📄 মহান আল্লাহর গুণাবলী সম্বন্ধে মৌলিক নীতিমালা
মহান আল্লাহর গুণাবলী সম্বন্ধেও নিয়ম-নীতি রয়েছে, যা মেনে না চললে পদস্খলন ঘটা স্বাভাবিক। যেমন:-
১। মহান আল্লাহর (ইতিবাচক ও নেতিবাচক) সমস্ত গুণাবলী প্রশংসনীয় ও ত্রুটিবিহীন। তাতে কোন প্রকার নিন্দা ও ত্রুটির লেশমাত্র থাকতে পারে না।
{لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالآخِرَةِ مَثَلُ السَّوْءِ وَلِلهِ الْمَثَلُ الْأَعْلَى وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ }
অর্থাৎ, যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের জন্য নিকৃষ্ট উদাহরণ। আর আল্লাহর জন্য রয়েছে উৎকৃষ্টতম উদাহরণ এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা নাহল ৬০ আয়াত) অর্থাৎ, তাঁর প্রত্যেক গুণ সৃষ্টির গুণের তুলনায় মহত্তর। যেমন তাঁর জ্ঞান অপরিসীম, তাঁর শক্তি অতুলনীয়, তাঁর দানশীলতা দৃষ্টান্তবিহীন, অনুরূপ সকল গুণাবলী। অথবা এর অর্থ হল, তিনি শক্তিশালী, সৃষ্টিকর্তা, রুযীদাতা, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ইত্যাদি (তিনি সর্বগুণনিধি।) (ফাতহুল কাদীর) অথবা নিকৃষ্ট উপমা বলতে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অসম্পূর্ণতা, আর উৎকৃষ্টতম উপমা বলতে সর্বতোমুখী পরিপূর্ণতা সর্বদিক দিয়ে আল্লাহর জন্যই। (ইবনে কাসীর)
পক্ষান্তরে যে গুণ কখনো কখনো নিন্দনীয়, তা মহান আল্লাহর শানে শোভনীয় নয়। অবশ্য প্রশংসনীয় অর্থে তা দোষাবহ নয়। যেমন, কৌশল, চক্রান্ত, ধোঁকা, উপহাস ইত্যাদি। এগুলি নিন্দনীয় হলেও, অপরের মুকাবিলায় অথবা প্রতিশোধে যখন তা করা হয়, তখন তা প্রশংসনীয় হয় এই জন্য যে, বিরোধীর মুকাবিলায় জয়ী হওয়া যায়। মহান আল্লাহর শানে এই শ্রেণীর গুণ প্রশংসনীয়ভাবেই বর্ণিত হয়েছে। যেমন,
{وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ) (٥٤) سورة آل عمران}
অর্থাৎ, অতঃপর তারা ষড়যন্ত্র করল এবং আল্লাহও কৌশল প্রয়োগ করলেন। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বোত্তম কৌশলী। (সূরা আলে ইমরান ৫৪ আয়াত)
{إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاؤُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً) (١٤٢) سورة النساء}
অর্থাৎ, নিশ্চয় মুনাফিক (কপট) ব্যক্তিরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়। বস্তুতঃ তিনিও তাদেরকে প্রতারিত ক'রে থাকেন এবং যখন তারা নামাযে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে নিছক লোক-দেখানোর জন্য দাঁড়ায় এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ ক'রে থাকে। (সূরা নিসা ১৪২ আয়াত)
