📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 ইসলামপূর্ব জাহেলি সমাজ

📄 ইসলামপূর্ব জাহেলি সমাজ


নবিজির সমাজ সংস্কারের ব্যাপকতা উপলব্ধির জন্য আমরা সংক্ষিপ্তভাবে নবুয়তপূর্ববর্তী আরব সমাজ নিয়ে পর্যালোচনা করব। মূলত ঘুণে ধরা ওই সমাজব্যবস্থাই স্বয়ং তাঁকে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করিয়েছিল। নবুয়তপূর্ববর্তী এ সময়টিকেই জাহেলিয়াতের সময় হিসেবে গণ্য করা হয়।

তৎকালীন আরবরা ছিল সংকীর্ণমনা, বস্তুবাদী ও আবেগপ্রবণ। মদ্য পান ও জুয়া খেলেই তাদের সময় কাটত। আর বিনোদনের অন্যতম উপকরণ ছিল আন্তঃগোত্রীয় দ্বন্দ্ব ও খুনাখুনি। এসব তাদের কাছে নিতান্তই তুচ্ছ ব্যাপার বলে পরিগণিত হতো। মেয়ে সন্তানকে তারা নিজেদের জন্য মনে করত অশুভ। তাই তাদের জীবন্ত দাফন করতেও কোনো প্রকার আবেগ তারা অনুভব করত না।

বেদুইন নারীরা এতটাই মর্যাদাহীন ছিল, গবাদি পশুর বিনিময়ে তাদের বেচাকেনা করা হতো। একজন পুরুষ যতজন ইচ্ছা স্ত্রী রাখতে পারত। জোরজবরদস্তি করে সম্পত্তির দখল কিংবা তুচ্ছ কারণে খুনাখুনি ছিল হাতের মোয়া। প্রকাশ্য দিবালোকে তারা এসব করে বেড়াত। কিন্তু তাদের মধ্যে গোত্রীয় আনুগত্যের চর্চা ছিল মারাত্মক পর্যায়ে, যা দিনশেষে যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াত। ২৯৬ মূলত তৎকালীন আব্রাহামিক ধর্ম তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টীয় ধর্ম বিকৃত হয়ে যাওয়ায় সমাজ থেকে নৈতিকতা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

তাফসিরকারক তোশিহিকো ইজুতসু ওই জাহেলি সংস্কৃতির অনেকগুলো দিক উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন-'আরবদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড বা নীতি ছিল না। উপজাতীয় ঐতিহ্যকে তারা মনেপ্রাণে ধারণ করত। নৈতিকতাবোধ ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ভালো-খারাপ মাপার জন্য পূর্বপুরুষদের কার্যক্রমকেই মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করত। '২৯৭

জাহেলি চেতনার দুটি বৈশিষ্ট্য জাগতিকতা ও গোত্রবাদ আমাদের অনুসন্ধানের সাথে প্রাসঙ্গিক। পৌত্তলিক আরবদের কাছে দুনিয়াই ছিল একমাত্র জগৎ। আখিরাতের অনন্ত জীবনকে তাঁরা অবিশ্বাস করত। প্রাক-ইসলামপূর্ব কবিদের রচনাগুলো তাই পূর্ণ থাকত মানবজীবনের নানা অপ্রাপ্তির শূন্যতা ও হতাশার তিক্ত আর্তনাদ দ্বারা।

ইসলামি তাওহিদ আরবের পৌত্তলিক বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। নবিজি পুনরুত্থান ও পরকালের জীবন সম্পর্কিত আল্লাহর যে বার্তা নিয়ে এসেছিলেন, তা তারা ঘৃণা ও উপহাস করে উড়িয়ে দিয়েছিল। কুরআনের ভাষায়-
'তারা বলে-"যখন আমরা মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হব, তখনও কি আমরা পুনরুত্থিত হব? অবশ্যই আমাদের ও ইতঃপূর্বে আমাদের পিতৃপুরুষদের এই ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল। এসব কেবল পৌরাণিক উপাখ্যান ছাড়া আর কিছু না।” সূরা মুমিনুন : ৮২-৮৩

প্রাক-ইসলামি আরবের সামাজিক কাঠামো মূলত ছিল গোত্রভিত্তিক। গোত্রীয় সম্মান ব্যতীত অন্যকিছুতে কোনো সম্মান ছিল না।২৯৮ কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর দাওয়াতে রক্তের বন্ধনের চাইতে ধর্মীয় সম্পর্কের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছিলেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে এক এবং একমাত্র আল্লাহতে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে একটি সম্পূর্ণ নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। ২৯৯ আর তাই মদিনায় হিজরতের পর ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বিশ্বাসীদের দাঁড় করিয়েছিলেন একই কাতারে।

ইসলামপূর্ব যুগে এত সব অনাচারের পাশাপাশি আরবদের বেশ কিছু প্রশংসনীয় গুণাবলিও ছিল। কুরআনে সেগুলোর বর্ণনা এসেছে। জাহেলি যুগের সেই বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর উদারতা, সাহসিকতা, মহানুভবতা, বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদিতাকে একীভূত করার মাধ্যমে তাদের শুদ্ধ ও সতেজ করেছেন।৩০০ আলি (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যথার্থ মন্তব্য করেন-
'তিনি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উদার, সবচেয়ে দৃঢ় হৃদয়ের, সবচেয়ে সত্যবাদী, আমানতের দেখভালে সবচেয়ে বিশ্বস্ত, মনের দিক দিয়ে সবচেয়ে শান্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ, মেলামেশায় সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। যারা অপরিচিত হওয়ার কারণে তাঁকে প্রথমে দেখে ভয় পেত, তাঁরাও পরিচিত হওয়ার পর তাঁকে প্রাণপণে ভালোবাসত। সত্যিই তাঁর মতো মানুষ আমি আর দেখিনি।'৩০১

মূর্তিপূজা, কুসংস্কার ও পৌত্তলিকতা পূর্ববর্তী নবিদের শিক্ষাগুলো সমাজ থেকে মুছে দিয়েছিল। ফলে মুহাম্মাদ (সা.)-কে যে তাঁর মিশন বাস্তবায়ন করতে এক বিশাল বাধার মুখোমুখি হতে হবে, এ ব্যাপারে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন। ফরাসি কবি ল্যা মার্টিন নবিজি সম্পর্কে বলেন-
'ইতিহাসের কোনো মানুষই তাঁর ক্ষমতার বাইরে এসে এতদূর পর্যন্ত কোনো কাজ করতে পারেননি। অবাক লাগে-মরুভূমিতে থাকা একজন মানুষ কোনো যন্ত্র বা অগণিত মানুষের সাহায্য ছাড়া কিছু মুষ্টিমেয় লোককে নিয়ে সমাজ পরিবর্তন করে ফেলেছিলেন!'৩০২

টিকাঃ
২৯৬ আবুল হাসান আলি, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (Lucknow : Academy of Islamic Research and Publication, 1982), p.28
২৯৭ তোশিহিকো ইজুতসু, Ethico-Religious Concepts in the Qur'an (Kuala Lumpur: Islamic Book Trust, 2004), p. 49
২৯৮ ইজ্জতসু Ethico-Religious Concepts in the Qur'an, pp.60 and 63.
২৯৯ ইজ্জতসু Ethico-Religious Concepts in the Qur'an, pp.63 and 66.
৩০০ ইজুতসু Ethico-Religious Concepts in the Qur'an, p.82.
৩০১ ইবনে ইসহাক, ভলিউম ১, পৃ. ২২৬
৩০২ আলফনসে দে লা মর্টিন Histoire de la Turquie, Vol. II (Paris: Lecou, 1854), p.276; as quoted by Ali, Muhammad Rasulullah, p.49.

নবিজির সমাজ সংস্কারের ব্যাপকতা উপলব্ধির জন্য আমরা সংক্ষিপ্তভাবে নবুয়তপূর্ববর্তী আরব সমাজ নিয়ে পর্যালোচনা করব। মূলত ঘুণে ধরা ওই সমাজব্যবস্থাই স্বয়ং তাঁকে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করিয়েছিল। নবুয়তপূর্ববর্তী এ সময়টিকেই জাহেলিয়াতের সময় হিসেবে গণ্য করা হয়।

তৎকালীন আরবরা ছিল সংকীর্ণমনা, বস্তুবাদী ও আবেগপ্রবণ। মদ্য পান ও জুয়া খেলেই তাদের সময় কাটত। আর বিনোদনের অন্যতম উপকরণ ছিল আন্তঃগোত্রীয় দ্বন্দ্ব ও খুনাখুনি। এসব তাদের কাছে নিতান্তই তুচ্ছ ব্যাপার বলে পরিগণিত হতো। মেয়ে সন্তানকে তারা নিজেদের জন্য মনে করত অশুভ। তাই তাদের জীবন্ত দাফন করতেও কোনো প্রকার আবেগ তারা অনুভব করত না।

বেদুইন নারীরা এতটাই মর্যাদাহীন ছিল, গবাদি পশুর বিনিময়ে তাদের বেচাকেনা করা হতো। একজন পুরুষ যতজন ইচ্ছা স্ত্রী রাখতে পারত। জোরজবরদস্তি করে সম্পত্তির দখল কিংবা তুচ্ছ কারণে খুনাখুনি ছিল হাতের মোয়া। প্রকাশ্য দিবালোকে তারা এসব করে বেড়াত। কিন্তু তাদের মধ্যে গোত্রীয় আনুগত্যের চর্চা ছিল মারাত্মক পর্যায়ে, যা দিনশেষে যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াত। ২৯৬ মূলত তৎকালীন আব্রাহামিক ধর্ম তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টীয় ধর্ম বিকৃত হয়ে যাওয়ায় সমাজ থেকে নৈতিকতা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

তাফসিরকারক তোশিহিকো ইজুতসু ওই জাহেলি সংস্কৃতির অনেকগুলো দিক উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন-'আরবদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড বা নীতি ছিল না। উপজাতীয় ঐতিহ্যকে তারা মনেপ্রাণে ধারণ করত। নৈতিকতাবোধ ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ভালো-খারাপ মাপার জন্য পূর্বপুরুষদের কার্যক্রমকেই মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করত। '২৯৭

জাহেলি চেতনার দুটি বৈশিষ্ট্য জাগতিকতা ও গোত্রবাদ আমাদের অনুসন্ধানের সাথে প্রাসঙ্গিক। পৌত্তলিক আরবদের কাছে দুনিয়াই ছিল একমাত্র জগৎ। আখিরাতের অনন্ত জীবনকে তাঁরা অবিশ্বাস করত। প্রাক-ইসলামপূর্ব কবিদের রচনাগুলো তাই পূর্ণ থাকত মানবজীবনের নানা অপ্রাপ্তির শূন্যতা ও হতাশার তিক্ত আর্তনাদ দ্বারা।

ইসলামি তাওহিদ আরবের পৌত্তলিক বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। নবিজি পুনরুত্থান ও পরকালের জীবন সম্পর্কিত আল্লাহর যে বার্তা নিয়ে এসেছিলেন, তা তারা ঘৃণা ও উপহাস করে উড়িয়ে দিয়েছিল। কুরআনের ভাষায়-
'তারা বলে-"যখন আমরা মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হব, তখনও কি আমরা পুনরুত্থিত হব? অবশ্যই আমাদের ও ইতঃপূর্বে আমাদের পিতৃপুরুষদের এই ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল। এসব কেবল পৌরাণিক উপাখ্যান ছাড়া আর কিছু না।” সূরা মুমিনুন : ৮২-৮৩

প্রাক-ইসলামি আরবের সামাজিক কাঠামো মূলত ছিল গোত্রভিত্তিক। গোত্রীয় সম্মান ব্যতীত অন্যকিছুতে কোনো সম্মান ছিল না।২৯৮ কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর দাওয়াতে রক্তের বন্ধনের চাইতে ধর্মীয় সম্পর্কের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছিলেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে এক এবং একমাত্র আল্লাহতে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে একটি সম্পূর্ণ নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। ২৯৯ আর তাই মদিনায় হিজরতের পর ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বিশ্বাসীদের দাঁড় করিয়েছিলেন একই কাতারে।

