📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 শূরা: পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা

📄 শূরা: পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা


একজন ভালো নেতার অবশ্যই সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা থাকতে হবে। এই সক্ষমতা থাকাটা বাধ্যতামূলক। একটি পরামর্শমূলক নেতৃত্বকাঠামো 'সত্যিই সেরা ও প্রিয়’ ২৪৬ হিসেবে বিবেচিত। নেতার কাছে যখন প্রয়োজনীয় তথ্য, অভিজ্ঞতা এবং কোনো বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকে, তখন তা সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।

একজন কার্যকর নেতা অত্যন্ত নম্র এবং এমন ব্যক্তিত্ব প্রদর্শন করেন, যেন তিনি তাঁর অধস্তনদের কথা শোনার জন্য সর্বদা প্রস্তুত। আর শুধু তখনই তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। ২৪৭ এই পদ্ধতি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করে। লোকেরা সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করতে আরও বেশি অনুপ্রাণিত হয়, যখন তারা দেখে-তাদের কথা আমলে নেওয়া হচ্ছে। ২৪৮

আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া কি শুধু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী থেকে আমরা পাই? না; বরং কুরআনে আল্লাহ তা বলে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন-
‘আর যারা তাদের রবের আহ্বানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, তাদের কার্যাবলি তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।’ সূরা আশ-শূরা: ৩৮

আল্লাহ আরও বলেন-
'আর আমি তোমার পূর্বে কেবল পুরুষদেরই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাদের প্রতি আমি ওহি পাঠিয়েছি। সুতরাং জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো, যদি তোমরা না জানো।' সূরা নাহল : ৪৩

'আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।' সূরা আলে ইমরান : ১৫৯

শূরার মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাদের এটা বুঝিয়ে দেন-তিনি ভবিষ্যৎ জানেন না। তাই যিনি যে বিষয়ে অভিজ্ঞ, তার কাছ থেকে সেভাবেই পরামর্শ নেওয়া হয়। এটা সকলের জন্যই উপকারী।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের দ্বারা পরিচালিত শূরার কিছু কিছু উদাহরণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
মুসলিম ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ হলো বদর যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ছিল সত্য-মিথ্যার লড়াই, বাঁচা-মরার লড়াই। সময়টা তখন ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের রমজান মাস, হিজরি দ্বিতীয় সন। প্রতিপক্ষ আর কেউ নয়; আরব মুশরিকরা। আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলাকে আটক করতে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। এদিকে কুরাইশরা এই খবর পেয়ে দলবল নিয়ে ছুটে আসে তাদের কাফেলা রক্ষা করতে। কাফেলা চলে গিয়েছে। কুরাইশ ও মুসলিমরা একে অন্যের মুখোমুখি।

রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের কাছে পরামর্শ চাইলেন; কী করবেন। আবু বকর (রা.) দাঁড়িয়ে কিছু কথা বললেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাতে কান দিলেন না। তারপর উমর (রা.) বললেন। তাতেও কিছু বললেন না। তারপর সাদ ইবনে উবাদা (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন-'আপনি বোধ হয় আমাদের পরামর্শ চাইছেন। আল্লাহর কসম! আপনি যদি আমাদের সাগরে ঝাঁপ দিতে বলেন, তাহলে আমরা সেখানেই ঝাঁপ দেবো। আপনি যা বলবেন, আমরা তা-ই করব।' তাঁর কথা শুনে তিনি অনেক খুশি হলেন এবং বদর প্রান্তে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন। ২৪৯

রাসূলুল্লাহ (সা.) আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে একটা বন্ধন তৈরি করে যুদ্ধে যেতে চেয়েছিলেন। কারণ, আনসাররা আক্রমণাত্মক যুদ্ধের জন্য বাইয়াতবদ্ধ হননি। আনসারি সাহাবি সাদ ইবনে উবাদা (রা.) যখন নবিজিকে অভয় দিলেন, তখন তিনি সন্তুষ্টচিত্তে সিদ্ধান্ত নিলেন।

