📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 ইসলামি সভ্যতার বৈশ্বিক প্রভাব

📄 ইসলামি সভ্যতার বৈশ্বিক প্রভাব


রাসূলুল্লাহ (সা.) ইসলামি সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এটি এমন একটি সভ্যতা, যার ভিত্তি ছিল আল্লাহর একত্ববাদ। ৩২৩ এই সভ্যতা বিনির্মাণের মাধ্যমে নবিজি মাত্র ২৩ বছরেই তাঁর সমাজকে পালটে দিয়েছিলেন পরিপূর্ণরূপে। তাঁর দাওয়াতের ফলে মানুষজন পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজা থেকে এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে। উপজাতীয় ঝগড়া ও যুদ্ধ থেকে নিজেদের নিয়ে যায় জাতীয় সংহতির দিকে। মাতালতা ও নৈরাজ্য থেকে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, অসম্মান থেকে সম্মান, পশ্চাৎপদতা ও অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সভ্যতার বিকাশের দিকে নিজেদের নিয়ে যায়।

তিনি ধর্ম প্রচার করেছেন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, জাতি গঠন করেছেন, নৈতিকতার মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, অসংখ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের সূচনা করেছেন এবং মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও আচরণকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করেছেন। ইতিহাসে মানুষ কখনোই সমাজ বা স্থানের এমন সম্পূর্ণ পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেনি। অবিশ্বাস্য বিস্ময় ব্যাপার হলো—তাঁর মাত্র ২৩ বছরের অল্প সময়ের মধ্যে এসব ঘটেছিল। ৩২৪

সাইদ নুরসি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রভাবের মাত্রা সম্পর্কে বলেন—
‘দেখুন, কীভাবে তিনি আরব উপদ্বীপের ভিন্ন, বন্য এবং অদম্য জনগণকে প্রশংসনীয় গুণাবলি দিয়ে একত্রিত করেছেন এবং তাদের বিশ্বের শিক্ষক ও মালিক বানিয়েছেন; বিশেষ করে সভ্য জাতির কাছে। অধিকন্তু এই আধিপত্য শুধু বাহ্যিক ছিল না। তিনি তাদের মন, হৃদয়, আত্মাকে জয় এবং বশীভূত করেছিলেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন হৃদয়ের প্রাণ, মনের শিক্ষক, আত্মার প্রশিক্ষক ও শাসক। ৩২৫

আধুনিক ইতিহাসের কোনো মহামানবকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে তুলনা করার সাহস করে কে? দার্শনিক, বক্তা, আইনপ্রণেতা, যোদ্ধা, বিজয়ী, মতবাদের পুনরুদ্ধারকারী, চিত্রবিহীন ধর্মের সাথে ২০টি পার্থিব সাম্রাজ্য এবং একটি আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা—তিনি হলেন মুহাম্মাদ (সা.)। যে সকল মানদণ্ড দ্বারা মানুষের মহত্ত্ব পরিমাপ করা যেতে পারে, আমরা সেসব সামনে রেখে জিজ্ঞাসা করি-'তাঁর চেয়ে বড়ো কোনো মানুষ আছে কি?'৩২৬

আরব উপদ্বীপের মানুষের ওপর কুরআনের শিক্ষা এবং নবিজির দ্বারা চূড়ান্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক ও জীবনব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রত্যাশিত পরিণতি হলো-কয়েক শতাব্দীর মধ্যে ইসলাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। এতে ইসলামের ছায়াতলে এলো বিশ্বের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। আর সেখান থেকে বর্তমানে প্রায় দুই বিলিয়ন মুসলমান। মার্কিন পিউ সেন্টার ভবিষ্যদ্বাণী করেছে-
'যদি বর্তমানে তাদের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, মুসলিমরা ২০৭০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রভাবশালী ধর্মীয় জনসংখ্যাতে পরিণত হবে এবং তাঁরা খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে।'৩২৭