{إِنَّهُمْ يَكِيدُونَ كَيْدًا} (١٥) وَأَكِيدُ كَيْدًا} (١٦) سورة الطارق}
অর্থাৎ, নিশ্চয় তারা ভীষণ চক্রান্ত করে। এবং আমিও ভীষণ কৌশল করি। (সূরা তারিকু ১৫-১৬ আয়াত)
{وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِؤُونَ (١٤) اللهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ} (١٥)}
অর্থাৎ, যখন তারা বিশ্বাসিগণের সংস্পর্শে আসে, তখন বলে, 'আমরা বিশ্বাস করেছি।' আর যখন তারা নিভৃতে তাদের দলপতিগণের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে, 'আমরা তো তোমাদের সাথেই রয়েছি; আমরা শুধু তাদের সাথে উপহাস ক'রে থাকি।' আল্লাহ তাদের সাথে উপহাস করেন, আর তাদের অবাধ্যতায় তাদেরকে বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াবার অবকাশ দেন।
২। মহান আল্লাহর নামাবলী অপেক্ষা গুণাবলী অনেক ব্যাপক। যেহেতু প্রত্যেক নামের মধ্যেই মহান আল্লাহর এক অথবা একাধিক গুণ আছে। তার উপর মহান আল্লাহর কর্মাবলীও এক একটি গুণ। তাঁর কর্মাবলীর কোন সীমা নেই, তেমনি তাঁর বাক্যাবলীরও কোন শেষ নেই। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَلَوْ أَنَّمَا فِي الْأَرْضِ مِن شَجَرَةِ أَقْلَامُ وَالْبَحْرُ يَمُدُّهُ مِن بَعْدِهِ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَّا نَفِدَتْ كَلِمَاتُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (۲۷) سورة لقمان}
অর্থাৎ, পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষ যদি কলম হয় এবং এ যে সমুদ্র এর সাথে যদি আরও সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও আল্লাহর বাণী (লিখে) শেষ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা লুকুমান ২৭ আয়াত)
মহান আল্লাহর কর্মগত গুণ যেমন: আসা, অবতরণ করা, গ্রহণ করা, নেওয়া, পাকড়াও করা, কষ্ট পাওয়া, হাসা, অবাক হওয়া, কথা বলা ইত্যাদি।
৩। মহান আল্লাহর গুণাবলী দুই শ্রেণীর; ইতিবাচক ও নেতিবাচক। ইতিবাচক গুণাবলী তা-ই, যা তিনি নিজের কিতাবে অথবা রসূলের মুখে 'আছে' বলে ব্যক্ত করেছেন। সে সকল গুণাবলী পরিপূর্ণ প্রশংসনীয় গুণ, তাতে কোন প্রকার ত্রুটি বা নিন্দার লেশমাত্র নেই। যেমন: তাঁর জীবন, জ্ঞান, শক্তি, আরশে আরোহণ, পৃথিবীর আকাশে অবতরণ, তাঁর মুখমণ্ডল, হাত ইত্যাদি।
এ সকল গুণ তাঁর প্রকৃতার্থেই তাঁর জন্য যেভাবে শোভনীয় সেইভাবে 'আছে' বলেই বিশ্বাস করতে হবে। যেহেতু এ বিশ্বাস আল্লাহর প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ যা নিজের জন্য 'আছে' বলেন, আমরা তাঁর জবাবে 'নেই' বলে এ কথা প্রকাশ করতে পারি না যে, 'আল্লাহ তুমি জান না, আমরা জানি, ঐ গুণ তোমার নেই। তোমার ঐ গুণ থাকতে পারে না; কারণ তা সৃষ্টির!'