আদিল সালাহি মুসলিমদের কাফেলা আক্রমণে ব্যাখ্যা করে বলেন-'মনে রাখা উচিত, যখন মুসলিমরা মক্কা ছেড়ে মদিনায় পাড়ি জমায়, তখন তাঁদের ধনসম্পদ সব মক্কায় রেখে গিয়েছিল। তারপর কুরাইশরা এসব ধনসম্পদ দখল করে নেয়। তাই এই কাফেলাতে মুসলিমদেরও ধনসম্পদ ছিল, যা পেলে তাঁরা ওইটার ক্ষতিপূরণ হিসেবে চুকিয়ে নিতেন।'২৫০

আরেকটি উদাহরণ হলো-বদর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সৈন্যদলকে নিয়ে কুয়া থেকে একটু দূরে অবস্থান নিয়েছিলেন। হুবাব ইবনে মুনজির (রা.) তাঁর কাছে গিয়ে বললেন-'আমরা এখানে যে অবস্থান নিয়েছি, তা কি আল্লাহর তরফ থেকে নাকি আপনার নিজের ইচ্ছায়?' অর্থাৎ এটা আল্লাহর হুকুম ছিল নাকি আপনার যুদ্ধকৌশল? নবিজি উত্তর দিলেন-'আল্লাহর ইচ্ছায় নয়, এটা আমার ইচ্ছায়!'২৫১

আল হুবাদ তখন বললেন-'সবাইকে কুয়ার পাশে নিয়ে চলুন। তাহলে আমরা সহজেই পানি পাব, আর শত্রুরা পাবে না। যুদ্ধে তৃষ্ণা পেলে আমরাই পান করব, তারা নয়।' রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর কথা শুনে বললেন-'তোমার পরামর্শ খুব ভালো।' তারপর সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন। ২৫২

ফলাফল ছিল মুসলিমদের বিজয়।

৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ অর্থাৎ তৃতীয় হিজরিতে শত্রুরা বিশাল বহর নিয়ে মদিনায় আক্রমণ করতে আসে। রাসূল (সা.)-এর পরামর্শ ছিল মদিনায় থেকে যুদ্ধ করা, কিন্তু অন্যরা চাচ্ছিলেন বাহিরে গিয়ে যুদ্ধ করতে। এক্ষেত্রে বেশির ভাগ মত ছিল উহুদে গিয়ে যুদ্ধ করার পক্ষে। ফলে রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে সবাই সেদিকে রওনা হলেন। ২৫৩

৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ তথা পঞ্চম হিজরিতে মুসলিমরা খবর পেলেন-সমগ্র আরব তাঁদের ধ্বংস করার জন্য মদিনার দিকে এগিয়ে আসছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাথে সাথে পরামর্শসভা ডাকলেন। অনেক আলোচনার পর তাঁরা সবাই সালমান ফারসি (রা.)-এর পরামর্শ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর পরামর্শ ছিল মদিনার তিন পাশে পরিখা খনন করা। এটা করলে শত্রুরা সীমানা পার হতে পারবে না। আর সহজেই তাঁরা শহরকে রক্ষা করতে পারবেন। কী দুর্দান্ত এক পরিকল্পনা! রাসূলুল্লাহ (সা.) দেরি না করে তাড়াতাড়ি পরিখা খনন করার নির্দেশ দেন এবং নিজেও কাজে লেগে পড়েন। ফলে এই যুদ্ধেও তাঁরা বিজয় লাভ করেন।

রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর নতুন এক নেতার অপেক্ষায় সবাই বসে ছিলেন; যিনি হবেন সৎপথের পরিচালক, খলিফা। নবিজি এই বিষয়ে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে মীমাংসা না করেই দুনিয়া থেকে বিদায় নেন, যেন তাঁরা পরামর্শ করে নেতা বাছাই করেন। পরামর্শসভায় এ নিয়ে অনেকক্ষণ আলোচনা হয়। তারপর সবাই একমত হয়ে আবু বকর (রা.)-কে খলিফা হিসেবে মেনে নেন। তিনিই হলেন মুসলিম বিশ্বের প্রথম খলিফা।

শূরার পরামর্শকে 'আধুনিক মুসলিম পার্লামেন্ট'-ও বলা যেতে পারে। শূরার সদস্যদের অবশ্যই বুদ্ধিমান, অভিজ্ঞ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ হতে হবে। মুসলিম নেতার জন্য শূরা কাউন্সিল বাধ্যতামূলক। শূরা বাস্তবায়ন হলে অন্তরে স্বৈরতন্ত্র বাসা বাঁধে না। বেশির ভাগ আলিম বিশ্বাস করেন- 'মুসলিম নেতাদের উচিত, হয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে চলা, আর না হয় শূরার যেদিকে সিদ্ধান্ত আসে সেদিকেই চলা।'২৫৪

