📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 হাফসা বিনতে উমর রা.

📄 হাফসা বিনতে উমর রা.


অধিক রোযাদার, অধিক নামাযী

আজ আমরা এক ভুবনমোহিনী বাগানের ফুল নিয়ে আলোচনা করব। হ্যাঁ, তিনি হচ্ছেন উম্মুল মুমিননীন হাফসা বিনতে উমর রা.। তিনি এমন এক প্রস্ফুটিত গোলাপের ন্যায় মানবী, যার মর্যাদা, মহত্ত্ব ও বহুবিদ কৃতিত্বে ভরা জীবনকাহিনী লিখে শেষ করা যাবে না।

পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে যিনি খ্যাত, আর ইসলামের প্রাথমিক পর্বে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়কারী হিসেবে যিনি পরিচিত, সেই আলোকময় ব্যক্তিত্ব হযরত উমর রা.-এর কন্যা উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা.-এর জন্য বংশ মর্যাদার ক্ষেত্রে অন্য কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না।

হযরত উমর রা. এমন ব্যক্তি ছিলেন, যাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াত নাযিল করেছেন। তার শান মান কত ঊর্ধ্বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট তার স্থান ছিল অতি উচ্চে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর ভাষ্যমতে, 'উমরের ইসলাম গ্রহণ ইসলামের বিজয়। তার হিজরত আল্লাহর সাহায্য এবং তার খিলাফত আল্লাহর রহমত। ১৮২ উমরের যাবতীয় গুণাবলী লক্ষ করেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'আমার পরে কেউ নবী হলে উমরই হতো।' কারণ, তার মধ্যে ছিল নবীদের স্বভাব বৈশিষ্ট্য।

যিনি দশ বছরের স্বল্প সময়ে গোটা বাইজান্টাইন রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটান। তার যুগে বিভিন্ন অঞ্চলসহ মোট ১০৩৬টি শহর বিজিত হয়। ইসলামী হুকুমাতের সরকার ও প্রশাসনিক কাজে নথি ও রেকর্ড ব্যবস্থা তার যুগেই আত্মপ্রকাশ করে। তার শাসন ও ইনসাফের কথা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে আছে।

হযরত উমর প্রথম খলীফা, যিনি আমীরুল মুমিনীন উপাধী লাভ করেন। তিনিই প্রথম হিজরী সন প্রবর্তন করেন, তারাবীর নামায জামাতে পড়ার ব্যবস্থা করেন, জনশাসনের জন্য দুররা বা ছড়ি ব্যবহার করেন, মদ্যপানে আশিটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন, বহু রাজ্য জয় করেন, নগর পত্তন করেন, সেনাবাহিনীর স্তরভেদ ও বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন নির্দিষ্ট করেন, জাতীয় রেজিস্টার বা নাগরিক তালিকা তৈরি করেন, কাজী নিয়োগ করেন, রাষ্ট্রকে বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত করেন।

✓ উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা.-এর চাচা হচ্ছেন হযরত যায়িদ ইবনে খাত্তাব রা.। যাঁর শাহাদাতের খবর শুনে হযরত ফারূকে আযম রা. বলে ওঠেন, رَحِمَ اللَّهُ زَيْدًا .. سَبَقَنِي إِلَى الْحُسْنَيَيْنِ.. أَسْلَمَ قَبْلِي.. وَاسْتَشْهَدَ قَبْلِي আল্লাহ যায়েদের ওপর রহম করুন। দু-টি নেক কাজে তিনি আমার থেকে অগ্রগামী রয়ে গেলেন। আমার আগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আমার আগে শাহাদাতও বরণ করলেন।

✓ যে সব বিজয় দিন দিন মুসলমানদের হাতে এসেছে, তার মধ্যে এমন কোনো বিজয় নেই যাতে হযরত উমর রা. তার ভাই হযরত যায়িদ ইবনে খাত্তাব রা.-কে স্মরণ করেননি। তিনি সবসময় বলতেন, مَا هَبَّتِ الصَّبَا إِلَّا وَجَدْتُ مِنْهَا رِيحَ زَيْدٍ প্রভাতের এমন কোনো বায়ু প্রবাহিত হয় না, যেখানে আমি যায়েদের সুঘ্রাণ পাই না।

✓ হযরত হাফসা রা.-এর আম্মাজান হচ্ছেন যায়নাব বিনতে মাযঊন রা.- যিনি বিশিষ্ট সাহাবী হযরত উসমান ইবনে মাযঊন রা.-এর সহোদরা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উসমান ইবনে মাযঊন রা.-কে ভীষণ ভালোবাসতেন। হযরত উসমানের পবিত্র আত্মাই মদীনার মুহাজিরদের মধ্যে প্রথম আখিরাতে সফরের প্রস্তুতি নেয়। এভাবে মদীনায় মুহাজিরদের জান্নাতের পথের তিনিই প্রথম অভিযাত্রী। হযরত উসমান ইবনে মাযউনের মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভীষণ ব্যথিত হন। তিনি তিনবার ঝুঁকে পড়ে তার কপালে চুমু দেন। ১৮৩ তখন রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চোখের পানিতে উসমানের গণ্ডদ্বয় সিক্ত হয়ে যায়। তারপর মাথা সোজা করে কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, আবু সাইব, আমি তোমার থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছি। আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন। দুনিয়া থেকে তুমি এমনভাবে বিদায় নিলে যে, তার থেকে তুমি কিছু নিলে না এবং দুনিয়াও তোমার থেকে কিছুই নিতে পারেনি।

✓ হযরত উসমান ইবনে মাযউন রা.-এর মৃত্যুর পরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ভুলে যাননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যা হযরত রুকাইয়্যা মারা গেলে তিনি কন্যাকে সম্বোধন করে বলেন,
الْحَقِى بِسَلَفِنَا الْخَيْرِ عُثْمَانُ بْنُ مَظْعُوْنٍ
যাও আমাদের উত্তম অগ্রগামী উসমান ইবনে মাযউনের সাথে গিয়ে মিলিত হও। ১৮৪

✓ তাঁর ফুফু হচ্ছেন, হযরত ফাতিমা বিনতুল খাত্তাব রা.। যিনি ইসলামের শুরুলগ্নেই স্বামীর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার স্বামী হচ্ছেন, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের অন্যতম সদস্য হযরত সাঈদ ইবনে যায়িদ রা.।

✓ তাঁর ভাই হচ্ছেন, আবিদ, যাহিদ, মুত্তাকী, আল্লাহভীরু ও পরহেযগার আলেম সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.। যাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আবদুল্লাহ অত্যন্ত নেক ব্যক্তি। ১৮৫

হযরত আয়েশা রা. তার ইত্তেবায়ে সুন্নাত সম্পর্কে বলেছেন, 'ইবনে উমরের মতো আর কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন না।'

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. তার দীর্ঘ জীবনটি এভাবে কাটান। এক সময় মুসলমানদের ওপর এমন এক যুগ আসে, যে যুগের ভালো মানুষেরা এটা কামনা করে দুআ করত:
হে আল্লাহ, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি জীবিত থাকি, ততক্ষণ পর্যন্ত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কেও জীবিত রাখ। যাতে আমি তার অনুসরণ করতে পারি।

হযরত আয়েশা রা. বলেন, 'আমি তো তাকে ছাড়া আর কাউকে এমন দেখছি না, যে প্রথম যুগের মতো আমলে অবিচল আছে।' ১৮৬

এই যাঁদের মর্যাদা, তাদের জীবন কাহিনী ও কৃতিত্বের কথা মুখের ভাষায় বা কলমের কালি দ্বারা কি বর্ণনা করা সম্ভব?

বরকতময় শৈশব
উপর্যুক্ত ভূমিকা দ্বারা এ কথা সহজেই অনুমেয়, ফারূকী গৃহে বড়ই শান ও অনুপম পরিবেশে লালিত-পালিত হন উম্মুল মুমিনীন হাফসা রা.। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ বছর পূর্বে তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। মক্কার কুরাইশরা তখন কাবা ঘরের পুনঃনির্মাণের কাজে ব্যস্ত।

হাফসা রা.-এর মধ্যে ছিল শেখা ও জানার প্রবল আগ্রহ। সবসময় তিনি বিভিন্ন বিষয়ে শেখানোর চিন্তা করতেন। হযরত শিফা বিনতে আবদিল্লাহ ছিলেন একজন মহিলা সাহাবী। তিনি লিখতে ও পড়তে জানতেন। হযরত হাফসা তার নিকট লেখা শেখেন। এভাবে তিনি হয়ে উঠেন কুরাইশদের একজন সুসাহিত্যিক নারী।

উমরের ইসলামগ্রহণ ছিল বিজয়
আরবের মাটিতে যখন ইসলামে নবসূর্য উদিত হয়, উমর তখন ছিলেন শিরকের অন্ধকারে নিমজ্জিত। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে বেশ আশা পোষণ করতেন। হাদীসে এসেছে, ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
اللَّهُمَّ أَعِنَّ الإِسْلَامَ بِأَبِي جَهْلِ بْنِ هِشَامٍ أَوْ بِعُمَرَ হে আল্লাহ, আবু জাহেল ইবনে হিশাম অথবা উমর ইবনুল খাত্তাবের মারফত ইসলামকে শক্তিশালী করুন।

রাবী বলেন, পরের দিন সকালে উমর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম কবুল করেন। ১৮৭

উমরের ইসলাম গ্রহণে ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। যদিও তখন পর্যন্ত ৪০-৫০জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে হযরত হামযা রা.ও ছিলেন তথাপি মুসলমানদের পক্ষে কাবায় গিয়ে নামায পড়া তো দূরের কথা, নিজেদের মুসলমান বলে প্রকাশ করাও নিরাপদ ছিল না। হযরত উমরের ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে এ অবস্থার পরিবর্তন হলো। তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দিলেন এবং অন্যদের সঙ্গে নিয়ে কাবাঘরে নামায আদায় করা শুরু করলেন। ১৮৮

উমর রা.-এর হিজরত এ অন্যান্যদের হিজরতের মধ্যে একটা বিশেষ পার্থক্য ছিল। অন্যদের হিজরত ছিল চুপে চুপে। সকলের অগোচরে। আর উমরের হিজরত ছিল প্রকাশ্য। তার মধ্যে ছিল কুরাইশদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ও বিদ্রোহের সুর। মক্কা থেকে মদীনায় যাত্রার পূর্বে তিনি প্রথমে কাবা তাওয়াফ করলেন। তারপর কুরাইশদের আড্ডায় গিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি মদীনা চলছি। কেউ যদি তার মাকে পুত্র শোক দিতে চায় সে যেন এ উপত্যকার অপর প্রান্তে আমার মুখোমুখি হয়। এমন একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তিনি মদীনার পথ ধরলেন; কিন্ত কেউ এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণের দুঃসাহস করল না।

হযরত উমর রা.-এর নিষ্ঠা, বীরত্ব ও সাহস ছিল মহান আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত। তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা.-এর দেখানো পথে রপ্ত করেন চরিত্র, ইবাদত, আচার-ব্যবহার ও দয়া-অনুগ্রহ।

খুনাইসের সাথে বিয়ে
বিয়ের বয়স হলে পিতা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম হযরত খুনাইস ইবনে হুজাফার সাথে তার প্রথম বিয়ে দেন। এই খুনাইস রা. হচ্ছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফাহ রা.-এর ভাই। বিয়ের পর তারা অটল ঈমানের সাথে আল্লাহর ইবাদতে দিন কাটাতে থাকেন। হযরত খুনাইস রা. ওই সময় ইসলাম গ্রহণ করেন যখন পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িতে প্রবেশ করেননি। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর হাতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

আল্লাহর রাস্তায় বের হও
সাহাবীদের ওপর মক্কার মুশরিকদের অনবরত নির্যাতন বাড়তেই থাকে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীদের আবিসিনিয়ার উদ্দেশে হিজরতের ইশারা দেন। খুনাইস রা.-ও আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। ক'দিন পর আবার মক্কায় ফিরে আসেন। এসে যখন দেখলেন, পূর্বের তুলনায় মুশরিকদের নির্যাতন ও নিপীড়নের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে এবং দিনের পর দিন তা বেড়েই চলেছে, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিলে হযরত হাফসা রা.-কে নিয়ে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় আনসারদের সাথে এই দম্পতি জীবন-যাপন করতে থাকেন।

এক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করে মদীনায় চলে আসেন। তখন পুরো মদীনা আলোকিত হয়ে ওঠে। প্রিয় হাবীব সা.-এর সান্নিধ্যে কতই না সুন্দর কাটছিল তাঁদের জীবন!

