📄 সবকিছুকে সহজ করা
নেতৃত্ব-সম্পর্কিত কোচ গোর্ডোন ট্রেডগোল্ড বলেছেন-'নেতারা শুধু কাজের দিকে তাকায় না। তারা কর্মীদের জীবনকে কষ্টসাধ্য বানানোর পরিবর্তে সরল করতে সাহায্য করে।'১৩৫
রাসূলুল্লাহ (সা.) সবকিছুকে সহজ করার জন্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করতেন। তবে ফরজ বিষয়ে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন-
'আল্লাহ আমাকে একজন শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যেন আমি কঠিন না করে বরং সহজ করি।'১৩৬
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে চান না; বরং তিনি চান তোমাদের পবিত্র করতে এবং তাঁর নিয়ামত তোমাদের ওপর পূর্ণ করতে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।' সূরা মায়েদা : ৬
আয়িশা (রা.) বলেন-
'রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে যদি দুটি বিষয় নিয়ে আসা হতো, তাহলে তিনি সহজটাকেই বেছে নিতেন এবং বলে দিতেন-তা ভুল কিছু নয়।'১৩৭
কিছু কিছু কাজ তিনি উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে করতেন না। মসজিদ থেকে কোনো বাচ্চার ক্রন্দন শুনলে তিনি নামাজ লম্বা না করে ছোটো করে শেষ করে দিতেন। তিনি যখন মুয়াজ ও আবু মুসা আল আশআরি (রা.)- কে ইয়েমেনে পাঠান, তখন তাঁদের বলে দেন-
'কোনো কিছুকে কঠিন না করে সহজ করো। সুসংবাদ দিয়ে তাদের কাছে টেনে নিয়ো, দূরে নয়। মতপার্থক্য করে সরে যেয়ো না; বরং একসাথেই থেকো।'১৩৮
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের সাবধান করে দেন, যারা মাত্রাতিরিক্ত নফল ইবাদত করে নিজের ওপর জুলুম করে। তিনি বলেন-
'অবশ্যই ইসলাম অনেক সহজসাধ্য। এটাকে কষ্টসাধ্য বানিয়ো না। বানালে নিজেই পরাজিত হবে। তাই মধ্যপন্থা অবলম্বন করো। ভালো কাজ করো, আনন্দিত হও, আল্লাহর কাছে সকাল, বিকাল ও মধ্যরাতে সাহায্য চাও।'১৩৯
টিকাঃ
১৩৫ গর্ডন ট্রেডগোল্ড, '9 Simple Reminders That Will Make You a Better Leader.' (Oct 8, 2017)
১৩৬ মুসলিম: ৩৯
১৩৭ বুখারি: ৭৬০
১৩৮ বুখারি: ১৫২
১৩৯ বুখারি: ৩৯
📄 রহমাতুল্লিল আলামিন
আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-কে খলিফা বানিয়ে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। পৃথিবীতে তাঁকে খলিফা বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, মালিকানা করে নয়। আল্লাহ বলেন-
'নিশ্চয় আমি জমিনে একজন খলিফা সৃষ্টি করছি।'১৪০
সকল মানুষই আদমের সন্তান, তাঁরই প্রজন্ম। তাই সবাই পৃথিবীতে খলিফার সিলসিলা নিয়ে বেঁচে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন-
'এই পৃথিবী অনেক সুন্দর ও সবুজ-শ্যামলে ভরপুর এবং আল্লাহ তোমাদের খলিফা হিসেবে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি দেখেন কীভাবে তোমরা কার্য সম্পাদনা করছ।'১৪১
আমরা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখব। তিনিই আমাদের একমাত্র ত্রাণকর্তা। তবে আমাদের কাজ ঠিকঠাকভাবে করে যেতে হবে। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহর সৃষ্টিরাজিকে সম্মান দিতে হবে। কুরআন আমাদের বলে-
'তুমি কি দেখোনি, আসমান ও জমিনে যারা আছে, তারা এবং সারিবদ্ধ হয়ে উড়ন্ত পাখিরা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে?' সূরা নুর: ৪১