ইসলামপূর্ব যুগে এত সব অনাচারের পাশাপাশি আরবদের বেশ কিছু প্রশংসনীয় গুণাবলিও ছিল। কুরআনে সেগুলোর বর্ণনা এসেছে। জাহেলি যুগের সেই বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর উদারতা, সাহসিকতা, মহানুভবতা, বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদিতাকে একীভূত করার মাধ্যমে তাদের শুদ্ধ ও সতেজ করেছেন।৩০০ আলি (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যথার্থ মন্তব্য করেন-
'তিনি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উদার, সবচেয়ে দৃঢ় হৃদয়ের, সবচেয়ে সত্যবাদী, আমানতের দেখভালে সবচেয়ে বিশ্বস্ত, মনের দিক দিয়ে সবচেয়ে শান্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ, মেলামেশায় সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। যারা অপরিচিত হওয়ার কারণে তাঁকে প্রথমে দেখে ভয় পেত, তাঁরাও পরিচিত হওয়ার পর তাঁকে প্রাণপণে ভালোবাসত। সত্যিই তাঁর মতো মানুষ আমি আর দেখিনি।'৩০১

মূর্তিপূজা, কুসংস্কার ও পৌত্তলিকতা পূর্ববর্তী নবিদের শিক্ষাগুলো সমাজ থেকে মুছে দিয়েছিল। ফলে মুহাম্মাদ (সা.)-কে যে তাঁর মিশন বাস্তবায়ন করতে এক বিশাল বাধার মুখোমুখি হতে হবে, এ ব্যাপারে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন। ফরাসি কবি ল্যা মার্টিন নবিজি সম্পর্কে বলেন-
'ইতিহাসের কোনো মানুষই তাঁর ক্ষমতার বাইরে এসে এতদূর পর্যন্ত কোনো কাজ করতে পারেননি। অবাক লাগে-মরুভূমিতে থাকা একজন মানুষ কোনো যন্ত্র বা অগণিত মানুষের সাহায্য ছাড়া কিছু মুষ্টিমেয় লোককে নিয়ে সমাজ পরিবর্তন করে ফেলেছিলেন!'৩০২

টিকাঃ
২৯৬ আবুল হাসান আলি, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (Lucknow : Academy of Islamic Research and Publication, 1982), p.28
২৯৭ তোশিহিকো ইজুতসু, Ethico-Religious Concepts in the Qur'an (Kuala Lumpur: Islamic Book Trust, 2004), p. 49
২৯৮ ইজ্জতসু Ethico-Religious Concepts in the Qur'an, pp.60 and 63.
২৯৯ ইজ্জতসু Ethico-Religious Concepts in the Qur'an, pp.63 and 66.
৩০০ ইজুতসু Ethico-Religious Concepts in the Qur'an, p.82.
৩০১ ইবনে ইসহাক, ভলিউম ১, পৃ. ২২৬
৩০২ আলফনসে দে লা মর্টিন Histoire de la Turquie, Vol. II (Paris: Lecou, 1854), p.276; as quoted by Ali, Muhammad Rasulullah, p.49.

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 রূপান্তরুমূলক অর্জন

📄 রূপান্তরুমূলক অর্জন


মক্কায় বসবাসরত আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে মুসলমানদের প্রাথমিক রূপান্তর ঐতিহাসিক বিবরণীগুলোতে পরিপূর্ণরূপে চিত্রিত হয়েছে। নবিজির চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন বেড়ে যায় বহুগুণে। প্রতিকূল পরিস্থিতির বিবেচনায় নবিজি মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে নির্যাতিত একটি দলকে হাবশায় প্রেরণ করেন ধর্মপ্রাণ রাজা নাজ্জাশির অধীনে বসবাস করার জন্য।

সেই খবর মক্কার মুশরিকদের কানে পৌঁছালে তারা সেখানে দূত পাঠায়। এই দূতরা নাজ্জাশিকে ভুলিয়ে মুসলমানদের পুনরায় মক্কায় ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল।

ক্ষুদ্র মুসলিম দলটির পক্ষে জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) নাজ্জাশির দরবারে একটি জ্বালাময়ী ভাষণ দেন, যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে। তিনি বলেন-
'আমরা ছিলাম মূর্তিপূজক। আমরা আমাদের মেয়ে সন্তানদের জ্যান্ত কবর দিতাম। অভ্যস্ত ছিলাম খারাপ আচার-আচরণে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম। একে অন্যের সঙ্গে মারামারি করতাম। খাবার হিসেবে খেতাম মৃত জীবজন্তু। লিপ্ত ছিলাম অনৈতিকতায়।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আমাদের মধ্য হতে একজনকে প্রেরণ করলেন। তাঁর বংশ, পরিবার, সততা সম্পর্কে আমরা পূর্ণ অবহিত। তিনি আমাদের আল্লাহর পথে চলার জন্য আহ্বান জানালেন। দিলেন এক আল্লাহর ইবাদত করার শিক্ষা। নির্দেশ দিলেন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করার। খারাপ কাজ হতে দূরে থাকতে বললেন।

তাঁর কাছে আল্লাহ কুরআন নাজিল করেন। আমরা তা অনুসরণ করি। শুধু এই কারণে আমাদের গোত্রের লোকেরা আমাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করা শুরু করে। পুনরায় মূর্তিপূজা করতে জোরজবরদস্তি করতে থাকে। তাদের নিষ্পেষণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌছালে আমরা আমাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হই।'

মানুষের কাছে আল্লাহর বার্তা পৌঁছানোর এই প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল। বিদায় হজের ভাষণে নবিজি আসমানের দিকে মুখ করে বলেন-'হে আল্লাহ! আমি সকলের কাছে তোমার বাণী পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছি।' বলার পর মানুষদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন-'আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?' সমস্বরে উপস্থিত সবাই বলেন-'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।' আল্লাহর রাসূল (সা.) আবারও আসমানের দিকে তাকিয়ে বলেন-
'ইয়া আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো। ৩০০ সাথে সাথেই আল্লাহ কুরআনের আয়াত নাজিল করে বলেন-
'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।' সূরা মায়েদা : ৩

মুহাম্মাদ (সা.) আরবদের কুসংস্কারপূর্ণ বিশ্বাস থেকে ঈমানের পথে নিয়ে আসার প্রচেষ্টায় পরিপূর্ণ সাফল্য লাভ করেন। মক্কা বিজয় করে যখন তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে মদিনায় প্রবেশ করেন, তখন সেখানকার চিত্র সম্পূর্ণ পালটে যায়। তিনি শুধু সমাজে পরিবর্তন আনেননি; বরং তাঁর দেখা স্বপ্নকে বাস্তবিক করেছিলেন। মদ্য পান, জুয়া, সুদ, কুসংস্কার, আন্তঃউপজাতি বৈরিতার মতো কাজকে আরব থেকে নির্মূলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।৩০৪

ইসলাম মক্কা-মদিনার কাঁটাতার পেরিয়ে সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর পুরো আরব সমাজ পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভ্রাতৃত্বের মিশেলে এক আল্লাহয় বিশ্বাসী উম্মতে পরিণত হয়। নতুন মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় শান্তি, সততা, উদারতা প্রভৃতি মূল্যবোধের ওপর। তাঁরা ছিল এমন এক সম্প্রদায়, যারা আল্লাহমুখী হতে চেয়েছিল। তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের পুরস্কার পাওয়ার জন্য চালাত সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।

মদিনা শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর শহর হিসেবে। সেখানে গড়ে উঠেছিল একটি মহৎ ও আধ্যাত্মিক সমাজ। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল-আল্লাহর বাণীর ভিত্তিতে নিজেদের ও সমাজকে গড়ে তোলা। নবিজির অনিন্দ্যসুন্দর মিতব্যয়ী, অনাড়ম্বরপূর্ণ সহজ-সরল জীবনধারাকে বিশ্বের আড়ম্বর ও চাকচিক্য স্পর্শই করতে পারেনি। অথচ তখন তিনি সমগ্র আরবের নিরঙ্কুশ শাসক। ৩০৫ জাতি, গোত্র, লিঙ্গ, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য নির্বিশেষে এক ইনসাফময় সমাজ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ইরা ল্যাপিডাস নবিজির জীবনের কৃতিত্ব বর্ণনা করে বলেন-
'মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর একত্বের দর্শনের ভিত্তিতে তাঁর অনুসারীদের একটি রাজনৈতিক নকশা প্রদান করেছিলেন। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বিশ্বাসের সাথে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হলেও ইসলামে আল্লাহর মহিমা, সর্বশক্তিমানতা ও অমুখাপেক্ষিতা সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহর কাছে নিজের বশ্যতা স্বীকার, তাঁর আদেশের কাছে আত্মসমর্পণ এবং তাঁকে সুবিচারক হিসেবে মেনে নেওয়া সব তাওহিদি ধর্মগুলোর নিজস্ব কাঠামো থাকলেও কুরআনের শিক্ষা একটি বিশেষ মৌলিকত্ব দিয়েছে। ইসলাম একেশ্বরবাদী মূল্যবোধ ও আরব সমাজের বিদ্যমান রীতিনীতির সংস্কারপূর্বক একটি নতুন সম্প্রদায় গঠন করে। তাঁরা পরবর্তী সময়ে তাদের জীবন, আচার-অনুষ্ঠান এবং আইনি নিয়মাবলিতে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।৩০৬

এটিই ছিল সেই উম্মাহ, সেই ভ্রাতৃত্ব, যা সমস্ত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সব জাতিগোষ্ঠীকে একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ে পরিণত করেছিল। তাঁরা এমন এক আইন তৈরি করেছিল, যা প্রয়োগ করে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ জনগণের মধ্যে ইনসাফ বজায় রাখতেন। কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ও উদাহরণে মুসলমানরা পরবর্তী সময়ে খুঁজে পেয়েছে এমন আইন, যাতে বিশ্বাসীদের মধ্যে ছিল-দুর্বল ও দরিদ্রদের যত্ন, শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের জন্য সর্বদা নিবেদিত সরকারব্যবস্থা।'৩০৭

দাউদ শাহ (রহ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামাজিক সংস্কার বাস্তবায়নে সফলতার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তাঁর উল্লিখিত কারণগুলো হলো-
প্রথম ধাপ: নবিজি মানুষকে আল্লাহর একত্বের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করিয়েছিলেন, যা তাদের হৃদয়ে খোদাভীতির অনুভূতি তৈরি করেছিল।

দ্বিতীয় ধাপ : তিনি মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন-শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং তদনুযায়ী তারা পুরস্কৃত হবে বা শাস্তি পাবে।
তৃতীয় ধাপ : তিনি তাঁর মুজিজা, ব্যক্তিগত উদাহরণ এবং কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করার মাধ্যমে মানুষকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
চতুর্থ ধাপ: তিনি মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য পদ্ধতিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।

পরিশেষে বিভিন্ন সামাজিক কুফলের নির্ধারিত কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করে সমাজের কার্যকর সংস্কার ও পরিবর্তনে অবদান রাখেন।৩০৮

টিকাঃ
০০০ মুসনাদে আহমাদ, ১৯৭৭৪.
০০৪ শাহ, নবি মুহাম্মাদ (সা.): একজন শিক্ষক, পৃ.-২১২
৩০৫ জাকারিয়া বাশির, Sunshine at Madinah, pp. 220-222
৩০৬ ‘Islam’ or ‘The Surrender to God’, was the primal religion of all the Prophets of God.
৩০৭ লাপিদুস, ইসলামি সমাজের ইতিহাস, পৃ.-৪৪-৪৫
৩০৮ শাহ, নবি মুহাম্মাদ (সা.): একজন শিক্ষক, পৃ.-২২৬

