📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও আত্মশৃঙ্খলার উন্নয়ন

📄 আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও আত্মশৃঙ্খলার উন্নয়ন


অধ্যাপক ব্র্যাড জ্যাকসন ও ক্যান প্যারি নেতৃত্বের ওপর তাদের বইতে বলেন- 'প্রকৃত নেতাদের উচ্চমাত্রার মানসিক পরিপক্বতা ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, যাকে 'আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা' (Emotional Intelligence) দ্বারা ভারসাম্যপূর্ণ করে রাখা হয়েছে। এর অর্থ-নেতারা তাদের মানসিক অবস্থা যাচাই করতে এবং শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে ভালোভাবে সচেতন থাকতে পারে।'২২৪

Emotional Intelligence বিশেষজ্ঞ হার্ভে ডয়েচেনডর্ফ লিখেছেন-'আবেগজনিত বুদ্ধিমত্তা হলো সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল কাজের দক্ষতাগুলোর মধ্যে একটি। নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে যারা কাজ করেন, তারা মত দিয়েছেন-কলেজ/স্নাতকদের মানসম্পন্ন ফলাফল না হওয়ার কারণ তারা তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার ক্ষেত্রে অধিক মনোযোগ দিয়েছে। অথচ কর্মক্ষেত্রে আমাদের আবেগগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সাফল্যের একটি প্রধান উপাদান।'২২৫

জ্যাকসন ও প্যারি বিশদভাবে বলেছেন- 'যখন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করি, তখন আমরা নেতৃত্বজ্ঞানের ওপর (অর্থাৎ নেতৃত্ব সম্পর্কে জানা) বেশি মনোযোগ দিয়েছিলাম। নেতৃত্বের আচরণগত বোঝাপড়ার বিকাশের জন্য মনোযোগ নিয়োজিত করেছিলাম। যাহোক, আমাদের নেতৃত্বের আবেগগত দিকটিকে বুঝতে এবং লালন করতে হবে।

এবার আপনি ব্যর্থ নেতৃত্বের দিকে তাকান। দেখবেন, তাদের মূল ব্যর্থতা সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে; জ্ঞানগত বিষয়গুলোতে নয়। অথচ সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে তাদের আবেগজনিত বুদ্ধিমত্তার যথাযথ ব্যবহার জরুরি ছিল। বিশেষভাবে একজন নেতার কি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট মানসিক দৃঢ়তা আছে? আবেগজনিত বুদ্ধিমত্তা (EI)-এর ধারণাটির মূল কথা হলো-নেতারা যেন অন্যদের মানসিক অবস্থা বিবেচনায় নিতে পারে।'২২৬

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ ও লেখক ডেনিয়েল গোলম্যান বলেন-'উচ্চ আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা থাকা নেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি তাদের নিজেদের মানসিক চাহিদা এবং অনুসারীদের মানসিক অবস্থা ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করে। এই একই বিষয়গুলো এখন থেকে ১৪০০ বছর আগে মুহাম্মাদ (সা.) আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- "একজন ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার চেয়ে নিজের এবং অন্যের আবেগকে পরিচালনা করার ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"'

হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গবেষণায় দেখা যায়-আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ গুরুত্বপূর্ণ। ২২৭ দৃঢ় আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বুদ্ধিমান নেতারা মনের ভেতরে আঁকা ইতিবাচক ছবিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন; এমনকি যখন তাদের আশেপাশের অনেকেই একই পরিস্থিতি সম্পর্কে মারাত্মক নেতিবাচক চিন্তা করছেন, ঠিক তখনও। ২২৮

আমরা বুঝতে পারলাম-নেতৃত্ব সম্পর্কে গবেষক ও আমাদের প্রগতিশীল সমাজ যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলে দিয়েছেন, ইসলামে তা আগে থেকেই উপস্থিত। ইসলামে আগেই বলা হয়েছে তাজকিয়াতুন নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধির কথা। আত্মা ভুলপ্রবণ হয়; বিশেষ করে কেউ যখন অত্যধিক অহংকারী, রাগান্বিত বা নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। আল্লাহ বলে দিয়েছেন-'আত্মা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা নিয়ন্ত্রণ একজন মানুষের চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য অপরিহার্য মানদণ্ড। যেমন-
'কসম নফসের এবং যিনি তা সুষম করেছেন। অতঃপর তিনি তাকে অবহিত করেছেন তার পাপসমূহ ও তাকওয়া সম্পর্কে। নিঃসন্দেহে সে সফলকাম হয়েছে, যে তাকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তা (নাফস)-কে কলুষিত করেছে।' সূরা আশ- শামস: ৭-১০

আত্মনিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব নিয়ে নবিজি বলেছেন-
'শক্তিশালী সে নয়, যে তার প্রতিপক্ষকে দমিয়ে দেয়; বরং সে-ই শক্তিশালী, যে রাগান্বিত হলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। ' ২২৯

