📄 যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.
সাত আসমানের ওপর থেকে যাঁকে আল্লাহ বিয়ের নির্দেশ দিয়েছেন
আমরা এখন এমন এক উম্মুল মুমিনীনের জীবন কাহিনী আলোচনা করব যাঁর যোগ্যতা ও মর্যাদা এবং মহত্ত্ব ও কীর্তি অতুলনীয়।
হ্যাঁ, আমরা হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর কথাই বলছি। যাঁর সম্পর্কে ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, 'তিনি দ্বীন, তাকওয়া, বদান্যতা ও খ্যাতির আলোকে একজন শ্রেষ্ঠ নারী ছিলেন। ২৩৩ ইমাম আবু নুয়াইম রহ. তার সম্পর্কে বলেন, হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. ছিলেন আল্লাহকে অধিক ভয়কারিণী, সন্তুষ্টকারিণী ও আল্লাহর পথে আহ্বানকারিণী। ২৩৪
তাহলে আসুন, আমরা এই বিশিষ্ট সাহাবিয়া ও উম্মুল মুমিনীনের জীবনী দ্বারা অন্তর সিক্ত করে তুলি।
এটাই প্রকৃত গর্বের বিষয়
মক্কার অভিজাত পরিবারে হযরত যায়নাব রা.-এর জন্ম। উচ্চ বংশীয় ও অনিন্দ্য রূপসী ছিলেন তিনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হচ্ছেন তার আপন মামাতো ভাই। তাদের দাদা ও নানা হচ্ছেন সেই যুগের কুরাইশদের সরদার আবদুল মুত্তালিব। তার এক ভাই—যাঁকে প্রথম আমীরুল মুমিনীন নামে ডাকা হয়, ইসলামের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী সেই মহান সাহাবী হচ্ছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা.। তার আরেক ভাই—ইসলামের অন্যতম কবি আবু আহমাদ ইবনে জাহাশ।
তাঁর ফুফা হচ্ছেন হামযা ও আব্বাস রা.। আর বোন হলেন নবুওয়াতের প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারী হযরত হামনা বিনতে জাহাশ। তার মা রাসূলুল্লাহ সা.-এর ফুফু হযরত উমাইমা বিনতে আবদুল মুত্তালিব।
উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর অন্যতম পরিচয় হচ্ছে, তিনিই একমাত্র নারী যাঁকে আল্লাহ তাআলা সাত আসমানের ওপর থেকে বিয়ে পড়িয়েছেন।
উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর নবুয়তের তেত্রিশ বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং পারিবারিক আভিজাত্যে লালিত-পালিত হন। তিনি এবং তার অন্য সকল ভাই-বোন ইসলামের শুরুর দিকেই নিজেদের সমর্পণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দারুল আরকামে যাওয়ার আগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করে অগ্রগামী মুসলমানদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন। ২৩৫
আল্লাহর নবীর সাহাবাদের ওপর মক্কার মুশরিকদের অনবরত নির্যাতন বাড়তেই থাকে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবীদের মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিলে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের নেতৃত্বে বনু জাহাশের সকল সদস্য মদীনায় হিজরত করেন। এ দলে ছিলেন তার ভাই আবু আহমাদ ইবনে জাহাশ ও মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে জাহাশ। তাদের মহিলাগণ এ সময় হিজরত করেন। তম্মধ্যে ছিলেন আমাদের আলোচ্য ব্যক্তিত্ব হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ, মুসআব ইবনে উমাইরের স্ত্রী হামনা বিনতে জাহাশ, আবদুর রহমান ইবনে আউফের স্ত্রী উম্মে হাবীব বিনতে জাহাশ রা.।
বনু জাহাশ যখন তাদের বাড়িঘর ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেন, তখন আবু সুফইয়ান ইবনে হারব তাদের বাড়ি দখল করে নেয় এবং সেটি আমর ইবনে আলকামার কাছে বিক্রি করে দেয়। বনু জাহাশ আবু সুফইয়ানের এই কর্মকাণ্ডের ঘটনা শোনার পর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা. তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, 'হে আবদুল্লাহ, তুমি কি এতে খুশি নও যে, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তোমাদের এরচেয়ে উত্তম বাড়ি দান করবেন!' আবদুল্লাহ বললেন, 'অবশ্যই খুশি।' ২৩৬
আনসারদের সান্নিধ্যে
এরপর উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. আনসার বোনদের সান্নিধ্যে জীবনের সেরা দিনগুলো কাটাচ্ছেন। আনসারদের সম্পর্কে আমরা আর কী বলব? আল্লাহ নিজেই যেখানে বলছেন,
'আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদীনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালোবাসে। আর মুহাজরিদের যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।' ২৩৭
হযরত যায়নাব রা. তাদের মধ্যে ছিলেন আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। গরিব-দুঃস্থদের তিনি ছিলেন আশ্রয়। অকাতরে দান-খয়রাত করতেন তাদের মাঝে। কেননা, তিনি ভালো করেই জানতেন, একজন মুমিনের জন্য দুনিয়াতেই সৎকর্ম ও মহানুভবতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে আখিরাতের নেয়ামত পাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। এ কারণে দিনভর তিনি রোযা রাখতেন আর রাত কাটিয়ে দিতেন ইবাদত-বন্দেগীতে। আল্লাহ তাআলা তাকে এভাবেই গড়ে তুলছিলেন উম্মুল মুমিনীন হিসেবে যোগ্য করে।
মুমিনদের জন্য উচিত নয়
'আর আল্লাহ ও তার রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।' ২৩৮
বর্ণিত আছে, উক্ত আয়াতটি হযরত যায়নাব রা.-এর উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে স্বীয় আযাদকৃত দাস ও পালিত পুত্র যায়িদ ইবনে হারিসা রা.-এর সাথে তার বিয়ে দেন। পৃথিবীতে ইসলাম যেভাবে সাম্য ও সমতার শিক্ষার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে এবং যেভাবে সকল স্তরের মানুষকে একই কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে ইতিহাসে তার অগণিত দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। তবে হযরত যায়নাব রা.-এর বিয়ের ঘটনাটি ছিল সাম্য ও সমতার বাস্তব শিক্ষার ভিত্তিস্বরূপ। এ কারণে তা এ জাতীয় সকল দৃষ্টান্তের ওপর প্রাধান্য ও গুরুত্ব লাভ করেছে।
পবিত্র কাবার খাদিম হিসেবে গোটা আরবে কুরাইশ খান্দান, বিশেষত বনু হাশিমের যে উঁচু মর্যাদা ও সম্মানের আসন ছিল, তৎকালীন ইয়ামেনের কোনো বাদশাহও তার সমকক্ষতার দাবি করতে দুঃসাহসী হতো না।
কিন্তু ইসলাম সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি ঘোষণা করে তাকওয়া ও আল্লাহভীতিকে এবং ঘোষণা করে যে, যে কোনো ধরনের গর্ব, আভিজাত্য ও কৌলীন্য জাহিলিয়াতের প্রতীক। এই ভিত্তিতে হযরত যায়িদ যদিও দৃশ্যত একজন দাস ছিলেন, তবুও যেহেতু ইসলাম তার দ্বারা সীমাহীন শক্তি লাভ করে, এ কারণে হাজার হাজার স্বাধীন ব্যক্তি থেকেও তাকে শ্রেষ্ঠতম গণ্য করা হতো। ইসলামী সাম্যের বাস্তব শিক্ষাদান ছাড়া এই বিয়ের আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল। ইবনুল আসীর তা বর্ণনা করেছেন এভাবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদের সাথে তাঁর বিয়ে এজন্য দিয়েছিলেন, যাতে যায়িদ তাকে কিতাবুল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের সুন্নাতের তালীম ও তারবিয়াত দান করেন।
কুরাইশরা বংশের বড়াই করত। বংশ নিয়ে তাদের গৌরবের অন্ত ছিল না; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাব বিনতে জাহাশের বিয়ে দিলেন যায়িদ ইবনে হারিসার সাথে। যায়িদ ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয়ভাজন ব্যক্তি। হযরত খাদীজা রা. ও হযরত আবু বকর রা. যে সময়ে মুসলমান হন, যায়িদও সে সময় মুসলমান হন।
অধিকাংশ অভিযানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশ নেতাদের ওপর তাকে পরিচালক নিয়োগ করতেন। যায়িদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এত কাছের মানুষ হয়ে যান যে, তিনি যায়িদ ইবনে মুহাম্মাদ হিসেবে প্রসিদ্ধি পান। তার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ অনুগ্রহ ছিল। এতসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন দাস। আর যায়নাবের ছিল বংশ-কৌলীন্য। প্রথম থেকেই এ বিয়েতে হযরত যায়নাবের মত ছিল না; কিন্তু সবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে রাজী হন। কারণ, তখন সূরা আল আহযাবের উপর্যুক্ত আয়াতটি নাযিল হয়।
হযরত যায়নাব এতে করে বিয়েতে রাজি হয়ে যান। এরপর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামের প্রাথমিক স্তরে এ বিয়ে এক দিগন্ত উন্মোচন। এ বিয়েতে মোহর ছিল দশটি লাল দীনার (প্রায় চার তোলা স্বর্ণ), ষাট দিরহাম (প্রায় আঠারো তোলা রৌপ্য), একটি ভারবাহী জন্তু। কিছু গৃহস্থালির আসবাবপত্র, আনুমানিক পঁচিশ সের আটা ও পাঁচ সের খেজুর। এ সব স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পক্ষ থেকে আদায় করে দেন।
একজন মুমিন নারী হিসেবে উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. আল্লাহ ও রাসূল সা.-এর নির্দেশ শিরোধার্য করে হযরত যায়িদ রা.-কে স্বামীত্বে বরণ করেন। বিয়ের পর এক বছর দুইজন একসাথে থাকেন; কিন্তু প্রেম-প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠল না। দিন দিন সম্পর্ক তিক্ত থেকে তিক্ততর হয়ে উঠল। হযরত যায়িদ রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে অভিযোগ করলেন এবং তালাক প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। যায়িদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, যায়নাব তার কঠোর বাক্যবাণে আমাকে বিদ্ধ করে। আমি তাকে তালাক দিতে চাই।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যায়িদকে তালাক দান থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কত চেষ্টা সত্ত্বেও হযরত যায়নাব ও হযরত যায়িদ রা.-এর বিয়ে টিকল না। হযরত যায়িদ রা. তাকে তালাক দিয়েই ছাড়লেন। যায়নাব ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বোন। বোধ- বুদ্ধি হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লালন পালন করেন। তাই যখন তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে খুশি করার জন্য নিজেই বিয়ে করার ইচ্ছে পোষণ করতে লাগলেন; কিন্তু যেহেতু তখনো পর্যন্ত মুসলিমদের মন-মানসে জাহিলী যুগের প্রথ্য ও সংস্কারের প্রভাব কিছুটা বিদ্যমান ছিল, এ কারণে তিনি নিজের মনের ইচ্ছা চেপে রাখেন। কারণ, যায়িদ ছিলেন তার পালিত পুত্র। আর জাহিলী সমাজ আপন ঔরসজাত পুত্র ও পালিত পুত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য করত না। যায়নাব ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পালিত পুত্র যায়িদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী। তাকে বিয়ে কররে মুনাফিক ও কাফেররা হই চই বাধিয়ে দিতে পারে এমন আশঙ্কা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করছিলেন; কিন্তু যেহেতু পালিত পুত্রের বিচ্ছেদপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে না করার প্রথাটি ছিল একটি জাহিলী প্রথা মাত্র, আর আল্লাহ ও তার রাসূলের ইচ্ছা ছিল তার মূলোৎপাটন করা, এ কারণে আল্লাহপাক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সে সময়ের মনের ইচ্ছাটি প্রকাশ করে দেন এভাবে,
'আর স্মরণ করো, আল্লাহ যার ওপর নেয়ামত দিয়েছিলেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে, তুমি যখন তাকে বলেছিলে 'তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো।' আর তুমি অন্তরে যা গোপন রাখছ আল্লাহ তা প্রকাশকারী এবং তুমি মানুষকে ভয় করছ অথচ আল্লাহই অধিকতর হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে; অতঃপর যায়িদ যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের কোনো অসুবিধা না থাকে; যখন তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে বিবাহসম্পর্ক ছিন্ন করে। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকর হয়ে থাকে।' ২৩৯
এভাবেই তিনি উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদায় অভিসিক্ত হন।
হযরত যায়িদ রা. তাকে তালাক দেওয়ার পর ইদ্দত শেষ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বিয়ে করেন। আর এতে তিনি উম্মুল মুমিনীনের মহান মর্যাদায় অভিসিক্ত হন। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এ আয়াতটি- (আপনি আপনার অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ তাআলা প্রকাশ করে দেবেন) ২৪০ যায়নাব বিনতে জাহশ এবং যায়িদ ইবনে হারিসা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। ২৪১
আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন যায়নাব রা. এর ইদ্দত পূর্ণ হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদ রা.-কে বললেন, তুমি যায়নাবের নিকট আমার কথা উল্লেখ করো। আনাস রা. বলেন, যায়িদ রা. রওনা হলেন এবং তার নিকট গেলেন। তখন তিনি আটার খামির করছিলেন। যায়িদ রা. বলেন, আমি যখন তাকে দেখলাম তার মর্যাদা আমার অন্তরে এমনভাবে জাগ্রত হলো যে, আমি তার প্রতি তাকাতে পারলাম না। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে স্মরণ করেছেন। তাই আমি তার দিকে পিঠ ফিরে দাঁড়ালাম এবং পেছনের দিকে সরে পড়লাম। এরপর বললাম, হে যায়নাব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে স্মরণ করে আমাকে পাঠিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি এ সম্পর্কে কিছুই করব না-যে পর্যন্ত না আমি আমার রবের কাছ থেকে নির্দেশ লাভ না করি। এরপর তিনি তার নামাযের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
এদিকে কুরআন নাযিল হলো এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে যায়নাবের বিনা অনুমতিতেই তার ঘরে প্রবেশ করলেন। আনাস রা. বলেন, আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (যায়নাবের সেই বিবাহ উপলক্ষে) দুপুর বেলায় আমাদের গোশত খাইয়েছেন। খাওয়া দাওয়ার পর লোকেরা বের হয়ে গেল; কিন্তু কয়েকজন লোক খাওয়ার পর আলাপে মশগুল থাকল। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হয়ে পড়লেন, আমিও তার অনুসরণ করলাম।
তিনি তার বিবিগণের ঘরে ঘরে উপস্থিত হয়ে তাদের সালাম করতে লাগলেন। আর বিবিগণ তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার এ স্ত্রীকে কেমন পেয়েছেন?' আনাস রা. বলেন, 'আমার মনে নেই, (আলাপরত) সে লোকদের বের হয়ে যাওয়ার কথা আমিই তাকে জানিয়ে ছিলাম, না তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন।' তিনি বলেন, তারপর তিনি চললেন এবং সে ঘরে প্রবেশ করলেন আমিও তার সঙ্গে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলাম। তিনি আমার ও তার মধ্যে পর্দা টেনে দিলেন। আর পর্দার বিধান নাযিল হলো। আনাস রা. বলেন, লোকদের উপদেশ দেওয়া হলো, যে উপদেশ দেওয়ার ছিল।
ইবনু রাফি' তার হাদীসে অতিরিক্ত বর্ণনা করতে গিয়ে সূরা আহযাবের ৫৩ নং আয়াত যেখানে বলা হয়েছে 'তোমাদের অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নবীগৃহে প্রবেশ করবে না...কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না...।' ২৪২ এ বিয়েকে কেন্দ্র করে হিজাবের হুকুম নাযিল হয় অথবা বলা চলে এ বিয়ে ছিল হিজাবের হুকুম নাযিলের পটভূমি। ২৪৩
আল্লাহর নির্দেশে এই বিয়ে হয়
উল্লিখিত আয়াত হতে একথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা তার নবীর দ্বারা এ কাজটি করিয়েছেন একটি বিশেষ প্রয়োজন পূরণ ও কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে। যা এ পন্থা ভিন্ন অন্য কোনো উপায়ে অর্জিত হওয়া সম্ভবপর ছিল না। আরবে মুখ-ডাকা আত্মীয়দের সম্পর্কে অত্যন্ত মারাত্মক ধরনের ভুল প্রথা প্রচলিত হয়েছিল এবং যুগযুগ ধরে অব্যাহতভাবে তা চলে আসছিল পূর্ণ দাপটের সাথে। তা উৎখাত করার একটি মাত্র উপায় কার্যকর ও সফল হতে পারত। আর তা হলো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তা শিকড়সহ উপড়ে ফেলবেন। অতএব, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে তার স্ত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা এই বিয়ে করাননি। একটি অত্যন্ত বড় ও অতিশয় প্রয়োজনীয় কাজের লক্ষ্যেই তিনি তা করিয়েছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যায়নাব রা.-কে স্ত্রী হিসেবে ঘরে আনার পর ওলীমার আয়োজন করেন। আয়োজন অর্থ এই নয় যে, তিনি রাজকীয় ভোজের আয়োজন করেন। তবে হযরত যায়নাব রা.-এর ওলীমা তুলনামূলকভাবে একটু জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছিল। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল দুপুর বেলা মতান্তরে রাতের বেলা। হযরত আনাস রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সকলকে রুটি ও গোশত খাওয়ান। আমাদের রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য এটা রাজকীয় আয়োজনই বটে। কারণ, দিনের পর দিন যে পরিবারের লোকদের শুধু দুধপান করে কাটতে হতো, তাদের পক্ষে তিন শো লোকের জন্য গোশত রুটির ব্যবস্থা করা জাঁকজমকপূর্ণই বলা চলে।
ইবনে সাআদ এই ওলীমার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন এভাবে, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অন্য কোনো স্ত্রীর ওলীমা সেভাবে করেননি যেভাবে যায়নাব রা.-এর ওলীমা করেছিলেন। তিনি যায়নাব রা.-এর ওলীমা করেন ছাগলের গোশত দিয়ে।'