৪। ইতিবাচক গুণাবলী প্রশংনীয় পরিপূর্ণতামূলক গুণ। সুতরাং সে গুণ যত বেশী হবে এবং তার অর্থ যত ভিন্ন হবে, তত মহান আল্লাহর প্রশংসা ও পরিপূর্ণতা প্রকাশ পাবে। এই জন্য তাঁর নেতিবাচক গুণাবলীর তুলনায় ইতিবাচক গুণাবলী অনেক অনেক বেশী।
মহান আল্লাহর নেতিবাচক গুণ তা-ই, যা তাঁর 'নেই' বলে খণ্ডন করা হয়েছে। আমাদেরকে তা 'নেই' বলেই বিশ্বাস করতে হবে এবং তাতেও মহান আল্লাহর প্রশংসা ও পরিপূর্ণতা ব্যক্ত হবে। যেমনঃ-
{لَيْسَ كَمِثْله شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البصير (۱۱) سورة الشورى}
অর্থাৎ, কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সুরা শূরা ১১ আয়াত)
{اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ} (٢٥٥) سورة البقرة}
অর্থাৎ, আল্লাহ! তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সব কিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। (সূরা বাক্বারাহ ২৫৫ আয়াত)
{وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِن لَّغُوبٍ}
অর্থাৎ, আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সব কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আমাকে কোন ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। (সূরা ক্বাফ ৩৮ আয়াত)
{قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ (1) اللهُ الصَّمَدُ (۲) لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ (3) وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوا أَحَدٌ (٤)}
অর্থাৎ, বল, তিনিই আল্লাহ একক (অদ্বিতীয়)। আল্লাহ স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। (সূরা ইখলাস)
৫। মহান আল্লাহর ইতিবাচক গুণাবলী দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়; সত্তাগত গুণ এবং কর্মগত গুণ।
(ক) সত্তাগত বা সাত্ত্বিক গুণে তিনি পূর্বে গুণান্বিত ছিলেন, বর্তমানে আছেন এবং ভবিষ্যতে থাকবেন। যেমন, জ্ঞান, শক্তি, সম্মান, প্রবলতা, মুখমণ্ডল, দুই হাত, দুই চোখ ইত্যাদি।
(খ) কর্মগত গুণ তাঁর ইচ্ছা ও এখতিয়ারভুক্ত। যেমনঃ কথা বলা, দেখা, শোনা, সৃষ্টি করা, হিদায়াত করা, রুযী দান করা, জীবন-মৃত্যু দান করা প্রভৃতি।
৬। মহান আল্লাহর গুণাবলীতে বিশ্বাস রাখার সময় তা কোন কাল্পনিক অথবা বাস্তবিক জিনিসের মত ভাবা যাবে না। কারণ তাঁর মত কোন কিছুই নেই; না বাস্তবে, না কল্পনায়। তিনি বলেন,
{لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البصير (۱۱) سورة الشورى}
অর্থাৎ, কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সুরা শুরা ১১ আয়াত)
তার প্রকৃতত্ব জানার চেষ্টা করা বৃথা। যেহেতু যেমন মহান আল্লাহর সত্তা আমাদের জ্ঞানের বাইরে, তেমনি তাঁর সকল গুণাবলীর প্রকৃতত্বও আমাদের জ্ঞানের নাগালের বাইরে। তিনি বলেন,
{يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاء}
অর্থাৎ, তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে, তা তিনি অবগত আছেন। যা তিনি ইচ্ছা করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। (সুরা বাক্বারাহ ২৫৫ আয়াত)
{يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ به علما (۱۱۰) سورة طه}
