📄 আল্লাহ সাকার না নিরাকার
অধিকাংশ মানুষ জানে আল্লাহ নিরাকার। অর্থাৎ তাঁর কোন আকার নেই। সউদী আরবে ছাপা (বর্তমানে নিষিদ্ধ) মাআরিফুল কুরআনে মুফতী শফী সাহেব কুরতুবীর বরাতে লিখেছেন, 'আল্লাহ তাআলার কোন আকার নেই।' ডক্টর ওসমান গনী সাহেব বলেছেন, 'তুমি শুন আমার কথা, আমি শুধু বলি তুমি স্থির স্থিতিমান, আমি সদা চলি। আলো আর অন্ধকারে আমি যে সাকার অদৃশ্যে আলোময় তুমি নিরাকার।' তিনি বলেছেন 'নিরাকার আল্লাহর উপাসনা...।'
আর সম্ভবতঃ এ ধারণা এসেছে ভারতের পুরানো ধর্ম-বিশ্বাস থেকে। মোহাম্মদ আব্দুল আযীয (নও মুসলিম) সাহেব লিখেছেন, 'আমাদের শাস্ত্রের "কঠোপনিষধ"-এর একটা শ্লোকে লিখা আছে, "অ শব্দম স্পর্শম রূপম ব্যয়ং রসান্নতম গন্ধ বয়ৎ অনাদ্যনন্তং মহতো পরং ব্রাবং।” অর্থঃ-- "যার শব্দ নাই, স্পর্শ নাই, রূপ নাই, গন্ধ নাই, ক্রয় নাই, যিনি মহৎ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং যার বিকার ব্যাধি নাই, তিনি প্রভু ঈশ্বর।” এই শ্লোক পড়ে আমি চিন্তা করতে লাগলাম যে, এই শ্লোকে যা বলছে তা তো ইসলামেরই কথা। ঈশ্বর তিনিই যাঁর কোন রূপ নাই, ঈশ্বর তিনিই যাঁকে কেউ স্পর্শ করতে পারে না, যাকে কেউ চর্ম চক্ষু দিয়া দেখতে পায় না।'
কিন্তু তা ইসলামের কথা নয়। যদি আপনি বলেন, 'আল্লাহর আকার নেই।' তার মানে তিনি দৃশ্য নন। তাঁকে দেখা যাবে না। তাহলে প্রশ্ন যে, আপনি বেহেস্ত যাবেন কি না? অবশ্যই। সেই বেহেশতের সবচেয়ে বড় নিয়ামত কি? নিশ্চয় আপনি বলবেন, 'আল্লাহর দীদার।' অর্থাৎ, আপনি আল্লাহর দীদার লাভ করবেন। তাঁর চেহারা আছে। সেই চেহারা বেহেস্তীগণ বেহেশতে দর্শন করবে। আর সেই দর্শন ও দীদার হবে জান্নাতের সব চাইতে বড় সুখ।
জান্নাতে প্রবেশের পর আল্লাহ পাক জান্নাতীদের উদ্দেশে বলবেন, "আরো অধিক (উত্তম সম্পদ) এমন কিছু চাও, যা আমি তোমাদেরকে প্রদান করব।" তারা বলবে, 'আপনি আমাদের চেহারা উজ্জ্বল করেছেন, আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ দিয়ে জান্নাতে প্রবিষ্ট করেছেন। (এর চেয়ে আবার উত্তম কি চাই প্রভু?)' ইত্যবসরে (উর্ধ্বদিকে) জ্যোতির যবনিকা উন্মোচিত হবে। তখন জান্নাতীরা সকলে আল্লাহর চেহারার প্রতি (নির্নিমেষ) দৃষ্টিপাত করবে। (তাতে তাদের নিকট অন্যান্য সব কিছু অবহেলিত হবে) এবং সেই দর্শন সুখই হবে জান্নাতীদের সর্বোৎকৃষ্ট মনোনীত সম্পদ।
একদিন পূর্ণিমার রাতে মহানবী ﷺ চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, "নিঃসন্দেহে তোমরা (পরকালে) তোমাদের প্রতিপালককে ঠিক সেইভাবে দর্শন করবে, যেভাবে তোমরা এই পূর্ণিমার চাঁদ দর্শন করছ। এটি দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না।”
আর যে জিনিসকে দেখা যাবে, তাকে কি নিরাকার বলা যাবে? মোটের উপর কথা, মহান আল্লাহর আকার আছে। তবে সে আকার কেমন তা কেউ বলতে পারে না। সে আকারের কোন উপমা নেই, দৃষ্টান্ত নেই, সাদৃশ্য নেই।
📄 ভ্রান্তি অপনোদন
হাদীসে এসেছে যে, মহানবী ﷺ বলেছেন, "তোমরা (কোন মানুষকে) মারলে চেহারায় মারা থেকে বিরত থেকো। কেননা, আল্লাহ আদমকে তাঁর আকারে সৃষ্টি করেছেন।"
