📄 পরকালে মহান আল্লাহর দর্শন
কিয়ামতের দিন মহানবী আল্লাহকে দেখে সিজদা করবেন। মু'মিন বান্দাগণ কিয়ামতে মহান আল্লাহর পদনালী দেখে সিজদা করবে। মুনাফিকরা সিজদা করতে পারবে না। তাদের পিঠ পাটার মত সোজা হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, (স্মরণ কর,) যেদিন পায়ের রলা উন্মোচন করা হবে এবং তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান করা হবে; কিন্তু তারা তা করতে সক্ষম হবে না।
পরকালে মহান আল্লাহ তাঁর বেহেস্তী বান্দাদেরকে দীদার দানে ধন্য করবেন। মহান আল্লাহ বলেন, সেদিন বহু মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। কক্ষনো না, অবশ্যই তারা সেদিন তাদের প্রতিপালক (দর্শন) থেকে পর্দাবৃত থাকবে। যারা কল্যাণকর কাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ (জান্নাত) এবং আরো অধিক (আল্লাহর দীদার)। তাদের মুখমন্ডলকে মলিনতা আচ্ছন্ন করবে না এবং লাঞ্ছনাও না; তারাই হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসী, তারা ওর মধ্যে অনন্তকাল বাস করবে। সেখানে তারা যা কামনা করবে তাই পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে তারও অধিক (আল্লাহর দর্শন)।
জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ বাজালী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী ﷺ-এর নিকট পূর্ণিমার রাতে বসে ছিলাম। তিনি চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, নিঃসন্দেহে তোমরা (পরকালে) তোমাদের প্রতিপালককে ঠিক এইভাবে দর্শন করবে যেভাবে তোমরা এই পূর্ণিমার চাঁদ দর্শন করছ। এটি দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না। সুতরাং যদি তোমরা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের আগে (নিয়মিত) নামায পড়তে পরাহত না হতে সক্ষম হও (অর্থাৎ এ নামায ছুটে না যায়), তাহলে অবশ্যই তা বাস্তবায়ন কর।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে, তখন মহান বর্কতময় আল্লাহ বলবেন, 'তোমরা কি চাও যে, আমি তোমাদের জন্য আরো কিছু বেশি দিই?' তারা বলবে, 'তুমি কি আমাদের মুখমন্ডল উজ্জ্বল ক'রে দাওনি? আমাদেরকে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করাওনি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাওনি?' অতঃপর আল্লাহ (হঠাৎ) পর্দা সরিয়ে দেবেন (এবং তারা তাঁর চেহারা দর্শন লাভ করবে)। সুতরাং জান্নাতীদের নিকট তাদের প্রভুর দর্শন (দীদার)ই হবে সবচেয়ে বেশী প্রিয়।” মহানবী ﷺ বলেছেন, "তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে চাক্ষুষ দর্শন করবে।" সুতরাং এ কথার অপব্যাখ্যা ক'রে কেউ বলতে পারে না যে, বেহেস্তীরা মহান আল্লাহর সওয়াব দর্শন করবে।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, 'যে ব্যক্তি বলে যে, আল্লাহকে পরকালে দেখা যাবে না, সে কাফের।'
📄 মহান আল্লাহর মন
মহান আল্লাহর 'মন'-এর কথা কুরআন ও হাদীসে উল্লেখ হয়েছে, সেহেতু আমাদেরকে তার প্রতি ঈমান রাখতে হবে। কুরআন মাজীদে তিনি তাঁর নবী ঈসা -এর কথা উদ্ধৃত ক'রে বলেন, (স্মরণ কর) যখন আল্লাহ বলবেন, 'হে মারয়্যাম-তনয় ঈসা! