন্তানের স্বার্থে হলেও শান্ত থাকতে বলছিল বার বার। আর এদিকে শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাত্রার প্রায় পুরো সময় জুড়েই বারাকার গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিল।
মদীনায় পৌঁছাতে প্রায় দশদিনের মতো লেগেছিল তাদের। প্রতিদিন আব্দুল্লাহর কবরে যাবার সময় আমিনা শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার বনু নাজ্জার গোত্রীয় ভাইদের কাছে রেখে যেতেন। এভাবে প্রায় কয়েক সপ্তাহ যাবত প্রতিদিন আমিনা আব্দুল্লাহর কবরে যেতেন। এসময় আমিনা আরও বেশি শোকার্ত হয়ে পড়েছিলেন।
এরপর মক্কা ফেরার পথে আমিনা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লেন হঠাৎ। মক্কা আর মদীনার মাঝামাঝি আবওয়া নামক একটা জায়গায় যাত্রা বিরতি করতে বাধ্য হলেন তারা। আমিনার অবস্থা আরও বেশি খারাপ হতে লাগল। এক অমাবস্যার রাতে, তার জ্বর মারাত্মক রকম বেড়ে গেল। এমন সময় আমিনা উম্মে আইমানকে কাছে ডেকে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে কানে কানে বললেন, বারাকা, আমি তো আর বেশিক্ষণ বাঁচবো না। আমি আমার সন্তান মুহাম্মাদকে তোমার দায়িত্বে দিয়ে গেলাম। পেটে থাকা অবস্থায় বাবাকে হারিয়েছে সে। আর এখন তার চোখের সামনেই তার মাকে হারাতে যাচ্ছে সে। তার মা হয়েই থেকো তুমি, বারাকাহ। কখনোই ছেড়ে যেয়ো না তাকে তুমি!
উম্মে আইমান বলেন, কথাটা শোনামাত্র হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেল আমার, কান্না আর ধরে রাখতে পারলাম না আমি। আমার কান্না দেখে শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও কাঁদা শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সে; জড়িয়ে ধরল তাকে গলায়। আমিনা শেষবারের মতো আর্তনাদ করে উঠলেন একবার। তারপর আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না তাঁর। সারাজীবনের জন্যই নীরব হয়ে গেলেন তিনি।³⁷¹
উম্মে আইমানের কান্না থামল না আর। কাঁদতেই থাকল সে অঝোর ধারায়। ধূ ধূ মরুর বুকে নিজ হাতেই কবর খুঁড়ল সে। আর নিজ হাতেই প্রিয় আমিনাকে দাফন করল। উম্মে আইমানের চোখের জলে ভিজল আমিনার কবর। মা-বাবা হারানো ইয়াতীম শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে দাফন শেষে মক্কায়তার দাদা আব্দুল মুতালিবের কাছে ফিরল সে।
বিবি আমেনার ইন্তেকালের পর শিশু নবীকে তার দাদার কাছে পৌঁছে দেন উম্মে আইমান। তার সেবা-যত্নে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শৈশব ও কৈশোর জীবন পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ২৫ বছর বয়সে যখন বিবি খাদিজার সাথে বিবাহ হয়েছিল তখনো উম্মে আইমান মায়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও হযরত উম্মে আইমানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। মাতৃভক্তির চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে গিয়েছেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
উবাইদের সাথে বিয়ে
খাদীজা রা.-এর সাথে বিয়ের পর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন উম্মে আইমান রা.-কে ডেকে বললেন, 'ইয়া উম্মাহ, (উম্মে আইমানকে তিনি 'মা' বলেই সম্বোধন করতেন সবসময়) এখন তো আমি বিবাহিত। আর আপনি বিয়েই করেননি এখনো। কেউ যদি এখন বিয়ে করতে চায় আপনাকে?' উম্মে আইমান মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে এক পলক তাকালেন, আর বললেন, 'তোমাকে ছেড়ে কখনোই যাব না আমি। মা কি তার ছেলেকে ছেড়ে যেতে পারে কখনো?'