হাদীসে এসেছে, 'আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-কে উপলক্ষ করে পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাবের সঙ্গে তার বিবাহ উপলক্ষে ওলীমা হিসাবে সেদিন রুটি ও গোস্ত খাইয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের ওপর যাইনাব রা. গর্ব করে বলতেন, আল্লাহ তো আসমানে আমার বিয়ের সিদ্ধান্ত করেছেন। ২৪৪
এ সবের কারণে হযরত যায়নাব রা. তার অন্য সতীনদের সামনে গর্ব করতেন। একদিন তো তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেই বসলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি আপনার অন্য কোনো বিবির মতো নই। তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাঁর বিয়ে তার পিতা, ভাই অথবা খান্দানের কোনো অভিভাবক দেননি। একমাত্র আমি—যার বিয়ে আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে আপনার সাথে সম্পন্ন করেছেন। আপনার ও আমার দাদা একই ব্যক্তি, আর আমার ব্যাপারে জিবরাঈল আ. হলেন দূত। ২৪৫
বর্ণিত আছে,
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যায়িদ ইবনে হারিসা রা. অভিযোগ নিয়ে আসলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতে লাগলেন, 'তুমি আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে রেখে দাও।' আনাস রা. বলেছেন, তিনি যদি কোনো জিনিস গোপন করতেন, তাহলে এ আয়াতটি অবশ্যই গোপন করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, যাইনাব রা. অপরাপর স্ত্রীদের কাছে এ বলে গর্ব করতেন যে, তোমাদের বিয়ে দিয়েছে তোমাদের পরিবার-পরিজন, আর আমাকে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সাত আসমানের ওপরে বিয়ে দিয়েছেন। ২৪৬
হযরত যায়নাব রা.-এর এ দাবীর যৌক্তিকতাও ছিল। কারণ, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফাতো বোন এবং রূপ ও সৌন্দর্যের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সব সময় তাঁকে খুশি রাখতে চাইতেন। হযরত যায়নাব রা.-এর চরিত্রে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যা খুব কম নারীর মধ্যেই পাওয়া যেত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নৈকট্যলাভের ব্যাপারে হযরত আয়েশা রা. ও তার মধ্যে পারস্পরিক একটি প্রতিযোগিতার মনোভাব কাজ করত-যা নারী স্বভাবের দাবি অনুযায়ী এক প্রকার পবিত্র ঈর্ষার রূপ লাভ করে। যাকে শরীয়তের পরিভাষায় 'গিবতা' বলে। তার ব্যাপারে হযরত আয়েশা রা. বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবিগণের মধ্যে একমাত্র তিনিই আমার সমকক্ষতার দাবীদার ছিলেন। ২৪৭
আনাস রা. হতে বর্ণিত, যায়নাবের বিয়ের আলোচনায় আনাস রা. উপস্থিত হয়ে তিনি বললেন, যায়নাব বিনতে জাহাশের সঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিয়ের সময় যে ওলীমার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তার চেয়ে বড় ওলীমার ব্যবস্থা তার অন্য কোনো স্ত্রীর বিয়েতে আমি দেখিনি। এতে তিনি একটি ছাগল দ্বারা ওলীমা করেন। ' ২৪৮
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর কাছে মধু পান করতেন এবং সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন। তাই আমি এবং হাফসা স্থির করলাম যে, আমাদের যার ঘরেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসবেন, সে তাকে বলবে, আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন? আপনার মুখ থেকে মাগাফীরের গন্ধ পাচ্ছি। তিনি বললেন, না, বরং আমি যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর নিকট মধু পান করেছি। আমি কসম করলাম, আর কখনো মধু পান করব না। তুমি এ ব্যাপারে অন্য কাউকে জানাবে না। ২৪৯
আয়েশা রা.-এর অন্তরে তার মর্যাদা
সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর ইফকের দুর্যোগের দিনে একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রা. সম্পর্কে হযরত যায়নাব রা.-এর মতামত জানতে চাইলেন। হযরত যায়নাব রা. অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বললেন, 'আমি তার মধ্যে ভালো ছাড়া আর কিছুই জানি না।'
পরে হযরত আয়েশা রা.-এর পবিত্রতা ঘোষণা করে কুরআনের দশটি আয়াত নাযিল হয়। আর সেই সাথে হযরত যায়নাব রা.-এর সত্যবাদিতা ও উন্নত নৈতিকতাও প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়। হযরত আয়েশা রা.-এর আজীবন হযরত যায়নাব রা.-এর এ ঋণ মনে রেখেছেন। সারা জীবন তিনি মানুষের কাছে সে কথা বলেছেন। যায়নাব রা.-এর মধ্যে যত গুণাবলী তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, অকপটে তা মানুষকে জানিয়েছেন।। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. লিখেছেন, হযরত আয়েশা রা. 'ইফক'-এর ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত যায়নাব রা.-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
হযরত আয়েশা রা.-এর মতো প্রখর বুদ্ধিমতী, বিদূষী ও মহীয়সী নারী যখন হযরত যায়নাব রা.-এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তখন তার মর্যাদা ও স্থান যে কোনো স্তরে তা অনুমান করতে আর কোনো ব্যাখ্যা প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ, হযরত আয়েশা রা. তার আল্লাহপ্রদত্ত তীক্ষ্ণ মেধা দিয়ে গভীরভাবে অতি নিকট থেকে হযরত যায়নাব রা.-কে পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়ন করেছিলেন। হাদীসের গ্রন্থাবলীতে হযরত আয়েশা রা.-এর যেসব উক্তি ছড়িয়ে আছে, তাতেই হযরত যায়নাব রা.-এর প্রকৃত মর্যাদা ফুটে উঠেছে। হযরত আয়েশা রা. বলেন, 'আমি যায়নাব রা.-এর চেয়ে কোনো মহিলাকে বেশি দ্বীনদার, বেশি পরহেযগার, বেশি সত্যভাষী, বেশি উদার, দানশীল, সৎকর্মশীল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে বেশি তৎপর দেখিনি। শুধু তার মেজাজে একটু রুক্ষতা ছিল। তবে তার জন্য তিনি খুব তাড়াতাড়ি লজ্জিত হতেন। ২৫০
আল্লামা ইবনে আবদিল বার হযরত যায়নাব রা. সম্পর্কে হযরত আয়েশা রা.- এর নিম্নোক্ত মন্তব্যটি বর্ণনা করেছেন, দ্বীনের ব্যাপারে আমি যায়নাব রা.-এর চেয়ে ভালো কোনো মহিলা কখনো দেখিনি। হযরত আয়েশা রা. আরও বলেছেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরকালে তার সাথে প্রথম মিলিত হওয়ার এবং জান্নাতে তার স্ত্রী হওয়ার সুসংবাদ দান করে গেছেন। ২৫১
দুনিয়াবিমুখিতা ও দানশীলতা
হযরত যায়নাব রা. ছিলেন খুবই দানশীল, দরাজহস্ত, আল্লাহভীরু ও অল্পেতুষ্ট নারী। ইয়াতিম, দুঃস্থ ও অভাবগ্রস্তদের আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থল বলে বিবেচিত হতেন। গরীব-দুঃখীদের প্রতি তার দয়া-মমতার শেষ ছিল না।
তাঁর দানের হাত এমন ছিল যে, খলীফা হযরত উমর রা. তার জন্য বাৎসরিক বারো হাজার দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করে দেন; কিন্তু তিনি কখনো তা গ্রহণ করেননি। একবার উমর রা. তার এক বছরের ভাতা পাঠালেন। হযরত যায়নাব দিরহামগুলো একখানা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। তারপর বাযরাহ ইবনে রাফে'কে নির্দেশ দেন দিরহামগুলো আত্মীয়-স্বজন ও গরীব মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করার জন্য।
বাযরাহ বললেন, 'এতে আমাদেরও কি কিছু অধিকার আছে?' তিনি বললেন, 'কাপড়ের নিচে যেগুলো আছে সেগুলো তোমার।' সেগুলি কুড়িয়ে গুনে দেখা গেল পঞ্চাশ (মতান্তরে পঁচাশি) দিরহাম। সব দিরহাম বণ্টন করার পর তিনি দুআ করেন এই বলে, 'হে আল্লাহ, আগামীতে এই অর্থ যেন আমাকে আর না পায়। কারণ, এ এক পরীক্ষা।' এ খবর হযরত উমরের রা. কানে গেল। তিনি মন্তব্য করলেন, 'এ এমন নারী যার থেকে শুধু ভালো আশা করা যায়।' তারপর হযরত উমর রা. কিছুক্ষণ তার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন এবং সালাম বলে পাঠান। তিনি যায়নাব রা.-কে বলেন, আপনি যা কিছু করেছেন সবই আমি জেনে গেছি। ফিরে গিয়ে তিনি আরও এক হাজার দিরহাম তার খরচের জন্য পাঠান। তিনি সেগুলোও আগের মতো খরচ করে ফেলেন। ঐতিহাসিকরা বলছেন, হযরত যায়নাব রা.-এর উপর্যুক্ত দুআ কবুল হয় এবং তিনি সে বছরই ইন্তেকাল করেন। ২৫২
ইবন সাআদ বর্ণনা করেছেন, 'যায়নাব বিনতে জাহশ দিরহাম-দীনারের কিছুই রেখে যাননি। যা কিছুই তার হাতে আসত দান করে দিতেন। তিনি ছিলেন গরীব-মিসকীনদের আশ্রয়স্থল। ২৫৩
হযরত যায়নাব রা. একজন হস্তশিল্পী ছিলেন। তিনি নিজ হাতে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় চামড়া দাবাগাত করে পাকা করতেন এবং তার থেকে যে আয় হতো তা সবই অভাবী মানুষদের দান করতেন।
হযরত আয়েশা রা. থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, যায়নাব রা. হাতে সূতা কেটে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধবন্দীদের দিতেন। আর তারা কাপড় বুনত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধের কাজে তা ব্যবহার করতেন। হযরত যায়নাব যে চূড়ান্ত পর্যায়ে খোদাভীরু, বিনয়ী ও আবিদা নারী ছিলেন তার সাক্ষ্য দিয়েছেন খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
দ্রুত সেই আমার সাথে মিলিত হবে যার হাত সবচেয়ে বেশি লম্বা
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতের পূর্বে একবার তার বিবিগণের কাছে বলেন, 'তোমাদের মধ্যে খুব দ্রুত সেই আমার সাথে মিলিত হবে যার হাত সবচেয়ে বেশি লম্বা।' তিনি হাত লম্বা দ্বারা রূপক অর্থে দানশীলতা বুঝিয়েছেন; কিন্তু সম্মানিত বিবিগণ শব্দগত অর্থ বুঝেছিলেন। এ কারণে তারা একত্র হয়ে পরস্পর পরস্পরের হাত মেপে দেখতেন যে, কার হাত বেশি লম্বা। যায়নাব রা. ছিলেন ছোট খাট মানুষ। যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর ইন্তেকাল না হওয়া পর্যন্ত তারা এমন করতেন; কিন্তু তিনি যখন সবার আগে মারা গেলেন তখন গভীরভাবে চিন্তা করে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথার তাৎপর্য বুঝতে পারেন। তাই হযরত আয়েশা রা. এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা হাতের অধিকারিণী ছিলেন যায়নাব। কারণ, তিনি নিজের হাতে কাজ করে উপার্জন করতেন এবং তা দান করতেন। ২৫৪
বিদায়ের ক্ষণ
হিজরী ২০ হিজরী মোতাবেক ৬৪১ খিষ্টাব্দে হযরত যায়নাব রা. ইন্তেকাল করেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে পর্যন্ত তার দানের স্বভাব বিদ্যামান ছিল। নিজের কাফনের ব্যবস্থা নিজেই করে যান। তবে তিনি আপনজনদের বলে যান, আমার মৃত্যুও পর উমর রা. কাফনের কাপড় পাঠাতে পারেন, যদি তেমন হয় তাহলে দুইটির যেকোনো একটি কাফন গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে। ২৫৫
তিনি আরও অসিয়ত করে যান যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে খাটিয়াতে করে কবরের কাছে নেওয়া হয়েছিল, তাকেও যেন সেই খাটিয়ায় বহন করা হয়। তিনিই প্রথম মহিলা যাঁকে হযরত আবু বকরের রা. পরে এই খাটিয়ায় ওঠানো হয়। তার দু-টি অসিয়তই পালিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য বিবিগণ তাকে গোসল দেন।
খলীফা হযরত উমর রা. তার জানাযার নামায পড়ান এবং জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়।
রাবীআ ইবনে আবদিল্লাহ বলেন, 'আমি উমর রা.-কে দেখলাম, তার এক কাঁধে দুররা ঝোলানো। সেই অবস্থায় সামনে গেলেন এবং চার তাকবীরের সাথে যায়নাব রা.-এর জানাযার নামায পড়ালেন, কবরের উপরে পানি ছিটিয়ে দেওয়া পর্যন্ত তিনি কবরের পাশে ছিলেন।
লাশ কবরে নামানোর সময় হযরত উমর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য বিবিগণের নিকট জানতে চান যে, তার কবরে কে কে নামবে? তারা বলেন, জীবদ্দশায় যারা তার কাছে যাওয়া-আসা করত তারা নামবে। অতঃপর হযরত উমর রা.-এর নির্দেশে মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসামা বিন যায়িদ, আবদুল্লাহ ইবনে আবি আহমাদ ইবনে জাহাশ ও মুহাম্মাদ ইবনে তালহা রা. কবরে নামেন। তারা সকলে ছিলেন হযরত যায়নাব রা.-এর আত্মীয়-স্বজন।
হযরত যায়নাব রা.-এর মৃত্যুতে হযরত আয়েশা রা. দারুণ শোকাভিভূত হন। তিনি তার সেই সময়ের অনুভূতি প্রকাশ করেন এভাবে : 'তিনি প্রশংসিত ও অতুলনীয় অবস্থায় চলে গেলেন। ইয়াতীম ও বিধবাদের অস্থির করে রেখে গেলন।' হযরত যায়নাব রা. সেদিন মারা যান সেদিন মদীনায় গরীব-মিসকীন ও অভাবী মানুষরা শোকে আহাজারি শুরু করে দেয়।
আম্মাজান হযরত যায়নাব রা.-এর এমন জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সা.-এর স্ত্রী হিসেবে থাকবেন-যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো হৃদয় তা অনুভবও করতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
টিকাঃ
২৩৩. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২১২।
২৩৪. আল হিলইয়া, ২/৫১।
২৩৫. আসহাবুর রাসূল, ২/৪৭৮-৪৭৯।
২৩৬. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/১০৭-১০৮।
২৩৭. সূরা হাশর, ৫৯:৯।
২৩৮. সূরা আহযাব, ৩৩:৩৬।
২৩৯. সূরা আহযাব, ৩৩:৩৭।
২৪০. সূরাহ আহযাব, ৩৩:৩৭।
২৪১. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৭৮৭।
২৪২. সহীহ, মুসলিম, ১৪২৮; সুনান, নাসায়ী: ৬/৮০৭৯; মুসনাদ, আহমাদ, ৩/১৯৫-১৯৬।
২৪৩. সহীহ, মুসলিম: ১৪২৮।
২৪৪. সহীহ, বুখারী, ৭৪২১; মুসনাদ, আহমাদ: ৩/২২৬।
২৪৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/১৪৬; আনসাবুল আশরাফ, ১/৪৩৫।
২৪৬. সহীহ, বুখারী, ৭৪২০; সুনান, আত-তিরমিযী, ৩২১৩।
২৪৭. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৭৫০; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৭৭০।
২৪৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫১৭১।
২৪৯. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৯১২।
২৫০. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৪২।
২৫১. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫২।
২৫২. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১০৯-১১০।
২৫৩. নিসাউন মুবাশশিরাত বিলজান্নাহ, ১৬৬-১৬৭।
২৫৪. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫২।
২৫৫. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১০৮।
📄 জুয়াইরিয়া বিনতুল হারিস রা.
দীর্ঘকাল ধরে মানবজাতি ছিল অজ্ঞতা ও মূর্খতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তার নবীর মাধ্যমে হিদায়াতের ঐশী বাণী পাঠালেন। বিশ্বাসীরা এতে উভয় জগতের আলোকদীপ্ত পরম সফলতার সন্ধান লাভ করে। আজ আমরা এমনই এক বিশ্বাসী আলোকিত মানবীর জীবনী আলোচনা করব।
হ্যাঁ, আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত জুয়াইরিয়া বিনতে হারিস রা.-এর কথাই বলছি। মহান আল্লাহ তাআলা যাঁর জীবনকে উভয় জগতেই সাফল্যে ভরপুর করে দিয়েছেন। তিনি ছিলেন তার গোত্রের বহু সংখ্যক লোকের মুক্তির সোপান। এমনই হন প্রকৃত মুসলমান। তারা নিজেদের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্ববাসীর জন্য রেখে যান অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
এরই প্রেক্ষিতে আমরা সেই গোয়ালিনীর পুত্রের কথাটুকু সামনে আনতে পারি। সংক্ষেপে যাঁর ঘটনাটি এই : গভীর রাত। আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তার গোলাম আসলামকে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন প্রজাদের খোঁজ-খবর নিতে। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে তিনি একটি দেয়ালের ওপর ভর করে দাঁড়িয়েছেন। এমন সময় তার কানে এক মহিলার কণ্ঠ ভেসে আসে। মহিলা তার মেয়েকে বলছে, বেটি, উঠে দুধের সঙ্গে পানি মিশিয়ে দাও। মেয়ে তার মাকে বলল, মা, আপনি কি আজ শোনেননি, আমীরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে ঘোষণাকারী ঘোষণা করেছে, কেউ যেন দুধের সঙ্গে পানি না মেশায়। অতঃপর মা বলল, বেটি, যাও, উঠে দুধে পানি মেশাও। কারণ, তুমি এমন স্থানে রয়েছ যে, তোমাকে উমর বা উমরের ঘোষণাকারী কেউই দেখছে না।
যুবতী বলল, মা, উমর যদিও আমাদের দেখছে না, উমরের প্রভু মহান আল্লাহ তো আমাদের দেখছেন। আল্লাহর কসম! আমি এমনটি করতে পারব না যে, সবার সামনে তার আনুগত্য করব আর অন্তরালে তার অবাধ্য হব! হকের পতাকাবাহী উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এসব কথোপকথন শুনে বললেন, হে আসলাম, এই স্থানটি চিনে রাখ। অতঃপর উমর রা. ফিরে আসেন।
পরদিন সকালে উমর রা. আসলামকে বললেন, 'হে আসলাম, ওই স্থানে যাও, খোঁজ নিয়ে আস, কে কাকে এ কথাগুলো বলেছিল। তাদের অভিভাবক আছে কি না?' আসলাম খোঁজ নিয়ে এসে উমর রা.-কে জানাল, 'ওই যুবতীটি অবিবাহিত। সম্বোধিত মহিলাটি তার মা। তাদের কোনো অভিভাবক নেই।'
অতঃপর উমর তার সন্তানদের ডেকে বললেন, তোমাদের কি কারও বিয়ে করা প্রয়োজন? তার ছেলে আসেম বলল, বাবা! আমার কোনো স্ত্রী নেই। আমি বিয়ে করতে ইচ্ছুক। অতঃপর তিনি ওই যুবতীকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন।
তার গর্ভ থেকেই জন্ম নেয় উম্মে আসেম। তাকে বিয়ে করেন আবদুল আযীয ইবনুল মারওয়ান। তার গর্ভ থেকেই জন্মগ্রহণ করেন ইসলামের পঞ্চম খলীফা আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল আবদুল আযীয রহ.।
কেমন ছিলেন তিনি?
