📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা.

📄 খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা.


বিশ্বের সকল নারীর নেত্রী

তিনি নববী আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার জীবন ছিল পবিত্রতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, সংযম ও আল্লাহভীতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। তিনি এমন এক প্রস্ফুটিত ফুল যাতে রয়েছে ঈমান, ত্যাগ, উৎসর্গ ও কুরবানীর ভুবনজুড়ানো সৌরভ। এ সৌরভে গোটা বিশ্বজগত আজও মাতোয়ারা!

তিনি এমন এক সৌভাগ্যবতী যিনি নারীদের মধ্যে সর্বাগ্রে আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছেন। প্রথম তিনি-ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাথে নামায পড়েছেন। তিনিই প্রথম নারী যাঁর থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তিনিই প্রথম যাঁকে রাসূলের সহধর্মিণীদের মধ্যে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, মহান প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা প্রথম তার কাছেই সালাম পাঠান। মুমিন নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম খাঁটি ঈমানদার ও সত্যসন্ধানী মহীয়সী নারী। তার জীবদ্দশায় তিনিই ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একমাত্র স্ত্রী। মক্কায় প্রথম তাকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাফন করার জন্য কবরে নামেন। এমন এক কঠিন সময়ে তিনি ঈমান আনেন যখন পুরো আরব সমাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অস্বীকার করেছিল। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তিনি তাকে সত্যবাদী হিসেবে স্বীকৃতি দেন যখন সবাই তাকে মিথ্যুক আখ্যা দিচ্ছিল। নিজের ধন-সম্পদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য ব্যয় করেছেন এমন এক দুঃসময়ে, দুনিয়ার মানুষ যখন তার থেকে মুখ ফিরিয়ে তাকে চরম কষ্টে নিপতিত করেছিল।

বুদ্ধিমতী, অতি সম্মানিতা, ধর্মপরায়ণা, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারিণী এক ভদ্রমহিলা তিনি। জাহিলী যুগেই যাঁর উপাধি ছিল 'আত-তাহিরা' তথা নিষ্কলুষ ও পবিত্রা। বয়স ও বুদ্ধি হওয়ার পর পূতঃপবিত্র চরিত্রের জন্য এ উপাধি পান তিনি। তাহলে ইসলামের ছায়াতলে তার মর্যাদা, গুণ ও কীর্তি কী পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে!

সেই ঘোর দুর্দিনে ইসলামের জন্য তিনি যে শক্তি যুগিয়েছেন চিরদিন তা অম্লান হয়ে থাকবে। ইসলামের সেই সূচনা লগ্নে প্রকৃতপক্ষেই তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরামর্শদাত্রী ও সাহায্যকারিণী। নিজের সব ধন-সম্পদ ও অর্থ-বিত্ত উজাড় করে দেন প্রিয়তম নবীর তরে। দ্বীনের দাওয়াতের জন্য সর্বাঙ্গীণ সহযোগিতার হাত খুলে দেন। দ্বীনের খাতিরে এমন কষ্ট-ত্যাগ স্বীকার করেন যে, সাত আসমানের ওপর হতে মহান প্রভুর পক্ষ থেকে তিনি সালামপ্রাপ্তার অধিকারিণী হন। শুধু তাই নয়; তাকে জান্নাতে মণি-মুক্তার তৈরি এমন একটি বাড়ির সুসংবাদ দেওয়া হয়—যাতে নেই কোনো চিৎকার-শোরগোল এবং ক্লান্তি বা কষ্টের লেশ।

হ্যাঁ, তিনি বিশ্বের সকল নারীর নেত্রী এবং সায়্যিদুল আউয়ালীন ওয়াল আখিরীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্ত্রী খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহা। ঈমান, পবিত্রতা, নিষ্কলুষতা, মহানুভবতা, আভিজাত্য, দয়া, অনুগ্রহ ও বিশ্বস্ততার আকাশে তিনি এক আলোকোজ্জ্বল তারকা, জ্যোতির্ময় নক্ষত্র।

এই মর্যাদা ধন-সম্পদ দ্বারা উপার্জন সম্ভব নয়। এ এমন এক মহান কীর্তি—যুগ-যুগান্তরে যার দীপ্তিতে আলোকময় হয়ে উঠছে বিশ্বজগত; জীবিতরা তাঁর আলোচনায় মুখর; তাঁর গুণ ও কীর্তির আলোচনায় জাগ্রত হয় চেতনা; তাঁর জীবনাচার জ্ঞানীদের জন্য নিয়ে আসে প্রভূত কল্যাণের খোরাক। মহান প্রতিপালকের দোহাই! বলুন, এটিই কি জীবনের স্বার্থকতা নয়?

মুমিন নারীদের প্রথম অকৃত্রিম বন্ধু খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহা কেবল সকল মুমিনদেরই জননী নন; বরং তিনি সকল মর্যাদা, গুণ ও শ্রেষ্ঠত্বেরও জননী। কিয়ামত অবধি প্রত্যেক মুমিনের নিকটই তার হক রয়েছে। আমরা কি আমাদের এই মায়ের অসংখ্য হক থেকে কিঞ্চিত হকও অস্বীকার করার স্পর্ধা দেখাতে পারব?

আল্লাহর শপথ! এই মহীয়সী জননীর ঘটনাবলী আমাদের আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপকরণ। আমাদের পঙ্কিল আত্মা সতেজ হবে তার জীবনীপাঠে। তার পদাঙ্ক অনুসরণে আমরা পেতে পারি সৌভাগ্যের সোনালী সোপান। তার নৈতিক গুণাবলি ও মহৎ কার্যাবলীর শিক্ষায় আমরা খুঁজে পাব সচ্চরিত্রের দীক্ষা এবং সামগ্রিক জীবনাচারের উত্তম আদর্শ।

আসুন, আল্লাহ ও তার রাসূলের কাছে এই মহীয়সী মায়ের মান-মর্যাদার মহত্ত্ব জেনে আমাদের আত্মাকে জাগিয়ে তুলি। মনোহর সুবাসে ভরা তার পবিত্র জীবনধারা আমাদের কন্যা, জায়া ও জননীদের জন্য নিয়ে আসবে অনুপম দৃষ্টান্ত ও অবিস্মরণীয় শিক্ষা।

কে এই খাদীজা?
তিনি উম্মুল মুমিনীন এবং নিজ সময়ের বিশ্বের সকল নারীর নেত্রী উম্মুল কাসিম খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ ইবনে আসাদ ইবনে আবদুল উয্যা ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব আল কারশিয়্যাহ আল আসাদিয়্যাহ। রাসূলের সন্তানের মা। প্রথম ব্যক্তি-যিনি তার ওপর ঈমান এনেছেন এবং তাকে সত্যবাদী হিসেবে মেনে নিয়েছেন সবার আগে।

গুণগুচ্ছ : একজন মানুষের মধ্যে যত গুণ, কৃতিত্ব ও মহত্ত্ব থাকতে পারে, তার সবগুলোরই সমাবেশ ঘটেছিল খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহার জীবনে। একাধারে তিনি ছিলেন মহীয়সী বুদ্ধিমতি, নিষ্কলুষ ও মহানুভব। দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তার প্রশংসা করেছেন। সকল উম্মুল মুমিনীনের মধ্যে তিনি সবার শ্রেষ্ঠ। তার সম্মান বর্ণনাতীত। এ ব্যাপারে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
مَا غِرْتُ عَلَى امْرَأَةٍ مَا غِرْتُ عَلَى خَدِيجَةَ مِنْ كَثْرَةِ ذِكْرِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِيَّاهَا
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য কোনো স্ত্রীর ব্যাপারে এত ঈর্ষা পোষণ করিনি, যতটুকু খাদীজা রা.-এর প্রতি করেছি। যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার আলোচনা বেশি করতেন।

তাঁর ফযীলত অনেক। যে সকল নারী (বিদ্যা, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায়) পূর্ণতা লাভ করেছেন, তিনি তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী, অতি সম্মানিতা, ধর্মপরায়ণা, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারিণী এক ভদ্রমহিলা। তিনি জান্নাতের অধিকারিণী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অনেক প্রশংসা করেছেন এবং অন্য বিবিগণের ওপর তার প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছেন। তার প্রতি অতিমাত্রায় সম্মান প্রদর্শন করেছেন। তিনি তার পূর্বে এবং তার জীবদ্দশায় দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একাধিক সন্তানের জননী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বোত্তম জীবনসঙ্গিনী। তাকে হারিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েন। নিজের ধন-সম্পদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য ব্যয় করেছেন, আর রাসূল তার ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। আল্লাহপাক তার নবীর মাধ্যমে তাকে জান্নাতের মণি-মুক্তার তৈরি একটি বাড়ির সুসংবাদ দান করেছেন।

যুবাইর ইবনে বাক্কার বলেন, খাদীজাকে জাহেলী যুগে 'তাহেরা' তথা নিষ্কলুষ ও পবিত্রা নামে ডাকা হতো। তার মায়ের নাম ফাতিমা বিনতে যায়িদা আল আমিরিয়‍্যা।

আবু হালা ইবনে যুরারা আত-তামীমীর সাথে খাদীজার প্রথম বিয়ে হয়। আবু হালার মৃত্যুর পর আতীক ইবনে আবিদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে মাখযূমের সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিয়ে করেন। তাদের উভয়ের মাঝে বয়সের ব্যবধান ছিল পনেরো বছর। খাদীজা ছিলেন বয়সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে পনেরো বছরেরর বড়। মক্কায় তার জন্ম হয় 'আমুল ফীল' (হাতির বছর)-এর প্রায় পনেরো বছর পূর্বে।

স্বনির্ভরতা
পবিত্র আত্মা ও নির্মল মনের অধিকারিণী মহীয়সী এই মায়ের আত্মনির্ভরশীলতার ব্যাপারটিও আলোচনার দাবি রাখে। অত্যন্ত সম্মানিত ও সম্পদশালী ব্যবসায়ী হিসেবে চারদিকে ছিল তার সুনাম। আল্লাহর ফযলে তার বাণিজ্য-সম্ভার সিরিয়া যেত এবং তার একার পণ্যসামগ্রী কুরাইশদের সকলের পণ্যের সমান হতো। এছাড়া অংশীদারী বা মজুরীর বিনিময়ে যোগ্য লোক নিয়োগ করে তিনি দেশ-বিদেশে মাল কেনাবেচা করতেন; কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি অপরাপর ধনীদের মতো অহঙ্কারী ছিলেন না। মনে মনে সব সময় তিনি এমন এক সত্যের সন্ধানে থাকতেন—পরবর্তী সময়ে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে পেয়ে যান। দাম্পত্য জীবনের অনুপম হৃদ্যতা ও সহমর্মিতায় পরবর্তী সময়ে যা হয়ে ওঠে এক কালজয়ী ইতিহাস। মহানুভবতা, আভিজাত্য, দয়া, অনুগ্রহ ও বিশ্বস্ততার এক অতুলনীয় আখ্যান গড়ে ওঠে তাদের দাম্পত্য জীবনে।

আবু হালা ইবনে যুরারা আত-তামীমীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর খাদীজা মনেপ্রাণে চাইতেন তার স্বামী সমাজের নেতৃত্বের আসন অলঙ্কৃত করুক; কিন্তু মৃত্যু নিভিয়ে দেয় তার আশার প্রদীপ। স্বামী মারা যান। মানুষের পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। এরপর মেয়ে হিন্দার লালন-পালনে অধিক মনোযোগ দেন খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহা। এরপর কুরাইশের মর্যাদাসম্পন্ন যুবক আতীক ইবনে আবিদ ইবনে আবদুল্লাহ আলমাখযূমী তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। উভয়ের বিয়ে হয়; কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের এই দাম্পত্যকাল দীর্ঘায়িত হয়নি। এরপর অনেক দিন একাকী বসবাস করতে থাকেন খাদীজা। তিনি মনে মনে খুঁজছিলেন জাতির একজন পরম মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতা তিনি ভুলে যেতে চান। পুরোদমে মনোনিবেশ করেন ব্যবসায়। অবশ্য অভিজাত ও বিত্তবান ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি আগে থেকেই বেশ পরিচিত। এক সময় তার মনে উঁকি দিতে থাকে সৌভাগ্যের আলোকরেখা।

স্বপ্নে স্বপ্ন-পুরুষের সন্ধান
খাদীজা ছিলেন অত্যন্ত সাহসী নারী। বেশ আবেগী, সহানুভূতিশীল ও উদ্দীপ্ত তার মন-মানস। খুবই দিলখোলা ও প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারিণী তিনি। দয়া, অনুগ্রহ ও নিষ্কলুষতার কমতি ছিল না তার মাঝে। সে যুগের নারীদের মধ্যে হযরত খাদীজা রা.-এর অবস্থান এতটাই প্রিয় ও সম্মানিত ছিল যে, পূর্ণতা ও উচ্চ মর্যাদার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনুপমা। সমকালীন কুরাইশ নারীদের মাঝে ইতোপূর্বে তিনি ‘তাহেরা’ উপাধিতে ভূষিত। এসব গুণই তাকে চিরকালীন এক মহিমান্বিত আসনে দাঁড় করিয়েছিল।

খাদীজার জ্ঞানবৃদ্ধ এক চাচাতো ভাই ছিলেন ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল। পার্থিব ও ধর্মীয় জ্ঞানে তিনি সমস্ত আরবে বিখ্যাত এবং সর্বজনমান্য ছিলেন। তার কাছে খাদীজা রা. পূর্ববর্তী নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাম, দ্বীন ও আসমানী গ্রন্থের বিভিন্ন ঘটনা শুনতেন।

আকাশের তারা উধাও হওয়া এক রাত। চারদিকে ছেয়ে আছে নিকষ কালো অন্ধকার। খাদীজা কাবা শরীফ তাওয়াফ করে নিজ ঘরে বসলেন। এক সময় ঘুমের বিছানায় গা এলিয়ে দেন। অকস্মাৎ ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে তিনি দেখতে পান—আকাশ হতে তার কোলে একটি চাঁদ নেমে এসেছে এবং এতে ঘরের চারদিক অত্যধিক আলোকিত হয়ে উঠল।

তৎক্ষণাৎ ঘুম ভেঙে যায় খাদীজার। তিনি বিচলিত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকেন। রাতের অন্ধকার দূরীভূত হয়ে গেলে ভোরে তিনি সোজা চলে যান ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের কাছে। সেই স্বপ্নের কথা তার চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফেলের কাছে বর্ণনা করেন। সবিস্তার স্বপ্নের ঘটনা শুনে ওয়ারাকা বিন নাওফেল বলল, সুসংবাদ তোমার জন্য, হে চাচাতো বোন! তুমি যদি সত্যিকার এমন দেখে থাক, তবে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো—শেষ যুগে এক রাসূলের আবির্ভাব ঘটবে এবং তার সাথে তোমার বিবাহ হবে। তার দ্বারা তোমার ঘর আলোকিত হবে। নবীর আগমনের ধারাবাহিকতা শেষ হবে তার মাধ্যমে।

আল্লাহু আকবার! এ কী শুনলেন খাদীজা! কী বলছে তার চাচাতো ভাই! হচকিত হয়ে পড়েন খাদীজা। তার সারা শরীরে অদ্ভুত শিহরণ! আশা- আকাঙ্ক্ষা, প্রীতি ও ভালোবাসার ঢেউ খেলতে থাকে তার মনমুকুরে। এই অপার্থিব আশা বুকে নিয়ে অধীর আগ্রহে দিন কাটাতে থাকেন খাদীজা। স্বপ্নের ব্যাখ্যার বাস্তবায়ন দেখার সেই সোনালী দিনটির অপেক্ষা করতে লাগলেন। কখন তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন হবে! কে সেই জগৎ আলোকিতকারী মানবতার সর্বোত্তম মহাপুরুষ? এই অপেক্ষায় তিনি অধিকহারে সৎকর্মে আত্মনিয়োগ করতে থাকেন।

কুরাইশের নেতৃস্থানীয় যুবকেরা যখন খাদীজার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছিল, তখন স্বপ্নে দেখা সেই মহারহস্যের উদ্ঘাটনে তিনি বার বার পিছু হঠতে থাকেন। ভাবতে থাকেন ধর্মীয় জ্ঞানে গোটা আরবে বিখ্যাত এবং সর্বজনমান্য তার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের মুখে শোনা ব্যাখ্যার কথা।

এই ক্ষণে আমরা খাতামুন নাবিয়্যীন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই রহস্যপূর্ণ গুণটির দিকে মনোযোগ দেব যে গুণের আলোকে খাদীজা রা. তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। যে কারণে তিনি সকল পাত্রপক্ষকে সুন্দরভাবে বিদায় দেন এবং জানিয়ে দেন—তিনি আর বিয়ে করতে চাচ্ছেন না। তিনি গভীরভাবে অনুভব করতে থাকেন, আল্লাহ তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করবেনই। তবে জানা নেই, তিনি কে? এরপরও তিনি তার অধীর অপেক্ষায় মনে এক দুর্বার প্রশান্তি অনুভব করতে থাকেন।

শুভ বিবাহ
ইবনে ইসহাক বলেন, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ ছিলেন একজন ধনাঢ্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী। এছাড়া অংশীদারী বা মজুরীর বিনিময়ে যোগ্য লোক নিয়োগ করে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। কুরাইশরা এমনিতেই ছিল ব্যবসায়ী। এদের মাঝে ব্যবসায়িক জ্ঞানের দ্বারা বিশাল বাণিজ্য পরিচালক হিসাবে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। ধীশক্তি আর সৌন্দর্যে, দৃঢ় চরিত্র এবং নরম হৃদয়ের সম্মিলন ঘটেছিল এই মহীয়সীর চিত্তে, এই সকল গুণরাজি তাকে দিয়েছিল সূক্ষ্ম জ্ঞান এবং মানুষ আর ঘটনাকে বিচার করার পরিপক্ব ক্ষমতা।

খাদীজা যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে জানতে পারলেন যে, তিনি কথাবার্তায় সত্যবাদী, আমানত যথাযথ রক্ষাকারী এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী; তখন তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট লোক পাঠিয়ে বললেন, 'অন্য লোকেরা আপনাকে যে পারিশ্রমিক দিবে, আমি তার দ্বিগুণ দেব।' মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহার এক বালক দাস ছিল, যার নাম ছিল মাইসারা। তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ চললেন সিরিয়ার উদ্দেশ্যে।

সিরিয়ায় একদিন ক্লান্ত অবস্থায় একটি অতি পুরাতন বৃক্ষের নিচে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কাছেই ছিল একটি প্রাচীন গির্জা। গির্জার পুরোহিত পাদ্রী এদিকে মনোযোগের সাথে নিরীক্ষণ করছিলেন। মাইসারার নিকট সঙ্গীর পরিচয় জানতে চাইলেন। মাইসারা বলল, 'তিনি কাবার নিকটে বসবাসকারী একজন সম্ভ্রান্ত কুরাইশী।' পাদ্রী বললেন, 'আশ্চর্য! এ গাছের নিচে নবী ছাড়া কখনো কেউ বিশ্রাম গ্রহণ করেনি!'

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিরিয়ার বাজারে পণ্যদ্রব্য বিক্রি করলেন এবং যা কেনার তা কিনলেন। তারপর মাইসারাকে সঙ্গে করে মক্কার পথে রওনা হলেন। পথে মাইসারা লক্ষ করল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উটের উপর সওয়ার হয়ে চলেছেন, আর দুপুরের প্রচণ্ড রোদে দু-জন ফেরেশতা মেঘের আকারে তার মাথার উপর ছায়া বিস্তার করে রেখেছে। এভাবে মক্কায় ফিরে খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহার পণ্যসামগ্রী বিক্রী করলেন। ব্যবসায় এবার দ্বিগুণ অথবা দ্বিগুণের কাছাকাছি মুনাফা হলো। এই সফরে আল্লাহ তাআলা মাইসারার অন্তরে রাসূলুল্লাহর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও প্রগাঢ় ভালেবাসা সৃষ্টি করে দেন। তিনি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাসে পরিণত হন।

খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন তৎকালীন মক্কার একজন বিচক্ষণ ও প্রখর বুদ্ধিমতী দৃঢ়চেতা ভদ্রমহিলা। এছাড়া আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা, তাকে সম্মানিত করবেন।

তারা ব্যবসা থেকে মক্কায় ফিরে এলেন। দাস মাইসারা অত্যন্ত সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে সফরে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যাবতীয় কর্মকাণ্ড, পাদ্রীর মন্তব্য, মেঘের ছায়াদান, দ্বিগুণ মুনাফা ইত্যাদি বিষয়ের একটি বিস্তারিত রিপোর্ট মনিব খাদীজার নিকট পেশ করেন। খাদীজা ভাবনার অতলে ডুবে যান। তিনি বিস্মিতচিত্তে ভাবতে থাকেন—বাণিজ্য চলাকালে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমানতদারি, ব্যবসায় কর্মরত সকল কর্মীদের সাথে ন্যায়পরায়ণ ব্যবহার, নির্লোভ, নির্মোহভাবে ব্যবসা পরিচালনা, পাদ্রীর মন্তব্য, মেঘের ছায়াদান, দ্বিগুণ মুনাফা, চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যৎবাণী। এছাড়া তার আচার-আচরণ, ন্যায়-নিষ্ঠা, কোমল ব্যবহার ইত্যাদি গভীরভাবে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন।

এমন বিরল প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তি সেই কাঙ্ক্ষিত পুরুষ—খাদীজার মনে এ ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ রইল না। তখন তাকে নিজের করে নেওয়ার ইচ্ছা অন্তরে জাগে। এদিকে খাদীজা যেহেতু উচ্চ বংশের সম্মানিত মহিলা, তাই তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বামী হিসাবে পাওয়ার ইচ্ছা লালন করলেও সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব না দিয়ে সংযমের সাথে অন্যকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি তার ঘনিষ্ঠ বিশ্বস্ত বান্ধবী নাসিফা বিনতে মুনিয়ার কাছে কৌশলে বিষয়টি তুলে ধরেন। খাদীজা রা. নাসিফা রা.-কে জানালেন, মুহাম্মাদ হচ্ছেন একজন অসামান্য ও অনন্য চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি। নাসিফা নিজেও জানতেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেমন ছিলেন। খাদীজার মুখ থেকে প্রশংসা শুনেই নাসিফা রা. বলে ওঠেন, আমি বিশ্বাস করি, মুহাম্মাদ হতে পারেন তোমার জন্য চমৎকার এক স্বামী।

নাসিফা রা. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যান এবং তার একান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তারপর এক পর্যায় জানতে চান, 'আপনি বিয়ে করছেন না কেন?; মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাফিসা রা.-এর প্রশ্নের জবাবে জানান, 'বিয়ে করার জন্য যে অর্থ-বিত্তের দরকার, তা এখনো আমি অর্জন করতে পারিনি।' নাসিফা জিজ্ঞাস করেন, 'যদি আপনার বিয়েতে সেই অর্থ-বিত্তের দরকার না পড়ে, আর যদি একজন বিত্তবান সুন্দরী নারী কোনো কিছুর দাবি ছাড়াই আপনাকে বিয়ে করতে চান, তাহলে আপনার কী অভিমত?'

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রশ্ন করেন, কে সেই নারী? নাসিফা জবাব দেন, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ।

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঙ্গে সঙ্গে জানতে চান, খাদীজা রা. কি আমাকে গ্রহণ করবেন?

নাসিফা বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে পারি। তারপর তিনি সেই শুভ সংবাদ নিয়ে খাদীজার কাছে ফিরে আসেন।

বিয়ের চিরন্তন ও শাশ্বত রীতি অনুযায়ী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচা আবু তালিব, হামযা ও অন্যদের সব জানান। এই বিয়েতে খাদীজার সম্মতি জানতে পেরে আবু তালিব যথা নিয়মে খাদীজার চাচা আমর বিন আসাদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে দু-জনের শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই বিয়েতে আবু তালিব খুতবা পাঠ করেন :

সকল প্রসংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের ইবরাহীমের বংশধর ও ইসমাঈলের ফসলের অন্তর্গত করেছেন। আমাদের দান করেছেন একটি সম্মানিত শহর ও মানুষের উদ্দীষ্ট একটি গৃহ। মানুষের ওপর আমাদের কর্তৃত্ব দান করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহকে যে কোনো কুরাইশ যুবকের সাথে পাল্লায় ওজন দেওয়া হোক না কেন, কল্যাণ, মাহাত্ম্য ও ন্যায়নিষ্ঠায় তার পাল্লা অবশ্যই ভারী হবে; যদিও বিত্ত-বৈভবে সে সর্বনিম্নে। তবে অর্থ-সম্মদ ক্ষণস্থায়ী ও অপসৃয়মাণ ছায়াস্বরূপ। খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদের প্রতি তার আগ্রহ আছে এবং তার প্রতিও খাদীজার একই রকম ঝোঁক আছে। আপনারা যে পরিমাণ মোহর চান, তা আদায় করার দায়িত্ব আমার।

মোহর নির্ধারিত হয় বারো উকিয়া স্বর্ণ। বিয়ের পর খাদীজা রা. পশু জবাই করেন। গরিব-মিসকিনদের খাওয়ান। আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ঘর উন্মুক্ত করে দেন।

বিয়ের সময় পুণ্যবতী খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক। এই পবিত্র বিয়ের মাধ্যমে খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহার পূর্ণাঙ্গ ভালোবাসার উন্মেষ ঘটে। তিনি হন দয়া, অনুগ্রহ, ভালোবাসা ও হৃদ্যতার জননী।

প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিদীপ্ত বিচক্ষণতা
খাদীজা রা. তীক্ষ্ণ প্রজ্ঞা ও নির্মোহ বিচক্ষণতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। যদিও কুরাইশ বংশের একদল মূর্খ, ত্রুটি অন্বেষণকারী নারী হযরত খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহা সম্পর্কে অভিযোগ ও উপহাস করত রাসূলের নামে। তারা উপহাস করে বলত, খাদীজার মতো একজন প্রসিদ্ধ ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী বিত্তশালী নারীর এটা মানায় না যে একজন ইয়াতীম, রিক্তহস্ত, দরিদ্র ব্যক্তিকে বিয়ে করবে আর এটা কি ন্যাক্কারজনক একটা বিষয় নয়?

যখন এই কথাটি হযরত খাদীজা রা.-এর কানে পৌঁছাল তিনি তার কর্মচারীদের সুস্বাদু খাবার তৈরির নির্দেশ দিলেন। ওইসকল নারীদের দাওয়াত করলেন। যখন সবাই আহারে ব্যস্ত তখন হযরত খাদীজা রা. তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'হে নারীসমাজ, তোমরা নাকি হযরত মুহাম্মাদকে বিয়ে করার বিষয়কে কেন্দ্র করে আমাকে উপহাস করছ! আমি তোমাদের কাছে জানতে চাই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো উত্তম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি কি তোমাদের নযরে আছে? মক্কা ও মদীনার আশে পাশে এমন ব্যক্তিত্ববান কেউ কি আছে—যিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো চরিত্র ও মর্যাদার দিক থেকে এত সৌন্দর্যপূর্ণ এবং পরিপূর্ণতার অধিকারী? আমি তার এই পূর্ণতার কারণেই তাকে বিবাহ করেছি, আর এমন কিছু তার সম্পর্কে শুনেছি ও দেখেছি যা অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার স্বাক্ষর বহন করে। সুতরাং এটা উচিত নয় যে, তোমরা যা খুশি তাই বলবে ও অজ্ঞতাবশে কাউকে অশোভনীয় অপবাদ দেবে।'

হযরত খাদীজা রা.-এর এ ধরনের হৃদয়গ্রাহী কথা শুনে উপস্থিত নারীরা নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাদের এই নিস্তব্ধতা প্রমাণ দেয়, এ সম্পর্কে তাদের আর বলার মতো কোনো ভাষা নেই। হযরত খাদীজা রা. এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তার সাথে ও আল্লাহর সন্তুষ্টচিত্তে তাদের কৃতকর্মের জবাব দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি বাণিজ্য চলাকালে তার আমানতদারি ও ব্যবসায় কর্মরত সকল কর্মীদের সঙ্গে ন্যায়পরায়ণ ব্যবহার সম্পর্কে জানতেন। মূলত নির্লোভ, নির্মোহ, সৎ চরিত্রের অধিকারী ও সর্বগুণের আধার মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তার জানার কোনো কমতি ছিল না।

খাদীজা রা. আমাদের মা। তিনি আমাদের আদর্শ। তিনি ছিলেন তৎকালীন মক্কা নগরের অন্যতম ধনাঢ্য নারী। তার এই ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব ছাড়াও তার আরও এক পরিচিতি ছিল, তিনি ইসলামপূর্ব আরবে পৌত্তলিকতায় ভেসে যাওয়া সময়ে কখনো স্বজাতি আরও দশজনের মতো মূর্তিপূজা করেননি।

খাদীজা রা. বিবেক বুদ্ধি, সৌন্দর্য, বংশ মর্যাদায় ছিলেন সেকালের শ্রেষ্ঠ নারী। যে মহিলাকে কুরাইশরা সম্মানের সাথে উপনাম দিয়েছিল, 'তাহিরা'। আর যিনি এই 'তাহিরা'কে বিয়ে করেছিলেন সেই মুহাম্মাদকেও আরবের লোকেরা 'বিশ্বস্ত' ও 'সৎ-চরিত্রের অধিকারী' হিসেবে জানত। কারণ, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিথ্যা কথা বলতেন না, ওয়াদার খেলাফ করতেন না, আমানতের খেয়ানত করতেন না। তাই তো সম্মান করে সবাই ডাকত ‘সাদিক’ ও ‘আল-আমিন’ অর্থাৎ ‘সৎ’ এবং ‘বিশ্বাসী’! আল্লাহপাক কী চমৎকার মিলন ঘটিয়ে দিলেন দুই সেরা চরিত্রের মাঝে!

রাসূলের প্রতি ভালোবাসার বিন্দু পরিমাণ কমতি ছিল না খাদীজার। বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে তিনি ঈমান আনেন রাসূলের প্রতি। অনুসরণ করতে থাকেন রাসূলের সব কাজ ও আমল-ইবাদত। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদীজার ঘরে ফিরে আসেন। এমন সময় জিবরাঈল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নামায পড়ান। খাদীজা বিষয়টি জানতে পেরে বললেন, আমাকে তা শিখিয়ে দিন যা আপনাকে শিখিয়েছেন জিবরাঈল আ.। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখালেন এবং শেখালেন। এরপর খাদীজা ওযু করলেন যেমন ওযু করেছেন রাসূলুল্লাহ। এরপর একসঙ্গে নামায পড়লেন এবং বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল।”

এ-ই হচ্ছেন সত্যবাদী ও পরম বিশ্বস্ত
আমাদের আম্মাজান খাদীজা রা. রাসূলের অনুপম অভ্যাস-প্রকৃতি ও নিষ্কলুষ চরিত্র সম্পর্কে বেশ ওয়াকিফহাল ছিলেন। তার মর্যাদা ও গুণাবলীতে তিনি পেতেন মনের অনাবিল প্রশান্তি। শুধু তাই নয়; গোত্রের ওইসব লোকজনও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উন্নত চরিত্রমাধুরি সম্পর্কে অবগত ছিলেন, যারা তাকে ‘সত্যবাদী’ ও ‘বিশ্বস্ত’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

কুরাইশ নেতারা কাবাগৃহের পুনঃনির্মাণ কাজ আরম্ভ করেন। কারণ, কাবাগৃহের স্থানটি চতুর্দিকে দেওয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় ছিল মাত্র। দেওয়ালের উপর কোনো ছাদ ছিল না। এই অবস্থায় কিছুসংখ্যক চোর এর মধ্যে প্রবেশ করে রক্ষিত বহু মূল্যবান সম্পদ এবং অলংকারাদি চুরি করে নিয়ে যায়।

আরেক বর্ণনামতে, ঘটনাক্রমে ওইসময় জনৈক রোমান ব্যবসায়ীর একটি জাহাজ সমুদ্রের প্রবাহের সাথে ভেসে জেদ্দার উপকূলে এসে আছড়ে পড়ে। এবং ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এই জাহাজের কাঠগুলো কুরাইশরা নিয়ে যায় এবং পবিত্র কাবার ছাদ তৈরির কাজে ব্যবহার করার জন্য তা ছেঁটেকেচে ঠিকঠাক করে। কেউ কেউ বলেন, দুষ্কৃতিকারীরা এটাকে জ্বালিয়ে দেয়। গ্রহণযোগ্য সূত্রমতে, এই ঘটনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতপ্রাপ্তির পাঁচ বছর আগের ঘটনা। এই সময়টাতে কাবা সংস্কারের বিকল্প ছিল না কুরাইশদের।

সহীহ হাদীসে এদিকে ইশারা করে বলা হয়, আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন,
لَهَا أَلَمْ تَرَيْ أَنَّ قَوْمَكِ لَمَّا بَنَوْا الْكَعْبَةَ اقْتَصَرُوا عَنْ قَوَاعِدِ إِبْرَاهِيمَ
তুমি কি জান না, তোমার কওম যখন কাবাঘরের পুনঃর্নির্মাণ করেছিল তখন ইবরাহীম আ. কর্তৃক কাবাঘরের মূল ভিত্তি হতে তা সঙ্কুচিত করেছিল।
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি একে ইবরাহীমী ভিত্তির ওপর পুনঃস্থাপন করবেন না? তিনি বললেন,
لَوْلا حِدْثَانُ قَوْمِكِ بِالْكُفْرِ لَفَعَلْتُ
যদি তোমার সম্প্রদায়ের যুগ কুফরীর নিকটবর্তী না হতো তা হলে অবশ্য আমি তা করতাম।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, যদি আয়েশা রা. নিশ্চিতরূপে তা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে শুনে থাকেন, তাহলে আমার মনে হয়, বায়তুল্লাহ হাতীমের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ ইবরাহিমী ভিত্তির ওপর নির্মিত না হওয়ার কারণেই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (তাওয়াফের সময়) হাতীম সংলগ্ন দু-টি কোণ স্পর্শ করতেন না। যাহোক, অতঃপর তারা কাবার দেওয়াল ভেঙে দিয়ে নতুন করে নির্মাণের আয়োজন করল। তারা বলল, 'হে কুরাইশগণ, তোমরা এই কাবার ভবন নির্মাণে শুধু তোমাদের বৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ নিয়েজিত করো। এতে ব্যভিচার, সুদ কিংবা উৎপীড়ন দ্বারা অর্জিত সম্পদ ব্যয় করো না।'

অতঃপর কুরাইশগণ কাবাগৃহ নির্মাণের কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল। দরজার অংশ নির্মাণের ভার বনু আবদ মানাফ ও যুহরার ভাগে, রুকনে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মধ্যবর্তী অংশ নির্মাণের ভার বনী মাখযূম গোত্রের ভাগে এবং তাদের সাথে আরও কয়টি কুরাইশ গোত্র যুক্ত হলো, কাবার মেঝে নির্মাণের ভার বরী জুমাহ ও বনী সাহামের ভাগে, আর হাজরে আসওয়াদ সংলগ্ন অংশ বনী আবদুদদার, বনী কুসাই ও বনী আসাদ ইবনে আবদুল উয্যা ও বনী আদী ইবনে কা'বের ভাগে পড়ল।

এবার ভাঙার কাজে হাত দেওয়ার পালা; কিন্তু এ কাজে হাত দিতে প্রত্যেকেই এক অজানা ভয়ে ভীত হয়ে পড়ল। তখন ওয়ালীদ ইবনুল মুগিরা ঘোষণা করল, আমিই ভাঙার কাজ শুরু করছি। এই বলে সে কোদাল হাতে নিয়ে জীর্ণ ভবনের এক প্রান্তে গাঁড়িয়ে বলল, 'হে আল্লাহ, তোমার ধর্ম থেকে বিচ্যুত হইনি এবং আমরা যা করছি তা সদুদ্দেশ্যেই করছি।' অতঃপর রুকনে ইয়ামানী ও রুকনে আসওয়াদের কোণ থেকে খানিকটা ভেঙে ফেলল। পরবর্তী রাত সবাই উৎকণ্ঠার সাথে কাটাল। সবাই বলল, 'দেখা যাক, ওয়ালীদের ওপর কোনো আপদ আসে কি না। যদি তেমন কিছু হয় তাহলে ভাঙবো না; বরং যেটুকু ভাঙা হয়েছে তা আবার জুড়ে আগের অবস্থায় বহাল রাখব। অন্যথায় বুঝব, আল্লাহ আমাদের উদ্যোগে সন্তুষ্ট। অবশিষ্ট অংশও ভেঙে ফেলব।' ওয়ালীদ পরদিন সকালে স্বাভাবিকভাবে আরদ্ধ কাজে ফিরে এল। এবং কাবার দেওয়াল ভাঙতে আরম্ভ করল। তার সাথে অন্যান্য লোকেরাও ভাঙতে লাগল। এভাবে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নির্মিত ভিত পর্যন্ত গিয়ে থামল। অতঃপর তারা সবাই উটের পিঠের কূজাকৃতির দুর্লভ সবুজ পাথর সংগ্রহ করতে গেল, যার একটা আরেকটার সাথে লেগে থাকে। অতঃপর কুরাইশ গোত্রগুলো কাবা পুনঃনির্মাণের উদ্দেশ্যে পাথর সংগ্রহ করল। প্রত্যেক গোত্র আলাদাভাবে সংগ্রহ করল ও পুনঃনির্মাণের কাজ সমাধা করল।

কাবাগৃহ নির্মাণে বণ্টনের কাজ ক্রমান্বয়ে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌঁছল; কিন্তু তা স্থাপনের ব্যাপারে শুরু হলো মতানৈক্য। প্রত্যেকেরই কামনা, তারাই এ পুণ্য অর্জন করবে। ফলে ঘটনাটি এতদূর পর্যন্ত পৌঁছে গেল যে, তারা মারামারি, কাটাকাটির জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে লাগল। জাতির কোনো কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি প্রস্তাব করলেন, পরামর্শ করে কোনো সন্ধির পথ বের করা হোক। এ উদ্দেশ্যে সবাই মসজিদে একত্র হলো।

পরামর্শ সভায় সিদ্ধান্ত হলো, যে ব্যক্তি প্রথম মসজিদের এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন তিনিই এ ব্যাপারে মীমাংসা করবেন এবং তার নির্দেশকে কুদরতী নির্দেশ বলে মেনে নিতে হবে।

মহান আল্লাহর কুদরতে প্রথম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন। রাসূলকে এভাবে আসতে দেখে সকলেই চিৎকার করে বলে উঠল, ইনিই আল-আমীন। আমরা সবাই তার ওপর সন্তুষ্ট। ইনিই মুহাম্মাদ। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নিকটবর্তী হলে ব্যাপারটি সবিস্তারে তার নিকট পেশ করা হলো। তখন তিনি একটি চাদর চাইলেন। চাদর দেওয়া হলে মেঝের ওপর তা বিছিয়ে দিয়ে স্বহস্তে কালো পাথরটি তার ওপর স্থাপন করলেন এবং বিবাদমান গোত্রপতিদের আহ্বান জানিয়ে বললেন, আপনারা সকলে একসাথে মিলে চাদরটি ধরুন এবং কালো পাথরটি বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে চলুন। অতঃপর স্বহস্তে তিনি কালো পাথরটি উঠিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলেন।

এ মীমাংসা সবাই খুশিমনে মেনে নিলেন। অত্যন্ত সহজ সরল সুশৃঙ্খল এবং সঙ্গত পন্থায় জ্বলন্ত একটি সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিরপেক্ষতা এবং উপস্থিত বুদ্ধিতে সকলেই আশ্চর্য হলো এবং আসন্ন যুদ্ধের আশঙ্কা কেটে গেল।

সৌভাগ্যের পায়রা ডানা মেলে উড়ছে বরকতমণ্ডিত ঘরে
খাদীজার ঘরে শান্তি, সৌহার্দ ও সৌভাগ্যের পায়রারা পতপত করে উড়তে লাগল। এক ভুবন মাতানো দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে 'তাহিরা' খাদীজা ও 'আল আমীন' মুহাম্মাদের মাঝে। সমাজের সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী মুহাম্মাদের কোমলতা, বিনয় ও ভদ্রতা গোটা মানবজাতিকে পরিবেষ্টিত করে রাখে। এক অতুলনীয় স্বাক্ষর বয়ে আনে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্রমাধুরী। বীরত্বের মতো তার ধৈর্যশক্তি, অনুগ্রহের মতো তার বীরত্ব, সহনশীলতার মতো তার দানশীলতা, দয়ার মতো তার কৃপা। শিষ্টাচার ও চারিত্রিক উৎকর্ষে তিনি ছাড়িয়ে যান সবাইকে।

এমনকি তিনি সেই নারীর অবদানও ভোলেননি যাঁকে তিনি মা ডেকেছিলেন। মৃত্যু পর্যন্ত উম্মে আইমানকে তার সঙ্গে রাখেন। অত্যধিক ভক্তি ও সম্মানে ভূষিত করেন তাকে। খাদীজা রা.-এর সন্তানদেরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত স্নেহ করতেন। রাসূলের সাথে খাদীজার বিয়ের পর সন্তান হিন্দা ইবনে খাদীজা মায়ের সাথেই থাকেন। রাসূলের স্নেহছায়ায় ধন্য হন তিনি। তিনি ছিলেন একজন প্রাঞ্জলভাষী বাগ্মী পুরুষ, বেশ দায়িত্ব-সচেতন এবং সমাজের পরম সম্মানিত ব্যক্তি।

যায়েদ ইবনে হারেসা রা.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী পরিমাণ স্নেহ করতেন তা তো সর্বজনবিদিত। এই যুবককে লুটেরা দল বিক্রির উদ্দেশ্যে 'উকাজ' মেলায় নিয়ে গেলে হাকীম ইবনে হিযাম ইবনে খুওয়াইলিদ নামে এক কুরাইশ নেতা যায়িদকে খরিদ করেন। তার প্রত্যাবর্তনের খবর শুনে তার ফুফু খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ দেখা করতে আসেন। ফুফুকে তিনি বলেন, ফুফু উকাজ থেকে আমি দাস খরিদ করে এনেছি। আপনাকে হাদিয়া হিসাবে দান করলাম। তিনি যায়িদকে সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে এলেন।

এ ক্রীতদাসকেই তিনি স্বামী মুহাম্মাদের হাতে তুলে দিলেন। এ সৌভাগ্যবান বালক ক্রীতদাস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হতে লাগলেন। তার মহান সাহচর্য লাভ করে উত্তম চারিত্রিক সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেলেন। সবাই তাকে মুহাম্মাদের ছেলে হিসেবেই সম্বোধন করত।

খাদীজা স্বামী মুহাম্মাদকে এত ভালোবাসতেন যার কোনো তুলনাই চলে না। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর এত অধিক মহব্বতের দৃষ্টান্ত কোথাও খুঁজে পাওয়া ভার। একসঙ্গে তারা দীর্ঘদিন কাটান। এতে খাদীজার মনে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের বিশ্বাস ও ভক্তি অধিক পরিমাণে বাড়তে থাকে। উম্মতের প্রতি তার দরদ মর্মে উপলব্ধি করেন তিনি।

খাদীজা তার ধন-সম্পদ, অর্থ-বিত্ত, সমৃদ্ধি ও স্বচ্ছলতার সব উপকরণ সঁপে দেন স্বামী মুহাম্মাদের হাতে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা চাইতেন খুশি মনে উদার হস্তে তা দিয়ে দিতেন খাদীজা। ধন-সম্পদে কৃপণতা দেখাতেন না কখনো। এমনিতেই তিনি ছিলেন বদান্যতার মূর্ত প্রতীক। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীকে ধন-দৌলত দ্বারা সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। এমনকি স্বামী মুহাম্মাদকে যে ভালোবাসত তার প্রতিও উদারহস্ত ছিলেন তিনি। স্বামীর বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদেরও সম্মান করতেন, খোঁজ খবর নিতেন এবং তাদের বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়াতেন। এদিকে, রাসূল যাকে ভালোবাসতেন, তাকে ভীষণ সম্মান করতেন এবং মনে-প্রাণে তাকে খুশি রাখতেন খাদীজা।

মহৎপ্রাণের অধিকারিণী
এক আধ্যাত্মিক আলোকপ্রভায় ভরা পরিবেশে খাদীজার সাথে বসে কথা বলছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তার কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গি ছিল মনোহর। ঠোঁটের মাঝখান থেকে মণিমুক্তোর মতো যে কথাগুলো বেরোতে থাকত, সারা দেহমন জুড়িয়ে যেত তা শুনে। এমন নূরানী আবহ হৃদয়ে বিরাজ করত যার বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

এমনই এক সময়ে খাদীজার দাসী এসে বলল, 'আম্মাজান! হালীমা বিনতে আবদিল্লাহ ইবনুল হারিস আস-সাদিয়া এসেছেন। তিনি প্রবেশ করতে চাচ্ছেন।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হালীমা সাদিয়ার নাম শুনেই মনের মধ্যে এক ধরনের পুলক ও কম্পন অনুভব করলেন। তার মনে ভেসে উঠল সেই শিশু বয়সের কথা যখন তিনি তার বুকের দুধ পান করেছিলেন। তার আদর-স্নেহ ও ভালোবাসার স্মৃতি তাকে আবেগে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

খাদীজা দাঁড়িয়ে হালীমাকে অভ্যর্থনা জানান। পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধায় তার সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। এমন সময়ে তিনি দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনন্দের আতিশয্যে উম্মী... উম্মী...(আমার মা, আমার মা) বলে ডাকছেন। নিজের শরীর থেকে চাদর খুলে তা মাটিতে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং সেখানে হালিমা সাদিয়াকে বসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার এই দুধমাতার জন্য চূড়ান্ত সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টান্ত পেশ করলেন। তার আগমনে পরম আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করলেন।

এক আনন্দঘন আবেগময় পরিবেশ ছেয়ে যায় ঘরজুড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হালীমা রা.-এর খোঁজখবর নেন। খাদীজা রা. আপন শাশুড়ীর মতো মর্যাদা ও সম্মান দিয়ে তার সেবা-যত্ম করলেন। হালীমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, তাদের অঞ্চলে খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে পশু-পাখি মারা গেছে এবং অভাব দেখা দিয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সমস্যা নিয়ে হযরত খাদীজার রা. সাথে কথা বললেন। খাদীজা রা. হালীমাকে চল্লিশটি ছাগল ও উট দান করলেন তার খান্দানের মধ্যে বণ্টনের জন্য।

খাদীজা এভাবেই সব সময় রাসূলের আত্মীয়-স্বজনদের সম্মান ও ভক্তি করতেন। ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুশি ও সন্তুষ্ট হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সন্তুষ্টচিত্তে কৃতজ্ঞতা জানাতেন। এমনই করে সব কিছু উদার হাতে রাসূলের সন্তুষ্টিতে বিলিয়ে দিতেন।

পবিত্র সন্তানদের আঙিনায়
এমনইভাবে এই পূতঃপবিত্র ঘরটি ভরে ওঠে মায়া-মমতা ও দয়া-ভালোবাসার সুনির্মল ছোঁয়ায়। খাদীজা আপ্রাণ চেষ্টা করতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হাসিখুশি ও সন্তুষ্ট রাখতে। এমন এক দিনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদীজার ঘরে এসে শুনতে পান এক মহান সুসংবাদ। সন্তানের সুসংবাদ পান তিনি। এতে প্রিয় হাবীবের মনপ্রাণ ভরে ওঠে খুশিতে। খাদীজাও তার স্বামীকে সন্তুষ্ট দেখে খুব খুশি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঔরসে খাদীজার প্রথম সন্তানের নাম কাসিম। তার নাম অনুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুনিয়াত বা উপনাম হয় আবুল কাসিম। এরপর আরও সন্তান জন্ম নেয় তার ঘরে। জন্ম নেন যায়নাব, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা। এরা সবাই নবুয়তের পূর্বে জন্ম গ্রহণ করেন। নবুয়তের পরে জন্ম নেন আবদুল্লাহ। যাকে তাইয়্যিব ও তাহির নামেও ডাকা হতো। একমাত্র ইবরাহীম ছাড়া রাসূলুল্লাহর সকল সন্তান হযরত খাদীজার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তারা হলেন, কাসিম, আবদুল্লাহ, যায়নাব, রুকাইয়া, উম্ম কুলসুম ও ফাতিমা রা.।

কাসিম ও আবদুল্লাহ রা. নবুওয়াতের আগেই ইন্তেকাল করেন। আর মেয়েরা সবাই তাদের জীবদ্দশায় ইসলামের সূচনা দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মদীনায় হিজরত করেন। রুকাইয়া ও উম্মে কুলসুমের স্বামী উসমান ইবনে আফফান রা., যায়নাবের স্বামী আবুল আস ইবনে রবী' ইবনে আবদে শামস এবং ফাতিমার স্বামী আলী ইবনে আবি তালিব রা.। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশাতেই ফাতিমা রা. ছাড়া রাসূলের অন্যান্য সন্তানগণ মারা যান। রাসূলের ইন্তেকালের ছয় মাস পর ফাতিমা রা.-এর মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যান।

হযরত খাদীজা রা. সন্তানদের খুব আদর যত্ন করতেন। আর্থিক সচ্ছলতাও ছিল। সন্তানদের প্রতিপালন ও দুধপান করানোর জন্য ধাত্রী নিয়োগ করতেন। সন্তান প্রসবের আগেই সব ব্যবস্থা করে রাখতেন। হযরত খাদীজা রা. তার সকল সন্তানকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাদের মঙ্গল কামনায় অস্থির থাকতেন। তার স্বর্ণোজ্জ্বল ঘটনাসমূহের মধ্যে একটি শিক্ষণীয় ও বিস্ময়কর ঘটনা হলো হযরত ফাতিমার জন্মের ঘটনা। যিনি ইহকাল ও পরকালের সর্বোত্তম নারী, জান্নাতের যুবকদের নেতা হাসান ও হুসাইন রা. এর মাতা এবং জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত আলী রা.-এর স্ত্রী। সৃষ্টির প্রারম্ভ হতে সর্বশেষ পর্যন্ত এমন কোনো নারীই তার (ফাতিমার) মর্যাদায় পৌঁছাতে পারবে না।

অনুগ্রহ ও পরহিতাকাঙ্ক্ষী মনোভাব
খাদীজা ছিলেন অত্যন্ত উদার ও দানশীল নারী। স্বামীর প্রিয়কে নিজের প্রিয় মনে করতেন। স্বামীর সন্তুষ্টির জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকতেন। প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ চাচাতো ভাই আলী ইবনে আবি তালিবের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি খাদীজার মনে তার প্রতি অগাধ স্নেহ-মমতা অনুভব করতেন। মায়ের মতো আগলে রাখতেন তাকে।

অনুরূপভাবে খাদীজা রা. যখন বুঝতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দাস যায়িদ ইবনে হারিসা রা.-কে অত্যধিক ভালোবাসেন, তখন তাকে তিনি হেবা করে দেন। এতে করে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে খাদীজার মর্যাদা আরও বেড়ে যায়।

‘আমার সাথে থাকতে চাইলে আমার করার কিছুই নেই’।
খাদীজা দেখলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদকে এত ভালোবাসেন, যা পরিমাপ করা কখনো কিছুতেই সম্ভব নয়। ঘটনার বিবরণটি এমন:

হযরত যায়িদ-এর পিতা তার স্ত্রী সুদাকে বেড়াতে নিয়ে যেতে প্রস্তুত করেন। স্ত্রী সুদা বনী মাআনে তার পিতা-মাতার সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতে চান। হারিসার স্ত্রীর কোলে ছিল যায়িদ নামীয় একটি বাচ্চা। যতদিন আল্লাহর ইচ্ছা ছিল সুদা তার বাপের বাড়িতে অবস্থান করেন। হঠাৎ এক রাতে বনী মাআনের লুটেরা দল তাদের তাঁবু আক্রমণ করে ধন সম্পদ, উট ইত্যাদি লুণ্ঠন করে এবং শিশুদের বন্দী করে নিয়ে যায়। এই বন্দী শিশুদের মধ্যে তার পুত্র যায়িদ ইবনে হারিসাও ছিলেন।

এরপর মা তার সন্তান ছাড়াই একা একা স্বামীর ঘরে পৌঁছেন। স্বামী এই হৃদয়বিদারক ঘটনা শুনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। হারিসার জ্ঞান ফিরে এলে তিনি লাঠি কাঁধে নিয়ে সম্ভাব্য সব স্থানে হারানো ছেলেকে খুঁজতে থাকেন। পরিচিত-অপরিচিত প্রতিটি মানুষের কাছে ছেলের সন্ধান জানতে চাইতেন আর নিম্নের কবিতাটি আবৃতি করতেন,
بكيت على زيد ولم ادر ما فعل أحي فيرجي؟ أم أنى دونه الأجل فوالله ما أدري، واني لسائل أغالك بعدي السهل؟ أم غالك الجبل تذكرينه الشمس عند طلوعها وتعرض ذكر اه اذا غربها أفل وان هبت الأرواح هيجن ذكره فيا طول حزني عليه، ويا وجل

যায়িদের জন্য আমি কাঁদছি! জানি না, তার কী হয়েছে? সে কি জীবিত? তবে তো ফেরার আশা আছে। নাকি মারা গেছে? আল্লাহর কসম, আমি জানি না, অথচ জিজ্ঞেস করে চলেছি। তোমাকে অপহরণ করেছে সমতল ভূমির লোকেরা, না পার্বত্য ভূমির? উদয়ের সময় সূর্য স্মরণ করিয়ে দেয় তার কথা। আর যখন অস্ত যায়, নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। আমি দেশ থেকে দেশান্তরে তোমার সন্ধানে উট হাঁকিয়ে ফিরব, কখনো আমি ক্লান্ত হব না, আমার বাহন উটও না। আমার জীবন থাকুক বা মৃত্যু আসুক। প্রতিটি মানুষই তো মরণশীল-যত আশার পেছনেই দৌড়াক না কেন।

সে যুগে দাসপ্রথা ছিল সমাজের আবশ্যিক অনুসঙ্গ। বাইজান্টাইনসহ অপরাপর দেশগুলোতেও এটি চালু ছিল। এমনকি গোটা বিশ্বেই গোলাম বা দাসপ্রথার প্রচলন ছিল। জাযিরাতুল আরবও বিশ্বের বাইরে নয়। সুতরাং সেখানেও এ ধারা চলতে থাকে।

লুটেরা দল তাকে বিক্রির উদ্দেশ্যে 'উকাজ' মেলায় নিয়ে যায়। হাকীম ইবনে হিযাম ইবনে খুওয়াইলিদ নামে এক কুরাইশ নেতা চারশো দিরহামে যায়িদকে খরিদ করেন। তার সাথে আরও কিছু দাস খরিদ করে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। হাকীম ইবনে হিযামের প্রত্যাবর্তনের খবর শুনে তার ফুফু খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ দেখা করতে আসেন। ফুফুকে তিনি বলেন, ফুফু উকাজ থেকে আমি দাস খরিদ করে এনেছি। আপনাকে হাদিয়া হিসাবে দান করলাম। তিনি যায়িদকে সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে এলেন।

একবার হজ মৌসুমে যায়িদের সাথে তার গোত্রের কতিপয় লোকের সাক্ষাৎ হয়। তারা তাকে তার পিতার কষ্টের ব্যাপারটি অবহিত করে। যায়িদ তার গোত্রের লোকদের বলল, 'আমার পিতাকে বলবেন, এখানে আমি একজন উত্তম পিতার সাহচর্যে আছি।'

ছেলের সন্ধান পেয়ে হারিসা সফরের প্রস্তুতি নিলেন। সফরসঙ্গী হলেন হারিসার ভাই। তারা মক্কার পথে বিরামহীন চলার পর 'বিশ্বস্ত ও আমানতদার মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহর' কাছে পৌঁছলেন এবং বললেন, 'ওহে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর, আপনারা আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী, অসহায়ের সাহায্যকারী, ক্ষুধার্তকে অন্নদানকারী ও আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয় দানকারী। আপনার কাছে আমাদের যে ছেলেটি আছে তার ব্যাপারে আমরা এসেছি। তার মুক্তিপণও সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন এবং আপনার ইচ্ছামতো তার মুক্তিপণ নির্ধারণ করুন।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে থাকা যায়িদের সম্পর্কে ভালো করেই জানেন; কিন্তু তার পিতা সম্পর্কেও তিনি যাচাই করতে চান। এ লক্ষ্যে তিনি হারিসাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'আমি তাকে আপনাদের সামনে ডাকছি। স্বেচ্ছায় সে নির্ধারণ করুক, আমার সাথে থাকবে, না আপনাদের সাথে যাবে। যদি আপনাদের সাথে যেতে চায়, মুক্তিপণ ছাড়া তাকে নিয়ে যাবেন। আর আমার সাথে থাকতে চাইলে আমার করার কিছুই নেই।'

এ কথা শুনে হারিসার চেহারা চমকে উঠল। কেননা, তার সম্পর্কে এমন উদার মনের ধারণা তার ছিল না। সে বলল, আপনি অত্যন্ত ন্যায় বিচারের কথা বলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়িদকে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'এ দু-ব্যক্তি কারা?' যায়িদ বললেন, ইনি আমার পিতা হারিসা ইবনে শুরাহবীল। আর ইনি আমার চাচা কাআব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি ইচ্ছা করলে তাদের সাথে যেতে পার, আর ইচ্ছা করলে আমার সাথেও থেকে যেতে পার।'

কোনো রকম ইতস্তত না করে সঙ্গে সঙ্গে যায়িদ বলে উঠলেন, 'আমি আপনার সাথেই থাকবো।' তার পিতা বললেন, 'যায়িদ, তোমার সর্বনাশ হোক! পিতা-মাতাকে ছেড়ে তুমি দাসত্ব বেছে নিলে?' তিনি বললেন, 'এ ব্যক্তির মাঝে আমি এমন কিছু দেখেছি—যার কারণে আমি কখনো তাকে ছেড়ে যেতে পারি না।'

যায়িদের এ সিদ্ধান্তের পর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার হাত ধরে কাবার কাছে নিয়ে আসেন এবং হাজরে আসওয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে উপস্থিত কুরাইশদের লক্ষ্য করে ঘোষণা করেন, 'ওহে কুরাইশ জনমণ্ডলী, তোমরা সাক্ষী থাক, আজ থেকে যায়িদ আমার ছেলে। সে হবে আমার এবং আমি হবো তার উত্তরাধিকারী।'

এ ঘোষণায় যায়িদের বাবা-চাচা খুব খুশি হলেন। তারা তাকে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহর নিকট রেখে প্রশান্ত চিত্তে দেশে ফিরে গেলেন। তার ছেলে শুধু আযাদই নয়; বরং এমন এক ব্যক্তির ছেলে হয়ে গেছেন—যিনি কুরাইশ বংশের বনী হাশিমের 'বিশ্বস্ত ও আমানতদার' হিসেবে খ্যাত এবং মক্কাজুড়ে তিনি একজন পরম সম্মানিত ব্যক্তি।

যায়িদের পিতা ও চাচা নিজ গোত্রে ফিরে আসছেন। তারা ছেলের ব্যাপারে মোটেও চিন্তিত নন। যাকে তারা মক্কায় একজন নেতার মতো রেখে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, শান্ত ও নিরাপদ। অথচ তিনি এক সময় ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন যে, তার ছেলেকে কি যমীন পুঁতে ফেলেছে, নাকি পাহাড় গিলে ফেলেছে!

