📄 সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই রা.
যাঁর বাবা, চাচা ও স্বামী আল্লাহর নবী
আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরবে প্রেরণ করেছেন। তাকে আল্লাহ তাআলা ইহুদীদের মধ্য থেকে পাঠাননি। তাই হিংসা ও ক্ষোভের অন্ত ছিল না ইহুদীদের। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব এবং মদীনায় হিজরত করে আসার সময় মদীনায় প্রধানত দুটি জাতি বসবাস করত। যথা: মদীনার আরব বাসিন্দা এবং ইহুদী সম্প্রদায়।
এই দুটি জাতি আবার অনেকগুলো গোত্রে বিভক্ত ছিল। যেমন: মদীনার আরব বাসিন্দারা বিভক্ত ছিল আউস ও খাযরাজ গোত্রে। আউস গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ চারটি শাখা ছিল; যথা: বনু আবদিল আশহাল, বনু জাফর, বনু মুয়াবিয়া এবং বনু হারিসা। এমনিভাবে খাযরাজও ছিল চারটি গোত্রের সমষ্টি। যথা: মালিক, আদী, মাযিন এবং দীনার।
আর মদীনায় অবস্থানকারী ইহুদীদের মোট গোত্র ছিল বিশটিরও বেশি। তবে এই বিশটি গোত্র গুরুত্বপূর্ণ ও বড় বড় তিনটি গোত্রে সীমাবদ্ধ। যথা: বনু নাযীর, বনু কুরাইযা ও বনু কাইনুকা। এ ধরনের একটি বহুজাতিক ও বহু ধর্মভিত্তিক অঞ্চলে হিজরত করে মদীনার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রধান হিসাবে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের প্রথম বর্ষে একটি লিখিত সনদ জারি করেন। ইতিহাসে এটি 'মদীনা সনদ' নামে প্রসিদ্ধ। আরবী ভাষায় জারিকৃত এই সনদে ৫৩টি ধারা বিদ্যমান ছিল, যার অনেকগুলো ধারাই ছিল মানবাধিকার বিষয়ক। এতে উল্লেখ করা হয় যে, মদীনায় বসবাসকারী সকল ইহুদী এবং ইয়াসরিব ও কুরাইশের সকল মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি স্বতন্ত্র জাতি এবং সকলে সমান নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ভোগ করবে। পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকবে এবং কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যাবে না, কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে প্রচলিত প্রথা ও ন্যায়বিচার মোতাবেক রক্তপণ আদায় করতে হবে, কেউ বন্দী হলে ন্যায়বিচার মোতাবেক তাকে মুক্ত করতে হবে, দুর্বল ও অসহায়কে আশ্রয় দেওয়া হবে এবং সর্বতোভাবে তাদের রক্ষা করা হবে, ঋণগ্রস্তদের ঋণের বোঝা লাঘব করা হবে, অত্যাচারী, পাপিষ্ঠ এবং সমাজে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সকলে অবস্থান গ্রহণ করবে, তারা কারও সন্তান কিংবা নিকটাত্মীয় হলেও। কোনো অন্যায়কারীকে সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না এবং কোনো প্রকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কেউ কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বানুমতি গ্রহণ ব্যতীত কেউ যুদ্ধে জড়িত হতে পারবে না, একজনের অপকর্মের জন্য অন্যজনকে দায়ী করা যাবে না, ইহুদীদের মিত্ররাও সমান নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ভোগ করবে, বহিঃশত্রু দ্বারা মদীনা আক্রান্ত হলে একে রক্ষা করার জন্য সকলে সম্মিলিত প্রয়াস চালাবে। এভাবে মদীনা সনদের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা বিধানের নযীর পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই প্রথম।
সমাজের সকল শ্রেণীর নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ও ধর্মীয় অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান এবং পরমত সহিষ্ণুতা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্প্রীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত মদীনা সনদ বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান বা শাসনতান্ত্রিক সরকারের মর্যাদা লাভ করে। বিদায় হজে প্রদত্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐতিহাসিক ভাষণ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত। কোনো আন্দোলন কিংবা সংগ্রামের মুখে নয়, কোনো চাপের কাছে নত স্বীকার করে নয়, সম্পূর্ণ নবুওয়াতী দায়িত্ব ও কর্তব্যের খাতিরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদত্ত এই ভাষণে তিনি মানবাধিকার বিষয়ে যে সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখেন—তা অবিস্মরণীয়। তিনি বলেন, ‘আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর তোমাদের নিকট পবিত্র অনুরূপভাবে তোমাদের জীবন এবং সম্পদ ও পবিত্র।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, ‘কারও নিকট কোনো সম্পদ গচ্ছিত থাকলে তা প্রকৃত মালিকের নিকট অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। জাহিলী যুগের সমস্ত সুদ প্রথা রহিত করা হলো, কিন্তু মূলধন ফেরত পাবে।’ ‘জাহিলী যুগের সকল রক্তের প্রতিশোধ রহিত করা হলো।’ ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, আর অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যার শাস্তি হলো একশত উট রক্তপণ আদায়।
ঐতিহাসিকদের মতে, যে সময়ে ইহুদীরা মদীনাকে নিজেদের আবাসস্থল বানায় এবং বসবাস শুরু করে, সে সময়ে তারা চাইলে নিজেদের ধর্মের প্রচার ও প্রসার করে মদীনা এবং তৎসংশ্লিষ্ট পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারত। সুসংহত করতে পারত নিজেদের ক্ষমতা। এর ফলে তারাই হতো সমগ্র আরবে প্রবল পরাক্রমশালী জাতি, একমাত্র ক্ষমতাধর; কিন্তু যে সময়ে ইহুদীদের একজোট ঐক্যবদ্ধ হয়ে, নীতি-নৈতিকতাকে সম্বল করে ধর্মের প্রচার ও প্রসারে প্রয়াসী হওয়ার কথা; সে সময়ে তারা নিজেদের মন্দ চরিত্র ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে নিজেরা একে অপরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এমনকি তারা আরবদের সাথে মিলে পরস্পর নিজেদের স্বধর্মীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা শুরু করে। এবং সেসব যুদ্ধের সময় ইহুদীরা তাদের অপর ভাইদের বিরুদ্ধে আরবদের থেকেও বেশি কঠোরতার পরিচয় দেয়।
মদীনায় অবস্থানকারী ইহুদীদের বড় বড় গোত্র বনু কুরাইযা ও বনু নাযীর শত্রুতার সূত্র ধরে তাদের স্বজাতীয় অপর গোত্র বনু কাইনুকার বিরুদ্ধে মদীনায় বসবাসকারী আরব গোত্র আওসকে সাথে নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং সে যুদ্ধে তারা অত্যন্ত নির্মমভাবে, নিদয়তার সাথে বনু কাইনুকার রক্তপাত ঘটায়। অত্যন্ত কঠিন হাতে তাদের মেরুদণ্ড গুড়িয়ে দেয়। এমনকি তারা বনু কাইনুকাকে তাদের বাস্তুভিটা থেকেও উচ্ছেদ করে। যার ফলে বাধ্য হয়ে বনু কাইনুকা নিজেদের কৃষিকর্ম ও ক্ষেত-খামার পরিত্যাগ করে শিল্পকর্মকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করে।
ইহুদীরা এভাবে নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা জিইয়ে রাখার কারণে আরবের বুকে তারা একটি প্রবল পরাক্রমশালী জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করা তো দূরের কথা, নিজেদের আবাসস্থল সুনিশ্চিত করতেও তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা অসহায় হয়ে একেকজন একেক আরব সরদার বা রঈসের অধীনতা গ্রহণ করে তাদেরকে নিয়মিত রাজস্ব বা কর দিয়ে তাদের ছত্রছায়ায় ও সহায়তায় জীবন-যাপন করতে থাকে।
ইহুদী জাতির উদ্ভব হয় বনী ইসরাঈল থেকে। ইহুদীদের অতীত এবং বর্তমান কার্যক্রম ও চালচলন প্রত্যক্ষ, পর্যালোচনা করলে একথা নির্দিধায় বলা যায় যে, এই ইহুদীদের চরিত্র বড়ই নিকৃষ্ট, এদের অতীত ইতিহাস খুবই মন্দ। জন্ম থেকেই এরা ঝগড়া-ফ্যাসাদ, ধোঁকা-প্রবঞ্চনা ইত্যাকর অন্যায়-অপরাধ ও মন্দ কার্যকলাপে লিপ্ত।
এই ইহুদীরা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বে অসংখ্য-অগণিত নিষ্পাপ নবী-রাসূলদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। পবিত্র কুরআনেও যার উল্লেখ আছে। এমনকি এরা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পর্যন্ত হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে একাধিকবার; কিন্তু মহান আল্লাহর রহমতে তারা সফল হতে পারেনি।
ইহুদীরা তাদের মন্দ স্বভাব চরিত্র নিয়ে যে কেবল নিজেরাই মারামারি ও খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়ে থাকত তাই নয়, বরং তারা অন্যদের মাঝেও এসব দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ছড়িয়ে দিত। এই ইহুদীদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রেই মদীনার আরব বাসিন্দা, দুই ভাই তুল্য আউস ও খাযরাজ ১২০ বছর যাবত গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে ছিল। যার মধ্যে প্রথম যুদ্ধ ছিল 'সুমাইর' আর সর্বশেষ যুদ্ধ ছিল 'বুআস'।
ঐতিহাসিকগণ বলেন, ইহুদীরা নেপথ্যে থেকে আউস ও খাযরাজ এই দুই গোত্রকে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত করাতে চক্রান্ত করত এবং তাদের মাঝে অনৈক্য ও হানাহানির আগুন জ্বেলে দিত। একথা আরবরাও জানত। যার কারণে তারা ইহুদীদেরকে 'সাআলিব' তথা খেকশিয়াল উপাধিতে স্মরণ করত।
তবে ইহুদীরা ষড়যন্ত্র করে আউস ও খাযরাজকে যে যুদ্ধে লিপ্ত করিয়ে ছিল, তা পরবর্তী সময়ে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হয়। এ ঘটনা সম্পর্কে মুসলিম মনীষীগণ বলেন, মহান আল্লাহ তাআলা ইসলামের জন্য একটি পবিত্র ভূমি নির্বাচন করছিলেন। ইসলামের জন্য কেন্দ্র হিসেবে মদীনা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তাকে ইসলামের বহুল প্রচার ও প্রসারের জন্য উপযোগী করেছিলেন আউস ও খাযরাজের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে। কেননা, ইসলাম আসার পর তার বহুল প্রচার ও প্রসারের জন্য প্রয়োজন ছিল তিনি যেখানে এসে তার কেন্দ্র স্থাপন করবেন, সেই স্থানের অধিবাসীরা দুর্বল হওয়া। আর আউস ও খাযরাজের মধ্যে বিরাজমান ১২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ তা আঞ্জাম দিয়েছিল অত্যন্ত সুনিপুণভাবে। কেননা, এই যুদ্ধের দ্বারা আউস ও খাযরাজের বড় বড় সকল প্রতাপশালী সকল সরদার নিহত হয়, আউস-খাযরাজের মধ্যকার ঐক্য সম্পূর্ণ রূপে বিনষ্ট হয়ে যায়। তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি খণ্ড বিখণ্ড হয়ে যায়। ফলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে।
আর মদীনাকে ইসলামের কেন্দ্র বানানোর জন্য সকল প্রস্তুতি যখন শেষ হয়, মদীনা যখন ইসলামের কেন্দ্র হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলী অর্জন করতে সক্ষম হয়, তখন মহান আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মদীনায় হিজরতের আদেশ দেন। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা ছেড়ে মদীনার দিকে রওনা হন।
বদরের যুদ্ধের পর তৎকালীন আরবের বুকে দু-জন প্রভাবশালী ব্যক্তির উদয় হয়। তারা হলেন মদীনায় হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর অন্যজন হলেন মক্কায় আবু সুফিয়ান। এ যুদ্ধ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায় এবং আবু সুফিয়ান হয়ে যান কুরাইশদের প্রধান। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে তৎকালীন মদীনায় বসবাসকারী বনু কায়নুকা ইহুদী সম্প্রদায়ের প্রথম সংঘাত শুরু হয়। এ গোত্রের বিভিন্ন কার্যকলাপ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাজনৈতিক শীর্ষত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। তারা মদীনা সনদকে উপেক্ষা করে একজন মুসলিম নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে বসে। বদরের যুদ্ধের পরপরই এ ঘটনা ঘটে। একজন মুসলিম মহিলা বনু কায়ানুকা গোত্রের একজন স্বর্ণকারের দোকানে গেলে তাকে তার চুল খুলতে বাধ্য করা হয় এবং তাকে ও তার পরিধেয় বস্ত্র এমনভাবে বাধা হয় যে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা খুলে যায়। মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়ে কায়নুকা গোত্রের ইহুদীরা প্রথমে মদীনার উত্তরে অবস্থিত ওয়াদি-আল-কুরাতে বসবাস শুরু করে। পরবর্তী সময়ে তারা সিরিয়ার দেরাতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
আগেই বলেছি উহুদের যুদ্ধের পর ইহুদীরা মুসলমানদের শক্তির ওপর সন্ধিহান হয়ে পড়ে। তারপর ৩১ মার্চ ৬২৭ সালে শুরু হয় খন্দকের যুদ্ধ। এ যাত্রায় বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিল বনু কুরাইযা গোত্রের ইহুদীরা এবং বনু নাযীর গোত্রের ইহুদীরা। কনফেডারেট সেনাবাহিনীর সৈন্যরা প্রথমে বনু কুরাইযা গোত্রের সঙ্গে মদীনা শহরের উভয় প্রান্ত থেকে আক্রমণের জন্য শলাপরামর্শ করে। এ কাজে সফল হতে না পেরে তারা বনু নাযীর, বনু গাতফান, বনু আসাদ, বনু সুলাইম, বনু আমির, বনু মুরা ও বনু শুয়া ইত্যাদি ইহুদী গোত্র সহকারে মদীনা নগরী ২৭ দিন অবরোধ করে রাখে। যুদ্ধের পর মুসলমানরা বনু কুরাইযা গোত্রকে ২৫ দিনব্যাপী অবরোধ করে রাখে। পরে তাদেরকে মদীনা থেকে বিতাড়িত করা হয়।
মুসলমানদের সঙ্গে ইহুদীদের সর্বশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধটি হয় ৬২৯ সালে খায়বারে। খায়বার ছিল একটি মরুদ্যান, যা মদীনার উত্তর-পশ্চিমে ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ৬২৫ সালে মদীনা থেকে মুসলিম বাহিনী কর্তৃক বিতাড়ণের পর বনু নাযীর ইহুদী গোত্র এই খায়বারে বসবাস করতে শুরু করে। এই বনু নাযীর খন্দকের যুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র করেছিল। সকল ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল খায়বার। ১৬০০ যোদ্ধা নিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বার অবরোধ করেন। ২০ দিন অবরোধ ও যুদ্ধের পর খায়বারের পতন ঘটে। এ যুদ্ধে হজরত আলী রা.-এর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। এ যুদ্ধের পর ইহুদীরা তাদের সকল সম্পদ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়। খায়বারের যুদ্ধ নিয়ে আল্লাহতালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন 'আল্লাহ তোমাদের বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওয়াদা দিয়েছেন, যা তোমরা লাভ করবে। তিনি তা তোমাদের জন্য ত্বরান্বিত করবেন। ইহুদীরা ফসলের অর্ধাংশ প্রদান করার শর্তে এসব জমি চাষাবাদের অধিকার প্রার্থনা করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।
**যেভাবে শুরু**
হযরত সাফিয়্যা রা.-এর পিতা ও নানা উভয়ে নিজ নিজ খান্দানের অতি সম্মানীয় নেতা ছিলেন। অতি প্রাচীনকাল থেকে আরবের উত্তরাঞ্চলে বসবাসরত ইহুদী সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের দুটি খান্দান বনু কুরাইযা ও বনু নাযীর অন্যসব আরব ইহুদী খান্দানের চেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী বলে গণ্য হতো। গোত্রের প্রতিটি সদস্য হুয়াই ইবনে আখতাবকে সীমাহীন সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হতো। গোত্রের আরব সদস্য তার হুকুম ও নেতৃত্ব বিনা প্রশ্নের মেনে নিত। তার নানা সামাওয়াল ছিলেন গোটা আরব উপদ্বীপে বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য প্রসিদ্ধ। মোটকথা, হযরত সাফিয়্যা রা. পিতৃ ও মাতৃকূলের দিক দিয়ে দারুণ কৌলীন্যের অধিকারিণী ছিলেন।
মূলত হযরত সাফিয়্যা রা.-এর আসল নাম যায়নাব। যেহেতু তিনি খায়বার যুদ্ধের গনীমাতের মাল হিসেবে মুসলমানদের অধিকারে আসেন এবং বণ্টনের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাগে পড়েন, আর তৎকালীন আরবে নেতা অথবা বাদশার অংশের গনীমাতের মালকে সাফিয়্যা বলা হতো, তাই যায়নাবও সেখানে থেকে সাফিয়্যা নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যান এবং তার আসল নামটি হারিয়ে যায়।
বনু কুরাইযার সালাম ইবনে মাশকাম ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি ও নেতা। তার সাথে হযরত সাফিয়্যার প্রথম বিয়ে হয়। এ বিয়ে টেকেনি। ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর হিজাযের বিখ্যাত সওদাগর ও খায়বরের অন্যতম নেতা আবু রাফে-এর ভাতিজা কিনানা ইবনে আবিল হুকাইক-এর সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। সম্মান ও প্রতিপত্তির দিক দিয়ে কিনানা সালামের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না। তিনি খায়বারের অতি প্রসিদ্ধ দুর্গ 'আল-কামূসে'র নেতা এবং বড় কবি ছিলেন। পরিবার-পরিজনসহ এই দুর্গেই বসবাস করতেন। এক প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে খায়বার যখন মুসলমানদের অধিকারে আসে এবং আল-কামুস' দুর্গের পতন ঘটে তখন দুর্গের অভ্যন্তরেই হযরত সাফিয়্যা রা.-এর স্বামী কিনানা নিহত হন এবং সাফিয়্যাসহ তাঁর পরিবারের অন্যসব সদস্য মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। তাদের মধ্যে সাফিয়্যা রা.-এর দুজন চাচাতো বোনও ছিলেন। ইবনে ইসহাক বলেছেন, সাফিয়্যা রা. ছিলেন কিনানার তরুণী স্ত্রী। মাত্র কিছুদনি আগেই তাদের বিয়ে হয়েছিল।
এ যুদ্ধ খায়বারের ইহুদীদের জন্য এত বিপর্যয়কর ছিল যে, তাদের সকল আশা-ভরসা কপূরের মতো উড়ে যায় এবং ভবিষ্যতে তারা মাথা তুলে দাঁড়াবার সকল যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। এ যুদ্ধে তাদের সকল নামী-দামী নেতা নিহত হন। নিহতদের মধ্যে হযরত সাফিয়্যা রা.-এর পিতা এবং ভাইও ছিলেন। এ কারণে তিনি সকল যুদ্ধবন্দীর মধ্যে অধিকতর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের যোগ্য ছিলেন।
সকল সীরাতবিশেষজ্ঞ হযরত সাফিয়্যা রা. নৈতিক গুণাবলীর অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। আল্লামা ইবনে আবদিল বার লিখেছেন, 'সাফিয়্যা রা. ছিলেন ধৈর্যশীল, বুদ্ধিমতি ও বিদুষী নারী। ইবনুল আসীর বলেছেন, 'তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমতি মহিলা। আল্লামা যাহাবী বলেছেন, 'হযরত সাফিয়্যা রা. ছিলেন ভদ্র, বুদ্ধিমতি, উঁচু বংশীয়া, রূপবতী ও দ্বীনদার মহিলা।
