📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 রহমাতুল্লিল আলামিন

📄 রহমাতুল্লিল আলামিন


আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-কে খলিফা বানিয়ে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। পৃথিবীতে তাঁকে খলিফা বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, মালিকানা করে নয়। আল্লাহ বলেন-
'নিশ্চয় আমি জমিনে একজন খলিফা সৃষ্টি করছি।'১৪০

সকল মানুষই আদমের সন্তান, তাঁরই প্রজন্ম। তাই সবাই পৃথিবীতে খলিফার সিলসিলা নিয়ে বেঁচে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন-
'এই পৃথিবী অনেক সুন্দর ও সবুজ-শ্যামলে ভরপুর এবং আল্লাহ তোমাদের খলিফা হিসেবে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি দেখেন কীভাবে তোমরা কার্য সম্পাদনা করছ।'১৪১

আমরা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখব। তিনিই আমাদের একমাত্র ত্রাণকর্তা। তবে আমাদের কাজ ঠিকঠাকভাবে করে যেতে হবে। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহর সৃষ্টিরাজিকে সম্মান দিতে হবে। কুরআন আমাদের বলে-
'তুমি কি দেখোনি, আসমান ও জমিনে যারা আছে, তারা এবং সারিবদ্ধ হয়ে উড়ন্ত পাখিরা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে?' সূরা নুর: ৪১

মহামহিম আল্লাহ পৃথিবীকে একটি নিয়মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছেন। এরপর এর ভারসাম্য রক্ষার জন্য সুন্দর আন্তঃসম্পর্কের সৃষ্টি করেছেন।
'তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত ও স্থাপন করেছেন মিজান, যাতে তোমরা ভারসাম্য লঙ্ঘন না করো। তোমরা ন্যায়ের সাথে মাপ ঠিক রেখো এবং মাপে কম দিয়ো না।' সূরা রহমান : ৭-৯

এই আয়াতটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসংক্রান্ত ধারণার ভিত্তি। কিন্তু আধুনিক মানুষেরা পরিবেশের এই ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। ফলে নানাবিধ দূষণ ও সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। যার ফলাফল এখন দেখতে পাচ্ছি। কুরআন পূর্বেই উল্লেখ করেছে-
'মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফ্যাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।' সূরা রূম: ৪১

রাসূলুল্লাহ (সা.) হলেন রহমাতুল্লিল আলামিন। তাই তিনি সব সময় প্রাণীদের ওপর দয়াশীল ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তাদের আঘাত না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একবার এক গাধার মুখ চাকুকাটা দেখতে পেয়ে তিনি বলেন-
‘আল্লাহর লানত তার ওপর, যে এই কাজ করেছে। যদি এটা করতেই হয়, তাহলে কম সূক্ষ্ম জায়গায় করো। ১৪২

একবার একটি সুন্দর পাখি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে চারিদিকে উড়ছিল। তিনি তখন একটি গাছের নিচে অবস্থান করছিলেন। তিনি বললেন—‘এই পাখি আমার কাছে নালিশ করেছে, তোমাদের মধ্যে কেউ একজন তার বাচ্চা নিয়ে এসেছে। ফলে সে কষ্টে ভুগছে। তোমাদের কেউ এই কাজ করে থাকলে বাচ্চাগুলোকে ফেরত দাও।’ নবিজির কথা শুনে এক সাহাবি তা দিয়ে দেন। অতঃপর সন্তানদের সাথে পুনর্মিলিত হতে পেরে মা পাখিটি খুব উৎফুল্ল হয়। ১৪৩

রাসূল (সা.) পশুদের ভূমিকার ওপর জোর দিতে একটি ঘটনা বলেন—
‘পিপাসায় কাতর একজন লোক একটি কুয়ার পাশে এলো। অতঃপর কুয়া থেকে পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করল। এ সময় দেখল—একটি কুকুর পিপাসায় কাতর, পানির জন্য ছটফট করছে। সে তাড়াতাড়ি কুয়া থেকে পানি তুলে কুকুরটিকে খাওয়াল। আল্লাহ তার ওপর খুশি হয়ে তার সকল গুনাহ মাফ করে দিলেন।’ ১৪৪

