📄 মসজিদে কুবায়
আল্লাহ তা'আলার তসবীহ ও তকদীসের পর:
হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে অবহিত করছি যে, হক সুবহানাহ
তা'আলা আমাকে উন্নত নৈতিক চরিত্রের পরিপূর্ণতা বিধানের জন্য
পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ আমি এসেছি শুধুমাত্র উত্তম চরিত্র পরিপূর্ণ করার
জন্য। তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি, উত্তম নৈতিক চরিত্র অবলম্বন কর।
মনে রেখো, তোমাদের মধ্যে আমি তাকে বেশী মহব্বত করি যে উত্তঘ
চরিত্রের অধিকারী। আমার দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে তার। উত্তম যার
পুতপবিত্র চরিত্রের মালিক। মন্দ চরিত্র আমলকে এমনভাবে বরবাদ করে
যেভাবে শিরক। মধুকে। যার চরিত্র পুতপত্তি তার মর্যাদা রাত জেগে
ইবাদতকারী ও দিনের বেল। সীয়াম পালনকারীর সমান। অর্থাৎ সে
ঐ সব সাধনাকারীর ন্যায় যারা রাত্রিকালে সালাতে মশগুল থাকে এবং
দিনের বেলা সাঁয়াম পালন করে। তোমরা কি জানো, উন্নত নৈতিক চরিত্র
কাকে বলে? স্মরণ রাখ, প্রত্যেকের সংগে মহব্বতের সাথে মেলামেশা
করা, অহংকার না করা, অধিক সময় চুপ থাকা, আল্লাহকে খুব বেশী
স্মরণ করা, বেহুদা কথাবার্তা অপছন্দ করা, ন্যায়-ইনসাফের ক্ষেত্রে
আপন-পর সাধারণ-অসাধারণ, উচ্চ নীচের ভেদাভেদ না করা গরীব-
মিহকিনকে তুচ্ছ জ্ঞান না করা, যাহেলদের কার্যকলাপে ধৈর্যধারণ করা।
খাদিমদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা এবং গরীব আত্মীয় স্বজনের প্রতি
দয়া করা হচ্ছে উন্নত চরিত্র। আর এসব গুণে যে ভূষিত সে সম্মানের
যোগ্য এবং আমি দৃঢ়তার সাথে বলছি, আমলের নিক্তিতে উত্তম
নৈতিকতার চেয়ে বেশী ওজন অন্য কোন কিছুতে নেই। অতএব
তোমরা উত্তম নৈতিক চরিত্র অবলম্বন কর।
হে উপস্থিত জনমণ্ডলী! তোমাদের মধ্যে যে কেউ সৎ চরিত্রের
তালিম দেবে সে এ পরিমাণ সওয়াব হাসিল করবে যে পরিমাণ সওয়াব
হাসিল করবে তার কথায় হেদায়েত প্রাপ্ত ব্যক্তিরা। অসৎ চরিত্রের তালিম
যে দেবে সে এত পাপ করবে যত পাপ তার কথায় অসৎ ব্যক্তিদের হবে।
আমি তোমাদেরকে অবহিত করছি, যে দীর্ঘায়, এবং সৎ চরিত্রের
অধিকারী সে উত্তম ব্যক্তি, যে দীর্ঘায়, অথচ অসৎ চরিত্রের অধিকারী সে
সবচেয়ে অধম। আমি তোমাদেরকে নসিহত করছি যে, তোমর। পরস্পর
উত্তম ব্যবহার কর। একে অন্যের সাথে শত্রুতা করো না, পরস্পর
হিংসা পোষণ করো না। কোন মুসলমানের জন্য উচিত নয় যে, অপর
মুসলমানের প্রতি তিন দিনের বেশী মনোকষ্ট পোষণ করবে। অর্থাৎ
ঘটনাক্রমে বিবাদ হলে তিন দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করে ফেলা উচিত।