সেই দিন থেকে যায়িদ ইবনে হারিসা হলেন যায়িদ ইবনে মুহাম্মাদ। সবাই তাকে মুহাম্মাদের ছেলে হিসেবেই সম্বোধন করত। এরপর এমন দিন আসতে থাকে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ওহীর ডাক আসে।

যায়িদ যেমন পিতা-মাতাকে ছেড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বেছে নেন, তেমনি রাসূলও তাকে গভীরভাবে ভালোবাসেন এবং তাকে আপন সন্তান ও পরিবারবর্গের মধ্যে শামিল করে নেন। যায়িদ দূরে গেলে তিনি উৎকণ্ঠিত হতেন, ফিরে এলে উৎফুল্ল হতেন। এত আনন্দের সাথে তাকে গ্রহণ করতেন যে অন্য কারও সাক্ষাতের সময় তেমন দেখা যেত না। কোনো এক অভিযান শেষে হযরত যায়িদ রা. মদীনায় ফিরে এলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যেভাবে গ্রহণ করেছিলেন, তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.। তিনি বলেন :

'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যায়িদের সাথে হযরত যায়নাব রা.-এর বিয়ে দেন। হযরত যায়নাব রা. লজ্জা ও সঙ্কোচজনিত কারণে বাহ্যত এ বিয়েতে রাজি হন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুপারিশ ফিরিয়ে দেওয়া সঙ্গত মনে করেননি। তবে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সুখ-শান্তি স্থির হয়নি। বিয়েটি ভেঙে যায়। শেষে হযরত যায়িদ রা. যায়নাব রা. থেকে পৃথক হয়ে যান।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বিয়েতে জবাবদিহির পাত্র ছিলেন। কেননা, তিনিই এদের বিয়ে দেন। পরবর্তী কালে এ বিয়ে বিচ্ছেদে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করে নেন এবং হযরত যায়িদ রা.-এর জন্য উম্মে কুলসুম বিনতে উকবাকে নির্বাচন করেন। এতে করে কুৎসা রটনাকারীরা সুযোগ পেয়ে যায়। তারা মদীনার আকাশে রটাতে থাকে, মুহাম্মাদ তার পুত্রের তালাকপ্রাপ্তাকে বিয়ে করেছেন। এটাই সেই ক্ষণ—যখন কুরআন তার প্রকৃতি ও বাস্তবতা তুলে ধরে। পিতৃত্ব ও পুত্রত্বের ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে ওহী অবতীর্ণ হয় :
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ وَ كَانَ اللهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا ،
মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী। আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ।

এভাবে হযরত যায়িদ রা. তার পূর্বের নামে ফিরে আসেন হযরত যায়িদ ইবনে হারিসা রা. হিসেবে।

সায়্যিদুল আওয়ালীন ওয়াল আখিরীন
মানুষের যতগুলো উত্তম গুণাবলি থাকতে পারে, তার সবগুলোরই সমাবেশ ঘটেছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে। যাবতীয় চিন্তাগত দৈন্যতা থেকে তিনি ছিলেন পূতঃপবিত্র। তিনি ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় বাজে কথা বলতেন না। কখনো কোনো শিশুকে ধমক দেননি। ছিলেন পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ আদর্শ মানুষ। কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য অনুপম আদর্শ। তার অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে মনুষ্যত্বের পূর্ণ মর্যাদা। তিনি শুধু মুসলমানদের জন্য শ্রেষ্ঠ ও আদর্শমানব ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বযুগের মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তিনি ছিলেন অতীত, বর্তমান এবং অনাগত ভবিষ্যতের একমাত্র পথ প্রদর্শক। স্থান, কাল, পাত্র, গোত্র, বর্ণ কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি কেমন; এটা শুধু তাকে দিয়েই মূল্যায়ন করা সম্ভব। তাঁর সুরভিত জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। বিশেষ করে তার স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও হুকুম আহকাম। এগুলো অনুসরণ করলে শুধু সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া যাবে তা নয়; বরং আল্লাহর কাছে সঞ্চিত তার উত্তম প্রতিদানে ধন্য হওয়া যাবে। সৌন্দর্যময় চন্দ্রের কলঙ্ক আবিষ্কার করা সম্ভব; কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্রে সামান্যতম কালিমা আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। মানবজাতির সামনে তিনি ছিলেন এক নিষ্কলঙ্ক পূর্ণচন্দ্রের মতো চির মহিমাময় আলোকরশ্মি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু তালিবের পুত্র আলী রা. শৈশবকাল থেকে রাসূলের কাছে প্রতিপালিত হয়েছেন। কিশোরদের মধ্যে তিনিই প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অতিশয় উদার, মহানুভব ও দয়ার্দ্রচিত্ত। সর্বাবস্থায় তার হৃদয়ের কোমলতা ও দয়ালু স্বভাবই প্রতিভাত হতো, কঠোরতা তিনি পরিহার করে চলতেন। তার মুখ দিয়ে কখনো কোনো খারাপ বা অশোভনীয় কথা বের হতো না। তিনি কখনো অন্যের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াতেন না। যদি এমন কোনো অনুরোধ তার কাছে পেশ করা হতো যা গ্রহণযোগ্য নয়, তা হলে তিনি যেমন তা অনুমোদন করতেন না, আবার সরাসরি নাকচও করে দিতেন না। যারা তাকে জানতেন, তারা সহজেই এর অর্থ অনুধাবন করতে পারতেন। তিনি এটা এজন্য করতেন যেন অন্যের অনুভূতিতে কোনো আঘাত না লাগে; আবার অনুমোদনযোগ্য নয়, এমন কাজ থেকেও সে নিবৃত্ত হয়।'

আলী রা. আরও বলেন, 'তিনি ছিলেন অতিশয় পরোপকারী মহানুভব ব্যক্তি, কঠোরভাবে সত্যবাদী ও দয়ার্দ্রচিত্ত। তার সাহচর্যে যারা আসার সৌভাগ্য লাভ করতেন, তারা-ই আনন্দিত ও মুগ্ধ হতেন। প্রথম দর্শনেই তার নিষ্পাপ অবয়ব সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। আর পরিচয় ঘনিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে তার প্রতি মহব্বত বহুগুণ বেড়ে যেত।'

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী খাদীজা রা.-এর আগের স্বামীর ঔরসজাত ছেলে হিন্দা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বলেন, 'তিনি ছিলেন অতিশয় মহানুভব ব্যক্তি। তিনি কখনো কারও মনে আঘাত দিতেন না বা এমন কোনো কথা কখনো বলতেন না যাতে কারও আত্মমর্যাদায় এতটুকু আঘাত লাগতে পারে। কেউ তার প্রতি সামান্যতম অনুগ্রহ প্রদর্শন করলেও তিনি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলতেন না। ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপারেই তিনি কখনো রাগান্বিত হতেন না বা প্রতিশোধ নিতেন না। তবে ন্যায় ও হকের ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপসহীন, যেকোনো মূল্যে তা প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।'

আল্লাহ প্রথম থেকেই তাকে মহান দাওয়াতের জন্য উত্তম চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার দাওয়াত ছিল হিকমত ও কৌশলপূর্ণ।

রাসূলের আবির্ভাবের সময় তৎকালীন আরব ধর্মীয় দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ ও নিকৃষ্ট অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। এ সময় তাদের ধর্ম-বিশ্বাসে শিরক, মূর্তিপূজা, গ্রহ-নক্ষত্র, দেব-দেবী, পাহাড়-পর্বত, পশু-পক্ষী, পাথর, ইত্যাদির উপাসনা বিরাজমান ছিল। এভাবে মানুষ এক আল্লাহর স্থলে বহু প্রভুর উপাসনার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। রাসূল ছিলেন এ সব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

ইমাম বুখারী রহ. হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন,
لَمَّا بُنِيَتُ الْكَعْبَةُ ذَهَبَ النَّبِيُّ وَعَبَّاسُ يَنْقُلَانِ الْحِجَارَةَ فَقَالَ عَبَّاسٌ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم اجْعَلْ إِزَارَكَ عَلَى رَقَبَتِكَ يَقِيكَ مِنَ الْحِجَارَةِ فَخَرَّ إِلَى الْأَرْضِ وَطَمَحَتْ عَيْنَاهُ إِلَى السَّمَاءِ ثُمَّ أَفَاقَ فَقَالَ إِزَارِي إِزَارِي فَشَدَّ عَلَيْهِ إِزَارَهُ
যখন কাবাগৃহ পুনঃর্নির্মাণ করা হচ্ছিল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আব্বাস রা. পাথর বয়ে আনছিলেন। আব্বাস রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, তোমার লুঙ্গিটি কাঁধের ওপর রাখ, পাথরের ঘর্ষণ হতে তোমাকে রক্ষা করবে। (লুঙ্গি খুলতেই) তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। তার চোখ দু-টি আকাশের দিকে নিবিষ্ট ছিল। চেতনা ফিরে এলে তিনি বলতে লাগলেন, আমার লুঙ্গি, আমার লুঙ্গি। তৎক্ষণাৎ তাকে তার লুঙ্গিটি পরিয়ে দেওয়া হলো।

মহান আল্লাহ তাআলা তাকে সত্য দ্বীন সহকারে মানবজাতির মুক্তি ও কল্যাণের পথ নির্দেশক হিসেবে সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শকরূপে পাঠিয়েছেন। নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর থেকে নয়, বরং জন্মলগ্ন থেকেই তিনি ছিলেন আদর্শের মূর্ত প্রতীক। বাল্যকাল থেকেই তিনি সে আদর্শ প্রচার- প্রসারের জন্য আল্লাহ তাআলা তাকে প্রস্তুত করতে থাকেন। চাল-চলন, আচার-ব্যবহার ও কথাবার্তায় তিনি ছিলেন এক অনন্য ও ব্যতিক্রমধর্মী আদর্শবান বালক। খাদীজা রা.-এর অভিব্যক্তিতে:
إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ ، وَتَقْرِي الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ
আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করেন, অসহায় দুঃস্থদের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং হক পথের দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন।

রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবজাতির মুক্তির জন্য, শান্তি ও কল্যাণের জন্য আজীবন সাধনা করেছেন। মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর উপলব্ধি জাগানো এবং মানুষকে কুফর ও শিরক থেকে মুক্ত করার ভাবনায় মগ্ন থাকতেন। তিনি আল্লাহর নৈকট্যলাভের জন্য নিজ বাসস্থান থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে পবিত্র হেরা পর্বতের গুহায় একাকী নির্জনে ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এই গুহায় একটানা ডুবে থাকতেন ধ্যানে-মগ্নে।

কয়েকদিনের খাদ্য-পানীয় সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তা শেষ হলে বাড়িতে এসে আবার কয়েকদিনের জন্য খাদ্য-পানীয় নিয়ে চলে যেতেন। খাদীজা পরম যত্ন সহকারে আহার্য প্রস্তুত করে দিতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্জনাসক্তি ও নির্জনতায় অবস্থান ছিল প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার ব্যবস্থাপনার একটি অংশ। কিছুদিন যাবত তিনি একটি স্বর্গীয় আলোক দেখতে পান। একটি অশ্রুতপূর্ব শব্দ তরঙ্গ শুনতে পান। তখন থেকে তিনি স্বপ্নযোগে যা দেখতেন তাই সত্যে পরিণত হতে লাগল। অবশেষে তার বয়স যখন চল্লিশ বছর, এমন সময়ে আল্লাহ তাকে প্রকাশ্যে ও বাহ্যিক নবুয়তের পরম মর্যাদায় ভূষিত করলেন।

সময়টা ছিল রমযান মাস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা রেখে হেরা গুহায় সারারাত জাগ্রত থেকে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন। এমনই রমযানের এক বিজোড় রজনীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধ্যানমগ্ন থাকাবস্থায় মহান আল্লাহর দূত জিবরাঈল আ. তার নিকট আগমন করেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ফেরেশতা তখন আমাকে ধরে এত জোরে আলিঙ্গন করলেন যে, এতে আমি প্রচণ্ড কষ্ট অনুভব করলাম। এরপর ফেরেশতা আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘পড়ুন’। আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না। তখন তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে ধরে খুব জোরে আলিঙ্গন করলেন। তাতে আমার অত্যন্ত কষ্ট বোধ হলো। এরপর আমাকে তিনি ছেড়ে দিয়ে পড়তে বললেন। আমি বললাম, আমি পড়তে জানি না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ফেরেশতা তৃতীয়বার ধরে দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করায় আমার ভীষণ কষ্ট হলো। এবার তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন,
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ اِقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمُ
আপনার রবের নামে পড়ুন, যিনি সৃষ্টি করেছেন। জমাট রক্ত থেকে যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আর আপনার রব সবচেয়ে বেশি সম্মানিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানত না।

সৃষ্টিজগতের সেই বরকতময় সময়
মূলত এটা ছিল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতলাভের সময়। প্রথম ওহী। এই সুবর্ণ সময়টির দিকে একটু কল্পনার দৃষ্টিতে তাকালে আমরা কী দেখতে পাই! এক অদ্ভুত শিহরণ! আশ্চর্য মোহময়তা—যা কল্পনা বা অনুধাবনশক্তির অনেক ঊর্ধ্বে। এই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যার ওপর নির্ভর করে গোটা মানবজীবন। একথা বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না যে, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে যা দামি। যার মাহাত্ম্য তুলনারহিত।

কী রহস্য ওই সময়টার? কেন তা এত দামি!
এর হাকীকত হচ্ছে মহামহিম জাব্বার, কাহহার, মুতাকাব্বির ও সকল বাদশার বাদশা ‘মানুষ’ নামের সৃষ্টিকে এক বিশেষ সম্মানে ভূষিত করতে যাচ্ছেন। এক ঐশী নূরে আলোকিত করতে চাচ্ছেন। এর মাধ্যমে তিনি তার কথাকে উচ্চকিত করবেন। প্রজ্ঞাকে সুদৃঢ় করবেন।

এটাই সবচেয়ে বড় হাকীকত, যার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। মানুষের ইন্দ্রিয়শক্তি যা কল্পনা করতে অক্ষম। যা পরিচয় দেবে চির অবিনশ্বর এক মহান সত্তার। এটা জাগতিক কোনো বিষয় নয়, নয় কোনো কল্পনা বিলাসিতা। এটা আকাশ হতে নেমে আসা মহান সৃষ্টিকর্তার ওহী বা প্রত্যাদেশ।

থেমে যাওয়া প্রবল ঘূর্ণিঝড়
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট প্রথম যে ওহী আসে, তা ছিল নিদ্রাবস্থায় বাস্তব স্বপ্নরূপে। যে স্বপ্নই তিনি দেখতেন তা একেবারে প্রভাতের আলোর ন্যায় প্রকাশিত হতো। অতঃপর তার নিকট নির্জনতা পছন্দনীয় হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি 'হেরা'র গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন। আপন পরিবারের নিকট ফিরে এসে কিছু খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এভাবে সেখানে তিনি এক নাগাড়ে বেশ কয়েক দিন ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। অতঃপর খাদীজা রা.-এর নিকট ফিরে এসে আবার একই সময়ের জন্য কিছু খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যেতেন। এভাবে 'হেরা' গুহায় অবস্থানকালে তার নিকট ওহী এলো। তার নিকট ফেরেশতা এসে বলল,
اقْرَأْ. قَالَ " مَا أَنَا بِقَارِي " . قَالَ " فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي حَتَّى بَلَغَ مِنِّي الْجَهْدَ. ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ اقْرَأْ. قُلْتُ مَا أَنَا بِقَارِي فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي الثَّانِيَةَ حَتَّى بَلَغَ مِنِّي الْجَهْدَ ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ اقْرَأْ. فَقُلْتُ مَا أَنَا بِقَارِي. فَأَخَذَنِي فَغَطَّنِي الثَّالِثَةَ ، ثُمَّ أَرْسَلَنِي فَقَالَ { اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ * خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الأَكْرَمُ }
পাঠ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আমি বললাম, আমি পড়তে জানি না। অতঃপর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলেন যে, আমার খুব কষ্ট হলো। অতঃপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পাঠ করুন। আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলেন যে, আমার খুব কষ্ট হলো। অতঃপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পাঠ করুন। আমি উত্তর দিলাম, আমি তো পড়তে জানি না। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, অতঃপর তৃতীয়বারে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। তারপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, 'পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে, পাঠ করুন, আর আপনার রব অতিশয় দয়ালু।

অতঃপর এ আয়াত নিয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যাবর্তন করলেন। তার হৃদয় তখন কাঁপছিল। তিনি খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদের নিকট এসে বললেন,
زَمِّلُونِي زَمِّلُونِي
আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত করো, আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত করো।

তিনি তাকে চাদর দিয়ে আবৃত করলেন। এক সময় তার শঙ্কা কিছুটা প্রশমিত হলো। তিনি খাদীজা রা.-এর নিকট পুরো ঘটনা জানিয়ে বললেন,
لَقَدْ خَشِيتُ عَلَى نَفْسِي
আমি আমার নিজেকে নিয়ে শঙ্কা বোধ করছি।

খাদীজা বললেন, আল্লাহর কসম! কখনই নয়। আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করেন, অসহায় দুস্থদের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং হক পথের দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন।

অতঃপর তাকে নিয়ে খাদীজা রা. তার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল ইবনে আবদুল আসাদ ইবনে আবদুল উযযার নিকট গেলেন। যিনি অন্ধকার যুগে ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হিব্রু ভাষায় লিখতে পারতেন এবং আল্লাহর তাওফীক অনুযায়ী হিব্রু ভাষায় ইনজীল হতে ভাষান্তর করতেন। তিনি ছিলেন অতিবৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।

খাদীজা রা. তাকে বললেন, 'হে চাচাতো ভাই, আপনার ভাতিজার কথা শুনুন।' ওয়ারাকা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ভাতিজা! তুমি কী দেখ?' আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা দেখেছিলেন, সবই বর্ণনা করলেন। তখন ওয়ারাকা বললেন, এ তো সেই বার্তাবাহক-যাকে আল্লাহ মূসা আ.-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন থাকতাম। আফসোস! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন তোমার কওম তোমাকে বহিষ্কার করবে।' আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তারা কি আমাকে বের করে দেবে?'

তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তুমি যা নিয়ে এসেছ অনুরূপ (ওহী) কিছু যিনিই নিয়ে এসেছেন তার সঙ্গেই বৈরিতাপূর্ণ আচরণ করা হয়েছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে তোমাকে জোরালোভাবে সাহায্য করব।' এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন। আর ওহীর বিরতি ঘটে।”

এক দিনেই গত হয়ে যায় চল্লিশটি বছর। নতুন স্বর্ণোজ্জ্বল দিন হতে শুরু হয় প্রত্যাদেশ। সত্যের আলোক দিশায় জেগে ওঠে বুদ্ধি-বিবেক। জগদ্দল পাথরের মতো ভারাক্রান্ত অন্তরে ইয়াকীনের শীতলতা ও প্রত্যাশার প্রশস্ততা অনুভব হতে থাকে। এ যে নবুওয়াত!

ইসলামের স্পন্দনে উদ্বেলিত প্রথম হৃদয়
ইসলাম একজন মহীয়সী নারীকে এতটাই উচ্চে তুলে ধরেছে যা এককথায় অকল্পনীয় ও অবিস্মরণীয়। তিনি নিজেও অনুধাবন করতে পারেননি কতটা মহিয়ান মর্যাদার সাক্ষর রেখে যাচ্ছেন তিনি ইতিহাসের সোনালী পাতায়। পূর্বে উল্লেখ করা ঘটনাবলীর সবই ইসলামের অব্যবহিত পূর্ব সময়ের ও সূচনাপর্বের।

এ ধরনের আরও বহু ঘটনার কথা জানা যায়—যাতে হযরত খাদীজা রা.-এর ধৈর্য, বিচক্ষণতা, স্বামীর প্রতি প্রবল আবেগ ও বিশ্বাস এবং সর্বাবস্থায় স্বামীর পাশে দাঁড়ানোর দৃশ্য ফুটে উঠেছে। এ সকল ঘটনা পর্যালোচনা করলে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট জিবরাঈল আ.-এর আগমনের পূর্বেই তিনি যেন স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তার স্বামী একজন অসাধারণ মানুষ হবেন। তিনি হবেন একজন নবী। আর তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তার কাছে এসে প্রথম দাবি করলেন, তার নিকট জিবরাঈল এসেছেন। তিনি ওহী লাভ করেছেন। তখন ক্ষণিকের জন্যও তার মনে কোনো দ্বিধা-সংশয় দেখা দেয়নি। তিনি যেন আগে থেকেই এমন একটি সংবাদ পাওয়ার জন্য প্রতীক্ষায় ছিলেন, মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন। তার সে সময়ের বিভিন্ন কর্ম ও আচরণ দ্বারা এ কথাগুলো প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত। এভাবেই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ঈমানী স্পন্দনে উদ্বেলিত হয় হযরত খাদীজা রা.-এর পবিত্র আত্মা।

ইমাম ইযযুদ্দীন ইবনুল আসীর বলেন, 'এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর ইজমা হয়েছে যে, হযরত খাদীজা রা. আল্লাহর সৃষ্টি-জগতের মধ্যে প্রথম মুসলিম হয়েছেন।'
এই মহীয়সী নারী কেবল নারীজগতেই নয়; বরং প্রজ্ঞা, জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক ও বিশুদ্ধ আত্মার ক্ষেত্রে অনেক পুরুষের চেয়েও অগ্রগামী।

কল্যাণময় ঘর
এভাবেই হযরত খাদীজা রা. হন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মুসলমান। তার কন্যারাও অনুরূপ... এমনকি তার বরকতমণ্ডিত ঘরের সকল সদস্যই অগ্রগামী মুসলমানদের মধ্যে অন্যতম। যেমন: আলী ইবনে আবি তালিব ও যায়িদ ইবনে হারিসা রা.।

এমনই করে পবিত্র এই ঘরটি সৃষ্টিজগতের এক মর্যাদাপূর্ণ ঘরের বৈশিষ্ট্য লাভ করে। এই ঘর থেকেই সৃষ্টি হন বিশ্বের সকল নারীর নেত্রী আম্মাজান খাদীজা রা.। এই ঘরে জন্ম নেন জান্নাতবাসী মহিলাদের নেত্রী হযরত ফাতিমা রা.। এসব ছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওহী অবতীর্ণ হয় এ ঘরে। এখানেই বসবাস করতেন সায়্যিদুল আউয়ালীন ওয়াল আখিরীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

এই ঘরে থাকতেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবীর অন্যতম একজন আলী ইবনে আবি তালিব রা.। এখানে থাকতেন যায়িদ ইবনে হারিসা রা.- যাঁঁর নাম ছাড়া আর কোনো সাহাবীর নাম আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেননি। ইরশাদ হয়েছে,
فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنُكَهَا
অতঃপর যায়িদ যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম।

ইমাম তাবারী উল্লেখ করেছেন, মসজিদে হারামের পর মক্কায় সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন ঘর হলো হযরত খাদীজা রা.-এর পবিত্র ঘর। এটা সম্ভবত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দীর্ঘ সময় এখানে অবস্থান ও ওহী নাযিলের বরকতেই হয়েছে।

ইমাম আলফাসী বর্ণনা করেন, হারাম শরীফের পর মক্কার পবিত্র কাল পরিক্রমায় উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা.-এর ঘরটি শ্রেষ্ঠ। এই ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন জগতের নারীকুলের নেত্রী ফাতিমা ও তার ভাই-বোনেরা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এ ঘরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদীজাকে নিয়ে বসবাস করতেন। এখানেই খাদীজা রা. ইন্তেকাল করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরতের আগ পর্যন্ত এখানেই বসবাস করেন। হিজরতের পর এটা আকীল ইবনে আবি তালিবের হস্তগত হয়। এরপর ঘরটি খলীফা মুআবিয়া ইবনে আবি সুফইয়ান রা. কিনে নেন। তিনি এটাকে নামায পড়ার জন্য মসজিদ বানান।

প্রিয়তম রাসূলের সান্নিধ্যে
হযরত খাদীজা রা. পঁচিশ বছর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যে কাটাবার গৌরব অর্জন করেন। এ সময়ে তিনি রাসূলের কাছ থেকে উন্নত চরিত্রমাধুরী ও জ্ঞান-প্রজ্ঞা আত্মস্থ করতে থাকেন। তার সেই অপরিসীম কীর্তি আর গুণের বর্ণনা দিতে আমাদের কলম অক্ষম। তার গুণের সামনে আমাদের শব্দমালা লজ্জাবনত হয়ে ওঠে।

তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সেই সময়ে যে নামায ছিল—তা পড়তেন। আর তা হচ্ছে প্রত্যুষে দুই রাকাত আর রাতে দুই রাকাত। এটা মিরাজের রাতে পাঁচওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার আগের ঘটনা। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
الصَّلاةُ أَوَّلُ مَا فُرِضَتْ رَكْعَتَيْنِ فَأُقِرَّتْ صَلَاةُ السَّفَرِ، وَأُتِمَّتْ صَلَاةُ الْحَضَرِ
প্রথম অবস্থায় নামায দু-রাকাআত করে ফরয করা হয় অতঃপর সফরে নামায সেভাবেই স্থায়ী থাকে এবং মুকীম অবস্থায় নামায পূর্ণ (চার রাকাআত) করা হয়েছে।

ঘটনা হচ্ছে, হযরত খাদীজা রা. ফরয নামাযের বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে ইন্তেকাল করেছিলেন। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খাদীজা রা.-এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো যে, তিনি তো ফারাইয ও আহকাম অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন! জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তাকে জান্নাতের ঝর্ণামালা থেকে একটি ঝর্ণার পাশে এমন ঘরে দেখেছি, যেখানে কোনো কোলাহল নেই, নেই কোনো শোরগোল।

আফীফ আল-কিন্দী বলেন, আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি ইয়ামেন থেকে হজের মৌসুমে আতর ইত্যাদি কেনা-বেচা করতেন। একদিন আমি আব্বাসের সাথে মিনায় দাঁড়ানো। হঠাৎ দেখলাম এক যুবক এসে ভালো করে ওযু করল এরপর নামায পড়ল। এরপর এলো একজন নারী। সেও এসে ভালো করে ওযু করল এরপর নামায পড়ল। এরপর একজন কিশোর এলো, সেও ভালো করে ওযু করল এরপর নামায পড়ল। আফীফ আল-কিন্দী আব্বাস রা.-কে বললেন, আশ্চর্য তো, হে আব্বাস! এটা কী ধর্ম! আব্বাস বললেন, এটা মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ-এর দ্বীন। সে আমার ভাতিজা। তার ধারণা, তাকে আল্লাহ তাআলা রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন। আর কিশোরটিও আমার ভাতিজা। সে মুহাম্মাদের নতুন দ্বীনের অনুসরণ করে। ওই নারী হচ্ছেন খাদীজা, তিনিও মুহাম্মাদের দ্বীনের অনুসারী।

আফীফ আল-কিন্দী ইসলাম গ্রহণের পর আক্ষেপ করে বলেন, আহ! আমি যদি চতুর্থজন হতাম!

এরপর এ দ্বীন মক্কায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ গোত্র ও আত্মীয়-স্বজনদের আল্লাহর একত্ববাদের দিকে দাওয়াত দিতে থাকেন।
عن أَبَا هُرَيْرَةَ - رضى الله عنه - قَالَ قَامَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عَلَيْهِ وسلم حِينَ أَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ { وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ } قَالَ " يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ ، أَوْ كَلِمَةً نَحْوَهَا اشْتَرُوا أَنْفُسَكُمْ ، لَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللهِ شَيْئًا، يَا بَنِي عَبْدِ مَنَافٍ لَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا، يَا عَبَّاسُ بْنَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لَا أُغْنِي عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا، وَيَا صَفِيَّةُ عَمَّةَ رَسُوْلِ اللَّهِ لَا أُغْنِي عَنْكِ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا، وَيَا فَاطِمَةُ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَلِينِي مَا شِئْتِ مِنْ مَالِي لَا أُغْنِي عَنْكِ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তাআলা কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল করলেন, 'আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করে দিন। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়ালেন এবং বললেন, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়, (কিংবা অনুরূপ শব্দ বললেন,) তোমরা আত্মরক্ষা করো। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোনো উপকার করতে পারব না। হে বনু আব্দ মানাফ, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোনো উপকার করতে পারব না। হে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না। হে সাফিয়্যা, (আল্লাহর রাসূলের ফুফু,) আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না। হে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ, আমার ধন-সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না।

এরপর শুরু হয় মুশরিকদের নিন্দ ও নির্যাতনের পালা। ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত সকলের ওপর নেমে আসে লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও কষ্টের স্টিমরোলার। মক্কাবাসী ক্ষোভে-ক্রোধে ফেটে পড়তে থাকে। নতুন দ্বীনকে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মের ওপর আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করে। অত্যাচার ও কষ্ট দেওয়ার যত রকম পন্থা আছে সবই প্রয়োগ করতে থাকে মুসলমানদের ওপর।

ধৈর্য ও সাওয়াবের প্রত্যাশা
মুশরিকদের প্রত্যাখ্যান ও অবিশ্বাসের কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ব্যথা অনুভব করতেন, খাদীজা রা.-এর দ্বারা আল্লাহ তা দূর করে দিতেন। কারণ, তিনি রাসূলকে সান্ত্বনা দিতেন, সাহস ও উৎসাহ যোগাতেন। তাঁর সব কথাই তিনি বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করতেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার বায়তুল্লাহর পাশে নামায আদায় করছিলেন। সেখানে আবু জাহাল ও তার সাথীরা বসা ছিল। এমন সময় তাদের একজন অন্যজনকে বলে উঠল 'তোমাদের মধ্যে কে অমুক গোত্রের উটনীর নাড়িভুঁড়ি এনে মুহাম্মাদ যখন সিজদা করেন তখন তার পিঠের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে'? তখন গোত্রের বড় পাষণ্ড (উকবা) তাড়াতাড়ি গিয়ে তা নিয়ে এলো এবং তার প্রতি লক্ষ রাখল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সিজদায় গেলেন, তখন সে তার পিঠের ওপর দুই কাঁধের মাঝখানে তা রেখে দিল।

ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি (এ দৃশ্য) দেখছিলাম কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। হায়! আমার যদি বাধা দেবার শক্তি থাকত! তিনি বলেন, তারা হাসতে লাগল এবং একে অন্যের ওপর লুটোপুটি খেতে লাগল। আর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সিজদায় থাকলেন, মাথা ওঠালেন না। অবশেষে ফাতিমা রা. এসে সেটি তার পিঠের ওপর থেকে ফেলে দিলেন।

অতঃপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আল্লাহ, আপনি কুরাইশকে ধ্বংস করুন। এরূপ তিনবার বললেন। তিনি যখন তাদের বদ দুআ করেন তখন তা তাদের অন্তরে ভয় জাগিয়ে তুলল।

বর্ণনাকারী বলেন, তারা জানত যে, এ শহরে দুআ কবুল হয়। অতঃপর তিনি নাম ধরে বললেন, হে আল্লাহ, আবু জাহালকে ধ্বংস করুন এবং উতবা ইবনে রবীআ, শায়বাহ ইবনে রবীআ, ওয়ালীদ ইবনে উতবা, উমাইয়া বিন খালাফ ও উকবা ইবনে আবি মুআইতকে ধ্বংস করুন।

রাবী বলেন, তিনি সপ্তম ব্যক্তির নামও বলেছিলেন; কিন্তু তিনি স্মরণ রাখতে পারেননি। ইবনে মাসউদ রা. বলেন, সেই সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের নাম উচ্চারণ করেছিলেন, তাদের আমি বদরের কূপের মধ্যে নিহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।

উরওয়া ইবনে যুবাইর বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা.-এর নিকটে বললাম, মক্কার মুশরিক কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সর্বাপেক্ষা কঠোর আচরণের বর্ণনা দিন। তিনি বললেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা শরীফের হিজর নামক স্থানে নামায আদায় করছিলেন। তখন উকবা ইবনে আবু মুয়াইত এলো এবং তার চাদর দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কণ্ঠনালি পেঁচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলল। তখন আবু বকর রা. এগিয়ে এসে উকবাকে কাঁধে ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হতে হটিয়ে দিলেন এবং বললেন,
أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ
তোমরা এমন লোককে হত্যা করতে চাও যিনি বলেন, একমাত্র আল্লাহই আমার রব।

কষ্ট ও নির্যাতনের তীব্রতায় এমনই আর্তনাদ করতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীরা। খাব্বাব রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি তার নিজের চাদরকে বালিশ বানিয়ে কা'বাগৃহের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করছিলেন। আমরা মুশরিকদের পক্ষ হতে কঠিন নির্যাতন ভোগ করছিলাম। তাই আমি বললাম, আপনি কি আল্লাহর কাছে দুআ করবেন না? তখন তিনি উঠে বসলেন এবং তার চেহারা লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন:
لَقَدْ كَانَ مَنْ قَبْلَكُمْ لَيُمْشَطُ بِمِشَاطِ الْحَدِيدِ مَا دُونَ عِظَامِهِ مِنْ لَحْمٍ أَوْ عَصَبٍ مَا يَصْرِفُهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ وَيُوضَعُ الْمِنْشَارُ عَلَى مَفْرِقِ رَأْسِهِ فَيُشَقُّ بِاثْنَيْنِ مَا يَصْرِفُهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ وَلَيُتِمَّنَّ اللَّهُ هَذَا الأَمْرَ حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنْ صَنْعَاءَ إِلَى حَضْرَ مَوْتَ مَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ
তোমাদের পূর্বের ঈমানদারদের মধ্যে কারও কারও শরীরের হাড় পর্যন্ত তামাম গোশত ও শিরা উপশিরাগুলো লোহার চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে বের করে ফেলা হতো; কিন্তু এসব নির্যাতনও তাদেরকে দ্বীন হতে বিমুখ করতে পারত না। তাদের মধ্যে কারও মাথার মাঝখানে করাত রেখে তাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলা হতো; কিন্তু এ নির্যাতনও তাদেরকে তাদের দ্বীন হতে ফেরাতে পারত না। আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই দ্বীনকে পরিপূর্ণ করবেন, ফলে একজন উষ্ট্রারোহী সান'আ হতে হাযারা মাউত পর্যন্ত একাই সফর করবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সে ভয় করবে না। তার মেষ পালের ওপর নেকড়ে বাঘের আক্রমণ ছাড়া অন্য কোনো ভয় সে করবে না।

ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, এর দ্বারা আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিনি তার পরিপূর্ণ প্রজ্ঞা দ্বারা মানুষকে তিনি পরিশুদ্ধ করবেন এবং পরীক্ষা করে নেবেন। যাতে করে মন্দ লোকদের মধ্য হতে ভালো লোক বাছাইকৃত হয়ে যায়। কে সংশোধন হবে আর কে হবে না, তাও যাতে প্রকাশ হয়ে যায়। সোনা যেভাবে আগুনে জ্বলে তার সুতীব্র আভা ও সৌন্দর্য প্রকাশ করে, তেমনই করে যেন মানুষকে পরিশুদ্ধ করে নেওয়া যায়। কারণ, নফস তো হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে অন্ধকার ও অজ্ঞ। এই অন্ধকার ও অজ্ঞতা থেকে আলো ও জ্ঞানের পথে আসতে তাদের প্রয়োজন অনেক ত্যাগ ও বিসর্জনের। যদি সে আলোর পথ না দেখে তাহলে সে হবে জাহান্নামের কীট, পক্ষান্তরে বান্দা যদি সোনার মতো নিজেকে জ্বালিয়ে পরিশুদ্ধ করে আসতে পারে তাহলে তাকে অনুমতি দেওয়া হবে জান্নাতে প্রবেশের।

নির্মমতার বিষ্ণু সময় ও আবিসিনিয়ায় হিজরত
তাওহীদপন্থীদের ওপর মুশরিকদের অত্যাচারের মাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে। নতুন মুসলিমদের কাবায় কুরআন পাঠ এমনকি গৃহেও উচ্চস্বরে কুরআন পাঠ করা ছিল অসম্ভব। এমনকি নামাজের মধ্যেও মুসলিম বিভিন্ন ভাবে নির্যাতিত হতেন। দৈহিক অত্যাচার হতে রাসূলও বাদ পড়েননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশদের ক্রমবর্ধমান অত্যাচারে বাধ্য হয়ে সাহাবীগণকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করার অনুমতি প্রদান করলেন।

অমানুষিক নিপীড়ন দেখা দিতে থাকে নবুয়তের চতুর্থ বর্ষের মধ্যবর্তী সময়ে কিংবা শেষদিকে। এরপর দিনের পর দিন মাসের পর মাস এই নির্যাতনের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে। এই ধারাবাহিকতায় নবুয়তের পঞ্চম বর্ষের মাঝামাঝি সময়ে অবতীর্ণ হয় সূরায়ে কাহাফ। মুশরিকদের বিভিন্ন প্রশ্ন ও অভিযোগ খণ্ডনে নাযিল হয় এই সূরা; কিন্তু তিনটি ঘটনা এই সূরায় বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়। যা দ্বারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইশারা ও নির্দেশনা পায় মুসলমানরা। আসহাবে কাহাফের ঘটনা দ্বারা শত্রু ও কুফরের নরককুণ্ড থেকে এবং দ্বীনের মধ্যে ফিতনার আশঙ্কায় আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করে হিজরত করার নির্দেশনা পাওয়া যায়। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَإِذِ اعْتَزَلْتُمُوهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ إِلَّا اللهَ فَأَوْا إِلَى الْكَهْفِ يَنْشُرْ لَكُمْ رَبُّكُمْ مِنْ رَّحْمَتِهِ وَيُهَيِّئُ لَكُمْ مِّنْ أَمْرِكُمْ مِرْفَقًا
আর যখন তোমরা তাদের থেকে আলাদা হয়েছ এবং আল্লাহ ছাড়া যাদের তারা উপাসনা করে তাদের থেকেও, তখন গুহায় আশ্রয় নাও। তাহলে তোমাদের রব তোমাদের জন্য তার রহমত উন্মুক্ত করে দেবেন এবং তোমাদের জন্য তোমাদের জীবনোপকরণের বিষয়টি সহজ করে দেবেন।

এদিকে হযরত খিযির আ. ও হযরত মূসা আ.-এর ঘটনা দ্বারা এ কথা বোঝা যায় যে, প্রকাশ্য সংঘটিত বিষয়াবলী সব সময় সফলতার মূলমন্ত্র হতে পারে না; বরং কখনো কখনো বিপরীত বিষয়াবলীও প্রকাশ্য বিষয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এ ঘটনা দ্বারা এদিকে সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের এই অত্যাচার ও নির্মমতা তাদের সফলতার লক্ষণ নয়, বরং ধৈর্যশীল মুসলমানদের জন্য প্রকৃত সুখ, শান্তি ও সফলতা অপেক্ষা করছে।

আর যুলকারনাইনের ঘটনা দ্বারা এ কথা বোঝানো হচ্ছে, গোটা দুনিয়ার আধিপত্য একমাত্র আল্লাহরই। আল্লাহ যাকে চান তাকে তার নেতৃত্ব দেন। প্রকৃত সফলতা হচ্ছে ঈমানের পথে, কুফরের পথে নয়। আল্লাহ তাআলা বর্তমান সময়ের ইয়াজুয-মাজুযের কবল থেকে যাঁকে চান রেহাই দেন। নির্বাচিত লোকদের মাধ্যমে। পৃথিবীতে বসবাস ও নেতৃত্বের অধিক হকদার একমাত্র আল্লাহ সৎকর্মশীল বান্দারাই।

এরপর সূরা যুমার অবতীর্ণ হয়। এখানেও হিজরতের দিকে ইংগিত দেওয়া হয়। আর ঘোষণা দেওয়া হয় যে, আল্লাহর যমীন এতটা সংকীর্ণ নয়! আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
قُلْ يُعِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً إِنَّمَا يُوَفَّى الصُّبِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
বলো, হে আমার মুমিন বান্দারা, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। যারা এ দুনিয়ায় ভালো কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর যমীন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।

এদিকে, ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ এ ব্যাপারে অবহিত হয়েছেন যে, আবিসিনিয়ার বাদশা নাজ্জাসী একজন নীতিবান ও সৎ বাদশা। কখনো তিনি কাউকে জুলুম করেননি। তাই তিনি মুসলমানদেরকে দ্বীনের মধ্যে ফিতনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কায় আবিসিনিয়া অভিমুখে হিজরতের নির্দেশ দেন। নবুয়তের পঞ্চম বর্ষের রজব মাসে সাহাবীগণের প্রথম দলটি মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। উক্ত দলে বারোজন পুরুষ ও চারজন নারী ছিলেন। উসমান রা. তাদের দলপতি। তার সাথে ছিলেন প্রিয় রাসূলের কন্যা রুকাইয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদের সম্পর্কে বলেন,
إنهما أول بيت هاجر في سبيل الله بعد إبراهيم ولوط
ইবরাহীম ও লুত আ.-এর পর এরাই হচ্ছেন প্রথম পরিবার, যারা আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করেন।

হিজরতের প্রাক্কালে আমাদের আম্মাজান হযরত খাদীজা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কন্যা রুকাইয়্যা রা. ও জামাতা উসমান রা.-কে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানান। অশ্রুফোঁটা বয়ে যায় তার দু-চোখ বেয়ে। তারপরও তিনি এমন মর্মবিদারী মুহূর্তে ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। নবীজীর মনে সাহস জোগান এবং সুন্দর ও সফল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে পালন করে যান অগ্রণী ভূমিকা।

বয়কট ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বন্দী জীবন
মুসা বিন উকবা ও ইবনে ইসহাক ইমাম যুহরী ও আসওয়াদ-এর বরাত দিয়ে বলেন, এ সময়ে ইসলাম ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর কুরাইশের ক্রোধ দিন দিন বেড়েই চলছিল। তারা দেখছিল যে তাদের সকল চেষ্টা সত্ত্বেও মক্কা শহরেও ভেতরে ভেতরে ইসলাম প্রসার লাভ করছিল। বাইরের গোত্রের লোকও একের পর এক মুসলমান হচ্ছিল। তারপর এ ব্যাপারটি শুধু আরব দেশেই সীমিত ছিল না। বরঞ্চ আবিসিনিয়া পর্যন্ত তার মূল বিস্তার লাভ করে। নাজ্জাশী প্রকাশ্যে মুসলমানদের সমর্থক হয়ে পড়েন। সেখান থেকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকটে প্রতিনিধি দল আসতে থাকে। উপরন্তু তাদের ক্রোধাগ্নিতে এ জিনিস ঘৃত নিক্ষেপ করছিল যে, হযরত হামযা রা. ও হযরত উমর রা.-এর মতো বীর ও প্রভাবশালী সর্দারগণের মুসলমানদের দলে শামিল হওয়ার ফলে ওসব মুসলমানদের হিম্মৎ সাহস বেড়ে যায়—যাঁরা হিজরতে আবিসিনিয়ার পর মক্কায় রয়ে গিয়েছিলেন। এ কারণসমূহ একত্রে মিলে অবশেষে কুরাইশের জাহেলিয়াতকে এতটা উত্তেজিত করে দেয় যে, তারা সর্বসম্মতিক্রমে একটি দলীল রচনা করে যাতে আল্লাহর কসম করে এ শপথ গ্রহণ করে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সাথে মেলামেশা, বিয়ে-শাদি, কথাবার্তা, বেচাকেনা প্রভৃতির কোনো সম্পর্ক থাকবে না। কুরাইশের সকল পরিবারের কর্মকর্তা এ দলীলের সত্যায়ন করে এবং তা কাবা ঘরে লটকিয়ে দেয়।

চুক্তিতে স্থির করা হলো যে, বনু হাশিম যতক্ষণ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমাদের হাতে সমর্পন না করবে এবং তাকে হত্যা করার অধিকার না দেবে, ততক্ষণ কেউ তাদের সাথে মেলা-মেশা, বেচা-কেনা, বিয়ে শাদী, লেনদেন, কোনো খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য সরবরাহ করতে পারবে না। এবার বনী হাশিমের সামনে মাত্র দু-টি পথই খোলা রইল—হয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কাফেরদের হাতে সমর্পণ করতে হবে, নচেত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের ফলে বন্দী জীবনের দুঃখ-মুসিবত সহ্য করার জন্যে তৈরি হতে হবে।

গোত্রীয় ব্যবস্থায় এ সিদ্ধান্তটা ছিল অত্যন্ত মারাত্মক এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ। সমগ্র বনু হাশিম অসহায় অবস্থায় শেষক্ত ধারা মেনে নিয়ে 'শিয়াবে আবু তালেব' উপত্যকায় আটক হয়ে গেল। এ গিরি-দুর্গের মধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহ বনু হাশিমকে দীর্ঘ তিন বছরকাল মহা দূর্গতির মধ্যে মানবেতর জীবন কাটাতে হলো। এসময় কখনো কখনো তাদের গাছের পাতা ও শুকনো চামড়া পর্যন্ত খেতে হতো। যখন ক্ষুধার জ্বালায় নিষ্পাপ শিশুরা চিৎকার করত, তখন কুরাইশরা আনন্দে উল্লাস করত। কখনো কোনো হৃদয়বান ব্যক্তির মনে করুণার উদ্রেক হলে হয়তো লুকিয়ে তিনি কিছু খাবার পাঠিয়ে দিতেন। সমগ্র বনু হাশিম গোত্র একমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কারণে এই করুন পরিস্থিতির শিকার হলো। এভাবে ক্রমাগত তিন বছরকাল বনু হাশিম গোত্র ধৈর্যের অগ্নি পরীক্ষা প্রদান করল।

