📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 ধৈর্য ও অধ্যবসায়

📄 ধৈর্য ও অধ্যবসায়


বিখ্যাত ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন- 'ইসলামে নেতৃত্ব অর্জিত হয় ধৈর্য ও বিশ্বাসের দৃঢ়তার মাধ্যমে।'১৭৩

কুরআনের বর্ণনানুসারে-
'আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নবি করেছিলাম, তাঁরা আমার আদেশ অনুযায়ী সৎপথপ্রদর্শন করত, যখন তাঁরা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তাঁরা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত।' সূরা সাজদা: ২৪

আল্লাহ তায়ালা নেতাদের ও তাঁর সময়ের মানুষদের অনেক পরীক্ষা নেন। আল্লাহ বলেন-
'আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব, যতক্ষণ না আমি প্রকাশ করে দিই তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদকারী ও ধৈর্যশীল এবং আমি তোমাদের কথা ও কাজ পরীক্ষা করে নেব।' সূরা মুহাম্মাদ: ৩১

'পরীক্ষা' শব্দটি নিয়ে ক্বাদি আইয়্যাদ তাঁর আশ-শিফা গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন-
'আল্লাহ নবিদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি ও মর্যাদা উন্নীত করার জন্য বিভিন্ন প্রকার কষ্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। নবিগণের দুর্দশা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা অটলতা, আনন্দ, কৃতজ্ঞতা, বশ্যতা, নির্ভরতা, অর্পণ, মিনতি, অনুনয়ে ব্যাকুল ও নমনীয় ছিলেন।

তাদের পরীক্ষা অন্যদের জন্য ছিল একটি সতর্কবাণী, যাতে লোকেরা কষ্টের মধ্যে নবিদের অনুসরণ করতে পারে। তাঁদের ওপর যে পরীক্ষাগুলো আসে, তাতে সান্ত্বনা পেতে পারে। আর অবিচলতার সাথে তাঁদের অনুকরণ করতে পারে। '১৭৪

রাসূলুল্লাহ (সা.) খুবই ধৈর্যশীল ছিলেন। আল্লাহ বলেন-
'অতএব, তুমি উত্তমরূপে ধৈর্যধারণ করো।' সূরা মাআরিজ : ৫

শাইখ আয়েজ আল কারনি ব্যাখ্যা করে বলেন-
'রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ধৈর্যশীল। যখন তিনি ধনী ছিলেন, তখন ছিলেন কৃতজ্ঞ। যখন দরিদ্র ছিলেন, তখনও তিনি ছিলেন কৃতজ্ঞ। কখনো কখনো রাসূল (সা.) এতটাই দরিদ্র ছিলেন, ক্ষুধা নিবারণের জন্য তাঁকে পেটে পাথর বাঁধতে হতো। তথাপি এমন কঠিন সময়ে তিনি ধৈর্য ধরেন এবং আল্লাহর আদেশে সন্তুষ্ট ছিলেন। যখন তিনি ধনী ছিলেন, তখন তিনি শত শত উট উপহার দিয়ে মানুষকে ইসলামের পরশে নিয়ে আসতেন।'১৭৫

নবিজি কঠিন কষ্টের সময়ও ধৈর্যের সর্বোচ্চ চূড়া প্রদর্শন করেছিলেন, আল্লাহর আদেশের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। মক্কায় মুসলিমদের একটা ছোটো দল ব্যতীত প্রাথমিকভাবে সবাই তাঁর মিশন প্রত্যাখ্যান করছিল। তায়েফে তাঁকে পাথর ছুঁড়ে মারা হয়েছিল। মক্কা ও মদিনায় থাকাকালীন ক্ষুদ্র মুসলিম সম্প্রদায় প্রচণ্ড ক্ষুধা আর কষ্টে জর্জরিত ছিল।

তিনি তাঁর জীবদ্দশায় ফাতিমা ছাড়া বাকি ছয় সন্তানকে হারিয়েছিলেন। মদিনায় নতুন মুসলিম সম্প্রদায়কে রক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত অপ্রতিরোধ্য প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। সব সময় তিনি ধৈর্য প্রদর্শন করতেন এবং প্রফুল্ল থাকতেন। তাঁর সফলতার অন্যতম কারণ ছিল দৃঢ়সংকল্প ও অটল-অবিচলতা।১৭৬

আরবি শব্দ 'সবর'-এর 'ধৈর্য' ছাড়াও আরেকটি নাম হলো 'অধ্যবসায়'। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজের বিখ্যাত উক্তি হলো-
'অধ্যবসায় ও দৃঢ়সংকল্পই সর্বশক্তির মূল।'

নবিজির অধ্যবসায়ের একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কুরাইশরা আবু তালিবের কাছে নবিজি সম্পর্কে অভিযোগ করতে এসেছিল। বলেছিল-'হে আবু তালিব! আপনার ভাতিজা আমাদের মজলিশ ও উপাসনালয়ে আমাদের অপমান করে। আপনি তাঁকে আমাদের অপমান করা থেকে নিষেধ করুন।'

আবু তালিব তাঁকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন-'হে আমার ভাতিজা! তোমার চাচাতো ভাই দাবি করে, তুমি নাকি তাদের অপমান করছ। যদি করে থাকো, তাহলে এটা বন্ধ করো।' নবিজি আকাশের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-'আপনি কি এই সূর্য দেখতে পাচ্ছেন?'

উত্তর দিলেন-'হ্যাঁ।'

তিনি বললেন-'আপনি তা থেকে একটি মশাল জ্বালাতে সক্ষম হলেও আমি ইসলামের দাওয়াত দেওয়া থেকে দূরে সরতে পারব না।' আবু তালিব তখন তাদের জানিয়ে দিলেন-'আমার ভাতিজা আমাকে মিথ্যা বলেনি। কাজেই ফিরে যাও (তাঁকে একা ছেড়ে দাও)।'১৭৭

এখানে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে নবিজির দৃঢ়তা প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি সংগ্রাম ও সংগ্রামের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, যতক্ষণ না ইসলামের বাণী গোটা পৃথিবীতে উত্থাপিত হয় অথবা এই প্রচেষ্টারত অবস্থায় তিনি শহিদ হন। ১৭৮ তিনি আল্লাহর সত্য ধর্মকে সমুন্নত রাখার জন্য লড়াই করেছিলেন এবং তাঁর আত্মত্যাগের প্রভাব আজও পুরো পৃথিবীতে অনুভূত হচ্ছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষালাভ করতেন। তিনি বলেন-
'প্রকৃত মুমিন একই গর্ত থেকে দুইবার দংশিত হয় না।'১৭৯

টিকাঃ
১৭৩ আয়েজ আল কারনি, মানবতার রহমত, পৃ.-২৭১
১৭৪ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৩৬৩
১৭৫ আল কারনি, মানবতার রহমত, পৃ.-৪২৮-৪২৯
১৭৬ আল কারনি, মানবতার রহমত, পৃ.-৫০৬
১৭৭ আয়েজ আল কারনি, মানবতার রহমত, পৃ.-৫০৬
১৭৮ আয়েজ আল কারনি, মানবতার রহমত, পৃ.-৫০৬-০৭
১৭৯ বুখারি: ১৫৪