নেতৃত্ববিষয়ক লেখকরা বিশেষ করে পশ্চিমা লেখকরা২৩০ কিছু অভিমত দেন। নেতাদের মানসিক বুদ্ধিমত্তা বাড়াতে ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অর্জন করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন-
১. আত্মসচেতনতা বিকাশ; একজনের আবেগকে স্বীকার এবং বুঝতে চেষ্টা করা।
২. বিভিন্ন পরিস্থিতিতে একজনের আচরণ ও অভ্যাস নিরীক্ষণ।
৩. শক্তি ও দুর্বলতার মূল্যায়ন করা।
৪. কোন আচরণগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত এবং কোন আচরণগুলো মূল্যবোধ ও লক্ষ্যগুলোকে প্রতিফলিত করে, তা চিহ্নিত করা।
৫. আবেগকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা।
৬. চিন্তা-ভাবনা এবং মুখের অভিব্যক্তি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৭. নেতিবাচক অনুভূতি প্রত্যাখ্যান করা।
৮. বিষাক্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যকর উপায়ে পরিচালনা করা এবং ইতিবাচক মনোভাব ও আচরণ বেছে নেওয়া।
৯. মনকে শান্ত করার জন্য নিয়মিত ধ্যানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নেওয়া, কৃতজ্ঞতার সময় প্রশান্তি লাভ করা এবং অনুশোচনাকে দমন করা; যা সমস্ত নেতিবাচকতাকে ইতিবাচকতায় পরিণত করতে সহায়তা করে। ২৩১

কুরআনের শিক্ষাপদ্ধতি হলো-সঠিক চিন্তা-ভাবনা (তাফাক্কু) একজন মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, বাহ্যিক কর্মকাণ্ড, শক্তি ও চরিত্রের ঘাটতিগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয় এবং সংশোধনের জন্য অগ্রাধিকার চিহ্নিত করে। এরপর আত্মাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় (তাজকিয়াতুন নাফস); যা নৈতিক পূর্ণতা অর্জনে নিজেকে সংশোধনের অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টা (মুজাহাদাহ)।২৩২

পবিত্র কুরআন নবিজি ও তাঁর সাহাবিদের এই ধরনের প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলে-
'কিন্তু রাসূল ও তাঁর সাথে মুমিনরা তাঁদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করে, আর সেসব লোকের জন্যই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ এবং তাঁরাই সফলকাম।' সূরা তাওবা : ৮৮

নিচের হাদিসটি নিজেকে উন্নত করতে অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টার গুরুত্বকে ইঙ্গিত করে। নবিজি বলেন-
'জ্ঞানী ব্যক্তি তিনি, যিনি তার শারীরিক আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগের প্রতি নজর রাখেন। কোনটি ক্ষতিকর তা থেকে নিজেকে যাচাই এবং মৃত্যুর পরে কী উপকার হবে, সেজন্য চেষ্টা করেন। বোকা সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে তার আকাঙ্ক্ষার অধীনস্থ এবং আল্লাহর কাছে নিরর্থক আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রত্যাশা করে।'২৩৩

নিচের দুটি উদাহরণ মুহাম্মাদ (সা.)-এর ব্যতিক্রমী সহনশীলতার প্রমাণ দেয়, যার ফলে লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

একদিন এক বেদুইন মসজিদে প্রবেশ করল এবং তাশাহুদের সময় বলল-'হে আল্লাহ! আমার এবং মুহাম্মাদের প্রতি রহম করুন এবং অন্য কাউকে দয়া করবেন না।' রাসূল (সা.) বলে দিলেন-'আল্লাহর রহমতকে শুধু দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা তার ভুল, যেহেতু আল্লাহর রহমত বিশাল এবং সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে। নিশ্চয়ই সে প্রশস্ততাকে সংকীর্ণ করে দিয়েছে।'২৩৪

বেদুইন তখন উঠে দাঁড়িয়ে মসজিদের এক কোণে চলে গেল এবং আকস্মিকভাবে ও অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রস্রাব করতে শুরু করল, যেন সে যা করছে, তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। নবিজি সাহাবিদের বললেন-'মাহ (একটি অভিব্যক্তি, যা কোনো বিষয়ের কাউকে তীব্রভাবে তিরস্কার করার জন্য ব্যবহৃত হয়)।'

রাসূল (সা.) বললেন-'তাকে প্রস্রাব বন্ধ করাও এবং ছেড়ে দাও।' প্রস্রাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাহাবিরা তাকে কিছুই বলেননি। অতঃপর নবিজি তাকে ডেকে বললেন-'প্রস্রাব বা ময়লা ফেলার স্থান মসজিদগুলো নয়; মসজিদ শুধু আল্লাহর স্মরণ, নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য উপযুক্ত।'২৩৫

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নম্রতা ও দয়া দেখে বেদুইন ইসলাম কবুল করে। তারপর তাঁর লোকদের কাছে ফিরে এসে ইসলামের দাওয়াত দেয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহর রহমতে তারা ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করে।

