📄 দুর্গ আবি-তালিবে
মহান আল্লাহর তসবীহ ও পবিত্রতা ঘোষণা করার পর:
হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবের আনুগত্য কর এবং পারস্পরিক
ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাক। তা না হলে তোমরা সাহস হারিয়ে
ফেলবে এবং তোমাদের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে। তোমরা কি এ সত্য
অবগত নও যে, আল্লাহর যমীন যখন চতুদিক থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল,
বোত-পরস্তি যখন আল্লাহ-পরস্তির স্থান দখল করে নিয়েছিল তখন
মানবীয় নৈতিকতা মুছে গিয়েছিল, সর্বত্র ফেতনা-ফাসাদের তুফান
প্রবাহিত ছিল। তোমরা সেযুগ প্রত্যক্ষ করেছ। এখানের বাসিন্দারা শত
শত বছর হিংস্র প্রাণীর ন্যায় পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এই হানাহানি-
খুনাখুনীর জন্য দুনিয়ার কোথাও আরববাসীর সম্মান ছিল না।
প্রত্যেক কওম তাদেরকে নিকৃষ্ট ও লাঞ্ছিত মনে করত। যুদ্ধ-বিগ্রহ,
শত্রুতা-দুশমনি ও ঘৃণা বিদ্বেষ ছিল তাদের পরিচয়ের বৈশিষ্ট্য। নিজে-
দের এ দুর্ভাগ্য সম্পর্কে' তার। অজ্ঞ ছিল।
অতঃপর আল্লাহ, তোমাদের অবস্থার উপর রহম করেছেন। তোমাদের
অন্তরে মহব্বত সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর ফযলে তোমরা ভ্রাতৃত্ববন্ধনে
আবদ্ধ হয়েছ। অতএব তোমরা এ মেহেরবানীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা
প্রকাশ করো না। পরস্পর মিলেমিশে থাক এবং আল্লাহকে ভয়
কর, যাতে তোমরা লক্ষ্য হাসিল করতে সক্ষম হও।
হে মানুষ, নিঃসন্দেহে সকল মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই এবং
সকল মুসলমান এক ব্যক্তি-সদৃশ। তার শিরঃপীড়া উপস্থিত হলে সর্ব-
শরীর বেদনায় জর্জরিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এক মুসলমান অন্য
মুসলমানের জন্য এক বুনিষাদ স্বরূপ, যার এক অংশ অন্য অংশের
বোঝা বহনে সাহায্যকারী। আমি তোমাদের নসিহত করছি, প্রত্যেক
মুসলমান পরস্পর ভাই-তাই কেউ যেন কাউকে খুলুম না করে এবং
কাউকে যেন একাকী বন্ধুহীন বা সাহায্যহীন ছেড়ে না দেয়া হয়। যে
ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পুরণ করবে আল্লাহ, তার প্রয়োজন পূরণ
করে দেবেন। যে কোন মুসলমানের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ, কিয়ামতের
দিন তার কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি অন্যের ত্রুটি গোপন করবে,
কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার ত্রুটিও গোপন রাখবেন।
হে মানুষ, যথাসম্ভব ঐক্যবদ্ধভাবে জীবন যাপন কর। পরস্পর
ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাক। তোমাদের রব তোমাদেরকে
নিঃস্বার্থ কর্জে'র হুকুম দিচ্ছেন এবং ফেতনা-ফাসাদ ও খুনাখুনী
নিষিদ্ধ করেছেন। যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, তোমরা
মুসলমান না হওয়া পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর
নিজের জন্য তোমর। যা পছন্দ কর অপর ভাইয়ের জন্যও তাই-ই
পছন্দ না কর। পর্যন্ত তোমরা মুসলমান হতে পারবে না।
এবং হে মুসলমান, অবশ্যই মহাপবিত্র আল্লাহ, তোমাদের উপর
করণা করেছেন-তিনি তোমাদের অন্তরে ভালবাস। সৃষ্টি করে
দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে হিংসা-বিদ্বেষের অভিশাপ থেকে মুক্ত
করেছেন। এ নিয়ামতের সম্মান কর। তোমাদের কর্তব্য। এবং
পরস্পরের সুখে-দুঃখে অংশগ্রহণ কর। আমি ইতিপূর্বে বলেছি
যে, এক মুসলমান অন্য মুসলমানের জন্য বুনিয়াদ স্বরূপ। তার
অর্থ হল: এক মুসলমান অন্য মুসলমানের জন্য দেওয়ালের ইটের
মত একে অপরকে আঁকড়ে থাকে। যেরূপ দেয়ালের এক ইট অপর ইটকে
সংযুক্ত রাখে, সেরূপ পরস্পর ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য আমি তোমাদেরকে
হেদায়েত করছি। তোমরা যে অবস্থায়ই থাক না কেন একে অপরের
সাহায্য করবে। আমি তোমাদের হংশিয়ার করছি যে, তোমরা যদি
ঐক্যবদ্ধ থাক, একে অপরকে সাহায্য কর অর্থাৎ আশ্রয় দান কর
তাহ'লে তোমরা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত থাকবে। অন্যথায় তোমরা
স্তুপীকৃত ইটের ন্যায় হবে। কোন দৃঢ়তা থাকবে না এবং যে কেউ
তা উড়িয়ে দিতে পারবে। আর তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ রয়েছে
সে যেন অবশ্যই তার ভাইয়ের উপকার করে এবং আমি পুনরায়
তোমাদেরকে একথা বলছি যে, কোন লোক ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার
হতে পারবে না যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার
ভাই-এর জন্যও তাই পছন্দ করে। আমি এ উদ্দেশ্যে বলছি যে, প্রত্যেক
মুসলমান লাভ-লোকসানের কাজে যেন অপর মুসলমানকে তার
নিজের মত মনে করে এবং সে যা নিজের জন্য অপছন্দ করে তা যেন
তার ভাই-এর জন্যও অপছন্দ করে। যতদূর সম্ভব এক মুসলমান অপর
মুসলমান ভাইকে যেন নিজের সত্তার ন্যায় প্রিয় মনে করে নিজের
সত্তাকে যেরূপ প্রিয় মনে করে সেরূপ যেন তার ভাইকেও প্রিয় মনে করে
এবং নিজের সত্তার প্রতি যে আচরণ করে সেরূপ আচরণ যেন তার
ভাইয়ের প্রতিও করে। কথাবার্তায় মুনাফিকও নিজেকে মুসলমান
বলে থাকে। কিন্তু মুসলমান তো সেই ব্যক্তি যার জিহ্বা ও হাত থেকে
অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।
হে মানুষ! মুসলমানের প্রত্যেক জিনিস অপর মুসলমানের
জন্য হারাম। পরস্পরের রক্ত, ইজ্জত, আবর, সম্পদ-এর কোনটারই
ক্ষতি সাধন তোমরা করো না। মানুষের চারিত্রিক গুণাবলীর মধ্যে
এমন দুটি গুণ রয়েছে যার চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। এর
প্রথমটি হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি ঈমান আর দ্বিতীয়টি, মুসলমানের
উপকার সাধন। দোষাবলীর মধ্যেও এমন দুটি দোষ রয়েছে যার
চেয়ে নিকৃষ্টতম আর কিছুই নেই। প্রথমটি, আল্লাহর সাথে কাউকে
শরীক করা, দ্বিতীয়টি: কোন মুসলমানের ক্ষতি সাধন করা। কোন