এখন আমাদের জন্য জরুরি দ্যা আল্টিমেট লিডারকে অনুসরণ করা, যিনি একজন রোলমডেল এবং সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ। সাইদ নুরসি বলেছেন-
'আমি আমার শব্দ দ্বারা মুহাম্মাদ (সা.)-কে প্রশংসা করিনি; বরং তাঁর নাম নেওয়ায় আমার শব্দমালা প্রশংসিত হয়েছে। '৩২৮

শেষনবি মুহাম্মাদ (সা.)-এর নির্দেশনা ও উদাহরণ অনুসরণ করার ক্ষেত্রে মুসলমানদের অপরিসীম সুবিধা রয়েছে। কেননা, আমরা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নেতার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একাধিক উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি-মানুষের জন্য তাঁকে অনুকরণ করা অতি আবশ্যক। তিনি হলেন শ্রেষ্ঠ মানব, শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী, যাকে জীবনের শেষ অবধি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

কুরআনে আল্লাহ তাঁর নবুয়তের কথা নিশ্চিত করে আয়াত নাজিল করে বলেন-
'বলো-হে মানুষ! আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, যার রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো ও তাঁর প্রেরিত উম্মি নবির প্রতি, যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের প্রতি ঈমান রাখে। আর তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। আশা করা যায়, তোমরা হিদায়াত লাভ করবে।' সূরা আ'রাফ : ১৫৮

একজন বিশিষ্ট অমুসলিম, স্কটিশ অ্যাংলিকান স্কলার এবং পুরোহিত মন্টগোমারি ওয়াট বলেন-
'সত্যই মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর নবি ছিলেন। বিশ্বাসের জন্য নিপীড়ন সহ্য করতে তাঁর প্রস্তুতি, পুরুষদের উচ্চ নৈতিক চরিত্রের কারণে তাঁর অনুসারীরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিল এবং তাঁকে নেতা হিসেবে দেখেছিল। তাঁর চূড়ান্ত কৃতিত্বের মহিমা সবই নবির মৌলিক সততার পক্ষে যুক্তি দেয়। '৩২৯

প্রখ্যাত মুসলিম স্কলার আস-সিবাই বলেন-
'এটা সবাই জানে-আরবরা নবিজির দাওয়াত বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল; এমনকি তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল। কতটা খারাপ ছিল চিন্তা করুন! তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু প্রতিপক্ষের মধ্যে হওয়া প্রতিটি যুদ্ধে তিনি জিতেছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্বে তাঁর বাণীকে বিশ্বজয় করতে যে অল্প সময় লেগেছিল, তা ছিল মাত্র ২৩ বছর। এতেই প্রমাণ নিশ্চিত হয়-মুহাম্মাদ (সা.) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রাসূল ছিলেন। আর যারা অস্বীকার করেছিল তারা ইতিহাসে হারিয়ে গিয়েছে। '৩৩০

একইভাবে এটাও প্রমাণিত হয়-রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত কুরআন আল্লাহর কিতাব। এই প্রমাণগুলোর প্রথমে রয়েছে বাগ্মিতা ও কুরআনের আয়াতের উচ্চ বিষয়বস্তু। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যদ্বাণীর অস্তিত্ব, যা সত্য হয়েছে (যেমন, কুরআন ৩০ : ২-৪)। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক জগৎ (যেমন, মহাবিশ্বের উৎপত্তি, মানব গর্ভে ভ্রূণ ও ভ্রূণের বিকাশের প্রকৃতি, পাহাড়ের মূল) সম্পর্কে বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত করা, যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে। আর চতুর্থত, মানুষের জন্য কার্যকর দিকনির্দেশন এবং আধ্যাত্মিক কল্যাণের উপায়। এসবই ইসলামের সত্যতা নিয়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রত্যয় প্রদান করে।

জর্ডান পিটারসন বলেন-
'বিশ্বের প্রকৃতি এখন দুঃখভোগ ও বিশৃঙ্খলায় নিপতিত। ৩০০১ বেঁচে থাকার জন্য একজনকে ১২টি স্বঘোষিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। '৩০২