মক্কায় বসবাসরত আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে মুসলমানদের প্রাথমিক রূপান্তর ঐতিহাসিক বিবরণীগুলোতে পরিপূর্ণরূপে চিত্রিত হয়েছে। নবিজির চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন বেড়ে যায় বহুগুণে। প্রতিকূল পরিস্থিতির বিবেচনায় নবিজি মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে নির্যাতিত একটি দলকে হাবশায় প্রেরণ করেন ধর্মপ্রাণ রাজা নাজ্জাশির অধীনে বসবাস করার জন্য।

সেই খবর মক্কার মুশরিকদের কানে পৌঁছালে তারা সেখানে দূত পাঠায়। এই দূতরা নাজ্জাশিকে ভুলিয়ে মুসলমানদের পুনরায় মক্কায় ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল।

ক্ষুদ্র মুসলিম দলটির পক্ষে জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) নাজ্জাশির দরবারে একটি জ্বালাময়ী ভাষণ দেন, যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে। তিনি বলেন-
'আমরা ছিলাম মূর্তিপূজক। আমরা আমাদের মেয়ে সন্তানদের জ্যান্ত কবর দিতাম। অভ্যস্ত ছিলাম খারাপ আচার-আচরণে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম। একে অন্যের সঙ্গে মারামারি করতাম। খাবার হিসেবে খেতাম মৃত জীবজন্তু। লিপ্ত ছিলাম অনৈতিকতায়।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আমাদের মধ্য হতে একজনকে প্রেরণ করলেন। তাঁর বংশ, পরিবার, সততা সম্পর্কে আমরা পূর্ণ অবহিত। তিনি আমাদের আল্লাহর পথে চলার জন্য আহ্বান জানালেন। দিলেন এক আল্লাহর ইবাদত করার শিক্ষা। নির্দেশ দিলেন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করার। খারাপ কাজ হতে দূরে থাকতে বললেন।

তাঁর কাছে আল্লাহ কুরআন নাজিল করেন। আমরা তা অনুসরণ করি। শুধু এই কারণে আমাদের গোত্রের লোকেরা আমাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করা শুরু করে। পুনরায় মূর্তিপূজা করতে জোরজবরদস্তি করতে থাকে। তাদের নিষ্পেষণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌছালে আমরা আমাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হই।'

মানুষের কাছে আল্লাহর বার্তা পৌঁছানোর এই প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল। বিদায় হজের ভাষণে নবিজি আসমানের দিকে মুখ করে বলেন-'হে আল্লাহ! আমি সকলের কাছে তোমার বাণী পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছি।' বলার পর মানুষদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন-'আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?' সমস্বরে উপস্থিত সবাই বলেন-'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।' আল্লাহর রাসূল (সা.) আবারও আসমানের দিকে তাকিয়ে বলেন-
'ইয়া আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো। ৩০০ সাথে সাথেই আল্লাহ কুরআনের আয়াত নাজিল করে বলেন-
'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।' সূরা মায়েদা : ৩

মুহাম্মাদ (সা.) আরবদের কুসংস্কারপূর্ণ বিশ্বাস থেকে ঈমানের পথে নিয়ে আসার প্রচেষ্টায় পরিপূর্ণ সাফল্য লাভ করেন। মক্কা বিজয় করে যখন তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে মদিনায় প্রবেশ করেন, তখন সেখানকার চিত্র সম্পূর্ণ পালটে যায়। তিনি শুধু সমাজে পরিবর্তন আনেননি; বরং তাঁর দেখা স্বপ্নকে বাস্তবিক করেছিলেন। মদ্য পান, জুয়া, সুদ, কুসংস্কার, আন্তঃউপজাতি বৈরিতার মতো কাজকে আরব থেকে নির্মূলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।৩০৪

ইসলাম মক্কা-মদিনার কাঁটাতার পেরিয়ে সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর পুরো আরব সমাজ পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভ্রাতৃত্বের মিশেলে এক আল্লাহয় বিশ্বাসী উম্মতে পরিণত হয়। নতুন মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় শান্তি, সততা, উদারতা প্রভৃতি মূল্যবোধের ওপর। তাঁরা ছিল এমন এক সম্প্রদায়, যারা আল্লাহমুখী হতে চেয়েছিল। তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের পুরস্কার পাওয়ার জন্য চালাত সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।

মদিনা শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর শহর হিসেবে। সেখানে গড়ে উঠেছিল একটি মহৎ ও আধ্যাত্মিক সমাজ। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল-আল্লাহর বাণীর ভিত্তিতে নিজেদের ও সমাজকে গড়ে তোলা। নবিজির অনিন্দ্যসুন্দর মিতব্যয়ী, অনাড়ম্বরপূর্ণ সহজ-সরল জীবনধারাকে বিশ্বের আড়ম্বর ও চাকচিক্য স্পর্শই করতে পারেনি। অথচ তখন তিনি সমগ্র আরবের নিরঙ্কুশ শাসক। ৩০৫ জাতি, গোত্র, লিঙ্গ, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য নির্বিশেষে এক ইনসাফময় সমাজ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ইরা ল্যাপিডাস নবিজির জীবনের কৃতিত্ব বর্ণনা করে বলেন-
'মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর একত্বের দর্শনের ভিত্তিতে তাঁর অনুসারীদের একটি রাজনৈতিক নকশা প্রদান করেছিলেন। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বিশ্বাসের সাথে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হলেও ইসলামে আল্লাহর মহিমা, সর্বশক্তিমানতা ও অমুখাপেক্ষিতা সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহর কাছে নিজের বশ্যতা স্বীকার, তাঁর আদেশের কাছে আত্মসমর্পণ এবং তাঁকে সুবিচারক হিসেবে মেনে নেওয়া সব তাওহিদি ধর্মগুলোর নিজস্ব কাঠামো থাকলেও কুরআনের শিক্ষা একটি বিশেষ মৌলিকত্ব দিয়েছে। ইসলাম একেশ্বরবাদী মূল্যবোধ ও আরব সমাজের বিদ্যমান রীতিনীতির সংস্কারপূর্বক একটি নতুন সম্প্রদায় গঠন করে। তাঁরা পরবর্তী সময়ে তাদের জীবন, আচার-অনুষ্ঠান এবং আইনি নিয়মাবলিতে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।৩০৬

এটিই ছিল সেই উম্মাহ, সেই ভ্রাতৃত্ব, যা সমস্ত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সব জাতিগোষ্ঠীকে একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ে পরিণত করেছিল। তাঁরা এমন এক আইন তৈরি করেছিল, যা প্রয়োগ করে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ জনগণের মধ্যে ইনসাফ বজায় রাখতেন। কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ও উদাহরণে মুসলমানরা পরবর্তী সময়ে খুঁজে পেয়েছে এমন আইন, যাতে বিশ্বাসীদের মধ্যে ছিল-দুর্বল ও দরিদ্রদের যত্ন, শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের জন্য সর্বদা নিবেদিত সরকারব্যবস্থা।'৩০৭

দাউদ শাহ (রহ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামাজিক সংস্কার বাস্তবায়নে সফলতার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তাঁর উল্লিখিত কারণগুলো হলো-
প্রথম ধাপ: নবিজি মানুষকে আল্লাহর একত্বের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করিয়েছিলেন, যা তাদের হৃদয়ে খোদাভীতির অনুভূতি তৈরি করেছিল।

দ্বিতীয় ধাপ : তিনি মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন-শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং তদনুযায়ী তারা পুরস্কৃত হবে বা শাস্তি পাবে।
তৃতীয় ধাপ : তিনি তাঁর মুজিজা, ব্যক্তিগত উদাহরণ এবং কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করার মাধ্যমে মানুষকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
চতুর্থ ধাপ: তিনি মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য পদ্ধতিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।

পরিশেষে বিভিন্ন সামাজিক কুফলের নির্ধারিত কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করে সমাজের কার্যকর সংস্কার ও পরিবর্তনে অবদান রাখেন।৩০৮

টিকাঃ
০০০ মুসনাদে আহমাদ, ১৯৭৭৪.
০০৪ শাহ, নবি মুহাম্মাদ (সা.): একজন শিক্ষক, পৃ.-২১২
৩০৫ জাকারিয়া বাশির, Sunshine at Madinah, pp. 220-222
৩০৬ ‘Islam’ or ‘The Surrender to God’, was the primal religion of all the Prophets of God.
৩০৭ লাপিদুস, ইসলামি সমাজের ইতিহাস, পৃ.-৪৪-৪৫
৩০৮ শাহ, নবি মুহাম্মাদ (সা.): একজন শিক্ষক, পৃ.-২২৬

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 পরিবর্তনশীল তত্ত্ব এবং নবিজির পরিবর্তনশীল নেতৃত্ব

📄 পরিবর্তনশীল তত্ত্ব এবং নবিজির পরিবর্তনশীল নেতৃত্ব


আমরা এখন নবিজির পরিবর্তনের সফল কৌশলের গতিশীলতা বোঝার জন্য আধুনিক পরিবর্তন তত্ত্ব ও ধারণাগুলো দেখব। আধুনিক তত্ত্বগুলোতে দুটি উপাদান পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। সেগুলো হলো-নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন।

নেতৃত্বের পরিবর্তন গতিবেগ সৃষ্টিকারী ব্যক্তির শৈলী, গুণাবলি, মূল্যবোধ ও আচরণকে পরিবেষ্টন করে। ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে হাতিয়ার, প্রক্রিয়া ও কৌশল, যা মানুষকে পরিবর্তনের মাধ্যমে অগ্রসর হতে সাহায্য করার জন্য ব্যবহৃত হয়। ৩০৯

সফল পরিবর্তন পরিচালনার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিশনকে রোলমডেল হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। কার্যকর পরিবর্তন ব্যবস্থাপনাকে পশ্চিমা ব্যবসায়ীরা আটটি ধাপে তুলে ধরেছে। ৩১০ এগুলো হলো-
১. পরিবর্তন আনতে কাজ করার জন্য বাধ্যবাধকতা তৈরি করুন।
২. পরিবর্তন নিয়ে আসা ক্ষমতাবান মানুষদের নিয়ে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করুন।
৩. ফলাফল অর্জনের জন্য কৌশল ব্যবহার করে পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করুন।
৪. পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর বার্তা প্রদান করুন।
৫. পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করতে প্রতিবন্ধকতা অপসারণের চেষ্টা করুন।
৬. মনোবল বজায় রাখতে স্বল্পমেয়াদি প্রতিযোগিতা তৈরি করুন।
৭. পরিবর্তনের ওপর নিজেকে গড়ে তুলুন।
৮. সাংগঠনিক সংস্কৃতি বা প্রক্রিয়াকরণ পরিবর্তনগুলোকে আয়ত্ত করুন।

প্রথম ধাপ: মুহাম্মাদ (সা.)-কে আল্লাহ তাঁর রাসূল হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এই নবুয়ত তাঁকে কুরআনের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহর দ্বীন প্রচার করেছিলেন। ফলে তাঁকে নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। জন্মভূমি থেকে চিরতরে বহিষ্কৃত হওয়ার; এমনকি দেখা দিয়েছিল জীবনের আশঙ্কাও।

কিন্তু তিনি কারও কাছে সাহায্যের আবেদন করেননি। কারণ, তিনি পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করতেন-আল্লাহ তাঁর মিশনে নিশ্চিত সাফল্য এনে দেবেন। তিনি তাঁর কিশোর বয়সে জাহেলি যুগের মূর্তিপূজারি সংস্কৃতির অবলোকন করে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।

