📄 আল্লাহর নামের তা'যীম
পরিচয়ে বস্তুর মাহাত্ম্যের বিকাশ ঘটে। ফুলের ভিতর যে মধু আছে, তা কেউ জানত না, যদি মৌমাছি তা আহরণ ক'রে মৌচাকে সংগ্রহ না করত। নিজের কথাই বলি, অনেক জায়গায় অনেক লোক আমার সাথে সালাম-মুসাফাহাহ করে না। কিন্তু পরিচয়ের পর নতুনভাবে সালাম ক'রে মুসাফাহার জন্য হাত বাড়ায়।
মহান আল্লাহর জন্য উত্তম উপমা। তাঁকে না চেনার ফলে অনেকে তাঁর যথার্থ তা'যীম করে না। না জানার ফলে রাজা ছেড়ে দারোয়ানের কাছে দান চায়। আল্লাহর যথার্থ পরিচয় জানা নেই বলেই তো লোকে তাঁর দরবার ছেড়ে তাঁর সৃষ্টি ও গোলামের দরবারে প্রার্থনা করে, মাথা লুটায়, নযর মানে, কুরবানী দেয়। অনেকে মানে না বলে তাঁর পবিত্রতা ও সম্মানকে মলিন করার অপচেষ্টা করে। মহান আল্লাহ বলেন, ওরা আল্লাহর যথোচিত কদর করেনি। কিয়ামতের দিন সমস্ত পৃথিবী তাঁর হাতের মুঠোয় থাকবে এবং আকাশমন্ডলী থাকবে তাঁর ডান হাতে গুটানো।
মহান আল্লাহ সবচেয়ে বড়। আল্লাহু আকবার। প্রভুর মান রক্ষা করা প্রত্যেক দাসের কর্তব্য। কোন রকমভাবেই যাতে তাঁর নাম-মান-সম্মান মলিন না হয় তার আপ্রাণ চেষ্টা রাখা প্রত্যেক দাস-দাসীর কর্তব্য। আল্লার নামে মিথ্যা কসম খাওয়া যাবে না। যারা খায়, তারা আসলে আল্লাহর নামকে নগণ্য ভাবে। আল্লাহর নামে হলফ ক'রে কোন ভাল কাজ বন্ধ করার সংকল্প করা বৈধ নয়। কসম খেলে তা রক্ষা করতে হবে। আর রক্ষা করতে না পারলে কাফফারা লাগবে। অনুরূপ আল্লাহর নামে কসম খেয়ে যাকে কিছু বলা হয়, তার উচিত, সেই নামের তা'যীম রক্ষা ক'রে তা বিশ্বাস করা।
আল্লাহর নামের তা'যীম করতে সেই নামের সাথে অন্য কাউকে 'এবং, 'ও' বা 'আর' লাগিয়ে কথা বলবেন না। যেমন 'আল্লাহ আর তুমি না থাকলে' ইত্যাদি বলে কথা বলবেন না। বলতে হলে 'অতঃপর' যোগে বলবেন। তাঁর নাম লেখার সময় অনেকে পাশাপাশি 'মুহাম্মাদ' লেখে। এতে কিন্তু আল্লাহর নামের তা'যীম লাঘব হয়ে যায়। কোথাও লিখতে হলে মহানবী ﷺ-এর মোহরের মত লিখতে হবে। উপরে 'আল্লাহ' এবং নিচে 'মুহাম্মাদ' লিখতে হবে।
মহানবী ﷺ বলেন, "কেউ আল্লাহর নাম নিয়ে চাইলে তাকে দাও।" "সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে, যার কাছে আল্লাহর দোহাই দিয়ে চাওয়া হয়, অথচ দেয় না।” মহান আল্লাহর তা'যীম আপনার মনে থাকলে আপনি কি আর মসজিদের অসম্মান করতে পারেন? ক্বিবলার দিকে কি থুথু ফেলতে পারেন? ক্বিবলার দিকে মুখ অথবা পিঠ ক'রে কি পেশাব-পায়খানা করতে পারেন? কুরআনের দিকে পা ক'রে কি বসতে পারেন? কুরআনের ছেঁড়া পাতা পড়ে থাকা দেখলে কি তা না তুলে থাকতে পারেন? মহান আল্লাহর নাম যেখানেই থাক, তার যথার্থ সম্মান করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