অর্থাৎ, তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে, তা তিনি অবগত। কিন্তু ওরা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না। (সূরা ত্বাহা ১১০ আয়াত)
{هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا (٦٥) سورة مريم}
অর্থাৎ, তুমি কি তাঁর সমনাম কাউকেও জান? (সূরা মারয়্যাম ৬৫ আয়াত)
৭। মহান আল্লাহর সকল গুণাবলী কুরআন ও সহীহ হাদীসের দলীল-সাপেক্ষ। কারো জ্ঞান বা অনুমিতি দ্বারা তা প্রমাণ ও বর্ণনা করা যাবে না। সুতরাং যা আছে বলে প্রমাণিত, তা আমাদেরকে বিনা কৈফিয়তে বিশ্বাস করতে হবে, যা নেই বলে প্রমাণিত, তা নেই বলেই বিশ্বাস করতে হবে এবং যা 'আছে' অথবা 'নেই' কিছু বলে প্রমাণিত নেই অর্থাৎ, কুরআন-হাদীস যে গুণের ব্যাপারে চুপ আছে, আমাদেরকেও সে বিষয়ে চুপ থাকতে হবে। তার ব্যাপারে 'আছে' অথবা 'নেই' বলা যাবে না। যেমন, 'তিনি অসীম, তিনি সীমা-পরিধির উর্ধ্বে। তিনি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সাজ-সরঞ্জাম নিরপেক্ষ। অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর ন্যায় ষষ্ঠ দিক তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না।' (আক্বীদাহ তাহাবিয়াহ)
অথচ আমরা জানি যে, মহান আল্লাহ উর্ধ্বে আছেন এবং তিনি আরশে আছেন। মহান আল্লাহ শোনেন, তাঁর السمع (শ্রবণশক্তি) আছে ---এ কথা প্রমাণিত; কিন্তু তাঁর الأذن (কান) আছে---এ কথা প্রমাণিত নয়। সুতরাং কান আছে কি না, তা বলা যাবে না। বলা যাবে না যে, তিনি কান দ্বারা শোনেন অথবা কান ছাড়া শোনেন। বরং এসব বিষয়ে বলতে হবে, আল্লাহই ভাল জানেন।
📄 মহান আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর দলীল বিষয়ক নীতিমালা
(১) কোন নাম বা গুণ কুরআন অথবা সহীহ হাদীসের প্রমাণ ছাড়া সাব্যস্ত করা যাবে না।
(২) নাম ও গুণ বিষয়ক শব্দের প্রকাশ্য অর্থই বুঝতে হবে; তার অপব্যাখ্যা করা যাবে না। শব্দ শুনতেই যে অর্থের প্রতি আমাদের মস্তিষ্ক দৌড় দেয়, তাই হল তার প্রকাশ্য অর্থ, তাই আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ: 'হাত' মানে শক্তি বা কবজা ইত্যাদি প্রায় সব ভাষাতেই ব্যবহার হয়। কিন্তু সেটা তার আসল ও প্রকাশ্য অর্থ নয়, সেটা তার রূপক বা আলঙ্কারিক অর্থ। মহান আল্লাহর সিফাতের ব্যাপারে রূপক বা আলঙ্কারিক অর্থ গ্রহণ করা বৈধ হবে না।
(৩) নাম ও গুণ বিষয়ক শব্দের অর্থ এক হিসাবে আমাদের জানা। কিন্তু অন্য হিসাবে আমাদের অজানা। যেহেতু সে গুণের প্রকৃতত্ব ও কেমনত্ব আমাদের জ্ঞানের নাগালের বাইরে। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَلا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ علمه إلا بما شاء (٢٥٥) سورة البقرة}
অর্থাৎ, যা তিনি ইচ্ছা করেন, তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। (সূরা বাক্বারাহ ২৫৫ আয়াত)
বলা বাহুল্য, যদি কেউ আপনাকে প্রশ্ন করে, 'আল্লাহ কোথায়?' আপনি বলুন, 'আকাশে।' যদি বলে, 'আল্লাহ কেমন?' আপনি বলুন, 'আল্লাহ কেমন তা তো বলা যাবে না। কারণ তিনি তাঁর কেমনত্বের কথা বলেননি; বরং বলেছেন, তাঁর মত কোন কিছুই নেই। আর মানুষের জ্ঞান তাঁর কেমনত্বের নাগাল পেতে পারে না।' যদি বলে, 'আল্লাহ কখন?' আপনি বলুন, 'আল্লাহই প্রথম, তাঁর পূর্বে কিছু নেই। আর তিনিই শেষ, তাঁর পরে কিছু নেই।' যদি বলে, 'আল্লাহ কয়জন?' তাহলে আপনি বলুন, 'আল্লাহ এক। আল্লাহ স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি জন্ম দেননি, জন্ম নেনও নি। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।'