যে মুসলমান ভাই-এর সাথে এক বছরের মধ্যে বিবাদ নিষ্পত্তি করেনি সে
যেন খুনের অপরাধে অপরাধী। যখন তোমার ভাই বিপদগ্রস্ত হয় তখন
তাকে সাহায্য কর। যখন পীড়িত হয় তখন তাকে দেখতে যাও এবং
তাকে সান্ত্বন। দান কর। কেউ অপরাধ করে থাকলে তাকে মাফ করে
দাও। কিন্তু আল্লাহর আইন যারি করার ক্ষেত্রে ন্যায়-ইনসাফ ত্যাগ
করো না। ধৈর্য ও সহনশীলতা উত্তম চরিত্র। গোমরাহী ও যুলুমের
মোকাবিলা করতে কখনও অক্ষমতা প্রকাশ করো না। বদান্যতা ও
আত্মত্যাগ অত্যাবশ্যক। অপব্যয় পরিহার কর। সাহসিকতা ও
বাহাদুরী উত্তম অলংকার। কিন্তু মযলুম ও বিজিতের জন্য সম্পূর্ণ
ভাবে মেহেরবান ও দয়াশীল হয়ে যাও। পরিবার-পরিজনের সাথে
উত্তম ব্যবহার কর। কেউ তোমার সাথে মুলাকাত করতে আসলে তার
সম্মান কর, তার সাথে অন্যায় ব্যবহার করো না। আল্লাহ, রব্বুল
আলামীন তোমাদের ধন-দওলত দিয়ে থাকলে তোমরা গর্বিত হয়ে।
না। এতিম, অসহায়, বিধবা, গরীব ও অক্ষম ব্যক্তিদের সাহায্য কর।
যার উপর যুলুম করা হয় তার সহায়তা কর।
হে উপস্থিত জনমণ্ডলী! তোমরা কি জান দুষ্কর্ম' ও মন্দ চরিত্র কি?
মনে রেখো, কারো সাথে মন্দ ব্যবহার করা, অহংকার করা, গরীবদের
তুচ্ছ মনে করা, খাদিমদের উপর অত্যাচার করা, প্রতিবেশীকে কষ্ট
দেয়া, পার্থিব কাজে নিজের সত্তার শ্রেষ্ঠত্ব দান করা, পরিবার-পরি-
জনের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করা, রোগীর দেখাশুনা না করা,
বন্ধুদের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করা, আমানতের খেয়ানত করা, মিথ্যা
বলা, ধোঁকা দেয়া, ছল-চাতুরী অবলম্বন করা, কারো অধিক প্রশংসা
করা, নির্লজ্জ কাজে মশগুল থাকা, ইনসাফের ক্ষেত্রে আপন-পর এবং
উচ্চ-নীচের ভেদাভেদ করা, অন্যের মুসিবতে খুশী হওয়া, মযলুমের
সাহায্য না করা, বড়দের সাথে কর্কশ ব্যবহার করা, ওয়াদা খেলাফ করা,
কারো অপবাদ দেয়া, মেহমানের বেইজ্জতি করা, কারো দোষ-ত্রুটি
বর্ণনা করা, অন্যের উন্নতিতে হিংসা পোষণ করা, এতিম, গরীব ও
অসহায়দের তুচ্ছ জ্ঞান করা এবং তাদের সাহায্য না করা, বাকহীন
পশ, থেকে তাদের শক্তির উর্ধে কাজ নেয়া, বেহুদা খরচ করা, অপ্রয়ো-
জনীয় কথা বলা, দিলের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করা-এসবই
দুশ্চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত। অতএব তোমরা এসব থেকে দূরে থাক।
আসসালাম, আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
📄 আইয়ুব আনসারীর (রাঃ) বাসভবনে
আল্লাহর হাম্দ ও সানা বর্ণনা করার পর:
হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তোমরা আল্লাহ,
তা'আলার এবং তাঁর বান্দাদের হক আদায় কর। তোমর। কি জান,