যন্ত্রণাদগ্ধ বিচ্ছেদ
বদর যুদ্ধ—যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের প্রভূত কল্যাণ ও সাহায্য দান করেছেন, এ যুদ্ধে হযরত খুনাইস রা. একজন সাহসী বীর বেশে শাহাদাতের অভিলাসে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রবল বিক্রমে লড়াই করেন। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম হয় তাঁর।

তারপরও তিনি আল্লাহর দ্বীনকে উচ্চকিত রাখার নিমিত্তে এবং কাফেরদের পিষ্ট করার লক্ষ্যে লড়াইয়ে অবিচল থাকেন। এক সময় যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। বিজয়ী বেশে মদীনা অভিমুখে মারাত্মক আহত অবস্থায় ফিরে আসেন হযরত খুনাইস রা.।

এই আহত অবস্থাতেই তিনি মহান রবের সান্নিধ্যে চলে যান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জানাযার নামায পড়ান এবং জান্নাতুল বাকীতে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত উসমান ইবনে মাযঊন রা.-এর কবরের পাশে দাফন করেন। এদিকে অল্প বয়সেই বিধবা হন হযরত হাফসা রা.।

উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভ
মেয়ে বিধবা হওয়ার পর পিতা উমর রা. তার দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবতে লাগলেন। উমর রা. গেলেন আবু বকরের রা. কাছে। বললেন, আপনার সাথে আমি হাফসাকে বিয়ে দিতে চাই। আবু বকর রা. চুপ থাকলেন, কোনো জবাব দিলেন না। এরপর উসমানের সাথে দেখা করে তার সাথে হাফসার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। উসমান বিষয়টি ভেবে দেখবো বলে সময় নেন। কয়েক দিন পর, 'আমি এ সময় বিয়ে করতে চাচ্ছি না' বলে জবাব দেন। উমারের রা. দুঃখের কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হাফসাকে বিয়ে করবে উসমানের চেয়েও ভালো এক ব্যক্তি এবং উসমান বিয়ে করবে হাফসার চেয়েও ভালো এক নারীকে। তারপরই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাফসাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠান। ১৮৯

রাসূলুল্লাহ সা.-এর কন্যা রুকাইয়া রা.-এর ইন্তেকালের পর উম্মে কুলসুমকে বিয়ে দেন হযরত উসমান রা.-এর সাথে।

হযরত উমর রা. বলেন, এরপর আবু বকর রা. আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, সম্ভবত আপনি আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। আপনি যখন হাফসাকে আমার জন্য পেশ করেন তখন আমি কোনো উত্তর দিইনি। উমর রা. বলেন, আমি বললাম, হাঁ। আবু বকর রা. বললেন, আপনার প্রস্তাবে সাড়া দিতে কোনো কিছুই আমাকে বিরত করেনি; এ ছাড়া যে, আমি জানি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাফসার বিষয় উল্লেখ করেছেন আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গোপন ভেদ প্রকাশ আমার পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা ত্যাগ করতেন তাহলে আমি হাফসাকে গ্রহণ করতাম। ১৯০

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাফসাকে হিজরী তৃতীয় সনে গাযওয়ায়ে উহুদের পূর্বে বিয়ে করেন এবং চার শো দিরহাম দেনমোহর দান করেন। হযরত হাফসা রা. ও তার পিতার ওপর এটা ছিল অনেক বড়ো সম্মান, অনুগ্রহ ও ইহসান।

উচ্চতর মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ সা.-এর অন্তরে হযরত হাফসা রা.-এর জন্য ছিল বিশেষ মর্যাদা। অন্যান্য পবিত্র স্ত্রীগণের অন্তরেও তার বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা অটুট ছিল। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা ও হাফসা রা. পরস্পর সতীন হলেও তাদের সম্পর্ক ছিল বোনের মতো। অধিকাংশ ব্যাপারে তারা একে অপরের সহযোগী ছিলেন। 'আয়েশা রা. হাফসা সম্পর্কে বলেছেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র হাফসাই আমার সমকক্ষতার দাবীদার ছিলেন। ১৯১

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের সকল ছোট-বড় ঘটনা সাধারণ মানুষের জীবনের মতো নিছক কোনো ঘটনা নয়। প্রত্যেকটি ঘটনার মধ্যে রয়েছে মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় বিষয়। আল্লাহ তাআলা এসব ঘটনার মাধ্যমে মানব জাতিকে বিভিন্ন বিধি-বিধান ও আচরণের বাস্তব শিক্ষা দিতে চেয়েছেন।

নবীজী সা.-এর পবিত্র সহধর্মিণীগণ মানবিক সহজাত স্বভাব-প্রকৃতি হতে মুক্ত ছিলেন না। তাদেরও অন্যদের মতো মান-অভিমান ছিল, ছিল রাগ-অনুরাগ; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা.-এর মতো মহান শিক্ষকের সান্নিধ্যে থেকে তারা যাবতীয় চারিত্রিক সৌন্দর্য ও গুণাবলী রপ্ত করে নিয়েছিলেন। নিজ হাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের শিক্ষা দিতেন শিষ্টাচার ও দাম্পত্য জীবনের নানাবিধ বিধি-বিধান। যাতে করে উম্মতের মা-বোন ও কন্যারা সহজে সুন্নাতের ওপর আমল করে আল্লাহর হুকুম পালন করতে পারে। ১৯২

একটি উপমা
এই একটি উপমা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, রাসূলুল্লাহ সা.-এর স্ত্রীগণের মধ্যে কখনো কখনো ঈর্ষা দেখা দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কীভাবে তার প্রতিবিধান করতেন। কী অনুপম প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সাথে তিনি সেই আঘাত উপশম করতেন। হাদীসে এসেছে, আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর কাছে মধু পান করতেন এবং সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন। তাই আমি এবং হাফসা স্থির করলাম যে, আমাদের যার ঘরেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসবেন, সে তাকে বলবে, আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন? আপনার মুখ থেকে মাগাফীরের গন্ধ পাচ্ছি। তিনি বললেন, না, বরং আমি যায়নাব বিনতে জাহশ রা.-এর নিকট মধু পান করেছি। আমি কসম করলাম, আর কখনো মধু পান করব না। তুমি এ ব্যাপারে অন্য কাউকে জানাবে না।' ১৯৩

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এমন সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে আয়েশা আফসোসের সুরে হাফসাকে বলেন, আমরা একটি মারাত্মক কাজ করে ফেলেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার একটি প্রিয় বস্তু থেকে বঞ্চিত করে ফেলেছি। এ ঘটনারই প্রেক্ষিতে নাযিল হয় সূরা তাহরীমের নিম্নোক্ত আয়াত,
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَ اللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
হে নবী, আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদের খুশি করার জন্য তা নিজের জন্য হারাম করেছেন কেন? ১৯৪

উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা. জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো রাসূলুল্লাহ সা.-এর সান্নিধ্যে কাটান। এতে করে দিন দিন তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও ইবাদতের পরিমাণ বাড়তে থাকে।... কেনই-বা বাড়বে না? তার অন্তর তো ছিল সরল ও পবিত্র। নবী সা.-এর অন্যান্য স্ত্রীদের সাথে তিনিও আল্লাহর রাসূল সা.-কে সন্তুষ্ট রাখতে প্রতিযোগিতা করতেন। কী করে নবীর অধিক প্রিয়ভাজন হওয়া যায়, সেই চেষ্টাই থাকত তার সব সময়।

জান্নাতে নবী সা.-এর স্ত্রী
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় এবং পরবর্তী জীবনে হাফসা রা. প্রচুর ইবাদত-বন্দেগী করতেন। সব সময় রোযা রাখতেন এবং অতিমাত্রায় রাত জেগে নামায আদায় করতেন। একটি বিশেষ কারণে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাফসা রা.-কে এক তালাক দেন। তারপর আবার ফিরিয়ে নেন। তালাক দেওয়ার পর জিবরাঈল আ. এসে রাসূলকে বলেন, হাফসা খুব বেশি রোযা পালনকারিণী এবং রাতে বেশি বেশি নামায আদায়কারিণী। জান্নাতে তিনি আপনার স্ত্রী হবেন। জিবরীলের এ কথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার তাকে ফিরিয়ে নেন। ১৯৫

উক্ত বর্ণনা দ্বারাই মহান আল্লাহ তাআলার কাছে আম্মাজান হযরত হাফসা রা.-এর মর্যাদা আঁচ করা যায়।

তাঁর জ্ঞান ও ফিকহ
উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা. ইলম, ফিকহ ও তাকওয়ার দীক্ষা নিয়েছিলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছ থেকে। তার সেই ইলম ও ফিকহ দ্বারা খিলাফতে রাশেদায় প্রভূত কল্যাণ সাধিত হয়েছে। বিশেষ করে তার পিতার শাসনামলে। যেমন: একদিন উমর রা. রাতের বেলা নগর পরিভ্রমণে বেরিয়ে এক মহিলা দু-টি কবিতার পংক্তি গাইতে শোনেন। তারপর তিনি হাফসাকে জিজ্ঞেস করেন, মেয়েরা সর্বাধিক কতদিন স্বামী ছাড়া থাকতে পারে? হাফসা বলেন, ছয় অথবা চার মাস। ১৯৬ উমর রা. বলেন, আমি এর চেয়ে বেশিদিন কোনো সৈনিককে আটকে রাখবো না।

এছাড়া কুরআন সংরক্ষণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদীসটি আমরা ওহী লেখক হযরত যায়িদ ইবেন সাবিত রা.-এর মুখেই শুনি:

হযরত যায়িদ ইবনে সাবিত রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়ামামাহর যুদ্ধে বহু লোক শহীদ হবার পর আবু বকর সিদ্দীক রা. আমাকে ডেকে পাঠালেন। এ সময় উমর রা.-ও তার কাছে উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর রা. বললেন, উমর রা. আমার কাছে এসে বললেন, ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদদের মধ্যে কারীদের সংখ্যা অনেক। আমি আশঙ্কা করছি, এমনিভাবে যদি কারীগণ শাহীদ হয়ে যান, তাহলে কুরআন মাজীদের বহু অংশ হারিয়ে যাবে। অতএব, আমি মনে করি, আপনি কুরআন সংকলনের নির্দেশ দিন। উত্তরে আমি উমর রা.-কে বললাম, যে কাজ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেননি, সে কাজ তুমি কীভাবে করবে? উমর রা. জবাবে বললেন, আল্লাহর কসম! এটা একটি উত্তম কাজ। উমর রা. এ কথাটি আমার কাছে বার বার বলতে থাকলে অবশেষে আল্লাহ তাআলা এ কাজের জন্য আমার বক্ষকে উন্মোচন করে দিলেন এবং এ ব্যাপারে উমর যা ভালো মনে করলেন আমিও তাই করলাম। যায়িদ রা. বলেন, আবু বকর রা. আমাকে বললেন, তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক। তোমার ব্যাপারে আমার কোনো সংশয় নেই। তদুপরি তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওহীর লেখক ছিলে। সুতরাং তুমি কুরআন মাজীদের অংশগুলোকে তালাশ করে একত্র করো। আল্লাহর শপথ! তারা যদি আমাকে একটি পর্বত এক স্থান হতে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিত, তাহলেও তা আমার কাছে কুরআন সংকলনের নির্দেশের চেয়ে কঠিন বলে মনে হতো না। আমি বললাম, 'যে কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেননি, আপনারা সে কাজ কীভাবে করবেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম! এটা একটা কল্যাণকর কাজ।'

এ কথাটি আবু বকর সিদ্দীক রা. আমার কাছে বার বার বলতে থাকেন, অবশেষে আল্লাহ আমার বক্ষকে উন্মোচন করে দিলেন সে কাজের জন্য, যে কাজের জন্য তিনি আবু বকর এবং উমর রা.-এর বক্ষকে উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। এরপর আমি কুরআন অনুসন্ধানের কাজে লেগে গেলাম এবং খেজুর পাতা, প্রস্তরখণ্ড ও মানুষের বক্ষ থেকে আমি তা সংগ্রহ করতে থাকলাম। এমনকি আমি সূরা তওবার শেষাংশ আবু খুযায়মাহ আনসারী রা. থেকে সংগ্রহ করলাম। এ অংশটুকু তিনি বাদে আর কারও কাছে আমি পাইনি। আয়াতগুলো হচ্ছে এই : তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের কাছে এক রাসূল এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তার জন্য তা কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মু'মিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। এরপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলো, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং তিনি মহা আরশের অধিপতি। (১২৮-১২৯) তারপর সংকলিত সহীফাসমূহ মৃত্যু পর্যন্ত আবু বকর রা.-এর কাছে রক্ষিত ছিল। তার মৃত্যুর পর তা উমর রা.-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল, যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন। অতঃপর তা উমর রা.-এর কন্যা হাফসা রা.-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল। ১৯৭

হযরত উসমান রা.-এর খিলাফতের সময় তার কাছ থেকে সেই সহীফাগুলো এনে কুরআন একত্রিকরণ করা হয়। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, 'হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. একবার হযরত উসমান রা.-এর কাছে এলেন। এ সময় তিনি আরমিনিয়া ও আযারবাইজান বিজয়ের ব্যাপারে সিরীয় ও ইরাকী যোদ্ধাদের জন্য যুদ্ধ-প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কুরআন পাঠে তাদের মতবিরোধ হুযাইফাহকে ভীষণ চিন্তিত করল। সুতরাং তিনি উসমান রা.-কে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, কিতাব সম্পর্কে ইহুদী ও নাসারাদের মতো মতপার্থক্যে লিপ্ত হবার পূর্বে এই উম্মতকে রক্ষা করুন। তারপর উসমান রা. হাফসা রা.-এর কাছে এক ব্যক্তিকে এ বলে পাঠালেন যে, আপনার কাছে সংরক্ষিত কুরআনের সহীফাসমূহ আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা সেগুলোকে পরিপূর্ণ মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করতে পারি। এরপর আমরা তা আপনার কাছে ফিরিয়ে দেব। হাফসা রা. তখন সেগুলো উসমান রা.-এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

এরপর উসমান রা. যায়িদ ইবনে সাবিত রা., আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র রা., সায়ীদ ইবনে আস রা. এবং আবদুর রহমান ইবনে হারিস ইবনে হিশাম রা.-কে নির্দেশ দিলেন। তারা মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করলেন। এ সময় উসমান রা. তিনজন কুরাইশী ব্যক্তিকে বললেন, কুরআনের কোনো ব্যাপারে যদি যায়িদ ইবনে সাবিতের সঙ্গে তোমাদের মতভেদ দেখা দেয়, তাহলে তোমরা তা কুরাইশদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ, কুরআন তাদের ভাষায় নাযিল হয়েছে। সুতরাং তারা তাই করলেন। যখন মূল লিপিগুলো থেকে কয়েকটি পরিপূর্ণ গ্রন্থ লেখা হয়ে গেল, তখন উসমান রা. মূল লিপিগুলো হাফসা রা.-এর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি কুরআনের লিখিত মাসহাফ-সমূহের এক একখানা মাসহাফ এক এক প্রদেশে পাঠিয়ে দিলেন এবং এছাড়া আলাদা আলাদা বা একত্র কুরআনের যে কপিসমূহ রয়েছে তা জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। ১৯৮