📄 মহান আল্লাহর কর্ম ও গুণাবলীর উপমা
মহান আল্লাহর কোন সদৃশ নেই, কোন দৃষ্টান্ত নেই, তাঁর কোন উপমা নেই। তিনি অনুপম, নিরুপম, অতুলনীয়, নযীরবিহীন। তাঁর প্রত্যেক কর্ম ও গুণও তাই। মহান আল্লাহ বলেন,
{لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ (۱۱) سورة الشورى}
অর্থাৎ, কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সুরা শূরা ১১ আয়াত)
তিনি আরো বলেন,
{فَلَا تَصْرِبُوا لله الأَمْثَالَ إِنَّ اللهَ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (٧٤) سورة النحل}
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর সদৃশাবলী স্থির করো না। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। (সূরা নাহল ৭৪ আয়াত)
যেমন, মুশরিকরা উদাহরণ দিয়ে থাকে যে, যদি রাজার সাথে সাক্ষাৎ করতে হয় বা তাঁর নিকট থেকে কোন কাজ নিতে হয়, তাহলে রাজার নিকট সরাসরি যাওয়া যায় না; বরং তাঁর নিকটতম লোকেদের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ করতে হয়, (উকিল ধরতে হয়,) তবেই রাজার নিকট পৌঁছনো সম্ভব হয়। অনুরূপ আল্লাহ অত্যন্ত মহান ও বিশাল রাজা। তাঁর নিকট পৌঁছনোর জন্য আমরা এই সব উপাস্যদের উপাসনা করি বা বুযুর্গদেরকে অসীলা ও মাধ্যমরূপে ব্যবহার করি।
মহান আল্লাহ এর উত্তরে বলেন, তোমরা আল্লাহকে নিজেদের উপর অনুমান করো না এবং তাঁর জন্য কোন উপমা, দৃষ্টান্ত বা সদৃশ পেশ করো না। কারণ তিনি অনুপম; তাঁর কোন উপমা নেই। তিনি একক; তাঁর কোন সদৃশ নেই। তারপর মানুষ রাজা না গায়বী খবর জানে, আর না সে সব সময় সবার নিকট উপস্থিত, না সে সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা যে, বিনা কোন মাধ্যমে প্রজাদের অবস্থা ও তাদের প্রয়োজন জানতে সক্ষম। অন্যথা মহান আল্লাহ প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, দৃশ্য-অদৃশ্য প্রত্যেক বস্তুর খবর রাখেন। রাত্রির অন্ধকারে সংঘটিত কর্মও তিনি দেখতে পান। প্রত্যেকের অভাব-অভিযোগও জানতে-শুনতে সক্ষম। অতএব কিভাবে একজন পার্থিব রাজা ও শাসকের সাথে মহান রাজা আল্লাহর তুলনা ও সাদৃশ্য হতে পারে?
পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ বলেন,
{وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ وَلَهُ المَثلُ الأَعْلَى فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الحكيم (۲۷) سورة الروم}
অর্থাৎ, আর তিনিই যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি পুনর্বার একে সৃষ্টি করবেন; এ তাঁর জন্য সহজ। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে সর্বোচ্চ গুণ (বা সর্বোৎকৃষ্ট উপমা) তাঁরই এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা রুম ২৭ আয়াত)
অর্থাৎ, তাঁর প্রত্যেক গুণ সৃষ্টির গুণের তুলনায় মহত্তর। যেমন তাঁর জ্ঞান অপরিসীম, তাঁর শক্তি অতুলনীয়, তাঁর দানশীলতা দৃষ্টান্তবিহীন, অনুরূপ সকল গুণাবলী। অথবা এর অর্থ হল, তিনি শক্তিশালী, সৃষ্টিকর্তা, রুযীদাতা, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ইত্যাদি (তিনি সর্বগুণনিধি।) (ফাতহুল কাদীর)
