📄 সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার
অনেকে চায় তাদের সাথে যেন সমানভাবে আচরণ করা হয়। যেমন : মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে। এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুরূপ; যা সমাজে সম্পদ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে ইনসাফ বজায় রাখে। ইনসাফ এমন এক নীতি, যা মানুষ হিসেবে প্রত্যেককে মর্যাদায় সমকাতারভুক্ত করে এবং সবার প্রাপ্যটুকু সুষম হিসাবের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়! ২৬৭
কুরআন নৈতিক শুদ্ধি ও তাকওয়া ব্যতীত একে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে না। সেটা হতে পারে কোনো ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্র। [কুরআন ৪৯ : ১৩]। নবিজি ধনী-গরিব, আরব-অনারব ও মালিক-দাসের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি; যেমনটি তাঁর বিদায়ি ভাষণে বলেছেন-
'সমস্ত মানবজাতি আদম ও হাওয়ার বংশধর। একজন আরবের অনারবের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং কোনো অনারবের আরবের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই; এ ছাড়াও একজন শ্বেতাঙ্গের কৃষ্ণাঙ্গের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গের শ্বেতাঙ্গের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাকওয়া এবং উত্তম কাজের মধ্যে। '২৬৮
হাদিসে আছে- 'সকল মানুষই একটি চিরুনির দাঁতের সমান; যেমন সকল আদমসন্তানই সমান।'২৬৯
মুহাম্মাদ হাশিম কামালি বলেন-'চৌদ্দ শতাব্দী আগে আরব সমাজের ঐতিহাসিক বিন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে, সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি একটি সামাজিক বিপ্লবের চেয়ে কম কিছু ছিল না।'২৭০
রাসূল (সা.) কোনো কাজের জন্য সাহাবিদের ডাকলে তাঁদের সাথে এমনভাবে অংশগ্রহণ করতেন, যেন তিনি নিজেও একজন সাধারণ শ্রমিক। মদিনায় পৌঁছে প্রথম যে কাজটি করেন, তা হলো একটি মসজিদ নির্মাণ। নবিজি নিজে এই মসজিদ নির্মাণে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। নিজ হাতে ইট বহন করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন-'আমাদের জীবন আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি কেন কষ্ট করছেন?' তবুও তিনি থেমে না থেকে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২৭১
একবার কোনো এক সফরে খাবার তৈরি না হওয়ায় সকল সাহাবি একত্র হয়ে খাবার তৈরি করলেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নেন। নবিজি বন থেকে কাঠ আনার দায়িত্ব নেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন-'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার দাসদের এ দায়িত্ব পালন করতে দিন।' তিনি উত্তরে বললেন- 'আচ্ছা, তোমরা ঠিকই বলেছ, কিন্তু আমি পছন্দ করি না তোমাদের ওপর আমি আমার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করি। আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না-কেউ নিজেকে তাঁর সাহাবিদের থেকে শ্রেষ্ঠ মনে করুক।'২৭২