মহামহিম আল্লাহ পৃথিবীকে একটি নিয়মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছেন। এরপর এর ভারসাম্য রক্ষার জন্য সুন্দর আন্তঃসম্পর্কের সৃষ্টি করেছেন।
'তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত ও স্থাপন করেছেন মিজান, যাতে তোমরা ভারসাম্য লঙ্ঘন না করো। তোমরা ন্যায়ের সাথে মাপ ঠিক রেখো এবং মাপে কম দিয়ো না।' সূরা রহমান : ৭-৯
এই আয়াতটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসংক্রান্ত ধারণার ভিত্তি। কিন্তু আধুনিক মানুষেরা পরিবেশের এই ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। ফলে নানাবিধ দূষণ ও সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। যার ফলাফল এখন দেখতে পাচ্ছি। কুরআন পূর্বেই উল্লেখ করেছে-
'মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফ্যাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।' সূরা রূম: ৪১
রাসূলুল্লাহ (সা.) হলেন রহমাতুল্লিল আলামিন। তাই তিনি সব সময় প্রাণীদের ওপর দয়াশীল ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তাদের আঘাত না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একবার এক গাধার মুখ চাকুকাটা দেখতে পেয়ে তিনি বলেন-
‘আল্লাহর লানত তার ওপর, যে এই কাজ করেছে। যদি এটা করতেই হয়, তাহলে কম সূক্ষ্ম জায়গায় করো। ১৪২
একবার একটি সুন্দর পাখি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে চারিদিকে উড়ছিল। তিনি তখন একটি গাছের নিচে অবস্থান করছিলেন। তিনি বললেন—‘এই পাখি আমার কাছে নালিশ করেছে, তোমাদের মধ্যে কেউ একজন তার বাচ্চা নিয়ে এসেছে। ফলে সে কষ্টে ভুগছে। তোমাদের কেউ এই কাজ করে থাকলে বাচ্চাগুলোকে ফেরত দাও।’ নবিজির কথা শুনে এক সাহাবি তা দিয়ে দেন। অতঃপর সন্তানদের সাথে পুনর্মিলিত হতে পেরে মা পাখিটি খুব উৎফুল্ল হয়। ১৪৩
রাসূল (সা.) পশুদের ভূমিকার ওপর জোর দিতে একটি ঘটনা বলেন—
‘পিপাসায় কাতর একজন লোক একটি কুয়ার পাশে এলো। অতঃপর কুয়া থেকে পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করল। এ সময় দেখল—একটি কুকুর পিপাসায় কাতর, পানির জন্য ছটফট করছে। সে তাড়াতাড়ি কুয়া থেকে পানি তুলে কুকুরটিকে খাওয়াল। আল্লাহ তার ওপর খুশি হয়ে তার সকল গুনাহ মাফ করে দিলেন।’ ১৪৪
মানুষজন নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন—‘প্রাণীদের সেবা করলে কোনো সওয়াব আছে কি?’ তিনি উত্তর দেন—‘হ্যাঁ, কোনো প্রাণীর সেবা করলে সওয়াব আছে।’
তিনি গাছ রোপণে বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন, যদিও লোকটা মৃত্যুশয্যায় থাকে। তিনি বলেছেন—
‘যদি কিয়ামত চলে আসে এবং তোমাদের মধ্যে কারও হাতে একটিমাত্র বীজ থাকে, তাহলে সে যেন দ্রুত তা রোপণ করে।’ ১৪৫
আনাস ইবনে মালেক (রা.) আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
‘মুসলমানদের মধ্যে কেউ যদি একটি গাছ রোপণ করে বা বীজ বপন করে, তারপর কোনো পাখি বা কোনো ব্যক্তি বা কোনো প্রাণী তা থেকে খায় বা উপকৃত হয়, তাহলে তা একটি দানশীল কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে।’ ১৪৬
টিকাঃ
১৪০ সূরা বাকারা: ৩০
১৪১ মুসলিম, আবু সাইদ খুদরি হতে বর্ণিত
১৪২ মুসলিম
১৪০ আয়াজ আল কারনি, Mercy to Humanity, pp. 259-260.