এ সমগ্র কালব্যাপী কুরাইশের অবরোধ অত্যন্ত কঠোরতার সাথে বিদ্যমান থাকে। তাদেরকে এমনভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল যে, পানাহারের দ্রব্যাদি তাদের নিকটে পৌঁছার সকল পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মূসা বিন উকবা বলেন, বাইরে কোনো ব্যবসায়ী মক্কায় আগমন করলে কুরাইশের লোকেরা তাড়াতাড়ি তাদের সমুদয় পণ্যদ্রব্য খরিদ করে নিত যাতে অবরুদ্ধ ব্যক্তিগণ কিছু খরিদ করতে না পারেন। আবু লাহাব ব্যবসায়ীদের বলত, তাদের নিকটে এমন চড়া মূল্য চাও যেন তারা কিনতে না পারে, তারপর আমি সেসব তোমাদের নিকট থেকে খরিদ করে নেব এবং তোমাদের কোনো লোকসান হতে দেব না। ইবনে সাআদ এবং বায়হাকী বলেন, অবরুদ্ধদের অবস্থা এমন হয়েছিল যে, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় শিশুদের কান্না শিয়াবে আবি তালেবের বাইরে শোনা যেত। এরা শুধু হজের সময় বের হতেন এবং দ্বিতীয় হজ পর্যন্ত নিজেদের মহল্লায় আবদ্ধ থাকতেন।

এ সময়ে শুধু হযরত খাদীজা রা.-এর ভাইপো হাকিম বিন জুযাম এবং নাদলা বিন হাশিম বিন আবদে মানাফের ভাইপো হিশাম বিন আমর আল আমেরী গোপনে আত্মীয়তার হক আদায় করতে থাকেন।

একবার আবু জাহেল হাকিম বিন জুযামকে তার ফুফুর নিকটে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যাবার সময় ধরে ফেলে এবং বলে, 'বনী হাশিমের জন্যে খাদ্য নিয়ে যাচ্ছ? আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তোমাকে ছাড়ব না যতক্ষণ না সারা মক্কায় তোমাকে লাঞ্ছিত-অপমানিত করে দিয়েছি।' এমন সময় আবুল বুখতারী বিন হিশাম (বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যা বিন কুসাই এর লোক এবং হযরত খাদীজার রা. নিকট আত্মীয়) সেখানে পৌঁছলেন এবং জিজ্ঞেস করেন, 'ব্যাপার কী? আবু জাহেল বলে, এ বনী হাশিমের জন্যে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যাচ্ছে।' তিনি বললেন, 'ছেড়ে দাও একে। সে তার ফুফুর খাদ্যদ্রব্য তার কাছে নিয়ে যাচ্ছে। তুমি কি তার নিজের জিনিস তার কাছে যেতে দেবে না?' একথা আবু জাহেল মেনে না নিলে উভয়ের মধ্যে ঝগড়া ও মারামারি শুরু হয়।

এক পর্যায়ে আবুল বুখতারী উটের চোয়ালের হাড় দিয়ে আবু জাহলের মাথায় আঘাত করলে মাথা ফেটে যায়। হযরত হামযা রা. এ ঘটনা লক্ষ করছিলেন। এতে উভয় মুশরিক কাফের লজ্জিত হয়ে পারস্পরিক বিবাদ বন্ধ করে দেয়—যাতে বনী হাশিম আনন্দিত না হয়। হিশাম বিন আমর আল আমেরী সম্পর্কে ইবনে ইসহাকের বর্ণনা ইবনে হিশাম উদ্ধৃত করে বলেন যে, তিনিও চুপে চুপে বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিবের সাথে আত্মীয় সুলভ সদাচরণ করতে থাকেন। তা করার পন্থা এ ছিল যে, উটের পিঠে রাতের বেলায় পণ্যদ্রব্য বোঝাই করে শিয়াবে আবি তালেবের ভেতরে হাঁকিয়ে দেওয়া হতো। অবরুদ্ধ লোকজন উটকে ধরে পণ্যদ্রব্য নামিয়ে নিয়ে তাকে বাইরে বের করে দিত। কুরাইশের লোকজন তাকেও ধমক দিত। কিন্তু আবু সুফিয়ান বলেন, তাকে ছেড়ে দাও। সে তো আত্মীয়ের প্রতি দয়া প্রদর্শনের কাজ করছে।

মক্কার কাফেরদের হঠকারী সরদারগণ যদিও সাময়িক রাগের বশবর্তী হয়ে শহরের অন্যান্য পরিবারগুলো থেকে দু-টি বৃহৎ পরিবারকে অবরুদ্ধ করে রাখে, কিন্তু মক্কায় এমন কোনো পরিবার ছিল না যাদের আত্মীয়তা বনী হাশিম এবং বনী আল মুত্তালিবের সাথে ছিল না। এ জন্যে প্রথম থেকেই অনেকের কাছে আপন ভাই বেরাদরের অবরোধ অসহনীয় ছিল। এ অবরোধ যতই দীর্ঘায়িত হতে থাকে, ততই এর বিরুদ্ধে তাদের মন তিক্ততর হতে থাকে। কারণ বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিব অনাহারের শিকার হয়ে পড়ে। তাদের শিশুদের কান্না ও বিলাপের আওয়ায পার্শ্ববর্তী মহল্লাগুলোতে শুনা যেত। অন্যান্য পরিবারে তাদের আত্মীয়-স্বজন যারা পাশেই অবস্থান করত, এ সব আর্তনাদ হাহাকার শুনে অস্থির হয়ে পড়তো। মূসা বিন ওকবা বলেন, তৃতীয় বছরের শেষে বনী আবদে মানাফ, বনী কুসাই এবং যাদের বিয়ে-শাদী বনী হাশিমে হয়েছিল একে অপরকে তিরস্কার করতে থাকে এবং পরিষ্কার বলতে থাকে—এ আত্মীয়তা বন্ধ করার অপরাধ যা আমরা করেছি। এ আচরণ দ্বরা আমরা পারিবারিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছি।

অবশেষে হিশাম বিন আমর আল আমেরী এ কাজের দায়িত্ব নিয়ে বলেন যে, এ অবরোধের অবসান করেই তিনি ছাড়বেন। প্রথম তিনি বনী মখযুমের প্রধান যুবাইর বিন আবি উমাইয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন যিনি ছিলেন হযরত উম্মে সালমা রা.-এর ভাই এবং রাসূলের ফুফু আতেকা বিনতে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র। তিনি বলেন, হে যুবাইর! তুমি কি এতে আনন্দ উপভোগ কর যে, তুমি নিশ্চিন্তে খাওয়া দাওয়া করবে, বিয়ে-শাদী করবে আর তোমার নানার দিকের লোকেরা অনাহারে মারা যাবে? তাদের সাথে লেনদেন ও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হবে? খোদার কসম করে বলছি, এ অবস্থা যদি আবু জাহলের হতো এবং তুমি যদি তার নানার পক্ষের লোকদের সাথে সে ব্যবহার করতে বলতে-যা সে তোমার নানার পক্ষের লোকদের সাথে করতে তোমাকে বলেছে, তাহলে সে তো কখনোই করত না।

যুবাইর বলেন, হিশাম, আমি একা কি করতে পারি? আরও কেউ যদি আমাদের সহযোগিতা করত তাহলে অবরোধের দলীল ছিন্ন না করে ছাড়তাম না। হিশাম বলেন, একজন তো আমি রয়েছি। যুবাইর বলেন, আর একজন তালাশ করো। তারপর হিশাম বনী নওফল বিন আবদে মানাফের সরদার মুতয়িম বিন আদীর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। বললেন, হে মুতয়িম, তুমি কি এতে খুশি যে, বনী আবদে মানাফের দু-টি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে আর তুমি তামাশা দেখতে থাকবে? তাদের ব্যাপারে তুমি যদি কুরাইশের সহযোগিতা কর এবং তাদেরকে শেষ করার জন্যে এভাবে কুরাইশকে ছেড়ে দাও, তাহলে শীঘ্রই এমন একদিন আসবে যেদিন এ অবস্থা তোমারও হবে। তিনি বললেন, আমি একা কী করতে পারি? আর কাউকে সাথে নাও। হিশাম বলেন, একজন তো আমি, দ্বিতীয় জন যুবাইর বিন আবি উমাইয়া। মুতয়িম বললেন, একজন তালাশ করো।

তারপর হিশাম বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যার সরদার আবুল বুখতারী আস বিন হাশিমের সাথে সাক্ষাৎ করেন তার কাছেও সে কথাই বলেন যা মুতয়িম বলেছিলেন। তিনি বলেন, আর কি কেউ আছে, যে আমাদের সাথে থাকবে? হিশাম বলেন, আমি, যুবাইর বিন আবি উমাইয়া এবং মুতয়িম বিন আদী। তিনি বললেন, ব্যস, আর একজন দেখ। অতএব, হিশাম যাময়া বিন আল আসওয়াদ বিন মুত্তালিবের সাথে আলাপ করেন। তিনি বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যার সরদারদের অন্যতম ছিলেন, তাকেও এ কাজে সম্মত করা হলো।

অতঃপর এ পাঁচজন (হিশাম, যুবাইর, মুতয়িম, আবুল বাখাতারী, যাময়া) মক্কার উচ্চভূমি হাজুনে একত্রে মিলিত হন এবং স্থির করেন কীভাবে অবরোধের দলীল নষ্ট করার চেষ্টা করা যায়। যুবাইর বলেন, আমি কথা শুরু করব এবং আপনারা আমাকে সমর্থন করবেন। দ্বিতীয় দিন সকালে তারা কুরাইশের বৈঠকের দিকে যান এবং যুবাইর কাবায় সাতবার তাওয়াফ করে মক্কার লোকদের সম্বোধন করে বলেন, হে মক্কাবাসী, আমরা খেয়ে-পরে থাকব আর বনী হিশাম ধ্বংস হয়ে যাবে? না তাদের থেকে কিছু কেনা যায় আর না তাদের কাছে কিছু বিক্রি করা যায়। খোদার কসম, আমি কিছুতেই বসব না, যতক্ষণ না অবরোধের দলীল ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।

আবু জাহেল উঠে বলে, তুমি মিথ্যা বলেছে, তা কখনো ছিঁড়ে ফেলা হবে না। যামআ বলেন, খোদার কসম, তুমি সবচেয়ে মিথ্যাবাদী। যখন এ দলীল লেখা হয় তখনো আমরা রাজী ছিলাম না। আবুল বুখতারী তার কথায় সমর্থন দিয়ে বলেন, যামআ ঠিক বলেছে। ওই দলীলে যা কিছু লেখা হয়েছে তাতে আমরা কিছুতেই রাজি ছিলাম না। আর আমরা স্বীকারও করি না। মুতয়িম বিন আদী বলেন, তোমরা উভয়ে সত্য কথা বলেছ। আর মিথ্যুক সে, অন্য কথা বলছে সে। আমরা আল্লাহর সামনে এ দলীল এবং তার মধ্যে যা লেখা আছে তার দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত ঘোষণা করছি। হিশাম বিন আমরও তা সমর্থন করেন। আবু জাহেল বলে, এ এক ষড়যন্ত্র—যা রাতে কোনো স্থানে বসে করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য এই সময়ে খাদীজা রা. ছিলেন ইসলামের ব্যাপারে সত্য ও সঠিক উজীর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল বিপদ-আপদে তার কাছে মনের কথা বলতেন, অভিযোগ করতেন।

পরে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত হলো। লোকেরা যখন চুক্তিটাকে কা'বার প্রাচীর থেকে নামাল তখন অবাক হয়ে দেখল যে, সমগ্র চুক্তিটাকে উইঁপোকায় খেয়ে ফেলেছে। কেবল 'বিইসমিকা আল্লাহুম্মা' (আল্লাহর নামে লেখা হলো) কথাটি বাকি আছে। নবুয়তের দশম বছর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ বনু হাশিম গোত্র বন্দীদশা থেকে মুক্তিলাভ করলেন।

শেষ হলো অবরোধ। উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা. ধৈর্যের সুফল নিয়ে মুক্তি পেলেন। একই বছর কিছুদিন পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন খাদীজা রা.। প্রিয় নবীজী তার চিকিৎসা ও সেবা শুশ্রূষায় সক্রিয় হন। প্রিয়তমাকে সুস্থ করে তুলতে তার আগ্রহ ও প্রয়াসের কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু তবুও তাকে ধরে রাখা গেল না। বিবাহিত জীবনের পঁচিশ বছর অতিবাহিত করে তিনি সাড়া দিলেন জান্নাতী আহ্বানে। যেই জান্নাত ধৈর্যশীলদের প্রতিদানস্থল। আল্লাহ তার সবরের উত্তম প্রতিদান দেন। যে প্রতিদানের কোনো তুলনা নেই।

আল্লাহ তাআলা সালাম পৌঁছিয়েছেন খাদীজা রা.-কে
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, একদিন জিবরাঈল আ.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলেন। পাশে বসা ছিলে খাদীজা রা.। জিবরাঈল বললেন, আল্লাহ তাআলা খাদীজাকে সালাম পৌঁছিয়েছেন। এ কথা শুনে হযরত খাদীজা রা. বললেন, আল্লাহ তাআলাই তো শান্তিদাতা। জিবরীলের প্রতি সালাম এবং আপনার ওপরও আল্লাহর সালাম, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।

কর্মের প্রতিফল
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জিবরাঈল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হাযির হয়ে বললেন:
يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذِهِ خَدِيجَةُ قَدْ أَتَتْ مَعَهَا إِنَاءٌ فِيْهِ إِدَامٌ أَوْ طَعَامٌ أَوْ شَرَابٌ فَإِذَا هِيَ أَتَتُكَ فَاقْرَأُ عَلَيْهَا السَّلَامَ مِنْ رَبِّهَا وَمِنِي وَبَشِّرُهَا بِبَيْتٍ فِي الْجَنَّةِ مِنْ قَصَبِ لَا صَخَبَ فِيهِ وَلَا نَصَبَ
হে আল্লাহর রাসূল, ওই যে খাদীজা রা. একটি পাত্র হাতে নিয়ে আসছেন। ওই পাত্রে তরকারি, অথবা খাদ্যদ্রব্য অথবা পানীয় ছিল। যখন তিনি পৌঁছে যাবেন তখন তাকে তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এবং আমার পক্ষ থেকেও সালাম জানাবেন আর তাকে জান্নাতের এমন একটি ভবনের খোশ খবর দিবেন—যার অভ্যন্তর ভাগ ফাঁকা-মোতি দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে থাকবে না কোনো প্রকার শোরগোল; কোনো প্রকার দুঃখ-ক্লেশ।

বেদনাবিধুর বছর
মুসলমানরা শিয়াব থেকে ফিরে গেল তাদের পুরনো বসত ভিটায়। দশটি বছর তাদের যন্ত্রণাদগ্ধতার কিছুটা শিথিল হলো; কিন্তু একই সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয়তমা সহধর্মিণী হযরত খাদীজা রা. ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় চাচা আবু তালিবের ইন্তেকালের ফলে এটাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুঃখ ও শোকের বছর হিসেবে গণ্য করা হয়। সব সময় সঙ্গদানকারী ও সাহায্যকারী এই দুই ব্যক্তিত্বের বিয়োগে সর্বদা তিনি বিষণ্ণ ও চিন্তিত থাকতেন।

খাদীজা রা.-এর অবর্তমানে কুরাইশদের একটি বাধার প্রাচীর ভেঙে গেল। আরও নিষ্ঠুর, আরও অত্যাচারী হয়ে উঠল তারা। অবাধ নির্যাতন চালাতে লাগল। রাসূলের দাম্পত্য বিরহ ও শোকও কম ছিল না। ডানা হারালে উড়ন্ত পাখির যে অবস্থা হয়, তিনিও তেমন অবস্থার শিকার হলেন। তার ইন্তেকালের পর এমন একটি সময় গেছে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রয়াত স্ত্রীর প্রশংসা না করে ঘর থেকে বের হতেন না।

দাম্পত্য জীবনে আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব ও সংকটকালে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা. এক আলোর মিনার হয়ে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন রাসূলের সংকটকালের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও সঙ্গী। তিনি নবীজিকে আশা ও সান্ত্বনার বাণী শোনাতেন। তার আনীত দ্বীনের প্রতি তিনি-ই প্রথম ঈমান এনেছিলেন। আর তিনি ছিলেন তার প্রথম সহধর্মিণী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পঞ্চাশ বছর বয়সে খাদিজা রা. ইন্তেকাল করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল পঁয়ষট্টি বছরেরও বেশি। তার জীবনের বিস্তারিত আখ্যান কলমে লিপিবন্ধ করা কি সম্ভব?

এমনই হয়ে থাকে বিশ্বস্ততা
খাদীজা রা.-এর ইন্তেকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভীষণ শোকসন্তপ্ত হয়ে পড়েন। কতই না ধৈর্যশীলা ও নিষ্ঠাবতী ছিলেন তিনি! সর্বদা প্রীতি-ভালোবাসায় বিমুগ্ধ রাখতেন রাসূলকে। দাম্পত্যে পুরোটা সময় দ্বীনের তরে অকাতরে বিলিয়ে অমর হয়ে আছেন তিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কী করে ভুলতে পারেন! তার সম্পর্কে তিনি যে প্রশংসাবাক্য উচ্চারণ করেছেন, তা গুণগুলো কি আমাদের কলম যথাযথভাবে তুলে ধরতে সক্ষম? খাদীজা রা.-এর প্রশংসা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
كَمَلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكْمُلُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا آسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ وَمَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَخَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ وَإِنَّ فَضْلَ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الشَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
পুরুষের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতা অর্জন করেছেন; কিন্তু মহিলাদের মধ্যে ফির'আউনের স্ত্রী আসিয়া, ইমরানের কন্যা মারইয়াম এবং খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ ব্যতীত আর কেউ পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়নি। তবে 'আয়েশার মর্যাদা সব মহিলার ওপর এমন, যেমন সারীদের (গোশতের সুরুয়ায় ভিজা রুটির) মর্যাদা সকল প্রকার খাদ্যের উপর।

এই হাদীস থেকে বিদগ্ধ কতেক আলেম একটি সূক্ষ্ম বিষয়ের অবতারণা করেছেন। আর তা হচ্ছে, এই তিনজন নারীর সবাই আল্লাহর প্রেরিত কোনো-না-কোনো নবীর অভিভাবকত্ব করেছেন, লালন-পালন করেছেন। তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করেছেন এবং ঈমান এনেছেন। তম্মধ্যে আসিয়া লালন-পালন করেছেন হযরত মূসা আ.-কে। তাকে সত্য নবী হিসেবে গ্রহণ করে অত্যন্ত মনোলোভা আচরণ করেছেন। আর মারইয়াম লালন-পালন করেছেন হযরত ঈসা আ.-কে। যখন তিনি নবী হন তখন তাকে সত্যবাদীরূপে মেনে নেন। আর খাদীজা রা. নিজের সমুদয় জান, মাল, ধন-সম্পদ সব কিছু বিলিয়ে দেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরণ তলে। রাসূলের কাছে প্রথম ওহী এলে তিনিই প্রথম তাকে সত্যবাদী নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পূর্বে কোনো নারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি এবং তার জীবদ্দশায় কাউকে বিয়ে করেননি। এ মর্মে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদীজা রা.-এর জীবদ্দশায় কাউকে বিয়ে করেননি। '

এ শুধু প্রেম নয়, নিছক স্মৃতিপূর্ণও নয়; এ এক অনির্বচনীয় শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমবোধ-যা পার্থিব জীবন অতিক্রম করে চারিত্রিক জীবনকেও সুরভিত করে। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা হযরত খাদীজাতুল কুবরা রা. সেই চিরন্তন প্রেম, শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমবোধের একটি গৌরবান্বিত নাম। উম্মতের তিনি মহীয়সী জননী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময় তার গুণ গাইতেন এবং কারও মুখে তার প্রশংসা শুনতে ভালোবাসতেন। কিংবা তাদের দাম্পত্য জীবনের সেই মধুর স্মৃতিকথা বলতেন।

আলী রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ কথা বলতে শুনেছি যে, সমগ্র নারীদের মধ্যে ইমরানের কন্যা মারইয়াম হলেন সর্বোত্তম আর নারীদের সেরা হলেন খাদীজা রা.। আবদুল্লাহ ইবনুল আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে এসেছে, 'জান্নাতের অধিকারী নারীদের মধ্যে খাদীজা, ফাতিমা, মারইয়াম ও আসিয়া সর্বোত্তম।'

আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সারা বিশ্বের নারীদের মধ্যে মারইয়াম বিনতে ইমরান, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া তোমার জন্য যথেষ্ট।

আবদুল্লাহ ইবনুল আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মারইয়াম বিনতে ইমরানের পর জান্নাতীদের নেত্রী হচ্ছে ফাতিমা, খাদীজা আসিয়া।

পূতঃপবিত্রা পুণ্যময়ী হযরত খাদীজা রা.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী পরিমাণ ভালোবাসতেন তার একটি উপমা আমরা দেখতে পাই গাযওয়ায়ে বদরে কুবরার সময়। বদরের যুদ্ধে অন্যান্যদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামাতা আবুল আসও গ্রেফতার হয়। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যা যায়নাব রা. (যিনি তখন মক্কায় ছিলেন) তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে যে সব বস্তু প্রেরণ করেন তম্মধ্যে সেই হারটিও ছিল-যা হযরত খাদীজা রা. যায়নাব রা.-কে আবুল আসের সাথে বিবাহ দেওয়ার সময় তাকে প্রদান করেছিলেন। সেই হারটি দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হৃদয় কোমল হয়ে ওঠে। ফলে তিনি অনুরোধের স্বরে সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, তোমরা সমীচীন মনে করলে যায়নাবের বন্দীকে পণ ব্যতীতই মুক্তি দিতে পার এবং তার প্রেরিত মুক্তিপণগুলো তাকে ফেরত দিতে পার। সকল সাহাবী দ্রুত এতে সম্মত হলেন। আবুল আসকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্তি দেওয়া হয়। কারণ, খাদীজা মুমিনদের মা। সমগ্র মুসলিম নর-নারীর কাঁধে রয়েছে তার ঋণ। আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন।

মহৎ কৃতিত্ব
উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা.-এর প্রাধান্যতা ও অগ্রগামিতার বিষয়ে বলেন,
✓ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম হযরত খাদীজাকেই বিয়ে করেন। বিশুদ্ধ বর্ণনামতে, খাদীজাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর প্রথম ঈমান আনেন।

খাদীজা রা.-এর প্রাধান্যতা ও অগ্রগামিতা বিষয়ে আরও আছে:
✓ প্রথম তিনিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে একসাথে নামায পড়েন।
✓ প্রথম তার গর্ভেই রাসূলের সন্তান জন্ম নেয়।
✓ রাসূলের সহধর্মিণীগণের মধ্যে তাকেই প্রথম জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়।
✓ প্রথম তাকেই আল্লাহ তাআলা সালাম পৌঁছান।
✓ মুমিনদের মধ্যে তিনিই প্রথম চিরসত্য দ্বীনের স্বীকৃতি দেন।
✓ রাসূলের স্ত্রীগণের মধ্যে তিনিই প্রথম ইন্তেকাল করেন।
✓ মক্কায় তাকেই প্রথম রাসূলুল্লাহ কবরে দাফন করেন।
✓ ইমাম যুহরী রহ. বলেন, খাদীজা রা. প্রথম আল্লাহ তাআলার ওপর ঈমান আনেন।

খাদীজা রা.-এর প্রতি আয়েশা রা.-এর ঈর্ষা
হযরত খাদীজা রা.-এর ইন্তেকালের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সাওদা বিনতে যামআ রা.-কে বিয়ে করেন। এরপর বিয়ে করেন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-কে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে সব সময় হযরত খাদীজা রা.-এর স্তুতিবাণী ও প্রশংসাবাক্য শুনে তাকে ভীষণ ঈর্ষা হতে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর। আর এটা হতো রাসূলকে তার ভালোবাসার আধিক্যের কারণে।

উম্মুল মুমিনীন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বলেন, আমি খাদীজা রা.-কে দেখিনি। তা সত্ত্বেও তাকে যে পরিমাণ ঈর্ষা করতাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য কোনো স্ত্রীকে সে পরিমাণ ঈর্ষা করিনি। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব বেশি বেশি তাকে স্মরণ করতেন। তিনি যখনই কোনো ছাগল জবেহ করতেন, তার কিছু অংশ কেটে খাদীজার বান্ধবীদের কাছে পাঠাতেন। আমি যদি বলতাম, দুনিয়াতে যেন খাদীজা ছাড়া আর কোনো নারী নেই। তিনি বলতেন, খাদীজা এমন ছিল.. তার থেকেই আমি সন্তান লাভ করেছি।

উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বলেন, খাদীজা রা.-এর বোন হালা বিনতে খুওয়াইলিদ একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য অনুমতি চাইলেন। (দুই বোনের গলার স্বর ও অনুমতি চাওয়ার ভঙ্গি একই রকম ছিল বলে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদীজার অনুমতি চাওয়ার কথা মনে করে হতচকিত হয়ে ওঠেন। তারপর (স্বাভাবিক হয়ে) তিনি বলে উঠলেন, ইয়া আল্লাহ, এ তো দেখছি হালা। আয়েশা রা. বলেন, এতে আমার ভারি ঈর্ষা হলো। আমি বললাম, কুরাইশ বুড়ীদের এক লাল গালের বুড়ী, যে শেষ হয়ে গেছে কতকাল আগে, তার আবার কী স্মরণ করেন! আল্লাহ তো তার চাইতেও উত্তম স্ত্রী দান করেছেন।

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা করিনি যতটুকু খাদীজা রা.-এর প্রতি করেছি। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার কথা বার বার আলোচনা করতে শুনেছি, অথচ আমাকে বিবাহ করার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন। খাদীজা রা.-কে জান্নাতে মণি-মুক্তা খচিত একটি প্রাসাদের খোশ খবর দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা রাসূলকে আদেশ করেন। কোনো দিন বকরি জবাই হলে খাদীজা রা.-এর বান্ধবীদের নিকট তাদের প্রত্যেকের দরকার মতো গোশত উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন। '

আয়েশা রা. আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার খাদীজার কথা আলোচনা করলেন। আমি বললাম, তিনি তো একজন বৃদ্ধা। তাছাড়া এমন, এমন..। আল্লাহ তার পরিবর্তে উত্তম নারী আপনাকে দান করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তার চেয়ে উত্তম নারী আমাকে দান করেননি। মানুষ যখন আমাকে মানতে অস্বীকার করেছে, তখন সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে। মানুষ যখন বঞ্চিত করেছে, তখন সে তার সম্পদে আমাকে অংশীদার করেছে। আল্লাহ তার সন্তান আমাকে দান করেছেন এবং অন্যদের সন্তান থেকে বঞ্চিত করেছেন। আমি বললাম, আমি আর কখনো তাকে নিয়ে আপনাকে তিরস্কার করব না।

আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, আয়েশা রা. বলেন, খাদীজার মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গৃহে কোনো ছাগল জবেহ হলেই বলতেন, কিছু গোশত তোমরা খাদীজার বান্ধবীদের বাড়িতে পাঠাও। একদিন তিনি খাদীজার আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, আমি খাদীজার বান্ধবীদের ভালোবাসি।

আয়েশা রা. আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদীজার কথা উঠলেই তার কিছু প্রশংসা না করে বিরত হতেন না। তিনি খাদীজার কিছু আলাচনা না করে প্রতিদিন ঘর থেকে বরে হতেন না।

একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে খাদীজার আলোচনা শুনে আয়েশা রা. অনুতপ্ত হয়ে মনে মনে বলেন, হে আল্লাহ, যদি তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাগ দূর করেন দাও, তাহলে আর কখনো তার সম্পর্কে কোনো মন্দ কথা উচ্চারণ করব না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রা.-এর মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন, তুমি এমন কথা কী করে বলতে পার? মানুষ যখন আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে তখন সে আশ্রয় দিয়েছে। আরেকবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রা.-কে বলেন, আল্লাহ আমার অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছন।

যখন তাওহীদের বাণী প্রচারের এক চরম কঠিন মূহূর্ত ছিল, তখন খাদীজা রা.-এর মতো বিশ্বস্ত, খেদমতকারিণী, বুদ্ধিমতি, বিচক্ষণ, দুঃসাহসী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্না একজন জীবনসঙ্গিনীর বিয়োগ ব্যথা কত বড় শোক ও বেদনার, উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে তা সহজেই অনুমেয়। উম্মুল মুমিনীন হযরত সায়্যিদা খাদীজা রা.-এর মহৎ কীর্তি ও অনুপম গুণাবলি হতে আমাদের মা-বোন-কন্যাদের রয়েছে অপূর্ব শিক্ষার সমাহার। তার মর্যাদা, মহত্ত্ব ও গুরুত্ব অত্যধিক।

পরিশেষে আমাদের আম্মাজানের পক্ষে কুরআনে কারীমের দু-টি আয়াত তিলাওয়াত করে আলোচনা ইতি টানতে পারি। আল্লাহ তাআল ইরশাদ করেন,
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّتٍ وَ نَهَرٍ فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِيكٍ مُّقْتَدِرٍ
নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণাধারার মধ্যে। যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতির নিকটে।

আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

টিকাঃ
* নিসাউ আহলিল বাইত, পৃ. ৬৭।
* সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৮১৭; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩৫।
* সিয়ারে আ'লামিন নুবালা, ২/১০৯-১১১; ঈষৎ সংক্ষেপিত।
* সিয়ারে আ'লামিন নুবালা, ২/১১১।
* নিসাউ আহলিল বাইত, ১৬-১৯; ঈষৎ সংক্ষেপিত।
* তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ১/১২৯; ওয়াকেদীর সূত্রে বর্ণিত। এর বর্ণনাটির সূত্র দুর্বল। এছাড়া ওয়াকেদী হচ্ছেন 'মাতরূক'। * গাযালী রহ. প্রণীত সীরাতে ইবনে হিশাম, ৮৮-৮৯।
১০ এক উকিয়া চল্লিশ দিরহারেম সমান।
১১ আল ইসাবাহ, হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী, ৪/২৭৪।
১২ সহীহ, বুখারী, ১৫৮৩; সহীহ, মুসলিম, ১৩৩৩।
১৩ সুনান, আবু দাঊদ, ১১৩; মুসতাদরাকে হাকিম, ১/৪৫৮।
১৪ নিসাউ আহলিল বাইত, ৩০-৩১; ঈষৎ সংক্ষেপিত।
১৫ নিসাউ আহলিল বাইত, ৩১-৩২।
১৬ বায়হাকী প্রণীত দালাইলুন নুবুওয়াহ, ২/৭০।
১৭ তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত, ১/২৬।
১৮ সরা আল-আহযাব, ৩৩:৪০।
১৯ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, ৩৮২৯; সহীহ, মুসলিম, ৩৪০; মুসনাদ, আহমাদ, ১৩৭২৭।
২০ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, ৪; সহীহ, মুসলিম, ১৬০।
২১ সূরা আলাক, ৯৬:১-৫।
২২ সূরা আলাক, ৯৬:১-৩।
২৩ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৬০।
২৪ উসদুল গাবাহ, ৭/৭৮।
২৫ ঊদাতুল হিজাব, মুহাম্মাদ ইসমাঈল, ২/৫৩৯।
২৬ সূরা আহযাব, ৩৩:৩৭।
২৭ শিফাউল গারাম বিআখবারিল বালাদিল হারাম, ১/৪৩৮।
২৮ সহীহ, বুখারী, ১০৯০; সহীহ, মুসলিম, ৬৮৫।
২৯ উয়ুনুল আসার, ১/১১৬; আসসীরাতুল হালাবিয়া, ১/৪৩৬।
৩০ সূরা শুআরা, ৪২:২১৪।
৩১ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, ২৭৫৩; সহীহ, মুসলিম, ২০৪; সুনান, তিরমিযী, ৩১৮৫।
৩২ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৪০; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৭৯৪।
৩৩ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৮৫৬।
৩৪ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৮৫২।
৩৫ যাদুল মাআদ, ৩/১৮।
৩৬ সূরা কাহাফ, ১৮:১৬।
৩৭ সূরা যুমার, ৩৯:১০।
৩৮ ইবনে হিশাম, ১/২১৩।
৩৯ মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৯/৮৪; রাহমাতুল লিল আলামীন, ১/৬১; আররাহীকুল মাখতুম হতে উদ্ধৃত, পৃ. ৯১-৯২।
৪০ নিসাউন মুবাশশিরাত বিল জান্নাহ, ২৬।
৪১ সুনান, নাসায়ী, হাদীস নং ২৫৪; এর সনদ হাসান।
৪২ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৮২০; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩২।
৪৩ এই বাড়তি অংশটি কুররাহ ইবনে ইয়াস হতে মারফু রেওয়ায়াত করেছেন ইবনে মারদুবিয়া। সনদটি সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন ইবনে কাসীর রহ.; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১২৯।
৪৪ মুত্তাফাকুন আলাইহি। সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৪১১; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩৩।
৪৫ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩৬।
৪৬ মুত্তাফাকুন আলাইহি। সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৪৩২; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩০।
৪৭ মুসনাদ, আহমাদ, ১/২৯৩; তাবারানী, হাদীস নং ১১৯২৮; এর সনদ সহীহ।
৪৮ সুনান, আত-তিরমিযী: হাদীস নং ৩৮৭৮, মুসনাদ, আহমাদ: ৩/১৩৫, হাকিম: ৩/১৫৭; এর সনদ সহীহ।
৪৯ তাবারানী, হাদীস নং ১২১৭৯; এর সনদ হাসান।
৫০ নিসাউন মুবাশশিরাতুন বিলজান্নাহ, ৩১।
৫১ আলফুসূল, ২৪৩।
৫২ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫২২৯; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩৫।
৫৩ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৮২১; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩৭।
৫৪ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩৫।
৫৫ মাজমাউয যাওয়াইদ, ১৫২৮১, মুসনাদ, আহমাদ; এর সনদ হাসান।
৫৬ সূরা কামার, ৫৪:৫৪-৫৫।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 সাওদা বিনতে যামআ রা.

📄 সাওদা বিনতে যামআ রা.


তিনি পূতঃপবিত্র পরম সম্মানিত একজন মহীয়সী নারী। দু-টি হিজরতেই অংশগ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। তার যাপিত জীবনের মাঝে আমরা দেখতে পাই মঙ্গল, বরকত, পবিত্রতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, সংযম ও আল্লাহভীতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। এমন পুষ্পের মতো মোহিনী তিনি— যাঁর সুবাস গোটা বিশ্বজগতকে মোহিত করে রেখেছে।

আজ আমরা এমন এক মর্যাদাসম্পন্না মহীয়সী মায়ের জীবন কাহিনী শুনব— যার ত্যাগ, মায়া-মমতা ও পরম ভালোবাসায় তৃপ্তি ও শান্তির ছোঁয়া পেয়েছিলেন প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

পূত-চরিত্রা এ নারী ইসলামের প্রথম পর্বে নির্দ্বিধায় ইসলামে দীক্ষিত হন। শুধু তাই নয়, আবিসিনিয়া এবং মদীনা মুনাওয়ারা—উভয় হিজরতেই অংশগ্রহণের সুযোগ হয় তাঁর। সর্বান্তকরণে তিনি রাসূলের সন্তুষ্টিতে নিজেকে সঁপে দেন। তার ব্যাপারে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বলেন, সাওদা বিনতে যামআ ছাড়া অন্য কোনো মহিলাকে দেখে আমার এমন ইচ্ছা হয়নি যে, তার দেহে যদি আমার প্রাণটি হতো!

হ্যাঁ, তিনিই হচ্ছে হযরত সাওদা বিনতে যামআ রা.।

তাহলে আসুন, আমরা তার সুবাসমাখা অনন্য জীবনকাহিনী দ্বারা আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তুলি। তিনি তো রেখে গেছেন আমাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

শিরক-কুফরের ঘোর অমানিশা থেকে তাওহীদ ও ঈমানের আলোর পথে
মানবজাতি তখন অজ্ঞতা ও পাপাচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত। এমন সময়ে আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক পবিত্র দ্বীন তথা জীবনবিধান নিয়ে এলেন। যাতে মানবতাকে শিরক ও কুফরের গহীন অন্ধকার থেকে বের করে তাওহীদ ও ঈমানের শুভ্র-সফেদ আলোর দিকে নিয়ে আসা যায়। এমন পরিস্থিতিতে উত্তম চরিত্র ও ভালো মনের মানুষেরা সাড়া দেয় তার ডাকে। জাহিলিয়াতের পোশাক খুলে তারা গায়ে জড়িয়ে নেয় ইসলামের আলোকোজ্জ্বল পোশাক। তারা সর্বান্তকরণে আপাদমস্তক বিলিয়ে দিতে থাকে মহান আল্লাহর ইবাদতে এবং দ্বীনের খেদমতের তরে। ইসলামের সূচনাপর্বেই তাদের অস্থি-মজ্জায় ছেয়ে যায় দ্বীনের দাওয়াতের অদম্য স্পৃহা।

✓ নারীদের মধ্যে প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন হযরত খাদীজা রা.। যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে পরম আশ্রয়দাতা ও উদার সাহায্যকারী।
✓ পুরুষদের মধ্যে প্রথম ইসলামে দীক্ষিত হন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.। যিনি কোনোরূপ বাক্যব্যয় ছাড়াই গ্রহণ করেছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনীত দ্বীনের দাওয়াত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই তাকে দাওয়াত দেন তখনই তিনি বলেন ওঠেন, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।

আবু বকর রা. ইসলাম গ্রহণ করার পর এই দ্বীনের দাওয়াতের ভার তার কাঁধেও অর্পিত হয়। তিনি বেরিয়ে গেলেন মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের দিকে ডাকতে। তার হাতেই ইসলাম গ্রহণ করেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবীর মধ্যে ছয়জন মহান সাহাবী। যাঁদের সৎকর্মের অংশ কিয়ামতের দিন তার মীযানের পাল্লাকে সর্বাধিক ভারী করে তুলবে। এভাবে অসংখ্য পূণ্যাত্মা সৎকর্মশীলদের তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে নিয়ে আসেন।

দায়ীর প্রতিদান তো এমনই হওয়া চাই, যিনি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য মানুষের প্রতি দরদী হয়ে অসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে পরকালীন কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচানোর প্রয়াসে নিজেকে সঁপে দেন।

ইসলামের সূচনাপর্বে দ্বীনের দীক্ষা
বিখ্যাত সাহাবী হযরত সুহাইল ইবনে আমর রা.-এর ভাই সাকরান ইবনে আমর রা. ইসলামের সূচনালগ্নেই ইসলাম গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, তার স্ত্রী সাওদাও তার সঙ্গেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা উভয়ে প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী ভাগ্যবান ও ভাগ্যবতী নর-নারীদের অন্তর্গত। ঈমান ও তাওহীদের শীতল পরশে তারা জীবন যাপন করতে থাকেন।

কতই না সৌভাগ্যময় জীবন-যা যাপিত হয় ঈমানের ছায়ায়! এটাই তো পবিত্র জীবন। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলার ঘোষণা,
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَ هُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيُوةً طَيِّبَةً ۚ وَ لَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব।

এভাবেই এরা উভয়ে অগ্রগামী মুসলমানদের মধ্য হতে গণ্য হন। যারা স্বীয় মনপ্রাণ সঁপে দেন দ্বীনের তরে। আর আল্লাহ তাআলা দুনিয়া-আখিরাতের তাদের সার্বিক সফলতার প্রতিশ্রুতি দেন এভাবে,
وَ السَّبِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهْجِرِينَ وَ الْأَنْصَارِ وَ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذُلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।

ধৈর্য ও সাওয়াবের প্রত্যাশা
দিন দিন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে তাদের ওপর কাফেরদের পাষণ্ডতা, নির্মমতা ও নির্যাতনের নতুন নতুন পন্থা ও মাত্রা যোগ হচ্ছিল। নিপীড়িত মুসলমানরা কাফেরদের অত্যাচার ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। কাফেরদের ভয়ে না তারা কোথাও যেতে পারতেন, না ইবাদত করতে পারতেন। তাই তারা এমন একটি স্থানের অনুসন্ধান করছিলেন যেখানে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন। এরই প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন, 'তোমরা এখন আবিসিনিয়ায় হিজরত করো। কেননা, সেখানকার বাদশা দয়াদ্র ও ন্যায়পরায়ণ। সে তোমাদের শান্তিতে বসবাসের সুযোগ দেবে।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই মুসলমানদের একটি বিশেষ সংখ্যা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। হযরত সাওদা বিনতে যামআ রা. ও তার স্বামী সাকরান রা.ও আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের মধ্যে শামিল হন।

নিজ মাতৃভূমি হতে এই দূর অঞ্চল আবিসিনিয়ায় মুসলমানরা অত্যন্ত স্বস্তি, শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে জীবন-যাপন করতে থাকেন। সেখানে কোনো কষ্টদায়ক ও বিরূপ পরিবেশ ছিল না। হযরত সাওদা বিনতে যামআ রা. ও তার স্বামী সাকরান রা. এখানে নিরাপদে ও শান্তিতে জীবন-যাপন করছিলেন; কিন্তু মক্কার অলি-গলি ও পাড়া-মহল্লা প্রায়ই তাদের স্মৃতিপটে ভেসে উঠত—যেখানে তারা কাটিয়েছেন জীবনের সিংহভাগ। এছাড়া কাফেরদের কষ্ট-নির্যাতন সত্ত্বেও রাসূলের সান্নিধ্যে অবস্থান করাকে তারা অধিক ভালোবাসতেন। হযরত সাওদা রা.-এর মধ্যেই সর্বাপেক্ষা বেশি অস্থিরতা ছিল। কেননা, তিনি সেখানে থাকার ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ হতে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। ফলশ্রুতিতে হযরত সাওদা বিনতে যামআ রা. ও তার স্বামী সাকরান রা. ইসলামী পরিবেশে নিরাপদ জীবন যাপনের লক্ষ্যে মক্কায় ফিরে আসেন।

মক্কায় ফিরে তারা দেখতে পান কুরাইশরা প্রকাশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের বিরোধিতার মাত্রা পূর্বাপেক্ষা বাড়িয়ে দিয়েছে। সাহাবীদের ওপর চালানো হচ্ছে ভয়াবহ নির্যাতন। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, অভয় দিচ্ছেন এই বলে যে, নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য খুবই সন্নিকটে। আল্লাহর প্রিয়ভাজনদের বিজয় সুনিশ্চিত। আর শত্রুদের জন্য অপেক্ষা করছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।

কষ্টদায়ক বিচ্ছেদ
হযরত সাওদা বিনতে যামআ রা. ও তার স্বামী সাকরান রা.-এর দাম্পত্য-জীবন ভালো যাচ্ছিল। তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত অনুযায়ী নিজেদের জীবনকে রাঙিয়ে নিচ্ছিলেন। এমন সময়ে হঠাৎ সাকরান রা. ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। মহান প্রতিপালকের ডাকে তিনি সাড়া দেন। মক্কায় তার ইন্তেকালে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েন হযরত সাওদা বিনতে যামআ রা.।

একাকী বসবাস করতে লাগলেন তিনি। স্বামী হারানোর বিচ্ছেদে ধৈর্যধারণ করেন এবং আল্লাহর তাআলার মর্জির ওপর সন্তুষ্ট থাকেন। কারণ, তিনি নিশ্চয় জেনেছিলেন, আল্লাহ তাআলা তার বান্দাকে দুগ্ধপোষ্য শিশুর প্রতি মায়ের যে ভালোবাসা—তার চেয়ে অধিক ভালোবাসেন।

বান্দা যখন বিপদে ধৈর্যধারণ করে ও সাওয়াবের প্রত্যাশা করে, তখন আল্লাহর পক্ষ হতে আসে অভূতপূর্ব সাহায্য। তাই তো আমরা দেখতে পাই, তিনি কী কখনো এমন ধারণা করতে পেরেছিলেন যে, একদিন তিনি হতে যাচ্ছেন উম্মুল মুমিনীন—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিতা স্ত্রী!

সৌভাগ্যের সোপান
এদিকে শোকে-দুঃখে, চিন্তা-ভাবনায় বিহ্বল নবীর জীবনে তখন প্রিয়তমা হারানোর বিচ্ছেদ। বিমর্ষ, বিষণ্ণ অসহায় ও নিঃসঙ্গ তিনি। কারণ, হযরত খাদীজা রা. ছিলেন হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রথমা এবং প্রিয়তমা স্ত্রী। একাকিত্বের অস্থিরতায়, বিপদ-আপদের ভয়াবহতায় এবং অত্যাচারী-উৎপীড়কের নিষ্ঠুর পৈশাচিকতায় তিনি ছিলেন প্রিয় স্বামীর একান্ত সঙ্গিনী। প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে সান্ত্বনা দিতেন, সমবেদনা প্রকাশ এবং পাশে থেকে সকল বাধা অতিক্রমে সাহায্য করতেন।

এমন একজন অন্তরঙ্গ স্ত্রী ও বান্ধবীর তিরোধানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দারুণ বিমর্ষ ও বেদনাহত হয়ে পড়েন। তার বিচ্ছেদ ব্যথায় এত কাতর হয়ে পড়েন যে জীবনও সংকটাপন্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া খাদীজা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সন্তানদের জননী এবং গৃহকর্ত্রী। তার অনুপস্থিতিতে মাতৃহারা সন্তানদের লালন-পালন ও ঘর সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। উপরন্তু পৌত্তলিকদের জ্বালাতন ও উৎপাতের মাত্রাও বেড়ে যায়। বাড়তে থাকে অপমান আর উৎপীড়ন। বস্তুত সব দিক দিয়েই আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বিপর্যস্ত। আল্লাহ তাকে এমন এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখী করেছেন।

এটা সবার বিশ্বাস ছিল যে, হযরত খাদীজা রা.-এর শূন্যস্থান পূরণের আর কেউ নেই। তাঁর মান-মর্যাদা ও ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না। অন্য কোনো নারীর পক্ষে তাঁর এই শূন্যস্থান পূরণ সম্ভব নয়।

এদিকে, হযরত সাওদা বিনতে যামআ রা.-এর জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে দুনিয়া-আখিরাতের সর্বোচ্চ সম্মানের দ্বার। আল্লাহর মর্জি—সাওদাকে তাঁর হাবীবের জীবনসঙ্গিনী বানাবেন।... কিন্তু কীভাবে তা সম্পন্ন হবে? আসুন, সেই চিত্তাকর্ষক ঘটনা শুনে আত্মাকে তৃপ্তিতে ভরিয়ে তুলি!

নবীজীর সহধর্মিণী ও উম্মুল মুমিনীনরুপে হযরত সাওদা রা.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা.-এর মর্যাদা কী পরিমাণ, তা সাহাবীগণ ভালো করেই জানতেন। কিন্তু তারপরও তারা এই আশা করতেন যে, যদি আল্লাহ তাআলা রাসূলের দুঃখ লাঘবকল্পে একটা ব্যবস্থা করতেন! কিন্তু কেউই বিয়ের ব্যাপারে আল্লাহর নবীকে বলার সাহস পাচ্ছিলেন না।

উসমান ইবনে মাজউন রা.-এর স্ত্রী খাওলা বিনতে হাকীম একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গেলেন। নানা কথার ফাঁকে এক সময় তিনি বলে ফেললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আবার বিয়ে করুন। রাসূল প্রশ্ন করেছেন, পাত্রী কে? খাওলা বললেন, বিধবা এবং কুমারী-দুই। রকম পাত্রীই আছে। এখন আপনি যাকে পছন্দ করেন তার ব্যাপারে কথা বলা যেতে পারে। তিনি আবার জানতে চাইলেন, পাত্রী কে? খাওলা বললেন, বিধবা পাত্রী সাওদা বিনতে যামআ আর কুমারী পাত্রী আবু বকরের মেয়ে আয়েশা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনি গিয়ে তাদের সাথে আমার ব্যাপারে আলাপ করুন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মতি পেয়ে খাওলা গেলেন সাওদার গৃহে। সাওদার পিতা তখন জীবনের প্রান্তসীমায়। পার্থিব সকল কর্মতৎপরতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়েছেন। খাওলা রা. সাওদা রা.-এর কুশল বিনিময় করে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ, সাওদা? সাওদা রা. দুঃখভরা কণ্ঠে বললেন, কেমন আর থাকবো বলো! খাওলা রা. বললেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পাঠিয়েছেন।

এ কথা শোনামাত্র খুশিতে চমকিত হয়ে ওঠেন সাওদা রা.। তার মনোজগতে আনন্দের ঢেউ খেলতে আরম্ভ করে। চোখে-মুখে উচ্ছ্বাসের ছাপ। তবে কি স্বপ্নে দেখা সেই কথা সত্যিই হচ্ছে! আল্লাহ তাকে সত্য স্বপ্নই দেখিয়েছেন! আল্লাহ তাকে এমন অনুপম সম্মানে ভূষিত করবেন! তিনিই হতে যাচ্ছেন উম্মুল মুমিনীন! চেহারাজুড়ে তার আনন্দের ফল্গুধারা। উচ্ছ্বাসভারা চোখে তিনি তাকান হযরত খাওলা রা.-এর দিকে। তিনি বললেন, আমার আব্বা আসছেন, তাকে এ বিষয়ে বলো।

খাওলা তার পিতার নিকট উপস্থিত হয়ে 'আনঈম সাবাহান'! (সুপ্রভাত) বলে জাহিলী রীতিতে সম্ভাষণ জানান।

বৃদ্ধ প্রশ্ন করেন, কে তুমি? খাওলা উত্তর দেন, আমি খাওলা বিনতে হাকীম। বৃদ্ধ খাওলাকে স্বাগত জানিয়ে কাছে বসান। খাওলা বিয়ের পয়গাম পেশ করেন এভাবে : মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে আবদিল মুত্তালিব সাওদাকে বিয়ের প্রস্তাব করেছেন। বৃদ্ধ বলেন, এ-তো অভিজাত কুফু। তোমার বান্ধবী সাওদা কী বলে? খাওলা বলেন, তার মত আছে। বৃদ্ধ সাওদাকে ডাকতে বলেন। সাওদা উপস্থিত হলে বলেন, আমার মেয়ে, এই মেয়ে (খাওলা) বলছে, মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তাকে পাঠিয়েছে। অভিজাত পাত্র। আমি তার সাথে তোমার বিয়ে দিতে চাই, তুমি কি রাজি? সাওদা বলেন, হ্যাঁ রাজি। তখন বৃদ্ধ খাওলাকে বলেন, তুমি যাও, মুহাম্মাদকে ডেকে আন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পত্নী হওয়ার গৌরব ও মর্যাদা লাভ করতে চলেছেন তার প্রিয় কন্যা। সানন্দে সম্মতি দিয়ে চারশো দিরহাম মোহরানার বিনিময়ে তিনি নিজেই বিয়ে পড়ান।

হযরত সাওদার ভাই আবদুল্লাহ ইবনে যামআ এই বিয়ের সময় পর্যন্ত অমুসলিম ছিলেন। বিয়ের সময় তিনি ছিলেন মক্কার বাইরে। বিয়ের কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি এ সংবাদ লাভ করেন। তখন ক্রোধে উত্তেজনায় ফেটে পড়েন। দুঃখ ও ক্ষোভে মাথা কুটতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি একজন আদর্শ মুসলমান হন। তিনি আমরণ তার সেই দিনের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতেন।

নববী ঘরের বিস্তৃত ভুবনে
উম্মুল মুমিনীনগণের মধ্যে হযরত সাওদা রা.-ই হযরত খাদীজা রা.-এর ইন্তেকালের পর প্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। প্রায় তিন বছর যাবত তিনি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী হিসেবে একাই ছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-কে বিবাহ করেন।

হযরত সাওদা রা. খুবই সুষ্ঠুভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘর-গৃহস্থালীর যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন। মাতৃহারা কন্যা ফাতিমাসহ অন্য কন্যাদের লালন-পালনের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন। সম্ভবত তখন পর্যন্ত নবী পরিবারের সদস্য হযরত আলীরও তত্ত্বাবধান করেন।

মোটকথা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের এক কঠিন ও সংকটময় পর্বে হযরত সাওদা রা. জীবনসঙ্গিনী হিসাবে কঠিন দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে খাদীজার শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করেন। এ সময়ে আবিসিনিয়ায় অবস্থানরত নবীজীর কন্যা রুকাইয়া রা. ও তার স্বামী উসমান রা.-এর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভীষণ উৎকণ্ঠায় ছিলেন। হযরত সাওদা তাকে আবিসিনিয়ায় রুকাইয়া ও উসমান রা.-এর সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি বর্ণনা করে রাসূলকে আশ্বস্ত করতেন এবং নিরুদ্বেগ রাখার চেষ্টা করতেন।

এ সময়ে রাসূলের একান্ত সান্নিধ্যে থেকে হযরত সাওদা রা. উত্তম চরিত্র, জ্ঞান ও বিচক্ষণতার অপূর্ব দীক্ষা নেন। এক মুহূর্তের জন্যও তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখ থেকে আড়াল হতে চাইতেন না। জগৎসেরা এই মহামনীষীকে এক পলক দেখার স্বপ্ন কার নেই? আর তিনি যখন সামনেই আছেন, তো কী করে চোখের পলক ফেলা যায়!