মানুষজন নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন—‘প্রাণীদের সেবা করলে কোনো সওয়াব আছে কি?’ তিনি উত্তর দেন—‘হ্যাঁ, কোনো প্রাণীর সেবা করলে সওয়াব আছে।’

তিনি গাছ রোপণে বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন, যদিও লোকটা মৃত্যুশয্যায় থাকে। তিনি বলেছেন—
‘যদি কিয়ামত চলে আসে এবং তোমাদের মধ্যে কারও হাতে একটিমাত্র বীজ থাকে, তাহলে সে যেন দ্রুত তা রোপণ করে।’ ১৪৫

আনাস ইবনে মালেক (রা.) আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
‘মুসলমানদের মধ্যে কেউ যদি একটি গাছ রোপণ করে বা বীজ বপন করে, তারপর কোনো পাখি বা কোনো ব্যক্তি বা কোনো প্রাণী তা থেকে খায় বা উপকৃত হয়, তাহলে তা একটি দানশীল কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে।’ ১৪৬

টিকাঃ
১৪০ সূরা বাকারা: ৩০
১৪১ মুসলিম, আবু সাইদ খুদরি হতে বর্ণিত
১৪২ মুসলিম
১৪০ আয়াজ আল কারনি, Mercy to Humanity, pp. 259-260.
১৪৪ বুখারি: ৪৬
১৪৫ মুসনাদে আহমাদ: ১২৪৯১
১৪৬ বুখারি: ০১

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 সক্ষমতা

📄 সক্ষমতা


একজন নেতাকে কাজের ক্ষেত্রে অবশ্যই পারদর্শী হতে হবে, যা তার সাফল্যের অন্যতম চাবি। নেতা যা বিশ্বাস করেন বা যে কাজ করেন, অনুসারীরা মূলত সেটাই করতে চায়। লুয়াই শাফি বলেন-'জ্ঞানের সাথে দক্ষতা অনেক বেশি সম্পর্কযুক্ত।'

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নেতৃত্ব হলো-একজন নেতাকে ইলম ও আমল একসঙ্গে প্রয়োগ করে কাজ করতে হবে, যাতে কাজের ক্ষেত্রে তা ফলপ্রসূ হয়। ১৪৭

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে অবগত ছিলেন। দ্বীনের ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। আর দুনিয়াবি যে বিষয়গুলোতে তিনি কোনো নির্দেশনা পাননি, সেখানে অন্যদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন। হাদিসে এসেছে, তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা.) বলেন-
'আমি ও রাসূলুল্লাহ (সা.) খেজুরগাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন-“ওরা কী করছে?” তাঁরা উত্তর দিলো-“ক্রস পরাগায়ন করছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন-“আমি এর কোনো উপকার দেখছি না।” তারা নবিজির কথা শুনে ক্রস পরাগায়ন বন্ধ করে দেয়।

আল্লাহর রাসূল (সা.) পরে যখন জানতে পারলেন ফলন কমে গেছে, তখন তিনি বললেন-“যদি এর কোনো উপকার হয়, তবে তাদের তা করা উচিত। কারণ, এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত মাত্র এবং আমার ব্যক্তিগত মতামত অনুসরণ করবে না; কিন্তু যখন আমি তোমাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু বলি, তখন তা গ্রহণ করো। কারণ, আমি মহান ও মহিমান্বিত আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করি না।”১৪৮

রাসূলুল্লাহ (সা.) নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতার প্রতি জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন-'যে ব্যক্তি অন্য কাউকে অধিক যোগ্য দেখেও তার চেয়ে কম যোগ্য কাউকে পদ অর্পণ করে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং মুসলিমদের সাথে প্রতারণা করেছে। ১৪৯

