📄 মহান আল্লাহর চক্ষু
মহান আল্লাহর চোখের কথাও আহলে সুন্নাহ অল-জামাআহ কোন রকম-ধরন বর্ণনা ছাড়াই বিশ্বাস করে। তাঁর চোখ যেমন তাঁর জন্য শোভনীয়, তার কোন উদাহরণ নেই। কোন সৃষ্টির চোখের মত তা নয়। তিনি গুপ্ত-প্রকাশ্য সবকিছু দেখেন। চোখের ব্যাখ্যা 'জ্ঞান' বা 'তত্ত্বাবধান' করা বৈধ নয়। আর এ কথাও বলা বৈধ নয় যে, তিনি চোখ ছাড়া দেখেন। যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহতে তাঁর চোখের কথা বর্ণিত হয়েছে।
মহান আল্লাহ মুসা -কে সম্বোধন ক'রে বলেছিলেন, আমি আমার নিকট হতে তোমার উপর ভালবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও। তিনি নূহ -কে বলেছিলেন, তুমি আমার চোখের সামনে ও আমার অহী (প্রত্যাদেশ) অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ কর, আর যালেমদের ব্যাপারে আমাকে কিছু বলো না। নিশ্চয়ই তাদেরকে ডুবানো হবে। তিনি নূহ সম্বন্ধেই বলেছিলেন, তখন নূহকে আরোহণ করালাম কাঠ ও পেরেক দ্বারা নির্মিত এক নৌযানে। যা চলল আমার চোখের সামনে, এ ছিল অবিশ্বাসীদের প্রতিফল।
তিনি নবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে বলেছিলেন, তুমি ধৈর্যধারণ কর তোমার প্রতিপালকের নির্দেশের অপেক্ষায়; তুমি আমার চোখের সামনেই রয়েছ। আর তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর যখন তুমি শয্যা ত্যাগ কর।
একটি দুর্বল বর্ণনায় 'আইন' (চোখ) দ্বিবচন শব্দে বর্ণিত হয়েছে।
📄 মহান আল্লাহর শ্রবণশক্তি
মহান আল্লাহর এক নাম 'আস্-সামী'। তিনি সর্বশ্রোতা। সব রকমের শব্দ তিনি শ্রবণ ক'রে থাকেন। মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, সেই আল্লাহর সকল প্রশংসা, যাঁর শ্রবণশক্তি সকল শব্দতে পরিব্যাপ্ত। একটি মহিলা রসূল-এর সাথে কথা বলছিল, আর আমি ঘরের এক কোণে ছিলাম। সে কি বলছিল আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না। (কিন্তু মহান আল্লাহ সাত আসমানের উপর থেকে তার কথা শুনে নিয়ে কুরআন অবতীর্ণ করলেন। "অবশ্যই আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে...।”
السمع শব্দটি শ্রবণশক্তি ও কান অর্থে ব্যবহার হয়। ওদিকে কান অর্থের জন্য আরবীতে শব্দ রয়েছে الأذن। মহান আল্লাহর জন্য এ শব্দ (আমাদের জানা মতে) কুরআন-হাদীসে কোথাও ব্যবহার হয়নি। মা আয়েশার ভাষায় ব্যবহার হয়েছে السمع শব্দ। এই জন্য মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে 'কান' শব্দ ব্যবহার না করাটাই সঙ্গত মনে হয়।
📄 মহান আল্লাহ কোথায় আছেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকে বলেন, 'তিনি কোথায় আছেন কেউ জানে না।' ইমাম আবু হানীফাহ বলেন, যে ব্যক্তি বলে যে, 'জানি না আমার প্রতিপালক আকাশে আছেন নাকি পৃথিবীতে' সে অবশ্যই কাফের হয়ে যায়। যেহেতু আল্লাহ বলেন, "দয়াময় আরশে আরোহণ করলেন।" আর তাঁর আরশ সপ্তাকাশের উপরে। আবার সে যদি বলে, 'তিনি আরশের উপরেই আছেন', কিন্তু বলে, 'জানি না যে, আরশ আকাশে আছে নাকি পৃথিবীতে'---তাহলেও সে কাফের। কারণ সে একথা অস্বীকার করে যে, তিনি আকাশে আছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁর আকাশে থাকার কথা অস্বীকার করে, সে অবশ্যই কাফের হয়ে যায়। যেহেতু আল্লাহ সকল সৃষ্টির উর্ধ্বে আছেন এবং উপর দিকে মুখ ক'রেই তাঁকে ডাকা হয় (দুআ করা হয়), নিচের দিকে মুখ ক'রে নয়।