এজন্য নবুয়তের পূর্বে কুরাইশের কিছু নীতিবান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে 'হিলফুল ফুজুল' নামে একটি সংগঠন দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁরা এই সংগঠনের মাধ্যমে নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল-ন্যায়বিচার না হওয়া পর্যন্ত নিপীড়িতদের পক্ষে থাকবেন, দাঁড়াবেন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে। সেই নির্যাতিত ব্যক্তি যে কেউ হতে পারে; কুরাইশ কিংবা বহিরাগত আগন্তুক। ৩১১ পরবর্তী সময়ে এই সংগঠন সম্পর্কে নবিজি বলেছিলেন-
'আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদানের বাড়িতে এত চমৎকার একটি চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম, এতে আমার অংশ লাল উটের পালের বিনিময় হলেও দেবো না। এখনও যদি আমাকে তাতে উপস্থিত থাকতে ডাকা হয়, আমি সানন্দে তাতে সাড়া দেবো। '৩১২

দ্বিতীয় ধাপ : নবুয়তের প্রাথমিক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) আবেগের সাথে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তখন তিনি তিরস্কারের পর তিরস্কারের সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু হাল ছেড়ে দেননি। তাঁর পুঁজি ছিল ধৈর্য, দৃঢ়তা ও বিশ্বাস। ফলে ছোট্ট একটি দল ইসলামে আসতে থাকে।

নিজের পরিবার; স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও চাচাতো ভাই আলি ইবনে আবু তালিব (রা.) -এর সমর্থন ছাড়াও তিনি আবু বকর, হামজা ও উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর মতো কুরাইশদের মধ্যে থাকা শক্তিশালী নীতিবান নেতাদের আকর্ষণ করেছিলেন। তাঁরা প্রভাবশালীদের মধ্যে পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন।

ইসলামের ছায়াতলে আসা দলটির ওপর ক্রমবর্ধমান নিপীড়ন, সামাজিক বয়কট বাড়তে থাকে। নবিজির প্রভাবশালী চাচা আবু তালিব এবং বিশ্বস্ত সহায়িকা স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুতে চ্যালেঞ্জ এবং বিরোধিতা বহুগুণে বেড়ে যায়। তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাহাবি রাসূল (সা.)-এর আশাবাদী চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরা কখনো হতাশায় পড়েননি।

এরপর রাসূল (সা.)-এর বিরুদ্ধে উসকানির তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। কুরাইশরা তাঁর দাওয়াতি কাজ বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় আরও হন্যে হয়ে উঠেপড়ে লাগে; এমনকি স্বয়ং আন্দোলনের সিপাহশালার রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। ফলে হিজরত অনিবার্য হয়ে ওঠে মুসলমানদের জন্য।

এ সময়টাতেই মদিনার কয়েকজন নাগরিক মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁরা বলেন- 'আমরা আমাদের লোকদের ছেড়ে চলে এসেছি। কারণ, তাদের মতো শত্রুতা ও পাপাচারে লিপ্ত আর কোনো গোত্র নেই। সম্ভবত আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাদের একত্রিত করবেন। আমরা আপনার দাওয়াত এবং এই ধর্ম নিয়ে তাদের কাছে যাব। আল্লাহ যদি তাদের আপনার চারপাশে একত্রিত করেন, তবে আপনার চেয়ে উচ্চতর কেউ হবেন না।'

তাঁরা মদিনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁদের নেতা হিসেবে গ্রহণ এবং তাঁকে সুরক্ষা প্রদান করতে নিজ গোত্রের লোকদের রাজি করান। ফলে মদিনা হয়ে ওঠে মুসলমানদের হিজরতের উপযুক্ত স্থান। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে রাসূল (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। গঠিত হয় একটি নতুন রাষ্ট্র; 'মদিনা সনদ' হয়ে ওঠে তার সংবিধান। এই নতুন রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন রাসূলুল্লাহ (সা.)।৩১৩

নতুন রাষ্ট্র গঠিত হবার পর মুসলমানরা দুটি বিষয়ের প্রতি একনিষ্ঠভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠে-আল্লাহর ইবাদত (তাওহিদ) এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ (আমর বিল মারুফ ওয়া নাহিআনিল মুনকার)। ৩১৪

তৃতীয় ধাপ : রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিশন ছিল সহজে বিশ্বের সমস্ত মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের সম্পূর্ণরূপে এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করার আমন্ত্রণ। নবিজির শিক্ষাগুলো নতুন মুসলিম সম্প্রদায়কে দিকনির্দেশনা এবং পরিবর্তনের জন্য স্পষ্ট ধারণা প্রদান করেছিল।

চতুর্থ ধাপ : তৎকালীন আরবরা মুখস্থ দক্ষতার জন্য ছিল সুপরিচিত। সাহাবিরা নাজিল হওয়া কুরআনের আয়াত এবং নবিজির মুখের বাণী তথা হাদিস; উভয়টিই মুখস্থ করেছিলেন। কুরআন মানুষের হৃদয় ও মনকে টেনে নিয়েছিল। নবিজিও তাঁর বাগ্মিতার জন্য ছিলেন বিখ্যাত। ইসলামের বাণী এভাবে তাঁর অনুসারীদের কাছে অত্যন্ত কার্যকরভাবে প্রচার করা হয়েছিল। আর পরবর্তী সময়ে তাঁরা অন্যদের কাছে প্রেরণ করেছিলেন।

পঞ্চম ধাপ : পরিবর্তনের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে মানবীয় প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিবন্ধকতাও অন্তর্ভুক্ত। কুরআন প্রদত্ত যুক্তি এবং নবির প্রজ্ঞার মাধ্যমে পূর্ববর্তী জাহেলি সমাজের প্রতিবন্ধকতা যেমন: মূর্তিপূজা, ভণ্ডামি, বস্তুবাদ, অন্যায় একের পর এক দূর হতে থাকে। মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সাহাবিদের ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে মুক্ত করে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে সচেষ্ট ছিলেন। গিবত, অপবাদ, সন্দেহ, হিংসা, ঈর্ষা ও অহংকার এড়িয়ে মানুষদের জন্য সম্মান ও মর্যাদা প্রচার করেছেন। তিনি বলেছেন-
'আল্লাহর পথে যোদ্ধা সেই ব্যক্তি, যে তার নফসের বিরুদ্ধে আল্লাহর আনুগত্যের জন্য সংগ্রাম করে।'৩১৫

কষ্ট, ক্ষুধা ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েই মুসলিম সমাজে প্রকৃত নেতাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। সাহাবিদের চরিত্রে গভীর পরিবর্তনের ফলেই ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছিল।

ষষ্ঠ ধাপ : স্বল্পমেয়াদি বিজয়গুলো পর্যায়ক্রমে সংঘটিত হয়। যেমন: কিছু শক্তিশালী মানুষের ইসলাম গ্রহণ, হাবশার রাজা কর্তৃক প্রাথমিক মুসলিম উদ্বাস্তুদের সমর্থন, মদিনায় আনসারগণের কাছে মুহাজিরদের গ্রহণযোগ্যতা, মদিনার জনগণ কর্তৃক মুহাম্মাদ (সা.)-কে নেতা হিসেবে গ্রহণ এবং বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের বিস্ময়কর বিজয়।

সপ্তম ধাপ : মুসলমানরা তাদের ভুল থেকে শিখেছিল। যেমন: উহুদের যুদ্ধের সময় একটি দল নবিজির আদেশ উপেক্ষা করে। ফলে তাদের ওপর নেমে আসে বিপর্যয়। আবার অনেক সাহাবি হুদাইবিয়ার চুক্তিতে নবিজির প্রজ্ঞা দেখতে পাননি। এই চুক্তির মাধ্যমে ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে কুরাইশদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা হয়; যদিও কুরাইশরা এই চুক্তি ভঙ্গ করে। নবিজি তাঁর ইতিবাচক বাস্তবতার মাধ্যমে অন্যদের শেখাতে ও জানাতে অত্যন্ত সফল ছিলেন। হুদাইবিয়াতে থাকা চৌদ্দশত সাহাবিকে এই ঘোষণা দিয়ে উৎসাহিত করেন-'তোমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ। '৩১৬

সময়ের সাথে সাথে সমাজের লোকের নবিজির শিক্ষা দ্বারা উদ্দীপিত পরিবর্তনগুলোর মাধ্যমে প্রচুর সুবিধা দেখতে পেয়েছিল, যা তাদের প্রচেষ্টাকে করেছিল আরও বেশি উৎসাহিত। হুদাইবিয়া চুক্তির মাধ্যমে মুসলমানদের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রকারান্তরে এটা ছিল ইসলামের সবচেয়ে বড়ো বিজয়। এই চুক্তির পরেই সকল যুদ্ধ, রক্তারক্তি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষজন নিরাপদে আলোচনা ও বিতর্কে মিলিত হতে পারত। এই চুক্তির ফলেই সকল মানুষের কাছে অবারিতভাবে ইসলামের আহ্বান পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এর পরবর্তী দুই বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে, দাওয়াতের সূচনা থেকে হুদাইবিয়ার সন্ধি পর্যন্ত তত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেনি। ফলে পরবর্তী সময়ে রাসূল (সা.) প্রায় ১০,০০০ লোক নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন এবং মক্কা বিজয় হয়েছিল। ৩১৭

মক্কা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কর্তৃত্বে চলে আসার পর মুসলিমদের ব্যাপক উন্নতি হয়। এরপর শুরু হয় সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামের বার্তা প্রেরণের কাজ। কুরাইশরা ইসলামে আত্মসমর্পণ করে। আরবরা জানত-তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাদের এই পরিমাণ শক্তি নেই, যা দ্বারা যুদ্ধ করবে বা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সাথে শত্রুতা করবে। সুতরাং তাঁরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করা শুরু করল। ৩১৮

অষ্টম ধাপ: মুহাম্মাদ (সা.) ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের অবস্থার মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো ঘটিয়েছিলেন, তাঁর ইন্তেকালের পরও তা বজায় ছিল। ফলে ইসলামি শিক্ষা ও অনুশীলনগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং আজ অবধি তা অব্যাহত আছে। এটি সম্ভব হয়েছিল-কারণ, মুহাম্মাদ (সা.) সফলভাবে ব্যক্তি-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন থেকে একটি প্রক্রিয়া-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে রূপান্তর করেছিলেন।৩১৯

মির্জা ইয়াওয়ার বেইগ তিনটি অপরিহার্য উপাদান প্রদানের মাধ্যমে এটি অর্জন করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন-

প্রথমত, স্পষ্ট, সরল কিন্তু শক্তিশালী এবং মানুষের গভীর চাহিদা পূরণ করে-এমন বিশ্বাস ও মূল্যবোধের একটি মূল মানদণ্ড থাকার মাধ্যমে।

দ্বিতীয়ত, একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব থাকা, যা মতাদর্শ প্রচার করার এবং অনুসারীদের জন্য অনুশীলন করার শর্ত তৈরি করার মাধ্যমে।

তৃতীয়ত, তহবিল তথা বায়তুলমাল সংগ্রহ, হিসাব-নিকাশ ও তা বিতরণপূর্বক সমাজের অর্থনৈতিক সাম্য অবস্থা আনয়নের নিমিত্তে একটি কেন্দ্রীয় বায়তুলমাল প্রশাসন গঠনের মাধ্যমে।

সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের উত্তরসূরিরা এর ফলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণকারী নেতা হয়ে ওঠেন; যারা ইসলামের বার্তা শিখিয়েছিলেন এবং অন্যদের নিকট তা সফলভাবে পৌঁছে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রকার পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতেও তাঁরা নবিজির মহান শিক্ষাকে উপস্থিত সংস্কৃতি ও ভূগোলের সাথে মিলিয়ে প্রয়োগ করে মানবতা রক্ষা করেছিলেন।

সাহাবায়ে কেরামের সেই সম্প্রদায়ের অসাধারণ পরিবর্তনের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হলো-পারস্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বিজয়। দরিদ্র, দুর্বল অস্ত্রসম্পন্ন এই ছোটো দলটি সাঁজোয়া সেনাবাহিনীকে উৎখাত করেছিল। আর এভাবেই আল্লাহ তাঁদের অনেক সম্মান দিয়ে উঁচুতে নিয়ে গিয়েছেন। ৩২০ রাসূল (সা.) তাঁর শেষ খুতবায় নির্দেশ দিয়েছেন-
'যারা আমার কথা শুনবে, তারা যেন তা অন্যদের কাছে প্রেরণ করে।'৩২১