**যখন থেকে উম্মুল মুমিনীন**
নিয়ম অনুযায়ী যখন গনীমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও দাস-দাসী) মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তুতি চলল এবং এ উদ্দেশ্যে সকল বন্দীকে একত্র করা হলো, তখন দাহইয়াতুল কালবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার একটি দাসীর প্রয়োজনের কথা জানালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বন্দী মেয়েদের মধ্য থেকে পছন্দ করার অনুমতি দিলেন। দাহইয়া রা. সাফিয়্যা রা.-কে পছন্দ করলেন। যেহেতু মান-মর্যাদার দিক দিয়ে হযরত সাফিয়্যা রা. দাহইয়ার রা. চেয়েও উঁচু স্তরের ছিলেন, এ কারণে সাহাবীদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, সাফিয়্যা রা. বনু নাযীর ও বনু কুরাইযার নেত্রী। সে আপনারই উপযুক্ত।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ পরামর্শ গ্রহণ করলেন এবং সাফিয়্যাসহ দাহইয়া কালবীকে ডেকে আনালেন। তিনি দাহইয়াকে অন্য একটি দাসী পছন্দ করতে বলে সাফিয়্যা রা.-কে নিজের কাছে রেখে দিলেন। পরে তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে বিয়ে করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাহইয়া কলবীকে সাফিয়্যা রা.-এর পরিবর্তে তার স্বামী কিনানার বোনকে দান করেন। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সাফিয়্যা রা.-এর চচাতো বোনকে দান করেন। সহীহ মুসলিমে এসেছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাতজন বন্দীর বিনিময়ে দাহইয়ার নিকট থেকে সাফিয়্যা রা.-কে খরীদ করেন।
এ হিজরী ৭ম সনের ঘটনা। বুখারীর একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বার অভিযান শেষ করে মদীনায় ফেরার পথে 'সাহ্বা' নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে হযরত আনাসের রা. মা হযরত উম্মে সুলাইম রা. সাফিয়্যা রা.-এর মাথায় চিরুনী করেন, কাপড় পাল্টান এবং তার দেহে সুগন্ধি লাগান। তারপর তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পাঠান। সেখানে বাসর হয় এবং সেখানেই ওলীমা হয়। কেউ খেজুর, কেউ চর্বি, কেউ হাইস অর্থাৎ যার কাছে খাবার যা কিছু ছিল নিয়ে এলো। তারপর সবাই এক সাথে বসে আহার করেন। মূলত এটাই ছিল ওলীমা। এই ওলীমার কথা সহীহাইনে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে।
এই সাহ্বাতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফিয়্যা রা.-এর সাথে তিন দিন কাটান। প্রথম বাসর রাতে হযরত আবু আইউব আল-আনসারী রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অজান্তে কোষমুক্ত তরবারি হাতে সারা রাত তার তাঁবুর দরজায় পাহারা দেন। সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেন, এই মহিলার পিতা, স্বামী, ভাইসহ সকল নিকট আত্মীয় নিহত হয়েছে। তাই আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, কোনো খারাপ কিছু করে না বসে। তার কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটু হেসে দেন এবং তার জন্য দুআ করেন।
'সাহবা' থেকে যখন সাফিয়্যা রা.-কে নিজের উটের ওপর বসিয়ে যাত্রা করেন তখন লোকেরা বুঝতে পারছিল না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বেগমের মর্যাদা দান করেছেন, না দাসী হিসেবে নিজের মালিকানায় রেখেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের এ মনোভাব বুঝতে পেরে একটি পর্দা টানিয়ে সাফিয়্যা রা.-কে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে নিয়ে যান। মূলত এ পর্দা দ্বারা একথা জানিয়ে দেন যে, সাফিয়্যা রা. দাসী নন; বরং তিনি পবিত্র বেগমের মর্যাদা লাভ করেছেন।
কোনো কোনো বর্ণণায় এসেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় 'আবা' দ্বারা পর্দা করেন। 'সাহবা' থেকে চলার পথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাফিয়্যা রা.-এর বাহন উটটি হোঁচট খায়। তাতে পিঠের আরোহীদ্বয় ছিটকে পড়ে যান। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অক্ষত রাখেন। পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে হযরত আবু তালহা রা. তার বাহনের পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছুটে গিয়ে বলেন, ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ! আপনি কষ্ট পেয়েছেন কি? তিনি জবাব দেন, 'না। তুমি মহিলাকে দেখ।' সাথে সাথে আবু তালহা কাপড় দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে দিয়ে হযরত সাফিয়্যা রা.-এর দিকে এগিয়ে যান এবং তার ওপর একখানি কাপড় ছুঁড়ে দেন। সাফিয়্যা রা. উঠে দাঁড়ান। আবু তালহা নিজের উটটি প্রস্তুত করেন এবং তার ওপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফিয়্যা রা.-কে নিয়ে আরোহণ করেন। 'সাহবা' থেকে যাত্রার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাঁটুর ওপর হযরত সাফিয়্যা রা. পা রেখে উটের পিঠে আরোহণ করেন।
হযরত জাবির রা. বলেন, সাফিয়্যা রা.-কে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাঁবুতে ঢোকানো হলো, আমরা সেখানে উপস্থিত হলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা তোমাদের মায়ের কাছ থেকে ওঠো।' সন্ধ্যায় আমরা আবার গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে আসলেন। তখন তার চাদরের মধ্যে দেড় 'মুদ' পরিমাণ 'আজওয়া' খেজুর ছিল তিনি আমাদেরকে বললেন, তোমরা তোমাদের মায়ের ওলীমা খাও।' মদীনা পৌঁছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সাফিয়্যাকে প্রখ্যাত সাহাবী হারিস ইবনে নু'মানের রা. বাড়িতে উঠালেন। হযরত হারিস রা. ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন জান-কুরবান সাহাবী। আল্লাহ তাকে অঢেল অর্থও দান করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রয়োজনের কথাও সব সময় স্মরণ রাখতেন। প্রয়োজনের সময় দ্রুত এগিয়ে আসতেন। হযরত সাফিয়্যাকেও তিনি সানন্দে থাকার জন্য ঘর ছেড়ে দেন।
উম্মে সিনান সালমিয়্যার বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত সাফিয়্যা রা.-এর রূপ ও সৌন্দর্যের কথা শুনে আনসার মহিলাদের সাথে হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ, হযরত হাফসা, হযরত ইয়াসার বর্ণনা করেছেন, আনসার মেয়েদের সাথে হযরত আয়েশা রা.-এর মুখে নিকাব টেনে সাফিয়্যাকে দেখতে আসেন। ফেরার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পেছনে যান এবং প্রশ্ন করেন, 'আয়েশা, তাকে কেমন দেখলে?' আয়েশা রা. বললেন, 'দেখেছি, সে তো এক ইহুদী নারী।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এমন বলো না। সে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং একজন ভালো মুসলমান হয়েছে।'
উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যা রা. ছিলেন খুবই দৃঢ় চিত্তের মহিলা। জীবনে কখনো অধৈর্য হয়েছেন—এমন কথা জানা যায় না। আল-কামূস দুর্গের পতন ঘটলে এবং গোটা খায়বরে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হলে হযরত বিলাল রা. সাফিয়্যা রা. ও তার চাচাতো বোনদের সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট যেতে থাকেন। ইহুদীদের লাশের পাশ দিয়েই তারা চলছিলেন। সাধারণত এরূপ পরিস্থিতি খুবই মর্মস্পর্শী হয়। অত্যন্ত শক্ত মনের মানুষের অন্তরও কেঁপে ওঠে। এ কারণে তার সাথের মহিলারাও এ ভয়াবহ দৃশ্য দেখে চিৎকার দিয়ে ওঠে। তারা মাথার চুল ছিঁড়ে মাতম করতে থাকে; কিন্তু হযরত সাফিয়্যা রা.-এর অবস্থা দেখুন। প্রিয় স্বামীর লাশের পাশ দিয়ে বন্দী অবস্থায় চলছেন, তিনি একটুও বিচলিত নন। কোনো রকম ভাবান্তর নেই। দৃঢ় পদক্ষেপে তিনি হেঁটে চলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরে এভাবে তাদের বাপ-ভাইয়ের লাশের পাশ দিয়ে নিয়ে আসার জন্য বিলাল রা.-কে তিরস্কার করেন।
**উদারচিত্তের অধিকারিণী**
হযরত সাফিয়্যা রা. স্বভাবগতভাবেই ছিলেন অত্যন্ত উদার ও দানশীল। ইবনে সাআদ লিখেছেন, যে ঘরখানিতে তিনি বসবাস করতেন জীবদ্দশায় তা দান করে গিয়েছিলেন। আল্লামা যুরকানীর বর্ণনায় জানা যায়, উম্মুল মুমিনীন হিসেবে মদীনায় আসার পর তিনি নিজের কানের সোনার দুইটি দুল হযরত ফাতিমা রা. ও অন্যান্য আযওয়াযে মুতাহহারাতের মধ্যে ভাগ করে দেন।
হযরত সাফিয়্যা রা.-এর এক দাসী একবার খলীফা হযরত উমর রা.-এর নিকট অভিযোগ করলেন যে, এখনো তার মধ্যে ইহুদী ভাব বিদ্যামন। কারণ, তিনি এখনো শনিবারকে মানেন এবং ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখেন। দাসীর কথার সত্যতা যাচায়ের জন্য হযরত উমর রা. লোক মারফত হযরত সাফিয়্যা রা.-কে অভিযোগের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। তিনি জবাব দেন, 'যখন থেকে আল্লাহ আমাকে শনিবারের পরিবর্তে জুমআকে দান করেছেন, তখন থেকে শনিবারকে মানার কোনো প্রয়োজন নেই। আর ইহুদীদের সাথে আমার সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে আমার বক্তব্য হলো, সেখানে আমার আত্মীয়-স্বজন আছে। তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার দিকে আমার দৃষ্টি রাখতে হয়।' তারপর তিনি দাসীকে ডেকে জানতে চান, এ অভিযোগ করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করছেন? দাসী বললেন, শয়তান। হযরত সাফিয়্যা রা. চুপ হয়ে যান এবং দাসীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য বেগমগণের মতো হযরত সাফিয়্যা রা.ও ছিলেন ইলম ও মারিফারেত কেন্দ্র। প্রায়ই লোকেরা তার কাছে বিভিন্ন বিষয় প্রশ্ন করত এবং তারা জবাব পেয়ে তুষ্ট হতো। সুহায়রা বিনতে হায়কার নাম্নী এক মহিলা একবার হজ আদায় করে হযরত সাফিয়্যা রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে মদীনায় আসেন। তিনি হযরত সাফিয়্যা রা.-এর গৃহে যখন যান এখন দেখতে পান, সেখানে কুফার বহু মহিলা বসে আছেন এবং তাকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করছেন। আর তিনি খুব সুন্দরভাবে তাদের জবাব দিচ্ছেন।
একবার হযরত সাফিয়্যা রা. বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি ছাড়া আপনার অন্য সব বেগমদেরই আত্মীয়-স্বজন আছে। আপনার যদি কোনো কিছু হয়ে যায়, আমি কোথায় আশ্রয় নেব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আলীর রা. নিকট।
উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যা রা. বর্ণনা করেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযানের শেষ দশদিনের ই'তিকাফে মসজিদে অবস্থান করছেন। সে সময় একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করতে মসজিদে যান। কিছুক্ষণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলার পর ঘরে ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামার দরজার কাছে মসজিদের দরজা পর্যন্ত তার সথে আসেন। তখন সেই পথে আনসারদের দুই ব্যক্তি যাচ্ছিল। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সালাম করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের দুইজনকে বললেন, তোমরা একটু থাম, এ হচ্ছে সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই। এ কথা শুনে তারা সুবহানাল্লাহ পাঠ করল, ও তাকবীর ধ্বনি দিল। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, শয়তান আদম সন্তানের রক্ত চলাচলের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় পৌঁছতে পারে। আমি শঙ্কিত হয়েছিলাম, সে তোমাদের দুইজনের অন্তরে খারাপ কিছু ঢুকিয়ে না দেয়।
**রাসূলের ভালোবাসা**
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি হযরত সাফিয়্যার ছিল অন্তহীন ভালোবাসা। রাসূল যখন আয়েশার গৃহে অন্তিম রোগশয্যায় তখন একদিন সাফিয়্যা রা.-সহ অন্য বিবিগণ স্বামীকে দেখতে ও সেবা করতে একত্র হয়েছেন। হযরত সাফিয়্যা রা. এক সময় অত্যন্ত ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আপনার এই সব কষ্ট যদি আমিই ভোগ করতাম, খুশি হতাম।' তার এমন কথা শুনে অন্য বিবিগণ একে অপরের দিকে এমনভাবে তাকাতে লাগলেন যেন, তার কথায় তারা সন্দেহ করছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর কসম! সে সত্য বলেছে।'
হযরত সাফিয়্যা রা.-এর প্রতি হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসার অবস্থা ঠিক এরকম ছিল। সাফিয়্যা রা.-এর সঙ্গ তিনি পছন্দ করতেন এবং সব সময় তাকে খুশি রাখার চেষ্টা করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফিয়্যাসহ অন্য বেগমগণকে সঙ্গে নিয়ে হজের সফরে বের হয়েছেন। পথিমধ্যে সাফিয়্যা রা.-এর বাহন উটটি অসুস্থ হয়ে বসে পড়ে। সাফিয়্যা রা. ভয় পেয়ে যান এবং কান্না শুরু করে দেন। খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসেন এবং নিজের পবিত্র হাতে তার চোখের পানি মুছে দেন; কিন্তু এতেও তার কান্না না থেমে আরও বেড়ে যায়। উপায়ান্তর না দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলকে নিয়ে সেখানে যাত্রাবিরতি করেন। সন্ধ্যার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রী হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-কে বলেন, 'যায়নাব, তুমি সাফিয়্যাকে একটি উট দিয়ে দাও।' হযরত যায়নাব রা. বললেন, আমি উট দেব আপনার এই ইহুদী মহিলাকে?' তার 'এমন প্রত্যুত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভীষণ নাখোশ হন এবং দুই অথবা তিন মাস যাবত হযরত যায়নাব রা.-এর সাথে কথা বলা এবং কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। অবশেষে হযরত আয়েশা রা.-এর মধ্যস্থতায় অতি কষ্টে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ অসন্তুষ্টি তিনি দূর করান।
আর একবার হযরত আয়েশা রা. হযরত সাফিয়্যা রা.-এর দৈহিক গঠন সম্পর্কে একটি মন্তব্য করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি এমন একটি কথা বলেছ, যদি তা সাগরেও ছেড়ে দেওয়া হয়, তাতে মিশে যাবে। অর্থাৎ সাগরের পানিও ঘোলা করে ফেলবে।
ইসলাম গ্রহণ করে পবত্রি হওয়ার পর তাকে কেউ ইহুদী বলে কটাক্ষ করলে তিনি ভীষণ কষ্ট পেতেন। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ঘরে গিয়ে দেখেন, তিনি কাঁদছেন। কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেন, 'আয়েশা ও যায়নাব দাবি করে যে, তারা অন্য বিবিগণের চেয়ে উত্তম। কারণ, তারা আপনার বিবি হওয়া ছাড়াও চাচাতো বোন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে খুশি করার জন্য বলেন, তুমি তাদেরকে একথা কেন বললে না যে, আমার বাবা হারুন আ., আমার চাচা মূসা আ. এবং আমার স্বামী মুহাম্মাদ। এ কারণে তোমরা আমার চেয়ে ভালো হতে পার কীভাবে!
**উসমান রা.-এর সাথে ঐতিহাসিক ভূমিকা**
হিজরী ৩৫ সনের বিদ্রোহীরা তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রা.-কে মদীনায় তার গৃহে অবরুদ্ধ করে রাখে। সে সময় হযরত সাফিয়্যা রা. খলীফার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বিদ্রোহীরা যখন খলীফার গৃহে বাইরে সকল সরবরাহ ও যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, তার গৃহের চতুর্দিকে পাহারা বসায়, তখন একদিন হযরত সাফিয়্যা রা. খচ্চরের ওপর চড়ে খলীফার গৃহের দিকে যেতে থাকেন। সঙ্গে দাস ছিল। তিনি আশতার নাখয়ীর দৃষ্টিতে পড়ে যান। আশতার তার চলায় বাধা দিতে খচ্চরটিকে মারতে শুরু করে। হযরত সাফিয়্যা রা. বললেন, আমার লাঞ্ছিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি ফিরে যাচ্ছি। তুমি আমার গাধা ছেড়ে দাও। এভাবে গৃহে ফিরে এসে হযরত সাফিয়্যা রা. হাসান রা.-কে খলীফার গৃহের সাথে যোগাযোগের দায়িত্বে নিয়োগ করেন। তিনি উম্মুল মুমিনীন সাফিয়্যা রা.-এর গৃহ থেকে খাবার ও পানি খলীফার বাসগৃহে পৌঁছে দিতেন।
**অন্তিম সময়**
আম্মাদের আম্মাজান হযরত সাফিয়্যা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন। এই সময়টুকু তিনি আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী, ইলম ও দাওয়াতের কাজে কাটান। খিলাফতে রাশেদার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি দেখে যান। দিক-দিগন্তে দেখে যান ইসলামের সুনির্মল আলো। হিজরী ৫০ সনের রমাযান মাসে ৬০ বছর বয়সে হযরত সাফিয়্যা রা. মদীনায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এবং পৃথিবীর বুকে রেখে যান এক আলোকোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
২৮৩. আসাহহুস সিয়ার, ২৩৭।
২৮৪. আল ইসতিআব, ৪/৩৪৮।
২৮৫. উসদুল গাবাহ, ৫/৪৯০।
২৮৬. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩২।
২৮৭. উসদুল গাবাহ, ৫/৪৯০।
২৮৮. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২২; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৩৬৫।
২৮৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৫।
২৯০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/১৯৬; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৩।
২৯১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৫।
২৯২. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৩৩৬; উসদুল গাবাহ, ৫/৪৯০।
২৯৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৭; আরনাউত বর্ণনাকারীদের 'সিকা' বলেছেন।
২৯৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৩; আল ইসতিআব, ৪/৩৪৮।
২৯৫. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২১৭৫।
২৯৬. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৮।
২৯৭. মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩৩৭; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৬।
২৯৮. সুনান, আবু দাউদ, ২/১৯৩।
২৯৯. সুনান, তিরমিযী, ৩৮৯২।
৩০০. আল ইসাবাহ, ৪/৩৩৯; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৭।
📄 মাইমুনা বিনতুল হারিস রা.
আমাদের মধ্যে মায়মুনা সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয় করতেন এবং সবচেয়ে বেশি আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখতেন। -আয়েশা রা.