কেউ বলেন, 'আল্লাহ সব জায়গায় আছেন।' মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, তুমি কি অনুধাবন কর না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, আল্লাহ তা জানেন। তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসাবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যে ষষ্ঠজন হিসাবে তিনি থাকেন না; তারা এ অপেক্ষা কম হোক বা বেশী হোক এবং যেখানেই থাকুক না কেন, আল্লাহ তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন জানিয়ে দেবেন তারা যা করে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।
ডক্টর ওসমান গনী সাহেব বলেন, 'আল্লাহ যে অন্তর্যামী, অণু-পরমাণুতে অবস্থানরত, কোরআনের এই আয়াতটিও তার প্রমাণ করে। অচিন্তনীয় এই বিশ্বে তাঁর অবস্থানও অতি অচিন্তনীয়। অনেকে বলেন, 'আল্লাহ থাকেন মু'মিনের অন্তরে।'
অথচ সঠিক বিশ্বাস হল এই যে, মহান আল্লাহ আছেন উপরে, সকল সৃষ্টির উপরে, সাত আসমানের উপরে, আরশের উপরে। তাঁর জ্ঞান ও দৃষ্টি সর্বময়, সর্বব্যাপী, সর্ববিস্তৃত। তাঁর যিক্র থাকে মু'মিনের অন্তরে। আরশে থেকে তিনি তাঁর জ্ঞান ও সাহায্য দ্বারা বান্দার সাথে থাকেন।
যে আয়াতে মহান আল্লাহর বান্দার সাথে থাকার কথা বলা হয়েছে সেই আয়াতেই তাঁর আরশে থাকার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, তিনিই ছয় দিনে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু তা হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা কিছু নামে ও আকাশে যা কিছু উত্থিত হয়। তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন। তিনি যে উপরে আছেন তার প্রমাণ নিম্নরূপঃ-
১। আল্লাহ তাআলা বলেন, তাঁর প্রতিই সৎবাক্য আরোহণ করে এবং সৎকর্মকে তিনি উত্থিত করেন।
২। তিনি আরো বলেন, যিনি সোপান-শ্রেণীর মালিক। ফিরিস্তা এবং রূহ তাঁর প্রতি ঊর্ধ্বগামী হবে।
৩। মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা কি নিশ্চিত আছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে সহ ভূমিকে ধসিয়ে দেবেন না?
৪। তিনি অন্যত্র বলেন, তুমি তোমার সুউচ্চ প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা কর।
৫। বুখারী কিতাবুত তাওহীদে আবুল আলিয়াহ ও মুজাহিদ হতে (নিম্নোক্ত) আয়াতের ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন: "অতঃপর তিনি আকাশের প্রতি আরোহণ করেন" 'অর্থাৎ ঊর্ধ্বে হন এবং উপরে উঠেন।'
৬। আল্লাহ তাআলা বলেন, দয়াময় আরশে আরোহণ করলেন। এর অর্থও (তিনি আরশের) উর্ধ্বে আছেন এবং (তার উপরে) উঠেছেন; আর এইভাবে কুরআনের সাত জায়গায় বলা হয়েছে, তিনি আরশে আছেন।
৭। বিদায়ী হজ্জে আরাফার দিনে আল্লাহর রসুল তাঁর ভাষণে বলেন, "শুনো! আমি কি পৌঁছে দিলাম?” সকলে বলল, 'হ্যাঁ।' (অতঃপর) তিনি আকাশের দিকে অঙ্গুলী উত্তোলন ক'রে এবং সকলের প্রতি তা নত ক'রে বলেন, "হে আল্লাহ সাক্ষী থাকুন।”
৮। প্রিয় নবী আরো বলেন, "আল্লাহ সৃষ্টি সৃজন করার পূর্বে (নিজের হাতে) একটি কিতাব লিখেছেন। (যাতে আছে) 'আমার ক্রোধ অপেক্ষা আমার করুণা অগ্রগামী।' সুতরাং তা তাঁর নিকট আরশের উপর রয়েছে।”
৯। "তোমরা আমাকে বিশ্বাস কর না কি? অথচ আমি তাঁর নিকট বিশ্বস্ত যিনি আকাশে আছেন। আমার নিকট সকাল ও সন্ধ্যায় আকাশের খবর আসে।”
১০। "পৃথিবীতে যে আছে, তার প্রতি দয়া কর, তাহলে যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।”
১১। মুআবিয়া বিন হাকাম বলেন, একদা আমি আল্লাহর রসুল-এর নিকট ক্রীতদাসীর ব্যাপারে জানালে তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, "আল্লাহ কোথায়?” সে বলল, 'আকাশে।' তিনি আবার বললেন, "আমি কে?” সে বলল, 'আল্লাহর রসুল।' তিনি বললেন, "তুমি ওকে স্বাধীন ক'রে দাও, ও একজন মু'মিন নারী।”