১৪৪ বুখারি: ৪৬
১৪৫ মুসনাদে আহমাদ: ১২৪৯১
১৪৬ বুখারি: ০১
📄 সক্ষমতা
একজন নেতাকে কাজের ক্ষেত্রে অবশ্যই পারদর্শী হতে হবে, যা তার সাফল্যের অন্যতম চাবি। নেতা যা বিশ্বাস করেন বা যে কাজ করেন, অনুসারীরা মূলত সেটাই করতে চায়। লুয়াই শাফি বলেন-'জ্ঞানের সাথে দক্ষতা অনেক বেশি সম্পর্কযুক্ত।'
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নেতৃত্ব হলো-একজন নেতাকে ইলম ও আমল একসঙ্গে প্রয়োগ করে কাজ করতে হবে, যাতে কাজের ক্ষেত্রে তা ফলপ্রসূ হয়। ১৪৭
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে অবগত ছিলেন। দ্বীনের ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। আর দুনিয়াবি যে বিষয়গুলোতে তিনি কোনো নির্দেশনা পাননি, সেখানে অন্যদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন। হাদিসে এসেছে, তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা.) বলেন-
'আমি ও রাসূলুল্লাহ (সা.) খেজুরগাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন-“ওরা কী করছে?” তাঁরা উত্তর দিলো-“ক্রস পরাগায়ন করছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন-“আমি এর কোনো উপকার দেখছি না।” তারা নবিজির কথা শুনে ক্রস পরাগায়ন বন্ধ করে দেয়।
আল্লাহর রাসূল (সা.) পরে যখন জানতে পারলেন ফলন কমে গেছে, তখন তিনি বললেন-“যদি এর কোনো উপকার হয়, তবে তাদের তা করা উচিত। কারণ, এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত মাত্র এবং আমার ব্যক্তিগত মতামত অনুসরণ করবে না; কিন্তু যখন আমি তোমাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু বলি, তখন তা গ্রহণ করো। কারণ, আমি মহান ও মহিমান্বিত আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করি না।”১৪৮
রাসূলুল্লাহ (সা.) নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতার প্রতি জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন-'যে ব্যক্তি অন্য কাউকে অধিক যোগ্য দেখেও তার চেয়ে কম যোগ্য কাউকে পদ অর্পণ করে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং মুসলিমদের সাথে প্রতারণা করেছে। ১৪৯
রফিক বেকন ও জামান বাদওয়ায়ি জোর দিয়ে বলেন- 'ইসলামি জ্ঞানে পারদর্শী কিন্তু কর্মদক্ষতায় দুর্বল; এমন কারও চাইতে ইসলামি জ্ঞানে দুর্বল কিন্তু কর্মদক্ষতায় পারদর্শী; এ রকম একজনকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। তবে অবশ্যই যে এই দুই জিনিসের প্রতি ভারসাম্য রেখেছে, তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। '১৫০
এখানে আমর ইবনে আস (রা.)-এর উদাহরণ মনে রাখা উচিত। ইসলামে প্রবেশ করার মাত্র চার মাসের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে সেনাবাহিনীর প্রধান করে সালাসিলের যুদ্ধাভিযানে পাঠিয়ে দেন। এই বিষয়টি ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর আস-সিয়াসাহ আশ-শারিয়াহ নামক গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন। দুর্বল বা অপর্যাপ্ত দক্ষতাসম্পন্ন একজন নেতা একটি দলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অপরদিকে একজন দক্ষ নেতা একই দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়; হোক না সে অন্য মুসলিমদের চাইতে কম আমলদার। আমলদার না হলে সে বিষয়ে শূরা সিদ্ধান্ত নেবে-কীভাবে তাঁকে আমলের ক্ষেত্রেও জোর দেওয়া যায়। সেটা উপদেশ বা অন্য কিছুর মাধ্যমে হতে পারে।
একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় পাড়ি দেওয়ার সময় বনি আল-দাইল গোত্রের এক মুশরিক ব্যক্তিকে পথপ্রদর্শক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কারণ, সে ছিল রাস্তা চেনায় পারদর্শী। তার ওপর বিশ্বাস করে নবিজি পথ চলেছিলেন। আর নবিজির সাথে ছিলেন আবু বকর (রা.) ও দুটি উট। ১৫১
টিকাঃ
১৪৭ লুয়াই সাফি, 'Leadership and Subordination: An Islamic Perspective.' American Journal of Islamic Social Sciences, Summer, vol. 12 (2), pp.204-223.