বান্দার হক কি? স্মরণ রেখো, প্রত্যেক মুসলমানের চারটি হক রয়েছে:
অসুস্থ হলে তার শুশ্রুষা কর', বিপদে তার সাহায্য করা, মৃত্যু হলে
তার দাফন-কাফনে শরীক হওয়া ও সাহায্য চাইলে সাহায্য দান করা।
যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ, কোন লোক ততক্ষণ পর্যন্ত
মুসলমান হতে পারে না যতক্ষণ না সে তার নিজের জন্য যা পছন্দ
করে তার ভাই-এর জন্যও তাই-ই পছন্দ করে।
হে মুসলমানগণ! যতদূর সম্ভব নিজের ভাইদের সাহায্য কর।
একে অপরের উপর যুলুম করে। না। অপরের মাল অবৈধভাবে
আত্মসমাৎ করো না, একে অপরের অসম্মান করো না। মনে রেখো,
যার সন্তান জন্মলাভ করবে তার উচিত হবে সন্তানের ভাল নামকরণ
করা, তার তালিম-তরবিয়াতের জন্য প্রচেষ্ট। করা এবং সাবালক হলে
তার শাদীর ব্যবস্থা করা এবং কোন রসম-রেওয়াজের খাতিরে শাদী-
দানে বিলম্ব না করা। কেননা অবিবাহিত অবস্থায় বালেগ ব্যক্তি কোন
গুনাহ, করলে তার জিম্মাদারী পিতার হবে। সন্তানকে আদব
বুদ্ধি-বিবেচনা এবং আচার-আচরণ শিক্ষা দেয়। জীবনের গুরুত্বপূণ
কর্তব্যের অন্যতম।
হে মুসলমানগণ! তোমাদের সন্তানদেরকে সাত বছর বয়সে
সালাতের তাগিদ কর এবং দশ বছর বয়সে কঠোর শাসন কর এজন্য
যে, সালাত এক মহান ইবাদত। যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে সালাত
আদায় করে তার রঙহ আলোকোজ্জ্বল হয়। সে আল্লাহর খাতিরে
আল্লাহ, ব্যতীত যাবতীয় সম্পর্ক' পরিত্যাগ করে। নিজের সম্পূর্ণ শক্তি
সহকারে আল্লাহর পছন্দনীয় কাজে মশগুল হয়ে যায়। নিজের মাল
মিসকিন ও অসহায়দের জন্য ব্যয় করে। মুসিবতকালে সবর ও
দৃঢ়তা প্রদর্শন করে এবং সুখের সময় আল্লাহর শোকর আদায় করে।
হে উপস্থিত জনমণ্ডলী! তোমাদের রব বলেনঃ প্রতিবেশীর
সাথে উত্তম ব্যবহার কর এবং তাদেরকে কষ্ট দিও না। যে প্রতিবেশী-
দের কষ্ট দেয় তার জন্য লাঞ্ছনাকারী আযাব রয়েছে। এতে বিন্দুমাত্র
সন্দেহ নেই যে, যার অনিষ্ট থেকে প্রতিবেশীরা নিরাপদ নয় সে
জান্নাতে দাখিল হতে পারবে না। সে মুমিন নয় যে তৃপ্তির সাথে
আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী উপস থাকে। প্রতিবেশীদের
মধ্যে নিকটতম গৃহের লোক তোমার সাহায্য পাওয়ার অধিক হকদার।
তোমরা কি জান, প্রতিবেশীর সীমা কতদূর? মনে রেখো, চল্লিশ
ঘর সামনে, চল্লিশ ঘর পেছনে, চলিশ ঘর ডানে ও চল্লিশ ঘর বামে
যারা আছে সবাই প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত। তোমার প্রতিবেশী ভুখা
রয়েছে জানতে পারলে তাকে তোমার নিজের খাবার থেকে কিছ, দাও।
তোমার ঘরে সুরউয়। রান্ন। হলে তাতে পানি বেশী করে দাও এবং তা
প্রতিবেশীদের মধ্যে বণ্টন কর। যে বক্তি সারা দিন সালাত আদায়