যাদের কোনো দিকনির্দেশক নেই, তাদের মধ্যে বেদনা ও বিশৃঙ্খলা ভরপুর। পিটারসনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো-সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গির মানুষরা অস্তিত্বের বাস্তবতা বুঝতে পারেন না। ঈশ্বর তিন জিনিসের নাম নিয়ে ঘোষণা করেছেন, যা সকলের ক্ষতি করবে-প্রথমত, শয়তান; যাকে মানুষকে খারাপ কাজে নেওয়ার এবং বিভ্রান্ত করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পৃথিবী নিজেই; যা মানুষকে পরবর্তী জীবনের স্থায়ী আবাস থেকে এই জীবনের দিকে সরিয়ে দিতে পারে এবং এটা ক্ষণস্থায়ী। আর তৃতীয়ত, প্রত্যেকের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত আকাঙ্ক্ষা বা আদেশকারী আত্মা রয়েছে, যা আমাদের পরিত্রাণ এবং চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে বিপথে নিয়ে যেতে চাইবে। তাঁকে অবশ্যই দমন করতে প্রশিক্ষিত হতে হবে।

মুসলমানরা দুটি মহান জিনিস দ্বারা নিয়ামতপ্রাপ্ত। প্রথমত, এক আল্লাহকে অনুসরণ করা, যিনি বিশ্বাসীদের প্রতি পরম করুণাময়। এর মধ্য দিয়ে মানুষ রহমদিল হওয়ার শিক্ষা পায়। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর নিযুক্ত রাসূল মুহাম্মাদ (সা.)- এর কাছ থেকে সত্যিকারের দিকনির্দেশনা পাওয়া, যাকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন-জগতের প্রতি রহমত হিসেবে।

মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর নবির প্রদত্ত করুণা এবং উম্মাহর মধ্যে পরস্পরের সত্যিকারের সাহচর্যের উষ্ণতা, মুসলমানদের জীবনের পরীক্ষা ও ক্লেশের মুখোমুখি হওয়া, যা আমাদের নিজেদের আধ্যাত্মিক বৃদ্ধির পরীক্ষা ও কল্যাণ হিসেবে প্রেরিত হয়। আল্লাহ তাঁর রহমত তাদের জন্য ওয়াদা করেছেন-
‘যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মি নবি; যার গুণাবলি তাঁরা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইনজিলে লিখিত পায়, যে তাদের সৎকাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎকাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃঙ্খল-যা তাদের ওপরে ছিল-অপসারণ করে। সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং তাঁর সাথে যে নুর নাজিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে, তাঁরাই সফলকাম।’ সূরা আ'রাফ : ১৫৭

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের বেশি ভালোবাসতেন, যারা তাঁর পরে আসবে এবং তাঁকে না দেখে বিশ্বাস করবে। হাদিসে বর্ণিত আছে-
‘ইশ! আমি যদি আমার ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারতাম। সাহাবিরা বললেন-আমরা কি আপনার ভাই নই? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন-তোমরা তো আমার সাহাবি, কিন্তু আমার ভাইরা হলো তাঁরা, যারা আমাকে না দেখে আমার ওপর বিশ্বাস আনবে।’৩৩৩

রহমতের আবাসস্থলের মধ্যে বসবাস করা কতই-না চমৎকার নিয়ামত! আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর অনুসরণের মধ্যেই সকল বিশ্বাসীর চূড়ান্ত সফলতা রয়েছে।