একরাতে আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনে আবদুল আযীয এশার পর দুই রাকআত নামায পড়ে হাতে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। তার গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছিল।
তাঁর স্ত্রী ফাতিমা তো বলেছেন, 'আওয়ায করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।' ভাব দেখে মনে হচ্ছে তার কলিজা ফেটে রূহ বের হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এভাবে সকাল পর্যন্ত কাঁদলেন। অতঃপর পরদিন আবার রোযা রাখলেন। তার স্ত্রী তার কাছে গিয়ে উষ্ণকণ্ঠে বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি গতকাল দিনে যে কারণে কান্না করছিলেন এখনো কি সে কারণেই কান্না করছেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তুমি আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।' স্ত্রী বলল, 'মেহেরবানি করে কারণ বর্ণনা করুন। হয়তো এ থেকে আমি উপদেশ গ্রহণ করতে পারব।' তিনি বললেন: তাহলে শোনো, আমি চিন্তা করে দেখলাম আমি এ উম্মতের ছোট-বড়, সাদা-কালো সকলের আমীর! এ পৃথিবীরে আনাচে কানাচে রয়েছে অসংখ্য গরীব, নিঃস্ব, অভাবী, বন্দী, স্বামীহারা, সন্তানহারা ইত্যাদি। তাদের সকলের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন আমাকে জিজ্ঞেস করবেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ব্যাপারে আমার প্রতিপক্ষ হবেন। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, আল্লাহর কাছে আমার কোনো অক্ষমতা গ্রহণযোগ্য হবে না এবং রাসূলের কাছে আমার কোনো দলীল-প্রমাণই টিকবে না। এ আশঙ্কায় আমার অন্তর প্রকম্পিত। তাই আমি অশ্রু ঝরাচ্ছি। একথাগুলো যখনই আমার অধিক পরিমাণে স্মরণ হয় ভয়-ভীতিও অধিকহারে বেড়ে যায়। আমি তোমাকে আমার কান্নার কারণ অবহিত করলাম এখন হয়তো তুমি উপদেশ গ্রহণ কর কিংবা আমাকে আমার হালতে ছেড়ে দাও।
এটা নতুন করে বলার কিছু নয় যে, উমর ইবনুল আবদুল আযীযের শাসনামলে ইসলামী রাষ্ট্র নতুন রূপ লাভ করে। সর্বত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যায়-অবিচার, যুলুম-নির্যাতন উঠে যায়। ছাগলের রাখালরা বলতে লাগল, কে সেই নেককার ব্যক্তি যিনি খেলাফতের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন? তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হলো, খলীফা সৎ ও ন্যায়পরায়ণ তা তোমরা কীভাবে জানতে পারলে? তারা বলল, যখন ন্যায়পরায়ণ শাসক অধিষ্ঠিত হয় তখন বাঘও ছাগলের ওপর আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকে। ২৫৬
জাসরুল কাসসাব বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল আবদুল আযীয রহ.-এর শাসনামলে আমি ছাগলের দুধ দোহন করতাম। একদা আমি এক রাখালের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, যার ছাগলের পালে প্রায় ত্রিশটি বাঘ ঢুকে এক সঙ্গে খাবার গ্রহণ করছিল। আমি সেগুলোকে কুকুর ভেবেছিলাম। কারণ, ইতোপূর্বে আমি বাঘ দেখি নাই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওহে রাখাল! বাঘ ছাগলের পালে, অথচ ছাগলকে কোনো ক্ষতি করছে না!
সে বলল, হে বৎস, শোনো, মাথা যখন ঠিক হয়ে যায়, তখন শরীরে কোনো অসুবিধা থাকে না।
আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল আবদুল আযীয মৃত্যুশয্যায় শায়িত। মাসলামা ইবনুল আবদুল মালিক তাকে দেখতে এসে দেখেন, তার গায়ে ময়লা জামা। তাই সে ফাতিমা বিনতে আবদুল মালিককে বললেন, ফাতিমা, আমীরুল মুমিনিনীনের জামাটি ধুয়ে দিয়ো। তিনি বললেন, ঠিক আছে, ইনশাআল্লাহ। এর কয়েকদিন পর মাসলামা আমীরুল মুমিনিনকে আবারও দেখতে এসে দেখেন সেই ময়লা কাপড়ই পরা আছে। তাই তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, ফাতিমা! আমি কি তোমাকে আমীরুল মুমিনিনীনের জামাটি ধুয়ে দিতে বলিনি?
লোকজন তাকে দেখার জন্য আসে। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, এছাড়া আর কোনো জামা নেই। হ্যাঁ, এমনই ছিলেন সেই গোয়ালিনীর ছেলে আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ.।
প্রাচুর্যে প্রতিপালিত
উপর্যুক্ত ভূমিকার পর আমরা ওই মহীয়সী সাহাবীর জীবন কাননের সুবাস নেবো—যিনি ছিলেন উত্তম চরিত্র, সৎকর্ম ও বরকতের আধার। উম্মুল মুমিনীন হযরত জুয়াইরিয়া বিনতুল হারিস রা. হিজরতের চৌদ্দ বছর পূর্বে এক সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হারিস ইবনে আবি যিরার ছিলেন বনী মুসতালিম গোত্রের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও প্রখ্যাত দানশীল ব্যক্তি। হযরত জুওয়াইরিয়ার রা. প্রথম বিয়ে হয় তাঁরই গোত্রের ‘মুসাফি ইবনে সাফওয়ান’ (জীশুফার) নামের এক ব্যক্তির সাথে; কিন্তু মহান আল্লাহর কী অপার মহিমা! এক সময় তিনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর সম্মানিতা স্ত্রীর মর্যাদায় ভূষিত হন। মূল ঘটনায় যাওয়ার পূর্বে আমাদের কিছু পূর্বকথা জেনে রাখতে হবে।
আরবের বুকে ইসলামের সূর্য
মুসলমানদের ওপর যুলুম অত্যাচার ও নির্যাতনের ক্রমাগত ধারা নবুয়তের চতুর্থ বছরের মাঝামাঝি বা শেষদিকে শুরু হয়েছিল। প্রথমদিকে ছিল মামুলি কিন্তু দিনে দিনে এর মাত্রা বেড়ে চলল। নবুয়তের পঞ্চম বছরের মাঝামাঝি সময়ে তা চরমে পৌঁছল। মক্কার অবস্থান করা মুসলমানদের জন্যে অসম্ভব হয়ে উঠল। সেই সঙ্কটময় এবং অন্ধকার সময়ে সূরা কাহাফ নাযিল হয়েছিল। এতে মুশরিকদের উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়েছে। তাতে বর্ণিত তিনটি ঘটনায় আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিন বান্দাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জানা ছিল যে, আবিসিনিয়ার বাদশাহ আসহামা নাজ্জাশী একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তার রাজ্যে কারও ওপর কোনো জুলুম অত্যাচার করা হয় না। এ কারণে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদেরকে তাদের দ্বীনের হেফাজতের জন্য আবিসিনিয়ায় হিজরত করার আদেশ দিলেন। এরপর পরিকল্পিত কর্মসূচী অনুযায়ী রজব মাসে সাহাবায়ে কেরামের প্রথম দল আবিসিনিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
রাতের অন্ধকারে চুপিসারে তারা গন্তব্যস্থলের দিকে অগ্রসর হন। কুরাইশদের জানতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের সতর্কতার ব্যবস্থা করা হয়। মুসলমানরা আবিসিনিয়ায় পৌঁছে স্বস্তির নিঃশেষ ফেলেন। সেই বছরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার কাবা চত্বরে প্রবেশ করে সূরা 'নাযম' তিলাওয়াত শুরু করেন। সেখানে নেতৃস্থানীয় কুরাইশরাও সমবেত হয়েছিল। সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদা করলে কুরাইশরাও সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। কুরাইশদের এই সিজদার খবর আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলমানদের নিকট পৌঁছে যায়। তারা শুনলেন, কুরাইশ নেতারা সবাই মুসলিম হয়ে গেছে। কিন্তু তারা ভুল খবর পেয়েছিলেন। এ খবর পাওয়ার পর শাওয়াল মাসে তারা মক্কায় ফিরে আসার জন্য আবিসিনিয়া ত্যাগ করেন। মক্কা থেকে একদিনের দূরত্বে থাকার সময় তারা আসল খবর লাভ করেন। এরপর কেউ কেউ আবিসিনিয়ায় ফিরে গেলেন, আবার কেউ কেউ চুপিসারে অথবা কুরাইশদের কোনো লোকের আশ্রিত হিসেবে মক্কায় প্রবেশ করেন।
আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরত
এরপর সেই হিজরতকারী মুহাজিরদের ওপর, বিশেষভাবে মুসলমানদের ওপর সাধারণভাবে মুশরিকদের অত্যাচার আরও বেড়ে গেল। পরিবারের অমুসলিমরা মুসলমানদের নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগল। কেননা, কুরাইশরা খবর পেয়েছিল যে, নাজ্জাশী মুসলমানদের সাথে খুব ভালো ব্যবহার করেছেন এবং আবিসিনিয়ায় মুসলমানরা খুব ভালোভাবেই দিন কাটিয়েছেন। এ খবর তাদের অর্ন্তজ্বালা বাড়িয়ে দিয়েছিল। কুরাইশদের অত্যাচার নির্যাতন বেড়ে যাওয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে সাহাবাদের পরামর্শ দেন। তবে প্রথমবারের হিজরতের চেয়ে এটা ছিল অনেক কঠিন। কারণ, কুরাইশ মুশরিকরা এবার ছিল অনেক সতর্ক। তাদের ফাঁকি দিয়ে মুসলমানরা অন্যত্র চলে গিয়ে নিরাপদে জীবনযাপন করবে-এটা তারা ভাবতেই পারছিল না; কিন্তু মুসলমানরা অমুসলিমদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়ায় আল্লাহ সুবহানহু ওয়া তাআলা তাদের জন্য আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পথ সহজ করে দিলেন। ফলে হিজরতকারী মুসলমানরা কুরাইশদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগেই আবিসিনিয়ার বাদশাহের কাছে পৌঁছে গেলেন। এবার বিরাশি বা তিরাশিজনের একটি দল হিজরত করেন।
মাতৃভূমির আকর্ষণ ত্যাগ করে, আত্মীয়-স্বজন ও পরিবার-পরিজনের মায়া-বন্ধন ছিন্ন করে আল্লাহর রাহে বাড়ি-ঘর ত্যাগের এই মহান গুরুত্বপূর্ণ আমল যেমন বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাদের জন্য খোদার প্রেমের কঠিন পরীক্ষা তেমনি তার অভ্যন্তরে নিহিত থাকে আল্লাহর সাহায্যের সূচনা।
যে সকল নবীর জীবনে হিজরতের ঐশী আদেশ এসেছে, তা এসেছে চূড়ান্ত পরীক্ষা ও বিজয়ের সূচনা হিসেবে। উদাহরণস্বরূপ হযরত ইবরাহীম আ.-এর কথা বলা যেতে পারে। নবুওয়াতলাভের পর হতে তিনি নিজ মাতৃভূমির মানুষকে রাত-দিন দাওয়াত দিলেন; কিন্তু তা গ্রহণ করেনি তারা, ত্যাগ করেছে তার সঙ্গ। তাকে অকথ্য নির্যাতন করতেও দ্বিধা করেনি। দ্বিধা করেনি তাকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করতে। তখন আল্লাহর পক্ষ হতে সিরিয়ায় হিজরতের নির্দেশ আসে। তাই তিনি ঘোষণা করেন,
'নিশ্চয়ই আমি আমার রবের দিকে হিজরত করছি, তিনি মহা পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।' ২৫৭
তাঁর এই হিজরতের ফলে সূচিত হয় এক বিপ্লবের। আসে ব্যাপক সফলতা ও আল্লাহর সাহায্য। আল্লামা ইবনে কাসীর রাহ. বলেন, 'যখন তিনি (ইবরাহীম আ.) মাওলার সন্তুষ্টির জন্য স্বীয় কওমকে ত্যাগ করলেন এবং সে দেশ থেকে হিজরত করলেন, তখন তার স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা ও নিঃসন্তান। তাদের কোনো সন্তান ছিল না। ছিল শুধু ভাতিজা লূত ইবনে হারুন ইবনে আজর। হিজরতের পর আল্লাহ তাকে অনেক নেক সন্তান-সন্ততি দান করলেন। তার বংশে দেওয়া হলো নবুওয়াত ও আসমানী কিতাব। এরপর পৃথিবীতে যত নবী তাশরীফ এনেছেন তারা সবাই হযরত ইবরাহীম আ.-এর বংশধর। এরপর যমীনে যত আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছে তা নাযিল হয়েছে হযরত ইবরাহীম আ.-এর সন্তানের উপর। এটি আল্লাহ প্রদত্ত সম্মান ও অপার অনুগ্রহ। কেননা, তিনি তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজ ঘর-বাড়ি ও আত্মীয়-স্বজনকে ত্যাগ করেছেন। এমন ভূমির দিকে হিজরত করেছিলেন যেখানে নিরাপদে আল্লাহর ইবাদত করা যায় এবং তার পথে মাখলুককে দাওয়াত দেওয়া যায়। ২৫৮
এই ধারায় হিজরত করেছেন আল্লাহর বহু নবী-রাসূলগণ। সকলের হিজরতের অক্লান্ত কষ্টের মাঝেই লুকিয়ে ছিল প্রাপ্তির সুসংবাদ আর বিজয়ের সূচনা। নিহিত ছিল ইবাদাতের স্পৃহা আর ঈমানের তেজসহ আরও অসংখ্য হিকমত। যা আল্লাহই ভালো জানেন। এই ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে এলেন রহমতের নবী, আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নবুওয়াতলাভের পর প্রায় তেরোটি বছর—তাঁর নবুওয়াতী জীবনের সিংহভাগ—তিনি কাটিয়ে দিলেন মক্কার কাফেরদের মাঝে। জনে-জনে, গোত্রে-গোত্রে, গ্রামে-পল্লীতে, পথে-প্রান্তরে মক্কার মানুষদের তিনি আহ্বান করলেন ইসলামের কালেমার দিকে, তাওহীদের সত্য পথে। কিছু মানুষ তার দাওয়াতে সাড়া দিল, কিন্তু মক্কার অধিকাংশ লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তার অনুসারীবৃন্দ এবং ইসলামের দাওয়াতকে প্রতিহত করতে উঠে পড়ে লাগে। নির্যাতন-নিপীড়নের মাত্রা দিন দিন চরম আকার ধারণ করে। কখনো ফুটন্ত গরম পানি শরীরে ঢেলে দিয়ে, আবার কখনো মরুভূমির প্রচণ্ড উত্তপ্ত পাথর-বালিতে টানা হেঁচড়া করে সাহাবীদের তারা অতিষ্ঠ করে তোলে। এমন বর্বর নির্যাতনের মাঝে কেটে গেল পাঁচটি বছর। ইতিহাসে এমন একজন সাহাবীর নামও পাওয়া যাবে না, যিনি এই সময়ের ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে নবীজীকে ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, কিংবা ছেড়ে দিয়েছেন তাওহীদী বিশ্বাস; বরং তারা ছিলেন ঈমানের ওপর অটল-অবিচল। প্রাণ দিয়েছেন, দিতে প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু দেননি ঈমান। কারণ তারা তার হাতে হাত রেখে বাইয়াত হয়েছিলেন, এ পথে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার। নিয়েছিলেন তাকে ছেড়ে কোথাও পালিয়ে না যাওয়ার বজ্র কঠিন শপথ।
আবার আল্লাহরই নির্দেশে কিংবা নবীজীর আদেশে বাস্তুভিটা ত্যাগ করে হিজরতের ওয়াদাও তারা দিয়েছিলেন। জীবন দান, পালিয়ে না যাওয়া ও হিজরতের ওয়াদা সম্বলিত সুনানে তিরমিযীর ১৫৯১ থেকে ১৫৯৬ পর্যন্ত বাইয়াতের হাদীসগুলো দেখলে সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, হিজরত নিছক দেশ ত্যাগ নয়, নয় পলায়ন। অন্যথায় পালিয়ে না যাওয়ার ওয়াদার পর আবার হিজরতের জন্য বাইয়াত করার অর্থ কী দাঁড়াতে পারে?