জায়েদ ইবনে সু'না ছিলেন মদিনার একজন মহান ইহুদি রাব্বি। জায়েদ নবিজিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আশি মিসকাল (৩৫০ গ্রাম) স্বর্ণ ধার দিয়ে পরীক্ষা করার কথা ভেবেছিলেন। অর্থ পরিশোধের কয়েক দিন আগে জায়েদ রাগ করে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর পরনে থাকা চাদরে চেপে ধরলেন। এরপর বললেন-'হে মুহাম্মাদ! আপনি বকেয়া পরিশোধ করছেন না কেন? আল্লাহর কসম! আমি আপনার পরিবারকে ভালো করে চিনি! আপনি বারবার আপনার ঋণ শোধের সময় পিছিয়ে দেওয়ার জন্য পরিচিত।'

উমর (রা.) তখন তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে নবিজি বললেন-'উমর, আমাদের এসবের দরকার নেই। তার সাথে গিয়ে ঋণ পরিশোধ করে দাও এবং তাকে আরও বিশ সা' (৩২ কেজি) বেশি খেজুর দাও। কারণ, তুমি তাকে ভয় দেখিয়েছ।'

নবিজির এমন প্রতিক্রিয়াই জায়েদকে ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি উমর (রা.)-কে বলেছিলেন- 'নবুয়তের একটিও চিহ্ন বাকি ছিল না দুটি ছাড়া, যা আমি তাঁর কাছ থেকে দেখিনি-তাঁর সহনশীলতা তাঁর রাগকে জয় করে এবং সেই তীব্র গালাগালি কেবল তাঁর সহনশীলতাই বৃদ্ধি করে। আমি এখন এগুলো পরীক্ষা করেছি। তাই হে উমর! জেনে রাখুন-আমি আল্লাহকে (আমার) পালনকর্তা হিসেবে, ইসলামকে (আমার) ধর্ম হিসেবে, মুহাম্মাদকে (আমার) নবি হিসেবে এবং আমার অর্ধেক সম্পদ (কেননা, আমার কাছে প্রচুর সম্পদ রয়েছে) মুহাম্মাদের উম্মতের জন্য দান করলাম। '২৩৬

টিকাঃ
২২৪ ব্র্যাড জ্যাকসন ও কেন প্যারি, A Very Short, Fairly Interesting and Reasonably Cheap Book about Studying Leadership, p. 18.
২২৫ হার্ভে ডাশেনডর্ফ, 'Five Ways the Most Effective Leaders Manage Their Emotions.'
২২৬ জ্যাকসন এবং প্যারি, p.139.
২২৭ লিসা স্টিফেনসন, 'True leadership built on emotional intelligence', The Weekend Australian
২২৮ জ্যাকসন এবং প্যারি, p.140.
২২৯ বুখারি, ভলিওম ৮, বই ৭৩, হাদিস ১৩৫
২৩০ Self-discipline implies self-control, self-motivation, self-reliance, self-confidence and self-awareness.
২০১ "The importance of becoming a self-disciplined leader' (June 19, 2017)
২০২ আবু দাউদ আবদুল ফাত্তাহ বাচলার 'Chapter 13: Reducing Wasteful Consumption Towards Sustainability by Waste Avoidance Using Self-Improvement (Tazkiyah) and Contentment (Qana'ah) Approaches' in Mohammad Hashim Kamali, Osman Bakar, Daud Abdul-Fattah Batchelor and Ruqayah Hashim (eds), pp.200 and 208.
২৩৩ তিরমিজি: ২৫
২৩৪ বুখারি: ৬০১০
২৩৫ মুসলিম: ২৮৫
২৩৬ সহিহ ইবনে হিব্বান : ২৮৮; বায়হাকি : ১১০৬৬; আল হাকিম : ৬৫৪৭

অধ্যাপক ব্র্যাড জ্যাকসন ও ক্যান প্যারি নেতৃত্বের ওপর তাদের বইতে বলেন- 'প্রকৃত নেতাদের উচ্চমাত্রার মানসিক পরিপক্বতা ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, যাকে 'আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা' (Emotional Intelligence) দ্বারা ভারসাম্যপূর্ণ করে রাখা হয়েছে। এর অর্থ-নেতারা তাদের মানসিক অবস্থা যাচাই করতে এবং শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে ভালোভাবে সচেতন থাকতে পারে।'২২৪

Emotional Intelligence বিশেষজ্ঞ হার্ভে ডয়েচেনডর্ফ লিখেছেন-'আবেগজনিত বুদ্ধিমত্তা হলো সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল কাজের দক্ষতাগুলোর মধ্যে একটি। নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে যারা কাজ করেন, তারা মত দিয়েছেন-কলেজ/স্নাতকদের মানসম্পন্ন ফলাফল না হওয়ার কারণ তারা তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার ক্ষেত্রে অধিক মনোযোগ দিয়েছে। অথচ কর্মক্ষেত্রে আমাদের আবেগগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সাফল্যের একটি প্রধান উপাদান।'২২৫