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হাসলেন, আর উম্মে আইমান- এর কপালে চুমু খেলেন। আর স্ত্রী খাদীজার দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখ, এটাই হলো উম্মে আইমান। আমার নিজের মায়ের পরে ইনিই আমার মা, আমার পরিবার।
তখন খাদিজা বললেন, উম্মে আইমান, আপনি আপনার যৌবন বিসর্জন দিয়েছেন আপনার প্রিয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য। সে আপনার প্রতি তার দায়িত্ব সম্পাদন করতে চাচ্ছে। তাই আমার আর আপনার প্রিয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্বার্থে বৃদ্ধ হয়ে যাবার আগেই এই বিয়েতে রাজি হয়ে যান আপনি।
উম্মে আইমান বললেন, ‘কে আমাকে বিয়ে করবে, খাদিজা?’ ‘ওই যে ইয়াসরিবের খাযরায গোত্রের উবাইদ ইবনে যায়িদ আমাদের কাছে এসেছিল আপনার বিয়ের ব্যাপারে। দয়া করে ‘না’ বলবেন না।’ উম্মে আইমান রাজি হয়ে গেলেন। বিয়ের পর উবাইদ ইবনে যায়িদের সাথে ইয়াসরিব চলে গেলেন তিনি। সেখানে তাদের সন্তানও হয়েছিল একজন। যার নাম ছিল আইমান। এরপর থেকে লোকে তাকে ‘উম্মে আইমান’ অর্থাৎ, আইমানের মা বলেই ডাকত।
তার বিয়ে অবশ্য বেশিদিন টেকেনি। হঠাৎ স্বামী মারা গেল তাঁর। আবার তিনি মক্কায় ফিরে এলেন—তার ‘ছেলে’ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে। তখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খাদীজার সাথে আলী ইবনে আবি তালিব, খাদীজার প্রথম স্বামীর কন্যা হিন্দা, আর যায়িদ ইবনে হারিসাও থাকতেন।
যায়িদ ছিল আরবের কাল্ব গোত্রের লোক। যাকে তার ছেলেবেলায় মক্কায় দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। তখন খাদিজার ভাইপো কিনে নিয়েছিল তাকে খাদিজার সেবা করার জন্য। খাদীজার গৃহে যায়িদ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংস্পর্শে আসার পর তার সেবায় নিয়োজিত করল নিজেকে। তাদের দু-জনের সম্পর্ক ছিল বাবা-ছেলের মতোই। সম্পর্কটা এতই সুন্দর ছিল যে যায়িদের বাবা যখন তার ছেলে খোঁজে মক্কায় এলেন তখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদকে বললেন, তুমি স্বাধীন, ইচ্ছা হলে আমার সাথে থাকতে পার তুমি অথবা তোমার বাবার সাথে চলে যেতে পার। তখন যায়িদ তার বাবাকে বললেন, তাঁকে (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে) ছেড়ে কখনোই যাব না আমি। একজন বাবা তার সন্তানকে আদর করেন যেভাবে তার চেয়েও বেশি আদর করেছেন তিনি আমাকে। তিনি এত ভালোবাসতেন আমাকে যে, একদিনের জন্যও মনে হয়নি আমার যে আমি তার চাকর। তিনি হলেন সৃষ্টির সেরা মানব। তাকে ছেড়ে কী করে আমি আপনার সাথে যাব? তাকে ছেড়ে কখনোই যাব না আমি!”