আজ আমরা এমন এক মর্যাদাসম্পন্না মহীয়সী মায়ের জীবনকাহিনী শুনব—যাঁর ত্যাগ, মায়া-মমতা ও পরম ভালোবাসায় তৃপ্তি ও শান্তির ছোঁয়া পেয়েছিলেন প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আজ আমরা এক ভুবনমোহিনী বাগানের ফুল নিয়ে আলোচনা করব যাঁর ত্যাগ, ঈমান ও তাকওয়া আমাদের জান্নাতের পথ দেখাতে পারে। হ্যাঁ, আমরা আমাদের আম্মাজান মাইমুনা বিনতে হারিস আল হিলালিয়্যাহ'র জীবনেতিহাস পাঠের জন্য উন্মুখ হয়ে আছি।
**পরিচয়পর্ব**
তিনিই সেই নারী যাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ বিয়ে করেন। তার এক বোন উম্মুল ফযল লুবাবা আল কুবরা ছিলেন হযরত আব্বাস রা.-এর স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাঁর গুণকীর্তন ও প্রশংসা করতেন। তার গুণাবলীর মাধুর্য তুলে ধরে বলতেন,
هُذِهِ بَقِيَّةُ آبَائِ
তিনি হচ্ছেন আমার বাপ-দাদার নিদর্শন।
هُذَا الْعَبَّاسُ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ أَجْوَدُ قُرَيْشٍ كَفَا وَأَوْصَلُهَا
এই আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব হচ্ছেন কুরাইশের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তি। আত্মীয়তার সম্পর্ক তিনি খুব উত্তমভাবে রক্ষা করেন।
তাঁর দ্বিতীয় বোন লুবাবা সুগরা ছিলেন হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদের রা.-এর মা যাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
খালিদ আল্লাহর একটি তরবারি যা আল্লাহ কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে কোষমুক্ত করেছেন। খালিদ আল্লাহর কতই না ভালো বান্দা এবং গোত্রের কতই না ভালো ভ্রাতা।
হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা. ছিলেন তার বৈপিত্রেয় বোন। হযরত জাফর রা.-এর ঔরসে আবদুল্লাহ, মুহাম্মাদ ও আউন নামের তিনি ছেলে ছিল। হযরত জাফর রা. মৃতার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করার পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. তাকে বিয়ে করেন এবং তার ঔরসে মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর জন্মগ্রহণ করেন। হযরত আবু বকরের রা. ইন্তেকালের পর হযরত আসমা রা.-কে বিয়ে করেন হযরত আলী রা.। তাঁর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন ইয়াহইয়া ও আউন নামের দুই ছেলে।
হযরত মায়মূনা রা.-এর বৈপিত্রেয় আরেক বোন সালমা বিনতে উমাইস রা. ছিলেন হযরত হামযা রা.-এর স্ত্রী।
হযরত মায়মূনা রা.-এর প্রথম বিয়ে হয় মাসউদ ইবনে আমর ইবনে উমাইর আস-সাকাফীর সঙ্গে। মাসউদ ইবনে আমরের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর আবু রুহমের সাথে বিয়ে হয়। হিজরী ৭ম সনে আবু রুহমের মৃত্যু হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেগমের মর্যাদা লাভ করেন। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বশেষ বেগম। তার পর আর কোনো নারীকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেগমের মর্যাদা দান করেননি। আসুন, তার পবিত্র এই বিয়ে সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা করা যাক।
**উমরাতুল কাযা ও সেই শুভক্ষণ**
খাইবার থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় রবিউল আউয়াল থেকে শাওয়াল মাস পর্যন্ত অবস্থান করেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন সামরিক অভিযানে নিজে গমন করেন অথবা অন্য সাহাবীদের পাঠান।
এরপর যুলকাদা মাসে তিনি আগের বছরের পরিত্যক্ত উমরার কাযা আদায় করার জন্য মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। আগের বছর এই মাসেই মুশরিকরা তাঁতে পথিমধ্যে বাধা দেয় ও উমরা বাদ দিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য করে। ওই একই সফরে আগের বছর তার সহচরবৃন্দ অত্যন্ত অভাব অনটন ও দুঃখ-কষ্টের মধ্যে কালতিপাত করছে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, কুরাইশরা রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবাদের দেখবার জন্য তাদের সম্মিলন গৃহ 'দারুন নাদওয়া'তে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন তখন তার চাদর ডান বগলের নীচে ও বাম কাঁধের ওপর পেঁচিয়ে পরলেন এবং ডান হাত উঁচু করে ডান বগল ফাঁক করে বললেন, 'আজকে যে ব্যক্তি নিজেকে শক্তিমান বলে জাহির করবে আল্লাহ তার ওপর রহমত করবেন।'
একথা বলার পর তিনি হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন। অতঃপর তিনি ও তার সাহাবাগণ জোরে জোরে বীরোচিত ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগলেন। কাবা ঘরের আড়ালে গিয়ে কুরাইশদের দৃষ্টির অন্তরালে গেলে রুকনে ইয়ামনী চুম্বন করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে রুকনে আসওয়াদে পৌঁছে এক চক্কর সমাপ্ত করলেন। অতঃপর আগের মতো বীরোচিত ভঙ্গিতে জোরে জোরে হাঁটলেন। এভাবে তিন চক্কর দিলেন এবং বাকি চক্করগুলি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে সম্পন্ন করলেন।
এই সফরেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় মাইমুনা বিনতে হারিস রা.-কে বিয়ে করেন। আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. এই বিয়ের উদ্যোক্তা ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনদিন মক্কায় অবস্থান করলেন। তৃতীয় দিন হুয়াইতিব ইবনে আবদুল উযযার নেতৃত্বে কুরাইশদের কয়েকজন এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলল, 'তোমরা মক্কায় থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অতএব, তুমি মক্কা ত্যাগ করো।'
কুরাইশরা তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এখানে তোমাদের উপস্থিতিতে আমি যদি বিয়ে সম্পন্ন করি এবং তোমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করি আর তোমরা তাতে যোগ দাও তাহলে ক্ষতি কি?' তারা বলল 'তোমার খাবারে আমাদের প্রয়োজন নেই। তমি চলে যাও।' ইবনে হিশামের বর্ণনামতে, মায়মুনা রা. বিয়ের দায়িত্ব উম্মুল ফাযলের ওপর ছেড়ে দেন। আর তিনি সে দায়িত্ব ছেড়ে দেন স্বামী আব্বাস রা.-এর হাতে। এই উমরার ইহরামের অবস্থায় হিজরী ৭ম সনের জিলকাদা মাসের পাঁচ শত মতান্তরে চারশত দিরহাম দেন-মাহরের বিনিময়ে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মায়মূনা রা.-কে বিয়ে করেন।
উমরা আদায়ের পর মদীনা ফেরার পথে মক্কা হতে ছয় থেকে বারো মাইল দূরে 'সারাফ' নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদেম হযরত আবু রাফে হযরত মায়মূনা রা.-কে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। এই 'সারাফে' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য নির্মিত তাঁবুতে হযরত মায়মূনা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মিলিত হন।
ইবন আব্বাস রা.-এর একটি বর্ণনায় জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মায়মূনার রা. বিয়ে হয় উমরা আদায়কালীন মক্কাতে। উমরা উপলক্ষে তিনদিন সেখানে অবস্থান করেন। তৃতীয় দিনে হুয়ায়তিব ইবনে আবদিল উযযা আরও কয়েজন কুরাইশ ব্যক্তিকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দেখা করে বলে, হুদায়বিয়ার চুক্তি অনুযায়ী আপনার অবস্থানের মেয়াদ আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। আপনি মক্কা ছেড়ে চলে যান।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাকে আরও একটু সময় দিলে তোমাদের এমন কী হতো। আমি তোমাদের মধ্যে মায়মুনার সাথে মিলিত হতাম এবং তোমাদের জন্য ওলীমার খাবার তৈরি করতাম।' তারা বলল, 'আপনার এ খাবারের আমাদের প্রয়োজন নেই। আপনি মক্কা ছাড়ুন।
এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব দ্রুত মক্কা থেকে বেরিয়ে সারাফে এসে অবস্থান করতে থাকেন এবং সেখানে মায়মুনার সাথে বাসর করেন।
ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম অবস্থায় মাইমুনা রা.-কে বিবাহ করেছেন।
'আবু রাফে' বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরামমুক্ত অবস্থায় হযরত মাইমুনা রা.-কে বিয়ে করেন। আর আমি তাদের দু-জনের মাঝে দূতিয়ালীর দায়িত্ব পালন করি।
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরাতুল কাযা'র সময়কালে হযরত মায়মূনা রা.-কে বিয়ে করেন। এ ব্যাপারে সকল সীরাতবিশেষজ্ঞ একমত। তবে ফকীহদের মধ্যে এ ব্যাপারে ভীষণ মতপার্থক্য রয়েছে যে, বিয়ের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম অবস্থান ছিলেন না হালাল অবস্থায়। ইবন হাজার রহ. এই মতপার্থক্যের সমন্বয় করতে গিয়ে বলেছেন, ইহরাম অবস্থায় বিয়ে সম্পন্ন হয়, আর মিলন হয় উমরা আদায়ের পর হালাল অবস্থায়।
তিনি খুব পরিচ্ছন্ন বিশ্বাস ও শুদ্ধ ধ্যান-ধারণার নারী ছিলেন। বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে তার স্বচ্ছ চিন্তা-বিশ্বাসের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন: একবার এক মহিলা অসুস্থ অবস্থায় মানত মানেন যে, আল্লাহ তাকে সুস্থ করলে বায়তুল মুকাদ্দাসে গিয়ে নামায আদায় করবেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এখন তিনি মানত পূর্ণ করতে বায়তুল মাকদাসে যাবেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি হযরত মায়মূনা রা.-এর নিকট বিদায় নিতে আসেন। হযরত মায়মূনা রা. তাকে বোঝালেন যে, মসজিদে নববীতে নামায আদায়ের সাওয়াব অন্য মসজিদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি। সুতরাং তুমি সেখানে না গিয়ে এখানে থাক।
হযরত মায়মূনা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৪৬টি, মতান্তরে ৭৬টি। তার মধ্যে সাতটি মুত্তাফাক আলাইহি। একটি বুখারী ও পাঁচটি মুসলিম স্বতন্ত্রভাবে বর্ণনা করেছেন। অন্যগুলো হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। তার থেকে বর্ণিত কিছু হাদীসের মাধ্যমে শরীয়তের গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়।
হযরত মায়মূনা রা.-এর নিকট থেকে যারা হাদীস শুনেছেন এবং বর্ণনা করেছেন, তাদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন, ইবনে আব্বাস রা. আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ ইবনুল হাদ, আবদুর রহমান ইবনুস সায়িব, ইয়াযীদ ইবনে আসাম, (তারা সবাই তাঁর বোনের ছেলে), 'উবায়দুল্লাহ আল-খাওলানী, নাদবা (দাসী), আতা ইবনে ইয়াসার মুসায়মান ইবনে ইয়াসার প্রমুখ।
**অন্তিম সময়**
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর হযরত মাইমুনা রা. নামায, রোযা, তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদতে জীবনের মূল্যবান সময়টুকু ব্যয় করতে থাকেন। এভাবেই এক সময় তিনি মহান রাব্বে কারীমের ডাকে সাড়া দেন। রাসূলের পরবর্তী খিলাফতে রাশেদার সম্মানিত খলীফাগণ তাঁকে ভীষণ সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন। হযরত আমীরে মুআবিআ রা. খিলাফতকালে তিনি পরপারে পাড়ি জমান।
তাঁর মৃত্যুর স্থানের ব্যাপারে আমরা একটি বিষয় জেনে নিতে পারি। ইয়াযীদ ইবনে আসাম হতে বর্ণিত, উম্মুল মুমিনীন মাইমুনা রা.-এর মক্কার জীবন বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের কেউই তখন মক্কায় ছিলেন না। তাই তিনি বললেন, আমাকে মক্কা থেকে নিয়ে যাও, কারণ আমি এখানে মারা যাব না। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন, আমি মক্কায় মারা যাব না।
তাঁর জীবনের এটাও এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা যে, একদিন যে সারাফ নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করে প্রথম মিলিত হন, তার প্রায় ৪৪ বছর পর সেখানেই ইন্তেকাল করেন। যে স্থানটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বাসর করেন, ঠিক সেখানেই সমাহিত হন। ইয়াযীদ ইবনে আসাম বলেন, 'আমি ও ইবনে আব্বাস রা. মাইমুনা রা.-কে দাফন করি। ৫১ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
হযরত আয়েশা রা. হযরত মায়মূনা রা.-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, আমাদের মধ্যে মায়মূনা সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয় করতেন এবং সবচেয়ে বেশি আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখতেন।
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّتٍ وَنَهَرٍ فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِيكٍ مُّقْتَدِرٍ
নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণাধারার মধ্যে। যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতির নিকটে।
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
৩০১. ইবনে আসাকির হাদীসটি হযরত উমর রা. হতে বর্ণনা করেছেন। আলবানী সহীহুল জামে, ৩২০৭ নম্বরে হাদীসটি বিশুদ্ধ বলেছেন।
৩০২. আল ইসাবাহ, ৮/৪৫০।
৩০৩. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৩৭২।
৩০৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৯।
৩০৫. হায়াতুস সাহাবা, ২/৬৬৫।
৩০৬. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১৮৩৭; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪১০।
৩০৭. মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩৯৩; সুনান, তিরমিযী, হাদীস নং ৮৪১।
৩০৮. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৩৩-১৩৬।
৩০৯. আসাহহুস সিয়ার, ৬৪৯।
৩১০. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৩৯।
৩১১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৯।
৩১২. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৩৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ৪/৩১।
৩১৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৩৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ৪/৩২।
৩১৪. সূরা কামার, ৫৪: ৫৪-৫৫।
📄 ফাতিমা বিনতে রাসূলিল্লাহ সা.
জান্নাতী নারীদের নেত্রী
হযরত ফাতিমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কতখানি প্রিয় ছিলেন, তা উপলব্ধি করাও আমাদের সাধ্যের বাইরে। তবে এটুকু মোটামুটি বলা যায়— সায়্যিদা হযরত ফাতিমা রা. ছিলেন তাঁর মহামহিম পিতার সত্তার গভীরে, অস্তিত্বে একাকার হয়ে।
জন্ম ও শুভ সূচনা
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতলাভের পাঁচ বছর পূর্বে উম্মুল কুরা তথা মক্কা নগরীতে হযরত ফাতিমা রা. জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আল্লাহর রাসূল আবুল কাসিম মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে আব্দুল মাত্তালিব এবং মাতা সারা বিশ্বের নারীজাতির নেত্রী, প্রথম মুসলমান উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা.।
সায়্যিদা ফাতিমা রা.-এর যখন জন্ম হয় তখন মক্কার কুরাইশরা পবিত্র কাবা ঘরের সংস্কার কাজ চালাচ্ছে; সেটা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতলাভের পাঁচ বছর পূর্বের ঘটনা। ফাতিমার জন্মগহণে তাঁর মহান পিতা-মাতা দারুণ খুশি হন। ফাতিমা ছিলেন কনিষ্ঠা মেয়ে। মা খাদীজা রা. তাঁর অন্য সন্তানদের জন্য ধাত্রী রাখলেও ফাতিমাকে ধাত্রীর হাতে ছেড়ে দেননি। তিনি তাঁর অতি আদরের ছোট মেয়েকে নিজে দুধ পান করান। এভাবে হযরত ফাতিমা রা. একটি পূতঃপবিত্র গৃহে তাঁর মহান পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন এবং নবুয়তের স্বচ্ছ ঝর্ণাধারায় স্নাত হন।
পবিত্রতম সান্নিধ্যে
হযরত ফাতিমার রা. মহত্ত্ব, মর্যাদা, আভিজাত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের মধ্যে উল্লেযোগ্য হচ্ছে :
✓ তাঁর পিতা মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম আ.-এর শ্রেষ্ঠ সন্তান রাহমাতুল্লিল আলামীন আমাদের মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
✓ তাঁর মা বিশ্বের নারীজাতির নেত্রী, প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা.।
✓ স্বামী দুনিয়া ও আখিরাতের নেতা আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী রা.।
✓ তাঁর দুই পুত্র হাসান ও হোসাইন রা. জান্নাতের যুবকদের দুই মহান নেতা এবং রাসূলুল্লাহর রা. সুগন্ধি।
✓ তাঁর এক দাদা শহীদদের মহান নেতা হযরত হামযা রা.।
✓ অন্য এক দাদা প্রতিবেশীর মান-মর্যাদার রক্ষক, বিপদ-আপদে মানুষের জন্য নিজের অর্থ-সম্পদ খরচকারী, উলঙ্গ ব্যক্তিকে বস্ত্র দানকারী, অভুক্ত ও অনাহার-ক্লিষ্টকে খাদ্য দানকারী হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব রা.।
✓ তাঁর এক চাচা মহান শহীদ নেতা ও সেনানায়ক হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.।
উল্লিখিত গৌরবের অধিকারী বিশ্বের নারীজাতির মধ্যে আর কেউ কি আছে?
অগ্রগামী মুসলিম
হযরত রাসূলে কারীমের রা. ওপর ওহী নাযিল হবার পর উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা. প্রথম তার প্রতি ঈমান আনেন এবং তার রিসালাতকে সত্য বলে গ্রহণ করেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি প্রথম পর্বে যেসব মহিলা ঈমান আনেন তাদের পুরো ভাগে ছিলেন তার পূতঃপবিত্র কন্যাগণ। তারা হলেন—যায়নাব, রুকাইয়্যা, উম্মে কুলসূম ও ফাতিমা রা.। তারা তাদের পিতার নবুওয়াত ও রিসালাতের প্রতি ঈমান আনেন তাদের মহীয়সী মা খাদীজার রা. সাথে।
ইবন ইসহাক হযরত আয়েশা রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ যখন তার নবীকে নবুয়তে ভূষিত করলেন তখন খাদীজা ও তার কন্যারা ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যারা তাদের মায়ের সঙ্গে সূচনাতেই ইসলামের আঙিনায় প্রবেশ করেন এবং তাদের পিতার রিসালাতে বিশ্বাস স্থাপন করেন। নবুওয়াতলাভের পূর্বেই তারা উন্নত নৈতিক গুণাবলীতে বিভূষিত হন। ইসলামের পরে তা আরও সুশোভিত হয়ে ওঠে।
শৈশব-কৈশোরে পিতার সহযোগিতা
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিল হলো। তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ মতো মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে লাগলেন এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করলেন। আর এজন্য তিনি যত দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, অত্যাচার নির্যাতন, অস্বীকৃতি, মিথ্যা দোষারোপ ও বাড়াবাড়ির মুখোমুখি হলেন, সবকিছুই তিনি উপেক্ষা করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে চরম বাড়াবাড়ি ও শত্রুতা করতে লাগল। তারা তাকে ঠাট্টাবিদ্রুপ করতে লাগল, তার প্রতি মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতে আরম্ভ করল। হযরত ফাতিমা রা. তখন জীবনের শৈশব অবস্থা অতিক্রম করছেন। পিতা যে তার জীবনের একটা কঠিন সময় অতিবাহিত করছেন, মেয়ে ফাতিমা এত অল্পবয়সেও তা বুঝতে পারতেন। অনেক সময় তিনি পিতার সাথে ধারে-কাছে এদিক ওদিক যেতেন।
একবার দুরাচারী উকবা ইবনে আবি মুয়াইতকে তার পিতার সাথে এমন একটি নিকৃষ্ট আচরণ করতে দেখেন যা তিনি আজীবন ভুলতে পারেননি। এই উকবা নিজেকে মক্কার কুরাইশ বংশের বলে পরিচয় দিত। আসলে তার জন্মের কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিল না। একজন নিকৃষ্ট ধরনের পাপাচারী ও দুর্বৃত্ত হিসেবে সে বেড়ে ওঠে। তার জন্মের এই কালিমা ঢাকার জন্য সে সব সময় আগ বাড়িয়ে নানা রকম দুষ্কর্ম করে কুরাইশ নেতৃবৃন্দের প্রীতিভাজন হওয়ার চেষ্টা করত।
উরওয়া ইবনে যুবায়র রহ. বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা.-এর নিকটে বললাম, মক্কার মুশরিক কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সর্বাপেক্ষা কঠোর আচরণের বর্ণনা দিন। তিনি বললেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা শরীফের হিজর নামক স্থানে সালাত আদায় করছিলেন। তখন উকবা ইবনে আবু মুয়াইত এলো এবং তার চাদর দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কণ্ঠনালি পেঁচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলল। তখন আবু বকর রা. এগিয়ে এসে উকবাকে কাঁধে ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হতে হটিয়ে দিলেন এবং বললেন, 'তোমরা এমন লোককে হত্যা করতে চাও যিনি বলেন, একমাত্র আল্লাহই আমার রব।'³¹⁵
সেই কিশোরী বয়সে ফাতিমা পিতার হাত ধরে একদিন গেছেন কাবার আঙিনায়। তিনি দেখলেন, পিতা যেই না হাজারে আসওয়াদের কাছাকাছি গেছেন অমনি মুশরিকদের একদল একযোগে তাকে ঘিরে ধরে বলতে লাগল, 'আপনি কি সেই ব্যক্তি নন যিনি এমন এমন কথা বলে থাকেন?' তারপর তারা এক এক করে বলতে থাকে 'আপনি আমাদের বাপ-দাদাদের গালি দেন, উপাস্যদের মন্দ বলেন, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোকদেরকে নির্বোধ ও বোকা মনে করেন।'
তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমিই সেই ব্যক্তি।
এর পরের ঘটনা দেখে বালিকা ফাতিমার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তিনি ভয়ে অসাড় হয়ে পড়েন। দেখেন, তাদের একজন তার পিতার গায়ের চাদরটি তার গলায় পেঁচিয়ে জোরে টানতে শুরু করেছে। আর আবু বকর রা. তাদের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত উত্তেজিত কণ্ঠে বলছেন, তোমরা একটি লোককে শুধু এ জন্য হত্যা করবে যে, তিনি বলেন: আল্লাহ আমার রব, প্রতিপালক?
লোকগুলো আগুনঝরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। তার দাড়ি ধরে টানল, তারপর মাথা ফাটিয়ে রক্ত ঝরিয়ে ছাড়ল।³¹⁶ আরেক হাদীসে এসেছে,
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদারত অবস্থায় ছিলেন। অন্য সূত্রে আহমাদ ইবনে উসমান রহ. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা বায়তুল্লাহর পাশে সালাত আদায় করছিলেন এবং সেখানে আবু জাহাল ও তার সাথীরা বসা ছিল। এমন সময় তাদের একজন অন্যজনকে বলে উঠল 'তোমাদের মধ্যে কে অমুক গোত্রের উটনীর নাড়িভুঁড়ি এনে মুহাম্মাদ যখন সিজদা করেন তখন তার পিঠের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে'? তখন গোত্রের বড় পাষণ্ড (উকবা) তাড়াতাড়ি গিয়ে তা নিয়ে এলো এবং তার প্রতি লক্ষ্য রাখল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সিজদায় গেলেন, তখন সে তার পিঠের ওপর দুই কাঁধের মাঝখানে তা রেখে দিল।
ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি (এ দৃশ্য) দেখছিলাম; কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। হায়! আমার যদি বাধা দেবার শক্তি থাকত! তিনি বলেন, তারা হাসতে লাগল এবং একে অন্যের ওপর লুটোপুটি খেতে লাগল। আর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সিজদায় থাকলেন, মাথা উঠালেন না। অবশেষে ফাতিমা রা. এসে সেটি তার পিঠের ওপর হতে ফেলে দিলেন।
অতঃপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আল্লাহ, আপনি কুরাইশকে ধ্বংস করুন। এরূপ তিনবার বললেন। তিনি যখন তাদের বদ দুআ করেন তখন তা তাদের অন্তরে ভয় জাগিয়ে তুলল। বর্ণনাকারী বলেন, তারা জানত যে, এ শহরে দুআ কবুল হয়। অতঃপর তিনি নাম ধরে বললেন, হে আল্লাহ, আবু জাহালকে ধ্বংস করুন এবং উতবাহ ইবনে রবীআহ, শায়বাহ ইবনে রবীআ, ওয়ালীদ ইবনে উতবাহ, উমাইয়াহ বিন খালাফ ও উকবাহ ইবনে আবি মুআইতকে ধ্বংস করুন। রাবী বলেন, তিনি সপ্তম ব্যক্তির নামও বলেছিলেন কিন্তু তিনি স্মরণ রাখতে পারেননি। ইবনে মাসউদ রা. বলেন, সেই সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের নাম উচ্চারণ করেছিলেন, তাদের আমি বদরের কূপের মধ্যে নিহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।³¹⁷
এভাবে আবু বকর রা. সেদিন নিজের জীবন বিপন্ন করে পাষণ্ডদের হাত থেকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ছাড়ালেন। ছাড়া পেয়ে তিনি বাড়ির পথ ধরলেন। মেয়ে ফাতিমা পিতার পেছনে পেছনে চললেন। পথে স্বাধীন ও দাস যাদের সাথে দেখা হলো, প্রত্যেকেই নানা রকম অশালীন মন্তব্য ছুঁড়ে ভীষণ কষ্ট দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোজা বাড়িতে গেলেন এবং মারাত্মক রকমের বিধ্বস্ত অবস্থায় বিছানায় এলিয়ে পড়লেন। বালিকা ফাতিমার চোখের সামনে এ ঘটনা ঘটল।³¹⁸
অবরুদ্ধ সময়ের সেই দুঃসহ যন্ত্রণা
৬ষ্ঠ হিজরীতে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও হযরত উমর রা. ইসলাম গ্রহণ করেন তখন কুরাইশ গোত্রের মুশরিকরা প্রচণ্ড রাগান্বিত হলো। তাদের ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেল। কুরাইশ গোত্রের সকল লোক এই সিদ্ধান্ত করল যে, যতদিন বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব মুহাম্মাদকে হত্যা করার জন্য তাদের কাছে অর্পন না করবে ততদিন তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখা যাবে না। তাদের কাছে কোনো জিনিস বিক্রয় করা যাবে না। তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না, তাদের খোলা জায়গায় থাকতে দেওয়া যাবে না, এই সিদ্ধান্ত লিখে সবাই এতে দস্তখত করল, কেউ কেউ টিপ দিল। এরপর তা কাবা শরীফের দেয়ালে ঝুলিয়ে দিল।
যখন বনু হাশিমের এই ভয়াবহ বয়কট সম্পর্কে জানা হলো, তখন তারা দিশেহারা হননি, তারা তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করল। বংশের সম্মানীত ব্যক্তি আবু তালিব বনু হাশিম ও আব্দুল মুত্তালিবের পরিবারের সকল সন্তানাদি নিয়ে শিয়াবে আবি তালিবে আশ্রয় নিলেন। তাদের মধ্যে বৃদ্ধা, যুবতী মহিলা ও শিশুরাও ছিল। শুধু মাত্র আবু লাহাব ও তার অধীন কয়েকজন মুশরিকদের পক্ষাবলম্বনকারী ছিল।
মক্কার মুশরিকরা ১লা মুহাররম ৭ হিজরীতে শিয়াবে আবি তালিব ঘেরাও করল। আর এমন কঠোরভাবে ঘেরাও করল যে, বাহির থেকে কোনো খাবার ভেতরে ঢুকতে দিত না। যদি কোনো ব্যবসায়ী খাবার বিক্রি করার জন্য আসত, তাহলে তার সব খাবার ক্রয় করে নিত; যাতে করে শিয়ায়ে আবি তালিবে আবদ্ধ এমন কেউ আর কোনো খাবার ক্রয় করতে না পারে।
বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের শিশুরা যখন ক্ষুধার যাতনায় চিৎকার করত, তখন মুশরিকরা খুব আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠত। মহিলাদের স্তনের দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। অবরুদ্ধদের মুখে কয়েকদিনেও কোনো খাবার জুটত না। যদি কখনো হাশিমী গোত্রের লোকেরা ছাড়া অন্য কোনো কিছু গোপন, জানবাজি রেখে নিয়ে আসত, তাহলে এর পরিমাণ হতো একেবারে কম—এক-দুদিনও যেত না। অবরুদ্ধরা ক্ষুধার যাতনায় গাছের পাতা ভক্ষণ করত।
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস একদিন প্রাকৃতিক প্রয়োজনে একটু দূরে কোনো এক স্থানে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি এক টুকরো চামড়া পড়ে থাকতে দেখলেন। তিনি সেটা উঠিয়ে নিলেন, ধৌত করলেন, রান্না করলেন এবং সেটা ভক্ষণ করলেন।
মোটকথা, বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব ধারাবাহিক তিন বছর শিয়ায়ে আবি তালিবে অবরুদ্ধ জীবন যাপন করেন। কষ্ট ও দুঃখের যে পরিমাণ সহ্য করেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। হযরত ফাতিমাতুয যাহরা রা. তার পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের সঙ্গে মুসিবতের সময় অবরুদ্ধ অবস্থায় কষ্টকর জীবন কাটিয়েছেন। সকল দুঃখ কষ্টকে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন।
তিন বছরে যখন হজের মওসুম আসত তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুয়াবে আবি তালিব থেকে বের হতেন। মানুষকে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। হতভাগ্য আবু লাহাব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেছনে পেছনে যেত এবং বলত আমার এই ভাতিজা পাগল হয়ে গেছে (নাউযুবিল্লাহ) তার কথায় তোমরা কর্ণপাত করবে না। অন্যথায় তোমাদের সীমাহীন ক্ষতি হবে।
মুশরিকদের মধ্যে কয়েকজন এমনও ছিল যাদের হৃদয় বনু হাশিমের দুঃখ-কষ্ট দেখে নরম হতো; কিন্তু প্রকাশ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা করলে সকল মুশরিকদের রোষানলে পড়তে হবে—এই ভেবে নীরব থাকে।
একদিনের একটি আশ্চার্যকর ঘটনা, উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা রা.-এর ভাতিজা হাকীম ইবনে হিসাম (যিনি তখনো মুসলমান হননি) তার গোলামের হাতে কিছু গম দিয়ে বলল, 'এগুলো আমার ফুফু হযরত খাদিজা রা.-এর কাছে পৌঁছে দিয়ো।' গোলাম গম নিয়ে রওনা হলো। রাস্তায় আবু জাহেলের সঙ্গে দেখা হলো। আবু জাহেল বলল, 'গমের বস্তা নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?' গোলাম বলল, 'শিয়াবে আবি তালেবের অবরুদ্ধদের কাছে।' আবু জাহেল তাকে বাধা দিল এবং বলল, 'এটা কখনো হতে পারে না। বনু হাশিমকে আমরা গমের একটি দানাও দেব না।'
ঘটনাক্রমে আবুল বুখতারী ইবনে হিশাম মুশরিকদের একদলের সর্দার। তবে মুসলমানদের দুঃখ কষ্টের জন্য তার মন কাঁদত। তিনি ওই দিক দিয়েই যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, 'তোমরা পরস্পর কেন ঝগড়া করছ?' তখন আবু জাহেল পুরো ঘটনা বলল।
আবুল বুখতারী সবকিছু শুনে বললেন, 'খাদিজা তার ভাতিজার কাছে কিছু গম আমানত রেখেছিল। সে এগুলো ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছে। এতে আমাদের অসুবিধা কী?'