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 সঠিক সিদ্ধান্ত

📄 সঠিক সিদ্ধান্ত


নেতৃত্ববিষয়ক লেখকদের প্রত্যাশাগুলোর মধ্যে একটি হলো-একজন নেতার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি এবং তা হতে হবে সময়োপযোগী। বিলম্বিত সিদ্ধান্তের কারণে একটি সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে অথবা কোম্পানি ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। আল্লাহ সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে কুরআনে বলেন-
'আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।' সূরা আলে ইমরান : ১৫৯

নবিজিকে এখানে উপদেশ দিয়েছেন—একবার অনুসারীদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটাকে বাস্তবায়ন করতে হতে হবে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ।

উহুদের যুদ্ধের আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। আনসার নেতারা যখন বুঝতে পারলেন যুদ্ধের জন্য শহরের বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নবির ইচ্ছার পরিপন্থি, তখন তাঁরা এই সিদ্ধান্তকে পালটাতে চাইলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন—
'একবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা মেনে চলা উচিত।'১৮০

নবিজির সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা থাকলেও পদ্ধতিকে তিনি মেনে চলেছেন এবং তা অনুসরণ করতে উৎসাহ দিয়েছেন। একজন নেতাকে অনুসারীদের সাথে পরামর্শ করতে হয়। তারপর তাঁকে ইস্তেখারার মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশনা চেয়ে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

টিকাঃ
১৮০ খালিক আহমাদ, Management from Islamic Perspective, Second edition pp.177-178.

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 আশাবাদী, প্রফুল্ল ও আত্মবিশ্বাসী

📄 আশাবাদী, প্রফুল্ল ও আত্মবিশ্বাসী


আশাবাদকে অক্সফোর্ড অভিধানে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে—'কোনো কিছুর ভবিষ্যৎ সাফল্য সম্পর্কে আশাবাদিতা ও আত্মবিশ্বাস।'১৮১

সামগ্রিক নেতৃত্ব কাঠামোতে আশাবাদের কারণে একজন নেতা পরিপক্ব হবেন। তিনি তার মিশনের জন্য দূরদর্শী দৃষ্টি রাখতে এবং সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পাবেন।

লেখক সু ব্যারেট আশাবাদের অনেকগুলো সুবিধা চিহ্নিত করেছেন—

১. আশাবাদী মানুষ সাধারণত ভালো নেতা হয়। কারণ, আশাই তাদের অনুপ্রেরণা জোগায়। ফলে তারা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাতে পারে। যা স্বপ্নে দেখে, তার চিত্র সবার সামনে তুলে ধরে এবং মানুষের প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দেয়।
২. আশাবাদী মানুষরা একসঙ্গে অনেক ব্যবসা শুরু করতে পারে। কারণ, তারা যেখানে সুযোগ দেখে অন্যরা দেখে হতাশা এবং অনিশ্চয়তা।
৩. আশাবাদীদের উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ, ১৫% নৈরাশ্যবাদীদের তুলনায় ৮৫% আশাবাদী মানুষকে তারা পাশে পায়।
৪. কোনো সমস্যা দেখলে আশাবাদীরা সেই সমস্যাটিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, তারপর এগিয়ে যায়।
৫. আশাবাদ এবং দীর্ঘ জীবনযাপনের মধ্যে যোগসূত্র অনেক শক্তিশালী।১৮২

ওয়ারেন বেনিসের লেখা দ্য লিডারশিপ অ্যাডভান্টেজ প্রবন্ধে লিখেছেন—
'আশাবাদ হলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যেটা মানুষ তাদের নেতাদের থেকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখে। আমি যে সকল আদর্শবাদী নেতাদের সাথে দেখা করেছি, তাদের কাছে আশাবাদিতাকে অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। অথচ এই আশাবাদ প্রয়োজনীয় শক্তি ও প্রতিশ্রুতি তৈরির মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে।'১৮৩

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি ডা. মার্টিন সেলিগম্যান তাঁর গবেষণায় দেখেছেন—
'আশাবাদ এমন একটি গুণ, যা সহজেই শেখা যায়। তিনি তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আশাবাদী মানুষদের মধ্যে থাকে—
১. আশাবাদীরা প্রতিকূলতাকে অস্থায়ী ও বাহ্যিক হিসেবে দেখে।
২. হতাশাবাদীদের বিপরীতে আশাবাদীরা প্রতিকূলতাকে সহজে জয় করতে পারে।
৩. বিপত্তি, চ্যালেঞ্জ বা কঠিন কাজের মুখে আশাবাদীরা দিনদিন অধ্যবসায়ী হয়ে ওঠে।'১৮৪

ব্রুনা মার্টিনুজি পরামর্শ দিয়ে বলেন—'সফল ব্যক্তিদের অনুপ্রেরণামূলক জীবনী পড়ে লোকেরা আশাবাদকে আয়ত্ত করতে পারে।'১৮৫

অন্যদিকে আমাদের পরামর্শ হলো—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী পড়া, যেখান থেকে যে কেউ অনুপ্রাণিত হতে পারে। মার্টিনুজি বলেন— 'আশাবাদীরা সাফল্যের জন্য তাদের কল্পনাকে ব্যবহার করে। তাঁরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের ইতিবাচক দিকটি মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে রাখে।' একইভাবে নবি মুহাম্মাদ (সা.) প্রায়শই সফল ভবিষ্যৎ কল্পনা করতেন এবং সাহাবিদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য এই চিত্রগুলো তাঁদের কাছে তুলে ধরতেন। তিনি অযৌক্তিক আশাবাদী ছিলেন না; বরং যেগুলো ইতিবাচক ও সত্য, সেগুলোকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে ধৈর্যধারণ করেছিলেন। ১৮৬

সিরাত অধ্যয়নে আমরা একটি ঘটনার বিবরণ বেশ ভালো দেখতে পাই। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন করার সময় একটি বিশাল পাথরকে কোনোভাবেই ভাঙ্গা যাচ্ছিল না। নবিজিকে খবর দিলে তিনি এসে সেখানে নামলেন। তারপর কুড়াল নিয়ে সজোরে বাড়ি দিলে তা ভেঙে যায়। সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) খুশিতে ‘আল্লাহু আকবার’১৮৭ উচ্চারণ করে সবাইকে বললেন-'আমাকে সিরিয়ার দরজার চাবি হস্তান্তর করা হয়েছে। আমি নিজ চোখে সেখানকার লাল প্রাসাদ দেখতে পাচ্ছি।' তারপর আরেকটি বাড়ি দিলেন। আবারও তিনি ‘আল্লাহু আকবার’ উচ্চারণ করে বললেন-'আমাকে পারস্যের চাবি দেওয়া হয়েছে। আমি মাদায়েনের সাদা প্রাসাদ দেখছি এখন।' তৃতীয়বারও তিনি আঘাত করে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি উচ্চারণ করে বললেন-'আমাকে ইয়েমেনের চাবি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি সানার গেট দেখতে পাচ্ছি।'১৮৮