বিদায়ের ধ্বনি
৪১ হিজরীতে আম্মাজান হযরত হাফসা রা. আল্লাহর সাথে এবং তার প্রিয়ভাজনদের সাথে পরপারে মিলিত হন। সেই বছর শাবানের আরও ক'টি দিন বাকি ছিল, এমন সময়ই তিনি রফীকে আ'লার সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। ১৯৯ তাঁর ইন্তেকালে গোটা মদীনায় রব পড়ে যায় যে, রাসূলের স্ত্রী ইন্তেকাল করে গেছেন! সাহাবাদের বড় একটি দল জানাযায় শরীক হন। তারা আবু হুরায়রা রা. ও আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর নেতৃত্বে তাকে দাফন করে আসেন। জানাযা পড়ান তৎকালীন মদীনার গভর্নর মারওয়ান ইবনুল হিকাম। তাকে কবরে নামান তার ভাই আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এবং তার ছেলেরা— আসিম, আবদুল্লাহ ও হামযা। ইন্তেকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ভাই আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে তার সব সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় সাদাকা করার অসিয়ত করে যান।

এভাবেই তিনি তার স্বামী ও প্রিয়তমের কাছে চলে যান, যে সম্পর্কে জিবরাঈল আ. বলেছিলেন, 'খুব বেশি রোযা পালনকারিণী এবং রাতে বেশি বেশি নামায আদায়কারিণী। জান্নাতে তিনি আপনার স্ত্রী হবেন।' আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং তার হাবীব সা.-এর জান্নাতে তাকে সঙ্গী করে দিন। আল্লাহই এ ব্যাপারে সক্ষম এবং সাহায্যকারী।

টিকাঃ
১৮২. আইম্মাতুল হুদা ওয়া মাসাবীহুদ দুজা, ২২৯।
১৮৩. সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৯৭৯।
১৮৪. মুসনাদ, আহমাদ।
১৮৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৭৪১; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৭৮।
১৮৬. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৩/২১১।
১৮৭. সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬৮৩; আলবানী হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
১৮৮. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ১/২৭০।
১৮৯. সহীহ, বুখারী, ৯/১৫২-১৫৩।
১৯০. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫১২২।
১৯১. ইমাম যাহাবী প্রণীত আসসিয়ার, ২/২২৭।
১৯২. নিসাইম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ৩৩০।
১৯৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৯১২; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪৭৪।
১৯৪. সূরা তাহরীম, ৬৬:১।
১৯৫. সুনান, আবু দাউদ, ২২৮৩; সুনান, ইবনু মাজাহ, ২০১৬; আরনাউত হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
১৯৬. হায়াতুস সাহাবা, ১/৪৭৬; আদদুররুল মানসূর, ১/৬৫২।
১৯৭. সহীহ, বুখারী, ৪৯৮৬; সুনান, আত-তিরমিযী, ৩১০৩; সুনান, নাসায়ী, ৫/২৯৩।
১৯৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৯৭৮।
১৯৯. সিফাতুস সাফওয়া, ২/৪০; তাবাকাত, ৮/৮৬।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 যায়নাব বিনতে খুযাইমা রা.

📄 যায়নাব বিনতে খুযাইমা রা.


মিসকীনদের জননী

প্রকৃত নীতিবান মানুষেরা নিজের জন্য যা ভালোবাসে তা অপর মুসলিম ভাইয়ের জন্যও ভালো মনে করে। অভাবগ্রস্থের প্রতি সে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। দুঃস্থদের সেবায় এগিয়ে আসে স্বেচ্ছায়। সাধারণ মানুষের উপকারের কথা বিবেচনা করে নিজের বিশেষ প্রয়োজনকে বিসর্জন দেয়। বরং মানুষের কল্যাণার্থে নিজেই কষ্ট সহ্য করা সাদরে বরণ করে নেয়। কিন্তু এই নীতিবান মানুষ পাওয়া যাবে কোথায়? কোন স্কুল থেকে বের হবে তারা?

জেনে নিন! এরা হচ্ছে ‘ঈমান’ নামক স্কুলের ছাত্র। এই ঈমানই মানুষকে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়। ঈমানের বলেই সে ক্ষুৎপিপাসাকে বরণ করে থাকে। নানাবিধ কষ্ট-ক্লেশ হাসিমুখে মেনে নেয়। ঈমানদার মানুষেরাই শারীরিক, মানসিক ও সব দিক দিয়ে আল্লাহর পথে ত্যাগ ও কুরবানী দিতে উদগ্রীব। কারণ, সে নিশ্চিত থাকে যে, এর প্রতিদান কখনো বিফলে যাবার নয়। একটি অনু পরিমাণ চেষ্টাও বৃথা যাবে না। এদের ব্যাপারে কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,

'এটা এ কারণে যে, তাদেরকে আল্লাহর পথে তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও ক্ষুধায় আক্রান্ত করে এবং তাদের এমন পদক্ষেপ যা কাফেরদের ক্রোধ জন্মায় এবং শত্রুদেরকে তারা ক্ষতিসাধন করে, তার বিনিময়ে তাদের জন্য সৎকর্ম লিপিবদ্ধ করা হয়। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। আর তারা স্বল্প কিংবা অধিক যা-ই ব্যয় করে এবং অতিক্রম করে যে প্রান্তরই, তা তাদের জন্য লিখে দেওয়া হয়, যাতে তারা যা আমল করত, আল্লাহ তাদেরকে তার চেয়ে উত্তম প্রতিদান দেন।' ২০০

আজ আমরা এমনই এক মহান তারকার জীবনের দ্যুতি অবলোকন করব। তাঁর একটি পরিচয়ই যথেষ্ট, আর তা হচ্ছে, তিনি হলেন মুমিনদের মা। গরীব-মিসকীনদের প্রতি তার দয়া-মমতা ও সহমর্মিতার কারণে, তাঁকে 'উম্মুল মাসাকীন' বা 'মিসকীনদের মা' বলা হতো।

যেভাবে শুরু
পবিত্রতা, দানশীলতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, সংযম ও আল্লাহভীতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি হযরত যায়নাব বিনতে খুযায়মা রা. মক্কায় নবুয়তের ১৩ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন গরিব-দুঃখীদের প্রতি খুবই অনুগ্রহশীল। আরবের আকাশে যখন ইসলামের সূর্য উদিত হয় সেই শুরু লগ্নেই উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে খুযাইমা রা. ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। যাঁদের ব্যাপারে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

'আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আলাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।' ২০১

হযরত যায়নাব বিনতে খুযায়মা রা.-এর প্রথম বিয়ে কার সাথে হয় সে ব্যাপারে মতপার্থক্য আছে। ইউনুস ইবনে মুহাম্মাদ, ইবনে ইসহাকের সূত্রে বলেছেন, পূর্বে তিনি হুসাইন ইবনুল হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিবের স্ত্রী ছিলেন, অথবা তার ভাই তুফাইল ইবনে হারিসের। প্রসিদ্ধ সীরাত লেখক আবুল হাসান আলী জুরজাননীর মতে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিয়ের আগে তার প্রথম স্বামী ছিলেন তুফাইল ইবনুল হারিস। তুফাইল তালাক দিলে তার ভাই উবায়দা ইবনে হারিস তাকে বিয়ে করেন। ২০২

যা হোক, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিয়ের অব্যবহিত পূর্বে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের স্ত্রী ছিলেন। হিজরী তৃতীয় সনে এই আবদুল্লাহ উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। কাফেররা তার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে বিচ্ছিন্ন করে লাশ বিকৃত করে ফেলে। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু উমাইমা বিনতে আবদিল মুত্তালিবের ছেলে। স্বামীর এমন মৃত্যুতে হযরত যয়নাব রা. দারুণ শোকার্ত হয়ে ওঠেন। তৃতীয় হিজরীর রমাযান মাসের প্রথম দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চারশ দিরহাম দেনমোহরের বিনিময়ে তাকে বিয়ে করেন।

পূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি, উম্মুল মুমিনীন যায়নাব বিনতে খুযাইমা রা. ছিলেন অত্যন্ত দানশীল প্রকৃতির নারী। রাসূলুল্লাহ সা.-এর সহধর্মিণী হওয়ার পর তার এই গুণ আরও বেড়ে যায়। কারণ দানশীলতার ব্যাপারে তিনি স্বয়ং হাদীস শুনতেন রাসূলের কাছ থেকে। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ, দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ, কৃপণকে ধ্বংস করে দিন।' ২০৩

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'উত্তম সাদাকাহ হলো, যা দান করার পরে মানুষ অমুখাপেক্ষী থাকে। উপরের হাত নীচের হাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যাদের ভরণ-পোষণ তোমার দায়িত্বে আছে তাদের আগে দাও। কেননা, স্ত্রী বলবে, হয় আমাকে খাবার দাও, নইলে তালাক দাও। গোলাম বলবে, খাবার দাও এবং কাজ করাও। ছেলে বলবে, আমাকে খাবার দাও, আমাকে তুমি কার কাছে ছেড়ে যাচ্ছ?'

লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আবু হুরায়রা, আপনি কি এ হাদীস রাসূলুল্লাহ থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তরে বললেন, এটি আবু হুরায়রার থলে থেকে পাওয়া) নয়; বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে। ২০৪

আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'যে ঈমানদার ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্ত ঈমানদার ব্যক্তিকে খাদ্য দান করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। যে মুমিন ব্যক্তি কোনো তৃষ্ণার্ত মুমিন ব্যক্তিকে পানি পান করাবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে সীলমোহর করা খাঁটি 'রাহীকুল মাখতুম' পান করবেন। যে মুমিন ব্যক্তি কোনো বস্ত্রহীন মুমিন ব্যক্তিকে পোশাক দান করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের সবুজ পোশাক পরাবেন।' ২০৫

উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে খুযাইমা রা. এ ধরনের দান-সাদাকার ব্যাপারে উদ্দীপনামূলক হাদীসগুলো শুনতেন। মহান দয়ালু প্রভুর অফুরান নেয়ামতের আধার জান্নাতের কথা শুনে বেশ উদ্দীপ্ত হতেন তিনি। তো, জাহেলী যুগে যিনি ছিলেন 'উম্মুল মাসাকিন' তথা দুস্থদের জননী, তিনি যখন উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদায় অভিসিক্ত হন তখন কী পরিমাণ দানশীল হতে পারেন—তা সহজেই অনুমেয়।

আল্লাহর জন্য সারাক্ষণ
এদিকে হযরত আয়েশা রা. ও হাফসা রা. রাসূলের ঘরের ঘরণী হয়েছেন তার পূর্বেই। রাসূলের কাছে এই উভয়ের জন্য ছিল বিশেষ মর্যাদা; কিন্তু নব পরিণীতা যায়নাব কখনো তাদের জন্য পরশ্রীকাতরতায় ভোগেননি বা মেয়েলি ক্ষোভ ঝাড়েননি।

উম্মুল মাসাকীন হযরত যায়নাব সর্বদা চেষ্টা করতেন কী করে আয়েশা ও হাফসার মতো রাসূলের আরও বেশি সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। দয়া, মায়া ও স্নেহ-ভালোবাসায় আগলে রাখতেন সবাইকে। এভাবেই তিনি রাসূলের ঘরে অনন্য জীবনাচার ও ইবাদতের মধ্যে দিনাতিপাত করতে থাকেন; কিন্তু এই সময়টি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র কয়েক মাস পরই তিনি পাড়ি জমান মহান প্রভুর সান্নিধ্যে। নবী সা.-এর স্ত্রীগণের মধ্যে তিনিই প্রথম মদীনায় ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে ভীষণ ব্যথিত হন রাসূলুল্লাহ সা.। এসময় তিনি খাদীজা রা.-এর মৃত্যুর কথা স্মরণ করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে তিনি কোনো হাদীস বর্ণনা করেন বলে জানা যায়নি। এমনটিই বলেছেন ইমাম যাহাবী রহ.। ২০৬ ইবনুল জাওযী রহ. বলেন, তার সনদের আমরা কোনো হাদীস পাইনি। ২০৭

ইহজগতের চেয়ে আখিরাতই হবে তার চির শান্তির আবাস। যেখানকার নেয়ামতরাজি কখনো ক্ষয় হবার নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
'হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা চিন্তিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে ঈমান এনেছিল এবং যারা ছিল মুসলিম। তোমরা সস্ত্রীক সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। স্বর্ণখচিত থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে, সেখানে মন যা চায় আর যাতে চোখ তৃপ্ত হয় তা-ই থাকবে এবং সেখানে তোমরা হবে স্থায়ী। আর এটিই জান্নাত, নিজেদের আমলের ফলস্বরূপ তোমাদেরকে এর অধিকারী করা হয়েছে। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে অনেক ফলমূল যা থেকে তোমরা খাবে।' ২০৮

পরিশেষে উম্মুল মুমিনীনের পক্ষে কুরআনে কারীমের দু-টি আয়াত তিলাওয়াত করে আলোচনা ইতি টানতে পারি। আল্লাহ তাআল ইরশাদ করেন,
'নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণাধারার মধ্যে। যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতির নিকটে।' ২০৯

আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন। আমীন ॥

টিকাঃ
২০০. সূরা তাওবাহ, ৯:১২০-১২১।
২০১. সূরা তাওবাহ, ৯:১০০।
২০২. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২১৮।
২০৩. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১৪৪২।
২০৪. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫৩৫৫।
২০৫. সুনান, আবু দাউদ, ১৬৮২; সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৪৯।
২০৬. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২১৮।
২০৭. আল মুজতাবা, ৯৫।
২০৮. সূরা যুখরুফ, ৪৩:৬৮-৭৩।
২০৯. সূরা কামার, ৫৪:৫৪-৫৫।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 উম্মে সালামা রা.

📄 উম্মে সালামা রা.