টিকাঃ
২৪৬ মাইকেল ভ্যান পেল্ট 'Why Consultative Leadership is truly the best and Beloved,' Ascent Leadership Resources
২৪৭ মাইকেল ভ্যান পেল্ট 'Why Consultative Leadership is truly the best and Beloved.'
২৪৮ নেসিওয়ার জেবনাওন, Islam and Management, Edition 3, p.108.
২৪৯ আল বিদাআতে ইমাম আহমাদ দ্বারা বর্ণিত, ভলিওম ৩, পৃ.-২৬৩
২৫০ সালাহি, মুহাম্মাদ : মানুষ ও নবি, পৃ.-২৫৩
২৫১ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.- ৩৪৯
২৫২ ইবনে ইসহাক, সিরাতুন্নবি, পৃ.- ৯৮
২৫৩ আহমাদ, Management from Islamic Perspective, p.124
২৫৪ উদাহরণ দেখুন, মুহাম্মাদ আসাদ। দ্যা প্রিন্সিপাল অব দ্যা স্টেট অ্যান্ড গভমেন্ট ইন ইসলাম, পৃষ্ঠা-৪৫, ৫৮

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 ন্যায়পরায়ণতা (আদল)

📄 ন্যায়পরায়ণতা (আদল)


ন্যায়বিচার ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য এবং নেতৃত্বের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। বিশিষ্ট আলিম মুহাম্মাদ হাশিম কামালি ব্যাখ্যা করেন- 'আদলের আক্ষরিক অর্থ হলো, কোনো কিছুকে তার সঠিক জায়গায় স্থাপন করা। এটি অন্যদের সাথে সমান আচরণের ক্ষেত্রেও হতে পারে। এভাবে নৈতিক শুদ্ধতা ও ন্যায্যতাকে আদল বোঝায়। কারণ, যে জিনিসগুলো যেখানে থাকার যোগ্য, সেগুলোকে সেখানেই রাখা উচিত।

ন্যায়বিচারের সাথে সমতা খুব ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এটা অধিকার ও কর্তব্য বণ্টনে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। তবে ন্যায়বিচার ও সমতা এই অর্থে অভিন্ন নয়-নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, ন্যায়বিচার শুধু অসমতার মাধ্যমে অর্জন করা বা একটি সম্পদের অসম বণ্টন। ন্যায়বিচার হলো একটি সর্বজনীন ধারণা। কারণ, এর মৌলিক অর্থ বিশ্বে আলাদা করে দেখা হয় বলে মনে হয় না।২৫৫

রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে যখন অনুরোধ করা হলো-ইসলাম নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেওয়ার। তিনি তখন আল্লাহর কুরআন থেকে তিলাওয়াত করে বলেন- 'নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকট আত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।' সূরা নাহল : ৯০২৫৬

বর্তমানে ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ন্যায়বিচার হলো-ব্যবস্থাপনা গবেষণার একটি প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের সমানভাবে সুযোগ দেওয়া, যা কাজের সন্তুষ্টি, অনুপ্রেরণা, কর্মচারীর প্রতিশ্রুতি এবং উৎপাদনশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে। এই ধরনের ন্যায়বিচারের মধ্যে রয়েছে নিয়োগ ও বরখাস্তের ন্যায্য শর্ত, কর্মচারীদের ন্যায়সংগত নির্বাচন, ন্যায়সংগত বেতন ও মজুরির সংকল্প, কর্তব্য ও দায়িত্বের ন্যায়সংগত বণ্টন, কর্মীদের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো পরিচালনা করার ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখা, অভিযোগসমূহ যথাযথ পরিচালনা করা এবং তাদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া ইত্যাদি!'২৫৭

টিকাঃ
২৫৫ মোহাম্মদ হাশিম কামালি, Freedom, Equality and Justice in Islam, p. 103.
২৫৬ মুহাম্মাদ আবু জাহরাহ, তানজিম আল ইসলাম লিল, পৃষ্ঠা-৩১
২৫৭ নূর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্ব, পৃ.-১৪।