করে ও সিয়াম পালন করে এবং সারারাত ইবাদত করে অথচ তার চরিত্র
উত্তম নয় এবং তার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ নয় সে
ব্যক্তি দোযখী হবে। যে ইবাদত করে, উন্নত চরিত্রের অধিকারী এবং
তার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে মুক্ত সে অবশ্যই জান্নাতী হবে।
হে উপস্থিত জনতা! সন্তানের উপর মা-বাপের হক রয়েছে।
তোমাদের রব বলেন: আমি ছাড়া কারো ইবাদত করো না, মাতা-পিতার
সাথে সুন্দর ব্যবহার কর, তাঁর। বৃদ্ধ হলে তাঁদের সামনে 'উহ' পর্যন্ত
বলো না; তাঁদের সাথে কঠোর ভাষায় কথা বলে। না, আদবের সাথে
আস্তে আস্তে কথা বল; তাদের জন্য দোয়া করঃ হে রব, তাঁরা যে
ভাবে আমাকে লালন-পালন করেছেন এবং আমার উপর রহম করেছেন
ঠিক সেভাবে তুমিও তাঁদের উপর রহম কর।
হে মানুষ! মাতা-পিতার আনুগত্য করা এবং তাদেরকে আরাম
দেয়ার চেষ্টা করা আল্লাহর নিকট প্রিয়তম আমল। আমি তোমাদেরকে
অবহিত করছি, আল্লাহর সন্তুষ্টি বাপের সন্তুষ্টির সাথে এবং আল্লাহর
ক্রোধ বাপের ক্রোধের সাথে জড়িত। উদ্দেশ্য হলে।: মাতা-পিতা সন্তুষ্ট
হলে আল্লাহও সন্তুষ্ট এবং তাঁরা অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহও অসন্তুষ্ট।
আমার খুব স্মরণ রয়েছে যে, একবার দামেস্কের এক নওজোয়ান
আমার কাছে এসেছিল। সে বলল, 'হিযরত করার জন্য আপনার কাছে
বায়েত করতে এসেছি অথচ আমার পিতা-মাতাকে অশ্র-প্লাবিত অবস্থায়
রেখে এসেছি। আমি তাকে বললাম, তোমার জন্য এটাই হিযরত।
কেননা মাতা-পিতার মনের সন্তুষ্টি বিধান মহান পুরস্কারের যোগ্য।
যে মাতা-পিতার সাথে উত্তম ব্যবহার করে তার জন্য দুনিয়া ও
আখেরাতেও উত্তম ব্যবহার রয়েছে। যে পিতা-মাতার সাথে মন্দ
ব্যবহার করে তার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতেও মন্দ ব্যবহার রয়েছে।
আমি পুনরায় তোমাদের নসিহত করছি যে, মাতা-পিতার সম্মান কর
এবং তাদের খেদমত কর।
আস্সালাম, আলাইকুম।
📄 আইয়ুব আনসারী (রা:) বাসভবনে দ্বিতীয় ভাষণ
আল্লাহর তসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনার পর:
হে মানুষ! তোমাদের রব বলেন: নিজের সম্পদ নেক কাজে
ব্যয় কর এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। অর্থাৎ দান-
খয়রাত করে অন্যের দয়া প্রদর্শন করা হয়েছে এ কথ। বলে দান বরবাদ
করো না। মনে রেখো, যে মংগলজনক কাজ তুমি করবে আল্লাহ-
তা'আল। তা' জানেন। যে তার বিষয়-সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে
তার জন্য তার রবের কাছে মহান প্রতিদান রয়েছে। সে নেকী থেকে
বঞ্চিত হবে না। তার জন্য কোন ভয়-ভীতি নেই এবং সে চিন্তিতও