আবু জাহেল বলল, 'তুমি বনু হাশিমের কল্যাণকামী মনে হচ্ছে। এই গমের বস্তা শিয়াবে আবি তালেবে পৌঁছতে পারবে না। এটাই শেষ কথা।'
আবুল বুখতারী রেগে গেলেন। ধমক দিয়ে বললেন, 'ঠিক আছে দেখা যাবে কীভাবে তুমি বাঁধা দাও। এই গম বনু হাশিমের লোকদের নিকট পৌঁছবেই।'
তিনি আবু জাহেলকে যমীনে ফেলে দিলেন এবং খুব পিটালেন। পিটিয়ে তাকে রক্তাক্ত করে ফেললেন। আবুল বুখতারীর সঙ্গে সে না পেরে আবু জাহেল স্থান ত্যাগ করল। তারপর হাকীম ইবনে হিসামের গোলাম শিয়াবে আবি তালিবে গমের বস্তা পৌঁছে দিল।
আবু জাহলের অপমান হওয়ার কথা ফাঁস হয়ে গেলে মানুষ বিভিন্ন রকম কথা বলা শুরু করল। আর কিছু লোক প্রকাশ্যে অবরুদ্ধদের সঙ্গে সহমর্মিতা শুরু করে দিলেন। বনু মাখযুমের এক সুহৃদয় ব্যক্তি হিশাম আমেরী আব্দুল মুত্তালিবের নাতী যুহাইর ইবনে আবু উমাইয়্যার কাছে গেলেন, বলতে লাগলেন, 'হে যুহাইর, তুমি কীভাবে এটা করতে পারলে যে, তুমি দুবেলা পেট ভর্তি করে খাও আর তোমার মামা একটি রুটির টুকরাও খেতে পারে না!' যুহাইর বলল, 'হে চাচাতো ভাই, যদি আমার সাধ্য থাকত, তাহলে এই নাপাক অঙ্গীকার আমি ভেঙে ফেলতাম।' কিন্তু আফসোস, আমি একা। একা তো আর পারি না। হিসাম বললেন, আমি তোমার সঙ্গে আছি। তুমি একা নও। হিম্মত করো। আরও সাথী পাবে।
যুহাইর ও হিশাম উভয়ে মুতইম ইবনে আদী এর কাছে গেলেন, যেখানে যুমআ ইবনে আসওয়াদ ও আবুল বুখতারীকেও সামনে পেলেন। দ্বিতীয় দিন বনু হাশিমের ও মুত্তালিবের সকল কল্যাণকামী কাবা ঘরে গেলেন, কুরাইশদের একত্র করে বললেন, 'হে কুরাইশ, এটা কি যুলুম নয় যে, আমরা পেট ভর্তি করে খাব, আর বনু হাশিম ও মুত্তালিব যারা আমাদের ভাই, তারা অনাহারে থাকবে? গমের একটি দানাও পর্যন্ত তারা পাচ্ছে না। তাদের শিশু ও মহিলারা ক্ষুধার তাড়নায় ধ্বংস হতে চলেছে। আল্লাহর কসম! যতক্ষণ এই সিদ্ধান্ত ভেঙে ফেলা না হবে, আমরা শান্তি পাব না।'
আবু জাহেল রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল। কারও ক্ষমতা নেই; এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের। এই সিদ্ধান্ত ততদিন বলবৎ থাকবে যতদিন বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব মুহাম্মদকে আমাদের হাতে অর্পণ না করবে।
যুমআ ইবনে আসওয়াদ বলল, 'তুমি মিথ্যা কথা বলছ। আমরা তো প্রথম দিনেই এই সিদ্ধান্তে রাজি ছিলাম না।' মুতইম ইবনে আদী ও আবুল বুখতারী হাত বাড়িয়ে চুক্তিপত্রটি কাবা থেকে নামিয়ে সেটি টুকরো টুকরো করে বাতাসে উড়িয়ে দিল। মুশরিকরা তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এরপর ঘুমআ, আবুল বুখতারী, যুহাইর, মুতইম ও অন্যান্য সাথীরা একসঙ্গে শিয়াবে আবি তালিবে পৌঁছে অবরুদ্ধদের বের করে আনলেন। তিন বছর অবর্ণনীয় কষ্ট করার পর তারা আবার নিরাপদ জীবন করতে লাগলেন। এক- দুদিন নয়, এক-দু সপ্তাহ নয়, এক-দুমাস নয়, ধারাবাহিক তিন বছর কষ্ট, যাতনা সহ্য করেছেন। তাদের হিম্মত ভাঙেনি। দৃঢ়তার এমন পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন যে, ইতিহাস এর দৃষ্টান্ত পাওয়া কঠিন। দৃঢ়তার এই সময়ে শিশু হযরত ফাতিমা রা. নিজের পিতা মাতার সঙ্গে অটল অবিচল ছিলেন। এই কষ্ট সহ্য করেছেন।
এই অবরুদ্ধদের মধ্যে ফাতিমাও রা. ছিলেন। এই অবরোধ তার স্বাস্থ্যের ওপর দারুণ প্রভাব ফেলে। এখানে অনাহারে থেকে যে অপুষ্টির শিকার হন তা আমরণ বহন করে চলেন।³¹⁹
খাদীজা রা.-এর ইন্তেকাল
অবরুদ্ধ জীবনের দুঃখ-বেদনা ভুলতে তিনি আরেকটি বড় রকম দুঃখের মুখোমুখী হন। স্নেহময়ী মা হযরত খাদীজা রা.- যিনি তাদের সবাইকে আগলে রেখেছিলেন, যিনি অতি নীরবে পুণ্যময় নবীগৃহের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে চলছিলেন, ইন্তেকাল করেন। তিনি আল্লাহর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাবতীয় দায়িত্ব যেন কন্যা ফাতিমার ওপর অর্পণ করে যান। তিনি অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়তার সাথে পিতার পাশে এসে দাঁড়ান। পিতার আদর ও স্নেহ বেশি মাত্রায় পেতে থাকেন। মদীনায় হিজরতের আগ পর্যন্ত মক্কায় পিতার দাওয়াতী কার্যক্রমের সহযোগী হিসেবে অবদান রাখতে থাকেন। আর এ কারণেই তার ডাকনাম হয়ে যায়—‘উম্মু আবীহা’ (তাঁর পিতার মা)।³²⁰
পবিত্র হিজরত
হযরত আয়েশা রা. বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করেন। তখন তিনি আমাকে এবং তাঁর মেয়ে হযরত ফাতিমাকে মক্কায় রেখে যান। যখন নবীজী মদীনায় পৌঁছেন তখন তিনি হযরত যায়িদ বিন হারেসা রা.-কে প্রেরণ করেন এবং তাঁর সঙ্গে গোলাম আবু রাফে'কে পাঠান। তাঁদের দুজনকে দু-টি উট এবং সঙ্গে আবু বকর রা.-এর কাছ থেকে পাঁচশত দিরহাম নিয়ে তাঁদের দুজনকে এই জন্য দিয়ে দেন যে, যখন প্রয়োজন পড়বে তখন সওয়ারি কিনবে এবং তাঁদের দুজনের সঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতকে দুই বা অথবা তিনটি উট দিয়ে পাঠান এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা.-কে এই চিঠি লিখে পাঠান যে, আমার মা রুম্মান এবং আমাকে এবং আমার বোন আসমা যিনি হযরত যুবায়ের রা.-এর বিবি ছিলেন, আমাদেরকে সওয়ারির ওপর বসিয়ে যেন রওনা করিয়ে দেয়।
এই তিনজন মদীনা থেকে একসঙ্গে রওনা দেন। কাদীদ নামক স্থানে পৌঁছে হযরত যায়িদ রা. ওই পাঁচশত দিরহাম দিয়ে আমাদের জন্য তিনটি উট ক্রয় করেন। অতঃপর মক্কায় প্রবেশ করলে তাঁর সঙ্গে তালহা বিন উবায়দুল্লাহ রা.-এর সঙ্গে দেখা হয়। তিনিও হিজরতের জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। এরপর আমরা সকলে মক্কা থেকে রওনা হই। আবু রাফে ও যায়িদ ইবনে হারিসার সঙ্গে ফাতিমা, উম্মে কুলসুম, সাওদা বিনতে যামআ রা., উম্মে আইমান ও উসামা ইবনে যায়িদ যাত্রা করে। যায়িদ রা. উম্মে আইমান ও উসামাকে একটি উটের ওপর আরোহণ করান। যখন আমরা বাইদা নামক স্থানে পৌঁছি, তখন আমার উট ভয় পেয়ে গেল। উটটি কাফেলা থেকে দ্রুত গতিতে ছুটে পালালো। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি হাওদা ছিটকে পড়বে। আমি হাওদায় ছিলাম। আমার সঙ্গে আমার মা ছিলেন। তখন আমার মা বলতে লাগলেন, 'হায়! আমার কন্যা! হায় দুলহান! (কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল হিজরতের আগে)। পরিশেষে উটটিকে বশে আনা হয়।
যখন আমরা মদীনায় পৌঁছি, তখন পিতা আবু বকর আমাকে নামিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে পৌঁছে দেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদ নির্মাণ করছিলেন। মসজিদের পাশে আরেকটি ছোট ঘর তৈরি করেন এবং তার মধ্যে আমাকে রাখেন।³²¹
আলী রা.-এর সাথে বিয়ে
আনসার ও মুহাজিরদের এক দল হযরত আলী রা.-কে ফাতিমা রা.-এর বিবাহের পয়গাম পৌঁছাবার প্রতি উৎসাহিত করলেন। হযরত আলী রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হলেন এবং আসল উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেন, 'আহলান ওয়া মারহাবান; খোশ আমদেদ।' পরে চুপ হয়ে গেলেন। সাহাবা রা.-এর জামাত বাহিরে অপেক্ষমাণ। হযরত আলী রা. তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জওয়াব শোনালেন। তারা হযরত আলী রা.-কে মুবারকবাদ দিয়ে বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন।
এক বর্ণনায় এটাও আছে যে, হযরত আলী রা.-কে এক আযাদকৃত বাঁদী একদিন জিজ্ঞাসা করল, কে হুজুরের কাছে ফাতিমা রা.-এর প্রস্তাব পাঠিয়েছে? হযরত আলী রা. জওয়াব দিলেন, আমি জানি না। সে বলল, 'আপনি কেন প্রস্তাব দেননি?' আলী রা. বললেন, 'আমার কি আছে যে আমি বিয়ে করব?' এই সৌভাগ্য হযরত আলী মুরতাযা রা.-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে পাঠাল। তিনি নবীর দরবারে হাযির হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শান-শওকত আর স্বভাবগত লজ্জায় মুখে কিছু না বলে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তাকে জিজ্ঞাস করলেন, 'আলী, অভ্যাস বহির্ভুত একেবারে চুপচাপ আছ, তুমি কি ফাতিমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছ?' হযরত আলী রা. বললেন, 'অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কাছে মোহর আদায় করার মতো কিছু আছে?'
হযরত আলী রা. উত্তর দিলেন, 'একটি লৌহবর্ম আর একটি ঘোড়া ছাড়া আর কিছুই নেই।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ঘোড়া তো যুদ্ধের জন্য আবশ্যক। লৌহবর্ম বিক্রি করে এর মূল্য নিয়ে আসো।' হযরত আলী রা. নববী আদেশের প্রতি মাথা অবনত করলেন। এরপর হযরত আলী রা. লৌহবর্ম বিক্রি করার জন্য সাহাবীদের সামনে পেশ করলেন। হযরত উসমান রা. ৪৮০ দিরহাম দিয়ে লৌহবর্ম কিনে নিলেন। অতঃপর হাদিয়া স্বরুপ হযরত আলী রা.-কে ফেরত দিলেন। হযরত আলী রা. এ সম্পদ নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উসমান রা.-এর জন্য কল্যাণের দুআ করলেন। এর মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমার সন্তুষ্টি অর্জন করে নিলেন। হযরত আলী রা. লৌহবর্মের বিক্রয়মূল্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে পেশ করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, দুই তৃতীয়াংশ সুগন্ধি ইত্যাদির পেছনে খরচ করো। আর এক তৃতীয়াংশ দিয়ে বিয়ের আসবাব ও পারিবারিক কাজে ব্যয় করো। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আনাস বিন মালেককে হুকুম দিলেন যাও, আবু বকর, উমর, তালহা, যুবাইর, আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. এবং অন্যান্য মুহাজির ও আনসারদেরকে মসজিদে ডাক।
হযরত আনাস রা.-এর বয়ান হলো, এর আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী আসার সময় যে অবস্থা হয় সে রকম অবস্থার অবতারণা হলো, এমন অবস্থা যখন দূর হয়ে গেল তখন তিনি বললেন, জিবরাঈল আমীন আ. আল্লাহর পক্ষ থেকে এই পয়গাম নিয়ে এসেছেন যে, ফাতিমা রা.-এর বিবাহ আলী রা.-এর সঙ্গে দিয়ে দিন। যখন দরবারে রিসালাত মসজিদে নববীতে অনেক সাহাবা রা. একত্র হলেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বারে এসে বললেন, 'হে মুহাজির ও আনসারদের জামাত, আল্লাহ তাআলা ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবাহ আলী ইবনে আবি তালিবের সঙ্গে দেওয়ার আদিষ্ট হয়েছেন। আমি তোমাদের সামনে ওই হুকুম আদায় করছি।' এরপর তিনি এই খুতবা পাঠ করলেন,
প্রশংসা আল্লাহর জন্য-যিনি তার নেয়ামতের কারণে সমস্ত প্রশংসার হকদার এবং তার কুদরতের কারণে ইবাদতের হকদার, তার ক্ষমতা সকল জায়গায় প্রতিষ্ঠিত, তার হুকুম যমীন ও আসমানে প্রযোজ্য, তিনি তার নিজ কুদরতে সমস্ত মাখলুককে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তার হুকুমের মাধ্যমে তাদের পরস্পরে পার্থক্য করেছেন এবং তার দ্বীনের মাধ্যমে ইজ্জত দান করেছেন এবং তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা বিবাহ শাদীকে এক আবশ্যক বিষয় নির্ধারণ করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা ওই পাবত্র সত্তা যিনি মানুষকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর পরস্পরে নারী-পুরুষ বানিয়েছেন। আপনার প্রতিপালক সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ তাআলা সবকিছুকে ক্ষমতা ও ফয়সালার অধীন করে দিয়েছেন। এবং তার ক্ষমতা ও ফায়সালার এক সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর সবকিছু তার নির্ধারিত সময়েই পূর্ণ হয়। আর সকল সময়ের একটি লিপিকা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা যা চান এর থেকে মুছে দেন আর যা চান বহাল রাখেন। তার তাকদীরের লিপিকা। (লওহে মাহফুজে)।
খুতবার পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকি হেসে আলী রা.-কে বললেন, 'আমি চারশত মিসকাল রূপার মোহরের বিনিময়ে ফাতিমাকে তোমার কাছে বিবাহ প্রদান করলাম। কি তুমি কবুল?' হযরত আলী রা. বললেন, 'জি, হ্যাঁ!' এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করলেন,
جَمَعَ اللَّهُ شَمْلَكُمَا وَأَسْعَدَ جِدَّكُمَا وَبَارَكَ عَلَيْكُمَا وَأَخْرَجَ مِنْكُمَا ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً
আল্লাহ তাআলা তোমাদের মধ্যে একতা দান করুন এবং তোমাদের চেষ্টাকে সফলকাম করুন, তোমাদের ওপর বরকত দান করুন এবং তোমাদের থেকে উত্তম সন্তান দান করুন।
তারপর সকলে মিলে কল্যাণ ও বরকতের দুআ করলেন। এবং একপাত্র খেজুর উপস্থিতদের মাঝে ছিটিয়ে দিলেন। কারও কথা অনুযায়ী উপস্থিতদের মাঝে মধুর শরবত ও খেজুর বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। অন্য এক বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে খুরমা বণ্টন করেছিলেন। এর ওপর ভিত্তি করেই কোনো ফকীহ বিবাহের সময় খুরমা অথবা বাদাম বা চিনি ছিটানোকে মুস্তাহাব বলেছেন।³²²
এক বর্ণনায় আছে, যখন ফাতিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিদায় নিয়ে স্বামীর ঘরে যাচ্ছিলেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রা.-কে বললেন, আমার জন্য অপেক্ষা করো। তারপর হযরত আলী রা. এবং হযরত ফাতিমা রা. তাদের ঘরে গিয়ে এক প্রান্তে বসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর সরওয়ারে আলম ঘরের দরজায় গিয়ে উপস্থিত হলেন। এবং ভেতরে আসার অনুমতি চাইলেন। হযরত উম্মে আইমান রা. দরজা খুলে আসলে তাদের দুজনের মাঝে কথোপকথন হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার ভাই এখানে আছে? হযরত উম্মে আইমান রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, তিনি আপনার ভাই হন কী করে? আপনি তো তার কাছে আপনার কন্যা বিবাহ দিয়েছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ এটা জায়েয। এখানে কি আসমা বিনতে উমাইসও আছে? সে কি আল্লাহর রাসূলের মেয়ের সম্মান ও মর্যাদার জন্য এসেছে?
