📄 ভ্রান্তি অপনোদন
হাদীসে এসেছে যে, মহানবী ﷺ বলেছেন, "তোমরা (কোন মানুষকে) মারলে চেহারায় মারা থেকে বিরত থেকো। কেননা, আল্লাহ আদমকে তাঁর আকারে সৃষ্টি করেছেন।"
এই হাদীস থেকে অনেকে ধারণা করে যে, আদমকে আল্লাহ তাঁর নিজ আকার দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু সে ধারণা ঠিক নয়। যেহেতু এখানে 'তাঁর আকারে' বলতে আদমের আকারকেই বুঝানো হয়েছে। যেহেতু অন্য হাদীসে এসেছে যে, আল্লাহ আদমকে তার আকারে সৃষ্টি করেছেন, যার দৈর্ঘ্য হল ষাট হাত। সুতরাং যখন তাঁকে সৃষ্টি করলেন, তখন বললেন, 'তুমি যাও এবং ঐ যে ফিরিশামন্ডলীর একটি দল বসে আছে, তাদের উপর সালাম পেশ কর। আর ওরা তোমার সালামের কি জবাব দিচ্ছে তা মন দিয়ে শুনো। কেননা, ওটাই হবে তোমার ও তোমার সন্তান-সন্ততির সালাম বিনিময়ের রীতি।' সুতরাং তিনি (তাঁদের কাছে গিয়ে) বললেন, 'আসসালামু আলায়কুম'। তাঁরা উত্তরে বললেন, 'আসসালামু আলাইকা অরাহমাতুল্লাহ'। অতএব তাঁরা 'অরাহমাতুল্লাহ' শব্দটা বেশী বললেন। যারা বেহেশতে প্রবেশ করবে, তাদের প্রত্যেকে হবে তাঁর আকারের (ষাট হাত)। তখন থেকে এ যাবৎ সৃষ্টি (মানুষের দৈর্ঘ্য) কম হয়ে আসছে।
এ হাদীস থেকে স্পষ্ট হয় যে, 'তাঁর আকারে' বলতে আদমের নিজস্ব আকারকেই বুঝানো হয়েছে। যেহেতু পরবর্তীতে সেই আকারের ব্যাখ্যাও বলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর নিজস্ব আকার ও সৃষ্টি-পদ্ধতি ভিন্ন। তাঁকে মায়ের পেটে তাঁর সন্তানদের মত অন্য আকারের পর্যায়সমূহ অতিক্রম করতে হয়নি। বরং মহান আল্লাহ তাঁকে সরাসরি পরিপূর্ণ 'মানব' আকার সৃষ্টি ক'রে তাতে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। বাকি থাকল এই হাদীস, আল্লাহ আদমকে রহমানের আকারে সৃষ্টি করেছেন। তা সহীহ নয়; বরং হাদীসটি মুনকার।
📄 পার্থিব জীবনে আল্লাহর দর্শন
পার্থিব-জগতে মানব-দানবের জন্য আল্লাহপাক অদৃশ্য। যেহেতু তাঁর নবীর ঘোষণা, "তোমরা মরণের পূর্ব পর্যন্ত তোমাদের প্রতিপালককে মোটেই দেখবে না।"
মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে দেখতে চাইলেন। বললেন, "প্রভু হে! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখব।" আল্লাহ বললেন, "তুমি আমাকে কখনই দেখবে না। তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর, যদি তা স্বস্থানে স্থির থাকে, তাহলে তুমি আমাকে দেখবে।" কিন্তু যখন আল্লাহ আয্যা অজান্ন পাহাড়ে জ্যোতিষ্মান হলেন, তখন পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হল এবং মুসা আলাইহিস সালামও সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। অতঃপর জ্ঞান ফিরে পেলে তিনি অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর নিকট তওবা করলেন।
📄 মহান আল্লাহকে কি স্বপ্নে দেখা যাবে?