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 সাংগঠনিক ন্যায়বিচারের প্রকারভেদ

📄 সাংগঠনিক ন্যায়বিচারের প্রকারভেদ


বণ্টনমূলক ন্যায়বিচার : কর্মচারীদের সাংগঠনিক ফলাফলের ন্যায্যতা বা পুরস্কার দেওয়া, যা তাদের অধিকার। যেমন: পদোন্নতি, বেতন স্তর।

পদ্ধতিগত ন্যায়বিচার : কর্মচারীদের ন্যায্যতা কোনো পদ্ধতি দ্বারা বরাদ্দ করা। যেমন: বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করে নির্বাচিত হওয়া।

পারস্পরিক ন্যায়বিচার : কর্মচারীরা তাদের আন্তঃব্যক্তিক আচরণের কারণে (মর্যাদা, সম্মান) কর্তৃপক্ষ থেকে পুরস্কৃত হওয়া।২৫৮

ইসলামে আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহিদ) এবং মুহাম্মাদ (সা.)-এর নবুয়তে বিশ্বাসের জন্য অন্যতম একটি গুণ রয়েছে। তা হলো—'ন্যায়বিচার'।১৫৯ কুরআনে আল্লাহ মুসলমানদের অন্যের সাথে ন্যায়পরায়ণ এবং সমান আচরণ করার আদেশ দিয়েছেন; এমনকি নিজের সাথে আচরণ করার সময়ও।
'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।' সূরা মায়েদা : ৮

ন্যায়পরায়ণতা ছিল নবি (সা.)-এর মহান চরিত্রের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তিনি আল্লাহ কর্তৃক ন্যায়বিচার প্রদর্শনের আদেশ পালন করেছিলেন; তা শুধু মুসলিম সাহাবিদের সাথে ছিল না, ছিল অমুসলিমদের সাথেও। সর্বশক্তিমান আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ এবং তাঁর ইচ্ছার মধ্যে এক নিখুঁত সামঞ্জস্য ছিল। আর তাইতো বিচারের সময় তিনি নিজের আবেগ বা স্বার্থকে সব সময় দূরে রাখতেন, যেন কোনোভাবে বিচারকার্যে তা প্রভাব না ফেলে। নেতাদের অবশ্যই অন্যায়কে এড়িয়ে যেতে হবে, যদি তাঁরা অনুসারীদের আস্থা ও সম্মানের জায়গা ধরে রাখতে চান। রাসূল (সা.) বলেন-
'বিচার দিবসে সকল মানুষের মধ্যে আল্লাহর সবচেয়ে কাছের এবং প্রিয় ব্যক্তি হবেন ন্যায়পরায়ণ নেতা আর আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ এবং যে তাঁর থেকে দূরে থাকবে, সে হবে অন্যায়কারী। '২৬০

কুরআনে আল্লাহ বলেন-
'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন-আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে, তখন ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কতই-না সুন্দর উপদেশ দিচ্ছেন। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।' সূরা নিসা : ৫৮

নবি (সা.) মদিনায় মুসলমানদের অবস্থান সুসংহত করার পর শহরের নিরাপত্তার জন্য প্রতিবেশী ইহুদি উপজাতিদের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। কুরআন অমুসলিমদের সাথে সুসম্পর্ককে সমর্থন করে-
'দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।' সূরা মুমতাহিনা : ৮

ইসলামের দীপ্তিময় আলো ছড়ানোর আগে অন্ধকার যুগে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে এমন সম্মান করা হয়েছিল-বিবাদ ফয়সালার সিদ্ধান্ত নিতে তাঁকে খোঁজা হতো। রাবি ইবনে খুসাইম বলেন-
'জাহেলিয়াতের যুগে তারা দুই পক্ষের মধ্যে ফয়সালা নিত, যদি তা নবি মুহাম্মাদ (সা.) থেকে ফয়সালা আসত।'২৬১