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর?' সে বলবে, 'তুমিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার জন্য আদৌ শোভনীয় নয়। যদি আমি বলে থাকি, তাহলে তা তো তুমি অবশ্যই জানো। আমার মনে কি আছে তা তুমি অবগত আছ, কিন্তু তোমার মনে যা আছে, তা আমি অবগত নই, নিশ্চয় তুমি অদৃশ্য সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আমার বান্দার ধারণার পাশে থাকি। (অর্থাৎ, সে যদি ধারণা রাখে যে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন, তার তওবা কবুল করবেন, বিপদ আপদ থেকে উদ্ধার করবেন, তাহলে তাই করি।) আর আমি তার সাথে থাকি, যখন সে আমাকে স্মরণ করে। সুতরাং সে যদি তার মনে আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে আমার মনে স্মরণ করি, সে যদি কোন সভায় আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে তাদের চেয়ে উত্তম ব্যক্তিদের (ফিরিশাদের) সভায় স্মরণ করি।
📄 মহান আল্লাহর মুখমন্ডল
মহান আল্লাহর মুখমণ্ডল তাঁর সত্তাগত একটি গুণ। তাঁর মুখমণ্ডল আছে, যেমন তাঁর জন্য শোভনীয়। সে মুখমণ্ডল কোন সৃষ্টির মুখমণ্ডলের মত নয়। তার কোন উদাহরণ নেই উপমা নেই। তার কেমনত্ব আমাদের অজানা; কিন্তু তার প্রতি ঈমান ওয়াজেব। মহান আল্লাহ বলেন, তাঁর মুখমন্ডল ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সমস্তই নশ্বর। অবিনশ্বর শুধু তোমার মহিমময়, মহানুভব প্রতিপালকের মুখমন্ডল (সত্তা)।
সেই চেহারা বড় দীপ্তিময়, তার পর্দা হল জ্যোতি। মহানবী ﷺ বলেন, "তাঁকে কিরূপে দেখা সম্ভব? যার পর্দা (অন্তরাল) হল নূর (জ্যোতি)। যে পর্দা উন্মোচিত হলে তাঁর মুখমণ্ডলের দীপ্তি সমগ্র সৃষ্টিকুলকে দগ্ধীভূত ক'রে ফেলবে।” সেই মুখমণ্ডল বা চেহারা জান্নাতীরা জান্নাতে দর্শন করবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে, তখন মহান বর্কতময় আল্লাহ বলবেন, 'তোমরা কি চাও যে, আমি তোমাদের জন্য আরো কিছু বেশি দিই?' তারা বলবে, 'তুমি কি আমাদের মুখমন্ডল উজ্জ্বল ক'রে দাওনি? আমাদেরকে তুমি জান্নাতে প্রবিশ করাওনি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাওনি?' অতঃপর আল্লাহ (হঠাৎ) পর্দা সরিয়ে দেবেন (এবং তারা তাঁর চেহারা দর্শন লাভ করবে)। সুতরাং জান্নাতীদের নিকট তাদের প্রভুর দর্শন (দীদার) ই হবে সবচেয়ে বেশী প্রিয়।”
বলা বাহুল্য, চেহারা বা মুখমণ্ডলের অপব্যাখ্যা ক'রে 'সওয়াব' বলা বৈধ নয়। যেহেতু তা শাব্দিক অর্থের বিরোধী এবং সলফদের ইজমার পরিপন্থী। যদি কেউ আল্লাহকে কোন সৃষ্টির চেহারার মত কল্পনা ক'রে প্রশ্ন করে যে, তাঁর নাক আছে কি? তাহলে প্রশ্ন বিদআত হলেও তার উত্তর হবে, 'জানি না।' যেহেতু কুরআন-হাদীসে তার উল্লেখ নেই। আছে বলেও নেই, নেই বলেও নেই। সুতরাং যা 'নেই' বলে উল্লেখ নেই, তার জন্য আমরা মানবীয় চাহিদার উপর কিয়াস ক'রে 'অবশ্যই জানি, তাঁর নাক নেই' বলতে পারি না।
📄 মহান আল্লাহর হাত
তাঁর দুই হাত আছে--যেমন তাঁর জন্য উপযুক্ত। তার কোন উপমা নেই। কেমন তাও তিনিই জানেন। তিনি তাঁর দুই হাত দ্বারা আদমকে তৈরী করেছেন। তিনি ইবলীসকে বলেছিলেন, হে ইবলীস! আমি যাকে নিজ দুই হাত দিয়ে সৃষ্টি করেছি তাকে সিজদা করতে তোমাকে কে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন? তিনি নিজ হাতে অনেক কিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন, ওরা কি লক্ষ্য করে না যে, আমি নিজ হাতে যা সৃষ্টি করেছি, তার মধ্যে ওদের জন্য সৃষ্টি করেছি পশু এবং ওরাই এগুলির মালিক? তাঁর দুই হাত অতি দানশীল, তিনি যথেচ্ছা দান ক'রে থাকেন। তিনি বলেন, ইয়াহুদীরা বলে, 'আল্লাহর হাত সংকুচিত।' তাদের হাত সংকুচিত হোক এবং তারা যা বলে, তার জন্য তারা অভিশপ্ত হোক। বরং আল্লাহর উভয় হস্তই মুক্ত, যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান ক'রে থাকেন।