ধৈর্যের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত দেখালেন যিনি

আজ আমরা এমন এক মহীয়সী নারীর জীবনকাহিনী শুনব যার জীবনপ্রদীপ আমাদের ঈমান ও বিশ্বাসকে আলোকিত করবে। রাসূলুল্লাহ সা.-এর সান্নিধ্যে যিনি নিজ জীবনকে করে তুলেছিলেন শাণিত।

হ্যাঁ, আমরা আমাদের মহান জননী উম্মে সালামা রা.-এর কথাই বলছি।

ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, উম্মে সালামা রা.-এর পিতা আবু উমাইয়্যা ইবনে মুগীরা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে মাখযুম ইবনে ইয়াকযা ইবনে মুররাহ আল মাখযুমিয়্যাহ। মক্কার আবু জাহলের পিতা হিশাম, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের রা. পিতা ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা—এরা সবাই ছিলেন মুগীরা মাখযুমীর ছেলে, আবু উমাইয়্যার ভাই এবং হযরত উম্মে সালামা রা.-এর চাচা।

ইসলামপূর্ব যুগে আমরা যদি হযরত উম্মে সালামা রা.-এর জীবনের দিকে দৃষ্টি দিই, তাহলে আমরা দেখতে পাই—তিনি ছিলেন এক অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। তার পিতা আবু উমাইয়্যার উপাধি ছিল 'যাদুর রাকব'। যাদুর রাবক অর্থ কাফেলার পাথেয়। মক্কার দানশীল ও অতিথি সেবকদের মধ্যে তার এক বিশেষ স্থান ছিল। তিনি যখন কোনো কাফেলার সাথে কোথাও বের হতেন তখন গোটা কাফেলার খাওয়া-দাওয়াসহ যাবতীয় দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতেন। তার এমন উদারতা ও মহানুভবতায় তুষ্ট হয়ে সমকালীন আরববাসী তাকে এ উপাধি দান করেন।

উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামার পিতার যখন এমন সুনাম-সুখ্যাতি উদারতা ও মহানুভবতায়, তো স্বয়ং উম্মে সালামা রা. কী পরিমাণ উদারতা ও দানশীলতার গুণ অর্জন করতে পেরেছিলেন, তা সহজেই অনুমেয়। ২১০

বরকতময় দাম্পত্য জীবন
উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা.-এর আসল নাম ‘হিন্দা’। হযরত উম্মে সালামা রা.-এর বিয়ে হয় আবদুল্লাহ ইবনে আবদিল আসাদ মাখযুমীর সাথে। যার ডাকনাম আবু সালামা এবং এ নামেই প্রসিদ্ধ। আবু সালামা রা.-এর পিতামহ হিলাল এবং উম্মে সালামা রা.-এর পিতামহ মুগীরা দুই ভাই। আবু সালামার পিতা আবদুল্লাহ ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর ফুফা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু বুররাকে তিনি বিয়ে করেন। তাঁরই ছেলে সালামা রা.। হযরত আবু তালিব, হযরত হাযমা রা. ও হযরত আব্বাস রা. আবু সালামার সম্মানিত মামা। অন্যদিকে আবু সালামা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুধভাই এবং তিনি একজন সৎকর্মশীল পুরুষ। ২১১

আব্দুল্লাহ্-হিন্দের নবজীবনের সূচনা হলো। দু-জনেই একে অপরকে নিয়ে মহাসুখী। এমন একজনের স্বপ্নই দেখেছিল দু-জন। জান-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে পরস্পরকে। তারা স্বামী-স্ত্রী উভয়ে ছিলেন ওই সকল লোকদের অন্তর্গত যাঁদেরকে বলা হয় ‘কাদীমুল ইসলাম’ বা প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী। ইসলামের সূচনা পর্বে যখন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে কি করবে না—এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল এবং যখন সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল একটি দুরুহ কাজ তখন এই দম্পতি ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেন। ২১২ ইসলাম গ্রহণের পর বনু মাখযুম হযরত আবু সালামা রা.- এর ওপর নির্দয়ভাবে অত্যাচার উৎপীড়ন চালাতে থাকেন।

আবিসিনিয়ায় হিজরত
দিন দিন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে তাদের ওপর কাফেরদের পাষণ্ডতা, নির্মমতা ও নির্যাতনের নতুন নতুন পন্থা ও মাত্রা যোগ হচ্ছিল। নিপীড়িত মুসলমানরা কাফেরদের অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কাফেরদের ভয়ে না তারা কোথাও যেতে পারতেন, না ইবাদত করতে পারতেন। তাই তারা এমন একটি স্থানের অনুসন্ধান করছিলেন যেখানে তারা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন। এরই প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বললেন, 'তোমরা এখন আবিসিনিয়ায় হিজরত করো। কেননা, সেখানকার বাদশা দয়াদ্র ও ন্যায়পরায়ণ। সে তোমাদের শান্তিতে বসবাসের সুযোগ দেবে।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই মুসলমানদের একটি বিশেষ সংখ্যা আবিসিনিয়ার উদ্দেশে হিজরত করেন। হযরত উম্মে সালামা রা. ও তার স্বামী আবু সালামা রা.-এর আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের মধ্যে শামিল হন। নিজ মাতৃভূমি হতে এই দূর অঞ্চল আবিসিনিয়ায় মুসলমানরা অত্যন্ত স্বস্তি, শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে জীবনযাপন করতে থাকেন। সেখানে কোনো কষ্টদায়ক ও বিরূপ পরিবেশ ছিল না। ২১৩

ধৈর্য ও সাওয়াবের প্রত্যাশা
আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় ফিরে তারা দেখলেন, কুরাইশরা নজিরবিহীন অত্যাচার চালাচ্ছে। এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের অনুমতি দিলেন মদীনায় হিজরতের। উম্মে সালামা ও তার স্বামী সিদ্ধান্ত নিলেন, কুরাইশদের নির্যাতন থেকে মুক্তি ও ইসলাম রক্ষার উদ্দেশ্যে তারা থাকবেন হিজরতকারীদের প্রথম সারিতে; কিন্তু উম্মে সালামা ও তার স্বামীর জন্য হিজরত তত সহজ ছিল না যতটা ভেবেছিলেন তারা। হিজরত করতে গিয়ে তারা মুখোমুখি হলেন এমন কঠিন ও বেদনাদায়ক অত্যাচারের-যা রেখে গেল তাদের জীবনে ভয়াবহ ও করুণ বিয়োগান্তক স্মৃতি। আমরা আম্মাজান হযরত উম্মে সালামা রা. এর মুখ থেকেই শুনি তার সেই সকরুণ স্মৃতির বেদনাময় কাহিনী।

উম্মে সালামা বলেন, 'আবু সালামা যখন মদীনায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তখন তার কাছে মাত্র একটি উট ছিল। তিনি সেই উটের ওপর আমাকে ও তার ছেলে সালামকে ওঠান এবং নিজে উটের লাগাম ধরে চলতে আরম্ভ করেন। আমার পিতৃকূল বনু মুগীরার লোকেরা আবু সালামাকে বাধা দিয়ে বলল, আমরা আমাদের মেয়েকে এমন খারাপ অবস্থায় যেতে দেব না। আবু সালামার হাত থেকে তারা উটের লাগাম ছিনিয়ে নিল এবং আমাকে তারা সঙ্গে করে নিয়ে চলল। ইতোমধ্যে আমার স্বামীর খান্দান আবু আবদিল আসাদের লোকেরা এসে পড়ে এবং তারা আমার সন্তান সালামাকে তাদের দখলে নিয়ে নেয়। তারা বুন মুগীরাকে বলল, তোমরা যদি তোমাদের মেয়েকে তার স্বামীর সাথে যেতে না দাও তাহলে আমরা আমাদের সন্তানকে তোমাদের মেয়ের কাছে থাকতে দেব না। এভাবে আমি, আমার স্বামী ও আমার সন্তান-তিনজন তিনদিকে ছিটকে পড়লাম। স্বামী-সন্তানের বিচ্ছেদ ব্যথায় আমার অবস্থা খুবই কাহিল হয়ে পড়ল।

যেহেতু হিজরতের নির্দেশ এসেছিল, তাই আবু সালামা মদীনায় পৌঁছে যান। আর এদিকে মক্কায় আমি একাকিনী। প্রতিদিন সকালে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তাম এবং আবতাহ উপত্যকায় একটি টিলার ওপর বসে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাঁদতাম। এভাবে প্রায় সাত-আটদিন চলে যায়।

একদিন আমাদের হিতাকাঙ্খী বনু মুগীরার এক ব্যক্তি আমার এ দুরবস্থা দেখে ভীষণ কষ্ট পেলেন। তিনি বনু মুগীরার লোকদের একত্র করে তাদের সম্বোধন করে বললেন, 'আপনারা এ অসহায় মেয়েটিকে মুক্তি দিচ্ছেন না কেন? তাকে কেন তার স্বামী-সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন? তাকে মুক্তি দিন এবং স্বামী-সন্তানের সাথে মিলিত হতে দিন।' তিনি কথাগুলি এমন আবেগভরা শব্দে প্রকাশ করেন যে, তাতে আমার পিতৃগোত্রের লোকদের অন্তরে দয়া ও করুণার সঞ্চার হয়। তারা আমাকে আমার স্বামীর কাছ যাওয়ার অনুমতি দেন। এ খবর শুনে বনু আবদিল আসাদও আমার সন্তানটিকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়। এখন আমি উটের ওপর হাওদায় বসলাম এবং সালামাকে কোলে করে সওয়ার হয়ে গেলাম। মক্কা থেকে একাকিনী বের হয়ে তান'ঈম পৌঁছালাম। সেখানে কাবার চাবি রক্ষক উসমান ইবনে তালহা ইবনে আবি তালহার সাথে দেখা হলো। তিনি আমার ইচ্ছার কথা জেনে, আমার সাথে আর কেউ আছে কি না—তা জানতে চাইলেন। বললাম, না, আর কেউ নেই। শুধু আমি ও আমার এ শিশু সন্তান। একথা শুনে তিনি আমার উটের লাগাম ধরে টানতে টানতে উটের আগে আগে চলতে লাগলেন।

আল্লাহ জানেন, আমি তালহার চেয়ে বেশি ভালো ও ভদ্র মানুষ আরবে আর কাউকে পাইনি। যখন আমরা কোনো মানযিলে পৌঁছতাম, এবং আমাদের বিশ্রামের প্রয়োজন পড়ত, তিনি উট বসিয়ে দিয়ে দূরে কোনো গাছের আড়ালে চলে যেতেন। আবার চলার সময় হলে, তিনি উট প্রস্তুত করে আমার কাছে এসে বলতেন, উটে আরোহন করো। আমি উটের পিঠে আরাম করে বসার পর তিনি লাগাম ধরে আগে আগে চলতে থাকতেন। গোটা ভ্রমণটাই এই নিয়মে হয়েছিল। যখন আমরা মদীনায় বনু আমর ইবনে আওফের পল্লী কুবায় পৌঁছলাম, উসমান ইবনে তালহা আমাকে বললেন, তোমার স্বামী এই পল্লীতে আছেন। আবু সালামা সেখানে অবস্থান করছিলেন। আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে মহল্লায় মধ্যে ঢুকে গেলাম এবং আবু সালামার দেখা পেলে গেলাম। এভাবে উসমান ইবনে তালহা আমাকে আবু সালামের সন্ধান দিয়ে আবার মক্কার দিকে যাত্রা করেন।

এই পরীক্ষাপর্বে চারিদিক থেকে মুসলমানরা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছিল এবং তাদের দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার কোনো অন্ত ছিল না। হিজরতের সময় উম্মে সালামাকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয় এ তারই কিছু অংশমাত্র। তার নিজের অন্তরেও এ উপলব্ধি ছিল। তাই পরবর্তীকালে হিজরতের প্রসঙ্গ উঠলেই তিনি একটু গর্বের সঙ্গে বলতেন, 'ইসলামের জন্য আবু সালামার পরিবারকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, আহলে বাইতের আর কেউ তেমন পোহায়েছে কি না-তা আমার জানা নেই। তিনি আরও বলতেন, 'আমি উসমান ইবনে তালহার চেয়ে বেশি ভদ্র সঙ্গী আর কখনো দেখিনি। ২১৪

বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা
হিজরতের দুর্ভোগ ও লাঞ্ছনার দগদগে স্মৃতি তখনো তাদের মন থেকে মুছে যায়নি এবং স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানসহ এক সাথে বসবাসের সুযোগও বেশি দিন হয়নি, এরই মধ্যে উহুদযুদ্ধের ডাক এসে যায় এবং হযরত আবু সালামা রা. সেই ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধে একই নামের প্রতিপক্ষের অপর এক ব্যক্তি আবু সালামা হাশমীর নিক্ষিপ্ত একটি তীরে তার বাহু আহত হয় এবং এক মাস চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে যান। ২১৫

এর কিছুদিন পর ৪র্থ হিজরীর মুহাররম মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সারইয়ায়ে আবি সালামায় অভিযানে পাঠান এবং ২৯ দিন সেখানে অতিবাহিত হয়। হিজরী ৪র্থ সনের সফর মাসের আট অথবা নয় তারিখে মদীনায় ফিরে আসেন। তখন তার সেই পুরানো ক্ষত আবার তাজা হয়ে জীবনাশঙ্কা দেখা দেয়। সেই বছর জামাদিউস সানী মাসের নয় তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন। ২১৬

হযরত উম্মে সালামা রা. স্বামীর মৃত্যুর খবর রাসূলকে দিতে আসেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামার গৃহে যান। উম্মে সালামা তখন শোকে বিহ্বল। তিনি বার বার শুধু বলছিলেন, 'হায়, বিদেশ-বিভূইঁয়ে এ তার কেমন মৃত্যু হলো!' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিয়ে বলেন, তোমরা তার মাগফিরাত কামনা করে দুআ কর। আর বলো, 'হে আল্লাহ, আমাকে তার চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প দান করুন।'