এভাবেই ঈমান-আমল ও উত্তম চরিত্রে টইটম্বুর হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন মুমিনদের মা। শ্রেষ্ঠ নবীর সহধর্মিণী। এই সৌভাগ্য ক'জনের ললাটে জোটে! মহামহিম আল্লাহ যাকে চান, তাকেই দান করেন অনন্য এই নেয়ামত।

মদীনা অভিমুখে হিজরত
মুশরিকরা দিনদিন সাহাবীদের ওপর কষ্ট ও নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন। যাতে তারা আনসারদের সুপরিসর ভূবনে এসে স্বস্তির শ্বাস নিতে পারে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَ الَّذِينَ تَبَوَّةُ الدَّارَ وَ الْإِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَ يُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ *
আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদীনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালোবাসে। আর মুহাজিরদেরকে যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়তের ত্রয়োদশ বছরে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় পৌঁছে একটু স্থির হওয়ার পর যায়িদ ইবনে হারিসা রা.-কে আবার মক্কায় পাঠান সাওদাসহ অন্যদের নেওয়ার জন্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় পৌঁছে যায়িদ ইবনে হারিসা ও আবু রাফে'কে দু-টি উট ও পাঁচশো দিরহাম দিয়ে মক্কায় পাঠান। যায়িদ ও আবু রাফে' মদীনায় ফিরে যান ফাতিমা, উম্মে কুলসুম, সাওদা, উম্মে আইমান ও উসামাকে নিয়ে।

বরকতময় শান্তির কুঠির
আয়েশা রা. যখন স্বামীগৃহে আসেন তখন সতীন সাওদা বিদ্যমান। এ অবস্থায় একে অপরের ভাগ বসানোর কল্পনা করতে পারতেন; কিন্তু এই স্বাভাবিক অনুমানের একেবারে বিপরীত ছিল এই দুইজনের অবস্থা। তাদের সংসার জীবনের সবকিছু ছিল পারস্পরিক সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও ঐক্যের। গার্হস্থ্য জীবনের অধিকাংশ বিষয়ে সাওদা ছিলেন আয়েশার বান্ধবী। উভয়ের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল না।

রাসূলের ঘর-সংসার এমনিতেই ছিল গোটা জগতবাসীর জন্য আদর্শ। সব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা ও কদার্যতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এখানে আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন জগতের শ্রেষ্ঠ নেয়ামতরাজী। এমন আলোকোজ্জ্বল প্রভা এখান থেকে বেরিয়েছে—যা দ্বারা আলোকিত হয়েছে বিশ্ব।

আত্মত্যাগ ও বদান্যতার অনন্য দৃষ্টান্ত
হযরত সাওদা রা. সব সময় রাসূলের সন্তুষ্টি কামনা করতেন। এ লক্ষ্যে তিনি সচেষ্ট থাকতেন সর্বদা। যা ছিল তার পরম সৌভাগ্য। তিনি নিশ্চিতভাবে জানতেন, আয়েশা রা. হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে অধিক প্রিয়তমা। তাই বন্ধুত্ব, পারস্পরিক প্রীতি ও সৌহার্দের এমন এক দৃষ্টান্ত তিনি দেখালেন যে, স্বামীর সঙ্গে রাত্রিবাসের যে পালা ছিল তার জন্য বরাদ্ধ, তিনি সেটি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরুণী পত্নী আয়েশাকে দান করেন।

এ সম্পর্কে একবার হযরত আয়েশা রা. উরওয়াকে বললেন, ভাতিজা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীদের জন্য তার বণ্টিত রাতে অবস্থানের ব্যাপারে কাউকে কারও ওপর প্রাধান্য দিতেন না। অনেক দিন এমন গেছে তিনি আমাদের সকলের নিকট এসে ঘুরে গেছেন, কোনো স্ত্রীকেই স্পর্শ করেননি। শেষে সেই স্ত্রীর নিকট রাত কাটিয়েছেন যার জন্য রাতটি নির্ধারিত ছিল।

সাওদা বিনতে যামআর যখন বার্ধক্য এসে যায় এবং এই ভয় পেয়ে যান যে না জানি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেন, তখন তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার ভাগের রাতটি আমি আয়েশা রা.-কে দিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার এ আবেদন মঞ্জুর করেন। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে ইরশাদ করেন,
وَإِنِ امْرَأَةٌ خَافَتْ مِنْ بَعْلِهَا نُشُورًا أَوْ إِعْرَاضًا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًا وَالصُّلْحُ خَيْرٌ وَأُحْضِرَتِ الْأَنْفُسُ الشُّحَّ وَإِنْ تُحْسِنُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
যদি কোনো নারী তার স্বামীর পক্ষ থেকে কোনো দুর্ব্যবহার কিংবা উপেক্ষার আশঙ্কা করে, তাহলে তারা উভয়ে কোনো মীমাংসা করলে তাদের কোনো অপরাধ নেই। আর মীমাংসা কল্যাণকর এবং মানুষের মধ্যে কৃপণতা বিদ্যমান রয়েছে। আর যদি তোমরা সৎকর্ম কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে আল্লাহ তোমরা যা কর সে বিষয়ে সম্যক অবগত।

আয়েশা রা. যাঁর প্রশংসা করতেন
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. তার বদান্যতার ব্যাপারে যেসব মন্তব্য করেছেন তা আজ ইতিহাসের অমূল্য উপাদান। তার বদান্যতা আর উদার হৃদয়ের কথা আমরা জেনেছি। খোদ আয়েশা রা. বলেন, 'উম্মুল মুমিনীন হযরত সাওদা রা. ছাড়া আর কাউকে দেখেই আমার মনে হয়নি যে, তার ভিতরে আমার আত্মা হতো!'

পরশ্রীকাতরতামুক্ত আত্মাই পবিত্র আত্মা। যে মনে হিংসার জন্ম হয় না, তেমন মনের আবিলতামুক্ত শুভ্র বস্তু আর কিছু নেই। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. এক পবিত্র নারী; কিন্তু তিনি যখন স্থুলকায়া দীর্ঘাঙ্গীর দেহ কাঠামোর মধ্যে আপন সত্তার অবস্থান কামনা করছেন, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না- কী জ্যোতির্ময় সত্তার অধিকারিণী ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত সাওদা বিনতে যামআ রা.।

বিরল দৃষ্টান্ত
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বলেন, একবার আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য (আটা, দুধ ও ঘি মিশ্রিত) 'হারীরাহ' তৈরি করেছিলাম। (হারীরাহ দ্বারা মিশ্রজাতীয় একপ্রকার খাদ্যদ্রব্য বোঝানো হয়) সে সময় আমাদের ঘরে হযরত সাওদাহ রা.ও উপস্থিত ছিলেন। আমি হারীরাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে পেশ করলাম। সাওদাহ রা.-কে বললাম, তুমিও খাও। তিনি খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। আমি বার বার জোরাজুরি করে বললাম, তোমাকে অবশ্যই খেতে হবে। নতুবা এই হারীরাহ আমি তোমার চেহারায় মাখবো। হযরত সাওদা রা. তারপরও খেতে অস্বীকৃতি জানালে আমি হারীরাতে হাত দিয়ে হযরত সাওদা রা.-এর চেহারায় মেখে দিলাম। এটা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকি হাসলেন।

হযরত সাওদাহ রা. বলেন, এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, তুমিও আয়েশার চেহারায় হারীরাহ মেখে দাও। তাই আমিও হারীরাহ হাতে নিয়ে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর চেহারায় মেখে দিলাম। তা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকি হাসলেন, যেভাবে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর কাণ্ড দেখে হেসেছিলেন। ইত্যবসরে হযরত উমর রা. ওখান দিয়ে আসছিলেন। তিনি কাকে যেন হে আবদুল্লাহ, হে আবদুল্লাহ বলে ডাকছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধারণা করলেন যে, উমর রা. হয়তো ভেতরে আসবে। তাই তিনি বললেন, যাও, মুখ ধুয়ে নাও।

হৃদ্যতা ও ভালোবাসা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَ مِنْ آيَتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে কওমের জন্য-যারা চিন্তা করে।

এই ভালোবাসা আর সৌহার্দ্য পূর্ণমাত্রায় ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে। তার সহধর্মিণীগণের মাঝে ছিল অপরিসীম দয়া ও প্রীতি। কখনো কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে বিভিন্ন অর্থবোধক কৌতুক ও রসাত্মক কথাবার্তা বলতেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত সাওদা রা. কোনো কোনো কথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে দিতেন। একদিন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, কাল রাতে আমি আপনার সাথে নামায পড়েছি। আপনি এত দীর্ঘ সময় রুকুতে ছিলেন যে, আমার নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু হয়েছে বলে মনে হয়েছিল। এ কারণে আমি দীর্ঘক্ষণ নাক চেপে ধরে রেখেছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কথায় মৃদু হেসে দেন।

দানশীলতায় অগ্রগামিতা
সকল প্রকার সৎকর্মে হযরত সাওদা রা. ছিলেন অগ্রগামী। তিনি তার অন্যান্য গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য ছাড়াও দানশীলতা, উদারতা ও বদান্যতায় বিশেষভাবে খ্যাত। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের মহৎ লক্ষ্যে পার্থিবতা বিমুখ হয়ে দানশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কোনো সম্পদ তার হস্তগত হতেই তা আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিতেন। কারণ, তিনি জানতেন, দুনিয়া হচ্ছে আখিরাতের ক্ষেতস্বরূপ। এখানে যা রোপণ করা হবে, তা-ই পাওয়া যাবে পরকালে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَ سَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمُوتُ وَ الْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَ الْكُظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَ اللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ وَ الَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَ مَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ ۖ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ أُولَبِكَ جَزَاؤُهُمْ مَّغْفِرَةٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ الْعُمِلِينَ
আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে অথবা নিজদের প্রতি যুলম করে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গোনাহের জন্য ক্ষমা চায়। আর আল্লাহ ছাড়া কে গোনাহ ক্ষমা করবে? আর তারা যা করেছে, জেনে-শুনে তা তারা বার বার করে না। এরাই তারা, যাদের প্রতিদান তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতসমূহ যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর আমলকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম!

হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা মুযদালিফায় অবতরণ করলাম। মানুষের ভিড়ের আগেই রওনা হওয়ার জন্য সাওদা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অনুমতি চাইলেন। আর তিনি ছিলেন ধীরগতি মহিলা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে অনুমতি দিলেন। তাই তিনি লোকের ভিড়ের আগেই রওনা হলেন। আর আমরা সকাল পর্যন্ত সেখানেই রয়ে গেলাম। এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রওনা হলেন, আমরা তার সঙ্গে রওনা হলাম। সওদার মতো আমিও যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট অনুমতি চেয়ে নিতাম তাহলে তা আমার জন্য হতে অধিক সন্তুষ্টির ব্যাপার হতো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণের ক্ষেত্রে তিনি সকল আযওয়াযে মুতাহহারাত (পবিত্র স্ত্রীগণ) অপেক্ষা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারিণী ছিলেন। বিদায় হজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাহাতুল মুমিনীনের (ঈমানদারদের মাতাগণ) উদ্দেশ্যে বলেন, আমার পরে তোমরা ঘরে অবস্থান করবে। হযরত সাওদা রা. এই নির্দেশের ওপর এত কঠোরভাবে আমল করেন যে, হজের উদ্দেশ্যেও আর কখনো ঘর থেকে বের হননি।

আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর তার অন্য সহধর্মিণীগণ হজ করতেন; কিন্তু সাওদা রা. রাসূলুল্লারহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ কঠোরভাবে পালন করতেন। ঘর থেক বের হতেন না। সাওদা রা. বলতেন, আমি হজ ও উমরা- দুটোই আদায় করেছি। এখন আল্লাহর নির্দেশমতো ঘরে বসে থাকবো।

উদারতা ও বদান্যতা
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আখলাক ও স্বভাব- চরিত্রের এক অনুপম দিক ছিল দানশীলতা। সাহাবীদের মধ্যে যিনি যত বেশি তার নিকটে থাকার সুযোগ পেয়েছেন তার মধ্যে এই বিশেষ গুণটির ছাপ পড়েছে অধিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্য ও সাহচর্য থেকে তার সহধর্মিণীগণই সর্বাধিক মাত্রায় গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন।

ইবনে সীরীন বর্ণনা করেছেন, একবার খলীফা হযরত উমর রা. হযরত সাওদার নিকট একটি থলি পাঠান। তিনি বহনকারীকে প্রশ্ন করেন। থলেতে কী? বলল, দিরহাম। থলেতে খেজুরের মতো দিরহাম পাঠানো হয়। একথা বলে তখনই দিরহামগুলো মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন।

আকাশ থেকে প্রত্যাদেশ
তিনি এমন এক মহীয়সী নারী যার কারণে এক বিশেষ প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে। জরুরত পূরণের নিমিত্তে তার বাইরে যেতে সমস্যা হচ্ছে—এই সমস্যার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে জানালে তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলা ওহী নাযিল করেন।

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক রাতে উন্মুহাতুল মুমিনীন সাওদা বিনতে যামআ রা. কোনো কারণে বাইরে গেলেন। উমর রা. তাকে দেখে চিনে ফেললেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! হে সাওদা, তুমি নিজেকে আমাদের নিকট হতে লুকাতে পারনি। এতে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ফিরে গেলেন এবং উক্ত ঘটনা তার কাছে বললেন। তিনি তখন আমার ঘরে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন এবং তার হাতে গোশতওয়ালা একখানা হাড় ছিল। এমন সময় তার কাছে ওহী অবতীর্ণ হলো। ওহী শেষ হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
قَدْ أَذِنَ اللَّهُ لَكُنَّ أَنْ تَخْرُجْنَ لِحَوَائِجِكُنَّ
আল্লাহ তাআলা প্রয়োজনে তোমাদেরকে বাইরে যাবার অনুমতি দিয়েছেন।

বিদায়ের করুণ ক্ষণ
হযরত সাওদা রা. কুরআন-সুন্নাহর আলোয় নিজের জীবনকে রেখেছেন আলোকিত। সৌভাগ্যের সেতারা গুনগুনিয়ে বাজতে থাকত তার কানে। অন্তর ভরে উঠত আধ্যাত্মিক প্রশান্তিতে; কিন্তু চিরস্থায়ী সুখ-শান্তি যে আখিরাতে!

হ্যাঁ, ঘনিয়ে আসে সেই সময়। বিরহ-বিচ্ছেদের সময় ঘনিভূত হতে আরম্ভ করে। এক সময় ইন্তেকাল করেন তার সর্বাধিক প্রিয়তম ব্যক্তি মহান স্বামী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যাঁকে দিয়ে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। যাঁর কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন উত্তম চরিত্র আর অপূর্ব ভালোবাসা। এক নিমিষেই সব শেষ হয়ে যায়।

রাসূলের মৃত্যুতে তিনি ভীষণ ভেঙে পড়েন; কিন্তু তিনি ধৈর্যশীলদের প্রতিদানের কথাও মনে রাখেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ওপর সন্তুষ্ট থেকেই এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। তাই তো তিনিও হবেন জান্নাতে রাসূলের স্ত্রী। যেখানে রয়েছে এমন নেয়ামত-যা না কোনো চোখ দেখেছে, না কোনো কান শুনেছে, না কোনো অন্তকরণ কল্পনা করতে পেরেছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর তিনি ইবাদত, নামায ও রোযার মাধ্যমে বাকি জীবন কাটিয়ে দেন। হযরত উমর রা.-এর খিলাফতকাল পর্যন্ত তিনি হায়াত পান। হযরত আবু বকর রা., হযরত উমর রা. ও অন্যান্য সকল সাহাবায়ে কেরাম রা. তার মান-মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। খুবই উত্তম ব্যবহার করেন তার সাথে।

হযরত উমর রা.-এর খিলাফতের শেষ সময়ে আমাদের আম্মাজান হযরত সাওদা রা. পরপারে পাড়ি জমান। তার পবিত্র আত্মা উড়ে যায় মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে। তার সুরভিত জীবন-কাহিনী এখানে থেমে গেলেও তার জীবনের শিক্ষা সর্বকালের সর্বযুগের নারী ও মা-বোনদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

টিকাঃ
৫৭ আসহাবুর রাসূল, ১/৫৮-৫৯।
৫৮ সূরা নাহাল, ১৬:৯৭।
৫৯ সূরা তাওবাহ, ৯:১০০।
৬০ নিসাউ আহলিল বাইত, ৮০-৮১।
৬১ মাজমাউয যাওয়াইদ, ১৫২৮৫।
৬২ মাজমাউয যাওয়াইদ, ১৫৭৮৬।
৬৩ মাজমাউয যাওয়াইদ, ১৫৩৪০।
৬৪ সূরা হাশর, ৫৯:৯।
৬৫ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ১/২৩৭-২৩৮।
৬৬ সূরা নিসা, ৪:১২৮।
৬৭ মুসনাদে আবী ইয়া'লা, ৭/৪৪৯; এর সনদ হাসান।
৬৮ সূরা রূম, ৩০:২১।
৬৯ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৫৪।
৭০ সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৩-১৩৬।
৭১ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১৬৮১; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১২৯০।
৭২ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৫৬; আরনাউত রিজালদের সিকা বলেছেন।
৭৩ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫২৩৭; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২১৭০।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 আয়েশা বিনতে আবি বকর রা.

📄 আয়েশা বিনতে আবি বকর রা.


আজ আমরা এমন এক ফুলে-ফলে ভরা অপরূপ কাননে প্রবেশ করব, যে কাননের ফুলের সুবাসে গোটা ভুবন মাতোয়ারা। যে কানন ঈমানের সুঘ্রাণে মোহিত ও ওহীর জলে স্নাত। যার সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে পূর্ব-পশ্চিম দিগন্তজুড়ে।

তিনি এমন এক মহান বৃক্ষের ফল যার শেকড় প্রোথিত মাটির গভীরে আর যার শিখর ছুঁয়েছে আকাশ। তারকারাজির সঙ্গে যে মিতালি করে বেড়ায়। আজ পূতঃপবিত্র, নিষ্কলুষ ও মহানুভব এমন মহান এক মানবীর কথা আমরা শুনব—যার ইলম, প্রজ্ঞা, ফিকহ, যুহদ ও আল্লাহভীরুতার প্রতি গোটা বিশ্ব ঋণী। আমরা পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে তার সেই কাহিনীই তুলে ধরতে চাই।

তিনি তার পিতার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছিলেন সর্বাধিক প্রিয়ভাজন। সেই সিদ্দীকী কাননে প্রথম নয়ন যুগল খুলেছিলেন যেখানে সর্বাগ্রে ইসলামের হৃদয় নিংড়ানো ও মনোলোভা সুবাস পৌঁছেছিল। যে বাগান শুরু থেকেই ছিল নববী সূর্যের কিরণে আলোকোজ্জ্বল। কুফর ও শিরকের কোনো প্রকার অণু-বিন্দুও সেই বাড়িতে পৌঁছার অবকাশ ছিল অকল্পনীয়। অতি সম্মানিতা, ধর্মপরায়ণা, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধকারিণী সেই মহান মানবী হচ্ছেন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা বিনতে আবি বকর রা.।

অনন্য চরিত্রের বিস্তৃত সমাহার
এই মহান মানবীর মূল ঘটনা শুরু করার পূর্বে আমরা ওই অনন্য চরিত্রের সেই সুপরিসর ভুবন সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারণা নিয়ে নিতে পারি—যাদের সান্নিধ্যে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন অনন্য গুণাবলীর আলোয়।

তার স্বামী হচ্ছেন, সায়্যিদুল আউয়্যালীন ওয়াল আখিরীন মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-যাঁকে মহান আল্লাহ তাআলা সারা বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন।

তার পিতা হচ্ছেন সিদ্দীকে আকবার রা.। যিনি পুরুষের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। নবীগণের পর যাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো মানুষ এ পৃথিবীর বুক ধারণ করেনি। নবুওয়াতপ্রাপ্তির পূর্বে এবং পরে ঘরে-বাইরে সর্বত্র সর্বদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয়বন্ধু হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-র শান-মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা কে অস্বীকার করতে পারে? তিনি সেই 'দুইজনের একজন'। রাসূলের কাছে সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তিত্ব।

আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন :
إِنَّ مِنْ أَمَنِ النَّاسِ عَلَيَّ فِي صُحْبَتِهِ وَمَالِهِ أَبَا بَكْرٍ وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا خَلِيْلًا غَيْرَ رَبِّي لَا تَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ وَلَكِنْ أُخُوَّةُ الْإِسْلَامِ وَمَوَدَّتُهُ لَا يَبْقَيَنَ فِي الْمَسْجِدِ بَابٌ إِلَّا سُدَّ إِلَّا بَابَ أَبِي بَكْرٍ
যে ব্যক্তি তার ধন-সম্পদ দিয়ে, তার সঙ্গ দিয়ে আমার ওপর সর্বাধিক অনুগ্রহ করেছে সে ব্যক্তি হলো আবু বকর রা.। আমি যদি আমার রব ছাড়া অন্য কাউকে আন্তরিক বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম, তাহলে অবশ্যই আবু বকরকে করতাম। তবে তার সঙ্গে আমার দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব, আন্তরিক ভালোবাসা আছে। মসজিদের দিকে আবু বকরের দরজা ছাড়া অন্য কোনো দরজা খোলা রাখা যাবে না।

অন্য হাদীসে এসেছে, হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে আবু বকর রা. আমার উম্মতের জন্য সর্বাধিক দয়ালু। আর উম্মতের মধ্যে আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা কঠোর উমর। উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক প্রকৃত লাজুক উসমান, আর সবচেয়ে ন্যায় বিচারক আলী।'

পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে আবু বকর রা.-এর প্রসঙ্গ জড়িয়ে আছে। কেবল খলীফা হিসেবেই নয়; ইসলামের বহু বিষয়েই তিনি প্রথম ছিলেন। পুরুষদের মধ্যে তিনি প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনিই প্রথম কুরআন সংকলন করেছিলেন। তিনি নিজের বাবার জীবদ্দশায় খলীফা হয়েছেন, এ বিষয়েও তিনি প্রথম। প্রথম তিনিই বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার স্থাপন করেছেন। হাদীস শরীফে এসেছে, 'আমার উম্মতের মধ্যে আবু বকর সবার আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'

ইসলামে তার অবদান নজিরবিহীন। ইসলাম ও মুসলমানদের সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি শক্ত হাতে হাল ধরেছেন। দিকভ্রান্ত নাবিকের ন্যায় উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকা মানুষের জন্য তিনি ধ্রুবতারার ন্যায় পথনির্দেশ করেছেন।

আবু সাঈদ রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ أَهْلَ الدَّرَجَاتِ الْعُلَى لَيَرَاهُمْ مَنْ تَحْتَهُمْ كَمَا تَرَوْنَ النَّجْمَ الطَّالِعَ فِي أُفُقِ السَّمَاءِ وَإِنَّ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ مِنْهُمْ وَأَنْعَمَا
(জান্নাতে) সর্বোচ্চ সম্মাননায় আসীন লোকদের অবশ্যই তাদের নীচের মর্যাদার লোকেরা দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আসমানের দিগন্তে উদিত তারকা দেখতে পাও। আবু বকর ও উমর তাঁদেরই দলভুক্ত, বরং আরও বেশি রহমত ও মর্যাদার অধিকারী।

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَا لأَحَدٍ عِنْدَنَا يَدَّ إِلَّا وَقَدْ كَافَيْنَاهُ مَا خَلَا أَبَا بَكْرٍ فَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا يَدًا يُكَافِئُهُ اللَّهُ بِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَا نَفَعَنِي مَالُ أَحَدٍ قَطُّ مَا نَفَعَنِي مَالُ أَبِي بَكْرٍ وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذَا خَلِيلاً لاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلًا أَلَا وَإِنَّ صَاحِبَكُمْ خَلِيلُ اللهِ
আবু বকর ছাড়া আর কারও যে কোনো ধরনের দয়া আমার ওপর ছিল আমি তার প্রতিদান দিয়েছি। আমার ওপর তার যে দয়া রয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে তার প্রতিদান দেবেন। আর আমাকে কারও সম্পদ এতটা উপকৃত করেনি, যতটা আবু বকরের সম্পদ আমাকে উপকৃত করেছে। আমি যদি কাউকে অন্তরঙ্গভাবে গ্রহণ করতাম, তাহলে আবু বকরকেই একনিষ্ঠ বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম। অবগত হও! তোমাদের এই সাথী আল্লাহ তাআলার অন্তরঙ্গ বন্ধু।

✓ উম্মুল মুমিনীন সাইয়্যিদা আয়েশা রা.-এর মা হচ্ছেন, মর্যাদাপূর্ণ সাহাবিয়া উম্মে রুমান বিনতে আমের রা.। এই দ্বীনের তরে যাঁর ত্যাগ ও সেবা অবিস্মরণীয়।
✓ তার বৈপিত্রীয় বোন হচ্ছেন, আসমা বিনতে আবি বকর রা.- যাঁকে ‘দুই ফিতাওয়ালী’ বলা হয়।
✓ তার ভগ্নিপতি হচ্ছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাওয়ারী, চাচাতো ভাই, আশারায়ে মুবাশশারা তথা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জনের অন্যতম সদস্য এবং আল্লাহর রাস্তায় প্রথম তরবারি উত্তোলনকারী হযরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম রা.।
✓ তার দাদা হচ্ছেন, আবু কুহাফাহ রা.; যিনি ইসলামে দীক্ষিত হয়ে রাসূলের সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
✓ তার দাদী হচ্ছেন, উম্মুল খাইর সালমা বিনতে সাখার; তিনিও ইসলামে দীক্ষিত হয়ে রাসূলের সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
✓ তার তিন ফুফু হচ্ছেন, আবু কুহাফার কন্যা যথাক্রমে উম্মে আমের, কুরাইবাহ ও উম্মে ফারওয়াহ।
✓ তার সহোদর হচ্ছেন, আবদুর রহমান রা.; যিনি একজন ঐতিহাসিক বীর সৈনিক সাহাবী।

এই হচ্ছে সেই পবিত্র বৃক্ষ, যেখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন আয়েশা রা.। সুতরাং এই গোলাপের কেমন ভুবনমোহিনী সুবাস হবে—তা সহজেই অনুমেয়।

জ্ঞান সাধনা ও শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশাকে নারী-শিক্ষার অগ্রদূত বলা যায়। তাঁর চতুর্মুখী প্রতিভা প্রমাণ করে যে, কোনো নারীও পুরুষের চেয়ে অধিক জ্ঞানী হতে পারে। তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা হয়েছে নবুয়তের মাদ্রাসায়। শৈশব কেটেছে ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দীক রা. এর অভিভাবকত্বে; যৌবন কেটেছে মানব সভ্যতার সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষক, নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তত্ত্বাবধানে। যার মধ্যে সন্নিবেশিত ছিল সর্বকালের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ভাষাশৈলী ও চমৎকার বাগ্মিতাসহ বিশ্বের যাবতীয় জ্ঞানভাণ্ডার।

ইমাম যুহরী রহ. বলেন, 'উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. ও সব মহিলার ইলম একত্র করা হয়, উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর ইলমই সর্বাধিক হবে।'

Hikam bin Urwa তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, 'আমি উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর সান্নিধ্যে (দীর্ঘদিন) ছিলাম। তখন এমন কাউকে পাইনি যিনি আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট, ফারায়েজ সূত্র, হাদীস, কবিতাগুচ্ছ, আরবের ইতিহাস এবং বংশপরম্পরা সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. থেকে অধিক জ্ঞানী ছিলেন।

হযরত আবু বকর রা. তাঁর অন্যান্য সন্তানদের মতো উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-কেও সুশিক্ষা দিয়েছেন। এই ধারাবাহিকতা সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর বিয়ের পরও অব্যাহত ছিল। তাঁর কোনো সাধারণ দোষ-ত্রুটিও পিতার চক্ষু এড়াত না। তিনি খুব সচেতন অভিভাবক ও শাসক ছিলেন।

ইতোপূর্বে আমরা জেনে এসেছি, আবু বকর রা. ইসলাম গ্রহণ করার পর এই দ্বীনের দাওয়াতের ভার তাঁর কাঁধেও অর্পিত হয়। তিনি বেরিয়ে গেলেন মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের দিকে ডাকতে। তাঁর হাতেই ইসলাম গ্রহণ করেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবীর মধ্যে ছয়জন মহান সাহাবী। যাঁদের সৎকর্মের অংশ কিয়ামতের দিন তাঁর মীযানের পাল্লাকে সর্বাধিক ভারি করে তুলবে। এভাবে অসংখ্য পুণ্যাত্মা সৎকর্মশীলদের তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে নিয়ে আসেন। যদিও উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. শুরু থেকেই পিতার সার্বক্ষণিক ছায়ায় থেকে শিক্ষা, দীক্ষা, আদব, ভাষা, ইতিহাস ইত্যাদি ইলম অর্জন করেছেন, তথাপি তার শিক্ষা-দীক্ষার বুনিয়াদী তথা মৌলিক সবক রাসূলে আকদাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে স্ত্রী হিসেবে আসার পর থেকে শুরু হয়েছিল।

সবই তো আল্লাহরই ইচ্ছা। তিনি যখন বলেন, 'হও', তা হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা তাকে নির্বাচন করেছিলেন 'উম্মুল মুমিনীন' হিসেবে। তাহলে আসুন, আমরা সেই মনোমুগ্ধকর ঘটনার দিকে এগোই আর তার দাম্পত্য জীবন শুরুর পর্বের সৌরভে মোহিত হই।

এ তোমার স্ত্রী, দুনিয়া ও আখিরাতে
আসমান থেকে ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর বিয়ে হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তিনবার স্বপ্নে দেখেছিলেন। জিবরাঈল আ. তার ছবি নিয়ে এসে বলতেন, এ তোমার সঙ্গী হবে, দুনিয়া ও আখিরাতে।

কতই না সৌভাগ্য আমাদের আম্মাজান উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশার! এ ব্যাপারে হাদীস শরীফের উদ্ধৃতি দেখুন: আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন,
أُرِيتُكِ فِي الْمَنَامِ مَرَّتَيْنِ أَرَى أَنَّكِ فِي سَرَقَةٍ مِنْ حَرِيْرٍ وَيَقُوْلُ هَذِهِ امْرَأَتُكَ فَأَكْشِفُ فَإِذَا هِيَ أَنْتِ فَأَقُولُ إِنْ يَكُ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ يُمْضِهِ
দু-বার তোমাকে আমায় স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। আমি দেখলাম, তুমি একটি রেশমী কাপড়ে আবৃতা এবং আমাকে বলছে ইনি আপনার স্ত্রী, আমি তার ঘোমটা সরিয়ে দেখলাম, সে তুমিই। তখন আমি ভাবছিলাম, যদি তা আল্লাহর পক্ষ হতে হয়ে থাকে, তবে তিনি তা বাস্তবায়িত করবেন।

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, জিবরাঈল আ. একখানা সবুজ রংয়ের রেশমী কাপড়ে তার (আয়েশার) প্রতিচ্ছবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে এসে বললেন, ইনি দুনিয়া ও আখিরাতে আপনার স্ত্রী।'

শুভ বিবাহের ঘটনা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা খাদীজাতুল কুরবার রা.-এর মৃত্যুর পর বিরহ-বিচ্ছেদে খুবই পেরেশান হয়ে পড়েছিলেন। ইত্যবসরে হযরত উসমান বিন মাযঊন রা.-এর সম্মানিতা স্ত্রী হযরত খাওলা বিনতে হাকীম রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে এসে অনুরোধ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কাকে বিয়ে করব? হযরত খাওলা রা. বললেন, বিধবা এবং কুমারী উভয় ধরনের মেয়েই আছে। আপনি তাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা বিয়ে করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওরা কারা?

খাওলা রা. বললেন, বিধবাদের মধ্যে সাওদা বিনতে যামআ, আর কুমারীদের মধ্যে আবু বকর রা.-এর কন্যা আয়েশা রা.। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ভালো হবে যদি তুমি আয়েশার ব্যাপারে কথোপকথন চালাও।

হযরত খাওলা রা. হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর নিকট তাশরীফ নিয়ে গেলেন এবং আয়েশার বিয়ের সম্মন্ধের ব্যাপারে কথা বললেন। আবু বকর রা. বললেন, খাওলা, আয়েশা তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাতিজি। (অর্থাৎ, সে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাতিজি, এমতাবস্থায় এ বিয়ে কেমন করে হতে পারে?)

হযরত খাওলা পুনরায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফিরে এসে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আবু বকর আমার ধর্মীয় ভাই। ধর্মীয় ভাইদের ক্ষেত্রে বিবাহ করা জায়েয।

এই মাসআলা জানতে পেরে হযরত আবু বকর রা. স্বতঃস্ফূর্ত ও খুশিমনে এই মোবারক আত্মীয়তার সম্পর্ক গঠনের প্রক্রিয়াকে সাদরে গ্রহণ করলেন। কিন্তু যেহেতু আগে থেকে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর সাথে জুবাইর ইবনে মুতইমের ছেলের বিয়ের কথা নির্ধারিত ছিল, তাই তাকে জিজ্ঞেস করাও জরুরি ছিল। এ জন্য হযরত আবু বকর রা. জুবাইরের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তোমার ছেলের সাথে আয়েশার বিয়ের ব্যাপারে কী বলো? জুবাইর ইবনে মুতইমের স্ত্রী এখনো ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়নি। সে এসে বলল, যদি এই মেয়ে (উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.) আমাদের ঘরে আসে, তাহলে আমাদের ছেলেও বাপ-দাদার ধর্ম ছেড়ে দেবে। আমি কখনোই এটি গ্রহণ করব না।

হযরত আবু বকর রা. সেখান থেকে এসে নিজের ঘরে তাশরীফ আনলেন এবং খাওলা রা.-কে বললেন, এই প্রস্তাব সর্বোতভাবে গৃহীত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই ইচ্ছা রাখেন, তাশরীফ রাখতে পারেন।

পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাশরীফ আনলে হযরত আবু বকর রা. বিবাহ পড়িয়ে দেন এবং মোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করেন চারশত দিরহাম।

আল্লাহর পথে চলো
এভাবে ওহীর মাধ্যমে ভেসে আসে আয়েশা রা.-এর মুখ। আল্লাহর রাসূলকে জানানো হয়, এই হবে উভয় জগতে আপনার জীবনসঙ্গিনী। আয়েশা তখনো ছোট্ট বালিকা। যখন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সিদ্দীকে আকবরের ঘরে বানানো মসজিদে তাশরীফ নিয়ে অত্যন্ত হৃদয়কাড়া সুমধুর কণ্ঠে তিলাওয়াত করতেন তখন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. সেই তিলাওয়াত থেকে উপকৃত হতেন। যদিও সময়টা শিশুকাল ছিল; কিন্তু আল্লাহ তাআলা যে সকল মহান সত্তাদেরকে উঁচু মর্যাদা দিতে চান তাদেরকে গোড়া থেকেই আল্লাহপ্রদত্ত যোগ্যতা দিয়ে অভিষিক্ত করেন। সেভাবেই উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. তার শিশুকালও বেকার যেতে দেননি; বরং স্বভাবোচিত মেধা ও স্মরণশক্তির বিনিময়ে সেই সময়টুকুও মূল্যবান করে তুলেছিলেন।

এ সময়টাতে মুশরিকরা আল্লাহর রাসূলের সাহাবীদের অমানুষিক নির্যাতন করতে থাকে। এদিকে তাকে ইশারা দেওয়া হয় মদীনার দিকে হিজরতের যেখানে পুণ্যবান আনসারগণ রয়েছেন। এক সময় আল্লাহ পক্ষ থেকে তিনি মদীনায় ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েমের অনুমতিপ্রাপ্ত হন।

বরকতময় হিজরত
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মাতা পিতাকে কখনো ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন পালন করতে দেখিনি এবং এমন কোনোদিন কাটেনি যেদিন সকালে কিংবা সন্ধ্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বাড়িতে আসেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমদের বললেন, আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান (স্বপ্নে) দেখানো হয়েছে। সে স্থানে খেজুর বাগান রয়েছে এবং তা দুইটি পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত। এরপর যারা হিজরত করতে চাইলেন, তারা মদীনার দিকে হিজরত করলেন। আর যারা হিজরত করে আবিসিনিয়ায় চলে গিয়েছিলেন, তাদেরও অধিকাংশ সেখান হতে ফিরে মদীনায় চলে এলেন।

আবু বকর রা.ও মদীনায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তুমি অপেক্ষা কর। আশা করছি আমাকেও অনুমতি দেওয়া হবে। আবু বকর রা. বললেন, আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান! আপনিও কি হিজরতের আশা করছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন আবু বকর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গ পাওয়ার জন্য নিজেকে হিজরত হতে বিরত রাখলেন এবং তার নিকট যে দু-টি উট ছিল এ দু-টি চার মাস পর্যন্ত বাবলা গাছের পাতা খাওয়াতে থাকেন।

ইবনু শিহাব উরওয়া রা. সূত্রে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, ইতোমধ্যে একদিন আমরা ঠিক দুপুর বেলায় আবু বকর রা. এর ঘরে উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে আবু বকরকে খবর দিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মস্তক আবৃত অবস্থায় আসছেন। তা এমন সময় ছিল, যে সময় তিনি পূর্বে কখনো আমাদের এখানে আসেননি। আবু বকর রা. তার আসার কথা শুনে বললেন, 'আমার মাতাপিতা তার প্রতি কুরবান। আল্লাহর কসম! তিনি এ সময় নিশ্চয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ কারণেই আসছেন।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৌঁছে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তাকে অনুমতি দেওয়া হলো। প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকরকে বললেন, 'এখানে অন্য যারা আছে তাদের বের করে দাও।' আবু বকর রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, তারা উভয়েই আমার কন্যা; তারা তো আপনার পরিবারের মতোই! তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে হিজরত এবং (মক্কা থেকে) বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।' আবু বকর রা. বললেন, 'আমরা কি একসঙ্গে যাব, হে আল্লাহর রাসূল?' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, একসঙ্গে।' আবু বকর রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমার পিতামাতা কুরবান! আপনি আমার এ দু-টি উটের যে কোনো একটি নিন।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তবে আমি এর মূল্য পরিশোধ করব।'

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আমরা তাদের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা অতি দ্রুত সম্পন্ন করলাম এবং একটি থলের মধ্যে তাদের খাদ্যসামগ্রী গুছিয়ে দিলাম। আমার বোন আসমা বিনতে আবু বকর রা. তার কোমরবন্ধের কিছু অংশ কেটে সে থলের মুখ বেঁধে দিলেন। এ কারণেই তাকে 'জাতুন নেতাক' (কোমরবন্দওয়ালী) বলা হতো।

আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রা. সাওর পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। তারা সেখানে তিনটি রাত অবস্থান করলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা. তাদের পাশেই রাত্রিযাপন করতেন। তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন তরুণ। তিনি শেষ রাত্রে ওখান হতে বেরিয়ে মক্কায় রাত্রি যাপনকারী কুরাইশদের সঙ্গে মিলিত হতেন এবং তাদের দু-জনের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করা হতো তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, ও স্মরণ রাখতেন। যখন আঁধার ঘনিয়ে আসত তখন তিনি সংবাদ নিয়ে তাদের উভয়ের কাছে যেতেন।

আবু বকর রা.-এর গোলাম আমির ইবনে যুহাইরা তাদের কাছেই দুধালো বকরির পাল চরিয়ে বেড়াত। রাতের কিছু সময় চলে গেলে পর সে বকরির পাল নিয়ে তাদের নিকটে যেত এবং তারা দু-জন দুধ পান করে আরামে রাত্রিযাপন করতেন। তারা বকরীর দুধ দোহন করে সাথে সাথেই পান করতেন। তারপর শেষ রাতে আমির ইবনে ফুহাইরা বকরিগুলি হাঁকিয়ে নিয়ে যেত। এ তিন রাতের প্রতি রাতে সে এমনই করল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রা. বনী আবদ ইবনে আদি গোত্রের এক ব্যক্তিকে মজুরির বিনিময়ে 'খিররীত' (পথ প্রদর্শক) নিযুক্ত করেছিলেন। দক্ষ পথপ্রদর্শককে 'খিররীত' বলা হয়। আদী গোত্রের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। সে ছিল কাফের কুরাইশের ধর্মাবলম্বী। তারা উভয়ে তাকে বিশ্বস্ত মনে করে তাদের উট দু-টি তার হাতে দিয়ে দিলেন এবং তৃতীয় রাত্রের পরে সকালে উট দু-টি সাওর গুহার নিকট নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন। আর সে যথা সময়ে তা পৌঁছিয়ে দিল। আর আমির ইবনে ফুহাইরা ও পথপ্রদর্শক তাদের উভয়ের সঙ্গে চলল। প্রদর্শক তাদের নিয়ে উপকূলের পথ ধরে চলতে লাগল।

ইবনে শিহাব রহ. বলেন, উরওয়া ইবনে যুবায়র রা. আমাকে বলেছেন, পথিমধ্যে যুবায়রের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ হয়। তিনি মুসলমানদের একটি বণিক কাফেলার সাথে সিরিয়া হতে ফিরছিলেন। তখন যুবায়র রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রা.-কে সাদা রঙের পোশাক দান করলেন। এদিকে মদীনায় মুসলিমগণ শুনলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা হতে মদীনার পথে রওনা হয়েছেন। তাই তারা প্রতিদিন সকালে মদীনার হাররা পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন, দুপুরে রোদ প্রখর হলে তারা ঘরে ফিরে আসতেন।

একদিন তারা পূর্বাপেক্ষা বেশি সময় প্রতীক্ষা করার পর নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন। এমন সময় এক ইহুদী একটি টিলায় আরোহণ করে এদিক ওদিক কী যেন দেখছিল। তখন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাথীসঙ্গীদের সাদা পোশাক পরা অবস্থায় দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমিতে ধীর গতিতে এগিয়ে আসতে দেখতে পেল। ইহুদী তখন নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল, 'হে ইয়াসরিববাসী, এই তো সেই ভাগ্যবান ব্যক্তি—যার জন্য তোমরা অপেক্ষা করছ।' মুসলিমগণ তাড়াতাড়ি হাতিয়ার তুলে নিয়ে মদীনার হাররার উপকণ্ঠে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি সকলকে নিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে বনু আমর ইবনে আউফ গোত্রে অবতরণ করলেন। এ দিনটি ছিল রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার।

আবু বকর রা. দাঁড়িয়ে লোকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নীরব রইলেন। আনসারদের মধ্য হতে যারা এ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেননি তারা আবু বকর রা.-কে সালাম করতে লাগলেন, তারপর যখন রৌদ্রের উত্তাপ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর পড়তে লাগল এবং আবু বকর রা. অগ্রসর হয়ে তার চাদর দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওপর ছায়া করে দিলেন তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিনতে পারল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু আমর ইবনে আউফ গোত্রে দশদিনের চেয়ে কিছু বেশি সময় কাটালেন এবং সে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে নামায আদায় করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উটনীতে আরোহণ করে রওনা হলেন। লোকেরাও তার সঙ্গে চলতে লাগলেন। মদীনায় মসজিদে নববীর স্থানে পৌঁছে উটনীটি বসে পড়ল। সে সময় ওই স্থানে কতিপয় মুসলিম নামায আদায় করতেন। এ জায়গাটি ছিল আসআদ ইবনে যুরারাহ এর আশ্রয়ে পালিত সাহল ও সুহায়েল নামক দু-জন ইয়াতীম বালকের খেজুর শুকাবার স্থান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে উটনীটি যখন এ স্থানে বসে পড়ল, তখন তিনি বললেন, ইনশাআল্লাহ, এ স্থানটিই হবে আবাসস্থল। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই বালক দু-টিকে ডেকে পাঠালেন এবং মসজিদ তৈরির জন্য তাদের কাছে জায়গাটি মূল্যের বিনিময়ে বিক্রয়ের আলোচনা করলেন। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল, বরং এটি আমরা আপনার জন্য বিনামূল্যে দিচ্ছি; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছ হতে বিনামূল্যে গ্রহণে অসম্মতি জানালেন এবং অবশেষে স্থানটি তাদের হতে খরিদ করে নিলেন। তারপর সেই স্থানে তিনি মসজিদ তৈরি করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদ নির্মাণকালে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে ইট বহন করছিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন :
أَيُّ بُيُوتِ أَهْلِنَا أَقْرَبُ ". فَقَالَ أَبُو أَيُّوبَ أَنَا يَا نَبِيَّ اللَّهِ ، هَذِهِ دَارِي ، وَهَذَا بَابِي. قَالَ " فَانْطَلِقُ فَهَيِّئُ لَنَا مَقِيلاً " . قَالَ قُومَا عَلَى بَرَكَةِ اللَّهِ
আমাদের লোকদের মধ্যে কার বাড়ি এখান হতে সবচেয়ে নিকটে? আবু আইয়ুব রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এই তো বাড়ি, এই যে তার দরজা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তবে চলো, আমাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করো। তিনি বললেন, আপনারা দু-জনেই চলুন। আল্লাহ বরকত দানকারী।

মদীনা তাইয়্যিবায় সুদিন ফিরে এলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পরিবার পরিজনদের মদীনায় নিয়ে আসার জন্য হযরত যায়িদ বিন হারেসা ও স্বীয় গোলাম হযরত আবু রাফে'কে মক্কা অভিমুখে পাঠালেন। একইভাবে হযরত আবু বকর রা. এক ব্যক্তিকে মক্কায় পাঠিয়েছেন। ওইদিকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর রা. স্বীয় মাতা হযরত উম্মে রুমান এবং দুই বোন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা ও হযরত আসমা রা.- কে নিয়ে মক্কা থেকে মদীনার পথে রওনা হয়ে গেছেন। যায়নাব থেকে যান আবুল আস-এর কাছে। তাকে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। বদরের পর তিনি হিজরত করেন।

উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় শুভাগমন করলে আবু বকর ও বিলাল রা. জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। হযরত আবু বকর রা. জ্বরাক্রান্ত হলে তিনি এ কবিতাংশটি আবৃত্তি করতেন :
كُلُّ امْرِي مُصَبِّحٌ فِي أَهْلِهِ وَالْمَوْتُ أَدْنَى مِنْ شِرَاكِ نَعْلِهِ
প্রতিটি ব্যক্তি তার পরিজনের মধ্যে সকালে শয্যা ত্যাগ করে; আর মৃত্যু তো জুতার ফিতার চেয়েও নিকটবর্তী।

আর হযরত বিলাল রা. জ্বর থেকে সেরে উঠলে উচ্চস্বরে এ কবিতাংশ আবৃত্তি করতেন :
أَلا لَيْتَ شِعْرِي هَلْ أَبِيتَنَّ لَيْلَةً بِوَادٍ وَحَوْلِي إِذْخِرٌ وَجَلِيلُ وَهَلْ أَرِدَنْ يَوْمًا مِيَاهَ مَجَنَّةٍ وَهَلْ يَبْدُونُ لِي شَامَةٌ وَطَفِيلُ
হায়, আমি যদি কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে মক্কার প্রান্তরে একটি রাত কাটাতে পারতাম! আর আমার চারদিকে থাকত ইযখির এবং জালীল ঘাস। মাজান্না ঝর্ণার পানি পানের সুযোগ কখনো হবে কি? আমার জন্য শামা এবং তফীল পাহাড় প্রকাশিত হবে কি?