রফিক বেকন ও জামান বাদওয়ায়ি জোর দিয়ে বলেন- 'ইসলামি জ্ঞানে পারদর্শী কিন্তু কর্মদক্ষতায় দুর্বল; এমন কারও চাইতে ইসলামি জ্ঞানে দুর্বল কিন্তু কর্মদক্ষতায় পারদর্শী; এ রকম একজনকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। তবে অবশ্যই যে এই দুই জিনিসের প্রতি ভারসাম্য রেখেছে, তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। '১৫০

এখানে আমর ইবনে আস (রা.)-এর উদাহরণ মনে রাখা উচিত। ইসলামে প্রবেশ করার মাত্র চার মাসের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে সেনাবাহিনীর প্রধান করে সালাসিলের যুদ্ধাভিযানে পাঠিয়ে দেন। এই বিষয়টি ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর আস-সিয়াসাহ আশ-শারিয়াহ নামক গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন। দুর্বল বা অপর্যাপ্ত দক্ষতাসম্পন্ন একজন নেতা একটি দলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অপরদিকে একজন দক্ষ নেতা একই দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়; হোক না সে অন্য মুসলিমদের চাইতে কম আমলদার। আমলদার না হলে সে বিষয়ে শূরা সিদ্ধান্ত নেবে-কীভাবে তাঁকে আমলের ক্ষেত্রেও জোর দেওয়া যায়। সেটা উপদেশ বা অন্য কিছুর মাধ্যমে হতে পারে।

একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় পাড়ি দেওয়ার সময় বনি আল-দাইল গোত্রের এক মুশরিক ব্যক্তিকে পথপ্রদর্শক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কারণ, সে ছিল রাস্তা চেনায় পারদর্শী। তার ওপর বিশ্বাস করে নবিজি পথ চলেছিলেন। আর নবিজির সাথে ছিলেন আবু বকর (রা.) ও দুটি উট। ১৫১

টিকাঃ
১৪৭ লুয়াই সাফি, 'Leadership and Subordination: An Islamic Perspective.' American Journal of Islamic Social Sciences, Summer, vol. 12 (2), pp.204-223.
১৪৮ মুসলিম: ৫৮৩০
১৪৯ আস-সিয়াসাহ আশ-শারিয়াহ, ইবনে তাইমিয়া
১৫০ রফিক বেকুন এবং জামাল বাদাবি, Leadership: An Islamic Perspective (Beltsville, Maryland: Amana Publications, 1999), pp.39-40.
১৫১ বুখারি: ৩৯০৬

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 সাহস ও সাহসিকতা

📄 সাহস ও সাহসিকতা


On Leadership নামক বইতে ইউএস সার্জেন্ট লিওনার্ড লোমেল লিখেছেন- 'সত্যিকারের নেতারা একটি উপায়ে তাদের সাহস বা বীরত্ব দেখায়। আর তা হলো-যুদ্ধের সামনে থাকা এবং দূর থেকে নির্দেশনা না দিয়ে সামনাসামনি দিকনির্দেশনা দেওয়া। নেতারা নিজে নিরাপদ থেকে অন্যদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না। '১৫২

মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার রিচার্ড স্ট্র্যাটন একটি পুরোনো উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন-'আপনি যা নিজে করেননি, তা করতে অন্যদের আদেশ করবেন না।'১৫৩

নবিজি এই সত্যের উদাহরণ ছিলেন। প্রায়শই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তাঁকে সামনে যুদ্ধ করতে দেখা যেত। আর তিনি কখনো ভয় বা নড়বড়ে হননি।১৫৪ নবিজির সাহস ও যুদ্ধের দক্ষতা সম্পর্কে আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন-
‘যখন পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত, ভয় ছিল তীব্র এবং যুদ্ধ ছিল প্রবল, তখন আমরা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর জন্য চিন্তিত ছিলাম। তিনি যতটা শত্রুর কাছাকাছি, তত কাছাকাছি অন্য কেউ ছিল না। আমি বদর যুদ্ধের দিনে দেখেছিলাম, তিনি ছিলেন শত্রুর সবচেয়ে নিকটে। সেদিন তিনি ছিলেন সবচেয়ে সাহসী ব্যক্তি।'১৫৫