সে যাই হোক, নবুওয়াতপ্রাপ্তির প্রায় পাঁচ বছর পর নবীজী ভাবলেন, কাফেরদের নির্যাতন তো সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। সাথে তারা সাহাবীদের ঘরের কোণের ইবাদত-বন্দেগীতেও বাঁধার সৃষ্টি করছে। তখন তিনি আল্লাহর নির্দেশে নিরাপদভাবে আল্লাহর ইবাদতের নিমিত্তে সাহাবীদের মধ্যে যাদের পক্ষে সম্ভব হয় তাদেরকে আবিসিনিয়ায় হিজরতের পরামর্শ দিলেন। নবীজীর পরামর্শে নবুয়তের পঞ্চম সনে প্রথমবারের মতো প্রায় পনেরজন মুসলমানের একটি ছোট্ট কাফেলা আবিসিনিয়ার পথে মক্কা থেকে হিজরত করেন। পরবর্তী বছর আরও প্রায় এক'শ জনের একটি বিশাল কাফেলা একই দেশে হিজরত করেছেন। ২৫৯
এভাবে কেটে যাচ্ছে নবুওয়াতপ্রাপ্তির প্রায় বারো-তেরটি বছর। যখন কাফেরদের ঔদ্ধত্য সীমা ছাড়িয়ে গেছে, তখন আল্লাহ তার সাহায্য ও নুসরত, দ্বীনের বিজয়, কালেমার বিশ্বময় প্রসারের জন্য মুমিনদের সর্বশেষ পরীক্ষার আয়োজন করেন। নবীজী আল্লাহর হুকুমে তাদের নির্দেশ দিলেন মদীনায় হিজরতের।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, 'নবীজী মক্কায় অবস্থান করছিলেন, আর কবীলাগুলোকে আহ্বান করছিলেন আল্লাহর পথে। প্রত্যেক হজ মওসুমে সমবেত সব গোত্র-কবীলার কাছে তিনি তাকে আশ্রয়দানের জন্য পেশ করতেন। যাতে তিনি সেখানে থেকে আল্লাহর রিসালাতের তাবলীগ করতে পারেন। আর এর প্রতিদানে তারা অর্জন করে নেয় জান্নাত; কিন্তু কোনো গোত্রই তার এই কথায় কর্ণপাত করেনি। অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা এই সম্মান আনসারদের ভাগ্যেই রেখেছিলেন। আল্লাহ যখন তার মনোনীত দ্বীনের প্রসার ও প্রতিষ্ঠা, স্বীয় ওয়াদা পূরণ, তার নবীর সাহায্য, কালেমার বিজয় এবং এই দ্বীনের শত্রুদের প্রতিশোধ নেওয়ার ইরাদা করলেন তখন সে দ্বীনকে তিনি মদীনায় নিয়ে যান আনসারদের কাছে।... এভাবে দ্বীন তাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ল। আনসারীদের এমন কোনো ঘর-বাড়ি ছিল না যেখানে নবীজীর আলোচনা হচ্ছিল না। অতঃপর নবীজী সাহাবীদের আদেশ করলেন মদীনায় হিজরতের। আর তারা দলে দলে মদীনার পথ ধরলেন। আনসারীরা মদীনায় তাদের অভ্যর্থনা জানালেন, স্বীয় গৃহে মেহমান বানালেন। তাদের দিকে বাড়িয়ে দিলেন সহযোগিতার হাত। এভাবেই ইসলাম ছড়িয়ে পড়ল পুরো মদীনায়। ২৬০
সাহাবায়ে কেরামদের দলে দলে এই হিজরত কোনো অদৃশ্য বিষয় ছিল না, ছিল না রাতের আঁধারে পালিয়ে যাওয়া। বরং বাধা-বিঘ্নহীনভাবে আপন দীন-ঈমানের সুরক্ষা ও ইবাদতের উপযোগী পরিবেশপ্রাপ্তির জন্য আল্লাহ ও রাসূলের আদেশে, তাদেরই সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, তাদেরই দেখিয়ে দেওয়া দেশের উদ্দেশ্যে আপন দেশকে তারা বিদায় জানাচ্ছিলেন। এ ছিল একটি মহান ইবাদত ও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ পালনমাত্র। এ জন্য তারা ঈমানী বলে বলীয়ান হয়ে সহায়-সম্পত্তির লোভ, গৃহ-বাড়ির প্রেম, পরিবার-পরিজনের টান, আর জন্মভূমির ভালোবাসাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অনন্তর ছুটে চলেছেন এই ইবাদত পালনের পথে। দিন-দুপুরে কিংবা রাতের গভীরে, প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে কিংবা সকলের অগোচরে, দলে দলে কিংবা একাকী, পায়ে হেঁটে কিংবা সওয়ারীর পিঠে চড়ে, যিনি যেভাবে পেরেছেন, যখনই পেরেছেন এই ইবাদত পালন করেছেন। পালন করেছেন হিজরতের আদেশ। ছুটে গেছেন মদীনায়।
একাকী বা কাফেলার সাথে মুসলমানরা মক্কা ত্যাগ করছিলেন। মুশরিকদের হাতে আটকে পড়া কিছু অক্ষম মুসলমান ছাড়া পুরো মক্কায় তেমন কোনো সাহাবী নেই; কিন্তু তখনো মক্কায় রয়ে গেলেন আল্লাহর নবী। সাথে রাখলেন, তাঁর ‘জানেসার’ দু-জন সাহাবী হযরত আবু বকর ও আলী রা.-কে। সহীহ বুখারীর বিশুদ্ধ বর্ণনামতে, ‘হযরত আবু বকর রা.ও অন্য সাহাবীদের মতো হিজরতের জন্য প্রস্তুত হলেন; কিন্তু নবীজী তাঁকে বললেন, অপেক্ষা করো, আশা করছি, আমাকেও হিজরতের অনুমতি দেওয়া হবে। অতঃপর হযরত আবু বকর রা.ও নবীজীর সঙ্গী হতে রয়ে গেলেন মক্কায়। আর সফরের প্রস্তুতিস্বরূপ প্রায় চার মাস যাবত দু-টি উষ্ট্রী বাহনের পরিচর্যা করতে লাগলেন। ২৬১
মদীনায় হিজরত
নবীজীর কী পরম দৃঢ়তা! প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি ও শংকা মাথায় নিয়েও নবীজী সাহাবীশূন্য মক্কায় দিব্যি হেঁটে চলেছেন মুশরিকদের নাগালের মধ্যেই। একদিন বা দু-দিন নয়, একে একে চারটি মাস। শুধুই আল্লাহর ওহীর অপেক্ষা! এত ঝুঁকির মাঝে মদীনাবাসীদের বারংবার তাগাদা সত্ত্বেও তিনি স্বেচ্ছায় মক্কা ত্যাগ বা মদীনায় আশ্রয় গ্রহণের জন্য একটি কদমও বাড়াননি। এভাবে কেটে গেল চারটি মাস। এক সময় মুশরিকদের ঔদ্ধত্য চরম আকার ধারণ করল। তারা নবীজীকে নিয়ে রাতে পরামর্শে বসল। কেউ বলল, নবীজীকে বন্দী করতে আর কেউ বলল, তাকে চিরতরে দেশান্তর করতে। পরে সম্মত হয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আগামীকাল সকালেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করে ফেলবে! নাউযুবিল্লাহ। কিন্তু তাদের সব পরিকল্পনা আল্লাহ নস্যাৎ করে দিলেন। রাতেই আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে এই চক্রান্তের কথা তার রাসূলকে জানিয়ে দিলেন।
আল্লাহ নবীজীকে নির্দেশ দিলেন, রাতে স্বীয় গৃহে শয়ন না করে তার স্থানে হযরত আলী রা.-কে রাখতে। এভাবে নবীজীর অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো, জিবরাঈল আ. হিজরতের নির্দেশ সম্বলিত আসমানী বার্তা নিয়ে এলেন। আয়াত নাযিল হলো,
'আর (হে নবী,) আপনি বলুন, হে আমার রব, আমাকে প্রবেশ করান কল্যাণের সাথে এবং আমাকে বের করান কল্যাণের সাথে। আর আমাকে আপনার পক্ষ হতে দান করুন সাহায্যকারী শক্তি।' ২৬২
হিজরতের নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে নিজ বাড়িতে আপন চাচাতো ভাই হযরত আলী রা.-কে রেখে নবীজী বের হলেন। হযরত আবু বকর রা.-কে সাথে নিয়ে পরদিন বের হলেন মদীনার পথে। রওনা হওয়ার মুহূর্তে বাইতুল্লাহর দিকে করুণ দৃষ্টি ফেলে নবীজী বললেন, 'হে মক্কা, খোদার কসম, তুমি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় শহর, আমার মাওলার কাছেও বেশি পছন্দের শহর তুমি। যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বের করে না দিত, আমি কখনোও বের হতাম না। ২৬৩
নবীজীকে দেশান্তরে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর একমাত্র আল্লাহর হুকুমে আদিষ্ট হয়েই তিনি মদীনার পথে হিজরত করেন। আর হিজরতের এই ঐশী হুকুম ও মহান ইবাদত পালনের মধ্য দিয়ে পদে পদে নেমে আসে আল্লাহর গায়েবী মদদ।
'আর যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন, যখন কাফেররা তাকে দেশান্তর করেছিল। তিনি ছিলেন দু-জনের দ্বিতীয়জন। যে সময় তারা দু-জন ছিলেন গুহায়। যখন তিনি তার স্বীয় সঙ্গীকে বলছিলেন, তুমি বিষণ্ণ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন। অতঃপর তার ওপর স্বীয় সাকীনা নাযিল করলেন এবং শক্তিশালী করলেন এমন সেনাদল দ্বারা, যাদের তোমরা দেখতে পাওনি। আল্লাহ কাফেরদের কালামকে নিচু করে দিলেন আর আল্লাহর কালেমাই হলো সমুচ্চ। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।' ২৬৪
নবীজী হিজরত করে মদীনায় এলেন। আর এর ফলে প্রতিফলন হলো পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে আসা আখেরী নবীর এই মদীনায় হিজরত করার সু- সংবাদটির। যার অপেক্ষায় ইহুদীরা কয়েক যুগ আগ থেকেই মদীনায় বসতি গড়তে শুরু করেছিল। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, হিজরত ছিল আল্লাহর দেওয়া অকাট্য বিধান যা নবীজি ও তার সাহাবীরা পালন করেছিলেন। আর দেশত্যাগের এই বিধান-যা একটি সাময়িক রণকৌশলও বটে-এর পালনের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন ও সশস্ত্র যুদ্ধে বাতিল শক্তির মুকাবিলার শুভ সূচনা হয়, উদিত হয় মক্কা বিজয়সহ ইসলামের বিশ্বজয়ের রঙিন সূর্য।
মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম
মদীনায় হিজরত করে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলাম প্রচারের উপযোগী পরিবেশ পেলেন। এখানে তিনি নিরাপদে ইসলাম প্রচার শুরু করলেন। তিনি মক্কা থেকে হিজরতকারী (মুহাজির) মুসলমানদের মদীনায় আশ্রয়দাতা (আনসার) মুসলমানদের সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিযরত করে মদীনাকে ইসলাম প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন। তিনি এখানে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর নিরাপত্তা ও হিফাজতের স্বার্থে কতগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তার মধ্যে মদীনার সনদ অন্যতম। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদী ও পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের লোকদের একত্র করে পরস্পরের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একটি সনদ সম্পাদন করেন। ইতিহাসে একে মদীনার সনদ নামে অভিহিত করা হয়। মদীনায় নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের এ সনদই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত চুক্তি বা সংবিধান।
সমাজের সকল শ্রেণীর নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ও ধর্মীয় অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান এবং পরমত সহিষ্ণুতা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্প্রীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত মদীনা সনদ বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান বা শাসনতান্ত্রিক সরকারের মর্যাদা লাভ করে। বিদায় হজে প্রদত্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐতিহাসিক ভাষণ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত। কোনো আন্দোলন কিংবা সংগ্রামের মুখে নয়, কোনো চাপের কাছে নত স্বীকার করে নয়, সম্পূর্ণ নবুওয়াতী দায়িত্ব ও কর্তব্যের খাতিরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদত্ত এই ভাষণে তিনি মানবাধিকার বিষয়ে যে সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখেন—তা অবিস্মরণীয়। তিনি বলেন, ‘আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর তোমাদের নিকট পবিত্র অনুরূপভাবে তোমাদের জীবন এবং সম্পদ ও পবিত্র।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, ‘কারও নিকট কোনো সম্পদ গচ্ছিত থাকলে তা প্রকৃত মালিকের নিকট অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। জাহিলী যুগের সমস্ত সুদ প্রথা রহিত করা হলো, কিন্তু মূলধন ফেরত পারবে।’ ‘জাহিলী যুগের সকল রক্তের প্রতিশোধ রহিত করা হলো।’ ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, আর অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যার শাস্তি হলো একশত উট রক্তপণ আদায়।
ঐতিহাসিকদের মতে, যে সময়ে ইহুদীরা মদীনাকে নিজেদের আবাসস্থল বানায় এবং বসবাস শুরু করে, সে সময়ে তারা চাইলে নিজেদের ধর্মের প্রচার ও প্রসার করে মদীনা এবং তৎসংশ্লিষ্ট পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারত। সুসংহত করতে পারত নিজেদের ক্ষমতা। এর ফলে তারাই হতো সমগ্র আরবে প্রবল পরাক্রমশালী জাতি, একমাত্র ক্ষমতাধর; কিন্তু যে সময়ে ইহুদীদের একজোট ঐক্যবদ্ধ হয়ে, নীতি-নৈতিকতাকে সম্বল করে ধর্মের প্রচার ও প্রসারে প্রয়াসী হওয়ার কথা; সে সময়ে তারা নিজেদের মন্দ চরিত্র ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে নিজেরা একে অপরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এমনকি তারা আরবদের সাথে মিলে পরস্পর নিজেদের স্বধর্মীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা শুরু করে। এবং সেসব যুদ্ধের সময় ইহুদীরা তাদের অপর ভাইদের বিরুদ্ধে আরবদের থেকেও বেশি কঠোরতার পরিচয় দেয়।
মদীনায় অবস্থানকারী ইহুদীদের বড় বড় গোত্র বনু কুরাইযা ও বনু নাযীর শত্রুতার সূত্র ধরে তাদের স্বজাতীয় অপর গোত্র বনু কাইনুকার বিরুদ্ধে মদীনায় বসবাসকারী আরব গোত্র আওসকে সাথে নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং সে যুদ্ধে তারা অত্যন্ত নির্মমভাবে, নিদয়তার সাথে বনু কাইনুকার রক্তপাত ঘটায়। অত্যন্ত কঠিন হাতে তাদের মেরুদণ্ড গুড়িয়ে দেয়। এমনকি তারা বনু কাইনুকাকে তাদের বাস্তুভিটা থেকেও উচ্ছেদ করে। যার ফলে বাধ্য হয়ে বনু কাইনুকা নিজেদের কৃষিকর্ম ও ক্ষেত-খামার পরিত্যাগ করে শিল্পকর্মকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করে।
ইহুদীরা এভাবে নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা জিইয়ে রাখার কারণে আরবের বুকে তারা একটি প্রবল পরাক্রমশালী জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করা তো দূরের কথা, নিজেদের আবাসস্থল সুনিশ্চিত করতেও তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা অসহায় হয়ে একেকজন একেক আরব সরদার বা রঈসের অধীনতা গ্রহণ করে তাদেরকে নিয়মিত রাজস্ব বা কর দিয়ে তাদের ছত্রছায়ায় ও সহায়তায় জীবন-যাপন করতে থাকে।
ইহুদী জাতির উদ্ভব হয় বনী ইসরাঈল থেকে। ইহুদীদের অতীত এবং বর্তমান কার্যক্রম ও চালচলন প্রত্যক্ষ, পর্যালোচনা করলে একথা নির্দিধায় বলা যায় যে, এই ইহুদীদের চরিত্র বড়ই নিকৃষ্ট, এদের অতীত ইতিহাস খুবই মন্দ। জন্ম থেকেই এরা ঝগড়া-ফ্যাসাদ, ধোঁকা-প্রবঞ্চনা ইত্যাকর অন্যায়-অপরাধ ও মন্দ কার্যকলাপে লিপ্ত।
এই ইহুদীরা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বে অসংখ্য- অগণিত নিষ্পাপ নবী-রাসূলদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। পবিত্র কুরআনেও যার উল্লেখ আছে। এমনকি এরা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পর্যন্ত হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে একাধিকবার; কিন্তু মহান আল্লাহর রহমতে তারা সফল হতে পারেনি।
ইহুদীরা তাদের মন্দ স্বভাব চরিত্র নিয়ে যে কেবল নিজেরাই মারামারি ও খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়ে থাকত তাই নয়, বরং তারা অন্যদের মাঝেও এসব দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ছড়িয়ে দিত। এই ইহুদীদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রেই মদীনার আরব বাসিন্দা, দুই ভাই তুল্য আউস ও খাযরাজ ১২০ বছর যাবত গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে ছিল। যার মধ্যে প্রথম যুদ্ধ ছিল 'সুমাইর' আর সর্বশেষ যুদ্ধ ছিল 'বুআস'।
ঐতিহাসিকগণ বলেন, ইহুদীরা নেপথ্যে থেকে আউস ও খাযরাজ এই দুই গোত্রকে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত করাতে চক্রান্ত করত এবং তাদের মাঝে অনৈক্য ও হানাহানির আগুন জ্বেলে দিত। একথা আরবরাও জানত। যার কারণে তারা ইহুদীদেরকে 'সাআলিব' তথা খেকশিয়াল উপাধিতে স্মরণ করত।
তবে ইহুদীরা ষড়যন্ত্র করে আউস ও খাযরাজকে যে যুদ্ধে লিপ্ত করিয়ে ছিল, তা পরবর্তী সময়ে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হয়। এ ঘটনা সম্পর্কে মুসলিম মনীষীগণ বলেন, মহান আল্লাহ তাআলা ইসলামের জন্য একটি পবিত্র ভূমি নির্বাচন করছিলেন। ইসলামের জন্য কেন্দ্র হিসেবে মদীনা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তাকে ইসলামের বহুল প্রচার ও প্রসারের জন্য উপযোগী করেছিলেন আউস ও খাযরাজের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে। কেননা, ইসলাম আসার পর তার বহুল প্রচার ও প্রসারের জন্য প্রয়োজন ছিল তিনি যেখানে এসে তার কেন্দ্র স্থাপন করবেন, সেই স্থানের অধিবাসীরা দুর্বল হওয়া। আর আউস ও খাযরাজের মধ্যে বিরাজমান ১২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ তা আঞ্জাম দিয়েছিল অত্যন্ত সুনিপুণভাবে। কেননা, এই যুদ্ধের দ্বারা আউস ও খাযরাজের বড় বড় সকল প্রতাপশালী সকল সরদার নিহত হয়, আউস-খাযরাজের মধ্যকার ঐক্য সম্পূর্ণ রূপে বিনষ্ট হয়ে যায়। তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি খণ্ড বিখণ্ড হয়ে যায়। ফলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে।
আর মদীনাকে ইসলামের কেন্দ্র বানানোর জন্য সকল প্রস্তুতি যখন শেষ হয়, মদীনা যখন ইসলামের কেন্দ্র হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলী অর্জন করতে সক্ষম হয়, তখন মহান আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মদীনায় হিজরতের আদেশ দেন। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা ছেড়ে মদীনার দিকে রওনা হন।
বদরের যুদ্ধের পর তৎকালীন আরবের বুকে দু-জন প্রভাবশালী ব্যক্তির উদয় হয়। তারা হলেন মদীনায় হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর অন্যজন হলেন মক্কায় আবু সুফিয়ান। এ যুদ্ধ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায় এবং আবু সুফিয়ান হয়ে যান কুরাইশদের প্রধান। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে তৎকালীন মদীনায় বসবাসকারী বনু কায়নুকা ইহুদী সম্প্রদায়ের প্রথম সংঘাত শুরু হয়। এ গোত্রের বিভিন্ন কার্যকলাপ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাজনৈতিক শীর্ষত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। তারা মদীনা সনদকে উপেক্ষা করে একজন মুসলিম নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে বসে। বদরের যুদ্ধের পরপরই এ ঘটনা ঘটে। একজন মুসলিম মহিলা বনু কায়ানুকা গোত্রের একজন স্বর্ণকারের দোকানে গেলে তাকে তার চুল খুলতে বাধ্য করা হয় এবং তাকে ও তার পরিধেয় বস্ত্র এমনভাবে বাধা হয় যে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা খুলে যায়। মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়ে কায়নুকা গোত্রের ইহুদীরা প্রথমে মদীনার উত্তরে অবস্থিত ওয়াদি-আল-কুরাতে বসবাস শুরু করে। পরবর্তী সময়ে তারা সিরিয়ার দেরাতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
আগেই বলেছি উহুদের যুদ্ধের পর ইহুদীরা মুসলমানদের শক্তির ওপর সন্ধিহান হয়ে পড়ে। তারপর ৩১ মার্চ ৬২৭ সালে শুরু হয় খন্দকের যুদ্ধ। এ যাত্রায় বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিল বনু কুরাইযা গোত্রের ইহুদীরা এবং বনু নাযীর গোত্রের ইহুদীরা। কনফেডারেট সেনাবাহিনীর সৈন্যরা প্রথমে বনু কুরাইযা গোত্রের সঙ্গে মদীনা শহরের উভয় প্রান্ত থেকে আক্রমণের জন্য শলাপরামর্শ করে। এ কাজে সফল হতে না পেরে তারা বনু নাযীর, বনু গাতফান, বনু আসাদ, বনু সুলাইম, বনু আমির, বনু মুরা ও বনু শুয়া ইত্যাদি ইহুদী গোত্র সহকারে মদীনা নগরী ২৭ দিন অবরোধ করে রাখে। যুদ্ধের পর মুসলমানরা বনু কুরাইযা গোত্রকে ২৫ দিনব্যাপী অবরোধ করে রাখে। পরে তাদেরকে মদীনা থেকে বিতাড়িত করা হয়।
মুসলমানদের সঙ্গে ইহুদীদের সর্বশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধটি হয় ৬২৯ সালে খায়বারে। খায়বার ছিল একটি মরুদ্যান, যা মদীনার উত্তর-পশ্চিমে ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ৬২৫ সালে মদীনা থেকে মুসলিম বাহিনী কর্তৃক বিতাড়ণের পর বনু নাযীর ইহুদী গোত্র এই খায়বারে বসবাস করতে শুরু করে। এই বনু নাযীর খন্দকের যুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র করেছিল। সকল ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল খায়বার। ১৬০০ যোদ্ধা নিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বার অবরোধ করেন। ২০ দিন অবরোধ ও যুদ্ধের পর খায়বারের পতন ঘটে। এ যুদ্ধে হজরত আলী রা.-এর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। এ যুদ্ধের পর ইহুদীরা তাদের সকল সম্পদ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়। খায়বারের যুদ্ধ নিয়ে আল্লাহতালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন 'আল্লাহ তোমাদের বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওয়াদা দিয়েছেন, যা তোমরা লাভ করবে। তিনি তা তোমাদের জন্য ত্বরান্বিত করবেন। ইহুদীরা ফসলের অর্ধাংশ প্রদান করার শর্তে এসব জমি চাষাবাদের অধিকার প্রার্থনা করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।