একবার উম্মে সালামার স্বামী আবু সালামাকে বলেন, আমি জেনেছি, যদি কোনো মহিলার স্বামী মৃত্যুর পর জান্নাতে যায়, আর তার স্ত্রী-দ্বিতীয় বিয়ে না করে তাহলে আল্লাহ সে স্ত্রীকেও স্বামীর সাথে জান্নাতে স্থান দান করবেন। এই অবস্থা পুরুষের জন্যও যদি হয়, তাহলে আসুন আমরা অঙ্গীকার করি, আপনি আমার পরে বিয়ে করবেন না, আর আমিও আপনার পরে আর বিয়ে করব না। আবু সালামা বলেন, তুমি কি আমার কথা মানবে? উম্মে সালামা বললেন, আপনার কথা মানা ছাড়া আমার আনন্দ আর কোথায়? আবু সালামা বললেন, আমি যদি তোমার আগে মারা যাই, তুমি আবার বিয়ে করবে। তারপর আবু সালামা দুআ করেন, 'হে আল্লাহ, আমার পরে উম্মে সালামাকে আমার চেয়েও ভালো পাত্র দান করুন।' হযরত উম্মে সালামা রা. বলেন, যখন আবু সালামা মারা গেলেন, তখন আমি মনে মনে বলতাম, আবু সালামার চেয়ে ভালো আর কে হবে? এর কিছুদিন পরেই রাসূলুল্লাহর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায়। ২১৭

উম্মে সালামা রা. বলেন, যখন আবু সালামা রা. মারা গেলেন তখন আমি বললাম, প্রবাসী প্রবাস ভূমিতে মারা গিয়েছেন। তার জন্য আমি এত কাঁদব যে, দীর্ঘদিন ধরে মানুষ তা চর্চা করবে। আমি কান্নার জন্য প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছিলাম। এমন সময়ে মদীনার পার্শ্ববর্তী উঁচু অঞ্চলের জনৈকা মহিলা আমার কান্নায় অংশগ্রহণ করার জন্য আসছিল। পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তিনি দু-বার বললেন,
'তোমরা কি এমন ঘরে শয়তানকে পুনরায় প্রবেশ করাতে চাও, যে ঘর হতে আল্লাহ তাকে বের করে দিয়েছেন।'
তখন আমি কান্না থেকে বিরত থাকলাম, আমি কাঁদলাম না। ২১৮

উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সালামা রা. এর কাছে গেলেন। তখন তার চোখগুলো উল্টে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চোখ বন্ধ করে দিলেন এবং বললেন, 'রুহ যখন নিয়ে যাওয়া হয়, তখন চোখ এর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।' এ কথা শুনে তার পরিবারের লোকেরা উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলেন। তিনি বললেন,
'তোমরা নিজেদের জন্য অমঙ্গলজনক কোনো দুআ করো না। কেননা, ফেরেশতাগণ তোমাদের কথার ওপর আমীন বলে থাকেন। তিনি তারপর বললেন, হে আল্লাহ, তোমরা আবু সালামাকে মাফ করে দাও, হিদায়াতপ্রাপ্তদের মধ্যে তার দরজাকে বুলন্দ করে দাও এবং তার উত্তরাধিকারীদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি নিযুক্ত কর। হে রাব্বুল আলামীন, আমাদেরকেও তাকে মাফ করে দাও তার জন্য কবরকে প্রশস্ত করে দাও এবং তার কবরকে আলোকময় করে দাও।' ২১৯

উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা যখন কোনো রোগী অথবা মৃত প্রায় ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হও, তখন তার সম্পর্কে ভালো মন্তব্য কর। কেননা, ফেরেশতাগণ তোমাদের কথার ওপর আমীন বলে থাকেন।' উম্মে সালামা রা. বলেন, যখন আবু সালামার (তাঁর স্বামী) ইন্তেকাল হলো, তখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আবু সালামা মৃত্যুবরণ করেছেন।' তিনি বলেন, 'তুমি এ দুআ করো: 'হে আল্লাহ, আমাকে এবং তাকে ক্ষমা করে দাও; আমাকে তার পর উত্তম প্রতিদান দাও।' তিনি বলেন, 'আমি ওই দুআ পাঠ করলাম। আল্লাহ আমাকে তার চেয়ে উত্তম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দান করলেন।' ২২০

উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, কোনো মুসলমান যখন কোনো বিপদে পতিত হয়, তখন সে যদি আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন' বলে এবং এ দুআ পাঠ করে,
'হে আল্লাহ, আমাকে বিপদে ধৈর্য ধারণের সাওয়াব দান কর এবং এর চেয়ে উত্তম স্থলাভিষিক্ত দাও।'
তবে আল্লাহ তাকে উত্তম স্থলাভিষিক্ত দিয়ে ধন্য করবেন। যখন আবু সালামার (তাঁর স্বামী) ইন্তেকাল হলো, তখন আমি বললাম, আবু সালামা থেকে কে উত্তম হতে পারে? তার পরিবারই প্রথম পরিবার যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে হিজরত করেছিল। এরপর আমি ওই দুআ পাঠ করলাম। ফলে আল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমার জন্য দান করলেন। উম্মে সালামা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার নিকট হাতিব ইবনে আবি বালতায়াকে দিয়ে বিবাহের পয়গাম পাঠালেন। আমি বললাম, 'আমার একটি মেয়ে রয়েছে, আর আমি একটু অভিমানী।' তিনি বললেন, 'তোমার মেয়ের জন্য আমি দুআ করছি যেন আল্লাহ তার সুব্যবস্থা করে দেন এবং এটাও দুআ করছি যে, তিনি তোমার অভিমানকে দুর করে দেন।' ২২১

সৌভাগ্যের পরাকাষ্ঠা
হযরত আবু সালামা রা.-এর যখন ইন্তেকাল হয় তখন হযরত উম্মে সালামা সন্তানসম্ভবা। সন্তান প্রসবের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. তার একাকিত্ব ও দুঃখ-বেদনার কথা চিন্তা করে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। হযরত উম্মে সালামা রা. এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর হযরত উমর রা.ও তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। উম্মে সালামা রা. এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ের পয়গাম পাঠান। তখন উম্মে সালামা রা. রাজি হয়ে যান। উম্মে সালামার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রস্তাব কবুল করতে অপারগতার যে কারণগুলো দেখান তা এরকম: (ক) আমি ভীষণ আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন নারী, (খ) আমার সন্তান রয়েছে, আমি একজন বয়স্ক মহিলা, (ঘ) আমার কোনো ওলী নেই। জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমার সন্তানের দায়িত্ব আল্লাহ ও তার রাসূলের ওপর। তোমার প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ আল্লাহ দূর করে দেবেন। ওলী, তা তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে রাজি হবে না, আর তুমি বয়স্কা, তোমার চেয়ে আমার বয়স বেশি। তারপর তিনি ছেলে উমরকে বলেন, যাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমর বিয়ের ব্যবস্থা করো।

হযরত উম্মে সালামা রা. ছিলেন একজন লজ্জাবতী ও প্রখর আত্মমর্যাবোধসম্পন্ন নারী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিয়ের পর প্রথমদিকে তার অবস্থা এমন ছিল যে, যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে আসতেন, তিনি দুগ্ধপোষ্য মেয়ে যায়নাবকে দুধ পান করাতে শুরু করতেন। এ অবস্থা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে যেতেন। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. ছিলেন তার দুধভাই। আম্মার একথা শুনে ক্ষেপে যান এবং যায়নাবকে নিজের কাছে নিয়ে যান। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামার ঘরে আসেন এবং এদিক-ওদিক তাকাতে থাকেন। শিশু মেয়েকে না দেখে জিজ্ঞেস করেন, 'যায়নাব কোথায়? তাকে কী করেছ?' তিনি জবাব দিলেন, 'আম্মার এসে নিয়ে গেছে।' সেদিন থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ঘরে অবস্থান করতে থাকেন। ২২২

ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, উম্মে সালামা রা. চতুর্থ হিজরীতে নবী সা.-এর ঘরের আসেন এবং তিনি ছিলেন অত্যধিক রূপসী ও উচ্চ বংশীয় মহিলা। ২২৩ স্বামী আবু সালামা রা.-এর মৃত্যুতে তিনি যে দুঃখ বেদনার শিকার হন, এভাবে তা দূর হয় এবং তার চেয়ে ভালো বিকল্প লাভ করেন। আল্লাহ তাআলা তার দুঃখকে অনন্তকালের জন্য আনন্দে রূপান্তর করে দেন।

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজোড়া যাঁতা, দুইটি মশক, এবং চামড়ার কভার ও খোরমার ছালে ভরা একটি বালিশ উম্মে সালামা রা.-কে দেন। এ সকল জিনিসই তিনি অন্য বিবিগণকেও দিয়েছিলেন।

মুত্তালিব ইবনে আবদিল্লাহ বলেন, আরবের বিধবা উম্মে সালমা সন্ধ্যার প্রথম পর্বে সায়্যিদুল মুসলিমীনের ঘরে বউ হিসেবে আসেন এবং রাতের শেষ পর্বে যব পিষতে লেগে যান। ২২৪

রাসূলের কাছে তার মর্যাদা
উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে একই চাদরের নীচে শায়িত অবস্থায় আমার হায়েয দেখা দিল। তখন আমি চুপিসারে বেরিয়ে এসে হায়েযের কাপড় পরে নিলাম। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ডেকে নিয়ে তার চাদরের নীচে স্থান দিলেন। বর্ণনাকারী যায়নাব বলেন, আমাকে উম্মে সালামা রা. এও বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা রাখা অবস্থায় তাকে চুমু খেতেন। (উম্মে সালামা রা. আরও বলেন) আমি ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একই পাত্র হতে পানি নিয়ে ফরয গোসল করতাম। ২২৫

জ্ঞানের প্রখরতা
হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত উম্মে সালামা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একটি সঠিক পরামর্শ দান করেছিলেন। ঘটনাটি হাদীসে এভাবে এসেছে,

হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যখন সুহায়ল ইবনে আমর এসে বলল, আসুন আমাদের ও আপনাদের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র লিখি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন লেখককে ডাকলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুক্তিপত্র লেখানোর এক পর্যায়ে সুহায়ল বলল, এও লেখা হোক, আমাদের কোনো ব্যক্তি যদি আপনার নিকট চলে আসে এবং সে যদিও আপনার দ্বীন গ্রহণ করে থাকে, তবুও তাকে আমাদের নিকট ফিরিয়ে দেবেন। মুসলিমগণ বললেন, সুবহানাল্লাহ্! যে ইসলাম গ্রহণ করে আমাদের নিকট এসেছে, তাকে কেমন করে মুশরিকদের নিকট ফেরত দেওয়া হতে পারে?

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এলাম এবং বললাম, আপনি কি আল্লাহর সত্য রাসূলুল্লাহ নন? তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' আমি বললাম, 'তা হলে দ্বীনের ব্যাপারে কেন আমরা এত হেয় হব?'

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমি অবশ্যই রাসূল; অতএব, আমি তার অবাধ্য হতে পারি না, অথচ তিনিই আমার সাহায্যকারী।' আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলেননি যে, আমরা শীঘ্রই বায়তুল্লাহ যাব এবং তাওয়াফ করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কি এ বছরই আসার কথা বলেছি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই কা'বাগৃহে যাবে এবং তাওয়াফ করবে। উমর রা. বলেন, অতঃপর আমি আবু বকর রা.-এর নিকট গিয়ে বললাম, 'হে আবু বাকর, তিনি কি আল্লাহর সত্য রাসূলুল্লাহ নন?'

আবু বকর রা. বললেন, 'অবশ্যই।' আমি বললাম, আমরা কি সত্যের ওপর নই এবং আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের ওপর নয়? আবু বকর রা. বললেন, নিশ্চয়ই। আমি বললাম, তবে কেন এখন আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এত হীনতা স্বীকার করব? আবু বকর রা. বললেন, 'ওহে! নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি তার রবের নাফরমানী করতে পারেন না। তিনিই তার সাহায্যকারী। তুমি তার অনুসরণকে আঁকড়ে ধরো। আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের ওপর আছেন।' আমি বললাম, তিনি কি বলেননি যে, আমরা অচিরেই বায়তুল্লাহ যাব এবং তার তাওয়াফ করব? আবু বকর রা. বললেন, 'অবশ্যই। কিন্তু তুমি এবারই যে যাবে—একথা কি তিনি বলেছিলেন?' আমি বললাম, 'না।' আবু বকর রা. বললেন, 'তবে নিশ্চয়ই তুমি সেখানে যাবে এবং তার তাওয়াফ করবে।'

যুহরী রহ. বলেন যে, উমর রা. বলেছেন, আমি এর জন্য (অর্থাৎ, ধৈর্যহীনতার কাফফারা হিসেবে) অনেক নেক আমল করেছি। বর্ণনাকারী বলেন, সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের বললেন, 'তোমরা ওঠো এবং কুরবানী কর ও মাথা কামিয়ে ফেল।'

রাবী বলেন, 'আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূল তিনবার তা বলার পরও কেউ উঠলেন না।' তাদের কাউকে উঠতে না দেখে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামা রা.-এর নিকট এসে লোকদের এই আচরণের কথা বলেন। উম্মে সালামা রা. বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আপনি যদি তাই চান, তাহলে আপনি বাইরে যান ও তাদের সঙ্গে কোনো কথা না বলে আপনার উট আপনি কুরবানী করুন এবং নাপিত ডেকে মাথা মুন্ডিয়ে নিন।' সে অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেরিয়ে গেলেন এবং কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলে নিজের পশু কুরবানী দিলেন এবং নাপিত ডেকে মাথা মুন্ডালেন। তা দেখে সাহাবীগণ উঠে দাঁড়ালেন ও নিজ নিজ পশু কুরবানী দিলেন এবং একে অপরের মাথা কামিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন হলো যে, ভীড়ের কারণে একে অপরের ওপর পড়তে লাগলেন। ২২৬

এভাবে সাহাবায়ে কেরাম রা. রাসূলের বিরোধিতা থেকে বেঁচে যান। আর তা হয়েছে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা রা.-এর বরকতে। ইতিহাস উম্মে সালামার এই অবদানকে কখনো মুছতে পারবে না।