১৪৮ মুসলিম: ৫৮৩০
১৪৯ আস-সিয়াসাহ আশ-শারিয়াহ, ইবনে তাইমিয়া
১৫০ রফিক বেকুন এবং জামাল বাদাবি, Leadership: An Islamic Perspective (Beltsville, Maryland: Amana Publications, 1999), pp.39-40.
১৫১ বুখারি: ৩৯০৬
📄 সাহস ও সাহসিকতা
On Leadership নামক বইতে ইউএস সার্জেন্ট লিওনার্ড লোমেল লিখেছেন- 'সত্যিকারের নেতারা একটি উপায়ে তাদের সাহস বা বীরত্ব দেখায়। আর তা হলো-যুদ্ধের সামনে থাকা এবং দূর থেকে নির্দেশনা না দিয়ে সামনাসামনি দিকনির্দেশনা দেওয়া। নেতারা নিজে নিরাপদ থেকে অন্যদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না। '১৫২
মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার রিচার্ড স্ট্র্যাটন একটি পুরোনো উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন-'আপনি যা নিজে করেননি, তা করতে অন্যদের আদেশ করবেন না।'১৫৩
নবিজি এই সত্যের উদাহরণ ছিলেন। প্রায়শই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তাঁকে সামনে যুদ্ধ করতে দেখা যেত। আর তিনি কখনো ভয় বা নড়বড়ে হননি।১৫৪ নবিজির সাহস ও যুদ্ধের দক্ষতা সম্পর্কে আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন-
‘যখন পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত, ভয় ছিল তীব্র এবং যুদ্ধ ছিল প্রবল, তখন আমরা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর জন্য চিন্তিত ছিলাম। তিনি যতটা শত্রুর কাছাকাছি, তত কাছাকাছি অন্য কেউ ছিল না। আমি বদর যুদ্ধের দিনে দেখেছিলাম, তিনি ছিলেন শত্রুর সবচেয়ে নিকটে। সেদিন তিনি ছিলেন সবচেয়ে সাহসী ব্যক্তি।'১৫৫
নবিজির চাচা আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন-
'হুনাইনের যুদ্ধে যখন মুসলমান ও কাফিররা মিলিত হয়েছিল এবং মুসলমানরা পিছু হটতে শুরু করেছিল, তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) কাফিরদের দিকে তাঁর খচ্চর নিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করেছিলেন আর আমি খচ্চরটির লাগাম টেনে ধরেছিলাম, যেন তাড়াহুড়ো না হয়। '১৫৬
আনাস (রা.) বর্ণনা করেন-
'উহুদের দিন নবিজির মাথার লোহার টুপি ভেঙে গিয়েছিল। নিজের মুখ থেকে রক্ত মুছে বলছিলেন-“যেসব লোক তাদের নবির মাথার লোহার টুপি ভেঙেছে এবং দাঁত ভেঙেছে, তাঁরা কীভাবে সফলতা পাবে, অথচ তিনি তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন!””১৫৭
এই সময়েই আল্লাহ নিম্নলিখিত আয়াতটি নাজিল করেন-
'তুমি কাফিরদের বলো-তোমরা অচিরেই পরাজিত হবে এবং তোমাদের জাহান্নামের দিকে সমবেত করা হবে। আর সেটি কতই-না নিকৃষ্ট আবাসস্থল!' সূরা আলে ইমরান: ১২
মালেক ইবনে সিনান ও আবু উবায়দা ইবনুল জাররা (রা.) আহত অবস্থায় রাসূল (সা.)-কে দেখতে পান। তিনি নিজের কথা না ভেবে তাঁর সাহাবিদের জন্য বেশি চিন্তিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন- 'তালহার যত্ন নাও।' কারণ, তিনি আহত অবস্থায় নবিজির কাছাকাছি ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এর মুখ থেকে যেহেতু প্রচুর রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল, তাই তাঁরা তাঁর কথায় মনোযোগ দেননি।১৫৮
এগুলো উহুদ যুদ্ধের ঘটনা। নবিজির বয়স তখন প্রায় ৫৫। সেই বিবেচনায় তাঁর শারীরিক সক্ষমতা এবং সামরিক বীরত্ব আরও বেশি আশ্চর্যজনক। তাঁর এই সক্ষমতা আজীবন সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, অল্প খাওয়া এবং নিয়মিত কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছিল।১৫৯