অবস্থাতেই মুসলমান ভাই-এর উপর যুলুম করা অন্য মুসলমানের
জন্য বৈধ নয়। বিপদকালে মুসলমান ভাইকে সাধ্যমত সাহায্য করা
অবশ্য কর্তব্য।
আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ,
📄 দুর্গ আবি-তালিবে দ্বিতীয় ভাষণ
মহান আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করায় পর:
হে মুসলমান। তোমাদের রব ইরশাদ করেছেনঃ মানুষের পথ-
প্রদর্শনের জন্য যত উম্মত তৈরী করা হয়েছে তন্মধ্যে তোমরা সবচেয়ে
উত্তম-এজন্য যে তোমরা ভাল কাজের জন্য হুকুম কর এবং মন্দ কাজে
বাধা দান কর। আল্লাহ, তাঁর এ ফরমানের মধ্যে তবলিগকে তোমাদের
জাতীয় বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষ মর্যাদার আসন দান করেছেন। আল্লাহ,
মুসলমানদেরকে সবচেয়ে 'উত্তম' এজন্য বলেন যে, তারা সত্যের প্রচার
ও প্রকাশ করে বাতিলকে মিটিয়ে দেয়, মঙ্গলজনক কাজের প্রতি আহবান
জানায় এবং মন্দ কাজে বাধা দান করে।
হে মুসলমান! তোমরা জান, আল্লাহ, সুবহানাহুতা'আলা আনুগত্য
এবং ইবাদত-বন্দেগীতে খুশী হন। কুফর, ও গোমরাহী এবং
অপরাধ ও বির-দ্ধাচরণে তিনি অসন্তুষ্ট হন। তাই তোমাদেরও
আনুগত্য ও ইবাদতে খুশী এবং অপরাধ ও বির-দ্ধাচরণে অসন্তুষ্ট
হওয়া উচিত। অর্থাৎ সৎ কাজ করা ও সৎ চরিত্র অর্জন করা উচিত এবং
গর্হিত কাজ ও অসৎ স্বভাব বর্জন করা উচিত। তোমাদের সমাজের
লোককে ভাল কাজের প্রতি আহবান করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত
রাখা তোমাদের সর্বপ্রধান কর্তব্য। আমি জানি, তোমরা আল্লাহর
সন্তুষ্টির প্রত্যাশী ও তাঁর প্রতি অনুরক্ত, তাই তোমাদেরকে বলছি-
মহব্বতের প্রথম শর্ত হিসেবে সর্বাবস্থায় মাহবুবের সন্তুষ্টি বিধান
কর এবং নিজেদের সকল ইচ্ছা-আকাংখা ছেড়ে দিয়ে একমাত্র আল্লাহর
সন্তুষ্টির অধীন হও। অর্থাৎ যে সব হুকুম-আহকাম আল্লাহ, পছন্দ
করেন তা পালন কর এবং যা অপছন্দ করেন তা থেকে বিরত থাক।
অন্যদেরকেও এই পথে আহ্বান কর। তোমরা কি জানো না যে
তোমাদের রব বলেন, 'সত্য ও ন্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতা কর এবং
কুফর ও অবাধ্যতা মিটিয়ে দাও।' সকল সৎ কাজ নতশিরে মেনে
নেয়। এবং প্রত্যেক মন্দ মিটিয়ে দেয়া তোমাদের প্রত্যেকের অবশ্য
কর্তব্য। তা না করতে পারলে নিদেনপক্ষে মন্দ কাজ ও মন্দ কাজ
যারা করে তাদের প্রতি মনে মনে ঘৃণা পোষণ কর। যথাসম্ভব সমাজের
অন্য মানুষকেও সৎ কাজের দিকে আকৃষ্ট করবে এবং মন্দ কাজ থেকে
বিরত রাখবে। এটাই জীবনের লক্ষ্য।
যাঁর হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ করে বলছি-'ইসলামের
প্রচার-প্রসার এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান' পরস্পর অবিচ্ছেদ্য জিনিস।
আল্লাহ, ও আখেরাতের প্রতি যার বিশ্বাস রয়েছে তার পক্ষে সত্য প্রচার
না কর। এবং কুফুর ও গোমরাহীর প্রতি বাধা না দেয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব।
দুনিয়াতে যখন সত্য কলেমার (ইসলাম) অবমাননা করা হয় তখন