তিনি অন্যের আরাম-আয়েশের প্রতি খুবই সতর্ক থাকতেন। যতদূর সম্ভব ভালো কাজে কার্পণ্য করতেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসার স্মৃতি হিসেবে তার দেহের একটি পশম তিনি নিজের কাছে সংরক্ষণ করেন। সহীহ বুখারীতে এসেছে, তার কাছে রূপোর একটি পাত্র ছিল, তাতে তিনি পশম মুবারক সংরক্ষণ করেছিলেন। সাহাবীদের দেউ কোনো দুঃখ-বেদনা পেলে একপেয়ালা পানি এনে তার সামনে রাখতেন, তিনি পশম মুবারকটি সেই পানির মধ্যে ডুবিয়ে দিতেন। সেই পানির বরকতে তার সকল দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যেত। আবদুল্লাহ ইবনে মাওহাব বলেন, আমি উম্মে সালামা রা.-এর গোলাম। তিনি 'হিন্না ও কাতাম'-এ রক্ষিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি পশম বের করেন। ২২৭

মহানুভবতা
হিজরী ৫ম সনে মদীনার ইহুদী গোত্র বনু কুরাইযার অবরোধের এক পর্যায়ে তাদের সাথে আলোচনার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু লুবাবা রা.-কে পাঠান। তাদের সাথে আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি হাতের ইঙ্গিতে তাদেরকে একথা বুঝিয়ে দেন যে, তোমাদের হত্যা করা হবে; কিন্তু এটাকে রাসূলুল্লারহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোপন কথা ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে মনে করে ভীষণ অনুতপ্ত হন। তারপর তিনি মসজিদের একটি খুঁটিতে নিজেকে বেঁধে ফেলেন। অনেকদিন পর্যন্ত তিনি নিজেকে এ অবস্থায় রাখেন, অতঃপর তার তাওবা কবুল হয়। সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামা রা.-এর ঘরে ছিলেন।

সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামা রা.-এর ঘরে ঘুম থেকে জেগে মৃদু হাসতে থাকেন। হযরত উম্মে সালামা রা. তা দেখে বলেন, আল্লাহ আপনাকে সর্বদা হাসিতে রাখুন। এ সময় হাসির কারণ কী? বললেন, আবু লুবাবার তাওবা কবুল হয়েছে। হযরত উম্মে সালামা তাকে এ খোশখবরটি শোনাবার অনুমতি চাইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হাঁ, চাইলে শোনাতে পার। উম্মে সালামার ঘরটি ছিল মসজিদে নববীর এত নিকটে যে, ঘর থেকে আওয়ায দিলে মসজিদ থেকে শোনা যেত। অনুমতি পেয়ে তিনি হুজরার দরজায়। দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠেন, আবু লুবাবা, তোমাকে মুবারকবারদ। তোমার তাওবা কবুল হয়েছে। এ আওয়ায মানুষের কানে যেতেই গোটা মদীনা যেন আনন্দ-উত্তেজনায় ফেটে পড়ে।

আম্মাজান হযরত উম্মে সালামা রা.-এর আরও একটি বিশেষ মর্যাদা হচ্ছে, তিনি হযরত জিবরাঈল আ.-কে দেখেছেন। হাদীসে এ ব্যাপারে এসেছে,

'আবু উসমান রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে জানানো হলো যে, একবার জিবরাঈল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আসলেন। তখন উম্মে সালামা রা. তার নিকট ছিলেন। তিনি এসে তার সঙ্গে আলোচনা করলেন। অতঃপর উঠে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালামা রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, লোকটিকে চিনতে পেরেছ কি? তিনি বললেন, এ তো দিহইয়া। উম্মে সালামা রা. বলেন, আল্লাহর কসম। আমি দিহইয়া বলেই বিশ্বাস করছিলাম; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তার খুতবায় জিবরাঈল আ.-এর আগমনের কথা বলতে শুনলাম। [সুলায়মান (রাবী) বলেন,] আমি আবু উসমানকে জিজ্ঞেস করলাম এ হাদীসিট আপনি কার নিকট শুনেছেন? তিনি বললেন, উসামা ইবনে যায়িদ রা.-এর নিকট শুনেছি। ২২৮

উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা রা.-কে ফকীহ সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করা হয়। ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, তিনি একজন ফকীহ সাহাবীয়া ছিলেন। ২২৯

হযরত উম্মে সালামা রা.-এর গোটা জীবনই ছিল যুহদ ও তাকওয়ার বাস্তব নমুনা। দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও চাকচিক্যের প্রতি খুব কমই দৃষ্টি দিতেন। একবার তিনি একটি হার গলায় পরেন। হারটিতে সামান্য সোনা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসন্তুষ্টি প্রকাশ করায় তা খুলে ফেলেন। ২৩০

হাদীসের গ্রন্থসমূহে তার ৩৭৮টি হাদীস পাওয়া যায়। তার মধ্যে ২৯টি মুত্তাফাকুন আলাইহি। এছাড়া ইমাম বুখারী তিনটি ও ইমাম মুসলিম তেরোটি হাদীস এককভাবে বর্ণনা করেছেন। ২৩১

অন্তিম সময়
হযরত হুসাইনের রা. শাহাদাতের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উম্মে সালামা রা. নিকট ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। হযরত হুসাইন রা. যে সময় ইয়াযীদের বাহিনীর সাথে বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে চলেছেন, ঠিক সেই সময় হযরত উম্মে সালামা রা. স্বপ্নে দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন। তিনি ভীষণ অস্থির। মাথা ও দাড়ি মুবারক ধুলি-মলিন। উম্মে সালামা রা. জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এ অবস্থা কেন?' বললেন, 'হুসাইনের শাহাদাত স্থল থেকে ফিরে আসছি।' ঘুম ভেঙে গেল। চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। এ অবস্থায় তার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো, ইরাকীরা হুসাইনকে হত্যা করেছে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন! হুসাইনকে তারা অপমান করেছে, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।

আহলে ইলমদের মতে, হিজরী ৬১ সনের শেষ দিকে হুসাইন ইবনে আলীর রা. শাহাদাতের পরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা রা. ইন্তেকাল করেন। ২৩২ আম্মাজান উম্মে সালামা রা. এমন জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সা.-এর স্ত্রী হিসেবে থাকবেন—যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো হৃদয় তা অনুভবও করতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

টিকাঃ
২১০. নিসাউ আহলিল বাইত, ২২৫-২২৬।
২১১. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২০১-২০২।
২১২. নিসাউ আহলিল বাইত, ২২৭।
২১৩. নিসাউ আহলিল বাইত, ২৩১।
২১৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১৬৯; ইবনে হিশাম, ২/৭৫-৭৬; তাকরীব, ১/৩১৭।
২১৫. তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত, ২/৩৬২।
২১৬. যাদুল মাআদ, ৩/২৪৩।
২১৭. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৮৮।
২১৮. মুসনাদ, আহমাদ, ৬/২৮৯; সহীহ, মুসলিম: হাদীস নং ৯২২।
২১৯. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৯২০।
২২০. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৯১৯।
২২১. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৯১৮।
২২২. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৯০; মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩১৩-১৪; সুনান, নাসায়ী, ৬/৮১-৮২।
২২৩. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২০২।
২২৪. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২০৫।
২২৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩২২; সহীহ, মুসলিম : হাদীস নং ২৯৬।
২২৬. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৭৩১, ২৭৩২।
২২৭. আনসাবুল আশরাফ, ১/৩৯৫।
২২৮. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী: হাদীস নং ৩৬৩৪; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫১।
২২৯. আসসিয়ার, ২/২০৩।
২৩০. মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৩১৫।
২৩১. ইবনুল জাওযী প্রণীত আল মুজতাবা মিনাল মুজতানা, ৯৩।
২৩২. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২০২।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.

📄 যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.


সাত আসমানের ওপর থেকে যাঁকে আল্লাহ বিয়ের নির্দেশ দিয়েছেন

আমরা এখন এমন এক উম্মুল মুমিনীনের জীবন কাহিনী আলোচনা করব যাঁর যোগ্যতা ও মর্যাদা এবং মহত্ত্ব ও কীর্তি অতুলনীয়।

হ্যাঁ, আমরা হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর কথাই বলছি। যাঁর সম্পর্কে ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, 'তিনি দ্বীন, তাকওয়া, বদান্যতা ও খ্যাতির আলোকে একজন শ্রেষ্ঠ নারী ছিলেন। ২৩৩ ইমাম আবু নুয়াইম রহ. তার সম্পর্কে বলেন, হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. ছিলেন আল্লাহকে অধিক ভয়কারিণী, সন্তুষ্টকারিণী ও আল্লাহর পথে আহ্বানকারিণী। ২৩৪

তাহলে আসুন, আমরা এই বিশিষ্ট সাহাবিয়া ও উম্মুল মুমিনীনের জীবনী দ্বারা অন্তর সিক্ত করে তুলি।

এটাই প্রকৃত গর্বের বিষয়
মক্কার অভিজাত পরিবারে হযরত যায়নাব রা.-এর জন্ম। উচ্চ বংশীয় ও অনিন্দ্য রূপসী ছিলেন তিনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হচ্ছেন তার আপন মামাতো ভাই। তাদের দাদা ও নানা হচ্ছেন সেই যুগের কুরাইশদের সরদার আবদুল মুত্তালিব। তার এক ভাই—যাঁকে প্রথম আমীরুল মুমিনীন নামে ডাকা হয়, ইসলামের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী সেই মহান সাহাবী হচ্ছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা.। তার আরেক ভাই—ইসলামের অন্যতম কবি আবু আহমাদ ইবনে জাহাশ।

তাঁর ফুফা হচ্ছেন হামযা ও আব্বাস রা.। আর বোন হলেন নবুওয়াতের প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারী হযরত হামনা বিনতে জাহাশ। তার মা রাসূলুল্লাহ সা.-এর ফুফু হযরত উমাইমা বিনতে আবদুল মুত্তালিব।

উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর অন্যতম পরিচয় হচ্ছে, তিনিই একমাত্র নারী যাঁকে আল্লাহ তাআলা সাত আসমানের ওপর থেকে বিয়ে পড়িয়েছেন।

উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. রাসূলুল্লাহ সা.-এর নবুয়তের তেত্রিশ বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং পারিবারিক আভিজাত্যে লালিত-পালিত হন। তিনি এবং তার অন্য সকল ভাই-বোন ইসলামের শুরুর দিকেই নিজেদের সমর্পণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দারুল আরকামে যাওয়ার আগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করে অগ্রগামী মুসলমানদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন। ২৩৫

আল্লাহর নবীর সাহাবাদের ওপর মক্কার মুশরিকদের অনবরত নির্যাতন বাড়তেই থাকে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবীদের মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিলে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের নেতৃত্বে বনু জাহাশের সকল সদস্য মদীনায় হিজরত করেন। এ দলে ছিলেন তার ভাই আবু আহমাদ ইবনে জাহাশ ও মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে জাহাশ। তাদের মহিলাগণ এ সময় হিজরত করেন। তম্মধ্যে ছিলেন আমাদের আলোচ্য ব্যক্তিত্ব হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ, মুসআব ইবনে উমাইরের স্ত্রী হামনা বিনতে জাহাশ, আবদুর রহমান ইবনে আউফের স্ত্রী উম্মে হাবীব বিনতে জাহাশ রা.।

বনু জাহাশ যখন তাদের বাড়িঘর ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেন, তখন আবু সুফইয়ান ইবনে হারব তাদের বাড়ি দখল করে নেয় এবং সেটি আমর ইবনে আলকামার কাছে বিক্রি করে দেয়। বনু জাহাশ আবু সুফইয়ানের এই কর্মকাণ্ডের ঘটনা শোনার পর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা. তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, 'হে আবদুল্লাহ, তুমি কি এতে খুশি নও যে, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তোমাদের এরচেয়ে উত্তম বাড়ি দান করবেন!' আবদুল্লাহ বললেন, 'অবশ্যই খুশি।' ২৩৬

আনসারদের সান্নিধ্যে
এরপর উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. আনসার বোনদের সান্নিধ্যে জীবনের সেরা দিনগুলো কাটাচ্ছেন। আনসারদের সম্পর্কে আমরা আর কী বলব? আল্লাহ নিজেই যেখানে বলছেন,

'আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদীনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালোবাসে। আর মুহাজরিদের যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।' ২৩৭

হযরত যায়নাব রা. তাদের মধ্যে ছিলেন আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। গরিব-দুঃস্থদের তিনি ছিলেন আশ্রয়। অকাতরে দান-খয়রাত করতেন তাদের মাঝে। কেননা, তিনি ভালো করেই জানতেন, একজন মুমিনের জন্য দুনিয়াতেই সৎকর্ম ও মহানুভবতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে আখিরাতের নেয়ামত পাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। এ কারণে দিনভর তিনি রোযা রাখতেন আর রাত কাটিয়ে দিতেন ইবাদত-বন্দেগীতে। আল্লাহ তাআলা তাকে এভাবেই গড়ে তুলছিলেন উম্মুল মুমিনীন হিসেবে যোগ্য করে।

মুমিনদের জন্য উচিত নয়
'আর আল্লাহ ও তার রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।' ২৩৮

বর্ণিত আছে, উক্ত আয়াতটি হযরত যায়নাব রা.-এর উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে স্বীয় আযাদকৃত দাস ও পালিত পুত্র যায়িদ ইবনে হারিসা রা.-এর সাথে তার বিয়ে দেন। পৃথিবীতে ইসলাম যেভাবে সাম্য ও সমতার শিক্ষার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে এবং যেভাবে সকল স্তরের মানুষকে একই কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে ইতিহাসে তার অগণিত দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। তবে হযরত যায়নাব রা.-এর বিয়ের ঘটনাটি ছিল সাম্য ও সমতার বাস্তব শিক্ষার ভিত্তিস্বরূপ। এ কারণে তা এ জাতীয় সকল দৃষ্টান্তের ওপর প্রাধান্য ও গুরুত্ব লাভ করেছে।