এটাই নিশ্চিত করে-নবি (সা.)-এর শিক্ষাগুলো বিশ্বস্তভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রেরণ করা হয়েছে, যা মানবতাকে আধ্যাত্মিকভাবে অনন্তকাল ধরে অনুপ্রাণিত করে চলছে।

মুসলিম খলিফাদের রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করতে গিয়ে বলেছেন, তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মূল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্যুত হবেন না। তাঁদের কাজ হবে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইবাদত করা এবং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ এড়ানো। রাসূল (সা.) সাহাবিদের বলেন-
'আমার এই পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার পরে তোমাদের নিয়ে যে বিষয়ে উদ্বিগ্ন তা হলো-দুনিয়ার আকর্ষণ ও ঐশ্বর্য, যা তোমাদের বিজয়ের ফলে তোমাদের কাছে বিস্তৃত হতে পারে।'৩২২

পরবর্তী মুসলিম প্রজন্ম যখনই এই আহ্বানকে উপেক্ষা করেছে, তারা ইতিহাসে অবজ্ঞার শিকার হয়েছে।

টিকাঃ
৩০৯ *Change Leadership vs Change Management.'
৩১০ জন পি. কটার, পরিবর্তনশীল, (Boston: Harvard Business School, 1996)
৩১১ মার্টিন লিংস, মুহাম্মাদ: পূর্ববর্তী সোর্সের আলোকে তাঁর জীবনী (London: Islamic Text Society, 1983), p.32.
৩১২ সিরাত ইবনে হিশাম
৩১৩ দেখুন মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ, পৃথিবীতে লিখিত প্রথম সংবিধান (Lahore: Mohammad Ashraf, 1975)
৩১৪ আল্লাহ তায়ালা সূরা আলে ইমরানের ১১০ নং আয়াতে বলেন-'তোমরা তো হচ্ছ শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের কল্যাণের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজে আদেশ করবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে।'
৩১৫ সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৬৭১, সনদ: হাসান। আরও, ইবনে হাম্বল, আল মুসনাদ : ১২৩৪
৩১৬ বুখারি: ৪১৫৪
৩১৭ ইবনে ইসহাক, সিরাতুন্নবি, পৃ.-১৩৫
৩১৮ ইবনে ইসহাক, সিরাতুন্নবি, পৃ.-১৬৫
৩১৯ মির্জা ইয়াওয়ার বেইগ। রাসূল (সা.)-এর জীবন হতে নেতৃত্বগুণ শিক্ষালাভ, পৃ.-২৩৯
৩২০ ইবনে আবি জাইদ আল ক্বারাওনি, মাদানিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি, পৃ.-১২
৩২১ ইমাম হাম্বল, মুসনাদ : ১৯৭৭৪
৩২২ বুখারি ও মুসলিম।

আমরা এখন নবিজির পরিবর্তনের সফল কৌশলের গতিশীলতা বোঝার জন্য আধুনিক পরিবর্তন তত্ত্ব ও ধারণাগুলো দেখব। আধুনিক তত্ত্বগুলোতে দুটি উপাদান পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। সেগুলো হলো-নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন।

নেতৃত্বের পরিবর্তন গতিবেগ সৃষ্টিকারী ব্যক্তির শৈলী, গুণাবলি, মূল্যবোধ ও আচরণকে পরিবেষ্টন করে। ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে হাতিয়ার, প্রক্রিয়া ও কৌশল, যা মানুষকে পরিবর্তনের মাধ্যমে অগ্রসর হতে সাহায্য করার জন্য ব্যবহৃত হয়। ৩০৯

সফল পরিবর্তন পরিচালনার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিশনকে রোলমডেল হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। কার্যকর পরিবর্তন ব্যবস্থাপনাকে পশ্চিমা ব্যবসায়ীরা আটটি ধাপে তুলে ধরেছে। ৩১০ এগুলো হলো-
১. পরিবর্তন আনতে কাজ করার জন্য বাধ্যবাধকতা তৈরি করুন।
২. পরিবর্তন নিয়ে আসা ক্ষমতাবান মানুষদের নিয়ে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করুন।
৩. ফলাফল অর্জনের জন্য কৌশল ব্যবহার করে পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করুন।
৪. পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর বার্তা প্রদান করুন।
৫. পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করতে প্রতিবন্ধকতা অপসারণের চেষ্টা করুন।
৬. মনোবল বজায় রাখতে স্বল্পমেয়াদি প্রতিযোগিতা তৈরি করুন।
৭. পরিবর্তনের ওপর নিজেকে গড়ে তুলুন।
৮. সাংগঠনিক সংস্কৃতি বা প্রক্রিয়াকরণ পরিবর্তনগুলোকে আয়ত্ত করুন।

প্রথম ধাপ: মুহাম্মাদ (সা.)-কে আল্লাহ তাঁর রাসূল হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এই নবুয়ত তাঁকে কুরআনের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহর দ্বীন প্রচার করেছিলেন। ফলে তাঁকে নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। জন্মভূমি থেকে চিরতরে বহিষ্কৃত হওয়ার; এমনকি দেখা দিয়েছিল জীবনের আশঙ্কাও।

কিন্তু তিনি কারও কাছে সাহায্যের আবেদন করেননি। কারণ, তিনি পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করতেন-আল্লাহ তাঁর মিশনে নিশ্চিত সাফল্য এনে দেবেন। তিনি তাঁর কিশোর বয়সে জাহেলি যুগের মূর্তিপূজারি সংস্কৃতির অবলোকন করে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।

এজন্য নবুয়তের পূর্বে কুরাইশের কিছু নীতিবান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে 'হিলফুল ফুজুল' নামে একটি সংগঠন দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁরা এই সংগঠনের মাধ্যমে নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল-ন্যায়বিচার না হওয়া পর্যন্ত নিপীড়িতদের পক্ষে থাকবেন, দাঁড়াবেন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে। সেই নির্যাতিত ব্যক্তি যে কেউ হতে পারে; কুরাইশ কিংবা বহিরাগত আগন্তুক। ৩১১ পরবর্তী সময়ে এই সংগঠন সম্পর্কে নবিজি বলেছিলেন-
'আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদানের বাড়িতে এত চমৎকার একটি চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম, এতে আমার অংশ লাল উটের পালের বিনিময় হলেও দেবো না। এখনও যদি আমাকে তাতে উপস্থিত থাকতে ডাকা হয়, আমি সানন্দে তাতে সাড়া দেবো। '৩১২

দ্বিতীয় ধাপ : নবুয়তের প্রাথমিক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) আবেগের সাথে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তখন তিনি তিরস্কারের পর তিরস্কারের সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু হাল ছেড়ে দেননি। তাঁর পুঁজি ছিল ধৈর্য, দৃঢ়তা ও বিশ্বাস। ফলে ছোট্ট একটি দল ইসলামে আসতে থাকে।

নিজের পরিবার; স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও চাচাতো ভাই আলি ইবনে আবু তালিব (রা.) -এর সমর্থন ছাড়াও তিনি আবু বকর, হামজা ও উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর মতো কুরাইশদের মধ্যে থাকা শক্তিশালী নীতিবান নেতাদের আকর্ষণ করেছিলেন। তাঁরা প্রভাবশালীদের মধ্যে পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন।

ইসলামের ছায়াতলে আসা দলটির ওপর ক্রমবর্ধমান নিপীড়ন, সামাজিক বয়কট বাড়তে থাকে। নবিজির প্রভাবশালী চাচা আবু তালিব এবং বিশ্বস্ত সহায়িকা স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুতে চ্যালেঞ্জ এবং বিরোধিতা বহুগুণে বেড়ে যায়। তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাহাবি রাসূল (সা.)-এর আশাবাদী চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরা কখনো হতাশায় পড়েননি।

এরপর রাসূল (সা.)-এর বিরুদ্ধে উসকানির তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। কুরাইশরা তাঁর দাওয়াতি কাজ বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় আরও হন্যে হয়ে উঠেপড়ে লাগে; এমনকি স্বয়ং আন্দোলনের সিপাহশালার রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। ফলে হিজরত অনিবার্য হয়ে ওঠে মুসলমানদের জন্য।

এ সময়টাতেই মদিনার কয়েকজন নাগরিক মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁরা বলেন- 'আমরা আমাদের লোকদের ছেড়ে চলে এসেছি। কারণ, তাদের মতো শত্রুতা ও পাপাচারে লিপ্ত আর কোনো গোত্র নেই। সম্ভবত আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাদের একত্রিত করবেন। আমরা আপনার দাওয়াত এবং এই ধর্ম নিয়ে তাদের কাছে যাব। আল্লাহ যদি তাদের আপনার চারপাশে একত্রিত করেন, তবে আপনার চেয়ে উচ্চতর কেউ হবেন না।'

তাঁরা মদিনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁদের নেতা হিসেবে গ্রহণ এবং তাঁকে সুরক্ষা প্রদান করতে নিজ গোত্রের লোকদের রাজি করান। ফলে মদিনা হয়ে ওঠে মুসলমানদের হিজরতের উপযুক্ত স্থান। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে রাসূল (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। গঠিত হয় একটি নতুন রাষ্ট্র; 'মদিনা সনদ' হয়ে ওঠে তার সংবিধান। এই নতুন রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন রাসূলুল্লাহ (সা.)।৩১৩

নতুন রাষ্ট্র গঠিত হবার পর মুসলমানরা দুটি বিষয়ের প্রতি একনিষ্ঠভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠে-আল্লাহর ইবাদত (তাওহিদ) এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ (আমর বিল মারুফ ওয়া নাহিআনিল মুনকার)। ৩১৪

তৃতীয় ধাপ : রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিশন ছিল সহজে বিশ্বের সমস্ত মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের সম্পূর্ণরূপে এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করার আমন্ত্রণ। নবিজির শিক্ষাগুলো নতুন মুসলিম সম্প্রদায়কে দিকনির্দেশনা এবং পরিবর্তনের জন্য স্পষ্ট ধারণা প্রদান করেছিল।

চতুর্থ ধাপ : তৎকালীন আরবরা মুখস্থ দক্ষতার জন্য ছিল সুপরিচিত। সাহাবিরা নাজিল হওয়া কুরআনের আয়াত এবং নবিজির মুখের বাণী তথা হাদিস; উভয়টিই মুখস্থ করেছিলেন। কুরআন মানুষের হৃদয় ও মনকে টেনে নিয়েছিল। নবিজিও তাঁর বাগ্মিতার জন্য ছিলেন বিখ্যাত। ইসলামের বাণী এভাবে তাঁর অনুসারীদের কাছে অত্যন্ত কার্যকরভাবে প্রচার করা হয়েছিল। আর পরবর্তী সময়ে তাঁরা অন্যদের কাছে প্রেরণ করেছিলেন।

পঞ্চম ধাপ : পরিবর্তনের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে মানবীয় প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিবন্ধকতাও অন্তর্ভুক্ত। কুরআন প্রদত্ত যুক্তি এবং নবির প্রজ্ঞার মাধ্যমে পূর্ববর্তী জাহেলি সমাজের প্রতিবন্ধকতা যেমন: মূর্তিপূজা, ভণ্ডামি, বস্তুবাদ, অন্যায় একের পর এক দূর হতে থাকে। মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সাহাবিদের ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে মুক্ত করে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে সচেষ্ট ছিলেন। গিবত, অপবাদ, সন্দেহ, হিংসা, ঈর্ষা ও অহংকার এড়িয়ে মানুষদের জন্য সম্মান ও মর্যাদা প্রচার করেছেন। তিনি বলেছেন-
'আল্লাহর পথে যোদ্ধা সেই ব্যক্তি, যে তার নফসের বিরুদ্ধে আল্লাহর আনুগত্যের জন্য সংগ্রাম করে।'৩১৫