জ্যাকসন ও প্যারি বিশদভাবে বলেছেন- 'যখন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করি, তখন আমরা নেতৃত্বজ্ঞানের ওপর (অর্থাৎ নেতৃত্ব সম্পর্কে জানা) বেশি মনোযোগ দিয়েছিলাম। নেতৃত্বের আচরণগত বোঝাপড়ার বিকাশের জন্য মনোযোগ নিয়োজিত করেছিলাম। যাহোক, আমাদের নেতৃত্বের আবেগগত দিকটিকে বুঝতে এবং লালন করতে হবে।

এবার আপনি ব্যর্থ নেতৃত্বের দিকে তাকান। দেখবেন, তাদের মূল ব্যর্থতা সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে; জ্ঞানগত বিষয়গুলোতে নয়। অথচ সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে তাদের আবেগজনিত বুদ্ধিমত্তার যথাযথ ব্যবহার জরুরি ছিল। বিশেষভাবে একজন নেতার কি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট মানসিক দৃঢ়তা আছে? আবেগজনিত বুদ্ধিমত্তা (EI)-এর ধারণাটির মূল কথা হলো-নেতারা যেন অন্যদের মানসিক অবস্থা বিবেচনায় নিতে পারে।'২২৬

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ ও লেখক ডেনিয়েল গোলম্যান বলেন-'উচ্চ আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা থাকা নেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি তাদের নিজেদের মানসিক চাহিদা এবং অনুসারীদের মানসিক অবস্থা ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করে। এই একই বিষয়গুলো এখন থেকে ১৪০০ বছর আগে মুহাম্মাদ (সা.) আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- "একজন ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার চেয়ে নিজের এবং অন্যের আবেগকে পরিচালনা করার ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"'

হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গবেষণায় দেখা যায়-আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ গুরুত্বপূর্ণ। ২২৭ দৃঢ় আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বুদ্ধিমান নেতারা মনের ভেতরে আঁকা ইতিবাচক ছবিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন; এমনকি যখন তাদের আশেপাশের অনেকেই একই পরিস্থিতি সম্পর্কে মারাত্মক নেতিবাচক চিন্তা করছেন, ঠিক তখনও। ২২৮

আমরা বুঝতে পারলাম-নেতৃত্ব সম্পর্কে গবেষক ও আমাদের প্রগতিশীল সমাজ যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলে দিয়েছেন, ইসলামে তা আগে থেকেই উপস্থিত। ইসলামে আগেই বলা হয়েছে তাজকিয়াতুন নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধির কথা। আত্মা ভুলপ্রবণ হয়; বিশেষ করে কেউ যখন অত্যধিক অহংকারী, রাগান্বিত বা নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। আল্লাহ বলে দিয়েছেন-'আত্মা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা নিয়ন্ত্রণ একজন মানুষের চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য অপরিহার্য মানদণ্ড। যেমন-
'কসম নফসের এবং যিনি তা সুষম করেছেন। অতঃপর তিনি তাকে অবহিত করেছেন তার পাপসমূহ ও তাকওয়া সম্পর্কে। নিঃসন্দেহে সে সফলকাম হয়েছে, যে তাকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তা (নাফস)-কে কলুষিত করেছে।' সূরা আশ- শামস: ৭-১০

আত্মনিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব নিয়ে নবিজি বলেছেন-
'শক্তিশালী সে নয়, যে তার প্রতিপক্ষকে দমিয়ে দেয়; বরং সে-ই শক্তিশালী, যে রাগান্বিত হলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। ' ২২৯

নেতৃত্ববিষয়ক লেখকরা বিশেষ করে পশ্চিমা লেখকরা২৩০ কিছু অভিমত দেন। নেতাদের মানসিক বুদ্ধিমত্তা বাড়াতে ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অর্জন করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন-
১. আত্মসচেতনতা বিকাশ; একজনের আবেগকে স্বীকার এবং বুঝতে চেষ্টা করা।
২. বিভিন্ন পরিস্থিতিতে একজনের আচরণ ও অভ্যাস নিরীক্ষণ।
৩. শক্তি ও দুর্বলতার মূল্যায়ন করা।
৪. কোন আচরণগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত এবং কোন আচরণগুলো মূল্যবোধ ও লক্ষ্যগুলোকে প্রতিফলিত করে, তা চিহ্নিত করা।
৫. আবেগকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা।
৬. চিন্তা-ভাবনা এবং মুখের অভিব্যক্তি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৭. নেতিবাচক অনুভূতি প্রত্যাখ্যান করা।
৮. বিষাক্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যকর উপায়ে পরিচালনা করা এবং ইতিবাচক মনোভাব ও আচরণ বেছে নেওয়া।
৯. মনকে শান্ত করার জন্য নিয়মিত ধ্যানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নেওয়া, কৃতজ্ঞতার সময় প্রশান্তি লাভ করা এবং অনুশোচনাকে দমন করা; যা সমস্ত নেতিবাচকতাকে ইতিবাচকতায় পরিণত করতে সহায়তা করে। ২৩১