নবিজির চাচা আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন-
'হুনাইনের যুদ্ধে যখন মুসলমান ও কাফিররা মিলিত হয়েছিল এবং মুসলমানরা পিছু হটতে শুরু করেছিল, তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) কাফিরদের দিকে তাঁর খচ্চর নিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করেছিলেন আর আমি খচ্চরটির লাগাম টেনে ধরেছিলাম, যেন তাড়াহুড়ো না হয়। '১৫৬

আনাস (রা.) বর্ণনা করেন-
'উহুদের দিন নবিজির মাথার লোহার টুপি ভেঙে গিয়েছিল। নিজের মুখ থেকে রক্ত মুছে বলছিলেন-“যেসব লোক তাদের নবির মাথার লোহার টুপি ভেঙেছে এবং দাঁত ভেঙেছে, তাঁরা কীভাবে সফলতা পাবে, অথচ তিনি তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন!””১৫৭

এই সময়েই আল্লাহ নিম্নলিখিত আয়াতটি নাজিল করেন-
'তুমি কাফিরদের বলো-তোমরা অচিরেই পরাজিত হবে এবং তোমাদের জাহান্নামের দিকে সমবেত করা হবে। আর সেটি কতই-না নিকৃষ্ট আবাসস্থল!' সূরা আলে ইমরান: ১২

মালেক ইবনে সিনান ও আবু উবায়দা ইবনুল জাররা (রা.) আহত অবস্থায় রাসূল (সা.)-কে দেখতে পান। তিনি নিজের কথা না ভেবে তাঁর সাহাবিদের জন্য বেশি চিন্তিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন- 'তালহার যত্ন নাও।' কারণ, তিনি আহত অবস্থায় নবিজির কাছাকাছি ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এর মুখ থেকে যেহেতু প্রচুর রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল, তাই তাঁরা তাঁর কথায় মনোযোগ দেননি।১৫৮

এগুলো উহুদ যুদ্ধের ঘটনা। নবিজির বয়স তখন প্রায় ৫৫। সেই বিবেচনায় তাঁর শারীরিক সক্ষমতা এবং সামরিক বীরত্ব আরও বেশি আশ্চর্যজনক। তাঁর এই সক্ষমতা আজীবন সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, অল্প খাওয়া এবং নিয়মিত কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছিল।১৫৯

উরওয়া (রা.) বর্ণনা করেন-'আমি ইবনুল আস (রা.)-কে বলেছিলাম মক্কার মুশরিকদের সবচেয়ে হিংসাত্মক আচরণ সম্পর্কে বলতে, যা তারা নবিজির সাথে করেছিল। তিনি উত্তরে বললেন-একবার নবি (সা.) কাবাঘরের কাছে নামাজ আদায় করছিলেন। আকাবা ইবনে আবু মুহিত এসে রাসূল (সা.)-এর গলায় চাদর দিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধ করতে চাইল। আবু বকর (রা.) তাঁকে নবিজির কাছ থেকে টেনে নিলেন এবং কুরআনের আয়াতটি পাঠ করলেন-
'আর ফেরাউন বংশের এক মুমিন ব্যক্তি, যে তাঁর ঈমান গোপন রাখছিল, সে বলল-"তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে, সে বলে-আমার রব আল্লাহ অথচ সে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছে?”” সূরা মুমিন : ২৮

ব্রিটিশ ডায়েরিস্ট স্যামুয়েল জনসন বলেন- 'সাহসকে সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে গণ্য করার কারণ হলো-একজন মানুষের সেই গুণটি না থাকলে তার অন্য কোনো গুণের নিরাপত্তা নেই। মুক্ত বিশ্বে যে কেউ নেতা হতে পারেন, কিন্তু তিনি সত্যিকারের নেতাতে আবির্ভূত হন, যখন তাকে একটি সংকটের মোকাবিলা করতে হয় অথবা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে মূল্যায়ন এবং কঠিন কঠিন সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হয়।'১৬০