আল্লাহর পুজারীর। অস্থির ও অশান্ত হয়ে ওঠে। তাদের পদক্ষেপ
হয় সত্যের সাহায্য এবং প্রত্যেক প্রচেষ্টা নিয়োজিত হয় সত্যকে প্রতি-
ষ্ঠিত করার জন্য। কুফর, ও পাপের চেহারা ক্ষতবিক্ষত না হওয়া
পর্যন্ত তারা শংকাহীনভাবে বসতে পারে না। যখন জলে-স্থলে
বিদ্রোহ ও পাপের ফাসাদ প্রসারিত হয় তখন আল্লাহর মহব্বতকারী-
দের শান্তি বিনষ্ট হয়, চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। তারা
দুনিয়ার যাবতীয় আরাম-আয়েশ অবহেলায় ত্যাগ করে ময়দানে
অবতীর্ণ হয় এবং মরণপণ করে অবিচল সত্য ও ন্যায়ের ঘোষণা করে।
হে মুসলমান, স্মরণ রাখ, যদি ইসলাম প্রচারের জিম্মাদারী পরিত্যাগ
কর তাহলে উত্তম উন্নত হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে এবং হক
সুবহানাহুতা'আলা প্রদত্ত মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। তখন
আল্লাহ, তোমাদের উপর যালিমদের কর্তৃত্ব দিয়ে দেবেন এবং তারা
তোমাদের উপর ফুযুলুম করবে। যদিও তখন তোমাদের উত্তম ব্যক্তিগণ
দোয়া করবে কিন্তু তাদের দোয়া কবুল হবে না।
অতএব তোমরা এ কর্তব্য থেকে গাফিল হয়ো না; কেননা তা'
তোমাদের ধ্বংসের কারণ হবে। আমি অবলোকন করছি, কোন কোন
লোক দুনিয়ার আরাম-আয়েশের সন্ধানে লিপ্ত এবং সত্য প্রচারে গাফিল।
তাদের অবস্থার জন্য আফসোস! আল্লাহর সাথে সম্পর্কহীন জীবন
ক্ষণস্থায়ী আশা-আকাংখা চরিতার্থ করার খেল। ব্যতীত আর কিছুই
নয়। আখেরাতের জিন্দেগী হচ্ছে চিরস্থায়ী জীবন। তোমাদের
প্রতিপালক তোমাদের কর্ম সম্পর্কে অজ্ঞাত নন। তোমরা যা করছ
তার প্রত্যেকটি সম্পর্কে' তিনি সম্পূর্ণ ওয়াকেফহাল। যে তাঁর হুকুম-
আহকামের উপর ঈমান আনে এবং সৎ কাজ করে সে পারিশ্রমিক ও
পুণ্য লাভের যোগ্য। রহম-করমশীল আল্লাহ, দয়াপরবশ হয়ে তাঁর
বান্দাকে প্রাপ্যের অধিক প্রতিদান দেবেন।
হে মুসলমান! আমি তোমাদেরকে সাবধান করছি, কোন কওমের
কোন ব্যক্তি যদি গুনাহ করে এবং কওমের বাধা দান করার শক্তি
থাকা সত্ত্বেও তাকে বাধা না দেয় তা হ'লে এ কারণে মৃত্যুর পূর্বেই
তাদের উপর আল্লাহর গজব নাযিল হবে। আমি তোমাদেরকে
হেদায়েত করছি, তোমাদের যে কেউ কুফর ও আল্লাহ-দ্রোহিতা হতে
দেখবে সে যেন শক্তি দিয়েও তা সংশোধন করে, শক্তি প্রয়োগে সক্ষম
না হ'লে মুখ দিয়ে তার প্রতিবাদ করবে এবং তাতেও সমর্থ না হলে
অন্তর থেকে তা ঘৃণা করবে এবং এটা হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতম
পর্যায়।
হে মুসলমান, তোমরা হক ও সাদাকাতের (সত্য ও ন্যায়পরায়ণতা)
আহবানকারী। তোমাদের কর্তব্য হচ্ছেঃ তোমরা নিজে ভাল কাজ
করবে এবং সমাজের লোকদেরকে সৎ কাজ ও সৎ চরিত্রের দিকে উৎসা-
হিত করবে। উৎসাহ ও উদ্দীপনা সহকারে ইসলামের খিদমত কর।
কেননা এটা হচ্ছে তোমাদের কর্ম-জীবনের সবচেয়ে উত্তম অধ্যায়। আর
এটা এমন এক সম্মান যা অন্য কোন কওমের ভাগ্যে জোটেনি।
আস্সালাম, আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহে ওয়াবারাকাতুহ,