কুরআনের শিক্ষাপদ্ধতি হলো-সঠিক চিন্তা-ভাবনা (তাফাক্কু) একজন মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, বাহ্যিক কর্মকাণ্ড, শক্তি ও চরিত্রের ঘাটতিগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয় এবং সংশোধনের জন্য অগ্রাধিকার চিহ্নিত করে। এরপর আত্মাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় (তাজকিয়াতুন নাফস); যা নৈতিক পূর্ণতা অর্জনে নিজেকে সংশোধনের অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টা (মুজাহাদাহ)।২৩২

পবিত্র কুরআন নবিজি ও তাঁর সাহাবিদের এই ধরনের প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলে-
'কিন্তু রাসূল ও তাঁর সাথে মুমিনরা তাঁদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করে, আর সেসব লোকের জন্যই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ এবং তাঁরাই সফলকাম।' সূরা তাওবা : ৮৮

নিচের হাদিসটি নিজেকে উন্নত করতে অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টার গুরুত্বকে ইঙ্গিত করে। নবিজি বলেন-
'জ্ঞানী ব্যক্তি তিনি, যিনি তার শারীরিক আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগের প্রতি নজর রাখেন। কোনটি ক্ষতিকর তা থেকে নিজেকে যাচাই এবং মৃত্যুর পরে কী উপকার হবে, সেজন্য চেষ্টা করেন। বোকা সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে তার আকাঙ্ক্ষার অধীনস্থ এবং আল্লাহর কাছে নিরর্থক আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রত্যাশা করে।'২৩৩

নিচের দুটি উদাহরণ মুহাম্মাদ (সা.)-এর ব্যতিক্রমী সহনশীলতার প্রমাণ দেয়, যার ফলে লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

একদিন এক বেদুইন মসজিদে প্রবেশ করল এবং তাশাহুদের সময় বলল-'হে আল্লাহ! আমার এবং মুহাম্মাদের প্রতি রহম করুন এবং অন্য কাউকে দয়া করবেন না।' রাসূল (সা.) বলে দিলেন-'আল্লাহর রহমতকে শুধু দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা তার ভুল, যেহেতু আল্লাহর রহমত বিশাল এবং সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে। নিশ্চয়ই সে প্রশস্ততাকে সংকীর্ণ করে দিয়েছে।'২৩৪

বেদুইন তখন উঠে দাঁড়িয়ে মসজিদের এক কোণে চলে গেল এবং আকস্মিকভাবে ও অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রস্রাব করতে শুরু করল, যেন সে যা করছে, তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। নবিজি সাহাবিদের বললেন-'মাহ (একটি অভিব্যক্তি, যা কোনো বিষয়ের কাউকে তীব্রভাবে তিরস্কার করার জন্য ব্যবহৃত হয়)।'

রাসূল (সা.) বললেন-'তাকে প্রস্রাব বন্ধ করাও এবং ছেড়ে দাও।' প্রস্রাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাহাবিরা তাকে কিছুই বলেননি। অতঃপর নবিজি তাকে ডেকে বললেন-'প্রস্রাব বা ময়লা ফেলার স্থান মসজিদগুলো নয়; মসজিদ শুধু আল্লাহর স্মরণ, নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য উপযুক্ত।'২৩৫

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নম্রতা ও দয়া দেখে বেদুইন ইসলাম কবুল করে। তারপর তাঁর লোকদের কাছে ফিরে এসে ইসলামের দাওয়াত দেয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহর রহমতে তারা ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করে।

জায়েদ ইবনে সু'না ছিলেন মদিনার একজন মহান ইহুদি রাব্বি। জায়েদ নবিজিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আশি মিসকাল (৩৫০ গ্রাম) স্বর্ণ ধার দিয়ে পরীক্ষা করার কথা ভেবেছিলেন। অর্থ পরিশোধের কয়েক দিন আগে জায়েদ রাগ করে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর পরনে থাকা চাদরে চেপে ধরলেন। এরপর বললেন-'হে মুহাম্মাদ! আপনি বকেয়া পরিশোধ করছেন না কেন? আল্লাহর কসম! আমি আপনার পরিবারকে ভালো করে চিনি! আপনি বারবার আপনার ঋণ শোধের সময় পিছিয়ে দেওয়ার জন্য পরিচিত।'

উমর (রা.) তখন তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে নবিজি বললেন-'উমর, আমাদের এসবের দরকার নেই। তার সাথে গিয়ে ঋণ পরিশোধ করে দাও এবং তাকে আরও বিশ সা' (৩২ কেজি) বেশি খেজুর দাও। কারণ, তুমি তাকে ভয় দেখিয়েছ।'

নবিজির এমন প্রতিক্রিয়াই জায়েদকে ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি উমর (রা.)-কে বলেছিলেন- 'নবুয়তের একটিও চিহ্ন বাকি ছিল না দুটি ছাড়া, যা আমি তাঁর কাছ থেকে দেখিনি-তাঁর সহনশীলতা তাঁর রাগকে জয় করে এবং সেই তীব্র গালাগালি কেবল তাঁর সহনশীলতাই বৃদ্ধি করে। আমি এখন এগুলো পরীক্ষা করেছি। তাই হে উমর! জেনে রাখুন-আমি আল্লাহকে (আমার) পালনকর্তা হিসেবে, ইসলামকে (আমার) ধর্ম হিসেবে, মুহাম্মাদকে (আমার) নবি হিসেবে এবং আমার অর্ধেক সম্পদ (কেননা, আমার কাছে প্রচুর সম্পদ রয়েছে) মুহাম্মাদের উম্মতের জন্য দান করলাম। '২৩৬