বদরের যুদ্ধে বাহনব্যবস্থা তেমন ভালো ছিল না। তিনজন লোকের জন্য ছিল একটি পশু, যেটার ওপর তাঁরা পালাক্রমে চড়ছিলেন। নবিজির ছিল একটি সওয়ারি পশু এবং একজন সাধারণ মানুষের মতো তাঁর সাথে আরও দুজন আরোহী ছিলেন। যখন বাকি দুজনের আরোহণের পালা এলো, তাঁরা নবিজিকে নিজেদের অধিকারটুকু ছেড়ে দেন। তাঁরা প্রস্তাব দেন-'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি নিচে নামবেন না; আমরা পায়ে হেঁটে যাব।' তখন নবিজি উত্তর দেন-'তোমরা আমার চেয়ে বেশি হাঁটতে পারবে না এবং আমি তোমাদের চেয়ে কম পুরস্কার চাই না।'২৭৩
কুরআনে সমতার বিষয়ে দুটি প্রধান বিষয়কে উৎসাহিত করা হয়েছে-
প্রথমত, এক আল্লাহতে বিশ্বাসীদের ভ্রাতৃত্ব।
দ্বিতীয়ত, মানবতার বৃহত্তর ভ্রাতৃত্ব। মৌলিক অধিকার ও কর্তব্যের বেলাতেও অনুরূপ। নিম্নে উল্লেখিত আয়াত জাতি, ভাষা বা সামাজিক মর্যাদায় বিভাজন; সমস্ত মানবজাতিকে সাধারণ সমতার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে।২৭৪
'হে মানুষ! আমি তোমাদের এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।' সূরা হুজুরাত : ১৩
এখানে তাকওয়া হলো-নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের একটি মাপকাঠি, যা আল্লাহর দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র স্বীকৃত মাপকাঠি। বাহ্যিকভাবে কিছু সাহাবি গরিব ছিলেন বটে, কিন্তু তাঁরা ছিলেন তাঁদের তাকওয়ার জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে উচ্চ সম্মানের অধিকারী। নিচের উদাহরণে তা বলা হয়েছে-
একদল কুরাইশ গণ্যমান্য ব্যক্তি নবিজির কাছে গিয়ে তাঁকে বলেছিলেন-'হে মুহাম্মাদ! আমরা কীভাবে আপনার সাথে বসতে পারি, যখন আপনি বিলাল, সুয়াইবের মতো লোকদের পাশে রেখেছেন। আপনার সঙ্গীদের তালিকা থেকে তাদের বাদ দিন। তাহলে আমরা আপনার সাথে বসব এবং আপনার কথা শুনব।' কিন্তু নবিজি তা মানতে অস্বীকৃতি জানালেও তারা তাদের শর্তে অনড় থাকে। তখন নিচের আয়াতটি তখন অবতীর্ণ হয়-
'আর যারা তাদের রবকে দিনরাত ডাকতে থাকে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রচেষ্টারত থাকে, তাদের তোমার কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিয়ো না। তাদের কৃতকর্ম থেকে কোনো জিনিসের (জবাবদিহির) দায়িত্ব তোমার ওপর নেই এবং তোমার কৃতকর্ম থেকেও কোনো জিনিসের (জবাবদিহির) দায়িত্ব তাদের ওপর নেই। এ সত্ত্বেও যদি তুমি তাদের দূরে ঠেলে দাও, তাহলে তুমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।' সূরা আনআম: ৫২
আল্লাহ এখানে নবিজিকে নির্দেশ দিয়েছেন-যারা তাকওয়ার গুণাবলির অধিকারী, তাঁদের প্রতি বেশি মনোযোগ দিতে।
একবার নবিজি কুরাইশ নেতাদের ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন। সেই আমন্ত্রণ অনুষ্ঠানে অন্ধ সাহাবি উম্মে মাকতুম ধর্মীয় বিষয়ে নবিজিকে একটি প্রশ্ন করেন। তখন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে কথা বলছিলেন নবিজি। ফলে উম্মে মাকতুমের কথায় কিঞ্চিত ভ্রুকুঞ্চন এবং একেবারেই হালকা বিরক্ত হলেন। ব্যাপারটি এতটা স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘটল যে, কেউ বুঝতেই পারেনি। কিন্তু আল্লাহ ঠিকই বুঝতে পারলেন। ২৭৫ এই ঘটনা নিয়ে সূরা আবাসা অবতীর্ণ হয়।