কোন কোন দেহতত্ত্ববাদীদের মতে মানুষের উভয় হাতের আঙ্গুলগুলিতে নাকি আরবীতে ৯৯ শব্দ লেখা আছে। তা যদি সত্য হয়, তাহলে সেই আঙ্গুল দিয়ে কোন অপবিত্র জিনিস ধরা ও ছোঁয়া হারাম। কিন্তু ব্যাপারটা যে নিছক কষ্ট-কল্পনা তা বলাই বাহুল্য।
📄 সিফাতে বিরোধীদের পদ্ধতি
আল্লাহর বিভিন্ন সিফাত বা গুণসমূদয়কে অস্বীকার করার নানা পদ্ধতি অবলম্বন ক'রে থাকে আহলে সুন্নাহর বিরোধীরা। যেমনঃ-
১। তাহরীফ (বিকৃত করা, পরিবর্তন করা): এই পদ্ধতিতে তারা কখনও কখনও শব্দই বিকৃত ক'রে ফেলে। যেমন 'আল্লাহ কথা বলেন' এ বিশ্বাস খণ্ডন করার জন্য তারা এই আয়াতের বিকৃতি ঘটিয়েছে। তারা 'আল্লাহ' শব্দে যবর লাগিয়ে পড়েছে। কখনও তারা অর্থের বিকৃতি ঘটিয়ে থাকে। যেমন 'আল্লাহ আরশে আছেন' এই বিশ্বাস খণ্ডন করার জন্য তারা استوى শব্দের অর্থ استولى ক'রে থাকে। অর্থাৎ, 'আল্লাহ আরশে সমারূঢ় আছেন' এর অর্থ এই করে যে, তিনি সার্বভৌম ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অধিকারী।'
২। তাফবীয (ভারার্পণ করা): এই পদ্ধতিতে তারা শব্দের অর্থই অবোধগম্য মনে করে এবং গুণাবলী অস্বীকার করে। গুণাবলী সম্পর্কিত শব্দাবলীর অর্থ সম্বন্ধে তারা বলে, 'আল্লাহই জানেন।' অথচ সলফগণ আল্লাহর গুণাবলীর কেমনত্ব বিষয়ের জ্ঞান তাঁর প্রতি সমর্পণ করেন এবং ঐ গুণাবলীর অর্থ বিষয়ক জ্ঞান তাঁর প্রতি সমর্পণ করেন না।
৩। তাজসীম (দেহ কল্পনা করা): অনেকে আল্লাহর হাত, পা, মুখমণ্ডল ইত্যাদি শুনে ধারণা করে যে, আল্লাহর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা গঠিত দেহ আছে। অথচ এমন ধারণা নিশ্চয়ই ভ্রষ্টতা। হাত-পা-মুখমণ্ডল ইত্যাদি শুনে মানুষের মত অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কল্পনা ক'রে তাঁকে 'দেহধারী' ধারণা করা মোটেই বৈধ নয়।
৪। তাঙ্ক্ষীফ (কেমনত্ব বর্ণনা করা): আল্লাহর গুণাবলীর কেমনত্ব বর্ণনা করাকে বলে। কেমন ক'রে, কিভাবে, কি রূপে ইত্যাদি প্রশ্নের জবাবে 'তাক্সীফ' হয়। বলা বাহুল্য, যে ব্যক্তি প্রশ্ন করে যে, 'আল্লাহ নিচের আসমানে নেমে আসেন, সে আবার কেমন?' তাকে বলুন যে, 'আল্লাহ কেমন?' সে নিশ্চয় বলবে, 'তা তো জানি না।'
৫। তামসীল (নমুনা বা দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা): সৃষ্টির গুণাবলীর দ্বারা আল্লাহর গুণাবলীর দৃষ্টান্ত দেওয়া অথবা তাঁর গুণাবলীকে সৃষ্টির গুণাবলীর সাথে তুলনা করা। যেমন 'আল্লাহর হাত মানুষের হাতের মত, তিনি রাজার মত সিংহাসনে বসে আছেন' ইত্যাদি।