আবদুল হামিদ সিদ্দিকি বলেন, 'ইতিহাস বলে-রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে। মুসলমানরা একতরফাভাবে বিজয়ী হয়েছে। আর প্রতিপক্ষরা একে একে ধসে পড়েছে গোড়া কেটে যাওয়া গাছের মতো। আর এটাই ছিল পরাশক্তি মুসলিমদের উত্থানের সময়।' ১৮৯

নবিজির জীবন থেকে আরেকটি উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। এটি হলো মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময়কার। ঘোষণা করা হলো-'যে-ই মুহাম্মাদকে এনে দিতে পারবে, ১০০ উট তার জন্য বরাদ্দ।' সুরাকা ইবনে মালেক খোঁজ পেয়ে তাদের ধাওয়া করেন। কিন্তু তার ঘোড়া বারবার পড়ে যাচ্ছিল। কোনোভাবেই তিনি নবিজির সামনে যেতে পারছিলেন না। অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে তিনি বুঝলেন-তাদের কেউ রক্ষা করছেন এবং তার সাথে যা ঘটছে, তা অলৌকিক ঘটনা।

তারপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন-'আমি জানি, আপনার ধর্ম সবদিকে ছড়িয়ে যাবে। আপনি আমাকে নিরাপত্তা দিন সেই দিনের, যেদিন আপনি হবেন অন্যদের চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর। আমি আপনার কাছ থেকে লিখিত নিরাপত্তা চাই।' রাসূল (সা.)-এর আদেশে আবু বকর (রা.) তাঁকে লিখিত দলিল দেন এবং অনুরোধ করেন, যাতে তিনি শত্রুদের বলে না দেন। ১৯০

যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বললেন-'হে সুরাকা! কেমন হবে সেদিন, যেদিন তুমি কিসরার মুকুট পরবে?' এই কথা দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.) যেন ইসলাম রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ারই ইঙ্গিত করলেন। সুরাকা ফিরে গেল এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় চলে এলেন। এই ঘটনাই বলে দেয়-রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আত্মবিশ্বাস কতটুকু ছিল। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিলেন, আল্লাহ তাঁকে সফল করবেন। পরবর্তী সময়ে সুরাকা ইসলাম কবুল করেছিলেন।

নবিজির ইন্তেকালের পর উমর (রা.)-এর আমলে পারস্য বিজয় করা হয়। পারস্য থেকে মদিনায় নিয়ে আসা হলো সমস্ত গনিমতের মাল। উমর (রা.) সুরাকা (রা.)-কে ডেকে আনলেন। সবার সামনে তাঁর মাথায় পরালেন পারস্য সম্রাটের মুকুট। গায়ে পরালেন পোশাক এবং সোনাদানার অলংকার পরালেন হাতে। আর এর মধ্য দিয়ে নবিজির সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়ে গেল। সুরাকা (রা.) তাঁর বিনয়ের কারণে তা গ্রহণ না করে উমর (রা.)-কে বললেন, এসব যেন তিনি মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। ১৯১

আল্লাহ বলেন-
'আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী, যদি মুমিন হয়ে থাকো।' সূরা আলে ইমরান: ১৩৯

ইসলাম আশাবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার মহান জীবনব্যবস্থা। এই জীবনব্যবস্থা তার অনুসারীদের জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে সাহায্য করে। প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা করার পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্য ও সর্বোত্তম ফলাফলের আশা করতে উৎসাহিত করে। আর আশাবাদী মনোভাবের কারণে মুমিনের জীবনের সমস্ত ঘটনাই হয়ে ওঠে কল্যাণের উৎস। ১৯২ হাদিস থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়-
'মুমিনের ব্যাপারটাই আশ্চর্যজনক। প্রতিটি কাজেই তার জন্য কল্যাণ রয়েছে। এটা মুমিন ব্যতীত অন্য কারও জন্য নয়। সুতরাং তার সুখ এলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ফলে এটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ এলে সে ধৈর্যধারণ করে। ফলে এটাও হয় তার জন্য কল্যাণকর।'১৯৩

আশাবাদিতা ছিল নবিজির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য, যা তাঁর মিশনের পরিপূর্ণতায় ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছিল। বহু বছর তিনি বড়ো রকমের সাফল্য ছাড়াই মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী প্রচার করে গিয়েছেন। তবুও আশাবাদী ছিলেন, ভবিষ্যতে সফলতা আসবেই। তিনি যখন দাওয়াতের কাজে তায়েফে যান এবং তায়েফবাসীর পাথর দ্বারা আহত হন, তখনও আশা প্রকাশ করে বলেছিলেন-'পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো ইসলাম গ্রহণ করবে।'

মদিনায় হিজরত করেন এই বিশ্বাসে, মুহাজির ও আনসাররা মিলে একক সম্প্রদায় হিসেবে একীভূত হবে। তিনি আশা করেছিলেন-মদিনার মুনাফিকরা আলো দেখবে এবং সত্যিকারের ঈমান গ্রহণ ও মুসলিমদের ক্ষতি করা বন্ধ করবে। এই প্রতিটি ঘটনায় তিনি সঠিক প্রমাণিত হয়েছেন। এটা ছিল আল্লাহর প্রতি তাঁর আস্থা, আন্তরিকতা ও অপরিসীম পরিশ্রমের মিশ্রণ; যা তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী মানবে পরিণত করেছে। ১৯৪

ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ব্যক্তিরা সাধারণত প্রফুল্ল থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্য, উত্তম আচার-ব্যবহার এবং সকল প্রকৃতির মানুষের সাথে প্রফুল্লতা নিয়ে মেশার অনেক হাদিস আছে।১৯৫ ইবনে আবি হালা (রা.) তাঁকে নিয়ে বর্ণনা করেছেন-
'নম্রতা ছিল তাঁর স্বভাবের অন্যতম একটি বিশেষ গুণ। তাঁর মধ্যে আনন্দ লেগে থাকত এবং কখনোই খারাপ বা অভদ্রতার লক্ষণ ছিল না।'১৯৬

রাসূল (সা.) স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় হাসিমুখে প্রফুল্ল হয়ে দেখা দিতেন। তিনি তাঁর দীপ্তিময় ও মৃদু হাসি দিয়ে সুস্থ করে তুলতেন সাহাবিদের আত্মাকে। শত্রুদের মন জয় করার জন্য তিনি সব সময় তাঁদের সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। হাদিসে বর্ণিত আছে-
'আপনি আপনার সম্পদ দিয়ে মানুষের মন জয় করতে পারবেন না, কিন্তু আপনি হাসিখুশি চেহারা এবং সর্বোত্তম আচরণের মাধ্যমে তাদের হৃদয় জয় করতে পারবেন।'১৯৭

আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রা.) বলেন-
'রাসূল (সা.)-এর চেয়ে সবচেয়ে বেশি হাসিখুশি মানুষ আমি কখনো দেখিনি।'১৯৮

টিকাঃ
১৮১ Australian Pocket Oxford Dictionary, Sixth Edition
১৮২ স্যু বারেট Why purposeful optimism is great for business (July 23, 2018)
১৮৩ ব্রুনা মার্তিনুজ্জি Optimism : The Hidden Asset
১৮৪ মার্তিনুজ্জি Optimism : The Hidden Asset
১৮৫ মার্তিনুজ্জি Optimism: The Hidden Asset
१८६ জিনান ইউসুফ Seeing the World in a Different Way Part I (December 2, 2013)
১৮৭ আরবিতে-'আল্লাহু আকবার'
১৮৮ ফতহুল বারি, পৃষ্ঠা-৪০০
১৮৯ সিদ্দিকি, মুহাম্মদের জীবনী, পৃ -১০৯
১৯০ সাদুক আল মিনশাউই-উমার আল খাত্তাবের জীবনে থেকে ১০০টি ঘটনা
১৯১ আনওয়ার আল আওলাকি দ্বারা বর্ণিত। আরও দেখুন বুখারি, ভলিওম ৪, বই ৫৬, হাদিস: ৮১২; ভলিওম ৫, হাদিস: ২৪৫
১৯২ আম্মার আওয়াইস-ইসলামে আশাবাদ
১৯৩ মুসলিম : ২৯৯৯
১৯৪ আম্মার আওয়াইস-ইসলামে আশাবাদ
১৯৫ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৬১
১৯৬ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়‍্যাদ, পৃ.-৬২
১৯৭ শুআবুল ইমান
১৯৮ তিরমিজি

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনকারী

📄 নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনকারী


যোগাযোগ নেতৃত্বের মূল ফাংশン এবং নেতাদের দক্ষতা অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর মধ্যে একটি।১৯৯ মনোবিজ্ঞানী মার্টিন নিউম্যান জোর দিয়ে বলেন-'আপনার আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা এবং আপনার বিশ্বাসকে গঠন করে-এমন মূল্যবোধগুলোকে প্রকাশ করতে পারলে আপনি একটি মজবুত নেতৃত্ব-কাঠামোর ভেতরে চলে যাবেন।'২০০

জন ডিলার্ড লিখেছেন-'আপনি কারও মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পেলে বুঝে নেবেন-তার সঙ্গে কেউ কার্যকরভাবে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।'২০১

নবিজি আরব সমাজের মানুষদের পরিবর্তনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আর তাঁদের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন-তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সফল ও দক্ষ সম্পর্কস্থাপনকারী। কার্যকরভাবে সম্পর্ক স্থাপনের কিছু উপাদানের কথা পশ্চিমা লেখকরা উল্লেখ করেছেন। যেমন-
উপযুক্ত ভাষা ব্যবহার : যাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা হবে, তাদের সাথে আপনার অন্তরঙ্গতা, বয়স, লিঙ্গ, গোষ্ঠী ইত্যাদি মাথায় রেখে উপযুক্ত ভাষায় সম্বোধন করা।

সুনির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহার : সঠিকভাবে বোঝার জন্য সুনির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিছু বোঝানোর জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শব্দ ব্যবহার করলে উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

প্রফুল্লভাব রেখে যোগাযোগ : মার্জিত ও ইতিবাচক শব্দগুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করে প্রশংসা করা যেতে পারে। একটি মার্জিত স্বভাব, বন্ধুত্বপূর্ণ অভিবাদন, একটি নির্মল হাসি, করমর্দন; এগুলো সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়াকে সুন্দর করে তোলে এবং গভীর সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখে। ২০২

সহজবোধ্যতা : যোগাযোগের ভাষা সহজ হলে তা সহজেই বোধগম্য হয়।

বিশ্বাসযোগ্যতা : বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটি মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। ফলে সবাই আস্থা রাখে। ২০৩

গল্পের ব্যবহার : ভালো গল্প জীবনকে চিন্তার খোরাক জোগায়। একটি সুন্দর গল্প বিশ্বাস তৈরিতে সহায়তা করে, হৃদয় ও মনকে দখল এবং দৃষ্টিশক্তিকে শাণিত করে। ২০৪

এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সাহাবিদের সাথে, অমুসলিম; এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথেও যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। নিচের কিছু উদাহরণের মাধ্যমে আমরা আরও পরিষ্কার হব। হাদিসে আছে-
'নবিজি যখনই কোনো বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ কিংবা জোর দিতে চাইতেন, তখন তিনি তা তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন।'২০৫

উম্মে মাবুদ (রা.) নবিজির গুণাবলি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন-
'যখন তিনি নীরব থাকতেন, তখন থাকতেন গভীর চিন্তাশীল। যখন তিনি কথা বলতেন, তখন কথায় বিশিষ্টতা এবং জাঁকজমক প্রকাশ পেত। তাঁর কথাগুলো যেন পিছলে থাকা মুক্তোর মতো। তিনি একজন প্রতিভাবান বক্তা, যার শব্দ খুব কম নয় আবার খুব বেশিও নয়। তিনি কথা বলার সময় যে শব্দ ব্যবহার করতেন, তা ছিল স্পষ্ট ও শ্রুতিমধুর।'

মুহাম্মাদ (সা.)-এর ব্যতিক্রমী যোগাযোগের দক্ষতা নিয়ে হিন্দ ইবনে আবি হালা (রা.) হাসান (রা.)-এর কাছে বর্ণনা করেছেন-
'রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বদা পরকালের জন্য ব্যথিত হতেন। চিন্তামগ্নতা ছাড়া তাঁর কোনো অবসর ছিল না। বক্তৃতা ছিল সংরক্ষিত এবং কোনো প্রয়োজন ছাড়া বেশি কথা বলতেন না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য হতো খুবই স্পষ্ট, নিখুঁত, যা সঠিক ও ভুলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করত। বক্তব্যে সর্বদা সংযোজন ও বিয়োজন থাকত না। তিনি ভদ্র ছিলেন এবং কোনো ব্যক্তির প্রতি কঠোর বা অপমানজনক ছিলেন না। তিনি আল্লাহর প্রতিটি অনুগ্রহের প্রশংসা করতেন। কখনো কারও অনুগ্রহ নিতেন না। যদি কেউ কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করত, তখন তিনি অধিকার ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত শান্ত হতেন না।'২০৬

ক্বাদি আইয়‍্যাদ লিখেছেন- 'বাকপটুতা এবং কথা বলার সাবলীলতায় নবির প্রাধান্য সর্বজনবিদিত। তিনি বিতর্কে ছিলেন দক্ষ। তাঁর কথা হতো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী। শব্দের অর্থ বুঝে ব্যবহার করতেন এবং ছিলেন অনুরাগমুক্ত। তাঁর বক্তব্য ছিল তীক্ষ্ণ, খুব দীর্ঘ নয় আবার খুব সংক্ষিপ্তও নয়।'২০৭