আরবের বর্বর ও যুদ্ধপ্রবণ গোত্রদের সাথে নবিজি প্রায়শই নানান বিষয় নিয়ে দেন- দরবার করতেন। তারা এতটাই বর্বর ছিল, একজনের প্রতি দয়ামায়া দেখালে অন্যরা তা সহ্য করতে পারত না। উলটো বিগড়ে গিয়ে লড়াইয়ে লিপ্ত হতো। এমন অবস্থাতেও নবিজি ন্যায়ের পথ হতে একটুও সরে যাননি। ন্যায়ের প্রশ্নে তিনি মুমিন-কাফির, শত্রু-মিত্র, ধনী-গরিব এসবের তারতম্য করতেন না।১৬২

একটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে। সাখর নামের একজন গোত্রপ্রধান তায়েফ অবরোধে নবিজিকে প্রচুর সাহায্য করেছিলেন। এ কারণে নবিজি তার প্রতি ছিলেন কৃতজ্ঞ। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সাখরের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ আনা হয়। তার মধ্যে একটি ছিল মুগিরা (রা.)-এর খালাকে অবৈধভাবে বন্দি করার অভিযোগ এবং অন্যটি ছিল বনু সালিমের কূপ জোরপূর্বক দখলের। উভয় ক্ষেত্রেই রাসূল (সা.) সাখরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং জরিমানা করেন। ২৬৩

বেশকিছু ক্ষেত্রে মুহাজিররা যুদ্ধের গনিমত বেশি পেত। মক্কা বিজয়ের ঘটনা অনেক মক্কাবাসী এবং অন্যান্য উপজাতিকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসে। হুনাইনের যুদ্ধে বিজয়ের পর আরও গনিমতের মালামাল পাওয়া যায়। তখন নবি (সা.) নতুন মুসলমানদের অধিক গনিমতের মাল দিয়ে তাদের হৃদয়কে আকৃষ্ট ও নরম করার চেষ্টা করেছিলেন। আনসারদের কিছুই দেওয়া হয়নি। নবিজি এখন তাঁর নিজের শহর ফিরে পেয়েছেন। এর মানে কি এই-তিনি আনসারদের ভুলে যাবেন? ২৬৪

আবু সাইদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন- 'আনসারি নেতা সাদ ইবনে উবাদা (রা.) নবি করিম (সা.)-এর কাছে গেলেন। তিনি অকপটে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আনসারদের এই দলটি গনিমত নিয়ে অসন্তুষ্ট। আপনি আপনার লোকদের মধ্যে যুদ্ধের মাল বণ্টন করেছেন এবং আরব গোত্রদের দিয়েছেন, কিন্তু আনসারদের কিছুই দেননি। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে আনসারদের একত্রিত করতে নির্দেশ দিয়ে বললেন, সেখানে অন্য কেউ যেন না আসে।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের কাছে গেলেন এবং বললেন-হে আনসারগণ! কী কারণে তোমরা আমার ব্যাপারে অসন্তুষ্টি পোষণ করেছ? আমি কি তোমাদের নিকট এমন অবস্থায় আসিনি, যখন তোমরা পথভ্রষ্ট ছিলে? আল্লাহ তোমাদের হিদায়াত দান করেছেন? তোমরা ছিলে অসহায়, তিনি তোমাদের সহায়-সম্পত্তি দান করেছেন। তোমরা ছিলে পরস্পর পরস্পরের শত্রু, তিনি তোমাদের মধ্যে মহব্বতের বন্ধন সৃষ্টি করে দিয়েছেন।

আনসারগণ বললেন-অবশ্যই, এ সবকিছুই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর অনুগ্রহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) শেষে বললেন, হে আনসারগণ! তোমরা কি সন্তুষ্ট নও-লোকেরা উট ও মেষ নিয়ে ফিরে যাক আর তোমরা স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে নিয়ে নিজ ঘরে ফিরে যাও?