বনু মুসতালিক-এর অভিযান
বনু মুসতালিক অভিযান পরিচালিত হয় হিজরী ষষ্ঠ সনের শাবান মাসে। এ সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খবর পেলেন যে, বনু মুসতালিক-এর নেতা হারিস ইবনে দিরার মক্কার কুরাইশদের প্ররোচনায় নিজের ও অন্য আরব গোত্রের লোকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনী নিয়ে মদীনা আক্রমণের তোড়জোড় শুরু করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবরটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বুরাইদা ইবনে হুসাইব আসলামী রা.-কে পাঠালেন। তিনি সেখানে পৌঁছে সরাসরি হারিসের সাথে কথা বলে বুঝলেন, ঘটনা সত্য। তিনি সাথে সাথে ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রকৃত অবস্থা জানালেন। কাল বিলম্ব না করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন।
বাহিনী প্রস্তুত হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদ ইবনে হারিসা রা., মতান্তরে আবু যর গিফারীকে মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করে নিজেই বাহিনী নিয়ে যাত্রা করেন। কোনো কোনো বর্ণনায় নুমাইলা ইবনে আবদিল্লাহ লাইসীকে মদীনায় খলীফা হিসেবে রেখে যাওয়ার কথা এসেছে। যা হোক, তিনি পঞ্চম হিজরীর শাবান মাসের ২ তারিখ মদীনা থেকে বের হন এবং মদীনা থেকে নয় মানযিল দূরে মুরাইসী পৌঁছ যাত্রা বিরতি করেন। হারিসের নেতৃত্বে হঠিত কাফেরদের সম্মিলিত বাহিনীর নিকট সব খবর পৌঁছে গেল। তারা ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ল। অন্যান্য আরব গোত্র প্রতিরোধের ইচ্ছা ত্যাগ করে যার যার মতো বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। হারিসের সঙ্গে থাকল শুধু তার গোত্রের লোকেরা। তারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল এবং দীর্ঘক্ষণ তীর-বর্শা নিক্ষেপ করে মুসলিম বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখল। অবশেষে মুসলিম বাহিনী হঠাৎ করে এক সাথে আক্রমণ করে বসে এবং শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করে। নেতা হারিস পালিয়ে যায়।
এগারোজন কাফের সৈন্য মারা যায় এবং অন্যরা সকলে বন্দী হয়। মুসলিম বাহিনীর কোনো সৈন্য শাহাদাত বরণ করেনি। তবে ভুলক্রমে একজন আনসার সাহাবীর হাতে এক ব্যক্তি শহীদ হন। ২৬৫ শত্রুপক্ষের পুরুষ-নারী-শিশু মিলে প্রায় ৬০০ জন বন্দী হয় এবং তাদের দুই হাজার উট, পাঁচ হাজার ছাগল-ভেড়া গনীমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) হিসেবে মুসলিম বাহিনী লাভ করে। এই যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে হযরত জুওয়াইরিয়াও রা. ছিলেন। ২৬৬
তাঁর ইসলামগ্রহণ ও বিবাহ তার গোত্রের প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনে
সকল যুদ্ধবন্দীকে দাস-দাসী ঘোষণা করে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। হযরত জুওয়াইরিয়া রা. পড়নে হযরত সাবিত ইবনে কায়সের রা. মতান্তরে তার চাচাতো ভাইয়ের ভাগে। তিনি ছিলেন গোত্রীয় নেতার কন্যা। তদুপরি তার ছিল প্রবল আত্মাসম্মানবোধ, কোমল স্বভাব, রূপ ও সৌন্দর্য। দাসীর জীবন মেনে নিতে পারলেন না। তিনি হযরত সাবিত ইবনে কায়সের রা. নিকট মুকাতাবা-এর আবেদন জানালেন। সাবিত রা. নয় উকিয়া স্বর্ণের বিনিময়ে দাসত্ব থেকে মুক্তিদানের 'মুকাতাবা' বা চুক্তি করলেন; কিন্তু হযরত জুওয়াইরিয়া রা. এ পরিমাণ অর্থ কোথায় পাবেন? তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মানুষের কাছে সাহায্যের হাত পেতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করবেন।
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গনীমতের মাল বণ্টন শেষ করার পর হযরত জুওয়াইরিয়া রা. তার সামনে এসে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি ইসলাম গ্রহণ করে এসেছি। আশহাদু আন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্নাকা রাসূলুহু'। আমি আমার গোত্রপতি হারিস ইবনে দিরারের কন্যা। মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়ে এসেছি এবং সাবিত ইবনে কায়সের ভাগে পড়েছি। সাবিত আমার সাথে 'মুকাতাবা' করেছেন। কিন্তু আমি অর্থ পরিশোধ করতে পারছি না। আমি আপনার নিকট এই প্রত্যাশা নিয়ে এসেছি যে, আপনি আমার চুক্তিবদ্ধ অর্থ পরিশোধে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কি এর চেয়ে ভালো কিছু আশা কর না? তা কী? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তোমার চুক্তিকৃতসকল অর্থ পরিশোধ করে দিই এবং তোমাকে বিয়ে করি। এমন অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে হযরত জুওয়াইরিয়া রা. দারুণ খুশি হন এবং সম্মতি প্রকাশ করেন। অতঃপর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাবিতকে ডেকে পাঠান এবং চুক্তিকৃত অর্থ তাকে দান করে জুওয়াইরিয়া রা.-কে দাসত্ব থেকে মুক্তি করেন। তারপর তাকে বিয়ে করে স্বাধীন স্ত্রীর মর্যাদা দান করেন। ২৬৭
ইবনে সাআদ হযরত জুওয়াইরিয়া রা.-এর দেন-মাহর সম্পর্কে বলেছেন, বনু মুসতালিক-এর প্রতিটি বন্দীর মুক্তি তার মোহর হিসেবে ধার্য হয়। ২৬৮
অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত জুওয়াইরিয়া রা.-এর পিতা হারিস ছিলেন আরবের একজন অন্যতম নেতা। মুসলিম বাহিনীর হাতে তার কন্যা বন্দী হলে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট এসে বলেন, আমার কন্যা দাসী হতে পারে না। আমার মর্যাদা দাসত্বের অনেক ঊর্ধ্বে। আপনি তাকে মুক্ত করে দিন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, বিষয়টি জুওয়াইরিয়ার মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া হোক—সেটাই কি ভালো হবে না?
হারিস কন্যা জুওয়াইরিয়ার নিকট গিয়ে বললেন, মুহাম্মাদ তোমার মর্জির ওপর তোমাকে ছেড়ে দিয়েছেন। দেখ, তুমি যেন আমাকে লজ্জায় ফেলো না। জুওয়াইরিয়া পিতাকে বললেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে থাকতে পছন্দ করছি।' অতৎপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বিয়ে করেন। ২৬৯
নববী ঘরে প্রবেশ
বিয়ের খবর যখন মুসলিম মুজাহিদদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, তখন তারা বললেন, বনু মুসতালিক তো এখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত শ্বশুরকুল। যে খান্দানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ে করেছেন, তারা কখনো দাস-দাসী হতে পারে না। এরপর তারা পরামর্শ করলেন এবং একজোট হয়ে একসাথে সকল বন্দীকে মুক্ত করে দিলেন। ২৭০
ইবনুল আসীর লিখেছেন, এই উপলক্ষে বনু মুসতালিকের এক শো বাড়ির সকল বন্দী মুক্তি পায়। ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম আহমাদ হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি কোনো নারীকে তার সম্প্রদায়ের জন্য জুওয়াইরিয়া থেকে অধিকতর কল্যাণময়ী দেখিনি।' ২৭১
ইমাম মুসলিম হযরত ইবনে আববাসের রা. একটি বর্ণনা সংকলন করেছেন। তিনি বলেন, 'হযরত জুওয়াইরিয়া রা.-এর প্রথম নাম ছিল 'বাররা'। বিয়ের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিবর্তন করে জুওয়াইরিয়া রাখেন। ২৭২ কারণ, প্রথম নামটির মধ্যে কিছুটা আত্ম-প্রশান্তির ভাব বিদ্যমান থাকায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাতে অশুভ ও অকল্যাণের ইঙ্গিত দেখতে পান। এ কারণে তিনি তা পছন্দ করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত জুওয়াইরিয়ার রা. যে সময় বিয়ে হয়, তখন তিনি মাত্র বিশ বছর বয়সের এক নারী। হযরত আয়েশা রা. প্রথম দর্শনেই তাকে যথেষ্ট রূপবতী এবং তার চাল-চলন খুবই মিষ্টি-মধুর বলে মনে করেছেন। ২৭৩
তিনি ছিলেন খুবই ব্যক্তিত্বসম্পন্না মহিলা। তার মধ্যে ছিল সীমাহীন আত্মসম্মানবোধ। তার প্রমাণ হলো, দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য তার অস্থিরতা ও চেষ্টা-সাধনা। পার্থিব ভোগ-বিলাসিতার প্রতি ছিলেন নির্মোহ এবং আল্লাহর ইবাদাতের প্রতি ছিলেন একাগ্রচিত্ত। হাদীসের একাধিক বর্ণনায় জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তার কাছে এসে তাকে তাসবীহ ও তাহলীলে মশগুল দেখতে পেয়েছেন।
একদিন সকালে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন যে, হযরত জুওয়াইরিয়া রা. মসজিদে বসে দুআ করছেন। তিনি চলে গেলেন। দুপুরে এসে তাকে একই অবস্থায় পেয়ে বললেন, তুমি সব সময় এ অবস্থায় থাক? সেই অবস্থায় তিনি 'হ্যাঁ' বলে জবাব দিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি কি তোমাকে এর চেয়ে ভালো কিছু কথা শিখিয়ে দেব না, যা তোমার এই নফল ইবাদত থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ? তারপর তিনি তাকে এ দুআ শিখিয়ে দেন ২৭৪ : [Arabic text]
ইবন সাআদের একটি বর্ণনায় এসেছে। এক জুমআর দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জুওয়াইরিয়ার রা. নিকট আসলেন। সেদিন জুওয়াইরিয়া রা. রোযা রেখেছিলেন। তিনি যেহেতু একটি মাত্র রোযা রাখা পছন্দ করতেন না, এ কারণে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি গতকাল রোযা রেখেছিলে? তিনি জবাব দিলেন 'না'। তিনি আবার জানাতে চাইলেন আগামীকাল রাখার ইচ্ছা আছে কি? বললেন, না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি ইফতার করে রোযা ভেঙে ফেলো। ২৭৫
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। সব সময় তার ঘরে আসা-যাওয়া করতেন। হযরত জুওয়াইরিয়া রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হিজরী ৫০ (পঞ্চাশ) সনের রবীউল আওয়াল মাসে তিনি মদীনায় ইন্তেকাল করেন। তখন তার বয়স ৬৫ (পঁয়ষট্টি) বছর। তৎকালীন মদীনার গভর্নর মারওয়ান জানাযার নামায পড়ান। তার কবর মদীনার বাকী গোরস্তানে। ২৭৬
আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
টিকাঃ
২৫৬. সীরাতে উমর ইবনে আবদুল আজিজ, ৯৭।
২৫৭. সূরা আনকাবুত, ২৯:২৬।
২৫৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/৩৪৬।
২৫৯. আল মুনতাজাম, ২/৩৭৪-৩৭৭।
২৬০. যাদুল মাআদ, ১/৯৭।
২৬১. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৯০৫।
২৬২. সূরা বনী ইসরাইল, ১৭:৮০।
২৬৩. সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৯২৫।
২৬৪. সূরা তাওবা, ৯:৪০।
২৬৫. আর রাহীকুল মাখতুম, ৩৫৩।
২৬৬. সহীহ, বুখারী, ২/২০২; সহীহ, মুসলিম, ১২/৩৫।
২৬৭. মুসনাদ, আহমাদ, ৬/২৭৭; সুনান, আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৯৩১; এ সনদটি বিশুদ্ধ।
২৬৮. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৬২।
২৬৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৬৩।
২৭০. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/২৯৪।
২৭১. উসদুল গাবাহ, ৫/৪২০।
২৭২. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২১২০।
২৭৩. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/২৯৪।
২৭৪. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৭২৬।
২৭৫. সহীহ, বুখারী, ৪/২০৩; সুনান, আবু দাউদ, হাদীস নং ২৪২২; মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৪৩০।
২৭৬. নিসাউ আহলিল বাইত, ৩৩৭-৩৩৮।
📄 রামলাহ বিনতে আবি সুফইয়ান রা.
উম্মে হাবীবা
ইসলামী ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় কাহিনী আপনাদের শোনাব—যা শুনে বিগলিত হবে অন্তর, সজীব হয়ে উঠবে প্রাণ। আজ আমরা এমন এক মহীয়সী সাহাবিয়ার জীবন-কাহিনীর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছি—যিনি দ্বীনের তরে তাওহীদের নেয়ামত দ্বারা সিক্ত হওয়ার বাসনায় আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। পরে যখন তার স্বামী মুরতাদ হয়ে ইসলাম থেকে ছিটকে পড়ে, তখন তিনি ধৈর্যধারণ করে সাওয়াবের প্রত্যাশা রাখেন এবং মুরতাদ স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। অতঃপর একাকী নির্জনে বসবাস করতে থাকেন; কিন্তু এক সময় মহান প্রভু তার প্রতি সদয় হন এবং রাসূলের সহধর্মিণী হবার সুযোগ দান করেন। আবিসিনিয়ায় তার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। সেখানে তার বিয়ে হয় এবং তিনি হয়ে উঠেন রাসূল সা.-এর সম্মানিতা স্ত্রী ও মুমিনদের মা জননী।
এভাবেই যে আল্লাহর জন্য ত্যাগ করেন, আল্লাহ তাআলা তাকে এর চেয়েও উত্তম বিনিময় দান করেন।
হ্যাঁ, আমরা আমাদের আম্মাজান হযরত উম্মে হাবীবা রা.-এর কথাই বলছি। আসুন, তার ভুবনমোহিনী জীবনেতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিই।
বংশপরিচয়
তিনি হচ্ছেন সায়্যিদা রামালাহ বিনতে আবি সুফইয়ান রা.। তিনি হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর চাচাতো বোন। বংশের দিক দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো স্ত্রী-ই তার চেয়ে বেশি নিকটের ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো স্ত্রীরই মোহর তার চেয়ে বেশি ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো স্ত্রীই তার চেয়ে বেশি দূরে অবস্থান করা অবস্থায় বিয়ে করেননি। ২৭৭
আল্লাহ ইচ্ছে করলে সবই সম্ভব
আল্লাহ তাআলা ভালো জানেন, কে তার বান্দা হবার উপযুক্ত আর কে উপযুক্ত নয়। বান্দা হওয়ার এই মহান নেয়ামতটির সাথে আর কোনো নেয়ামতের তুলনা চলে না।
আবু সুফইয়ান ইবনে হারবের কখনো মনে হয়নি যে, তার সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া অথবা তার মতামতের বিরোধিতা করার সাধ্য কুরাইশী কোনো সদস্যের থাকতে পারে। কারণ তিনি মক্কার একমাত্র অবিসংবাদিত নেতা। তিনি এমন সরদার—মক্কার সকল মানুষ যার আনুগত্য করে দ্বিধাহীনভাবে। কিন্তু তারই মেয়ে রামালাহ—যার ডাক নাম উম্মে হাবীবা, এই বদ্ধমূল ধারণাকে একেবারে মিথ্যা প্রমাণ করে দিলেন। সেটা এইভাবে যে, তিনি সরাসরি অস্বীকার করলেন পিতার দেব-দেবীকে মানতে, পূজা করতে। তিনি ও তার স্বামী উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ঈমান গ্রহণ করলেন এক ও লা শারীক আল্লাহর প্রতি এবং নবী মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ-এর রিসালাতকে সত্য বলে স্বীকার করলেন।
আবু সুফইয়ান নিজের সকল শক্তি ও ক্ষমতা দিয়ে নিজের মেয়ে ও জামাতাকে নিজের ও পূর্বপুরুষের ধর্মে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালাল; কিন্তু সফল হলো না। কেননা, উম্মে হাবীবা রা.-এর কলবের যমীনে ঈমানের যে চারা শিকড় ছড়িয়ে মজবুত ও দৃঢ় হয়েছে, তার মূলোৎপাটন আবু সুফইয়ানের ক্রোধের ঘূর্ণিঝড় দ্বারাও সম্ভব নয়। আবু সুফইয়ানের রাগ তার ঈমানী বৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে পারল না।
আবিসিনিয়ায় হিজরত
কুরাইশের লোকজন যখন দেখল—আবু সুফইয়ান নিজের মেয়ে ও জামাতার ওপর ক্ষিপ্ত, তখন তাদের স্পর্ধা বেড়ে গেল। তারা ওই দুইজনের জীবনকে ফেলে দিল গভীর সঙ্কটে। নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের ঠেলে দিল দুর্বিষহ জীবনে। অবশেষে তাদের এ ধারণা সৃষ্টি হলো যে, মক্কায় টিকে থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের অনুমতি দিলেন, তখন আবু সুফইয়ানের কন্যা রামালাহ ও স্বামী উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ছিলেন নিজেদের দ্বীন রক্ষার উদ্দেশ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় হিজরতকারীদের সঙ্গে; বরং নিজেদের ঈমান হেফাজতের লক্ষ্যে নাজ্জাশীর আশ্রয়ে গমনকারীদের শীর্ষে।
আল্লাহকে ধোঁকা দেওয়া সহজ নয়
আবিসিনিয়া অভিমুখে মুসলমানদের হিজরতের ফলে তাদের ওপর অত্যাচারের অনল শীতল হয়নি। কাফেরদের হিংসা-ক্ষোভও হ্রাস পায়নি; বরং কুরাইশরা চিন্তা করতে থাকে যে, হিজরতের কারণে মুসলমানরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং তাদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে। তারা তাদের মধ্য থেকে শক্তিমান ও তাগড়া জোয়ান দু-ব্যক্তিকে নির্বাচন করে নাজ্জাশীর কাছে পাঠাল। এ দু-ব্যক্তি হলো, আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবীয়া—যারা এখনো মুসলমান হয়নি। তাদের একটাই লক্ষ্য—বাদশাহ নাজ্জাশী যেন তার দেশ থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করেন।
আবিসিনিয়ার রাজত্বে আসীন তখন বাদশাহ নাজ্জাশী। যিনি ঈমানের তাপ অনুভব করেছিলেন। তিনি একনিষ্ঠভাবে খ্রিস্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। অহঙ্কার, দম্ভ, কুটিলমনা ও হীনদৃষ্টি হতে অনেক দূরে থাকতেন। ছিলেন ভীষণ নীতিপরায়ণ। তার খ্যাতি তখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামদের জন্য তার দেশকে হিজরতের ক্ষেত্র হিসেবে মনোনীত করেন।
কুরাইশরা তাদের প্রেরিত সেই দুই প্রতিনিধির সঙ্গে নাজ্জাশী ও তার দরবারের চাটুকার পাদ্রীদের জন্য প্রচুর মূল্যবান উপঢৌকন পাঠাল। তাদেরকে বলে দেওয়া হয়েছিল, আবিসিনিয়ার রাজার সাথে আমাদের বিষয়টি আলোচনার পূর্বেই প্রত্যেক পাদ্রীর জন্য নির্ধারিত হাদিয়া পৌঁছে দেবে। তারা দু-জন আবিসিনিয়া পৌঁছে নাজ্জাশীর পাদ্রীদের সাথে মিলিত হলো এবং তাদের প্রত্যেককে তার জন্য নির্ধারিত উপঢৌকন পৌঁছে দিয়ে বলল, 'বাদশাহর সাম্রাজ্যে আমাদের কিছু বিভ্রান্ত সন্তান আশ্রয় নিয়েছে। তারা তাদের পিতৃপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টি করেছে। আমরা যখন তাদের সম্পর্কে বাদশাহর সঙ্গে কথা বলব, আপনারা তাদের দ্বীন সম্পর্কে কোনো রকম জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই তাদেরকে আমাদের নিকট ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাদশাহকে একটু অনুরোধ করবেন। দরবারী পাদ্রীরা তাদের কথায় সায় দিল।
পরিশেষে প্রতিনিধিদের সাথে বাদশার সাক্ষাৎ এবং তার সামনে কুরাইশদের আপিল ও মোকাদ্দমা উপস্থাপনের দিন নির্ধারণ করা হয়।
নিয়মমাফিক একদিন বাদশা নাজ্জাশী তার পূর্ণ শান-শওকত ও মর্যাদাপূর্ণ আসনে খুবই বিনয়ের সাথে আসীন হন। আল্লাহর পক্ষ থেকে পরম প্রশান্তি ও রহমত তাকে ঢেকে নিয়েছিল। অতঃপর কুরাইশের দুই প্রতিনিধি বাদশাহকে বলল, 'মহামান্য বাদশাহ, আমাদের কিছু দুষ্টু প্রকৃতির ছেলে আপনার সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেছে। তারা এমন একটি ধর্ম আবিষ্কার করেছে যা আমরাও জানি না এবং আপনিও জানেন না। তারা আমাদের দ্বীন পরিত্যাগ করেছে; কিন্তু আপনাদের দ্বীনও গ্রহণ করেনি। তাদের পিতা, পিতৃব্য ও গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদেরকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন।
বাদশা নাজ্জাশী তাদের এ কথা শুনে খুবই আশ্চর্য হলেন। মাথা তুলে নাজ্জাশী মুসলমানদের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'সে কোন্ ধর্মমত যা তোমরা নতুন আবিষ্কার করেছ এবং যার কারণে তোমরা তোমাদের খান্দানী ধর্মকেও পরিত্যাগ করেছ, অথচ আমার অথবা অন্য কোনো ধর্মও গ্রহণ করনি?'
হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. উঠে দাঁড়ালেন। যাতে মুসলমান মুহাজিরদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে প্রেক্ষিতে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আদায় করতে পারেন। তিনি বেশ দীপ্ত ও সম্মানের সাথে বাদশার প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন :
মহামান্য বাদশাহ, আমরা ছিলাম একটি মূর্খ জাতি। মূর্তির উপাসনা করতাম, মৃত জন্তু ভক্ষণ করতাম, অশ্লীল কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম এবং প্রতিবেশীর সাথে অসদ্ব্যবহার করতাম। আমাদের সবলরা দুর্বলদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করত। আমরা ছিলাম এমনই এক অবস্থায়। অবশেষে আল্লাহ তাআলা আমাদের নিকট একজন রাসূল পাঠালেন। আমরা তার বংশ, সততা, আমানতদারী, পবিত্রতা ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানালেন—যেন আমরা তার একত্বে বিশ্বাস করি, তার ইবাদত করি এবং আমরা ও আমাদের পূর্ব পুরুষরা যেসব গাছ, পাথর ও মূর্তির পূজা করতাম তা পরিত্যাগ করি।
তিনি আমাদের নির্দেশ দিলেন সত্য বলার, গচ্ছিত সম্পদ যথাযথ প্রত্যার্পণের, আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখার, প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার, হারাম কাজ ও অবৈধ রক্তপাত থেকে বিরত থাকার। তাছাড়া অশ্লীল কাজ, মিথ্যা বলা, ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ ও নিষ্কলুষ চরিত্রের নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া থেকে নিষেধ করলেন। তিনি আমাদের আরও আদেশ করেছেন এক আল্লাহর ইবাদত করার, তার সাথে অন্য কিছু শরীক না করার, নামায কায়েম করার, যাকাত দানের এবং রমযান মাসে রোযা রাখার। আমরা তাকে সত্যবাদী জেনে তার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন-তার অনুসরণ করেছি। সুতরাং যা তিনি আমাদের জন্য হালাল এবং হারাম ঘোষণা করেছেন, আমরা তা হালাল ও হারাম বলে বিশ্বাস করেছি।
মহামান্য বাদশাহ, অতঃপর আমাদের জাতির সকলেই আমাদের ওপর বাড়াবাড়ি আরম্ভ করল। তারা আমাদের দ্বীন থেকে পুনরায় মূর্তিপূজার দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের ওপর অত্যাচার চালাল। তারা যখন আমাদেরকে অত্যাচার উৎপীড়নে জর্জরিত করে তুলল এবং আমাদের ও আমাদের দ্বীনের মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল, তখন আমরা অন্য কোথাও না গিয়ে আপনার এখানে আসাকেই প্রাধান্য দিলাম এই আশায় যে, আপনার এখানে আমরা অত্যাচারিত হবো না।
হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর মুখ থেকে মহা মূল্যবান এই আলোকদীপ্ত বাণী এমনভাবে ফুটে উঠছিল-যেন প্রভাতের আলোকরশ্মিতে রাতের অন্ধকার দূরীভূত হচ্ছে। তার বাচনভঙ্গি, শব্দচয়ন নাজ্জাশীর আত্মা ছুঁয়ে যায়। তিনি আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। এরপর তিনি হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা.-এর কাছে জানতে চান, 'তোমাদের নবী আল্লাহর নিকট থেকে যা নিয়ে এসেছেন তার কিছু অংশ কি তোমাদের সঙ্গে আছে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ'। 'আমাকে একটু পাঠ করে শোনাও তো।' জাফর সুমিষ্ট সুরে পূর্ণ বিনয়ের সাথে সূরা মারইয়ামের আয়াতগুলো পাঠ করলেন।
আল্লাহর কালাম শুনে নাজ্জাশী এত কাঁদলেন যে অশ্রুধারায় তার শ্মশ্রু সিক্ত হয়ে গেল এবং দরবারে উপস্থিত পাদ্রীরা কেঁদে তাদের সম্মুখে উন্মুক্ত ধর্মগ্রন্থসমূহ ভিজিয়ে দিল। কিছুটা শান্ত হয়ে নাজ্জাশী বললেন, 'তোমাদের নবী যা নিয়ে এসেছেন এবং তার পূর্বে ঈসা আ যা নিয়ে এসেছিলেন উভয়ের উৎস এক।' অতঃপর আমর ও তার সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমরা চলে যাও। আল্লাহর কসম! তোমাদের হাতে আমি তাদেরকে সমর্পণ করব না।'
এভাবে মজলিসের সমাপ্তি ঘটে। আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের সাহায্য করতে থাকেন, যখন কুরাইশের প্রতিনিধিরা ভগ্ন মনোরথে লজ্জিত হয়ে ফিরে আসছিল।
দুঃখের পর সুখের পরশ
আবিসিনিয়ায় যাওয়ার কিছুদিন পর স্বামী উবাইদুল্লাহ ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। তর ধর্মত্যাগের পূর্বে হযরত উম্মে হাবীবা রা. একবার স্বপ্নে স্বামীকে বিভৎসরূপে দেখেন। তিনি ভীত-শংকিত হয়ে আপন মনে বলেন, নিশ্চয় তার কোনো খারাপ পরিণতি হতে যাচ্ছে। সকাল বেলা উবাইদুল্লাহ তাকে বলল, 'উম্মে হাবীবা! আমি ধর্মের ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছি। খ্রিস্টধর্ম থেকে অন্য কোনো ধর্ম বেশি ভালো বলে মনে হয়নি। যদিও আমি মুসলমান হয়েছি, তবে এখন আমি খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছি। হযরত উম্মে হাবীবা রা. স্বামীর এহেন পথভ্রষ্টতায় যথেষ্ট তিরস্কার করলেন এবং নিজের স্বপ্নের কথাও তাকে বললেন; কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হলো না। সে খ্রিস্টানই থেকে গেল। এভাবে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।
ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর হযরত উম্মে হাবীবা রা. কন্যা হাবীবাকে নিয়ে আবিসিনিয়ায় বসবাস করতে থাকেন। এ খবর মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কানে পৌঁছল। উম্মে হাবীবা রা.-এর ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা থেকে আমর ইবনে উমাইয়্যা দামরী রা.-কে একটি চিঠি এবং চারশো দীনার দেনমোহরের অর্থসহ আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর নিকট পাঠান। চিঠিতে তিনি নাজ্জাশীকে লেখেন, 'আমার সাথেই উম্মে হাবীবার বিয়ের কাজ সমাধা করে দাও।'
চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে নাজ্জাশী তার দাসী আবরাহাকে উম্মে হাবীবার নিকট পাঠিয়ে বিয়ের পয়গাম পৌঁছে দেন। তাকে একথাও জানান যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনার বিয়ের ব্যবস্থা করার জন্য আমাকে লিখেছেন। এখন এ অনুষ্ঠান সম্পাদনের জন্য আপনি আপনার পক্ষের একজন উকিল মনোনীত করুন। হযরত উম্মে হাবীবা রা. এ সুসংবাদ দানের জন্য আবরাহাকে নিজের দুইটি রূপোর চুড়ি, কানের দুল ও একটি নকশা করা আংটি দান করেন। আর মামাতো ভাই খালিদ ইবনে সায়ীদ ইবনে আবীল আসকে উকিল নিয়োগ করে নাজ্জাশীর নিকট পাঠান। ২৭৮ সন্ধ্যার সময় নাজ্জাশী আবিসিনিয়ায় বসবাসরত হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব রা. ও অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম রা.-কে দরবারে ডেকে পাঠান এবং তাদের সবার উপস্থিতিতে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করেন। নাজ্জাশী নিজেই বিয়ের খুতবা পাঠ করেন এবং চারশো দীনার মোহরের অর্থ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে খালিদ ইবনে সায়ীদের হাতে তুলে দেন। অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন খালিদ ইবনে সায়ীদ সবাইকে থামিয়ে বললেন, নবীদের আ. সুন্নাত বা রীতি হচ্ছে বিয়ের পর আহার করানো। তারপর তিনি সকলকে আহার করিয়ে বিদায় দেন। ২৭৯
বিয়ের পর নাজ্জাশী বহু মিশক, আম্বর, সুগন্ধি এবং আরও অন্যান্য জিনিস উপহার হিসেবে উম্মে হাবীবা রা.-এর নিকট পাঠান। এসব কথা হযরত উম্মে হাবীবা রা. নিজে বর্ণনা করেছেন। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, সে সময় আবরাহা তার ইসলাম গ্রহণের কথা জানায় এবং আমাকে অনুরোধ করে আমি যেন তার ইসলামের কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবহিত করি এবং তার সালাম পৌঁছে দিই। উম্মে হাবীবা রা. বলেন, মদীনায় পৌঁছে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিয়ের সব কথা বলি এবং আবরাহার সকল আচরণের কথা অবহিত করে তার সালাম পেশ করি।
কেমন ছিলেন তিনি
উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে হাবীবা রা. অত্যন্ত শক্ত ঈমানদার নারী ছিলেন। তিনি যে যুগের মানুষ, সে অনুপাতে যে ধৈর্য, দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতা দেখিয়েছেন, তা ভেবে দেখলে বিস্মিতই হতে হয়। ইসলামের আবির্ভাবকালেই তিনি স্বীয় মেধা ও বুদ্ধি দ্বারা সত্যকে চিনতে পেরে আঁকড়ে ধরেন। যে কাজ সে সময়ের অনেক বড় বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা করতে পারেনি, বা করতে যাদের অনেক সময় লেগেছে, তিনি সহজেই তা করতে পেরেছেন। সত্যের জন্য তিনি মা-বাবা, ভাই-বোনেসহ সকল আত্মীয় বন্ধুদের ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেছেন। যে স্বামীকে অবলম্বন করে সবকিছু ছাড়লেন, বিদেশ-বিভূঁইয়ে সে স্বামী তাকে ছেড়ে গেল। কিন্তু তিনি সত্য থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হলেন না। তিনি তার বিশ্বাসের ওপর পর্বত পরিমাণ অটল থাকলেন। কী পরিমাণ বিশ্বাসের জোর থাকলে এত কিছু করা যায়? সম্ভবত তার এই মজবুত ঈমানের জন্যই আল্লাহপাক পুরস্কারস্বরূপ দুনিয়াতে তাকে দান করেন উম্মুল মুমিনীনের সুমহান মর্যাদা।
এভাবেও হয় নবীভক্তি
মজবুত ঈমানের সাথে আল্লাহর রাসূলের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসাও তার অন্তরে ছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিনি যে কত বড় ও পবিত্র বলে জানতেন—তার প্রমাণ পাওয়া যায় নিজের মুশরিক পিতাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিছানায় বসতে না দেওয়ার মাধ্যমে।
হুদায়বিয়ার সন্ধির একটি ধারা অনুযায়ী মক্কার পার্শ্ববর্তী খুযাআ গোত্র মদীনার মুসলমানদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে। এতে কুরাইশরা এই চুক্তি ভঙ্গ করে তাদের ওপর অত্যাচার চালায়। খুযাআ গোত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহায্য প্রার্থনা করে। এতে মক্কার কুরাইশরা শঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা সন্ধিচুক্তি বলবৎ রাখার জন্য তদের পক্ষ থেকে আবু সুফইয়ানকে মদীনায় পাঠায়। আবু সুফইয়ান মদীনায় এসে প্রথমে কন্যা উম্মুল মুমিনীন উম্মে হাবীবা রা.-এর নিকট যান। কন্যা পিতাকে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিছানা গুটিয়ে বসতে দেন। আবু সুফইয়ান মেয়েকে প্রশ্ন করেন, বেটি, তুমি বিছানা গুটিয়ে নিলে! তা বিছানা আমার বসার উপযুক্ত মনে না করে, না আমাকে বিছানার উপযুক্ত মনে না করে? মেয়ে বললেন, এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিছানা। আর আপনি একজন মুশরিক (অংশীবাদী) ও অপবিত্র। এ কারণে আমি ইচ্ছা করিনি যে, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিছানায় বসুন। মেয়ের এমন কথা শুনে আবু সুফইয়ান সেখানে থেকে উঠে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে বসেন এবং মেয়েকে বলেন, আমাকে ছাড়ার পর তোমার মধ্যে অনেক মন্দ ঢুকেছে। ২৮০
এরই নাম ঈমান, এরই নাম আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসের ওপর তিনি নিজে যেমন কঠোরভাবে আমল করতেন, তেমনি অন্যদেরও আমল করার তাকীদ দিতেন। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হযরত উম্মে হাবীবা রা.-কে বিয়ে করেন তখন নিম্নের এ আয়াতটি নাযিল হয়,
'যারা তোমাদের শত্রু আল্লাহ তাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সদ্ভাব বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন।' ২৮১
অন্তিম শয্যায়
আউফ ইবনুল হারিস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মৃত্যুর পূর্বে তিনি হযরত আয়েশা রা. ও হযরত উম্মে সালামা রা.-কে ডেকে আনান। তিনি তাদেরকে বলেন, আমার ও আপনাদের মধ্যে তেমন সম্পর্ক ছিল, যেমন সতীনদের পরস্পরের থাকে। যেহেতু আপনারা তেমন চেয়েছিলেন, তাই আমিও তাই পছন্দ করেছিলাম। আপনারা আমার মাগফিরাতের জন্য দুআ করুন। হযরত আয়েশা রা. তার মাগফিরাতের জন্য দুআ করলে তিনি খুশি হয়ে বলেন, আপনি আমাকে খুশি করেছেন, আল্লাহ আপনাকে খুশি করুন। ২৮২
উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে হাবীবা রা. ৪৪ হিজরীতে তার ভাই হযরত মুয়াবিয়া রা.-এর শাসনামলে ইন্তেকাল করেন। এভাবেই তিনি তার সুরভিত জীবনের ফুলেল সুবাস ছড়িয়ে যান ধরার মাঝে। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
টিকাঃ
২৭৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২১৮-২১৯।
২৭৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/১৪৩; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৯৮-৯৯।
২৭৯. মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৪২৭; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৯৮।
২৮০. আল ইসাবাহ, ৮/১৪২; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৯৯-১০০।
২৮১. সূরা মুমতাহিনা, ৬০:৭।
২৮২. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১০০; মুসতাদরাকে হাকিম, ৪/২২-২৩।
📄 সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই রা.