এই হাদীস থেকে অনেকে ধারণা করে যে, আদমকে আল্লাহ তাঁর নিজ আকার দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু সে ধারণা ঠিক নয়। যেহেতু এখানে 'তাঁর আকারে' বলতে আদমের আকারকেই বুঝানো হয়েছে। যেহেতু অন্য হাদীসে এসেছে যে, আল্লাহ আদমকে তার আকারে সৃষ্টি করেছেন, যার দৈর্ঘ্য হল ষাট হাত। সুতরাং যখন তাঁকে সৃষ্টি করলেন, তখন বললেন, 'তুমি যাও এবং ঐ যে ফিরিশামন্ডলীর একটি দল বসে আছে, তাদের উপর সালাম পেশ কর। আর ওরা তোমার সালামের কি জবাব দিচ্ছে তা মন দিয়ে শুনো। কেননা, ওটাই হবে তোমার ও তোমার সন্তান-সন্ততির সালাম বিনিময়ের রীতি।' সুতরাং তিনি (তাঁদের কাছে গিয়ে) বললেন, 'আসসালামু আলায়কুম'। তাঁরা উত্তরে বললেন, 'আসসালামু আলাইকা অরাহমাতুল্লাহ'। অতএব তাঁরা 'অরাহমাতুল্লাহ' শব্দটা বেশী বললেন। যারা বেহেশতে প্রবেশ করবে, তাদের প্রত্যেকে হবে তাঁর আকারের (ষাট হাত)। তখন থেকে এ যাবৎ সৃষ্টি (মানুষের দৈর্ঘ্য) কম হয়ে আসছে।
এ হাদীস থেকে স্পষ্ট হয় যে, 'তাঁর আকারে' বলতে আদমের নিজস্ব আকারকেই বুঝানো হয়েছে। যেহেতু পরবর্তীতে সেই আকারের ব্যাখ্যাও বলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর নিজস্ব আকার ও সৃষ্টি-পদ্ধতি ভিন্ন। তাঁকে মায়ের পেটে তাঁর সন্তানদের মত অন্য আকারের পর্যায়সমূহ অতিক্রম করতে হয়নি। বরং মহান আল্লাহ তাঁকে সরাসরি পরিপূর্ণ 'মানব' আকার সৃষ্টি ক'রে তাতে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। বাকি থাকল এই হাদীস, আল্লাহ আদমকে রহমানের আকারে সৃষ্টি করেছেন। তা সহীহ নয়; বরং হাদীসটি মুনকার।
📄 পার্থিব জীবনে আল্লাহর দর্শন
পার্থিব-জগতে মানব-দানবের জন্য আল্লাহপাক অদৃশ্য। যেহেতু তাঁর নবীর ঘোষণা, "তোমরা মরণের পূর্ব পর্যন্ত তোমাদের প্রতিপালককে মোটেই দেখবে না।"
মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে দেখতে চাইলেন। বললেন, "প্রভু হে! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখব।" আল্লাহ বললেন, "তুমি আমাকে কখনই দেখবে না। তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর, যদি তা স্বস্থানে স্থির থাকে, তাহলে তুমি আমাকে দেখবে।" কিন্তু যখন আল্লাহ আয্যা অজান্ন পাহাড়ে জ্যোতিষ্মান হলেন, তখন পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হল এবং মুসা আলাইহিস সালামও সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। অতঃপর জ্ঞান ফিরে পেলে তিনি অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর নিকট তওবা করলেন।
📄 মহান আল্লাহকে কি স্বপ্নে দেখা যাবে?
জাগ্রত অবস্থায় কোন নবী-ওলী আল্লাহকে দেখতে পারেন না। কিন্তু স্বপ্নের মাধ্যমে কি হৃদয়-নেত্রে তাঁরা তাঁকে দেখতে পারেন? এ বিষয়টি জটিল ও বিতর্কিত। আল্লাহর নবী স্বপ্নে তাঁকে দর্শন করেছেন। তিনি বলেছেন, "আমি আমার প্রতিপালককে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতিতে দর্শন করেছি।"
স্বপ্নের এ দর্শন কেবল মহানবী ﷺ-এর জন্য প্রমাণিত। আল্লামা ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এ দর্শন কোন অনবীর জন্য প্রমাণিত বলে জানি না এবং এ কথাও জানি না যে, কোন অনবীর জন্য এ দর্শন সম্ভব কি না।' তিনি অন্যত্র বলেন, 'অন্য কেউ দেখতে পারে, এ ব্যাপারে আমার মনে সন্দেহ আছে। এমনকি ইমাম আহমাদ থেকে (তাঁর স্বপ্নে মহান আল্লাহকে দেখা সম্পর্কে) যা বর্ণনা করা হয়, সে ব্যাপারেও আমার মনে সন্দেহ আছে। যেহেতু "তোমরা মরণের পূর্ব পর্যন্ত তোমাদের প্রতিপালককে মোটেই দেখবে না।" নবী ﷺ-এর এই বাণী জাগ্রত ও ঘুমন্ত উভয় অবস্থাই শামিল। আর যদি উভয় অবস্থা শামিল হয়, তাহলে কিভাবে বলতে পারি যে, তাঁকে স্বপ্নে দেখা সম্ভব?'