নবিজি বলেছেন, তাঁকে আদেশ করা হয়েছে-তিনি যা বলবেন, তা যেন সংক্ষিপ্ত রাখেন। কারণ, সংক্ষিপ্ততাই উত্তম। ২০৮

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন- 'আল্লাহর রাসূলের বাণীতে মার্জিত বাক্যাংশ এবং সহজ বাক্য উভয়েরই উপস্থিতি ছিল। '২০৯

কুরআনে আল্লাহ বলেন-
'আর আমার বান্দাদের বলো-তারা যেন এমন কথা বলে, যা অতি সুন্দর। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি করে; আর শয়তান মানুষের স্পষ্ট শত্রু।' সূরা বনি ইসরাইল : ৫৩

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন—
'যারা আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে, তাঁরা যেন কথা বলার সময় ভালোটাই বলে। আর না হলে চুপ থাকে।'২১০

রাসূল (সা.)-এর সময়ে বাগ্মিতায় শ্রেষ্ঠত্ব, কথা বলার সাবলীলতা এবং সুরেলা আরবি ভাষার জন্য দুটি গোত্র বিখ্যাত ছিল-মক্কার কুরাইশ ও বনু হাওয়াজিন। তারা ছিল গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী বনু সাদের অন্তর্ভুক্ত। এই গোত্রেই তিনি বড়ো হয়েছিলেন, যা তাঁকে মরুভূমির শক্তি ও বিশুদ্ধতা, অভিব্যক্তির বাগ্মিতা এবং এর শব্দের সৌন্দর্য শেখার সুযোগ করে দিয়েছিল। ২১১

নবিজি নিজেই বলেছেন-
'আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাবলীল, যদিও আমি কুরাইশ, কিন্তু আমার ভাষা বনু সাদের। '২১২

বক্তৃতায় দক্ষতা ও খুতবা প্রদানে শ্রেষ্ঠত্ব হলো নবুয়তের অপরিহার্য পূর্বশর্ত। মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর প্রতি এই অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেন-
'আমি সবচেয়ে বাগ্মী আরব। আমি প্রেরিত হয়েছি বিস্তৃত বাণী ও বক্তব্যসহ। '২১৩

নবিজির বিস্ময়কর কিছু বাণী উল্লেখ করতে চাই-
'যাকে তুমি ভালোবাসো, তার সাথেই থাকবে।'২১৪
‘যেকোনো বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ পথ। '২১৫

‘আপনার ভালোবাসার মানুষকে সুন্দরভাবে উত্তর দিন। কেননা হতেও পারে—একদিন সে আপনাকে ঘৃণা করে বসবে। '২১৬

‘তারাই আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয়, যারা মানবজাতির জন্য সবচেয়ে উপকারী। '২১৭

‘আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি করুণা করেন, যে ভালো কথা বলে বা যে চুপ থাকে এবং নিরাপদে থাকার চেষ্টা করে। '২১৮

‘মানুষ যেন স্বর্ণ-রুপার খনি। জাহেলিয়াতের যুগে তোমাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন, ইসলাম গ্রহণের পরও তাঁরাই সর্বোত্তম ব্যক্তি, যদি তাঁরা ইসলামি জ্ঞানার্জন করে থাকেন। '২১৯

‘যেখানেই থাকুন, আল্লাহকে ভয় করুন। খারাপ কাজ করে ফেললে সাথে সাথে ভালো কাজ করুন, যা খারাপ কাজকে মুছে ফেলবে। আল্লাহ মানুষকে উত্তম চরিত্র দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।'২২০

‘আমি তোমাদের মধ্যে যাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, তারা কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে কাছে বসবে। তারাই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্র, যারা আশ্রয় দেয়, অন্যদের রক্ষা করে এবং একসাথে রাখে। '২২১

নবিজির বক্তব্যগুলো সাহাবিদের হৃদয়কে দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত করেছে। আল ইরবাদ ইবনে সারিয়াহ (রা.) বলেন—
‘আল্লাহর রাসূল (সা.) একটি ভাষণ দিয়েছিলেন, যা শুনে আমাদের চোখ অশ্রুতে উপচে পড়েছিল এবং আমাদের হৃদয় হয়েছিল বিগলিত। আমরা বললাম—“হে আল্লাহর রাসূল! এটা বিদায়ের ভাষণ। আপনি আমাদের কী নির্দেশ দেবেন?” তিনি বললেন—
“আমি তোমাদের কাছে এমন এক উজ্জ্বল পথ রেখে যাচ্ছি, যার রাতও দিনের মতো। আমি চলে যাওয়ার পর কেউই এখান থেকে বিচ্যুত হবে না। যে হবে, তার জন্য সর্বনাশ! তোমাদের মধ্যে যে-ই বাস করবে, সে মহাসংঘাত দেখতে পাবে। আমি তোমাদের আমার সুন্নাহ এবং সৎপথে পরিচালিত খলিফাদের পথ মেনে চলার জন্য এবং দৃঢ়ভাবে তা আঁকড়ে ধরার আহ্বান জানাচ্ছি। তোমাদের অবশ্যই আনুগত্য করতে হবে, যদিও তোমাদের নেতা একজন আবিসিনিয়ান ক্রীতদাসও হয়। কেননা, প্রকৃত মুমিন হলো নাকে আংটিওয়ালা উটের মতো; যেখানেই তা চালিত হয়, সেখানেই তা মেনে চলে।”২২২

তাবুক অভিযানের সময় তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তার মাধ্যমে নবিজির বাগ্মিতার উদাহরণ পাওয়া যায়। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন—
‘নিশ্চয়ই সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কিতাব। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শক্তিশালী হলো তাকওয়ার বাণী। সর্বোত্তম ধর্ম হলো ইবরাহিমের ধর্ম। সর্বোত্তম উদাহরণ হলো মুহাম্মাদের উদাহরণ। সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর কাছে দুআ করা। সর্বোত্তম বর্ণনা এই কুরআন। সর্বোত্তম বিষয় হলো যা দৃঢ়ভাবে সমাধান করা হয়েছে। ধর্মের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস হলো যা অনুমোদন ছাড়াই পালন করা হয়। সর্বোত্তম পন্থা হলো পদদলিত পথ। সর্বশ্রেষ্ঠ মৃত্যু হলো শহিদের মৃত্যু। সবচেয়ে দুঃখজনক অন্ধত্ব হলো হিদায়াতের পর পথভ্রষ্টতা।