১২। ইমাম আওযায়ী বলেন, 'বহু সংখ্যক তাবেঈন বর্তমান থাকা কালীন সময়েও আমরা বলতাম, "আল্লাহ জাল্লা যিকরুহ আরশের উপরে আছেন।"
১৩। ইমাম শাফেয়ী বলেন, 'আল্লাহ তাআলা আকাশে আরশের উপর আছেন। যেভাবে ইচ্ছা তিনি সৃষ্টির নিকটবর্তী হন এবং আল্লাহ যেভাবে চান পৃথিবীর আকাশের প্রতি অবতরণ করেন।'
মহান আল্লাহ আরশে আরূঢ় আছেন। তবে এ প্রশ্ন তোলা বৈধ নয় যে, তা কিভাবে? যেহেতু আমরা মহান আল্লাহর সত্তা ও আরশের স্বরূপ জানি না। 'আল্লাহ কিভাবে আরশে সমারূঢ়?'--এ বিষয়ে ইমাম মালেক (রঃ) জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেছিলেন, 'আরোহণ করা বিদিত, এর কেমনত্ব অবিদিত, এর প্রতি ঈমান (বিশ্বাস) রাখা ওয়াজেব এবং এর কেমনত্ব প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলা বিদআত।'
📄 মহান আল্লাহর আরশ-কুরসী
আরশ হল রাজার সিংহাসন। শরীয়তে আরশ বলা হয় সেই মহাসনকে, যার উপর মহান আল্লাহ সমারূঢ় আছেন। এই আরশ হল মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। মহানবী ﷺ বলেন, "কুরসীর তুলনায় সাত আসমান হল ময়দানে পড়ে থাকা একটি বালার মত। আর আরশের তুলনায় কুরসী হল ঐরূপ বালার মত!” ইবনে আব্বাস বলেন, 'কুরসী হল মহান আল্লাহর পা রাখার জায়গা।'
মহান আল্লাহ সেই কুরসীর বিশালতা সম্বন্ধে বলেন, তাঁর কুরসী আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী পরিব্যাপ্ত। আর সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি সুউচ্চ, মহামহিম।
মহান আল্লাহর আরশের নিচে আছে সর্বোচ্চ জান্নাত ফিরদাউস। মহানবী ﷺ বলেন, "অবশ্যই জান্নাতে একশ'টি দর্জা (মর্যাদা) রয়েছে, যা আল্লাহ তাঁর পথে জিহাদকারীদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন; সুতরাং তোমরা চাইলে ফিরদাউস চেয়ো। কারণ তা হল জান্নাতের মধ্যভাগ ও জান্নাতের উপরিভাগ, আর তার উপরে রয়েছে রহমানের আরশ।”
এই মহা আরশের পায়া ও প্রান্ত আছে। মহানবী ﷺ বলেন, "সর্বপ্রথম কবর থেকে উঠে দেখব মুসা আরশের পায়াসমূহের একটি পায়া ধরে আছেন।”
মহান আল্লাহ বলেন, তুমি ফিরিস্তাদেরকে দেখতে পাবে যে, ওরা আরশের চারিপাশ ঘিরে ওদের প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছে। যারা আরশ ধারণ ক'রে আছে এবং যারা এর চারিপাশ ঘিরে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা প্রশংসার সাথে ঘোষণা করে এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে। আরশ বহনকারী নির্দিষ্ট ফিরিস্তা আছেন। কিয়ামতে আরশের ছায়া হবে। আল্লাহর রসূল ﷺ বলেন, "যে ব্যক্তি ঋণ-পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিকে সময় দেবে, অথবা তার ঋণ মকুব ক'রে দেবে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ সেই দিন তাঁর আরশের ছায়া দান করবেন।"
উক্ত আলোচনার পর ৩টি বাংলা কুরআন-অনুবাদকের আরশ সম্বন্ধে ধারণা পড়ুন--- "আল্লাহ আরশে আরূঢ় আছেন” অর্থাৎ, কুদরতের সিংহাসনে আরূঢ় হইয়া আছেন। 'আরশ' শব্দের শাব্দিক অর্থ ছাদবিশিষ্ট কিছু। সৃষ্টির ব্যাপার-বিষয়াদির পরিচালন-কেন্দ্রকে আল্লাহর 'আরশ' বলা হয়। (আরশ মানে) সিংহাসন---আকাশ ও পৃথিবী জুড়ে অবস্থিত, যা বিশ্বাসীদের অন্তরে অবস্থিত---!
এ একটি অসম্ভাব্য কল্পনা যে, মহান আল্লাহ অথবা তাঁর আরশ কোন মানুষের হৃদয়ে স্থান পাবে। তবে হ্যাঁ তাঁরা এ কথা বলে যদি বিশ্বাসীর হৃদয়ে তাঁর স্মরণ বুঝাতে চান, তাহলে সে কথা ভিন্ন। তবুও বলতে হবে, তাতে আছে বিভ্রান্তিকর অতিরঞ্জন। প্রকাশ থাকে যে, মহান আল্লাহ আরশের মুখাপেক্ষী নন।