সূরায় আল্লাহ তায়ালা নবি (সা.)-কে ইসলামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে
'সে ভ্রুকুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ, তাঁর কাছে অন্ধ লোকটি আগমন করেছিল। আর কীসে তোমাকে জানাবে যে, সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো অথবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে সে উপদেশ তার উপকারে আসত। আর যে বেপরোয়া হয়েছে, তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছ। অথচ সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোনো দায়িত্ব বর্তাবে না। পক্ষান্তরে, যে তোমার কাছে ছুটে এলো, আর সে ভয়ও করে; অথচ তুমি তাঁর প্রতি উদাসীন হলে।' সূরা আবাসা : ১-১০
আইনের দৃষ্টিতে সমতার অর্থ-সকল মানুষ বৈষম্য ছাড়াই সমানভাবে আইনের শাসনের অধীন। সরকারি নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ কারও জন্য বাড়তি কোনো সুযোগ-সুবিধার স্বীকৃতি নেই। মুসলিম নেতা ও অনুসারীদের মধ্যে ন্যায়বিচার ও ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে আপস করা উচিত নয়। নিচের আলোচনার মাধ্যমে আমরা বিষয়টি বুঝতে পারব-
নবিজি বলেন-তিনি; এমনকি তাঁর নিজের পরিবারের ওপরও আইন প্রয়োগ করবেন, যদি প্রয়োজন হয়। মক্কা বিজয়ের সময় একজন মহিলা চুরি করেছিল। মহিলার গোত্রের লোকেরা তার জন্য সুপারিশ করতে উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর কাছে গেল। উসামা যখন রাসূল (সা.)-এর কাছে এ বিষয়ে সুপারিশ করলেন। আর সাথে সাথেই নবিজির মুখের রং পরিবর্তন হয়ে গেল।
তিনি বললেন-'তুমি কি আল্লাহর নির্দেশিত আইনগত শাস্তির একটি বিষয়ে আমার কাছে সুপারিশ করছ?' উসামা (রা.) বললেন-'হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।' বিকেলে আল্লাহর রাসূল (সা.) লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং তারপর বললেন-
'তোমাদের পূর্বের জাতিগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছিল। কারণ, তাদের মধ্যে সম্ভ্রান্তশালী কেউ চুরি করলে তারা তাকে মাফ করে দিত। আর তাদের মধ্যে কোনো গরিব চুরি করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তি প্রয়োগ করত। ২৭৬ আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা চুরি করে, তবে আমি তাঁর হাত কাটতে দ্বিধা করব না।' ২৭৭
মহিলাটি সম্ভ্রান্তশালী হওয়া সত্ত্বেও তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল এবং পরে সে অনুতপ্ত হয়েছিল।
টিকাঃ
২৬৭ আবদুল রশিদ মতিন ও আল ফাতিহ আবদুস সালাম, Glossary of Political Science Terms: Islamic and Western, p.45.
২৬৮ নবি (সা.)-এর শেষ আদেশ, মুসলিম
২৬৯ ইমাম জালালুদ্দিন সুযুতি, মানাবিল আস-সাফায়িইল সুয়ুতি, পৃষ্ঠা-৪৯
২৭০ কামালি, Freedom, Equality and Justice in Islam, p. 47.
২৭১ আল্লামা শিবলি নুমানি, সিরাতুন্নবি, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-২২৪
২৭২ নুমানি, সিরাতুন্নবি, ৩, পৃ.-২২৫
২৭৩ নুমানি, সিরাতুন্নবি, ৩, পৃ.-২২৫
২৭৪ কামালি, Freedom, Justice and Equality, p.50.
২৭৫ কামালি, Freedom, Justice and Equality, p.54.