আরও বলেন-যদি হিজরতের বিধান না হতো, তবে আমিও হতাম আনসারদের মধ্যে একজন। যদি অন্য লোকেরা এক পথে চলেন এবং আনসারগণ অন্য পথে, তাহলে আমিও আনসারদের পথে চলব। হে আল্লাহ! আপনি আনসারদের, তাঁদের সন্তানদের এবং তাঁদের প্রতি রহম করুন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মুখে এমন কথা শুনে আনসাররা এত বেশি কান্নাকাটি করেন যে, তাঁদের চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে গিয়েছিল। সন্তোষজনক জবাব পেয়ে তাঁরা বললেন-হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের মধ্যে থাকাই সবচেয়ে বড়ো উপহার।'২৬৫

আরেকবার নবি (সা.) যুদ্ধের গনিমতের মাল বণ্টন করছিলেন। তখন লোকেরা তাঁর চারপাশে ভিড় জমায় এবং একজন প্রায় তাঁর ওপর উঠে পড়ে। তিনি লাঠি দিয়ে লোকটিকে সামান্য আঘাত করেন। এরপর তিনি এতটাই দুঃখিত হয়েছিলেন যে, লোকটিকে বলেছিলেন-'তুমি তোমার প্রতিশোধ নিতে পারো।' কিন্তু লোকটি বলল-'হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।'২৬৬

টিকাঃ
২৫৮ Ideas for Leaders, Justice, Fairness and Employee Engagement
২৫৯ কামালি, Freedom, Equality and Justice in Islam, p.107.
২৬০ তিরমিজি: ১৩২৯
১৬১ আবু বকর ইবনে আবি শাইবা, মুসান্নাফ, পৃষ্ঠা-৬৯
২৬২ "Prophet Muhammad's justice and equality', Islamweb.net
২৬৩ আবু দাউদ: ৩০৬১
২৬৪ 'The Ansar and Us,' (January 9, 2015)
২৬৫ ইবনে ইসহাক, সিরাতুন্নবি, পৃষ্ঠা-৫৯৬-৫৯৭
২৬৬ আবু দাউদ : ৪৫২১

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার

📄 সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার


অনেকে চায় তাদের সাথে যেন সমানভাবে আচরণ করা হয়। যেমন : মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে। এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুরূপ; যা সমাজে সম্পদ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে ইনসাফ বজায় রাখে। ইনসাফ এমন এক নীতি, যা মানুষ হিসেবে প্রত্যেককে মর্যাদায় সমকাতারভুক্ত করে এবং সবার প্রাপ্যটুকু সুষম হিসাবের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়! ২৬৭

কুরআন নৈতিক শুদ্ধি ও তাকওয়া ব্যতীত একে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে না। সেটা হতে পারে কোনো ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্র। [কুরআন ৪৯ : ১৩]। নবিজি ধনী-গরিব, আরব-অনারব ও মালিক-দাসের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি; যেমনটি তাঁর বিদায়ি ভাষণে বলেছেন-
'সমস্ত মানবজাতি আদম ও হাওয়ার বংশধর। একজন আরবের অনারবের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং কোনো অনারবের আরবের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই; এ ছাড়াও একজন শ্বেতাঙ্গের কৃষ্ণাঙ্গের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গের শ্বেতাঙ্গের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাকওয়া এবং উত্তম কাজের মধ্যে। '২৬৮

হাদিসে আছে- 'সকল মানুষই একটি চিরুনির দাঁতের সমান; যেমন সকল আদমসন্তানই সমান।'২৬৯

মুহাম্মাদ হাশিম কামালি বলেন-'চৌদ্দ শতাব্দী আগে আরব সমাজের ঐতিহাসিক বিন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে, সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি একটি সামাজিক বিপ্লবের চেয়ে কম কিছু ছিল না।'২৭০

রাসূল (সা.) কোনো কাজের জন্য সাহাবিদের ডাকলে তাঁদের সাথে এমনভাবে অংশগ্রহণ করতেন, যেন তিনি নিজেও একজন সাধারণ শ্রমিক। মদিনায় পৌঁছে প্রথম যে কাজটি করেন, তা হলো একটি মসজিদ নির্মাণ। নবিজি নিজে এই মসজিদ নির্মাণে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। নিজ হাতে ইট বহন করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন-'আমাদের জীবন আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি কেন কষ্ট করছেন?' তবুও তিনি থেমে না থেকে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২৭১

একবার কোনো এক সফরে খাবার তৈরি না হওয়ায় সকল সাহাবি একত্র হয়ে খাবার তৈরি করলেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নেন। নবিজি বন থেকে কাঠ আনার দায়িত্ব নেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন-'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার দাসদের এ দায়িত্ব পালন করতে দিন।' তিনি উত্তরে বললেন- 'আচ্ছা, তোমরা ঠিকই বলেছ, কিন্তু আমি পছন্দ করি না তোমাদের ওপর আমি আমার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করি। আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না-কেউ নিজেকে তাঁর সাহাবিদের থেকে শ্রেষ্ঠ মনে করুক।'২৭২