নেতৃত্বের গুণাবলি তাদেরই কাজে আসে, যাদের আছে প্রচণ্ড সাহস আর হিম্মত। কারণ, শুধু তারাই কঠিন পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দিতে পারে। সফলতা অর্জনের সঠিক কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদেরই আছে। বিনা ব্রাউন পর্যবেক্ষণ করেছেন-'নেতারা প্রায়শই চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসে। যেমন : পর্বত আরোহণ বা চরম খেলাধুলায় তাদের নেতৃত্বের গুণাবলি অনুসরণ করে সেটাকে বিকাশ করতে চায়। এই শারীরিক ব্যায়ামগুলো নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রকাশ করে।'১৬১

রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর অনুসারীগণ বিশ্বাস ও সাহসের পরীক্ষায় পরীক্ষিত হয়েছিলেন অসংখ্য যুদ্ধে। এমন যুদ্ধ, যেখানে তাঁরা শত্রুদের সংখ্যার চেয়ে ছিলেন অনেক কম। এসব যুদ্ধে যদিও অনেককে শহিদ করা হয়েছিল, তবুও যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁরা দৃঢ় বিশ্বাস, চরম সাহস ও নির্ভীকতার দুর্দান্ত গুণাবলির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।

পরবর্তী সময়ে নবিজির ইন্তেকালের পর এই সাহাবিরাই আশ্চর্যজনকভাবে অল্প সময়ের মধ্যে ইসলামের বাণী পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং এর বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মদিনায় আরামদায়ক বাড়িগুলো ত্যাগ করেছিলেন।

টিকাঃ
১৫২ ডোনাল্ট পালমিসানো, On Leadership: Essential principles for success (New York: Skyhorse Publishing, 2008), p.212.
১৫৩ পালমিসানো, On Leadership, p.219.
১৫৪ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়‍্যাদ, পৃ.-৫৯
১৫৫ ইবনে হাম্বল, আন-নাসায়ি, আত-তাবারানি ও বায়হাকি
১৫৬ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়‍্যাদ, পৃষ্ঠা-৫৯
১৫৭ হাসাতুস-সাহাবা, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৩৪
১৫৮ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-২৯
১৫৯ জাকারিয়া বাশিয়ের, মদিনার আলোকোজ্জ্বল, পৃ.-৯২
১৬০ পালমিসানো, On Leadership, p.8.
১৬১ ব্রাউন, Follow My Lead, p.120.

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 বিশ্বাসযোগ্যতা ও সত্যবাদিতা

📄 বিশ্বাসযোগ্যতা ও সত্যবাদিতা


নীতিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের মূল উপাদান হলো-সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। বিশ্বস্ততা হলো সততার সমার্থক এবং নির্ভরযোগ্যতার সমর্থক সত্যবাদিতা। প্রশিক্ষকরা এগুলোকে নেতৃত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেন-
'সত্যবাদী হওয়া সম্মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা এনে দেয় এবং এই গুণের মাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা যায়।'১৬২

আমেরিকায় প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক নিবন্ধ এই গুণাবলির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে উল্লেখ করেছে-
'ক্রমবর্ধমানভাবে আমরা শুনে এসেছি-সফল নেতারা নিজস্ব মূল্যবোধ ও নৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার চিত্রায়ণের জন্য, যা পূর্বের দশকে হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। বিশ্বস্ততা, সততা, আনুগত্য; এমনকি নির্ভরযোগ্যতার মতো গুণসমূহ নেতৃত্ব-সম্পর্কিত সাহিত্য, জার্নাল ও বইগুলোয় এখন আর অপ্রচলিত শব্দ হিসেবে পরিগণিত হয় না।'১৬৩

স্টিফেন কোভে অবশ্য ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি এসব গুণাবলির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন-'বিশ্বাস এমন এক জিনিস, যার উপস্থিতি বা অভাব যেকোনো সম্পর্কের সাফল্য বা ব্যর্থতার মূল। আর ব্যাবসা, শিল্প, শিক্ষা ও সরকারের ক্ষেত্রে এর অনুপস্থিতি সবকিছুর ফলাফলকে নিম্নগামী করে।'১৬৪