হবে না।
হে উপস্থিত জনমণ্ডলী! তোমরা কি মনে কর আল্লাহ, তোমাদের
মুখাপেক্ষী? কখনও নয়। তিনি অভাবহীন এবং বেনিয়ায। তোমর
যা উপার্জন কর তা তোমাদের ফায়দার জন্য। যে নিজের মাল
অপরকে দেখানোর জন্য ব্যয় করে সে হতভাগ্য। সে কিয়ামতের দিনের
উপর বিশ্বাসী নয়। আমি তোমাদেরকে অবহিত করছি যে, দানশীল
এবং ত্যাগী মানুষ হক সুবহানাহুতা'আলার নিকটবর্তী, জান্নাতের
নিকটবর্তী ও জাহান্নাম থেকে দূরে অবস্থান করছে। স্বার্থপর ও
বখিল ব্যক্তি আল্লাহ্তা'আলা থেকে দূরে, জান্নাত থেকে দূরে ও
জাহান্নামের নিকটবর্তী।
হে উপস্থিত জনতা! আমি যা জানি এবং দেখি তোমরা তা দেখ না
এবং জান না। মনে রেখো, প্রত্যেক দিন ভোর বেলা দুজন ফেরেশত
নাযিল হন। একজন বলেন, হে আল্লাহ! দানশীল এবং ত্যাগী মানুষের
সম্পদে বরকত দান কর ও অপরজন বলেন, হে মহাপবিত্র আল্লাহ!
স্বার্থপর এবং বখিলের সম্পত্তি বিনষ্ট কর। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ
নেই যে, মানুষের জীবনের আমল এবং কর্তব্য কাজের মধ্যে (ত্যাগ ও
সৎপথে ব্যয় করা) উত্তম আমল। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর নামে
শপথ করছি যে, ওহোদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ' আমার কাছে থাকলেও
তা তিন রাতের মধ্যে খরচ হয়ে গেলে আমি খুব খুশী হবে। এবং চাইব
যে আমার হাতে কিছুই যেন অবশিষ্ট না থাকে। আমি জানি, ধন-
সম্পত্তি ব্যয় করা মানুষের জন্য লাভজনক এবং সঞ্চিত করে রাখ।
অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিন্তু প্রয়োজন বোধে সঞ্চিত করে রাখা নিন্দনীয় নয়।
আল্লাহর রাস্তায় তাদের জন্য প্রথম ব্যয় করা শুর কর যাদের ভরণ-
পোষণ তোমাদের কর্তব্য। আমি সুস্পষ্ট ভাবে বলতে চাই, আল্লাহর
রাস্তায় তোমরা যে অর্থ সম্পদ ব্যয় কর তা কখনও বৃথা যায় না বরং
তা তোমাদের সম্পদ বৃদ্ধি করে যদিও তোমরা তা উপলব্ধি করতে
পার না। দুনিয়ার ফায়দা ব্যতীত আখেরাতের সওয়াবও তাতে
রয়েছে। আখেরাতে বিশ্বাসীদের জন্যই হেদায়েত।
হে মানুষ! এ দুনিয়া পরীক্ষা ক্ষেত্র এবং কর্ম'স্থলও বটে। তোমর।
যেরূপ কাজ করবে সেরূপ ফল লাভ করবে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি
কামনা করে তাদের জন্য ইজ্জত ও শান্তি। যাদের আনুগত্যের মস্তক
আল্লাহর হাজরে অবনত, যাদের জীবনের অধিকাংশ সময় আল্লাহর
ইবাদতে নিয়োজিত এবং যারা নিজের প্রয়োজনের চেয়ে মুসলমান
ভাইদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দান করে তাদের মত নেক লোককে
মহাপবিত্র আল্লাহ, কঠিন অবস্থা ও ব্যর্থতার মধ্যেও খুশী ও আনন্দিত
