📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 আনুগত্য

📄 আনুগত্য


লিও বগি বলেন-'মহত্ত্বই হলো শ্রেষ্ঠ নেতৃত্বের চাবিকাঠি। আত্মত্যাগ অনেক উপকারী। এটা আমাদের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, চাপ কমায়, সম্পর্ক অটুট রাখে এবং একটি লম্বা সুখী জীবনের জানান দেয়। '১১৫

ব্রুনা মার্টিনুজি নেতৃত্ব নিয়ে মন্তব্য করেন-'নেতার প্রধান কর্তব্য হলো উদার হৃদয় দিয়ে নেতৃত্ব দেওয়া এবং মনের আভিজাত্য দ্বারা পরিচালিত হওয়া। একজন উদার নেতার কাছে ইতিবাচকতা ছড়ানোর জাদু রয়েছে।'

তিনি আরও যোগ করে বলেন-'মহৎ হওয়ার আরেকটি অর্থ হলো পরোপকারী হওয়া। পরোপকারের গুণাবলি অর্জন করলে আপনি কিছু না কিছু নিশ্চয়ই ফেরত পাবেন। সকলের মধ্যে পরিচিতিও বাড়বে। সব সময় মনে একধরনের প্রশান্তি কাজ করবে। সময়, জ্ঞান, পরোপকারিতা ধারণ করে থাকা অনেক উপভোগ্য।'১১৬

সমাজের দায়বদ্ধতাবিষয়ক গবেষক মেগান হোল্টজার বলেন-'আত্মত্যাগ সমাজে একটি ঊর্ধ্বমুখী শৃঙ্খল তৈরির মাধ্যমে সমাজের রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করে।'১১৭

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহত্ত্বের নীতি ছিল অনেকটাই ভিন্ন, যা উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর কাছে কিছু চাওয়া হয়েছে আর তিনি 'না-বোধক' উত্তর দিয়েছেন-এমন ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে না।১১৮ থাকলে তিনি তা দিয়ে দিতেন, আর না থাকলে উত্তম কোনো কথা বলতেন। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন-
‘এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে কিছু চাইল। তিনি তাকে দুই পর্বতের মাঝখানে যতগুলো মেষ ছিল, সবগুলো দিয়ে দিলেন। লোকটি তার সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে বলল—“ইসলাম গ্রহণ করো। তিনি কখনো অভাবের ভয় করেন না। এই দেখো তিনি আমাকে এসব দিয়েছেন”। রাসুলুল্লাহ (সা.) অনেক মানুষকে ১০০টির বেশি উট দিয়েছেন। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে তিনি প্রথমে ১০০, তারপর আরও ১০০, তারপর আরও ৩০০টি উট দিয়েছিলেন।১১৯

তারপর আরেকজন এসে তাঁর কাছে চাইল। তখন তিনি বললেন— “আমার কাছে আর কিছু নেই। তবে আমার নাম নিয়ে কিছু নিয়ে নিতে পারো। আমি পরে তা চুকিয়ে দেবো।” উমর (রা.) বললেন— “আপনি যা করতে পারবেন না, তা করতে তো আল্লাহ আপনাকে বাধ্য করেননি।” রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই উক্তি পছন্দ করলেন না। এক আনসারি সাহাবি তখন বললেন—“ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আপনি হ্রাস পাওয়ার চিন্তা না করে আল্লাহর ধনভাণ্ডার হতে দান করুন।” আল্লাহর রাসুল এবার হাসলেন এবং বললেন—“আমাকে তা করতে আদেশ করা হয়েছে!”১২০

আয়িশা (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চারিত্রিক গুণ ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ। যখনই তাঁকে ঘরের কেউ কিংবা সাহাবিরা তাঁর সাহায্য চেয়েছেন, তাঁরা তা পেয়েছেন।১২২

আনাস (রা.) আরও বলেন— ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ার কারণে তিনি কখনো আগামীকালের জন্য ঘরে কোনো কিছু জমিয়ে রাখতেন না।১২২

নবিজির নাতি হাসান (রা.) বলেন— ‘তিনি মানুষের কারণে অনেক সময় না খেয়ে থাকতেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে পাথর পর্যন্ত বেঁধেছেন। অনেক সময় এমনও হয়েছে—টানা তিন দিন কোনো খাবারই খাননি।১২৩