হযরত উম্মে আইমান বললেন, জী হ্যাঁ। আসমা বিনতে উমাইসও এসেছেন। আমি আর তিনি আল্লাহর রাসূলের মেয়ের সম্মান ও মর্যাদার জন্য এসেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে আইমানকে কল্যাণের দুআ করে ভেতরে এসে পানি চাইলেন। এক কাঠের পেয়ালা বা অন্য কোনো পাত্রে করে পানি পেশ করা হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের থেকে কিছু পান করলেন অথবা এর থেকে তার হাতে ঢেলে এবং আল্লাহর মর্জি মোতাবেক এর ওপর কিছু পড়ে হযরত আলী রা.-এর সামনে এনে তার দুই, দুই বাহু ও বুকের ওপর ছিটিয়ে দিলেন। তারপর ফাতেমা রা.-কে ডাকলেন। তিনি লজ্জিত হয়ে সামনে আসলেন তার উপরও পানি ছিটিয়ে দিলেন আর বললেন, হে ফাতিমা! আমি আমার বংশের সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তির কাছে তোমাকে বিয়ে দিয়েছি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের কন্যা হযরত ফাতিমাতুয যাহারা রা.-কে হযরত আলী রা.-এর সঙ্গে বিবাহ দিলেন। যখন হযরত ফাতিমা স্বামীর গৃহে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি হযরত আলী রা.-এর গৃহে একটি খাট, একটি মটকা, আর একটি চামড়ার পাত্র ছাড়া কিছুই দেখতে পাননি। যমীনে পাথরের বিছানা বিছানো ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবর পাঠালেন : যতক্ষণ আমি না আসি ততক্ষণ হযরত ফাতিমার কাছে যাবে না। কিছুক্ষণ পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করলেন। তিনি পানি আনার জন্য বললেন। পানি আনা হলো। তিনি পানিতে কিছু দুআ-যিকির পড়ে ফুঁক দিলেন। এরপর হযরত আলী রা.-এর চোহারায় কিছু পানি ছিটিয়ে দিলেন। এরপর হযরত ফাতিমা রা.-কে ডাকলেন। হযরত ফাতিমা লজ্জায় অবনত হয়ে হাযির হলেন। তিনি তার চেহারাতেও পানি ছিটিয়ে দিলেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমাকে বললেন, মনে রেখো! আমি তোমার বিবাহ এমন লোকের সঙ্গে দিয়েছি যে আমার বংশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী রা.-কে বললেন, 'তুমি তোমার স্ত্রীকে গ্রহণ কর।' তারপর তিনি তাদের জন্য দুআ করতে করতে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন।³²³
মানুষ হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর পাশে বসে কথা শুনছিলেন। কথা প্রসঙ্গে হযরত উমর রা. বললেন, হযরত আলী রা.-এর মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য এমন আছে, যদি এর একটিও আমার থাকত তাহলে এটা আমার কাছে লাল উট অপেক্ষা উত্তম ছিল। মানুষ খুব আগ্রহ নিয়ে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, সেই তিনটি গুণ কী?' তিনি বললেন, 'প্রথমত হচ্ছে, তার বিবাহ ফাতিমার সঙ্গে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তার জন্য মসজিদে অবস্থান হালাল ছিল—যা আমার জন্য হালাল নয়। তৃতীয়ত, খায়বারের যুদ্ধে পতাকা তার হাতে দেওয়া হয়েছিল।³²⁴
ফাতিমা রা.-এর ওলিমা
হযরত বুরাইদ রা. বলেন, আনসারী কিছু লোক হযরত আলী রা.-কে বলল, ‘তুমি হযরত ফাতিমাকে বিবাহের প্রস্তাব দাও।’ হযরত আলী রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আবু তালেবের ছেলের (আলী) কী কাজ?’ হযরত আলী রা. বলেন, ‘আমি রাসূলের কন্যা ফাতিমার বিবাহের প্রস্তাব দিতে চাচ্ছি।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘মারহাবা! আহলান!’ আর কিছুই বললেন না। হযরত আলী রা. বাইরে আসলেন। আনসারি লোকগুলো তার অপেক্ষা করছিল। তারা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে?’
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাব দিলেন, ‘মারহাবা ও আহলান ছাড়া তিনি তো আর কিছুই বললেন না।’ একথা শুনে তারা বলে উঠলেন, ‘আরে আলী, রাসূলের পক্ষ থেকে এ দুটোর একটাই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনি তোমাকে স্বাগত জানিয়েছেন আর তার মেয়েকে দিয়েছেন।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তার সঙ্গে বিবাহ দিলেন তখন তাকে বলেন, ‘হে আলী, নববধূ ঘরে এলে ওলিমা করতে হয়।’
হযরত সাআদ রা. বলেন, আমার কাছে একটি ভেড়া আছে। (আমি সেটা দিচ্ছি)। আনসারিরা হযরত আলী রা. এর জন্য কয়েক সা’ ভুট্টা আনলেন। যখন বধুবিদায়ে রাত আসল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার অপেক্ষা কর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পানি চাইলেন। এর দ্বারা ওযু করলেন এবং পানি হযরত আলী রা.-এর ওপর ছিটিয়ে দিলেন। তারপর এই দুআ করলেন, হে আল্লাহ, তাদের উভয়ের মাঝে বরকত দান করুন। তাদের দু-জনের এ বিবাহের মাঝে বরকত নসীব করুন।³²⁵
তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারিণী
শিশু হযরত ফাতিমা মাঝে মাঝে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত খাদীজাতুল কুবরা রা.-কে এমন এমন প্রশ্ন করত যাতে তার তীক্ষ্ণ মেধা ও বুদ্ধি ফুটে উঠত।
একদিনের ঘটনা। শিশু সায়্যিদাহ হযরত ফাতিমা রা. তার শ্রদ্ধেয় মাতাকে জিজ্ঞেস করল, 'আম্মাজান, আল্লাহ তাআলা আমাদের ও দুনিয়ার সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তাকে কি দেখা যায়?'
হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. বললেন, 'হে আমার কন্যা, যদি আমরা দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করি, তার বান্দাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করি, নিষিদ্ধ বস্তু থেকে বিরত থাকি, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করি, কেবলমাত্র তাকেই ইবাদতের যোগ্য মনে করি, আল্লাহর রাসূলের ওপর ঈমান রাখি-তাহলে কিয়ামতের দিন অবশ্যই আমরা আল্লাহর দিদারে ধন্য হব। ওই দিন নেক ও বদ আমলের হিসাব হবে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ঘরে আসতেন, তখন শিশু সায়্যিদাহ হযরত ফাতিমা রা.-কে এমন এমন বিষয় শেখাতেন, যাতে আল্লাহকে চেনা যায়। মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করা যায়। আল্লাহ তাকে তীক্ষ্ণ মেধা দান করেছিলেন। যে কথা একবার শুনতেন সব সময় মনে রাখতে পারতেন।
যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হতেন তখন শিশু ফাতিমা রা.-কে খাদীজাতুল কুবরা রা. জিজ্ঞেস করতেন যে, আজ তোমার আব্বাজান কি কি বিষয় শিখিয়েছেন? তিনি তৎক্ষণাৎ সব কিছু বলে দিতেন।
সাধাসিধে জীবন
হযরত সায়্যিদাহ ফাতিমা রা.-এর জীবন শৈশবকাল থেকেই দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে মুক্ত ছিল। একদিনের ঘটনা, হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা.-এর কোনো একজন প্রিয় লোকের বিবাহ ছিল। হযরত খাদিজা রা. বিবাহ অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য ভালো কাপড় ও অলংকারের ব্যবস্থা করলেন। যখন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় হলো, তখন ফাতিমা রা. ওই কাপড় ও অলংকার পরিধান করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তারপর সাধারণ কাপড় পরেই বিয়েতে গেলেন। মোটকথা, শৈশবকাল থেকেই দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে দূরে থাকাই তার অভ্যাস ছিল। তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রিয়ভাজন ও পরমুখাপেক্ষিতা মুক্ত ছিল তার গোটা জীবন।
কষ্টের চেয়ে দয়া বেশি
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের শুরুর দিকে একদিন আবু জাহেল ফাতিমাকে থাপ্পর মারলেন। ফাতিমা রা. কাঁদতে কাঁদতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেল। তিনি হযরত ফাতিমা রা.-কে বললেন, যাও আবু সুফিয়ানকে এ বিষয়টি জানাও। হযরত ফাতিমা রা. আবু সুফিয়ানকে পূর্ণ ঘটনা শুনাল। আবু সুফিয়ান সায়্যিদা ফাতিমা রা.-এর আঙুল ধরে সোজা আবু জাহেলের কাছে চলে গেলেন। তিনি ফাতিমা রা.-কে বললেন, যাও যেভাবে সে তোমাকে থাপ্পর দিয়েছিল, তুমিও ঠিক সেই ভাবে তাকে থাপ্পর দাও। যদি সে কিছু করে সেটা আমি দেখব।
ফাতিমা রা. আবু জাহেলকে থাপ্পর দিল, এরপর ঘরে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পূর্ণ ঘটনা শোনালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ানের জন্য দুআ করলেন। হে প্রভু, তুমি আবু সুফিয়ানের এই আচরণকে ভুলো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই দুআর প্রেক্ষিতে মক্কা বিজয়ের পর আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন।
রাসূলের কাছে ফাতিমা রা.-এর মর্যাদা
তাঁর মহত্ত্ব, মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য অনেক। নবী পরিবারের মধ্যে আরও মর্যাদাবান ব্যক্তি আছেন; কিন্তু তাদের মাঝে হযরত ফাতিমার রা. অবস্থান এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থানে। সূরা আল-আহযাবের আয়াতে তাতহীর (পবিত্রকরণের আয়াত) এর নুযূল হযরত ফাতিমার রা. বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করেন।
إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا
হে নবী-পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।³²⁶
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখলাম, তিনি আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসায়ন রা.-কে ডাকলেন এবং তাদের মাথার ওপর একখানা কাপড় ফেলে দিলেন। তারপর বললেন, হে আল্লাহ, এরা আমার পরিবারের সদস্য। তাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করুন!'³²⁷
হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আয়াত নাযিলের পর ছয়মাস পর্যন্ত ফজরের নামাযে যাওয়ার সময় ফাতিমার রা. ঘরের দরজা অতিক্রম করাকালে বলতেন, 'আস্-সালাত, ওহে নবী-পরিবার! আস-সালাত।'³²⁸
ইমাম আহমাদ রা. হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইনের রা. দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, 'তোমাদের সঙ্গে যে যুদ্ধ করে আমি তাদের জন্য যুদ্ধ, তোমাদের সাথে যে শান্তি ও সন্ধি স্থাপন করে আমি তাদের জন্য শান্তি।'³²⁹
হিজরী নবম সনে নাজরানের একটি খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আসে এবং হযরত 'ঈসা আ.-এর ব্যাপারে তারা অহেতুক বিতর্কে লিপ্ত হয়। তখন নাযিল হয় আয়াতে 'মুবাহালা'। মুবাহালার অর্থ হলো, যদি সত্য ও মিথ্যার ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ হয় এবং যুক্তিতর্কে মীমাংসা না হয়, তাহলে তারা সকলে মিলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে, যে পক্ষ এ ব্যাপারে মিথ্যাবাদী, সে যেন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এভাবে প্রার্থনা করাকে 'মুবাহালা' বলা হয়। এই মুবাহালা বিতর্ককারীরা একত্র হয়ে করতে পারে এবং গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য পরিবার-পরিজনকেও একত্র করতে পারে। মুহাবালার আয়াতটি হলো,
فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَ أَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَّعْنَتَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ
তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর যে কেউ এ বিষয়ে তোমার সাথে তর্ক করে তাকে বলো, এসো, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রগণকে, তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারীগণকে, তোমাদের নারীগণকে, আমাদের নিজদিগকে ও তোমাদের নিজদিগকে, অতঃপর আমরা বিনীত আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর দিই আল্লাহর লা'নত।³³⁰
এ আয়াত নাযিলের পর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিনিধিদলকে মুবাহালার আহ্বান জানান এবং নিজেও ফাতিমা, আলী, হসান ও হুসাইন রা.-কে সঙ্গে নিয়ে মুবাহালার জন্য প্রস্তুত হয়ে আসেন এবং বলেন: 'হে আল্লাহ, এই আমার পরিবার-পরিজন। আপনি তাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করে পবিত্র করুন।' এ কথাগুলো তিনবার বলার পর উচ্চারণ করেন: 'হে আল্লাহ আপনি আপনার দয়া ও অনুগ্রহ মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজনকে দান করুন যেমন আপনি করেছেন ইবরাহীমের পরিবার-পরিজনকে। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত।'³³¹
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন ফাতিমা রা.-কে বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমার খুশিতে খুশি হন এবং তোমার অসন্তুষ্টিতে অসন্তুষ্ট হন।'³³²
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো যুদ্ধ বা সফর থেকে ফিরতেন তখন প্রথমে মসজিদে গিয়ে দুই রাক'আত নামায আদায় করতেন। তারপর ফাতিমার ঘরে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করে বেগমদের নিকট যেতেন।³³³
বুখারী শরীফে আছে, একবার আবু জাহলের ভাই হযরত আলী রা.-কে গাওরা বিনতে আবু জাহেলকে বিবাহের প্রস্তাব দিল। তিনি কিছুটা সম্মত হলেন। সুতরাং গাওরা এর অভিভাবকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অনুমতি নেওয়ার জন্য আসল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়টি খুব অপছন্দ করলেন। তিনি মসজিদে গেলেন, মিম্বারে উঠে বললেন, বনু হিশাম ইবনে মুগীরা আলী ইবনে আবি তালিবের সঙ্গে তাদের মেয়ে বিবাহ দিতে চায়, আমার কাছে এসেছে অনুমতি নেওয়ার জন্য। আমি কখনো অনুমতি দিবো না। কখনো দেব না। তবে আলী আমার মেয়েকে তালাক দিয়ে তাকে বিবাহ করতে পারে।
ফাতিমা আমার শরীরের অংশ। যে তাকে কষ্ট দিবে, সে আমাকে কষ্ট দিবে। এরপর যায়নাবের স্বামী আবুল আস রা.-এর দিকে ইশারা করে বললেন, সে যে কথা আমাকে বলেছিল তা সে সত্যে পরিণত করে আমাকে দেখিয়েছে। আর আমি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালালকারী নই; কিন্তু আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূলের মেয়ে আর আল্লাহর দুশমনের মেয়ে একত্র হতে পারে না। হযরত আলী রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাগ দেখে আবু জাহেলের মেয়ের বিবাহের নিয়ত সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিলেন। এরপরে হযরত ফাতিমা রা.-এর জীবদ্দশায় আর কোনো বিবাহের খেয়াল পর্যন্ত মনে আসেনি।
হযরত হাসান রা. বর্ণনা করেন, এক রাতে আমার আম্মাজান নামাযের জন্য দাঁড়ালেন এবং সারারাত নামায পড়লেন। এমতাবস্থায় সকাল হয়ে গেল। আম্মাজান মুমিন পুরুষ ও নারীদের জন্য খুব দুআ করলেন; কিন্তু নিজের জন্য কোনো দুআ করলেন না। আমি বললাম, আম্মাজান! আপনি সবার জন্য দুআ করলেন কিন্তু নিজের জন্য কোনো দুআ করলেন না। হযরত ফাতিমা রা. বললেন, দুআর মধ্যে প্রথম হক হচ্ছে বাহিরের মানুষের, এরপর ঘরের মানুষের।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমা রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বলতে পার মহিলাদের সবচেয়ে ভালো গুণ কোনটি? হযরত ফাতিমা রা. বললেন, মহিলাদের সবচেয়ে ভালো গুণ হলো এই যে, সে কোনো ভিন্ন পুরুষ দেখবে না এবং ভিন্ন কোনো পুরুষও তাকে দেখবে না।
অষ্টম হিজরীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দশ হাজার জান উৎসর্গকারী সাহাবীদের সঙ্গে নিয়ে মক্কা বিজয়ের জন্য রওনা হলেন। হযরত ফাতিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় তার বিদ্যমান থাকার প্রমাণ নিম্নোক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত। উম্মে হানী বর্ণনা করেন, যখন মক্কা বিজয় হয়েছিল (এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় অবস্থান করছিলেন) একদিন ফাতিমা রা. আসলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাম দিকে বসলেন আর আমি ডান দিকে বসেছিলাম। ইতিমধ্যে একজন বাদী একটি পাত্র নিয়ে আসল যাতে পানি রাখা ছিল। বাদী ওই পাত্রটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে দিলেন। তা থেকে অল্প পানি পান করে আমাকে দিয়ে দিলেন। আমি পান করলাম। এরপর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি রোযাদার ছিলাম পানি পান করে ফেলেছি। এখন কী হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন তুমি কোনো কাযা রোযা রেখেছিলে? আমি বললাম না। তিনি বললেন নফল রোযা হয়ে থাকলে কোনো অসুবিধা নেই।
দারিদ্র্যতা নিত্য সঙ্গী
পিতৃগৃহ থেকে ফাতিমা যে স্বামীগৃহে যান সেখানে কোনো প্রাচুর্য ছিল না। বরং সেখানে যা ছিল তাকে দারিদ্রের কঠোর বাস্তবতাই বলা সঙ্গত। সে ক্ষেত্রে তার অন্য বোনদের স্বামীদের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলক অনেক ভালো ছিল। যায়নাবের বিয়ে হয় আবুল আসের রা. সাথে। তিনি মক্কার বড় ধনী ব্যক্তি আবদুল উযযা ইবনে আবদিল মুত্তালিবের দুই ছেলের সাথে। ইসলামের কারণে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর একের পর একজন করে তাদের দু'জনেরই বিয়ে হয় উসমান ইবনে আফফানের রা. সাথে। আর উসমান রা. ছিলেন একজন বিত্তবান ব্যক্তি। তাদের তুলনায় আলী রা. ছিলেন একজন নিতান্ত দরিদ্র মানুষ। তার নিজের অর্জিত সম্পদ বলে যেমন কিছু ছিল না, তেমনি উত্তরাধিকার সূত্রেও কিছু পাননি। তার পিতা মক্কার সবচেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তি ছিলেন। তবে তেমন অর্থ-বিত্তের মালিক ছিলেন না। আর সন্তান ছিল অনেক। তাই বোঝা লাঘবের জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার চাচা আব্বাস তার দুই ছেলের লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেন। এভাবে আলী রা. যুক্ত হন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিবারের সাথে।
এখানে একটি প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, আলীর রা. মতো মক্কার সম্ভ্রান্ত বংশীয় বুদ্ধিমান যুবক এত সীমাহীন দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেন কেন? এর উত্তর আলীর রা. জীবনের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাসূল হলেন। কিশোরদের মধ্যে আলী রা. প্রথম তার প্রতি ঈমান আনলেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী তখন তার বয়স দশ বছর।
আর তখন থেকে তিনি নবী মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠিন বাস্তবতা মোকাবেলা করে নবুওয়াতের দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। রাসূলের সান্নিধ্যে এসে আলী রা.-এর জীবন যেভাবে শুরু হয়, তাতে তার কোনো পেশায় জড়িত হওয়ার সুযোগই ছিল না। মদীনায় হিজরত করেন একেবারে খালি হাতে। সেখানে নতুন জায়গায় নতুনভাবে দাওয়াতী কাজে জড়িয়ে পড়েন। এর মধ্যে বদর যুদ্ধ এসে গেল। তিনি যুদ্ধে গেলেন। যুদ্ধের পর গনীমতের অংশ হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে একটি বর্ম দিলেন। এই প্রথম তিনি একটি সম্পদের মালিক হলেন!
ফাতিমা রা. আঠারো বছরে স্বামী-গৃহে যান। সেখানে যে বিত্ত-বৈভবের কিছু মাত্র চিহ্ন ছিল না, সে কথা সব ঐতিহাসিকই বলেছেন। সেই ঘরে গিয়ে পেলেন খেজুর গাছের ছাল ভর্তি চামড়ার বালিশ, বিছানা, একজোড়া জাঁতা, দুটি মশক, দুটি পানির পাত্র, আর আতর-সুগন্ধি। স্বামী দারিদ্র্যের কারণে ঘরের কাজ-কর্মে তাকে সহায়তা করার জন্য অথবা অপেক্ষাকৃত কঠিন কাজগুলো করার জন্য কোনো দাস-দাসী দিতে পারেননি। ফাতিমা রা. একাই সব ধরনের কাজ করতেন। জাঁতা ঘুরাতে ঘুরাতে তার হাতে কড়া পড়ে যায়, মশক ভর্তি পানি টানতে টানতে কোমড়ে দাগ হয়ে যায় এবং ঘর-বাড়ি ঝাড়ু দিতে দিতে পরিহিত কাপড়-চোপড় ময়লা হয়ে যেত।³³⁴
তাঁর এভাবে কাজ করা আলী রা. মেনে নিতে পারতেন না; কিন্তু তার করারও কিছু ছিল না। যতটুকু পারতেন নিজে তার কাজে সাহায্য করতেন। তিনি সব সময় ফাতিমার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। কারণ, মক্কী জীবনে নানারূপ প্রতিকূল অবস্থায় তিনি যে অপুষ্টির শিকার হন তাতে বেশ ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে পড়েন। ঘরে-বাইর এভাবে দু'জনে কাজ করতে করতে তারা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। একদিন আলী রা. তার মা ফাতিমা বিনতে আসাদ ইবনে হাশিমকে বলেন, তুমি পানি আনা ও বাইরের অন্যান্য কাজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়েকে সাহায্য কর, আর ফাতিমা তোমাকে বাড়িতে গম পেষা ও রুটি বানাতে সাহায্য করবে।
এ সময় ফাতিমার পিতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও যুদ্ধবন্দীসহ বিজয়ীর বেশে একটি যুদ্ধ থেকে মদীনায় ফিরলেন। আলী রা. একদিন বললেন, ফাতিমা, তোমার এমন কষ্ট দেখে আমার বড় দুঃখ হয়। আল্লাহ তাআলা বেশ কিছু যুদ্ধবন্দী দিয়েছেন। তুমি যদি তোমার পিতার কাছে গিয়ে তোমার সেবার জন্য যুদ্ধবন্দী একটি দাসের জন্য আবেদন জানাতে! ফাতিমা ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় হাতের জাঁতা পাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে বলেন, আমি যাব ইনশাআল্লাহ। তারপর বাড়ির আঙিনায় একটু বিশ্রাম নিয়ে চাদর দিয়ে গা-মাথা ঢেকে ধীর পায়ে পিতৃগৃহের দিকে গেলেন। পিতা তাকে দেখে কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, মেয়ে! কেন এসেছ? ফাতিমা বললেন, আপনাকে সালাম করতে এসেছি। তিনি লজ্জায় পিতাকে মনের কথাটি বলতে পারলেন না। বাড়ি ফিরে এলেন এবং স্বামীকে সে কথা বললেন। আলী রা. এবার ফাতিমাকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গেলেন। ফাতিমা পিতার সামনে লজ্জায় মুখ নীচু করে নিজের প্রয়োজনের কথাটি এবার বলে ফেলেন। পিতা তাকে বলেন, আল্লাহর কসম! তোমাদেরকে আমি একটি দাসও দেব না। আহলে সুফফার লোকেরা না খেয়ে নিদারুণ কষ্টে আছে। তাদের জন্য আমি কিছুই করতে পারছি না। এগুলো বিক্রি করে সেই অর্থ আমি তাদের জন্য খরচ করব।
একথা শোনার পর তারা স্বামী-স্ত্রী দু-জন পিতাকে ধন্যবাদ দিয়ে ঘরে ফিরে আসেন। তাদেরকে এভাবে খালি হাতে ফেরত দিয়ে স্নেহশীল পিতা যে পরম শান্তিতে থাকতে পেরেছিলেন তা কিন্তু নয়। সারাটি দিন কর্মক্লান্ত আদরের মেয়েটির চেহারা তার মনের মধ্যে ভাসতে থাকে।
সন্ধা হলো। ঠান্ডাও ছিল প্রচণ্ড। আলী-ফাতিমা শক্ত বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন; কিন্তু এত ঠান্ডায় কি ঘুম আসে? এমন সময় দরজায় করাঘাতের শব্দ। দরজা খুলতেই তারা দেখতে পান পিতা মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে। তিনি দেখতে পান, এই প্রবল শীতে মেয়ে-জামাই যে কম্বলটি গায়ে দিয়ে ঘুমানোর চেষ্ট করছে তা এত ছোট যে দু-জন কোনো রকম গুটিশুঁটি মেরে থাকা যায়। মাথার দিকে টানলে পায়ের দিকে বেরিয়ে যায়। আবার পায়র দিকে সরিয়ে দিলে মাথার দিক আলগা হয়ে যায়। তারা এই মহান অতিথিকে স্বাগতম জানানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি তাদেরকে ব্যস্ত না হয়ে যে অবস্থায় আছে সেভাবে থাকতে বলেন। তিনি তাদের অবস্থা হৃদয় দিয়ে গভীরভাবে উলব্ধি করেন, তারপর কোমল সুরে বলেন: তোমরা আমার কাছে যা চেয়েছিলে তার চেয়ে ভালো কিছু কি আমি তোমাদেরকে বলে দেব?