আমলের মধ্যে সর্বোত্তম সেই কাজ, যা উপকারী। সর্বোত্তম দিকনির্দেশনা হলো যা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়। সবচেয়ে খারাপ অন্ধত্ব হলো হৃদয়ের অন্ধত্ব। ওপরের হাত (যে দেয়) নিচের হাতের (যে নেয়) থেকে উত্তম। প্রাচুর্য ও লোভনীয় বস্তুর সামান্যই জীবনের জন্য যথেষ্ট। সবচেয়ে খারাপ ক্ষমাভিক্ষা হলো মৃত্যু যখন মুখের সামনে আসবে, তখন ক্ষমা চাওয়া। সবচেয়ে নিকৃষ্ট অনুশোচনা হলো যা কিয়ামতের দিন অনুভূত হবে।

কিছু পুরুষ জুমার নামাজে আসে না বা এলেও দ্বিধা নিয়ে বিলম্বে আসে। আর কেউ কেউ অনিচ্ছায় আল্লাহকে স্মরণ করে না। যে জিহ্বা মিথ্যা অভিব্যক্তিতে আসক্ত, তা যেন পাপের ঝরনাধারা।

সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো হৃদয়ের তৃপ্তি। সর্বোত্তম বিধান হলো তাকওয়া। পরাক্রমশালী ও মহান আল্লাহকে ভয় করাই সর্বোচ্চ জ্ঞান। অন্তরে লালন করা সর্বোত্তম জিনিস হলো বিশ্বাস ও প্রত্যয়। সন্দেহ হলো অবিশ্বাস।

অধৈর্য হয়ে কান্নাকাটি এবং মৃতদের জন্য উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করা অজ্ঞতার কাজ। বিশ্বাসঘাতকতা একজন ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুনে নিয়ে যায়। অশ্লীল কবিতা শয়তানের কাজ। মদ হলো সব মন্দের জননী। এতিমের সম্পদ চুরি করা সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ। ধন্য সে, যে অন্যের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে। তোমাদের প্রত্যেককে চার হাত কবরে যেতে হবে। তোমাদের কাজকর্মের হিসাব নেওয়া হবে পরবর্তী জীবনে। সবচেয়ে খারাপ স্বপ্ন হলো একটি মিথ্যা স্বপ্ন।

একজন মুমিনকে গালি দেওয়া সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলা কুফরি। তার গিবত করা আল্লাহর অবাধ্যতা। তার সম্পত্তির অলঙ্ঘ্যতা (এবং পবিত্রতা) তার রক্তের মতো। যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকেই মিথ্যা বলে। যে অন্যকে ক্ষমা করে, সে নিজেই ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়। যে অন্যকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন।

যে রাগ দমন করে, আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য সহকারে দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষতিপূরণ দেন। যে ব্যক্তি শুধু খ্যাতি ও সুনামের জন্য কাজ করে, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন করে, আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেন। যে আল্লাহর অবাধ্য হয়, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। '২২৩

টিকাঃ
১৯৯ জন ডিলার্ড Effective Communication: A Key Leadership Skill.
২০০ বিনা ব্রাউন, ফলো মাই লিড পৃ.-১১৮
২০১ জন ডিলার্ড, Effective Communication : A Key Leadership Skill
২০২ খালিক আহমাদ, পৃ.-২৩৫
২০০ Centre for Creative Leadership-Why Communication is So Important for Leaders
২০৪ Centre for Creative Leadership-Why Communication is So Important for Leaders
২০৫ বুখারি : ২৮৬
২০৬ কান্দলভি, হায়াতুস-সাহাবা, পৃ-২৮
২০৭ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৩৯ এবং ৭১
২০৮ আবু দাউদ: ৪৯৯০ (আহমাদ হাসান অনূদিত)
২০৯ আবু দাউদ, আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃষ্ঠা-৭১
২১০ বুখারি: ১৫৮
২১১ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৪২
২১২ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১৭১
২১০ বুখারি: ৬৮৪৫
২১৪ বুখারি: ১৩৪
২১৫ আল জুহাইলি, পৃ.-৫৫০
২১৬ তিরমিজি, ভলিওম ২, পৃ.-২৪৩
২১৭ ইবনে হিব্বান
২১৮ আবু দাউদ, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৩৩৩
২১৯ বুখারি, খণ্ড-৪, পৃ.-১৪২
২২০ তিরমিজি, ভলিওম ৩, পৃ.-২৩৯
২২১ তিরমিজি, ভলিওম ৩, পৃ.-৩৪৯
২২২ ইবনে মাজাহ, চ্যাপ্টার ১, হাদিস ৪৩। আরও; আবু দাউদ, হাদিস ৪৬০৭
২২০ ইবনুল কাইয়্যিম, জাদুল মাআদ, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৩-১৪

যোগাযোগ নেতৃত্বের মূল ফাংশン এবং নেতাদের দক্ষতা অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর মধ্যে একটি।১৯৯ মনোবিজ্ঞানী মার্টিন নিউম্যান জোর দিয়ে বলেন-'আপনার আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা এবং আপনার বিশ্বাসকে গঠন করে-এমন মূল্যবোধগুলোকে প্রকাশ করতে পারলে আপনি একটি মজবুত নেতৃত্ব-কাঠামোর ভেতরে চলে যাবেন।'২০০

জন ডিলার্ড লিখেছেন-'আপনি কারও মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পেলে বুঝে নেবেন-তার সঙ্গে কেউ কার্যকরভাবে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।'২০১

নবিজি আরব সমাজের মানুষদের পরিবর্তনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আর তাঁদের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন-তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সফল ও দক্ষ সম্পর্কস্থাপনকারী। কার্যকরভাবে সম্পর্ক স্থাপনের কিছু উপাদানের কথা পশ্চিমা লেখকরা উল্লেখ করেছেন। যেমন-
উপযুক্ত ভাষা ব্যবহার : যাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা হবে, তাদের সাথে আপনার অন্তরঙ্গতা, বয়স, লিঙ্গ, গোষ্ঠী ইত্যাদি মাথায় রেখে উপযুক্ত ভাষায় সম্বোধন করা।

সুনির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহার : সঠিকভাবে বোঝার জন্য সুনির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিছু বোঝানোর জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শব্দ ব্যবহার করলে উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

প্রফুল্লভাব রেখে যোগাযোগ : মার্জিত ও ইতিবাচক শব্দগুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করে প্রশংসা করা যেতে পারে। একটি মার্জিত স্বভাব, বন্ধুত্বপূর্ণ অভিবাদন, একটি নির্মল হাসি, করমর্দন; এগুলো সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়াকে সুন্দর করে তোলে এবং গভীর সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখে। ২০২

সহজবোধ্যতা : যোগাযোগের ভাষা সহজ হলে তা সহজেই বোধগম্য হয়।

বিশ্বাসযোগ্যতা : বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটি মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। ফলে সবাই আস্থা রাখে। ২০৩

গল্পের ব্যবহার : ভালো গল্প জীবনকে চিন্তার খোরাক জোগায়। একটি সুন্দর গল্প বিশ্বাস তৈরিতে সহায়তা করে, হৃদয় ও মনকে দখল এবং দৃষ্টিশক্তিকে শাণিত করে। ২০৪

এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সাহাবিদের সাথে, অমুসলিম; এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথেও যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। নিচের কিছু উদাহরণের মাধ্যমে আমরা আরও পরিষ্কার হব। হাদিসে আছে-
'নবিজি যখনই কোনো বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ কিংবা জোর দিতে চাইতেন, তখন তিনি তা তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন।'২০৫

উম্মে মাবুদ (রা.) নবিজির গুণাবলি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন-
'যখন তিনি নীরব থাকতেন, তখন থাকতেন গভীর চিন্তাশীল। যখন তিনি কথা বলতেন, তখন কথায় বিশিষ্টতা এবং জাঁকজমক প্রকাশ পেত। তাঁর কথাগুলো যেন পিছলে থাকা মুক্তোর মতো। তিনি একজন প্রতিভাবান বক্তা, যার শব্দ খুব কম নয় আবার খুব বেশিও নয়। তিনি কথা বলার সময় যে শব্দ ব্যবহার করতেন, তা ছিল স্পষ্ট ও শ্রুতিমধুর।'

মুহাম্মাদ (সা.)-এর ব্যতিক্রমী যোগাযোগের দক্ষতা নিয়ে হিন্দ ইবনে আবি হালা (রা.) হাসান (রা.)-এর কাছে বর্ণনা করেছেন-
'রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বদা পরকালের জন্য ব্যথিত হতেন। চিন্তামগ্নতা ছাড়া তাঁর কোনো অবসর ছিল না। বক্তৃতা ছিল সংরক্ষিত এবং কোনো প্রয়োজন ছাড়া বেশি কথা বলতেন না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য হতো খুবই স্পষ্ট, নিখুঁত, যা সঠিক ও ভুলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করত। বক্তব্যে সর্বদা সংযোজন ও বিয়োজন থাকত না। তিনি ভদ্র ছিলেন এবং কোনো ব্যক্তির প্রতি কঠোর বা অপমানজনক ছিলেন না। তিনি আল্লাহর প্রতিটি অনুগ্রহের প্রশংসা করতেন। কখনো কারও অনুগ্রহ নিতেন না। যদি কেউ কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করত, তখন তিনি অধিকার ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত শান্ত হতেন না।'২০৬

ক্বাদি আইয়‍্যাদ লিখেছেন- 'বাকপটুতা এবং কথা বলার সাবলীলতায় নবির প্রাধান্য সর্বজনবিদিত। তিনি বিতর্কে ছিলেন দক্ষ। তাঁর কথা হতো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী। শব্দের অর্থ বুঝে ব্যবহার করতেন এবং ছিলেন অনুরাগমুক্ত। তাঁর বক্তব্য ছিল তীক্ষ্ণ, খুব দীর্ঘ নয় আবার খুব সংক্ষিপ্তও নয়।'২০৭

নবিজি বলেছেন, তাঁকে আদেশ করা হয়েছে-তিনি যা বলবেন, তা যেন সংক্ষিপ্ত রাখেন। কারণ, সংক্ষিপ্ততাই উত্তম। ২০৮

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন- 'আল্লাহর রাসূলের বাণীতে মার্জিত বাক্যাংশ এবং সহজ বাক্য উভয়েরই উপস্থিতি ছিল। '২০৯

কুরআনে আল্লাহ বলেন-
'আর আমার বান্দাদের বলো-তারা যেন এমন কথা বলে, যা অতি সুন্দর। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি করে; আর শয়তান মানুষের স্পষ্ট শত্রু।' সূরা বনি ইসরাইল : ৫৩

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন—
'যারা আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে, তাঁরা যেন কথা বলার সময় ভালোটাই বলে। আর না হলে চুপ থাকে।'২১০

রাসূল (সা.)-এর সময়ে বাগ্মিতায় শ্রেষ্ঠত্ব, কথা বলার সাবলীলতা এবং সুরেলা আরবি ভাষার জন্য দুটি গোত্র বিখ্যাত ছিল-মক্কার কুরাইশ ও বনু হাওয়াজিন। তারা ছিল গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী বনু সাদের অন্তর্ভুক্ত। এই গোত্রেই তিনি বড়ো হয়েছিলেন, যা তাঁকে মরুভূমির শক্তি ও বিশুদ্ধতা, অভিব্যক্তির বাগ্মিতা এবং এর শব্দের সৌন্দর্য শেখার সুযোগ করে দিয়েছিল। ২১১

নবিজি নিজেই বলেছেন-
'আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাবলীল, যদিও আমি কুরাইশ, কিন্তু আমার ভাষা বনু সাদের। '২১২

বক্তৃতায় দক্ষতা ও খুতবা প্রদানে শ্রেষ্ঠত্ব হলো নবুয়তের অপরিহার্য পূর্বশর্ত। মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর প্রতি এই অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেন-
'আমি সবচেয়ে বাগ্মী আরব। আমি প্রেরিত হয়েছি বিস্তৃত বাণী ও বক্তব্যসহ। '২১৩

নবিজির বিস্ময়কর কিছু বাণী উল্লেখ করতে চাই-
'যাকে তুমি ভালোবাসো, তার সাথেই থাকবে।'২১৪
‘যেকোনো বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ পথ। '২১৫

‘আপনার ভালোবাসার মানুষকে সুন্দরভাবে উত্তর দিন। কেননা হতেও পারে—একদিন সে আপনাকে ঘৃণা করে বসবে। '২১৬

‘তারাই আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয়, যারা মানবজাতির জন্য সবচেয়ে উপকারী। '২১৭

‘আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি করুণা করেন, যে ভালো কথা বলে বা যে চুপ থাকে এবং নিরাপদে থাকার চেষ্টা করে। '২১৮

‘মানুষ যেন স্বর্ণ-রুপার খনি। জাহেলিয়াতের যুগে তোমাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন, ইসলাম গ্রহণের পরও তাঁরাই সর্বোত্তম ব্যক্তি, যদি তাঁরা ইসলামি জ্ঞানার্জন করে থাকেন। '২১৯

‘যেখানেই থাকুন, আল্লাহকে ভয় করুন। খারাপ কাজ করে ফেললে সাথে সাথে ভালো কাজ করুন, যা খারাপ কাজকে মুছে ফেলবে। আল্লাহ মানুষকে উত্তম চরিত্র দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।'২২০

‘আমি তোমাদের মধ্যে যাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, তারা কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে কাছে বসবে। তারাই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্র, যারা আশ্রয় দেয়, অন্যদের রক্ষা করে এবং একসাথে রাখে। '২২১