বিশ্বাসযোগ্যতা : ইসলামে নেতৃত্ব একটি পবিত্র আমানত। তাই একজন মুসলিম নেতাকে অবশ্যই বিশ্বস্ত হতে হবে। মুহাম্মাদ (সা.)-কে একজন শত্রুও সবচেয়ে বেশি বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী ব্যক্তি হিসেবে অবলীলায় মেনে নিত। বাল্যকাল থেকেই তাঁর ডাকনাম ছিল 'আল আমিন'। আল্লাহ স্বয়ং কুরআনে ঘোষণা করেছেন-
'যাকে সেখানে মান্য করা হয় এবং সে বিশ্বস্ত।' সূরা তাকভির: ২১

তাফসিরকারকগণ মনে করেন-এই আয়াত মুহাম্মাদ (সা.)-এর দিকে ইঙ্গিত দেয়। কাবা পুনর্নির্মাণের সময় কালো পাথরটিকে তার জায়গায় কে রাখবে-এটা নিয়ে কুরাইশদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি হওয়ার উপক্রম হলে তারা সিদ্ধান্ত নেয়-প্রথম যে ব্যক্তি কাবায় আসবেন, তিনি হবেন বিচারক। পরদিন যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রথম কাবাঘরে দেখা গেল। তারা বলল-'ইনি মুহাম্মাদ। বিশ্বস্ত এক মানুষ। আমরা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট।'১৬৫

আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করেন, তখনও তাঁর কাছে অনেক নিপীড়কের জিনিসপত্র আমানত হিসেবে ছিল। তাঁর সততা কখনো আপস করেনি, যদিও এই ব্যক্তিরাই তাঁর সঙ্গীদের বহিষ্কার করেছিল এবং তিনি তাদের নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন।

তিনি আলি (রা.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন মক্কায় থাকার জন্য, যাতে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর কাছে থাকা সমস্ত আমানত ফেরত দিতে পারেন। মক্কায় এমন কেউ ছিল না (এমনকি তাঁর শত্রুরাও) যারা তাঁর কাছে এসে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আমানত হিসেবে রাখেনি। কারণ, এই লোকগুলো তাঁর সততা ও বিশ্বস্ততার পরিচিতি ছিল। এভাবে আলি (রা.) তিন দিন তিন রাত (রাসূল (সা.)-এর হিজরতের পর) আমানতগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অবস্থান করেছিলেন। ১৬৬

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
'যদি তুমি আমাকে তোমার পক্ষ থেকে ছয়টি বিষয়ের নিশ্চয়তা দাও, আমি তোমার জান্নাতের জিম্মাদার হব। কথা বলার সময় সত্য বলা, কাউকে প্রতিশ্রুতি দিলে তা রাখা, কারও কাছে আমানত রাখলে তা পূরণ করা, অনৈতিকতা এড়িয়ে চলা, দৃষ্টি অবনত রাখা এবং হাতকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখা।'১৬৭

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন-
'যাকে আল্লাহ শাসন করার সুযোগ করে দিয়েছেন, সে যদি তা বিশ্বাসের সাথে না পালন করে, তবে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।'১৬৮

সত্যবাদিতা : সত্যবাদিতা ধার্মিকতার দিকে নিয়ে যায় এবং ধার্মিকতা নিয়ে যায় জান্নাতের দিকে। মিথ্যা পাপাচার ও আগুনের দিকে নিয়ে যায়। একজন মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে, যতক্ষণ না তাকে আল্লাহ মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত করেন। ১৬৯

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সবচেয়ে গুরুতর শত্রুরাও তাঁর সত্যতা স্বীকার করেছিল। আলি (রা.) বলেন-
'আবু জাহেল নবিজিকে বলেছিল- “আমরা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলছি না। আমরা বলছি-আপনি যা নিয়ে এসেছেন, তা মিথ্যা।” তারপর আল্লাহ আয়াত নাজিল করে বলেন-“তারা তো তোমাকে অস্বীকার করে না।” সূরা আনআম : ৩৩