কষ্ট, ক্ষুধা ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েই মুসলিম সমাজে প্রকৃত নেতাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। সাহাবিদের চরিত্রে গভীর পরিবর্তনের ফলেই ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছিল।

ষষ্ঠ ধাপ : স্বল্পমেয়াদি বিজয়গুলো পর্যায়ক্রমে সংঘটিত হয়। যেমন: কিছু শক্তিশালী মানুষের ইসলাম গ্রহণ, হাবশার রাজা কর্তৃক প্রাথমিক মুসলিম উদ্বাস্তুদের সমর্থন, মদিনায় আনসারগণের কাছে মুহাজিরদের গ্রহণযোগ্যতা, মদিনার জনগণ কর্তৃক মুহাম্মাদ (সা.)-কে নেতা হিসেবে গ্রহণ এবং বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের বিস্ময়কর বিজয়।

সপ্তম ধাপ : মুসলমানরা তাদের ভুল থেকে শিখেছিল। যেমন: উহুদের যুদ্ধের সময় একটি দল নবিজির আদেশ উপেক্ষা করে। ফলে তাদের ওপর নেমে আসে বিপর্যয়। আবার অনেক সাহাবি হুদাইবিয়ার চুক্তিতে নবিজির প্রজ্ঞা দেখতে পাননি। এই চুক্তির মাধ্যমে ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে কুরাইশদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা হয়; যদিও কুরাইশরা এই চুক্তি ভঙ্গ করে। নবিজি তাঁর ইতিবাচক বাস্তবতার মাধ্যমে অন্যদের শেখাতে ও জানাতে অত্যন্ত সফল ছিলেন। হুদাইবিয়াতে থাকা চৌদ্দশত সাহাবিকে এই ঘোষণা দিয়ে উৎসাহিত করেন-'তোমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ। '৩১৬

সময়ের সাথে সাথে সমাজের লোকের নবিজির শিক্ষা দ্বারা উদ্দীপিত পরিবর্তনগুলোর মাধ্যমে প্রচুর সুবিধা দেখতে পেয়েছিল, যা তাদের প্রচেষ্টাকে করেছিল আরও বেশি উৎসাহিত। হুদাইবিয়া চুক্তির মাধ্যমে মুসলমানদের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রকারান্তরে এটা ছিল ইসলামের সবচেয়ে বড়ো বিজয়। এই চুক্তির পরেই সকল যুদ্ধ, রক্তারক্তি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষজন নিরাপদে আলোচনা ও বিতর্কে মিলিত হতে পারত। এই চুক্তির ফলেই সকল মানুষের কাছে অবারিতভাবে ইসলামের আহ্বান পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এর পরবর্তী দুই বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে, দাওয়াতের সূচনা থেকে হুদাইবিয়ার সন্ধি পর্যন্ত তত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেনি। ফলে পরবর্তী সময়ে রাসূল (সা.) প্রায় ১০,০০০ লোক নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন এবং মক্কা বিজয় হয়েছিল। ৩১৭

মক্কা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কর্তৃত্বে চলে আসার পর মুসলিমদের ব্যাপক উন্নতি হয়। এরপর শুরু হয় সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামের বার্তা প্রেরণের কাজ। কুরাইশরা ইসলামে আত্মসমর্পণ করে। আরবরা জানত-তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাদের এই পরিমাণ শক্তি নেই, যা দ্বারা যুদ্ধ করবে বা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সাথে শত্রুতা করবে। সুতরাং তাঁরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করা শুরু করল। ৩১৮

অষ্টম ধাপ: মুহাম্মাদ (সা.) ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের অবস্থার মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো ঘটিয়েছিলেন, তাঁর ইন্তেকালের পরও তা বজায় ছিল। ফলে ইসলামি শিক্ষা ও অনুশীলনগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং আজ অবধি তা অব্যাহত আছে। এটি সম্ভব হয়েছিল-কারণ, মুহাম্মাদ (সা.) সফলভাবে ব্যক্তি-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন থেকে একটি প্রক্রিয়া-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে রূপান্তর করেছিলেন।৩১৯

মির্জা ইয়াওয়ার বেইগ তিনটি অপরিহার্য উপাদান প্রদানের মাধ্যমে এটি অর্জন করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন-

প্রথমত, স্পষ্ট, সরল কিন্তু শক্তিশালী এবং মানুষের গভীর চাহিদা পূরণ করে-এমন বিশ্বাস ও মূল্যবোধের একটি মূল মানদণ্ড থাকার মাধ্যমে।

দ্বিতীয়ত, একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব থাকা, যা মতাদর্শ প্রচার করার এবং অনুসারীদের জন্য অনুশীলন করার শর্ত তৈরি করার মাধ্যমে।

তৃতীয়ত, তহবিল তথা বায়তুলমাল সংগ্রহ, হিসাব-নিকাশ ও তা বিতরণপূর্বক সমাজের অর্থনৈতিক সাম্য অবস্থা আনয়নের নিমিত্তে একটি কেন্দ্রীয় বায়তুলমাল প্রশাসন গঠনের মাধ্যমে।

সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের উত্তরসূরিরা এর ফলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণকারী নেতা হয়ে ওঠেন; যারা ইসলামের বার্তা শিখিয়েছিলেন এবং অন্যদের নিকট তা সফলভাবে পৌঁছে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রকার পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতেও তাঁরা নবিজির মহান শিক্ষাকে উপস্থিত সংস্কৃতি ও ভূগোলের সাথে মিলিয়ে প্রয়োগ করে মানবতা রক্ষা করেছিলেন।

সাহাবায়ে কেরামের সেই সম্প্রদায়ের অসাধারণ পরিবর্তনের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হলো-পারস্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বিজয়। দরিদ্র, দুর্বল অস্ত্রসম্পন্ন এই ছোটো দলটি সাঁজোয়া সেনাবাহিনীকে উৎখাত করেছিল। আর এভাবেই আল্লাহ তাঁদের অনেক সম্মান দিয়ে উঁচুতে নিয়ে গিয়েছেন। ৩২০ রাসূল (সা.) তাঁর শেষ খুতবায় নির্দেশ দিয়েছেন-
'যারা আমার কথা শুনবে, তারা যেন তা অন্যদের কাছে প্রেরণ করে।'৩২১

এটাই নিশ্চিত করে-নবি (সা.)-এর শিক্ষাগুলো বিশ্বস্তভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রেরণ করা হয়েছে, যা মানবতাকে আধ্যাত্মিকভাবে অনন্তকাল ধরে অনুপ্রাণিত করে চলছে।

মুসলিম খলিফাদের রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করতে গিয়ে বলেছেন, তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মূল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্যুত হবেন না। তাঁদের কাজ হবে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইবাদত করা এবং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ এড়ানো। রাসূল (সা.) সাহাবিদের বলেন-
'আমার এই পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার পরে তোমাদের নিয়ে যে বিষয়ে উদ্বিগ্ন তা হলো-দুনিয়ার আকর্ষণ ও ঐশ্বর্য, যা তোমাদের বিজয়ের ফলে তোমাদের কাছে বিস্তৃত হতে পারে।'৩২২

পরবর্তী মুসলিম প্রজন্ম যখনই এই আহ্বানকে উপেক্ষা করেছে, তারা ইতিহাসে অবজ্ঞার শিকার হয়েছে।

টিকাঃ
৩০৯ *Change Leadership vs Change Management.'
৩১০ জন পি. কটার, পরিবর্তনশীল, (Boston: Harvard Business School, 1996)
৩১১ মার্টিন লিংস, মুহাম্মাদ: পূর্ববর্তী সোর্সের আলোকে তাঁর জীবনী (London: Islamic Text Society, 1983), p.32.
৩১২ সিরাত ইবনে হিশাম
৩১৩ দেখুন মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ, পৃথিবীতে লিখিত প্রথম সংবিধান (Lahore: Mohammad Ashraf, 1975)
৩১৪ আল্লাহ তায়ালা সূরা আলে ইমরানের ১১০ নং আয়াতে বলেন-'তোমরা তো হচ্ছ শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের কল্যাণের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজে আদেশ করবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে।'
৩১৫ সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৬৭১, সনদ: হাসান। আরও, ইবনে হাম্বল, আল মুসনাদ : ১২৩৪
৩১৬ বুখারি: ৪১৫৪
৩১৭ ইবনে ইসহাক, সিরাতুন্নবি, পৃ.-১৩৫
৩১৮ ইবনে ইসহাক, সিরাতুন্নবি, পৃ.-১৬৫
৩১৯ মির্জা ইয়াওয়ার বেইগ। রাসূল (সা.)-এর জীবন হতে নেতৃত্বগুণ শিক্ষালাভ, পৃ.-২৩৯
৩২০ ইবনে আবি জাইদ আল ক্বারাওনি, মাদানিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি, পৃ.-১২
৩২১ ইমাম হাম্বল, মুসনাদ : ১৯৭৭৪
৩২২ বুখারি ও মুসলিম।

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 ইসলামি সভ্যতার বৈশ্বিক প্রভাব

📄 ইসলামি সভ্যতার বৈশ্বিক প্রভাব


রাসূলুল্লাহ (সা.) ইসলামি সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এটি এমন একটি সভ্যতা, যার ভিত্তি ছিল আল্লাহর একত্ববাদ। ৩২৩ এই সভ্যতা বিনির্মাণের মাধ্যমে নবিজি মাত্র ২৩ বছরেই তাঁর সমাজকে পালটে দিয়েছিলেন পরিপূর্ণরূপে। তাঁর দাওয়াতের ফলে মানুষজন পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজা থেকে এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে। উপজাতীয় ঝগড়া ও যুদ্ধ থেকে নিজেদের নিয়ে যায় জাতীয় সংহতির দিকে। মাতালতা ও নৈরাজ্য থেকে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, অসম্মান থেকে সম্মান, পশ্চাৎপদতা ও অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সভ্যতার বিকাশের দিকে নিজেদের নিয়ে যায়।

তিনি ধর্ম প্রচার করেছেন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, জাতি গঠন করেছেন, নৈতিকতার মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, অসংখ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের সূচনা করেছেন এবং মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও আচরণকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করেছেন। ইতিহাসে মানুষ কখনোই সমাজ বা স্থানের এমন সম্পূর্ণ পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেনি। অবিশ্বাস্য বিস্ময় ব্যাপার হলো—তাঁর মাত্র ২৩ বছরের অল্প সময়ের মধ্যে এসব ঘটেছিল। ৩২৪

সাইদ নুরসি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রভাবের মাত্রা সম্পর্কে বলেন—
‘দেখুন, কীভাবে তিনি আরব উপদ্বীপের ভিন্ন, বন্য এবং অদম্য জনগণকে প্রশংসনীয় গুণাবলি দিয়ে একত্রিত করেছেন এবং তাদের বিশ্বের শিক্ষক ও মালিক বানিয়েছেন; বিশেষ করে সভ্য জাতির কাছে। অধিকন্তু এই আধিপত্য শুধু বাহ্যিক ছিল না। তিনি তাদের মন, হৃদয়, আত্মাকে জয় এবং বশীভূত করেছিলেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন হৃদয়ের প্রাণ, মনের শিক্ষক, আত্মার প্রশিক্ষক ও শাসক। ৩২৫

আধুনিক ইতিহাসের কোনো মহামানবকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে তুলনা করার সাহস করে কে? দার্শনিক, বক্তা, আইনপ্রণেতা, যোদ্ধা, বিজয়ী, মতবাদের পুনরুদ্ধারকারী, চিত্রবিহীন ধর্মের সাথে ২০টি পার্থিব সাম্রাজ্য এবং একটি আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা—তিনি হলেন মুহাম্মাদ (সা.)। যে সকল মানদণ্ড দ্বারা মানুষের মহত্ত্ব পরিমাপ করা যেতে পারে, আমরা সেসব সামনে রেখে জিজ্ঞাসা করি-'তাঁর চেয়ে বড়ো কোনো মানুষ আছে কি?'৩২৬

