📄 মহান আল্লাহকে কি স্বপ্নে দেখা যাবে?
জাগ্রত অবস্থায় কোন নবী-ওলী আল্লাহকে দেখতে পারেন না। কিন্তু স্বপ্নের মাধ্যমে কি হৃদয়-নেত্রে তাঁরা তাঁকে দেখতে পারেন? এ বিষয়টি জটিল ও বিতর্কিত। আল্লাহর নবী স্বপ্নে তাঁকে দর্শন করেছেন। তিনি বলেছেন, "আমি আমার প্রতিপালককে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতিতে দর্শন করেছি।"
স্বপ্নের এ দর্শন কেবল মহানবী ﷺ-এর জন্য প্রমাণিত। আল্লামা ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ দর্শন কোন অনবীর জন্য প্রমাণিত বলে জানি না এবং এ কথাও জানি না যে, কোন অনবীর জন্য এ দর্শন সম্ভব কি না।' তিনি অন্যত্র বলেন, 'অন্য কেউ দেখতে পারে, এ ব্যাপারে আমার মনে সন্দেহ আছে। এমনকি ইমাম আহমাদ থেকে (তাঁর স্বপ্নে মহান আল্লাহকে দেখা সম্পর্কে) যা বর্ণনা করা হয়, সে ব্যাপারেও আমার মনে সন্দেহ আছে। যেহেতু "তোমরা মরণের পূর্ব পর্যন্ত তোমাদের প্রতিপালককে মোটেই দেখবে না।" নবী ﷺ-এর এই বাণী জাগ্রত ও ঘুমন্ত উভয় অবস্থাই শামিল। আর যদি উভয় অবস্থা শামিল হয়, তাহলে কিভাবে বলতে পারি যে, তাঁকে স্বপ্নে দেখা সম্ভব?'
📄 মহানবী কি তাঁকে মি'রাজের রাতে দেখেছিলেন?
এটিও একটি বিতর্কিত বিষয়। খোদ সাহাবাগণ এ বিষয়ে মতভেদ করেছেন। ইবনে আব্বাস বলেন, 'তিনি অন্তর-নেত্রে তাঁকে দর্শন করেছেন।' মা আয়েশা বলেন, যে বলে যে, 'মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর রব্ব (আল্লাহ) কে দেখেছেন, সে মিথ্যুক। (সে আল্লাহর প্রতি বড় মিথ্যা আরোপ করে।)'
যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না, কিন্তু দৃষ্টিসমূহ তাঁর আয়ত্বে আছে এবং তিনিই সুক্ষ্মদর্শী; সম্যক পরিজ্ঞাত। কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন ওহীর (প্রত্যাদেশ) মাধ্যম ব্যতিরেকে, অন্তরাল ব্যতিরেকে অথবা কোন দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে; আর তখন আল্লাহ যা চান তা তাঁর অনুমতিক্রমে অহী (প্রত্যাদেশ) করেন; নিঃসন্দেহে তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাময়।
প্রিয় নবীকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি কি আপনার প্রতিপালককে দেখেছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, "তাঁকে কিরূপে দেখা সম্ভব? যাঁর পর্দা (অন্তরাল) হল নূর (জ্যোতি)। যে পর্দা উন্মোচিত হলে তাঁর আনন-দীপ্তি সমগ্র সৃষ্টিকূলকে দগ্ধীভূত ক'রে ফেলবে।” অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন, "আমি নূর দেখেছি।”
সুতরাং কেউ বলেন, তিনি আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছেন। কেউ বলেন, অন্তর-নেত্রে দর্শন করেছেন। আবার কেউ বলেন, তিনি ঐ রাত্রে মহান আল্লাহর নূর ও জিব্রাঈলকে দর্শন করেছিলেন, মহান আল্লাহকে নয়। সত্যানুসন্ধানী উলামাগণ বলেন, সঠিক এই যে, তিনি চাক্ষুষ দৃষ্টিতে মহান আল্লাহকে দর্শন করেননি। বরং অন্তর-দৃষ্টি দ্বারা স্বপ্নে ও মি'রাজের রাত্রে দর্শন করেছেন।
📄 পরকালে মহান আল্লাহর দর্শন
কিয়ামতের দিন মহানবী আল্লাহকে দেখে সিজদা করবেন। মু'মিন বান্দাগণ কিয়ামতে মহান আল্লাহর পদনালী দেখে সিজদা করবে। মুনাফিকরা সিজদা করতে পারবে না। তাদের পিঠ পাটার মত সোজা হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, (স্মরণ কর,) যেদিন পায়ের রলা উন্মোচন করা হবে এবং তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান করা হবে; কিন্তু তারা তা করতে সক্ষম হবে না।