আবু তালহা (রা.) বর্ণনা করেন-
'একদা ক্ষুধার জ্বালায় আমরা রাসূল (সা.)-এর কাছে গিয়ে এ বিষয়ে বর্ণনা করি এবং পেটে যে পাথর বেঁধেছি, তা দেখাই। তিনি তা দেখে তাঁর শরীরে উন্মুক্ত করে দেখান। সেখানে আমরা দুটি পাথর দেখতে পাই।'১২৪

এসবই বলে দেয়-রাসূলুল্লাহ (সা.) যা শিখিয়েছেন, তা নিজে আগে পালন করেছেন। হাদিসে আছে-
'ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপর ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করবে।'১২৫

উদারতা নেতৃত্বের অন্যতম গুণ। রাসূল (সা.) একবার একটি গোত্রের নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে অন্য একজনকে দায়িত্ব দেন। কারণ, সেই নেতা উদার ছিলেন না। একবার একটি প্রতিনিধিদল এলে রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাস করলেন-
'হে বনু সালামা! তোমাদের নেতা কে?' তারা উত্তর দিলো-'বিশির ইবনে কিয়াস! যদিও সে অনেক হৃদয়হীন নেতা।' রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন- 'হৃদয়হীন হওয়ার চেয়ে আর কোনো খারাপ অসুখ আছে কি?' তখন তাঁরা বলল-'তাহলে কে হবে আমাদের নেতা?' তিনি বলেন- 'বিশির ইবনে বারা ইবনে আল মারওয়ান।'১২৬

টিকাঃ
১১৫ লিও জে বগি, III-'5 Reasons Generosity is the Key to Great Leadership' (Dec 6, 2016)
১১৬ ব্রুনা মার্তিনজ্জি, 'Why Being a Generous Leader Can Make You a Great Leader.'
১১৭ মেগান হাল্টজার, What is generous leadership? (Nov 7, 2018)
১১৮ মুসলিম: ৫৭২৬
১১৯ মুসলিম : ৫৭০০
১২০ তিরমিজি, কুদি আইয়াদের আশ-শিফা গ্রন্থে বর্ণিত, পৃ.-৫৮
১২১ আবু নুআইম, আশ-শিফা গ্রন্থে বর্ণিত, পৃ.-৬২
১২২ তিরমিজি, আশ-শিফা গ্রন্থে বর্ণিত, পৃ.-৫৮
১২৩ হায়াতুস-সাহাবা, পৃষ্ঠা-৩৭৬
১২৪ আততারগিব ওয়াত-তারহিব, পৃষ্ঠা ১৫৬
১২৫ বুখারি: ১২
১২৬ আল হাইসাম, মাজমাউল জাওয়াইদ, হাদিস : ৯.৩১৫

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 উদারতা ও ক্ষমাশীলতা

📄 উদারতা ও ক্ষমাশীলতা


উদারতাকে নেতৃত্বের উচ্চমানের গুণ হিসেবে উল্লেখ করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রুশবেথ কান্টার বলেন-'নেতৃত্বের সবচেয়ে সাহসী কাজ হচ্ছে-প্রতিপক্ষে থাকা মানুষদের প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তাধারাকে শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যারা কোনো সমস্যা করে বা ক্ষমতা টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।'১২৭

শাওয়েন বলেন- 'যখন ক্ষমা একটি নেতৃত্বের পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়, তখন আপনি আনুগত্যের জন্ম দেন, সৃষ্টিশীলতা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করেন।'১২৮

রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর দেওয়া আদেশ পালন করেন এবং তা আগে নিজের ওপর প্রয়োগ করেন। আল্লাহ বলেছেন-
'মন্দকে প্রতিহত করো ভালো কিছুর মাধ্যমে। ফলে যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হবে।' সূরা হা-মিম সাজদা: ৩৪

আয়িশা (রা.) বলেন- 'রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কখনো কারও ওপর প্রতিশোধ নিতে আমি দেখিনি। তিনি কারও ওপর হাত তোলেননি; শুধু আল্লাহর রাস্তায় করা যুদ্ধ ব্যতীত।'১২৯

আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন- 'রাসূলুল্লাহ (সা.) আর আমি একসাথে হাঁটছিলাম। তাঁর পরনে ছিল নাজরানি পোশাক। একজন বেদুইন এসে সেই কাপড় এমনভাবে টানতে শুরু করল, যার কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) কাঁধে ব্যথা অনুভব করছিলেন। তারপর সে সেটা চাইল। নবিজি তাঁকে তা উপহার হিসেবে দিয়ে দিলেন।'১৩০

ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় দেখার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অসহনীয় কষ্ট সইতে হয়েছে। উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দুটি দাঁত ভেঙে যায়। সাহাবিরা তাঁকে এই অবস্থায় দেখে কষ্টে বলে ফেলেন-'আপনি যদি তাদের বিরুদ্ধে শুধু একটি দুআ করতেন!' তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন- 'আমাকে তা করতে পাঠানো হয়নি। আমাকে মানবতার জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে।'১৩১

এমনকি আবু সুফিয়ানকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে নিয়ে আসা হলে তাকেও তিনি শর্তহীনভাবে ক্ষমা করে দিয়ে দুনিয়ার বুকে ক্ষমাশীলতার অনন্য উদাহরণ রেখে যান। অথচ এই আবু সুফিয়ান বারবার তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছে, তাঁর আপন চাচাকে হত্যা করেছে, সাথে সাহাবিদেরও।

তিনি আবু সুফিয়ানকে বলেন-'হে আবু সুফিয়ান! তোমার কি এখনও সময় আসেনি এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনার?' সে তখন জবাব দেয়-'আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কুরবান হোক। কতই-না দয়াবান ও উদার আপনি, যিনি আত্মীয়তার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখেন!'১৩২

মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি রক্তপাতহীন বিজয়ের চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন। তিনি এমন এমন মানুষদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, যা চিন্তা করাও অকল্পনীয়। অথচ ওই লোকগুলো তাঁকে প্রাণে মারতে চেয়েছিল। কাবা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তিনি সবার দিকে তাকিয়ে বললেন-'হে কুরাইশ! আজ তোমরা প্রতিদান হিসেবে কী চাও?' তাঁরা জবাব দেয়- 'হে আমাদের ভাই! আমরা আপনার থেকে ভালোটাই আশা রাখি।' তাদের জবাব শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের দিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন-'আজ কোনো অভিযোগ নেই। যাও তোমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হলো, তোমরা যা ইচ্ছা করো।'১৩৩

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উদারতার চূড়ান্ত উদাহরণ আরও আছে। তাঁর জানশত্রু ইকরামা ইবনে আবু জাহেল, যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অনেক ক্ষয়ক্ষতি করেছে, তাকেও ক্ষমা করা হয়। ওয়াশিকে ক্ষমা করে দেন, যে তাঁর প্রিয় চাচা হামজা (রা.)-কে হত্যা করেন। হিন্দাকে ক্ষমা করে দেন, অথচ সে হামজা (রা.)-এর শরীর ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে তারপর কলিজা মুখে নিয়ে চর্বণ করে। হাব্বার ইবনে আল আসওয়াদকে ক্ষমা করে দেন, যে রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর মেয়ে জয়নাব (রা.)-এর উটকে খেপিয়ে দিয়ে তাঁকে ফেলে দেন। ফলে তাঁর গর্ভপাত হয়। এর কারণেই তিনি বেশি দিন বাঁচতে পারেননি।

মাত্র চারজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। তারা হলো-আল হুয়াইরিত, যে জয়নাব (রা.)-কে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল, মদিনা থেকে মুসলিম হত্যা করে পালিয়ে আসা দুই যুবক এবং ইবনে খাতালের একজন দাসী। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
'হে বালক! কারও মনে কোনো প্রকার আঘাত কিংবা কষ্ট না দিয়ে তুমি যদি সকাল থেকে সন্ধ্যা পার করতে পারো, তাহলে সেটাই করো। এটাই আমার সুন্নাহ। আর যে আমার সুন্নাহকে ভালোবাসে, সে যেন আমাকে ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসে, সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে।'১৩৪

টিকাঃ
১২৭ মারিসা লেভিন, The Secret of Great Leadership: Forgiveness (June 15, 2017)
১২৮ লেভিন, The Secret of Great Leadership : Forgiveness
১২৯ মুসলিম ও বুখারি, আশ-শিফা গ্রন্থে বর্ণিত, পৃ.-৫৬; বুখারি: খণ্ড-৪, হাদিস ৭৬০
১০০ বুখারি: ৩৩৭
১৩১ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৫৫
১৩০২ আত তাবারানি ও আল বায়হাকি, ক্বাদি আইয়‍্যাদের আশ-শিফায় বর্ণিত, পৃ.-৫৭
১০০ জাদুল মাআদ, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৩৯৪
১৩৪ তিরমিজি, আশ-শিফা, পৃ.-২২৭