পবিত্র কাবার খাদিম হিসেবে গোটা আরবে কুরাইশ খান্দান, বিশেষত বনু হাশিমের যে উঁচু মর্যাদা ও সম্মানের আসন ছিল, তৎকালীন ইয়ামেনের কোনো বাদশাহও তার সমকক্ষতার দাবি করতে দুঃসাহসী হতো না।

কিন্তু ইসলাম সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি ঘোষণা করে তাকওয়া ও আল্লাহভীতিকে এবং ঘোষণা করে যে, যে কোনো ধরনের গর্ব, আভিজাত্য ও কৌলীন্য জাহিলিয়াতের প্রতীক। এই ভিত্তিতে হযরত যায়িদ যদিও দৃশ্যত একজন দাস ছিলেন, তবুও যেহেতু ইসলাম তার দ্বারা সীমাহীন শক্তি লাভ করে, এ কারণে হাজার হাজার স্বাধীন ব্যক্তি থেকেও তাকে শ্রেষ্ঠতম গণ্য করা হতো। ইসলামী সাম্যের বাস্তব শিক্ষাদান ছাড়া এই বিয়ের আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল। ইবনুল আসীর তা বর্ণনা করেছেন এভাবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদের সাথে তাঁর বিয়ে এজন্য দিয়েছিলেন, যাতে যায়িদ তাকে কিতাবুল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের সুন্নাতের তালীম ও তারবিয়াত দান করেন।

কুরাইশরা বংশের বড়াই করত। বংশ নিয়ে তাদের গৌরবের অন্ত ছিল না; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাব বিনতে জাহাশের বিয়ে দিলেন যায়িদ ইবনে হারিসার সাথে। যায়িদ ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয়ভাজন ব্যক্তি। হযরত খাদীজা রা. ও হযরত আবু বকর রা. যে সময়ে মুসলমান হন, যায়িদও সে সময় মুসলমান হন।

অধিকাংশ অভিযানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশ নেতাদের ওপর তাকে পরিচালক নিয়োগ করতেন। যায়িদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এত কাছের মানুষ হয়ে যান যে, তিনি যায়িদ ইবনে মুহাম্মাদ হিসেবে প্রসিদ্ধি পান। তার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ অনুগ্রহ ছিল। এতসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন দাস। আর যায়নাবের ছিল বংশ-কৌলীন্য। প্রথম থেকেই এ বিয়েতে হযরত যায়নাবের মত ছিল না; কিন্তু সবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে রাজী হন। কারণ, তখন সূরা আল আহযাবের উপর্যুক্ত আয়াতটি নাযিল হয়।

হযরত যায়নাব এতে করে বিয়েতে রাজি হয়ে যান। এরপর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামের প্রাথমিক স্তরে এ বিয়ে এক দিগন্ত উন্মোচন। এ বিয়েতে মোহর ছিল দশটি লাল দীনার (প্রায় চার তোলা স্বর্ণ), ষাট দিরহাম (প্রায় আঠারো তোলা রৌপ্য), একটি ভারবাহী জন্তু। কিছু গৃহস্থালির আসবাবপত্র, আনুমানিক পঁচিশ সের আটা ও পাঁচ সের খেজুর। এ সব স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পক্ষ থেকে আদায় করে দেন।

একজন মুমিন নারী হিসেবে উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. আল্লাহ ও রাসূল সা.-এর নির্দেশ শিরোধার্য করে হযরত যায়িদ রা.-কে স্বামীত্বে বরণ করেন। বিয়ের পর এক বছর দুইজন একসাথে থাকেন; কিন্তু প্রেম-প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠল না। দিন দিন সম্পর্ক তিক্ত থেকে তিক্ততর হয়ে উঠল। হযরত যায়িদ রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে অভিযোগ করলেন এবং তালাক প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। যায়িদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, যায়নাব তার কঠোর বাক্যবাণে আমাকে বিদ্ধ করে। আমি তাকে তালাক দিতে চাই।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যায়িদকে তালাক দান থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কত চেষ্টা সত্ত্বেও হযরত যায়নাব ও হযরত যায়িদ রা.-এর বিয়ে টিকল না। হযরত যায়িদ রা. তাকে তালাক দিয়েই ছাড়লেন। যায়নাব ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বোন। বোধ- বুদ্ধি হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লালন পালন করেন। তাই যখন তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে খুশি করার জন্য নিজেই বিয়ে করার ইচ্ছে পোষণ করতে লাগলেন; কিন্তু যেহেতু তখনো পর্যন্ত মুসলিমদের মন-মানসে জাহিলী যুগের প্রথ্য ও সংস্কারের প্রভাব কিছুটা বিদ্যমান ছিল, এ কারণে তিনি নিজের মনের ইচ্ছা চেপে রাখেন। কারণ, যায়িদ ছিলেন তার পালিত পুত্র। আর জাহিলী সমাজ আপন ঔরসজাত পুত্র ও পালিত পুত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য করত না। যায়নাব ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পালিত পুত্র যায়িদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী। তাকে বিয়ে কররে মুনাফিক ও কাফেররা হই চই বাধিয়ে দিতে পারে এমন আশঙ্কা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করছিলেন; কিন্তু যেহেতু পালিত পুত্রের বিচ্ছেদপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে না করার প্রথাটি ছিল একটি জাহিলী প্রথা মাত্র, আর আল্লাহ ও তার রাসূলের ইচ্ছা ছিল তার মূলোৎপাটন করা, এ কারণে আল্লাহপাক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সে সময়ের মনের ইচ্ছাটি প্রকাশ করে দেন এভাবে,

'আর স্মরণ করো, আল্লাহ যার ওপর নেয়ামত দিয়েছিলেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে, তুমি যখন তাকে বলেছিলে 'তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো।' আর তুমি অন্তরে যা গোপন রাখছ আল্লাহ তা প্রকাশকারী এবং তুমি মানুষকে ভয় করছ অথচ আল্লাহই অধিকতর হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে; অতঃপর যায়িদ যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের কোনো অসুবিধা না থাকে; যখন তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে বিবাহসম্পর্ক ছিন্ন করে। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকর হয়ে থাকে।' ২৩৯

এভাবেই তিনি উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদায় অভিসিক্ত হন।

হযরত যায়িদ রা. তাকে তালাক দেওয়ার পর ইদ্দত শেষ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বিয়ে করেন। আর এতে তিনি উম্মুল মুমিনীনের মহান মর্যাদায় অভিসিক্ত হন। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এ আয়াতটি- (আপনি আপনার অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ তাআলা প্রকাশ করে দেবেন) ২৪০ যায়নাব বিনতে জাহশ এবং যায়িদ ইবনে হারিসা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। ২৪১

আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন যায়নাব রা. এর ইদ্দত পূর্ণ হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদ রা.-কে বললেন, তুমি যায়নাবের নিকট আমার কথা উল্লেখ করো। আনাস রা. বলেন, যায়িদ রা. রওনা হলেন এবং তার নিকট গেলেন। তখন তিনি আটার খামির করছিলেন। যায়িদ রা. বলেন, আমি যখন তাকে দেখলাম তার মর্যাদা আমার অন্তরে এমনভাবে জাগ্রত হলো যে, আমি তার প্রতি তাকাতে পারলাম না। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে স্মরণ করেছেন। তাই আমি তার দিকে পিঠ ফিরে দাঁড়ালাম এবং পেছনের দিকে সরে পড়লাম। এরপর বললাম, হে যায়নাব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে স্মরণ করে আমাকে পাঠিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি এ সম্পর্কে কিছুই করব না-যে পর্যন্ত না আমি আমার রবের কাছ থেকে নির্দেশ লাভ না করি। এরপর তিনি তার নামাযের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন।

এদিকে কুরআন নাযিল হলো এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে যায়নাবের বিনা অনুমতিতেই তার ঘরে প্রবেশ করলেন। আনাস রা. বলেন, আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (যায়নাবের সেই বিবাহ উপলক্ষে) দুপুর বেলায় আমাদের গোশত খাইয়েছেন। খাওয়া দাওয়ার পর লোকেরা বের হয়ে গেল; কিন্তু কয়েকজন লোক খাওয়ার পর আলাপে মশগুল থাকল। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হয়ে পড়লেন, আমিও তার অনুসরণ করলাম।

তিনি তার বিবিগণের ঘরে ঘরে উপস্থিত হয়ে তাদের সালাম করতে লাগলেন। আর বিবিগণ তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার এ স্ত্রীকে কেমন পেয়েছেন?' আনাস রা. বলেন, 'আমার মনে নেই, (আলাপরত) সে লোকদের বের হয়ে যাওয়ার কথা আমিই তাকে জানিয়ে ছিলাম, না তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন।' তিনি বলেন, তারপর তিনি চললেন এবং সে ঘরে প্রবেশ করলেন আমিও তার সঙ্গে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলাম। তিনি আমার ও তার মধ্যে পর্দা টেনে দিলেন। আর পর্দার বিধান নাযিল হলো। আনাস রা. বলেন, লোকদের উপদেশ দেওয়া হলো, যে উপদেশ দেওয়ার ছিল।

ইবনু রাফি' তার হাদীসে অতিরিক্ত বর্ণনা করতে গিয়ে সূরা আহযাবের ৫৩ নং আয়াত যেখানে বলা হয়েছে 'তোমাদের অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নবীগৃহে প্রবেশ করবে না...কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না...।' ২৪২ এ বিয়েকে কেন্দ্র করে হিজাবের হুকুম নাযিল হয় অথবা বলা চলে এ বিয়ে ছিল হিজাবের হুকুম নাযিলের পটভূমি। ২৪৩

আল্লাহর নির্দেশে এই বিয়ে হয়
উল্লিখিত আয়াত হতে একথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা তার নবীর দ্বারা এ কাজটি করিয়েছেন একটি বিশেষ প্রয়োজন পূরণ ও কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে। যা এ পন্থা ভিন্ন অন্য কোনো উপায়ে অর্জিত হওয়া সম্ভবপর ছিল না। আরবে মুখ-ডাকা আত্মীয়দের সম্পর্কে অত্যন্ত মারাত্মক ধরনের ভুল প্রথা প্রচলিত হয়েছিল এবং যুগযুগ ধরে অব্যাহতভাবে তা চলে আসছিল পূর্ণ দাপটের সাথে। তা উৎখাত করার একটি মাত্র উপায় কার্যকর ও সফল হতে পারত। আর তা হলো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তা শিকড়সহ উপড়ে ফেলবেন। অতএব, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে তার স্ত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা এই বিয়ে করাননি। একটি অত্যন্ত বড় ও অতিশয় প্রয়োজনীয় কাজের লক্ষ্যেই তিনি তা করিয়েছিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যায়নাব রা.-কে স্ত্রী হিসেবে ঘরে আনার পর ওলীমার আয়োজন করেন। আয়োজন অর্থ এই নয় যে, তিনি রাজকীয় ভোজের আয়োজন করেন। তবে হযরত যায়নাব রা.-এর ওলীমা তুলনামূলকভাবে একটু জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছিল। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল দুপুর বেলা মতান্তরে রাতের বেলা। হযরত আনাস রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সকলকে রুটি ও গোশত খাওয়ান। আমাদের রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য এটা রাজকীয় আয়োজনই বটে। কারণ, দিনের পর দিন যে পরিবারের লোকদের শুধু দুধপান করে কাটতে হতো, তাদের পক্ষে তিন শো লোকের জন্য গোশত রুটির ব্যবস্থা করা জাঁকজমকপূর্ণই বলা চলে।

ইবনে সাআদ এই ওলীমার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন এভাবে, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অন্য কোনো স্ত্রীর ওলীমা সেভাবে করেননি যেভাবে যায়নাব রা.-এর ওলীমা করেছিলেন। তিনি যায়নাব রা.-এর ওলীমা করেন ছাগলের গোশত দিয়ে।'

হাদীসে এসেছে, 'আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-কে উপলক্ষ করে পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাবের সঙ্গে তার বিবাহ উপলক্ষে ওলীমা হিসাবে সেদিন রুটি ও গোস্ত খাইয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের ওপর যাইনাব রা. গর্ব করে বলতেন, আল্লাহ তো আসমানে আমার বিয়ের সিদ্ধান্ত করেছেন। ২৪৪

এ সবের কারণে হযরত যায়নাব রা. তার অন্য সতীনদের সামনে গর্ব করতেন। একদিন তো তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেই বসলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি আপনার অন্য কোনো বিবির মতো নই। তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাঁর বিয়ে তার পিতা, ভাই অথবা খান্দানের কোনো অভিভাবক দেননি। একমাত্র আমি—যার বিয়ে আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে আপনার সাথে সম্পন্ন করেছেন। আপনার ও আমার দাদা একই ব্যক্তি, আর আমার ব্যাপারে জিবরাঈল আ. হলেন দূত। ২৪৫

বর্ণিত আছে,
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যায়িদ ইবনে হারিসা রা. অভিযোগ নিয়ে আসলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতে লাগলেন, 'তুমি আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে রেখে দাও।' আনাস রা. বলেছেন, তিনি যদি কোনো জিনিস গোপন করতেন, তাহলে এ আয়াতটি অবশ্যই গোপন করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, যাইনাব রা. অপরাপর স্ত্রীদের কাছে এ বলে গর্ব করতেন যে, তোমাদের বিয়ে দিয়েছে তোমাদের পরিবার-পরিজন, আর আমাকে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সাত আসমানের ওপরে বিয়ে দিয়েছেন। ২৪৬