আরব উপদ্বীপের মানুষের ওপর কুরআনের শিক্ষা এবং নবিজির দ্বারা চূড়ান্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক ও জীবনব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রত্যাশিত পরিণতি হলো-কয়েক শতাব্দীর মধ্যে ইসলাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। এতে ইসলামের ছায়াতলে এলো বিশ্বের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। আর সেখান থেকে বর্তমানে প্রায় দুই বিলিয়ন মুসলমান। মার্কিন পিউ সেন্টার ভবিষ্যদ্বাণী করেছে-
'যদি বর্তমানে তাদের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, মুসলিমরা ২০৭০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রভাবশালী ধর্মীয় জনসংখ্যাতে পরিণত হবে এবং তাঁরা খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে।'৩২৭

এখন আমাদের জন্য জরুরি দ্যা আল্টিমেট লিডারকে অনুসরণ করা, যিনি একজন রোলমডেল এবং সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ। সাইদ নুরসি বলেছেন-
'আমি আমার শব্দ দ্বারা মুহাম্মাদ (সা.)-কে প্রশংসা করিনি; বরং তাঁর নাম নেওয়ায় আমার শব্দমালা প্রশংসিত হয়েছে। '৩২৮

শেষনবি মুহাম্মাদ (সা.)-এর নির্দেশনা ও উদাহরণ অনুসরণ করার ক্ষেত্রে মুসলমানদের অপরিসীম সুবিধা রয়েছে। কেননা, আমরা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নেতার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একাধিক উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি-মানুষের জন্য তাঁকে অনুকরণ করা অতি আবশ্যক। তিনি হলেন শ্রেষ্ঠ মানব, শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী, যাকে জীবনের শেষ অবধি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

কুরআনে আল্লাহ তাঁর নবুয়তের কথা নিশ্চিত করে আয়াত নাজিল করে বলেন-
'বলো-হে মানুষ! আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, যার রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো ও তাঁর প্রেরিত উম্মি নবির প্রতি, যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের প্রতি ঈমান রাখে। আর তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। আশা করা যায়, তোমরা হিদায়াত লাভ করবে।' সূরা আ'রাফ : ১৫৮

একজন বিশিষ্ট অমুসলিম, স্কটিশ অ্যাংলিকান স্কলার এবং পুরোহিত মন্টগোমারি ওয়াট বলেন-
'সত্যই মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর নবি ছিলেন। বিশ্বাসের জন্য নিপীড়ন সহ্য করতে তাঁর প্রস্তুতি, পুরুষদের উচ্চ নৈতিক চরিত্রের কারণে তাঁর অনুসারীরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিল এবং তাঁকে নেতা হিসেবে দেখেছিল। তাঁর চূড়ান্ত কৃতিত্বের মহিমা সবই নবির মৌলিক সততার পক্ষে যুক্তি দেয়। '৩২৯

প্রখ্যাত মুসলিম স্কলার আস-সিবাই বলেন-
'এটা সবাই জানে-আরবরা নবিজির দাওয়াত বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল; এমনকি তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল। কতটা খারাপ ছিল চিন্তা করুন! তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু প্রতিপক্ষের মধ্যে হওয়া প্রতিটি যুদ্ধে তিনি জিতেছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্বে তাঁর বাণীকে বিশ্বজয় করতে যে অল্প সময় লেগেছিল, তা ছিল মাত্র ২৩ বছর। এতেই প্রমাণ নিশ্চিত হয়-মুহাম্মাদ (সা.) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রাসূল ছিলেন। আর যারা অস্বীকার করেছিল তারা ইতিহাসে হারিয়ে গিয়েছে। '৩৩০

একইভাবে এটাও প্রমাণিত হয়-রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত কুরআন আল্লাহর কিতাব। এই প্রমাণগুলোর প্রথমে রয়েছে বাগ্মিতা ও কুরআনের আয়াতের উচ্চ বিষয়বস্তু। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যদ্বাণীর অস্তিত্ব, যা সত্য হয়েছে (যেমন, কুরআন ৩০ : ২-৪)। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক জগৎ (যেমন, মহাবিশ্বের উৎপত্তি, মানব গর্ভে ভ্রূণ ও ভ্রূণের বিকাশের প্রকৃতি, পাহাড়ের মূল) সম্পর্কে বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত করা, যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে। আর চতুর্থত, মানুষের জন্য কার্যকর দিকনির্দেশন এবং আধ্যাত্মিক কল্যাণের উপায়। এসবই ইসলামের সত্যতা নিয়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রত্যয় প্রদান করে।

জর্ডান পিটারসন বলেন-
'বিশ্বের প্রকৃতি এখন দুঃখভোগ ও বিশৃঙ্খলায় নিপতিত। ৩০০১ বেঁচে থাকার জন্য একজনকে ১২টি স্বঘোষিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। '৩০২

যাদের কোনো দিকনির্দেশক নেই, তাদের মধ্যে বেদনা ও বিশৃঙ্খলা ভরপুর। পিটারসনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো-সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গির মানুষরা অস্তিত্বের বাস্তবতা বুঝতে পারেন না। ঈশ্বর তিন জিনিসের নাম নিয়ে ঘোষণা করেছেন, যা সকলের ক্ষতি করবে-প্রথমত, শয়তান; যাকে মানুষকে খারাপ কাজে নেওয়ার এবং বিভ্রান্ত করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পৃথিবী নিজেই; যা মানুষকে পরবর্তী জীবনের স্থায়ী আবাস থেকে এই জীবনের দিকে সরিয়ে দিতে পারে এবং এটা ক্ষণস্থায়ী। আর তৃতীয়ত, প্রত্যেকের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত আকাঙ্ক্ষা বা আদেশকারী আত্মা রয়েছে, যা আমাদের পরিত্রাণ এবং চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে বিপথে নিয়ে যেতে চাইবে। তাঁকে অবশ্যই দমন করতে প্রশিক্ষিত হতে হবে।

মুসলমানরা দুটি মহান জিনিস দ্বারা নিয়ামতপ্রাপ্ত। প্রথমত, এক আল্লাহকে অনুসরণ করা, যিনি বিশ্বাসীদের প্রতি পরম করুণাময়। এর মধ্য দিয়ে মানুষ রহমদিল হওয়ার শিক্ষা পায়। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর নিযুক্ত রাসূল মুহাম্মাদ (সা.)- এর কাছ থেকে সত্যিকারের দিকনির্দেশনা পাওয়া, যাকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন-জগতের প্রতি রহমত হিসেবে।

মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর নবির প্রদত্ত করুণা এবং উম্মাহর মধ্যে পরস্পরের সত্যিকারের সাহচর্যের উষ্ণতা, মুসলমানদের জীবনের পরীক্ষা ও ক্লেশের মুখোমুখি হওয়া, যা আমাদের নিজেদের আধ্যাত্মিক বৃদ্ধির পরীক্ষা ও কল্যাণ হিসেবে প্রেরিত হয়। আল্লাহ তাঁর রহমত তাদের জন্য ওয়াদা করেছেন-
‘যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মি নবি; যার গুণাবলি তাঁরা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইনজিলে লিখিত পায়, যে তাদের সৎকাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎকাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃঙ্খল-যা তাদের ওপরে ছিল-অপসারণ করে। সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং তাঁর সাথে যে নুর নাজিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে, তাঁরাই সফলকাম।’ সূরা আ'রাফ : ১৫৭

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের বেশি ভালোবাসতেন, যারা তাঁর পরে আসবে এবং তাঁকে না দেখে বিশ্বাস করবে। হাদিসে বর্ণিত আছে-
‘ইশ! আমি যদি আমার ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারতাম। সাহাবিরা বললেন-আমরা কি আপনার ভাই নই? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন-তোমরা তো আমার সাহাবি, কিন্তু আমার ভাইরা হলো তাঁরা, যারা আমাকে না দেখে আমার ওপর বিশ্বাস আনবে।’৩৩৩

রহমতের আবাসস্থলের মধ্যে বসবাস করা কতই-না চমৎকার নিয়ামত! আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর অনুসরণের মধ্যেই সকল বিশ্বাসীর চূড়ান্ত সফলতা রয়েছে।

মুসলিম উম্মাহর উচ্চ নৈতিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং সাধারণভাবে বিশ্বাসীদের জন্য প্রথমে আমাদের আত্মাকে (তাজকিয়াতুন নফস) পরিশুদ্ধ করতে হবে। আমরা আমাদের শেষ লক্ষ্য অর্জন করতে পারব না, যদি না নিজেদের চরিত্রের উন্নতি করি। নিজেদের ও পরিবারের অপরিহার্য সংস্কার ছাড়াও নবিজির চমৎকার উদাহরণ অনুসরণ করে নেতাদের প্রশিক্ষণ ও তাদের নেতৃত্বের বিকাশ করতে হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। কারণ, আমাদের কাছে রয়েছে কুরআনের শিক্ষা এবং মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিস্তৃত ও ব্যাপক সিরাত ও হাদিস। আমাদের প্রয়োজন-এই বইয়ে উল্লিখিত নেতৃত্বের গুণাবলিকে নিজেদের মধ্যে নিয়ে আসা এবং প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটানো। এটি করতে হবে একটি রাষ্ট্রে আলো ছড়ানোর জন্য।

টিকাঃ
৩২৩ শাহ, নবি মুহাম্মাদ (সা.): একজন শিক্ষক, পৃ.২২৮.
৩২৪ সাইয়্যিদ কাজিম, ইসলামে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন। (March 2015)
৩২৫ সাইদ নুরসি, রিসালায়ে নূর, The Words : The Nineteenth Word, p.249.
৩২৬ আল্পোন্স দোলা মার্টিন, তুর্কির ইতিহাস
৩২৭ অলিভিগা রুগার্ড-'২০৭০ সালে ইসলাম পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ ধর্ম হিসেবে প্রকাশ পাবে।' says report", Telegraph (March 1, 2017)
৩২৮ সাইদ নরসি, রিসালায়ে নুর, The Words: The Nineteenth Word, p.247.
৩২৯ ওয়াট, মক্কায় মুহাম্মাদ, পৃ. ৫২
৩৩০ আস-সিবাই, মুহাম্মাদ (সা.) জীবনী, পৃ. ২৬
৩০১ গৌতম বুদ্ধ এমন দাবি করেন।
৩০২ জর্ডান বি. পিটারসন, জীবনের ১২টি নিয়ম: বিশৃঙ্খলার ওষুধ
৩৩৩ মুসনাদে আহমদ: ১২৫৭৯

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইসলামি সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এটি এমন একটি সভ্যতা, যার ভিত্তি ছিল আল্লাহর একত্ববাদ। ৩২৩ এই সভ্যতা বিনির্মাণের মাধ্যমে নবিজি মাত্র ২৩ বছরেই তাঁর সমাজকে পালটে দিয়েছিলেন পরিপূর্ণরূপে। তাঁর দাওয়াতের ফলে মানুষজন পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজা থেকে এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে। উপজাতীয় ঝগড়া ও যুদ্ধ থেকে নিজেদের নিয়ে যায় জাতীয় সংহতির দিকে। মাতালতা ও নৈরাজ্য থেকে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, অসম্মান থেকে সম্মান, পশ্চাৎপদতা ও অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সভ্যতার বিকাশের দিকে নিজেদের নিয়ে যায়।

তিনি ধর্ম প্রচার করেছেন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, জাতি গঠন করেছেন, নৈতিকতার মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, অসংখ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের সূচনা করেছেন এবং মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও আচরণকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করেছেন। ইতিহাসে মানুষ কখনোই সমাজ বা স্থানের এমন সম্পূর্ণ পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেনি। অবিশ্বাস্য বিস্ময় ব্যাপার হলো—তাঁর মাত্র ২৩ বছরের অল্প সময়ের মধ্যে এসব ঘটেছিল। ৩২৪