২৭৬ বুখারি: ৫৫৯৭
২৭৭ বুখারি: ৭৭৮
📄 জবাবদিহিতা
নেতৃত্ববিষয়ক এক কানাডিয়ান প্রশিক্ষক ইয়ান কর্নেট লিখেছেন-'জবাবদিহিতা তখনই ঘটে, যখন নেতারা তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে। অন্যকে দেখায়-তারা যা যা বলবে, তা-ই করবে; যাতে জনগণ তাদের বিশ্বাস করতে পারে। নিজের কাজ ও সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট ফলাফলের দায় নিজের কাঁধে নেওয়ার মাধ্যমে নেতারা তাদের জবাবদিহিতার প্রদর্শন করে। আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দূরদর্শিতার মাধ্যমে নেতারা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে যান। এই আদর্শ জবাবদিহিতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা এমন এক গুণ-অন্যরা একে আচরণ ও বিবেকের উত্তম সমাহার হিসেবে বিবেচনা করে। তারপর তারা তা অনুসরণ করে। '২৭৮
আমরা দাবি করছি-মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর কর্ম ও আচরণের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জবাবদিহিতার এই 'আদর্শ মানদণ্ড' উদাহরণ দিয়েছেন। দায়িত্ব যখন কাজের ওপর ফোকাস করে, তখন অর্পিত দায়বদ্ধ কাজগুলো সফলভাবে শেষ হয়। ল্যাসি লিও-এর প্রধান সুবিধাগুলো তুলে ধরে বলেন-'জবাবদিহিতা দলগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরি করে, নেতা-কর্মীদের মধ্যে তৈরি করে শ্রদ্ধা।'২৭৯
বিভিন্ন দায়িত্ব পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন মুসলিম নেতাকে অবশ্যই স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি যেন নিজেকে ইসলামি অনুশাসন অনুযায়ী পরিচালনা করেন, এর জন্য নেতৃত্বের নীতিকেন্দ্রিক সমস্ত কর্মকাণ্ডে শূরা, ন্যায়বিচার, ন্যায়পরায়ণতা ও জবাবদিহিতার নীতির প্রয়োগ থাকা জরুরি।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
'আর যে পাপ কামাই করবে, বস্তুত সে তো নিজের বিরুদ্ধেই তা কামাই করবে। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' সূরা নিসা : ১১১
'তা এই যে, কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।' সূরা নাজম : ৩৮
'আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে, তা-ই সে পায়।' সূরা নাজম: ৩৯
ইসলামে হিসাবরক্ষণ দুটি অর্থ বহন করে। প্রথমত, ব্যক্তির নিজের হিসাব এবং দ্বিতীয়ত, জনগণের সামনে জবাবদিহিতা। জনসাধারণের দায়বদ্ধতার বিষয়ে মুহাম্মাদ হাশিম কামালি বলেছেন-'জনসাধারণের দায়বদ্ধতার মধ্যে রয়েছে-ভালো কিছু প্রচার, মন্দের প্রতিরোধে কুরআনের নীতি (ভালো কাজে আদশ দেওয়া ও মন্দ কাজ করতে নিষেধ করা), আন্তরিক পরামর্শ দেওয়ার ধারণা এবং সরকারকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে বলা। মানুষ যা করে, তার জন্য তারা প্রত্যেকেই দায়বদ্ধ। এটি হলো স্বহিসাবের মৌলিক নীতির উপাদান, যা শাসক ও শাসিতদের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আইনের শাসনে কোনো ব্যতিক্রম নেই।
ইসলামি ব্যবস্থায় দায়বদ্ধতা হলো-কর্মকর্তাদের নির্বাচন ও নিয়োগ, সরকারি কর্মচারীদের নির্বাচন এবং বরখাস্তের মাপকাঠি প্রকাশ করা। ইসলামি জীবনব্যবস্থায় শাসনের ব্যাপারে আল্লাহ এবং সমাজে কাছে দায়বদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। এটি খিলাফত প্রতিষ্ঠার একটি ধারণা, যা লোকদের ভালো সরকার প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। '২৮০