মুসলিম উম্মাহর উচ্চ নৈতিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং সাধারণভাবে বিশ্বাসীদের জন্য প্রথমে আমাদের আত্মাকে (তাজকিয়াতুন নফস) পরিশুদ্ধ করতে হবে। আমরা আমাদের শেষ লক্ষ্য অর্জন করতে পারব না, যদি না নিজেদের চরিত্রের উন্নতি করি। নিজেদের ও পরিবারের অপরিহার্য সংস্কার ছাড়াও নবিজির চমৎকার উদাহরণ অনুসরণ করে নেতাদের প্রশিক্ষণ ও তাদের নেতৃত্বের বিকাশ করতে হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। কারণ, আমাদের কাছে রয়েছে কুরআনের শিক্ষা এবং মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিস্তৃত ও ব্যাপক সিরাত ও হাদিস। আমাদের প্রয়োজন-এই বইয়ে উল্লিখিত নেতৃত্বের গুণাবলিকে নিজেদের মধ্যে নিয়ে আসা এবং প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটানো। এটি করতে হবে একটি রাষ্ট্রে আলো ছড়ানোর জন্য।

টিকাঃ
৩২৩ শাহ, নবি মুহাম্মাদ (সা.): একজন শিক্ষক, পৃ.২২৮.
৩২৪ সাইয়্যিদ কাজিম, ইসলামে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন। (March 2015)
৩২৫ সাইদ নুরসি, রিসালায়ে নূর, The Words : The Nineteenth Word, p.249.
৩২৬ আল্পোন্স দোলা মার্টিন, তুর্কির ইতিহাস
৩২৭ অলিভিগা রুগার্ড-'২০৭০ সালে ইসলাম পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ ধর্ম হিসেবে প্রকাশ পাবে।' says report", Telegraph (March 1, 2017)
৩২৮ সাইদ নরসি, রিসালায়ে নুর, The Words: The Nineteenth Word, p.247.
৩২৯ ওয়াট, মক্কায় মুহাম্মাদ, পৃ. ৫২
৩৩০ আস-সিবাই, মুহাম্মাদ (সা.) জীবনী, পৃ. ২৬
৩০১ গৌতম বুদ্ধ এমন দাবি করেন।
৩০২ জর্ডান বি. পিটারসন, জীবনের ১২টি নিয়ম: বিশৃঙ্খলার ওষুধ
৩৩৩ মুসনাদে আহমদ: ১২৫৭৯

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইসলামি সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এটি এমন একটি সভ্যতা, যার ভিত্তি ছিল আল্লাহর একত্ববাদ। ৩২৩ এই সভ্যতা বিনির্মাণের মাধ্যমে নবিজি মাত্র ২৩ বছরেই তাঁর সমাজকে পালটে দিয়েছিলেন পরিপূর্ণরূপে। তাঁর দাওয়াতের ফলে মানুষজন পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজা থেকে এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে। উপজাতীয় ঝগড়া ও যুদ্ধ থেকে নিজেদের নিয়ে যায় জাতীয় সংহতির দিকে। মাতালতা ও নৈরাজ্য থেকে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, অসম্মান থেকে সম্মান, পশ্চাৎপদতা ও অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সভ্যতার বিকাশের দিকে নিজেদের নিয়ে যায়।

তিনি ধর্ম প্রচার করেছেন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, জাতি গঠন করেছেন, নৈতিকতার মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, অসংখ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের সূচনা করেছেন এবং মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও আচরণকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করেছেন। ইতিহাসে মানুষ কখনোই সমাজ বা স্থানের এমন সম্পূর্ণ পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেনি। অবিশ্বাস্য বিস্ময় ব্যাপার হলো—তাঁর মাত্র ২৩ বছরের অল্প সময়ের মধ্যে এসব ঘটেছিল। ৩২৪

সাইদ নুরসি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রভাবের মাত্রা সম্পর্কে বলেন—
‘দেখুন, কীভাবে তিনি আরব উপদ্বীপের ভিন্ন, বন্য এবং অদম্য জনগণকে প্রশংসনীয় গুণাবলি দিয়ে একত্রিত করেছেন এবং তাদের বিশ্বের শিক্ষক ও মালিক বানিয়েছেন; বিশেষ করে সভ্য জাতির কাছে। অধিকন্তু এই আধিপত্য শুধু বাহ্যিক ছিল না। তিনি তাদের মন, হৃদয়, আত্মাকে জয় এবং বশীভূত করেছিলেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন হৃদয়ের প্রাণ, মনের শিক্ষক, আত্মার প্রশিক্ষক ও শাসক। ৩২৫