বদরের যুদ্ধে বাহনব্যবস্থা তেমন ভালো ছিল না। তিনজন লোকের জন্য ছিল একটি পশু, যেটার ওপর তাঁরা পালাক্রমে চড়ছিলেন। নবিজির ছিল একটি সওয়ারি পশু এবং একজন সাধারণ মানুষের মতো তাঁর সাথে আরও দুজন আরোহী ছিলেন। যখন বাকি দুজনের আরোহণের পালা এলো, তাঁরা নবিজিকে নিজেদের অধিকারটুকু ছেড়ে দেন। তাঁরা প্রস্তাব দেন-'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি নিচে নামবেন না; আমরা পায়ে হেঁটে যাব।' তখন নবিজি উত্তর দেন-'তোমরা আমার চেয়ে বেশি হাঁটতে পারবে না এবং আমি তোমাদের চেয়ে কম পুরস্কার চাই না।'২৭৩

কুরআনে সমতার বিষয়ে দুটি প্রধান বিষয়কে উৎসাহিত করা হয়েছে-
প্রথমত, এক আল্লাহতে বিশ্বাসীদের ভ্রাতৃত্ব।

দ্বিতীয়ত, মানবতার বৃহত্তর ভ্রাতৃত্ব। মৌলিক অধিকার ও কর্তব্যের বেলাতেও অনুরূপ। নিম্নে উল্লেখিত আয়াত জাতি, ভাষা বা সামাজিক মর্যাদায় বিভাজন; সমস্ত মানবজাতিকে সাধারণ সমতার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে।২৭৪
'হে মানুষ! আমি তোমাদের এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।' সূরা হুজুরাত : ১৩

এখানে তাকওয়া হলো-নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের একটি মাপকাঠি, যা আল্লাহর দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র স্বীকৃত মাপকাঠি। বাহ্যিকভাবে কিছু সাহাবি গরিব ছিলেন বটে, কিন্তু তাঁরা ছিলেন তাঁদের তাকওয়ার জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে উচ্চ সম্মানের অধিকারী। নিচের উদাহরণে তা বলা হয়েছে-

একদল কুরাইশ গণ্যমান্য ব্যক্তি নবিজির কাছে গিয়ে তাঁকে বলেছিলেন-'হে মুহাম্মাদ! আমরা কীভাবে আপনার সাথে বসতে পারি, যখন আপনি বিলাল, সুয়াইবের মতো লোকদের পাশে রেখেছেন। আপনার সঙ্গীদের তালিকা থেকে তাদের বাদ দিন। তাহলে আমরা আপনার সাথে বসব এবং আপনার কথা শুনব।' কিন্তু নবিজি তা মানতে অস্বীকৃতি জানালেও তারা তাদের শর্তে অনড় থাকে। তখন নিচের আয়াতটি তখন অবতীর্ণ হয়-
'আর যারা তাদের রবকে দিনরাত ডাকতে থাকে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রচেষ্টারত থাকে, তাদের তোমার কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিয়ো না। তাদের কৃতকর্ম থেকে কোনো জিনিসের (জবাবদিহির) দায়িত্ব তোমার ওপর নেই এবং তোমার কৃতকর্ম থেকেও কোনো জিনিসের (জবাবদিহির) দায়িত্ব তাদের ওপর নেই। এ সত্ত্বেও যদি তুমি তাদের দূরে ঠেলে দাও, তাহলে তুমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।' সূরা আনআম: ৫২

আল্লাহ এখানে নবিজিকে নির্দেশ দিয়েছেন-যারা তাকওয়ার গুণাবলির অধিকারী, তাঁদের প্রতি বেশি মনোযোগ দিতে।