হিসবাহ; অর্থাৎ ভালোর প্রচার এবং মন্দের প্রতিরোধের কুরআনের নীতি একটি বিস্তৃত নীতি, যা প্রত্যেককে অপরাধ এবং মন্দের প্রতি সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার অধিকার দেয়। ইমাম গাজালি হিসবাহকে আল্লাহর নাজিলকৃত ধর্মগ্রন্থের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ২৮১
'আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে। আর তারা সালাত কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদের আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' সূরা তাওবা : ৭১
হিসবাহের তিনটি স্তর রয়েছে, যা নবিজি নিজেই ব্যাখ্যা করেন-
'তোমাদের কেউ যদি মন্দ কিছু দেখে, সে যেন হাত দিয়ে প্রতিহত করে; যদি সে তা করতে অক্ষম হয়, তবে তার জিহ্বা দ্বারা এবং যদি সে তা করতেও অক্ষম হয়, তবে তার অন্তরে (তার নিন্দা করা উচিত)। কিন্তু এটাই ঈমানের দুর্বলতম রূপ।'২৮২
নসিহা (আন্তরিক পরামর্শ) সম্পর্কে নবি (সা.) তাঁর সাহাবিদের বলেন-
'ধর্ম হলো আন্তরিক উপদেশ। '২৮৩
জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বে বিশ্বাস (আমানাহ) প্রদর্শন করাও জড়িত। ইসলামি জীবনব্যবস্থায় সরকারি কর্মকর্তারা আল্লাহ এবং সমাজের প্রতি কর্তব্যের অধীন। যেমন : কুরআন তাদের নির্দেশ দেয় বিশ্বস্তভাবে দায়িত্বপালনের জন্য-
'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে, তখন ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কতই-না সুন্দর উপদেশ দিচ্ছেন। তার আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।' সূরা নিসা : ৫৮
পাবলিক অফিসে বিশ্বাসের একটি দিক হলো-কর্মকর্তাদের নির্বাচন ও নিয়োগ, যা অবশ্যই যোগ্যতা ও উপযুক্ততার ভিত্তিতে গ্রহণ করা উচিত। সেই ক্ষেত্রে দেখানো হয়েছে, একবার নবিজি বিখ্যাত সাহাবি আবু জর গিফারি (রা.)-এর একটি অনুরোধে সাড়া দিয়েছিলেন। গিফারি (রা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন-তিনি একটি সরকারি পদে নিয়োগ পেতে পারেন কি না। নবিজি উত্তর দিলেন-'হে আবু জর! এটি একটি আমানত এবং তুমি দুর্বল; এটি বিচারের দিনে অনুশোচনা নিয়ে আসবে, যদি না তা যথাযথভাবে গ্রহণ করা হয় এবং যথাযথভাবে পালন করা হয়।'২৮৪
মুহাম্মাদ আল গাজালি এই হাদিসটির ওপর মন্তব্য করেছেন-
'একজন মানুষ খুব শিক্ষিত হতে পারে। যেমন আবু জর ছিলেন, কিন্তু তিনি প্রযুক্তিগত ও ব্যাবহারিক দক্ষতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলির অধিকারী নাও হতে পারেন।'২৮৫
সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে সামুরা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন-
'আবদুর রহমান, কর্তৃত্বের পদের জন্য জিজ্ঞাসা করবে না। কারণ, তুমি যদি এটি চাওয়ার ফলে এই পদটি মঞ্জুর করা হয়, তবে তুমি একা থাকবে (সেখানে দায়িত্বপালনের জন্য আল্লাহর সাহায্য ছাড়া) এবং যদি তুমি এটির জন্য কোনো অনুরোধ না করেই মঞ্জুর করা হয়ে থাকে, তাহলে তোমাকে সাহায্য করা হবে (আপনার দায়িত্বপালনে আল্লাহর দ্বারা)।'২৮৬
এই পরামর্শ সম্পর্কে আধুনিক লেখক স্যাম ওয়াকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে লেখেন-