আয়েশা রা. বলেন, এ সংবাদ রাসূলকে জানালে তিনি দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, মদীনাকে আমাদের নিকট মক্কার মতো বা তার চেয়েও বেশি প্রিয় করে দাও। হে আল্লাহ, আমাদের সা' ও মুদে বরকত দান করো এবং মদীনাকে আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর বানিয়ে দাও। এর জ্বরের প্রকোপকে বা মহামারীকে জুহফায় স্থানান্তরিত করে দাও।'

সৌভাগ্যের পায়রারা এভাবেই ডানা মেলে
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. হিজরতের পর মদীনা মুনাওয়ারায় বনু হারিস ইবনে খাযরাজের মহল্লায় নিজের আত্মীয়দের সাথে মিলিত হন। এখানেই তার আম্মাজানের সাথে ৭-৮ মাস পর্যন্ত অবস্থান করেন। মদীনা তাইয়্যিবার পানি ও বাতাস বৈরী থাকায় অধিকাংশ মুহাজিরীন অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্বয়ং আবু বকর রা.-এর মতো তার কন্যা উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুখের তীব্রতায় তার মাথার চুলও পড়ে গিয়েছিল।

উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর সুস্থতার পর হযরত আবু বকর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে অনুরোধ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এখন আপনি আপনার স্ত্রীকে আপনার ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন না কেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এখন আমার কাছে মোহর আদায় করার মতো মুদ্রা নেই। হযরত আবু বকর রা. অনুরোধের সুরে বললেন, আপনি আমার সম্পত্তি কবুল করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বার 'আউকিয়া' এবং এক 'নশ' অর্থাৎ একশ' টাকা হযরত আবু বকর রা.-এর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর কাছে পাঠালেন। পরে আনসারী মেয়েরা নববধু নিয়ে যেতে হযরত আবু বকর রা.-এর ঘরে আসলেন। হযরত উম্মে রুমান রা. উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-কে ডাকলেন। সে সময় তিনি তার বান্ধবীদের সাথে খেলা করছিলেন।

ঘটনাটি উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর মুখ থেকেই শোনা যাক। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমাকে বিবাহ করেন, তখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর। তারপর আমরা মদীনায় এলাম এবং বনু হারিস গোত্রে অবস্থান করলাম। সেখানে আমি জ্বরে আক্রান্ত হলাম। এতে আমার চুল পড়ে গেল। পরে যখন আমার মাথার সামনের চুল জমে উঠল। সে সময় আমি একদিন আমার বান্ধবীদের সাথে দোলনায় খেলা করছিলাম। তখন আমার মাতা উম্মে রুমান আমাকে উচ্চস্বরে ডাকলেন। আমি তার কাছে এলাম। আমি বুঝতে পারিনি, তার উদ্দেশ্য কী? তিনি আমার হাত ধরে ঘরের দরজায় এসে আমাকে দাঁড় করালেন। আর আমি হাঁফাচ্ছিলাম। শেষে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা প্রশমিত হলো। এরপর তিনি কিছু পানি নিলেন এবং তা দিয়ে আমার মুখমণ্ডল ও মাথা মাসেহ করে দিলেন। তারপর আমাকে ঘরের ভেতর প্রবেশ করালেন। সেখানে কয়েকজন আনসারী মহিলা ছিলেন। তারা বললেন, 'তোমার আগমন শুভ ও কল্যাণময় হউক। আমাকে তাদের কাছে দিয়ে দিলেন। তারা আমার অবস্থান ঠিক করে দিলেন; তখন ছিল দ্বিপ্রহরের পূর্বমুহূর্ত। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে আমি হকচকিয়ে গেলাম। তারা আমাকে তার কাছে তুলে দিলেন। সে সময় আমি নয় বছরের বালিকা।

রাসূল সা. আয়েশা রা. ছাড়া আর কোনো কুমারীকে বিয়ে করেননি
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, মনে করুন, আপনি একটি ময়দানে পৌঁছেছেন, সেখানে একটি গাছ আছে যার কিছু অংশ খাওয়া হয়ে গেছে। আর এমন আর একটি গাছ পেলেন, যার কিছুই খাওয়া হয়নি। এর মধ্যে কোনো গাছের পাতা আপনার উটকে খাওয়াবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, যে গাছ থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। এ কথার উদ্দেশ্য হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ব্যতীত অন্য কোনো কুমারীকে বিয়ে করেননি।

বরকতময় ঘর
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. পারিবারিক জীবন ক্ষুধা, দারিদ্রতা, অভাব ও অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে কাটিয়েছেন। যেই ঘরে বউ হয়ে এলেন, সেটা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবার। খুব স্বল্প সামগ্রীই ছিল সেখানে। রাতের বেলা বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থাও ছিল পরিবারবর্গের সামর্থ্যের বাইরে। চল্লিশ রাত অতিবাহিত হতো; কিন্তু ঘরে বাতির আলো জ্বলত না। মাসের পর মাস রান্নাঘরের চুলাও জ্বলত না। শুধুমাত্র ছাতু খেয়ে আর পানি পান করে দিনের পর দিন কাটাতেন। যদি কখনো ঘরে খাবারের মতো কিছু আসত, তাও উদারতার কারণে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে দিতেন। সব মিলে ঘরে মাত্র দুজন মানুষ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.। কিছুদিন পর বাঁদি বারারাহ ঘরওয়ালাদের মধ্যে শামিল হয়ে গেলেন।

ঘরটি কোনো আলিশান অট্টলিকা ছিল না। মদীনার বনু নাজ্জার মহল্লার মসজিদে নববীর চারপাশে ছোট্ট ছোট্ট কিছু কাঁচা ঘর ছিল, তারই একটিতে তিনি এসে ওঠেন। ঘরটি ছিল মসজিদের পূর্ব দিকে। তাঁর একটি দরজা ছিল পশ্চিম দিকে মসজিদের ভিতরে। ফলে মসজিদ ঘরের আঙিনায় পরিণত হয়। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই দরজা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতেন। তিনি যখন মসজিদে ইতিকাফ করতেন, মাথাটি ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন, আর আয়েশা রা. চুলে চিরুনি করে দিতেন। কখনো মসজিদে বসেই ঘরের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে কোনো কিছু আয়েশা রা.-এর নিকট থেকে চেয়ে নিতেন।

ঘরটির প্রশস্ততা ছিল ছয় হাতের সামান্য বেশি। দেয়াল ছিল মাটির। খেজুর পাতা ও ডালের ছাদ ছিল। তার উপরে বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য কম্বল দেওয়া হত। যেত। এতটুকু উঁচু ছিল যে, একজন মানুষ দাঁড়ালে তার হাতে ছাদের নাগাল পাওয়া যেত। এক পাল্লার একটি দরজা ছিল, কিন্তু তা কখনো বন্ধ করার প্রয়োজন পড়েনি।

পর্দার জন্য দরজায় একটি কম্বল ঝুলানো থাকত। এই ঘরের লাগোয়া ছিল আরও একটি ঘর—যাকে 'মাশরাবা' বলা হতো। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীদের থেকে পৃথক থাকা কালে এক মাস এখানেই কাটান।

কী ছিল সেই ঘরের আসবাবপত্র? সেগুলোর মধ্যে ছিল একটি খাট, একটি চাটাই, একটি বিছানা, একটি বালিশ, খোরমা-খেজুর রাখার দুইটি মটকা, পানির একটি পাত্র এবং পান করার একটি পেয়ালা। এর বেশি কিছু নয়। বিভিন্ন হাদীসে একাধিক স্থানে এইসব জিনিসের নামই এসেছে।

যতদিন আয়েশা ও সাওদা মাত্র দুই স্ত্রীই ছিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন পর পর আয়েশা রা.-এর ঘরে রাত কাটাতেন। পরে আরও কয়েকজনকে স্ত্রীর মর্যাদা দান করলে এবং হযরত সাওদা রা. স্বেচ্ছায় স্বীয় বারির দিনটি আয়েশা রা.-কে দান করলে প্রতি নয় দিনে দুই দিন কাটাতেন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর ঘরে।

ঘর-গৃহস্থালীর গোছগাছ ও পরিপাটির বিশেষ কোনো প্রয়োজন পড়ত না। খাবার তৈরি ও রান্নাবান্নার সুযোগ খুব কমই আসত। হযরত আয়েশা রা. নিজেই বলতেন, কখনো একাধারে তিন দিন এমন যায়নি—যখন নবী পরিবারের লোকেরা পেট ভরে খেয়েছেন। তিনি আরও বলতেন, মাসের পর মাস ঘরে আগুন জ্বলত না। এ সময় খেজুর ও পানির ওপরই কাটত।

অবশ্য সেই ঘরে অভূতপূর্ব এক সম্পদ ছিল। আর তা ছিল পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক সহমর্মিতা, হামদর্দী ও নির্মল ভালোবাসা। এ কারণেই উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. মাত্র ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহুমুখী কষ্ট-ক্লেশ, পেরেশানী, অভাব-অনটনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও 'ঈলা'র ঘটনা ব্যতিরেকে কখনো কোনো সাধারণ রাগ বা অভিযোগের কথাও মুখে আনেননি। নববী কাননটি তাদের পারস্পরিক মুহাব্বত, ভালোবাসা, হামদর্দী, একতা ও অগাধ বিশ্বাসের সুবাসই মোহিত করে রাখত।

অনুপম চরিত্রমাধুরি
আল্লাহ তাআলা উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-কে অতুলনীয় উন্নত চরিত্র ও পছন্দনীয় গুণে গুণান্বিত করেছেন। জীবনটা যদিও অভাব-অনটনে কাটিয়েছেন; কিন্তু কখনো মুখে অভিযোগের কোনো শব্দও উচ্চারণ করেননি। অল্পে তুষ্টির বাতি উজ্জ্বল রেখেছিলেন সারাক্ষণ। সর্বদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য এবং তার শান্তি, সুখ ও সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যস্ত থাকতেন। এমনকি তার আত্মীয়-স্বজনদের প্রতিও যথাসম্ভব খেয়াল রাখতেন।

ইবাদতে মগ্নতার এমন অবস্থা ছিল যে, তাহাজ্জুদ, চাশত্ এবং অন্যান্য নফল নামায কোনো অবস্থাতেই ছাড়তেন না। কঠিন ও তীব্র গরমের দিনেও রোযা রাখতেন। প্রতি বছর হজ করা ছিল তার অভ্যাস। আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের চিন্তায় তটস্থ থাকতেন সারাক্ষণ। পরকালের ভয় যখন অশ্রু হয়ে ঝরত তিনি তখন কাঁপতে থাকতেন। মনটা ছিল খুবই নরম। চারিত্রিক উদারতা ও দানশীলতার মনোভাব এমন ছিল যে, এক লাখ দিরহাম একদিনের সাদাকা করে দেওয়া এবং নিজের জন্য কিছুই অবশিষ্ট না রাখা ছিল তার জন্য সাধারণ ব্যাপার। সব সময় অন্যদের সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। কারও বৈধ অভিযোগে কখনো মনোঃক্ষুণ্ণ হতেন না।

পারতপক্ষে কারও সাহায্য বা দাক্ষিন্য নিতেন না। সাহস ও নির্ভিকতায় অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। রাতের বেলা ঘুম থেকে জেগে একাকী কবরস্থানে চলে যেতেন। জিহাদের ময়দানে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত ইতিহাসের বুকে খোদাই করা থাকবে। হক কথা প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় ক্ষমতাধর হাকিমেরও পরোয়া করতেন না। তার অন্তর্দৃষ্টি ছিল প্রচণ্ড সজাগ। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র এবং সাধারণ মামুলি কথার প্রতিও খুব খেয়াল রাখতেন। গোলাম এবং অধীনস্থদের সাথে উত্তম ও দয়া-মায়া-মমতার ব্যবহার করতেন। নিজের সতীনদের সাথেও সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। তাদের গুণাবলি প্রাণখুলে বর্ণনা করতেন। মানুষের সাথে ব্যক্তিত্ব অনুসারে কথা বলা ও লেন-দেন করা ছিল তার উন্নত চরিত্র মাধুরীর আরেক উজ্জ্বল দিক।

গীবত, কুধারণা, মিথ্যা অপবাদ ও কাউকে দোষারোপ বা অভিশম্পাত দেওয়া থেকে আজীবন বিরত থেকেছেন। 'পর্দা'—যা নারীজাতির অত্যাবশ্যকীয় গুণ এবং প্রাকৃতিক ভূষণ, সেদিকে সর্বক্ষণ সতর্ক ও সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। এমনকি নিজের দুধ-ভাইয়ের চাচার সাথেও পর্দা করতে চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পেয়ে পর্দা ছেড়েছেন।

মোটকথা, উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর পবিত্র সত্তায় এতগুলো গুণের সমাবেশ ঘটেছিল—যার মধ্যে সত্যবাদিতা, ভারসাম্য, আমানত রক্ষা, অল্পেতুষ্টি, বন্দেগী, পবিত্রতা, বদান্য, সাহসিকতা, ইসলামী আইনে প্রাজ্ঞতা, সত্য অন্বেষণ, ইবাদত, স্মরণশক্তি, আত্মপরিচয়, সাহিত্য, ভাষায় দক্ষতা, অন্যকে ক্ষমা করে দেওয়া ও ধৈর্যশক্তি ইত্যাদি সমুদয় উন্নত গুণাবলি সন্নিবেশ ঘটেছিল। সেকালের আরবে কুনিয়াত বা উপনাম ছিল শরাফত ও আভিজাত্যের প্রতীক। অভিজাত শ্রেণির লোকদের নাম ধরে ডাকার নিয়ম ছিল না। কুনিয়াত বা উপনামেই তাদেরকে সম্বোধন করা হতো। কুনিয়াত হয় কোনো সন্তানের নামের সাথে। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. ছিলেন নিঃসন্তান। তাই তার কোনো কুনিয়াত ছিল না। আবদুল্লাহ ছিলেন আয়েশা রা.-এর বোন আসমা রা.-এর ছেলে। ইতিহাসে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর নামে প্রসিদ্ধ। একদিন আয়েশা রা. স্বামী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, আপনার অন্য স্ত্রীগণ তাদের পূর্বের স্বামীদের সন্তানদের নামে নিজেদের কুনিয়াত ধারণ করেছেন, আমি কার নামে কুনিয়াত ধারণ করি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার বোনের ছেলে আবদুল্লাহর নামে। সেই দিন থেকে তার কুনিয়াত বা ডাকনাম হয় 'উম্মু আবদিল্লাহ' বা 'আবদুল্লাহ্ মা'।

শৈশবের চঞ্চলতা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রা.-এর বয়স স্বল্পতার বিষয়টি খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতেন। এই অল্প বয়সেই তিনি অতুলনীয় জ্ঞান ও মেধার অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন। মাঝেমধ্যে তার বালিকাসুলভ চঞ্চলতা ও আবেগময় দৃষ্টিকে খুব মূল্যায়ন করতেন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাশরীফ এনেছেন, এমন সময় হঠাৎ আমরা শোরগোল শুনতে পেলাম। ছোট ছেলে-মেয়েদের হৈ-হুল্লোড়ের শব্দও শোনা যাচ্ছে। নবীজী উঠে দেখলেন, এক হাবশী মহিলা ছোট ছেলে-মেয়েদের সামনে বিচিত্র ও আশ্চর্যজনক ক্রীড়া পরিবেশন করছে এবং নাচছে। ছোট ছেলে-মেয়ে এবং এলাকার লোকজন তার চতুর্পার্শ্বে ঘিরে তা দেখছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, আয়েশা, এদিকে এসো, দেখ! আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তার কাঁধ মোবারকের ওপর স্বীয় মুখ রেখে (কাঁধ এবং মাথার মাঝখানে) সেই মহিলাকে দেখছিলেন। কিছুক্ষণ পর নবীজী আয়েশা রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, কী হলো, মন ভরে গেছে? আমি রাসূলকে বললাম, না। (আমি আরও দেখতে চাই)।

আমার এই বলা এ জন্য ছিল না যে, আমার দেখার আগ্রহ ছিল; বরং আমি তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরে আমার ভালোবাসা এবং আমার মর্যাদার মূল্যায়ন করতে চাচ্ছি যে, প্রিয়নবীর কাছে আমার মরতবা কেমন? এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসে গেলেন।

এসময় হঠাৎ হযরত উমর ফারুক রা. ওখান দিয়ে অতিক্রমকালে তার গাম্ভীর্য ও ভয়ে লোকজনের সমাগম মুহূর্তের বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমি জিন ও মানব সম্প্রদায়ের শয়তানকে দেখছিলাম। তাদেরকে এই উমরের ভয়ে ভেগে যেতে দেখলাম।' এরপর আয়েশা ফিরে এলেন। অপর বর্ণনায় আছে, উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন হাবশীদের খেলা দেখছিলাম। তারা মসজিদের আঙিনায় খেলা খেলছিল। আমি খেলা দেখে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেখছিলাম। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রেখেছিলেন। তোমরা অনুমান করো, অল্পবয়স্কা মেয়েরা খেলাধুলা দেখতে কী পরিমাণ আগ্রহী!

অন্যত্র হযরত আয়েশা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনেই আমি পুতুল বানিয়ে খেলতাম। আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলা করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলে তারা দৌড়ে পালাত। তখন তিনি তাদের ডেকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন এবং তারা আমার সঙ্গে খেলত।

'শুনেছি, সুলাইমান আ.-এর ঘোড়ার পাখা ছিল'
একবার উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. খেলা করছিলেন। সেই খেলনায় একটি ঘোড়াও ছিল; যার ডানে-বাঁয়ে ছিল দু-টি পাখা। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওখান দিয়ে কোথাও যেতে গিয়ে এই খেলনা-ঘোড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে আয়েশা রা. জবাবে বললেন, এটা ঘোড়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঘোড়ার তো পাখা থাকে না। আয়েশা রা. দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিলেন, 'কেন? হযরত সুলাইমান আ.-এর ঘোড়ার তো পাখা ছিল।'

এমনও হয়!
একবার এক মেয়েকে সঙ্গে করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশার নিকট এসে বললেন, 'তুমি এই মেয়েটিকে চেন?' আয়েশা রা. বললেন, 'না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'সে অমুকের দাসী। তুমি কি তার গান শুনতে চাও?' আয়েশা রা. শোনার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। দাসীটি দীর্ঘক্ষণ গান গাইল। এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্পর্কে মন্তব্য করলেন, 'শয়তান তার নাকের ছিদ্রে বাদ্য বাজায়।' অর্থাৎ এ ধরনের গান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপছন্দ করেন।

উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-কে খুশি করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝে মধ্যে তাকে গল্পও শোনাতেন। আবার কখনো কখনো ধৈর্যসহকারে আয়েশা রা.-এর গল্পও শুনতেন।

একটি যুদ্ধের প্রাক্কালে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সফরসাথী ছিলেন। রাস্তায় চলা অবস্থায় হুযুরে আকরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা সামনে এগোতে থাক। পরে আয়েশা রা.-কে বললেন, 'এসো। আমরা উভয়ে দৌড়ে দেখি, কে আগে পৌঁছতে পারি।' আয়েশা রা. হালকা-পাতলা ছিলেন। এজন্য তিনি দৌড়ে রাসূলের আগে চলে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু বললেন না।

কয়েক বছর পরে ঠিক এমনই এক সময়ে একই জায়গা সম্মুখে এলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের সামনে অগ্রসর হতে বললেন এবং আয়েশা রা.-কে (যিনি আগের তুলনায় একটু স্থূল হয়ে উঠেছেন এবং আগের ঘটনাও ভুলে গেছেন) বললেন, 'এসো। উভয়ে দৌড়ে দেখি, কে অগ্রগামী হয়।' এবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৌড়ে আগে চলে গেলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকি হাসলেন এবং বললেন, আয়েশা, এটা সেই দিনের জবাব এবং বদলা।

একবার আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে একটু উঁচু গলায় কথা বলছিলেন। এমন সময় পিতা আবু বকর রা. এসে উপস্থিত হলেন। তিনি মেয়ের এমন বেয়াদবী দেখে রেগে গেলেন এবং মারার জন্য হাত উঁচু করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্রুত মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে আয়েশাকে রক্ষা করলেন। আবু বকর রা. চলে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশাকে বললেন, 'দেখলে, আমি তোমাকে কীভাবে বাঁচালাম?

সীরাত ও হাদীসের গ্রন্থসমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আয়েশা রা.-এর প্রেম-প্রীতি ও মান-অভিমানের এক চমৎকার দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। ইসলাম যে মানুষের স্বাভাবগত নির্মল আগে-অনুভূতিকে অস্বীকার করেনি তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের আচরণের মধ্যে। কখনো কখনো তাদের দেখা যায় সাধারণ মানুষের মতো আবেগপ্রবণ। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আয়েশা রা. যেমন একজন নবীর স্ত্রী, তেমনি একজন নারীও বটে। আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমন একজন নবী ও রাসূল তেমনি একজন স্বামীও বটে সুতরাং স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের এমন বহু আচরণ ও মান-অভিমানের কথা ও ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যা অতি চমকপ্রদ ও শিক্ষণীয়।

নিশ্চয় তিনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত
আম্মাজান আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যেই অনুপম চরিত্র মাধুরীর বর্ণনা দিয়েছেন—তা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। আল্লাহ তাআলা নিজেই যেখানে বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
আর নিশ্চয় তুমি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।

হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কোনো স্ত্রী বা দাসীকে প্রহার করেননি। সব সময় তো ইবাদতেই কাটিয়ে দিতেন এবং উম্মতের চিন্তায় পেরেশান থাকতেন। অবশ্য তিনি ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী।

আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা রা.-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গৃহে কী কাজ করতেন? তিনি বললেন, তিনি ঘরের কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন, যখন আযান শুনতেন, তখন বেরিয়ে পড়তেন।

উচ্চতর শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জ্ঞান-প্রজ্ঞায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সব সময় দয়া ও সহানুভূতির অনুশীলন করাতেন। ইসলামের শত্রুরা ইসলামের ওপর বিভিন্নভাবে আক্রমণ করে যেত। ইহুদীরাও এ ক্ষেত্রে যে কোনো সুযোগকে কাজে লাগাতে সচেষ্ট ছিল। এটা ছিল তাদের প্রাকৃতিক অভ্যাস। এ অভ্যাস মতে একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কিছু ইহুদী এসে তাদের আত্মিক শত্রুতার দুরভিসন্ধি চরিতার্থে বলল, اَلسَّامُ عَلَيْكَ 'আসসামু আলাইকা' অর্থাৎ 'তোমার মৃত্যু হোক'। ঘটনাক্রমে সেখানে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাদের কথা শুনছিলেন এবং বুঝতে পারলেন اَشَامُ عَلَيْكَ বলে তারা কী বোঝাতে চেয়েছে। এর মর্মার্থ কী? এটাও তিনি অনুধাবন করলেন। সায়্যিদা উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. প্রচণ্ড ক্ষোভে তাদের জবাবে বললেন 'তোমাদের মৃত্যু হোক এবং আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হোক।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা শুনে বললেন, আয়েশা, কঠিন কথা বলো না। আল্লাহ তাআলা নরম কথা বলা পছন্দ করেন। এটাও বললেন যে, وَعَلَيْكُمْ 'ওয়ালাইকুম' বলে তাদের কথা তাদেরকেই ফেরত দিয়েছি। আমার অভিশাপ তাদের জন্য কবূল হলো; কিন্তু তাদের বদদুআ আমার ব্যাপারে কখনোই কবুল হবে না।'

ইনসাফ ও শুধরে দেওয়া
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ছাড় দিতেন না। তার অত্যধিক ভালোবাসাও এক্ষেত্রে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. নয় বছর বয়স থেকে রাত-দিনের এ দীর্ঘ সময়ের সাহচর্য ও সান্নিধ্যে কখনো কোনো নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করেননি। এমনকি ইশারা ইঙ্গিতেও কখনো অনুচিত বা অশোভন কথা বলেননি। হঠাৎ কোনো ভুল হয়ে গেলে সাথে সাথেই তা শুধরে নিতেন।

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন, তিনি একটি ছবিওয়ালা বালিশ ক্রয় করেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা দেখতে পেয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন, ভেতরে প্রবেশ করলেন না। আমি তার চেহারায় অসন্তুষ্টি ভাব দেখতে পেলাম। তখন বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহ ও তার রাসূলের কাছে তওবা করছি। আমি কী অপরাধ করেছি?' তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এ বালিশ কোত্থেকে এলো?' আমি বললাম, 'আমি এটি আপনার জন্য ক্রয় করেছি, যাতে আপনি টেক লাগিয়ে বসতে পারেন।' তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এই ছবি তৈরিকারীদের কিয়ামাতের দিন শাস্তি দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে, তোমরা যা তৈরি করেছিলে, তা জীবিত করো।' তিনি আরও বলেন, 'যে ঘরে এসব ছবি থাকে, সে ঘরে (রহমতের) ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না।' পরে তিনি সেটি সরিয়ে ফেললে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রবেশ করেন।

রাসূলের ওপর ঈর্ষা
আয়েশা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভীষণ ভালোবাসতেন। এর কোনো তুলনা ছিল না। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বলেন, একবার রাতের বেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কাছ থেকে বাইরে তাশরীফ নিয়ে গেলেন। তার ওপর আমার ঈর্ষা হলো। পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে আমার অবস্থা দেখে বললেন, 'হে আয়েশা, তোমার কী হলো? তুমি কি ঈর্ষা করছ?' উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. আরয করলেন, 'আমার মতো মেয়ে আপনার মতো বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারীকে কী করে ঈর্ষা না করে?'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার কাছে তোমার শয়তান এসেছিল।' উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. আরয করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আমার সাথেও কি শয়তান থাকতে পারে?' রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ।' উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. আরয করলেন, 'প্রত্যেক মানুষের কাছেই কি শয়তান থাকে?' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ।' পরে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. আরয করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আপনার সাথেও?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ। তবে আমার প্রতিপালক তার মোকাবেলায় আমার সাহায্য করে থাকেন। সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমি তার থেকে নিরাপদ।'

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীদের সঙ্গে অবস্থানের পালার ব্যাপারে আমাদের থেকে অনুমতি চাইতেন এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরও;
تُرْجِي مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُئْوِى إِلَيْكَ مَنْ تَشَاءُ وَ مَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكَ
আপনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট হতে দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট স্থান দিতে পারেন এবং আপনি যাকে দূরে রেখেছেন তাকে কামনা করলে আপনার কোনো অপরাধ নেই। (সূরা আহযাব, ৩৩ : ৫১)

এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর মুআয বলেন, আমি আয়েশা রা.-কে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি এর উত্তরে কী বলতেন?' তিনি বললেন, 'আমি তাকে বলতাম, এ বিষয়ের অধিকার যদি আমার থেকে থাকে তাহলে হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার ব্যাপারে অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দিতে চাই না।

তোমার আম্মু রাগ করেছে
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোনো এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার একজন স্ত্রীর কাছে ছিলেন। ওই সময় উম্মাহাতুল মুমিনীনের আর একজন একটি পাত্রে কিছু খাদ্য পাঠালেন। যে স্ত্রীর ঘরে নবীজী অবস্থান করছিলেন সে স্ত্রী খাদিমের হাতে আঘাত করলেন। ফলে খাদ্যের পাত্রটি পড়ে ভেঙে গেল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাত্রের ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে একত্র করলেন, তারপর খাদ্যগুলো কুড়িয়ে তাতে রাখলেন এবং বললেন, তোমাদের আম্মাজীর আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লেগেছে। তারপর তিনি খাদিমকে অপেক্ষা করতে বললেন এবং যে স্ত্রীর কাছে ছিলেন তার নিকট হতে একটি পাত্র নিয়ে যার পাত্র ভেঙেছিল, তার কাছে পাঠালেন এবং ভাঙা পাত্রটি যে ভেঙেছিল তার ঘরেই রাখলেন।

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যেসব নারী নিজেকে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হেবাস্বরূপ ন্যস্ত করে দেন, তাদের আমি ঘৃণা করতাম। আমি (মনে মনে) বলতাম, নারীরা কি নিজেকে ন্যস্ত করতে পারে? এরপর যখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন, 'আপনি তাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট হতে দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট স্থান দিতে পারেন। আর আপনি যাকে দূরে রেখেছেন, তাকে কামনা করলে আপনার কোনো অপরাধ নেই।' তখন আমি বললাম, আমি দেখছি যে, আপনি যা ইচ্ছা করেন আপনার রব, তা-ই শীঘ্র পূর্ণ করে দেন।

তীক্ষ্ণ অনুভূতি ও ধীশক্তি
আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার সাথে ছিলেন এমন এক রাতে তিনি চাদর এবং জুতা মোবারক খুলে রাখলেন। আমি সেগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পায়ের কাছে রাখলাম। তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন; কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত ঘুমাননি, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি নিশ্চিত হননি যে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। (তিনি যখন ভাবলেন, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি) খুবই ধীরে ধীরে স্বীয় চাদর উঠালেন এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে জুতা পরে দরজার বাইরে বের হলেন। খুবই আস্তে ও ধীরে দরজা বন্ধ করলেন। আমিও নিজেকে লুকিয়ে রেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেছনে পেছনে চললাম।

তিনি জান্নাতুল বাকীতে পৌঁছে গেলেন এবং অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। শেষে তিনি তিনবার হাত মোবারক উপরের দিকে উঠিয়ে দ্রুত ফিরে আসলেন। আমিও খুব দ্রুত ঘরের দিকে ফিরে আসলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগে ঘরে এসে পৌঁছলাম।

তিনি ঘরে এসে ভালোবাসার সুরে বললেন, 'হে আয়েশা, তুমি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছ কেন?' উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বললেন, 'কিছু না, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।' তিনি বললেন, তুমি আমাকে বলবে? নাকি 'লতীফ ও খবীর' আল্লাহ তাআলা আমাকে খবর পাঠাবেন? আয়েশা রা. আরয করলেন, আমার আব্বা-আম্মা আপনার ওপর কুরবান হোক, তারপর তিনি সব ঘটনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলে শোনালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেই ছায়া কি তোমারই ছিল, যা আমি আমার সামনে দেখেছিলাম?

আমি আরজ করলাম, জি হ্যাঁ। তিনি আমাকে চিমটি কাটলেন, এতে আমি সামান্য ব্যথা অনুভব করলাম। পরে তিনি বললেন, তুমি কি এমন ধারণা করেছ যে, আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার সাথে কোনো প্রকার বেইনসাফী করবে?

উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. আরজ করলেন, মানুষ যতই তার কথাকে গোপন রাখুক, আল্লাহ সে বিষয়ে অবগত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। আমার কাছে জিবরাঈল আমীন আলাইহিস সালাম সে সময়ে এসেছেন যখন তুমি আমাকে দেখেছিলে। পরে তিনি আমাকে গোপনে ও আস্তে আওয়ায দিলেন। আমিও আস্তে উত্তর দিলাম, যাতে তুমি অবগত না হও। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম পর্দা ব্যতিরেকে তোমার কাছে আসতে পারছে না। তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ ভেবে তোমাকে জাগানো সমুচিত মনে করিনি। তোমাকে জাগালে তুমি ভীত হও কি না সে আশঙ্কাও করছিলাম। পরে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরজ করলেন, আপনার প্রতিপালক আপনাকে এই নির্দেশ দিয়েছেন যে, জান্নাতুল বাকীতে দাফনকৃতদের কাছে গিয়ে তাদের জন্য মাগফিরাতের দুআ করুন। উম্মুল মুমিনীন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমরা তাদের জন্য কীভাবে দুআ করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এভাবে বলবে, "শান্তি বর্ষিত হোক মুমিন ও মুসলমান পুরুষ (ও নারীদের) ওপর, যারা এই ঘরে অবস্থান করছে। (অর্থাৎ, কবরে শায়িত আছে)। আল্লাহ তাআলা রহম করুন তাদের ওপর যারা মৃত্যুর ব্যাপারে আমাদের অগ্রগামী। তাদের ওপরও যারা তাদের পেছনে রয়ে গেছেন। (অর্থাৎ, জীবিত আছেন)। নিঃসন্দেহে আমরা (একদিন) ইনশাআল্লাহ তোমাদের সাথে মিলিত হবো। (অর্থাৎ, আমরাও মৃত্যুর পানীয় পান করব)।

মধুর ঘটনা
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধু ও হালুয়া (মিষ্টি) পছন্দ করতেন। আসর নামায শেষে তিনি তার স্ত্রীদের নিকট যেতেন। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সময় কাটাতেন। একদা তিনি হাফসা বিনতে উমরের নিকট গেলেন এবং অন্যান্য দিনের চেয়ে অধিক সময় কাটালেন। এতে আমি ঈর্ষা বোধ করলাম। পরে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, তার হাফসার) গোত্রের এক মহিলা তাকে এক পাত্র মধু উপঢৌকন দিয়েছিল। তা থেকেই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিছু পান করিয়েছেন। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমরা এজন্য একটা মতলব আঁটব। এরপর আমি সাওদা বিনতে যাম'আহকে বললাম, তিনি তো এখনই তোমার কাছে আসছেন, তিনি তোমার নিকটবর্তী হলেই তুমি বলবে, আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন? তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে বলবেন 'না'। তখন তুমি তাকে বলবে, তবে আমি কীসের গন্ধ পাচ্ছি? তিনি বলবেন, হাফসা আমাকে কিছু মধু পান করিয়েছে। তুমি তখন বলবে, এর মৌমাছি মনে হয় 'উরফুত নামক বৃক্ষ থেকে মধু সংগ্রহ করেছে। আমিও তাই বলব। সাফিয়্যা! তুমিও তাই বলবে।

আয়েশা রা. বলেন, সাওদা রা. বললেন, আল্লাহর কসম, তিনি দরজার নিকট আসতেই আমি তোমার ভয়ে তোমার আদিষ্ট কাজ পালনে প্রস্তুত হলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তার নিকটবর্তী হলেন, তখন সাওদা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি মাগাফির খেয়েছেন? তিনি বললেন, না। সাওদা বললেন, তবে আপনার নিকট হতে এ কীসের গন্ধ পাচ্ছি? তিনি বললেন হাফসা আমাকে কিছু মধু পান করিয়েছে। সাওদা বললেন, এ মধু মক্ষিকা 'উরফুত' নামক গাছ থেকে সংগ্রহ করেছে। এরপর তিনি ঘুরে যখন আমার নিকট এলেন, তখন আমিও ওই রকম বললাম। তিনি সাফিয়্যাহর নিকট গেলে তিনিও তেমনই কথা বললেন। পরদিন যখন তিনি হাফসাহর কাছে গেলেন, তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনাকে মধু পান করাব কি? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার এর কোনো দরকার নেই। 'আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, সাওদা বললেন, আল্লাহর কসম, আমরা তাকে বিরত রেখেছি। আমি বললাম, চুপ করো।'

খাদীজার প্রতি আয়েশার ঈর্ষা
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য কোনো স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা করিনি যতটুকু খাদীজা রা.-এর প্রতি করেছি। অথচ আমি তাকে দেখিনি; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কথা বেশি সময় আলোচনা করতেন। কোনো কোনো সময় বকরী যবহ করে গোশতের পরিমাণ বিবেচনায় হাড়-গোস্তকে ছোট ছোট টুকরা করে হলেও খাদীজা রা.-এর বান্ধবীদের ঘরে পৌঁছে দিতেন। আমি কোনো সময় ঈর্ষা ভরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতাম, মনে হয়, খাদীজা রা. ছাড়া দুনিয়াতে যেন আর কোনো নারী নাই। উত্তরে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন :
إِنَّهَا كَانَتْ وَكَانَتْ وَكَانَ لِي مِنْهَا وَلَدٌ
হ্যাঁ। তিনি এমন ছিলেন, এমন ছিলেন, তার গর্ভে আমার সন্তানাদি জন্মেছিল।

যখন তাওহীদের বাণী প্রচারের এক চরম কঠিন মুহূর্ত ছিল, তখন খাদীজা রা.-এর মতো বিশ্বস্ত, খেদমতকারিণী, বুদ্ধিমতি, বিচক্ষণ, দুঃসাহসী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্না একজন জীবনসঙ্গিনীর বিয়োগ-ব্যথা কত বড় শোক ও বেদনার, উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে তা সহজেই অনুমেয়।

এ হচ্ছে আবু বকরের কন্যা
রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যথাসম্ভব সমুদয় ঐচ্ছিক কর্মকাণ্ডে স্বীয় পূতঃপবিত্র সহধর্মিণীগণের সঙ্গে ন্যায় ও ইনসাফের ব্যবহার করতেন। উম্মুল মুমিনীনগণ এটা চাইতেন যে, তাদের ব্যাপারে রাসূলের অন্তরের ভালোবাসাও সমান হওয়া চাই। অথচ অন্তরের ভালোবাসা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ব্যাপার। এতে ন্যায় ও সমতা বিধান মানুষের সাধ্যের বাইরে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অত্যধিক আন্তরিক ভালোবাসাপ্রাপ্ত ছিলেন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা., তাই তারাও চেষ্টা করতেন যেন এই হৃদ্যতায় আমারও সমান হওয়া চাই।

এরই ধারাবাহিকতায় একবার রাসূলের সহধর্মিণীগণ ফাতিমা রা.-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে পাঠালেন। ফাতিমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসার অনুমতি চাইলেন। সে সময় তিনি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর সাথে শুয়েছিলেন।

নবীজী হযরত ফাতিমা রা.-কে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলে তিনি আরজ করলেন, আমাকে অন্যান্য উন্মুহাতুল মুমিনীনবৃন্দ আপনার কাছে পাঠিয়েছেন এবং তারা হযরত আবু কুহাফার কন্যা (উম্মুল মুমিনীন আয়েশা)-এর ব্যাপারে ন্যায়ানুগ সমতা চায়। নবীজী বললেন, 'হে আমার প্রিয় কন্যা, তুমি কি তাকে ভালোবাসো না, যাকে আমি ভালোবাসি?' হযরত ফাতিমা রা. বললেন, 'কেন নয়? (আমিও তাকে ভালোবাসি)।' তিনি হযরত ফাতিমা রা.-কে বললেন, 'তুমিও আয়েশাকে ভালোবাসো।' হযরত ফাতিমা রা. এই কথা শুনে দাঁড়ালেন এবং অন্যান্য উন্মুহাতুল মুমিনীনদের কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা খুলে বললেন।

আযওয়াযে মুতাহহারাত অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণীগণ আবারও হযরত ফাতিমা রা.-কে প্রিয়নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে গিয়ে সমতার অনুরোধ (অর্থাৎ, আন্তরিক ভালোবাসার ক্ষেত্রে এক সমান) করার আবেদন করলেন। হযরত ফাতিমা রা—যিনি উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর প্রতি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসার গভীরতা উপলব্ধি করেছেন এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র বাণী শুনেছেন—সঙ্গত কারণেই তিনি দ্বিতীয়বার এ অনুরোধ উপস্থাপনে অপারগতা প্রকাশ করলেন এবং বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ ব্যাপারে কখনো কোনো কথা বলব না। বলব না।'

আয়েশা ও অন্যান্য উম্মুল মুমিনীনরা আল্লাহ, রাসূল ও আখিরাতকেই গ্রহণ করেছেন
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণীদের মধ্যে ওই দুই সহধর্মিণী সম্পর্কে উমর রা.-এর কাছে জিজ্ঞেস করতে সব সময় আগ্রহী ছিলাম, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'যদি তোমরা দু-জনে তাওবা কর (তাহলে সেটাই হবে কল্যাণকর)। কেননা, তোমাদের অন্তর বাঁকা হয়ে গেছে।

একবার আমি তার (উমর রা.-এর) সঙ্গে হজে রওনা করলাম। তিনি রাস্তা হতে সরে গেলেন। আমিও একটি পানির পাত্র নিয়ে তার সঙ্গে গতি পরিবর্তন করলাম। তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে এলেন। আমি পানির পাত্র হতে তার দু-হাতে পানি ঢাললাম, তিনি ওযু করলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আমীরুল মুমিনীন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণীদের মধ্যে দুই সহধর্মিণী কারা ছিলেন, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'যদি তোমরা দু-জন তাওবাহ কর (তবে সেটাই হবে তোমাদের জন্য কল্যাণকর) কেননা, তোমাদের অন্তর বাঁকা হয়ে গেছে'। তিনি বললেন, 'হে ইবনে আববাস, এটা তোমার জন্য তাজ্জবের বিষয় যে, তুমি তা জান না। তারা দু-জন হলেন, 'আয়েশা ও হাফসা রা.।' অতঃপর উমর রা. পুরো ঘটনা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, আমি ও আমার এক আনসারী প্রতিবেশী মদীনার অদূরে বনু উমাইয়া ইবনে যায়দের মহল্লায় বসবাস করতাম। আমরা দু-জন পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হাজির হতাম। একদিন তিনি যেতেন, আরেকদিন আমি যেতাম, আমি যে দিন যেতাম সে দিনের খবর (ওহী) ইত্যাদি বিষয় তাকে অবহিত করতাম। আর তিনি যে দিন যেতেন, তিনিও অনুরূপ করতেন। আর আমরা কুরাইশ গোত্রের লোকেরা মহিলাদের ওপর কর্তৃত্ব করতাম। কিন্তু আমরা যখন মদীনায় আনসারদের কাছে আসলাম তখন তাদেরকে এমন পেলাম, যাদের নারীরা তাদের ওপর কর্তৃত্ব করে থাকে। ধীরে ধীরে আমাদের মহিলারাও আনসারী মহিলাদের রীতিনীতি গ্রহণ করতে লাগল।

একদিন আমি আমার স্ত্রীকে ধমক দিলাম। সে সঙ্গে সঙ্গে এর জবাব দিল। আর এই জবাব আমার পছন্দ হলো না। তখন সে আমাকে বলল, 'আমার জবাবে তুমি অসন্তুষ্ট হও কেন? আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণীরাও তো তার কথার জবাব দিয়ে থাকেন এবং তার কোনো কোনো সহধর্মিণী রাত পর্যন্ত পুরো দিন তার কাছ হতে আলাদা থাকেন।' এ কথা শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম। বললাম, যিনি এরূপ করেছেন তিনি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারপর আমি জামা-কাপড় পরে (আমার মেয়ে) হাফসা রা.-এর কাছে গিয়ে বললাম, 'হাফসা, তোমাদের কেউ কেউ নাকি রাত পর্যন্ত পুরো দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অসন্তুষ্ট রাখে।' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আমি বললাম, 'তবে তো সে বরবাদ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমার কি ভয় হয় না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহও অসন্তুষ্ট হবেন। এর ফলে তুমি বরবাদ হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করো না এবং তার কোনো কথার জবাব দিতে যেও না এবং তার হতে পৃথক থেক না। তোমার কোনো কিছুর দরকার হয়ে থাকলে আমাকে বলবে। আর তোমার প্রতিবেশী, তোমার চেয়ে অধিক সুন্দরী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধিক প্রিয়-এ যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে।'

তিনি উদ্দেশ্য করেছেন আয়েশা রা.-কে। সে সময় আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল যে, গাস্সানের লোকেরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ঘোড়াগুলো প্রস্তুত করছে। একদিন আমার সাথী তার পালার দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলেন এবং ইশার সময় এসে আমার দরজায় খুব জোরে করাঘাত করলেন এবং বললেন, তিনি (উমর) কি ঘুমিয়েছেন? তখন আমি ঘাবড়ে তার কাছে বেরিয়ে এলাম। তিনি বললেন, সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে। আমি বললাম, সেটা কী? গাস্সানের লোকেরা কি এসে গেছে? তিনি বললেন, না, বরং তার চেয়েও বড় ঘটনা ও বিরাট ব্যাপার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সহধর্মিণীদেরকে তালাক দিয়েছেন। উমর রা. বললেন, তাহলে তো হাফসার সর্বনাশ হয়েছে এবং সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার তো ধারণা ছিল যে, এমন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। আমি কাপড় পরে বেরিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ফজরের নামায আদায় করলাম। নামায শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কোঠায় প্রবেশ করে একাকী বসে থাকলেন। তখন আমি হাফসা রা.-এর কাছে গিয়ে দেখি সে কাঁদছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কাঁদছ কেন? আমি কি তোমাকে আগেই সতর্ক করে দিইনি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি তোমাদের তালাক দিয়েছেন?' সে বলল, 'আমি জানি না। তিনি তার ওই কোঠায় আছেন।

আমি বের হয়ে মিম্বরের কাছে এলাম। দেখলাম, লোকজন মিম্বরের চারপাশ জুড়ে বসে আছেন এবং কেউ কেউ কাঁদছেন। আমি তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ বসলাম। তারপর আমার উদ্বেগ বেড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেখানে ছিলেন, আমি সেখানে গেলাম। আমি রাসূলের এক কালো গোলামকে বললাম, 'উমরের জন্য অনুমতি গ্রহণ করো।' সে প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আলাপ করে বেরিয়ে এসে বলল, 'আমি আপনার কথা তার কাছে উল্লেখ করেছি, কিন্তু তিনি নীরব ছিলেন।' আমি ফিরে এলাম এবং মিম্বরের পাশে বসা লোকদের কাছে গিয়ে বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর আমি আবার অস্থির হয়ে উঠলাম। তাই আমি আবার এসে গোলামকে বললাম। (উমরের জন্য অনুমতি গ্রহণ কর) এবারও সে আগের মতোই বলল। তারপর যখন আমি ফিরে আসছিলাম, গোলাম আমাকে ডেকে বলল, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছেন।'

এখন আমি তার নিকট প্রবেশ করে দেখি, তিনি খেজুরের পাতায় তৈরি ছোবড়া ভর্তি একটা চামড়ার বালিশে হেলান দিয়ে খালি চাটাই এর ওপর কাত হয়ে শুয়ে আছেন। তার শরীর ও চাটাই এর মাঝখানে কোনো ফরাশ ছিল না। ফলে তার শরীরের পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গেছে। আমি তাকে সালাম করলাম এবং দাঁড়িয়ে আবার আরয করলাম, আপনি কি আপনার সহধর্মিণীদের তালাক দিয়েছেন? তখন তিনি আমার দিকে চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন, না। তারপর আমি (থমথমে ভাব কাটিয়ে) অনুকূল ভাব সৃষ্টির জন্য দাঁড়িয়ে থেকেই বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখুন, আমরা কুরাইশ গোত্রের লোকেরা নারীদের ওপর কর্তৃত্ব করতাম। তারপর যখন আমরা এমন একটি সম্প্রদায়ের নিকট এলাম, যাদের ওপর তাদের নারীরা কর্তৃত্ব করছে। তিনি এ ব্যাপারে আলোচনা করলেন। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকি হাসলেন। তারপর আমি বললাম, আপনি হয়তো লক্ষ্য করছেন যে, আমি হাফসার ঘরে গিয়েছি এবং তাকে বলেছি, তোমাকে এ কথা যেন ধোঁকায় না ফেলে যে, তোমার প্রতিবেশিনী (সতীন) তোমার চেয়ে অধিক আকর্ষণীয় এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধিক প্রিয়।

এ কথা দ্বারা তিনি আয়েশা রা.-কে বুঝিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার মুচকি হাসলেন। তাকে একা দেখে আমি বসে পড়লাম। তারপর আমি তার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের ভেতর এদিক সেদিক দৃষ্টি করলাম; কিন্তু তার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে তিনটি কাঁচা চামড়া ব্যতীত দৃষ্টিপাত করার মতো আর কিছুই দেখতে পেলাম না। তখন আমি আরয করলাম, 'আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আপনার উম্মাতকে পার্থিব সচ্ছলতা দান করেন। কেননা, পারস্য ও রোমের অধিবাসীদের সচ্ছলতা দান করা হয়েছে এবং তাদেরকে পার্থিব (অনেক প্রাচুর্য) দেওয়া হয়েছে, অথচ তারা আল্লাহর ইবাদত করে না।' রাসূল তখন হেলান দিয়ে বসেছিলেন। তিনি বললেন, 'হে ইবনে খাত্তাব, তোমার কি এতে সন্দেহ রয়েছে যে, তারা তো এমন এক জাতি, যাদেরকে তাদের ভালো কাজের প্রতিদান দুনিয়ার জীবনেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে।' আমি আরয করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য ক্ষমার দুআ করুন।'

হাফসা রা. আয়েশা রা.-এর কাছে এ কথা প্রকাশ করার পরই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সহধর্মিণীগণ থেকে আলাদা হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি এক মাস তাদের কাছে যাব না।' তাদের ওপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভীষণ রাগের কারণে এটি হয়েছিল। যেহেতু আল্লাহ তাআলা তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

যখন ঊনত্রিশ দিন কেটে গেল, তিনি প্রথম আয়েশা রা.-এর কাছে এলেন। আয়েশা রা. তাকে বললেন, আপনি কসম করেছেন যে, এক মাসের মধ্যে আমাদের কাছে আসবেন না। আর এ পর্যন্ত আমরা ঊনত্রিশ রাত অতিবাহিত করেছি, যা আমি ঠিক ঠিক গণনা করে রেখেছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মাস ঊনত্রিশ দিনেও হয়। আর মূলত এ মাসটি ঊনত্রিশ দিনেরই ছিল। 'আয়েশা রা. বলেন, যখন ইখতিয়ারের আয়াত নাযিল হলো, তখন তিনি তার সহধর্মিণীদের মধ্যে প্রথম আমার কাছে এলেন এবং বললেন, আমি তোমাকে একটি কথা বলতে চাই, তবে তোমার পিতা-মাতার সঙ্গে পরামর্শ না করে এর জওয়াবে তুমি তাড়াহুড়ো করবে না।

আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা জানতেন যে, আমার পিতা-মাতা তার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে আলাদা হওয়ার পরামর্শ আমাকে কখনো দেবেন না। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাখয়ীরের আয়াত পাঠ করলেন। আমি বললাম, এ ব্যাপারে আমি আমার পিতা-মাতার কাছে কী পরামর্শ নেব? আমি তো আল্লাহ ও তার রাসূলের সন্তুষ্টি এবং পরকালীন (সাফল্য) পেতে চাই। তারপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অন্য সহধর্মিণীদেরকেও ইখতিয়ার দিলেন এবং প্রত্যেকে সে একই জবাব দিলেন, যা আয়েশা রা. দিয়েছিলেন।

হযরত জাবির রা. বর্ণনা করেন, উম্মুল মুমিনীনগণ সমবেত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তাদের নিত্য আহার্য রুটি-রুজি বৃদ্ধি করার অনুরোধ জানালেন। ওইদিকে কিসরা ও কায়সারের স্ত্রীরা বাহারী অলংকার ও নিত্যনতুন দামি দামি পোশাক পরে থাকে। আর এদিকে আমাদের অভাব-অনটনের অবস্থা তো আপনি দেখছেনই।

যেহেতু উম্মুল মুমিনীনগণ জীবন-যাপনের মান বৃদ্ধির দাবীদার ছিলেন অন্যদিকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহধর্মিণীদের সন্তুষ্টির জন্য পার্থিব ভোগ-বিলাস দ্বারা নিজেকে কলুষিত করতে পারেন না। এই জন্য আল্লাহ তাআলা 'তাখয়ির'-এর আয়াত নাযিল করেন। 'তাখয়ির' অর্থ ইখতিয়ার ও স্বাধীনতা দান করা। অর্থাৎ, স্ত্রীদের মধ্যে যাঁর ইচ্ছা দরিদ্র অবস্থা ও অভাব-অনটন মেনে নিয়ে আল্লাহর রাসূলের সাথে সংসার ধর্ম পালন করেন। আর যাঁর ইচ্ছা তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারেন। আয়াতটি হলো,
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ إِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعُكُنَّ وَ أُسَرِّ حُكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا وَإِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَ رَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَتِ مِنْكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا
হে নবী, তোমার স্ত্রীদের বলো, তোমরা যদি দুনিয়া ও তার চাকচিক্যই পেতে চাও তবে এসো, আমি তোমাদের কিছু দিয়ে ভালোভাবে বিদায় করে দিই। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূল ও পরকারে ঘর পেতে চাও, তবে জেনে রাখ তোমাদের মধ্যে যারা নেককার, তাদের জন্য আল্লাহ বিরাট পুরষ্কার নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।

এই আয়াত যখন নাযিল হলো, তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম হযরত আয়েশা রা.-এর সাথে কথা বললেন, 'তোমাকে একটি কথা বলছি।, খুব তাড়াতাড়ি করে জবাব দিয়ো না। তোমার পিতা-মাতার মতামত জেনে নাও।' তারপর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে উল্লেখিত আয়াতটি পাঠ করে শোনালেন এবং বললেন, আল্লাহর নিকট থেকে এই হুকুম এসেছে।

সাথে সাথে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বললেন, এ বিষয়ে আমার বাবা-মার নিকট কী জিজ্ঞেস করব? আমি তো আল্লাহ, তার রাসূল এবং পরকালের সাফল্যই চাই। আয়েশা রা.-এর এমন জবাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দারুণ খুশি হলেন। তিনি বললেন, বিষয়টি যেভাবে তোমার নিকট উপস্থাপন করেছি সেভাবে তোমার অন্য সতীনদের নিকটও করব। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বললেন, অনুগ্রহ করে আপনি আমার সিদ্ধান্তের কথাটি অন্য কাউকে জানাবেন না; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সে অনুরোধ রাখেননি। কারণ, তাকে আল্লাহ তাআলা শিক্ষকরূপে পাঠিয়েছেন।

এতেই সন্তুষ্ট যাঁর প্রাণ
উপর্যুক্ত ঘটনা দ্বারা আমরা মোটাদাগে এটুকু বুঝতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণীদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণির নারী ছিলেন। কেউ কেউ ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠ অভিজাত পরিবারের মেয়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এমন দীন-হীন অবসথায় জীবন-যাপন করতে গিয়ে তাদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। এ জন্য তারা সমবেতভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট জীবন-যাপনের মান বৃদ্ধির আবদার করতে থাকেন। এরই প্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। যাতে তাদেরকে এ চূড়ান্ত কথা বলে দেওয়া হয় যে, যারা ইচ্ছা স্বেচ্ছায় সম্পর্ক ছিন্ন করলে যেতে পারেন অথবা এই দীন-হীন অবস্থা মেনে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে জীবন যাপন করতে পারেন। আয়েশা রা. যেহেতু ছিলেন কম বয়স্কা, তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে মা-বাবার সাথে পরামর্শ করে জানিয়ে দেন। বলেন, আমি আল্লাহর রাসূলকেই চাই।' সবার আগেই তিনি এ সিদ্ধান্ত দেন।

আমাদের জানামতে, এ পৃথিবীতে একজন নারীর সবচেয়ে অসহনীয় বিষয় হলো সতীনের অস্তিত্ব। আয়েশা রা.-এর এক সাথে সতীন ছিলেন একজন থেকে নিয়ে আটজন পর্যন্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহান সাহচর্যের দৌলতে তাদের সকলের হৃদয়ের যাবতীয় আবিলতা দূর হয়ে তা স্বচ্ছ আয়নায় পরিণত হয়। সতীন ও তাদের সন্তান-সন্ততিদের সাথে আয়েশা রা.-এর জীবন-যাপনের যে চিত্র আমরা পাই তা বিশ্বের নারীজাতির জন্য এক অতুলনীয় আদর্শ হয়ে আছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আয়েশা রা.-এর যুগল জীবন এবং তাদের মধ্যের মধুর সম্পর্কের একটি চিত্র আমাদের সামনে থাকা দরকার। ইসলাম নারীকে না অতি পবিত্র মনে করে দেবীর আসনে বসিয়েছে, আর না তাকে কেবল পুরুষের ভোগের বস্তু বলে মনে করেছে। নারী সম্পর্কে প্রাচীন ও আধুনিক কালের পৃথিবীর মানুষের ধারণা মূলত এমনই। তাই কোনোকালেই কোনো সমাজে নারী সঠিক মর্যাদা লাভ করেনি। একমাত্র ইসলামই সঠিক মর্যাদা দিয়েছে। ইসলাম নারীর সর্বোত্তম যে পরিচিতি তুলে ধরেছে তা হচ্ছে, এই দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় বিশ্বের নারী হলো পুরুষের প্রশান্তি ও সান্ত্বনার উৎস। তাদের নয় বছরে দাম্পত্য জীবনে ছিল গভীর ভালোবাসা, পারস্পরিক সহমর্মিতা, সীমাহীন আবেগ ও নিষ্ঠা। কঠিন দারিদ্র্য, অনাহার, তথা সকল প্রতিকূল পরিবেশেও তাদের এ মধুর সম্পর্কে একদিনের জন্যও ফাটল দেখা যায়নি। কোনো রকম তিক্ততা ও মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়নি।

অনেকে মনে করে থাকে, আয়েশা রা.-এর প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এমন আবেগ ও মুগ্ধতার কারণ তার রূপ-লাবণ্য। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। রাসূলে পাকের সহধর্মিণীদের মধ্যে জুওয়াইরিয়া, যায়নাব ও সাফিয়্যা রা. ছিলেন সর্বাধিক সুন্দরী। তাদের সৌন্দর্যের কথা হাদীস, সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে বিদ্যমান; কিন্তু আয়েশা রা.-এর রূপ লাবণ্যের কথা দুই একটি স্থান ব্যতীত তেমন কিছু উল্লেখ নেই। যেমন একবার উমর রা. হাফসা রা.-কে উপদেশ দিতে গিয়ে তার সম্পর্কে একটি মন্তব্য করেন। আর তা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটু হেসে দেন। মূলত উমরের এ উক্তি দ্বারা এতটুকু প্রমাণিত হয় যে, আয়েশা রা. হাফসার রা. চেয়ে প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য।

রাসূলে কারীমের গোটা জিন্দেগী মানবজাতির জন্য আদর্শ। এ কারণে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে খুশি করার জন্য কেমন আচরণ করবে, আমরা তাও আয়েশা রা. ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে দেখতে পাই। আমরা কখনো কখনো নবীজীকে আয়েশা রা.-এর সাথে দারুণ উদার ও খোলামেলা দেখতে পাই। আয়েশার অতি তুচ্ছ কোনো তামাশা বা খেলাধুলা দেখেও তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন।

রাসূলের কাছে তার মর্যাদা
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত সময়কাল এমন এক পবিত্র ব্যক্তি-সত্তার সাহচর্যে কাটে, এই ধরাধামে যার আগমন ঘটেছিল মহোত্তম নৈতিকতার পূর্ণতা বিধানের জন্য। এই সাহচর্য তাকে নৈতিকতার এমন আদর্শ স্তরে পৌঁছে দেয় যা আধ্যাত্মিক উন্নতির চূড়ান্ত পর্যায় বলে বিবেচিত। সুতরাং তার নৈতিকতার মান ছিল অতি উঁচুতে। তাঁর হৃদয় ছিল অতি প্রশস্ত। তাছাড়া তিনি ছিলেন দানশীল, মিতব্যয়ী, ইবাদতকারিণী এবং দয়াময়ী।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আম্মাজান হযরত আয়েশা রা.-এর ছিল সুউচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থান। তাঁর মান-মর্যাদার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ছাড়া আর কোনো কুমারী নারী বিয়ে করেননি এবং তাঁর মতো আর কাউকে ভালোবাসেননি। এটা আমরা দেখতে পাই হযরত আমর ইবনুল আস রা.-এর ঘটনা থেকে। তিনি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, মানুষের মধ্যে কে আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, আয়েশা। আমর রা. বললেন, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তাঁর পিতা।

এবার এক সফরে চলার পথে আয়েশা রা.-এর উটনীটি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে তাঁকে নিয়ে দৌড় দেয়। এতে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতই অস্থির হয়ে পড়েন যে, তাঁর মুখ দিয়ে তখন উচ্চারিত হতে শোনা যায়, ‘ওয়া আরূসাহ!’ হায়! আমার বধূ!