যাঁর বাবা, চাচা ও স্বামী আল্লাহর নবী
আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরবে প্রেরণ করেছেন। তাকে আল্লাহ তাআলা ইহুদীদের মধ্য থেকে পাঠাননি। তাই হিংসা ও ক্ষোভের অন্ত ছিল না ইহুদীদের। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব এবং মদীনায় হিজরত করে আসার সময় মদীনায় প্রধানত দুটি জাতি বসবাস করত। যথা: মদীনার আরব বাসিন্দা এবং ইহুদী সম্প্রদায়।
এই দুটি জাতি আবার অনেকগুলো গোত্রে বিভক্ত ছিল। যেমন: মদীনার আরব বাসিন্দারা বিভক্ত ছিল আউস ও খাযরাজ গোত্রে। আউস গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ চারটি শাখা ছিল; যথা: বনু আবদিল আশহাল, বনু জাফর, বনু মুয়াবিয়া এবং বনু হারিসা। এমনিভাবে খাযরাজও ছিল চারটি গোত্রের সমষ্টি। যথা: মালিক, আদী, মাযিন এবং দীনার।
আর মদীনায় অবস্থানকারী ইহুদীদের মোট গোত্র ছিল বিশটিরও বেশি। তবে এই বিশটি গোত্র গুরুত্বপূর্ণ ও বড় বড় তিনটি গোত্রে সীমাবদ্ধ। যথা: বনু নাযীর, বনু কুরাইযা ও বনু কাইনুকা। এ ধরনের একটি বহুজাতিক ও বহু ধর্মভিত্তিক অঞ্চলে হিজরত করে মদীনার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রধান হিসাবে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের প্রথম বর্ষে একটি লিখিত সনদ জারি করেন। ইতিহাসে এটি 'মদীনা সনদ' নামে প্রসিদ্ধ। আরবী ভাষায় জারিকৃত এই সনদে ৫৩টি ধারা বিদ্যমান ছিল, যার অনেকগুলো ধারাই ছিল মানবাধিকার বিষয়ক। এতে উল্লেখ করা হয় যে, মদীনায় বসবাসকারী সকল ইহুদী এবং ইয়াসরিব ও কুরাইশের সকল মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি স্বতন্ত্র জাতি এবং সকলে সমান নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ভোগ করবে। পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকবে এবং কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যাবে না, কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে প্রচলিত প্রথা ও ন্যায়বিচার মোতাবেক রক্তপণ আদায় করতে হবে, কেউ বন্দী হলে ন্যায়বিচার মোতাবেক তাকে মুক্ত করতে হবে, দুর্বল ও অসহায়কে আশ্রয় দেওয়া হবে এবং সর্বতোভাবে তাদের রক্ষা করা হবে, ঋণগ্রস্তদের ঋণের বোঝা লাঘব করা হবে, অত্যাচারী, পাপিষ্ঠ এবং সমাজে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সকলে অবস্থান গ্রহণ করবে, তারা কারও সন্তান কিংবা নিকটাত্মীয় হলেও। কোনো অন্যায়কারীকে সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না এবং কোনো প্রকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কেউ কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বানুমতি গ্রহণ ব্যতীত কেউ যুদ্ধে জড়িত হতে পারবে না, একজনের অপকর্মের জন্য অন্যজনকে দায়ী করা যাবে না, ইহুদীদের মিত্ররাও সমান নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ভোগ করবে, বহিঃশত্রু দ্বারা মদীনা আক্রান্ত হলে একে রক্ষা করার জন্য সকলে সম্মিলিত প্রয়াস চালাবে। এভাবে মদীনা সনদের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা বিধানের নযীর পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই প্রথম।
সমাজের সকল শ্রেণীর নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ও ধর্মীয় অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান এবং পরমত সহিষ্ণুতা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্প্রীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত মদীনা সনদ বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান বা শাসনতান্ত্রিক সরকারের মর্যাদা লাভ করে। বিদায় হজে প্রদত্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐতিহাসিক ভাষণ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত। কোনো আন্দোলন কিংবা সংগ্রামের মুখে নয়, কোনো চাপের কাছে নত স্বীকার করে নয়, সম্পূর্ণ নবুওয়াতী দায়িত্ব ও কর্তব্যের খাতিরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদত্ত এই ভাষণে তিনি মানবাধিকার বিষয়ে যে সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখেন—তা অবিস্মরণীয়। তিনি বলেন, ‘আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর তোমাদের নিকট পবিত্র অনুরূপভাবে তোমাদের জীবন এবং সম্পদ ও পবিত্র।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, ‘কারও নিকট কোনো সম্পদ গচ্ছিত থাকলে তা প্রকৃত মালিকের নিকট অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। জাহিলী যুগের সমস্ত সুদ প্রথা রহিত করা হলো, কিন্তু মূলধন ফেরত পাবে।’ ‘জাহিলী যুগের সকল রক্তের প্রতিশোধ রহিত করা হলো।’ ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, আর অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যার শাস্তি হলো একশত উট রক্তপণ আদায়।
ঐতিহাসিকদের মতে, যে সময়ে ইহুদীরা মদীনাকে নিজেদের আবাসস্থল বানায় এবং বসবাস শুরু করে, সে সময়ে তারা চাইলে নিজেদের ধর্মের প্রচার ও প্রসার করে মদীনা এবং তৎসংশ্লিষ্ট পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারত। সুসংহত করতে পারত নিজেদের ক্ষমতা। এর ফলে তারাই হতো সমগ্র আরবে প্রবল পরাক্রমশালী জাতি, একমাত্র ক্ষমতাধর; কিন্তু যে সময়ে ইহুদীদের একজোট ঐক্যবদ্ধ হয়ে, নীতি-নৈতিকতাকে সম্বল করে ধর্মের প্রচার ও প্রসারে প্রয়াসী হওয়ার কথা; সে সময়ে তারা নিজেদের মন্দ চরিত্র ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে নিজেরা একে অপরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এমনকি তারা আরবদের সাথে মিলে পরস্পর নিজেদের স্বধর্মীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা শুরু করে। এবং সেসব যুদ্ধের সময় ইহুদীরা তাদের অপর ভাইদের বিরুদ্ধে আরবদের থেকেও বেশি কঠোরতার পরিচয় দেয়।
মদীনায় অবস্থানকারী ইহুদীদের বড় বড় গোত্র বনু কুরাইযা ও বনু নাযীর শত্রুতার সূত্র ধরে তাদের স্বজাতীয় অপর গোত্র বনু কাইনুকার বিরুদ্ধে মদীনায় বসবাসকারী আরব গোত্র আওসকে সাথে নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং সে যুদ্ধে তারা অত্যন্ত নির্মমভাবে, নিদয়তার সাথে বনু কাইনুকার রক্তপাত ঘটায়। অত্যন্ত কঠিন হাতে তাদের মেরুদণ্ড গুড়িয়ে দেয়। এমনকি তারা বনু কাইনুকাকে তাদের বাস্তুভিটা থেকেও উচ্ছেদ করে। যার ফলে বাধ্য হয়ে বনু কাইনুকা নিজেদের কৃষিকর্ম ও ক্ষেত-খামার পরিত্যাগ করে শিল্পকর্মকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করে।
ইহুদীরা এভাবে নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা জিইয়ে রাখার কারণে আরবের বুকে তারা একটি প্রবল পরাক্রমশালী জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করা তো দূরের কথা, নিজেদের আবাসস্থল সুনিশ্চিত করতেও তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা অসহায় হয়ে একেকজন একেক আরব সরদার বা রঈসের অধীনতা গ্রহণ করে তাদেরকে নিয়মিত রাজস্ব বা কর দিয়ে তাদের ছত্রছায়ায় ও সহায়তায় জীবন-যাপন করতে থাকে।
ইহুদী জাতির উদ্ভব হয় বনী ইসরাঈল থেকে। ইহুদীদের অতীত এবং বর্তমান কার্যক্রম ও চালচলন প্রত্যক্ষ, পর্যালোচনা করলে একথা নির্দিধায় বলা যায় যে, এই ইহুদীদের চরিত্র বড়ই নিকৃষ্ট, এদের অতীত ইতিহাস খুবই মন্দ। জন্ম থেকেই এরা ঝগড়া-ফ্যাসাদ, ধোঁকা-প্রবঞ্চনা ইত্যাকর অন্যায়-অপরাধ ও মন্দ কার্যকলাপে লিপ্ত।
এই ইহুদীরা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বে অসংখ্য-অগণিত নিষ্পাপ নবী-রাসূলদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। পবিত্র কুরআনেও যার উল্লেখ আছে। এমনকি এরা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পর্যন্ত হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে একাধিকবার; কিন্তু মহান আল্লাহর রহমতে তারা সফল হতে পারেনি।
ইহুদীরা তাদের মন্দ স্বভাব চরিত্র নিয়ে যে কেবল নিজেরাই মারামারি ও খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়ে থাকত তাই নয়, বরং তারা অন্যদের মাঝেও এসব দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ছড়িয়ে দিত। এই ইহুদীদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রেই মদীনার আরব বাসিন্দা, দুই ভাই তুল্য আউস ও খাযরাজ ১২০ বছর যাবত গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে ছিল। যার মধ্যে প্রথম যুদ্ধ ছিল 'সুমাইর' আর সর্বশেষ যুদ্ধ ছিল 'বুআস'।
ঐতিহাসিকগণ বলেন, ইহুদীরা নেপথ্যে থেকে আউস ও খাযরাজ এই দুই গোত্রকে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত করাতে চক্রান্ত করত এবং তাদের মাঝে অনৈক্য ও হানাহানির আগুন জ্বেলে দিত। একথা আরবরাও জানত। যার কারণে তারা ইহুদীদেরকে 'সাআলিব' তথা খেকশিয়াল উপাধিতে স্মরণ করত।
তবে ইহুদীরা ষড়যন্ত্র করে আউস ও খাযরাজকে যে যুদ্ধে লিপ্ত করিয়ে ছিল, তা পরবর্তী সময়ে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হয়। এ ঘটনা সম্পর্কে মুসলিম মনীষীগণ বলেন, মহান আল্লাহ তাআলা ইসলামের জন্য একটি পবিত্র ভূমি নির্বাচন করছিলেন। ইসলামের জন্য কেন্দ্র হিসেবে মদীনা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তাকে ইসলামের বহুল প্রচার ও প্রসারের জন্য উপযোগী করেছিলেন আউস ও খাযরাজের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে। কেননা, ইসলাম আসার পর তার বহুল প্রচার ও প্রসারের জন্য প্রয়োজন ছিল তিনি যেখানে এসে তার কেন্দ্র স্থাপন করবেন, সেই স্থানের অধিবাসীরা দুর্বল হওয়া। আর আউস ও খাযরাজের মধ্যে বিরাজমান ১২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ তা আঞ্জাম দিয়েছিল অত্যন্ত সুনিপুণভাবে। কেননা, এই যুদ্ধের দ্বারা আউস ও খাযরাজের বড় বড় সকল প্রতাপশালী সকল সরদার নিহত হয়, আউস-খাযরাজের মধ্যকার ঐক্য সম্পূর্ণ রূপে বিনষ্ট হয়ে যায়। তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি খণ্ড বিখণ্ড হয়ে যায়। ফলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে।
আর মদীনাকে ইসলামের কেন্দ্র বানানোর জন্য সকল প্রস্তুতি যখন শেষ হয়, মদীনা যখন ইসলামের কেন্দ্র হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলী অর্জন করতে সক্ষম হয়, তখন মহান আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মদীনায় হিজরতের আদেশ দেন। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা ছেড়ে মদীনার দিকে রওনা হন।
বদরের যুদ্ধের পর তৎকালীন আরবের বুকে দু-জন প্রভাবশালী ব্যক্তির উদয় হয়। তারা হলেন মদীনায় হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর অন্যজন হলেন মক্কায় আবু সুফিয়ান। এ যুদ্ধ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায় এবং আবু সুফিয়ান হয়ে যান কুরাইশদের প্রধান। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে তৎকালীন মদীনায় বসবাসকারী বনু কায়নুকা ইহুদী সম্প্রদায়ের প্রথম সংঘাত শুরু হয়। এ গোত্রের বিভিন্ন কার্যকলাপ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাজনৈতিক শীর্ষত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। তারা মদীনা সনদকে উপেক্ষা করে একজন মুসলিম নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে বসে। বদরের যুদ্ধের পরপরই এ ঘটনা ঘটে। একজন মুসলিম মহিলা বনু কায়ানুকা গোত্রের একজন স্বর্ণকারের দোকানে গেলে তাকে তার চুল খুলতে বাধ্য করা হয় এবং তাকে ও তার পরিধেয় বস্ত্র এমনভাবে বাধা হয় যে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা খুলে যায়। মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়ে কায়নুকা গোত্রের ইহুদীরা প্রথমে মদীনার উত্তরে অবস্থিত ওয়াদি-আল-কুরাতে বসবাস শুরু করে। পরবর্তী সময়ে তারা সিরিয়ার দেরাতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
আগেই বলেছি উহুদের যুদ্ধের পর ইহুদীরা মুসলমানদের শক্তির ওপর সন্ধিহান হয়ে পড়ে। তারপর ৩১ মার্চ ৬২৭ সালে শুরু হয় খন্দকের যুদ্ধ। এ যাত্রায় বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিল বনু কুরাইযা গোত্রের ইহুদীরা এবং বনু নাযীর গোত্রের ইহুদীরা। কনফেডারেট সেনাবাহিনীর সৈন্যরা প্রথমে বনু কুরাইযা গোত্রের সঙ্গে মদীনা শহরের উভয় প্রান্ত থেকে আক্রমণের জন্য শলাপরামর্শ করে। এ কাজে সফল হতে না পেরে তারা বনু নাযীর, বনু গাতফান, বনু আসাদ, বনু সুলাইম, বনু আমির, বনু মুরা ও বনু শুয়া ইত্যাদি ইহুদী গোত্র সহকারে মদীনা নগরী ২৭ দিন অবরোধ করে রাখে। যুদ্ধের পর মুসলমানরা বনু কুরাইযা গোত্রকে ২৫ দিনব্যাপী অবরোধ করে রাখে। পরে তাদেরকে মদীনা থেকে বিতাড়িত করা হয়।
মুসলমানদের সঙ্গে ইহুদীদের সর্বশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধটি হয় ৬২৯ সালে খায়বারে। খায়বার ছিল একটি মরুদ্যান, যা মদীনার উত্তর-পশ্চিমে ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ৬২৫ সালে মদীনা থেকে মুসলিম বাহিনী কর্তৃক বিতাড়ণের পর বনু নাযীর ইহুদী গোত্র এই খায়বারে বসবাস করতে শুরু করে। এই বনু নাযীর খন্দকের যুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র করেছিল। সকল ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল খায়বার। ১৬০০ যোদ্ধা নিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বার অবরোধ করেন। ২০ দিন অবরোধ ও যুদ্ধের পর খায়বারের পতন ঘটে। এ যুদ্ধে হজরত আলী রা.-এর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। এ যুদ্ধের পর ইহুদীরা তাদের সকল সম্পদ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়। খায়বারের যুদ্ধ নিয়ে আল্লাহতালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন 'আল্লাহ তোমাদের বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওয়াদা দিয়েছেন, যা তোমরা লাভ করবে। তিনি তা তোমাদের জন্য ত্বরান্বিত করবেন। ইহুদীরা ফসলের অর্ধাংশ প্রদান করার শর্তে এসব জমি চাষাবাদের অধিকার প্রার্থনা করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।
**যেভাবে শুরু**
হযরত সাফিয়্যা রা.-এর পিতা ও নানা উভয়ে নিজ নিজ খান্দানের অতি সম্মানীয় নেতা ছিলেন। অতি প্রাচীনকাল থেকে আরবের উত্তরাঞ্চলে বসবাসরত ইহুদী সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের দুটি খান্দান বনু কুরাইযা ও বনু নাযীর অন্যসব আরব ইহুদী খান্দানের চেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী বলে গণ্য হতো। গোত্রের প্রতিটি সদস্য হুয়াই ইবনে আখতাবকে সীমাহীন সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হতো। গোত্রের আরব সদস্য তার হুকুম ও নেতৃত্ব বিনা প্রশ্নের মেনে নিত। তার নানা সামাওয়াল ছিলেন গোটা আরব উপদ্বীপে বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য প্রসিদ্ধ। মোটকথা, হযরত সাফিয়্যা রা. পিতৃ ও মাতৃকূলের দিক দিয়ে দারুণ কৌলীন্যের অধিকারিণী ছিলেন।
মূলত হযরত সাফিয়্যা রা.-এর আসল নাম যায়নাব। যেহেতু তিনি খায়বার যুদ্ধের গনীমাতের মাল হিসেবে মুসলমানদের অধিকারে আসেন এবং বণ্টনের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাগে পড়েন, আর তৎকালীন আরবে নেতা অথবা বাদশার অংশের গনীমাতের মালকে সাফিয়্যা বলা হতো, তাই যায়নাবও সেখানে থেকে সাফিয়্যা নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যান এবং তার আসল নামটি হারিয়ে যায়।
বনু কুরাইযার সালাম ইবনে মাশকাম ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি ও নেতা। তার সাথে হযরত সাফিয়্যার প্রথম বিয়ে হয়। এ বিয়ে টেকেনি। ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর হিজাযের বিখ্যাত সওদাগর ও খায়বরের অন্যতম নেতা আবু রাফে-এর ভাতিজা কিনানা ইবনে আবিল হুকাইক-এর সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। সম্মান ও প্রতিপত্তির দিক দিয়ে কিনানা সালামের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না। তিনি খায়বারের অতি প্রসিদ্ধ দুর্গ 'আল-কামূসে'র নেতা এবং বড় কবি ছিলেন। পরিবার-পরিজনসহ এই দুর্গেই বসবাস করতেন। এক প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে খায়বার যখন মুসলমানদের অধিকারে আসে এবং আল-কামুস' দুর্গের পতন ঘটে তখন দুর্গের অভ্যন্তরেই হযরত সাফিয়্যা রা.-এর স্বামী কিনানা নিহত হন এবং সাফিয়্যাসহ তাঁর পরিবারের অন্যসব সদস্য মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। তাদের মধ্যে সাফিয়্যা রা.-এর দুজন চাচাতো বোনও ছিলেন। ইবনে ইসহাক বলেছেন, সাফিয়্যা রা. ছিলেন কিনানার তরুণী স্ত্রী। মাত্র কিছুদনি আগেই তাদের বিয়ে হয়েছিল।
এ যুদ্ধ খায়বারের ইহুদীদের জন্য এত বিপর্যয়কর ছিল যে, তাদের সকল আশা-ভরসা কপূরের মতো উড়ে যায় এবং ভবিষ্যতে তারা মাথা তুলে দাঁড়াবার সকল যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। এ যুদ্ধে তাদের সকল নামী-দামী নেতা নিহত হন। নিহতদের মধ্যে হযরত সাফিয়্যা রা.-এর পিতা এবং ভাইও ছিলেন। এ কারণে তিনি সকল যুদ্ধবন্দীর মধ্যে অধিকতর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের যোগ্য ছিলেন।
সকল সীরাতবিশেষজ্ঞ হযরত সাফিয়্যা রা. নৈতিক গুণাবলীর অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। আল্লামা ইবনে আবদিল বার লিখেছেন, 'সাফিয়্যা রা. ছিলেন ধৈর্যশীল, বুদ্ধিমতি ও বিদুষী নারী। ইবনুল আসীর বলেছেন, 'তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমতি মহিলা। আল্লামা যাহাবী বলেছেন, 'হযরত সাফিয়্যা রা. ছিলেন ভদ্র, বুদ্ধিমতি, উঁচু বংশীয়া, রূপবতী ও দ্বীনদার মহিলা।