অথবা নিকৃষ্ট উপমা বলতে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অসম্পূর্ণতা, আর উৎকৃষ্টতম উপমা বলতে সর্বতোমুখী পরিপূর্ণতা সর্বদিক দিয়ে আল্লাহর জন্যই। (ইবনে কাসীর)
সুতরাং সুন্দর উপমা দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর কোন কর্ম ইত্যাদি বুঝানো দূষণীয় নয়। উদাহরণ স্বরূপঃ-
যেমন বাতাস, কারেন্ট ইত্যাদি না দেখে বিশ্বাস করি, তেমনি আল্লাহকে না দেখে বিশ্বাস করা যায়।
বাদশার সামনে একজন রক্ষীর মাথায় মুকুট দিলে, বাদশা যেমন রাগান্বিত হন, তেমনি আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে সিজদা করলে আল্লাহ রাগান্বিত হন।
একজন স্বামী যেমন স্ত্রীর পক্ষ থেকে তার প্রেমে শরীক পছন্দ করে না, মহান আল্লাহও তেমনি তাঁর ইবাদতে কোন শরীক পছন্দ করেন না।
এগুলি আসলে আল্লাহর উদাহরণ নয়; বরং তাঁকে না দেখে বিশ্বাস এবং তাঁর শির্ক অপছন্দ করা ও তাতে রাগান্বিত হওয়ার উদাহরণ। আর এ কথায় কোন সন্দেহ নেই যে, তাঁর রাগ বা অপছন্দনীয়তা কোন সৃষ্টির মত নয়। তাই এই শ্রেণীর উপমা বর্ণনা করতে গিয়ে উলামাগণ বলেন, 'আল্লাহর আছে সর্বোৎকৃষ্ট উপমা।'
📄 মহান আল্লাহর 'ইসমে আ'যম'
মহান আল্লাহর সুন্দর নামাবলীর মধ্যে একটি নাম আছে যেটি তাঁর ইসমে আ'যম (সবচেয়ে মহান নাম), যে নাম ধরে তাঁকে ডাকলে তিনি সাড়া দেন; অর্থাৎ, সেই নাম নিয়ে দুআ করলে তিনি তা কবুল করেন।
কিন্তু তাঁর নামাবলীর মধ্যে কোন্ নামটি ইসমে আ'যম (সবচেয়ে মহান নাম), তা নিয়ে মতভেদ আছে।
১। অনেকে ধারণা রাখে যে, সে নাম কেবল আল্লাহর সেই ওলী জানেন, যাঁর কারামতী আছে।
অথচ এ ধারণা ভুল। যেহেতু মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর নামাবলী জানতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং তা (অর্থসহ) জেনে যে দুআ ও যিক্র করবে, তার প্রশংসা করেছেন এবং তাকে বেহেশ্ দানের ওয়াদা দিয়েছেন, সেহেতু সে নাম এমন গুপ্ত হবে কেন?
২। মহান আল্লাহর সকল নামই ইসমে আ'যম। এর মধ্যে আযীম ও আ'যমের কোন পার্থক্য নেই।
৩। ইসমে আ'যম সেই নামাবলীর অন্তর্ভূত, যা মহান আল্লাহ নিজের গায়বী ইলমে গুপ্ত রেখেছেন; যেমন শবেকদর, জুমআর দিন দুআ কবুল হওয়ার নির্দিষ্ট সময়, মধ্যবর্তী নামায প্রভৃতি সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ঘোষণা দেননি।
৪। ইসমে আ'যম হল, 'হু' বা 'হুয়া'। যেহেতু বিরাট মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির নাম না নিয়ে আদবের সাথে 'হু' বা 'উনি'ই বলতে হয়। এ মত হল সুফীবাদীদের। এই জন্য তাদের একটি যিক্র হল ঐ 'হু' বা 'হুয়া' নামের। অথচ তা একটি বিদআত।
৫। ইসমে আ'যম হল, 'আল্লাহ'। কারণ এ নামই হল সাত্ত্বিক আসল ও মূলনাম, অবশিষ্টগুলি গুণগত উপনাম।
৬। ইসমে আ'যম হল, 'আল্লাহুর রাহমানুর রাহীম'।
৭। ইসমে আ'যম হল, 'আরাহমানুর রাহীমুল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম'। যেহেতু সহীহ হাদীসে এরূপ বর্ণিত হয়েছে। (দেখুন সিলসিলাহ সহীহাহ ৭৪৬নং)
৮। ইসমে আ'যম হল, 'আল-হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম'। এটিও একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (ইবনে মাজাহ, হাকেম, সিলসিলাহ সহীহাহ ৭৪৬নং) তাছাড়া এ নাম মহান আল্লাহর প্রতিপালকত্বের মহৎ গুণাবলীর কথা ঘোষণা করে।