পরবর্তীকালে আয়েশা রা. বলতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ঘরে আমার বারির দিনে এবং আমারই বুকে ইন্তেকাল করেন। জীবনের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর রা. একটি কাঁচা মিসওয়াক হাতে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতে আসেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই মিসওয়াকটির দিকে বার বার তাকাতে লাগলেন। বুঝলাম, তিনি সেটা চাচ্ছেন। আমি সেটা নিয়ে ধুয়ে নিজে চিবিয়ে নরম করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিলাম। তিনি সেটা দিয়ে সুন্দর করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিলাম। তিনি সেটা দিয়ে সুন্দর করে মিসওয়াক করলেন। তারপর আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন, কিন্তু হাতটি পড়ে গেল। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। সেই মহান আল্লাহর প্রশংসা যিনি তার রাসূলের পার্থিব জীবনের শেষ মুহূর্তটিতে তার ও আমার থুতু মিলিত করেছেন।

পুরুষদের মধ্যে কামালিয়াত বা পূর্ণতা অর্জন করেছেন অনেকে, কিন্তু নারীদের মধ্যে মারইয়াম বিনতে ইমরান এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া ছাড়া আর কেউ পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
فَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الشَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
আয়েশার মর্যাদা সব মহিলাদের ওপর এমন, যেমন 'সারিদ এর মর্যাদা সব খাদ্যদ্রব্যের ওপর।

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
لَا تُجْزِينِي فِي عَائِشَةَ فَإِنَّ الْوَحْيَ لَمْ يَأْتِنِي وَأَنَا فِي ثَوْبِ امْرَأَةٍ إِلَّا عَائِشَةَ
(আমার কাছে অনিচ্ছাকৃত ব্যাপারসমূহ সম্পর্কে জানতে চেয়ে) আয়েশা সম্পর্কে কষ্ট দিয়ো না। কারণ, নিঃসন্দেহে আমার ওপর আয়েশার বিছানা ছাড়া অন্য কারও বিছানায় ওহী অবতীর্ণ হয়নি।

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতিমা রা.-কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
أَيْ بَنِيْهِ الَسْتِ تُحِبِّيْنَ مَا أُحِبُّ فَقَالَتْ بَلَى فَقَالَ فَاحْبِنِي هَذِهِ لِعَائِشَةَ
হে প্রিয় কন্যা, তুমি কি তাকে ভালোবাসবে না, যাকে আমি ভালোবাসি? হযরত ফাতিমা রা. বললেন, কেন নয়? (অর্থাৎ, আমিও তাকে অবশ্যই ভালোবাসবো যাকে আপনি ভালোবাসেন)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি আয়েশাকে ভালোবেসো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তিম সময়ে মিসওয়াক চিবিয়ে দেওয়ার মতো ব্যক্তি একমাত্র উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-ই ছিলেন। তিনি যখন অন্যান্য স্ত্রীদের ঘরে থাকতেন, অসুস্থতা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করতেন, আজ কোন্ দিন? সম্ভবত তিনি উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর জন্য নির্ধারিত দিনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন। এমতাবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূতঃপবিত্র স্ত্রীদের অনুরোধক্রমে তিনি উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর ঘরে তাশরীফ নিয়ে গিয়েছিলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক সময় আয়েশা রা.-এর রানের ওপর মাথা রেখে শুয়ে যেতেন। একদিন তিনি সেই অবস্থায় বিশ্রাম নিচ্ছেন, এমন সময় আবু বকর রা. কোনো এক কারণে মেয়ের ওপর উত্তেজিত হয়ে তার ঘরে ঢুকে পড়েন এবং তার পার্শ্বদেশে ধাক্কা দেন; কিন্তু আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আরামের ব্যাঘাত হতে পারে, তাই মোটেই নড়াচড়া করলেন না।

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাযানের শেষ দশকে ই'তিকাফ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আয়েশা রা. তার কাছে ই'তিকাফ করার অনুমতি চাইলে তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। এরপর হাফসা রা. আয়েশা রা.-এর নিকট অনুমতি চাইলে তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। তা দেখে যায়নাব বিনতে জাহশ রা. নিজের জন্য তাঁবু লাগানোর নির্দেশ দিলে তা পালন করা হলো। আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের নামায আদায় করে নিজের তাঁবুতে ফিরে এসে কয়েকটি তাঁবু দেখতে পেলেন। তখন তিনি বললেন, এ কী ব্যাপার? লোকেরা বলল, আয়েশা, হাফসা ও যায়নাব রা.-এর তাঁবু। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তারা কি নেকি পেতে চায়? আমি আর ই'তিকাফ করব না। এরপর তিনি ফিরে আসলেন। পরে রোযা শেষ করে শাওয়াল মাসের দশ দিন ই'তিকাফ করেন। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন:
إِنِّي لَأَعْلَمُ إِذَا كُنْتِ عَنِّي رَاضِيَةً، وَإِذَا كُنْتِ عَلَى غَضْبَى " . قَالَتْ فَقُلْتُ مِنْ أَيْنَ تَعْرِفُ ذَلِكَ فَقَالَ " أَمَّا إِذَا كُنْتِ عَنِّي رَاضِيَةً فَإِنَّكِ تَقُولِينَ لا وَرَبِّ مُحَمَّدٍ ، وَإِذَا كُنْتِ غَضْبَى قُلْتِ لا وَرَبِّ إِبْرَاهِيمَ " . قَالَتْ قُلْتُ أَجَلْ وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ ، مَا أَهْجُرُ إِلَّا اسْمَكَ
আমি জানি, কখন তুমি আমার প্রতি খুশি থাক এবং কখন রাগান্বিত হও। আমি বললাম, কী করে আপনি তা বুঝতে সক্ষম হন? তিনি বললেন, তুমি প্রসন্ন থাকলে বল, 'না, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রবের কসম!'; কিন্তু তুমি আমার প্রতি নারাজ থাকলে বল, 'না, ইবরাহীম আ.-এর রবের কসম!'। শুনে আমি বললাম, আপনি ঠিকই বলেছেন। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল, সে ক্ষেত্রে শুধু আপনার নাম উচ্চারণ করা থেকেই বিরত থাকি।

আয়েশার প্রতি সালাম পাঠিয়েছেন জিবরাঈল
কতই না মর্যাদাসিক্ত সেই মহান সত্ত্বা—যার প্রতি সালাম পাঠিয়েছেন খোদ হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম। হাদীসে এসেছে, আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন :
يَا عَائِشَةَ هَذَا جِبْرِيلُ يُقْرِئُكِ السَّلَامَ فَقُلْتُ وَعَلَيْهِ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ تَرَى مَا لَا أَرَى تُرِيدُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم
আয়েশা, জিবরাঈল আ. তোমাকে সালাম বলেছেন। আমি উত্তরে বললাম, ওয়া আলাইহিস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আপনি যা দেখতে পান আমি তা দেখতে পাই না। এ কথা দ্বারা তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝিয়েছেন।

আয়েশার বিছানায় ওহীর প্রত্যাদেশ
উরওয়া রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হাদিয়া প্রদানের জন্য আয়েশা রা.-এর গৃহে তার অবস্থানের দিন হিসাব করতেন। আয়েশা রা. বলেন, একবার আমার সতীনগণ উম্মে সালামা রা.-এর নিকট সমবেত হয়ে বললেন, হে উম্মে সালামা, আল্লাহর কসম, লোকজন তাদের উপঢৌকনসমূহ প্রেরণের জন্য আয়েশা রা.-এর গৃহে অবস্থানের দিন গণনা করেন। আয়েশা রা.-এর মতো আমরাও কল্যাণ আকাঙ্ক্ষা করি। আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলুন, তিনি যেন লোকদের বলে দেন, তারা যেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেদিন যেখানেই অবস্থান করেন সেখানেই তারা হাদিয়া পাঠিয়ে দেন।

উম্মে সালামা রা. বলেন, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে এ বিষয় উল্লেখ করলেন। উম্মে সালামা রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কথা শুনে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পরে আমার গৃহে অবস্থানের জন্য পুনরায় এলে আমি ওই কথা তাকে বলি। এবারও তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তৃতীয়বারেও আমি ওই কথা তাকে বললাম, তিনি বললেন, হে উম্মে সালামা, আয়েশা রা.-এর ব্যাপারে তোমরা আমাকে কষ্ট দিয়ো না। আল্লাহর কসম, তোমাদের মধ্যে আয়েশা রা. ছাড়া অন্য কারও শয্যায় শায়িত থাকাকালীন আমার ওপর ওহী নাযিল হয়নি।

অপূর্ব গুণের আধার
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বলতেন, আমি গর্বের জন্য নয়, বরং বাস্তব কথাই বলছি। আর তা হলো, আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যা আর কাকেও দান করেননি। ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নের মধ্যে আমার ছবি দেখিয়েছেন, আমার সাত বছর বয়সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বিয়ে করেছেন, নয় বছর বয়সে আমি স্বামী গৃহে গমন করেছি, আমিই ছিলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী, যখন তিনি আমার বিছানায় থাকতেন তখনো তার ওপর ওহী নাযিল হতো, আমি ছিলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী, আমার নির্দোষিতা ঘোষণা করে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে, জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে আমি স্বচক্ষে দেখেছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, আমি তার খলীফা ও তার সিদ্দীকের কন্যা, আমাকে পবিত্র করে সৃষ্টি করা হয়েছে, আমার মাগফিরাত এবং জান্নাতে আমাকে উত্তম জীবিকা দানের অঙ্গীকার করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পার্থিব জীবনের সর্বশেষ মুহূর্তে আমার মুখের লালা তার লালার সাথে মিলেছে, আমারই ঘরে তার কবর দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের আরও গৌরব ও মর্যাদার কথা তিনি নিজেও যেমন বলেছেন, তেমনে আরও বহু সাহাবী বর্ণনা করেছেন। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে যা ছড়িয়ে আছে।

আয়েশা রা.-এর দানশীলতা
হযরত আয়েশা রা. ছিলেন দানের ক্ষেত্রে খুবই দরাজহস্ত। অন্তরটাও ছিল অতি উদার ও প্রশস্ত। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর ঘর-গৃহস্থালীর গোছগাছ ও পরিপাটির বিশেষ কোনো প্রয়োজন পড়ত না। খাদ্য খাবার তৈরি ও রান্নাবান্নার সুযোগ খুব কমই আসত। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. নিজেই বলতেন, কখনো একাধারে তিন দিন এমন যায়নি যখন নবী পরিবারের লোকেরা পেট ভরে খেয়েছেন। তিনি আরও বলতেন, মাসের পর মাস ঘরে আগুন জ্বলত না। এ সময় খেজুর ও পানির উপরই কাটত। খাইবার বিজয়ের পর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আযওয়াযে মুতাহহারাতের (পবিত্র সহধর্মিণীগণ) প্রত্যেকের জন্য বাৎসরিক ভাতা নির্ধারণ করে দেন। আবদুর রহমান আরাজ মদীনায় তার মজলিসে বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর জীবিকার জন্য খাইবারের ফসল থেকে আশি ওয়াসাক খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক যব মতান্তরে গম দিতেন; কিন্তু তার দানশীলতার কারণে এই পরিমাণ খাদ্য সারা বছরের জন্য কখনো যথেষ্ট ছিল না।

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَوْ كَانَ لِي مِثْلُ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا يَسُرُّنِي أَنْ لَا يَمُرَّ عَلَيَّ ثَلَاثٌ وَعِنْدِي مِنْهُ شَيْءٌ إِلَّا شَيْءٌ أَرْصِدُهُ لِدَيْنِ
আমার কাছে যদি উহুদ পাহাড়ের সমান সোনা থাকত, তাহলেও আমার পছন্দ নয় যে, তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তার কিছু অংশ আমার কাছে থাকুক। তবে এতটুকু পরিমাণ ব্যতীত, যা আমি ঋণ পরিশোধ করার জন্য রেখে দেই।

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করলেন। তখন যৎসামান্য যব ছাড়া কোনো প্রাণী খেতে পারে এমন কিছু আমার তাকের ওপর ছিল না। তা থেকে বেশ কিছুদিন খেলাম। একবার মেপে নিলাম, তখন তা শেষ হয়ে গেল।

আমর ইবনে হারিস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো দীনার, দিরহাম, গোলাম ও বাঁদি রেখে যাননি। কেবলমাত্র একটি সাদা খচ্চর যার ওপর তিনি আরোহণ করতেন এবং তার যুদ্ধাস্ত্র আর একখণ্ড যমীন যা মুসাফিরদের জন্য ওয়াক্‌ফ করে গেছেন।

আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো একসময় খেজুর পাতার মাদুরে শুয়েছিলেন। তিনি ঘুম হতে জাগ্রত হয়ে দাঁড়ালে দেখা গেল তার গায়ে মাদুরের দাগ পড়ে গেছে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনার জন্য যদি একটি নরম বিছানার (তোষক) ব্যবস্থা করতাম। তিনি বললেন:
مَا لِي وَمَا لِلدُّنْيَا مَا أَنَا فِي الدُّنْيَا إِلاَّ كَرَاكِبِ اسْتَقَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا
দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক! দুনিয়াতে আমি এমন একজন পথচারী মুসাফির ছাড়া তো আর কিছুই নই, যে একটি গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিল, তারপর তা ছেড়ে দিয়ে গন্তব্যের দিকে চলে গেল।

কুতাইবা রহ. আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আসার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার পরিবারের লোকেরা এক নাগাড়ে তিন রাত গমের রুটি পেট পুরে খাননি।

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি একবার উরওয়া রা.-এর উদ্দেশে বললেন, ভাগ্নে! আমরা নতুন চাঁদ দেখতাম, আবার নতুন চাঁদ দেখতাম। এভাবে দু-মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো ঘরেই আগুন জ্বালানো হতো না।

উরওয়া রহ. বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, খালা, আপনারা তাহলে বেঁচে থাকতেন কীভাবে? তিনি বললেন, দু-টি কালো জিনিস অর্থাৎ, খেজুর আর পানিই শুধু আমাদের বাঁচিয়ে রাখত। কয়েক ঘর আনসার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিবেশী ছিল। তাদের কিছু দুগ্ধবতী উটনী ও বকরি ছিল। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য দুধ হাদিয়া পাঠাত। তিনি আমাদের তা পান করতে দিতেন।

হযরত উরওয়া রা. বর্ণনা করেন, একবার হযরত আয়েশা রা. তার সামনে পুরো সত্তর হাজার দিরহাম এক সাথে আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিয়ে চাদরের কোণা ঝেড়ে ফেলেন।

হযরত আমীর মুআবিয়া রা. একবার এক লাখ দিরহাম হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট পাঠালেন। সন্ধ্যা হতে হতে একটি পয়সাও থাকল না। সবই গরীব-মিসকনীদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। ঘটনাক্রমে সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। দাসী বলল, ইফতারীর খাদ্যসামগ্রী কেনার জন্য কিছু রেখে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। বললেন, এটি যদি আগে স্মরণ করিয়ে দিতে। এ রকম ঘটনা আরও আছে। একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. বড় বড় দুইটি থলিতে ভরে এক লাখ দিরহাম পাঠালেন। তিনি সবগুলি একটি খাঞ্চায় ঢেলে বিলাতে শুরু করেন। সেদিও তিনি রোযা রেখেছিলেন। সন্ধ্যার সময় দাসীকে ইফতারী জন্য আনতে বলেন। দাসী বলেন, উম্মুল মুমিনীন, এই অর্থ দিয়ে কিছু গোশত ইফতারের জন্য আনাতে পারতেন না? বললেন, এখন তিরস্কার করো না। তখন কেন স্মরণ করিয়ে দাওনি?

একদিন তিনি রোযা আছেন। ঘরে একটি রুটি ছাড়া কিছুই নেই। এমন সময় এক মহিলা ভিক্ষুক এসে কিছু খাবার চায়। তিনি দাসীকে বলেন রুটিটি তাকে দিয়ে দিতে। দাসী বলেন, রুটি দিয়ে দিলে সন্ধ্যায় ইফতার করবেন কী দিয়ে? বললেন, এখন রুটিটি দিয়ে দাও তো তারপর দেখা যাবে। সন্ধ্যার সময় কেউ একজন খাসীর গোশত পাঠাল। তিনি দাসীকে বললেন, এই দেখ, তোমার রুটির চেয়েও ভালো জিনিস আল্লাহ পাঠিয়েছেন। নিজের থাকার ঘরটি তিনি আমীর মুয়াবিয়ার রা. নিকট বিক্রি করে যে অর্থ পান তা সবই আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেন।

বোন হযরত আসমাও রা. ছিলেন খুবই দানশীল। দুই বোনের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দানশীলতা। আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. বলেন, তাদের দু-জনের চেয়ে বড় দানশীল ব্যক্তি আর কাউকেও দেখিনি। তবে দুইজনের মধ্যে পার্থক্য এই ছিল যে, হযরত আয়েশা রা. অল্প অল্প করে জমা করতেন। যখন কিছু জমা হয়ে যেত, তখন সব এক সাথে বিলিয়ে দিতেন। আর হযরত আসমা রা.-এর অবস্থা ছিল, হাতে কিছু এলে জমা করে রাখতেন না, সাথে সাথে বিলিয়ে দিতেন।

অধিকাংশ সময় তিনি ঋণগ্রস্ত থাকতেন। বিভিন্ন জনের নিকট ককে ঋণ গ্রহণ করতেন। লোকেরা যখন বলত, আপনার এত ঋণ করার প্রয়োজন কি? তিনি বলতেন, ঋণ পরিশোধের যার ইচ্ছা থাকে আল্লাহ তাতে সাহায্য করেন। আমি আল্লাহর এই সাহায্য তালাশ করি।

দান-খয়রাতের ব্যাপারে তিনি কম-বেশির চিন্তা করতেন না। হাতে যা কিছু থাকত তাই দিয়ে দিতেন। একবার এক মহিলা ছোট ছোট দুই বাচ্চা কোলে করে এসে কিছু সাহায্য চায়। ঘটনাক্রমে সেই সময় তাদের দেওয়ার মতে ঘরে কিছুই ছিল না। খুঁজে খুঁজে একটি মাত্র খেজুর পেলেন। সেটি দুই ভাগ করে বাচ্চা দুইটির হাতে দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে এলে তাকে ঘটনাটি শোনালেন।

আর একবার এক ভিক্ষুক এসে সাহায্য চাইল। হযরত আয়েশা রা.-এর সামনেই ছিল কিছু আঙুরের দানা। সেখান কে তিনি একটি দানা নিয়ে ভিক্ষুকের হাতে তুলে দেন। ভিক্ষুক দানাটির দিকে এমনভাবে তাকিয়ে দেখতে থাকে যে, একটি দানা কি কেউ কারও হাতে দেয়! তখন তিনি ভিক্ষুককে লক্ষ্য করে বলেন, দেখ, এই একটি দানার মধ্যে কত দানা রয়েছে।

একবার এক দরিদ্র মহিলা তার দুইটি ছোট্ট শিশুসন্তান নিয়ে কিছু সাহায্যের আশা হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট আসে। তখন ঘরে তেমন কিছু ছিল না। তিনি তিনটি খেজুর মহিলার হাতে দেন। মহিলা একটি করে খেজুর তার দুই সন্তানের হাতে এবং একটি নিজের মুখে দেয়। সন্তান দু-টি নিজেদের খেজুর খেয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাতে থাকে। তখন মহিলা নিজের মুখ থেকে খেজুর বের করে দুই ভাগ করে দুই সন্তানের মুখে দেয়। নিজে কিছুই খেল না। তিনি মাতৃস্নেহের এমন দুঃখজনক দৃশ্য এবং তার অসহায় অবস্থা দেখে ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী আয়েশা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একটি স্ত্রীলোক দু-টি মেয়ে সাথে নিয়ে আমার কাছে এসে কিছু চাইল। আমার কাছে একটি খুরমা ব্যতীত আর কিছুই সে পেল না। আমি তাকে ওটা দিলাম। স্ত্রীলোকটি তার দু-মেয়েকে খুরমাটি ভাগ করে দিল। তারপর সে উঠে বের হয়ে গেল। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এলেন। আমি তাকে ব্যাপারটি জানালাম। তখন তিনি বললেন:
مَنْ يَلِي مِنْ هَذِهِ الْبَنَاتِ شَيْئًا فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ
যাকে এ সব কন্যা সন্তান দিয়ে কোনো পরীক্ষা করা হয়, অতঃপর সে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে, এ কন্যারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে প্রতিবন্ধক হবে।

আল্লাহু আকবার! উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রা.-এর দুনিয়াবিমুখতা ও আল্লাহর পথে ব্যয়ের এমন বিস্ময়কর কীর্তি দেখিয়ে গেছেন, যার প্রকৃতি তুলে ধরার ভাষা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বাস্তবিকই তার এই কীর্তি ইতিহাসের এক আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়।

রোযাদার ইবাদতগুযার
অধিক ইবাদতগুযার নারীদের তালিকায় মহীয়সী সাহাবিয়াগণ ছিলেন শীর্ষে। মহীয়সী সাহাবিয়াদের মধ্যে উম্মুল মুমিনীনগণ ছিলেন অগ্রভাগে। আর ইবাদতের ক্ষেত্রে উম্মুল মুমিমনীনদের তালিকায় সর্বশীর্ষে রয়েছে হযরত আয়েশা রা.।

রাত-দিনের বেশিরভাগ সময় ইবাদাতে নিমগ্ন থাকতেন। চাশতের নামায নিয়মিত পড়তেন। বলতেন, আমার আব্বাও যদি কবর থেকে উঠে এসে এ নামায পড়তে বারণ করেন তবুও আমি ছাড়বো না।

তিনি বছরের অধিকাংশ সময় রোযা রাখতেন। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, তিনি সর্বদা রোযা অবস্থায় থাকতেন। একবার গরমকালে আরাফাতের দিনে রোযা রাখেন। গরম ও সূর্যের তাপ এত তীব্র ছিল যে, মাথায় পানির ছিটে দেওয়া হচ্ছিল। এ অবস্থা দেখে তার ভাই আবদুর রহমান রা. ছিলেন, এই প্রচণ্ড গরমে রোযা রাখার এত কী দরকার। ইফতার করে ফেলুন। বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে শুনেছি যে, আরাফাতের দিনে রোযা রাখলে সারা বছরের গোনাহ মাফ হয়ে যায়। তারপরেও আমি রোযা ভেঙে ফেলব?

হযরত কাসেম বিন মুহাম্মাদ বিন আবু বকর রা.- যিনি সাইয়িদুনা হযরত আবু বকর রা.'র নাতি ছিলেন, তিনি বলেন, আমার দৈনন্দিন রুটিন ছিল, আমি প্রতিদিন খুব সকালে আমার ফুফু আয়েশা রা.-এর কাছে সালাম করার জন্য যেতাম এবং তারপর দিনের অন্যান্য কাজের জন্য বের হতাম।

একদিন অভ্যাস মতো আমি ফুফুজান উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে দেখলাম, তিনি চাশতের নামায পড়ছেন এবং নিম্নের আয়াতে মুবারাকা তিলাওয়াত করছেন,
فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقْنَا عَذَابَ السَّمُومِ
আল্লাহ আমাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে পুঁজের আযাব থেকে বাঁচিয়েছেন।

এ আয়াত পড়ে তিনি ভীষণ বিচলিত ও ভীত পয়ে পড়লেন। আয়াতটি বারংবার পড়ে যাচ্ছেন এবং অঝোরে কাঁদছিলেন। আমি কিছুক্ষণ তার নামায শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম; কিন্তু দীর্ঘক্ষণ পরও নামায শেষ হচ্ছিল না। আমি ভাবলাম, বাজারের কাজগুলো সেরে এসে ফুফুজানকে সালাম জানাবো।

এ ভাবনাতেই হযরত কাসেম বিন মুহাম্মাদ বিন আবু বকর রা. বাজারে চলে গেলেন। সেখান থেকে নিজের কাজ সেরে ফিরে এলেন ফুফু উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর কাছে। এসে দেখলেন, এখনো তিনি নামাযরত আছেন এবং ওই আয়াতটি বার বার তিলাওয়াত করে যাচ্ছেন এবং কেঁদে যাচ্ছেন।

'তোমাদের জিহাদ হচ্ছে হজ'
আম্মাজান সায়্যিদা উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন হয়—এমন সব সব আমলের প্রতি ছিলেন প্রবল আকাঙ্ক্ষী। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুমতি চান।

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট জিহাদের অনুমতি চাইলে তিনি বলেন, তোমাদের জিহাদ হলো হজ।

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে আরও বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, জিহাদকে আমরা সর্বোত্তম আমল মনে করি। কাজেই আমরা কি জিহাদ করব না? তিনি বললেন, না, বরং তোমাদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হলো, হজে মাবরূর।

হযরত আয়েশা রা.-এর অন্তরে ছিল তীব্র আল্লাহ-ভীতি। অন্তরটিও ছিল অতি কোমল। খুব তাড়াতাড়ি কাঁদতে শুরু করতেন। উম্মুল মুমিনীন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. হুজ্জাতুল বিদা'র সময়ে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম বাঁধার ইচ্ছা প্রকাশ করলে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. প্রিয়নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সুগন্ধি লাগিয়ে দিলেন। প্রিয়নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারাফ নামক স্থানে পৌঁছলে উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর মাসিক শুরু হয়ে যায়। নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর কাছে পৌঁছলে তাকে ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখতে পেলেন।

রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আল্লাহ তাআলা আদম আ.-এর সকল কন্যাদের ভাগ্যে এই নিয়ম লিখে দিয়েছেন। (অর্থাৎ, কাঁদার কোনো কারণ নেই। যতটুকু হজের সাথে সম্পর্কিত) সে সব কাজ করে নাও, হজে অংশগ্রহণকারী অন্যরা যেভাবে করে থাকে, শুধু তাওয়াফ করা বাকি রাখবে। পবিত্র হলে পরে তাওয়াফ আদায় করে নেবে।

জিহাদের ময়দানের কিছু স্মৃতি
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর মর্যাদা ও মহত্ত্বের বিবরণে ইসলামী ইতিহাসের গ্রন্থগুলো ভরপুর। তিনি যেখানে একজন বিজ্ঞ ইসলামী আইনবিদ, মুজতাহিদ, প্রচণ্ড ধীশক্তি সম্পন্ন এবং ইমামুল আম্বিয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মন-মেজায বুঝতে পারা মহিলা ছিলেন, সেখানে তার জিহাদী জীবনের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে।

হিজরী তৃতীয় সনের ঘটনা। উহুদ-যুদ্ধের প্রাক্কালে হঠাৎ একটি ভুলের কারণে মুসলমানরা বিজয় ধরে রাখতে পারেনি। এমন সময় ইমামুল আম্বিয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শহীদ হওয়ার ভুল সংবাদও চাউর হয়ে গিয়েছিল। মদীনা তাইয়্যিবা থেকে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. এবং তার সাথে অন্যান্য মহিলারা নির্ভীকচিত্তে হাতের মুঠোয় প্রাণ রেখে জিহাদের ময়দানে চলে এসেছিলেন।

হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদের দিন আমি আয়েশা বিনতে আবু বকর এবং উম্মে সুলায়ম রা.-কে দেখেছি, তারা দু-জনেই পায়ের কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আমি তাদের পায়ের তলা দেখতে পেয়েছি। তারা মশক ভরে পানি আনতেন এবং (আহত) লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন। আবার ফিরে গিয়ে পানি এনে লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন।

বনু মুসতালিক অভিযানে মুনাফিকরা হযরত আয়েশা রা.-কে নিয়ে একটি কুৎসিত ষড়যন্ত্র করে। তারা হযরত আয়েশা রা.-এর পবিত্র চরিত্রের ওপর এক চরম অপমানকর মিথ্যা অপবাদ দেয়। হযরত আয়েশা রা.-এর নির্দোষিতা ঘোষণা করে কুরআনের আয়াত নাযিল হয় যা কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ তিলাওয়াত করবে।

এমনই হয় মুসলমানদের ঘর
উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বলেন, আমার দুগ্ধ সম্পর্কীয় বাবা আবুল কাইসের ভাই আফলাহ নামীয় ব্যক্তি পর্দার নির্দেশ অবতীর্ণ হওয়ার পর আমার কাছে আসার অনুমতি চাইলে আমি বললাম, যতক্ষণ পর্যন্ত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে এ ব্যাপারে শরীয়তের নির্দেশনা না মিলবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া যাবে না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর কাছে তাশরীফ আনলে তিনি সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। তোমাকে এ ব্যাপারে কোন্ বস্তু নিষেধ করল যে, স্বীয় (দুধ সম্পর্কীয়) চাচাকে আসতে দেবে না? উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বললেন, আমাকে তো পুরুষ মানুষ দুধ পান করায়নি। (যার সাথে আফলাহ'র কোনো সম্পর্ক নেই; কেননা, সে তো ওই মহিলার দেবর)। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আফলাহকে তোমার কাছে আসার অনুমতি দাও। কেননা, তিনি তোমার চাচা। তোমার মঙ্গল হোক।

এমনই হওয়া উচিত মুসলমানের ঘর। আমরা আজ দ্বীনের মহান বার্তার প্রতি দৃষ্টি না দেওয়ার কারণে আমার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা। উম্মুল মুমিনীনদের এই ঘটনাবলী আমাদের সচেতন হতে বলে। শিক্ষা দেয় সভ্য ও শিষ্ট হওয়ার।

একবার হযরত আয়েশা রা. স্বপ্নে দেখেন যে, তার ঘরে একের পর এক তিনটি চাঁদ ছুটে এসে পড়ছে। তিনি এই স্বপ্নের কথা পিতা আবু বকর সিদ্দীক রা.-কে বলেন। যখন রাসূলে কারীমকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ঘরে দাফন করা হলো তখন আবু বকর রা. মেয়েকে বললেন, সেই তিন চাঁদের একটি এই এবং সবচেয়ে ভালোটি।

পরবর্তী ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, তার স্বপ্নের দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাঁদ ছিলেন আবু বকর রা. ও উমর রা.।

হযরত আয়েশা রা. আঠারো বছর বয়সে বিধবা হন এবং এ অবস্থায় জীবনের আরও আটচল্লিশটি বছর অতিবাহিত করেন। যতদিন জীবিত ছিলেন, কবর পাকের পাশেই ছিলেন। প্রথম দিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবরের পাশেই ঘুমাতেন। একদিন রাসূলুল্লাহকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বপ্নে দেখার পর সেখানে ঘুমানো ছেড়ে দেন। হযরত উমর রা.-কে আয়েশা রা.-এর ঘরে দাফন করার পূর্ব পর্যন্ত হিজাব ছাড়া আসা-যাওয়া করতেন। কারণ, তখন সেখানে যে দুই জন শায়িত ছিলেন, তাদের একজন স্বামী এবং অপরজন পিতা। তাদের পাশে উমর রা.-কে দাফন করার পর বলতেন, এখন ওখানে যেতে গেলে হিজাবের প্রয়োজন হয়।

সাপ মেরে ফিদইয়া আদায় করা
একবার উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর ঘরে একটি সাপ এসেছিল। তিনি সেটা মেরে ফেললেন। কেউ বলল যে, আপনি ভুল করেছেন। কেননা, হতে পারে সে মুসলমান জিন ছিল। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বললেন, যদি সে মুসলমান জিন হয় তবে সে উন্মুহাতুল মুমিনীনদের ঘরে কেন আসবে? সে বলল, যখন সে এসেছিল তখন আপনি পরিপূর্ণ পর্দা অবস্থায় ছিলেন।

উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. এই যুক্তি শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং সাপ মারার ফিদইয়াস্বরূপ একটি গোলাম আযাদ করে দিলেন।

ইফকের ঘটনা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণী আয়েশা রা. বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোথাও সফরে বের হতেন, তখন তিনি তার স্ত্রীগণের মধ্যে লটারী দিতেন। এতে যার নাম উঠত, তাকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হতেন। আয়েশা রা. বলেন, অতএব, কোনো এক যুদ্ধে যাওয়ার সময় আমাদের মধ্যে লটারী দিলেন, তাতে আমার নাম উঠল। আমি রসূসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে বের হলাম, পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরে। আমাকে হাওদায় করে উঠানো হতো এবং তাতে করে নামানো হতো। এভাবেই আমরা চললাম। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধ শেষ করে ফিরলেন এবং ফেরার পথে আমরা মদীনার নিকটবর্তী হলাম। একদা রওনা দেওয়ার জন্য রাত থাকতেই ঘোষণা দিলেন। এ ঘোষণা হলে আমি উটে চড়ে সৈন্যদের অবস্থান থেকে কিছু দূরে চলে গেলাম। আমার প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে যখন সওয়ারীর কাছে এলাম, তখন দেখতে পেলাম যে, জাফরের দানা (Zifar beads, ইয়েমেনের জাফার অঞ্চলের একটি বিশেষ পাথরের দানা) খচিত আমার হারটি ছিঁড়ে কোথাও পড়ে গেছে। আমি তা খোঁজ করতে লাগলাম। খোঁজ করতে আমার একটু দেরী হয়ে গেল।

ইতোমধ্যে এ সকল লোক যারা আমাকে সওয়ার করাতো তারা, আমি আমার হাওদার ভেতরে আছি মনে করে, আমার হাওদা উটের পিঠে রেখে দিল। কেননা, এ সময় শরীরের গোশত আমাকে ভারী করেনি। আমরা খুব অল্প- খাদ্য খেতাম। আমি ছিলাম অল্পবয়স্কা এক বালিকা। সুতরাং হাওদা উঠাবার সময় তা যে খুব হালকা, তা তারা টের পায়নি এবং তারা উট হাঁকিয়ে রওনা দিল। সেনাদল চলে যাওয়ার পর আমি আমার হার পেয়ে গেলাম এবং যেখানে তারা ছিল সেখানে ফিরে এলাম। তখন সেখানে এমন কেউ ছিল না, যে ডাকবে বা ডাকে সাড়া দিবে। আমি যেখানে ছিলাম সে স্থানেই থেকে গেলাম। এ ধারণায় বসে থাকলাম যে, যখন কিছুদূর অগ্রসর হয়ে তারা যখন আমাকে দেখতে পাবে না, তখন এ স্থানে অবশ্যই খুঁজতে আসবে। সেখানে বসা অবস্থায় আমার চোখে ঘুম এসে গেল, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। আর সৈন্যবাহিনীর পিছনে সাফওয়ান ইবনে মুআত্তাল সুলামী যাওকয়ানী ছিলেন। তিনি একজন মানুষের অবয়ব দেখতে পেলেন। তিনি আমার কাছে এসে আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। কেননা, পর্দার হুকুম অবতীর্ণ হবার আগেই তিনি আমাকে দেখেছিলেন। কাজেই আমাকে চেনার পর উচ্চকণ্ঠে 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পড়লেন। পড়ার শব্দে আমি উঠে গেলাম এবং আমি আমার চাদর পেঁচিয়ে চেহারা ঢেকে নিলাম। আল্লাহর কসম, তিনি আমার সঙ্গে কোনো কথাই বলেননি এবং তার মুখ হতে 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' ব্যতীত আর কোনো কথা আমি শুনিনি। এরপর তিনি তার উষ্ট্রী বসালেন এবং সামনের দুই পা নিজ পায়ে দাবিয়ে রাখলেন। আর আমি তাতে উঠে গেলাম। তখন সাফওয়ান উষ্ট্রীর লাগাম ধরে চললেন। শেষ পর্যন্ত আমরা সৈন্যবাহিনীর নিকট এ সময় গিয়ে পৌঁছলাম, যখন তারা দুপুরের প্রচণ্ড উত্তাপের সময় অবতরণ করে। (এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে) যারা ধ্বংস হওয়ার তারা ধ্বংস হলো।

আর যে ব্যক্তি এ অপবাদের নেতৃত্ব দেয়, সে ছিল (মুনাফিক সরদার) আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই ইবনে সালুল। তারপর আমি মদীনায় এসে পৌঁছলাম এবং পৌঁছার পর আমি দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত অসুস্থ ছিলাম। আর অপবাদকারীদের কথা নিয়ে লোকেরা রটনা করছিল। আমি এসব কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে এতে আমাকে সন্দেহে ফেলেছিল যে, আমার অসুস্থ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে রকম স্নেহ-ভালোবাসা দেখাতেন, এবারে তেমনি ভালোবাসা দেখাচ্ছেন না। শুধু এতটুকুই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কাছে আসতেন এবং সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, তোমার অবস্থা কী? তারপর তিনি ফিরে যেতেন। এই আচরণই আমাকে সন্দেহে ফেলেছিল; অথচ আমি এই অপপ্রচার সম্বন্ধে জানতেই পারিনি। অবশেষে একটু সুস্থ হওয়ার পর মিসতাহের মায়ের সঙ্গে মানাসের (শহরের বাইরে খোলা ময়দানের) দিকে বের হলাম। সে জায়গাটিই ছিল আমাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার স্থান আর আমরা কেবল রাতের পর রাতেই বাইরে যেতাম।

এ ছিল এ সময়ের কথা যখন আমাদের ঘরের পাশে পায়খানা নির্মিত হয়নি। আমাদের তখন অনেকটা প্রাচীন আরবদের ন্যায় নিচু ময়দানের দিকে বের হয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে হতো। কেননা, ঘর-সংলগ্ন পায়খানা নির্মাণকে আমরা কষ্টকর মনে করতাম। কাজেই আমি ও মিসতাহের মা বাইরে গেলাম। তিনি ছিলেন আবু রুহম ইবনে আব্দ মানাফের কন্যা এবং মিসতাহর মায়ের মা ছিলেন সাখর ইবনে আমীরের কন্যা, যিনি আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর খালা ছিলেন। আর তার পুত্র ছিলেন মিসতাহ্ ইবনে উসাসাহ।

আমি ও উম্মে মিসতাহ্ আমাদের প্রয়োজন সেরে ঘরের দিকে ফিরলাম। তখন মিসতাহের মা তার চাদরে হোঁচট খেয়ে বললেন, 'মিসতাহ্' ধ্বংস হোক। আমি তাকে বললাম, তুমি খুব খারাপ কথা বলছ, তুমি কি এমন এক ব্যক্তিকে মন্দ বলছ, যে বাদরের যুদ্ধে হাজির ছিল? তিনি বললেন, হায়রে বেখেয়াল! তুমি কি শোননি সে কী বলেছে? আমি বললাম, সে কী বলেছে? তিনি বললেন, এমন এমন। এ বলে তিনি অপবাদকারীদের মিথ্যা অপবাদ সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত খবর দিলেন। এতে আমার অসুখের মাত্রা বৃদ্ধি পেল। যখন আমি ঘরে ফিরে আসলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ঘরে প্রবেশ করে বললেন, তুমি কেমন আছ? তখন আমি বললাম, আপনি কি আমাকে আমার আববা-আম্মার নিকট যেতে অনুমতি দিবেন? আয়েশা রা. বললেন, তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল যে, আমি তাদের কাছে গিয়ে তাদের থেকে আমার এ ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জেনে নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আববা-আম্মার কাছে চলে গেলাম এবং আমার আম্মাকে বললাম, ও গো আম্মা! লোকেরা কী বলাবলি করছে? তিনি বললেন, বৎস! তুমি তোমার মন হালকা রাখ। আল্লাহর কসম! এমন কমই দেখা যায় যে, কোনো পুরুষের কাছে এমন সুন্দরী রূপবতী স্ত্রী আছে, যাকে সে ভালোবাসে এবং তার সতীনও আছে; অথচ তার ত্রুটি বের করা হয় না। রাবী বলেন, আমি বললাম, 'সুবহানাল্লাহ'! সত্যি কি লোকেরা এ ব্যাপারে বলাবলি করছে?

তিনি বলেন, আমি সে রাত কেঁদে কাটালাম, এমনকি ভোর হয়ে গেল, তথাপি আমার কান্না থামল না এবং আমি ঘুমাতেও পারলাম না। আমি কাঁদতে কাঁদতেই ভোর করলাম। যখন ওহী আসতে দেরী হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী ইবনে আবু তালিব রা. ও উসামাহ ইবনে যায়িদ রা.-কে তার স্ত্রীর বিচ্ছেদের ব্যাপারে তাদের পরামর্শের জন্য ডাকলেন। তিনি বলেন, উসামাহ ইবনে যায়িদ তার সহধর্মিণী (আয়েশা রা.-এর পবিত্রতা এবং তার অন্তরে তাদের প্রতি তার ভালোবাসা সম্পর্কে যা জানেন তার আলোকে তাকে পরামর্শ দিতে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার পরিবার সম্পর্কে আমরা ভালো ধারণাই পোষণ করি। আর আলী ইবনে আবু তালিব রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আপনার ওপর কোনো পথ সংকীর্ণ করে দেননি এবং তিনি ব্যতীত বহু মহিলা রয়েছেন। আর আপনি যদি দাসীকে জিজ্ঞেস করেন, সে আপনার কাছে সত্য ঘটনা বলবে।

আয়েশা রা. বলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারীরাকে ডাকলেন এবং বললেন, হে বারীরা, তুমি কি তার নিকট হতে সন্দেহজনক কিছু দেখেছ? বারীরা বললেন, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, তার কসম! আমি এমন কোনো কিছু তার মধ্যে দেখতে পাইনি, যা আমি গোপন করতে পারি। তবে তার মধ্যে সবচাইতে অধিক যা দেখেছি, তা হলো, তিনি একজন অল্পবয়স্কা বালিকা। তিনি কখনো তার পরিবারের আটার খামির রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন। অর ছাগলের বাচ্চা এসে তা খেয়ে ফেলত।

এরপরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মিম্বরে) দাঁড়ালেন। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুলের বিরুদ্ধে তিনি সমর্থন চাইলেন। 'আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বরের ওপর থেকে বললেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, ওই ব্যক্তির মিথ্যা অপবাদ থেকে আমাকে সাহায্য করতে পারে, যে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভালোই জানতে পেরেছি এবং তারা এমন এক পুরুষ সম্পর্কে অভিযোগ এনেছে, যার সম্পর্কে আমি ভালো ব্যতীত কিছুই জানি না। সে কখনো আমাকে ব্যতীত আমার ঘরে আসেনি। এ কথা শুনে সাআদ ইবনে মু'আয আনসারী রা. দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, তার বিরুদ্ধে আমি আপনাকে সাহায্য করব, যদি সে আউস গোত্রের হয়, তবে আমি তার গর্দান মেরে দিব। আর যদি আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের লোক হয়, তবে আপনি নির্দেশ দিলে আমি আপনার নির্দেশ কার্যকর করব। 'আয়েশা রা. বলেন, এরপর সাআদ ইবনে উবাদা দাঁড়ালেন; তিনি খাযরাজ গোত্রের সর্দার। তিনি পূর্বে একজন নেক্কার লোক ছিলেন; কিন্তু এ সময় স্ব-গোত্রের পক্ষপাতিত্ব তাকে উত্তেজিত করে তোলে। কাজেই তিনি সা'দকে বললেন, চিরঞ্জীব আল্লাহর কসম! তুমি মিথ্যা বলেছ, তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না এবং তাকে হত্যা করার ক্ষমতা তুমি রাখ না। তারপর উসায়দ ইবনে হুদায়র দাঁড়ালেন, যিনি সা'দের চাচাতো ভাই। তিনি সাআদ ইবনে উবাদাকে বললেন, চিরঞ্জীব আল্লাহর কসম! তুমি মিথ্যা বলছ। আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। তুমি নিজেও মুনাফিক এবং মুনাফিকের পক্ষে প্রতিবাদ করছ। এতে আউস এবং খাযরাজ উভয় গোত্রের লোকেরা উত্তেজিত হয়ে উঠল, এমনকি তারা পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার উপক্রম হলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বরে দাঁড়ানো ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের থামাতে লাগলেন। অবশেষে তারা থামল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও নীরব হলেন।

আয়েশা রা. বলেন, আমি সেদিন এমনভাবে কাটালাম যে, আমার চোখের অশ্রুও থামেনি এবং চোখেও ঘুমও আসেনি। আয়েশা রা. বলেন, সকালবেলা আমার আববা-আম্মা আমার কাছে আসলেন, আর আমি দু-রাত এবং একদিন (একাধারে) কাঁদছিলাম। এর মধ্যে না আমার ঘুম হয় এবং না আমার চোখের পানি বন্ধ হয়। তারা ধারণা করছিলেন যে, এ ক্রন্দনে আমার কলজে ফেটে যাবে।

আয়েশা রা. বলেন, এর পূর্বে তারা যখন আমার কাছে বসা ছিলেন এবং আমি কাঁদছিলাম, ইত্যবসরে জনৈকা আনসারী মহিলা আমার কাছে আসার জন্য অনুমতি চাইলেন। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সে বসে আমার সঙ্গে কাঁদতে লাগল। আমাদের এ অবস্থার মধ্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে প্রবেশ করলেন এবং সালাম দিয়ে বসলেন। আয়েশা রা. বলেন, এর পূর্বে যখন থেকে এ কথা রটনা চলেছে, তিনি আমার কাছে বসেননি। এ অবস্থায় তিনি একমাস অপেক্ষা করেছেন, আমার সম্পর্কে ওহী আসেনি। আয়েশা রা. বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাশাহুদ পাঠ করলেন। তারপর বললেন, হে আয়েশা, তোমার সম্পর্কে এরূপ এরূপ কথা আমার কাছে পৌঁছেছে, তুমি যদি নির্দোষ হয়ে থাক, তবে অচিরেই আল্লাহ তাআলা তোমার পবিত্রতা ব্যক্ত করে দিবেন। আর যদি তুমি কোনো পাপে লিপ্ত হয়ে থাক, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তার কাছে তাওবাহ করো। কেননা, বান্দা যখন তার পাপ স্বীকার করে নেয় এবং আল্লাহর কাছে তাওবাহ করে, তখন আল্লাহ তার তাওবাহ কবুল করেন।

উত্তম ধৈর্যের উপমা
আয়েশা রা. বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কথা শেষ করলেন, তখন আমার চোখের পানি এমনভাবে শুকিয়ে গেল যে, এক ফোঁটা পানিও অনুভব করছিলাম না। আমি আমার পিতাকে বললাম, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে (তিনি যা কিছু বলেছেন তার) জবাব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কী জবাব দেব, তা আমার বুঝে আসছে না। তারপর আমার আম্মাকে বললাম, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জবাব দিন।

তিনি (আয়েশা রা.-এর আম্মা) বললেন, আমি বুঝতে পারছি না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কি জবাব দিব। আয়েশা রা. বলেন, তখন আমি নিজেই জবাব দিলাম, অথচ আমি একজন অল্প বয়স্কা বালিকা, কুরআন খুব অধিক পড়িনি। আল্লাহর কসম! আমি জানি, আপনারা এ ঘটনা শুনেছেন, এমনকি তা আপনাদের অন্তরে বসে গেছে এবং সত্য বলে বিশ্বাস করে নিয়েছেন। এখন যদি আমি বলি যে, আমি নির্দোষ এবং আল্লাহ ভালোভাবেই জানেন যে, আমি নির্দোষ; তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না। আর আমি যদি আপনাদের কাছে এ বিষয় স্বীকার করে নেই, অথচ আল্লাহ জানেন, আমি তা থেকে নির্দোষ; তবে আপনারা আমার এই উক্তি বিশ্বাস করে নেবেন। আল্লাহর কসম! এ ক্ষেত্রে আমি আপনাদের জন্য ইউসুফ আ.-এর পিতার উক্তি ব্যতীত আর কোনো দৃষ্টান্ত পাচ্ছি না। তিনি বলেছিলেন, ﴾فَصَبْرٌ جَمِيْلٌ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ﴿ 'পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া যায়।

আকাশ থেকে নেমে আসে নির্দোষিতার প্রমাণ
তিনি বলেন, এরপর আমি আমার চেহারা ঘুরিয়ে নিলাম এবং কাত হয়ে আমার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। তিনি বলেন, এ সময় আমার বিশ্বাস ছিল যে আমি নির্দোষ এবং আল্লাহ তাআলা আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করে দিবেন। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি তখন এ ধারণা করতে পারিনি যে, আল্লাহ আমার সম্পর্কে এমন ওহী অবতীর্ণ করবেন যা তিলাওয়াত করা হবে। আমার দৃষ্টিতে আমার মর্যাদা এর চাইতে অনেক নিচে ছিল; বরং আমি আশা করেছিলাম যে, হয়তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিদ্রায় কোনো স্বপ্ন দেখবেন, যাতে আল্লাহ তাআলা আমার নির্দোষিতা জানিয়ে দিবেন।

আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়াননি এবং ঘরের কেউ বের হননি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ওহী অবতীর্ণ হতে লাগল এবং তার শরীর ঘামতে লাগল। এমনকি যদিও শীতের দিন ছিল, তবুও তার ওপর যে ওহী অবতীর্ণ হচ্ছিল এর বোঝার ফলে মুক্তার মতো তার ঘাম ঝরছিল। যখন ওহী শেষ হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসছিলেন। তখন তিনি প্রথম যে বাক্যটি বলেছিলেন, তাহলে হে আয়েশা, আল্লাহ তোমার নির্দেষিতা প্রকাশ করেছেন। এ সময় আমার মা আমাকে বললেন, তুমি উঠে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব না, আল্লাহ ব্যতীত আর কারও প্রশংসা করব না। আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন পূর্ণ দশ আয়াত পর্যন্ত। ﴾إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوْ بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنْكُمْ﴿ 'যারা এ অপবাদ রচনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল।' যখন আল্লাহ তাআলা আমার নির্দোষিতার আয়াত অবতীর্ণ করলেন, তখন আবু বকর সিদ্দীক রা. যিনি মিস্তাহ ইবনে উসাসাকে নিকটবর্তী আত্মীয়তা এবং দারিদ্র্যের কারণে আর্থিক সাহায্য করতেন, তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! মিসতাহ আয়েশা সম্পর্কে যাঁ বলেছে, এরপর আমি তাকে কখনো কিছুই দান করব না।