টিকাঃ
২২৪ ব্র্যাড জ্যাকসন ও কেন প্যারি, A Very Short, Fairly Interesting and Reasonably Cheap Book about Studying Leadership, p. 18.
২২৫ হার্ভে ডাশেনডর্ফ, 'Five Ways the Most Effective Leaders Manage Their Emotions.'
২২৬ জ্যাকসন এবং প্যারি, p.139.
২২৭ লিসা স্টিফেনসন, 'True leadership built on emotional intelligence', The Weekend Australian
২২৮ জ্যাকসন এবং প্যারি, p.140.
২২৯ বুখারি, ভলিওম ৮, বই ৭৩, হাদিস ১৩৫
২৩০ Self-discipline implies self-control, self-motivation, self-reliance, self-confidence and self-awareness.
২০১ "The importance of becoming a self-disciplined leader' (June 19, 2017)
২০২ আবু দাউদ আবদুল ফাত্তাহ বাচলার 'Chapter 13: Reducing Wasteful Consumption Towards Sustainability by Waste Avoidance Using Self-Improvement (Tazkiyah) and Contentment (Qana'ah) Approaches' in Mohammad Hashim Kamali, Osman Bakar, Daud Abdul-Fattah Batchelor and Ruqayah Hashim (eds), pp.200 and 208.
২৩৩ তিরমিজি: ২৫
২৩৪ বুখারি: ৬০১০
২৩৫ মুসলিম: ২৮৫
২৩৬ সহিহ ইবনে হিব্বান : ২৮৮; বায়হাকি : ১১০৬৬; আল হাকিম : ৬৫৪৭

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 আলোচনা

📄 আলোচনা


নিম্নলিখিত পর্যালোচনাগুলো আধুনিক নেতৃত্বের ধরন, যা মুহাম্মাদ (সা.)-এর নেতৃত্বের বিভিন্ন উপাদানকেও প্রতিফলিত করে- রূপান্তর ও কার্যসম্পাদনমূলক নেতৃত্ব: যুক্তিযুক্তভাবে নেতৃত্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সারাংশ হলো-রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব, যা অনুসারীদের মনোভাব, অনুপ্রেরণা ও আচরণের রূপান্তরকে প্রকাশ করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস বার্নস বিশ্বাস করতেন-'নেতৃত্বের রূপান্তর শেষ পর্যন্ত নৈতিক হয়ে ওঠে এবং নেতৃত্ব ও নেতা উভয়ের মানবিক আচরণ ও নৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে বৃদ্ধি করে। এভাবে রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব উভয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। নেতারা নিজেদের অনুগামীদের সাথে সুসম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হবে। ফলে নেতা ও অনুসারীরা নিজেদের কাজে হবে আরও বেশি সক্রিয়। এতে নতুন অনুসারী বৃদ্ধি পাবে।'২৩৭

ইসমাইল নুর বলেন-'পরিবর্তন আবারও গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ইসলাম জীবনের সকল ক্ষেত্রে অন্তর্দৃষ্টি এবং ব্যাপক প্রসারের কারণে মদিনার লোকদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছিল।'২৩৮

নেতৃত্বের আরেকটি শৈলী হলো-কার্যসম্পাদনমূলক নেতৃত্ব, যেখানে নেতা ও অনুসারীর মধ্যে বিনিময় জড়িত। এখানে নেতা কর্মক্ষমতার বিনিময়ে পুরস্কার প্রদান করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) পবিত্র কুরআনের প্রতিফলন। তিনি সর্বদা তাঁর সাহাবিদের কাছে তুলে ধরেছেন-আল্লাহ তায়ালা এই পুরস্কার দুনিয়া ও পরকালের জীবনে বিশ্বাসীদের প্রদান করবেন। তিনি যুদ্ধের গনিমতও বিতরণ করেছিলেন, যাতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মন জয় করতে পারেন। তিনি নতুন মুসলমানদের বেশি পুরস্কার দিয়েছিলেন। কার্যকর নেতারা রূপান্তর ও কার্যসম্পাদন উভয়টাতে সফল হন এবং অনুসারীদের প্রত্যাশার বাইরে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেন।২৩৯

সেবক, প্রামাণিক, আধ্যাত্মিক ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব : সেবক নেতারা তাদের দলের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেয়। সংযুক্ততার ধারণার ওপর ভিত্তি করে সেবক নেতৃত্বের চারটি কর্মবিধি তৈরি করা হয়েছে। যথা : নিজের আগে অন্যের সেবা; নিশ্চিতকরণের উপায় হিসেবে শোনা, বিশ্বাস তৈরি করা এবং অনুসারীদের গড়ে তোলা।২৪০