নবিজির বক্তব্যগুলো সাহাবিদের হৃদয়কে দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত করেছে। আল ইরবাদ ইবনে সারিয়াহ (রা.) বলেন—
‘আল্লাহর রাসূল (সা.) একটি ভাষণ দিয়েছিলেন, যা শুনে আমাদের চোখ অশ্রুতে উপচে পড়েছিল এবং আমাদের হৃদয় হয়েছিল বিগলিত। আমরা বললাম—“হে আল্লাহর রাসূল! এটা বিদায়ের ভাষণ। আপনি আমাদের কী নির্দেশ দেবেন?” তিনি বললেন—
“আমি তোমাদের কাছে এমন এক উজ্জ্বল পথ রেখে যাচ্ছি, যার রাতও দিনের মতো। আমি চলে যাওয়ার পর কেউই এখান থেকে বিচ্যুত হবে না। যে হবে, তার জন্য সর্বনাশ! তোমাদের মধ্যে যে-ই বাস করবে, সে মহাসংঘাত দেখতে পাবে। আমি তোমাদের আমার সুন্নাহ এবং সৎপথে পরিচালিত খলিফাদের পথ মেনে চলার জন্য এবং দৃঢ়ভাবে তা আঁকড়ে ধরার আহ্বান জানাচ্ছি। তোমাদের অবশ্যই আনুগত্য করতে হবে, যদিও তোমাদের নেতা একজন আবিসিনিয়ান ক্রীতদাসও হয়। কেননা, প্রকৃত মুমিন হলো নাকে আংটিওয়ালা উটের মতো; যেখানেই তা চালিত হয়, সেখানেই তা মেনে চলে।”২২২

তাবুক অভিযানের সময় তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তার মাধ্যমে নবিজির বাগ্মিতার উদাহরণ পাওয়া যায়। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন—
‘নিশ্চয়ই সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কিতাব। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শক্তিশালী হলো তাকওয়ার বাণী। সর্বোত্তম ধর্ম হলো ইবরাহিমের ধর্ম। সর্বোত্তম উদাহরণ হলো মুহাম্মাদের উদাহরণ। সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর কাছে দুআ করা। সর্বোত্তম বর্ণনা এই কুরআন। সর্বোত্তম বিষয় হলো যা দৃঢ়ভাবে সমাধান করা হয়েছে। ধর্মের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস হলো যা অনুমোদন ছাড়াই পালন করা হয়। সর্বোত্তম পন্থা হলো পদদলিত পথ। সর্বশ্রেষ্ঠ মৃত্যু হলো শহিদের মৃত্যু। সবচেয়ে দুঃখজনক অন্ধত্ব হলো হিদায়াতের পর পথভ্রষ্টতা।

আমলের মধ্যে সর্বোত্তম সেই কাজ, যা উপকারী। সর্বোত্তম দিকনির্দেশনা হলো যা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়। সবচেয়ে খারাপ অন্ধত্ব হলো হৃদয়ের অন্ধত্ব। ওপরের হাত (যে দেয়) নিচের হাতের (যে নেয়) থেকে উত্তম। প্রাচুর্য ও লোভনীয় বস্তুর সামান্যই জীবনের জন্য যথেষ্ট। সবচেয়ে খারাপ ক্ষমাভিক্ষা হলো মৃত্যু যখন মুখের সামনে আসবে, তখন ক্ষমা চাওয়া। সবচেয়ে নিকৃষ্ট অনুশোচনা হলো যা কিয়ামতের দিন অনুভূত হবে।

কিছু পুরুষ জুমার নামাজে আসে না বা এলেও দ্বিধা নিয়ে বিলম্বে আসে। আর কেউ কেউ অনিচ্ছায় আল্লাহকে স্মরণ করে না। যে জিহ্বা মিথ্যা অভিব্যক্তিতে আসক্ত, তা যেন পাপের ঝরনাধারা।

সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো হৃদয়ের তৃপ্তি। সর্বোত্তম বিধান হলো তাকওয়া। পরাক্রমশালী ও মহান আল্লাহকে ভয় করাই সর্বোচ্চ জ্ঞান। অন্তরে লালন করা সর্বোত্তম জিনিস হলো বিশ্বাস ও প্রত্যয়। সন্দেহ হলো অবিশ্বাস।

অধৈর্য হয়ে কান্নাকাটি এবং মৃতদের জন্য উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করা অজ্ঞতার কাজ। বিশ্বাসঘাতকতা একজন ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুনে নিয়ে যায়। অশ্লীল কবিতা শয়তানের কাজ। মদ হলো সব মন্দের জননী। এতিমের সম্পদ চুরি করা সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ। ধন্য সে, যে অন্যের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে। তোমাদের প্রত্যেককে চার হাত কবরে যেতে হবে। তোমাদের কাজকর্মের হিসাব নেওয়া হবে পরবর্তী জীবনে। সবচেয়ে খারাপ স্বপ্ন হলো একটি মিথ্যা স্বপ্ন।

একজন মুমিনকে গালি দেওয়া সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলা কুফরি। তার গিবত করা আল্লাহর অবাধ্যতা। তার সম্পত্তির অলঙ্ঘ্যতা (এবং পবিত্রতা) তার রক্তের মতো। যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকেই মিথ্যা বলে। যে অন্যকে ক্ষমা করে, সে নিজেই ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়। যে অন্যকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন।

যে রাগ দমন করে, আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য সহকারে দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষতিপূরণ দেন। যে ব্যক্তি শুধু খ্যাতি ও সুনামের জন্য কাজ করে, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন করে, আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেন। যে আল্লাহর অবাধ্য হয়, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। '২২৩

টিকাঃ
১৯৯ জন ডিলার্ড Effective Communication: A Key Leadership Skill.
২০০ বিনা ব্রাউন, ফলো মাই লিড পৃ.-১১৮
২০১ জন ডিলার্ড, Effective Communication : A Key Leadership Skill
২০২ খালিক আহমাদ, পৃ.-২৩৫
২০০ Centre for Creative Leadership-Why Communication is So Important for Leaders
২০৪ Centre for Creative Leadership-Why Communication is So Important for Leaders
২০৫ বুখারি : ২৮৬
২০৬ কান্দলভি, হায়াতুস-সাহাবা, পৃ-২৮
২০৭ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৩৯ এবং ৭১
২০৮ আবু দাউদ: ৪৯৯০ (আহমাদ হাসান অনূদিত)
২০৯ আবু দাউদ, আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃষ্ঠা-৭১
২১০ বুখারি: ১৫৮
২১১ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৪২
২১২ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১৭১
২১০ বুখারি: ৬৮৪৫
২১৪ বুখারি: ১৩৪
২১৫ আল জুহাইলি, পৃ.-৫৫০
২১৬ তিরমিজি, ভলিওম ২, পৃ.-২৪৩
২১৭ ইবনে হিব্বান
২১৮ আবু দাউদ, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৩৩৩
২১৯ বুখারি, খণ্ড-৪, পৃ.-১৪২
২২০ তিরমিজি, ভলিওম ৩, পৃ.-২৩৯
২২১ তিরমিজি, ভলিওম ৩, পৃ.-৩৪৯
২২২ ইবনে মাজাহ, চ্যাপ্টার ১, হাদিস ৪৩। আরও; আবু দাউদ, হাদিস ৪৬০৭
২২০ ইবনুল কাইয়্যিম, জাদুল মাআদ, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৩-১৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00