তারপর আল্লাহ তাআলা আয়াত অবতীর্ণ করলেন, তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তার আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহত্যাগ করেছে তাদের কিছুই দেবে না। তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আবু বকর রা. এ সময় বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই পছন্দ করি যে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করেন। তারপর তিনি মিসতাহকে সাহায্য আগের মতো দিতে লাগলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এ সাহায্য কখনো বন্ধ করব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জয়নব বিনতে জাহশকেও আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হে জয়নব, (আয়েশা সম্পর্কে) কী জান আর কী দেখেছ? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আমার কান ও চোখকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আমি তার সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু জানি না।

আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণীদের মধ্যে তিনি আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন; কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে পরহেযগারীর কারণে রক্ষা করেন। আর তার বোন হামনা তার পক্ষ অবলম্বন করে দ্বন্ধ করে এবং অপবাদ দানকারী যারা ধ্বংস হয়েছিল তাদের মধ্যে সেও ধ্বংস হলো।

আমরা যখন উম্মুল মুমিনীন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর নির্দোষিতা ও নিষ্কলুষতা সংক্রান্ত আয়াতে কারীমা পাঠ করি, তখনই আমরা বুঝতে পারি কতই গুণী ও কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি।

আয়েশার বরকতে তায়াম্মুমের আয়াত
আল্লাহপাক হযরত আয়েশা রা.-কে উপলক্ষ করে মানবজাতিকে বহুবিধ কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন। ইফক-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানব সমাজে যৌনাচার ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্র রাখার জন্য অনেকগুলি বিধি-নিষেধ ও দণ্ডবিধি ঘোষণা করেছেন। তেমনি পাক-পবিত্র হওয়ার জন্য পানির বিকল্প হিসেবে তায়াম্মুমের সুযোগও তাঁকেই কেন্দ্র করে দান করেছেন। এখানে সে সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলে মনে করি।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোনো এক সফরে বের হয়েছিলাম যখন আমরা ‘বায়যা’ অথবা ‘যাতুল জায়শ’ নামক স্থানে পৌঁছলাম তখন একখানা হার হারিয়ে গেল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-সেখানে হারের খোঁজে থেমে গেলেন আর লোকেরাও তাঁর সঙ্গে থেমে গেলেন, অথচ তারা পানির নিকটে ছিলেন না। তখন লোকেরা আবু বকর রা. এর নিকট এসে বললেন, ‘আয়েশা কী করেছেন আপনি কি দেখেননি? তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও লোকদের আটকিয়ে ফেলেছেন, অথচ তারা পানির নিকটে নেই এবং তাদের সাথেও পানি নেই। আবু বকর রা. আমার নিকট আসলেন, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-আমার উরুর উপরে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলেন। আবু বকর রা. বললেন, তুমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লোকদের আটকিয়ে ফেলেছ! অথচ আশেপাশে কোথাও পানি নেই। এবং তাদের সাথেও পানি নেই।

আয়েশা রা. বলেন, আবু বকর আমাকে খুব তিরস্কার করলেন এবং আল্লাহর ইচ্ছা, তিনি যা খুশি তাই বললেন। তিনি আমার কোমরে আঘাত দিতে লাগলেন। আমার উরুর ওপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথা থাকায় আমি নড়তে পারছিলাম না। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভোরে উঠলেন, কিন্তু পানি ছিল না। তখন আল্লাহ তাআলা তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল করলেন। অতঃপর সবাই তায়াম্মুম করে নিলেন।

উসায়দ ইবনে হুযাইর রা. বললেন, হে আবু বকরের পরিবারবর্গ, এটাই আপনাদের প্রথম বরকত নয়। আয়েশা রা. বলেন, তারপর আমি যে উটে ছিলাম তাকে দাঁড় করালে দেখি আমার হারখানা তার নীচে পড়ে আছে।

রাসূলের ইন্তেকালের পূর্বাভাস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতী জীবন পূর্ণ হয়ে গেল। ইহকাল থেকে বিদায়ের নিদর্শনসমূহ তার কাছে প্রতিভাত হতে লাগল। তিনি তা অনুভবও করতে লাগলেন। দশম হিজরী সনের রমযান মাসে তিনি বিশ দিন ইতেকাফ করলেন। অথচ তিনি আগে মাত্র দশদিন ইতেকাফ করতেন। জিবরাঈল আ. তাকে সাথে নিয়ে কুরআন দুই বার অধ্যয়ন করেন। বিদায় হজে তিনি বলেন, 'জানিনা, সম্ভবত আমি পরবর্তী বছর এই স্থানে আর তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবো না।'

১১ হিজরীর সফর মাসের শেষের দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহুদ প্রান্তরে গেলেন এবং জীবিতরা যেভাবে মৃতদের শেষ বিদায় জানায়, সেভাবে শহীদদের জন্য দুআ করলেন। কোনো এক রাতের মধ্যভাগে তিনি বাকী গোরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, বললেন, 'হে কবরবাসী! তোমাদের প্রতি সালাম। তাদেরকে শুভ সংবাদ দিলেন, নিশ্চয় অচিরেই আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো।”

একবার উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় ভুগছিলেন। সে সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও মৃত্যুকালীন অসুস্থতা শুরু হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে আয়েশা, যদি তুমি আমার সামনে মৃত্যুবরণ করতে, তাহলে আমি তোমাকে আমার হাত দিয়ে গোসল করাতাম। আমার হাত দিয়ে তোমার কাফন-দাফন করতাম এবং তোমার জন্য দুআ করতাম।

উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. অভিমানের সুরে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনি আমার মৃত্যু কামনা করছেন? যদি এমন হয়, তাহলে এই কক্ষে নতুন বিবি নিয়ে আসবেন? ইমামুল আম্বিয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা শুনে মুচকি হাসলেন।

১১হিজরীর ২৯ শে সফর সোমবারের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাকী কবরস্থানে একটি জানাযায় শরীক হন। ফেরার পথে তার মাথা ব্যথাশুরু হয়, তাপমাত্রা চরমে ওঠে। এমনকি মাথার পট্টির ওপর দিয়েও তা অনুভব করা যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসুখ বেশি হয়ে গেল। তিনি বিবিদের জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, আগামী দিন আমি কোথায়? আগামী দিন আমি কোথায়? তারা তার উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন। তাই তারা ইচ্ছানুযায়ী তাকে থাকার অনুমতি দিলেন। তিনি আয়েশার রা. ঘরে স্থানান্তরিত হলেন। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে,

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, মৃত্যু রোগকালীন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করতেন, আমি আগামীকাল কার ঘরে থাকব। আগামীকাল কার ঘরে? এর দ্বারা তিনি আয়েশা রা.-এর ঘরের পালার ইচ্ছা পোষণ করতেন। সহধর্মিণীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যার ঘরে ইচ্ছা অবস্থান করার অনুমতি দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রা.-এর ঘরে ছিলেন। এমনকি তার ঘরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার জন্য নির্ধারিত পালার দিন আমার ঘরে ইন্তেকাল করেন এবং আল্লাহ তার রূহ কবজ করেন এ অবস্থায় যে, তার মাথা আমার গণ্ড ও সীনার মধ্যে ছিল এবং আমার থুথু (তাঁর থুথুর সঙ্গে) মিশ্রিত হয়ে যায়। তারপর তিনি বলেন, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা. তার ঘরে প্রবেশ করল আর তার হাতে একটি মিসওয়াক ছিল যা দিয়ে সে তার দাঁত মাজছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে তাকালেন। আমি তখন তাকে বললাম, হে আবদুর রহমান, এই মিসওয়াকটি আমাকে দাও; তখন সে আমাকে তা দিয়ে দিল। আমি সেটি চিবিয়ে নরম করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দিলাম। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করলেন, তিনি তখন আমার বুকে হেলান দেওয়া অবস্থায় ছিলেন।

মাসেহ করে দিতেন নিজ হাতে
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়তেন তখন তিনি আশ্রয় প্রার্থনার দুই সূরাহ (ফালাক ও নাস) পাঠ করে নিজ দেহে ফুঁক দিতেন এবং স্বীয় হাত দ্বারা শরীর মাসাহ করতেন। এরপর যখন মৃত্যু-রোগে আক্রান্ত হলেন, তখন আমি আশ্রয় প্রার্থনার সূরাহ দুটি দিয়ে তার শরীরে ফুঁ দিতাম, যা দিয়ে তিনি ফুঁ দিতেন। আর আমি তার হাত দ্বারা তার শরীর মাসাহ করিয়ে দিতাম।

আবু মূসা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়লেন, ক্রমে তার অসুস্থতা তীব্রতর হলে তিনি বললেন, আবু বকরকে লোকদের নিয়ে নামায আদায় করতে বলো। আয়েশা রা. বললেন, তিনি তো কোমল হৃদয়ের লোক, যখন আপনার স্থানে দাঁড়াবেন, তখন তিনি লোকদের নিয়ে নামায আদায় করতে পারবেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার বললেন, আবু বকরকে বলো, সে যেন লোকদের নিয়ে নামায আদায় করে। আয়েশা রা. আবার সে কথা বললেন। তখন তিনি আবার বললেন, আবু বকর রা.-কে বলো, সে যেন লোকদের নিয়ে নামায আদায় করে। তোমরা ইউসুফের আ. সাথী মহিলাদেরই মতোই। অতঃপর একজন সংবাদদাতা আবু বকর রা.-এর নিকট সংবাদ নিয়ে আসলেন এবং তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশাতেই লোকদের সঙ্গে নিয়ে নামায আদায় করলেন।

তারপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমা রা.-কে ডেকে কানে কানে কিছু কথা বললেন। তিনি কেঁদে ফেলেন, আবার তাকে ডাক দিয়ে কানে কানে কিছু কথা বললে তিনি হেসে উঠলেন। আয়েশা রা. বলেন, আমরা তাকে পরবর্তী সময়ে এসম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে গোপনে বলেছিলেন, যে তিনি এখন যে ব্যথায় আক্রান্ত তাতেই ইন্তেকাল করবেন, তাই আমি কেঁদেছিলাম। আবার তিনি আমাকে গোপনে বলেছিলেন, আমি তার পরিবার থেকে সর্ব প্রথম তার সাথে মিলিত হব। তাই আমি হেসেছিলাম। ফাতিমা রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওপর মহা বিপদ আচ্ছাদিত হওয়া দেখে বলেন, আহা আমার পিতা কতবড় বিপদে! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আজকের দিনের পর তোমার পিতার ওপর আর কোনো বিপদ নেই। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে,

আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রোগ প্রকট আকার ধারণ করে, তখন তিনি বেঁহুশ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ফাতিমা রা. বললেন, আহ! আমার পিতার ওপর কত কষ্ট! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'আজকের পরে তোমার পিতার ওপর আর কোনো কষ্ট থাকবে না।' যখন তিনি ইন্তেকাল করলেন, তখন ফাতিমা রা. বললেন, 'হায়! আমার পিতা! রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হায় আমার পিতা! জান্নাতুল ফিরদাউসে তার বাসস্থান। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমাহিত করা হলো, তখন ফাতিমা রা. বললেন, 'হে আনাস, রাসূলুল্লাহকে মাটি চাপা দিয়ে আসা তোমরা কীভাবে বরদাশত করলে!'

আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেদিন হিজরত করে মাদীনায় প্রবেশ করেন সেদিন সেখানকার প্রতিটি জিনিস জ্যোতির্ময় হয়ে যায়। তারপর যে দিন তিনি মৃত্যুবরণ করেন সেদিন আবার সেখানকার প্রত্যেকটি বস্তু অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। তার দাফনকার্য আমরা সমাপ্ত করে হাত থেকে ধূলা না ঝাড়তেই আমাদের মনে পরিবর্তন এসে গেল (ঈমানের জোর কমে গেল)।'

আবু বকর রা.-এর ভূমিকা
আবু বকর রা. সুন্হ নামক আবাসস্থল থেকে ঘোড়ায় চড়ে ফিরে আসলেন। ঘোড়া থেকে নামার পর মসজিদে প্রবেশ করলেন। মানুষের সাথে কোনো কথা না বলেই আয়েশা রা. এর ঘরে প্রবেশ করে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিকে গেলেন। সেসময় তিনি হাবিরা নামক স্থানের কাপড় দ্বারা আবৃত ছিলেন। তিনি নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চেহারা মুবারক হতে কাপড় সরিয়ে তার ওপর ঝুঁকে পড়লেন। তাকে চুম্বন করলেন এবং কাঁদতে লাগলেন অতঃপর বললেন, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক, নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে দু-বার মৃত্যু দেবেন না। আপনার ওপর যে মরণ লেখা হয়েছিল তা হয়ে গেছে। এরপর আবু বকর রা. সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লেন। উমর রা. সেসময় মানুষের সাথে কথা বলছিলেন। আবু বকর বললেন, হে উমর, আপনি বসে পড়ুন; কিন্তু উমর বসতে অস্বীকার করলেন। তখন আবু বকর রা. কথা বলতে শুরু করলেন, মানুষ এবার উমর রা.-কে ছেড়ে দিয়ে তার দিকেই ঝুকে পড়ল। আল্লাহর প্রশংসার পর আবু বকর রা. বললেন,
হে লোক সকল, তোমাদের মধ্য থেকে যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইবাদত করত, তাদের জেনে রাখা উচিত, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুবরণ করেছেন। আর তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর ইবাদত করত তাদের যেনে রাখা উচিত, আল্লাহ চিরঞ্জীব চিরস্থায়ী। আল্লাহ বলেন, মুহাম্মাদ তো আল্লাহর রাসূল, তার পূর্বে অনেক রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। যদি তিনি ইন্তেকাল করেন বা নিহত হন, তোমরা কি তোমাদের পশ্চাতে ফিরে যাবে? বস্তুত যে ব্যক্তি তার পশ্চাতে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।

ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, উমর রা. বলেন, আমি যখন আবু বকর রা.-কে উক্ত আয়াতটি পাঠ করতে শুনলাম তখনই আমি অবস হয়ে গেলাম। আমার দুই পা আমাকে বহন করতে পারল না। তার কাছে উক্ত আয়াত শুনে যমীনে পড়ে গেলাম এবং একীন করে নিলাম যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুবরণ করেছেন।

তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোথায় দাফন করবেন এ নিয়ে মতবিরোধ করলেন। তখন আবু বকর রা. বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'যে নবীই মৃত্যুবরণ করেছেন তাকে তার মরণস্থলেই দাফন করা হয়েছে।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বিছানার ওপর মৃত্যুবরণ করেন, তালহা তা গুটিয়ে দিলেন এবং তার নিচে মাটি খনন করে বুগলী কবর তৈরি করলেন। এটি ছিল মঙ্গলবার দিবাগত রাতের মধ্যাংশ। আল্লাহ আমাদের প্রিয় নবীজির ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষিত করুন।

আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ জ্ঞান
তিনি শরীয়াতের এক চতুর্থাংশ জ্ঞান বহন করেছেন। মহান আল্লাহ তাআলা উন্মুহাতুল মুমিনীনদের উদ্দেশ্য করে বলছেন,
وَ اذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَتِ اللَّهِ وَ الْحِكْمَةِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا
আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর যে, আয়াতসমূহ ও হিকমত পঠিত হয়-তা তোমরা স্মরণ রেখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, 'প্রত্যেক মুসলমানের ওপর জ্ঞান অর্জন করা ফরয।' হাফিয সাখাবী রহ. বলেন, এই হাদীসের শেষে কোনো কোনো গ্রন্থকার مسلمة, শব্দটিও যোগ করেছেন। অথচ এ শব্দ উল্লেখ না করলেও সেই অর্থও উপর্যুক্ত হাদীসটি বহন করে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ لَهُمْ أَجْرَانِ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ آمَنَ بِنَبِيِّهِ، وَآمَنَ بِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ وَالْعَبْدُ الْمَمْلُوكُ إِذَا أَدَّى حَقَّ اللَّهِ وَحَقَّ مَوَالِيهِ. وَرَجُلٌ كَانَتْ عِنْدَهُ أَمَةٌ {يَطَؤُهَا} فَأَدَّبَهَا، فَأَحْسَنَ تَأْدِيبَهَا، وَعَلَّمَهَا فَأَحْسَنَ تَعْلِيمَهَا ، ثُمَّ أَعْتَقَهَا فَتَزَوْجَهَا، فَلَهُ أَجْرَانِ
তিন ধরনের লোকের জন্য দুটি পুণ্য রয়েছে: (১) আহলে কিতাব, যে ব্যক্তি তার নবীর ওপর ঈমান এনেছে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরও ঈমান এনেছে। (২) যে ক্রীতদাস আল্লাহর হক আদায় করে এবং তার মালিকের হকও (আদায় করে)! (৩) যার বাঁদী ছিল, যার সাথে সে মিলিত হতো। তারপর তাকে সে সুন্দরভাবে আদব-কায়দা শিক্ষা দিয়েছে এবং ভালোভাবে দ্বীনি ইলম শিক্ষা দিয়েছে, অতঃপর তাকে আযাদ করে বিয়ে করেছে; তার জন্য দুটি পুণ্য রয়েছে।

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা.-এর সীরাতে মুবারাকার প্রতি যখন আমরা একটি বিশ্লেষণ ও তুলনামূলক দৃষ্টিপাত করি তখন কেবল সকল মহিলা সাহাবী নয়, বরং অনেক বড় বড় পুরুষ সাহাবীদের তুলনায় তার মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যটি পরিপূর্ণরূপে পাই তা হলো, তিনি জন্ম ও স্বভাবগতভাবে চিন্তা-চেতনায় অনুসন্ধিৎসু মেধার অধিকারী ছিলেন। দ্বীনের তাৎপর্য বিষয়ে গভীর জ্ঞান, ইজতিহাদের ক্ষমতা ও শক্তি, সমালোচনা ও পর্যালোচনার রীতি-পদ্ধতি, ঘটনাবলীর যথাযথ উপলব্ধি, গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং শুদ্ধ ও সঠিক মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে তার স্থান ছিল অতি উচ্চে।

তিনি যে সব কথা বলতেন, যেসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিতেন, তা হতো বিলকুল প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির অনুকূলে। তার এমন কোনো বর্ণনা খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য হবে যা সমর্থনের জন্য মানুষের বুদ্ধি ও প্রজ্ঞাকে নানা রকম তাবীল বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। একথা অবশ্য সত্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতি নিকটের মানুষ হওয়ার সুবাদে তিনি তার যাবতীয় কথা ও কাজ পর্যবেক্ষণের খুব চমৎকার সুযোগ লাভ করেছিলেন; কিন্তু যখন আমরা দেখি যে, তিনি ছাড়া আরও অনেক ব্যক্তি এমন ছিলেন যাঁদের নৈকট্য তার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না তখন আমাদের সামনে হযরত আয়েশা রা.-এর মেধা ও মননের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঘুরে ফিরে সেই একই কথা আসে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখনিঃসৃত বাণী আয়েশা রা. ছাড়া আরও অনেকে শুনতেন, কিন্তু তিনি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেন এবং তার প্রকৃত প্রাণসত্তা, তার মেধা ও মনন যতটুকু অনুধাবন করতে সক্ষম হতো, অন্যরা তা পারত না।

আবু সাঈদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার হাদীস তো কেবল পুরুষেরা শুনতে পায়। সুতরাং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করে দিন, যে দিন আমরা আপনার কাছে আসব, আল্লাহ আপনাকে যা কিছু শিখিয়েছেন তা থেকে আপনি আমাদের শেখাবেন। তিনি বললেন, তোমরা অমুক অমুক দিন অমুক অমুক জায়গায় একত্র হবে। সে মোতাবেক তারা একত্র হলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছে এলেন এবং আল্লাহ তাকে যা কিছু শিখিয়েছেন তা থেকে তাদের শিক্ষা দিলেন।

এ ব্যাপারে ইমাম যুহরী রা. সাক্ষ্য দিচ্ছেন, অপর একটি বর্ণনামতে, ইমাম যুহরী বলেন, গোটা নারীজাতির ইলম (জ্ঞান) এবং আয়েশা রা.-এর ইলম যদি একত্র করা যেত তাহলে আয়েশা রা.-এর ইলমই শ্রেষ্ঠ হতো।'

প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত আতা ইবনে আব রাবাহ-যিনি বহু সাহাবীর ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, বলেন, হযরত আয়েশা রা. ছিলেন মানুষর মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ, সবচেয়ে বেশি জানা ব্যক্তি এবং আম জনতার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর মতামতের অধিকারিণী। উরওয়া ইবনে যুবাইর রা. বলেন, আমি হালাল-হারাম, জ্ঞান, কবিতা ও চিকিৎসা বিদ্যায় উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. অপেক্ষা অধিকতার পারদর্শী অন্য কাউকে দেখিনি।

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দারসগাহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধাবী শিক্ষার্থী। তার জ্ঞানের পরিধি ও গভীরতা ছিল অতুলনীয়। জ্ঞানের ক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তৎকালীন সকল নারী অথবা সকল উন্মুহাতুল মুমিনীন-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এর সহধর্মিণীগণ যাঁরা বিশ্বের সকল বিশ্বাসীদের মাতা অথবা সাহাবীদের একটি অংশের উপরই ছিল না, বরং কতিপয় বিশিষ্ট সাহাবী ছাড়া সকল সাহাবীর উপরই ছিল। হযরত আবু মূসা আশআরী রা. বলেন, আমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীরা কক্ষনো এমন কোনো কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হইনি, যে বিষয়ে আমরা আয়েশা রা.-এর নিকট জানতে চেয়েছি এবং সে সম্পর্কে কোনো জ্ঞান আমরা তার কাছে পাইনি।

হযরত আবু মূসা আশআরী রা. একজন অতি উঁচু মর্যাদার সাহাবী। তার উপর্যুক্ত মন্তব্য দ্বারা হযরত আয়েশা রা.-এর জ্ঞানের পরিধি ও বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়।

প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত মাসরূক রা.-যিনি হযরত আয়েশা রা.-এর তত্ত্বাধনানে লালিত-পালিত হন, একবার তাকে প্রশ্ন করা হলো, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. কি ফারায়েয শাস্ত্র জানতেন? তিনি জবাব দিলেন, সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বড় বড় সাহবীদেরকে তার নিকট ফারায়েয বিষয়ে প্রশ্ন করতে দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস ও সুন্নাতের হিফাযত ও প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব ও কর্তব্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য বেগমগণও করেছেন। তবে তাদের কেউই হযরত আয়েশা রা.-এর স্তরে পৌঁছতে পারেননি।

নারীজাতির ওপর আয়েশা রা.-এর মর্যাদা তেমন, যেমন সকল খাদ্য-সামগ্রীর ওপর সারীদের মর্যাদা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে আয়েশা রা.-কে স্ত্রী হিসেবে লাভের সুসংবাদ পান। তার বিছানা ছাড়া আর কোনো স্ত্রীর বিছানায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী লাভ করেননি। মহান ফেরেশতা জিবরাঈল আমীন তাকে সালাম পেশ করেছেন। তিনি দুইবার জিবারাঈলকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। আল্লাহ তাআলা তার পবিত্রতা ঘোষণা করে আয়াত নাযিল করেছেন। আর তিনিই যে আখিরাতে জীবনে রাসূলে পাকের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রী হবেন, সে কথাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়ে গেছেন। এ সকল কথা সহীহ বুখারীর আয়েশার সম্মান ও মর্যাদা অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।

তাবেয়ীদের ইমাম বলে খ্যাত হযরত ইমাম যুহরী—যিনি একাধিক অতি মর্যাদাবান সাহাবীর তত্ত্বাবধানের লালিত-পালিত হন, বলেন, হযরত আয়েশা রা. মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলিম ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক বড় বড় সাহাবী তার কাছে জানতে চাইতেন।

প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফের রা. সুযোগ্য পুত্র আবু সালামা যিনি একজন অতি উঁচু স্তরের তাবেয়ী ছিলেন, বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের জ্ঞান, প্রয়োজনে কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দান, আয়াতের শানে নুযূল এবং ফরয় বিষয়সমূহে আমি আয়েশা রা. অপেক্ষা অধিকতর পারদর্শী ও সুনিশ্চিত মতামতের অধিকারী আর কাউকে দেখিনি।

হযরত আমীর মুআবিয়া রা. একদিন দরবারের এক ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলেন, আচ্ছা, আপনি বলুন তো, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় আলিম কে? লোকটি বলল, আমীরুল মুমিনীন, আপনি। আমীর মুআবিয়া রা. বললেন, না। আমি কসম দিচ্ছি, আপনি সত্য কথাটি বলুন। তখন লোকটি বলল, যদি তাই হয়, তাহলে আয়েশা রা.।

এ প্রসঙ্গে মাহমুদ ইবনে লাবীদ মন্তব্য করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেগমগণ বহু হাদীস স্মৃতিতে ধরে রেখেছিলেন; কিন্তু কেউ আয়েশা রা. ও উম্মে সালামা রা.-এর সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেননি।

উপরের বর্ণনাসমূহের প্রেক্ষিতে আল্লামা যাহাবী বলেন, 'তিনি ছিলেন বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার।' তিনি আরও বলেন, 'উম্মাতে মুহাম্মাদীর মধ্যে, সার্বিকভাবে মহিলাদের মধ্যে তার চেয়ে বড় জ্ঞানী ব্যক্তি আর কেউ নেই।'

কোনো কোনো মুহাদ্দিস আয়েশা রা.-এর ফযীলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, তোমাদের দ্বীনের একটি অংশ তোমরা হুমায়রা হতে গ্রহণ করো। ইলম ও ইজাতিহাদ বা জ্ঞান ও গবষেণায় হযরত আয়েশা রা. কেবল মহিলাদের মধ্যেই নন, বরং পুরুষদের মধ্যেও বিশেষ স্থান অধিকার করতে সক্ষম হন। কুরআন, সুন্নাহ, ফিকাহ ও আহকাম বিষয়ক জ্ঞানে তার স্থান ও মর্যাদা এত ঊর্ধ্বে যে উমর রা., আলী রা., আবদুল্লাহ ইবনে মাস'উদ রা., আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. প্রমুখের সাথে তার নামটি নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করা যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বৈবাহিক জীবনে হযরত আয়েশা রা.-এর অভ্যাস ছিল, যদি কোনো আয়াতের অর্থ বোধগম্য না হতো, তাহলে তা স্বামী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করে জেনে নিতেন। সহীহ হাদীসসমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বহু আয়াত সম্পর্কে তার প্রশ্নের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেগমগণ উম্মাহাতুল মুমিনীনের প্রতি নির্দেশ ছিল-'হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ, আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানগর্ভ কথা, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয় তোমরা সেগুলো স্মরণ করবে।'

তারা এই নির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ যোগ্যতা ও সাধ্যমতো আমল করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাহাজ্জুদের নামাযে অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে এবং বিনয় ও বিনম্রচিত্তে কুরআনের বড় বড় সূরা তিলাওয়াত করতেন। সেই সব নামাযে হযরত আয়েশা রা.-এর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিছনে ইকতিদা করতেন। একমাত্র হযরত আয়েশা রা. ছাড়া আর কোনো স্ত্রীর বিছানায় কুরআন নাযিল হয়নি। এমতাবস্থায় নাযিলকৃত আয়াতের প্রথম ধ্বনিটি তার কানেই যেত। তিনি বলছেন, সূরা বাকারা ও সূরা নিসা যখন নাযিল হয়, তখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছেই ছিলাম।

মোটকথা, এ সকল পরিবেশ ও অবস্থার কারণে হযরত আয়েশা রা. কুরআনের প্রতিটি আয়াতের পাঠ-পদ্ধতি, অর্থ ও তাৎপর্য এবং হুকুম-আহকাম বের করার পন্থা-পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করেন। এ কারণে, কোনো বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো প্রথম তিনি কুরআন পাকের প্রতি দৃষ্টি দিতেন। আকায়েদ, ফিকাহ, আহকাম ছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত ও আখলাক-যা মূলত ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত, সবকিছুই তিনি কুরআনপাক দ্বারা বোঝার চেষ্টা করতেন। একবার কিছু লোক তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসল। তারা বলল, 'উম্মুল মুমিনীন, আপনি আমাদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু আখলাকের কথা বর্ণনা করুন!' তিনি বললেন, 'তোমরা কি কুরআন পড় না? তার আখলাক হলো কুরআন।' তারা আবার প্রশ্ন করল, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাত্রিকালীন ইবাদাতের পদ্ধতি কেমন ছিল?' তিনি বললেন, 'তোমরা কি সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাস্তব সত্তাই হচ্ছে মূলত ইলমে হাদীসের বিষয়বস্তু। এই কারণে যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে বেশি নৈকট্য লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন, তার ইলমে হাদীসের জ্ঞানও বেশি অর্জন করার সুযোগ হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পরে অবশ্য ছয় মাসের জন্য স্বামীর দীদার থেকে মাহরুম থাকেন। মদীনায় আসার অল্প কিছুদিন পর স্বামীর ঘরে চলে যান, তারপর থেকে আর বিচ্ছিন্ন হননি। তার শৈশব জীবনেই ইসলামের প্রথম পর্বটি অতিবাহিত হয়; কিন্তু তা হলে কি হবে, তার স্বভাবগত মেধা ও স্মৃতিশক্তি সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র হযরত সাওদা রা. ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। তার দৈহিক ও মানসিক শক্তি ক্ষয়িষ্ণু হতে চলেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের কয়েক বছর পূর্বেই তিনি স্বামী সেবায় অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন। অপর দিকে হযরত আয়েশা রা. ছিলেন উঠতি বয়সের এক নারী। সেই বয়সে দিন দিন তার বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার উন্নতি ঘটছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পার্থিব জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সেবার সুযোগ লাভ করেন। এই কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সার্বিক অবস্থা এবং শরীয়তের যাবতীয় বিধি-বিধান সম্পর্কে তার অবগতি ছিল সবার চেয়ে বেশি।

হযরত সাওদা রা. ছাড়া অন্য স্ত্রীগণ হযরত আয়েশা রা.-এর পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। যেহেতু হযরত সাওদা রা. বার্ধক্যের কারণে নিজের বারির দিনটি হযরত 'আয়িশা রা.-কে দান করেন, তাই অন্যরা যখন প্রতি আট দিনে একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একান্ত সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেতেন তখন হযরত আয়েশা রা. পেতেন দুইদিন। আর যে মসজিদ ছিল আল্লাহর রাসূলের রা. গণশিক্ষাকেন্দ্র, সৌভাগ্যক্রমে হযরত আয়েশা রা.-এর ঘরটি ছিল তারই সাথে। এই সকল কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস ও জীবনধারা সম্পর্কে অবগতির ব্যাপারে বেগমগণের কেউই হযরত আয়েশা রা.-এর সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেননি।

হযরত আয়েশা রা. বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এত বেশি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেগমগণ তথা সকল মহিলা সাহাবীদের শুধু নন হাতে গোনা চার-পাঁচজন পুরুষ সাহাবী ছাড়া আর কেউই তার সমকক্ষতা দাবি করতে পারেন না। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা., হযরত উমর রা., হযরত 'উসমান রা., হযরত আলী রা. প্রমুখের মতো বড় বড় সাহাবী তাদের দীর্ঘ সোহবত বা সাহচার্য, তীক্ষ্ণ বোধ ও মেধাশক্তি ইত্যাদি কারণে 'আয়েশা রা. থেকে মর্যাদার দিক দিয়ে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন। তবে একজন স্ত্রী স্বাভাবিকভাবে স্বামী সম্পর্কে এক মাসে যতটুকু জ্ঞান লাভ করতে পারে, আত্মীয়-বন্ধুরা বহু বছরেও তা পারে না। অন্যদিকে উল্লেখিত উঁচু স্তরের সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর পরই খিলাফতের শুরু দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনায় সময় ও সুযোগ খুব কমই পেয়েছেন। তারপরেও তাদের বর্ণিত হাদীস বা সংরক্ষিত আছে তা বিচার ও বিধি বিধান সংক্রান্ত। সেগুলিই আমাদের ফিকাহশাস্ত্রের ভিত্তি। মূলত হাদীস বর্ণনার মূল দায়িত্ব পালন করেছেন যাঁরা খিলাফত পরিচালনার দায়িত্ব থেকে মুক্ত ছিলেন।

তাছাড়া ওই সকল উঁচু মর্যাদার সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এত কম হওয়ার আরও একটি কারণ আছে। তাদের যুগ ছিল পূর্ণভাবে সাহাবীদের যুগ। সে সময় একজন অন্যজনের নিকট থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী বা কর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করার খুব কমই প্রয়োজন পড়ত। সুতরাং হাদীস বর্ণনার সুযোগও হতো অতি অল্প। যাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেননি বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ লাভ করেননি সেই পরবর্তী প্রজন্ম হলেন তাবেয়ীন। মূলত তাদের যুগ শুরু হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের বিশ-পঁচিশ বছর পরে। তারাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন সম্পর্কে খুঁটিয়ে জানতে চাইতেন; কিন্তু তখন ওইসব উঁচু স্তরের সাহাবী দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। অন্যদিকে অল্পবয়সী সাহাবীরা তখন জীবনের মধ্য অথবা শেষ স্তরে এসে পৌঁছেছেন। তারাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে তাবেয়ীদের জানার আকাঙ্ক্ষা মিটিয়েছেন। এ কারণে অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে যে সকল সাহাবীর নাম হাদীসের গ্রন্থসমূহে দেখা যায় তারা প্রায় সকলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের সময়ে কম বয়সী সাহাবী।

মুসলিম উম্মাহর নিকট হযরত আয়েশা রা.-এর যে উঁচু মর্যাদা ও বিরাট সম্মান তা তার অধিক হাদীস বর্ণনার জন্য নয়; বরং হাদীসের গভীর ও সূক্ষ্ণ তাৎপর্য এবং মূল ভাব অনুধাবন করার প্রগাঢ় ধীশক্তিই প্রধান কারণ। সাহাবীদের মধ্যে অনেকেই এমন আছেন যাঁদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা খুবই অল্প; কিন্তু তারা উঁচু স্তরের ফকীহ সাহাবীদের অন্তর্গত। যাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর মূল তাৎপর্য অনুধাবন না করে যা কিছু শুনেছেন তাই বর্ণনা করে দিয়েছেন, তাদের বর্ণনার সংখ্যা বেশি। আমরা দেখতে পাই যে, সকল সাহাবী বেশি হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে প্রসিদ্ধ তাদের মধ্যে কেবল হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও হযরত আয়েশা রা. ফকীহ ও মুজতাহিদ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। কথিত আছে শরীয়তের যাবতীয় আহকামের এক-চতুর্থাংশ তার থেকে বর্ণিত হয়েছে। তাই আল্লামা যাহাবী বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফকীহ (গভীর জ্ঞানসম্পন্ন) সাহাবীরা তার কাছ থেকে জানতেন। একদল লোক তার নিকট থেকেই দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।

বর্ণনার আধিক্যের সাথে সাথে দ্বীনের তাৎপর্যের গভীর উপলব্ধি এবং হুকুম-আহকাম বের করার প্রবল এক ক্ষমতা হযরত আয়েশা রা.-এর মধ্যে ছিল। তার বর্ণনাসমূহের এ এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে, আহকাম ও ঘটনাবলী বর্ণনার সাথে সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার কারণও বলে দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম রা. ইসলামী দাওয়াত ও ইলমের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে ইসলামী খিলাফতের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। মক্কা মুআজ্জামা, তায়িফ, বাহরাইন, ইয়ামান, দিমাশক, মিসর, কুফা, বসরা প্রভৃতি বড় বড় শহর ও নগরে এই মহান শিক্ষকবৃন্দের এক একটি ছোট দল অবস্থান করতেন। খিলাফাত ও সরকারের কেন্দ্র ২৭ বছর পর মদীনা থেকে প্রথমে কুফায় অবস্থান করতেন। ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রভূমি ২৭ বছর পর মদীনা থেকে প্রথমে কুফায় এবং পরবর্তীকালে দিমাশকে স্থানান্তরিত হয়। তা সত্ত্বেও মদীনার রূহানী ও ইলমী (আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানগত) শ্রেষ্ঠত্বের কোনো অংশে ভাটা পড়েনি। তখনো মদীনায় হযরত ইবনে উমর রা., হযরত আবু হুরাইয়া রা., হযরত ইবনে আব্বাস রা. ও হযরত যায়িদ ইবনে সাবিত রা. প্রমুখের পৃথক পৃথক দারসগাহ চালু ছিল। তবে সবচেয়ে বড় দারসগাহটি ছিল হযরত আয়েশা রা.-এর হুজরাকেন্দ্রিক মসজিদে নববীর সেই বিশেষ স্থান।

মদীনা ছিল ইসলামী খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র। যিযারত ও বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে চতুর্দিক থেকে মানুষ সেখানে ছুটে আসত। যারা আসত তারা অবশ্যই একবার না একবার উম্মুল মু'মিনীনের হুজরার দরজায় হাজিরা দিত। তারা সালাম পেশ করত। তিনি আগন্তুকদের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করতেন। কথাবার্তা, সালাম-কালাম, মাসআলা জিজ্ঞাসা ও জবাব দান সবই হতো পর্দার অন্তরাল থেকে। ইরাক, মিসর, শাম প্রভৃতি অঞ্চল থেকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে তার খিদমতে হাজির হতো এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও ফাতওয়া চাইত। যে সব শিক্ষার্থী সর্বক্ষণ উম্মুল মুমিনীনের খিদমতে থাকত, এসকল আগন্তুক তাদেরকেও সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করত। এ ধরনের একজন শিক্ষার্থী আয়েশা বিনতে তালহা বর্ণনা করেছেন, 'প্রতিটি শহর থেকে মানুষ হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট আসত। তার সাথে আমার সম্পর্কের কারণে বৃদ্ধরা আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসত। যুবকরা আমার সাথে ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলত। লোকেরা আমার কাছে হাদিয়া-তোহফা পাঠাত এবং বিভিন্ন শহর থেকে চিঠি-পত্র লিখত। আমি তা হযরত আয়েশা রা.-এর সামনে উপস্থাপন করে বলতাম, খালা আম্মা! এ অমুকের চিঠি ও হাদিয়া। তিনি বলতেন, বেটি! তুমি এর জবাব দাও এবং বিনিময়ে তুমিও কিছু পাঠিয়ে দাও।'

স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের চেয়ে মহিলাদেরই ভিড় হতো বেশি। মহিলা বিষয়ক মাসআলার সমাধান দানের সাথে সাথে বলে দিতেন, তোমরা পুরুষদেরকেও অবহিত করবে। একবার বসরা থেকে কিছু মহিলা আসে। তিনি তাদের কিছু নসীহত করে বলেন, তোমরা পুরুষদের অবহিত করবে। তাদেরকে অনেক কথা বলতে আমার শরম হয়। তাদের বলবে তারা যেন পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করে।

নারী, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে এবং যে পুরুষদের থেকে হযরত আয়েশা রা.-এর পর্দা করার প্রয়োজন ছিল না, তারা সকলে হুজরার ভেতরের মসজিদে বসতেন, আর অন্যরা বসতেন হুজরার বাইরে মসিজদে নববীর মধ্যে। দারজায় পর্দা টানানো থাকত। পর্দার আড়ালে তিনি নিজে বসে যেতেন। লোকেরা প্রশ্ন করত, তিনি জবাব দিতেন। কোনো কোনো মাসআলায় শিক্ষয়িত্রী ও শিক্ষার্থীর মধ্যে তর্ক-বাহাস হতো। কখনো কোনো মাসআলা নিজেই বিস্তারিত বর্ণনা করতেন, লোকেরা নীরবে কান লাগিয়ে শুনত। তিনি শিক্ষার্থীদের ভাষা, প্রকাশভঙ্গি এবং সঠিক উচ্চারণের দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। একবার তার দুই ভাতিজা আসেন। তারা দুইজন ছিলেন দুই মায়ের সন্তান। একজনের ভাষা তেমন শুদ্ধ ছিল না। তার ভাষায় যথেষ্ট ভুল-ভুটি ছিল। হযরত আয়েশা রা. তার ভুল ধরে দিয়ে বলেন, তুমি তেমন ভাষায় কথা বল না কেন, আমার এই ভাতিজা যেভাবে বলে? হাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি, তাকে তার মা এবং তোমাকে তোমার মা শিক্ষা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, যাঁর ভাষা শুদ্ধ ছিল না, তার মা ছিলেন দাসী।

উল্লিখিত এ ধরনের অস্থায়ী শিক্ষার্থী ছাড়া তিনি বিভিন্ন খান্দানের ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে এবং ইয়াতীম শিশুদেরকে নিজের তত্ত্বাবধানে লালন-পালন করতেন এবং শিক্ষা দিতেন। কখনো এমন হয়েছে যে, শিশু নয়, বরং যারা বড় হয়ে গেছে এমন ছেলেদের তাদের দুধ-খালা বা দুধ-নানী হওয়ার কারণে নিজের ঘরের মধ্যে ঢোকার অনুমতি দিতেন। আর যাদের ঘরের ঢোকার অনুমতি ছিল না, এমন গায়রে মুহাররম ব্যক্তিরা আফসোস করে বলত, ইলম হাসিলের ভালো সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত। কুবায়সা বলতেন, উরওয়া আমার চেয়ে জ্ঞানে এগিয়ে যাওয়ার কারণ হলো, সে আয়েশা রা.-এর ঘরে প্রবেশ করতে পারত। ইরাকের সর্বজনমান্য ইমাম নাখয়ী ছোটবেলায় হযরত আয়েশা রা.-এর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ লাভ করেছিলেন। এজন্য তার সমকালীনরা তাকে ঈর্ষা করতেন।

অসংখ্য বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত আয়েশা রা. ছিলেন একজন সুভাষিণী। তার কথা ছিল অতি স্পষ্ট, বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল। মূসা ইবনে তালহা তার একজন ছাত্র। ইমাম তিরমিযী 'মানবিক' পরিচ্ছেদে তার এ মন্তব্য বর্ণনা করেছেন। যার অর্থ: আমি আয়েশা রা.-এর অপেক্ষা অধিকতর প্রাঞ্জল ও বিশুদ্ধভাষী কাউকে দেখিনি।

মুসতাদরাকে হাকিমে আহনাফ ইবনে কায়সের একটি মন্তব্য বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, আমি আয়েশা রা.-এর মুখের চমৎকার বর্ণনা ও শক্তিশালী কথার চেয়ে ভালো কথা আর শুনিনি।

হযরত আয়েশা রা.-এর থেকে যে কত শত হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্যে তার নিজের ভাষার অনেক বর্ণনাও সংরক্ষিত হয়েছে। সেগুলি পাঠ করলে তার মধ্যে চমৎকার এক শিল্পরূপ পরিলক্ষিত হয়। তাতে রূপক ও উপমার সার্থক প্রয়োগ দেখা যায়। হযরত আয়েশা রা. প্রাচীন আরবের অনেক লোক-কাহিনীও জানতেন এবং সুন্দরভাবে তা বর্ণনাও করতে পারতেন। হাদীসের কোনো কোনো গ্রন্থে তার বলা দু-একটি গল্প বর্ণিত হয়েছে। আরবের এগারো সহদরের একটি দীর্ঘ কাহিনী তিনি একদিন স্বামী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনিয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে তার গল্প শোনেন।

এ গল্পে তার চমৎকার বাচনভঙ্গি এবং শিল্পোকারিতা লক্ষ্য করা যায়। শব্দ ও বাক্যালংকারের ছড়াছড়ি দেখা যায়। বাগ্মী ও বাকপটু ব্যক্তিরাই বক্তৃতা-ভাষণ দিতে পারে। এ এক খোদাপ্রদত্ত গুণ। মানুষকে স্ব-মতে আনার জন্য, প্রভাবিত করার জন্য এ এক অসাধারণ শিল্প। সেই আদিকাল থেকে নিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে সকল জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে এ শিল্পের চর্চা দেখা যায়। সেই প্রাচীন আরবদের মধ্যে এর ব্যাপক চর্চা ছিল। জাহিলী আরবের বড় বড় খতীব এবং তাদের খুতবা বা ভাষণের কথা ইতিহাসে দেখা যায়। নানা কারণ ও প্রয়োজনে ইসলামী আমলে এই খুতবা শাস্ত্রের ব্যাপক উন্নতি ও বিকাশ ঘটে। পুরুষদের গণ্ডি অতিক্রম করে নারীদের মধ্যেও এর বিস্তার ঘটে। হযরত আয়েশা রা. একজন শ্রেষ্ঠ মহিলা খতীব বা বক্তা ছিলেন। আরবী সাহিত্যের প্রাচীন সূত্রসমূহে হযরত আয়েশা রা. বহু খুতবা বা বক্ততা সংকলিত হয়েছে।

আহনাফ ইবনে কায়স একজন বিখ্যাত তাবেয়ী। সম্ভবত তিনি বসরায় হযরত আয়েশা রা.-এর একটি ভাষণ শোনার সুযোগ লাভ করেছিলেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, 'আমি হযরত আবু বকর রা., হযরত উমর রা., হযরত উসমান রা., হযরত আলী রা. এবং এই সময় পর্যন্ত সকল খলীফার ভাষণ শুনেছি; কিন্তু আয়েশা রা.-এর মুখ থেকে বের হওয়া কথায় সে কলামণ্ডিত সৌন্দর্য ও জোর থাকত তা আর কারও কথায় পাওয়া যেত না।'

কাব্যপ্রীতি
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর আরবের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এমন একটি পর্বে জন্মলাভ করেন। তার নিজের পরিবারেও কবিতার চর্চা ছিল। পিতা আবু বকর রা. একজন কবি ছিলেন। প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন, 'আবু বকর রা. কবি ছিলেন। উমর রা. কবি ছিলেন। আর আলী রা. ছিলেন তিনজনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি।'

তাই বলা চলে পিতার কাছ থেকেই তিনি কাব্যশাস্ত্রের জ্ঞান লাভ করেন। কবিতার আঙ্গিক, বিষয়বস্তু, চিত্রকল্প ইত্যাদি বিষয়ে তিনি যেসব মন্তব্য ও মতামত রেখেছেন তাতে এ শাস্ত্রে তার জ্ঞানের গভীরতা প্রমাণিত হয়। তার এক গুণমুগ্ধ শাগরিদ আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ বলেছেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে কাব্য ও ফারায়েয-শাস্ত্রে আয়েশা রা.-এর চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখে এমন কাউকে আমি জানি না। হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর ঠিক একই রকম কথা বলেছেন।

তার অন্য একজন শাগরিদ বলেছেন, 'আমি আয়েশা রা.-এর কাব্য-জ্ঞান দেখে বিস্মিত হই না। কারণ, তিনি আবু বকরের রা. মেয়ে।' হযরত আয়েশা রা. নিজেও একজন কবি ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি যে শোকগাঁথাটি রচনা করেন, তার কিছু অংশ আল্লামা আলুসী তার বুলুগুল আরিব গ্রন্থর ২য় খণ্ডে সংকলন করেছেন।

ইমাম বুখারী আবদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে হযরত উরওয়ার একটি বর্ণনা নকল করেছেন। তিনি বলেছেন, হযরত কাআব ইবনে মালিকের রা. একটি পূর্ণ কাসীদা উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর মুখস্থ ছিল। একটি কাসীদায় কম-বেশি চল্লিশটি শ্লোক ছিল। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. বলতেন, 'তোমরা তোমাদের সন্তানদের কবিতা শেখাও। তাহলে তাদের ভাষা মাধুরীময় হবে।

জাহিলী ও ইসলামী যুগের কবিদের বহু কবিতা হযরত আয়েশা রা.-এর মুখস্থ ছিল। সেই সকল কবিতা বা তার কিছু অংশ সময় ও সুযোগমতো উদ্ধৃতির আকারে উপস্থাপন করতেন। তার বর্ণিত বহু কবিতা বা পংক্তি হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থ বর্ণিত হয়েছে। এক ব্যক্তি উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-কে জিজ্ঞেস করে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি কখনো কবিতা আবৃত্তি করেছেন? বললেন, হ্যাঁ, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার কিছু শ্লোক তিনি আবৃত্তি করতেন।

ইবনে আবিসসাইব তাবেয়ী মদীনা তাইয়্যিবার বক্তা ছিলেন। বক্তাদের একটি স্বাভাবিক অভ্যাস হচ্ছে, তারা মজলিস গরম করার জন্য খুবই চিত্তাকর্ষক দুআ বানিয়ে বানিয়ে পড়ত এবং নিজের মাহাত্ম্যের জনান দিতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সব সময় ওয়ায করার জন্য নিমন্ত্রণ পেত।

আয়েশা রা. তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'তুমি আমার সাথে তিনটি বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হও, নচেৎ আমি তোমাকে জোর করতে বাধ্য হব।' বক্তা বলল, 'হে উম্মুল মুমিনীন, সেই তিনটি কথা কী?' আয়েশা রা. বললেন, 'তুমি যখন নামায পড়বে, তখন এমন কোনো আচরণ করবে না যাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর গাম্ভীর্য বিনষ্ট হয়। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবীদের কখনো এমন করতে দেখিনি। মানুষকে প্রতিদিন উপদেশ দেওয়ার চেয়ে সপ্তাহে একদিন, শুক্রবার উপদেশ দেবে। আর যদি আরও বেশি করতে চাও তাহলে দুদিন, সর্বোচ্চ তিন দিন করতে পার। মানুষকে কুরআনের ব্যাপারে নিরাশ করো না। আমি আশা করি, তুমি লোকদের কথা বলার মাঝখানে বাধা সৃষ্টি করবে না। যদি তুমি কোনো মজমার পাশ দিয়ে যাও, তাহলে তাদের তাদের মতো থাকতে দিও। যদি তারা তোমাকে সম্মান করে এবং তোমার কাছে কিছু জানতে চায়, তখন কথা বল।

উম্মুল মুমিনীন এবং চিকিৎসা-শাস্ত্র
হযরত উরওয়াহ্ রা. (যিনি উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর ভাইজি ছিলেন) বলেন, আমি উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর খেদমতে আরয করলাম, আমি আপনার ব্যাপারে যতই ভাবি, ততই অবাক হই। আপনাকে আমি সবার চেয়ে বেশি দ্বীনী জ্ঞানের অধিকারী মনে করি। আমি মনে করি এটা আবার কেমন কথা! (অর্থাৎ, এটা আশ্চর্যের কোনো বিষয় নয়। কেননা,) আপনি তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিতা স্ত্রী। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.'র কন্যা (আপনারই তো দ্বীনের ব্যাপারে সবার চেয়ে বেশি জ্ঞানী হওয়া মানায়)। আপনি আরবের যুদ্ধসমূহের, তাদের বংশ পরিক্রমার, তাদের কবিতাসমূহ বিশদভাবে জানেন। আমি বলি, এতেই বা আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? আপনার পিতা (হযরত আবু বকর রা.) কুরাইশ গোত্রের অনেক বড় আলেম ছিলেন। (সুতরাং তার কন্যাও তেমন হবেন)। কিন্তু! আমার খুবই আশ্চর্য লাগে, আপনি 'চিকিৎসা' শাস্ত্রও জানেন। এটা আপনি কোথা হতে শিখলেন? তিনি আদর করে আমার হাত ধরে (এবং আদর করে নাম পরিবর্তন করে) বললেন, হে উরইয়াহ্, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসুস্থতা বেড়ে গেল, আরবের এবং আরবের বাইরের অনেক চিকিৎসক তার কাছে ঔষধপত্র পাঠাতে থাকল। এভাবেই আমি 'চিকিৎসা-শাস্ত্র' আয়ত্ব করে ফেলি। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় আছে, উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. ওইসব ঔষধ দিয়ে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চিকিৎসা করাতেন। এর চর্চা করতে গিয়ে তিন 'চিকিৎসা-শাস্ত্র' শিখে নিয়েছিলেন।