৯। ইসমে আ'যম হল, 'আল-মান্নান, বাদীউস সামাওয়াতি অল-আরয়ি যুল-জালালি অল-ইকরাম, ইয়া হাইয়্যু ইয়া ক্বাইয়্যুম'। যেহেতু একটি সহীহ হাদীসে এটিকে ইসমে আ'যম বলা হয়েছে। (আবু দাউদ ১৪৯৫, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ৩৮৫৮, আহমাদ, হাকেম, ইবনে হিব্বান)
১০। 'আল্লা-হু, লা ইলা-হা ইল্লা আন্তাল আহাদুস স্বামাদুল্লাযী লাম ইয়ালিদ অলাম ইউলাদ, অলাম য়্যাকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।' এটিও ইসমে আ'যম বলে সহীহ হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে। (আবু দাউদ ১৪৯৩, তিরমিযী ৩৪৭৫, ইবনে মাজাহ ৩৮৭, আহমাদ, হাকেম, ইবনে হিব্বান)
হাফেয ইবনে হাজার (রঃ) বলেন, এ বিষয়ে উল্লিখিত হাদীসের মধ্যে সনদের দিক দিয়ে এটিই সবচেয়ে বলিষ্ঠ। (ফাতহুল বারী ১৮/২১৫, তুহফাতুল আহওয়াযী ৮/৩৭৮)
১১। আয়েশা ও ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত আছে, ইসমে আ'যম হল, 'রাব্বি, রাব্বি'। (হাকেম, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা)
১২। ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)র অন্য এক বর্ণনায় আছে, 'মা-লিকুল মুল্ক'। কিন্তু বর্ণনাটি জাল। (সিলসিলাহ যয়ীফাহ ২৭৭২নং)
১৩। অন্য এক দুর্বল বর্ণনা মতে ইসমে আ'যম হল, দুআয়ে ইউনুস 'লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নী কুন্তু মিনায যা-লিমীন।' (নাসাঈ হাকেম সিলসিলাহ যদীসহ ২৭৭৫নং)
১৪। যাইনুল আবেদীন থেকে বর্ণিত ইসমে আ'যম হল, 'আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া রাব্বুল আরশিল আযীম।'
১৫। কাযী ইয়াযের মতে ইসমে আ'যম হল, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।'
১৬। ইমাম যারকাশীর মতে তা হল, 'আল্লাহুম্মা'। তিনি বলেন, 'আল্লাহু' তাঁর সত্তার প্রতি ইঙ্গিত করে, আর 'ম্মা' (মীম) বাকী সকল সিফাত (গুণাবলী)র প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। অনুরূপ বর্ণিত আছে ইমাম হাসান বাসরী ও নায়ুর বিন শুমাইল হতে।
১৭। ইবনে মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)র মতে 'আলিফ-লাম-মীম' হল আল্লাহর ইসমে আযম। (ইবনে জারীর) ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)র এক অন্য মতও তাই। (ইবনে আবী হাতেম)
১৮। এক যয়ীফ হাদীস মতে ইসমে আযম হল, সূরা হাশরের শেষ ৬টি আয়াত। (সিলসিলাহ যয়ীফাহ ২৭৭৩নং)
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তাঁর সকল নামই সুন্দর, সকল নামই মহান এবং ইসমে আ'যমও সেই সকলেরই অন্তর্ভূত। অতএব সঠিক কথা এই যে, যে একক নামে তাঁর সমস্ত সুন্দর ও পরিপূর্ণ গুণাবলী সন্নিবিষ্ট আছে, সেই নামই মহানতম নাম; আর তা হল 'আল্লাহ'।
অথবা যাতে আছে একাধিক নামের সমষ্টি এবং তাতে প্রধান প্রধান সত্তা ও কর্মগত বহু গুণাবলীর উল্লেখ আছে, সেই নামই হল ইসমে আ'যম।
অথবা যে নামের কথা সহীহ হাদীস দ্বারা সমর্থিত, সেই নামই ইসমে আ'যম। ভক্তের উচিত, ভক্তিভাজন আল্লাহর সেই নাম বেছে নিয়ে দুআ করা। অবশ্য তার মানে এই নয় যে, অন্য নাম ধরে দুআ করা যাবে না। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, যয়ীফ বা জাল হাদীসে উল্লিখিত নাম দ্বারা অথবা কারো মনগড়া নাম দ্বারা তাঁকে ডাকা বৈধ নয়।