আধুনিক ইতিহাসের কোনো মহামানবকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে তুলনা করার সাহস করে কে? দার্শনিক, বক্তা, আইনপ্রণেতা, যোদ্ধা, বিজয়ী, মতবাদের পুনরুদ্ধারকারী, চিত্রবিহীন ধর্মের সাথে ২০টি পার্থিব সাম্রাজ্য এবং একটি আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা—তিনি হলেন মুহাম্মাদ (সা.)। যে সকল মানদণ্ড দ্বারা মানুষের মহত্ত্ব পরিমাপ করা যেতে পারে, আমরা সেসব সামনে রেখে জিজ্ঞাসা করি-'তাঁর চেয়ে বড়ো কোনো মানুষ আছে কি?'৩২৬

আরব উপদ্বীপের মানুষের ওপর কুরআনের শিক্ষা এবং নবিজির দ্বারা চূড়ান্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক ও জীবনব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রত্যাশিত পরিণতি হলো-কয়েক শতাব্দীর মধ্যে ইসলাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। এতে ইসলামের ছায়াতলে এলো বিশ্বের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। আর সেখান থেকে বর্তমানে প্রায় দুই বিলিয়ন মুসলমান। মার্কিন পিউ সেন্টার ভবিষ্যদ্বাণী করেছে-
'যদি বর্তমানে তাদের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, মুসলিমরা ২০৭০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রভাবশালী ধর্মীয় জনসংখ্যাতে পরিণত হবে এবং তাঁরা খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে।'৩২৭

এখন আমাদের জন্য জরুরি দ্যা আল্টিমেট লিডারকে অনুসরণ করা, যিনি একজন রোলমডেল এবং সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ। সাইদ নুরসি বলেছেন-
'আমি আমার শব্দ দ্বারা মুহাম্মাদ (সা.)-কে প্রশংসা করিনি; বরং তাঁর নাম নেওয়ায় আমার শব্দমালা প্রশংসিত হয়েছে। '৩২৮

শেষনবি মুহাম্মাদ (সা.)-এর নির্দেশনা ও উদাহরণ অনুসরণ করার ক্ষেত্রে মুসলমানদের অপরিসীম সুবিধা রয়েছে। কেননা, আমরা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নেতার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একাধিক উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি-মানুষের জন্য তাঁকে অনুকরণ করা অতি আবশ্যক। তিনি হলেন শ্রেষ্ঠ মানব, শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী, যাকে জীবনের শেষ অবধি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

কুরআনে আল্লাহ তাঁর নবুয়তের কথা নিশ্চিত করে আয়াত নাজিল করে বলেন-
'বলো-হে মানুষ! আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, যার রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো ও তাঁর প্রেরিত উম্মি নবির প্রতি, যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের প্রতি ঈমান রাখে। আর তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। আশা করা যায়, তোমরা হিদায়াত লাভ করবে।' সূরা আ'রাফ : ১৫৮

একজন বিশিষ্ট অমুসলিম, স্কটিশ অ্যাংলিকান স্কলার এবং পুরোহিত মন্টগোমারি ওয়াট বলেন-
'সত্যই মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর নবি ছিলেন। বিশ্বাসের জন্য নিপীড়ন সহ্য করতে তাঁর প্রস্তুতি, পুরুষদের উচ্চ নৈতিক চরিত্রের কারণে তাঁর অনুসারীরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিল এবং তাঁকে নেতা হিসেবে দেখেছিল। তাঁর চূড়ান্ত কৃতিত্বের মহিমা সবই নবির মৌলিক সততার পক্ষে যুক্তি দেয়। '৩২৯