রাখেন; ধ্বংস ও দুর্যোগের মধ্যেও চিন্তিত ও নিরাশ হতে দেন না।
যে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক সে আসমানী বরকত থেকে বঞ্চিত। তার
সুনিশ্চিত হওয়া দরকার যে তার ঈমান অসম্পূর্ণ এবং সে অনন্ত
সৌভাগ্যের অধিকারী নয়।
হে উপস্থিত জনতা। যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় নিজের মাল খরচ
করে বা নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে সে কোন অবস্থাতেই লোকসানের
মধ্যে থাকে না। সে প্রেমিকের স্থান হাসিল করে এবং তার মর্যাদা
উন্নীত হয়। কেননা আল্লাহর মহব্বতে নিজেকে বিলীন করে দেয়।
বা তাঁর কালেমা সমুন্নত করার জন্য নিজের প্রাণকে মৃত্যুর হাতে
সপে দেয়া সবচেয়ে উত্তম কাজ। এসব কিছ, কঠিন কাজ নয়।
দুনিয়াতে এমন লোক রয়েছে যারা প্রমাণ করেছে, মানুষ হিম্মত
করলে কি না করতে পারে! আত্মত্যাগ ও কোরবানী করার মধ্যে
অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট কষ্ট স্বীকার করতে হয়। কিন্তু এ কষ্টের মধ্যে
আরাম নিহিত। বিপদে পতিত হলে বা যে কোন রকম দুর্যোগের
সম্মুখীন হলে ঈমানদারদের ধৈর্য ধারণ করা উচিত। এটাও ত্যাগ।
অতীতের সকল উম্মতকেই পরীক্ষা করা হয়েছে। আল্লাহর কানুন
হল তিনি ঈমানদারদের বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেন। কখনও ভয়-
ভীতি, কখনও উপবাস, কখনও মালের লোকসান, কখনও বা প্রাণের
ক্ষতির দ্বারা পরীক্ষা করে থাকেন। যখন বান্দা এসব পরীক্ষায় পুরা-
পুরি উত্তীর্ণ হয় তখন তার মর্যাদা উন্নীত হয়। এট। সম্পূর্ণ সত্য
যে, পরীক্ষায় তারাই কৃতকার্য হয় যারা ত্যাগী এবং ব্যর্থ তারা হয় যারা
স্বার্থবাদী এবং আল্লাহ্ তাদের জন্য আযাব তৈরী করে রেখেছেন।
মুসাফিরদের সাহায্য করা, মিসকিন, এতিম ও অক্ষমদের সাহায্য কর।
এবং প্রয়োজনে প্রতিবেশীদের সাহায্য করাও ইসার (আত্মত্যাগ)
ও ইনফাকের (সৎকর্মে ব্যয়) অন্তর্গত।
হে মুসলমানগণ! আমি তোমাদেরকে হেদায়েত করছি যে, তোমর।
ত্যাগের মনোভাব ইখতিয়ার কর এবং স্বার্থপরতা থেকে নিজেদেরকে
মুক্ত রাখ। স্বার্থপরতা পূর্ববর্তী কওমদের বরবাদ করেছে। একথা
স্মরণ রাখ যে, ঈমান ও আত্মত্যাগ এ কওমের সর্বপ্রথম মংগল এবং
স্বার্থপরত। ও দয়াহীনতা সর্বপ্রথম অমংগল।
আস্সালাম, আলাইকুম।
📄 মদীনা মুনাওয়ারায়
আল্লাহর হাম্দ ও সানার পয়:
হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে হেদায়েত করছি যে নিজের
আমলকে ধোঁকা, প্রবঞ্চনা ও রিয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখ। মনে রেখো,
হক সুবহানাহুতা'আলা এমন আমল কবুল করে থাকেন যার মধ্যে
সততা নিহিত থাকে। যে কাজ ধোঁকা ও শঠতার দ্বারা কর। হয় তা