একবার নবিজি কুরাইশ নেতাদের ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন। সেই আমন্ত্রণ অনুষ্ঠানে অন্ধ সাহাবি উম্মে মাকতুম ধর্মীয় বিষয়ে নবিজিকে একটি প্রশ্ন করেন। তখন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে কথা বলছিলেন নবিজি। ফলে উম্মে মাকতুমের কথায় কিঞ্চিত ভ্রুকুঞ্চন এবং একেবারেই হালকা বিরক্ত হলেন। ব্যাপারটি এতটা স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘটল যে, কেউ বুঝতেই পারেনি। কিন্তু আল্লাহ ঠিকই বুঝতে পারলেন। ২৭৫ এই ঘটনা নিয়ে সূরা আবাসা অবতীর্ণ হয়।

সূরায় আল্লাহ তায়ালা নবি (সা.)-কে ইসলামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে
'সে ভ্রুকুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ, তাঁর কাছে অন্ধ লোকটি আগমন করেছিল। আর কীসে তোমাকে জানাবে যে, সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো অথবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে সে উপদেশ তার উপকারে আসত। আর যে বেপরোয়া হয়েছে, তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছ। অথচ সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোনো দায়িত্ব বর্তাবে না। পক্ষান্তরে, যে তোমার কাছে ছুটে এলো, আর সে ভয়ও করে; অথচ তুমি তাঁর প্রতি উদাসীন হলে।' সূরা আবাসা : ১-১০

আইনের দৃষ্টিতে সমতার অর্থ-সকল মানুষ বৈষম্য ছাড়াই সমানভাবে আইনের শাসনের অধীন। সরকারি নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ কারও জন্য বাড়তি কোনো সুযোগ-সুবিধার স্বীকৃতি নেই। মুসলিম নেতা ও অনুসারীদের মধ্যে ন্যায়বিচার ও ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে আপস করা উচিত নয়। নিচের আলোচনার মাধ্যমে আমরা বিষয়টি বুঝতে পারব-

নবিজি বলেন-তিনি; এমনকি তাঁর নিজের পরিবারের ওপরও আইন প্রয়োগ করবেন, যদি প্রয়োজন হয়। মক্কা বিজয়ের সময় একজন মহিলা চুরি করেছিল। মহিলার গোত্রের লোকেরা তার জন্য সুপারিশ করতে উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর কাছে গেল। উসামা যখন রাসূল (সা.)-এর কাছে এ বিষয়ে সুপারিশ করলেন। আর সাথে সাথেই নবিজির মুখের রং পরিবর্তন হয়ে গেল।

তিনি বললেন-'তুমি কি আল্লাহর নির্দেশিত আইনগত শাস্তির একটি বিষয়ে আমার কাছে সুপারিশ করছ?' উসামা (রা.) বললেন-'হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।' বিকেলে আল্লাহর রাসূল (সা.) লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং তারপর বললেন-
'তোমাদের পূর্বের জাতিগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছিল। কারণ, তাদের মধ্যে সম্ভ্রান্তশালী কেউ চুরি করলে তারা তাকে মাফ করে দিত। আর তাদের মধ্যে কোনো গরিব চুরি করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তি প্রয়োগ করত। ২৭৬ আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা চুরি করে, তবে আমি তাঁর হাত কাটতে দ্বিধা করব না।' ২৭৭

মহিলাটি সম্ভ্রান্তশালী হওয়া সত্ত্বেও তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল এবং পরে সে অনুতপ্ত হয়েছিল।

টিকাঃ
২৬৭ আবদুল রশিদ মতিন ও আল ফাতিহ আবদুস সালাম, Glossary of Political Science Terms: Islamic and Western, p.45.
২৬৮ নবি (সা.)-এর শেষ আদেশ, মুসলিম
২৬৯ ইমাম জালালুদ্দিন সুযুতি, মানাবিল আস-সাফায়িইল সুয়ুতি, পৃষ্ঠা-৪৯
২৭০ কামালি, Freedom, Equality and Justice in Islam, p. 47.
২৭১ আল্লামা শিবলি নুমানি, সিরাতুন্নবি, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-২২৪
২৭২ নুমানি, সিরাতুন্নবি, ৩, পৃ.-২২৫
২৭৩ নুমানি, সিরাতুন্নবি, ৩, পৃ.-২২৫
২৭৪ কামালি, Freedom, Justice and Equality, p.50.
২৭৫ কামালি, Freedom, Justice and Equality, p.54.
২৭৬ বুখারি: ৫৫৯৭
২৭৭ বুখারি: ৭৭৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00