বাইজেন্টাইন খ্রিষ্টান সম্রাট হিরাক্লিয়াস ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে নবি মুহাম্মাদ (সা.)-এর কাছ থেকে ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণসংবলিত একটি চিঠি পান। আবু সুফিয়ান মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিরোধী কুরাইশ সর্দার। তিনি কাকতালীয়ভাবে একটি বাণিজ্য সফরে সেখানে গিয়েছিলেন। হিরাক্লিয়াস তাঁকে মুহাম্মাদ (সা.) সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। তাঁর দুটি প্রশ্ন ছিল প্রাসঙ্গিক। এই ব্যাপারটি নিয়ে আবু সুফিয়ান আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কাছে বর্ণনা করেছেন-
'হিরাক্লিয়াস আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- “আপনি কি তাঁর (নবি হওয়ার) দাবি করার পূর্বে তাঁকে মিথ্যা বলার জন্য অভিযুক্ত করেছেন?” আমি উত্তর দিলাম-“না।”
হিরাক্লিয়াস জানতে চাইলেন-“তিনি (মুহাম্মাদ) আপনাকে কী করার জন্য আদেশ করেছেন?” আমি উত্তর দিলাম-“তিনি আমাদের নামাজ কায়েম করতে, সত্য কথা বলতে, পবিত্র হতে, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এবং আমানত ফেরত দেওয়ার আদেশ দেন।" তারপর হিরাক্লিয়াস বললেন- “এগুলো সত্যিই একজন নবির গুণাবলি।”১৭০

কিছু বর্ণনা থেকে ধারণা করা হয়, হিরাক্লিয়াস তাঁর ধর্মীয় প্রধানের সাথে আলোচনা করার পরে স্বীকার করেন-মুহাম্মাদ (সা.) সেই নবি, যার কথা যিশু আগেই বলে গিয়েছেন। কিন্তু 'আমি আমার সাম্রাজ্য ত্যাগ করতে পারব না' বলে সেই ধর্ম গ্রহণ করতে আর রাজি হননি। ১৭১

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন-'হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার কাছ থেকে যা শুনছি, তা কি লিখে নেব?' তিনি উত্তর দিলেন-'হ্যাঁ।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন-'তখনও, যখন আপনি খুশি ও রাগান্বিত হন?' নবি উত্তর দিলেন- 'হ্যাঁ, আমার অবস্থা যা-ই হোক না কেন, আমি কেবল সত্যই বলি। '১৭২

নবিজি সারাজীবনের উক্তি ও কর্মের (হাদিস) বিশাল সংগ্রহ লিপিবদ্ধ করা আছে, যা বিশ্বকে পড়তে এবং প্রকৃতপক্ষে তিনি যা বলেছিলেন তা যে সত্য ছিল, এটি প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ দেয়।

টিকাঃ
১৬২ পালমিসানো, নেতৃত্ব, পৃ. : ১৪২-১৪৩
১৬০ 'Spirituality in the workplace', Mining People International News, Edition 73 (January, 2012), pp.2-3
১৬৪ কাভারি, Principle-Centred Leadership, p.31
১৬৫ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৬৯
১৬৬ মোহাম্মদ আল শিনাবি, 'How the Prophet Muhammad (pbuh) Rose above Enmity and Insult'
১৬৭ তিরমিজি: ১২৬০
১৬৮ বুখারি, বই ৯৩, হাদিস ১৪ (সুন্নাহ.কম, হাদিস ৭১৫০)
১৬৯ বুখারি: ৮১১৬
১৭০ বুখারি, ভলিয়ম ৩, বই ৪৮, হাদিস ৮৪৬
১৭১ হায়াতুস সাহাবা, পৃ. : ১৩৭-৩৯, কয়েকটি হাদিসের ওপর ভিত্তি করে
১৭২ ইবনে হাম্বল, আবু দাউদ ও আল হাকিম, আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়‍্যাদ, পৃ.-৩০০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00