'খারাপ নেতাদের সমস্যা হলো, নেতা হিসেবে তারা নিজেদের প্রথম স্থানে এগিয়ে রাখে। নেতৃত্ব প্রায়শই সেই ব্যক্তিদের দেওয়া হয়, যারা তা পেতে সবচেয়ে বেশি আকাঙ্ক্ষা করে। আমরা নেতৃত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটিকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি। তা হলো-কাজটি নেওয়ার জন্য অনিচ্ছা করা।'
ডগলাস অ্যাডামস লিখেছেন-'এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য, যারা সবচেয়ে বেশি মানুষকে শাসন করতে চায়, তারাই তা করার জন্য সবচেয়ে কম উপযুক্ত।'২৮৭
হাদিসে বলা হয়েছে-
'সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন অভিভাবক এবং তাঁর জিম্মায় যা আছে, তা তাঁর জন্য দায়ী। ইমাম (রাষ্ট্র বা সম্প্রদায়ের নেতা) একজন অভিভাবক এবং তিনি তাঁর প্রজাদের জন্য দায়ী, একজন পুরুষ একজন অভিভাবক এবং তিনি তাঁর পরিবারের জন্য দায়ী, একজন মহিলা তাঁর স্বামীর ঘর ও সন্তানদের অভিভাবক এবং তিনি তাদের জন্য দায়ী। অবশ্যই তোমাদের প্রত্যেকেই একজন অভিভাবক এবং সে তার দায়িত্বের জন্য দায়ী। '২৮৮
প্রত্যেকেই তার অধীনে যা আছে, তার জন্য দায়বদ্ধ।
নবি (সা.) সতর্ক করে বলেন-
'তোমাদের মধ্যে যাকে আমির নিযুক্ত করা হয় এবং আমাদের কাছ থেকে একটি সুচ বা তার চেয়ে ছোটো কিছু গোপন করে, তা হবে অপব্যবহার (সরকারি তহবিলের) এবং তাকে বিচারের দিন হিসাব দিতে হবে।' ২৮৯
এই নিয়মের ফলে নবিজি তাঁর আচরণের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে দায়বদ্ধ রাখতেন। নবি (সা.) যখন মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন, তখন তিনি ইবনে আব্বাস (রা.)-কে তাঁর হাত ধরে মসজিদে যেতে সাহায্য করতে বলেছিলেন। এরপর মসজিদে প্রবেশ করে তিনি লোকদের উদ্দেশে বললেন-
'আমি যদি তোমাদের অধিকার পূরণ করতে ব্যর্থ হয়ে থাকি, তবে তার কারণ হলো-আমি একজন মানুষ (এবং ভুলের জন্য দায়ী)। তোমাদের মধ্যে যদি এমন কেউ থাকে, যাকে আমি কোনোভাবে অপমান করেছি, আমি তার প্রতিশোধ গ্রহণে প্রস্তুত। যদি তোমাদের কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করে থাকি, তাহলে তোমরাও প্রতিশোধ নিতে পারো। তোমাদের মধ্যে কারও যদি আমার বিরুদ্ধে আর্থিক দাবি থাকে, সে যেন আমার সম্পত্তি থেকে তার পাওনা নিয়ে নেয়। জেনে রেখো, আমি এমন একজন ব্যক্তিকে সম্মান করি, আমার কাছে যার দাবি আছে এবং তা আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয় বা আমাকে অব্যাহতি দেয়। কারণ, আমি আমার প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই। যদিও আমি এ ধরনের দাবি থেকে মুক্ত।'২৯০
সভার মধ্যে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এলো। এক ব্যক্তি কয়েক দিরহাম দাবি করে এগিয়ে আসেন, যা একবারে পরিশোধ করা হয়। ২৯১