কবুল করা হয় না। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, হক সুবহানাহ
তা'আলা তোমাদের চেহারা ও বিষয়-সম্পত্তির দিকে নজর দেন না।
তিনি তোমাদের দিল এবং তোমাদের কাজ দেখে থাকেন। অতএব রিয়া
থেকে বাঁচো। যার। দিলের সতত। ও ইখলাসের সাথে কাজ করে তারা
সত্যবাদী ও খাঁটি। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে কিয়ামতের দিন নবী,
সিদ্দীক ও শহীদদের সাথে উঠাবেন। তারা কামীয়াব হবে, দুনিয়াতে
তাঁদের বেঁচে থাকাটা রহমতের কারণ হবে এবং তারা হবে হেদায়েতের
চেরাগ স্বরূপ। তাদের কারণে অনেক ফেৎনা দূর হয় এবং আল্লাহর
ফেরেশত। তাদের তাযিম ও তকরিম করে থাকেন।
হে উপস্থিত জনতা! তোমরা যদি আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসী
হও, তাহলে আমি তোমাদেরকে হেদায়েত করছি যে, রিয়ার দ্বারা
তোমাদের আমলকে বরবাদ করো না। তোমাদের শর্বশক্তি সহকারে
আল্লাহর হুযুরে আত্মসমর্পণ কর। মহাপবিত্র, দানশীল আল্লাহ,
তোমাদেরকে দুনিয়া এবং আখেরাত উভয় স্থানের মংগল দান করতে
সক্ষম। আমি তোমাদেরকে হংশিয়ার করছি যে, তোমাদের রব বলেন:
যার। নিজের ধন-সম্পত্তি অন্যকে দেখানোর জন্য ব্যয় করে এবং আল্লাহ
ও আখেরাতে বিশ্বাস করে না তাদের পরিণতি হল অবমাননা ও লাঞ্ছনা,
লজ্জা ও ব্যর্থতার শিকার হওয়া। সকল দিক থেকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সফলতা তাদের ভাগ্যে কখনও আসবে না। রিয়াকারী মুমিন নয়।
তাদের পরিচয়-যখন তাদেরকে প্রাণ দানের জন্য, জীবন ও তার
স্বাদ ত্যাগের জন্য আহহ্বান করা হয় তখন তারা আত্মগোপন করে এবং
সত্যের সমর্থন করে না। সত্য ও ইখলাসের প্রতি তারা ঘৃণা পোষণ-
কারী, তারা প্রতিটি মুহূর্ত শত্রুতা ও আল্লাহ-দ্রোহিতায় মগ্ন থাকে
এবং অপরকেও পাপের পরামর্শ' দেয়।
আমি স্পষ্টভাবে বলছি যে, হক সুবহানাহুতা'আলার সাথে কাকেও
অংশীদার করা শির্ক। ধোঁকা, প্রবঞ্চনা এবং রিয়ার সাথে ইবাদত করা
ছোট শিরক। যখন হক সুবহানাহুতা'আলা কিয়ামতের দিন কর্মে'র
প্রতিদান স্বরূপ পুরস্কার ও আযাব দান করবেন তখন যারা রিয়ার
সাথে ইবাদত করেছে তাদেরকে বলা হবেঃ যাদের দেখানোর জন্য
ইবাদত করতে, তাদের কাছ থেকে পুণ্য ও প্রতিদান লাভ কর।
অতঃপর আমল তার মুখের উপর নিক্ষেপ করা হবে। যার হাতে আমার
জীবন তার নামে কসম করছি, যারা রিয়াকারী তারা কখনও দুনিয়াতে
কামিয়াব হবে না এবং আখেরাতেও তাদের জন্য কোন অংশ থাকবে না।
যে খাঁটি সে আল্লাহর রহমতের নিকটবর্তী ও আল্লাহর মখলুকের কাছে
সম্মানিত এবং সে আখেরাতেও কামিয়াব হবে। এ সব পবিত্র সত্তার পরি-