প্রখ্যাত মুসলিম স্কলার আস-সিবাই বলেন-
'এটা সবাই জানে-আরবরা নবিজির দাওয়াত বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল; এমনকি তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল। কতটা খারাপ ছিল চিন্তা করুন! তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু প্রতিপক্ষের মধ্যে হওয়া প্রতিটি যুদ্ধে তিনি জিতেছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্বে তাঁর বাণীকে বিশ্বজয় করতে যে অল্প সময় লেগেছিল, তা ছিল মাত্র ২৩ বছর। এতেই প্রমাণ নিশ্চিত হয়-মুহাম্মাদ (সা.) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রাসূল ছিলেন। আর যারা অস্বীকার করেছিল তারা ইতিহাসে হারিয়ে গিয়েছে। '৩৩০

একইভাবে এটাও প্রমাণিত হয়-রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত কুরআন আল্লাহর কিতাব। এই প্রমাণগুলোর প্রথমে রয়েছে বাগ্মিতা ও কুরআনের আয়াতের উচ্চ বিষয়বস্তু। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যদ্বাণীর অস্তিত্ব, যা সত্য হয়েছে (যেমন, কুরআন ৩০ : ২-৪)। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক জগৎ (যেমন, মহাবিশ্বের উৎপত্তি, মানব গর্ভে ভ্রূণ ও ভ্রূণের বিকাশের প্রকৃতি, পাহাড়ের মূল) সম্পর্কে বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত করা, যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে। আর চতুর্থত, মানুষের জন্য কার্যকর দিকনির্দেশন এবং আধ্যাত্মিক কল্যাণের উপায়। এসবই ইসলামের সত্যতা নিয়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রত্যয় প্রদান করে।

জর্ডান পিটারসন বলেন-
'বিশ্বের প্রকৃতি এখন দুঃখভোগ ও বিশৃঙ্খলায় নিপতিত। ৩০০১ বেঁচে থাকার জন্য একজনকে ১২টি স্বঘোষিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। '৩০২

যাদের কোনো দিকনির্দেশক নেই, তাদের মধ্যে বেদনা ও বিশৃঙ্খলা ভরপুর। পিটারসনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো-সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গির মানুষরা অস্তিত্বের বাস্তবতা বুঝতে পারেন না। ঈশ্বর তিন জিনিসের নাম নিয়ে ঘোষণা করেছেন, যা সকলের ক্ষতি করবে-প্রথমত, শয়তান; যাকে মানুষকে খারাপ কাজে নেওয়ার এবং বিভ্রান্ত করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পৃথিবী নিজেই; যা মানুষকে পরবর্তী জীবনের স্থায়ী আবাস থেকে এই জীবনের দিকে সরিয়ে দিতে পারে এবং এটা ক্ষণস্থায়ী। আর তৃতীয়ত, প্রত্যেকের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত আকাঙ্ক্ষা বা আদেশকারী আত্মা রয়েছে, যা আমাদের পরিত্রাণ এবং চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে বিপথে নিয়ে যেতে চাইবে। তাঁকে অবশ্যই দমন করতে প্রশিক্ষিত হতে হবে।

মুসলমানরা দুটি মহান জিনিস দ্বারা নিয়ামতপ্রাপ্ত। প্রথমত, এক আল্লাহকে অনুসরণ করা, যিনি বিশ্বাসীদের প্রতি পরম করুণাময়। এর মধ্য দিয়ে মানুষ রহমদিল হওয়ার শিক্ষা পায়। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর নিযুক্ত রাসূল মুহাম্মাদ (সা.)- এর কাছ থেকে সত্যিকারের দিকনির্দেশনা পাওয়া, যাকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন-জগতের প্রতি রহমত হিসেবে।

মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর নবির প্রদত্ত করুণা এবং উম্মাহর মধ্যে পরস্পরের সত্যিকারের সাহচর্যের উষ্ণতা, মুসলমানদের জীবনের পরীক্ষা ও ক্লেশের মুখোমুখি হওয়া, যা আমাদের নিজেদের আধ্যাত্মিক বৃদ্ধির পরীক্ষা ও কল্যাণ হিসেবে প্রেরিত হয়। আল্লাহ তাঁর রহমত তাদের জন্য ওয়াদা করেছেন-
‘যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মি নবি; যার গুণাবলি তাঁরা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইনজিলে লিখিত পায়, যে তাদের সৎকাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎকাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃঙ্খল-যা তাদের ওপরে ছিল-অপসারণ করে। সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং তাঁর সাথে যে নুর নাজিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে, তাঁরাই সফলকাম।’ সূরা আ'রাফ : ১৫৭

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের বেশি ভালোবাসতেন, যারা তাঁর পরে আসবে এবং তাঁকে না দেখে বিশ্বাস করবে। হাদিসে বর্ণিত আছে-
‘ইশ! আমি যদি আমার ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারতাম। সাহাবিরা বললেন-আমরা কি আপনার ভাই নই? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন-তোমরা তো আমার সাহাবি, কিন্তু আমার ভাইরা হলো তাঁরা, যারা আমাকে না দেখে আমার ওপর বিশ্বাস আনবে।’৩৩৩

রহমতের আবাসস্থলের মধ্যে বসবাস করা কতই-না চমৎকার নিয়ামত! আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর অনুসরণের মধ্যেই সকল বিশ্বাসীর চূড়ান্ত সফলতা রয়েছে।

মুসলিম উম্মাহর উচ্চ নৈতিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং সাধারণভাবে বিশ্বাসীদের জন্য প্রথমে আমাদের আত্মাকে (তাজকিয়াতুন নফস) পরিশুদ্ধ করতে হবে। আমরা আমাদের শেষ লক্ষ্য অর্জন করতে পারব না, যদি না নিজেদের চরিত্রের উন্নতি করি। নিজেদের ও পরিবারের অপরিহার্য সংস্কার ছাড়াও নবিজির চমৎকার উদাহরণ অনুসরণ করে নেতাদের প্রশিক্ষণ ও তাদের নেতৃত্বের বিকাশ করতে হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। কারণ, আমাদের কাছে রয়েছে কুরআনের শিক্ষা এবং মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিস্তৃত ও ব্যাপক সিরাত ও হাদিস। আমাদের প্রয়োজন-এই বইয়ে উল্লিখিত নেতৃত্বের গুণাবলিকে নিজেদের মধ্যে নিয়ে আসা এবং প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটানো। এটি করতে হবে একটি রাষ্ট্রে আলো ছড়ানোর জন্য।

টিকাঃ
৩২৩ শাহ, নবি মুহাম্মাদ (সা.): একজন শিক্ষক, পৃ.২২৮.
৩২৪ সাইয়্যিদ কাজিম, ইসলামে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন। (March 2015)
৩২৫ সাইদ নুরসি, রিসালায়ে নূর, The Words : The Nineteenth Word, p.249.
৩২৬ আল্পোন্স দোলা মার্টিন, তুর্কির ইতিহাস
৩২৭ অলিভিগা রুগার্ড-'২০৭০ সালে ইসলাম পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ ধর্ম হিসেবে প্রকাশ পাবে।' says report", Telegraph (March 1, 2017)
৩২৮ সাইদ নরসি, রিসালায়ে নুর, The Words: The Nineteenth Word, p.247.
৩২৯ ওয়াট, মক্কায় মুহাম্মাদ, পৃ. ৫২
৩৩০ আস-সিবাই, মুহাম্মাদ (সা.) জীবনী, পৃ. ২৬
৩০১ গৌতম বুদ্ধ এমন দাবি করেন।
৩০২ জর্ডান বি. পিটারসন, জীবনের ১২টি নিয়ম: বিশৃঙ্খলার ওষুধ
৩৩৩ মুসনাদে আহমদ: ১২৫৭৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00