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 সবকিছুকে সহজ করা

📄 সবকিছুকে সহজ করা


নেতৃত্ব-সম্পর্কিত কোচ গোর্ডোন ট্রেডগোল্ড বলেছেন-'নেতারা শুধু কাজের দিকে তাকায় না। তারা কর্মীদের জীবনকে কষ্টসাধ্য বানানোর পরিবর্তে সরল করতে সাহায্য করে।'১৩৫

রাসূলুল্লাহ (সা.) সবকিছুকে সহজ করার জন্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করতেন। তবে ফরজ বিষয়ে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন-
'আল্লাহ আমাকে একজন শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যেন আমি কঠিন না করে বরং সহজ করি।'১৩৬

আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে চান না; বরং তিনি চান তোমাদের পবিত্র করতে এবং তাঁর নিয়ামত তোমাদের ওপর পূর্ণ করতে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।' সূরা মায়েদা : ৬

আয়িশা (রা.) বলেন-
'রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে যদি দুটি বিষয় নিয়ে আসা হতো, তাহলে তিনি সহজটাকেই বেছে নিতেন এবং বলে দিতেন-তা ভুল কিছু নয়।'১৩৭

কিছু কিছু কাজ তিনি উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে করতেন না। মসজিদ থেকে কোনো বাচ্চার ক্রন্দন শুনলে তিনি নামাজ লম্বা না করে ছোটো করে শেষ করে দিতেন। তিনি যখন মুয়াজ ও আবু মুসা আল আশআরি (রা.)- কে ইয়েমেনে পাঠান, তখন তাঁদের বলে দেন-
'কোনো কিছুকে কঠিন না করে সহজ করো। সুসংবাদ দিয়ে তাদের কাছে টেনে নিয়ো, দূরে নয়। মতপার্থক্য করে সরে যেয়ো না; বরং একসাথেই থেকো।'১৩৮

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের সাবধান করে দেন, যারা মাত্রাতিরিক্ত নফল ইবাদত করে নিজের ওপর জুলুম করে। তিনি বলেন-
'অবশ্যই ইসলাম অনেক সহজসাধ্য। এটাকে কষ্টসাধ্য বানিয়ো না। বানালে নিজেই পরাজিত হবে। তাই মধ্যপন্থা অবলম্বন করো। ভালো কাজ করো, আনন্দিত হও, আল্লাহর কাছে সকাল, বিকাল ও মধ্যরাতে সাহায্য চাও।'১৩৯

টিকাঃ
১৩৫ গর্ডন ট্রেডগোল্ড, '9 Simple Reminders That Will Make You a Better Leader.' (Oct 8, 2017)
১৩৬ মুসলিম: ৩৯
১৩৭ বুখারি: ৭৬০
১৩৮ বুখারি: ১৫২
১৩৯ বুখারি: ৩৯

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 রহমাতুল্লিল আলামিন

📄 রহমাতুল্লিল আলামিন


আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-কে খলিফা বানিয়ে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। পৃথিবীতে তাঁকে খলিফা বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, মালিকানা করে নয়। আল্লাহ বলেন-
'নিশ্চয় আমি জমিনে একজন খলিফা সৃষ্টি করছি।'১৪০

সকল মানুষই আদমের সন্তান, তাঁরই প্রজন্ম। তাই সবাই পৃথিবীতে খলিফার সিলসিলা নিয়ে বেঁচে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন-
'এই পৃথিবী অনেক সুন্দর ও সবুজ-শ্যামলে ভরপুর এবং আল্লাহ তোমাদের খলিফা হিসেবে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি দেখেন কীভাবে তোমরা কার্য সম্পাদনা করছ।'১৪১

আমরা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখব। তিনিই আমাদের একমাত্র ত্রাণকর্তা। তবে আমাদের কাজ ঠিকঠাকভাবে করে যেতে হবে। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহর সৃষ্টিরাজিকে সম্মান দিতে হবে। কুরআন আমাদের বলে-
'তুমি কি দেখোনি, আসমান ও জমিনে যারা আছে, তারা এবং সারিবদ্ধ হয়ে উড়ন্ত পাখিরা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে?' সূরা নুর: ৪১