গার্ডনার ও তার সহকর্মীরা বলেন- 'প্রকৃত নেতা তারাই, যারা স্বচ্ছতা, বিশ্বাস, সততা এবং উচ্চ নৈতিক মান দ্বারা নেতৃত্ব দেন। আমরা এমন নেতাদের বলি প্রামাণিক নেতা। তারা কেবল নিজের প্রতিই সৎ নন, একইভাবে সততা অর্জনে সাহায্য করে অন্যদেরও নেতৃত্ব দেন।'২৪১

মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সমস্ত প্রচেষ্টায় দেখিয়েছেন-তিনি নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে খাঁটি/প্রামাণিক মানুষ ছিলেন।

নেতৃত্ববিশেষজ্ঞ লুই ফ্রাই বলেন-'আধ্যাত্মিকতা হলো ব্যক্তিদের সন্তুষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে একটি।'২৪২

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান ভূমিকা ছিল মানবতার মধ্যে তাদের রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রভুর অস্তিত্ব এবং তাদের অন্তর্নিহিত আত্মা (রুহ)-এর অস্তিত্বকে জাগ্রত করা। সর্বশক্তিমান আল্লাহকে নিরন্তর স্মরণ ও তাঁর কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে কীভাবে আত্মার খোরাক সরবরাহ করা যায়, তা দেখানো এবং সর্বাবস্থায় তাঁকে খুশি করাও তাঁর ভূমিকার অন্যতম অংশ।

'গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব'; যা পূর্বে আলোচিত নেতৃত্বের শৈলীগুলোর সাথে যুক্ত। এর অর্থ নেতারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দলের সদস্যদের কাছ থেকে পরামর্শ চান।

উপসংহার নবিজির নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি নেতৃত্ববিষয়ক অনেকগুলো ইতিবাচক নেতৃত্বের শৈলীকে আলিঙ্গন করে। এই অধ্যায়ের আগে বর্ণিত নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যগুলোকে সর্বাধিক পরিমাণে উদাহরণ হিসেবে নবিজিকে তুলে ধরা হয়েছে। সুতরাং মুহাম্মাদ (সা.)-কে চূড়ান্ত নেতা হিসেবে চিহ্নিত করতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই। নেতৃত্ববিষয়ক লেখক আজমান হুসাইন, রোজহান উসমান ও তারেক আল সুওয়াইদানের মূল্যায়নের সাথে আমরা সম্পূর্ণ একমত। যারা বিশ্বাস করেন-'আধুনিক নেতৃত্বের অধ্যয়নের ভিত্তিতেও রাসূলুল্লাহ (সা.) নেতৃত্বের একক রোলমডেল হতে পারেন।'২৪৩

টিকাঃ
২৩৭ থমাস জে পিটার্স ও এইচি ওয়াটারম্যান জুনিয়র, In Search of Excellence : Lesson's from America's Best-Run Companies, pp. 82-83.
২৩৮ নুর, রাসূলুল্লাহর নেতৃত্ব, পৃ.-৬৮
২৩৯ জ্যাকসন ও প্যারি, পৃষ্ঠা ৩১
২৪০ Leadership Theory and Practice
২৪১ 'Can you see the real me? A self-based model of authentic leader and follower development', p.344.
২৪২ ফ্রাই এল, ডব্লিউ Towards a paradigm of spiritual leadership, p.619-622.
২৪৩ হুসাইন, উসমান ও আল সুওয়াইদান, নবি মুহাম্মাদ (সা.), পৃ.-২৬৮

নিম্নলিখিত পর্যালোচনাগুলো আধুনিক নেতৃত্বের ধরন, যা মুহাম্মাদ (সা.)-এর নেতৃত্বের বিভিন্ন উপাদানকেও প্রতিফলিত করে- রূপান্তর ও কার্যসম্পাদনমূলক নেতৃত্ব: যুক্তিযুক্তভাবে নেতৃত্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সারাংশ হলো-রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব, যা অনুসারীদের মনোভাব, অনুপ্রেরণা ও আচরণের রূপান্তরকে প্রকাশ করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস বার্নস বিশ্বাস করতেন-'নেতৃত্বের রূপান্তর শেষ পর্যন্ত নৈতিক হয়ে ওঠে এবং নেতৃত্ব ও নেতা উভয়ের মানবিক আচরণ ও নৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে বৃদ্ধি করে। এভাবে রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব উভয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। নেতারা নিজেদের অনুগামীদের সাথে সুসম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হবে। ফলে নেতা ও অনুসারীরা নিজেদের কাজে হবে আরও বেশি সক্রিয়। এতে নতুন অনুসারী বৃদ্ধি পাবে।'২৩৭

ইসমাইল নুর বলেন-'পরিবর্তন আবারও গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ইসলাম জীবনের সকল ক্ষেত্রে অন্তর্দৃষ্টি এবং ব্যাপক প্রসারের কারণে মদিনার লোকদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছিল।'২৩৮