📄 কাবা প্রাঙ্গণে
আল্লাহ তা'আলার তসবিহ ও পবিত্রতা বর্ণনা করার পর:
হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে রহম ও করমের নসিহত করছি এবং
উত্তম কথা দিয়ে শুর করছি। আমি যা বলছি তা মনোযোগ সহকারে
শোন। আমার রব বলেন, 'আমি রহম ও করম পছন্দ করি। যে বেরহম
সে আমার রহমত থেকে বঞ্চিত।' আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত
হওয়া কত বড় বিপদ তা কি তোমরা উপলব্ধি করেছ? হে আল্লাহর
বান্দাগণ, আমি তোমাদেরকে সতর্ক' করছি, আল্লাহ, তার উপর রহম
করেন না যে অন্যের উপর রহম করে না। অর্থাৎ তোমরা যদি আল্লাহর
মখলুকের উপর দয়া না কর তাহলে আল্লাহও তোমাদের উপর
রহম করবেন না, যাঁর রহম-করমের তোমরা সব সময় মুখাপেক্ষী। তাই
তোমাদের কর্তব্য হল অন্যের উপর রহম করা যাতে তোমাদের উপরও
রহম করা হয়। আমি এক বে-রহম ব্যক্তিকে দেখেছি। আমি একবার
ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে সিরিয়ার পথে ছিলাম। এক যালিমকে গরীবদের
উপর যুলুম করতে দেখে ব্যথিত হয়েছি। সে তাদেরকে রোদের
মধ্যে দাঁড় করিয়ে তাদের মাথায় তেল ঢালছিল। আমি এর কারণ
জানতে চাইলে লোকেরা বললঃ খেরাজ উসুল করার জন্য এ যুলুম
করা হচ্ছে। এ দৃশ্যে আমি ব্যথিত হয়েছি। যে মহামহিম আল্লাহর
হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ করে বললামঃ রহমশীল ছাড়া কেউ
জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে,
হকতা'আল। তাদেরকে আযাব দেবেন, যারা দুনিয়াতে মানুষকে কষ্ট
দেয়। আমার রবের ফরমানঃ তোমরা যদি আমার রহমের প্রত্যাশী
হও, তাহলে তোমর। আমার মখলুকের উপর রহমশীল হও।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! মনে রাখ, মানুষের কল্যাণ সাধন রহম-
করমের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বেরহম ও কঠিন হৃদয় ব্যক্তি কারও
উপকার করতে পারবে না। তার থেকেই মঙ্গল পৌঁছতে পারে
যার দিলের মধ্যে রহম রয়েছে। অন্য কথায়, দয়াশীলতার উৎকৃষ্ট
প্রকাশ মানুষের কল্যাণ সাধন। অতঃপর উদাহরণ স্বরূপ কিছু, কথা
বলছি, এক বিকলাংগ রোগীর প্রতি রহম করার অর্থ' হচ্ছে তার চিকিৎসা
ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা। এটার নাম রহম। বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে
বিপদ থেকে উদ্ধার করাও রহম। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূর
করাও রহম। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সেই দূর করবে যার দিলের
মধ্যে রহম রয়েছে। বেরহম ও যালিম ব্যক্তি এটা করতে পারে না।
অতএব, তোমরা যালিমের অনুসরণ করো না। বরং রহম-দিল হও।
হে মানুষ! যে বিধবা এবং মিসকীনের সাহায্যের জন্য কোশেশ
করে এবং তাদের প্রতি রহম করে সে আল্লাহর রাস্তায় যিহাদকারী ও
রাত জেগে সালাত আদায়কারীর সমতুল্য।
আমি তোমাদেরকে এতিমের প্রতি রহম করার হেদায়েত করছি।