হযরত যায়নাব রা.-এর এ দাবীর যৌক্তিকতাও ছিল। কারণ, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফাতো বোন এবং রূপ ও সৌন্দর্যের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সব সময় তাঁকে খুশি রাখতে চাইতেন। হযরত যায়নাব রা.-এর চরিত্রে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যা খুব কম নারীর মধ্যেই পাওয়া যেত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নৈকট্যলাভের ব্যাপারে হযরত আয়েশা রা. ও তার মধ্যে পারস্পরিক একটি প্রতিযোগিতার মনোভাব কাজ করত-যা নারী স্বভাবের দাবি অনুযায়ী এক প্রকার পবিত্র ঈর্ষার রূপ লাভ করে। যাকে শরীয়তের পরিভাষায় 'গিবতা' বলে। তার ব্যাপারে হযরত আয়েশা রা. বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবিগণের মধ্যে একমাত্র তিনিই আমার সমকক্ষতার দাবীদার ছিলেন। ২৪৭

আনাস রা. হতে বর্ণিত, যায়নাবের বিয়ের আলোচনায় আনাস রা. উপস্থিত হয়ে তিনি বললেন, যায়নাব বিনতে জাহাশের সঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিয়ের সময় যে ওলীমার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তার চেয়ে বড় ওলীমার ব্যবস্থা তার অন্য কোনো স্ত্রীর বিয়েতে আমি দেখিনি। এতে তিনি একটি ছাগল দ্বারা ওলীমা করেন। ' ২৪৮

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর কাছে মধু পান করতেন এবং সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন। তাই আমি এবং হাফসা স্থির করলাম যে, আমাদের যার ঘরেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসবেন, সে তাকে বলবে, আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন? আপনার মুখ থেকে মাগাফীরের গন্ধ পাচ্ছি। তিনি বললেন, না, বরং আমি যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর নিকট মধু পান করেছি। আমি কসম করলাম, আর কখনো মধু পান করব না। তুমি এ ব্যাপারে অন্য কাউকে জানাবে না। ২৪৯

আয়েশা রা.-এর অন্তরে তার মর্যাদা
সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর ইফকের দুর্যোগের দিনে একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রা. সম্পর্কে হযরত যায়নাব রা.-এর মতামত জানতে চাইলেন। হযরত যায়নাব রা. অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বললেন, 'আমি তার মধ্যে ভালো ছাড়া আর কিছুই জানি না।'

পরে হযরত আয়েশা রা.-এর পবিত্রতা ঘোষণা করে কুরআনের দশটি আয়াত নাযিল হয়। আর সেই সাথে হযরত যায়নাব রা.-এর সত্যবাদিতা ও উন্নত নৈতিকতাও প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়। হযরত আয়েশা রা.-এর আজীবন হযরত যায়নাব রা.-এর এ ঋণ মনে রেখেছেন। সারা জীবন তিনি মানুষের কাছে সে কথা বলেছেন। যায়নাব রা.-এর মধ্যে যত গুণাবলী তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, অকপটে তা মানুষকে জানিয়েছেন।। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. লিখেছেন, হযরত আয়েশা রা. 'ইফক'-এর ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত যায়নাব রা.-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

হযরত আয়েশা রা.-এর মতো প্রখর বুদ্ধিমতী, বিদূষী ও মহীয়সী নারী যখন হযরত যায়নাব রা.-এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তখন তার মর্যাদা ও স্থান যে কোনো স্তরে তা অনুমান করতে আর কোনো ব্যাখ্যা প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ, হযরত আয়েশা রা. তার আল্লাহপ্রদত্ত তীক্ষ্ণ মেধা দিয়ে গভীরভাবে অতি নিকট থেকে হযরত যায়নাব রা.-কে পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়ন করেছিলেন। হাদীসের গ্রন্থাবলীতে হযরত আয়েশা রা.-এর যেসব উক্তি ছড়িয়ে আছে, তাতেই হযরত যায়নাব রা.-এর প্রকৃত মর্যাদা ফুটে উঠেছে। হযরত আয়েশা রা. বলেন, 'আমি যায়নাব রা.-এর চেয়ে কোনো মহিলাকে বেশি দ্বীনদার, বেশি পরহেযগার, বেশি সত্যভাষী, বেশি উদার, দানশীল, সৎকর্মশীল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে বেশি তৎপর দেখিনি। শুধু তার মেজাজে একটু রুক্ষতা ছিল। তবে তার জন্য তিনি খুব তাড়াতাড়ি লজ্জিত হতেন। ২৫০

আল্লামা ইবনে আবদিল বার হযরত যায়নাব রা. সম্পর্কে হযরত আয়েশা রা.- এর নিম্নোক্ত মন্তব্যটি বর্ণনা করেছেন, দ্বীনের ব্যাপারে আমি যায়নাব রা.-এর চেয়ে ভালো কোনো মহিলা কখনো দেখিনি। হযরত আয়েশা রা. আরও বলেছেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরকালে তার সাথে প্রথম মিলিত হওয়ার এবং জান্নাতে তার স্ত্রী হওয়ার সুসংবাদ দান করে গেছেন। ২৫১

দুনিয়াবিমুখিতা ও দানশীলতা
হযরত যায়নাব রা. ছিলেন খুবই দানশীল, দরাজহস্ত, আল্লাহভীরু ও অল্পেতুষ্ট নারী। ইয়াতিম, দুঃস্থ ও অভাবগ্রস্তদের আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থল বলে বিবেচিত হতেন। গরীব-দুঃখীদের প্রতি তার দয়া-মমতার শেষ ছিল না।

তাঁর দানের হাত এমন ছিল যে, খলীফা হযরত উমর রা. তার জন্য বাৎসরিক বারো হাজার দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করে দেন; কিন্তু তিনি কখনো তা গ্রহণ করেননি। একবার উমর রা. তার এক বছরের ভাতা পাঠালেন। হযরত যায়নাব দিরহামগুলো একখানা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। তারপর বাযরাহ ইবনে রাফে'কে নির্দেশ দেন দিরহামগুলো আত্মীয়-স্বজন ও গরীব মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করার জন্য।

বাযরাহ বললেন, 'এতে আমাদেরও কি কিছু অধিকার আছে?' তিনি বললেন, 'কাপড়ের নিচে যেগুলো আছে সেগুলো তোমার।' সেগুলি কুড়িয়ে গুনে দেখা গেল পঞ্চাশ (মতান্তরে পঁচাশি) দিরহাম। সব দিরহাম বণ্টন করার পর তিনি দুআ করেন এই বলে, 'হে আল্লাহ, আগামীতে এই অর্থ যেন আমাকে আর না পায়। কারণ, এ এক পরীক্ষা।' এ খবর হযরত উমরের রা. কানে গেল। তিনি মন্তব্য করলেন, 'এ এমন নারী যার থেকে শুধু ভালো আশা করা যায়।' তারপর হযরত উমর রা. কিছুক্ষণ তার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন এবং সালাম বলে পাঠান। তিনি যায়নাব রা.-কে বলেন, আপনি যা কিছু করেছেন সবই আমি জেনে গেছি। ফিরে গিয়ে তিনি আরও এক হাজার দিরহাম তার খরচের জন্য পাঠান। তিনি সেগুলোও আগের মতো খরচ করে ফেলেন। ঐতিহাসিকরা বলছেন, হযরত যায়নাব রা.-এর উপর্যুক্ত দুআ কবুল হয় এবং তিনি সে বছরই ইন্তেকাল করেন। ২৫২

ইবন সাআদ বর্ণনা করেছেন, 'যায়নাব বিনতে জাহশ দিরহাম-দীনারের কিছুই রেখে যাননি। যা কিছুই তার হাতে আসত দান করে দিতেন। তিনি ছিলেন গরীব-মিসকীনদের আশ্রয়স্থল। ২৫৩

হযরত যায়নাব রা. একজন হস্তশিল্পী ছিলেন। তিনি নিজ হাতে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় চামড়া দাবাগাত করে পাকা করতেন এবং তার থেকে যে আয় হতো তা সবই অভাবী মানুষদের দান করতেন।

হযরত আয়েশা রা. থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, যায়নাব রা. হাতে সূতা কেটে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধবন্দীদের দিতেন। আর তারা কাপড় বুনত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধের কাজে তা ব্যবহার করতেন। হযরত যায়নাব যে চূড়ান্ত পর্যায়ে খোদাভীরু, বিনয়ী ও আবিদা নারী ছিলেন তার সাক্ষ্য দিয়েছেন খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

দ্রুত সেই আমার সাথে মিলিত হবে যার হাত সবচেয়ে বেশি লম্বা
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতের পূর্বে একবার তার বিবিগণের কাছে বলেন, 'তোমাদের মধ্যে খুব দ্রুত সেই আমার সাথে মিলিত হবে যার হাত সবচেয়ে বেশি লম্বা।' তিনি হাত লম্বা দ্বারা রূপক অর্থে দানশীলতা বুঝিয়েছেন; কিন্তু সম্মানিত বিবিগণ শব্দগত অর্থ বুঝেছিলেন। এ কারণে তারা একত্র হয়ে পরস্পর পরস্পরের হাত মেপে দেখতেন যে, কার হাত বেশি লম্বা। যায়নাব রা. ছিলেন ছোট খাট মানুষ। যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর ইন্তেকাল না হওয়া পর্যন্ত তারা এমন করতেন; কিন্তু তিনি যখন সবার আগে মারা গেলেন তখন গভীরভাবে চিন্তা করে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথার তাৎপর্য বুঝতে পারেন। তাই হযরত আয়েশা রা. এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা হাতের অধিকারিণী ছিলেন যায়নাব। কারণ, তিনি নিজের হাতে কাজ করে উপার্জন করতেন এবং তা দান করতেন। ২৫৪

বিদায়ের ক্ষণ
হিজরী ২০ হিজরী মোতাবেক ৬৪১ খিষ্টাব্দে হযরত যায়নাব রা. ইন্তেকাল করেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে পর্যন্ত তার দানের স্বভাব বিদ্যামান ছিল। নিজের কাফনের ব্যবস্থা নিজেই করে যান। তবে তিনি আপনজনদের বলে যান, আমার মৃত্যুও পর উমর রা. কাফনের কাপড় পাঠাতে পারেন, যদি তেমন হয় তাহলে দুইটির যেকোনো একটি কাফন গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে। ২৫৫

তিনি আরও অসিয়ত করে যান যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে খাটিয়াতে করে কবরের কাছে নেওয়া হয়েছিল, তাকেও যেন সেই খাটিয়ায় বহন করা হয়। তিনিই প্রথম মহিলা যাঁকে হযরত আবু বকরের রা. পরে এই খাটিয়ায় ওঠানো হয়। তার দু-টি অসিয়তই পালিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য বিবিগণ তাকে গোসল দেন।

খলীফা হযরত উমর রা. তার জানাযার নামায পড়ান এবং জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়।

রাবীআ ইবনে আবদিল্লাহ বলেন, 'আমি উমর রা.-কে দেখলাম, তার এক কাঁধে দুররা ঝোলানো। সেই অবস্থায় সামনে গেলেন এবং চার তাকবীরের সাথে যায়নাব রা.-এর জানাযার নামায পড়ালেন, কবরের উপরে পানি ছিটিয়ে দেওয়া পর্যন্ত তিনি কবরের পাশে ছিলেন।

লাশ কবরে নামানোর সময় হযরত উমর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য বিবিগণের নিকট জানতে চান যে, তার কবরে কে কে নামবে? তারা বলেন, জীবদ্দশায় যারা তার কাছে যাওয়া-আসা করত তারা নামবে। অতঃপর হযরত উমর রা.-এর নির্দেশে মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসামা বিন যায়িদ, আবদুল্লাহ ইবনে আবি আহমাদ ইবনে জাহাশ ও মুহাম্মাদ ইবনে তালহা রা. কবরে নামেন। তারা সকলে ছিলেন হযরত যায়নাব রা.-এর আত্মীয়-স্বজন।

হযরত যায়নাব রা.-এর মৃত্যুতে হযরত আয়েশা রা. দারুণ শোকাভিভূত হন। তিনি তার সেই সময়ের অনুভূতি প্রকাশ করেন এভাবে : 'তিনি প্রশংসিত ও অতুলনীয় অবস্থায় চলে গেলেন। ইয়াতীম ও বিধবাদের অস্থির করে রেখে গেলন।' হযরত যায়নাব রা. সেদিন মারা যান সেদিন মদীনায় গরীব-মিসকীন ও অভাবী মানুষরা শোকে আহাজারি শুরু করে দেয়।

আম্মাজান হযরত যায়নাব রা.-এর এমন জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সা.-এর স্ত্রী হিসেবে থাকবেন-যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো হৃদয় তা অনুভবও করতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

টিকাঃ
২৩৩. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/২১২।
২৩৪. আল হিলইয়া, ২/৫১।
২৩৫. আসহাবুর রাসূল, ২/৪৭৮-৪৭৯।
২৩৬. সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/১০৭-১০৮।
২৩৭. সূরা হাশর, ৫৯:৯।
২৩৮. সূরা আহযাব, ৩৩:৩৬।
২৩৯. সূরা আহযাব, ৩৩:৩৭।
২৪০. সূরাহ আহযাব, ৩৩:৩৭।
২৪১. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৭৮৭।
২৪২. সহীহ, মুসলিম, ১৪২৮; সুনান, নাসায়ী: ৬/৮০৭৯; মুসনাদ, আহমাদ, ৩/১৯৫-১৯৬।
২৪৩. সহীহ, মুসলিম: ১৪২৮।
২৪৪. সহীহ, বুখারী, ৭৪২১; মুসনাদ, আহমাদ: ৩/২২৬।
২৪৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/১৪৬; আনসাবুল আশরাফ, ১/৪৩৫।
২৪৬. সহীহ, বুখারী, ৭৪২০; সুনান, আত-তিরমিযী, ৩২১৩।
২৪৭. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৭৫০; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৭৭০।
২৪৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫১৭১।
২৪৯. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৯১২।
২৫০. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৪২।
২৫১. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫২।
২৫২. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১০৯-১১০।
২৫৩. নিসাউন মুবাশশিরাত বিলজান্নাহ, ১৬৬-১৬৭।
২৫৪. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫২।
২৫৫. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/১০৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00