**যখন থেকে উম্মুল মুমিনীন**
নিয়ম অনুযায়ী যখন গনীমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও দাস-দাসী) মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তুতি চলল এবং এ উদ্দেশ্যে সকল বন্দীকে একত্র করা হলো, তখন দাহইয়াতুল কালবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার একটি দাসীর প্রয়োজনের কথা জানালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বন্দী মেয়েদের মধ্য থেকে পছন্দ করার অনুমতি দিলেন। দাহইয়া রা. সাফিয়্যা রা.-কে পছন্দ করলেন। যেহেতু মান-মর্যাদার দিক দিয়ে হযরত সাফিয়্যা রা. দাহইয়ার রা. চেয়েও উঁচু স্তরের ছিলেন, এ কারণে সাহাবীদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, সাফিয়্যা রা. বনু নাযীর ও বনু কুরাইযার নেত্রী। সে আপনারই উপযুক্ত।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ পরামর্শ গ্রহণ করলেন এবং সাফিয়্যাসহ দাহইয়া কালবীকে ডেকে আনালেন। তিনি দাহইয়াকে অন্য একটি দাসী পছন্দ করতে বলে সাফিয়্যা রা.-কে নিজের কাছে রেখে দিলেন। পরে তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে বিয়ে করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাহইয়া কলবীকে সাফিয়্যা রা.-এর পরিবর্তে তার স্বামী কিনানার বোনকে দান করেন। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সাফিয়্যা রা.-এর চচাতো বোনকে দান করেন। সহীহ মুসলিমে এসেছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাতজন বন্দীর বিনিময়ে দাহইয়ার নিকট থেকে সাফিয়্যা রা.-কে খরীদ করেন।
এ হিজরী ৭ম সনের ঘটনা। বুখারীর একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বার অভিযান শেষ করে মদীনায় ফেরার পথে 'সাহ্বা' নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে হযরত আনাসের রা. মা হযরত উম্মে সুলাইম রা. সাফিয়্যা রা.-এর মাথায় চিরুনী করেন, কাপড় পাল্টান এবং তার দেহে সুগন্ধি লাগান। তারপর তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পাঠান। সেখানে বাসর হয় এবং সেখানেই ওলীমা হয়। কেউ খেজুর, কেউ চর্বি, কেউ হাইস অর্থাৎ যার কাছে খাবার যা কিছু ছিল নিয়ে এলো। তারপর সবাই এক সাথে বসে আহার করেন। মূলত এটাই ছিল ওলীমা। এই ওলীমার কথা সহীহাইনে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে।
এই সাহ্বাতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফিয়্যা রা.-এর সাথে তিন দিন কাটান। প্রথম বাসর রাতে হযরত আবু আইউব আল-আনসারী রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অজান্তে কোষমুক্ত তরবারি হাতে সারা রাত তার তাঁবুর দরজায় পাহারা দেন। সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেন, এই মহিলার পিতা, স্বামী, ভাইসহ সকল নিকট আত্মীয় নিহত হয়েছে। তাই আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, কোনো খারাপ কিছু করে না বসে। তার কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটু হেসে দেন এবং তার জন্য দুআ করেন।
'সাহবা' থেকে যখন সাফিয়্যা রা.-কে নিজের উটের ওপর বসিয়ে যাত্রা করেন তখন লোকেরা বুঝতে পারছিল না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বেগমের মর্যাদা দান করেছেন, না দাসী হিসেবে নিজের মালিকানায় রেখেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের এ মনোভাব বুঝতে পেরে একটি পর্দা টানিয়ে সাফিয়্যা রা.-কে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে নিয়ে যান। মূলত এ পর্দা দ্বারা একথা জানিয়ে দেন যে, সাফিয়্যা রা. দাসী নন; বরং তিনি পবিত্র বেগমের মর্যাদা লাভ করেছেন।
কোনো কোনো বর্ণণায় এসেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় 'আবা' দ্বারা পর্দা করেন। 'সাহবা' থেকে চলার পথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাফিয়্যা রা.-এর বাহন উটটি হোঁচট খায়। তাতে পিঠের আরোহীদ্বয় ছিটকে পড়ে যান। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অক্ষত রাখেন। পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে হযরত আবু তালহা রা. তার বাহনের পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছুটে গিয়ে বলেন, ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ! আপনি কষ্ট পেয়েছেন কি? তিনি জবাব দেন, 'না। তুমি মহিলাকে দেখ।' সাথে সাথে আবু তালহা কাপড় দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে দিয়ে হযরত সাফিয়্যা রা.-এর দিকে এগিয়ে যান এবং তার ওপর একখানি কাপড় ছুঁড়ে দেন। সাফিয়্যা রা. উঠে দাঁড়ান। আবু তালহা নিজের উটটি প্রস্তুত করেন এবং তার ওপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফিয়্যা রা.-কে নিয়ে আরোহণ করেন। 'সাহবা' থেকে যাত্রার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাঁটুর ওপর হযরত সাফিয়্যা রা. পা রেখে উটের পিঠে আরোহণ করেন।
হযরত জাবির রা. বলেন, সাফিয়্যা রা.-কে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাঁবুতে ঢোকানো হলো, আমরা সেখানে উপস্থিত হলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা তোমাদের মায়ের কাছ থেকে ওঠো।' সন্ধ্যায় আমরা আবার গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে আসলেন। তখন তার চাদরের মধ্যে দেড় 'মুদ' পরিমাণ 'আজওয়া' খেজুর ছিল তিনি আমাদেরকে বললেন, তোমরা তোমাদের মায়ের ওলীমা খাও।' মদীনা পৌঁছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সাফিয়্যাকে প্রখ্যাত সাহাবী হারিস ইবনে নু'মানের রা. বাড়িতে উঠালেন। হযরত হারিস রা. ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন জান-কুরবান সাহাবী। আল্লাহ তাকে অঢেল অর্থও দান করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রয়োজনের কথাও সব সময় স্মরণ রাখতেন। প্রয়োজনের সময় দ্রুত এগিয়ে আসতেন। হযরত সাফিয়্যাকেও তিনি সানন্দে থাকার জন্য ঘর ছেড়ে দেন।
উম্মে সিনান সালমিয়্যার বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত সাফিয়্যা রা.-এর রূপ ও সৌন্দর্যের কথা শুনে আনসার মহিলাদের সাথে হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ, হযরত হাফসা, হযরত ইয়াসার বর্ণনা করেছেন, আনসার মেয়েদের সাথে হযরত আয়েশা রা.-এর মুখে নিকাব টেনে সাফিয়্যাকে দেখতে আসেন। ফেরার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পেছনে যান এবং প্রশ্ন করেন, 'আয়েশা, তাকে কেমন দেখলে?' আয়েশা রা. বললেন, 'দেখেছি, সে তো এক ইহুদী নারী।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এমন বলো না। সে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং একজন ভালো মুসলমান হয়েছে।'
উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যা রা. ছিলেন খুবই দৃঢ় চিত্তের মহিলা। জীবনে কখনো অধৈর্য হয়েছেন—এমন কথা জানা যায় না। আল-কামূস দুর্গের পতন ঘটলে এবং গোটা খায়বরে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হলে হযরত বিলাল রা. সাফিয়্যা রা. ও তার চাচাতো বোনদের সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট যেতে থাকেন। ইহুদীদের লাশের পাশ দিয়েই তারা চলছিলেন। সাধারণত এরূপ পরিস্থিতি খুবই মর্মস্পর্শী হয়। অত্যন্ত শক্ত মনের মানুষের অন্তরও কেঁপে ওঠে। এ কারণে তার সাথের মহিলারাও এ ভয়াবহ দৃশ্য দেখে চিৎকার দিয়ে ওঠে। তারা মাথার চুল ছিঁড়ে মাতম করতে থাকে; কিন্তু হযরত সাফিয়্যা রা.-এর অবস্থা দেখুন। প্রিয় স্বামীর লাশের পাশ দিয়ে বন্দী অবস্থায় চলছেন, তিনি একটুও বিচলিত নন। কোনো রকম ভাবান্তর নেই। দৃঢ় পদক্ষেপে তিনি হেঁটে চলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরে এভাবে তাদের বাপ-ভাইয়ের লাশের পাশ দিয়ে নিয়ে আসার জন্য বিলাল রা.-কে তিরস্কার করেন।
**উদারচিত্তের অধিকারিণী**
হযরত সাফিয়্যা রা. স্বভাবগতভাবেই ছিলেন অত্যন্ত উদার ও দানশীল। ইবনে সাআদ লিখেছেন, যে ঘরখানিতে তিনি বসবাস করতেন জীবদ্দশায় তা দান করে গিয়েছিলেন। আল্লামা যুরকানীর বর্ণনায় জানা যায়, উম্মুল মুমিনীন হিসেবে মদীনায় আসার পর তিনি নিজের কানের সোনার দুইটি দুল হযরত ফাতিমা রা. ও অন্যান্য আযওয়াযে মুতাহহারাতের মধ্যে ভাগ করে দেন।
হযরত সাফিয়্যা রা.-এর এক দাসী একবার খলীফা হযরত উমর রা.-এর নিকট অভিযোগ করলেন যে, এখনো তার মধ্যে ইহুদী ভাব বিদ্যামন। কারণ, তিনি এখনো শনিবারকে মানেন এবং ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখেন। দাসীর কথার সত্যতা যাচায়ের জন্য হযরত উমর রা. লোক মারফত হযরত সাফিয়্যা রা.-কে অভিযোগের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। তিনি জবাব দেন, 'যখন থেকে আল্লাহ আমাকে শনিবারের পরিবর্তে জুমআকে দান করেছেন, তখন থেকে শনিবারকে মানার কোনো প্রয়োজন নেই। আর ইহুদীদের সাথে আমার সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে আমার বক্তব্য হলো, সেখানে আমার আত্মীয়-স্বজন আছে। তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার দিকে আমার দৃষ্টি রাখতে হয়।' তারপর তিনি দাসীকে ডেকে জানতে চান, এ অভিযোগ করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করছেন? দাসী বললেন, শয়তান। হযরত সাফিয়্যা রা. চুপ হয়ে যান এবং দাসীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য বেগমগণের মতো হযরত সাফিয়্যা রা.ও ছিলেন ইলম ও মারিফারেত কেন্দ্র। প্রায়ই লোকেরা তার কাছে বিভিন্ন বিষয় প্রশ্ন করত এবং তারা জবাব পেয়ে তুষ্ট হতো। সুহায়রা বিনতে হায়কার নাম্নী এক মহিলা একবার হজ আদায় করে হযরত সাফিয়্যা রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে মদীনায় আসেন। তিনি হযরত সাফিয়্যা রা.-এর গৃহে যখন যান এখন দেখতে পান, সেখানে কুফার বহু মহিলা বসে আছেন এবং তাকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করছেন। আর তিনি খুব সুন্দরভাবে তাদের জবাব দিচ্ছেন।
একবার হযরত সাফিয়্যা রা. বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি ছাড়া আপনার অন্য সব বেগমদেরই আত্মীয়-স্বজন আছে। আপনার যদি কোনো কিছু হয়ে যায়, আমি কোথায় আশ্রয় নেব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আলীর রা. নিকট।
উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যা রা. বর্ণনা করেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযানের শেষ দশদিনের ই'তিকাফে মসজিদে অবস্থান করছেন। সে সময় একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করতে মসজিদে যান। কিছুক্ষণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলার পর ঘরে ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামার দরজার কাছে মসজিদের দরজা পর্যন্ত তার সথে আসেন। তখন সেই পথে আনসারদের দুই ব্যক্তি যাচ্ছিল। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সালাম করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের দুইজনকে বললেন, তোমরা একটু থাম, এ হচ্ছে সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই। এ কথা শুনে তারা সুবহানাল্লাহ পাঠ করল, ও তাকবীর ধ্বনি দিল। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, শয়তান আদম সন্তানের রক্ত চলাচলের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় পৌঁছতে পারে। আমি শঙ্কিত হয়েছিলাম, সে তোমাদের দুইজনের অন্তরে খারাপ কিছু ঢুকিয়ে না দেয়।
**রাসূলের ভালোবাসা**
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি হযরত সাফিয়্যার ছিল অন্তহীন ভালোবাসা। রাসূল যখন আয়েশার গৃহে অন্তিম রোগশয্যায় তখন একদিন সাফিয়্যা রা.-সহ অন্য বিবিগণ স্বামীকে দেখতে ও সেবা করতে একত্র হয়েছেন। হযরত সাফিয়্যা রা. এক সময় অত্যন্ত ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আপনার এই সব কষ্ট যদি আমিই ভোগ করতাম, খুশি হতাম।' তার এমন কথা শুনে অন্য বিবিগণ একে অপরের দিকে এমনভাবে তাকাতে লাগলেন যেন, তার কথায় তারা সন্দেহ করছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর কসম! সে সত্য বলেছে।'
হযরত সাফিয়্যা রা.-এর প্রতি হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসার অবস্থা ঠিক এরকম ছিল। সাফিয়্যা রা.-এর সঙ্গ তিনি পছন্দ করতেন এবং সব সময় তাকে খুশি রাখার চেষ্টা করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফিয়্যাসহ অন্য বেগমগণকে সঙ্গে নিয়ে হজের সফরে বের হয়েছেন। পথিমধ্যে সাফিয়্যা রা.-এর বাহন উটটি অসুস্থ হয়ে বসে পড়ে। সাফিয়্যা রা. ভয় পেয়ে যান এবং কান্না শুরু করে দেন। খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসেন এবং নিজের পবিত্র হাতে তার চোখের পানি মুছে দেন; কিন্তু এতেও তার কান্না না থেমে আরও বেড়ে যায়। উপায়ান্তর না দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলকে নিয়ে সেখানে যাত্রাবিরতি করেন। সন্ধ্যার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রী হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-কে বলেন, 'যায়নাব, তুমি সাফিয়্যাকে একটি উট দিয়ে দাও।' হযরত যায়নাব রা. বললেন, আমি উট দেব আপনার এই ইহুদী মহিলাকে?' তার 'এমন প্রত্যুত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভীষণ নাখোশ হন এবং দুই অথবা তিন মাস যাবত হযরত যায়নাব রা.-এর সাথে কথা বলা এবং কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। অবশেষে হযরত আয়েশা রা.-এর মধ্যস্থতায় অতি কষ্টে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ অসন্তুষ্টি তিনি দূর করান।
আর একবার হযরত আয়েশা রা. হযরত সাফিয়্যা রা.-এর দৈহিক গঠন সম্পর্কে একটি মন্তব্য করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি এমন একটি কথা বলেছ, যদি তা সাগরেও ছেড়ে দেওয়া হয়, তাতে মিশে যাবে। অর্থাৎ সাগরের পানিও ঘোলা করে ফেলবে।
ইসলাম গ্রহণ করে পবত্রি হওয়ার পর তাকে কেউ ইহুদী বলে কটাক্ষ করলে তিনি ভীষণ কষ্ট পেতেন। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ঘরে গিয়ে দেখেন, তিনি কাঁদছেন। কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেন, 'আয়েশা ও যায়নাব দাবি করে যে, তারা অন্য বিবিগণের চেয়ে উত্তম। কারণ, তারা আপনার বিবি হওয়া ছাড়াও চাচাতো বোন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে খুশি করার জন্য বলেন, তুমি তাদেরকে একথা কেন বললে না যে, আমার বাবা হারুন আ., আমার চাচা মূসা আ. এবং আমার স্বামী মুহাম্মাদ। এ কারণে তোমরা আমার চেয়ে ভালো হতে পার কীভাবে!
**উসমান রা.-এর সাথে ঐতিহাসিক ভূমিকা**
হিজরী ৩৫ সনের বিদ্রোহীরা তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রা.-কে মদীনায় তার গৃহে অবরুদ্ধ করে রাখে। সে সময় হযরত সাফিয়্যা রা. খলীফার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বিদ্রোহীরা যখন খলীফার গৃহে বাইরে সকল সরবরাহ ও যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, তার গৃহের চতুর্দিকে পাহারা বসায়, তখন একদিন হযরত সাফিয়্যা রা. খচ্চরের ওপর চড়ে খলীফার গৃহের দিকে যেতে থাকেন। সঙ্গে দাস ছিল। তিনি আশতার নাখয়ীর দৃষ্টিতে পড়ে যান। আশতার তার চলায় বাধা দিতে খচ্চরটিকে মারতে শুরু করে। হযরত সাফিয়্যা রা. বললেন, আমার লাঞ্ছিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি ফিরে যাচ্ছি। তুমি আমার গাধা ছেড়ে দাও। এভাবে গৃহে ফিরে এসে হযরত সাফিয়্যা রা. হাসান রা.-কে খলীফার গৃহের সাথে যোগাযোগের দায়িত্বে নিয়োগ করেন। তিনি উম্মুল মুমিনীন সাফিয়্যা রা.-এর গৃহ থেকে খাবার ও পানি খলীফার বাসগৃহে পৌঁছে দিতেন।
**অন্তিম সময়**
আম্মাদের আম্মাজান হযরত সাফিয়্যা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন। এই সময়টুকু তিনি আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী, ইলম ও দাওয়াতের কাজে কাটান। খিলাফতে রাশেদার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি দেখে যান। দিক-দিগন্তে দেখে যান ইসলামের সুনির্মল আলো। হিজরী ৫০ সনের রমাযান মাসে ৬০ বছর বয়সে হযরত সাফিয়্যা রা. মদীনায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এবং পৃথিবীর বুকে রেখে যান এক আলোকোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।
**টিকাঃ**
২৮৩. আসাহহুস সিয়ার, ২৩৭।
২৮৪. আল ইসতিআব, ৪/৩৪৮।
২৮৫. উসদুল গাবাহ, ৫/৪৯০।
২৮৬. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩২।
২৮৭. উসদুল গাবাহ, ৫/৪৯০।
২৮৮. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২২; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৩৬৫।
২৮৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৫।
২৯০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/১৯৬; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৩।
২৯১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৫।
২৯২. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৩৩৬; উসদুল গাবাহ, ৫/৪৯০।
২৯৩. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৭; আরনাউত বর্ণনাকারীদের 'সিকা' বলেছেন।
২৯৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৩; আল ইসতিআব, ৪/৩৪৮।
২৯৫. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২১৭৫।
২৯৬. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৮।
২৯৭. মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩৩৭; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৬।
২৯৮. সুনান, আবু দাউদ, ২/১৯৩।
২৯৯. সুনান, তিরমিযী, ৩৮৯২।
৩০০. আল ইসাবাহ, ৪/৩৩৯; তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১২৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৩৭।