ইসলামী খিলাফতের ছায়ায়
হযরত রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর সম্মানিত পিতা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. খলীফা নির্বাচিত হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাফন-দাফন ও খলীফা নির্বাচনের কাজ থেকে মুক্ত হওয়ার কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেগমগণ চাইলেন, হরত উসমান রা.-কে তাদের পক্ষ থেকে খলীফার নিকট পাঠাবেন উত্তরাধিকারের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য। তখন আয়েশা রা. তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবদ্দশায় বলেছিলেন, 'আমার কোনো উত্তারাধিকারী থাকবে না। আমার পরিত্যক্ত সবকিছু সাদাকা হিসেবে গণ্য হবে।

আসলে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়-সম্পত্তি এমন কী-ইবা রেখে গিয়েছিলেন, যা তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হতে পারত? হাদীসে এসেছে, তিনি দিরহাম ও দীনার, চতুষ্পদ জন্তু, দাস-দাসী কিছুই মীরাস হিসেবে রেখে যাননি।

হযরত আবু বকর রা. মাত্র দুই বছর খিলাফত পরিচালনার সুযোগ পান। হিজরী তেরো সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার যখন অন্তিম দশা তখন মেয়ে আয়েশা রা. পিতার শিয়রে বসা ছিলেন। এর আগে সুস্থ অবস্থায় তিনি মেয়েকে কিছু বিষয়-সম্মতি ভোগ-দখলের জন্য দিয়েছিলেন। এখন অন্য সন্তানদেরও বিষয়-সম্মতির প্রয়োজনের কথা মনে করে বললেন, আমার কলিজার টুকরো মেয়ে! তুমি কি ওই বিষয়-সম্পত্তি তোমার অন্য ভাইদের দিয়ে দেবে? মেয়ে বললেন, অবশ্যই দেব। তারপর তিনি মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাফনে মোট কতখানা কাপড় ছিল? মেয়ে বললেন, তিনখানা সাদা কাপড়। আবার জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কোন দিন ওফাত পান? বললেন, সোমবার। আবার জিজ্ঞেস করলেন, আজ কী বার? বললেন, সোমবার বললেন, তাহলে আজ রাতে আমাকেও যেতে হবে। তারপর তিনি নিজের চাদরটি দেখেলেন। তাতে জাফরানের দাগ ছিল। বললেন, এই কাপড়খানি ধুয়ে তার ওপর আরও দুইখানি কাপড় দিয়ে আমাকে কাফন দেবে। মেয়ে বললেন, এই কাপড় তো পুরানো। বললেন, মৃতদের চেয়ে জীবিতদেরই নতুন কাপড়ের প্রয়োজন বেশি। সেই দিন রাতেই তিনি ওফাত পান। হযরত আয়েশা রা.-এর হুজরার মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে, একটু পায়ের দিকে সরিয়ে তাকে দাফন করা হয়। হযরত আয়েশা রা.-এর হুজরায় পতিত এটা হলো দ্বিতীয় চাঁদ। এত অল্প বয়সে স্বামী হারানোর মাত্র দুই বছরের মধ্যে তিনি পিতাকে হারালেন।

হযরত ফারুকে আযমের রা. খিলাফতে কালটি ছিল সর্বদিক দিয়ে উৎকর্ষমণ্ডিত। তিনি প্রত্যেক মুসলমানের জন্য নগদ ভাতা নির্ধারণ করে দেন। একটি বর্ণনামতে, তিনি আযওয়াযে মুতাহ্হারাতের প্রত্যেকের জন্য বাৎসরিক বারো হাজার করে দিতেন। অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, অন্য আযওয়াযে মুতাহ্হারাতের প্রক্যেককে দশ হাজার এবং আয়েশা রা.-কে বারো হাজার দিতে। এমন প্রাধান্য দানের কারণ উমর রা. নিজেই বলে দিয়েছে। আমি তাকে দুই হাজার এই জন্য বেশি দিই যে, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বাধিক প্রিয়পাত্রী।

আযওয়াযে মুতাহ্হারাতের সংখ্যা অনুযায়ী খলীফা উমর রা. নয়টি পেয়ালা তৈরি করান। যখন কোনো জিনিস তার হাতে আসত, নয়টি ভিন্ন ভিন্ন পেয়ালা সকলের নিকট পাঠাতেন। হাদিয়া-তোহফা বণ্টনের সময় এতখানি খেয়াল রাখতেন যে, কোনো জন্তু জবেহ হলে তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাদের নিকট পাঠাতেন।

ইরাক বিজয়ের এক পর্যায়ে মূল্যবান মোতি ভর্তি একটি কৌটা মুসলমানদের হাতে আসে। অন্যান্য মালে গনীমতের সাথে সেটিও খলীফার দরবারে পাঠানো হয়। এই মোতির বণ্টন সকলের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। খলীফা উমর রা. বললেন, আপনারা সকলে অনুমতি দিলে এই মোতিগুলো আমি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর নিকট পাঠিয়ে দিতে পারি। কারণ, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বাধিক প্রিয়পাত্রী। পাত্রটি আয়েশা রা.-এর নিকট পাঠানো হলো। তিনি সেটা খুলে দেখে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে ইবনে খাত্তাব আমার প্রতি অনেক বড় বড় অনুগ্রহ দেখিয়েছেন। হে আল্লাহ, আগামীতে তার এমনসব অনুগ্রহ লাভের জন্য আমাকে জীবিত রেখো না।

খলীফা হযরত উমরের রা. বাসনা ছিল, আয়েশা রা.-এর হুজরায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কদম মুবারকের কাছে দাফন হওয়ার। কিন্তু একথা বলতে পারছিলেন না। তার কারণ, যদিও মাটির নীচে চলে গেলে শরীয়তের দৃষ্টিতে পুরুষদের থেকে পর্দা করা জরুরী নয়, তবুও আদব ও শিষ্টাচারের দৃষ্টিতে দাফনের পরেও তিনি আয়েশার নিকট গায়ের মাহরামই মনে করতেন। একেবারে অন্তিম মুহূর্তে এসব চিন্তায় তিনি বড় পেরেশান ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে পাঠালেন এই বলে যে, 'উম্মুল মুমিনীনকে আমার সালাম পেশ করে বলবে, উমরের বাসনা হলো তার দুই বন্ধুর পাশে দাফন হওয়ার।' আয়েশা রা. বললেন, 'যদিও আমি ওই স্থানটি নিজের জন্য রেখেছিলাম, তবে আমি সন্তুষ্টচিত্তে তাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছি।'

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর এই অনুমতি পাওয়ার পরেও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে উমর রা. অসিয়ত করে গেলেন, আমার লাশবাহী খাটিয়া তার দরজায় নিয়ে গিয়ে আবার অনুমতি চাইবে। যদি তিনি অনুমতি দান করেন তাহলে ভিতরে দাফন করবে। অন্যথায় দাফন করবে সাধারণ মুসলমানদের গোরস্থানে। খলীফার ইন্তেকালের পর তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা হয়। আয়েশা রা. দ্বিতীয়বার অনুমতি দান করেন এবং লাশ ভিতরে নিয়ে দাফন করা হয়।

আর এভাবে তিনি হলেন হযরত আয়েশা রা.-এর স্বপ্নের তৃতীয় চাঁদ-যাঁর মাধ্যমে তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়।

উষ্ট্রীর যুদ্ধে উপস্থিতি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তিরোধানের সময় উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.-এর বয়স ছিল মাত্র আঠারো বছর। কোনো সন্তান-সন্ততি ছিল না। তিনি সব সময় নীরবে-নিভৃতে জ্ঞানসাধনায় নিমগ্ন থাকতেন।

৩৫ হিজরীর জিলহজ মোতাবেক জুন, ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহী কর্তৃক আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান রা. শহীদ হলে তার জীবনে কিছুটা ছন্দপতন ঘটে। এ সময় তিনি হজ উপলক্ষে মক্কায় ছিলেন। শাহাদাতের হৃদয়বিদারক দুঃসংবাদে তিনি খুবই মর্মাহত হন। খিলাফতের মহান দায়িত্বে আসেন আমীরুল মুমিনীন হজরত আলী রা.। তখন জনসাধারণের প্রথম দাবি ছিল, উসমান-হত্যার বিচার গ্রহণ। শাহাদাতের চার মাস পর উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা. এ উদ্দেশ্যে বসরা গমন করেন। সঙ্গী ছিলেন হযরত তালহা ও যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহুমা। সংবাদ পেয়ে হযরত আলী রা.ও সেখানে পৌঁছে যান। তারা কেউ ধারণা করতে পারেননি, বিষয়টা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াবে; কিন্তু নানাবিধ কারণে ৩৬ হিজরির জুমাদাল উখরা মোতাবেক ডিসেম্বর, ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়।

ইতিহাসে এটাই জঙ্গে জামাল তথা উটের যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। কারণ, যুদ্ধের সব শক্তি উটের চারপাশেই কেন্দ্রিভূত ছিল, যার পিঠে সাওয়ার ছিলেন উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা রা.। আকস্মিক এ যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য যদিও সংশোধন ও প্রতিকার ছিল; কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহতার জন্য প্রায়ই তিনি আক্ষেপ করতেন। যখনই পবিত্র কুরআনের এ আয়াত পড়তেন: 'তোমরা তোমাদের স্বগৃহে অবস্থান করবে' তখনই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়তেন। অশ্রুজলে তার আঁচল ভিজে যেত।

আবু মারইয়াম আবদুল্লাহ্ ইবনে যিয়াদ আসাদী রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তালহা, যুবায়র ও আয়েশা রা. যখন বসরার দিকে গেলেন, তখন আলী রা. আম্মার ইবনে ইয়াসির ও হাসান ইবনে আলী রা.-কে পাঠালেন। তারা আমাদের কুফায় আসলেন এবং (মসজিদের) মিম্বরে উপবেশন করলেন। হাসান ইবনে আলী রা. মিম্বারের সর্বোচ্চ ধাপে উপবিষ্ট ছিলেন, আর আম্মার রা. হাসান রা.-এর নিচের ধাপে দণ্ডায়মান ছিলেন। আমরা এসে তার নিকট জড় হলাম। এ সময় আমি শুনলাম, আম্মার রা. বলেছেন, আয়েশা রা. বসরার দিকে রওনা হয়ে গেছেন। নিঃসন্দেহে তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের (আমাদের) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পত্নী; কিন্তু আল্লাহ এ কথা স্পষ্ট করে জেনে নেওয়ার জন্য তোমাদের পরীক্ষায় ফেলেছেন যে, তোমরা কি তাঁরই আনুগত্য কর, না তার (অর্থাৎ আয়েশা রা.-এর) আনুগত্য কর।

বিদায়লগ্ন
জীবনের এই দীর্ঘ সময় তিনি ইবাদত, ইলম, প্রজ্ঞা, দান-দক্ষিণা ও আল্লাহর পথে ত্যাগের পরম দৃষ্টান্ত দেখিয়ে যান। তখন হযরত আমীর মুআবিয়া রা.-এর খিলাফতকালের শেষ পর্যায়। মৃত্যুর পূর্বে কিছুকাল রোগগ্রস্ত অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। অসংখ্য মানুষ সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে দরজায় ভিড় করত। কেউ কুশল জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ভালো আছি।

ইবনে আবু মুলাইকাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনে আব্বাস রা. আয়েশা রা.-এর ওফাতের পূর্বে তার কাছে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলেন। এ সময় তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন। তিনি বললেন, আমি ভয় করছি, তিনি আমার কাছে এসে আমার সুখ্যাতি করবেন। তখন তার কাছে বলা হলো, তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই এবং সম্মানিত মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বললেন, তবে তাকে অনুমতি দাও। তিনি (এসে) জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কাছে আপনার অবস্থা কেমন লাগছে? তিনি বললেন, আমি যদি নেক হই তবে ভালোই আছি। ইবনে আব্বাস রা. বললেন, আল্লাহ চান তো আপনি নেকই আছেন। আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণী এবং তিনি আপনাকে ব্যতীত আর কোনো কুমারীকে বিবাহ করেননি এবং আপনার নির্দোষিতা আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর তার পেছনে ইবনে যুবায়র রা. প্রবেশ করলেন। তখন আয়েশা রা. বললেন, ইবনে আব্বাস রা. আমার কাছে এসেছিলেন এবং আমার সুখ্যাতি করেছেন; কিন্তু আমি এ-ই পছন্দ করি যে, আমি যেন লোকের স্মৃতির পাতা থেকে পুরোপুরি মুছে যাই।

পরম বন্ধুর সান্নিধ্যে
মৃত্যুর পূর্বে অসিয়ত করে যান যে, আমাকে জান্নাতুল বাকীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য স্ত্রীদের সাথে দাফন করবে। মৃত্যু যদি রাতের বেলায় হয় তাহলে রাতেই দাফন করবে। তার ওফাত হয় রাতে বিতর নামাযের পরে। সুতরাং তখনই তাকে অসিয়ত-মতো জান্নাতুল বাকী'তে দাফন করা হয়। তার ওফাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে মদীনায় কান্নার রোল পড়ে যায়। আনসাররা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। জানাযায় এত লোকের সমাগম হয় যে, রাতের বেলা এত জনসমাগম পূর্বে আর কখনো দেখা যায়নি বলে লোকেরা বর্ণনা করেছে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে যে, মহিলাদের ভিড় দেখে ঈদের দিন বলে মনে হচ্ছিল। হযরত উম্মে সালামা রা. কান্নার আওয়ায শুনে বলেন, আয়েশা রা.-এর জন্য জান্নাত অপরিহার্য। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী।

হযরত আবু হুরাইরা রা. ছিলেন তখন মদীনার গভর্নর। তিনি জানাযার নামায পড়ান। কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর রা., আবদুল্লাহ ইবনে আবদির রহমান ইবনে আবি বকর, আবদুল্লাহ ইবনে আতীক, উরওয়া ইবনে যুবাইর রা. এবং আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-ভাই ও বোনের এই ছেলেরা তাকে কবরে নামান। তার অন্তিম অসিয়ত অনুযায়ী জান্নাতুল বাকী গোরস্তানে তাকে দাফন করা হয়।

পরিশেষে আমাদের আম্মাজানের পক্ষে কুরআনে কারীমের দু-টি আয়াত তিলাওয়াত করে আলোচনা ইতি টানতে পারি। আল্লাহ তাআল ইরশাদ করেন,
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّتٍ وَنَهَرٍ فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِيكٍ مُّقْتَدِرٍ
নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণাধারার মধ্যে। যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতির নিকটে।

আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তার ঠিকানা করে দিন।

টিকাঃ
৭৪ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৬৫৪; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৮২।
৭৫ মুসনাদে আহমাদ; সহীহ, তিরমিযী, হাদীস নং ৩৭৯০; সুনান, ইবনে মাজাহ, ১৫৫।
৭৬ মুসনাদ, আহমাদ; সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬৫৮; সুনান, ইবনে মাজাহ, ৯৬।
৭৭ সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬৬১; আলবানী হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
৭৮ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, ৩৮৯৫; সহীহ, মুসলিম, ২৪৩৮; মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৪১, ১২৮ ও ১৬১।
৭৯ সুনান, আত-তিরমিযী: হাদীস নং ৩৮৮০; আরনাউত রিজালগণকে সিকা বলেছেন।
৮০ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৯০৫; সুনান, আবু দাউদ, হাদীস নং ৪০৮৩; মুসনাদ, আহমাদ, ২৫৭৩৪।
৮১ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৯০৬।
৮২ যাদুল মাআদ, ২/৫৫।
৮৩ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১৮৮৯; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৩৭৬।
৮৪ বুখারী, সহীহ, ফাযায়েলু'স সাহাবাহ, ৭৩ (১৪২৩)।
৮৫ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৮৯৪; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪২২।
৮৬ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫০৭৭।
৮৭ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৭১।
৮৮ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৬৫।
৮৯ মুসনাদ, আহমাদ, ৬/২৭১।
৯০ নিসাউ আহলিল বাইত, ১১৯-১২০।
৯১ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫২৩৬; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৮৯২।
৯২ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৬১৩০।
৯৩ মুসনাদ, আহমাদ, ৬/১৫৭।
৯৪ সুনান, আবু দাউদ।
৯৫ সূরা কালাম, ৬৮:৪।
৯৬ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫৩৬৩।
৯৭ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২১০৫।
৯৮ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৮১৫।
৯৯ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৭৮৯; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪৭৬।
১০০ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫২২৫।
১০১ মুত্তাফাকুন আলাইহি। সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৭৮৮; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪৬৪।
১০২ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৯৭৪; সুনান, নাসায়ী, হাদীস নং ৩৯৭৩।
১০৩ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫২৬৮; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪৭৪।
১০৪ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৮১৮; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩৫।
১০৫ শরহু ইমাম নববী।
১০৬ সূরা তাহরীম, ৬৬:৪।
১০৭ প্রাগুক্ত।
১০৮ সূরা আহযাব, ৩৩:২৮-২৯।
১০৯ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৪৬৮; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪৭৯; সুনান, তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩১৮; মুসনাদ, আহমাদ: হাদীস নং ২২২।
১১০ আল আহযাব, ৩৩:২৮-২৯।
১১১ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪৭৮।
১১২ মুসনাদ, আহমাদ, ৬/২৩৮।
১১৩ সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১/১৮৯।
১১৪ 'সারিদ' তরকারির ঝোলজাতীয় খাদ্য, যা রুটি দিয়ে তৈরিকৃত খাদ্যদ্রব্যের নাম। এটি আরবের উৎকৃষ্টমানের খাদ্য।
১১৫ সহীহ, বুখারী, ২১৭৯, সহীহ, মুসলিম, ৪৪৫৯, সুনান, তিরমিজী, ১৭৫৭।
১১৬ সহীহ, বুখারী, ২৩৯৩, সহীহ, মুসলিম, ৪৪৭১, সুনান, তিরমিজী, ৩৮১৪।
১১৭ সহীহ, বুখারী, ২৩৯৩; সহীহ, মুসলিম, ৪৪৭২, সুনান, নাসায়ী, ৩৮৮৩।
১১৮ সহীহ, বুখারী, ২০৪৫; মুসনাদ, আহমাদ, ৬/৮৪।
১১৯ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, ৫২২৮; সহীহ, মুসলিম, ৮০, ২৪৩৯।
১২০ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৭৬৮; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৮০, ২৪৪৭; সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৮৮১।
১২১ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৭৭৫; সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৮৭৯।
১২২ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, ২৩৮৯; সহীহ, মুসলিম, ৮০, ৯৯১।
১২৩ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, ৬৪৫১; সহীহ, মুসলিম, ৮০, ২৯৭৩।
১২৪ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৪৬১।
১২৫ সুনান, তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৭৭।
১২৬ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫৪১৬, সহীহ, মুসলিম : হাদীস নং ২৯৭০।
১২৭ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৫৬৭, সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৯৭২।
১২৮ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৬৭।
১২৯ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৪৬; হিলইয়া, ২/৪৭।
১৩০ তাবাকাতে ইবনে সাআদ।
১৩১ মুসনাদ, আহমাদ।
১৩২ আদাবুল মুফরাদ।
১৩৩ মুসতাদরাকে হাকিম, ২০৬।
১৩৪ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৬২৯।
১৩৫ মুসনাদ, আহমাদ, ৬/১৩৮।
১৩৬ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৮/৪৭।
১৩৭ মুসনাদ, আহমাদ: ৬/১২৮।
১৩৮ সূরা তুর, ৫২:২৭।
১৩৯ আসসামতুস সামীন, ৯০।
১৪০ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১২১১।
১৪১ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১৫২০।
১৪২ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১২১১।
১৪৩ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪০৬৪; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৮১১।
১৪৪ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৬৪৪; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪৪৫।
১৪৫ আল আনসাব, ১/৫৭১।
১৪৬ সূরা আন-নূর, ২৪:১১।
১৪৭ সূরা আন-নূর, ২৪:২২।
১৪৮ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৭৫০; সহীহ, মুসলিম হাদীস নং ২৭৭০; মুসনাদ, আহমাদ, ৬/১৯৪-১৯৭।
১৪৯ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৩৪; সহীহ, মুসলিম: হাদীস নং ৩৬৭; মুসনাদ, আহমাদ, ৬১ ৭৯।
১৫০ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৪৫০; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৪৩।
১৫১ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৪৩৯; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২১৯২।
১৫২ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৬৭৮; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৪২০।
১৫৩ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৪৬২।
১৫৪ সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬১৮।
১৫৫ সূরা আলে ইমরান, ৩:১৪৪।
১৫৬ সূরা আহযাব, ৩৩:৩৪।
১৫৭ আল মাকাসিদুল হাসানাহ, ২৭৭।
১৫৮ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৯৭; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৫৪।
১৫৯ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৭৩১০; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৬৩৪।
১৬০ সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/১৮৫।
১৬১ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৭/৩৯-৫৬।
১৬২ সুনান, তিরমিযী, হাদীস নং ৩৮৮৩।
১৬৩ আল ইজাবাহ, যারকাশী রহ., ৫৭।
১৬৪ মুসতাদরাকে হাকিম, ৪/১১।
১৬৫ সুনান, তিরমিযী, হাদীস নং ৩৮৮৪।
১৬৬ মুসতাদরাকে হাকিম, ৪/১১।
১৬৭ সীরাতে আয়েশা, ৫৪-৫৫।
১৬৮ মুসতাদরাকে হাকিম, ৪/১১।
১৬৯ আল ইকদুল ফারীদ, ৫/২৮৩।
১৭০ তাযকিরাতুল হুফফায, ১/২৮।
১৭১ আল ইকদুল ফারীদ, ৫/২৭৪।
১৭২ যারকাসি, ইযাবা, ১৭৬।
১৭৩ মুসনাদ, আহমাদ।
১৭৪ সহীহ, বুখারী।
১৭৫ প্রাগুক্ত।
১৭৬ সহীহ, বুখারী।
১৭৭ সহীহ, বুখারী, ৭১০০।
১৭৮ আল ইসতিআব, ১/৩৭৭।
১৭৯ সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৭৫৩।
১৮০ নিসাউ আহলিল বাইত, ১৬৬।
১৮১ সূরা কামার, ৫৪:৫৪-৫৫।

📘 মহীয়সী নারী সাহাবিদের আলোকিত জীবন > 📄 হাফসা বিনতে উমর রা.

📄 হাফসা বিনতে উমর রা.


অধিক রোযাদার, অধিক নামাযী

আজ আমরা এক ভুবনমোহিনী বাগানের ফুল নিয়ে আলোচনা করব। হ্যাঁ, তিনি হচ্ছেন উম্মুল মুমিননীন হাফসা বিনতে উমর রা.। তিনি এমন এক প্রস্ফুটিত গোলাপের ন্যায় মানবী, যার মর্যাদা, মহত্ত্ব ও বহুবিদ কৃতিত্বে ভরা জীবনকাহিনী লিখে শেষ করা যাবে না।

পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে যিনি খ্যাত, আর ইসলামের প্রাথমিক পর্বে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়কারী হিসেবে যিনি পরিচিত, সেই আলোকময় ব্যক্তিত্ব হযরত উমর রা.-এর কন্যা উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা.-এর জন্য বংশ মর্যাদার ক্ষেত্রে অন্য কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না।

হযরত উমর রা. এমন ব্যক্তি ছিলেন, যাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াত নাযিল করেছেন। তার শান মান কত ঊর্ধ্বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট তার স্থান ছিল অতি উচ্চে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর ভাষ্যমতে, 'উমরের ইসলাম গ্রহণ ইসলামের বিজয়। তার হিজরত আল্লাহর সাহায্য এবং তার খিলাফত আল্লাহর রহমত। ১৮২ উমরের যাবতীয় গুণাবলী লক্ষ করেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'আমার পরে কেউ নবী হলে উমরই হতো।' কারণ, তার মধ্যে ছিল নবীদের স্বভাব বৈশিষ্ট্য।

যিনি দশ বছরের স্বল্প সময়ে গোটা বাইজান্টাইন রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটান। তার যুগে বিভিন্ন অঞ্চলসহ মোট ১০৩৬টি শহর বিজিত হয়। ইসলামী হুকুমাতের সরকার ও প্রশাসনিক কাজে নথি ও রেকর্ড ব্যবস্থা তার যুগেই আত্মপ্রকাশ করে। তার শাসন ও ইনসাফের কথা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে আছে।

হযরত উমর প্রথম খলীফা, যিনি আমীরুল মুমিনীন উপাধী লাভ করেন। তিনিই প্রথম হিজরী সন প্রবর্তন করেন, তারাবীর নামায জামাতে পড়ার ব্যবস্থা করেন, জনশাসনের জন্য দুররা বা ছড়ি ব্যবহার করেন, মদ্যপানে আশিটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন, বহু রাজ্য জয় করেন, নগর পত্তন করেন, সেনাবাহিনীর স্তরভেদ ও বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন নির্দিষ্ট করেন, জাতীয় রেজিস্টার বা নাগরিক তালিকা তৈরি করেন, কাজী নিয়োগ করেন, রাষ্ট্রকে বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত করেন।

✓ উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা.-এর চাচা হচ্ছেন হযরত যায়িদ ইবনে খাত্তাব রা.। যাঁর শাহাদাতের খবর শুনে হযরত ফারূকে আযম রা. বলে ওঠেন, رَحِمَ اللَّهُ زَيْدًا .. سَبَقَنِي إِلَى الْحُسْنَيَيْنِ.. أَسْلَمَ قَبْلِي.. وَاسْتَشْهَدَ قَبْلِي আল্লাহ যায়েদের ওপর রহম করুন। দু-টি নেক কাজে তিনি আমার থেকে অগ্রগামী রয়ে গেলেন। আমার আগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আমার আগে শাহাদাতও বরণ করলেন।

✓ যে সব বিজয় দিন দিন মুসলমানদের হাতে এসেছে, তার মধ্যে এমন কোনো বিজয় নেই যাতে হযরত উমর রা. তার ভাই হযরত যায়িদ ইবনে খাত্তাব রা.-কে স্মরণ করেননি। তিনি সবসময় বলতেন, مَا هَبَّتِ الصَّبَا إِلَّا وَجَدْتُ مِنْهَا رِيحَ زَيْدٍ প্রভাতের এমন কোনো বায়ু প্রবাহিত হয় না, যেখানে আমি যায়েদের সুঘ্রাণ পাই না।

✓ হযরত হাফসা রা.-এর আম্মাজান হচ্ছেন যায়নাব বিনতে মাযঊন রা.- যিনি বিশিষ্ট সাহাবী হযরত উসমান ইবনে মাযঊন রা.-এর সহোদরা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উসমান ইবনে মাযঊন রা.-কে ভীষণ ভালোবাসতেন। হযরত উসমানের পবিত্র আত্মাই মদীনার মুহাজিরদের মধ্যে প্রথম আখিরাতে সফরের প্রস্তুতি নেয়। এভাবে মদীনায় মুহাজিরদের জান্নাতের পথের তিনিই প্রথম অভিযাত্রী। হযরত উসমান ইবনে মাযউনের মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভীষণ ব্যথিত হন। তিনি তিনবার ঝুঁকে পড়ে তার কপালে চুমু দেন। ১৮৩ তখন রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চোখের পানিতে উসমানের গণ্ডদ্বয় সিক্ত হয়ে যায়। তারপর মাথা সোজা করে কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, আবু সাইব, আমি তোমার থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছি। আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন। দুনিয়া থেকে তুমি এমনভাবে বিদায় নিলে যে, তার থেকে তুমি কিছু নিলে না এবং দুনিয়াও তোমার থেকে কিছুই নিতে পারেনি।

✓ হযরত উসমান ইবনে মাযউন রা.-এর মৃত্যুর পরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ভুলে যাননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যা হযরত রুকাইয়্যা মারা গেলে তিনি কন্যাকে সম্বোধন করে বলেন,
الْحَقِى بِسَلَفِنَا الْخَيْرِ عُثْمَانُ بْنُ مَظْعُوْنٍ
যাও আমাদের উত্তম অগ্রগামী উসমান ইবনে মাযউনের সাথে গিয়ে মিলিত হও। ১৮৪

✓ তাঁর ফুফু হচ্ছেন, হযরত ফাতিমা বিনতুল খাত্তাব রা.। যিনি ইসলামের শুরুলগ্নেই স্বামীর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার স্বামী হচ্ছেন, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের অন্যতম সদস্য হযরত সাঈদ ইবনে যায়িদ রা.।

✓ তাঁর ভাই হচ্ছেন, আবিদ, যাহিদ, মুত্তাকী, আল্লাহভীরু ও পরহেযগার আলেম সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.। যাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আবদুল্লাহ অত্যন্ত নেক ব্যক্তি। ১৮৫

হযরত আয়েশা রা. তার ইত্তেবায়ে সুন্নাত সম্পর্কে বলেছেন, 'ইবনে উমরের মতো আর কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন না।'

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. তার দীর্ঘ জীবনটি এভাবে কাটান। এক সময় মুসলমানদের ওপর এমন এক যুগ আসে, যে যুগের ভালো মানুষেরা এটা কামনা করে দুআ করত:
হে আল্লাহ, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি জীবিত থাকি, ততক্ষণ পর্যন্ত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কেও জীবিত রাখ। যাতে আমি তার অনুসরণ করতে পারি।

হযরত আয়েশা রা. বলেন, 'আমি তো তাকে ছাড়া আর কাউকে এমন দেখছি না, যে প্রথম যুগের মতো আমলে অবিচল আছে।' ১৮৬

এই যাঁদের মর্যাদা, তাদের জীবন কাহিনী ও কৃতিত্বের কথা মুখের ভাষায় বা কলমের কালি দ্বারা কি বর্ণনা করা সম্ভব?

বরকতময় শৈশব
উপর্যুক্ত ভূমিকা দ্বারা এ কথা সহজেই অনুমেয়, ফারূকী গৃহে বড়ই শান ও অনুপম পরিবেশে লালিত-পালিত হন উম্মুল মুমিনীন হাফসা রা.। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ বছর পূর্বে তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। মক্কার কুরাইশরা তখন কাবা ঘরের পুনঃনির্মাণের কাজে ব্যস্ত।

হাফসা রা.-এর মধ্যে ছিল শেখা ও জানার প্রবল আগ্রহ। সবসময় তিনি বিভিন্ন বিষয়ে শেখানোর চিন্তা করতেন। হযরত শিফা বিনতে আবদিল্লাহ ছিলেন একজন মহিলা সাহাবী। তিনি লিখতে ও পড়তে জানতেন। হযরত হাফসা তার নিকট লেখা শেখেন। এভাবে তিনি হয়ে উঠেন কুরাইশদের একজন সুসাহিত্যিক নারী।

উমরের ইসলামগ্রহণ ছিল বিজয়
আরবের মাটিতে যখন ইসলামে নবসূর্য উদিত হয়, উমর তখন ছিলেন শিরকের অন্ধকারে নিমজ্জিত। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে বেশ আশা পোষণ করতেন। হাদীসে এসেছে, ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
اللَّهُمَّ أَعِنَّ الإِسْلَامَ بِأَبِي جَهْلِ بْنِ هِشَامٍ أَوْ بِعُمَرَ হে আল্লাহ, আবু জাহেল ইবনে হিশাম অথবা উমর ইবনুল খাত্তাবের মারফত ইসলামকে শক্তিশালী করুন।

রাবী বলেন, পরের দিন সকালে উমর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম কবুল করেন। ১৮৭

উমরের ইসলাম গ্রহণে ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। যদিও তখন পর্যন্ত ৪০-৫০জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে হযরত হামযা রা.ও ছিলেন তথাপি মুসলমানদের পক্ষে কাবায় গিয়ে নামায পড়া তো দূরের কথা, নিজেদের মুসলমান বলে প্রকাশ করাও নিরাপদ ছিল না। হযরত উমরের ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে এ অবস্থার পরিবর্তন হলো। তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দিলেন এবং অন্যদের সঙ্গে নিয়ে কাবাঘরে নামায আদায় করা শুরু করলেন। ১৮৮

উমর রা.-এর হিজরত এ অন্যান্যদের হিজরতের মধ্যে একটা বিশেষ পার্থক্য ছিল। অন্যদের হিজরত ছিল চুপে চুপে। সকলের অগোচরে। আর উমরের হিজরত ছিল প্রকাশ্য। তার মধ্যে ছিল কুরাইশদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ও বিদ্রোহের সুর। মক্কা থেকে মদীনায় যাত্রার পূর্বে তিনি প্রথমে কাবা তাওয়াফ করলেন। তারপর কুরাইশদের আড্ডায় গিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি মদীনা চলছি। কেউ যদি তার মাকে পুত্র শোক দিতে চায় সে যেন এ উপত্যকার অপর প্রান্তে আমার মুখোমুখি হয়। এমন একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তিনি মদীনার পথ ধরলেন; কিন্ত কেউ এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণের দুঃসাহস করল না।

হযরত উমর রা.-এর নিষ্ঠা, বীরত্ব ও সাহস ছিল মহান আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত। তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা.-এর দেখানো পথে রপ্ত করেন চরিত্র, ইবাদত, আচার-ব্যবহার ও দয়া-অনুগ্রহ।

খুনাইসের সাথে বিয়ে
বিয়ের বয়স হলে পিতা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম হযরত খুনাইস ইবনে হুজাফার সাথে তার প্রথম বিয়ে দেন। এই খুনাইস রা. হচ্ছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফাহ রা.-এর ভাই। বিয়ের পর তারা অটল ঈমানের সাথে আল্লাহর ইবাদতে দিন কাটাতে থাকেন। হযরত খুনাইস রা. ওই সময় ইসলাম গ্রহণ করেন যখন পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িতে প্রবেশ করেননি। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর হাতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

আল্লাহর রাস্তায় বের হও
সাহাবীদের ওপর মক্কার মুশরিকদের অনবরত নির্যাতন বাড়তেই থাকে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীদের আবিসিনিয়ার উদ্দেশে হিজরতের ইশারা দেন। খুনাইস রা.-ও আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। ক'দিন পর আবার মক্কায় ফিরে আসেন। এসে যখন দেখলেন, পূর্বের তুলনায় মুশরিকদের নির্যাতন ও নিপীড়নের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে এবং দিনের পর দিন তা বেড়েই চলেছে, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিলে হযরত হাফসা রা.-কে নিয়ে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় আনসারদের সাথে এই দম্পতি জীবন-যাপন করতে থাকেন।

এক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করে মদীনায় চলে আসেন। তখন পুরো মদীনা আলোকিত হয়ে ওঠে। প্রিয় হাবীব সা.-এর সান্নিধ্যে কতই না সুন্দর কাটছিল তাঁদের জীবন!

যন্ত্রণাদগ্ধ বিচ্ছেদ
বদর যুদ্ধ—যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের প্রভূত কল্যাণ ও সাহায্য দান করেছেন, এ যুদ্ধে হযরত খুনাইস রা. একজন সাহসী বীর বেশে শাহাদাতের অভিলাসে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রবল বিক্রমে লড়াই করেন। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম হয় তাঁর।

তারপরও তিনি আল্লাহর দ্বীনকে উচ্চকিত রাখার নিমিত্তে এবং কাফেরদের পিষ্ট করার লক্ষ্যে লড়াইয়ে অবিচল থাকেন। এক সময় যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। বিজয়ী বেশে মদীনা অভিমুখে মারাত্মক আহত অবস্থায় ফিরে আসেন হযরত খুনাইস রা.।

এই আহত অবস্থাতেই তিনি মহান রবের সান্নিধ্যে চলে যান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জানাযার নামায পড়ান এবং জান্নাতুল বাকীতে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত উসমান ইবনে মাযঊন রা.-এর কবরের পাশে দাফন করেন। এদিকে অল্প বয়সেই বিধবা হন হযরত হাফসা রা.।

উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভ
মেয়ে বিধবা হওয়ার পর পিতা উমর রা. তার দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবতে লাগলেন। উমর রা. গেলেন আবু বকরের রা. কাছে। বললেন, আপনার সাথে আমি হাফসাকে বিয়ে দিতে চাই। আবু বকর রা. চুপ থাকলেন, কোনো জবাব দিলেন না। এরপর উসমানের সাথে দেখা করে তার সাথে হাফসার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। উসমান বিষয়টি ভেবে দেখবো বলে সময় নেন। কয়েক দিন পর, 'আমি এ সময় বিয়ে করতে চাচ্ছি না' বলে জবাব দেন। উমারের রা. দুঃখের কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হাফসাকে বিয়ে করবে উসমানের চেয়েও ভালো এক ব্যক্তি এবং উসমান বিয়ে করবে হাফসার চেয়েও ভালো এক নারীকে। তারপরই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাফসাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠান। ১৮৯

রাসূলুল্লাহ সা.-এর কন্যা রুকাইয়া রা.-এর ইন্তেকালের পর উম্মে কুলসুমকে বিয়ে দেন হযরত উসমান রা.-এর সাথে।

হযরত উমর রা. বলেন, এরপর আবু বকর রা. আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, সম্ভবত আপনি আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। আপনি যখন হাফসাকে আমার জন্য পেশ করেন তখন আমি কোনো উত্তর দিইনি। উমর রা. বলেন, আমি বললাম, হাঁ। আবু বকর রা. বললেন, আপনার প্রস্তাবে সাড়া দিতে কোনো কিছুই আমাকে বিরত করেনি; এ ছাড়া যে, আমি জানি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাফসার বিষয় উল্লেখ করেছেন আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গোপন ভেদ প্রকাশ আমার পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা ত্যাগ করতেন তাহলে আমি হাফসাকে গ্রহণ করতাম। ১৯০

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাফসাকে হিজরী তৃতীয় সনে গাযওয়ায়ে উহুদের পূর্বে বিয়ে করেন এবং চার শো দিরহাম দেনমোহর দান করেন। হযরত হাফসা রা. ও তার পিতার ওপর এটা ছিল অনেক বড়ো সম্মান, অনুগ্রহ ও ইহসান।

উচ্চতর মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ সা.-এর অন্তরে হযরত হাফসা রা.-এর জন্য ছিল বিশেষ মর্যাদা। অন্যান্য পবিত্র স্ত্রীগণের অন্তরেও তার বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা অটুট ছিল। উম্মুল মুমিনীন সায়্যিদা আয়েশা ও হাফসা রা. পরস্পর সতীন হলেও তাদের সম্পর্ক ছিল বোনের মতো। অধিকাংশ ব্যাপারে তারা একে অপরের সহযোগী ছিলেন। 'আয়েশা রা. হাফসা সম্পর্কে বলেছেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র হাফসাই আমার সমকক্ষতার দাবীদার ছিলেন। ১৯১

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের সকল ছোট-বড় ঘটনা সাধারণ মানুষের জীবনের মতো নিছক কোনো ঘটনা নয়। প্রত্যেকটি ঘটনার মধ্যে রয়েছে মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় বিষয়। আল্লাহ তাআলা এসব ঘটনার মাধ্যমে মানব জাতিকে বিভিন্ন বিধি-বিধান ও আচরণের বাস্তব শিক্ষা দিতে চেয়েছেন।

নবীজী সা.-এর পবিত্র সহধর্মিণীগণ মানবিক সহজাত স্বভাব-প্রকৃতি হতে মুক্ত ছিলেন না। তাদেরও অন্যদের মতো মান-অভিমান ছিল, ছিল রাগ-অনুরাগ; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা.-এর মতো মহান শিক্ষকের সান্নিধ্যে থেকে তারা যাবতীয় চারিত্রিক সৌন্দর্য ও গুণাবলী রপ্ত করে নিয়েছিলেন। নিজ হাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের শিক্ষা দিতেন শিষ্টাচার ও দাম্পত্য জীবনের নানাবিধ বিধি-বিধান। যাতে করে উম্মতের মা-বোন ও কন্যারা সহজে সুন্নাতের ওপর আমল করে আল্লাহর হুকুম পালন করতে পারে। ১৯২

একটি উপমা
এই একটি উপমা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, রাসূলুল্লাহ সা.-এর স্ত্রীগণের মধ্যে কখনো কখনো ঈর্ষা দেখা দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কীভাবে তার প্রতিবিধান করতেন। কী অনুপম প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সাথে তিনি সেই আঘাত উপশম করতেন। হাদীসে এসেছে, আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়নাব বিনতে জাহাশ রা.-এর কাছে মধু পান করতেন এবং সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন। তাই আমি এবং হাফসা স্থির করলাম যে, আমাদের যার ঘরেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসবেন, সে তাকে বলবে, আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন? আপনার মুখ থেকে মাগাফীরের গন্ধ পাচ্ছি। তিনি বললেন, না, বরং আমি যায়নাব বিনতে জাহশ রা.-এর নিকট মধু পান করেছি। আমি কসম করলাম, আর কখনো মধু পান করব না। তুমি এ ব্যাপারে অন্য কাউকে জানাবে না।' ১৯৩

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এমন সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে আয়েশা আফসোসের সুরে হাফসাকে বলেন, আমরা একটি মারাত্মক কাজ করে ফেলেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার একটি প্রিয় বস্তু থেকে বঞ্চিত করে ফেলেছি। এ ঘটনারই প্রেক্ষিতে নাযিল হয় সূরা তাহরীমের নিম্নোক্ত আয়াত,
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَ اللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
হে নবী, আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদের খুশি করার জন্য তা নিজের জন্য হারাম করেছেন কেন? ১৯৪

উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা. জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো রাসূলুল্লাহ সা.-এর সান্নিধ্যে কাটান। এতে করে দিন দিন তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও ইবাদতের পরিমাণ বাড়তে থাকে।... কেনই-বা বাড়বে না? তার অন্তর তো ছিল সরল ও পবিত্র। নবী সা.-এর অন্যান্য স্ত্রীদের সাথে তিনিও আল্লাহর রাসূল সা.-কে সন্তুষ্ট রাখতে প্রতিযোগিতা করতেন। কী করে নবীর অধিক প্রিয়ভাজন হওয়া যায়, সেই চেষ্টাই থাকত তার সব সময়।

জান্নাতে নবী সা.-এর স্ত্রী
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় এবং পরবর্তী জীবনে হাফসা রা. প্রচুর ইবাদত-বন্দেগী করতেন। সব সময় রোযা রাখতেন এবং অতিমাত্রায় রাত জেগে নামায আদায় করতেন। একটি বিশেষ কারণে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাফসা রা.-কে এক তালাক দেন। তারপর আবার ফিরিয়ে নেন। তালাক দেওয়ার পর জিবরাঈল আ. এসে রাসূলকে বলেন, হাফসা খুব বেশি রোযা পালনকারিণী এবং রাতে বেশি বেশি নামায আদায়কারিণী। জান্নাতে তিনি আপনার স্ত্রী হবেন। জিবরীলের এ কথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার তাকে ফিরিয়ে নেন। ১৯৫

উক্ত বর্ণনা দ্বারাই মহান আল্লাহ তাআলার কাছে আম্মাজান হযরত হাফসা রা.-এর মর্যাদা আঁচ করা যায়।

তাঁর জ্ঞান ও ফিকহ
উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা. ইলম, ফিকহ ও তাকওয়ার দীক্ষা নিয়েছিলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছ থেকে। তার সেই ইলম ও ফিকহ দ্বারা খিলাফতে রাশেদায় প্রভূত কল্যাণ সাধিত হয়েছে। বিশেষ করে তার পিতার শাসনামলে। যেমন: একদিন উমর রা. রাতের বেলা নগর পরিভ্রমণে বেরিয়ে এক মহিলা দু-টি কবিতার পংক্তি গাইতে শোনেন। তারপর তিনি হাফসাকে জিজ্ঞেস করেন, মেয়েরা সর্বাধিক কতদিন স্বামী ছাড়া থাকতে পারে? হাফসা বলেন, ছয় অথবা চার মাস। ১৯৬ উমর রা. বলেন, আমি এর চেয়ে বেশিদিন কোনো সৈনিককে আটকে রাখবো না।

এছাড়া কুরআন সংরক্ষণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদীসটি আমরা ওহী লেখক হযরত যায়িদ ইবেন সাবিত রা.-এর মুখেই শুনি:

হযরত যায়িদ ইবনে সাবিত রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়ামামাহর যুদ্ধে বহু লোক শহীদ হবার পর আবু বকর সিদ্দীক রা. আমাকে ডেকে পাঠালেন। এ সময় উমর রা.-ও তার কাছে উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর রা. বললেন, উমর রা. আমার কাছে এসে বললেন, ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদদের মধ্যে কারীদের সংখ্যা অনেক। আমি আশঙ্কা করছি, এমনিভাবে যদি কারীগণ শাহীদ হয়ে যান, তাহলে কুরআন মাজীদের বহু অংশ হারিয়ে যাবে। অতএব, আমি মনে করি, আপনি কুরআন সংকলনের নির্দেশ দিন। উত্তরে আমি উমর রা.-কে বললাম, যে কাজ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেননি, সে কাজ তুমি কীভাবে করবে? উমর রা. জবাবে বললেন, আল্লাহর কসম! এটা একটি উত্তম কাজ। উমর রা. এ কথাটি আমার কাছে বার বার বলতে থাকলে অবশেষে আল্লাহ তাআলা এ কাজের জন্য আমার বক্ষকে উন্মোচন করে দিলেন এবং এ ব্যাপারে উমর যা ভালো মনে করলেন আমিও তাই করলাম। যায়িদ রা. বলেন, আবু বকর রা. আমাকে বললেন, তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক। তোমার ব্যাপারে আমার কোনো সংশয় নেই। তদুপরি তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওহীর লেখক ছিলে। সুতরাং তুমি কুরআন মাজীদের অংশগুলোকে তালাশ করে একত্র করো। আল্লাহর শপথ! তারা যদি আমাকে একটি পর্বত এক স্থান হতে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিত, তাহলেও তা আমার কাছে কুরআন সংকলনের নির্দেশের চেয়ে কঠিন বলে মনে হতো না। আমি বললাম, 'যে কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেননি, আপনারা সে কাজ কীভাবে করবেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম! এটা একটা কল্যাণকর কাজ।'

এ কথাটি আবু বকর সিদ্দীক রা. আমার কাছে বার বার বলতে থাকেন, অবশেষে আল্লাহ আমার বক্ষকে উন্মোচন করে দিলেন সে কাজের জন্য, যে কাজের জন্য তিনি আবু বকর এবং উমর রা.-এর বক্ষকে উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। এরপর আমি কুরআন অনুসন্ধানের কাজে লেগে গেলাম এবং খেজুর পাতা, প্রস্তরখণ্ড ও মানুষের বক্ষ থেকে আমি তা সংগ্রহ করতে থাকলাম। এমনকি আমি সূরা তওবার শেষাংশ আবু খুযায়মাহ আনসারী রা. থেকে সংগ্রহ করলাম। এ অংশটুকু তিনি বাদে আর কারও কাছে আমি পাইনি। আয়াতগুলো হচ্ছে এই : তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের কাছে এক রাসূল এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তার জন্য তা কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মু'মিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। এরপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলো, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং তিনি মহা আরশের অধিপতি। (১২৮-১২৯) তারপর সংকলিত সহীফাসমূহ মৃত্যু পর্যন্ত আবু বকর রা.-এর কাছে রক্ষিত ছিল। তার মৃত্যুর পর তা উমর রা.-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল, যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন। অতঃপর তা উমর রা.-এর কন্যা হাফসা রা.-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল। ১৯৭

হযরত উসমান রা.-এর খিলাফতের সময় তার কাছ থেকে সেই সহীফাগুলো এনে কুরআন একত্রিকরণ করা হয়। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, 'হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. একবার হযরত উসমান রা.-এর কাছে এলেন। এ সময় তিনি আরমিনিয়া ও আযারবাইজান বিজয়ের ব্যাপারে সিরীয় ও ইরাকী যোদ্ধাদের জন্য যুদ্ধ-প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কুরআন পাঠে তাদের মতবিরোধ হুযাইফাহকে ভীষণ চিন্তিত করল। সুতরাং তিনি উসমান রা.-কে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, কিতাব সম্পর্কে ইহুদী ও নাসারাদের মতো মতপার্থক্যে লিপ্ত হবার পূর্বে এই উম্মতকে রক্ষা করুন। তারপর উসমান রা. হাফসা রা.-এর কাছে এক ব্যক্তিকে এ বলে পাঠালেন যে, আপনার কাছে সংরক্ষিত কুরআনের সহীফাসমূহ আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা সেগুলোকে পরিপূর্ণ মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করতে পারি। এরপর আমরা তা আপনার কাছে ফিরিয়ে দেব। হাফসা রা. তখন সেগুলো উসমান রা.-এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

এরপর উসমান রা. যায়িদ ইবনে সাবিত রা., আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র রা., সায়ীদ ইবনে আস রা. এবং আবদুর রহমান ইবনে হারিস ইবনে হিশাম রা.-কে নির্দেশ দিলেন। তারা মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করলেন। এ সময় উসমান রা. তিনজন কুরাইশী ব্যক্তিকে বললেন, কুরআনের কোনো ব্যাপারে যদি যায়িদ ইবনে সাবিতের সঙ্গে তোমাদের মতভেদ দেখা দেয়, তাহলে তোমরা তা কুরাইশদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ, কুরআন তাদের ভাষায় নাযিল হয়েছে। সুতরাং তারা তাই করলেন। যখন মূল লিপিগুলো থেকে কয়েকটি পরিপূর্ণ গ্রন্থ লেখা হয়ে গেল, তখন উসমান রা. মূল লিপিগুলো হাফসা রা.-এর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি কুরআনের লিখিত মাসহাফ-সমূহের এক একখানা মাসহাফ এক এক প্রদেশে পাঠিয়ে দিলেন এবং এছাড়া আলাদা আলাদা বা একত্র কুরআনের যে কপিসমূহ রয়েছে তা জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। ১৯৮

বিদায়ের ধ্বনি
৪১ হিজরীতে আম্মাজান হযরত হাফসা রা. আল্লাহর সাথে এবং তার প্রিয়ভাজনদের সাথে পরপারে মিলিত হন। সেই বছর শাবানের আরও ক'টি দিন বাকি ছিল, এমন সময়ই তিনি রফীকে আ'লার সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। ১৯৯ তাঁর ইন্তেকালে গোটা মদীনায় রব পড়ে যায় যে, রাসূলের স্ত্রী ইন্তেকাল করে গেছেন! সাহাবাদের বড় একটি দল জানাযায় শরীক হন। তারা আবু হুরায়রা রা. ও আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর নেতৃত্বে তাকে দাফন করে আসেন। জানাযা পড়ান তৎকালীন মদীনার গভর্নর মারওয়ান ইবনুল হিকাম। তাকে কবরে নামান তার ভাই আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এবং তার ছেলেরা— আসিম, আবদুল্লাহ ও হামযা। ইন্তেকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ভাই আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে তার সব সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় সাদাকা করার অসিয়ত করে যান।

এভাবেই তিনি তার স্বামী ও প্রিয়তমের কাছে চলে যান, যে সম্পর্কে জিবরাঈল আ. বলেছিলেন, 'খুব বেশি রোযা পালনকারিণী এবং রাতে বেশি বেশি নামায আদায়কারিণী। জান্নাতে তিনি আপনার স্ত্রী হবেন।' আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁকেও সন্তুষ্ট রাখুন এবং তার হাবীব সা.-এর জান্নাতে তাকে সঙ্গী করে দিন। আল্লাহই এ ব্যাপারে সক্ষম এবং সাহায্যকারী।

টিকাঃ
১৮২. আইম্মাতুল হুদা ওয়া মাসাবীহুদ দুজা, ২২৯।
১৮৩. সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৯৭৯।
১৮৪. মুসনাদ, আহমাদ।
১৮৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৭৪১; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪৭৮।
১৮৬. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৩/২১১।
১৮৭. সুনান, আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬৮৩; আলবানী হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
১৮৮. তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ১/২৭০।
১৮৯. সহীহ, বুখারী, ৯/১৫২-১৫৩।
১৯০. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫১২২।
১৯১. ইমাম যাহাবী প্রণীত আসসিয়ার, ২/২২৭।
১৯২. নিসাইম মুবাশশারাত বিল জান্নাহ, ৩৩০।
১৯৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৯১২; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪৭৪।
১৯৪. সূরা তাহরীম, ৬৬:১।
১৯৫. সুনান, আবু দাউদ, ২২৮৩; সুনান, ইবনু মাজাহ, ২০১৬; আরনাউত হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
১৯৬. হায়াতুস সাহাবা, ১/৪৭৬; আদদুররুল মানসূর, ১/৬৫২।
১৯৭. সহীহ, বুখারী, ৪৯৮৬; সুনান, আত-তিরমিযী, ৩১০৩; সুনান, নাসায়ী, ৫/২৯৩।
১৯৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৯৭৮।
১৯৯. সিফাতুস সাফওয়া, ২/৪০; তাবাকাত, ৮/৮৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00