তিনি নিজ হাতে তাওরাত লিখেছেন। মহানবী ﷺ বলেন, একদা আদম ও মুসায় তর্কে লিপ্ত হলেন। মুসা বললেন, 'হে আদম! আপনি আমাদের পিতা। আপনি আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন ও জান্নাত থেকে বের করেছেন।' আদম তাঁকে বললেন, 'তুমি মুসা। আল্লাহ তোমাকে নিজ (সরাসরি) কথোপকথন দ্বারা নির্বাচিত করেছেন এবং তোমার জন্য নিজ হাতে তওরাত লিখেছেন...।'
তিনি কিয়ামতের দিন পৃথিবীকে নিজ হাতে রুটি বানিয়ে দেবেন। মহনবী ﷺ বলেন, কিয়ামতের দিন পৃথিবী একটি রুটির মত হবে। প্রতাপশালী (আল্লাহ) তা নিজ হাতে নিয়ে উলটপালট করবেন, যেমন তোমাদের কেউ সফরে তার রুটিকে উলটপালট করে। তা হবে বেহেস্তীদের মেহমানী (আহার)।
তাঁর উভয় হাতই ডান। মহানবী ﷺ বলেন, "আল্লাহর নিকট যারা ন্যায়পরায়ণ তারা দয়াময়ের ডান পার্শ্বে জ্যোতির মিম্বরের উপর অবস্থান করবে। আর তাঁর উভয় হস্তই ডান। (ঐ ন্যায়পরায়ণ তারা) যারা তাদের বিচারে, পরিবারে এবং তার কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বাধীন ব্যক্তিবর্গের ব্যাপারে ন্যায়নিষ্ঠ।”
তাঁর করতলের কথাও শুদ্ধভাবে প্রমাণিত। মহানবী ﷺ বলেন, "যে ব্যক্তি (তার) বৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ থেকে একটি খেজুর পরিমাণও কিছু দান করে আর আল্লাহ তো বৈধ অর্থ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণই করেন না - সে ব্যক্তির ঐ দানকে আল্লাহ ডান হাতে গ্রহণ করেন। পরিশেষে তা রহমানের করতলে বৃদ্ধিলাভ ক'রে পাহাড় থেকেও বড় হয়ে যায়। যেমন তোমাদের কেউ তার অশ্ব-শাবককে লালন-পালন ক'রে থাকে।"
তাঁর আঁজলা বা অঞ্জলি ও মুঠির কথাও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। প্রিয় নবী ﷺ বলেন, "আমার রব আয্যা অজাল্ল আমাকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি আমার উম্মতের সত্তর হাজার মানুষকে বিনা হিসাব ও আযাবে বেহেস্ত প্রবেশ করাবেন। প্রত্যেক হাজারের সাথে থাকবে সত্তর হাজার এবং আমার রব আয্যা অজাল্লার তিন অঞ্জলি মানুষ।"
আল্লাহ আয্যা অজাল্ল বলবেন, 'ফিরিস্তাগণ সুপারিশ করেছে, নবীগণ সুপারিশ করেছে এবং মু'মিনগণ সুপারিশ করেছে। এখন শ্রেষ্ঠ দয়ালু ছাড়া অন্য কেউ বাকী নেই।' সুতরাং দোযখ থেকে এক মুঠি মানুষ তুলে নেবেন এবং এমন এক সম্প্রদায়কে সেখান হতে বের করবেন, যারা (ঈমান আনার পর) কোন ভাল কাজ করেনি, তারা তখন কয়লায় পরিণত হয়ে গিয়ে থাকবে...।
তাঁর আঙ্গুলসমূহের কথায়ও মু'মিন বিশ্বাস স্থাপন করে। মহানবী ﷺ বলেন, "নিশ্চয় আদম সন্তানের হৃদয়সমূহ একটি হৃদয়ের মত রহমানের আঙ্গুলসমূহের মধ্যে দু'টি আঙ্গুলের মাঝে রয়েছে। তিনি তা নিজ ইচ্ছামত উলটপালট ক'রে থাকেন।"
সঠিক বিশ্বাস এই যে, এ সব যেভাবে এসেছে, সেইভাবেই বিশ্বাস করতে হবে। এ সব তাঁর অঙ্গ কি না, সে প্রশ্ন মাথায় আনা চলবে না। আর অবশ্যই মনে রাখতে হবে মানবীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মত তাঁর কিছু নয় অথবা তা রক্ত-মাংস- হাড়বিশিষ্ট নয়। তিনি কেমন তা আমাদের যেমন জানা নেই, তেমনি তাঁর এ সকল গুণ কেমন -- তা আমাদের অজানা। এ সবের অন্য অর্থও করতে পারি না। 'হাত' মানে কুদরত বা নিয়ামত করলে অর্থ সঠিক হয় না। আল্লাহর নিজের দুই কুদরত বা দুই নিয়ামত দিয়ে আদমকে সৃষ্টি করার কি অর্থ হতে পারে? 'আল্লাহর দুটো কুদরতই ডান' কথার কি অর্থ হতে পারে?
লক্ষণীয় যে, 'হাত' শব্দটি কোথাও একবচন, কোথাও দ্বিবচন এবং কোথাও বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। আরবী বাক্যগঠনে এমনটি বৈধ। বহুবচন শব্দের সাথে তার সম্বন্ধই দ্বিবচনকে বহুবচনরূপে ব্যবহার করার বৈধতা প্রদান করে।