তাঁর দু-জনই এক সাথে বলে উঠলেন, 'বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ,' তিনি বললেন, জিবরাঈল আমাকে এই কথাগুলো শিখিয়েছেন : প্রত্যেক নামাযের পরে তোমরা দু-জন দশবার সুবহানাল্লাহ, দশবার আলহামদু লিল্লাহ ও দশবার আল্লাহু আকবর পাঠ করবে। আর রাতে যখন বিছানায় ঘুমোতে যাবে, তখন সুবহানাল্লাহ তেত্রিশবার, আলহামদুলিল্লাহ তেত্রিশবার, আল্লাহু আকবর চৌত্রিশবার পাঠ করবে। একথা বলে তিনি মেয়ে-জামাইকে রেখে দ্রুত চলে যান।³³⁵
এ ঘটনার কয়েক দশক পরেও হযরত আলী রা.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো এই কথাগুলো আলোচনা করতে শোনা গেছে। তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের এই কথাগুলো শেখানোর পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি একদিনও তা বাদ দিইনি। একবার একজন ইরাকী প্রশ্ন করেন: সিফফীন যুদ্ধের সেই ঘোরতর রাতেও না? তিনি খুব জোর দিয়ে বলেন: সিফফীনের সেই রাতেও না।³³⁶
দারিদ্র্য ও অভাব অনটনের অবস্থা এই ছিল যে, সায়্যিদা হযরত ফাতিমা রা.- এর শরীরে অনেক সময় পোশাক থাকত না। তিনি একবার অসুস্থ হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন সাহাবীসহ তার শুশ্রূষার জন্য গেলেন। দরজায় গিয়ে সালাম করলেন। ভিতরে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। হযরত ফাতিমা রা. মারহাবা বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন আছে, তারাও কি আসবে? তিনি জবাব দিলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই মুহূর্তে আমার পরনে একটি ছোট জামা—যা দ্বারা আমার শরীর ঠিকমতো ঢাকা যাচ্ছে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের চাদর তাকে দিয়ে বললেন, চাদর দিয়ে পর্দা করে নাও। এবারে হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামসহ ঘরে গেলেন। ফাতিমা রা. বললেন, অসুস্থতার কষ্ট ছাড়াও আরও কঠিন পরীক্ষা এই যে, ঘরে খাওয়ার কোনো কিছু নেই। যা দ্বারা আপনাদের খেদমত করতে পারি। জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এতে কি তুমি খুশি নও যে, তুমি বেহেশতে সকল নারীদের সরদার হবে।³³⁷
হে আবু তুরাব, ওঠো
একদিন হযরত আলী রা. হযরত ফাতিমা রা.-এর কাছে এলেন। পরবর্তী সময়ে রাগান্বিত অবস্থায় বের হয়ে গেলেন এবং মসজিদে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমা রা.-এর ঘরে এলেন, কিন্তু আলী রা.-কে ঘরে পেলেন না। তিনি ফাতিমা রা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার চাচাতো ভাই কোথায়?' তিনি বললেন, 'আমার ও তাঁর মধ্যে কিছু ঘটেছে। তিনি আমার সাথে রাগ করে বাইরে চলে গেছেন। আমার কাছে দুপুরের বিশ্রামও করেননি।' তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যাক্তিকে বললেন, 'দেখ তো সে কোথায়?' সে ব্যাক্তি খোঁজে এসে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, তিনি মসজিদে শুয়ে আছেন।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এলেন, তখন আলী রা. কাত হয়ে শুয়ে ছিলেন। তাঁর শরীরের এক পাশের চাঁদর পড়ে গিয়েছে এবং তাঁর শরীরে মাটি লেগেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর শরীরের মাটি ঝেড়ে দিতে দিতে বললেন: উঠ, হে আবু তুরাব! উঠ, হে আবু তুরাব!³³⁸
ক্রন্দনরত ফাতিমা মুচকি হাসলেন
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যখন إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ এই সূরা নাযিল হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমাকে ডেকে বললেন: 'আমাকে আমার মৃত্যুর (নিকটবর্তীতার) কথা জানানো হয়েছে।' এ কথা শুনে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'কেঁদো না, আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সাথে আগে মিলিত হবে।' একথা শুনে তিনি হাসতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কয়েকজন স্ত্রী এ ঘটনা দেখে বললেন, 'হে ফাতিমা, একবার তোমাকে আমরা কাঁদতে দেখলাম, এরপরই আবার হাসতে দেখলাম (ব্যাপারটা কী)?' তখন ফাতিমা রা. বললেন, 'তিনি আমাকে বললেন যে, তাঁকে তাঁর মৃত্যুর (নিকটবর্তীতার) খবর জানানো হয়েছে, তা শুনে আমি কাঁদতে লাগলাম। এরপর তিনি আমাকে বললেন, 'কেঁদো না; কেননা, তুমিই সর্বপ্রথম আমার পরিবারের মধ্য হতে আমার সাথে মিলিত হবে।' তখন আমি হাসলাম।³³⁹
অতুলনীয় দৃষ্টান্ত
একবার হযরত আলী রা. ও ফাতিমা রা. উভয়ে সারাদিন ক্ষুধার্ত ছিলেন। সন্ধ্যাবেলা এক ব্যবসায়ী উট আসে। উটের সামানাপত্র নামানোর জন্য তার একজন শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। হযরত আলী রা. এ কাজের জন্য নিজেকে নিজে পেশ করলেন। দীর্ঘ রাত পর্যন্ত তার উটের সামানাদি নামালেন। ব্যবসায়ী এক দিরহাম পারিশ্রমিক দিল। অনেক রাত হওয়ার কারণে খাবার-দাবারের দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একটি দোকান খোলা ছিল। হযরত আলী রা. ভাবলেন, এখান থেকে যা পাই নিয়ে যাই। শেরে খোদা আলী রা. এক দিরহামের কিছু নিয়ে ঘরে এলেন। আর হযরত ফাতিমা রা. অনেক্ষণ যাবত রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। স্বামীকে আসতে দেখে খুশিতে বাগ বাগ হয়ে যান। তিনি আসার পর এটাকে পিষে খামিরা বানালেন। আগুন জ্বালালেন। রুটি বানিয়ে আলী রা. এর সামনে রাখলেন। তিনি খাওয়ার পর ফাতিমা নিজে খাওয়ার জন্য বসেন। হযরত আলী রা. বলেন, আমার এতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের সরদারের কথা স্মরণ হচ্ছিল যে, ফাতিমা দুনিয়ার উত্তম মহিলাদের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।
একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে খাবারের কিছুই ছিল না। মহিলাদের সরদার হযরত ফাতিমা রা. এর ঘরেরও একই অবস্থা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঝুঁপড়ি থেকে বাহিরে বের হন। রাস্তায় হযরত আবু বকর সিদ্দিক ও হযরত উমর ফারুক রা.-এর সঙ্গে দেখা হলো। ঘটনাক্রমে তারাও সেদিন ক্ষুধার্ত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উভয়কে নিয়ে হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা.-এর বাড়িতে যান। সে সময় তিনি নিজ খেজুরের বাগানে গিয়েছিলেন। ঘরে খাবারের কিছুই ছিল না। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা.-এর স্ত্রী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বাগত জানান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'আবু আইয়ুব কোথায়?'
হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর বাগান ঘরের একদম নিকটেই ছিল। তিনি রহমতে আলমের আওয়াজ শুনে খেজুরের একটি আঁটি পেরে অস্থির হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ঘরে আসেন। আঁটিটা মেহমানের খেদমতে পেশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে একটি বকরীও যবাই করে দেন। অর্ধেক দিয়ে তরকারি আর বাকী অর্ধেক দিয়ে কাবাব বানিয়ে খাবার হুজুরের সামনে রাখেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি রুটিতে কিছু গোশত রেখে বলেন, 'এটা ফাতিমাকে পাঠিয়ে দাও। সে কয়েকদিন যাবত ক্ষুধার্ত।'
হযরত আবু আইয়ুব আনসারী হুকুম পালন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথীদের নিয়ে খানা খেলেন। এ লৌকিকতাপূর্ণ খাবার খেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাঁদতে শুরু করেন আর বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেছেন, কেয়ামতের দিন বান্দাকে দুনিয়ার নেয়ামতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।' (অর্থাৎ, এ নেয়ামতের হক তোমরা কীভাবে আদায় করবে।)
একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমার ঘরে যান। তিনি দেখলেন, মহিলাদের সরদার উটের চামড়া পরিধান করে আছে। তাতে রয়েছে আবার তেরটি পট্টি ও দুর্গন্ধ। তবে মুখে ছিল আল্লাহর যিকির। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দৃশ্য দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে যান। আর বলেন, 'ফাতিমা দুনিয়ার কষ্টে ধৈর্যধারণ করো, আর আখেরাতের চিরস্থায়ী আনন্দের অপেক্ষা করো। আল্লাহ তাআলা তোমাকে উত্তম বদলা দেবেন।'
আলী রা. বলেন, একবার আমাদের ওপর দিয়ে কয়েকদিন এভাবে কেটেছে যে, আমাদের কাছেও খাবারের কিছু ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছেও কিছু ছিল না। সে সময় একদিন আমি কোথাও যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে দেখলাম, এক দিনার পরে আছে। কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম, এটা তুলবো, না তুলবো না। শেষমেষ আমি তা তুলে নিলাম। কারণ, কঠিন বিপদে (দারিদ্রতায়) ছিলাম। এটা নিয়ে দোকানীর কাছে গেলাম। তার থেকে আটা ক্রয় করে ফাতিমার নিকট নিয়ে গেলাম। তাকে বললাম, এটাকে খামিরা বানিয়ে রুটি পাকাও। সে আটা পিষতে শুরু করেছে। তখন ক্ষুধার কারণে তার দুর্বলতার এ অবস্থা হয়েছিল যে, কোমর বেঁকে যায় এবং তার কপালের চুল মোমের আগুন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মোটকথা, সে তড়িঘড়ি করে আটা পিষে রুটি তৈরি করল। অতঃপর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে এ ঘটনা আরয করলাম। তিনি বলেন, 'এটা খেয়ে নাও। আল্লাহ তাআলা তোমাকে এ রিযিক দিয়েছেন।'
ক্ষুধা থেকে মুক্তি
ইমরান ইবনে হোসাইন রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, আমি একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে ছিলাম। সামনের দিক থেকে হযরত ফাতিমা এসে সোজা রাসূলের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। রাসূল বলেন, হে ফাতিমা, কাছে আস। তিনি একটু সামনে আসলেন। রাসূল পুনরায় বলেন, হে ফাতিমা, কাছে আস। তিনি আরেকটু এগিয়ে এসে একেবারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার মুখে তখন হলদে বর্ণের ছাঁপ দেখা যাচ্ছিল। রক্ত একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের আঙুল ছড়িয়ে নিজের তালু হযরত ফাতিমার বুকের ওপর রাখলেন এবং মাথা উঠিয়ে বলেন, 'হে আমার আল্লাহ, ক্ষুধার্তকে পরিতৃপ্তকারী, প্রয়োজন পূর্ণকারী এবং অপদস্তকে মর্যাদানকারী, মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাকে ক্ষুধার্ত রেখ না।'
আমি দেখলাম, ক্ষুধার কারণে হযরত ফাতিমার চেহারায় যে হলদে বর্ণ ছিল তা আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে এবং লালচে দেখা যাচ্ছে। এ ঘটনার কয়েকদিন পর আমি হযরত ফাতিমাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেন, হে ইমরান, এর পর আমার আর কখনো ক্ষুধায় কষ্ট হয়নি।
একবার ফাতিমা রা. এর জ্বর এলো। রাত্রটা খুব অস্থিরতা ও কষ্টে কেটেছে। আলী রা. এর বর্ণনা, আমিও তার সঙ্গে জাগ্রত ছিলাম। শেষ রাতে আমাদের দুজনেরই চোখ লেগে যায়। ফজরের আযান শুনে জাগ্রত হলাম। দেখলাম যে, ফাতিমা ওযু করছে। আমি মসজিদে গিয়ে নামায পড়লাম। ফিরে আসলাম। দেখলাম, ফাতিমা নিয়ম অনুযায়ী চাক্কি ঘুরাচ্ছে।
আমি বললাম, 'ফাতিমা, তোমার কি নিজের ওপর দয়া হয় না। সারারাত জ্বরে কাটিয়েছ। সকালে উঠে ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু করলে। এখন আবার চাক্কি পিষছ। আল্লাহ না করুন, যদি অসুস্থতা বেড়ে যায়।'
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো সাহাবীকে দাফন করে আসছিলেন। রাস্তায় ফাতিমার সঙ্গে দেখা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'মেয়ে, কোথায় গিয়েছিলে এবং ঘর থেকে কেন বের হয়েছ?' হযরত ফাতিমা বলেন, 'প্রতিবেশীর ঘরে মৃত্যু হয়েছে। সেখানে সমবেদনার জন্য গিয়েছিলাম।³⁴⁰
আলী রা. বলেন, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ে ফাতিমাকে বিবাহ করি। দারিদ্র্যতার কারণে অবস্থা এমন ছিল যে, আমাদের নিকট ভেড়ার চামড়া ছাড়া আর কোনো বিছানা ছিল না। যাতে আমরা রাতে শয়ন করতাম। আর দিনের বেলা পানি পানকারী উটকে ঘাস খাওয়াতাম। আমার কাছে ফাতিমা ছাড়া আর কোনো খাদেম ছিল না।³⁴¹
আমলের আগ্রহ
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমার ঘরে তাশরীফ আনলেন। তার পেছনে পেছনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রা. নামক একজন দৃষ্টিহীন সাহাবীও ভেতরে চলে আসে। তাকে দেখে হযরত ফাতিমা রা. দৌড়ে ঝুপড়িতে গিয়ে আড়াল হন। সে চলে যাওয়ার পর হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, বেটি! তুমি কেন লুকিয়ে পড়েছিল? উম্মে মাকতুম তো অন্ধ। হযরত ফাতিমা রা. উত্তর দেন, আব্বাজান, যদিও সে অন্ধ কিন্তু আমি তো অন্ধ নই। অনর্থকই গায়রে মাহরামের সঙ্গে দেখা করব?