উরওয়া (রা.) বর্ণনা করেন-'আমি ইবনুল আস (রা.)-কে বলেছিলাম মক্কার মুশরিকদের সবচেয়ে হিংসাত্মক আচরণ সম্পর্কে বলতে, যা তারা নবিজির সাথে করেছিল। তিনি উত্তরে বললেন-একবার নবি (সা.) কাবাঘরের কাছে নামাজ আদায় করছিলেন। আকাবা ইবনে আবু মুহিত এসে রাসূল (সা.)-এর গলায় চাদর দিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধ করতে চাইল। আবু বকর (রা.) তাঁকে নবিজির কাছ থেকে টেনে নিলেন এবং কুরআনের আয়াতটি পাঠ করলেন-
'আর ফেরাউন বংশের এক মুমিন ব্যক্তি, যে তাঁর ঈমান গোপন রাখছিল, সে বলল-"তোমরা কি একটি লোককে কেবল এ কারণে হত্যা করবে যে, সে বলে-আমার রব আল্লাহ অথচ সে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছে?”” সূরা মুমিন : ২৮
ব্রিটিশ ডায়েরিস্ট স্যামুয়েল জনসন বলেন- 'সাহসকে সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে গণ্য করার কারণ হলো-একজন মানুষের সেই গুণটি না থাকলে তার অন্য কোনো গুণের নিরাপত্তা নেই। মুক্ত বিশ্বে যে কেউ নেতা হতে পারেন, কিন্তু তিনি সত্যিকারের নেতাতে আবির্ভূত হন, যখন তাকে একটি সংকটের মোকাবিলা করতে হয় অথবা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে মূল্যায়ন এবং কঠিন কঠিন সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হয়।'১৬০
নেতৃত্বের গুণাবলি তাদেরই কাজে আসে, যাদের আছে প্রচণ্ড সাহস আর হিম্মত। কারণ, শুধু তারাই কঠিন পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দিতে পারে। সফলতা অর্জনের সঠিক কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদেরই আছে। বিনা ব্রাউন পর্যবেক্ষণ করেছেন-'নেতারা প্রায়শই চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসে। যেমন : পর্বত আরোহণ বা চরম খেলাধুলায় তাদের নেতৃত্বের গুণাবলি অনুসরণ করে সেটাকে বিকাশ করতে চায়। এই শারীরিক ব্যায়ামগুলো নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রকাশ করে।'১৬১
রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর অনুসারীগণ বিশ্বাস ও সাহসের পরীক্ষায় পরীক্ষিত হয়েছিলেন অসংখ্য যুদ্ধে। এমন যুদ্ধ, যেখানে তাঁরা শত্রুদের সংখ্যার চেয়ে ছিলেন অনেক কম। এসব যুদ্ধে যদিও অনেককে শহিদ করা হয়েছিল, তবুও যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁরা দৃঢ় বিশ্বাস, চরম সাহস ও নির্ভীকতার দুর্দান্ত গুণাবলির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে নবিজির ইন্তেকালের পর এই সাহাবিরাই আশ্চর্যজনকভাবে অল্প সময়ের মধ্যে ইসলামের বাণী পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং এর বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মদিনায় আরামদায়ক বাড়িগুলো ত্যাগ করেছিলেন।
টিকাঃ
১৫২ ডোনাল্ট পালমিসানো, On Leadership: Essential principles for success (New York: Skyhorse Publishing, 2008), p.212.
১৫৩ পালমিসানো, On Leadership, p.219.
১৫৪ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৫৯
১৫৫ ইবনে হাম্বল, আন-নাসায়ি, আত-তাবারানি ও বায়হাকি
১৫৬ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃষ্ঠা-৫৯
১৫৭ হাসাতুস-সাহাবা, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৩৪
১৫৮ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-২৯
১৫৯ জাকারিয়া বাশিয়ের, মদিনার আলোকোজ্জ্বল, পৃ.-৯২
১৬০ পালমিসানো, On Leadership, p.8.
১৬১ ব্রাউন, Follow My Lead, p.120.