তোমাদের অধীনস্থদের সাথে এরূপ ব্যবহার কর যেরূপ তোমরা
তোমার সন্তানদের সাথে করে থাক। জেনে রাখ, যে ব্যক্তি শুধু, মাত্র
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এতিমের মাথায় হাত বুলাবে তার প্রতিটি চুলের
হিসেবে তাকে কল্যাণ দান করা হবে। যে ঘরের মধ্যে এতিমের সম্মান
করা হয় সে ঘর হচ্ছে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
হে মানুষ, বাকহীন পশুর সাথেও রহম কর। যখন তোমরা এদের-
কে সফরে নিয়ে যাও তখন তাদের উপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দিও
না। তাদের সাথে ইনসাফ কর এবং ইনসাফ করার অর্থ হচ্ছে, যে পরি
মাণ বোঝ। তারা বহন করতে পারবে তার চেয়ে বেশী চাপিয়ে তাদেরকে
কষ্ট দিও না। এক মনযিলের পরিবর্তে দু' মনখিল চলতে বাধ্য
করো না। তাদের দানা-পানির প্রতি খেয়াল রেখো। এমন কোন স্থানে
তাদেরকে রেখো না যেখানে ঘাস, পানি ইত্যাদি নেই। পিপাসার্ত' হলে
তাদেরকে পানি দিও। প্রত্যেক পিপাসার্ত প্রাণীকে পানি পান করানো
পুণ্যের কাজ। যেখানেই হোক, ছায়া দানকারী গাছ কাটবে না। কেনন।
তা সৃষ্ট জীবের উপকার সাধন করে। আমি মনে করি না যে, পুকুর
ও নদীতে কারও মালিকানা রয়েছে। যে কোন ব্যক্তি তা থেকে ফায়দা
হাসিল করতে পারে এবং এ ব্যাপারে কেউ কাউকে বাধা দিতে পারে
না। আমি তোমাদের বলছি: কোন প্রাণীকে আগুনে পোড়াবে না।
কাউকে নির্দয়ভাবে প্রহার করবে না। কারও হাত, পা, নাক, কান
কাটবে না। অন্যের জন্তু-জানোয়ার যেসব ময়দানে বিচরণ করে, সে সব
বরবাদ করা কোনভাবেই জায়েজ নয়। যে পুকুর বা কুয়ার পানি থেকে
মানুষ উপকৃত হয় তা বন্ধ করে দেয়। কোনরূপ বৈধ নয়। যে সব কয়েদী
তোমাদের অধীন তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করো না। তারা তোমা-
দের ভাই। তোমরা যা খাও তা তাদেরকে খেতে দাও; যা তোমরা পরিধান
কর তা তাদেরকেও পরতে দাও। যখন তোমরা বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধ
কর তখন তাদের সন্তানদের উপর রহম কর। বিকলাংগ এবং অক্ষম
মানুষকে সম্মান করবে এবং স্ত্রীলোকের উপর হাত উঠাবে না, তাদের
ইজ্জতের হেফাজত করবে। দুনিয়ার সব লোক আল্লাহর মখলুক।
আল্লাহর মখলুকের সাথে যে ভাল ব্যবহার করে সে আল্লাহর প্রিয়।
সেই ব্যক্তি উত্তম যার দ্বারা লোকের উপকার হয় এবং সেই ব্যক্তি অধম
যার দ্বার। লোকের উপকার সাধিত হয় না। আমি পুনরায় তোমাদেরকে
বলছিঃ তোমরা যদি আল্লাহর সৃষ্ট জীবের উপর রহম না কর
আল্লাহও তোমাদের উপর রহম করবেন না। অথচ প্রতিটি মুহূর্ত
তোমরা আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষী। আমি তোমাদেরকে আল্লাহর
পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি। যারা উপস্থিত রয়েছে তারা যেন অনু-
পস্থিতদের কাছে এ পয়গম পৌঁছে দেয়।
আস্সালামুআলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহে ও বারাকাতুহ,