ফাতিমা রা. সুন্নতের প্রতি এতটাই অনুরাগিণী ছিলেন যে, কখনো কখনো স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই যখন নিজের পূর্বের কোনো -আমল অথবা হুকুম অথবা ইরশাদ (আল্লাহর নির্দেশ) পরিবর্তন করতেন, তখন তিনি সে সুন্নাত সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবহিত করতেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো এ কথা অমুক সময় এমন বলেছেন। এখন কেন এমন করছেন। এটা কেন? অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটি জেনেশুনেই করতেন। কেননা, যখন কোনো উপকারের প্রতি লক্ষ্য করে আল্লাহর নির্দেশে প্রথম হুকুম রহিত হয়ে যেত, তখন তিনি আল্লাহর নির্দেশেই আবার নতুন মাসআলা বর্ণনা করতেন। কখনো জায়েযের জন্য করতেন-এটাও ঠিক। সেটাও ঠিক।
প্রিয় সন্তানেরা
একবার হযরত আলী রা. ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন যে, তাদের দুই শিশু সন্তান (হাসান ও হুসাইন) কান্নাকাটি করছে। হযরত ফাতিমা রা.-এর কাছে তাদের কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন? হযরত ফাতিমা রা. বললেন, 'বাচ্চারা ক্ষুধার তাড়নায় কাঁদছে।' ঘরে খাবার নেই-এই কথা শুনে হযরত আলী রা. বাইরে বের হলেন। কিছুক্ষণ পর দিনার নিয়ে আসলেন। হযরত ফাতিমা রা.-কে বললেন, 'আমি একটি দিনার নিয়ে এসেছি।' ফাতিমা রা. বললেন, 'দিনার নিয়ে অমুক ইহুদীর দোকান থেকে আটা ক্রয় করে নিয়ে আসেন।' হযরত আলী রা. ইহুদীর দোকানে আটা কিনতে গেলেন। দোকানদার যদিও ইহুদী ছিল, তবুও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে সুধারণা ছিল। দোকানদার জিজ্ঞাস করল, 'আপনি তো ওই লোকের জামাতা-যিনি নিজেকে নবী দাবি করেন?' হযরত আলী রা. বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছ।' দোকানদার বলল, 'আপনি আটা নিয়ে যান, দিনারও নিয়ে যান।' হযরত আলী রা. দিনার দেওয়ার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করার পরও সে নিল না।
হযরত আলী রা. আটা নিয়ে এসে হযরত ফাতিমা রা.-কে বললেন, 'ইহুদী বিনামূল্যে আটা দিয়েছে।' হযরত ফাতিমা রা. বললেন, 'এবার বাজারে গিয়ে এক দিরহাম দিয়ে গোশত নিয়ে আসেন।' হযরত আলী রা. গোশত নিয়ে আসেন। হযরত ফাতিমা রা. খানা রান্না করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও দাওয়াত দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসার পর ফাতিমা রা. তাকে আটা ও গোশত সম্পর্কে বিস্তারিত ঘটনা জানালেন। এখানে উদ্দেশ্য ছিল, যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দেন তাহলে তারা তা খাবেন, অন্যথায় নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিলেন এবং বললেন, ‘বিসমিল্লাহ বলে খেয়ে নাও।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও খেলেন।³⁴²
হযরত হাসান রা. ১৫ই রমজান ৩য় হিজরীতে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম রাখলেন হাসান। সপ্তম তারীখে তার আকীকা করলেন। মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজন পরিমাণ রূপা সাদাকা করার জন্য বললেন।³⁴³
হযরত হাসান রা.-এর জন্মের পূর্বে উম্মুল ফযল রা. একটি স্বপ্ন দেখলেন। এতে হযরত হাসান রা.-এর জন্মের শুভ সংবাদের ইশারা ছিল। স্বপ্ন দেখে হযরত উম্মুল ফযল রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির হয়ে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার ঘরে আপনার শরীরের একটি টুকরা!’ এটা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তুমি একটি ভালো স্বপ্ন দেখেছ। ফাতিমার ঘরে একজন ছেলে সন্তান হবে। আর তুমি (তোমার ছেলে) কাসাম-এর দুধের অংশ তাকে পান করাবে।’ ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী হযরত ফাতিমা রা. একজন ছেলে সন্তান (হাসান রা.) প্রসব করলেন। আর উম্মুল ফযল রা. তার ছেলে কাসাম-এর দুধ তাকে পান করালেন।³⁴⁴
একদা হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমা রা.-এর ঘরে গেলেন। হযরত ফাতিমা রা. ও হযরত আলী রা. শুয়ে ছিলেন। হযরত হাসান রা. ক্ষুধার কারণে কাঁদছিলেন এবং খাবার চাচ্ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে জাগানো উপযোগী মনে না করে একটি বকরীর দুধ দোহন করে হযরত হাসান রা.-কে নিজের হাতে পান করালেন। হযরত হাসান রা. পরিতৃপ্ত হয়ে পান করলেন। ফলে তার ক্ষুধা দূর হয়ে গেল।³⁴⁵
হযরত হুসাইন রা. ৫ই শাবান ৪র্থ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া) তাকে একটি কাপড় আবৃত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে আনা হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দিলেন। এরপর মিষ্টিজাতীয় বস্তু চিবিয়ে তার মুখে দিলেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পবিত্র থুথু তার মুখে দিয়ে তার জন্য দুআ করলেন। তাকে খালুকের সুগন্ধি দিয়ে হযরত ফাতিমা রা.-এর কাছে দিয়ে দিলেন। পরবর্তী সময়ে শিশু হযরত হুসাইন রা. এর মাথা মুণ্ডন করা হলো এবং তার ওজন পরিমাণ রূপা দান করা হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম রাখলেন হুসাইন। হযরত হুসাইন রা.-এর আকীকায় দুটি দুম্বা জবেহ করা হলো। একটির রান ধাত্রিকে দেওয়া হলো। পরবর্তী সময়ে তার খৎনা করা হলো।³⁴⁶
হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেউ জিজ্ঞেস করল আপনার পরিবার-পরিজনের মধ্যে কাকে বেশি মহব্বত করেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হাসান-হুসাইনকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝে মধ্যে বলতেন, আমার বাচ্চাদেরকে নিয়ে আসো। যখন হযরত হাসান- হুসাইনকে নিয়ে আসতেন তখন তিনি তাদেরকে স্নেহ করতেন এবং বুকের সঙ্গে লাগাতেন।³⁴⁷
জান্নাতী নারীদের সর্দার
হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান বর্ণনা করেন, একবার আমি আমার মাতার কাছে আরয করলাম, আপনি আমাকে অনুমতি দিন-আমি আজ রাসূলের সঙ্গে মাগরীবের নামায পড়ব এবং রাসূলের কাছে আরজ করব, তিনি যেন আপনার আমার জন্য মাগফিরাতের দুআ করেন। আমার মাতা আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি রাসূলের খেদমতে এলাম এবং মাগরীবের নামায পড়লাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাগরীবের পর নফল পড়তে পড়তে ঈশা হয়ে গেল। ঈশার নাময পড়ে যখন ঘরের দিকে রওনা হলেন আমি তার পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে? হুযাইফা নাকি? আমি বললাম, জি, হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার কি প্রয়োজন? আল্লাহ তোমাকে ও তোমার মাতাকে মাফ করে দিন। একজন ফেরেশতা—যিনি ইতোপূর্বে দুনিয়াতে আসেননি—এসে সালাম দিয়ে এই সুসংবাদ দিলেন, ফাতিমা রা. জান্নাতী নারীদের নেত্রী এবং হাসান-হুসাইন জান্নাতী যুবকদের নেতা।'³⁴⁸
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পারলেন যে, হযরত আলী ও হযরত ফাতিমা রা. অসন্তুষ্ট। তিনি দ্রুত তাদের ঘরে গেলেন এবং পরস্পর সমঝতা করালেন। যখন তিনি বাহিরে বের হলেন, তখন লোকেরা জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার? আপনি যখন ফাতিমার ঘরে গেলেন তখন আপনার চেহারায় মলিনতা ছিল। যখন বের হলেন তখন আপনার চেহারায় খুশি দেখা যাচ্ছে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমাদের জানা নেই যে, আমি এমন দুজনের মধ্যে সমঝতা করেছি যারা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।'³⁴⁹
একবার ফাতিমা রা. চাক্কী (যা দারা আটা পেষা হয়) দ্বারা আটা পিষছিলেন। তখন তার হাতে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। শরীর ঘেমে ভিজে গিয়েছিল। তিনি হাঁফাতে লাগলেন। এমতাবস্থায় পাশে একটি করুণ আওয়ায শুনতে পেয়ে চাক্কী বন্ধ করে ওই বাড়িতে চলে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, একজন প্রসব ব্যথায় কাতরাচ্ছে। সে জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। গৃহবাসী চিন্তিত ও পেরেশান কী করবে, কাকে ডাকবে। হযরত ফাতিমা রা. তাদেরকে সান্ত্বনা দিলেন এবং মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিরাপদে বাচ্চা হয়ে গেল। তিনি ঘরে ফিরে এলেন এবং এত আনন্দিত হলেন যেন উভয় জাহানের ধনভাণ্ডার পেয়ে গেছেন!³⁵⁰
একবার হযরত ফাতিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দরিদ্রতার অভিযোগ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সময় নামাযে বসা ছিলেন। তিনি বললেন, ফাতিমা, তুমি আমার কাছে আস। যখন তিনি কাছে আসলেন তখন বললেন, তুমি যদি দুনিয়া চাও তাহলে আমি তোমাকে তা আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে দেব; কিন্তু জেনে রেখো, তুমি আল্লাহ থেকে গাফেল হয়ে যাবে। আর পরকাল থেকে হবে বঞ্চিত। তুমি যা নিতে চাও, যেই পরিমাণ নিতে চাও, নিয়ে নাও। কোনো বাধা নেই; কিন্তু জেনে রেখো, পরকালে তুমি কিছুই পাবে না। এটা শুনে ফাতিমা রা. সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন এবং তাওবা ইস্তিগফার করতে লাগলেন।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে কিছু গোলাম আসল। এবারও হযরত আলী রা. হযরত ফাতিমা রা.-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পাঠালেন যেন কাম-কাজের জন্য একজন বাদী নিয়ে যায়। হযরত ফাতিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, আব্বাজান আমার একজন বাদী প্রয়োজন। এটা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে ফাতিমা, তুমি কি বলছ, আমি তো এখনো আহলে সুফফার হক আদায় করতে পারিনি এবং তাদের খেদমত থেকে এখনো অবসর হতে পারিনি। এছাড়াও অনেক ইয়াতীম মিসকিন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তোমাকে বাদী দিই কীভাবে? যাও আল্লাহর জিকির করো, ইবাদতে মনোনিবেশ করো, দুনিয়ার সঙ্গে মন লাগিয়ো না। দুনিয়ার সব কিছুকে অপছন্দ করো।³⁵¹
একবার হযরত ফাতিমা রা. অসুস্থ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'কেমন আছ, মেয়ে?' ফাতিমা রা. কিছু অভাব-অনটনের অভিযোগ করলে তিনি বললেন, 'মেয়ে! তুমি বিশ্বের সকল নারীর নেত্রী হও এতে কি সন্তুষ্ট নও?' ফাতিমা রা. বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, তাহলে মারইয়াম বিনতে ইমরানের অবস্থান কোথায়?' জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তিনি ছিলেন তার সময়ের নারীদের নেত্রী, আর তুমি হবে তোমার সময়ের নারীদের নেত্রী। আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতের একজন নেতার সাথে বিয়ে দিয়েছি।' হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেছেন, 'জান্নাতের অধিবাসী নারীদের নেত্রী হলেন ক্রমানুসারে মারইয়াম, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, খাদীজা ও ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া।³⁵²
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটিতে চারটি রেখা টানলেন, তারপর বললেন, তোমরা কি জান এটা কি? সবাই বলল, আল্লাহর ও তাঁর রাসূলই সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালো জানেন। তিনি বললেন, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ, মারইয়াম বিনতে 'ইমরান ও আসিয়া বিনতে মুযাহিম (ফিরআউনের স্ত্রী) –জান্নাতের নারীদের ওপর তাদের রয়েছে এক বিশেষ মর্যাদা।
হযরত ফাতিমা রা. ব্যক্তিত্বের প্রতি যে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে তা রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই হাদীসে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-'পৃথিবীর নারীদের মধ্যে তোমার অনুসরণের জন্য মারইয়াম, খাদীজা, ফাতিমা ও ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া যথেষ্ট।'³⁵³
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে বেশি স্নেহের ও প্রিয় পাত্রী ছিলেন ফাতিমা রা.। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার সবচেয়ে বেশি প্রিয় মানুষটি কে? বললেন, ফাতিমা।³⁵⁴ নারীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিলেন ফাতিমা রা. এবং পুরুষদের মধ্যে আলী রা.।³⁵⁵
রাসূলের অন্তিম শয্যায়
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১২ই রবিউল আউয়াল ১১ হিজরীতে সোমবার দিন ইন্তেকাল করেন। হযরত ফাতিমা রা.-এর জন্য যদিও তা অসহনীয় ছিল তারপরও তিনি ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসিয়তের ওপর আমল করলেন। শোকে অধীর হয়ে বললেন, আমার পিতা রবের দাওয়াতে সাড়া দিলেন। আল্লাহ তাকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন। হে আমার পিতা, আপনার ঠিকানা জান্নাত হোক। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
হযরত ফাতিমাতুয যাহরা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের সময় কিছু কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। তার কবিতা নিম্নরূপ,
يا خاتم الرسول المبارك صلوة صلى عليك منزل القرآن
হে বরকতময় আখেরী নবী, কুরআন অবতীর্ণকারী আপনার ওপর দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
অন্য আরেকটি কবিতা হলো এই,
انا فقد ناك فقد الارض وابلها - وغاب من غبت عنا الوحي والكتب
আমরা আপনর থেকে এইভাবে বঞ্চিত হয়েছি যেভাবে যমীন বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। যখন আপনা ইন্তেকাল হয়েছে তখন থেকে ওহী আসা, কিতাব অবতীর্ণ হওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
ফাতিমা রা.-এর কবিতা দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে শেষ নবী—এর শক্তিশালী প্রমাণ মেলে। একথা খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, তার পর নবুয়তের ধারা বন্ধ। হাকীকী, গায়রে হাকীকী ও জিল্লা ইত্যাদি সব ধরনের নবুওয়াত বন্ধ। যে ব্যক্তি পরে কোনো প্রকার নবী দাবি করবে সে মিথ্যাবাদী। ইসলাম থেকে বঞ্চিত।
একবার হযরত আলী রা. ঘাসের গাট্টি মাথায় নিয়ে ঘরে আসলেন। ফাতিমাকে বললেন, 'গাট্টিটা নামাতে আমাকে একটু সাহায্য করো।' তখন তিনি কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন বিধায় আসতে একটু দেরি হলো। হযরত আলী রা. গাট্টি মাটিতে ফেলে দিয়ে বলেন, 'আমি জানি, তুমি ঘাসের গাট্টি হাতে ধরতে অপমানবোধ করো।'
হযরত ফাতিমা রা. ক্ষমাপ্রার্থনা করে বললেন, 'কক্ষনো না। কাজে ব্যস্ত থাকার ফলে তাড়াতাড়ি আসতে পারিনি। নতুবা যে কাজ আমার আব্বাজান আল্লাহর রাসূল হওয়ার পরও নিজের মোবারক হাত দিয়ে করেছেন, তা করতে আমি কেন অপমান বোধ করব?'
হযরত আলী রা. তার উত্তর শুনে মুচকি হেসে ঘরের ভেতরে চলে যান। এ রকমই ছিল হযরত ফাতিমা রা.-এর গুণাবলী ও স্বভাব! তার মৃত্যুর পর যখনই কেউ আলী রা.-কে জিজ্ঞাসা করত, 'আপনার সঙ্গে ফাতিমা রা.-এর আচরণ কেমন ছিল?' তখনি তিনি অশ্রুসজল হয়ে যেতেন। আর বলতেন, ‘সে এমন এক সুন্দর ফুলের মতো ছিল যে সর্বদাই ঘ্রাণ ছড়াত। সে মরে যাওয়ার পরেও হৃদয় মনকে এখনো সুবাসিত করে। সে তার জীবদ্দশায় আমাকে কখনো কোনো বিষয়ে অভিযোগ করার সুযোগ দেয়নি।’
মহান প্রভুর সান্নিধ্যে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন কেউ কোনো দিন তাকে হাসতে দেখেনি; এমনকি মুচকি হাসিও না। হযরত ফাতিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালে শোকে অধীর হয়ে গিয়েছিলেন; কিন্তু তারপরেও মৃত্যু-দিবস পালন করেননি, শরীয়ত-পরিপন্থী কোনো কাজ করেননি।³⁵⁶
হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুমূর্ষু অবস্থায় নিজ কন্যা ফাতিমা রা.-কে ডেকে কানে কানে কিছু কথা বললেন, আর তিনি কাঁদতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় তাকে ডেকে কানে কানে কিছু কথা বললেন, আর তিনি হাসতে লাগলেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে আমাকে বললেন, এই অসুস্থতায় তার ইন্তেকাল হয়ে যাবে। তো আমি কাঁদতে লাগলাম। পরে তিনি আমাকে বললেন যে, আমি তার খান্দানের মধ্য থেকে প্রথম তার সঙ্গে গিয়ে মিলব। তো আমি হাসতে লাগলাম।
ইবনে সাআদ বলেন, যেমন হাদীস হযরত উম্মে সালমা বর্ণনা করেছেন আমি এমন হাদীস ফাতিমা রা. থেকেও বর্ণনা করেছি। আর এতে আছে, হযরত উম্মে সালমা রা. তাকে প্রথমে কাঁদা এবং পরে হাসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে আমাকে বললেন, খুব শীঘ্রই তার ইন্তেকাল হয়ে যাবে। পরে আবার বললেন, আমি মারইয়াম বিনতে ইমরান আ.-এর পর থেকে জান্নাতের মহিলাদের সরদার হব তো আমি হাসতে লাগলাম।³⁵⁷
হযরত ফাতিমার রা. অপর তিন বোন যেমন তাদের যৌবনে ইন্তেকাল করেন তেমনি তিনিও হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের আট মাস, মতান্তরে সত্তর দিন পর ইহলোক ত্যাগ করেন। অনেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের দুই অথবা চার মাস অথবা আট মাস পরে তার ইন্তেকালের কথাও বলেছেন। তবে এটাই সঠিক যে, হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পর তিনি ইন্তেকাল করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী-'আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই প্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে-সত্যে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতলাভের পাঁচ বছর পূর্বে যদি হযরত ফাতিমার রা. জন্ম ধরা হয় তাহলে মৃত্যুকালে তার বয়স ২৯ বছর হয়। আর কেউ বলেছেন যে, নবুওয়াত লাভের এক বছর পর ফাতিমার রা. জন্ম হয়, এই হিসাবে তার বয়স ২৯ বছর হবে না। যেহেতু অধিকাংশ সীরাতবিশেষজ্ঞ মনে করেন, মৃত্যুকালে ফাতিমার রা. বয়স হয়েছিল ২৯ বছর, তাই তার জন্মও হবে নবুয়তের পাঁচ বছর পূর্বে।³⁵⁸
আল-ওয়াকিদী বলেছেন, হিজরী ১১ সালে রমাযান মাসের তৃতীয় দিন ফাতিমার রা.-এর ইন্তেকাল হয়। হযরত আব্বাস রা. তার জানাযার নামায পড়ান। হযরত আলী, ফযল ও আব্বাস রা. কবরে নেমে দাফন কাজ সম্পন্ন করেন। তার অসিয়ত মতো রাতের বেলা তাকে দাফন করা হয়। একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, আলী, মতান্তরে আবু বকর রা., জানাযার নামায পড়ান। স্বামী আলী রা. ও আসমা বিনতে উমাইস রা. তাকে গোসল দেন।³⁵⁹
ঐতিহাসিক মাসউদী বর্ণনা করেন, সাইয়েদা ফাতিমা রা.-এর দাফনের পর হযরত আলী রা. ঘরে ফিরে আসলেন। তিনি খুব চিন্তিত ছিলেন আর বার বার এই কবিতাগুলো পড়ছিলেন,
ارى علل الدنيا كثيرة وصاحبها حتى الممات عليل لكل اجتماع من عليلين فرقة وكل الذي دون الفراق قليل وان افتقادي فاطمة بعد احمد دليل على ان لا يدوم خليل
আমি দেখছি, দুনিয়ার অসুস্থতা ও মুসিবত চতুর্দিক থেকে আমাকে ঘিরে ফেলেছে। আর দুনিয়াবাসী যতদিন আছে অসুস্থতাও থাকবে। প্রত্যেক মিলনের পরেই দুই প্রিয়ভাজনের মধ্যে বিচ্ছেদ রয়েছে। আর বিচ্ছেদবিহীন সময় একেবারেই অল্প হয়। নিশ্চয়ই আহমদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর ফাতিমার বিচ্ছেদ এ কথারই প্রমাণ যে, প্রিয়জন সবসময় এক সঙ্গে থাকে না।
অন্য আরেক বর্ণনায় আছে হযরত আলী রা. কিছু দিন যাবৎ প্রতিদিন হযরত ফাতিমা রা.-এর কবরে আসেন, হযরত ফাতিমা রা.-কে স্মরণ করে কাঁদতে কাঁদতে এই কবিতা পড়েন,
مالی مررت على القبور مسلماً قبر الحبيب مسلم يرد جوابی ياقبر مالك لا تجيب مناديا امللت بعدي خلة الاحباب
আমার কী হলো! আমি কবরকে সালাম দিতে আসি; কিন্তু প্রিয়জন কবর থেকে আমার প্রশ্নের কোনো উত্তরই দিচ্ছে না। হে কবর, তোমার কী হলো যে, আহ্বানকারীকে কোনো জাওয়াব দাও না? তুমি কি প্রিয়জনের ভালোবাসা থেকে বিরক্ত হয়ে গিয়েছ?