মহামহিম আল্লাহ পৃথিবীকে একটি নিয়মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছেন। এরপর এর ভারসাম্য রক্ষার জন্য সুন্দর আন্তঃসম্পর্কের সৃষ্টি করেছেন।
'তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত ও স্থাপন করেছেন মিজান, যাতে তোমরা ভারসাম্য লঙ্ঘন না করো। তোমরা ন্যায়ের সাথে মাপ ঠিক রেখো এবং মাপে কম দিয়ো না।' সূরা রহমান : ৭-৯

এই আয়াতটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসংক্রান্ত ধারণার ভিত্তি। কিন্তু আধুনিক মানুষেরা পরিবেশের এই ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। ফলে নানাবিধ দূষণ ও সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। যার ফলাফল এখন দেখতে পাচ্ছি। কুরআন পূর্বেই উল্লেখ করেছে-
'মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফ্যাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।' সূরা রূম: ৪১

রাসূলুল্লাহ (সা.) হলেন রহমাতুল্লিল আলামিন। তাই তিনি সব সময় প্রাণীদের ওপর দয়াশীল ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তাদের আঘাত না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একবার এক গাধার মুখ চাকুকাটা দেখতে পেয়ে তিনি বলেন-
‘আল্লাহর লানত তার ওপর, যে এই কাজ করেছে। যদি এটা করতেই হয়, তাহলে কম সূক্ষ্ম জায়গায় করো। ১৪২

একবার একটি সুন্দর পাখি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে চারিদিকে উড়ছিল। তিনি তখন একটি গাছের নিচে অবস্থান করছিলেন। তিনি বললেন—‘এই পাখি আমার কাছে নালিশ করেছে, তোমাদের মধ্যে কেউ একজন তার বাচ্চা নিয়ে এসেছে। ফলে সে কষ্টে ভুগছে। তোমাদের কেউ এই কাজ করে থাকলে বাচ্চাগুলোকে ফেরত দাও।’ নবিজির কথা শুনে এক সাহাবি তা দিয়ে দেন। অতঃপর সন্তানদের সাথে পুনর্মিলিত হতে পেরে মা পাখিটি খুব উৎফুল্ল হয়। ১৪৩

রাসূল (সা.) পশুদের ভূমিকার ওপর জোর দিতে একটি ঘটনা বলেন—
‘পিপাসায় কাতর একজন লোক একটি কুয়ার পাশে এলো। অতঃপর কুয়া থেকে পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করল। এ সময় দেখল—একটি কুকুর পিপাসায় কাতর, পানির জন্য ছটফট করছে। সে তাড়াতাড়ি কুয়া থেকে পানি তুলে কুকুরটিকে খাওয়াল। আল্লাহ তার ওপর খুশি হয়ে তার সকল গুনাহ মাফ করে দিলেন।’ ১৪৪

মানুষজন নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন—‘প্রাণীদের সেবা করলে কোনো সওয়াব আছে কি?’ তিনি উত্তর দেন—‘হ্যাঁ, কোনো প্রাণীর সেবা করলে সওয়াব আছে।’

তিনি গাছ রোপণে বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন, যদিও লোকটা মৃত্যুশয্যায় থাকে। তিনি বলেছেন—
‘যদি কিয়ামত চলে আসে এবং তোমাদের মধ্যে কারও হাতে একটিমাত্র বীজ থাকে, তাহলে সে যেন দ্রুত তা রোপণ করে।’ ১৪৫

আনাস ইবনে মালেক (রা.) আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
‘মুসলমানদের মধ্যে কেউ যদি একটি গাছ রোপণ করে বা বীজ বপন করে, তারপর কোনো পাখি বা কোনো ব্যক্তি বা কোনো প্রাণী তা থেকে খায় বা উপকৃত হয়, তাহলে তা একটি দানশীল কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে।’ ১৪৬

টিকাঃ
১৪০ সূরা বাকারা: ৩০
১৪১ মুসলিম, আবু সাইদ খুদরি হতে বর্ণিত
১৪২ মুসলিম
১৪০ আয়াজ আল কারনি, Mercy to Humanity, pp. 259-260.
১৪৪ বুখারি: ৪৬
১৪৫ মুসনাদে আহমাদ: ১২৪৯১
১৪৬ বুখারি: ০১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00