সাইদ নুরসি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রভাবের মাত্রা সম্পর্কে বলেন—
‘দেখুন, কীভাবে তিনি আরব উপদ্বীপের ভিন্ন, বন্য এবং অদম্য জনগণকে প্রশংসনীয় গুণাবলি দিয়ে একত্রিত করেছেন এবং তাদের বিশ্বের শিক্ষক ও মালিক বানিয়েছেন; বিশেষ করে সভ্য জাতির কাছে। অধিকন্তু এই আধিপত্য শুধু বাহ্যিক ছিল না। তিনি তাদের মন, হৃদয়, আত্মাকে জয় এবং বশীভূত করেছিলেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন হৃদয়ের প্রাণ, মনের শিক্ষক, আত্মার প্রশিক্ষক ও শাসক। ৩২৫

আধুনিক ইতিহাসের কোনো মহামানবকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে তুলনা করার সাহস করে কে? দার্শনিক, বক্তা, আইনপ্রণেতা, যোদ্ধা, বিজয়ী, মতবাদের পুনরুদ্ধারকারী, চিত্রবিহীন ধর্মের সাথে ২০টি পার্থিব সাম্রাজ্য এবং একটি আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা—তিনি হলেন মুহাম্মাদ (সা.)। যে সকল মানদণ্ড দ্বারা মানুষের মহত্ত্ব পরিমাপ করা যেতে পারে, আমরা সেসব সামনে রেখে জিজ্ঞাসা করি-'তাঁর চেয়ে বড়ো কোনো মানুষ আছে কি?'৩২৬

আরব উপদ্বীপের মানুষের ওপর কুরআনের শিক্ষা এবং নবিজির দ্বারা চূড়ান্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক ও জীবনব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রত্যাশিত পরিণতি হলো-কয়েক শতাব্দীর মধ্যে ইসলাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। এতে ইসলামের ছায়াতলে এলো বিশ্বের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। আর সেখান থেকে বর্তমানে প্রায় দুই বিলিয়ন মুসলমান। মার্কিন পিউ সেন্টার ভবিষ্যদ্বাণী করেছে-
'যদি বর্তমানে তাদের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, মুসলিমরা ২০৭০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রভাবশালী ধর্মীয় জনসংখ্যাতে পরিণত হবে এবং তাঁরা খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে।'৩২৭

এখন আমাদের জন্য জরুরি দ্যা আল্টিমেট লিডারকে অনুসরণ করা, যিনি একজন রোলমডেল এবং সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ। সাইদ নুরসি বলেছেন-
'আমি আমার শব্দ দ্বারা মুহাম্মাদ (সা.)-কে প্রশংসা করিনি; বরং তাঁর নাম নেওয়ায় আমার শব্দমালা প্রশংসিত হয়েছে। '৩২৮

শেষনবি মুহাম্মাদ (সা.)-এর নির্দেশনা ও উদাহরণ অনুসরণ করার ক্ষেত্রে মুসলমানদের অপরিসীম সুবিধা রয়েছে। কেননা, আমরা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নেতার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একাধিক উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি-মানুষের জন্য তাঁকে অনুকরণ করা অতি আবশ্যক। তিনি হলেন শ্রেষ্ঠ মানব, শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী, যাকে জীবনের শেষ অবধি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

কুরআনে আল্লাহ তাঁর নবুয়তের কথা নিশ্চিত করে আয়াত নাজিল করে বলেন-
'বলো-হে মানুষ! আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, যার রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো ও তাঁর প্রেরিত উম্মি নবির প্রতি, যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের প্রতি ঈমান রাখে। আর তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। আশা করা যায়, তোমরা হিদায়াত লাভ করবে।' সূরা আ'রাফ : ১৫৮

একজন বিশিষ্ট অমুসলিম, স্কটিশ অ্যাংলিকান স্কলার এবং পুরোহিত মন্টগোমারি ওয়াট বলেন-
'সত্যই মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর নবি ছিলেন। বিশ্বাসের জন্য নিপীড়ন সহ্য করতে তাঁর প্রস্তুতি, পুরুষদের উচ্চ নৈতিক চরিত্রের কারণে তাঁর অনুসারীরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিল এবং তাঁকে নেতা হিসেবে দেখেছিল। তাঁর চূড়ান্ত কৃতিত্বের মহিমা সবই নবির মৌলিক সততার পক্ষে যুক্তি দেয়। '৩২৯

প্রখ্যাত মুসলিম স্কলার আস-সিবাই বলেন-
'এটা সবাই জানে-আরবরা নবিজির দাওয়াত বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল; এমনকি তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল। কতটা খারাপ ছিল চিন্তা করুন! তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু প্রতিপক্ষের মধ্যে হওয়া প্রতিটি যুদ্ধে তিনি জিতেছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্বে তাঁর বাণীকে বিশ্বজয় করতে যে অল্প সময় লেগেছিল, তা ছিল মাত্র ২৩ বছর। এতেই প্রমাণ নিশ্চিত হয়-মুহাম্মাদ (সা.) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রাসূল ছিলেন। আর যারা অস্বীকার করেছিল তারা ইতিহাসে হারিয়ে গিয়েছে। '৩৩০

একইভাবে এটাও প্রমাণিত হয়-রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত কুরআন আল্লাহর কিতাব। এই প্রমাণগুলোর প্রথমে রয়েছে বাগ্মিতা ও কুরআনের আয়াতের উচ্চ বিষয়বস্তু। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যদ্বাণীর অস্তিত্ব, যা সত্য হয়েছে (যেমন, কুরআন ৩০ : ২-৪)। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক জগৎ (যেমন, মহাবিশ্বের উৎপত্তি, মানব গর্ভে ভ্রূণ ও ভ্রূণের বিকাশের প্রকৃতি, পাহাড়ের মূল) সম্পর্কে বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত করা, যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে। আর চতুর্থত, মানুষের জন্য কার্যকর দিকনির্দেশন এবং আধ্যাত্মিক কল্যাণের উপায়। এসবই ইসলামের সত্যতা নিয়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রত্যয় প্রদান করে।

জর্ডান পিটারসন বলেন-
'বিশ্বের প্রকৃতি এখন দুঃখভোগ ও বিশৃঙ্খলায় নিপতিত। ৩০০১ বেঁচে থাকার জন্য একজনকে ১২টি স্বঘোষিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। '৩০২

যাদের কোনো দিকনির্দেশক নেই, তাদের মধ্যে বেদনা ও বিশৃঙ্খলা ভরপুর। পিটারসনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো-সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গির মানুষরা অস্তিত্বের বাস্তবতা বুঝতে পারেন না। ঈশ্বর তিন জিনিসের নাম নিয়ে ঘোষণা করেছেন, যা সকলের ক্ষতি করবে-প্রথমত, শয়তান; যাকে মানুষকে খারাপ কাজে নেওয়ার এবং বিভ্রান্ত করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পৃথিবী নিজেই; যা মানুষকে পরবর্তী জীবনের স্থায়ী আবাস থেকে এই জীবনের দিকে সরিয়ে দিতে পারে এবং এটা ক্ষণস্থায়ী। আর তৃতীয়ত, প্রত্যেকের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত আকাঙ্ক্ষা বা আদেশকারী আত্মা রয়েছে, যা আমাদের পরিত্রাণ এবং চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে বিপথে নিয়ে যেতে চাইবে। তাঁকে অবশ্যই দমন করতে প্রশিক্ষিত হতে হবে।

মুসলমানরা দুটি মহান জিনিস দ্বারা নিয়ামতপ্রাপ্ত। প্রথমত, এক আল্লাহকে অনুসরণ করা, যিনি বিশ্বাসীদের প্রতি পরম করুণাময়। এর মধ্য দিয়ে মানুষ রহমদিল হওয়ার শিক্ষা পায়। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর নিযুক্ত রাসূল মুহাম্মাদ (সা.)- এর কাছ থেকে সত্যিকারের দিকনির্দেশনা পাওয়া, যাকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন-জগতের প্রতি রহমত হিসেবে।

মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর নবির প্রদত্ত করুণা এবং উম্মাহর মধ্যে পরস্পরের সত্যিকারের সাহচর্যের উষ্ণতা, মুসলমানদের জীবনের পরীক্ষা ও ক্লেশের মুখোমুখি হওয়া, যা আমাদের নিজেদের আধ্যাত্মিক বৃদ্ধির পরীক্ষা ও কল্যাণ হিসেবে প্রেরিত হয়। আল্লাহ তাঁর রহমত তাদের জন্য ওয়াদা করেছেন-
‘যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মি নবি; যার গুণাবলি তাঁরা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইনজিলে লিখিত পায়, যে তাদের সৎকাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎকাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃঙ্খল-যা তাদের ওপরে ছিল-অপসারণ করে। সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং তাঁর সাথে যে নুর নাজিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে, তাঁরাই সফলকাম।’ সূরা আ'রাফ : ১৫৭

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের বেশি ভালোবাসতেন, যারা তাঁর পরে আসবে এবং তাঁকে না দেখে বিশ্বাস করবে। হাদিসে বর্ণিত আছে-
‘ইশ! আমি যদি আমার ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারতাম। সাহাবিরা বললেন-আমরা কি আপনার ভাই নই? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন-তোমরা তো আমার সাহাবি, কিন্তু আমার ভাইরা হলো তাঁরা, যারা আমাকে না দেখে আমার ওপর বিশ্বাস আনবে।’৩৩৩

রহমতের আবাসস্থলের মধ্যে বসবাস করা কতই-না চমৎকার নিয়ামত! আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর অনুসরণের মধ্যেই সকল বিশ্বাসীর চূড়ান্ত সফলতা রয়েছে।

মুসলিম উম্মাহর উচ্চ নৈতিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং সাধারণভাবে বিশ্বাসীদের জন্য প্রথমে আমাদের আত্মাকে (তাজকিয়াতুন নফস) পরিশুদ্ধ করতে হবে। আমরা আমাদের শেষ লক্ষ্য অর্জন করতে পারব না, যদি না নিজেদের চরিত্রের উন্নতি করি। নিজেদের ও পরিবারের অপরিহার্য সংস্কার ছাড়াও নবিজির চমৎকার উদাহরণ অনুসরণ করে নেতাদের প্রশিক্ষণ ও তাদের নেতৃত্বের বিকাশ করতে হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। কারণ, আমাদের কাছে রয়েছে কুরআনের শিক্ষা এবং মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিস্তৃত ও ব্যাপক সিরাত ও হাদিস। আমাদের প্রয়োজন-এই বইয়ে উল্লিখিত নেতৃত্বের গুণাবলিকে নিজেদের মধ্যে নিয়ে আসা এবং প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটানো। এটি করতে হবে একটি রাষ্ট্রে আলো ছড়ানোর জন্য।

টিকাঃ
৩২৩ শাহ, নবি মুহাম্মাদ (সা.): একজন শিক্ষক, পৃ.২২৮.
৩২৪ সাইয়্যিদ কাজিম, ইসলামে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন। (March 2015)
৩২৫ সাইদ নুরসি, রিসালায়ে নূর, The Words : The Nineteenth Word, p.249.
৩২৬ আল্পোন্স দোলা মার্টিন, তুর্কির ইতিহাস
৩২৭ অলিভিগা রুগার্ড-'২০৭০ সালে ইসলাম পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ ধর্ম হিসেবে প্রকাশ পাবে।' says report", Telegraph (March 1, 2017)
৩২৮ সাইদ নরসি, রিসালায়ে নুর, The Words: The Nineteenth Word, p.247.
৩২৯ ওয়াট, মক্কায় মুহাম্মাদ, পৃ. ৫২
৩৩০ আস-সিবাই, মুহাম্মাদ (সা.) জীবনী, পৃ. ২৬
৩০১ গৌতম বুদ্ধ এমন দাবি করেন।
৩০২ জর্ডান বি. পিটারসন, জীবনের ১২টি নিয়ম: বিশৃঙ্খলার ওষুধ
৩৩৩ মুসনাদে আহমদ: ১২৫৭৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00