পরকালে মহান আল্লাহ তাঁর বেহেস্তী বান্দাদেরকে দীদার দানে ধন্য করবেন। মহান আল্লাহ বলেন, সেদিন বহু মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। কক্ষনো না, অবশ্যই তারা সেদিন তাদের প্রতিপালক (দর্শন) থেকে পর্দাবৃত থাকবে। যারা কল্যাণকর কাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ (জান্নাত) এবং আরো অধিক (আল্লাহর দীদার)। তাদের মুখমন্ডলকে মলিনতা আচ্ছন্ন করবে না এবং লাঞ্ছনাও না; তারাই হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসী, তারা ওর মধ্যে অনন্তকাল বাস করবে। সেখানে তারা যা কামনা করবে তাই পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে তারও অধিক (আল্লাহর দর্শন)।
জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ বাজালী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী ﷺ-এর নিকট পূর্ণিমার রাতে বসে ছিলাম। তিনি চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, নিঃসন্দেহে তোমরা (পরকালে) তোমাদের প্রতিপালককে ঠিক এইভাবে দর্শন করবে যেভাবে তোমরা এই পূর্ণিমার চাঁদ দর্শন করছ। এটি দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না। সুতরাং যদি তোমরা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের আগে (নিয়মিত) নামায পড়তে পরাহত না হতে সক্ষম হও (অর্থাৎ এ নামায ছুটে না যায়), তাহলে অবশ্যই তা বাস্তবায়ন কর।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে, তখন মহান বর্কতময় আল্লাহ বলবেন, 'তোমরা কি চাও যে, আমি তোমাদের জন্য আরো কিছু বেশি দিই?' তারা বলবে, 'তুমি কি আমাদের মুখমন্ডল উজ্জ্বল ক'রে দাওনি? আমাদেরকে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করাওনি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাওনি?' অতঃপর আল্লাহ (হঠাৎ) পর্দা সরিয়ে দেবেন (এবং তারা তাঁর চেহারা দর্শন লাভ করবে)। সুতরাং জান্নাতীদের নিকট তাদের প্রভুর দর্শন (দীদার)ই হবে সবচেয়ে বেশী প্রিয়।” মহানবী ﷺ বলেছেন, "তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে চাক্ষুষ দর্শন করবে।" সুতরাং এ কথার অপব্যাখ্যা ক'রে কেউ বলতে পারে না যে, বেহেস্তীরা মহান আল্লাহর সওয়াব দর্শন করবে।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, 'যে ব্যক্তি বলে যে, আল্লাহকে পরকালে দেখা যাবে না, সে কাফের।'
📄 মহান আল্লাহর মন
মহান আল্লাহর 'মন'-এর কথা কুরআন ও হাদীসে উল্লেখ হয়েছে, সেহেতু আমাদেরকে তার প্রতি ঈমান রাখতে হবে। কুরআন মাজীদে তিনি তাঁর নবী ঈসা -এর কথা উদ্ধৃত ক'রে বলেন, (স্মরণ কর) যখন আল্লাহ বলবেন, 'হে মারয়্যাম-তনয় ঈসা! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর?' সে বলবে, 'তুমিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার জন্য আদৌ শোভনীয় নয়। যদি আমি বলে থাকি, তাহলে তা তো তুমি অবশ্যই জানো। আমার মনে কি আছে তা তুমি অবগত আছ, কিন্তু তোমার মনে যা আছে, তা আমি অবগত নই, নিশ্চয় তুমি অদৃশ্য সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আমার বান্দার ধারণার পাশে থাকি। (অর্থাৎ, সে যদি ধারণা রাখে যে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন, তার তওবা কবুল করবেন, বিপদ আপদ থেকে উদ্ধার করবেন, তাহলে তাই করি।) আর আমি তার সাথে থাকি, যখন সে আমাকে স্মরণ করে। সুতরাং সে যদি তার মনে আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে আমার মনে স্মরণ করি, সে যদি কোন সভায় আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে তাদের চেয়ে উত্তম ব্যক্তিদের (ফিরিশাদের) সভায় স্মরণ করি।