সরকার ও নেতা নাগরিকদের স্বার্থে তাদের দায়িত্ব পালন করছে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। নবিজির সময়ে সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর কাছে তাঁদের জবাবদিহিতার ভয়ে নিজেদের দায়িত্বপালনে উদ্যোগী ছিলেন। তবে কিছু ঘটনা আছে, যেখানে নবি (সা.) তাঁর নিযুক্ত কর্মকর্তাদের ইসলামি বিধান থেকে সরে যাওয়ার জন্য তিরস্কার করেছিলেন।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবিজি তাঁর নিয়োগকৃত কর্মকর্তাদের সম্পর্কে জনসাধারণের সমালোচনার জবাব দেন। লোকেরা অভিযোগ করেছিল-ইয়েমেনের গভর্নর মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) জামাতের নামাজে কুরআন তিলাওয়াত দীর্ঘ করেন, যা মুসলিমদের জন্য কষ্টকর হয়েছিল। নবিজি তখন মুয়াজ (রা.)-কে সম্বোধন করলেন-'তুমি কি রাষ্ট্রদ্রোহের অ্যাজেন্ট? '২৯২ এরপর তিনি নেতাদের বলে দিলেন, তাঁরা কীভাবে জামাতের নেতৃত্ব দেবে—
'তোমাদের কেউ যখন লোকদের নামাজের ইমামতি করবে, তখন সে যেন সংক্ষিপ্ত করে। কেননা, নামাজের মধ্যে যুবক ও বৃদ্ধ, দুর্বল ও অসুস্থ মানুষ রয়েছে।’২৯৩
আরেকটি উদাহরণে নবিজির তত্ত্বাবধানে থাকা লোকদের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার অনুভূতি প্রদর্শন করে। খাইবার বিজয়ের পর চাষের জমি ভাগ করে নেওয়ার শর্তে মুসলমানদের মধ্যে তা বণ্টন করা হয়। মুসলমানরা জমিটিকে তাদের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ইহুদি মালিকদের অনুমতি ছাড়াই তারা উৎপাদিত ফসল ব্যবহার করতে শুরু করে। এ কথা নবিজি জানতে পেরে মুসলমানদের একত্র করলেন। তারপর তাদের নিম্নোক্ত ভাষায় সম্বোধন করলেন-
'আমরা এই ইহুদিদের জান-মালের নিরাপত্তা দিয়েছি এবং তাদের আমাদের কর্মী হিসেবে নিযুক্ত করেছি। তারা এখন আমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ। ন্যায্য ফেরত ছাড়া তাদের সম্পত্তি থেকে খাওয়া বেআইনি।' ২৯৪
বর্ণিত ঘটনায় আরও যোগ করে বলা হয়েছে—এই নির্দেশের পর মুসলমান বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে আর কোনো অভিযোগ ওঠেনি। এই নির্দেশ দুর্বল কাউকে শোষণ না করার মূলনীতি হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। ২৯৫
টিকাঃ
২৭৮ ইয়ান কর্নেট, '5 Ways to Demonstrate Leadership Accountability & Ensure It in Others.
২৭৯ লেসি ল্যু, The Buck Stops here: A Culture of Accountability Drives Effective Leadership, Brandon Hall
২৮০ মুহাম্মাদ হাশিম কামালি, Citizenship and Accountability of Government: An Islamic Perspective, পৃষ্ঠা-১৯৫-১৯৬
২৮১ ইমাম গাজালি, ইহইয়াউ উলূমুদ্দিন, ফজলুল করীম অনূদিত
২৮২ আবদুল আজিম আল মুনজিরি, মুখতাসার সহিহ মুসলিম: ৩৪
২৮৩ মুসলিম, কিতাবাল ঈমান, বাব আল দ্বীন আল নাসিহাহ
২৮৪ মুসলিম, কে. আল-ইমারাহ, বি. কারাহিয়াত আল-ইমারাহ বি-গাইর দারুরাহ, হাদিস: ১৮২৫
২৮৫ মুহাম্মাদ আল গাজালি, মুশকিলাত فی তারিক আল হায়াত আল ইসলামিয়্যাহ, ২য় এডিশন (কায়রো: দারুল্লাদওয়া আল মিসরিয়্যাহ লিল তিবাহ ওয়াল নাশর, ১৯৯৬) পৃ.-১৩৯-৪০
২৮৬ মুসলিম: ৪৪৮৭
২৮৭ সাথনাম সাংঘেরা 'Think you'd make a great leader? You might be surprised' (Weekend Australian, January 5-6, 2019)
২৮৮ বুখারি, (মুহসিন খান অনূদিত) ভলিওম ৯, হাদিস ২৫২
২৮৯ মুসলিম: ৪৫১৪
২৯০ ইবনে সাদ, তাবাকাত ২য়, ২৫৫;
২৯১ সিরাত ইবনে হিশাম
২৯২ মুসলিম, মুখতাসার সহিহ মুসলিম, ৮২, হাদিস: ২৮৯
২৯৩ মুসলিম: ৯৪১
২৯৪ তাকি উদ্দীন আহমাদ Al-Maqrizi, edited by Mahmud Shakir (Cairo: Lajnah al-Ta'lif wa'l-Tarjamah wa'l-Nashr, 1360/1941), р.-328;
২৯৫ কামালি, নাগরিক ও সরকারের জবাবদিহিতা, পৃ.-২৩৬