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরে প্রকাশ্যে মুক্ত ঘোষণা করেছিলেন যায়িদকে; কিন্তু তারপরও যায়িদ তাকে ছেড়ে যায়নি; বরং তার সাথে থেকে তার সেবায়আরও বেশি মনোনিবেশ করেছিলেন।
পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নবুওয়াতপ্রাপ্ত হলেন, তাতে প্রথম বিশ্বাস স্থাপনকারীদের মধ্যে যায়িদ এবং উম্মে আইমান তথা বারাকা ছিলেন অন্যতম। প্রথম মুসলিম হিসেবে কুরাইশদের অমানুষিক নির্যাতনও সহ্য করতে হয়েছিল তাদের।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসলাম প্রচারের মিশনে তাদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সেসময় ইসলামের বিরুদ্ধে মুশরিকদের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা সম্পর্কে গোপনে তথ্য সংগ্রহের জন্য নিজেদের জীবন পর্যন্ত বাজি রেখেছিল তারা।
'যে জান্নাতী নারী বিয়ে করতে চায়'
এক রাতে মুশরিকরা যখন দারুল আরকামে যাবার পথ অবরোধ করে বসল, উম্মে আইমান সেই অবরোধের মধ্যেই তার জীবন বাজি রেখে খাদীজার পাঠানো গোপন বার্তা নিয়ে দারুল আরকামে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে হাজির হয়েছিলেন। যখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে খবরটা জানালেন, তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হেসে বললেন, 'আপনি অনেক ভাগ্যবতী, উম্মে আইমান! নিঃসন্দেহে জান্নাতের অধিবাসী হবেন আপনি।'
উম্মে আইমান রা. সেখান থেকে চলে যাবার পর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমাদের মাঝে কেউ যদি জান্নাতী কোনো মহিলাকে বিয়ে করবার ইচ্ছা পোষণ কর তবে তার উচিত উম্মে আইমানকে বিয়ে করা।'
এই কথা শোনার পর সব সাহাবীই নীরব হয়ে গেলেন হঠাৎ। কোনো সাড়া পাওয়া গেল না কারও কাছ থেকে। কেননা, উম্মে আইমান না ছিলেন সুন্দরী না ছিলেন আকর্ষণীয়া। বয়স ইতিমধ্যেই পঞ্চাশের কাছাকাছি হয়ে গেছে তার, দেখতেও বৃদ্ধ বৃদ্ধ লাগত তাকে; কিন্তু যায়িদ ইবনে হারিসা এগিয়ে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আমিই বিয়ে করব উম্মে আইমানকে। আল্লাহর কসম! সুন্দরী রূপবতী মহিলাদের চাইতে তিনিই উত্তম।'
এরপর যথারীতি বিয়ে হয়ে গেল তাদের দুজনের। একটা সন্তানও জন্ম নিয়েছিল তাদের সংসারে। তার নাম ছিল উসামা। উসামাকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি প্রায়সময়ই খেলাধুলা করতেন তার সাথে, আদর করতেন তাকে চুমু দিয়ে আর খাইয়ে দিতেন তাকে নিজ হাতে। একারণে মুসলিমরা 'প্রিয় নবীর প্রিয় সন্তান' হিসেবেই জানত তাকে। অল্প বয়স থেকেই উসামা নিজেকে ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত করেন। পরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেন তার ওপর।
বরকতময় হিজরত
সাহাবাদের ওপর মক্কার মুশরিকরা নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদেরকে মদীনায় হিজরতের অনুমতি দেন। এই হিজরতকারীদের মধ্যে হযরত উম্মে আইমান রা. অন্যতম। তিনি যখন হিজরত করছিলেন তখন পথিমধ্যে এক স্থানে সন্ধ্যা হলো এবং তিনি পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লেন। ধারে কাছে কোথাও পানি ছিল না। এমন সময় আকাশ থেকে সাদা রশিতে ঝোলানো এক বালতি পানি তার সামনে এসে দাঁড়াল। তিনি পেট ভরে সেই পানি পান করলেন। ফল এই দাঁড়ায় যে, তিনি জীবনে আর কখনো পিপাসায় কাতর হননি। তিনি বলতেন, প্রচণ্ড গরমের দুপুরে রোযা অবস্থায় আমার পিপাসা হয় না।³⁷²
হযরত উম্মে আইমান রা. আজীবন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। আলী ও ফাতিমার বিয়ের সময়ও আমরা উম্মে আইমান রা.-কে সবার আগ্রভাগে দেখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদরের কন্যা ফাতিমাকে স্বামীগৃহে পাঠালেন, পরদিন সকালেই মেয়ে-জামাইকে দেখার জন্য ছুটে গেলেন জামাই বাড়ি। উম্মে আইমান রা. রাতে আলীর বাড়িতেই ছিলেন।