📄 কাবা প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় ভাষণ
আমি মহাপবিত্র আল্লাহর প্রশংসা করছি। তাঁর মাগফেরাত চাই।
মাবুদ বরহক যাকে হেদায়েতের শক্তি দান করেন তাকে কেউ গোমরাহ
করতে পারে না; যাকে তিনি বিপথগামী করেন তাকে কেউ সঠিক পথে
নিয়ে আসতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মহাপবিত্র আল্লাহ, এক ও
অদ্বিতীয়, তাঁর কেউ শরিক নেই। আমি তাঁর বান্দা ও রসুল।
অতঃপর হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে হেদায়েত করছি, দাসদের
সাথে ভাল ব্যবহার কর। তাদেরকে কষ্ট দিও না। তোমরা কি অবগত
নও যে, তাদের কাছেও এমন এক দিল রয়েছে, যা কষ্ট পেলে ব্যথিত
হয় এবং আরামে খুশী হয়? তোমাদের কি হল যে, তোমরা তাদের
দিলের সন্তুষ্টি বিধান কর না? আমি লক্ষ্য করছি, তোমরা তাদেরকে হীন
মনে কর এবং তাদের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর না। এটা
কি? এটা কি যাহেলিয়াতের অহংকার নয়? নিঃসন্দেহে এটা যুলুম
ও বে-ইনসাফি। আমি জানি, যাহেলিয়াতের যুগে তাদের কোন মর্যাদা
ছিল না। পশুর চেয়েও তাদেরকে অধম মনে করা হতো। সর্বত্র
আমীর এবং গোত্র-সরদাররা সম্মান ও কর্তৃত্বের মালিক সেজে বসেছিল।
আল্লাহর বান্দারা এ কথা ভুলে গিয়েছিল যে মানুষ হিসেবে সবাই
সমান এবং খেদমতকারীরাও ইনসাফের অধিকারী। সেটা ছিল এমন
এক যুগ যখন আমীর-ওমরাহ, এবং শাসকবর্গ' তাদেরকে মানবীয়
শুরের ঊর্ধে মনে করতো। নিজেদেরকে নিংপাপ ঘোষণা করতো।
তাদের দৃষ্টিতে খাদিমদের জিন্দেগীর উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র মনিব-
দের খেদমত করা এবং তাদের যুলুম বরদাশত করা। মনিবদের
সাথে গোলামদের বসা নিষিদ্ধ ছিল। তাদের সামনে গোলামদের কথা
বলা পাপ ছিল। মনিবদের কোন কাজের সামান্যতম বির-দ্ধাচরণ
হত্যার যোগ্য অপরাধ ছিল। ইসলাম এ ধরনের রসুম-রেওয়াজের
অবসান ঘটিয়েছে এবং যাহেলী অহংকারকে ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছে।
হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে অবহিত করছি যে, তোমাদের
রবের ফরমান হচ্ছেঃ তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে আল্লাহ-ভীর, আল্লাহর
কাছে সে সবচেয়ে বেশী সম্মানের পাত্র। তোমরা জান যে, সকল
মানুষই আদমের সন্তান এবং আদম মাটির তৈরী। তাহলে অহংকারের
হেতু কি? মনে রাখবে, ইসলামের দৃষ্টিতে মানবতার উর্ধে কোন
মর্যাদা নেই এবং মনিব-গোলাম, উচ্চ-নীচ, আমীর-ফকীর সবাই সমান।
ইসলামের দৃষ্টিতে যে জিনিস বৈশিষ্ট্যের দাবী করতে পারে তা হচ্ছে
তাকওয়া ও সৎকর্ম'। এটাই যখন বাস্তব তখন কেন তোমরা তোমাদের
খাদিমদের নীচ মনে কর? আমি লক্ষ্য করেছি যে, মনিবের সাথে
কোন গোলাম কথা বলতে চাইলে রাগে মনিবের চেহারা হিংস্র প্রাণীর
ন্যায় রক্তলোলুপ হয়ে যায় এবং সে কোনভাবেই তার ক্রোধ দমন
করতে পারে না। এটা যাহেলিয়াত ছাড়া আর কি হতে পারে? এমন
হতে পারে, গোলাম তার মনিবের চেয়ে উত্তম এবং তার আমলও
আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য।
হে মানুষ। যখন হুকুমত ছিল যিহালতের এবং নফসের পুজা তার
চূড়ান্ত প্রভাব বিস্তার করেছিল মানুষের উপর তখন যে কি মর্মান্তিক
দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছিল তা মানবতার দৃষ্টি কখনও ভুলতে পারে না।
আমি সে যুগও দেখেছি, যখন গোলামদের সাথে বর্বর আচরণ ও
যুলুম করা হতে। এবং তাদেরকে জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট মনে কর।
হতো। মহাপবিত্র আল্লাহ, তাদের উপর রহম করেছেন, তাদের
অধিকার প্রকাশ করে দিয়েছেন এবং তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করার
হেদায়েত করেছেন। আমি আমার রবের ফরমান মুতাবেক বলছি যে,
তোমর। তাদেরকে নিজেদের ভাই মনে কর। তাদের কাছ থেকে
এতটুকু কাজ আদায় কর যতটুকু তারা সহজে করতে পারে। তোমরা যা
খাও তাদেরকে তা খেতে দাও। যা তোমরা পরে। তাই তাদেরকে পরতে
দাও। তাদের সাথে এরূপ ব্যবহার কর যেরূপ তোমরা আপন জনের
প্রতি করে থাক, তাদের জন্য তা' পছন্দ কর যা তোমরা নিজেদের
জন্য কর। তাদের জন্য তা অপছন্দ কর, যা তোমরা নিজেদের জন্য
অপছন্দ কর। তাদেরকে নীচ ও তুচ্ছ মনে করো না। তোমরা যখন
সফরে যাও আর তারাও তোমাদের সংগে থাকে তখন তাদের আরামের
প্রতিও খেয়াল রেখো। তোমাদের সাথে সোয়ারী থাকলে কিছুক্ষণ
তোমরা আরোহণ কর এবং কিছুক্ষণ তাদেরকেও আরোহণের অনুমতি
দিও। মানুষ হিসেবে তারা কোন অংশেই তোমাদের চেয়ে ছোট নয়।
যেরূপ হৃদয় তোমাদের রয়েছে সেরূপ তাদেরও রয়েছে। তোমরা কি
লক্ষ্য করনি যে আমি যায়েদকে আযাদ করে আমার ফুফাত বোনের
সাথে তার বিয়ে দিয়েছি এবং বেলালকে মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করেছি
এজন্য যে তার। আমার ভাই। তোমরা দেখেছ যে, আনাস, আমার কাছে
থাকে, তাকে আমি ছোট মনে করি না। কোন কাজ না করলেও আমি
তাকে বলি না যে কেন তুমি তা করনি। ঘটনাক্রমে তার দ্বারা কোন
ক্ষতি হয়ে গেলেও আমি তাকে কোন শাসন করি না। আমি তোমা-
দেরকে নসিহত করছি যে, তোমাদের কোন খাদিম যখন খাবার নিয়ে
আসে তখন তাকেও তোমাদের সঙ্গে বসানো উচিত। তারা যদি একসঙ্গে
বসতে পছন্দ না করে তাহলে তাদেরকে কিছ, খাবার দিয়ে দেয়া উচিত।
তোমাদের কোন গোলাম অপরাধ করে থাকলে সত্তর বার তাকে মাফ
করবে। এজন্য যে, তুমি যাঁর গোলাম তিনি তোমার অপরাধ হাজার
বার মাফ করে দেন। মনে রেখো, কোন লোক তার গোলামের প্রতি
অন্যায় অপবাদ আরোপ করলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ, তাকে কঠিন
শাস্তি দেবেন। আমি পুনরায় তোমাদেরকে বলছি, তোমাদের খাদিম
তোমাদের ভাই, তারা বাধ্য হয়ে তোমাদের অধীন হয়েছে। তাই যার
ভাই তার নিজের অধীন তার উচিত, সে নিজে যা খায় তাই তাকে
খেতে দেয়, নিজে যা পরে তা তাকে পরতে দেয় এবং সাধ্যের বাইরে
তার কাছ থেকে কোন কাজ আদায় না করে।
আসসালাম, আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।