কোনো বর্ণনায় আছে যখন মদীনাবাসী ফাতিমাতুয যাহরা রা.-এর মৃত্যুর খবর পেল তখন সকল নারী ও পুরুষ অশ্রুসজল হলো। মানুষের ওপর এমন পেরেশানী ও বিস্ময় নেমে এলো যেমন এসেছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের দিন। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা., হযরত উমর রা. প্রতিদিন আলী মুরতাযা রা.-এর কাছে গিয়ে সমবেদনা জ্ঞাপন করতেন।³⁶⁰
উম্মু সালমা রা. বলেন, ফাতিমার রা. ওফাতের সময় আলী রা. পাশে ছিলেন না। তিনি আমাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, আমার গোসলের জন্য পানির ব্যবস্থা করুন। নতুন পরিচ্ছন্ন কাপড় বের করুন, পরব। আমি পানির ব্যবস্থা করে নতুন কাপড় বের করে দিলাম। তিনি উত্তমরূপে গোসল করে নতুন কাপড় পরেন। তারপর বলেন, আমার বিছানা করে দিন বিশ্রাম করব। আমি বিছানা করে দিলাম। তিনি কিবলামুখী হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তারপর আমাকে বলেন, আমার বিদায়ের সময় অতি নিকটে। আমি গোসল করেছি। দ্বিতীয়বার গোসল দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমার পরিধেয় বস্ত্রও খোলার প্রয়োজন নেই। এরপর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
আলী রা. ঘরে আসার পর আমি তাকে এসব ঘটনা বললাম। তিনি ফাতিমার রা. সেই গোসলকেই যথেষ্ট মনে করলেন এবং সেই অবস্থায় দাফন করেন। এ রকম বর্ণনা উম্মে রাফি থেকেও পাওয়া যায়। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস এবং আলী রা. ফাতিমাকে গোসল দিয়েছেন।³⁶¹
ফাতিমা রা. এই পরিমাণ লাজ-লজ্জাসম্পন্না ছিলেন যে, তিনি যখন মুমূর্ষ অবস্থায়—তখন একদিকে অসুস্থতার কষ্ট, অন্যদিকে চিন্তা করতেন, যদি জানাযা খোলামেলা নেওয়া হয় তাহলে মানুষ আমার অবয়ব দেখে ফেলবে। আর এটা লজ্জাশীল মহিলাদের মর্যাদার পরিপন্থী। এই জন্য তিনি হযরত আবু বকর রা.-এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস রা.-কে বললেন, ‘হে উমাইস, মেয়েদের লাশ উন্মুক্ত অবস্থায় যে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়—এটা আমার পছন্দ নয়। এতে বেপর্দা হয়। নারী-পুরুষের লাশের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করা হয় না। পুরুষরা যে মেয়েদের লাশ খোলা অবস্থায় বহন করেন, এটা তাদের একটা মন্দ কাজ।’ আসমা বিনতে উমাইস রা. প্রথম স্বামী জাফর ইবনে আবি তালিবের সঙ্গে আবিসিনিয়ায় ছিলেন। সেখানকার সব অবস্থা সম্পর্কে তার জানা ছিল। উমায়েস রা. বলতে লাগলেন, ‘হে রাসূলের মেয়ে, আমি আবিসিনিয়াতে মহিলাদের জানাযায় নেওয়ার একটি পদ্ধতি দেখেছি।’ হযরত ফাতিমা রা. বললেন, ‘তাহলে আমাকে বলো সেটা কীভাবে।’ হযরত ফাতিমা রা.-এর আগ্রহের কথা শুনে হযরত আসমা রা. কয়েকটি খেজুরের ডাল নিয়ে মুড়িয়ে গোলাকৃতি করে খাটের ওপর রাখলেন। তারপর এগুলোকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন। ফলে এটি পালকির মতো হয়ে গেল যা পর্দাবৃত। হযরত ফাতিমা রা. এটা দেখে খুব খুশি হলেন এবং মুচকি হেসে বললেন, ‘আমার জানাযা যেন এভাবে নিয়ে যাওয়া হয়; কোনো প্রকার পর্দার যেন অসুবিধা না হয়।’ হযরত আলী রা.-কে বললেন, ‘তুমি আমাকে রাতে দাফন দিয়ো যেন জানাযায় কোনো বেগানা পুরুষের দৃষ্টি না পড়ে।’ হযরত আলী রা. তার অসিয়ত পালন করলেন।
হযরত ফাতিমা রা.-এর লাশ পর্দার মধ্য দিয়ে কবর পর্যন্ত নেওয়া হয়। ইসলামে প্রথম এভাবে তার লাশটিই নেওয়া হয়। তার পরে উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশের লাশটিও এভাবে কবর পর্যন্ত বহন করা হয়। হযরত আলী রা. স্ত্রী ফাতিমা রা.-এর দাফন-কাফনের কাজ সম্পন্ন করে যখন ঘরে ফিরলেন, তখন তাকে বেশ বিষণ্ণ ও বেদনাকাতর দেখাচ্ছিল।
আল-ওয়াকিদী বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনে আবিল মাওলাকে বললাম, 'বেশিরভাগ মানুষ বলে থাকে যে, ফাতিমা রা.-কে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়েছে। আপনি কী মনে করেন?' তিনি জবাব দিলেন: 'জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়নি। তাকে আকীলের বাড়ির এক কোণে দাফন করা হয়েছে। তার কবর ও রাস্তার মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় সাত হাত।'
মহান আল্লাহ তার ইচ্ছাকে সর্বদায় পরিপূর্ণতা দান করে থাকেন। মানুষ যত বড়ই হোক না কেন একদিন তাকে নিঃশেষ হয়ে যেতে হবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যা জান্নাতী মহিলাদের সরদার ফাতিমা রা. একই বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তিনি তার পিতৃশোক বেশি দিন সহ্য করতে পারেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের ছয় মাস পরেই পিতার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তার সঙ্গে মিলিত হন। তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র উনত্রিশ বছর।
হযরত ফাতিমা রা.-এর জানাযায় হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. পড়িয়েছিলেন। অন্য রেওয়াতে আছে হযরত আলী রা.। আল্লাহু আকবার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ের পর্দার প্রতি কি পরিমাণ গুরুত্ব দিতেন। তিনি তার জানাযা খোলা নিয়ে যাওয়াকে অপছন্দ করতেন এবং এই চিন্তায় অস্থির ছিলেন যে কোনো বেগানা পুরুষ দেখে ফেলে কি না। এই ঘটনায় আমাদের জন্য এই শিক্ষা রয়েছে যে, মহিলাদের জানাযায় পর্দার খুব খেয়াল রাখা। যে কোনো মূল্যেই হোক পর্দার লঙ্ঘন করা এবং বেগানা পুরুষ মহিলাদের দেখা অনেক বড় গোনাহ। দ্বিতীয় শিক্ষা এই যে, মহিলাদের লজ্জাশীল হওয়া উচিত। যে যত বেশি লজ্জাশীল হবে সে দুনিয়া আখেরাতে ততবেশী মর্যাদা পাবে। হযরত ফাতিমা রা.-কে বাকী নামক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
হযরত আলী রা. ফাতিমার মৃত্যুতে ভীষণ কষ্ট পেলেন। সাহাবায়ে কেরামও একইভাবে দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠেন। তারা এসে আলী রা.-কে সান্ত্বনা দেন। ফাতিমা রা.-এর ইন্তেকালের পর হযরত আলী রা. যদিও অন্য বিবাহ করেছিলেন, তারপরেও হযরত ফাতিমাকে কখনো ভোলেননি। মাঝে মধ্যে তার গুণাগুণ স্মরণ করতেন এবং কাঁদতেন করতেন। কেউ তাকে একবার ফাতিমা রা.-এর পরিচিতি জিজ্ঞেস করল—তিনি কেমন গুণের অধিকারী ছিল? জবাবে হযরত আলী রা. বললেন, 'তার পরিচিতি ও গুণাগুণ কয়েক শব্দে বর্ণনা করা যাবে না। সে পৃথিবীর সকল মহিলাদের থেকে ভালো ছিল।'
মোটকথা, আমাদের মা-বোন মেয়ে-স্ত্রীগণ যদি হযরত ফাতিমা রা.-এর জীবনীকে আদর্শ বানায় তাহলে সে কখনো বিভ্রান্ত হবে না। হযরত ফাতিমা রা.-এর পবিত্র আমল ও আদর্শ থেকে সে এমন শিক্ষা নিতে পারবে যা তার দুনিয়া আখিরাতকে সুন্দর ও আলোকিত করবে। এবং সে আল্লাহ তাআলার কাছে মাকবুল ও উঁচু মর্যাদা পাবে।
টিকাঃ
৩১৫. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৮৫৬।
৩১৬. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/৩১০।
৩১৭. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৪০।
৩১৮. তারাজিমু সায়্যিদাতি বায়তিন নুবুওয়াহ, ৫৯২।
৩১৯. নিসাউম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ২০৬।
৩২০. উসুদুল গাবাহ, ৫/২৫০; আল ইসাবাহ, ৪/৪৫০।
৩২১. হায়াতুস সাহাবা, ১/৪৯৪।
৩২২. সিরাতে ফাতেমাতুয যাহরা, ৯১-৯৩।
৩২৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৪/২৬।
৩২৪. তারীখুল খুলাফা সূযুতী, ২৭৫।
৩২৫. হায়াতুস সাহাবা, ২/৪৩০।
৩২৬. সূরা আহযাব, ৩৩:৩৩।
৩২৭. মুখতাসার তাফসীর ইবনে কাসীর, ৩/৯৪।
৩২৮. উসুদুল গাবাহ, ৭১৭৫; আদ-দুররুল মানসূর, ৬/৬০৫; নিসাউম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ২১৯।
৩২৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১২৩।
৩৩০. সূরা আলে ইমরান, ৩:৬১।
৩৩১. মুসনাদ, আহমাদ, ৪/১০৭; মুখতাসার তাফসীর ইবনে কাসীর, ১/২৮৭-২৮৯।
৩৩২. তাহযীবুত তাহযীব, ১২/৪৪২; আল ইসাবাহ, ৪/৩৬৬।
৩৩৩. উসুদুল গাবাহ, ৫/৫৩৫।
৩৩৪. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৫৯; আল ইসাবাহ, ৪/৪৫০।
৩৩৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৫।
৩৩৬. সহীহ, মুসলিম, ২০৯১।
৩৩৭. আল ইসাবাহ, ৪/২৮৩।
৩৩৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪২৮।
৩৩৯. সুনান, আদ-দারেমী, হাদীস নং ৮০; হায়াতুস সাহাবা, ২/৪৩০।
৩৪০. সুনান, আবু দাউদ, ৩১৩৩; সুনান, নাসায়ী, ১৮৮১।
৩৪১. হায়াতুস সাহাবা, ১/৪৩৭।
৩৪২. সুনান, আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭১৬।
৩৪৩. তাহযীবুল আসমা, ১৬২।
৩৪৪. সুনান, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৯১৩।
৩৪৫. তরজমায়ে আবনাউন নবী, ১৭৪।
৩৪৬. তরজমায়ে ইমাম হুসাইন রা., ২২।
৩৪৭. সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৭৭২।
৩৪৮. সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৫৭০।
৩৪৯. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/২৬।
৩৫০. সিরাতে ফাতিমা, ৯৮।
৩৫১. সুনান, আবু দাউদ, হাদীস নং ২৯৮৯।
৩৫২. মুসনাদ, আহমাদ: ১/২৯৩; মুসতাদরাকে হাকিম, ২/৫৯৪।
৩৫৩. সুনান, আত-তিরমিযী, ৩৮৭৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ৩/১৫৫।
৩৫৪. আস সিয়ার, ২/১৩৩।
৩৫৫. সুনান, আত-তিরমিযী, ৩৮৬৮; মুসতাদরাকে হাকিম, ৩/১৫৭।
৩৫৬. সীরাতে ফাতিমা, ১৩৪-১৩৬।
৩৫৭. হায়াতুস সাহাবা, ২/৪৩১।
৩৫৮. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১২৭।
৩৫৯. আল-ইসতিআব, ৪/৩৬৭, ৩৬৮; আনসাবুল আশরাফ, ১/৪০২, ৪০৫।
৩৬০. সিরাতে ফাতিমাতুয যাহরা, ১৭৮।
৩৬১. দেখুন তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১৭; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১২৯।
📄 হালীমা সা‘দিয়া রা.
রাসূলের দুধ মা
ব্যক্তিত্বসম্পন্না এই মহীয়সী নারী প্রতিটি মুসলমানের কাছে খুবই সম্মানিতা। প্রত্যেক মুমিনেরই প্রিয় পাত্রী তিনি। কারণ, তার স্তন থেকেই দুধ পান করেছেন পরম সৌভাগ্যবান শিশু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.।
তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসাপূর্ণ কোলে ঘুমিয়েছেন। তার মাতৃমমতায় উপচে পড়া কোলে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তিনি তার ও তার গোত্র বনু সাআদের স্পষ্ট ও মিষ্টি ভাষা থেকে উপকৃত হয়েছেন। ফলে তিনি হয়েছিলেন আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ স্পষ্টভাষী এবং ভাষা-অলঙ্কার ও বাগ্মিতায় হয়েছেন সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ।³⁶²
জগদ্বিখ্যাত সেই মানবী হচ্ছেন হযরত হালীমা সা'দিয়া রা.। রাসূলুল্লাহ সা.-এর সম্মানিতা দুধ মা।
দুগ্ধপানের ঘটনা
হালীমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই আবু সুফইয়ান ইবনুল হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিবের ধাত্রী ও দুধ মা ছিলেন। বনু সাআদ গোত্রের এক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হামযা ইবনে আবদিল মুত্তালিবের ধাত্রী ও দুধ মা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হালীমার কাছে তখন একদিন হামযা রা.-এর দুধ মা তাকে নিজের বুকের দুধ পান করান। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হালীমার নিকট যাওয়ার আগে কিছু দিন আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবার দুধ পান করেছিলেন। সুওয়াইবা কিছুদিন হামযাকেও দুধ পান করিয়েছিলেন। তাই হামযা বনু সাআদ ও সুওয়াইবা দু'দিক দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুধভাই।³⁶³
হালীমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুধপান করিয়েছেন। এ কারণে তিনি দুধ পানকারিণী হিসেবে আরবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিনি দুধের শিশু হিসেবে যেভাবে লাভ করেন তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, সে ছিল অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষের বছর। আমি বনু সাআদের আরও দশজন মহিলার সাথে সাদা রঙের একটি দুর্বল মাদি গাধার ওপর সওয়ার হয়ে দুগ্ধপোষ্য শিশুর খোঁজে বের হলাম। আমাদের সাথে একটা বুড়ো মাদি উটও ছিল। আল্লাহর কসম! তার ওলান থেকে এক কাতরা দুধও বের হচ্ছিল না। খিদের জ্বালায় আমাদের শিশুদের কান্নাকাটির কারণে আমরা রাতে মোটেও ঘুমোতে পারতাম না। আমার বুকের ও আমাদের উটনীর দুধে আমার শিশু পুত্র আবদুল্লাহর পেট ভরত না। তবে আমরা বৃষ্টি ও সচ্ছলতার আশা করতাম।
অবশেষে আমরা মক্কায় পৌঁছলাম। আমাদের প্রত্যেকের সামনে শিশু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপস্থাপন করা হলো। তিনি ইয়াতীম শিশু—একথা শোনার পর কেউ আর তাকে নিতে আগ্রহ দেখাল না। কারণ, আমরা শিশুর পিতা-মাতার নিকট থেকে ভালো কিছু লাভের আশা করতাম। আমরা বলাবলি করতাম—শিশুটি ইয়াতীম। তার মা ও দাদা তেমন কী আর দিতে পারবে? এ কারণে আমরা তাকে অপছন্দ করলাম। এর মধ্যে দলের একমাত্র আমি ছাড়া আর সবাই স্তন্যপায়ী শিশু পেয়ে গেল।
যখন আমরা আমাদের গোত্রে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম তখন আমি আমার স্বামীকে বললাম, আল্লাহর কসম! অন্যরা স্তন্যপায়ী শিশু নিয়ে ফিরবে আর আমি শূন্য হাতে ফিরবো, এ আমার মোটেই পছন্দ নয়। আমি এই হাশিমী ইয়াতীম শিশুটির নিকট যাব এবং তাকেই নিয়ে ফিরবো। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি তাই কর। হতে পারে তার মধ্যে আমাদের জন্য বরকত ও সমৃদ্ধি রেখেছেন। অতঃপর তার বাড়িতে গিয়ে নিয়ে এলাম।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গ্রহণের সাথে সাথে হালীমা ও তার স্বামীর নিকট কল্যাণ ও সমৃদ্ধি নেমে এলো। হালীমা শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোলে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরার সাথে সাথে তার শুকনো বুক দুধে ভরে গেল। তিনি পেট ভরে পান করলেন। তারপর হালীমা ওঁর নিজের শিশু সন্তান আবদুল্লাহকে স্তন দিলেন, সেও পেট ভরে পান করল। তারপর দু'শিশুই ঘুমিয়ে পড়ল।
হালীমা ও তার স্বামী দুজনই ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর ছিলেন। যেহেতু তাদের মাদী উটটি ওলান ছিল শুকনো। তারা খাবার বা দুধ পাবেন কোথায়? কিন্তু হঠাৎ করে তাদের অবস্থা বদলে গেল। এ সম্পর্কে হালীমা নিজেই বলেছেন, 'আমার স্বামী আমাদের গাধীটির কাছে গিয়ে দেখলেন, তার ওলানটি দুধে পূর্ণ হয়ে আছে। তিনি দুধ দুইলেন এবং আমরা দুজন পেট ভরে পান করলাম। সে রাতটি আমাদের পরম সুখে কাটল। সকালে স্বামী আমাকে বললেন, 'আল্লাহর কসম, হালীমা! জেনে রাখ, তুমি একটি কল্যাণময় শিশু গ্রহণ করেছ।"
আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, আমি তা-ই আশা করি।' তারপর আমরা আমাদের পল্লীতে ফেরার জন্য বের হলাম। আমি শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে আমার মাদী গাধাটির ওপর উঠে বসলাম। কী আশ্চর্য! সেটি এত দ্রুত চলতে লাগল যে, কাফেলার অন্য কারও গাধা তার সাথে পেরে উঠছিল না। এক সময় আমার সঙ্গী-মহিলারা আমাকে বলল, যুওয়ায়িবের মেয়ে, আচ্ছা বলো তো, এটা কি তোমার সেই গাধী—যার ওপর সাওয়ার হয়ে তুমি গিয়েছিলে? আমি বললাম, নিশ্চয়, এটা সেই গাধী। তারা বলল, আল্লাহর কসম, তাহলে অন্য কোনো ব্যাপার আছে।³⁶⁴
কাফেলা বনু সাআদের পল্লীতে পৌঁছল। সে বছর এই পল্লীতে অভাব ও দারিদ্র্যের একটা ছাপ সর্বত্র বিরাজমান ছিল। হালীমা সেখানে পৌঁছার পরই এই ইয়াতীম শিশুর বরকত ও কল্যাণ প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন। সবকিছুতেই তাদের বরকত ও সমৃদ্ধি হতে লাগল। তার ছাগল-ভেড়া শুকনো চারণভূমিতে অন্যদের ছাগল-ভেড়ার সাথে চরতে যেত। যখন ফিরত তখন তার গুলোর ওলান দুধে পূর্ণ থাকত, কিন্তু অন্যদের গুলো যেমন যেত তেমনই ফিরত। তাই তার গোত্রের লোকেরা তাদের নিজ নিজ রাখালদেরকে বলত, তোমাদের কী হয়েছে, আবু যুওয়ায়িবের মেয়ের রাখাল যেখানে তার ছাগল চরায় সেখানে তোমরা চরাতে পার না? কিন্তু তা করেও তারা দেখল, তাতে কোনো লাভ হয় না।
হালীমার এভাবে দু-টি বছর কেটে গেল। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতি দিনই তিনি কল্যাণ ও সমৃদ্ধি দেখেতে পেলেন। এর ভেতর দিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুধপানের সময়-সীমা পূর্ণ হয়ে গেল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনভাবে বেড়ে উঠলেন-যা সচরাচর অন্য শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। হালীমা মনে করলেন, এখন তাকে মক্কায় তার মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। তিনি এই শিশুর মধ্যে যে শুভ ও কল্যাণ এ দু-বছর প্রত্যক্ষ করেছেন তাতে স্বভাবতই তাকে আরও কিছু দিন নিজের কাছে রাখার ইচ্ছা করতেন। তা সত্ত্বেও তিনি তাকে মক্কায় নিয়ে গেলেন।
মা আমিনা তার প্রিয় সন্তানকে ফিরে পেয়ে দারুণ খুশি হলেন। বিশেষত যখন দেখলেন, তার সন্তান এমনভাবে বেড়ে উঠেছে যেন সে চার বছরের কোনো শিশু। অথচ তার বয়স এখনো দু-বছর অতিক্রম করেনি। হালীমা শিশুকে আরও কিছু দিন পল্লীতে তার নিকট রাখার জন্য মা আমিনার নিকট আবদার জানালেন। মা রাজী হলেন। হালীমা উৎফুল্ল চিত্তে শিশুকে নিয়ে পল্লীতে ফিরে এলেন। শিশুটিও পল্লী প্রকৃতিতে ফিরে আসতে পেরে দারুণ খুশি। এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু সাআদে দ্বিতীয় বারের জন্য ফিরে এলেন। আর এখানেই তার বক্ষ বিদারণের বিস্ময়কর ঘটনটি ঘটে যখন তার বয়স চার অথবা পাঁচ বছর।
ইমাম মুসলিম তার নিজস্ব সনদে আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য শিশুদের সাথে একদিন খেলছেন, এমন সময় জিবরাঈল আ. তার কাছে আসেন। তারপর তাকে ধরে মাটিতে চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে তার বুকটি ফেঁড়ে ফেলেন। তারপর তার হৃৎপিণ্ডটি (কালব) বের করে তার থেকে একটি রক্তপিণ্ড পৃথক করে বলেন, এ হলো তোমার মধ্যে শয়তানের অংশ। তারপর সেটা একটি সোনার গামলায় যমযমের পানি দিয়ে ধুয়ে যথাস্থানে স্থাপন করেন। খেলার সঙ্গীরা এ দৃশ্য দেখে দৌড়ে তার ধাত্রী মা হালীমার কাছে গিয়ে বলে, মুহাম্মাদকে হত্যা করা হয়েছে। সবাই ছুটে আসে এবং তাকে বিবর্ণ অবস্থায় দেখতে পায়।³⁶⁵
এ ঘটনার পর হালীমা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেন। ইবন ইসহাক বলেন, শিশু মুহাম্মাদকে তাঁর মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে কোনো কোনো আলিম আমাকে একথা বলেছেন যে, দুধ ছাড়ার বয়স হওয়ার পর দ্বিতীয় বার যখন হালীমা রা. মুহাম্মাদকে নিয়ে যান তখন আবিসিনিয়ার কিছু খ্রিস্টধর্মাবলম্বী লোক তাকে দেখে তার পরিচয় জানতে চায় এবং তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তারপর তারা তাকে তাদের দেশে, তাদের রাজার নিকট নিয়ে যেতে চায়। তারা বলে, এই শিশু ভবিষ্যতে বড় কিছু করবে। আমরা তার মধ্যে সেসবের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। হালীমা ভয় পেলেন, তারা হয়তো তাকে চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি তার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেন।³⁶⁶ ছয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি মায়ের স্নেহে লালিত-পালিত হন। তারপর মা ইন্তেকাল করেন।
একটি বর্ণনা এ রকম এসেছে যে, হালীমা যখন শিশু মুহাম্মাদকে শেষ বারের মতো তার মায়ের নিকট নিয়ে আসছিলেন তখন মক্কার উঁচু ভূমিতে পৌঁছার পর তাকে হারিয়ে ফেলেন। পরে ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল ও কুরাইশ গোত্রের অন্য এক ব্যক্তি তাকে পান। তারা দু'জন তাকে নিয়ে আবদুল মুত্তালিবের নিকট এসে বলেন, এই আপনার ছেলে। আমরা তাকে মক্কার উঁচু ভূমিতে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। আমরা তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে সে বলে: আমি মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে আবদিল মুত্তালিব। তাই আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।³⁶⁷
রাসূলের কাছে দুধমাতার মর্যাদা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার নিকট ফিরিয়ে দিয়ে হালীমা তার জনপদে ফিরে গেলেন। বহু বছর চলে গেল। এ দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবক হলেন, বিয়ে করলেন; কিন্তু মা হালীমার স্মৃতি কোনো দিন ভোলেননি। তাঁর স্নেহ-মমতার কথা, লালন-পালনের কথা প্রায়ই তিনি স্ত্রী খাদীজার রা. কাছে বলতেন। খাদীজার রা. মনেও হালীমাকে একটু দেখার ইচ্ছা জাগত। একবার এক অভাবের বছর তিনি আসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সসম্মানে বাড়িতে রাখলেন ও সমাদর করলেন। হালীমা অনাবৃষ্টির কথা বললেন, জীব-জন্তু মারা যাবার কথা শোনালেন এবং তীব্র অভাবের বর্ণনা দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সাহায্যের ব্যাপারে খাদীজার রা. সাথে কথা বললেন। খাদীজা রা. অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাকে চল্লিশটি ছাগল এবং পানি বহন ও এদিক ওদিক যাওয়ার জন্য একটি উট দান করেন। এ যাত্রায় হালীমা তার পরিবারের লোকদের জন্য অনেক উপহার-উপঢৌকন নিয়ে যান।³⁶⁸
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন কোমল মনের দয়াপ্রবণ মানুষ। নিজের আশে পাশের লোকদের শুধু নয়, বরং নিকট ও দূরের সবাইকে ভালোবাসতেন এবং হাদিয়া-তোহফা পাঠাতেন। আর এর থেকে তার দুধ মা হালীমা বাদ পড়তে পারেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা জীবন হালীমার স্নেহ-মমতার কথা মনে রেখেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্তরের গভীরে ছিল মা হালীমার স্থান। তাই চল্লিশ বছরের বেশি বয়সেও তাকে 'মা মা' বলে ডাকতে শোনা যায়, নিজের গায়ের চাদরটি খুলে বিছিয়ে তার বসার স্থান করে দিতে দেখা যায়। শুধু তাই নয়, তার ভালো-মন্দ ও অভাব-অভিযোগের কথাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনতে দেখা যায়। আরও দেখা যায় মায়ের একান্ত অনুগত সন্তানের মতো হৃষ্টচিত্তে হাসি মুখে তার সাথে কথা বলতে।³⁶⁹
হযরত হালীমার রা. দীর্ঘ হায়াত লাভ করেন। মদীনায় তিনি ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
টিকাঃ
৩৬২. সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবিয়্যাত, ৭।
৩৬৩. নিসাউম মিন আসরিন নুবুওয়াহ, ১১; সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৬১।
৩৬৪. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৬৪; উসুদুল গাবাহ, ৫/৪২৭; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/২৫৫।
৩৬৫. সহীহ, মুসলিম, ১/১০১।
৩৬৬. সীরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৬৭।
৩৬৭. ইবনে কাসীর, আস সীরাহ, ১/১৫।
৩৬৮. আনসাবুল আশরাফ, ১/৯৫; নিসাউম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ১/৩২।
৩৬৯. আল ইসাবাহ, ৪/২৭৪।