চয় হল যে আল্লাহতা'আলার জন্য তারা অন্যসব সম্পর্ক' ছিন্ন করে এবং
নিজের সার্বিক শক্তি স্রষ্টার সন্তুষ্টির কাজে ব্যয় করে। প্রত্যেক মুহূর্ত
তারা তাদের পারোয়ারদিগারের আনুগত্য করার জন্য তৈরী থাকে।
তাদের যাবতীয় কাজ যথা-ক্ষুধার্ত'দের খাদ্যদান, গরীব-মিসকিনদের
সাহায্য করা এবং সংগ্রাম সাধনা করা প্রভৃতির বুনিয়াদ হল ইখলাস।
তারা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যে আল্লাহর অনুগত। যাবতীয় শক্তির দ্বারা
আল্লাহর বাণী সমুন্নত করা এবং তাঁর দিকে মানুষকে আহহ্বান করার
কাজে যাবতীয় শক্তি ব্যয় করা তাদের স্বভাব। হকের তবলীগ এবং
প্রচার তাদের লক্ষ্য। তার। তাদের রবের হুকুম বর্ণনাকারী এবং তাঁর
মহাপবিত্র আদেশাবলীর প্রচারকারী। তাদের দাওয়াত ও তবলীগ
দুনিয়ার সংশোধন ও কল্যাণের উৎস। সর্বাবস্থায় তারা সত্যের সাহায্য-
কারী। এপথে কষ্ট স্বীকার করতে হলেও তারা ভগ্নহৃদয় হয় না বরং
ধৈর্য ধারণ করে। কেননা তারা আল্লাহর দোস্ত ও তাঁর তাবেদার।
তারা তাদের নেক কাজের পরিবর্তে সাফল্য লাভ করবে এবং কখনও
ব্যর্থতার দুঃখ, পরাজয়ের গ্লানি এবং অকৃতকার্যতার লাঞ্ছনা স্পর্শ
করবে না, কখনও তাদের অবমাননা করা হবে না।
হে জনতা! আমি এ উম্মতের ঐ ধরনের লোক সম্পর্কে আশংকা
করি যার প্রকাশ্য বেশভূষা উত্তম হবে, মুখে হবে কুরআনের বাণী
এবং সে ধৈর্য, বিনয় রহম-করম, নিষ্কলংক-নিষ্পাপ, তাকওয়া ও
নির্লিপ্ততা, ভয়-ভীতি, সংকল্প ও দৃঢ়তা, ইবাদত ও সাধনার দাবীদার
হবে। কিন্তু তার আমল হবে তার দাওয়াতের বিপরীত। মনে রেখো,
এধরনের লোকই রিয়াকারী এবং আষাবের যোগ্য। তোমরা কি উপলব্ধি
করেছ যে, রিয়া কারীদের পরিণতি কি? মনে রেখো, যে ব্যক্তি মানুষের
কাছে প্রচার করার জন্য কোন আমল করবে আল্লাহ, তার আয়েব (দোষ-
এটি) মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেবেন, তাকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত
করবেন। যে রিয়াকারী সে শয়তানের অনুগত। গোমরাহী তার উপর
প্রভাব বিস্তার করেছে। সে আল্লাহকে ত্যাগ করে শয়তানকে নিজের
অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং এসব সত্ত্বেও সে এমন ধারণায়
লিপ্ত রয়েছে যে, 'আমি সৎপথে চলছি।' স্মরণ রাখ যে, যে অল্লাহকে
ত্যাগ করে শয়তানকে নিজের দোস্ত বানিয়েছে সে অবশ্যই গোমরাহীর
মধ্যে রয়েছে। কিয়ামতের দিন লাঞ্ছনা ও ব্যর্থতার দরুন তার চেহারা
এমন কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করবে যেন রাতের আঁধারের এক টুকরা তার উপর
নিক্ষেপ করা হয়েছে। অতএব হে মুসলমানগণ! যতদূর সম্ভব শঠতা,
ধোঁকা ও রিয়া থেকে বাঁচে।।
আসসালাম, আলাইকুম।