নেতৃত্বের আরেকটি শৈলী হলো-কার্যসম্পাদনমূলক নেতৃত্ব, যেখানে নেতা ও অনুসারীর মধ্যে বিনিময় জড়িত। এখানে নেতা কর্মক্ষমতার বিনিময়ে পুরস্কার প্রদান করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) পবিত্র কুরআনের প্রতিফলন। তিনি সর্বদা তাঁর সাহাবিদের কাছে তুলে ধরেছেন-আল্লাহ তায়ালা এই পুরস্কার দুনিয়া ও পরকালের জীবনে বিশ্বাসীদের প্রদান করবেন। তিনি যুদ্ধের গনিমতও বিতরণ করেছিলেন, যাতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মন জয় করতে পারেন। তিনি নতুন মুসলমানদের বেশি পুরস্কার দিয়েছিলেন। কার্যকর নেতারা রূপান্তর ও কার্যসম্পাদন উভয়টাতে সফল হন এবং অনুসারীদের প্রত্যাশার বাইরে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেন।২৩৯

সেবক, প্রামাণিক, আধ্যাত্মিক ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব : সেবক নেতারা তাদের দলের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেয়। সংযুক্ততার ধারণার ওপর ভিত্তি করে সেবক নেতৃত্বের চারটি কর্মবিধি তৈরি করা হয়েছে। যথা : নিজের আগে অন্যের সেবা; নিশ্চিতকরণের উপায় হিসেবে শোনা, বিশ্বাস তৈরি করা এবং অনুসারীদের গড়ে তোলা।২৪০

গার্ডনার ও তার সহকর্মীরা বলেন- 'প্রকৃত নেতা তারাই, যারা স্বচ্ছতা, বিশ্বাস, সততা এবং উচ্চ নৈতিক মান দ্বারা নেতৃত্ব দেন। আমরা এমন নেতাদের বলি প্রামাণিক নেতা। তারা কেবল নিজের প্রতিই সৎ নন, একইভাবে সততা অর্জনে সাহায্য করে অন্যদেরও নেতৃত্ব দেন।'২৪১

মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সমস্ত প্রচেষ্টায় দেখিয়েছেন-তিনি নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে খাঁটি/প্রামাণিক মানুষ ছিলেন।

নেতৃত্ববিশেষজ্ঞ লুই ফ্রাই বলেন-'আধ্যাত্মিকতা হলো ব্যক্তিদের সন্তুষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে একটি।'২৪২

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান ভূমিকা ছিল মানবতার মধ্যে তাদের রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রভুর অস্তিত্ব এবং তাদের অন্তর্নিহিত আত্মা (রুহ)-এর অস্তিত্বকে জাগ্রত করা। সর্বশক্তিমান আল্লাহকে নিরন্তর স্মরণ ও তাঁর কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে কীভাবে আত্মার খোরাক সরবরাহ করা যায়, তা দেখানো এবং সর্বাবস্থায় তাঁকে খুশি করাও তাঁর ভূমিকার অন্যতম অংশ।

'গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব'; যা পূর্বে আলোচিত নেতৃত্বের শৈলীগুলোর সাথে যুক্ত। এর অর্থ নেতারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দলের সদস্যদের কাছ থেকে পরামর্শ চান।

উপসংহার নবিজির নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি নেতৃত্ববিষয়ক অনেকগুলো ইতিবাচক নেতৃত্বের শৈলীকে আলিঙ্গন করে। এই অধ্যায়ের আগে বর্ণিত নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যগুলোকে সর্বাধিক পরিমাণে উদাহরণ হিসেবে নবিজিকে তুলে ধরা হয়েছে। সুতরাং মুহাম্মাদ (সা.)-কে চূড়ান্ত নেতা হিসেবে চিহ্নিত করতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই। নেতৃত্ববিষয়ক লেখক আজমান হুসাইন, রোজহান উসমান ও তারেক আল সুওয়াইদানের মূল্যায়নের সাথে আমরা সম্পূর্ণ একমত। যারা বিশ্বাস করেন-'আধুনিক নেতৃত্বের অধ্যয়নের ভিত্তিতেও রাসূলুল্লাহ (সা.) নেতৃত্বের একক রোলমডেল হতে পারেন।'২৪৩

টিকাঃ
২৩৭ থমাস জে পিটার্স ও এইচি ওয়াটারম্যান জুনিয়র, In Search of Excellence : Lesson's from America's Best-Run Companies, pp. 82-83.
২৩৮ নুর, রাসূলুল্লাহর নেতৃত্ব, পৃ.-৬৮
২৩৯ জ্যাকসন ও প্যারি, পৃষ্ঠা ৩১
২৪০ Leadership Theory and Practice
২৪১ 'Can you see the real me? A self-based model of authentic leader and follower development', p.344.
২৪২ ফ্রাই এল, ডব্লিউ Towards a paradigm of spiritual leadership, p.619-622.
২৪৩ হুসাইন, উসমান ও আল সুওয়াইদান, নবি মুহাম্মাদ (সা.), পৃ.-২৬৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00