জাগ্রত অবস্থায় কোন নবী-ওলী আল্লাহকে দেখতে পারেন না। কিন্তু স্বপ্নের মাধ্যমে কি হৃদয়-নেত্রে তাঁরা তাঁকে দেখতে পারেন? এ বিষয়টি জটিল ও বিতর্কিত। আল্লাহর নবী স্বপ্নে তাঁকে দর্শন করেছেন। তিনি বলেছেন, "আমি আমার প্রতিপালককে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতিতে দর্শন করেছি।"
স্বপ্নের এ দর্শন কেবল মহানবী ﷺ-এর জন্য প্রমাণিত। আল্লামা ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ দর্শন কোন অনবীর জন্য প্রমাণিত বলে জানি না এবং এ কথাও জানি না যে, কোন অনবীর জন্য এ দর্শন সম্ভব কি না।' তিনি অন্যত্র বলেন, 'অন্য কেউ দেখতে পারে, এ ব্যাপারে আমার মনে সন্দেহ আছে। এমনকি ইমাম আহমাদ থেকে (তাঁর স্বপ্নে মহান আল্লাহকে দেখা সম্পর্কে) যা বর্ণনা করা হয়, সে ব্যাপারেও আমার মনে সন্দেহ আছে। যেহেতু "তোমরা মরণের পূর্ব পর্যন্ত তোমাদের প্রতিপালককে মোটেই দেখবে না।" নবী ﷺ-এর এই বাণী জাগ্রত ও ঘুমন্ত উভয় অবস্থাই শামিল। আর যদি উভয় অবস্থা শামিল হয়, তাহলে কিভাবে বলতে পারি যে, তাঁকে স্বপ্নে দেখা সম্ভব?'
📄 মহানবী কি তাঁকে মি'রাজের রাতে দেখেছিলেন?
এটিও একটি বিতর্কিত বিষয়। খোদ সাহাবাগণ এ বিষয়ে মতভেদ করেছেন। ইবনে আব্বাস বলেন, 'তিনি অন্তর-নেত্রে তাঁকে দর্শন করেছেন।' মা আয়েশা বলেন, যে বলে যে, 'মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর রব্ব (আল্লাহ) কে দেখেছেন, সে মিথ্যুক। (সে আল্লাহর প্রতি বড় মিথ্যা আরোপ করে।)'
যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না, কিন্তু দৃষ্টিসমূহ তাঁর আয়ত্বে আছে এবং তিনিই সুক্ষ্মদর্শী; সম্যক পরিজ্ঞাত। কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন ওহীর (প্রত্যাদেশ) মাধ্যম ব্যতিরেকে, অন্তরাল ব্যতিরেকে অথবা কোন দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে; আর তখন আল্লাহ যা চান তা তাঁর অনুমতিক্রমে অহী (প্রত্যাদেশ) করেন; নিঃসন্দেহে তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাময়।
প্রিয় নবীকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি কি আপনার প্রতিপালককে দেখেছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, "তাঁকে কিরূপে দেখা সম্ভব? যাঁর পর্দা (অন্তরাল) হল নূর (জ্যোতি)। যে পর্দা উন্মোচিত হলে তাঁর আনন-দীপ্তি সমগ্র সৃষ্টিকূলকে দগ্ধীভূত ক'রে ফেলবে।” অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন, "আমি নূর দেখেছি।”
সুতরাং কেউ বলেন, তিনি আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছেন। কেউ বলেন, অন্তর-নেত্রে দর্শন করেছেন। আবার কেউ বলেন, তিনি ঐ রাত্রে মহান আল্লাহর নূর ও জিব্রাঈলকে দর্শন করেছিলেন, মহান আল্লাহকে নয়। সত্যানুসন্ধানী উলামাগণ বলেন, সঠিক এই যে, তিনি চাক্ষুষ দৃষ্টিতে মহান আল্লাহকে দর্শন করেননি। বরং অন্তর-দৃষ্টি দ্বারা স্বপ্নে ও মি'রাজের রাত্রে দর্শন করেছেন।