অষ্টম হিজরীতে যায়নাব বিনতু রাসূলিল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল হলে অন্য মহিলাদের সাথে তার গোসলে অংশগ্রহণ করেন। তার পূর্বে বদর যুদ্ধের সময় রুকাইয়্যা বিনতে রাসূলিল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল হলে তাকেও গোসল দেন উম্মে আইমান রা.। আল কালবী বলেন, উম্মুল মুমিনীন খাদীজা রা. মৃত্যুবরণ করলে তাকে গোসল দেন উম্মে আইমান ও উম্মুল ফাদ।³⁷³
রণাঙ্গনে উম্মে আইমান
উম্মে আইমান মদীনায় গিয়েও ইসলামের সেবায় পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করেন নিজেকে তিনি। উহুদের যুদ্ধে তৃষ্ণার্তদের মাঝে পানি বিতরণ করেন তিনি এবং আহত সৈনিকদের সেবা শুশ্রূষা করেন। খাইবার ও হুনাইনের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযানেও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পাশে ছিলেন তিনি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় সাহাবী উম্মে আইমানের পুত্র আইমান হিজরি অষ্টম বর্ষে হুনাইনের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। তার স্বামী যায়িদও মুতার যুদ্ধে শহীদ হন। ইতোমধ্যে উম্মে আইমানের বয়স সত্তরের কাছাকাছি হয়ে গিয়েছিল। বার্ধক্যের কারণে বেশিরভাগ সময় ঘরে বসেই কাটাতে হতো তাঁর। আবু বকর রা. ও উমর রা.-কে সাথে নিয়ে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই তাকে দেখতে যেতেন এবং জিজ্ঞাস করতেন, ইয়া উম্মি (ও আমার মা), কেমন আছেন আপনি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলতেন, হে আল্লাহর নবী, ইসলাম যতক্ষণ ভালো, আমিও ভালো ততক্ষণ।
উহুদযুদ্ধের সময় উম্মে আইমান পানির মশক পিঠে নিয়ে পিপাসার্ত মুসলিম মুজাহিদদের পানি পান করাতেন। মুসলিম সৈন্যগণ যখন ছত্রভঙ্গ হয়েছিলেন তখন উম্মে আইমান পালন করেছিলেন সাহসী এক সৈনিকের ভূমিকা। উহুদের যুদ্ধে হযরত উম্মে আয়মানের শরীরে ছাব্বিশটি তীরের এবং চারটি তলোয়ারের আঘাত লেগেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধাত্রী উম্মে আইমান রা. উহুদযুদ্ধে আনসার মহিলাদের সাথে মুসলিম মুজাহিদদের পানি পান করাচ্ছিলেন। তাকে লক্ষ্য করে হিব্বান ইবনে আরাকা একটি তীর নিক্ষেপ করে। তীরটি তার ঝালরে লাগে এবং তার দেহের কিছু অংশ বেরিয়ে পড়ে। তা দেখে তীর নিক্ষেপকারী অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের হাতে তীর ধরিয়ে দিয়ে বলেন, এটি মার। সাআদ তীরটি ছুঁড়ে মারলেন এবং তা হিব্বানের গায়ে লাগে। সাথে সাথে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং মারা যায়। তা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনভাবে হেসে দেন যে, তার দাঁত দেখা যায়।
এরপর থেকে ইসলামের প্রতিটি যুদ্ধে উম্মে আইমান রা. সেবিকা হিসাবে যেতেন। বায়তুল মাল থেকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারবর্গ যে ভাতা পেতেন সদস্যা হিসাবে উম্মে আইমানকেও এক অংশ দিতেন। খায়বারের যুদ্ধের পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বাগান বাড়ি ভাগে পেয়েছিলেন তার একটা অংশ উম্মে আইমানকে হেবাস্বরূপ দান করেছিলেন। মৃতার যুদ্ধে উম্মে আইমানের স্বামী যায়িদ রা. শহীদ হয়েছিলেন।
উসামার প্রতি ভালোবাসা
যায়িদ ও উম্মে আইমান দম্পতির সন্তান হযরত উসামা রা.-কে ভীষণ ভালোবাসতেন প্রিয়নবী। হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি সেনাবাহিনী পাঠানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং উসামাহ ইবনে যায়িদ রা.-কে উক্ত বাহিনীর নেতা মনোনীত করেন। কিছুসংখ্যক লোক তার নেতৃত্বের ওপর মন্তব্য প্রকাশ করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তার নেতৃত্বের প্রতি তোমরা সমালোচনা করছ। ইতোপূর্বে তার পিতার নেতৃত্বের প্রতিও তোমরা সমালোচনা করেছ। আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই সে নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি ছিল এবং আমার প্রিয়পাত্রদের একজন ছিল। অতঃপর তার পুত্র আমার প্রিয়পাত্রদের একজন।'³⁷⁴
হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার এক কায়িফ (রেখা চিহ্নে অভিজ্ঞ) ব্যক্তি আসে, সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত ছিলেন। উসামা রা. ও তার পিতা শুয়েছিলেন। কায়িফ বলে উঠল, এ পাগুলো একটি অন্যটির অংশ। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত খুশি হলেন এবং আয়েশা রা.-কেও এ খবর জানালেন।³⁷⁵
বিদায় হজের সময়ও হযরত উম্মে আইমান প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময় বালকপুত্র উসামাকে নবীজীর খাদেম হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। একজন বলেছিলেন, 'তোমার একমাত্র পুত্র যদি কাফেরদের হাতে শহীদ হয়?' উত্তেজিত কণ্ঠে হযরত উম্মে আইমান জবাব দিলেন, 'আল্লাহর ইচ্ছা হলে শহীদ হবে, তাতে তোমার আমার কী করার আছে? আল্লাহ যদি আমাকে একটি সন্তান না দিয়ে এক হাজার সন্তান দিতেন, তাহলে প্রতিটি সন্তান আল্লাহ ও তার রাসূলের পথে কুরবান করে দিতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম।'
প্রিয় রাসূলের ইন্তেকালে
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর প্রায়সময়ই কাঁদতে দেখা যেত উম্মে আইমান রা.-কে। তাকে যখন একবার জিজ্ঞাস করা হয়েছিল, 'আপনি এত কাঁদছেন কেন?' তিনি বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ইন্তেকাল করবেন, তা আমি জানতাম। কিন্তু আমি একারণে কাঁদছি যে, তার মৃত্যুর পর আমাদের প্রতি আর কখনো আল্লাহর ওহী নাযিল হবে না।'
উম্মে আইমানই হলেন একমাত্র মহিলা যে কিনা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম থেকে শুরু করে ইন্তেকাল পর্যন্ত পাশে ছিলেন। সারাজীবন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও শ্রম দিয়ে গেছেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বাত্মক সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। সর্বোপরি ইসলামের ক্রান্তি-লগ্নে এবং ইসলামের আবির্ভাবের সময় দ্বীনের প্রতি তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবদ্দশায় উম্মে আইমানের সাথে মাঝে মাঝে দেখা করতেন। এরই অনুসরণ করে আবু বকর রা. ও উমর রা. একদিন উম্মে আইমানের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তারা দুজন উম্মে আইমানের নিকট পৌঁছলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তারা বললেন, 'আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহর নিকট যা কিছু আছে, তা তার রাসূলের জন্য উত্তম।' উম্মে আইমান বললেন, 'আমি তা জানি। আমি এজন্য কাঁদছি যে, আকাশ থেকে ওহী আসা বন্ধ হয়ে গেল।' এ কথা শুনে আবু বকর রা. ও উমর রা. উভয়ে কাঁদতে লাগলেন।³⁷⁶
অনুরূপ দ্বিতীয় খলীফা উমর রা. শাহাদাত বরণ করলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, 'আজ ইসলাম দুর্বল হয়ে গেল।'³⁷⁷
মহান প্রভুর সান্নিধ্যে
হযরত হাসান রা.-এর খেলাফতকালে পবিত্র জুমুআর দিন রাতে নিজ ঘরে পবিত্র কুরআনের সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াতরত অবস্থায় মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে যান। ইন্তেকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ১০৫ বছর। জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়। তার সোনালী জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে মা-বোনদের উচিত আদর্শ ও সুন্দর জীবন গঠনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা।
টিকাঃ
৩৭০. ওয়াকফাত তারবাবিয়া, শায়খ আহমাদ ফরীদ, ৪৭।
৩৭১. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৬৮; তালকীহ ফুহূমি আহলিল আসার, ৭।
৩৭২. তাবাকাতে ইবেন সাআদ, ৮/২২৪; আল ইসাবাহ, ১৩/১৭৮।
৩৭৩. আনসাবুল আশরাফ, ১/৪০০, ৪০১, ৪০৬।
৩৭৪. সহীহ, বুখারী, ৩৭৩০; সহীহ, মুসলিম, ২৪২৬।
৩৭৫. সহীহ, বুখারী, ৩৭৩১; সহীহ, মুসলিম, ১৪৫৯।
৩৭৬. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫৪; সুনান, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৬৩৫।
৩৭৭. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২২৭।