৬। তাশবীহ (সদৃশ বর্ণনা করা): পুরোপুরি দৃষ্টান্ত নয়, কাছাকাছি কোন সদৃশ ধারণা করা। যারা মনে করে যে, মহান আল্লাহর কোন গুণ মানবীয় কোন গুণের মত, তারা অবশ্যই পাগল অথবা ভ্রষ্ট।
৭। তা'ত্বীল (অর্থবিহীন, নিষ্ক্রিয় বা বিরহিতকরণ): আল্লাহর গুণাবলীকে অস্বীকার করা এবং তাঁকে ঐ সমস্ত গুণবিহীন ভাবাকে বলে। যেমন, আল্লাহর আকাশের উর্ধ্বে অবস্থানকে কিছু ভ্রষ্ট ফিকাহ অস্বীকার করে ও বলে, 'আল্লাহ সকল স্থানেই আছেন!' যারাই আল্লাহর গুণাবলীকে মানবীয় গুণাবলীর মত ধারণা করে, তারাই আসলে 'তা'ত্বীল'-এর সমস্যায় পড়ে।
৮। তা'বীল (অপব্যাখ্যা করা): আয়াত ও সহীহ হাদীসের স্পষ্ট অর্থকে ভিন্ন কোন অসঙ্গত ও বাতিল অর্থে পরিবর্তন করাকে বলা হয়। যেমন, 'আল্লাহ আরশে সমারূঢ় আছেন। এর অর্থ এই করা যে, তিনি সার্বভৌম ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অধিকারী।'
৯। ইল্হাদ (বক্রপথ অবলম্বন): দ্বীনের মধ্যে ইল্হাদ হল, বক্রপথ অবলম্বন করা বা ধর্মত্যাগী হওয়া। আল্লাহর নামসমূহে বক্রপথ অবলম্বন করা তিনভাবে হতে পারে: (ক) আল্লাহর নামের পরিবর্তন করা। (খ) আল্লাহর নামে মনগড়া অতিরিক্ত বা সংযোজন করা। (গ) তাঁর নাম কম ক'রে দেওয়া। (ঙ) মহান আল্লাহর এমন গুণবাচক নামে আখ্যায়ন করা যাতে তাঁর ত্রুটি প্রকাশ পায়। (ঘ) আল্লাহর নামসমূহে বক্রপথ অবলম্বন করার একটি অর্থ এটাও হতে পারে যে, তার তা'বীল (অপব্যাখ্যা) করা।
সুতরাং আমরা আহলে সুন্নাহর অনুসরণ ক'রে কোন 'ইলহাদ' বা 'তা'বীল'-এর ধারে পাশে যাব না। আমরা তা'বীল বা দূর ব্যাখ্যা করব না দু'টি কারণে:- প্রথম এই যে, মহান আল্লাহ তা'বীল করতে নিষেধ করেছেন। আর দ্বিতীয় এই যে, তা'বীল হল নিছক ধারণাপ্রসূত সমাধান। আর মহান আল্লাহর ব্যাপারে ধারণাপ্রসূত সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করা নিশ্চয় মহা অপরাধ।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক ক'রে বলেন, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়ো না। নিশ্চয় কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় ওদের প্রত্যেকের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে। (সূরা বানী ইস্রাঈল ৩৬ আয়াত)
هذا وصلى الله على نবিনা মুহাম্মদ وعلى آله وصحبه أجمعين. সমাপ্ত
📄 হে আল্লাহ!
'যা কিছু শুনেছি যা কিছু বুঝেছি তার চেয়ে তুমি উপরে, প্রভু! তার চেয়ে তুমি উপরে, আমার কল্পনা, আমার ধারণা পারে না তোমারে ধরিতে প্রভু! পারে না তোমারে ধরিতে। জীবন আমার আসিবে ফুরায়ে হইবে অসার লেখনী, তবুও যে আমি তেমনি অক্ষম তব গুণগান করিতে। প্রভু! তব গুণগান করিতে।।' --শায়খুল হাদীস মওলানা আব্দুর রউফ শামীম (রঃ)